প্রিয়াংকা দেবনাথ
প্রকাশিত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘কৌশিকের নগরকীর্তন’
ক্ষমতার চাপে পুঁটি-মধুরা কি হেরে যাবে!
প্রিয়াংকা দেবনাথ

কখনো কী এমনটা সম্ভব, মানুষ হিসেবে আমাদের মন যা চায়, আমরা যা করতে চাই বা আমাদের শরীর যা চায় সেটা করা? আমাদের এই সমাজ-বাস্তবতা কী সেই সুযোগটা কখনো দেয়! প্রতিষ্ঠান হিসেবে সমাজ কি কেবল তার গণ্ডির মধ্যেই চক্রাকারে ঘুরতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না! আর যেহেতু সমাজে একমাত্র ‘চিন্তাশীল ও সামাজিক জীব’ হিসেবে মানুষের খ্যাতি রয়েছে, তাই এখানে এই চক্রের মূল নিয়ামক হলো মানুষ। সুতরাং কালের প্রয়োজনে এই গণ্ডিবদ্ধ সমাজের যদি বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তনের দরকার পড়ে সেটাও করে/করবে এই মানুষই। কেননা মানুষের মতো এমন বিপুল প্রাণশক্তি, বিপুল আত্মার শক্তি আর কোনো প্রাণীর আছে কি না এটা নিয়ে সন্দেহ আছে। আবার এই মানুষই তো ‘স্বাভাবিক’কে ‘অস্বাভাবিক’ আর অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক করে তুলছে সেই কতো কাল ধরে। এভাবেই সমাজকে রাস্তা দেখিয়েছে, ঠিক-ভুলের একটা কাঠামোবদ্ধ নিয়ম দাঁড় করিয়েছে এই মানুষই।
সেই সঙ্গে নারী-পুরুষের এক লিঙ্গীয় বাইনারি দাঁড় করানো হয়েছে সেখানে--পুরুষ মানেই ‘মহাবীর’ আর নারী ঠিক তার উল্টো মানে অবলা, স্বভাবে লাজুক। অর্থাৎ নারী শরীর মানেই একটা আস্ত দুর্বলতা আর পুরুষ শরীর মানে স্বভাবতই মহাশক্তির আধার। আর এ বিষয়গুলো চর্চার মধ্যে রাখতে রাখতে এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে এই সমাজের নারীরাও ভাবতে শুরু করে তারা আসলেই দুর্বল এবং বিপদে পড়লে অবশ্যই কোনো পুরুষই তাকে বাঁচাতে বা রক্ষা করতে আসবে। ঠিক এভাবেই চলতে থাকে নানা বিষয়ে কাঠামোকরণ। আর এভাবেই সমাজের মধ্যে একটা শরীরী রাজনীতির কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে।
ঠিক এমন পরিস্থিতিতে সমাজ তার নিয়মের বাইরের সব চাওয়া, ইচ্ছাকে খুব সহজে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। শুধু প্রত্যাখ্যানই করে না তাদেরকে এই সমাজ, পরিবেশ থেকে আলাদা করেও দেয়। কখনো তাদের পুরো জীবনকে আলাদা করে নেওয়ার ইঙ্গিতও দেয় এই সমাজই। চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেয় এটা কোনো সংখ্যালঘুর সমাজ নয়, এটা একটা বৃহৎ অংশের সমাজ। তাই বৃহৎ অংশের কথা অনুযায়ীই চলবে। অবশ্য তাদেরকে কেবল আলাদা আর বিচ্ছিন্ন করেই থেমে থাকে না সমাজ, বরং কখনো ‘মজার বস্তু’ আবার কখনো অস্বাভাবিক বলেও আখ্যা দেয়। যেমন, রূপান্তকামী ও হিজড়াদের ঠিক যেনো মানুষ হিসেবে মনে করা হয় না! এ প্রবন্ধটি লেখা এমনই একটি চলচ্চিত্রকে নিয়ে, যার আখ্যানে মূলত এক মানব শিশুর ছোটো থেকে বেড়ে ওঠা এবং এই সমাজ-বাস্তবতায় তার টিকে থাকার যে লড়াই তা উঠে এসেছে। তারপর একটা সময় জগতের সব নিয়মকানুন, রীতিনীতি থেকে সে মুক্তি নেয়।
বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রের গল্পে আমরা সাধারণত কী দেখি--নায়ক-নায়িকা, প্রেম-ভালোবাসা, সেই প্রেমে বাধা, তারপর সেই প্রেমকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টা; সবশেষে সুখে বসবাস। নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলী তার নগরকীর্তন-এ প্রেমকেই দেখিয়েছেন। তবে এই প্রেমের গল্প, এই মানুষদের গল্প অনেক নির্মাতাই বলে না। এই প্রেম শরীরের চেয়ে মনকে বেশি গণ্য করে। মানুষে মানুষে ভালোবাসাই যে চিরন্তন, চিরসত্য, সেই কথাই বলে। সঙ্গে মানুষ হিসেবে পুঁটিদের অবস্থান এই সমাজের কোথায়, সে প্রশ্নও তোলে। গল্প হয়তো কতকগুলো অন্য মানুষের, অন্য জীবনের, কিন্তু গল্পের সমাজটা আমাদের খুব চেনা। যে সমাজ এমন কিছু ব্যক্তির হাতে তৈরি, যাদের কাছে অর্থ, ক্ষমতা আছে। সেই সমাজ মোটাদাগে সবসময় দুটি লিঙ্গের (নারী-পুরুষ) কথাই বলে। ফাহমিদুল হক যেমনটা বলেন, ‘আমাদের দেশে লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে সমীক্ষার দৌড় কেবল পুরুষের বিপরীতে নারীর লৈঙ্গিক পরিচয় বা অধিকার কী দাঁড়াচ্ছে তার হিসাব নিকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে’।১ এই হিসাবের খাতাতে নারীর দিকটা আগাগোড়া হালকাই রাখা হয়। আর অন্য মানুষ মানে রূপান্তরকামীদের জন্য তো সেখানে কোনো হিসাবই নেই। এই সমাজে নারীকে প্রান্তিক করা হয়েছে, আর তারচে বেশি প্রান্তিক করা হয়েছে রূপান্তরকামীদের। অর্থাৎ লৈঙ্গিক রাজনীতিতে পুরুষমাত্র কর্তা।
ফলে যে সমাজে রূপান্তরকামীদের আদতে কোনো জায়গাই নেই; সেখানে তাদের ইচ্ছে পূরণ তো অনেক দূরের ব্যাপার। আর তাই সমাজের ‘ভদ্রস্থ সচ্ছল পরিবারে জন্ম নেওয়ার পরও তাদের জীবন কাটতে পারে বস্তি-ঝুপড়িতে, মাসির অধীনে, হিজড়া-বন্ধুদের সঙ্গে’।২ যদিও আমাদের দেশে এখন রূপান্তরকামী ও হিজড়াদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে, চাকরির ফর্মে জেন্ডারের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পাশাপাশি অন্যান্যও লেখা হচ্ছে। কিন্তু আদতে কি তাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন এসেছে? সমাজের মানুষগুলো কি এখনো তাদের দেখে হাসাহাসি, চোখ টানাটানি বন্ধ করেছে; নাকি তারা তাদের পরিবার থেকে অন্যসব শিশুর মতো সুযোগ-সুবিধা বা সম্পত্তির সমান অধিকার পাচ্ছে। কতোজন হিজড়া তার পরিবার ফিরে পেয়েছে! প্রথমে পরিবার থেকে, তারপর সমাজ থেকে, অবহেলা পেতে পেতে একটা সময় তারা বুঝেই যায়, এই সমাজে তাদের আসলে কোনো ঠাঁই নেই। এই সমাজই তাদের জন্য তৈরি করে দিয়েছে অন্য আরেকটি সমাজ। যেখানে বেঁচে থাকার জন্য শুরু থেকেই লড়াই শুরু হয় তাদের। আর এসব কিছুর পিছনে একটা শক্তিশালী কাঠামো তো আছেই।
দুই.
খুব ছোটো থেকেই শিশুদেরকে তার সমাজ সম্পর্কে একটু একটু করে ধারণা দেওয়া হয়। সেই সমাজের নারী-পুরুষ কেমন হবে, সম্পর্কগুলো কেমন হবে। শুধু ধারণাই নয়, তাকে শেখানো হয় এই সার্বিক বিষয়ের ওপর তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে বা হওয়া উচিত। শিশুটি শারীরিকভাবে মেয়ে হলে তাকে কেমন হতে হবে আর ছেলে হলে কেমন--এসব কিছুই থাকে নিয়ন্ত্রিত, ছকে বাঁধা। সেই মেয়ে বা ছেলে শরীরটার বাইরে গিয়েও যে মনটা ভিন্ন কিছু চাইতে পারে--এমনটা কখনো তাকে ভাবতে দেওয়াই হয় না। তেমনটা হলেই শুরু হয় শিশুকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ প্রক্রিয়া। যেমনটা হয়েছে নগরকীর্তন-এ পরীর ক্ষেত্রে। আসলে খালি চোখে যে সত্য দেখা যায়, তার বাইরেও কখনো কখনো বড়ো সত্য থাকে। আর এই ‘স্বাভাবিকীকরণ’ প্রক্রিয়ায় সেই স্বাভাবিক সত্যকেও প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। কেননা সত্যকে প্রকাশ করলে কখনো কখনো সিস্টেমকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়। কারণ যতো বেশি মানুষ তার নিজেকে জানবে, ততোই সে সমাজের সংস্কার, নিয়ন্ত্রিত ও ছক বাঁধা অবস্থাকে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করবে। তার নিজেরটা সে বুঝে নিতে শিখে যাবে। প্রশ্ন করতে শিখে যাবে যাবতীয় ‘স্বাভাবিকীকরণ’ প্রক্রিয়াকে। ফলে সমাজের প্রতিটি স্তরেই নিয়ন্ত্রণ, গৎবাঁধা কাঠামো, মানুষের নিজের সত্তাকে প্রকাশ করতে না দেওয়া, সবকিছুতে গোপনীয়তা এই সিস্টেমেরই বৈশিষ্ট্য। শুধু তাই নয়,
জনমত, সামাজিক শাসন, ধর্ম্মের অনুশাসন, রাষ্ট্রীয় আইন প্রভৃতি বিধি ব্যবস্থার দ্বারা সর্ব্ব দেশেই যৌন বিষয়ক আলোচনার, চতুর্দ্দিকে দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে। যৌন বিষয়ক সামান্যতম উল্লেখও শিষ্ট, শীলতা এবং সুরুচির বহির্ভূত বলিয়া মনে করা হয়। কাম জয়ের সহিত ধর্ম্ম সাধনের নিকট সম্বন্ধ আমাদের দেশে অনেক দিন ধরিয়া স্বীকৃত হইয়া আসিয়াছে বলিয়াও কাম বিষয়ক আলোচনা এখানে আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হইয়াছে, এইরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।৩
চলচ্চিত্রে মধু ঠিক তেমনই একজন; যার জন্ম, বেড়ে ওঠা এক কীর্তনীয়া পরিবারে। যে কিনা পুঁটির প্রেমে পড়ার পরে তাকেই প্রশ্ন করে--‘সত্যি হয়! এরম দুটো লোকের মধ্যে? ছেলে ছেলে প্রেম হয়?’ এ কথার উত্তরে পুঁটি বলে, ‘হচ্ছে তো। তুমিও কাজ ফেলে আসছো আমিও রিস্ক নিয়ে আসছি; (দেখা করতে) কেনো? এই জন্যে। একটা কথা সত্যি করে বলো তো মধুদা, যখন আমরা সঙ্গ করেছি তখন তোমার একবারও মনে হয়েছে আমি ছেলে?’ মধু মাথা নাড়িয়ে না বোধক উত্তর দেন। অর্থাৎ সঙ্গমের সময় তার মাথায় আসেনি যে সে কোনো ছেলের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে। অথচ এরপরই পুঁটির সঙ্গে দেখা করতে এসে মধুর মনে প্রশ্ন জাগছে। তাহলে মধুর সঙ্গে পুঁটির প্রেম আর মধুর প্রশ্নের মধ্যে দ্বন্দ্বটা আসলে কোথায়? তাহলে কি আমাদের সমাজব্যবস্থা, এই সিস্টেম আমাদের এমনটা শিখিয়েছে যে, শারীরিক গঠনে এক হলে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক বা শারীরিক সম্পর্ক সম্ভব নয়। লিঙ্গীয় বৈপরীত্য প্রেমের সম্পর্ককেই কী শুধু জায়েজ করা হয়েছে?
যুগের পর যুগ ধরে যেভাবে লিঙ্গীয় পরিচয়ের এক রাজনীতি দাঁড় করানো হয়েছে। যে লিঙ্গীয় রাজনীতির ঘেরাটোপে হয়তো অনেক মানুষকে তার নিজের পরিচয়, সম্পর্ক, ভালোবাসা, অধিকার, ইচ্ছা এগুলোকে হারাতে হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষের চিত্রাঙ্গদার কথা মনে পড়ে যায়। যেখানে তিনি “লিঙ্গীয় পরিচয় চিহ্নকারী ‘নারী-পুরুষ’ বৈপরীত্যযুগলের মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এবং মূল্যচেতনাকে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত করে ছেড়েছেন।”৪ মানুষের যে মূল্যচেতনা এতোদিন ধরে অনেক স্বাভাবিককে অস্বাভাবিক বলে চালিয়ে দিয়েছে। বলা হয়ে থাকে এই চলচ্চিত্রের ‘মাধ্যমে নিজের আইডেন্টিটির স্বীকৃতিও দাবি করে গেছেন তিনি’।৫ নগরকীর্তন-এ নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলীও পুঁটিকে দিয়ে সেই দাবিটাই করিয়েছেন। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার দাবি, এই সমাজে নিজেকে আলাদা কোনো মানুষ হিসেবে নয় বরং শুধু মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবি। আর এই দাবির ফলই হয়তো চিত্রাঙ্গদার রুদ্র আর নগরকীর্তন-এর পুঁটির শেষ পরিণতি।
তিন.
চলচ্চিত্রে পুঁটির প্রেমে পড়ে মধু অর্থাৎ এক নারীর, নারী শরীরের প্রেমে পড়ে। কিন্তু যখন সে জানতে পারে পুঁটি শুধু মনেই নারী শরীরটা পুরুষ, তখন তাকে মনের সঙ্গে নানা যুদ্ধ করতে হয়। তার মনে সবসময় প্রশ্ন আসে ছেলে ছেলেও প্রেম হয়? দুজন পুরুষেরও যে প্রেম হয়, এটা মানতে তার খানিকটা অসুবিধা হয়। পুঁটিকে ছেলে হিসেবে দেখতে, লাগানো চুল খুলে ফেললে তাকে দেখতে ভালো লাগে না তার। কোথাও গিয়ে মধু যেনো দোটানার মধ্যে পড়ে যান। এই দোটানার একদিকে থাকে তার মন আর একদিকে এই সমাজ, তার কীর্তনীয়া পরিবার। তাই যতো টাকারই প্রয়োজন হোক না কেনো, অস্ত্রোপচার করে পুঁটির শরীরকে মেয়ের শরীরের রূপ দিতে চান তিনি। পুঁটি শারীরিকভাবে মেয়ে হলেই মধু তাকে বিয়ে করবেন। আর পুঁটিও সেই আশাতেই মধুর সঙ্গে পালিয়ে আসে। যে আশাটা সে ছোটো থেকেই লালন করে এসেছে।
নগরকীর্তন-এর ২১ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে দেখা যায়, পুঁটি বলছে ‘বড্ড গরম চুলটা একটু খুলি বাবা’, তখনই মধু বলেন, ‘না না না যদ্দিন না তোমার নিজেরটা বড়ো হচ্ছে ওটা থাক।’ মধুর এই কথায় পুঁটি হয়তো কষ্ট পায়, কিন্তু সেই কষ্টটাকে বুঝতে দেয় না। কষ্টটা শুধু দীর্ঘশ্বাসের মধ্যেই থেকে যায়। আসলে পুঁটি যেমন সেভাবে থাকা হয়তো কখনোই হয়ে ওঠেনি তার। এটা তার সঙ্গে ছোটো থেকেই হয়ে এসেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারে পুরুষ শরীর আর নারী সত্তা নিয়ে জন্ম নেওয়া এক শিশু পরিমল। পরে সেই পরিবার থেকে পালিয়ে মধুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েও তার নিজের মতো থাকাটা আর হয় না। কেননা ওই প্রেমিকও একজন পুরুষ, এই সিস্টেমেরই একটা অংশ সে। আর তাই প্রেমিকের সামনেও তার লাগানো চুল বয়ে বেড়াতে হয়। তাই তো চলচ্চিত্রে মধুকে বলতে শোনা যায়, ‘একদম তৈরি হয়ে আসবে, আমার জোড়াতাবড়ি ভালো লাগে না। একদম পুঁটি হয়ে আসবে (অস্ত্রোপচারের পর)।’ অর্থাৎ শুধু মনেই পুঁটি হলে চলবে না; একেবারে শরীরীভাবেই পুঁটি হতে হবে। নারীর শরীরের মতো একটা শরীর তাকে বানাতে হবে।
কিন্তু এসবের পরও পুঁটির প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা জন্মাতে থাকে মধুর মনে। আস্তে আস্তে তখন সেই প্রেম আর শরীরকেন্দ্রিক থাকে না; প্রেম হয় শুধু দুটো মনের, দুটো মানুষের। পুঁটিকে তিনি তার বাড়িতে (নবদ্বীপ) নিয়ে যান। আর তার পরেই মূল ঘটনার অবতারণা।
চার.
শিশু পরিমল (পুঁটি) যে কিনা জন্ম নেয় ছেলে সন্তান হিসেবে, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিকভাবে আসলে সে মেয়ে। ছোটো থেকেই সে তার মায়ের জিনিস দিয়ে সাজগোজ করতে চায়, তার দিদির পোশাক পরতে চায়। একবার এক অনুষ্ঠানে যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় নারী সেজে অংশ নিয়ে প্রথম হয় সে। সেসময় মা তার বাবাকে গিয়ে খবরটা দিলে বাবা খুশি হওয়া দূরের কথা বিরক্ত হয়ে সেই সাজ খুলে ফেলতে বলেন। পরিমলের অপরাধ, সে মা-সারদা সেজেছিলো। এভাবে মনের বিপরীতে বাধ্য হয়েই হয়তো বেড়ে উঠছিলো সে। কিন্তু এই বেড়ে ওঠার মধ্যে তার মনের চাহিদাগুলোর সঙ্গে শরীরী চাহিদারও পরিবর্তন আসতে থাকলো। পুরুষ হয়ে জন্ম নিলেও মনে মনে সে নারী সত্তাকে লালন করে, আর তারই নানা দিক ফুটে উঠতে থাকে সময়ের সঙ্গে।
ছোটো থেকেই পরীকে তার নিজের সঙ্গে, নিজের শরীরের সঙ্গে একরকম লড়াই করতে হয়েছে। যে শরীরটাকে সে কখনো চায়নি, সেটাকেই মেনে নিতে হয়েছে তাকে। পরিবারে তার বাবা যেমন তাকে মেনে নেয়নি, আশপাশের মানুষগুলোও কখনো মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু মানুষ হিসেবে আগে তো তার পরিবারের সমর্থনটা দরকার ছিলো; সে আসলে যেমন চায় সেভাবে থাকতে দেওয়ার কথা ছিলো। অথচ এই সুযোগটা সে পায়নি। স্কুলে পুরস্কার জেতার পর তার মা চেয়েছিলো তার বাবা যেনো ছেলেকে একটু আদর করে, অন্তত একটু ভালোভাবে কথা বলে। কিন্তু তার মায়ের সে চাওয়াকে বাবা একেবারে প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি তার মাকেই বকাঝকা করেন পরিমলকে মেয়েদের পোশাক পরানোর জন্য। কিন্তু এতোসব করেও তাকে ছেলে বানাতে পারেনি তারা। কেননা সে শুধু পুরুষ দেহ নিয়েই জন্মেছে, ভিতরটা তো আসলে তা না। আর শরীর তো বদল করা যায় কিন্তু নিজের মনকে, নিজের সত্তাকে হাজার চেষ্টা করেও কখনো বদলানো যায় না। কেউ যেটা পারে না, পরিমলও সেটা পারেনি।
বাড়ি থেকে পালিয়ে আসার পর হিজড়াদের কাছে আশ্রয় হয় পুঁটির। ঘটনাক্রমে মধুর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর একটা সময় তার মনে হয় সে আর এই পুরুষ শরীরটাকে বয়ে বেড়াবে না। তার মন যেটা চায়, সে আসলে যা, সেটাতেই সে রূপান্তর হবে। ফলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নারী শরীর গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় সে। ঈশ্বর যে শরীরটার ক্ষেত্রে অঙ্ক কষতে একটু ‘ভুল’ করেছিলো সেটাকে পুঁটি সংশোধন করতে চায়। যার জন্য এক অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে যায় সে; যিনি শারীরিকভাবে পুরুষ থেকে নারী হয়েছেন। নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলী এখানে চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধনের জন্য একটি নিয়ামক যুক্ত করেছেন। কলেজ অধ্যক্ষের চরিত্রে তিনি এখানে স্বয়ং ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী নারীকে হাজির করেন। যিনি কিনা মানব বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় হয়েছেন। শুধু নামে নয় শরীরীভাবেও। তিনি বাস্তবেও একটা কলেজের অধ্যক্ষ। মাত্র কয়েকটি দৃশ্যেই নির্মাতা দেখিয়েছেন বাস্তব জীবনে নিজেকে, নিজের সত্তাকে প্রকাশ করতে কতো ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় মানুষকে। আর সঙ্গে সেই সত্তাকে প্রকাশ না করতে পারার যে কষ্ট, তার যন্ত্রণাটাও নেহাতই কম নয়! তবে এসব কষ্টের চেয়েও বড়ো কষ্ট মানুষের হাততালি, বাঁকা চোখের চাহনি, সমাজের অবহেলা, অবজ্ঞা! আর তাই শরীরের ওপর শত যন্ত্রণা সহ্য করেও অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে হয় একজন মানুষকে।
পাঁচ.
পরিমলের প্রতিবেশী সুভাষ, যার কাছে পড়তো পরিমল। একপর্যায়ে সুভাষের সঙ্গে প্রেম হয় তার। সুভাষ কিন্তু ছেলে জেনেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলো পরিমলের সঙ্গে। সুভাষের সঙ্গে আমেরিকায় পালাতে চেয়েছিলো সে। কেননা আমেরিকায় ছেলেতে ছেলেতে আইনত বিয়ে হয়। কিন্তু না, সুভাষদা তাকে নিয়ে পালাননি; সুভাষ বিয়ে করেছিলেন পরিমলেরই দিদিকে। এর ফলে পালাতে হয়েছিলো পরিমলকে। একা। যদিও দিদিসহ অনেকেই জানতো সুভাষের সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা। একদিকে ছাঁদনাতলায় তার দিদি আর সুভাষের বিয়ে, অন্যদিকে একা ঘরে পরিমল ভাবতে থাকে সে যদি তার দিদির মতো নারী শরীরের হতো তাহলে হয়তো সুভাষ তাকে ঠকাতো না, তার ভালোবাসার মানুষটাকে সে তার জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতো। আর ঠিক সেদিনই বাড়ি ছেড়ে পালায় পরিমল। এরপর সে আশ্রয় নেয় নিমতলা ঘাটের হিজড়া গুরু আরতীর কাছে; হয়ে যায় পরী থেকে পুঁটি। সেখানে গিয়েই পরিচয় মধুর সঙ্গে। আর এ পরিচয় থেকেই প্রেম।
মধুর সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক হওয়ার পর সেই আশ্রয় থেকে পালিয়ে সে যায় মধুর বাড়িতে। সেখানে গিয়ে কীর্তনের অনুষ্ঠানে পুঁটির পরচুলা খুলে পড়ায় তা দেখে ফেলে মধুর বৌদি। এই ঘটনার পর পুঁটি পালায় সেখান থেকে; এসে ওঠে নবদ্বীপের একটি বাজারে। এরই মধ্যে প্রচণ্ড খিদে লাগায় একটি দোকান থেকে কিছু টাকা তোলে সে। কেননা এতো সব ঘটনার পর সে এতোটুকু বুঝে গেছে, এই জীবনে হাততালি দিয়ে টাকা তোলা ছাড়া সে অর্থে খিদে নিবারণের আর কোনো উপায় নেই তার। এরপর সেখানে উপস্থিত হয় স্থানীয় কিছু হিজড়া। তারা জানতে পারে তাদের শহরেই আরেকজন হিজড়া এসেছে যে কিনা বিভিন্ন দোকান থেকে টাকা উঠিয়েছে। এ কথা শোনার পর তাকে খুঁজতে থাকে তারা এবং পেয়েও যায়। তাকে দেখে একরকম হামলে পড়ে তারা। পুঁটি/পরী তাদের নানাভাবে বোঝাতে চেষ্টা করলেও তার ওপর নির্যাতন চলতে থাকে। শুধু মারধর করেই থামেনি তারা। তাকে বিবস্ত্র করেছে! আসলে এই হিজড়াদের জীবনের গল্পও তো পরীর জীবনের গল্পের থেকে খুব ভিন্ন কিছু নয়। তারাও তো অবজ্ঞা, অবহেলা পেতে পেতেই জীবনের এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। পরীর ওপর তাদের এই হিংস্রতা শুধু পরীর সঙ্গে নয়; এ হিংস্রতা তাদের সঙ্গে ঘটে চলা শত অবহেলা, অবজ্ঞা, লাঞ্ছনার ফল মাত্র। তাদের এই হিংস্রতা, নির্মমতা হয়তো এই সমাজে, রাষ্ট্রে, সিস্টেমে তাদের সঙ্গে ঘটে চলা প্রতিটি ঘটনার জবাব।
অন্যদিকে পরীর সত্যটা মধুর বাড়ির লোক জেনে ফেলার পর সেও চলে আসে বাড়ি ছেড়ে। শহরে এসে খুঁজতে থাকে পরীকে। একসময় সে জানতে পারে পরীকে মারধর করে বিবস্ত্র অবস্থায় থানায় দেওয়া হয়েছে। এরপর পরীর খোঁজে মধু থানায় যায়; পরীর খোঁজও পায় সেখানে। তবে তার পরী সেখান থেকেও পালিয়েছে। এবার আর তাকে তার শরীর নিয়ে পালাতে হয়নি। যে শরীরটাকে নিয়ে সেই ছোটো থেকে এতো এতো ঝামেলা; এবার সে শরীরটাকে রেখেই পালিয়েছে পরী। যে শরীরের জন্য তাকে তার নিজের বাড়ি ছাড়তে হয়েছে; জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটাকে হারাতে হয়েছে; শেষমেষ যখন মধুর বাড়ির লোকও জেনে যায় যে সে আসলে মেয়ে নয়; তখন আর মধুকে সঙ্গী না করে নিজেকেই নিজের কাছে হারিয়ে দিয়েছে সে। হয়তো এভাবেই সে তার জীবনের অঙ্কটাকে মিলিয়েছে। পরীরা এভাবেই হয়তো তাদের জীবনের অঙ্ক মেলায়।
চলচ্চিত্রের ৫৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে পরীকে বলতে শোনা যায়, ‘আসলে আমি একজন মেয়ে মধুদা। প্যান্ট শার্ট পরিয়ে, পরিমল নাম দিয়েও ওরা আমাকে ছেলে বানাতে পারেনি জানো। আমি জন্ম থেকেই এ রকম, একজন মেয়ে।’ ভালোবাসার মানুষটাকে এভাবেই বোঝাতে হয় পরীদের, প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ দিতে হয় সে একজন নারী। তাকে একটু সমর্থনের জন্যও কাতর গলায় বলতে হয় ‘আমাকে একটু হেল্প করো মধুদা, সমস্ত অঙ্ক ঠিক কষে দেখিয়ে দেবো তোমায়। এক ইঞ্চি পরিমল থাকবে না এই শরীরে’। ছোটো থেকেই সে কখনো পরিমল হয়ে থাকতে চায়নি। তাকে সবসময় বাধ্য করা হয়েছে পরিমল হয়ে থাকতে। তার সেই চির চাওয়াটাকে পাওয়ার জন্যই তার যতো লড়াই--পরিবার ছাড়া, নিমতলা ঘাটের আশ্রয় ছাড়া।
সুভাষ যখন তার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার পরও দিদিকে বিয়ে করে নেয়, তখন সুভাষের কাছে প্রতারিত হয় পরী। তখন হয়তো তার মনে হয়েছিলো, যদি দিদির মতো তারও একটা নারী শরীর থাকতো তাহলে হয়তো সুভাষ তাকে এভাবে ঠকাতো না। আর তাই তো মধুর বৌদির শাড়ি পাল্টানো দেখে তার চোখ বার বার আটকে যায় সেদিকে। এই নারী শরীরটার জন্যেই তো আজ এই পরিচয় সঙ্কটের মধ্যে পড়া। এই শরীরের প্রত্যাশায় সে আজ পরিবার ছাড়া। এই শরীরটা যদি তার থাকতো তাকে হয়তো বার বার আশ্রয়হীন হতে হতো না। আর তাই চির আকাঙ্ক্ষিত বৌদির সেই নারী শরীরটাকেই হয়তো অপলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে পরী।
আবার পরীর এমনও মনে হতে পারে, তার মতো মানুষের আসলেও এই সমাজে কোনো জায়গা নেই। রূপান্তরকামীদের সঙ্গেও তো এই সমাজ ঠিক একই আচরণ করে। এসব ভেবেই হয়তো সে হিজড়াদের সঙ্গে যোগ দেয়। আদতে হিজড়া তো একটা জীবিকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি। মানুষের যখন অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়, সেই সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্যই মূলত এ ধরনের সংস্কৃতির নির্মাণ। সুতরাং ব্যক্তিমানুষ হিসেবে পরীকে যখনই সমাজ আলাদা ভাবতে, আলাদা দেখতে, আলাদা করতে শুরু করে, তার মাথায় তখনই আলাদা হয়ে যাওয়ার আলাদা সংস্কৃতিতে ভিড়ে যাওয়ার মনোভাব তৈরি হয়; এবং পরী সেটা করেও। কিন্তু একটা সময় পর সে বুঝতে পারে আসলেই সে কী চায়।
পরী আসলে চায়নি নিমতলা ঘাটের হিজড়াদের সঙ্গে থাকতে। চায়নি হাততালি দিয়ে রাস্তায় লোকের কাছ থেকে টাকা তুলতে। সে শুধু চেয়েছে তার পুরুষ শরীরটাকে নারী শরীরে রূপান্তর করতে। সে চেয়েছে আর পাঁচজন সাধারণ মেয়ের মতো ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধতে। শরীর রূপান্তরের পর মধুকে বিয়ের স্বপ্ন দেখে সে। আর তাই তো হিজড়াদের আস্তানা ছেড়ে পালিয়ে আসে মধুর সঙ্গে। কিন্তু তার সেই স্বপ্নটা স্বপ্নই থেকে যায়। আসলে পরীদের মতো মানুষগুলোর স্বপ্ন এই সমাজ কখনো পূরণ হতে দেয় না। সুভাষের মতো অনেকে কেবল তাদের স্বপ্ন দেখায়!
ছয়.
নবদ্বীপের স্থানীয় হিজড়াদের আক্রমণের পর সেখান থেকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয় পরীকে। পরে তার খোঁজ করতে করতে একপর্যায়ে মধুও উপস্থিত হন সেখানে। পুলিশের সঙ্গে মধুর কথোপকথন ছিলো এ রকম--
পুলিশ : কী হয় (সম্পর্কে)?
মধু : গার্লফ্রেন্ড।
পুলিশ : গার্ল কোথায় দেখলে ভাই! এতো ছক্কা-পাঞ্জার কী দরকার ছিলো দুনিয়ায় এতো সুন্দর সুন্দর মেয়ে থাকতে? ও বুঝেছি ছদ্দবেশে ফেঁসেছো না? শোনো এদের একটা গ্যাঙ হয়। চুরি করে, ছিনতাই করে। হিজড়ে সেজে এমনভাবে থাকে না, চিনতে পারবে না! ড্রাগ কেনাবেচা করে।
অর্থাৎ কোনো না কোনোভাবে আমাদের এই সমাজে হিজড়া নিয়ে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে। হিজড়া মানেই তারা কোনো না কোনো গ্যাঙয়ের অংশ, হিজড়া মানেই চুরি, ছিনতাই করে, হিজড়া মানেই তারা মধুদের মতো ছেলেদের ফাঁদে ফেলে। আর হিজড়া বাদে সমাজে বাকি যারা আছে সবাই ভীষণভাবে ‘নিষ্পাপ’ আর ‘সাধু’! কিন্তু হিজড়া মানেই যে অন্য কোনোকিছু এ ধারণাইবা আমাদের মধ্যে কবে থেকে আসা শুরু করলো! এই ভারতীয় উপমহাদেশে তো একটা সময় হিজড়াদের শুভ মনে করা হতো। সে সময়টাতে বাড়িতে কোনো সন্তানের জন্ম হলেই তাদের কাছ থেকে আশির্বাদ নেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিলো। আমাদের দেশে এখনো অনেক এলাকাতে এ রীতির প্রচলন আছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব রীতিনীতিরও যেমন পরিবর্তন এসেছে, একইভাবে হিজড়া নিয়ে ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এসেছে। অথচ এসবের বিপরীতে গিয়ে এ সমাজ থেকে তাদেরকে যেসব সুযোগ দেওয়ার বা তাদের যেসব সুযোগ পাওয়ার কথা, সেগুলো কখনোই তারা পায়নি। কিন্তু যেগুলো তাদের পাওয়ার কথা ছিলো না, সেগুলো তারা ঠিকই পেয়েছে।
চলচ্চিত্রে এক ঘণ্টা ৪৬ মিনিটে থানায় কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাকে বলতে শোনা যায়--‘সরকার ছেলেদের জন্য জেল বানিয়েছে, মেয়েদের জন্য জেল বানিয়েছে, কিন্তু হিজড়াদের জন্য জেল বানায়নি’। চলচ্চিত্রে পুলিশ কর্মকর্তা তো শুধু জেলের কথা বলেছেন। অথচ একটু খোলা চোখে দেখলেই আরো অনেক কিছুই চোখে পড়বে যেমন, হিজড়াদের চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। এগুলোর কোনোটাই যে তাদের জন্য খুব সহজ কোনো বিষয় নয়, সেটা হয়তো অনেকেরই জানা। এমন কি অনেক সময় দেখা যায় কোনো হিজড়া মারা গেলে তার দাফন নিয়েও অনীহা তৈরি হয়।
থানায় নেওয়ার পর পুলিশি হেফাজতেই গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে পুঁটি। এবার সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক আর শরীরী খেলা থেকে ছুটি নেয় সে। যে সমাজ কখনো মানুষ হিসেবে মেনে নেয়নি তাকে; যে সমাজ তাকে মেরে জোর করে তার মুখ থেকে ‘আমি ব্যাটা ছেলে’ কথাটি স্বীকার করিয়ে নেয়; যে সমাজ লিঙ্গীয় রাজনীতির বেড়াজালে আটকে রাখতে চায় মানুষকে; সেই সমাজ থেকে ছুটি নেয় সে। কেননা এতোদিনের জীবদ্দশায় সে বুঝে গেছে এই সমাজে আসলে তার কোনো প্রয়োজন নেই! পরিবার থেকে শুরু করে এই রাষ্ট্র, এই সিস্টেম থেকে তার আর কিছুই পাওয়ার নেই! খুব সহজভাবে বলতে গেলে, তাকে হয়তো জীবন থেকে ছুটি নিতে বাধ্য করেছে এই সিস্টেম।
পুঁটির মৃত্যুর পর মধুও নারীর বেশে হিজড়াদের দলে অর্থাৎ পুঁটি যেখানে থাকতো সেখানে এসে ওঠেন। মধু হয়তো পুঁটির সারাজীবনের কষ্টটাকে, আক্ষেপটাকে অনুধাবন করতেই এমনটা করেন। আবার এমনও হতে পারে ফুকো যেমনটা বলেন, ‘সাধারণ দৃষ্টিতে আমাদের মনে হয় যৌনতা প্রকৃতিদত্ত এবং তাকে সামাজিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও অবদমন করছে।’৬ খুব সহজভাবে বলতে গেলে যৌনতার সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক পারস্পরিক। ক্ষমতাই মানুষের যৌনতার চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্ষমতাই মানুষকে বাতলে দেয় লিঙ্গীয় চরিত্রে সে বা তার উপস্থাপন কেমন হবে। ফলে মধু তো শারীরিক ও মানসিক সব দিক দিয়েই পুরুষ। তিনি তার সেই পুরুষ মনস্তত্ত্ব দিয়েই একটা নারী শরীর চেয়েছিলেন। এই পুঁটির শরীর নারী শরীরে রূপান্তর করতেই তো তিনি তার ভাগের জমি বিক্রি করে হলেও অস্ত্রোপচারের কথা বলেছিলেন। সেই মধুরই হয়তো পরীর সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা সম্পৃক্ততা বা তার মধ্যে নতুন করে কোনো পরিবর্তনের সৃষ্টি হয়েছে। মধু তো পুঁটির কষ্টটাকে দিনের পর দিন দেখেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সব ক্ষমতার বিপরীতে এই সমাজ-বাস্তবতায় পুঁটিদের অবস্থান, ঠিক তার পাশাপাশি বার বার চলচ্চিত্রের গল্পে পুঁটির হেরে যাওয়া আর সবশেষে তার আত্মহত্যা এই সবগুলো ঘটনা মধুকে হয়তো তার লিঙ্গীয় পরিচয় পরিবর্তনের সায় দিয়েছে। মধু নিজেকে নতুনভাবে, নতুন পরিচয়ে, নতুন সত্তায় আবিষ্কার করেছে।
সাত.
পরিবর্তন; শব্দটি দেখতে-বলতে-শুনতে যতোটা সহজ, এর বাস্তবিক প্রয়োগ ঠিক ততোটাই কঠিন আর কষ্টসাধ্য। তাই তো বছরের পর বছর নারীবাদ, বর্ণবাদ বা সাম্যবাদ নিয়ে এতো এতো কথা ওঠার পরও এই আলোচনার কোনো সমাধান এখন পর্যন্ত আসেনি। তবে এই প্রবন্ধের শুরুতেই মানুষের যে অপার জীবনীশক্তি আর প্রাণশক্তির কথা বলা হয়েছে তারই রেশ ধরে বলা যেতে পারে, পরিবর্তনের সুর কিন্তু কোথাও না কোথাও বেজে চলেছেই। এই প্রবন্ধ লেখার মধ্যেই (২০২০) বাংলাদেশে হিজড়াদের জন্য প্রথম কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) চালু করা হয়েছে।৭ শুধু তাই নয়, হিজড়ারা যাতে করে মা-বাবার সম্পত্তির সমান ভাগ পায়, সে বিষয়েও সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মুসলিম শরিয়া আইন এবং সংবিধানের আলোকে একটা উপায় বের করার চেষ্টা করছে আইন মন্ত্রণালয়।৮ ফলে আশাবাদী মানুষ হিসেবে এতোটুকু আশা করা যায়, সব বৈষম্য আর অসামঞ্জস্যের পরিসমাপ্তি ঘটবে একদিন। হয়তো এমন একটা সময় আসবে যখন শুধু আত্মপরিচয়টুকুর জন্য আর কোনো পুঁটিদের প্রাণ দিতে হবে না। সব অসমতার দিনও একদিন হয়তো শেষ হবে। বদলাবে রাষ্ট্র, সমাজ আর এই সিস্টেম। জয় হবে কেবল মনুষ্যত্ব আর মানুষের। কোনো লিঙ্গীয় পরিচয়ের নয়; শুধুই মানুষের।
লেখক : প্রিয়াংকা দেবনাথ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
priyankadebnath422@gmail.com
https://www.facebook.com/priyanka.debnath.31521
তথ্যসূত্র
১. হক, ফাহমিদুল; ‘কমনজেন্ডার’; প্রথম আলো, ৫ জুলাই ২০১২।
২. প্রাগুক্ত; হক, ৫ জুলাই ২০১২।
৩. বসু, প্রদীপ (২০০৫ : ৭৮); ‘যৌনতা ও সংস্কৃতি’; সমীক্ষা ও সন্ধান : ভাষা দর্শন সংগীত; অনুষ্টুপ, কলকাতা, ভারত।
৪. মামুন, আ-আল; ‘শরীর ও লিঙ্গীয় রাজনীতির চিত্র-ভাষা দিয়ে গেলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ’; আলোকিত বাংলাদেশ-এর শুক্রবারের সাময়িকী ‘শুক্রবার আলোকিত বাংলাদেশ’, ৭ জুন ২০১৩।
৫. প্রাগুক্ত; মামুন, ৭ জুন ২০১৩।
৬. প্রাগুক্ত; বসু (২০০৫ : ৭২)।
7.https://www.bbc.com/bengali/news-54822329; retrieved on: 05.09.2020
8.https://www.bbc.com/bengali/news-54910659; retrieved on: 13.11.2020
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন