Magic Lanthon

               

মমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

প্রসঙ্গ ‘প্যারাসাইট’

দমবন্ধ হাওয়ায় পরজীবীদের বড়ো হয়ে ওঠার পর্যবেক্ষণ

মমিনুল ইসলাম


ভূমিকা : প্যারাসাইট কে বা কারা?

এমন এক সময়ে এই লেখা লিখছি যখন করোনা মহামারিতে গোটা পৃথিবী বিপর্যস্ত। মানব স্বাস্থ্যের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় ‘উন্নয়ন’ এজেন্ডা যখন মুখ থুবড়ে পড়ছে, মানুষকে তখন কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন অথবা লকডাউন নামক করোনাবিধি পালনে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, লকডাউন শুধু কি করোনা নির্মূলেই ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি রাষ্ট্রীয় নজরদারি/আধিপত্য বজায় রাখার লক্ষ্যেও এসবকে ব্যবহার করা হচ্ছে? স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রের অপারগতার ক্ষোভে জনগণ যেনো রাষ্ট্রের বিপরীতে কোনোরূপ আন্দোলনে না আসতে পারে--সেই পথ সুগম করতেই শোষক রাষ্ট্র তথাকথিত কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন ও লকডাউন বিধির প্রচলন ঘটাচ্ছে না তো! অথচ অনবরত জনস্বাস্থ্যের বাহানা দিয়ে জনগণের সম্মতি উৎপাদন করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মনে হয়, এগুলো যতোটা না জনস্বাস্থ্যের খাতিরে, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে জনগণকে বাধ্য করা হচ্ছে। নামমাত্র স্বাস্থ্যবিধির বালাই দিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির খাতিরে কলকারখানা খুলে দেওয়া হচ্ছে, আর রাষ্ট্রীয় অনুশাসনের খাতিরে অফিস আদালত। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক। এ রকম এক ভয়াবহ রাষ্ট্রীয়-সময়ে নির্মাতা বং জুন-হো’র প্যারাসাইট চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার প্রয়াস থেকেই এই লেখার সূত্রপাত।

চলচ্চিত্রের নাম যেহেতু প্যারাসাইট, প্রথমে তাই শব্দ হিসেবে প্যারাসাইট নিয়ে আলোচনা বেশি জরুরি। প্যারাসাইট ইংরেজি শব্দ। এর বাংলা অর্থ পরজীবী,--পরভৃত প্রাণী বা জীবাণু, পরজীবী গাছ, লতাপাতা ইত্যাদি। পরাশ্রয়ী ব্যক্তি।১ এখন প্রশ্ন থাকছে, চলচ্চিত্রে নির্মাতা কাকে পরজীবী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, গরিব নাকি ধনী পরিবারকে? নাকি উত্তর পুঁজিবাদের এই যুগে ধনী-গরিব নির্বিশেষে পরজীবী রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। নিতান্তই অর্থের কাছে আজ সবাই পরজীবী। ধনীরা গরিবের শ্রম শোষণ করে যেমন পরজীবীর পরিচয় দেয়, ঠিক তেমনই এককভাবে ধনীর ওপর গরিবদের আর্থিক নির্ভরশীলতাও এক ধরনের পরজীবীতা। পুঁজির কারণে ধনীর কাছে গরিবরা আজ আর্থিকভাবে জিম্মি। যার দরুন একজন গরিব ধনীর কাছে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজে ধনী এবং গরিবদের স্বার্থ পরস্পর বিপরীতমুখী। প্যারাসাইট-এ ধনী-গরিবের এই পরজীবীতার রাজনীতি বেশ খোলাসাভাবেই দৃশ্যায়ন করার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা বং জুন-হো।

এক অর্থে খোদ সিস্টেমটাই সব পরজীবীকে পুষ্টি দিয়ে থাকে। পুঁজিবাদি সিস্টেমটাই যেনো সমাজস্থিত পরজীবীদের আশ্রয়স্থল। সাধারণের থেকে সামাজিক জীবনের সব কলকব্জা হাতিয়ে নিয়ে পুঁজিবাদ তার ভিত শক্ত করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান সব খাতে আজ পুঁজির উপস্থিতি! তাই পুঁজিবাদকে সবচেয়ে বড়ো পরজীবী হিসেবে নামাঙ্কিত করা ভুল কিছু নয়।

আবার প্যারাসাইট-এর পোস্টারে অভিনয়শিল্পীদের চোখে কালো টেপ দেখা যায়। স্থিরচিত্রটি প্রতীকী, কিন্তু এর মাহাত্ম্য সমাজে বিদ্যমান আছে বৈকি। আমাদের সকলের চোখেই আজ অদৃশ্য এক ঠুলি। যে কারণে পাহাড়সম বৈষম্য থাকা সত্ত্বেও উচ্চবিত্ত নিম্নবিত্তের অনায়াস সহাবস্থান। উচ্চবিত্ত খুশি হয়, কারণ নিম্নবিত্ত তাদের গণ্ডি ডিঙিয়ে অনধিকার চর্চা করে না। শুধু নিম্নবিত্তের গরিবি গন্ধটাই উচ্চবিত্তের নাকে ঝাপটা দিয়ে যায়।

একটি জানালাকে ফোকাসে রেখে ক্যামেরা নিচের দিকে প্যান করা হয়, এই হলো প্যারাসাইট-এর প্রথম দৃশ্য। ঠিক এভাবেই গোটা চলচ্চিত্রে নিচুতলার মানুষেরই কথা বলতে চান নির্মাতা। সেটাকেও একতরফা নিম্নবিত্ত প্রদর্শন বলা যেতে পারে। উচ্চবিত্তকে একরকম ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখে নিম্নবিত্তের কার্যকলাপ প্রদর্শিত হয়েছে চলচ্চিত্রটিতে। একই সঙ্গে গরিবকে দেখানো হয়েছে অপরাধপ্রবণ হিসেবেও। অথচ কোন পরিস্থিতিতে তারা অপরাধে লিপ্ত হয়, সেই প্রশ্ন যেনো নির্মাতা একরকম স্বজ্ঞানেই এড়িয়ে গিয়েছেন।

আবার অনেকে প্যারাসাইটকে অনবরত কোরিয়ান জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র বলছে।২ সেই দাবির সত্যতাও বিচারযোগ্য। সর্বোপরি সমসাময়িক রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ব্যবস্থার আলোকে প্যারাসাইট নিয়ে নানা কথার প্রয়াস থাকবে এই প্রবন্ধে।

গল্পে প্যারাসাইট

দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল শহরের দুটি পরিবার। দরিদ্র কিম পরিবার; ধনী পরিবার পার্ক-এর। কিম পরিবার বসবাস করে একটি ভবনের বেইসমেন্টে বা মাটির নিচের ফ্ল্যাটে; দক্ষিণ কোরিয়ায় যেসব ফ্ল্যাট বানজিহা নামে পরিচিত। প্রথম পরিবারটিতে আছে বাবা কিম কি তায়েক, মা চুংসুক, ছেলে কিয়ু ও মেয়ে কিজং। এই নিয়ে কিম কি তায়েকের টানাপড়েনের সংসার। কর্মক্ষম হলেও চারজনই বেকার। আক্ষরিক অর্থেই দরিদ্রতার অন্ধকূপে আটকে গেছে তাদের জীবন। শুধু পিৎজার বাক্স তৈরি করে সামান্য কিছু অর্থ উপার্জন হয় তাদের। ধনী পরিবারটির বসবাস শহরে প্রাসাদতুল্য এক বাড়িতে। তাদের জীবনে বিলাসিতার শেষ নেই। আই টি ফার্মের মালিক পার্ক পরিবারে রয়েছে বাবা পার্ক দংয়িক, মা ইয়োন গিয়ো, মেয়ে দা হাই ও ছেলে দা সং।

দরিদ্র পরিবারের কিয়ু তার বন্ধুর মাধ্যমে পার্ক পরিবারের বড়ো মেয়ের টিউশনির চাকরি পেয়ে যায়। তখন কিয়ু নিজেকে স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিলেও আসলে সে লেখাপড়াই করে না। মিসেস পার্কের সরলতার সুযোগ নিয়ে কিয়ু কৌশলে ওই বাড়িতে তার বোন কিজিয়ং-এর চাকরি জুটিয়ে দেয়; ছোট্ট দা সং-কে পড়ানোর। এরপরে কিয়ু ও কিজং মিলে কৌশলে তাদের বাবাকে ওই বাড়ির গাড়িচালক ও মাকে গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়ে আসে। এতে যদিও ওই বাড়ির পুরনো গৃহপরিচারিকা মুনগুয়াং তাদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বিতাড়িত হন। তবে একপর্যায়ে গোটা কিম পরিবারের আয়ের মূল উৎস ও আশ্রয় হয়ে ওঠে পার্ক পরিবার। অথচ পার্ক পরিবারের কেউ কোনোভাবেই বুঝতে পারে না তাদের গাড়িচালক, গৃহশিক্ষক, গৃহপরিচারিকা সবাই এক পরিবারের সদস্য। কেবল ছোটো দা সং কিছুটা আন্দাজ করতে পারে তাদের শরীরের গন্ধ শুঁকে!

ধনী পরিবারটির আপাত নিখুঁত জীবনেও একসময়ে কিছুটা বিপত্তি আসে। তাদের ছোট্ট ছেলেটা অজানা এক কারণে ট্রমাটাইজ হয়। প্রায়ই মিসেস পার্কের মধ্যে একটা অসুখী ভাব লক্ষ করা যায়। আলিশান জীবনযাপন করেও পার্ক পরিবারের কারও মাঝে আত্মবিশ্বাসের ছিটেফোঁটাটুকু নেই। অগাধ সম্পদের মালিক হয়েও এক ফ্যান্টাসি জগতে তাদের বসবাস। একপর্যায়ে চলচ্চিত্রের নাটকীয়তা মুনগুয়াং ও কিম পরিবারকে একই জায়গায় নিয়ে আসে। শুরু হয় পার্ক পরিবারের কাছে নিজেদের (মুনগুয়াং পরিবারের) অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই। গল্পের নাটকীয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যেখানে কিম খুন করে মালিক পার্ককে। এর পরে অভিযুক্ত কিম লুকিয়ে থাকে পার্কের আলিশান বাড়ির বেইসমেন্টেই। সবশেষে কিমের ছেলের অধরা স্বপ্নের দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে সমাপ্তি হয় প্যারাসাইট-এর।

সব দেখা এক নয়

চলমান এই অর্থব্যবস্থায় সিংহভাগ সম্পদ আজ মুষ্টিমেয় লোকের হাতে পুঞ্জীভূত। সম্পদ যাদের হাতে কুক্ষিগত, সমাজ ও রাষ্ট্র চালানোর ক্ষমতাও তারা নিজেদের করে নিয়েছে; এমনকি সম্মান-প্রতিপত্তিও। সম্পদ যাদের নেই, সেই মানুষগুলো সবকিছু থেকেই বঞ্চিত। অথচ বঞ্চিতদের শ্রমে-ঘামে তৈরি সিঁড়ি বেয়েই ধনবান হয়ে উঠছে বুর্জোয়া গোষ্ঠী। যাপন করছে বিলাসী জীবন। যার ছোঁয়াটুকু বঞ্চিতদের অন্দরমহলে পৌঁছায় না। বর্তমান বিশ্ব যে ভয়াবহ শ্রেণিবৈষম্যে জর্জরিত সেই বৈষম্যের সারথি হয়ে গতির চাকায় শান দিচ্ছে রাষ্ট্র নামক যন্ত্রটি। প্যারাসাইট-এ যা অভিনবরূপে হাজির করেছেন নির্মাতা।

চলচ্চিত্রে পরিবার দুটির বাড়িতে প্রবেশের দৃশ্য খেয়াল করলেই বোঝা যায়, বৈষম্য আজ কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ধনী পরিবারের বাড়ি শহরের সবচেয়ে উঁচুতে, বিপরীতে দরিদ্র পরিবারের বাড়ি সমতল ভূমি থেকেও নিচে। নির্মাতা যেনো এখানে ধনী গরিবের বৈষম্য দৃশ্যায়নে এমন মেটাফোরের ব্যবহার করেছেন। যদিও চলচ্চিত্রে এ রকম মেটাফোরের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। ১৯২৭-এ মুক্তি পাওয়া মেট্রোপলিস চলচ্চিত্রে এই মেটাফোরের ব্যবহার সর্বপ্রথম দৃশ্যায়িত হয়। অবশ্য সমাজের উঁচু ও নিচুতলার বাসিন্দাদের মধ্যে অকাট্য বৈষম্য দৃশ্যায়নে এটি বেশ সুবিধাজনক মেটাফোর।

বিশ্বায়নের নামে বুর্জোয়া যুগে এসে গোটা সমাজ উত্তরোত্তর দুটি বিশাল বিরোধী ক্যাম্পে বিভক্ত হয়ে গেছে। যারা পরস্পর মুখোমুখি দুটি শ্রেণি--অল্পসংখ্যক মানুষ যারা অগণিত সম্পদের মালিক; বিপরীতে একবেলা খেয়ে পরে বাঁচতে চাওয়া বিশাল সংখ্যক মানুষ। এর মধ্যে বুর্জোয়া শ্রেণি অনবরত সম্পদ গড়েই যাচ্ছে। নির্মাতা সেলুলয়েডে এটিই প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন। তবে ধনীরা কোন উপায়ে অর্থ উপার্জন করে, কোন পথে পার্ক এতো বিত্তবান, সেই প্রশ্নের অনুসন্ধান চলচ্চিত্রে খুব একটা দেখা যায় না।

পার্ক পরিবারটি আপাদমস্তক ‘বুর্জোয়া’ চরিত্রকে ধারণ করে, ফলে তাদের সার্বিক জীবনাচরণে এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। অর্থের বিনিময়ে সবকিছু কিনতে চাওয়া যার প্রধান লক্ষণ। আসলে অর্থ ব্যতীত তাদের কিছু দেওয়ারও থাকে না। শঙ্কা বোধ তাদের পিছু ছাড়ে না। তবে আপাত দৃষ্টিতে প্যারাসাইট-এ দুটি শ্রেণি (ধনী ও দরিদ্র পরিবার) চিত্রিত হলেও এর বাইরে আরেকটি শ্রেণির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। পুরনো গৃহপরিচারিকা মুনগুয়াং ও গোপনভাবে আশ্রিত তার স্বামী এ রকমই এক শ্রেণি। তারাও পুঁজির দৌরাত্ম্যে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছে। সমাজে এদের শ্রেণি নির্ধারণ করাও বেশ কঠিন! ধনীদের ছায়াতলে বসবাস করে এরা আলিশান জীবনযাপনে অভ্যস্ত, অথচ ঋণের দায়ে অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে। আসলে উত্তর-পুঁজিবাদের এই যুগে এসে তথাকথিত দরিদ্রতার চেহারাও পাল্টে যাচ্ছে। যার স্বরূপ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে কিছুটা হলেও দেখা যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবসময় একটা দ্বান্দ্বিক চরিত্রে ঝুলে থাকে। কখনো সে বুর্জোয়া চরিত্র ধারণ করে, কখনোবা শোষিত; আবার বুর্জোয়া ও শোষিতের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজও করে। ‘... রাষ্ট্রে যখন শ্রেণিকাঠামো খুবই তীক্ষ্ম ও ধ্রুপদি ধাঁচে চালিত হয়, তখন মধ্যবর্তী ও ক্রান্তিকালীন স্তর দেখা যায়, যা শ্রেণির সীমানাকে অস্পষ্ট করে ফেলে।’৩ অনেকটা যেনো ধনী পরিবারের চার সদস্যের বাইরে ওই বাড়িতে যে দুজন মানুষ বাস করে--বাড়ির মালিকানা পরির্বতন হয় কিন্তু গৃহকর্মী একই থাকে, এমন বিশ্বস্ত গৃহকর্মী এবং গৃহকর্মীর কাছে গোপনে আশ্রিত তার ঋণগ্রস্ত স্বামী। যে কিনা ঋণের দায়ে সমাজে মেলামেশার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে।

আসলে সমাজ শুধু শোষক ও শোষিত শ্রেণি দিয়েই গঠিত হয় না। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশও ঘটে। উন্নত ধনবাদী দেশে নানা স্তরের মধ্যবিত্ত ও পেশাজীবী শ্রেণির অবস্থান শ্রেণি বিশ্লেষণকে খুবই কঠিন করে ফেলেছে। একইভাবে অনুন্নত দেশগুলোতেও শ্রেণি বিশ্লেষণ সহজ বিষয় নয়। এসব দেশে শ্রেণিস্বার্থ ও জীবনযাত্রার মধ্য দিয়ে কীভাবে একদল অন্যদল থেকে পৃথক, তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটা হয়ে থাকে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন স্তর বা গোষ্ঠীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও স্বার্থের সংশ্লেষ থাকার কারণে। তাহলে প্যারাসাইট-এ দৃশ্যায়িত কিম ও পার্ক পরিবারের বাইরে যে দুটি চরিত্র দেখা যায় তাদের কি সমাজে কোনো অস্তিত্ব নেই? সে প্রশ্ন পাঠকের কাছেই তোলা থাকলো। তবে পুঁজিবাদী সিস্টেমটাকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে দিনশেষে প্যারাসাইট যেনো শোষিতকে স্বপ্নের মধ্যেই ডুবিয়ে রাখে। যেটাকে এক অর্থে পুঁজিবাদী সিস্টেমের প্রতি সহাবস্থান বলা ভুল হবে না।

সব জানা এক নয়

নিউজ এজেন্সিগুলোতে সয়লাব হয়ে গেছে কোরিয়ান চলচ্চিত্র নাকি অস্কার পেয়েছে (অবশ্য প্রথম কোনো কোরিয়ান চলচ্চিত্র হিসেবে প্যারাসাইট কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাম ডি’অর জিতেছে। এর ঝুলিতে রয়েছে বাফটা অ্যাওয়ার্ডও)! সুর মিলিয়ে কোরিয়ান শীর্ষ কিছু পত্রিকা দাবি করতে থাকে প্যারাসাইট তাদের চলচ্চিত্র; কোরিয়ানদের চলচ্চিত্র। প্যারাসাইট দৃশ্যত কোরিয়ানদের কথাই বলে, সেখানে প্রতিটি দৃশ্যেই যেনো কোরিয়ান সংস্কৃতির সদয় আবির্ভাব ঘটে। আবার নির্মাতাও একজন কোরিয়ান। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে মিডিয়া/নিউ মিডিয়াগুলোতে প্যারাসাইট ‘কোরিয়ান জাতীয়তাবাদী’ চলচ্চিত্র হিসেবে পরিচয় পেতে থাকে।৪ তাহলে কোরিয়ান চলচ্চিত্র প্যারাসাইট-এ মার্কিন বন্দনা কেনো!

বং জুন-হোর প্যারাসাইট-এ এমন দৃশ্য আছে বলেই, এই প্রশ্ন উত্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়। এখন সেটাই খুঁজে দেখা হবে, প্যারাসাইট কি নিখাদ কোরিয়ান চলচ্চিত্র? নাকি এর পিছনে অন্য কোনো রাজনীতি বা মতাদর্শিক আধিপত্য বজায় রাখার অভিপ্রায় লুকিয়ে আছে? কিংবা নিউজ এজেন্সিগুলোর প্রচারিত খবরের সত্যতাইবা কতোটুকু?

চলচ্চিত্রের ১৯ মিনিট এক সেকেন্ডে মার্কিনিদের প্রবর্তিত কাব স্কাউট ধারণার প্রশংসার মাধ্যমে আমেরিকান বন্দনার সূত্রপাত ঘটে। এরপর ২০ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে দরিদ্র পরিবারের কিয়ু তার বোনকে জেসিকা হিসেবে পরিচয় করে দেওয়ার সময় আমেরিকান ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দেয়, এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধারণা জন্মায় আসলে সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিশ্বমানের। ধরেই নেওয়া হয়, শুধু শিক্ষায় নয়, আমেরিকা সবকিছুতেই শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক।

আবার প্যারাসাইট-এর এক ঘণ্টা ২৫ মিনিটে পার্ক পরিবারের ছোটো ছেলে দা সং যখন তাঁবু বিছিয়ে বাইরে ঘুমিয়ে পড়ে, তখন বাবা পার্কের উদ্দেশে তার মা বলেন, এই তাবু আমেরিকা থেকে নিয়ে আসা, প্রবল বৃষ্টিতেও কোনো সমস্যা হবে না। এভাবেই প্যারাসাইট-এ অনবরত দৃশ্যায়ন হয়েছে গণতন্ত্র থেকে পুঁজিতন্ত্র সবকিছুর রোল মডেল যেনো আমেরিকা। এছাড়া চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১২ মিনিটে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন’কে নিছক গালমন্দ করা হয়। যা দক্ষিণ কোরিয়া তথা মার্কিন মতাদর্শের সঙ্গে খুব সহজেই খাপ খেয়ে যায়। আর দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা মার্কিনিদের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার দ্বন্দ্বের বিষয়টি সবারই জানা।

এভাবেই প্যারাসাইট-এ এককভাবে আমেরিকান মতাদর্শকে যতোটা পারা যায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। সেই অর্থে চলচ্চিত্রটিকে মতাদর্শিক আধিপত্যবাদী হাতিয়ার বলাটা বাড়িয়ে বলা হবে না। বরং নির্মাতা যেনো আমেরিকাকে এক হাত সামনে রেখেই প্যারাসাইট নির্মাণ করেছেন। কারণ আমেরিকা রাষ্ট্রের আদলে বাকি সব রাষ্ট্রকে সাজাতে পারলে পুঁজির বিস্তার সহজ হয়ে যায়। বিশ্বায়নের নামে পুঁজিবাদের প্রসার যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

এতোকিছুর পরও প্যারাসাইটকে কি কোরিয়ান জাতীয়তাবাদী চলচ্চিত্র বলা যায়? উত্তরটা পাঠকই খুঁজে নিবে। তাহলে নিউজ এজেন্সিগুলোর দাবি কতোটা গ্রহণযোগ্য? নাকি তারা আধিপত্যশীল জ্ঞান দিয়ে শাসকের গদি পাকাপোক্ত করার কাজে ব্যস্ত? কারণ ফুকোর বরাতে জানা যায়, ক্ষমতা প্রশ্নে জ্ঞান কতোটা জরুরি।

আসলে কোনো মতাদর্শ ঠিক তখনই মতাদর্শ হয়ে ওঠে, যখন সেটি গণমানুষের সমর্থন লাভ করে। মতাদর্শের প্রথম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, গণমানুষের চর্চিত বিষয়। আর এই মতাদর্শ সমাজে স্থান লাভ করে জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে। এখানে চলচ্চিত্র ইন্ডাষ্ট্রি তথা নিউজ এজেন্সিগুলো অনবরত সমাজের সঙ্গে আধিপত্যবাদী জ্ঞানের সংশ্লেষ ঘটাচ্ছে এবং গণমানুষ সেটার চর্চা করছে। এভাবে রাষ্ট্র তার স্বার্থে জনগণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘জ্ঞান’ উৎপাদন করে। যেই ‘জ্ঞান’ আদতে রাষ্ট্রীয় পরাধীনতায় ডুবিয়ে রাখতেই ভালোবাসে।


অতএব অস্কার!

কাউকে পুরস্কৃত করার ধারণা কবে থেকে চালু হয়েছে তা বলা মুশকিল। দাবি করা হয়, পুরস্কার সবসময় সেরাদেরই দেওয়া হয়। তবে সেই ‘সেরা’ কারও উদ্দেশ্যমূলক তৈরি করা নয়, সেই ‘সেরা’ যে কারও সঙ্গে আঁতাত করে না, সেই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেলে তবেই তাকে নির্ভেজাল ‘সেরা’ বলা যায়। বিজ্ঞান, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলাধুলা, বাণিজ্য, যুদ্ধবিগ্রহ, পড়াশোনা এহেন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে কোনো পুরস্কার দেওয়া হয় না। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখাতে পারলেই পুরস্কার দেওয়া হয় সেই কীর্তিমানকে। প্রশ্ন থেকে যায় সবসময় কৃতিত্ব বিচার করেই পুরস্কার দেওয়া হয় কি না। এই সেরা নির্মাণের যথার্থ মাপকাঠিইবা কী?

আপনি তো তাকেই কাছে টানবেন, যে আপনাকে ভালো বলবে, আপনাকে মেনে চলবে, আপনার হয়ে কাজ করবে; আর অবাধ্যদের জন্য রইবে তিরস্কার। ঠিক যখন বৃটিশ শাসকরা নবাব আব্দুল লতিফকে মুসলিমদের তৎকালীন সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করছে; তখনই ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনকে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। অথচ আব্দুল লতিফের মতে, মুসলিমদের একমাত্র ভাষা উর্দু, তাদের উর্দু শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। অর্থাৎ তিনি স্বশাসন চাননি। মুসলমান মাত্রই তাকে উর্দু শিখতে হবে, সে পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ অথবা উপমহাদেশের অন্য কোনো স্থানের হোক। অন্যদিকে সূর্যসেন, ক্ষুদিরাম চেয়েছিলেন এই ভূখণ্ডের স্বাধীনতা। তাহলে কি শাসকশ্রেণির মতাদর্শের পক্ষে কথা বললেই পুরস্কার/খেতাব মেলে? নাকি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের জন্য নির্ধারিত শর্ত পালন করলে পুরস্কার পাওয়া যায়? তাহলে প্যারাসাইট-এ কোনটি ঘটেছিলো?

নির্মিত চলচ্চিত্রটি যাতে অনেক জনগণের কাছে সমাদৃত হয়, এই সুপ্ত অভিপ্রায় সব নির্মাতার মনের নিগূঢ়ে থাকে। আবার নির্মাতার মননে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘মহার্ঘ’ পুরস্কার প্রাপ্তির স্বপ্নও বাদ যায় না। বলাই বাহুল্য চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে অস্কার হচ্ছে বর্তমান যুগের সেই ‘মহার্ঘ’। মানা হয়, অস্কার প্রাপ্তিতে যেকোনো চলচ্চিত্রের ষোলোকলা পূর্ণ হয়। অথচ অস্কারের ইতিহাস কিছুটা ভিন্ন ইঙ্গিত দেয়।

চলচ্চিত্রের ইতিহাস বলে শুরুতে স্টুডিওনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ হতো। অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, সিনেমাটোগ্রাফারসহ সব কলাকুশলী স্রেফ বেতনভুক্ত চাকুরে হিসেবে কাজ করতো স্টুডিওতে। চলচ্চিত্রের লভ্যাংশ স্টুডিও মালিকের হাতেই থাকতো। আবার স্টুডিও ঠিক যেভাবে চাইতো সেভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হতো। ফলে নির্মাতার কোনো স্বাধীনতা ছিলো না বললেই চলে। সেসময়ে নির্মাতাদের বশে রাখার অভিপ্রায়ে স্টুডিও মালিকপক্ষ পুরস্কার ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। বর্তমানে যা অস্কার নামে বহুল পরিচিত। অস্কার পুরস্কার প্রর্বতনে ভূমিকা রাখা অন্যতম সদস্য লুইস বুর্ট মেয়ারের ভাষায় যা অনেকটা পরিষ্কার হয়, ‘I found that the best way to handle [filmmakers] was to hang medals all over them … If I got them cups and awards they’d kill them to produce what I wanted. That’s why academy award was created.’৫

আবার এমনটাও হয়েছে শুধু অস্কার প্রাপ্তির কথা মাথায় রেখে নির্মাতা চলচ্চিত্রের আধেয় ও দৃশ্য পরিবর্তনে ব্রত হয়েছে। কারণ নির্মাতাদের অজানা নেই, রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বললে আর যাই হোক অস্কার পাওয়া যায় না। বং জুন-হো যেনো এ রকম এক স্বার্থবাদী রাষ্ট্রের পদতলে আপোসনামা লিখেই প্যারাসাইট নির্মাণ করেছেন।

এখন অবশ্য আগের মতো স্টুডিও প্রথা নেই। তবে আজ স্টুডিওর রূপ ধারণ করেছে রাষ্ট্র নিজে। সেন্সরশিপসহ নানা আইন করে চলচ্চিত্রকে সর্বদা নজরদারির ভিতরে রাখা হচ্ছে। বলাই বাহুল্য, একটি চলচ্চিত্র মুক্তির আগে রাষ্ট্রীয় সব নিয়মাবলি অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হয়। কয়েক দফা রাষ্ট্রীয় পরীক্ষানিরীক্ষার পরেই তা মুক্তি পায়। শাসকের মতাদর্শের সঙ্গে না মিললে সেই চলচ্চিত্র আটকে দেওয়া অথবা সংশোধন করতে বলা হয়। অস্কার পুরস্কারের প্রবর্তক এবং অর্থায়ন করা রাষ্ট্র যেহেতু আমেরিকা, স্বভাবতই সেখানে আমেরিকার স্বার্থ বেশি দেখা হয়। সেদিক বিবেচনায় প্যারাসাইট যে আমেরিকায়নকে সমর্থন করে তার একপশলা আলোচনা আগেই করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, আমেরিকান চলচ্চিত্র জোকারকে বাদ দিয়ে কোরিয়ান প্যারাসাইটকে কেনো অস্কার দেওয়া হলো? জোকারও তো বেশ নাম হাকিয়েছে, তাহলে তাকে কেনো অস্কার কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখান করলো! আসলে জোকার দিনশেষে পুঁজিবাদের তলানিতে আটকে যাওয়া এক মানসিক বৈকল্যের কথা বলে। যে কিনা পুঁজির চাপে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে খুনের মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নেয়। যা সর্বদ্রষ্টা আমেরিকান পুঁজিবাদকে কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্যারাসাইট-এ যদিও প্রায় একই অর্থে খুনের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। তবুও জোকার-এর তুলনায় প্যারাসাইট হয়তো তাদের খানিকটা স্বস্তি দেয়। দিনশেষে ধনীরা ধনীই থাকে, আর দরিদ্ররা ধনী হওয়ার স্বপ্ন নিয়েই চলে যায়। বং জুন-হোর প্যারাসাইট-এ দৃশ্যায়িত পাথরের মেটাফোর এটাকে সমর্থন করে। সেখানে পাথরকে মানা হয় সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। আবার শহুরে ‘উন্নয়নে’ সৃষ্ট বন্যায় গরিবের ঘর ভেসে গেলেও সৌভাগ্যের প্রতীক সেই পাথরকে জড়িয়ে ঘুমাতে হয় তাকে। এমনই এক দৃশ্য চলচ্চিত্রটির এক ঘণ্টা ৪১ মিনিটে দেখানো হয়।

‘পরিবর্তনই সবচেয়ে বড়ো অপরিবর্তন’, ধনীরা যেনো সেটা মানতেই নারাজ। শ্রমিক আজীবন শ্রমিকই থাকবে। আর ধনীরা টাকার পাহাড় গড়বে--চলচ্চিত্রে ৩৮ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে যার চাক্ষুষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যেখানে গাড়িচালককে আজীবন গাড়িচালক হিসেবে দেখতেই পছন্দ বোধ করে। এককথায় দরিদ্র আজীবন দরিদ্রই থাকবে, ধনীরা আজীবন ধনীই থাকবে। এভাবেই যেনো প্যারাসাইট-এ দৃশ্যায়িত ‘আমেরিকায়ন’ তথা ‘পুঁজিবাদ’, বা বর্তমান সিস্টেম সমর্থনকারী অস্কার কর্তৃপক্ষের কাছে বেশি সুবিধাজনক মনে হয়। হয়তো এ রকম অভিপ্রায় থেকেই প্যারাসাইট অস্কার পায়।

অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া যেহেতু আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্র, তাই সেদেশের চলচ্চিত্রকে পুরস্কৃত করায় ক্ষতির কিছু নেই। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দক্ষিণ কোরিয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চিনের সবচেয়ে কাছের আমেরিকান নৌঘাঁটি দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত। তাই দক্ষিণ কোরিয়াকে হাতে রাখা আমেরিকার প্রথম কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে অনেকদিনের গুঞ্জন ছিলো, অস্কারে ‘সেরা চলচ্চিত্র’ পুরস্কার হলিউডের বাইরে অন্য চলচ্চিত্রকে দেওয়া হয় না। এজন্য স্বয়ং অস্কার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছিলো। এক অর্থে সেই অভিযোগ এড়ানোর খাতিরে হলেও দুইয়ে-দুইয়ে মিলে যাওয়া প্যারাসাইটকে অস্কার দিতে হয়।

আবার মিডিয়া/নিউ মিডিয়াগুলোতে প্রচারিত হতে থাকে, প্যারাসাইটকে অস্কার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন মতাদর্শে দীক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত পুরস্কার ব্যবস্থাকে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অসঙ্গতি কেনো! সেটা আলোচনার্থেই প্রবন্ধের এই অংশের সূত্রপাত। তাত্ত্বিক জাঁ বদ্রিয়া’র ‘ছায়াসদৃশতা’ তত্ত্বের বরাতে ট্রাম্পের এই অস্বীকৃতি প্রদানের রাজনৈতিক অর্থনীতি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। তার চিন্তা অনেকটা এ রকম--‘... মিডিয়া এবং তথ্য প্রযুক্তির দ্বারা আমরা পূর্ণ এক উত্তরাধুনিক যুগে প্রবেশ করেছি, প্রবেশ করেছি ছদ্মসদৃশতার (সিমুলেশন) যুগে এবং আরো নির্দিষ্ট করে তৃতীয় ধারার ছদ্মসদৃশতার যুগে।’৬ বর্তমানে এই ছায়াদৃশ্যতা (সিমুলেশন) বা তৃতীয় ধারা নির্মাণের সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার চলচ্চিত্র। এক্ষেত্রে আমেরিকা আরো একধাপ এগিয়ে বক্তব্যের মাধ্যমে ছায়াদৃশতা নির্মাণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরক্তি প্রকাশ যেনো সেই তৃতীয় ধারা নির্মাণে সহায়তা করে।

অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিডিয়া/চলচ্চিত্রে প্রচারিত বাস্তবতার রিপ্রেজেন্টেশন মানুষের মগজে বিভ্রম সৃষ্টি করে। অন্যদিকে প্যারাসাইটকে অস্কার দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের অমত যেনো বাস্তবতার রিপ্রেজেন্টেশনকে সমর্থন করে--জলবায়ু কিংবা অভিবাসন ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের নেওয়া সিদ্ধান্ত সেটারই অতীত বহিঃপ্রকাশ। একইসঙ্গে ট্রাম্পের ছেলেমানুষি সর্বজন বিদিত। সেটাও ঠিক মিডিয়ায় নির্মিত বয়ানেই স্থিত করা হয়। এভাবে যেনো ট্রাম্পের বিরক্তি প্রকাশ সাধারণের কাছে নিছকই উপভোগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। অথচ অস্কার প্রাপ্তিতে প্যারাসাইট-এর যোগ্যতা নিরূপণের প্রশ্ন অনুত্থাপিত থেকে যায়। ট্রাম্পের বিরোধিতা অথবা সমর্থন তখন মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাহলে কি অস্কারের মাধ্যমে ক্ষমতা পোক্ত করার পুরো খেলাটি সাধারণের অভিজ্ঞতা থেকে আড়াল করতেই ট্রাম্পের এমন অসঙ্গতিপূর্ণ বক্তব্য মিডিয়াগুলো প্রচার করেছে? উপসাগরীয় যুদ্ধ হয়নি অথবা ডিজনিল্যান্ড আসল আমেরিকাজ--বদ্রিয়া’র এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বলাই যেতে পারে, প্যারাসাইট নিছকই আমেরিকান এজেন্ডা প্রচারকারী-প্রসারকারী চলচ্চিত্র।

উপসংহার

ইংরেজি ভাষার বাইরের চলচ্চিত্র হয়েও অস্কারে ‘সেরা চলচ্চিত্রের’ পুরস্কার জিতে নেওয়া কিন্তু মামুলি ব্যাপার নয়, ইতিহাসে এই প্রথম এমনটা ঘটলো! অন্যভাবে বললে এটি পশ্চিমাদের অপারগতার প্রতিচ্ছবিও বটে। তারা ‘সেরা’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারছে না। যার ফলে মার্কিন অর্থায়নে, মার্কিন নীতিনির্ধারণে পরিপুষ্ট পুরস্কার/বরমাল্য, খোদ মার্কিনিদেরই হারাতে হয়। এদিক থেকে অস্কার পুরস্কারের ইতিহাসের ব্যত্যয় ঘটানো প্যারাসাইট প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। আসলে শিল্পের দৃষ্টি এমনই হওয়া উচিত। শিল্পকে কখনো মতাদর্শের বুলি দিয়ে বাঁধানো যায় না, শিল্পের অগ্রযাত্রা কখনো থামিয়ে রাখা যায় না।

লেখক : মমিনুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

https://m.facebook.com/mominul.islam.50159

mominulmcj27@gmail.com

 তথ্যসূত্র

1. Siddiqui, Zillur Rahman (Edit) (1993); Bangla Academy English-Bengali Dictionary; Bangla Academy, Dhaka.

2. https://rb.gy/mxdad6; retrieved on: 02.08.2020

৩. উল্লাহ, মাহবুব; ‘সমকালীন বিশ্ব পুঁজিবাদ ও মার্কসবাদের তিনটি প্রশ্ন’; প্রতিচিন্তা; সম্পাদনা : মতিউর রহমান, বর্ষ ২০১৯, পৃ. ৫১, ঢাকা।

4. https://rb.gy/l9xefo; retrieved on: 03.09.2020

5. https://en.wikipedia.org/wiki/1st_Academy_Awards#cite_note-6; retrieved on: 07.09.2020

৬. বদ্রিয়ার, জে (১৯৮৩), উদ্ধৃত; লফে, ড্যান; ‘বদ্রিয়ার : অতিবাস্তববতা (হাইপার-রিয়ালিটি) ও ছদ্মসদৃশতা (সিমুলেশন)’; যোগাযোগ; অনুবাদ : ওয়াসেক রহমান; সম্পাদনা : ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন, সংখ্যা ১৩, বর্ষ ২০১৯, পৃ. ৩৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন