আনতারা সোনিয়া
প্রকাশিত ০২ নভেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
জীবনকে একেবারে অন্যভাবে চেনায় ‘পিউপা’
আনতারা সোনিয়া

রঙিন প্রজাপতি হওয়ার ঠিক আগে
ছোটো ছোটো সুতোর আল দিয়ে তৈরি হয় বড়ো বড়ো জাল। জালে বন্দি থাকে সুতোগুলো। সেই জাল থেকে কোনো সুতোকে অক্ষত অবস্থায় আলাদা করা অসম্ভব। মানুষও জালের সুতোর মতোই পরিবার ও সমাজে আবদ্ধ, এক মানুষের জীবন আরেক মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়ানো। কখনো দায়িত্ব, কখনো ভালোবাসা এই বন্ধনকে আরো গাঢ় করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে দায়িত্ব কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রবাদে আছে ‘ঘর পুড়লে উঠোন তাপায়’। পরিবারের কোনো সদস্যের ওপর সমস্যা আসলে তার আঁচ অন্য সবার গায়েই লাগে। সবাইকেই কমবেশি সেই সমস্যার সঙ্গে লড়তে হয়। এক্ষেত্রে আঁতাতের অনুপাত অনুযায়ী ঝুঁকির হেরফের হয়। কিছুকাল আগের জামানায় একক পরিবারের তুলনায় একান্নবর্তী পরিবারে সমস্যাগুলো ভাগ করে নেওয়ার মানুষ বেশি ছিলো। হা করা নেকড়ের মুখের মতো এই সময়ে তথাকথিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগা একক পরিবারে সমস্যা ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ কম। এই পরিস্থিতিতে এক প্রাণকে সমস্যা মুক্ত করতে আরেক প্রাণ সমস্যায় পড়ে আইঢাই করে। শুধু আইঢাই করেই শেষ হয় না, কখনো কখনো পরিবারের জন্য স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হয়। সেই বিসর্জনে মানব মন আবার ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ভিতরে ভিতরে আহত হতে থাকে অফুটন্ত ভবিষ্যতের ভাবনায়। আহত মন নিয়ে জীবনকে গতি দেওয়া অসম্ভব হয়ে যায়।
সেই আহত মন নিয়ে মানুষ ধিক ধিক করে বাঁচে। স্বপ্নগুলো নিষ্প্রভ হয়। ব্যথাতুর মন খাঁ-খাঁ করে মরুভূমির মতো। এই পরিস্থিতিতে মানব মনে জন্ম হয় দ্বন্দ্ব--স্বপ্ন ও স্বপ্ন ভঙ্গের দ্বন্দ্ব, ভালো-মন্দের দ্বন্দ্ব, বর্তমান-ভবিষ্যতের দ্বন্দ্ব। দ্বন্দ্বের মধ্যে মানুষ গুটি পোকার মতো আবদ্ধ হয়ে থাকে। বেশিরভাগ মানুষের জন্যই দ্বন্দ্বের দেয়াল চিরে বেরিয়ে আসা সহজ হয় না। তবে চারপাশে অল্প সংখ্যক হলেও চিরাচরিত নিয়মের বাইরের কিছু মানুষ থাকে/আছে; যারা জীবনকে দেখে ভিন্ন চোখে, জীবনকে গতি দেয় সত্য-বাস্তবতার নিরিখে। তাদের জীবন চলে দর্শন এবং বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে। তারা জাগতিক জীবনের কোনো জঞ্জালের কাছে হেরে যায় না। জীবনকে তারা কাজ, নিষ্ঠা এবং আনন্দে ভরিয়ে রাখতে জানে। তারা প্রিয়জনকে ভালোবাসতে জানে। প্রিয়জন/মানুষের আপদে-বিপদে তারা মমতার হাত বাড়িয়ে দেয়। দ্বন্দ্বের দেয়াল ভেঙে তারা প্রিয়জন/মানুষকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করে। তারা প্রত্যাশিত স্বপ্নের ফেরি করে বেড়ায়। এ রকম কিছু বিষয় একীভূত করেই নির্মিত হয়েছে পিউপা চলচ্চিত্রটি।
পিউপা দেখার পর বার বার মনে হয়েছে কেনো চলচ্চিত্রের নাম পিউপা। নিজের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার খাতিরে পিউপা শব্দটির মানে খুব ভালো করেই জানতাম। কীটপতঙ্গের জীবনচক্রের একটি ধাপের নাম--পিউপা, যার মানে গুটিপোকা। এর পরের ধাপ হচ্ছে রঙিন ডানাযুক্ত মোহনীয় প্রজাপতির। গুটিপোকা একটি খোলকে অবস্থান করে স্থবির সময় পার করে, এ সময় তারা খাদ্য গ্রহণ করে না, চলাচল করে না, এমনকি উজ্জ্বল রঙও ধারণ করে না। চলচ্চিত্রটির চরিত্রগুলোও ঠিক যেনো গুটিপোকার মতোই নিশ্চল, রঙহীন। তবে শেষটায় সমস্যা শেষে নতুন স্বপ্ন হাতছানি দেয়। সবাই রঙিন প্রজাপতির মতো স্বপ্ন ছোঁয়ার আশায় উড়াল দেয়। যেমন ঠিক গুটিপোকার আবদ্ধ জীবন শেষ হলেই রঙিন প্রজাপতি উড়ে। মানুষের জীবনেও হয়তো এমন গুটিপোকার সময়কাল আসে। ইন্দ্রাশীস-এর পিউপা যেনো প্রজাপতি হয়ে ওঠার আগের ধাপকেই সবিস্তারে মেলে ধরেছে।
মৃত্যুর ভাঁজে ভাঁজে জীবনের গল্প
পিউপায় দৃশ্যায়ন হয়েছে এক মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের গল্প। গল্প জুড়েই মৃত্যুর গন্ধ। পরিবারের একজন মানুষের শেষকৃত্যের সঙ্গে সঙ্গেই আরেকজন মানুষ মৃত্যুকে আলিঙ্গনে পা বাড়ায়। তার সেই অন্তিম যাত্রায় পরিবারের মানুষেরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখতে থাকে। সেই মৃত্যু পথযাত্রীর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে প্রতিটি জীবন। এর সঙ্গে যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত তার নাম শুভ্র। আর মৃত্যু পথযাত্রী মানুষটি শুভ্রের বাবা সজলবাবু। টেলিপোর্টেশন১ এ কাজ করা শুভ্র আমেরিকা অভিবাসী। অসুস্থ মাকে দেখতে এসে মায়ের ভস্ম গঙ্গায় ভাসাতে হয়। মা’র বিদায়ে মানুষ কাঁদে। কিন্তু শুভ্র কাঁদেনি। দেখে মনে হয়, শক্ত ধরনের ছেলে শুভ্র। কিন্তু মায়ের স্মরণ সভা শেষ হতে না হতেই সিরেব্রাল অ্যাটাকে কোমাচ্ছন্ন হন তার বাবা। একদিকে মৃত্যুশয্যায় বাবা, অন্যদিকে প্রবাসে কাজে ফেরার চাপ। কোনটা করবেন তিনি। এদিকে নিজের দেশে টেলিপোর্টেশনের কাজের কোনো ভালো ক্ষেত্রও নাই; তাই আমেরিকা ফেরাটা তার জন্য জরুরি।
পরিবারের অন্যান্য সদস্য বলতে তার কাকা রজত ও বোন মৌ। মৌ বিবাহিত। নিজের সংসারের টাল সামলে রোজ বাবাকে দেখতে আসেন তিনি। মুমূর্ষু বাবাকে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চান। কিন্তু কোথায় যেনো তার শিকল বাঁধা। ব্যাগে রাখা ঘুমের ওষুধ বলে দেয় সংসারে তিনিও খুব একটা ভালো নেই। একসময় টান পড়ে সংসারের রশিতে। মুমূর্ষু বাবাকে দেখতে আসার ইচ্ছা ধীরে ধীরে দমন করতে চান মৌ। তবে জীবনের সঙ্গে জীবনের যোগ সহজে ছিন্ন করা যায় না।
এদিকে অসীমের দিকে তরি বেয়ে চলা বাবাকে নিয়ে বড্ড অসহায় হয়ে পড়েন শুভ্র। চিকিৎসকরা বার বারই বলে, বাবার হাতে সময় বেশি নেই। তবে সে সময় কতোদিন তা কেউ বলতে পারে না। অন্যদিকে বাবার সঙ্গে পড়ে থেকেও ক্যারিয়ার এবং নিজের ভবিষ্যতের জন্য শুভ্রের মনে ধীরে ধীরে মেঘ জমতে থাকে। কিন্তু মুমূর্ষু বাবাকে ফেলে জীবনের ডাকে সাড়া দিতে পারেন না শুভ্র। একটি মৃত্যু পেরিয়ে আরেকটি মৃত্যুর অপেক্ষায় তাকে বসে থাকতে হয়! তাই বলে কি এক জীবন অন্য জীবনের জন্য থেমে থাকে! একসময় শুভ্রের প্রেমিকা বর্ষা আমেরিকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন। বর্ষার এই সিদ্ধান্তে আরো দিশেহারা হয়ে পড়েন শুভ্র। ভিতরে ভিতরে নিয়ত দ্বন্দ্ব চলতে থাকে; কিন্তু কোনো সমাধান খুঁজে পান না তিনি। একপর্যায়ে মরণাপন্ন বাবার কারণে তার নিজের জীবনই উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। তবে শুভ্রকে তার চাচা রজত আবেগে আটকে না থেকে ফিরে যেতে বলেন।
রজত জীবনকে দেখেন বাস্তবতার নিরিখে। তিনি ঘুরতে পছন্দ করেন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মানুষের মুখাবয়ব ও মস্তিষ্কের ডেটা অ্যানালাইসিস করে তাদের বৈশিষ্ট্য বের করা তার কাজ। রজত নানাভাবে শুভ্রকে এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করতে থাকেন। কিন্তু শুভ্র খানিকটা দিশেহারা। শেষ পর্যন্ত নিরুপায় রজত একরাতে গোপনে কড়া ঘুমের ওষুধ দিয়ে ভাই সজলবাবুকে চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দেন। নির্মম এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় একটি জীবন আরেকটি জীবনের সামনে থেকে সরে দাঁড়ায়। শুভ্র আমেরিকা চলে যান। মৌ সংসার-সন্তান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আর রজত বের হন তার জীবনের অনুকূল অবস্থান খুঁজতে। পাহাড়ের উপর নীল আকাশের নিচে হাঁটতে থাকেন তিনি। ঝলমলে আলো ফিকরে পড়ে তার চারপাশটায়। এসব মিলেই পিউপার মানুষগুলোর গল্প।
দায়িত্ব বড়ো কঠিন এ বিশ্ব চরাচরে
পিউপায় শুভ্রের হয়তো প্রচলিত রীতিনীতি খুব একটা ভালো লাগতো না। তাই শ্রাদ্ধের বদলে মায়ের জন্য স্মরণ সভার আয়োজন করেন তিনি। পরিবারের সব কাজের পাঠ চুকিয়ে শুভ্র যখন নয়া জীবনের টানে আমেরিকা উড়াল দেওয়ার আয়োজন করছেন বিপত্তিটা ঠিক তখনই ঘটে। শুভ্রের বাবা সিরেব্রাল অ্যাটাকে কোমাচ্ছন্ন হন। যে বাবা সন্তানকে এতো আদর-যত্ন, মমতায় বড়ো করে, সেই বাবাকে এভাবে রেখে তিনি প্রবাসে ফেরার চিন্তা করতে পারেন না। অচেতন বাবার দায়িত্ব অর্পণের মতো আস্থাশীল মানুষও হয়তো শুভ্রের ছিলো না। চলচ্চিত্রের একপর্যায়ে বর্ষার কোলে মাথা রেখে শুভ্রকে হতাশ গলায় বলতে শোনা যায়, ‘দিদি আসছে মাঝে মাঝে, এর মধ্যেই অরুণদার সঙ্গে ঝামেলা শুরু হয়ে গেছে। আর কাকা (রজত) তো ব্যস্ত মানুষ’। দিদি বা কাকা কারও ওপরেই তিনি অসুস্থ বাবার দায়িত্ব অর্পণে ভরসা করতে পারছিলেন না। কেননা দিদি/কাকা দুজনেরই নিজস্ব কাজ/ভুবন আছে।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২৫ মিনিট ১৯ সেকেন্ডে কাকার সঙ্গে মদ্যপানের সময় শুভ্র খুব উত্তেজিত হয়ে পড়েন। রাগত গলায় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি যখন বিদেশে ছিলে এ বাড়ি তখন আত্মীয়স্বজনে গম গম করতো, কোনো সমস্যা হলে সবাই দেখতো, বাট নাও টাইম চেঞ্জেস’। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ায় সেই বাড়িতে এখন কেউ নেই। শুভ্রের অনুপস্থিতিতে তার কোমায় থাকা বাবা একা, নিঃসঙ্গ। কিন্তু অসুস্থ বাবার সামান্যতম যত্ন-আত্তির ত্রুটি তাকে বিপর্যস্ত করে। সেবিকাদের দায়িত্বহীন আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে খুব রাগ করতে দেখা যায়। বাবা-ছেলের অমোঘ বন্ধন তাকে ফিরতে দেয় না। বাবার প্রতি ভালোবাসা তাকে বিনা ডোরে বেঁধে রাখে। শেষ সময়ে তিনি বাবাকে দু-হাতে ছুঁয়ে পাশে থাকতে চান। এজন্য বাবার বিছানার পাশে নিজের বিছানা পাতেন। কখনো প্রিয় গাছে গাছে ভরিয়ে দিতে চান বাবার ঘর।
শুভ্রের কাছে বাবা হয়তো শুধু একজন মানুষ নয়, স্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মধ্যে জড়িয়ে আছে বিশালতার এক মায়াবী প্রকাশ। সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানো বাবাকে শুধু একজন মানুষের সঙ্গে তুলনা করলে চলে না। বাবার বুকের সিঁড়ি বেয়ে সন্তানের বিচরণ। এর বিপরীতে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্বও কম নয়। আবেগ আর দায়িত্বের মিশেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয় সেটা হেলায় ফেলে দেওয়ার মতো নয়।
ফলে শুভ্রের ক্ষেত্রে আবেগ আর দায়িত্ববোধের মানদণ্ডে দায়িত্ববোধের পাল্লাটাই ভারী। যদিও কোমায় থাকা, মৃতপ্রায় সজলবাবুর দৃশ্যত কোনো আবেগ, অনুভূতির বালাই ছিলো না। তার সেবায় দুইজন সেবিকা ছিলো। তবুও শুভ্র বাবাকে ফেলে ফিরতে পারছিলেন না। কারণ বাবা-সন্তান-বাবা পরম্পরায় আদর্শ, নীতি, দায়িত্ব, সংস্কৃতি প্রবাহিত হয়। এ ধারা জারি রাখার জন্য বাবা-সন্তান-বাবা সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। কবি গোলাম মোস্তফা যেমনটা বলেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’। আজকের শিশুই ভবিষ্যতের বাবা। তাই ভবিষ্যতের বাবার জন্য পরিবারে বর্তমান বাবা-সন্তান সম্পর্কের জুড়ি নেই। শুভ্রও একদিন বাবা হবেন। সেই বাবাই আজকের এই কোমায় থাকা বাবাকে হয়তো ধারণ করছে।
দর্শন ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধন
দর্শন ও বিজ্ঞান উভয়ের মূলে সত্যানুসন্ধানের অপ্রতিহত বাসনা থাকলেও বিস্তর ফারাক। পদ্ধতিগত দিক দিয়ে দর্শন যৌক্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী হলেও বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণনির্ভর অভিজ্ঞতা। দর্শনের বিষয় মানবজীবন হলেও বিজ্ঞান বিশ্বজগৎ নিয়ে কাজ করে। দার্শনিক সিদ্ধান্ত সর্বজনীন না হলেও বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত সর্বজনীন ও নিশ্চিত। পিউপায় নির্মাতা ইন্দ্রাশীস আচার্য দর্শন ও বিজ্ঞানকে সমান্তরালে উপস্থাপন করেছেন। রজতই যেনো সেই মেলবন্ধন। ঘোর বাস্তববাদী রজত একসময় বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। অকৃতদার এই মানুষটি ভ্রমণ পাগল। মুক্তমনা মানুষও বটে। মৃত্যু তার কাছে স্বাভাবিক; তিনি খুব নিবিড়ভাবে মৃত্যুকে উপভোগ করতে চান। কালজয়ী ঔপন্যাসিক শহীদুল্লাহ কায়সার যেমনটা মনে করেন, ‘জীবনকে যেমন মৃত্যুকেও তেমন স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হবে।’ পিউপায় রজত অল্পকিছু নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিয়ে সব মায়া ত্যাগ করে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান। এতো প্রিয় বউদির মৃত্যু, দাদার অন্তর্যাত্রা তাকে খুব বেশি বিচলিত করে না। ভাইপো শুভ্রকে তিনি নানা উদাহরণ দিয়ে মৃত্যুর স্বাভাবিকতার রহস্য জানাতে চান। শুভ্র যাতে বাবার কোমাচ্ছন্ন অবস্থা নিয়ে বিচলিত না হন, তার বিদায় স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন।
শুভ্রকে উদ্দেশ করে রাজা চন্দ্রগুপ্তের কথা বলেন রজত। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য রাজকার্য শেষ করে জঙ্গলে হারিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। জীবনের চিরন্তন সত্য মৃত্যুকে নিয়ে এ যেনো তার (চন্দ্রগুপ্ত) পূর্বপ্রস্তুতি। শুভ্রকে রজত বিখ্যাত চলচ্চিত্র The Ballad of Narayama-এর কথা বলেন। যেখানে বৃদ্ধ মাকে এক ছেলে জঙ্গলে ফেলে আসেন। ওই ছেলের কাছে মৃত্যু হয়তো খুব স্বাভাবিক ছিলো। মাকে তাই জঙ্গলে রেখে আসতে পেরেছিলেন।
রজতও পরিবার-পরিজন ছেড়ে পাহাড়ে চলে যান। ভাইপো আর ভাইঝি’কে মেইল করে বলেন, ‘আমাকে আর খুঁজিস না, আমি বাকিটা জীবন নিজের মতো ঘুরবো আর কাজ করবো’। রজত হয়তো মরণের আগেই মরতে পেরেছিলেন; সংসারের আবেগ-মায়া কাটিয়ে কাজকে সঙ্গী করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মোটের ওপর এই হলো রজতের দার্শনিক অবস্থান।
এবার আসা যাক তার বৈজ্ঞানিক চিন্তায়। মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে দেশ-বিদেশে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ানো রজত বিজ্ঞান ভালোবাসেন। তিনি মানুষের মুখাবয়ব ও মস্তিষ্কের তথ্য পরীক্ষা করে তার অভিপ্রায় ও স্বভাব জানার চেষ্টা করেন। প্রতিটি মানুষের মুখ ও মস্তিষ্কের পৃথক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য তার আচরণে প্রভাব ফেলে। আবার জিনও মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলে। এজন্য বিজ্ঞান জরুরি। কেননা ‘আমাদের অনেক আচরণের পিছনেই হয়তো বংশগতিয় এবং পরিবেশের এক জটিল এবং সমন্বিত ফ্যাক্টর কাজ করে। বংশগতিয় ফ্যাক্টরগুলোর সাথে মনোযোগ, তাৎক্ষনিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের করার জন্য স্নায়বিক সমন্বয়, পরিবেশ, সংস্কৃতি বা এপিজেনিটিক প্রভাবসহ এক জটিল পদ্ধতির জাল কাজ করতে পারে।’২ হয়তো সেকারণেই রজত মানুষের আচরণ পর্যবেক্ষণের জন্য বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। চলচ্চিত্রে রজত একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও মানুষের মনস্তত্ব নিয়ে কাজ করেন। সেই সঙ্গে তার দার্শনিক চিন্তাভাবনাও যুক্ত।
বিজ্ঞান ও দর্শনের দ্বন্দ্ব থাকলেও জীবনের ব্যাখ্যায় তারা কিন্তু একই পথের যাত্রী। প্রাচীনকালে দর্শন ও বিজ্ঞান হাত ধরাধরি করে চলেছে। সভ্যতার আদিতে বিজ্ঞান দার্শনিক বিষয়বস্তু হিসেবেই পঠিত ছিলো। পদার্থবিজ্ঞানের যুক্তির প্রয়োগ, আরোহী, অবরোহী যুক্তির প্রয়োগ--এসব দার্শনিক ভাবপ্রসূত। কিন্তু ক্রমশ গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান শাস্ত্রীয় দর্শন থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। বলা হয়ে থাকে ‘বিজ্ঞান হচ্ছে সাধারণ অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা, আর বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা হলো দর্শন। দর্শন হলো সমন্বিত (Comprehensive) জ্ঞান। বিজ্ঞানের অনুমান-তত্ত্ব-তথ্যের সমালোচনা করে দর্শন’৩। দর্শন ও বিজ্ঞানের সম্পর্ক মূলত গাছের শেকড়ের সঙ্গে পাতার সম্পর্কের মতো--‘ All philosophy is like a tree. The roots are metaphysics, the trunk is physics and the branches are all the other sciences’.৪
পিউপায় রজত তার দার্শনিক চিন্তাকে বিজ্ঞানের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করেন। তিনি বর্ষা ও শুভ্রের এক সঙ্গে থাকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইলেকট্রন নিজস্ব অরবিটে পোষাতে না পারলে জাম্প করতে পারে’। অর্থাৎ কোনো সম্পর্কে কেউ থাকতে না চাইলে তা থেকে বের হয়ে আসা যায়। বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে রজতের মানবজীবনের সম্পর্কের এই উদাহরণ দুর্দান্ত!
মোরাল ডিলেমা ইন পিউপা
পিউপায় চারজন মানুষের সমস্যা ও দ্বন্দ্ব প্রতীয়মান। নির্মাতা পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতার সঙ্গে পারলৌকিক ও পার্থিব জগতের সমস্যা মিলিয়ে দিয়েছেন খুব সহজে। সেই সঙ্গে নির্মাতার ‘মোরাল ডিলেমার’ রিপ্রেজেন্টেশন চলচ্চিত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। শুভ্রের এই ‘মোরাল ডিলেমা’ প্রকট। মোরাল ডিলেমা বা নৈতিক সঙ্কট হচ্ছে সিদ্ধান্তহীনতার একটি নৈতিক সমস্যা। যখন প্রায় সমগুরুত্ব সম্পন্ন দুটি অবস্থানের মধ্যে যথোপযুক্ত একটিকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বেছে নিতে হয়, তখনই এই সমস্যার উদ্ভব ঘটে। এই পরিপ্রেক্ষিতে সঠিক অবস্থান বেছে নেওয়াটা জটিল। কারণ দুটি অবস্থানের তাৎপর্য প্রায় অভিন্ন।
চলচ্চিত্রজুড়ে শুভ্র ঠিক কী করবেন/কী করা উচিত, এই সঙ্কটে ভুগতে থাকেন। পারিবারিক মূল্যবোধ, কর্তব্য নাকি নিজের ভবিষ্যৎ কোনটাকে গুরুত্ব দেবেন তিনি। এই দ্বন্দ্ব তাকে গ্রাস করে রাখে সারাক্ষণ। কোমাচ্ছন্ন বাবার গোঙানির শব্দে শুভ্রকে কান চেপে ধরতে দেখা যায়। তার চোখেমুখে চিন্তার খেলা স্পষ্ট। কিন্তু শুভ্র কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাকে বলতে শোনা যায়, ‘ফেলে চলে যাবো, সম্ভব!’ এ যেনো এক মনের দুই রূপ। এক মন শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হয়ে ডানা মেলার স্বপ্ন দেখে। আরেক মন আটকা পড়ে ডানা ঝাপটায়। একই ব্যক্তির একই মনের দুই রকম আকুতির ডানা ঝাপটানোর শব্দ থাকলেও কোনো গন্তব্য নেই।
শুভ্রের প্রেমিকা বর্ষা আমেরিকায় পড়তে যাবেন; সবকিছু ঠিকঠাক। কিন্তু যার সঙ্গে থাকবেন সেই শুভ্ররই ফেরা নিশ্চিত নয়। এজন্য হয়তো বর্ষাও নৈতিক সঙ্কটে ভোগেন। মলিন মুখ, দ্বিধাগ্রস্ত মুখাবয়ব, ডুকরে কেঁদে ওঠার দৃশ্যই তার নৈতিক সঙ্কটের জানান দেয়। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৫ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে শুভ্রকে উদ্দেশ করে কাঁদতে কাঁদতে বর্ষাকে বলতে শোনা যায়, ‘শুভ্র বিশ্বাস করো, আমি কিছু বুঝতে পারছি না’। যাকে সঙ্গে নিয়ে স্বপ্ন দেখা, সেই শুভ্রর যাওয়া অনিশ্চিত--তাই হয়তো বর্ষা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আবার পি এইচ ডি গবেষণাটাও তার জন্য জরুরি। দুটো কাজের মধ্যে একটাকে তিনি নির্দ্বিধায় গ্রহণও করতে পারেন না। একদিকে প্রেম, অন্যদিকে ক্যারিয়ার! বর্ষার জন্য দুটি কাজই প্রায় সমান গুরুত্বপূর্ণ। এটি হয়তো বর্ষার ‘নৈতিক সঙ্কট’।
আবার মৌয়ের মধ্যেও দোলাচলের অন্ত নেই। সংসার সামলে রোজ বাবাকে দেখতে আসেন। একসময় তার আর বাবাকে দেখতে আসতে ইচ্ছে করে না। আবার দেখতে না এসেও তিনি পারেন না। এদিকে বাবাকে রোজ দেখতে আসার জন্য তার সংসারেও অশান্তি হতে থাকে। মৌয়ের কপালের ভাঁজ আর ভাষাহীন ঠোঁট অনেক কথা বলে। চোখ মুখের ভাষা বলে দেয় তার আসা-না আসার দ্বন্দ্ব।
পুঁজি প্রাধান্যশীলতার আজকের দিনে এই ‘নৈতিক সঙ্কট’ মানুষের নিত্য দিনের সঙ্গী। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই সঙ্কট আরো ভয়াবহ। কেননা তরুণ প্রজন্মকেই পুঁজি তার অন্যতম ভোক্তা মনে করে। তারা আবদ্ধ হয়ে পড়ে এই চাহিদার বৃত্তে। এই চাহিদা তাদের মানুষ নয়, অর্থ উপার্জনে আগ্রহী করে। এজন্য বেশিরভাগ তরুণ প্রকৃত শিক্ষা অর্জন, না ভালো ক্যারিয়ার এই দুটো নিয়ে ‘নৈতিক সঙ্কটে’ পড়ে। আবার শিক্ষাজীবন পরবর্তী চাকরি জীবনে সঙ্কট হয় ক্যারিয়ার ও পরিবার নিয়ে। এটা অনেকটা বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বিখ্যাত চলচ্চিত্র চরাচর-এর সেই সংলাপের মতো; বনের পাখি ধরে বিক্রি করা সেই প্রোটাগনিস্ট তার স্ত্রী সারি’কে নিয়ে বলেন, ‘পাখি থাকলে সারি থাকে না, সারি থাকলে পাখি থাকে না।’ এ রকম অবস্থানে মানুষের ‘নৈতিক সঙ্কট’ দানা বাঁধতে থাকে।
তবে ব্যক্তিমানুষ পরিবার-সমাজের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ব্যক্তিমানুষ নিরঙ্কুশভাবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গেলেই তার পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে দোলাচল শুরু হয়। ফলে কোনো কোনো ব্যক্তিমানুষকে এক ধরনের দোদুল্যমান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কেউ কেউ হয়তো নিজস্ব পরিবেশ, নিজস্ব চর্চা ও মানসিক দৃঢ়তায় এই অবস্থান থেকে বের হয়ে আসতে পারে। কারও কারও পক্ষে সেটা সম্ভব হয় না। কারণ সব ব্যক্তিমানুষের মানসিক দৃঢ়তা, বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও চর্চা তো এক নয়।
এর শেষ হওয়া জরুরি
পিউপায় একটা স্থবির সময়কে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন ইন্দ্রাশীস আচার্য। চলচ্চিত্রটি শ্যুট করা হয়েছে থমথমে পরিবেশের বিশাল এক সাবেকি বাঙালি বাড়িতে। যেখানে প্রতিটি চরিত্রের নিঃশ্বাস যেনো দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে আরো উত্তপ্ত হয়ে গুমোট পরিবেশ তৈরি করে। চলচ্চিত্রকরিয়ের দুর্দান্ত শটে সেই গুমোট ভাব দর্শকের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। নির্মাতার ধূসর রঙের সঠিক ব্যবহার গল্পের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তোলে। অভিনয়শিল্পীদের প্রত্যেকের অভিনয় দক্ষতাই প্রাণ পিউপার। শুধু শুভ্রের ইংরেজি উচ্চারণে খানিক মার্কিনি টানের অভাব ছিলো।
চলচ্চিত্রকরিয়ের সম্পর্ক বিশ্লেষণের হাত পাকা হওয়ায় পিউপায় বেশকিছু সুন্দর মানবিক মুহূর্তের ইমেজ রয়েছে। সেবিকা থাকা সত্ত্বেও মৌয়ের ভালোবেসে বাবাকে খাওয়ানো; সন্তানের প্রতি মৌয়ের ভালোবাসা, রজতের বৃক্ষপ্রেম; বর্ষা ও শুভ্রের সম্পর্ক; বাবার প্রতি শুভ্রের ভালোবাসা। এই চলচ্চিত্রে রজতের (কমলেশ্বরের) অভিনয় দুর্দান্ত; শুভ্র (রাহুল) চলনসই। বর্ষার (পিয়ালী মুন্সি) অভিনয়ও চোখে পড়ার মতো। আর মৌ চরিত্রায়ণে সুদীপ্তা অনন্য। অভিনয়ে নাটকীয়তা থাকলেও বাস্তবতা বর্জিত নয়। পারস্পরিক সম্পর্কের বোঝাপড়া, বাবার প্রতি সন্তানের দায়িত্ববোধ। প্রতিটি শটের বিন্যাস ও শটের সমাপ্তি যেনো হাল আমলের ইঙ্গিত দেয়। বিটোফেনের সিম্ফনির ব্যবহার পিউপায় আলাদা নান্দনিকতা যোগ করে।
দর্শক হিসেবে চলচ্চিত্রের শেষটা প্রথম দেখায় অমানবিক লেগেছে! বার বার ভেবেছি এটি কী করে সম্ভব! ইনজেকশনটা পুশ করার পর রজতের চেহারার ছবি কেমন দুঃখে ভরে যায়। যেনো মনের দুঃখ পোড়াতে তিনি নিজের একটি আলোকচিত্র পুড়িয়ে ফেলেন। রজতের গায়ের কালো চাদরের মতো দুঃখ ভর করে মনে। এই দুঃখের বিপরীতে মনের মধ্যে সচেতনে চলতে থাকে আবেগ আর বাস্তবের পক্ষে-বিপক্ষে লড়াই। কাকা-ভাইপোর যুক্তি-প্রতিযুক্তির এই চলচ্চিত্রে দর্শকের জন্য রয়েছে অনেক বার্তা। যা আমাকে/আমাদেরকে জীবন, সম্পর্ক, দায়িত্ব, আবেগ আর বাস্তবতা নিয়ে আরেকবার ভাবায়। অমানবিক লাগা সেই দৃশ্যটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়, সিদ্ধান্ত নিতে নয়।
চলচ্চিত্র দেখে জীবন নিয়ে যারা নতুন করে ভাবতে চান পিউপা তাদের জন্য।
লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষে করোনা অতিমারির জন্য আটকে আছেন।
soniaislam.kgc@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100010523371229
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. টেলিপোর্টেশন হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে মাধ্যমবিহীন শক্তির বিনিময় নিয়ে কাজ করা হয়।
2. https://rb.gy/3u0ubb; retrieved on: 08.12.2020
3. https://rb.gy/tgavcv; retrieved on: 08.12.2020
4. https://rb.gy/tgavcv; retrieved on: 08.12.2020y
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন