Magic Lanthon

               

ফারুক আলম

প্রকাশিত ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

গুমনামি’র নামে নেতাজির দেহভস্মে বেনিয়া পুঁজির ছাই

ফারুক আলম


‘আপন মনের মাধুরি মিশায়ে তোমারে করেছি রচনা’

চলচ্চিত্র গুমনামি। শব্দার্থ অজানা বা অচেনা। নির্মাতা সৃজিত মুখোপাধ্যায়। বিষয় ভারতবর্ষের অবিসংবাদিত নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু রহস্য। কলকাতা রিজিওনাল সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্রের তারিখ ২৮ আগস্ট ২০১৯। ওই বছর দুর্গাপুজোতে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়ে নানা মহলের নজর কাড়ে; সঙ্গে সৃষ্টি হয় নানা বিতর্ক। কড়া সমালোচনা করে নেতাজির পরিবারের সদস্যরা। চলচ্চিত্রটি শুরু হয়েছে এ রকমের একটি ইংরেজি ও বাংলা ভূমিকা দিয়ে--

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু ঘিরে প্রাথমিকভাবে তিনটি তত্ত্ব আছে। প্রথম, এবং যা সরকারি তত্ত্ব তা হলো, তিনি ১৮ই আগস্ট ১৯৪৫, পূর্বকালীন ফর্মোসা-এর তাইহোকু এয়ারড্রোমে এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। দ্বিতীয়, এই বিমান দুর্ঘটনা তাঁর সাজানো এবং তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে যান যেখানে কোনো নাম না জানা জেলে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তৃতীয়, তাঁর সাজানো বিমান দুর্ঘটনার পরে তিনি রাশিয়া পালিয়ে যান, পরে তিনি ভারতে আবার ফিরে আসেন এক সন্ন্যাসী হয়ে এবং ১৯৮৫ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের অন্তর্গত ফায়জাবাদে তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া মুখার্জী কমিশন যা এই উপরোক্ত তিন তত্ত্বের অনুসন্ধান করার জন্য গঠিত হয়, এই চলচ্চিত্রটি তার কার্যধারার একটি নাটকীয় রূপান্তর। এই চলচ্চিত্রটি উপরোক্ত তিনটে তত্ত্ব বিষয়ক নানান গবেষণামূলক বই-এর ওপর আধারিত এবং তা থেকে অনুপ্রাণিত, যেমন অনুজ ধরের বই ‘ইন্ডিয়াস বিগেস্ট কভার আপ’, অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ঘোষের লেখা ‘কনান্ড্রাম’।

নেতাজিকে নিয়ে ছায়াবাজি

নেতাজিকে নিয়ে অনেক টিভি সিরিয়াল, ওয়েব সিরিজ, সাক্ষাৎকার, চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। কারো লক্ষ্য ছিলো নেতাজির মহান কর্মকে স্মরণ করে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আবার অনেকের উদ্দেশ্য নাম-যশ অর্থ উপার্জন বা ব্যবসাসফল পণ্য উৎপাদন। নেতাজিকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্র তার জীবদ্দশায় নির্মাণ হয়--অন টু দিল্লি; বিষয়, আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বে ভারতের মুক্তি সংগ্রাম। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন জাপানি নির্মাতা ইয়াসুজিরো ওজু। জাপানের সামরিক প্রচারচিত্রের অংশ হিসেবে এটি নির্মাণের বরাত পেয়েছিলেন তিনি। অভিনয়ে ছিলেন প্রবাসী ভারতীয়রা। নামকরণ ও বিষয়বস্তু নির্ধারণ করেন নেতাজি স্বয়ং। যুদ্ধে জাপানের পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ওজুর দাবি তিনি চলচ্চিত্রটি নষ্ট করে ফেলেন। ৯ মার্চ ১৯৪৭-এর ‘আনন্দ বাজার পত্রিকা’য় নেতাজী সুভাস চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিলো এভাবে--‘আজাদ হিন্দ সরকার প্রযোজিত এবং বল্লভভাই পটেল পুনঃপ্রযোজিত’। এই চলচ্চিত্রে হরিপুরা কংগ্রেস থেকে শুরু করে ভারতের স্বাধীনতার জন্য নেতাজির কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়েছে। চলচ্চিত্রটির অধিকাংশ দৃশ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধারণ করা ও ভারতেই সম্পাদিত। পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রটি ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি, অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের প্রথম নেতাজি জয়ন্তীতে মুক্তি পায়। সুতরাং এই চলচ্চিত্রই যে ওজুর আরাধ্য সেই চলচ্চিত্র তা প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। কলকাতার ১৪টি প্রেক্ষাগৃহে এটি মুক্তি পায়। আই এন এ-এর মেজর জেনারেল শাহনওয়াজ খান এবং মেয়র সুধীর বাবু চলচ্চিত্রটির উদ্বোধন করেন। প্রথম সপ্তাহের প্রথম ও শেষ প্রদর্শনীর বিক্রিত অর্থ আজাদ হিন্দ ফৌজের শহীদদের দুস্থ পরিবারের সাহায্যার্থে দেওয়া হয়।১

৩ আগস্ট ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে নেতাজির জীবনী নিয়ে বাংলা ভাষায় মুক্তি পায় সুভাষ চন্দ্র বোস। নাম ভূমিকায় ছিলেন অমর দত্ত; চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় পীযূষ বসু। চলচ্চিত্রটি জাতীয় পুরস্কার পায়। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় শ্যাম বেনেগাল পরিচালিত এবং শচীন খেড়েকার অভিনীত নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস: দ্য ফরগটেন হিরো। চলচ্চিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ও সাড়া ফেলে; এটিও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। এতে নেতাজির বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন ও রণাঙ্গনের বিভিন্ন দিক চিত্রায়িত হয়। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত নেতাজিকে নিয়ে নির্মিত প্রায় সব চলচ্চিত্রই ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে।

সৃজিত সজ্জিত গুমনামি

প্রথম দেখাতে ভুলে যেতে হয় কী দেখছি! দেখছি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনী নিয়ে চলচ্চিত্র। শুরুতে মহাত্মা গান্ধী, নেহেরু ও নেতাজি। ভারতের রাজনীতি নিয়ে কথোপকথন। নেতাজি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি বৃটিশদের সহযোগিতার নীতি মানবেন না। তিনি অহিংস নন, সহিংস। তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন এবং চেয়েচিন্তে ভিক্ষে করে দেশের স্বাধীনতা নেবেন না। লড়াই করে, যুদ্ধ করে, স্বাধীনতা অর্জন করবেন--‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’--এই ঘোষণার প্রতিধ্বনি। ফলে তিনি কংগ্রেসের সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। গলা থেকে খুলে ঘরের মেঝেতে গান্ধীজির কাছে রাখেন কংগ্রেস সভাপতি স্মৃতি পদক। মনে হবে, যে পদ পদলেহনের, সে পদ নেতাজির নয়। এরপর আবহসঙ্গীত বাজতে বাজতে পর্দায় নেতাজির পৃথিবীব্যাপী কর্মকাণ্ডের বিশ্ব মানচিত্র চিত্রিত হয়। গুমনামিতে এই দৃশ্যায়নের জন্য যে ইতিবৃত্ত ফেলে আসা হয়েছে, তা সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা প্রয়োজন।

গান্ধীজি বনাম নেতাজি

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে গান্ধীজি পরোক্ষভাবে বিরোধিতা করা সত্ত্বেও নেতাজি বিদেশে থাকাবস্থায় হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি হন। ওই বছরের ২৪ জানুয়ারিতে তিনি বিমানযোগে করাচিতে পৌঁছান। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ত্রিপুরা কংগ্রেস নির্বাচনে সভাপতির পদে প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকভাবে অংশগ্রহণ করেন মৌলানা আজাদ, পট্টভি সিতারামায়া ও সুভাষ বসু। গান্ধীজি, মৌলানা আজাদ এবং কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশই পট্টভি সিতারামায়াকে নগ্নভাবে সমর্থন জানায়। এতোকিছুর পরেও সুভাষ এতে জয়লাভ করেন। তখন গান্ধীজি এক বিবৃতিতে জানান, ‘পট্টভি সিতারামায়ার পরাজয় আমারই পরাজয়। হাজার হোক সুভাষবাবু দেশের শত্রু নন। তাঁর জয়লাভে আমি আনন্দিত।’ তবে তিনি অন্য এক বিবৃতিতে জানান, ‘আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, গোড়া থেকেই আমি তাঁর (সুভাষ) পুনর্নির্বাচনের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলাম। এর কারণ আজ আমি বলতে চাইনে।’ অবশ্য সে কারণ গান্ধীজি কখনোই আর ব্যাখ্যা করেননি।

সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর, ২২ ফেব্রুয়ারি ওয়ার্কিং কমিটির সভায় স্বাস্থ্যগত কারণে সুভাষ অনুপস্থিত থাকেন। এক রকম বিনা কারণেই ওই সভায় ১২ জন ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য পদত্যাগ করে। সুভাষের পক্ষে ওই সভায় লিখিত ভাষণ পাঠ করেন তার মেজ দাদা শরৎ চন্দ্র বসু। সভায় শেষপর্যন্ত গান্ধীর সমর্থকদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়। ২১ এপ্রিল সুভাষ সুস্থ হয়ে কলকাতায় ফেরেন। নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির অধিবেশনে যোগদানের জন্য গান্ধীজি কলকাতায় আসেন ২৭ এপ্রিল। ২৮ এপ্রিল ওয়েলিংটন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে গান্ধীজি ও সুভাষ বসুর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। কিন্তু গান্ধীজি, কংগ্রেস সভাপতি সুভাষ বসুর বিরুদ্ধেই অবস্থান নেন। শেষপর্যন্ত সুভাষ পদত্যাগপত্র জমা দিলে সঙ্গে সঙ্গে তা গৃহীত হয়। এরপর কংগ্রেসের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে তার বিরোধ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩ মে সুভাষ ‘অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর জার্মান বাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সুভাষ এই সুযোগে তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নেন। পক্ষান্তরে যুদ্ধকালীন বৃটিশদের পক্ষে থাকার পথ হাঁটেন গান্ধীজি।

যে পথে রচিত হয়েছে অমর ইতিহাস

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ২০-২২ জুন নাগপুরে ফরওয়ার্ড ব্লক প্রথম সম্মেলন করে। এই সম্মেলনে একটি অস্থায়ী জাতীয় সরকারের আহ্বান জানানো হয়। এই সময় ৩ জুলাই কলকাতায় হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের ঘোষণাও করা হয়। বৃটিশ সরকার ২ জুলাই সুভাষকে গ্রেফতার করে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কারাগারে পাঠায়। ২৯ নভেম্বর মুক্তির দাবিতে তিনি কারাগারে অনশন শুরু করেন। সাত দিন অনশনের পর সুভাষকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে তিনি তখন পুলিশি নজরদারিতে ছিলেন। ইতোমধ্যে সুভাষ বৃটিশের শত্রু হিসেবে জার্মান, ইতালি, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিলো এসব দেশের সাহায্য নিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ভারত স্বাধীন করা। শেষপর্যন্ত এই সব রাষ্ট্রের সঙ্গে ভালোভাবে যোগাযোগ না করেই তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারত থেকে পালানোর উদ্যোগ নেন। এতে তাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছিলো পাঞ্জাবের কীর্তি কিষাণ পার্টি এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের ফরওয়ার্ড ব্লকের সদস্যরা।

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি দিবাগত রাত একটা ২৫ মিনিটে পশ্চিমি মুসলমান পোশাকে সুভাষ তার ভাতিজা শিশির বসুকে সঙ্গে নিয়ে মোটরগাড়ি করে কলকাতা ছাড়েন। ১৮ জানুয়ারি কলকাতা থেকে দুইশো ১০ মাইল দূরের গোমো’তে পৌঁছান। শেষ রাতে ট্রেনযোগে তিনি রওনা দেন উত্তর ভারতের দিকে। ছদ্মনাম, ছদ্মবেশে দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ৩১ জানুয়ারি তিনি কাবুলে পৌঁছান। সেখানে পৌঁছে সেদিনের মতো বিশ্রাম নিয়ে, পরদিন তিনি সেখানকার রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু রুশ-রাষ্ট্রদূত তাকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কয়েকদিন ঘোরাঘুরির পর তিনি জার্মান দূতাবাসে গিয়ে রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করেন। জার্মান রাষ্ট্রদূত তাকে আশ্বাস দিলেও বার্লিনের অনুমতি লাগবে বলে জানান। এই পরিস্থিতিতে সুভাষ রাশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। ঠিক শেষ মুহূর্তে বার্লিন থেকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আসে। এরপর জার্মান অ্যাম্বেসির নির্দেশ মতো তিনি ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যালবার্ট কোরানি’র সঙ্গে দেখা করেন। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ব্রিটেনের ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে রাশিয়ান অ্যাম্বেসি তাকে ভিসা দিতে গড়িমসি শুরু করে।

১২ মার্চ ১৯৪১ রাশিয়ান অ্যাম্বেসি সুভাষের ভিসা দিতে সম্মত হয়। ১৭ মার্চ সিনর অরল্যান্ডো ম্যাজোট্টা নামে ইতালির পাসপোর্ট নিয়ে সুভাষ কাবুল ত্যাগ করেন। এরপর তিনি প্রথমে মস্কো যান এবং সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান স্তালিনের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে তিনি মস্কো থেকে রোমে আসেন এবং ২৮ মার্চ রোম থেকে বার্লিন পৌঁছান। বার্লিনে এসে সুভাষ মুক্ত ভারতীয় কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এই সময় তাকে নানাভাবে সাহায্য করেন স্ত্রী এমিলি। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সুভাষ-এমিলির মেয়ে সন্তান হয়। তার নাম রাখা হয় অনিতা বসু। বর্তমানে অনিতা জার্মানির অগসবার্গ বিশ্বদ্যিালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে সুভাষ বসুর অন্তর্ধানের কারণে, সমগ্র ভারতে ফরওয়ার্ড ব্লককে নিষিদ্ধ করা হয় এবং এর সব রাজনৈতিক কার্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এছাড়া ফরওর্য়াড ব্লক-এর নেতাকর্মীদের রাখা হয় পুলিশি নজরদারিতে।

‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’

জার্মানিতে গিয়ে সুভাষ ভারতের স্বাধীনতার জন্য জার্মান চ্যান্সেলর এডলফ হিটলারের সাহায্য প্রার্থনা করেন। তাৎক্ষণিকভাবে জার্মানি কিছুটা সাহায্য করলেও ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে হিটলারের উদাসীনতা সুভাষের মনোবল ভেঙ্গে দেয়। ফলে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি জার্মানি ত্যাগ করেন। একটি জার্মান সাবমেরিনে চড়ে ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই তিনি সিঙ্গাপুরে পৌঁছান। ইতোমধ্যে ভারতীয় আরেক নেতা রাসবিহারী বসু প্রবাসে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। এই বাহিনীর নাম ছিলো--ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ৪-৭ জুলাই সিঙ্গাপুরে মহা-এশিয়া মিলনায়তনে ভারতীয় স্বাধীনতা লীগের প্রধান নেতৃবৃন্দের মহাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী রাসবিহারী বসু সভায় দাঁড়িয়ে সুভাষ চন্দ্র বসুকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। সেই সঙ্গে প্রবাসী সরকারের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে সুভাষ বসুকে স্থলাভিষিক্ত করার প্রস্তাব করেন। উপস্থিত সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হলে সুভাষ প্রবাসী সরকার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক পদ লাভ করেন। উল্লেখ্য, রাসবিহারী বসুর গড়া এই বাহিনীতে একটি আলাদা নারী বাহিনীও (রানী লক্ষ্মীবাঈ কমব্যাট) ছিলো। সবমিলিয়ে এই বাহিনীতে ছিলো প্রায় ৮৫ হাজার সৈন্য। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ বৃটিশ বাহিনীকে পরাজিত করে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’ ইম্ফল ও কোহিমার পথে অগ্রসর হয়। ২১ মার্চ তারা ভারত-ভূমির মনিপুরে প্রবেশ করে। এই ফৌজের কার্যক্রম খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভারতব্যাপী।

অবিনাশী জীবন

অবস্থা বদলাতে শুরু করে ১৯৪৫-এর ফেব্রুয়ারি থেকে। ১০ ফেব্রুয়ারি কুয়ালালামপুর বসে সুভাষ খবর পান জাপান আত্মসমর্পণ করবে। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুর ফেরেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ আগস্ট হিরোশিমা ও ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে আমেরিকার আণবিক বোমা হামলার পর জাপানের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সুভাষ ১১ আগস্ট আজাদ হিন্দ ফৌজ প্রত্যাহার করেন এবং পরবর্তী সময়ে বাহিনী ভেঙে দিয়ে রাশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। জাপানের সঙ্গে নেতাজির কথা হয়। তিনি রাশিয়ায় যেতে চান। জাপান নেতাজিকে সরাসরি রাশিয়ায় পাঠাতে অপারগতা প্রকাশ করে। তারা তাকে চিনের মাঞ্চুরিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই মোতাবেক সুভাষ সিঙ্গাপুর থেকে ব্যাংকক হয়ে সায়গনে এসে পৌঁছান। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৭ আগস্ট সঙ্গীদের বিদায় দিয়ে একটি জাপানি বোমারু বিমানে কর্নেল হাবিবুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ রওনা দেন। পরদিন বিমানটি তাইহোকুতে দুই ঘণ্টার যাত্রা বিরতি নেয় এবং জ্বালানি ভরে দুপুর দুইটা ৩০ মিনিটে মাঞ্চুরিয়ার উদ্দেশে আকাশে উড়ে। বিমানে ক্রুসহ মোট ১৪ জন আরোহী ছিলো। ২৪ আগস্ট ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয় বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু।

গুমনামি বাবা কে?

৬০-এর দশকের শুরুতে উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার কাছে ফয়জাবাদের নেমিসা এলাকায় এক সুদর্শন, দীর্ঘদেহী সাধুবাবার আবির্ভাব হয় বলে জানা যায়। তিনি কারো সঙ্গে দেখা করতেন না, পর্দার আড়ালে থাকতেন ও কথা বলতেন সেখান থেকেই। কখনো বের হলে মুখ ঢেকে রাখতেন সাদা চাদরে। স্থানীয় কেউ নাম জানতে চাইলে বলতেন--তিনি বহুদিন আগেই মৃত। এলাকার লোকজন সাধুবাবাকে ডাকতেন ভগবানজি আর গুমনামি বাবা নামে। কঠোর গোপনীয়তা ভেদ করে কয়েকজন বাঙালি বিপ্লবী তার সঙ্গে দেখা করতে পেরেছিলো এবং তাকে নেতাজি বলে শনাক্ত করেছিলো। এর মধ্যে আছেন নেতাজির স্নেহধন্য লীলা রায় ও সমর গুহসহ বেশ কজন। তারা যদিও এক দশক ধরে নেতাজির অবস্থান নিয়ে মুখ খোলেনি এবং তার কোনো কারণও জানা যায় না। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে গুমনামি বাবার মৃত্যু হয়। অনেকে বিশ্বাস করে, এই গুমনামি বাবাই আসলে নেতাজি সুভাষ বসু।

১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে নেতাজির মৃত্যু রহস্য অনুসন্ধানে মুখার্জি কমিশন গঠন করা হয়। গুমনামি বাবার ব্যবহৃত প্রায় তিন হাজার সামগ্রীর মধ্যে আটশো ৭০টি মুখার্জি কমিশন পরীক্ষা করে। কমিশনের দাবি, এর মধ্যে ছিলো নেতাজির বাবা জানকীনাথ বসু ও মা প্রভাবতীর বাঁধানো ছবি, ভাইবোনদের সঙ্গে নেতাজির ছবি, তিনটি হাফ-বেন্ট ডাবলিন ধূমপানের পাইপ, জার্মানি ও ইতালির সিগার, গোল ফ্রেমের চশমা, দূরবীন, রোলেক্স অয়েস্টার পার্পেচুয়াল ঘড়ি, স্পুল ক্যাসেট টেপ রেকর্ডার, পোর্টেবল বেলজিয়াম টাইপ রাইটার, একটি রেডিও, ভারতীয় রাজনীতির ওপর অজস্র বই এবং স্বাধীনতার আগে ও পরের বহু সংবাদপত্রের বিপুল সংগ্রহ।

অন্যদিকে কথিত আছে এই গুমনামি বাবা একজন পলাতক খুনের আসামী--কৃষ্ণ দত্ত উপাধ্যায়--যিনি একটি আশ্রমের বোর্ড অব ট্রাস্টি সদস্য ছিলেন। টাকা বা জমি নিয়ে বিবাদের জেরে পণ্ডিত ব্রহ্মদেব শাস্ত্রী নামে একজনকে খুন করে গুমনামি বাবার ছদ্মবেশে তিনি গা ঢাকা দেন২।

নেতাজি সুভাষ বসু ও গুমনামি রহস্য

২০১০ খ্রিস্টাব্দে গুমনামি রহস্য তদন্তের জন্য আবেদন করেন বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিষ্ণু সহায়ের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে উত্তর প্রদেশ সরকার। রাজ্যপালের কাছে ৩২৭ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে সহায় কমিশন জানায়, অধিকাংশ সাক্ষী জানিয়েছে নেতাজিই ছিলেন ছদ্মবেশী গুমনামি বাবা। সাক্ষীদের মধ্যে মাত্র কয়েকজন বলেন, তিনি নেতাজি ছিলেন না। আদৌ ওই সাধু নেতাজি ছিলেন কি না নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদন জনসমক্ষে আনেনি মোদি সরকার। পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করে না যে, নেতাজি লুকিয়ে থাকতে পারেন। কৃষ্ণা বসু, চন্দ্র বসুসহ ৩৩ জন বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ডি এন এ পরীক্ষার মাধ্যমে মুখার্জি কমিশন প্রমাণ দিয়েছে, নেতাজি এবং গুমনামি বাবার মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। দুজনের হাতের লেখা পরীক্ষা হলে তাতেও কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

মিশন নেতাজি

গুমনামিতে সৃজিতের কাল্পনিক চরিত্র চন্দ্রচূড় ধর ‘ইন্ডিয়া টাইমস’ সংবাদপত্রে কাজ করতে গিয়ে নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে গঠিত মুখার্জি কমিশনের ওপর একটি প্রতিবেদন লেখার দায়িত্ব পান। সেই থেকে গবেষণার শুরু। অতঃপর দিল্লিতে ‘মিশন নেতাজি’ নামের একটা ছোট্ট রিসার্চার গ্রুপ--স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সত্য অনুসন্ধানী সংগঠন, যারা নেতাজি অন্তর্ধান রহস্যের ওপর গবেষণা করে--তারা তথ্য সংগ্রহ করে নেতাজিকে নিয়ে বই লিখেছে। যেমন, অনুজ ধরের বই ‘ইন্ডিয়াস বিগেস্ট কভার আপ’; অনুজ ধর ও চন্দ্রচূড় ধরের লেখা ‘কনান্ড্রাম’। তবে তাদের কষ্টার্জিত গবেষণা ‘কনান্ড্রাম’-এ তারা এমন কোনো তথ্য তুলে ধরতে পারেনি, যা প্রমাণ করে গুমনামি বাবাই নেতাজি ছিলেন।

নেতাজি সুভাষ বসুর মৃত্যুতে ভারতবাসীর ট্রাজেডি

কিছু কিছু মানুষ তার জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলে যেনো সেই জীবনের সঙ্গে শুধু দেশ-জাতির ইতিহাস নয়, মানব সভ্যতার ইতিহাস জড়িয়ে যায়। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সংগ্রামী নেতা সুভাষ চন্দ্র বসুর জীবনও তেমনই। লেলিন ঘোষণা করেছিলেন, জাতীয় মুক্তির সংগ্রামই শ্রমিক শ্রেণির মুক্তির সংগ্রাম। সুভাষ তা জানতেন, তাই তিনি ডাক দেন সশস্ত্র বিপ্লবের। সময়ের শ্রেষ্ঠ এই সাহসী সন্তান নেতাজি নামে খ্যাত। জন্ম ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি, বর্তমান ভারতের উড়িষ্যার কটক শহরে। ছাত্রজীবন থেকে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে জড়িত। আই সি এস পাসের পরও তিনি বৃটিশের চাকুরি না করে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেন। ১১ বার ইংরেজের কারাগারে যান। শেষপর্যন্ত অহিংসার নামে কংগ্রেসের ইংরেজ ভক্তিতে বিরক্ত হয়ে তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পথ বেছে নেন; দ্বারস্থ হন আন্তর্জাতিক শক্তির।

এদিকে চলতে থাকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের ভারত ছাড় আন্দোলন। দ্বি-জাতি তত্ত্বের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে সব জাতি-ধর্মের সমন্বয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। লক্ষ্য সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। এরপর জাপানের পরাজয়। নেতাজির মৃত্যু। বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন। ১৯৪৭-এ রক্তক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভারত ভাগ এবং বৃটিশদের ক্ষমতা হস্তান্তর। অতঃপর ধর্মীয় জাতিতত্ত্বের কল্পতরু বিষবৃক্ষের বিষক্রিয়া। ভিতরে বাইরে অশান্তি। উপমহাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত। অবিশ্বাস ও যুদ্ধ। আদি অন্তহীন মানব সভ্যতার প্রতিকূল এক রক্ত পিচ্ছিল যাত্রা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিকথা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে পরিস্থিতির জটিলতা বিশ্লেষণ করা যায়। ‘১৯৪৩ সালে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হয়েছে।’৩ যুদ্ধের সময় সৈন্যদের জন্য বৃটিশ সরকার কাপড় ও খাদ্য কব্জা করেছে। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা ধান, চাল, কাপড় গুদামজাত করে লুকিয়ে রেখেছে। যে চাল ১০ টাকা মণ দরে বিক্রি হতো তা বিক্রি হচ্ছে ৪০-৫০ টাকায়। লাখ লাখ লোক না খেয়ে মারা যাচ্ছে। সাংসদেরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি হয়ে গেলো। বাংলায় পতন হয় মুসলিম লীগ সরকারের। গভর্নর শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে নেন। সরকার পতন উপলক্ষে দেখা যায়, ‘টুপি ও পাগড়ি পরা মাড়োয়ারিরা বাজি পোড়াতে শুরু করেছে এবং হৈচৈ করতে আরম্ভ করেছে।’৪ এখানে বঙ্গবন্ধু তখনকার শিক্ষিত উচ্চবিত্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম অবক্ষয়েরও বর্ণনা তুলে ধরেন। পাশাপাশি মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র তথা পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও নেতাজির সশস্ত্র সংগ্রাম সম্পর্কে লিখেছেন এভাবে--

এই সময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমান সৈন্যদের দলে নিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন। মনে হত, ইংরেজের থেকে জাপানই বোধহয় আমাদের আপন। আবার ভাবতাম, ইংরেজ যেয়ে জাপান আসলে স্বাধীনতা কোনোদিনই দিবে না। জাপানের চীন আক্রমণ আমাদের ব্যথাই দিয়েছিল। মাঝে মাঝে সিঙ্গাপুর থেকে সুভাষ বাবুর বক্তৃতা শুনে চঞ্চল হয়ে উঠতাম। মনে হত, সুভাষ বাবু একবার বাংলাদেশে আসতে পারলে ইংরেজকে তাড়ান সহজ হবে। আবার মনে হত, সুভাষ বাবু আসলে তো পাকিস্তান হবে না। পাকিস্তান না হলে দশ কোটি মুসলমানের কি হবে? আবার মনে হত, যে নেতা দেশ ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন তিনি কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। মনে মনে সুভাষ বাবুকে তাই শ্রদ্ধা করতাম।৫

বিশ্ব যখন রাজনীতির জালে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয় ১৯১৪ থেকে ১৯১৯ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত। দুটি বিশ্বযুদ্ধের কারণ ও ফলাফল মানব সভ্যতার শিক্ষা হয়ে আছে। পুঁজিবাদের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটে যুদ্ধ অনিবার্য। শিল্পোন্নয়নে কাঁচামাল আহরণ ও পর্যাপ্ত বাজার দখল নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দ্বন্দ্বে মানব সভ্যতার নিকৃষ্টতম উদাহরণ হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এতে বিশ্বের প্রায় সব দেশ জড়িয়ে পড়ে। ব্যাপক বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রায় ১০ কোটি লোক প্রাণ হারায়। বিশ্ব ভাগ হয়ে দুটি রণশক্তিতে পরিণত হয়। জাপান, জার্মান, ইতালির নেতৃত্বে অক্ষশক্তি। আমেরিকা, বৃটেন, রাশিয়া, ফ্রান্সের নেতৃত্বে মিত্রশক্তি। ইউরোপ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় জার্মান ইতালির বিরুদ্ধে বৃটেন, রাশিয়া, ফ্রান্সের নেতৃত্বে যুদ্ধ চলছে আর অন্যান্য এলাকায় বিশেষত অস্ট্রেলিয়া, এশিয়ায় জাপানের সঙ্গে আমেরিকার জোর লড়াই, সঙ্গে আছে বৃটেন।

সবাই জানে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীরা বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রকট হয় তাদের মোড়লগিরি। অক্ষশক্তি আত্মসমর্পণ করে ও হাত গুটিয়ে নেয়। বিশ্বরাজনীতি বদলে গিয়ে শুরু হয় সেনাবাহিনী দিয়ে দেশ দখল করে কলোনি তৈরির পরিবর্তে বাজার দখলের রাজনীতি। সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি দখলের খেলা জমে ওঠে। দেশে দেশে পুঁজি বাজারের নিয়ন্ত্রণ যায় মার্কিন নিয়ন্ত্রিত করপোরেট পুঁজির হাতে। ভাবা হতো, আমেরিকা পুঁজিবাদের মোড়ল আর রাশিয়া শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বদানকারী মানবিক দেশ। আমেরিকা শোষণ, শাসন ও যুদ্ধাংদেহীদের দলে আর রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক শান্তিকামী শোষিত বঞ্চিত মানুষের দলে। শুরু হয় মিত্রশক্তির মধ্যে দুই পরাশক্তি আমেরিকা ও রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধ। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হলেও তার আর প্রয়োজন হয়নি। কারণ স্পষ্ট; ১৯৯০-এ সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গন। শান্তির পরিবেশে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের নামে রাশিয়ার অঘোষিত আত্মসমর্পণ, অতঃপর অর্ধ-শতাব্দীজুড়ে দুই মেরু বিশ্বের পরিবর্তে এককেন্দ্রিক বিশ্ব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই নেতাজি জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা সংগ্রামকে সশস্ত্র রূপ দেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ ঝোলাবন্দি ভারতবাসীকে কাঁচকলা দেখানোর প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে উঠেছিলো তার মনে। বিশ্বাসঘাতকতার ভয়াবহ পরিণাম দেখানোর জন্য একহাত নেওয়ার সংকল্প করেছিলেন তিনি। দেশের অভ্যন্তরে থেকে লড়াইটা যুক্তিযুক্ত হলেও তিনি বিশ্ব বাস্তবতার সুবিধা হাতছাড়া করতে চাননি। চেয়েছিলেন রাশিয়ার সহযোগিতা; কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে অক্ষশক্তির দ্বারস্থ হলেন। লক্ষ্য ইংরেজদেরকে যুদ্ধে পরাজিত করে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। কিন্তু বাস্তবে তা হলো না। রাশিয়ার মতো দেশ তার মিত্রশক্তির কাছে হয়তোবা অকারণে অবিশ্বস্ত হতে চায়নি। নেতাজিকে বেছে নিতে হয়েছে জার্মানকে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে হিটলারের সঙ্গে বৈঠক সেরে ডুবোজাহাজে করে যেতে হয়েছে জাপান। ভারত স্বাধীনের পর ইংরেজ ভক্ত জওহরলাল নেহেরু রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। বিশ্বরাজনীতির স্বার্থে স্তালিন-নেহেরু দোস্ত হলেন। অথচ সেদিন সুভাষ বসুর সঙ্গে আলাপ করলে হতে পারতো শ্রমিক শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক অখণ্ড ভারত। পুঁজিবাদী নেহেরুরা হতে পারতো পরাজিত। নেতাজি এখানে ছিলেন দূরদর্শী কিন্তু দুর্ঘটনা তাকে গন্তব্যে পৌঁছাতে দিলো না।

গুমনামি-এর একটি দৃশ্য

’আপনি মজিলে তুমি জগত মজালে’

সৃজিত তার চলচ্চিত্র দিয়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যুরহস্য বিতর্ক আবারও উসকে দিলেন। চলচ্চিত্রের নাম গুমনামি। ‘আপনি মজিলে তুমি জগত মজালে’--সৃজিত বিতর্ক তৈরি করে নিজেও বিতর্কিত হলেন বেশ। গুমনামি নামকরণ যদিও চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবুও নেতাজির মৃত্যু নিয়ে যে রহস্য এখানে উত্থাপন করা হয়েছে তা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত কেন্দ্রীয় চরিত্র মিশন নেতাজি সংগঠনের মূল ব্যক্তি চন্দ্রচূড় ধর যা প্রতিষ্ঠিত করতে চাচ্ছেন--১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি এবং সেখানে তার শেষকৃত্যও হয়নি। এ সম্পর্কে তার ১৯টি প্রমাণ রয়েছে। টোকিও’র রেনকোজি মন্দিরে রাখা অস্তিভস্ম নেতাজির নয়। গুমনামি বাবাই নেতাজির ছদ্মরূপ। সেই বক্তব্যের মূল চরিত্র গুমনামি বাবার সঙ্গে চলচ্চিত্রের নামকরণের মিল থাকায় নেতাজির মৃত্যুরহস্য নিয়ে সৃজিতের কথিত ত্রি-তত্ত্ব--প্লেন ক্রাশ, রাশিয়া ও গুমনামিবাবা--ভিত হারিয়ে কেবলই গুমনামিবাবা তত্ত্বে রূপান্তরিত হয়।

নেতাজিকে নিয়ে গবেষণা খুব একটা কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটি করতে গেলে পরিবার, চাকরি, অর্থনীতি, সমাজ সবকিছুর ঊর্ধ্বে আত্মনিয়োগ করতে হয়। সেই আত্মনিয়োগ দেখাতে দেখাতে নেতাজির ছবি পুড়িয়ে সেই নেতাজিকেই অবমাননা করা হয়েছে। তাই সৃজিতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র রাজকাহিনী দেখার পর গুমনামি দেখে হতাশ হতে হয়। প্রসেনজিৎ ও অনির্বাণের অভিনয় দর্শকের মন কেড়েছে ঠিকই, তবে তাদের কাছে আরো বেশি প্রত্যাশা করাই যায়। সবমিলিয়ে এই চলচ্চিত্রে নির্মাতা সৃজিত নানাভাবে সমালোচিত।

নেতাজির মৃত্যুরহস্য অনুসন্ধান : একটি কমিটি ও দুটি কমিশন

নেতাজির মৃত্যুরহস্য অনুসন্ধানে তদন্ত প্রতিবেদন

শাহনওয়াজ কমিটি

খোসলা কমিশন

মুখার্জি কমিশন

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ--জহরলাল নেহেরু

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে--ইন্দিরা গান্ধী

১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ--অটল বিহারী বাজপাই

প্রতিবেদন : বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু

প্রতিবেদন : বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু

প্রতিবেদন : মৃত্যু হয়েছে, তবে বিমান দুর্ঘটনায় নয়

নেতৃত্ব : শাহনওয়াজ খান, মেজর জেনারেল, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি

নেতৃত্ব : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি জি ডি খোসলা

নেতৃত্ব : অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায়

 

সদস্য : আই সি এস এস এন মৈত্র ও সুভাষ চন্দ্র বসুর দাদা সুরেশ চন্দ্র বসু। ৬৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ, যার মধ্যে ১১ জন প্রত্যক্ষদর্শী।

বিমানে নেতাজির চার সঙ্গী এবং পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন। চার বছর ধরে কথা বলেন আগের কমিটির নেতৃত্বে থাকা শাহনওয়াজ খান ও সুভাষ চন্দ্র বসুর দাদা সুরেশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে। এছাড়া তারা কথা বলে দুইশো ২৪ জন অন্যান্য সাক্ষীর সঙ্গে।

এছাড়া তারা কথা বলে দুইশো ২৪ জন অন্যান্য সাক্ষীর সঙ্গে।এই কমিশন প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য আর নিতে পারেনি; কারণ প্রত্যক্ষদর্শীরা তখন আর কেউ বেঁচে নেই।

 

বিমান দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর মৃত্যু হয়।

তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় আগুনে পুড়ে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু গুরুতরভাবে আহত হন এবং সেই রাতেই তার মৃত্যু হয়।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তাইহোকুর বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনার কোনো প্রমাণ মেলেনি।

 

কমিটির সদস্যরা কথা বলেন নেতাজির বিশ্বস্ত সঙ্গী হাবিবুর রহমানসহ পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে। ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকার কারণে এই কমিটি তাইহোকুতে যেতে পারেনি।

তবে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ১৮ আগস্ট তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর কয়েকজন যে নেতাজিকে দেখার দাবি করেছিলেন এই প্রতিবেদনে সে কথাও উল্লেখ করেন জি ডি খোসলা।

নেতাজির মৃত্যু হয়েছে তবে বিমান দুর্ঘটনায় নয়।  টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে রাখা অস্তিভস্মও নেতাজির নয়।

অনুসন্ধান শেষে তিন সদস্য একমত হয়ে তিন পৃষ্ঠার খসড়া প্রতিবেদন পেশ করেন। উল্লেখ করা হয়, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট তাইহোকুর বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয় এবং সেখানেই তার শেষকৃত্য হয়। টোকিওর রেনকোজি মন্দিরে রাখা অস্তিভস্ম নেতাজির।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত এক কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র বসুকে ক্রেমলিন যেতে দেখেন। প্রতিবেদনে এক সাংসদ দাবি করেন, সুভাষ চন্দ্র সাইবেরিয়ার কারাগারে ৪৫ নম্বর সেলে রয়েছেন।

অসংখ্য গল্প বা অতিকথনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

খসড়া প্রতিবেদনে স্বাক্ষরের পরও আচমকা অবস্থান বদল করেন সুভাষ চন্দ্র বসুর দাদা সুরেশ চন্দ্র বসু। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তিনি স্বাক্ষর করেননি।

মত পার্থক্য থাকলেও তাতে বিমান দুর্ঘটনা মিথ্যা প্রমাণিত হয় না।

কোনো প্রমাণ ছাড়াই মুখার্জি কমিশন নেতাজির মৃত্যু সম্পর্কে আগের কমিটি ও কমিশনের প্রতিবেদনের বিপরীতে প্রতিবেদন জমা দেয়।

 

শাহনওয়াজ খান ও এস এন মৈত্র স্বাক্ষরিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি পেশ করা হয় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৩ আগস্ট। সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে সংসদ। সুরেশ চন্দ্র বসু আপত্তি সংক্রান্ত প্রতিবেদনও সংসদে পেশ করা হয়। সেখানে তিনি দাবি করেন, বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি, নেতাজির মৃত্যুও হয়নি।

 

২০০৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। এই প্রতিবেদনের সঙ্গে কেন্দ্রের একটি অ্যাকশন টেকেন প্রতিবেদন সংসদে জমা দেয়। তারা মুখার্জি কমিশনের সঙ্গে একমত নয়, বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়নি এবং জাপানের মন্দিরে রাখা অস্তিভস্ম নেতাজির নয়। 

 

 

সাংবাদিক আশীষ রায়ের পর্যবেক্ষণ

লন্ডনের সাংবাদিক আশীষ রায় তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেন সুভাষ বসুকে নিয়ে। তিনি আমেরিকান টেলিভিশন সি এন এন-এর এশিয়ান ব্যুরো চিফ। তিনি জানান৬, বিমান দুর্ঘটনাতেই নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হন এবং ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট রাতে পরলোকগমন করেন। তার ওয়েবসাইটে নেতাজির চিকিৎসক তানিয়োসি ইয়োসিমির সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন; যেখানে তানিয়োসি দাবি করেছেন, তিনি নিজে সুভাষ চন্দ্র বসুর ডেথ সার্টিফিকেট লিখেছিলেন। তিনি আরো বলেন, সেদিন এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন পাঁচজন। লেফটেন্যান্ট নোনোমিয়া, ইয়োসিকাজু নাকামুরা নামে এক জাপানি দোভাষী, একজন নার্স ও নেতাজির ব্যক্তিগত সহকারী হাবিবুর রহমান। চিকিৎসার সময় সুভাষের প্রচণ্ড যন্ত্রণা হলেও তিনি নীরব ছিলেন। কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি জাপানি ভাষায় পানি চান। তাকে পানি দেওয়া হয় এবং কিছুক্ষণ পরে ঘুমাতে চান। তখন তাকে ইঞ্জেকশন পুষ করা হয়। রাত ১১টার দিকে সুভাষ মারা যান।

সাংবাদিক রায় সেই দোভাষীর সঙ্গে কথা বলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন। তিনি আরো দাবি করেন, জাপানের সামরিক উপদেষ্টার অফিস থেকে নেতাজির মৃত্যু সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে লে. কর্নেল নোনোগাকি জানান, বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ চন্দ্র বসু গুরুতর জখম হন। দুর্ঘটনার পর তিনি মাটিতে পড়েছিলেন, তার সারা গায়ে আগুন ধরে গিয়েছিলো। কোনোমতে আগুন নিভিয়ে তাকে অন্যান্য আহতদের সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তিনি নেতাজির মৃত্যুর খবর পান। রায় আরো জানান, হাবিবুর রহমানের বয়ান থেকে জানা যায়, ২২ আগস্ট সামরিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে তার সৎকার হয়। ২৩ আগস্ট তার অস্তিভস্ম জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রাখা হয়। অস্তিভস্মের সঙ্গে একটি সোনার দাঁতও রাখা হয়েছিলো।

এক্ষেত্রে কর্নেল হাবিবুর রহমানের লিখিত বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই বক্তব্যে বলা হয়েছে,

দুইটা ৩৫ নাগাদ বিমানটি উড়লো। এয়ার ফিল্ডের মধ্যে তখনো রয়েছে। সেই সময় বিকট আওয়াজ। মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়লো বিমান। সামনে পিছনে আগুন। পাইলটের পিছনে এক জাপানি অফিসার। ঠিক তার পিছনে বাদিকে বসেছিলেন তিনি। ঠিক ডানদিকে প্লেনের জ্বালানি ট্যাংক। আমি বসেছিলাম ঠিক তার পিছনে। প্লেন মাটিতে আছড়ে পড়ার পর আগুনের মধ্য দিয়ে তিনি বাইরে বেরুলেন। পিছনে আমি। দেখলাম তার সারা শরীরে আগুন। দ্রুত এগিয়ে গেলাম তার পোশাক খুলতে। যতোক্ষণে পোশাক আলগা করা হলো ততোক্ষণে তার শরীর আগুনে ঝলসে গেছে। মাথাতেও আঘাত। ট্যাংক থেকে তেল ছড়িয়ে পড়েছে পোশাকে। আমারও মুখ শরীর ঝলসে গেছে। মিনিট পনেরর মধ্যে আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো। ...৭

অনিতা বসুর একটি সাক্ষাৎকার এবং ...

২৮ জুলাই ২০১২ তে সুমনকে দেওয়া অনিতা বসুর এক সাক্ষাৎকার৮ সবাইকে সচেতন করে এবং নেতাজির মৃত্যু রহস্যকে সিদ্ধান্তে পরিণত করতে সাহায্য করে। মেয়ের কাছে বাবার মৃত্যু নিঃসন্দেহে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই তিনি এ নিয়ে ভেবেছেন এবং এ প্রশ্নের একটি উত্তর তার মনকে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে। তার উত্তরই বলে দেয়, তিনি নেতাজির মেয়ে। সাফ জবাব--বুদ্ধিদীপ্ত উন্নত মস্তিষ্ক, কোনো ভাবাবেগ বা হৃদয় তাড়িত উত্তর নয়। যে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে মহাত্মা গান্ধীও আবেগ তাড়িত ছিলেন--রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজনীতি করেছে--সেই প্রশ্নের যা উত্তর হওয়া উচিত তিনি তাই বলেছেন। শুধু জবাব নয়, সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাও উত্থাপন করেছেন অনিতা।

সুমন : স্বাধীন ভারতের সব থেকে বিতর্কিত প্রশ্ন--আপনার বাবার মৃত্যু কীভাবে হয়েছিলো বলে আপনার মনে হয়?

অনিতা বসু : এর উত্তর দেওয়া শক্ত। যতোদূর সম্ভব, বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়; অন্তত যে প্রমাণ পাওয়া যায়, সেই প্রমাণ তো এ কথাই বলে। সেই দুর্ঘটনা ঘটেছিলো ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হচ্ছে। তৎকালীন ফরমোজা বা বর্তমান তাইওয়ান থেকে জাপান বেরিয়ে আসছে। চারদিকে তখনো ধ্বংসলীলা চলছে। এই ডামাডোলের মধ্যে এটা আশা করা কঠিন যে, সব ঘটনার অকাট্য প্রমাণ থাকবে। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। বেশ কয়েক বছর আগে, অধ্যাপক গর্ডন--আমার বাবার জীবনীকার--জাপানে ছিলেন। তখন আমি এবং আমার স্বামীও জাপানে ছিলাম। ওই অধ্যাপক আমাদের ডাকেন। আমাদের সামনেই বেশ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে তিনি কথা বলেন। তাছাড়া তদন্ত কমিশনও দুর্ঘটনার কথা বলেছে। আমার মতামতের কথা যদি বলেন, আমি মনে করি, তৎকালীন ফরমোজা বা আজকের তাইওয়ানে তিনি সেদিন ছিলেন। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনা বা তার মৃত্যু বা তার সৎকার এ বিষয়গুলো নিয়ে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই।

আমি আগেই বলেছি এতো বছর আগে ও রকম অশান্ত সময়ে অতো প্রমাণ আশা করা যায় না। তবে আমি জানি, অনেকেই বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যুর বিষয়টি বিশ্বাস করে না। তার পিছনেও বিভিন্ন কারণ আছে। অনেকেই বিশ্বাস করে, তিনি অমর। এর পিছনে থাকা কারণগুলোকে আমার যুক্তিহীন বলে মনে হয়। তাছাড়া, অনেকেরই প্রবণতা থাকে, যেকোনো ঘটনাকে অকারণে রহস্যাবৃত করা। কেনেডি এবং আরাফাতের মৃত্যু ঘিরেও এই প্রবণতা দেখা যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, যতোদূর সম্ভব তিনি বিমান দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারান।

সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে অনিতা ভারত সরকারকে এই বিতর্কের অবসান ঘটানোরও অনুরোধ করেন। অনিতা বলেন, জাপানের রেনকোজি মন্দিরে রক্ষিত নেতাজির অস্তিভস্মের ডি এন এ টেস্ট করা হোক এবং স্বাধীন ভারতে নেতাজির অস্তিভস্ম এনে তা গঙ্গায় ছড়িয়ে নেতাজির প্রতি প্রকৃত সম্মান দেখানো হোক।

লেখক : ফারুক আলম, সাহিত্যিক ও ছড়াকার। তিনি খুলনায় একটি কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পড়ান। তার প্রকাশিত ছড়ার বই ‘গোলাপ-কাঁটা’।

falamsmc@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100008092277114

তথ্যসূত্র

১. ‘নেতাজিকে নিয়ে ওজুর ছবি!’; কালের কণ্ঠ, ১৭ অক্টোবর ২০১৯।

২. ‘গুমনামী বাবা আদতে নেতাজি নন’; ফয়জাবাদ থেকে প্রকাশিত হিন্দি দৈনিক জন মোর্চা; ২ নভেম্বর ১৯৮৫।

৩. রহমান, শেখ মুজিবুর (২০১২ : ১৭); অসমাপ্ত আত্মজীবনী; দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা।

৪. প্রাগুক্ত; রহমান (২০১২ : ৩৩)।

৫. প্রাগুক্ত; রহমান (২০১২ : ৩৬)।

6. https://www.youtube.com/watch?v=3kGkYDOt7Vs; retrieved on: 05.06.2019

7. https://www.youtube.com/watch?v=3kGkYDOt7Vs; retrieved on: 05.06.2019

8. https://www.youtube.com/watch?v=3kGkYDOt7Vs; retrieved on: 05.06.2019

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন