Magic Lanthon

               

তামান্না মৌসী

প্রকাশিত ২৬ মার্চ ২০২৪ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেখা থেকে লেখা

কলুষিত যুদ্ধে চুরি হওয়া শৈশব নিয়ে ‘ইনোসেন্ট ভয়েসেস’

তামান্না মৌসী



কালরাত্রি। শব্দটা শুনলেই মাথার মধ্যে একটা দৃশ্যপট ভেসে ওঠে¾ভারী বুট পায়ে একদল সৈন্য অস্ত্র বাগিয়ে জিপ থেকে নামছে। হেডলাইটের আলোয় কিছু নিরীহ মানুষ। লাথি দিয়ে তাদের মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে গুলি চালাচ্ছে ভারি বুট পরা সৈন্যরা। মধ্যরাতের এ নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ইতিহাসে অপারেশন সার্চলাইট নামে পরিচিত। আর এ অপারেশন পাক সেনাবাহিনী চালিয়েছিলো নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর। এর মাধ্যমে তারা কৌশলে আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার পরিকল্পনা করে। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের সেই মনোকামনা অপূর্ণই থেকে যায়।

মাত্র নয় মাসের গেরিলা যুদ্ধে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশিরা নিজেদের ভূখণ্ড স্বাধীন করে। যুদ্ধের ইতিহাসে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে কম সময়ে ফলাফলে পৌঁছানোর যুদ্ধ। একটা সুপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক হাজার সামরিক-আধাসামরিক যোদ্ধার বিজয় রীতিমত অকল্পনীয়। কিন্তু বিজয়ী দেশকে এজন্য কম মূল্য দিতে হয়নি! তাই সন্তানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা আমাদের কাছে চরম মূল্যবান। তাহলে দীর্ঘ এক যুগ ধরে যারা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে, তাদের কাছে এটার মূল্য কতো খানি হতে পারে ভাবুন একবার!

মধ্য আমেরিকার দেশ এল সালভাদরের মানুষকে কিন্তু এই দুর্গম পথই অতিক্রম করতে হয়েছে। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে দেশটির সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের সঙ্গে বামপন্থি বিদ্রোহী দলগুলোর সংগঠন আমব্রেলা পার্টির গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তা চলে ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদি এ যুদ্ধ যে কারণে সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত তা হলো শিশুদের সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা। এ নিয়ে অবশ্য বিস্তর লেখালেখি, এমনকি চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। আন্ডার ফায়ার (১৯৮৩), ইন দ্য নেম অব দ্য পিপল (১৯৮৫), সালভাদর (১৯৮৬), ভোসেস ইনোসেন্তেস (Voces Inocentes, ২০০৪) ও রিটার্ন টু এল সালভাদর¾এই চলচ্চিত্রগুলো যুদ্ধের ভয়াবহতা বেশ ভালোভাবেই তুলে ধরেছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে ভোসেস ইনোসেন্তেস বা ইনোসেন্ট ভয়েসেস। আত্মজীবনীমূলক লেখা থেকে এর চিত্রনাট্য বলেই হয়তো এটি মুগ্ধ করেছে দর্শকদের।

খ.

বৃষ্টির রিমঝিম ছন্দের সঙ্গে যুদ্ধের দামামা বাজানো ইনোসেন্ট ভয়েসেস চাভা নামের এক ১২ বছর বয়সী বালকের পথচলার গল্প। মধ্য আমেরিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ এল সালভাদরে যার শৈশব কাটে তীব্র আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। চাভা প্রতিনিয়ত চায় কোনোমতে যুদ্ধের ডামাডোল এড়িয়ে একটু শান্তিতে থাকতে। কিন্তু ৮০র দশকের সেই গৃহযুদ্ধময় পরিস্থিতি কারো চাওয়া না-চাওয়া মানেনি। তাই যুদ্ধ চাভার পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। তাইতো স্কুল কিংবা খেলার জায়গা, সবখান থেকেই শিশুদের ধরে নিয়ে যেতে থাকে সেনাবাহিনী। আর তাদের দলে যোগ দেওয়ার পর কৈশোরের কোমলতা ভুলে শিশুগুলোও কেমন জানি রুক্ষ-শুষ্ক হয়ে পড়ে। যেমনটি হয় চাভার বন্ধুরাও।

যুদ্ধে শিশুসেনা ব্যবহারের এ চলচ্চিত্রটি নিয়ে যখন আমরা কথা বলছি, ঠিক তখনো বিশ্বজুড়ে ২০টিরও বেশি যুদ্ধে তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে। কোয়ালিশন টু স্টপ দ্য ইউজ অব চাইল্ড সোলজার্স-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রতিটি সশস্ত্র যুদ্ধেই শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ডজনখানেক জঙ্গি-মিলিশিয়া এবং অন্তত ১০টি দেশের সরকারি বাহিনীতে রয়েছে শিশুসৈন্য। শিশুরা নাকি অনেকটা নিরুপায় হয়েই এ কাজে লাগছে বলে দাবি ইনোসেন্ট ভয়েসেস-এর চিত্রনাট্যকার অস্কার অর্লান্দো তোরেস-এর। তার জীবনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে এ চলচ্চিত্রের গল্প। তোরেস বলেন, ১২ বছরের যেকোনো ছেলেকে আপনি জিজ্ঞেস করুন, সে যুদ্ধে যেতে চায় কি না। নির্দ্বিধায় না বলবে সে। কিন্তু তার পরও তাদের যুদ্ধে যেতে হয়।

গ.

ইনোসেন্ট ভয়েসেস মুক্তি পাওয়ার পর দ্য গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়¾১২ বছরের একটি শিশুর জীবনে যে এতো অনিশ্চয়তা থাকতে পারে, এ চলচ্চিত্রটি না দেখলে বোঝা সম্ভব হতো না। ১৯৮০ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত এল সালভাদরে চলা গৃহযুদ্ধে বর্বর সেনাবাহিনীর ভূমিকা এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। আর তোরেসের আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে পরিচালক লুইস মাদুরো কাজটি বেশ ভালোভাবেই করেছেন। দেশটির গ্রামাঞ্চলে মায়ের সঙ্গে বাস করা এক বালক এ চলচ্চিত্রের নায়ক। যার বেশিরভাগ বন্ধুকেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। কবে জোর করে তাকেও ধরে নিয়ে যাবে সেনারা, এ আতঙ্কে তার দিন কাটে। জানা এমনই একটি ঘটনাকে পর্দায় হাজির করেছেন নির্মাতা। আর অভিনয়শিল্পীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। চাভার চরিত্রে কার্লোস পাদিয়ার অনবদ্য অভিনয়ে চলচ্চিত্রটির আই এম ডিবি (ইন্টারনেট মুভি ডাটাবেজ; অ্যামাজন ডটকম এর মালিক। এরা সারা পৃথিবীর সব চলচ্চিত্র, টিভি অনুষ্ঠান, ভিডিও গেমস সম্পর্কিত তথ্য অনলাইনে সংগ্রহ করে রাখে।) রেটিং ১০-এ হয়েছে আট।

ঘ.

কথায় বলে¾সুখস্মৃতি মস্তিষ্ক থেকে নয়, উঠে আসে হৃদয় থেকে। অনুভব করতে না পারলে এটা মনে রাখা বৃথা। ইনোসেন্ট ভয়েসেস-এর ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি করে সত্য। এখানে নির্মাতা লুইস মাদুরো গৃহযুদ্ধ, মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা গেরিলা হামলার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তোরেসের নিজস্ব চিন্তাকে। তাইতো গৎবাঁধা কোনো কাহিনি হয়ে ওঠেনি চলচ্চিত্রটি। এক যুগের তিক্ত এ যুদ্ধে মারা গেছে কমপক্ষে ৭৫ হাজার মানুষ। আর দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে আরো কয়েক লক্ষ। তাইতো চলচ্চিত্রের শুরুতেই কেন্দ্রীয় চরিত্র চাভাকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় সে পাশের বন্ধুকে প্রশ্ন করে, ‘আমরা যদি কিছুই না করে থাকি, তাহলে কেনো তারা আমাদের মেরে ফেলতে চাইছে?’

এর পরই ফ্ল্যাশব্যাকে তুলে ধরা হয় একশো ২০ মিনিটের পুরো চলচ্চিত্র। গৃহযুদ্ধ কবলিত এল সালভাদরের গেরিলা বাহিনী চাভার গ্রামের স্কুলে প্রায়ই টহল দিতে এসে ১২ বছরের বেশি বয়সী ছেলেদের ধরে নিয়ে যায়। সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ওই শিশুদের আবার টহল দিতে ফেরত পাঠানো হয় গ্রামে। কিন্তু তখন ওই সব শিশু একেবারেই অন্য মানুষ। হাতে রাইফেল আর ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে পুরোদস্তুর পুরুষ হয়ে ওঠে তারা। এমনকি কদিন আগের সহপাঠীকে পর্যন্ত ধমক দেয়। বন্দুকের মুখে জিম্মি করে তাদের নিয়ে হাসাহাসি করে।

শুধু গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেওয়া বালকেরাই নয়, বাকি শিশুদের জীবনেও অনেক পরিবর্তন আসে। বাচ্চাগুলো হুট করেই যেনো বড়ো হয়ে যায়। যুদ্ধের নির্মমতায় তাদের শিশুসুলভ বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। সে জায়গা দখল করে রুক্ষ-শুষ্ক গাম্ভীর্য। এমন পরিস্থিতিতে চাভাকেও একসময় তার মা বাড়ির একমাত্র পুরুষ হিসেবে দায়িত্ব নিতে বলেন দুই বোনের। চাভার বাবা বাড়িতে থাকে না। যুদ্ধের কারণেই তিনি পালিয়ে গেছেন মার্কিন মুল্লুকে। মাকেও উপার্জনের আশায় বেরুতে হয় ঘর ছেড়ে। তখন দেখাশোনা করার জন্য চাভা ছাড়া তো কেউ নেই! আর তাদের বাবা ফিরে আসবে-এই আশায় বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতেও নারাজ চাভার মা। তার পরও শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটা সময় তাকে বাড়ি ছেড়ে গিয়ে থাকতে হয় মায়ের বাড়িতে।

ঙ.

এক ঝড়-বৃষ্টির রাতে বোনদের নিয়ে পড়াশোনা করছিলো চাভা। সেসময় হুট করেই তাদের এলাকায় শুরু হয় গোলাগুলি। ছোটো তিন শিশু তাতে চমকে উঠলেও, ভীত হয় না। অভ্যাসবশতই তারা দরজা-জানালা বন্ধ করে খাটের নীচে লুকায়। তবে একেবারে ছোটো মেয়েটি কান্না জুড়ে দেয়। তাকে থামাতে সেই সংঘর্ষের মধ্যেই মায়ের লিপস্টিক দিয়ে জোকার সাজে চাভা। একসময় ক্লান্ত হয়ে বাচ্চারা সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ে। ওদিকে তাদের মা কাজ শেষে বাস থেকে নেমেই দেখেন লণ্ডভণ্ড এলাকা। শঙ্কিত মা সন্তানদের নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ঘরে ঢোকেন। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন অক্ষত বাচ্চারা খাটের নীচে ঘুমিয়ে আছে। এ তো গেলো এক রাতের কাহিনি। রোজই তাদের এমন দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি হতে হয়। একদিনের সংঘর্ষে তো চাভার বোনের বান্ধবী নিহত হয়। এদিন অবশ্য চাভার গেরিলা যোদ্ধা মামা বেটো ঘরে ফিরেছিলেন। আবারও সেই বৃষ্টি। ঝুম বৃষ্টিতে বাচ্চাদের সান্ত¡না দিতে তিনি গিটার বাজিয়ে গান ধরেন। আর যাওয়ার সময় চাভাকে একটি ওয়াকিটকি-রেডিও (একই সঙ্গে কথা বলা ও রেডিওর গান শোনার যন্ত্র) উপহার দিয়ে যান। যাতে এলাকায় সেনাবাহিনীর কর্মতৎপরতা সম্পর্কে সহজেই খবর দিতে পারে চাভা।

গেরিলা কিংবা সরকারি বাহিনী, উভয়ের সামনেই গান শোনার ভান করে কানে রেডিও লাগিয়ে নিশ্চিন্ত ভাব নিয়ে চলে চাভা। যেনো বিশ্বসংসারের কোথায় কী ঘটছে, এ নিয়ে কোনো চিন্তাই তার নেই। এমনকি সৈন্যদের জলপাই রঙের গাড়ির সামনে দিয়েও কানে রেডিও লাগিয়ে নেচে নেচে স্কুলে যায় সে! একটা সময় চাভার এ কৌশল সেনারা ধরে ফেলার উপক্রম হলে, সরকারি বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ যাজক গির্জার মাইকের সঙ্গে রেডিও জুড়ে দিয়ে তাকে রক্ষা করেন। তিনি সেনাদের বোঝাতে চান, চাভা আসলে রেডিও দিয়ে গানই শোনে। এভাবেই সরকারি বাহিনীর হাত থেকে বেঁচে যায় সে।

এর আগেও কয়েকবার সরকারি বাহিনীর অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দেখা যায় এ যাজককে। সেজন্য অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাকে মাশুলও দিতে হয়। চাভার ঘটনায় গির্জার ভিতরেই তাকে মারধর করে সরকারি সৈন্যরা। যাহোক, চাভার এই রেডিওপ্রীতিতে একসময় বিরক্ত হন তার মা; বিপদের আশঙ্কায় তিনি সেটি ভেঙে লুকিয়ে রাখেন সেলাইয়ের বাক্সে।

চ.

অলিভার স্টোনের সালভাদরও (১৯৮৬) এই গৃহযুদ্ধ নিয়েই নির্মিত। সেখানে এক সাংবাদিকের জবানিতে উঠে এসেছে যুদ্ধের বর্ণনা। যিনি উভয় দলের সংবাদ সংগ্রহের চেষ্টা করতেন। তবে যুদ্ধের চলচ্চিত্র হিসেবে ইনোসেন্ট ভয়েসেস সব দিক থেকেই স্বতন্ত্র। কারণ, এ চলচ্চিত্রের যুদ্ধ একটি শিশুর দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণিত। সবচেয়ে বড়ো কথা, কোনো রাজনৈতিক কচকচানি নেই এতে। আছে শুধু অনিশ্চিত শৈশব আর শিশুযোদ্ধাদের বিস্তারিত বিবরণ এবং তাদের মানসিক অবস্থার বর্ণনা।

চাভার মামা গেরিলা বাহিনীর সদস্য বলে সে হয়তো তাদের পক্ষ সমর্থন করে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, চাভা গেরিলাদের পক্ষে। অন্যদিকে যেকোনো মুহূর্তে সরকারি সেনারা তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে আর্মিতে যুক্ত করাতে পারে- এজন্য চাভা ভয় পায় সরকারি দলকে। যদিও উভয় পক্ষই সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই আচরণ করে। তাদের নীতি অনেকটা এমন- আমার দলে আসো, নয়তো মরো।

ছ.

টিকে থাকার ইতিহাস ইনোসেন্ট ভয়েসেস। এতে শিশুদের ওপর যুদ্ধের প্রভাবকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তার প্রশংসা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও। তাদের মতে, বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র যুদ্ধস্থলে বসবাসকারী শিশু এবং তাদের বাবা-মায়ের সাহসিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রে যুদ্ধ মহৎ কিছু নয়, আবার কেবল উগ্র সহিংসতাও নয়, কিন্তু যুদ্ধ! তাই শিশুদের দেখার উপযোগী।

যুদ্ধের মধ্যেই জীবনের বয়ে চলা। অন্যদের চেয়ে চাভা যেনো জীবনটাকে অনেকখানি সহজভাবেই নেয়! নিত্যকার ছোটোখাটো বিষয়গুলো এতো কিছুর মধ্যেও তাকে আনন্দ দেয়। আশপাশের চরম দারিদ্রও তাকে দমাতে পারে না কোনোভাবে। বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে নিয়মিত স্কুলে যায়। একটা সময় পরিবারকে সাহায্য করতে বাসের চালকের সহযোগীর (হেলপার) কাজও করে। এর মধ্যে এমনকি এক সহপাঠীর প্রতি দুর্বলও হয়ে পড়ে সে। লুকিয়ে লুকিয়ে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে যায়। গোলাগুলির মধ্যেই ছাদের উপর আড্ডা দেয় তার সঙ্গে। একটু চোখাচোখি হবে, এই আশায় তার বাড়ির সামনে ঘুরঘুরও করে। আর মেয়েটি জানালা খোলামাত্রই তার মনোযোগ কাড়তে এলোমেলো নাচ জুড়ে দেয় রাস্তার মধ্যেই। আবার পালিয়ে নানির বাড়ি যাওয়ার পর আম গাছে চড়ে আমও খায়। বোঝা যায়, চিরচেনা এই শৈশবকে থামাতে পারেনি যুদ্ধ, পারবেও না কোনো দিন।

জ.

শুরুতেই রিমঝিম বৃষ্টির কথা বলেছি একবার। অসাধারণ সেই দৃশ্য অনেকদিন মনে রাখার মতো। আরেকটি দৃশ্যের কথা না বললেই নয়¾সরকারি বাহিনীর হামলা শুরু হলে এলাকার সব শিশু ছাদে লুকিয়ে পড়ে। ভয়ঙ্কর সহিংসতার মধ্যে জীবনের জন্য প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার এ খেলা একই সঙ্গে নান্দনিক আবার মর্মান্তিকও! এল সালভাদরের ঘটনা হলেও অবশ্য পুরো চলচ্চিত্রটিরই চিত্রায়ণ হয়েছে মেক্সিকোতে। এমনকি অভিনয়শিল্পীরাও কেউ এল সালভাদরের নন। একে অবশ্য মোটেও ভালোভাবে নেয়নি দেশটির নাগরিকরা।

শেষে এসে আবার ফিরতে হচ্ছে সেই শুরুতেই। অর্থাৎ বৃষ্টির মধ্যে জঙ্গলে শিশু সৈন্যদের এগিয়ে চলা। চলচ্চিত্রটির পুরো কাহিনি ফ্ল্যাশব্যাকে। ভালো করে দেখলে অবশ্য সময়ের পার্থক্যটা বোঝা যায়। নায়ক চাভাও আছে সেখানে। একসময় সেও যোগ দেয় গেরিলা বাহিনীতে। পরে অবশ্য ধরা পড়ে সরকারি সেনাদের হাতে। তারাই তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অজ্ঞাত কোনো জায়গায়। সেখানেই হয়তো সে মারা পড়বে। এই একটি দৃশ্যই যেনো যুদ্ধে শিশু সৈন্যদের অনিশ্চিত জীবনকে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। অনেকটা নচিকেতার সেই গানটারই যেনো চিত্রায়ণ¾

ভিড় করে ইমারত, আকাশটা ঢেকে দিয়ে,

চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনা রোদ।

ছোটো ছোটো শিশুদের শৈশব চুরি করে,

গ্রন্থ-কীটের দল বানায় নির্বোধ।

তবে এখানে পার্থক্যটা কেবল ‘গ্রন্থ-কীটের’ জায়গায় দখলদারিত্বের উন্মাদনায় অস্ত্রধারী কিছু মানুষে।

 

লেখক : তামান্না মৌসী, বর্তমানে সমকাল-এ শিক্ষানবিশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত

tammcj@gmail.com

তথ্যসূত্র

১.  https://www.nationalgeographic.com/

২.  https://www.theguardian.com/film/2006/aug/11/drama.worldcinema

৩. https://tinyurl.com/2s3bxp9c




বি. দ্র. প্রবন্ধটি ২০১৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ম্যাজিক লণ্ঠনের ৯ম সংখ্যায় প্রথম প্রকাশ হয়।



এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন