রোকসানা আরশি
প্রকাশিত ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘দ্য মিরর’ : অন্য আয়না নয়, নিজেকে আঁকতে হবে নিজের আয়নায়
রোকসানা আরশি

আরশিতে রাখি চোখ
আরশিরে দেখিতে
অথচ কী অদ্ভুত ব্যাপার মানুষের দুই চোখ কখনো একে অন্যটিকে দেখে না। নিজকে দেখতে হলেও মানুষকে চোখ রাখতে হয় আয়নায়; প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবিটি তখনই সে দেখতে পায়। কিন্তু ওই উল্টো প্রতিচ্ছবিটি কী শুধুই মানুষের মুখের আদল কিংবা দৈহিক গঠনের প্রতিফলন, নাকি অন্য কিছু! আয়নার কাছে হয়তো ব্যক্তিমানুষ কিছুই লুকোতে পারে না। পারদের আয়নায় পর্দা টেনে জীবনের অপূর্ণতা এড়ানো যায় না। কারণ জীবন নিজেই একটা আয়না। তাই সময়ের ছাঁচে জীবনের প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হতে থাকে। আপনার পরিবার আপনার আয়না, আপনার সময় আপনার আয়না; আয়না আপনার সমাজ; আয়না আপনার দেশ। সেই আয়নাগুলোতে আপনার প্রতিচ্ছবি প্রতিফলিত হয় বার বার।
আয়না নিয়ে এই আলোচনা উঠেছে আন্দ্রেই তারকোভস্কির দ্য মিরর (১৯৭৫) নিয়ে কথা বলতে গিয়ে। যেখানে তিনি একজন মাকে, একজন বাবাকে দেখিয়েছেন; তাদের সন্তান, পরিবার, তাদের সময়, তাদের দেশ এবং তাদের সংগ্রাম সবকিছুর প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় সেখানে। দ্য মিরর একটি পরিবারের গল্প। যে পরিবারের বাবা দেশের জন্য পরিবার ত্যাগ করেন, এরপর সেই পরিবারে সন্তানদের নিয়ে একাকী এক মা সময়ের ছাঁচে জীবনের প্রতিফলিত রূপ দেখতে পান। চলচ্চিত্রজুড়েই সেই মাকে দেখা যায়, যিনি খুব এলোমেলো জীবনযাপন করেন। জীবন নিয়ে তার হতাশা আছে, আবার কোথাও যেনো আছে আশা। কোথায় যেনো তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন, আবার নিজেকে ফিরে পাচ্ছেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন তার এক জীবনের নানা রকম প্রতিচ্ছবি। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে সেই জীবন, পরিবর্তন আসছে সম্পর্কেও।
একটি পরিবারের গল্প হলেও মিরর তারকোভস্কির আত্মজৈবনিক চলচ্চিত্র।১ তারকোভস্কি নিজের জীবনে যা প্রত্যক্ষ করেছেন সেটিই মিরর-এ দেখাতে চেয়েছেন, চিত্রিত করেছেন। যদিও তিনি নিজেই বলেছেন, এখানে এমন কিছু দৃশ্য আছে যা সম্পর্কে আমি নিজেই স্পষ্ট নই। কিন্তু বাস্তবে ঘটনাটি ঘটেছে।২ মানুষের জীবনেও এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যার রহস্য সে জানে না। জীবনে এমন অনেক প্রশ্ন আছে, যার উত্তর মানুষ প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ায়। হয়তো সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নামই জীবন। কিন্তু কতোজন সেই উত্তর খুঁজে পায়! কতোজনের জীবনের আয়নায় প্রতিফলন ঘটে সেই উত্তরের!
দুই.
দ্য মিরর-এর সূচনা দৃশ্যের ঠিক পরের দৃশ্যটিকে এর প্লট বলা যায়। বাঁশের উপর বসে থাকা অপেক্ষমান নারীটি জানেন না আদৌ তার অপেক্ষার অবসান হবে কি না! তার প্রত্যাশিত মুখটি চোখের পর্দায় ভেসে উঠবে কি না! দৃশ্যে হঠাৎ এক আগন্তুক উপস্থিত হয় এবং নারীটির সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে আগন্তুক বাঁশের উপর বসতে গেলে সেটি ভেঙে পড়ে। এখানে বোধ হয় এমন ইঙ্গিত রয়েছে, যে ভিতের উপর নারীটি বসে আছেন, যে দায়িত্বের ভার তিনি বহন করছেন, সেটি শুধুই তার একার। তাই যদি কখনো তার অপেক্ষার অবসান হয়, যদি তার প্রত্যাশিত ব্যক্তিটি আসেও তবু তার প্রতিফলন ওই নারীর জীবনে পড়বে না। তাকে তার সংগ্রাম তার মতো করেই করে যেতে হবে। কারণ তিনি মা; বাবা যতোটুকু সহজভাবে তার কর্তব্য ভুলে থাকে, মা ততোখানি কঠিন হয়ে তার দায়িত্ব পালন করেন।
তারকোভস্কি নিজে তার পরিবারের কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমার মা-বাবা, বিশেষভাবে আমি মার দ্বারাই লালিত পালিত কেননা বাবা আমার তিন বছর বয়সেই মা-কে ছেড়ে চলে যান। অর্থাৎ বাস্তবে আমার মার দ্বারাই আমি লালিত পালিত। তিনি বলেন, আমার উপর বাবার কোনো প্রভাব নেই। মা-র কাছেই প্রধানত আমি ঋণী সবকিছুর জন্য। মা-ই আমাকে নিজস্বতা খুঁজে পেতে সাহায্য করেন।’৩ যদিও তারকোভস্কি বলছেন প্রভাব নেই, কিন্তু তারপরও কোথায় যেনো বাবার অভাববোধ তার জীবনে বিশাল প্রভাব সৃষ্টি করেছে বলে মনে হয়।
মিরর-এ দেখা যায়, বাবা চলে যাওয়ার পর মা হয়ে পড়েন একা। এরপর পুরো চলচ্চিত্রে মাত্র দুইবার বাবাকে দেখা যায়। দৃশ্যত বাবার অনুপস্থিতি থাকলেও প্রতিটি দৃশ্যেই তিনি ছিলেন। তারকোভস্কি তার নিজের জীবনে বাবার প্রভাব সম্পর্কে বলেন এভাবে--আমার ধারণা, অচেতন স্তরে জৈবিক অর্থে বাবার প্রভাব আমার মধ্যে হয়তো ছিলো।৪ প্রশ্ন হলো, সচেতনে কি তা একেবারেই ছিলো না? চলচ্চিত্রে ছোটো সেই ছেলেটি বাবাকে স্বপ্নে দেখে। বাবা দৃষ্টির আড়ালে গেলেও মন থেকে দূরে যেতে পারেনি। হয়তো ছেলেটি তার বাবাকে খুব করে কাছে পেতে চায়; হয়তো মায়ের এতো এতো অবদান তার জীবনে থাকা সত্ত্বেও সে অভাববোধ করে বাবার। এগুলো তার চেতন-অচেতন মিলেই ঘটে।
জীবনে বাবা-মায়ের জায়গাও কি আয়নার মতো নয়! হাসি মুখে আয়নায় তাকালে মনে হয় ওই হাসি যেনো আয়নার হাসি। বাবা-মাও তেমনই; ঠিক আয়নার মতো। তাদের সামনে প্রতিচ্ছবির মতো ব্যক্তিমানুষ প্রতিফলিত হয়। এই আয়না যদি কখনো ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তাহলে সেই আয়নায় যে প্রতিচ্ছবি দেখা যায় তা ভাঙা টুকরোর মতো কেবল; কোনো সরল দর্পণ নয়। টুকরো আয়নায় প্রতিফলিত হয় যে জীবন, সে জীবন টুকরো জীবন। আবার অনেকগুলো টুকরো জীবন মিলেই কিন্তু একটা জীবন। তাই তারকোভস্কিও যে আয়না (মিরর) নির্মাণ করেছেন, সে আয়না থেকে হয়তো তার বাবাকে বাদ দিতে পারেননি। বাবার অভাববোধটাই ছেলের জীবনে বিশাল প্রভাব ফেলেছে; তার অনুপস্থিতি তাকে উপস্থিত করেছে।
তিন.
তারকোভস্কি যখন মিরর নির্মাণ শুরু করেন তখন ভেবেছিলেন, তিনি নিজেকে নিয়ে চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন, কিন্তু শেষ হওয়ার পর বুঝতে পারলেন চলচ্চিত্রটি আসলে তার মাকে নিয়ে।৫ তিনি তার শৈশবের স্মৃতি, সেই সময় এবং সেই অবস্থা আবার অনুভব করতে চেয়েছেন চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। অবুঝ শৈশবে তার মায়ের যে সংগ্রাম তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি সেটিই তিনি উপলব্ধি করতে চেয়েছেন মিরর-এর মাধ্যমে।
তারকোভস্কির বাবা যখন তার মাকে ছেড়ে চলে যান, তখন তার বয়স ছিলো তিন বছর। আর তার বোনের মাত্র দেড়। তখন থেকেই তারা মায়ের কাছে বড়ো হয়েছে। পড়াশোনার খরচ থেকে সবকিছুর জন্যই তারা নির্ভরশীল ছিলো মায়ের ওপর। অথচ সেসময় তাদের কোনো অর্থসংস্থান ছিলো না। কীভাবে তাদের মা ব্যবস্থা করেছেন সবকিছুর! কীভাবে নীরবে করে গেছেন সন্তানদের জন্য! তাছাড়া সেই সময়ে পৃথিবীজুড়ে চলছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তাণ্ডবলীলা। সেই সময়ের একজন একাকী নারীর জীবন কতোটা জটিল, কতোটা দুর্বিষহ ছিলো! তারকোভস্কি মিরর-এ সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চেয়েছেন বার বার। তার শৈশবের সেই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, ধৈর্যশীল, জীবনযুদ্ধে হার না মানা মাকে তিনি আবার দেখতে চেয়েছেন; ছেলে হিসেবে নয়, বর্তমানের একজন পুরুষ হিসেবে প্রচণ্ড সাহসী সেই নারীর জীবনকে তিনি উপলব্ধি করতে চেয়েছেন মিরর-এ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নারী এবং বর্তমানের নারীর জীবনযাপনের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। তার মানে এই নয় যে, নারীর জীবন সহজ হয়েছে। কিন্তু তারা নিয়মের নামে সব অনিয়ম ভাঙার চেষ্টা করছেন; হয়তো অনেকটা ভানই করছেন; কিন্তু সেই ভানটুকুর জন্য যে মানসিক শক্তি দরকার সেটাও এই দীর্ঘ সময়ে নারীদের অর্জন করতে হয়েছে। সেই নারী বাংলাদেশি হোক কিংবা রাশিয়ান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই বলা যায়, অনেক একা মা (সিঙ্গেল মাদার) বর্তমানে সহজ জীবনযাপনের চেষ্টা করছে সমাজের গতানুগতিক চিন্তাকে উপেক্ষা করে। এছাড়া শিক্ষা, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সাহিত্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, বিচার নানা ক্ষেত্রে নারী তার সামর্থ্য তুলে ধরছে। সময়ের সঙ্গে এগুলো নারীকে অর্জন করতে হয়েছে।
তারকোভস্কি হয়তো তার মায়ের মানসিক শক্তিতে চমৎকৃত হয়েছিলেন। কীভাবে ওই সময়ের একজন নারী এতোখানি মানসিক শক্তি দেখালেন! শুধু মানসিকভাবে নয়; শারীরিকভাবেও। তার মাকে অর্থসংস্থানের ব্যবস্থাও করতে হয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় তাকে কাজ করতে হয়েছে। তিনি দীর্ঘ সময় একটি প্রেসেও কাজ করেছেন। সর্বোপরি একজন নারীর এই সক্ষমতাটাকেই তারকোভস্কি হয়তো দেখাতে চেয়েছেন মিরর-এ।
চার.
কেউ যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করে চলচ্চিত্র কী? সহজ উত্তর একটা আছে--চলচ্চিত্র হচ্ছে আয়না, যেখানে জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। যে চলচ্চিত্রটি নিয়ে কথা বলছি, সেটিও একটি আয়না; আসলে একটা আয়না নিয়ে কথা বলছি, যে আয়নায় তারকোভস্কি নয়, নানা মানুষ তার জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজছে। মিরর যারা দেখেছে তাদের অনেকেই নাকি তারকোভস্কির কাছে একটি সাঙ্কেতিক প্রশ্ন করেছে--‘আপনি আমার জীবন জেনে ফেললেন কী করে?’৬ অর্থাৎ দর্শক মিরর-এ তাদের অতীত জীবনের একটি প্রতিবিম্ব দেখেছে, অনুভব করেছে। মিরর দেখার পর দর্শকের কাছ থেকে অসংখ্য চিঠি পেয়েছিলেন তারকোভস্কি। একজন নারী চিঠি লিখেছিলেন এভাবে--
মিরর ছবির জন্য ধন্যবাদ। আমার শৈশব ঠিক ওইরকম ছিল। আপনি কি করে সেটা জেনে ফেললেন? ঠিক ওইরকম বাতাস আর ঝড় ছিল ...। ... আপনার ছবি কী সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছে একটি শিশুর মধ্যে এই চেতনার জেগে ওঠা, এই ভাবনাটা ... হা ঈশ্বর! কী নিখুঁত সত্যি ...। ... জানেন, ওই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে, আপনার প্রতিভায় আলোকিত এক টুকরো ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে, জীবনে প্রথম মনে হল আমি একা নই ...।৭
তারকোভস্কি শুধু গল্পটুকু নয়, অনুভূতির সবটুকু প্রতিফলন মিরর-এ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। শুধু মিরর-এর কারণে একজন মানুষ জীবনের এতোগুলো বছর পরে অনুভব করতে পেরেছেন, তিনি একা নন; তার যে জীবন, তার যে কষ্ট, এগুলো শুধুই তার একার নয়। অথচ নির্মাতা হিসেবে তারকোভস্কি কখনোই তার কাজ দিয়ে দর্শক ধরে রাখার কথা ভাবতেন না। বরং তার চলচ্চিত্র দেখার পর এক ধরনের দুর্বোধ্যতা কিংবা বোঝা না বোঝার ভাব চলে আসে; মনে হয় যেনো অনেক কিছু বোঝার আছে; যেনো কিছু একটা পাওয়া যাবে; এমন কিছু যা আপনি অনেক দিন ধরে খুঁজছেন। মিরর নিয়েও এমনটাই হয়েছে।
পাঁচ.
সংলাপ, কবিতা, দৃশ্য সবমিলিয়েই মিরর চলচ্চিত্র হিসেবে দর্শকের মনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। চলচ্চিত্রের সূচনা দৃশ্যটিই যেনো একটা সূত্র বহন করছে দর্শকের জন্য। দৃশ্যটি এমন--একটি ছেলে চিকিৎসকের শরণাপণ্ন হয়; সমস্যা, তার কথা জড়িয়ে যায়; অর্থাৎ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সে তার কথা অন্যকে বোঝাতে পারে না। অনেক চেষ্টার পরও চিকিৎসকের সঙ্গে কথোপকথনে সমস্যা হচ্ছিলো তার; কিন্তু শেষপর্যন্ত সে কথা বলতে সমর্থ হয়। দৃশ্যটি দিয়ে শুরুতেই হয়তো নির্মাতা এটা জানান দিতে চান, একজন মানুষের আবেগ, অনুভূতি অন্য মানুষকে বোঝানো কঠিন। এছাড়া কোনো যোগাযোগই শুরুতে স্বতঃস্ফূর্ত হয় না, সময় দিতে হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগকে এই অর্থেই কঠিন বলে জ্ঞাপন করা হয়। অবশ্যই এই আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ কঠিন কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়; মিরর নির্মাণ ও তা দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তারকোভস্কি হয়তো এটিই প্রমাণ করেছেন। তারকোভস্কির অন্যান্য চলচ্চিত্র থেকে মিরর সামগ্রিক গঠনে বেশ জটিল এবং পাকানো।৮ আবার একইসঙ্গে বলা যায়, মিরর অকপট, সরল গল্প। সবমিলিয়ে মিরর-এর গল্প সরল কিন্তু এর কাঠামো জটিল; ঠিক যেমন মানুষের জীবন।
মানুষের সবার জীবনের গল্পই সরল। সেই সরল গল্পের কখনো কখনো জটিল কাঠামো তৈরি করে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার কিংবা কখনো ব্যক্তিমানুষ নিজে। ফলে জটিল হতে হতে মানুষ এতোটাই জটিলতায় ডুবে যায় যে, কোনোকিছুই আর সরল করে দেখা হয় না। মানুষ সবকিছুতেই জটিলতা খোঁজে, সে জীবনের গল্প হোক কিংবা চলচ্চিত্র! মিরর নিয়ে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ উঠলেও তারকোভস্কি এটাকে খুবই সরল গল্প বলে দাবি করেন এবং মিররকে খুব বেশি বোধগম্য করার প্রয়োজনও তিনি অনুভব করেননি।৯ মিরর দেখার পর অনেক দর্শকই তার সঙ্গে একমত হয়েছিলো। তারা বুঝতে পারলো, এখানে আসলেই কোনো ধাঁধা নেই; যে দৃশ্য, ছবি, সংলাপ এমনকি যে শব্দ পর্দায় ব্যবহার হয়েছে সবকিছুই বাস্তব থেকে আসা। চলচ্চিত্রটি দেখার পর এর অনেকগুলো দৃশ্যই দর্শক হিসেবে লেখককেও নাড়া দেয়।
আবারও সেই সূচনা দৃশ্যেই ফিরে আসা যাক। চিকিৎসকের প্রচেষ্টায় শেষপর্যন্ত ছেলেটি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ এখানে চিকিৎসক, ছেলেটির কথা স্বাভাবিকভাবে না বলতে পারার যে জটিলতা, সেটিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করেন এবং চাইলেই এই জটিলতাকে খুব সহজে পরাস্ত করা যায়, তা ছেলেটিকে বোঝাতে সমর্থ হন। ফলে ছেলেটির মধ্যে একধরনের আত্মবিশ্বাস জন্মে, যা তাকে শেষপর্যন্ত সফল করে। কখনো কখনো কোনো মানুষের সফলতার জন্য অন্য মানুষের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সেই সহযোগিতা সেই মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। এজন্যই মানুষ সমাজে, পরিবারে বাস করে; একে অন্যের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সবসময় সমাজ কি এই সহযোগিতাটুকু করে? এই আত্মবিশ্বাসটুকু জন্মাতে সাহায্য করে! নাকি মানুষের অক্ষমতা নিয়ে হাস্যরসাত্মক গল্প বানাতেই সমাজ বেশি পারদর্শী!
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যাদের নিজেকে, নিজের যোগ্যতাকে তথাকথিত সমাজের কাছে প্রমাণ করতে করতেই জীবন শেষ করতে হয়। অনেকে তো প্রমাণের সেই সুযোগটুকুও পায় না। যেমন, কোনো মানুষের (ছেলে হোক কিংবা মেয়ে) যদি শারীরিক কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে, তাহলে সমাজের কিছু ‘সুস্থ’ শারীরিক গঠন সম্পন্ন মানুষ ধরেই নেয়, এই কাজ ওকে দিয়ে হবে না, ও পারবে না কিংবা তাকে দিয়ে এটা সম্ভবই হবে না। এমনকি তার পরিবারও ঠিক একইভাবে চিন্তা করে; তাকে তার নিজেকে প্রমাণের সুযোগও দেওয়া হয় না। তখন সেই মানুষটির মনের ওপর যে চাপ পড়ে, তা কেবল ওই মানুষটিই ব্যাখ্যা করতে পারবে, অন্য কেউ নয়! যখন বাবা বিশ্বাস করে না, তার মেয়ে কখনো একা রাস্তা পার হতে পারবে; যখন মা বিশ্বাস করে না, কখনো তার মেয়ে রান্না করতে পারবে; যখন সমাজ বিশ্বাস করে না, এই মেয়ের ভালো ঘরে বিয়ে হবে; তখন সেই মেয়েটি কী করবে! কীভাবে নিজেকে প্রমাণ করবে! তখন কি সমাজের নিয়মে, পরিবারের নিয়মেই চলবে! নাকি পরিবার আর সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে সে নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণ করবে!
মিরর-এ যে নারীকে সংগ্রাম করতে দেখা যায়, তা তিনি করতে পেরেছেন শুধু তার ইচ্ছাশক্তির জোরে, তিনি সমাজ, রাষ্ট্রের কথা ভাবেননি; ভাবেননি কারও কোনো কটু কথা নিয়ে। তিনি শুধু তার সন্তানদের কথা ভেবেছেন। তিনি তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করেছেন ঠিকই, কিন্তু হাত গুটিয়ে বসে থাকেননি। নিজের মতো করে গুছিয়ে নিয়েছেন যতোটা পেরেছেন। আর যদি তিনি এতো কিছু ভাবতেন, তাহলে হয়তো যা করেছেন, তা কখনই করতে পারতেন না।
তথাকথিত এই সমাজে বার বার নারীকেই কেবল প্রমাণ দিয়ে যেতে হয়; তারপরও সে যেনো প্রমাণিত নয়। যদি কোনো নারী একান্তভাবে কোনো পুরুষকে বিশ্বাস করে, আর সেই পুরুষ যদি বিশ্বাস ভাঙে, তাহলে তার দায় নারীটির ওপরই বর্তায়। কারণ সমাজে বিশ্বাস করাটাই অপরাধ, বিশ্বাস ভাঙা নয়। যদি কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হয়, তাহলে দোষ হয় তার পোশাকের, চলাফেরার। সবার আগে প্রশ্ন ওঠে নারীটিকে নিয়েই, এখানে পুরুষের মানসিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না! প্রশ্ন ওঠে না, এই প্রশ্নগুলো কেবল নারীকেই কেনো করা হবে? কেবল সে একজন নারী এইজন্য?
মিরর-এর ৩০ মিনিটে এমনই এক দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে নারীটির বর্তমান অবস্থার জন্য সম্পূর্ণভাবে তাকে দায়ী করে তারই বান্ধবী, যে নিজেও একজন নারী। সেই বান্ধবী ওই নারীকে বলেন, তার জীবন এখন পিপাসার্ত পথিকের মতো এবং তিনি চাতকের মতো পানির আশায় বসে আছেন। তখন ওই নারী বিচলিত হয়ে পড়েন এবং বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে গায়ে পানি ঢালতে থাকেন। একসময় লক্ষ করেন, ঝরনার পানি পড়ছে না, তখন তিনি ভাবেন বান্ধবীর কথাই হয়তো ঠিক; তিনি আসলেই চাতকের মতো পানির অপেক্ষায় আছেন। এই সময় তার মুখে খানিক হাসির আভা দেখা যায়; যে হাসি ছিলো করুণ আর তাচ্ছিল্যে ভরা। সেই হাসিতে লুকিয়ে ছিলো কোনো এক কঠিন জীবনের সহজ অর্থ। সেই অর্থ হয়তো কিছুটা এ রকম যে--দায়িত্বও তাকে নিতে হবে আবার সব ভুলও তারই ধরা হবে। তাকেই সব প্রশ্ন করা হবে, কিন্তু তার উত্তর শুনতে সবাই নারাজ! এভাবেই ওই নারী বার বার হতাশ হয়েছেন, কখনো হয়েছেন হতবুদ্ধি; কিন্তু কখনো থেমে যাননি। কারণ থেমে থাকার নাম জীবন নয়!
তারকোভস্কিও তার মায়ের গতিহীন এই পথচলার ছায়া ফেলেছেন মিরর-এ। সেই ছায়ায় সামান্য ছেদও তিনি ফেলতে চাননি। তিনি চেয়েছেন বাস্তবে যা ঘটেছে তাই যেনো তিনি দেখাতে পারেন। নির্মাণ পরবর্তী সময়ে একবার তার মনে হয়েছিলো, একটা চিত্রনাট্য তার লেখা উচিত ছিলো। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ভাবলেন, নিজে থেকে কিছু বানাতে যাবেন না। ফলে মিরর-এ তিনি তার মাকে তুলে আনেন বাস্তবের মায়ের মতো করেই। মায়ের মুখের সেই ভাব, চাহনি, শঙ্কা, লজ্জা সব ঠিক সেভাবেই পর্দায় এনেছেন নির্মাতা।
চলচ্চিত্রের ৪৯ মিনিটে পর্দায় দর্শক সেই ভাব, লজ্জা, শঙ্কাময় একটি মুখ দেখতে পায়, যার কোনোকিছুতেই কোনোধরনের কৃত্রিমতা ছিলো না। তারকোভস্কি তার মায়ের ওই আগমন দস্তয়ভস্কি বা মারমায়লাদোরভার কোনো চরিত্রের মতো দেখাতে চেয়েছিলেন।১০ তার নিজস্ব একটি সত্তার বিশেষ অবস্থা, নৈরাশ্য, আত্মিক প্রতিবন্ধকতা এই বিষয়গুলোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তারকোভস্কির কাছে।
শেষপর্যন্ত কিন্তু ওই নারী তার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। তিনি হাল ছেড়ে দেন না; তার সর্বস্ব ত্যাগ করে হলেও, তার শখের কানের দুল বিক্রি করে হলেও তিনি তার সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পিছু হটেননি; আবার মুখে হাসি মেখে সেই কষ্ট সন্তানের কাছ থেকে লুকাতেও ভুলে যাননি। মিরর-এর শেষ দৃশ্যটি এ রকম কিছুই ব্যাখ্যা করে। দৃশ্যটির একটি ভাগে দেখা যায়, ওই নারীকে তার স্বামী অনাগত সন্তানের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। অন্যদিকে একজন নারী (তারকোভস্কির মা আরো একবার পর্দায় আসেন) দুই শিশুকে নিয়ে দূরে কোথাও হাঁটতে শুরু করেন; তার এই একাকী পথ চলায় কোনো জড়তা ছিলো না। আর জড়তা থাকবেইবা কেনো! শেষপর্যন্ত নারীকেই তার সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয় আর পুরুষ শুধু অনাগত সন্তানের স্বপ্নই দেখিয়ে যায়। আর এটা ভেবেই হয়তো ওই নারী শেষ দৃশ্যে শেষবার সেই তাচ্ছিল্যের হাসিটি হাসেন।
তাছাড়া স্বামীর সঙ্গে ওই নারীর যে কয়বার কথোপকথন হয় সেসব দৃশ্যে স্বামীর মুখ দেখানো হয় না; কারণ উনি তার জীবনে হয়তো ওই পুরুষের অস্তিত্ব খুব একটা অনুভব করেন না। স্বামীর সঙ্গে প্রতিটি কথায় যেনো তার চাপা ক্ষোভ প্রকাশ হতে থাকে। সেই ক্ষোভ তার নিজের একাকিত্বের জন্য, তার সন্তানদের বাবাকে কাছে না পাওয়ার জন্য; দেশকে আপন ভেবে পরিবারকে পর করে দেওয়ার জন্য। তবে দেশ আর পরিবার তো আলাদা কিছু নয়; হাজার পরিবারের সমন্বয়েই তো একটা দেশ। সেই হাজারো পরিবারকে বাঁচাতেই তো দেশের জন্য লড়াই করে সৈনিকেরা। তাহলে মিরর-এ যে পরিবারকে দেখা যাচ্ছে তারা কেনো একাকিত্বের বেদনায় জর্জরিত! এ দায় কার! ব্যক্তিমানুষের নাকি মানুষের সমন্বয়ে যে রাষ্ট্র গঠিত তার!
ছয়.
এইসব আলোচনার মধ্যে যে বিষয়গুলো বার বার এসেছে তা মূলত একজন সাহসী নারীর সংগ্রামী জীবন, নানা রকম জটিল এবং কঠিন সময়ের মধ্যে তার সন্তানদের বেড়ে ওঠা; স্বামীর প্রতি চেপে রাখা ক্ষোভ এবং সন্তানদের মনে বাবার অভাববোধ থেকে তৈরি হওয়া থেকে ক্ষোভ। কিন্তু এসবের অন্তরালে আরো একটি বিষয় মিরর-এ আছে। সেটি হচ্ছে একজন স্বামী, একজন বাবা এবং একজন সৈনিকের একান্ত কিছু কথা; কিছু অনুভূতি।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা চার মিনিটে হাতে ব্যাগ নিয়ে ব্যারাক থেকে এক কিশোর বের হয়ে একটি গাছের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। হয়তো গাছটি পরিবারের প্রতীক, যে ডালপালা মেলে মাটিতে শিকড় গেড়েছে। ঠিক তখনই হঠাৎ তার মাথায় একটা পাখি উড়ে এসে বসে। সে হাত দিয়ে পাখিটিকে স্পর্শ করে। তারপর এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটে লেখক (যাকে মিরর-এ একটি রূপক চরিত্রে আনা হয়েছে; মূলত তিনি তারকোভস্কির বাবা) যখন মারা যান, তার ঠিক আগে তার হাতের মুঠো থেকে একটা পাখি উড়ে যায়।
এই পাখিটি হয়তো একজন সৈনিকের অনুভূতির প্রতীক, তার দায়িত্বের প্রতীক। যে দায়িত্ব আমৃত্যু বহন করে যেতে হয়েছে তাকে; কখনো ইচ্ছায় কখনোবা অনিচ্ছায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেই পাখিকে তিনি ছাড়তে পারেননি। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি খেয়াল করলেন, বনের পাখির যত্নে এতোই ব্যস্ত ছিলেন যে, তার মনের পাখি কবে খাঁচা থেকে বেরিয়ে বনে চলে গেছে সে খবরও পায়নি তার মন! তাকে স্বামী এবং বাবার দায়িত্ব ভুলে থাকতে হয়েছে কিংবা ভুলে থেকেছেন শুধু সৈনিকের দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি দেশের জন্য তার পরিবারকে ভুলেছেন, ভুলেছেন সম্পর্ক। কিন্তু আসলেই কি ভুলতে পেরেছেন! এক ঘণ্টা ছয় মিনিটে যখন তিনি তার সন্তানদের জড়িয়ে কাঁদেন, তখন তার গায়ে সৈনিকের পোশাক ছিলো। তখন একজন সৈনিক বাবা কাঁদছিলেন; কিন্তু কেনো কাঁদছিলেন! বাবা হয়ে সন্তানদের পাশে থাকতে না পারার কষ্টে নাকি সৈনিকের পোশাকের আড়ালে একজন বাবার অস্তিত্ব ঢাকা পড়ার লজ্জায়!
দেশের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে করতে নিজের অজান্তেই পরিবারের প্রতি অবহেলার গ্লানি তার হয়তো আমৃত্যু ছিলো। স্ত্রী, সন্তানদের আপন করতে না পারার কষ্ট ছিলো তার। কিন্তু যখন তার বুকের কষ্ট মুখে আনার ইচ্ছে হলো, তখন সময়টুকু ছিলো না। সময় সবচেয়ে বড়ো নিয়ন্ত্রক। মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় সময়ের দ্বারা। তাই কেউ যদি সময়ের কাছে হেরে যায়, তাহলে জীবনের কাছেও হেরে যেতে হয়; জিতে যায় কেবল সে, যে সময়কে ধরে রাখতে জানে, বেখেয়ালে হারাতে দেয় না।
সাত.
আন্দ্রেই তারকোভস্কি তার নিজস্ব চিন্তা ও ভাবকে কবিতার মতো মানে কবি যেমন তার সব আবেগ শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ করে, ঠিক তেমনই করে প্রকাশ করেছেন সেলুলয়েডে। তার চলচ্চিত্র যেনো এক একটা কবিতা! এজন্যই তিনি চলচ্চিত্রের কবি হিসেবেই খ্যাত। বিশ্বচলচ্চিত্রের আরেক দিকপাল বার্গম্যান তারকোভস্কি সমন্ধে বলতে গিয়ে নিজের প্রসঙ্গ টেনে দ্বিধাহীনভাবে বলেন, তিনি তার কাজ দিয়ে সারা জীবন স্বপ্নের দরজায় কড়া নেড়েছেন কিন্তু তারকোভস্কি তার কাজ দিয়ে গভীর আত্মপ্রত্যয় এবং নির্দ্বিধায় সেখানে প্রবেশ করেছেন।১১ তার মতে, তারকোভস্কি স্বপ্নকে ছুঁয়ে দিতে পেরেছিলেন তার কাজের মাধ্যমে। ফরাসি নির্মাতা অলিভিয়ার আসাইয়াস মিররকে স্বপ্নের মতো সত্য চলচ্চিত্র বলেছেন।১২ আসলে স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থেকেই হয়তো কিছু স্বপ্ন পূজারি মানুষ চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হয়। তারপর তারকোভস্কির মতো হয়তো আরো অনেকেই সেই স্বপ্নের সিঁড়িগুলো একের পর এক অতিক্রম করতে থাকে কাজের মাধ্যমে।
প্রায় প্রতিটি মানুষ তার অতীত নিয়ে বেদনাহত এবং ভবিষ্যতের চিন্তায় অস্থির এক বর্তমানে বাস করে। বর্তমান জুড়ে অতীত আর ভবিষ্যতের বসবাস। মানুষ চাইলেও হয়তো বর্তমান থেকে অতীতের ছাপ মুছে ফেলতে পারে না, তেমনই পারে না ভবিষ্যতের চিন্তা দূর করতে। প্রত্যেক মানুষের ভিতরে এমন একটা আয়না আছে যে আয়না একইসঙ্গে এই তিনটি সময়কেই ধারণ করে। তাই বার বার মনে হয় সময়ই আয়না, মুহূর্তগুলো এক একটা টুকরো আয়না। মিরর-এ বার বার সেই টুকরো আয়নায় নারীর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। একজন নারী কোনো পুরুষকে প্রত্যাখ্যান করছে; স্বামীর জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করছে; সামাজিক-অর্থনৈতিক নানা সমস্যায় পড়ছে; তারপরও সন্তানদের আঁকড়ে ধরে আছে; কিন্তু কেনো!
প্রকৃতি বোধ হয় নারীদের মধ্যে লড়াই করার এক বিস্ময়কর ক্ষমতা উজাড় করে দিয়েছে; আর সেই ক্ষমতার বলেই একজন নারী নিজের সঙ্গে নিজে লড়াই করে চলে প্রতিনিয়ত! মাঝে মধ্যে মনে হয় এই সমাজে নারী হওয়া বড়ো কঠিন! কোনো একটা পোশাক কেনার আগে কে কী বলবে ভাবতে হয়! লিপস্টিক লাগানোর আগে ভাবতে হয় রঙটা কী একটু বেশি গাঢ় হয়ে গেলো! একজন নারী রাস্তায় চলার সময় পুরুষের সঙ্গে ধাক্কা লাগলেও তাকে বুঝতে হয় ধাক্কাটা কী ইচ্ছাকৃত ছিলো! পুরুষের দৃষ্টির দিকে না তাকিয়েই তাকে বুঝে নিতে হয় সেই দৃষ্টির মানে!
মিরর দেখার পর একজন নারী হিসেবে এতোটুকু উপলব্ধি হয়েছে যে, এই লড়াই কেবল নিজের সঙ্গে করলেই চলবে না; প্রয়োজনে ব্যক্তি, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও করতে হবে। একা কেউ বাঁচে না কথাটা ভুল, বাঁচতে হলে একাই বাঁচতে হয়। আপনার জীবন আপনাকেই যাপন করতে হবে, আপনার লড়াই আপনাকেই লড়তে হবে; আপনার সিদ্ধান্ত, আপনার দায়িত্ব আপনাকেই নিতে হবে। আপনি কী পোশাক পরবেন, কী রঙের লিপস্টিক কতোটুকু লাগাবেন; কেউ ইচ্ছাকৃত ধাক্কা দিলে আপনি তার প্রতিবাদ করবেন নাকি মুখ বুজে সহ্য করবেন, সে সিদ্ধান্ত শুধুই আপনার। এবং আপনাকে আরো মনে রাখতে হবে আপনি শুধু আপনার কাছেই নিরাপদ; আপনার নিরাপত্তার দায়িত্বও আপনার। অন্য কারও হওয়ার আগে আপনাকে আপনার হতে হবে! নিজের আয়নায় আগে নিজেকে সাজাতে হবে! নারী যেদিন নিজের আয়নায় পুরোপুরি নিজস্ব প্রতিচ্ছবি আঁকতে পারবে সেদিনই কেবল সমাজের আয়নায় নারীর যথাযথ রূপ প্রতিফলিত হবে! প্রতিটি নারী হয়ে উঠুক প্রতিবাদী নারী; প্রতিটি মা হয়ে উঠুক মিরর-এর সেই সাহসী মা!
লেখক : রোকসানা আরশি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
rokshanaarshi339@gmail.com
https://www.facebook.com/rokshana.arshi.7
তথ্যসূত্র
১. তারকোভস্কি, আন্দ্রেই (২০১১ : ৬৩); আন্দ্রেই তারকোভস্কি; অনুবাদ : প্রবীর মিত্র; সম্পাদনা : অস্ট্রিক আর্যু; বাঙলায়ন, ঢাকা।
২. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৫)।
৩. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৭-৬৮)।
৪. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৭)।
৫. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৯)।
৬. তারকোভস্কি, আন্দ্রেই (২০০৮ : ৫২); তারকোভস্কির ঘরবাড়ি; সম্পাদনা ও অনুবাদ : পরিমল ভট্টাচার্য; অবভাস, কলকাতা।
৭. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০০৮ : ৫১)।
৮. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৪)।
৯. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ২৫)।
১০. প্রাগুক্ত; তারকোভস্কি (২০১১ : ৬৫)।
১১. ঘোষ, রবিন (২০০৭ : ৭); ‘প্রসঙ্গ : আন্দ্রেই তারকোভ্স্কি’; আন্দ্রেই তারকোভস্কি চলচ্চিত্র ও শিল্পভাবনা; সম্পাদনা : রবিন ঘোষ, বিজ্ঞাপনপর্ব; কলকাতা, ভারত।
১২. আসাইয়াস, অলিভিয়ের (২০০৭ : ৪৩); আন্দ্রেই তারকোভস্কি চলচ্চিত্র ও শিল্পভাবনা; সম্পাদনা : রবিন ঘোষ; বিজ্ঞাপনপর্ব, কলকাতা, ভারত।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন