Magic Lanthon

               

রাশেদুল ইসলাম

প্রকাশিত ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ছোটো সিনেমার বড়ো লেখা

‘লস্ট আইডেনটিটি’ : আলো ভেবে আলেয়ার সন্ধানে

রাশেদুল ইসলাম

ভূমিকার বদলে

মানুষ একই সঙ্গে দুটো সত্তা নিয়ে চলে। প্রথমত, ব্যক্তিসত্তা--সমাজের প্রতিটি মানুষ অনন্য। তাদের পছন্দ, রুচি, সৌন্দর্যবোধ অনন্য। দ্বিতীয়ত, মানুষ একা একজন ব্যক্তি হয়ে উঠতে পারে না। সমাজের প্রতিটি উপাদান, সম্পর্ক, তার ওপর প্রভাব ফেলে--সে সামাজিক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ চর্চার মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সত্তার ওপর ভর করেই একজন মানুষের পরিচয়বোধ, অস্তিত্ববোধ গড়ে ওঠে। অন্যদিকে, ক্ষমতা ও পুঁজি নিজ বৈশিষ্ট্যেই ব্যক্তি ও সমাজের ওপর চেপে বসতে চায়। সংস্কৃতি, সাম্রাজ্যবাদ, রাষ্ট্র ইত্যাদি নানা নামে হাজির হয়ে চুষে নিতে চায় ব্যক্তিকে (বৃহৎ অর্থে সমাজকে)। নিজের বিস্তারের গরজেই সে চারদিকে চালাতে থাকে সম্মতি উৎপাদনের খেলা। আর সেই খেলার গুটিতে পরিণত হয়ে মানুষ নিজেদের মধ্যে তৈরি করে মিথ্যা চৈতন্য, হারাতে থাকে স্বকীয়তা-স্বাতন্ত্র্য-পরিচয়।

পুঁজির কোনো দেশ নেই। সে নিরন্তর ছুটে চলে--সামনে যতো বাধাই পাক, সব বাধাকে এড়িয়ে-গুড়িয়ে-মাড়িয়ে সে এগিয়ে যায়। আর তার এগিয়ে চলার রাস্তায় নদী পড়লে নদীকে শুকিয়ে ফেলে, বন পড়লে উজাড় করে ফেলে, ব্যক্তিমানুষ আসলে তার পরিচয়কে নস্যাৎ করে দেয়। বিশাল এ ‘হত্যাযজ্ঞে’ ব্যক্তি হয়ে পড়ে ভীষণ অসহায়। আর পুঁজির দৌরাত্ম্য এমনই যে, মানুষ নিজের অসহায়ত্বকেও শক্তি বলে ভুল করে। এমনই এক অসহায়ত্বের গল্প নিয়ে হাজির হয় পাঁচ মিনিটের একটি ইরানি চলচ্চিত্র লস্ট আইডেনটিটি (২০১১)।

লস্ট আইডেনটিটির আখ্যান

বৃটেনের রাস্তা ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরে সারা। মেয়েটি ইরান থেকে আসা। বসনে জিন্স-টিশার্ট-হিজাব। থাকে মায়ের সঙ্গে। বাড়িতে সারার মাকে ইরানে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে দেখা যায়--বৃটেনে এসে মানিয়ে নিতে না পারার কথা, খুবই কষ্ট করে টিকে থাকার কথা ইত্যাদি। সেই সময় দরজা খুলে বাড়িতে প্রবেশ করে সারা। দরজার পাশেই দেয়ালে ঝোলানো আয়নাটির দিকে চোখ পড়ে তার। আয়নায় নিজেকে জিন্স আর টিশার্টে দেখে খুব খুশি মনে হয় তাকে। মা ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। স্কুল কেমন কাটলো, ইরানি বান্ধবী কথাবার্তা বললো কি না, সারাকে এসব কথা জিজ্ঞাসা করেন মা।

এরপর নিজের ঘরে যায় সারা। স্কুলব্যাগ থেকে বেশ মোটাসোটা একটা পদার্থবিজ্ঞান বই বের করে পড়তে শুরু করে। একটু পরেই বোঝা যায়, আসলে সে বই পড়ছে না; পড়ছে বইয়ের মধ্যে লুকানো ফ্যাশন ম্যাগাজিন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে মা আসেন এবং তাকে নামাজ পড়তে বলেন। সারা হন্তদন্ত হয়ে ম্যাগাজিনটি লুকিয়ে নামাজের জন্য যায়। খুবই যত্ন নিয়ে সে ওজু করে, নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে সারা ঘরের বড়ো আয়নাটার সামনে বসে। সেখানে হিজাবে মোড়ানো নিজেকে দেখে অন্যমনস্ক হয়ে যায়। একপর্যায়ে নিজের রূপ ও সৌন্দর্য নিয়ে শঙ্কা-দ্বিধায় পড়ে!

সারা কল্পনায় নিজেকে দেখতে থাকে পশ্চিমা পোশাক পরিহিত অবস্থায়, যৌনাবেদনময়ী অবস্থায়, ধূমপান করা অবস্থায়। নিজেকে সে চিন্তা করে বৃটেনের আর পাঁচটা মেয়ের মতো, যাদের সবাই পছন্দ করে। এবার সে আবারও নিজের দিকে তাকায়। নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্ব যেনো আরো বেড়ে যায়; নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। ঠিক এই মুহূর্তে সারার মা ঘরে ঢোকেন এবং তাকে এমন অবস্থায় দেখে বুকে জড়িয়ে নেন।

রাস্তা কোন পথে নিয়ে যায়

পাঁচ মিনিট দৈর্ঘ্যরে লস্ট আইডেনটিটির শুরুতেই দেখা যায়, একটি সরু রাস্তা ধরে হাঁটছে সারা। এ রাস্তা ইরানের নয়, পাশ্চাত্যের। এখানে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো পাশ্চাত্যের, রাস্তার পাশে টাঙানো হোল্ডিংয়ের ছবিগুলো পাশ্চাত্যের, বাড়িগুলো পাশ্চাত্যের, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পাশ্চাত্যের। ফলে এখানে ‘ইরানি’ হয়ে ঘুরে বেড়োনো অস্বস্তির মনে হয় সারার চলনে-পরনে। আর সেজন্যই হয়তো গায়ে ওঠে জিন্স, শার্ট। এ যেনো পথেরই দাবি। পারস্য তাকে দেয় হিজাব আর পাশ্চাত্য জিন্স। খুবই যত্নে পথের সে দাবি পূরণ করে চলতে দেখা যায় সারাকে। এ যেনো অদ্ভুত স্বাধীনতা। যা খুশি পরার স্বাধীনতা, রাস্তায় অবাধে চলার স্বাধীনতা। বিদেশের রাস্তা-মানুষ-বন্ধু সবকিছুর মধ্যেই সারা যেনো নতুন কিছুর স্বাদ পেতে শুরু করে। সবকিছু সারাকে নতুন কিছু পরাতে চায়। সেই নতুন দেশ, পথঘাট, স্কুল, বিলবোর্ড, সিনেমা, ম্যাগাজিন দেখে জীবনকে নতুন করে বুঝতে চায়। সে নতুন সম্পর্ক দেখে, রীতিনীতি দেখে; দেখে বাজার, বিজ্ঞাপন। প্রভাবিত হয়। মনে মনে ভাবে, এসবই হয়তো পরম সত্য। এসব তার ফেলে আসা জীবনের চেয়ে ভালো।


পাশ্চাত্যের রাস্তা ধরে হাটছে সারা


কিন্তু পথের এ দাবির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যে অতোটাও সহজ নয়, তা সারার মায়ের সংলাপে বোঝা যায়। যখন তিনি ইরানবাসী আত্মীয়কে বলেন--‘এখানে সবই তো অপরিচিত, আমরা কেবল অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি।’ আর ‘কেমন আছো’র জবাবে বলেন--‘কোনোরকমে ভালো আছি।’ তারপর আয়নার সামনে দাঁড়ান। নিজেকে নিয়ে তিনি শঙ্কায় পড়েন, উত্তরটা ঠিক দিলেন তো!

আলোর নামে আলেয়া--বইয়ের বদলে ম্যাগাজিন

পুঁজির ধর্ম নদীর মতো বয়ে চলা। নদী নিজে থেকে তার গতিপথ তৈরি করে নেয়, তার তীরে গড়ে ওঠে জনপদ, সংস্কৃতি, সমাজ। পুঁজিও চলে তেমনভাবেই। তাকে কেন্দ্র করে মানুষ, সংস্কৃতি, সমাজ বদলায়। নদী যদি কোথাও ক্রমাগত বাধা পেতে থাকে, সে তখন সব বাধাকে ধ্বংস করে সামনে এগিয়ে যায়। পুঁজির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি খুব বেশি আলাদা নয়। নিজের গতিপথকে সামাল দিতে সে সংস্কৃতি, সমাজ এমনকি মানুষকে ধ্বংস করে নিজের বিস্তৃতি ঘটায়।

এভাবে পুঁজি তার নিজের প্রয়োজনে মানুষের জীবনবোধ, সংস্কৃতি, রুচিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তার নিজের স্বার্থানুযায়ী জীবনবোধের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা তৈরি করে দেয়, সঙ্গে সৌন্দর্য-নীতিবোধেরও। সে সংজ্ঞার বাইরে গেলে মানুষ আর সুন্দর থাকে না, পাত্তা পায় না! এই বিষয়ের অবতারণা লস্ট আইডেনটিটির দুই মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে চোখে পড়ে। সারা তার ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে রাখা ফ্যাশন ম্যাগাজিনটি বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকে। এমন সময়ে মা ঘরে ঢুকলে সে ইতস্তত হয়ে সেটি লুকানোর চেষ্টা করে। মা তাকে প্রশ্ন করে পড়াশোনা হচ্ছে কি না। উত্তরে সে হ্যাঁ বলে।

এই হ্যাঁ কোন অর্থে হ্যাঁ, আর এই পড়াশোনা যে কেমন পড়াশোনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে মা বোঝেন না। কিন্তু ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে সারা ভাবতে শুরু করে, কীভাবে তাকে সুন্দর লাগবে, নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করলে সে গুরুত্ব পাবে, সবাই তাকে সুন্দর বলবে ইত্যাদি। এ কারণেই হয়তো সে বোরখা ছেড়ে জিন্স বেছে নেয়। ম্যাগাজিনের নারীটিকে দেখে হয়তো তার মতো হতে ইচ্ছে করে সারার। হয়তো ভাবতে শুরু করে, ম্যাগাজিনে দেখানো সৌন্দর্যই আসল। নারী হিসেবে ‘অবদমন’, ‘পরাধীনতা’ আর ‘গোপনীয়তা’র মধ্যে বেড়ে ওঠা সারা হয়তো এর ভিতরেই মুক্তির পথ দেখে। অথচ এই মনে হওয়ার মধ্যে অজান্তেই সে সায় দিতে শুরু করে পুঁজি-ক্ষমতা-রাষ্ট্রের গোলকধাঁধায়।

মানুষকে নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার তার সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ। সারা ম্যাগাজিনের মডেলকে দেখে হয়তো ভেবে নেয় এটাই ‘সভ্যতা’; এটাই আসল সংস্কৃতি। এভাবে পুঁজি-ক্ষমতা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়ে সাধারণের মননে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই ব্যবহৃত হতে থাকে। পুঁজির স্বার্থে সংস্কৃতির আদর্শ রূপ তৈরি হয়ে যায়--এর বাইরে গেলেই ‘অসভ্য’, ‘অনুন্নত’। ফলে মানুষ সেই সংস্কৃতির দিকে উঠে পড়ে লাগে, পণ্যে পরিণত হয়। একপর্যায়ে সে তার নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে দূরে চলে যায়। সারার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হতে শুরু করেছে।

সারার মতো অসংখ্য মানুষ চেতনে-অচেতনে পুঁজিবাদের রাজনীতিতে হাবুডুবু খায়। আর পুঁজিবাদ ঢাকঢোল পিটিয়ে তার দর্শনকে প্রচার করে হাজারো বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ব্যানার, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, নাটক, প্রতিযোগিতা, পুরস্কারে। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় হাজারো হম্বিতম্বি, যজ্ঞ-যন্ত্রণা করে গোটা বিশ্ব থেকে কিছু নারীকে তারা নির্বাচন করে। এরপর যে দেশ বা ভৌগলিক পরিমণ্ডলে পণ্যদূত প্রয়োজন, যেখানে বাণিজ্যের সম্ভাবনা ভালো, সেখান থেকে একজনকে পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হয়। তারপর তাকে ঘিরে চলতে থাকে বিজ্ঞাপন আর বাণিজ্যের পাহাড় গড়ার খেলা। জনমানুষও বুঁদ হয়ে থাকে সেই নারীর ‘সৌন্দর্য’ তথা পণ্যের বিজ্ঞাপনে, বাণিজ্যে। আর এই ফাঁদে পা দিতে যাওয়া সারাদের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই তো ম্যাগাজিন নিয়ে সারার এতো লুকোচুরি! মূলত এই লুকোচুরি কেবল ম্যাগাজিন নিয়েই নয়, এটা তার নিজের সঙ্গে নিজের শিক্ষা-সংস্কৃতি-আচার-মূল্যবোধ নিয়েও।

এ এক মানিয়ে নিতে না পারার গল্প

সারার জন্ম ইরানে। সেখানকার পরিবেশ, সংস্কৃতি, কবিতা, চলচ্চিত্র, বইয়ের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা। ইরান তার শিরা-উপশিরায় বহমান। মধ্যপ্রাচ্যের সারা পাশ্চাত্যে এসে যে সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে তা ইরান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সে দোটানায় পড়ে যায়। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। কারণ সৌদি আরবের সংস্কৃতি আর ইরানের সংস্কৃতি এক নয়। আবার মালয়েশিয়া কিংবা ইন্দোনেশিয়ার প্রেক্ষাপট আরো ভিন্ন। বাংলাদেশের অবস্থা একেবারে অন্যরকম।

চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ১৯ সেকেন্ডে সারাকে তার মা বলেন, ‘অন্ধকার হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি নামাজ পড়ে নাও। ইরানের মতো এখানে তো আর নামাজের জন্য আলাদা ঘর নেই।’ এ সংলাপ থেকে স্পষ্ট হয়, ইরানে প্রত্যেক বাড়িতে হয়তো নামাজের জন্য আলাদা ঘর থাকে। পৃথিবীতে একমাত্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত ইরানের সমাজব্যবস্থা নিয়ে একটু খোঁজ নিলে জানা যায়, সেখানে নারীদের জীবন ব্যাপকভাবে ইসলামি নিয়মকানুনে আবদ্ধ। সবাইকে খুব কঠোরভাবে পর্দা মানতে হয়। আরো কঠিন ব্যাপার হলো, কোনো নারী ইচ্ছা করলেই একা ট্রেনে বা বাসে কোথাও যেতে পারে না, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া। কর্মক্ষেত্রেও তাদের নানাধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। বাস্তবে সামগ্রিক এই ‘কঠোরতা’ হয়ে উঠেছে ইরানের সংস্কৃতি। ফলে ইরান থেকে যাওয়া সারার ‘স্বাধীন’ বৃটেনের অনেক কিছুই মেনে নিতে কষ্ট হয়।

লস্ট আইডেনটিটি -এর একটি দৃশ্য


এছাড়া স্কুলে সহপাঠীদের থেকেও সারা ‘অন্যরকম’। সে অন্যরকম চিন্তায়, বেশভূষায়, চলনেবলনে। ফলে তার সঙ্গে কেউ মিশতে চায় না। তার একমাত্র বন্ধুটিও ইরানি। নতুন বন্ধু তৈরি, সবার সঙ্গে মেশার ইচ্ছে হয় সারার। তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করে সে, যাতে সবাই তাকে নিজেদের মানুষ মনে করে। অথচ নিজের ‘গণ্ডি’ থেকে বের হতেও ভয় হয় তার। এর ফল হিসেবে নিজের মধ্যে সারা পুষে রাখে ভয়ঙ্কর এক মানিয়ে না নিতে পারার যন্ত্রণা!

স্বাধীনতার খোঁজে

সৃজনশীলতার পূর্বশর্ত স্বাধীনতা।১ কিন্তু সেই স্বাধীনতা নানা কারণে বাধাগ্রস্থ হয়--কখনো পুঁজিতন্ত্র, কখনো পুরুষতন্ত্র, কখনো পেশিতন্ত্র দ্বারা। স্বাধীনতার দরজা যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন আপনা-আপনিই মনুষ্যত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। স্বাধীন হতে গেলে সর্বপ্রথম শিকলটাকে চিনতে হয়। প্রশ্ন তুলতে হয় শিকলটা নিয়ে। স্বাধীনতাহীন মানুষ আর গৃহপালিত পশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।

অন্যভাবে বলতে গেলে, অস্তিত্ব রক্ষার অধিকার হলো স্বাধীনতা; স্বেচ্ছাচারিতা নয়। একজন ব্যক্তি কী কাজ করবে, করবে না বা কতোটুকু করবে, কী খাবে আর খাবে না বা কতোটুকু খাবে, বের হবে নাকি ঘরে থাকবে তার এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারই স্বাধীনতা। মার্কস যেমনটা বলেন, একজন মানুষ কখনোই স্বাধীন নয়, যতোক্ষণ সে নিজেই নিজের অধিপতি না হয়। এই নিজের অধিপতি হওয়া বলতে বোঝায়, ব্যক্তির অস্তিত্ব তার নিজের দখলে রাখা। একটি রাষ্ট্রের মানুষ যখন স্বাধীনতা লাভ করে তা আর ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ‘প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনতার নিশ্চয়তাই হচ্ছে সামগ্রিক স্বাধীনতা।’২

এই স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষার একটি অসাধারণ মোটিভ ব্যবহার হয়েছে লস্ট আইডেনটিটিতে। চলচ্চিত্রজুড়ে সারা ও তার মাকে নানা কারণে বেশ কয়েকবার দরজা খুলতে দেখা যায়। বার বার এই দরজা খোলার মধ্যে সবকিছু থেকে বেরিয়ে আসার একটা আকাঙ্ক্ষা ফুটে ওঠে। হাজারো বাধা পাশ কাটিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে তারা যেনো প্রস্তুত। যতোই খাঁচাবন্দি করার চেষ্টা হোক, বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষা যেনো ততোই গভীর।

সুন্দর কিন্তু সুন্দর না

আজকের ইথিওপিয়া নামের দেশটির নাম শুনলেই মনের মধ্যে কিছু কালো, ক্ষুধার্ত, রুগ্ন মানুষের চেহারা ভেসে ওঠে। অথচ এই ইথিওপিয়াই একসময় ছিলো বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর, ধনী রাষ্ট্র। গ্রিকরাও নাকি বলতো, ঈশ্বর এসে ইথিওপিয়ার সঙ্গে আড্ডা দেয়। এবং সেসময় গোটা বিশ্বে মানুষের আদর্শ প্রতিমা ছিলো ইথিওপিয়ানরা। অর্থাৎ ইথিওপিয়ান মানুষ ছিলো সুন্দর, কালো সুন্দর, মোটা সুন্দর!

এখন ইথিওপিয়া ক্ষমতাধর না। এখন ক্ষমতা অন্যদের হাতে--যুক্তরাষ্ট্র, চিন, সাদাদের হাতে। এবং এবারও বিশ্বের কাছে সুন্দর মানুষ মানেই আমেরিকার মানুষ, সাদা চামড়ার মানুষ, চিকন-ছিমছাম মানুষ। অর্থাৎ যার হাতে ক্ষমতা, সে সুন্দর। সৌন্দর্যের এই রাজনীতি একদিনের নয়। প্রোপাগান্ডা-বিজ্ঞাপন-শিল্প-সাহিত্য-ভিজ্যুয়াল দিয়ে, বলপ্রয়োগ করে নানাভাবেই ক্ষমতাবানরা তাদের ‘সৌন্দর্য’কে সাধারণের আদর্শ করে তুলেছে। চলচ্চিত্রের দুই মিনিটে সারাকে ম্যাগাজিনে চোখ রাখতে দেখা যায়। সে ম্যাগাজিনে থাকা বিভিন্ন মডেলকে দেখতে থাকে। সে নিয়মিত ম্যাগাজিনের মানুষটিকেই পরম ‘সুন্দর’ বলেই ভাবতে শুরু করে। তার কল্পনাতেও সেটা ঘটতে থাকে।

ম্যাগাজিনের মডেল যেমন জানে না, কীভাবে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে--সারাও ঠিক জানে না কীভাবে সৌন্দর্যের নামে নিজেকে সে সমর্পণ করতে যাচ্ছে। এভাবে ক্ষমতা আর সৌন্দর্য একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। বর্তমানে পশ্চিম ক্ষমতায় আছে, তাই বিশ্ব তাদের সৌন্দর্য-ব্যাকরণের বাইরে যেতে পারে না। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন হয় ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’, ‘পন্ডস’ এর। বিজ্ঞাপনের নামে প্রতিনিয়ত তারা ঘোষণা করে সুন্দরের সংজ্ঞা। আর সাধারণ মানুষ তা অনুসরণ করতে গিয়ে স্বকীয়তাকে হারাতে থাকে, অস্তিত্বকে ভুলতে বসে।

অভিবাসী সঙ্কট ও দুজন নারী

২১ শতকের বিশ্বে অন্যতম আলোচ্য বিষয় অভিবাসন। বিশ্বায়ন প্রবাহের প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়নকে সংজ্ঞায়ন ও চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে অভিবাসন অধ্যয়ন জ্ঞানকাণ্ডীয় পরিসরে একটি বহুল অধিত বিষয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। উত্তর আধুনিক চিন্তা-চেতনা এবং বিশ্বায়নের স্রোতধারা অভিবাসনে এক নতুন ধারার সংযোজন করেছে। লস্ট আইডেনটিটিরও অন্যতম আলোচ্য বিষয় এটি। এখানে সারা ও তার মা ইরান থেকে পাশ্চাত্যে অভিবাসী জীবন যাপন করতে আসে।

মানুষ কেনো অভিবাসী হয়? এর পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে সাধারণত জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য মানুষ অভিবাসী হয়ে থাকে। নানা কারণের মধ্যে শিক্ষা, বাসস্থান, খাদ্য, পোশাক ইত্যাদি চাহিদাগুলোর অনটন থেকে রেহাই পেতে মূলত মানুষ অভিবাসী হয়। তাছাড়া দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক নিপীড়নের মধ্যে অভিবাসন কখনো কখনো হয়ে ওঠে অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র উপায়। আবার অনেক সময় নতুন উপায়ে উপার্জনের হাতছানি, তথ্য প্রযুক্তির প্রসার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণেও অভিবাসিত হতে দেখা যায়। 

সারা ও তার মা ঠিক কোন কারণে অভিবাসিত হয়, তা চলচ্চিত্রে পরিষ্কার নয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের নারীদের অভিবাসী হওয়ার আরো কিছু কারণ আছে। সেখানে নারী কখনোই পুরুষের সমান বলে বিবেচিত হয় না। পদে পদে তাকে নির্যাতিত, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনের নামে অবদমনের শিকার হতে হয়। রাষ্ট্রই যখন এমন ব্যবস্থাকে সমর্থন করে, তখন অভিবাসী হওয়ার পথে পা বাড়ানো অস্বাভাবিক নয়। চলচ্চিত্রে পুরুষহীনভাবে দুজন নারীর উপস্থাপন হয়তো সেদিকেই ইঙ্গিত করে; হয়তো পুরুষের বাইরে গিয়ে, কর্তৃত্বের বাইরে গিয়ে, অবদমন মুক্ত এক জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছে। যদিও সে আকাঙ্ক্ষা নতুন দেশে কতোটা পূরণীয়, তা ভাবার অবকাশ আছে।

শেষ করার আগে

ইরানের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সারা এখন পশ্চিমের ‘স্বাধীনতা’ ভোগ করে। সে এখন ‘পুরুষ’ অভিভাবক ছাড়াই যখন খুশি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারে, ইচ্ছা মতো পোশাক পরতে পারে। তার কোনো কাজেই যেনো এখন আর ‘না’ বলার কেউ নেই। এতোসব ‘স্বাধীনতা’ পেয়েও সারা কেনো যেনো অজানা এক শিকল থেকে মুক্তি চায়। সে যে স্বাধীনতাকে প্রতিদিন দেখছে তা যেনো তার অস্তিত্বেরই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। তাই দিনশেষে সারা হয়তো তার অস্তিত্বকে খুঁজে পেতে মায়ের বুকেই আশ্রয় নেয়।

মানুষ নিজের সত্তাকে পিছনে ফেলে ‘অপর’ হতে চায়। অথচ সে আসলেই কি লাভবান হয়? এ প্রশ্নই বার বার মূর্ত হয়ে ওঠে মাহরোখ রাভেই (Mahrokh Ravaei) এর লস্ট আডেনটিটিতে। যেখানে সারা হয়ে উঠেছে অস্তিত্বের খোঁজে থাকা হাজারো মানুষের প্রতিনিধি।

লেখক : রাশেদুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবী বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

rashed73635@gmail.com

https://facebook.com/md.rashedulislam.5036459

তথ্যসূত্র

১. মাহমুদ, আরিফ রেজা (২০১৯ : ৮); ‘কর্তৃত্ব বিরোধী ইশতেহার’; অরাজ গ্রন্থগুচ্ছ-১; সম্পাদনা : আরিফ রেজা মাহমুদ, পার্থ প্রতীম দাস; স্বাধীনতা প্রকাশন, ঢাকা।

২. প্রাগুক্ত; মাহমুদ (২০১৯ : ৬)।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০ তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।


 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন