Magic Lanthon

               

ইব্রাহীম খলিল

প্রকাশিত ১৩ জুন ২০২৩ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি থেকে ঋত্বিক বিপ্লবের দুই ধারা

ইব্রাহীম খলিল

বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় সাতশো কোটি! বাড়তে বাড়তে এ সংখ্যা হয়তো একসময় হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের সংখ্যা? এটা কি বাড়ছে? নাকি কমতে কমতে শূন্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে! যদি শূন্যের দিকেই ধাবিত হয়, তাহলে আমাদের অবস্থান কোন্‌দিকে? আচ্ছা, ধরে নিলাম আমরাও মানুষ; কিন্তু মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক উঁচিয়ে সে দাবি করতে পারবো তো? পারলে অস্বস্তির কোনো কারণ নেই; থাকার কথাও নয়। কারণ মানসিক শান্তিই তো মূল কথা! কিন্তু যদি না পারি? সেক্ষেত্রে এই খ্যাতি, প্রতিপত্তি দিয়ে কী হবে? আর নিজেকে ‘মানুষ’ দাবি করে অন্য মানুষকে যেভাবে প্রতারণা, অত্যাচার, নির্যাতন করেছি তার হিসাবই বা নিজেকে কীভাবে দেবো? আমরা হয়তো সংসারের ক্লেদ-কালিমা, মান-অপমানবোধ হাঁসের পাখার মতো ঝেড়ে ফেলার দুরূহ কৌশল শিখেছি, ফলে এর কিছুই আমাদের আর গায়ে লাগে না। কিন্তু তার পরও আমাদের মধ্যে ‘গোটা’ জীবনটা নিয়ে একটু হিসাবনিকাশ করে দেখার তীব্র আগ্রহ কি কখনো জেগেছে? যদি না জাগে তাহলে মৃত্যুর আগে আমাদের বোধশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ হয়ে গোটা জীবনের ছবি চলচ্চিত্রের মতো চোখের সামনে অবশ্যই ভেসে উঠবে। সেটা নির্বান্ধবপুরী কিংবা জনসমাগমপূর্ণ কোনো ভূস্বর্গ যেখানেই থাকি না কেনো।

মেদিনীপুরের ক্ষুদিরাম বসুর কথাই ধরুন। ১৯০৮ সালে ১৯ বছর বয়সী এ তরুণ অত্যাচারী ব্রিটিশ বিচারক কিংস্‌ফোর্ড’কে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ‘নির্বিকার’ মুখে স্বীকার করে নেন। বিচারের একপর্যায়ে দেশের তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলতে চাইলে সন্ত্রস্ত বিচারক বলেন, ‘ওহ, নো, নেভার। তোমাকে কিছু বলতে দেওয়া হবে না।’ ক্ষুদিরাম শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘আমি আবার আসবো।’

ক্ষুদিরাম বসুরা যুগে যুগে তাই আসেন, আসতে থাকেন। কারণ পরাধীন-নিপীড়িত-শোষিত মানুষের মধ্যে তারা যে ফিরে আসার কথা দিয়েছিলেন। অনেক সময় তাদের এই দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে লেখা হয় গান, কবিতা; নির্মাণ হয় নাটক-চলচ্চিত্র। যদিও এই গান, কবিতা, নাটক কিংবা চলচ্চিত্র-নির্মাণে তাদের কিছু যায় আসে না। কারণ তারা খ্যাতি বা যশ নয়, একান্তই স্বদিচ্ছায় আগুন নিয়ে খেলেছেন; সে আগুনের উত্তাপকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। এ কারণেই হয়তো মানুষ তাদেরকে জানতে চায়, বুঝতে চায়; যে কর্ম করে তার সমর্থন চায়। ২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া এমনই দুটি চলচ্চিত্র সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের জাতিস্মর ও কমলেশ্বর মুখার্জির মেঘে ঢাকা তারা। যেখানে কেউ ভাষা, ধর্মকে ভালোবেসে সমতার কথা বলেছেন; কেউ ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শোষণ, দুঃখ, দুর্দশা দেখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমতার জন্য গলা ফাটিয়েছেন। চিত্রায়িত দুই প্রধান চরিত্র দুই মেরুর ভিন্ন সময়ের হলেও তাদের লক্ষ্য ছিলো অভিন্ন। এদের একজন প্রথম ইউরোপিয় বাংলা ভাষার কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, অন্যজন আমাদের ঋত্বিক কুমার ঘটক। লেখা জাতিস্মরমেঘে ঢাকা তারাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি অ্যান্টনি ও ঋত্বিককে ধরে এগিয়ে যাবে।

চেনা সুরে অচেনা সব পথিক

১৮ শতকের শেষের দিকে শিল্পবিপ্লব শুরু হলে সারাবিশ্বে নতুন ধরনের পরিবর্তন আসে। সে পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সমাজজীবনেও ছড়িয়ে পড়েছিলো। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ইংরেজদের উপনিবেশ থাকায় শিল্পবিপ্লবটা এখানে ঠিক হয়ে ওঠেনি। তবে সমাজে সেটার একটা প্রভাব পড়েছিলো। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯ শতকে কলকাতায় পাশ্চাত্য-আদর্শ প্রসারের ফলে সমাজে নবীন তরুণদের মধ্যে একধরনের জাগরণ লক্ষ করা যায়। যারা কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। সেই সময় তারা ইয়ংবেঙ্গল বা ইয়ংক্যালকাটা নামে পরিচিতি লাভ করেন। তখন এই তরুণদের যিনি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, তিনি হলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও নামের এক পর্তুগিজ ফিরিঙ্গি। যদিও সেসময়ে ফিরিঙ্গিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের হৃদ্যতা খুব কমই ছিলো। কিন্তু ডিরোজিও ব্যতিক্রম ছিলেন; জাতিতে পর্তুগিজ হলেও তিনি কিন্তু জন্মেছিলেন কলকাতার ধর্মতলায়। যে কারণে হয়তো এদেশকেই তিনি মাতৃভূমি মনে করতেন।

১৯ শতকের বঙ্গদেশে মুক্তবুদ্ধির যে চর্চা আরম্ভ হয়, হিন্দু কলেজ ছিলো তার সূতিকাগৃহ। আর সেই বুদ্ধিচর্চার প্রবর্তক ও গুরু ছিলেন ডিরোজিও’ই। আপ্তবাক্য ও পুরনো মূল্যবোধকে প্রশ্ন করা; যূথবদ্ধ বিশ্বাসকে অগ্রাহ্য করে নিজের দৃষ্টিতে জগৎ ও জীবনকে দেখা; প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সংজ্ঞা অনুসারে ভালো-মন্দের বিচার না করে যুক্তি ও উদারতা দিয়ে প্রতিটি জিনিসের মূল্যায়ন করা; প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস ও আচার-আচরণকে অগ্রাহ্য করা; এমনকি ঈশ্বর আছেন কি নেই, সেটি নিয়ে ১৮৩০-এর দশকে যে বিতর্কের সূচনা হয়, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব মাত্র ২৩ বছর বয়সে পরপারে চলে যাওয়া এই তরুণ শিক্ষক ডিরোজিও’র।

খুব কাছ থেকে ডিরোজিও প্রত্যক্ষ করেছিলেন এখানকার দরিদ্রতাকে, দেখেছিলেন এর কষাঘাতে কীভাবে মানুষ দাসে পরিণত হয়; ধর্মান্ধতার জন্য কীভাবে মানুষ অবলীলায় নিজেকে বিকিয়ে দেয়। এটা সহ্য করতে না পেরেই হয়তো

ব্রিটিশযুগে পরাধীন ভারতবর্ষে, কোম্পানির আমলও শেষ হয়নি যখন, কিশোর-কবি ডিরোজিও তখন ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন ও গান রচনা করেছিলেন। স্বাধীন ভারতের বেদনা ও কামনা তাঁরই কাব্যে স্বতঃস্ফূত ছন্দে সর্বপ্রথম মূর্ত হয়ে উঠেছিলো।

অবশ্য ডিরোজিওর সেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিলো প্রায় একশো বছর পর। কিন্তু স্বাপ্নিক সেই স্বাধীনতার নামে ভারত ভাগকে মেনে নিতে পারেননি অনেকেই। তারা মনে করতেন, এটা স্বাধীনতা নয়,স্বাধীনতার নামে নতুনভাবে শোষণ। এমন মনে করনেওয়ালাদেরই একজন ঋত্বিক কুমার ঘটক, নিজেকে যিনি, ‘... একজন মাতাল। ভাঙা বুদ্ধিজীবী, ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল বলতেন। আর দেশভাগ নিয়ে বলতেন, ‘ওরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভাগ করতে পেরেছে, কিন্তু আমাদের হৃদয়কে আলাদা করতে পারবে না।’ তার সামনে পশ্চিম বাংলা, পূর্ব বাংলার প্রশ্ন আসলে কড়া ভাষায় জবাব দিতেন— ‘বাংলার আবার এপার ওপার হয় নাকি মশাই?’

ডিরোজিও, ঋত্বিকের কেউই গতানুগতিক ধারায় ভাবতে পারেননি। বাংলার মানুষের দুঃখ, হাহাকার তাদেরকে যে অস্বস্তিতে রেখেছিলো, তা-ই হয়তো তাদেরকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। ফলে ধর্মও তাদের কাছে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ধর্ম নিয়ে তাদের মতাদর্শ ছিলো প্রায় একই রকম। ডিরোজিও বলতেন, ‘ধর্ম বা ঈশ্বর সম্বন্ধে চূড়ান্ত সত্য কি তা আমি আজও জানি না। আমার অনুসন্ধান শেষ হয়নি এখনো।’ তিনি আরো বলতেন, ঈশ্বর যদি কেউ থাকেন তো থাকুক, যাদের অফুরন্ত অবসর আছে তারা স্বর্গলোক কোথায় তার হদিস করুন, কিন্তু ইহজীবনে মানুষই ঈশ্বর, মানুষই সর্বময় প্রভু এবং মানব চিন্তাই ঈশ্বর চিন্তার নামান্তর। অন্যদিকে স্পষ্টবাদী ঋত্বিক একই কথা বললেন অন্যভাবে, ‘দেব-দেবী আমি মানি না, ভগবান আমার পোষায় না। আমার কথা আছে, বক্তব্য আছে, তা আমাকে বলতে হবে।’ তিনি হয়তো সেটা বলেওছিলেন, মানুষের জন্যই।

কলকাতায় ডিরোজিও’র সময়কালে আমরা হ্যান্সম্যান অ্যান্টনি বা অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি নামে আরেক পর্তুগিজকে দেখি। যিনি কর্মসূত্রে বাবার ব্যবসা দেখার জন্য এসে এদেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার বিশেষ করে সনাতন ধর্মের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। বিয়ে করেন হিন্দু বিধবাকে। তবে বাংলার এতো সবের মধ্যে তার প্রধান আগ্রহের বিষয় ছিলো কবিগান। এ নিয়ে তার আগ্রহ, সাধনা পরবর্তী সময়ে এমন উচ্চ পর্যায়ে গিয়েছিলো যে, পরে তিনি ‘কবিয়াল অ্যান্টনি’ বলে পরিচিতি পান। নিজে অসংখ্য গান রচনা করে হারিয়েছিলেন বিখ্যাতসব কবিয়ালকে। এছাড়া ফিরিঙ্গি হয়েও করেছেন সনাতন ধর্মের কালী’র সাধনা। এজন্য তাকে অনেক অপমান সহ্য করে লড়তে হয়েছিলো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।

অ্যান্টনি ও ডিরোজিওর সমকালীন প্রসিদ্ধ বাঙালিদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায় অন্যতম। যিনি সেই শম্বুকগতির যুগেই ইউরোপ-আমেরিকার ভাবুকদের সঙ্গে চিন্তার আদান-প্রদান করেছিলেন। সুদূর ইউরোপের কোন্‌ দেশে কী ঘটলো, সেকালের দুরূহ যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যেও সেগুলোর খবরাখবর রাখতেন তিনি এবং সে সম্পর্কে নিজের প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করতেন। তিনি কেবল নিজেই আধুনিক ছিলেন না, গোটা ভারতবর্ষকেই মধ্যযুগীয়তা থেকে আধুনিকতার আলোকে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতবর্ষে পুরুষরা স্ত্রীলোককে প্রতারিত করলে, সেটা যাতে দোষের মধ্যে গণ্য করা হয়, সেজন্য সমাজকে সজাগ হতে সর্বপ্রথম রামমোহনই প্রণোদিত করেন। তার বড়ো ভাই জগমোহন মারা গেলে বৌদি অলকামঞ্জরী দেবী সহমৃতা হয়েছিলেন স্বামীর জ্বলন্ত চিতায়। ঘটনাটি বেশ দাগ কেটেছিলো রামমোহনের মনে। মন কাঁদলেও বৌদির জন্য তখন কিছু করতে পারেননি তিনি। যদিও নারীর সহমরণে কোনো পুরুষের মন কাঁদা এই প্রথম নয়। এর আগে সতীদাহ নিয়ে প্রথম কথা বলেছিলো মিশনারিরা। তবে তারা তেমন কিছুই করতে পারেনি। কারণ ততোদিনে এটা ধর্মীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রীতি হয়ে গেছে। মিশনারিরা না পারলেও রামমোহন শেষ পর্যন্ত এ রীতি মেনে নেননি। ১৮২৯ সালে ইংরেজদের সহযোগিতায় রামমোহন সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করান। যে কারণে শত শত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের রোষানলে পড়তে হয়েছিলো তাকে।

সতীদাহ রদে সহায়তা নিলেও ইংরেজদের ছেড়ে কথা বলেননি রামমোহন। দেশীয়দের প্রতি ইংরেজদের উদ্ধত আচরণ ও অন্যায়ের প্রতিবাদে প্রকাশ করেছিলেন সংবাদপত্র ‘মিরাৎ-উল-আখবার’। এছাড়া সনাতন ধর্মে ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠা করে একেশ্বরবাদী ধারণা, ধর্মীয় সংস্কার ও পুনর্জাগরণের পুরোধা ছিলেন তিনি। আর এ কারণেই তাকে বলা হয়, বাংলায় পুনর্জাগরণের জনক।

পর্তুগিজ অ্যান্টনি আর বাঙালি রামমোহনের ধর্মীয় আদর্শ ভিন্ন হলেও তারা কিন্তু উভয়ই ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চেয়েছিলেন। একজন বাংলা ভাষার জন্য ‘গৌড়ীয় ব্যাকরণ’ লিখেছেন, অন্যজন সে ভাষার প্রেমে পড়ে সব ছেড়েছেন। কেউ ধর্মীয় রীতিকে শৃঙ্খলে আনতে চেয়েছেন, আবার কেউ সেটাকে উন্মুক্ত করতে চেয়েছেন। তবে সবকিছুর মূলেই ছিলো মানুষ আর মানুষের মুক্তি।

প্রতিবাদের ভাষা : ‘আগুন-পাখি’

১৯৪৩ সাল। একদিকে রাজনীতি, আরেক দিকে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের ক্ষুধার যন্ত্রণা। একটু খাবার আর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য মানুষ ছুটছে দিগ্‌বিদিক। এই মানুষের একজন ঋত্বিক কুমার ঘটক। ‘হিন্দু-ঋত্বিক’কে পূর্ব বাংলা ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো পশ্চিম বাংলায়। তাই তিনি অন্য মানুষের দুঃখ, কষ্ট, বেদনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন খুব কাছ থেকে। তার ভাষায়—

বাংলা ভাগটা আমি কিছুতেই গ্রহণ করতে পারিনি, আজও  পারি না। ইতিহাসে যা হয়ে গেছে তা পাল্টানো ভীষণ মুশকিল, সেটা আমার কাজও নয়। সাংস্কৃতিক মিলনের ক্ষেত্রে যে বাঁধা, যে ছেদ, যার মধ্যে রাজনীতি-অর্থনীতি সবই এসে পড়ে, সেটাই আমাকে প্রচণ্ড ব্যথা দিয়েছিলো।

ঋত্বিক দেশভাগের সময়টাতেই মূলত গল্প-কবিতা লিখে মানুষের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সচেতনতার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু এর মাধ্যমে অনেক মানুষের কাছে পৌঁছানো ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার জন্য তিনি এর বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। ১৯৪৮ সালে জড়িয়ে পড়েন কলকাতার ভারতীয় গণনাট্য সংঘ ও কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। গণনাট্য সংঘ ছিলো ভারতের প্রথম সুসংগঠিত নাট্য আন্দোলন, যেখানে নাটকের মাধ্যমে সামাজিক অবিচার ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করা হতো। কিন্তু নাটকও খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি ঋত্বিককে, একপর্যায়ে নাটক ছেড়ে চলচ্চিত্রে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। মেঘে ঢাকা তারায় বিক্রম যখন নীলকণ্ঠকে (ঋত্বিক) তার ক্রমাগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি বলেন, ‘আমি সিনেমার প্রেমে পড়িনি বিক্রম দা, আমি ওটাকে যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসেবে দেখছি। কাল যদি সিনেমার চেয়ে আরো ধারালো কোনো অস্ত্র আসে তাহলে সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাবো।’

সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা কখনো ভুলে যাননি ঋত্বিক। একের পর এক চলচ্চিত্র ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি; হতাশ হয়েছেন কিন্তু দায়িত্ব থেকে দূরে সরে যাননি, ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এ নিয়ে ঋত্বিক বলতেন—

প্রতিবাদ করা শিল্পীর প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব। শিল্প ফাজলামি নয়। যারা প্রতিবাদ করছে না তারা অন্যায় করছে। শিল্প দায়িত্ব। আমার অধিকার নেই সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার। শিল্পী সমাজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। সে সমাজের দাস। এই দাসত্ব স্বীকার করে তবে সে ছবি করবে।১০

প্রশ্ন ওঠে, কেনো চলচ্চিত্র বানাতেন ঋত্বিক, আর সে চলচ্চিত্র কেনোই বা শুধু দেশভাগ-ক্ষুধা-দারিদ্র নিয়ে? এতসব প্রশ্নের উত্তরও তিনি দিয়েছেন—

আমি প্রতি মুহূর্তে আপনাকে ধাক্কা দিয়ে বোঝাবো যে, ইট ইজ নট এন ইমেজিনারী স্টোরী বা আমি আপনাকে সস্তা আনন্দ দিতে আসিনি। প্রতি মুহূর্তে আপনাকে হাতুড়ি মেরে বোঝাব যে যা দেখছেন তা একটা কল্পিত ঘটনা কিন্তু এর মধ্যে যেটা বোঝাতে চাইছি আমার সেই থিসিসটা বুঝুন, সেটা সম্পূর্ণ সত্যি, সেটার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যেই আমি আপনাকে এলিয়েনেট করব প্রতি মুহূর্তে। যদি আপনি সচেতন হয়ে ওঠেন ছবি দেখে বেরিয়ে এসে বাইরের সেই সামাজিক বাধা দুর্নীতি বদলানোর কাজে লিপ্ত হয়ে ওঠেন, আমার প্রোটেস্টাকে যদি আপনার মধ্যে চাপিয়ে দিতে পারি তবেই শিল্পী হিসেবে আমার সার্থকতা।১১

অন্যদিকে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি কলকাতায় আসেন ১৭৮৬ সালের দিকে লর্ড কর্নওয়ালিসের সময়কালে; পশ্চিমবঙ্গের ফরাসডাঙ্গার চন্দননগরে; উদ্দেশ্য বাবার লবণের ব্যবসা দেখাশোনা করা।১২ পরিবারের চাপ কিংবা নিজের প্রয়োজনে সে ব্যবসা হয়তো কিছুদিন করেছিলেন, তবে ধরে রাখতে পারেননি। কারণ ব্যবসার বদলে তার মন আকৃষ্ট হয়েছিলো বাংলার কবিগানের প্রতি। যখন যেখানে কবিগান, কবিয়ালের কথা শুনেছেন, ছুটে গিয়েছেন মুহূর্তের মধ্যে।