Magic Lanthon

               

তনি সুভংকর

প্রকাশিত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ধারাবাহিক পাঠ

চিত্রকলা থেকে চলচ্চিত্রকলা

তনি সুভংকর


দর্শক হিসেবে সিনেমা দেখাটা আমার সেই ছোটো থেকেই; মানে শুক্রবারে বিটিভি’তে তিনটার পরে যা শুরু হতো; তা সে যে সিনেমাই হোক। সিনেমাহলে খুব ছোটোবেলায় দুই--একবার গিয়েছিলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে, সেটাও পূজায়। আর একা সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখা হাইস্কুল থেকে শুরু হয়েছিলো। তবে তা পুরোটা সিনেমা হিসেবে একদমই নয়, স্রেফ নগ্নতা দেখার জন্য। সময়টা ২০০৬-২০০৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে। তখন পটুয়াখালী শহরে তিনটা সিনেমাহল ছিলো--‘মুকুল’, ‘রুপালি’ আর ‘তিতাস’। সবগুলোতেই চলতো সেইসব সিনেমা। পাড়ার মোড়ে মোড়ে পোস্টার দেখে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বন্ধুরা মিলে মাঝে মধ্যেই যেতাম সেইসব সিনেমা দেখতে। এখন বুঝি তখন বয়সটা একটা ব্যাপার ছিলো ওইসব সিনেমা দেখার জন্য। এখন অবশ্য ‘মুকুল’ ও ‘রুপালি’ বন্ধ হয়ে গেছে। ধুঁক ধুঁক করে চলছে ‘তিতাস’; শহরে সিনেমার পোস্টারও আর চোখে পড়ে না।

২০০৮-২০০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে আমি প্রথম একটা অন্যরকম সিনেমা দেখি। সেটা অবশ্য সিনেমাহল কিংবা টেলিভিশনে নয়, ডেস্কটপ কম্পিউটারে। এই প্রথম কোনো সিনেমা আমাকে একটা ভিন্ন রকমের অনুভূতি দিয়েছিলো। সিনেমাটা দেখার পর মনের মধ্যে কেমন জানি করেছিলো, সেটা এখন ঠিক বোঝাতে পারবো না। তবে তখনো নাম মনে রাখার মতো সখ্যতা সিনেমার সঙ্গে আমার তৈরি হয়নি। এরপর থেকে অবশ্য ভালো-খারাপ অনেক সিনেমাই আমার দেখা হয়েছে। দুই বছর বিরতি দিয়ে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে সেই সিনেমাটা আমার সামনে আবার চলে আসে। এবার সেটার নাম আমি আমার মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে নিই--ঋতুপর্ণ ঘোষের অন্তরমহল।

এর পর থেকে ঋতুপর্ণের এই সিনেমা আমি অনেকবার দেখেছি। আমি বোঝার চেষ্টা করেছি কেনো এই সিনেমা আমার এতো ভালো লাগে! কেনো বার বার দেখেও বিরক্তি আসে না! দিনের পর দিন সিনেমাটা দেখে একপর্যায়ে আমি বুঝতে পারলাম, সিনেমাটি জুড়ে যে রঙের ব্যবহার সেটাই আমার পছন্দের অন্যতম কারণ। এর বাইরে সিনেমাটার প্রতিটি শটে প্রত্যেকটি ইমেজে যা-ই ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো এতো অসাধারণভাবে দেখানো হয়েছে যে, তা আমাকে মুগ্ধ করে--এক কথায় অপূর্ব।

তখনো আমি আসলে জানি না/বুঝি না সিনেমায় শিল্পনির্দেশনা বলে কোনো জিনিস আছে কিংবা প্রোডাকশন ডিজাইনইবা কী জিনিস। তো এই সব বিষয় নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি একটু করে বুঝতে শুরু করি। ঠিক সেই সময় আমার সামনে আসে আরেকটি সিনেমা গয়নার বাক্স। অপর্ণা সেনের এই সিনেমার শিল্পনির্দেশনায় ছিলেন তন্ময় চক্রবর্তী নামে একজন। এটা ছিলো ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। আমি তখন খানিকটা বুঝে গেছি শিল্পনিদের্শনা কী। ফলে গয়নার বাক্স-এর শিল্পনির্দেশক হিসেবে তন্ময় চক্রবর্তীর নাম দেখে আমি তাকে খোঁজার জন্য গুগল সার্চ করে একাকার অবস্থা! পরিস্থিতি এমন হলো যে, তাকে ঠিক ওই মুহূর্তে না পেলে আমার যেনো চলবেই না! এই আকাঙ্ক্ষায় অবশ্য কাজ হয়, পেয়ে যাই তাকে। এবং ফেইসবুকের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি। মেসেঞ্জারে আমাদের মধ্যে কথা হতে থাকে, তবে সেটা হাই-হ্যালো, শুভ সকাল পর্যন্ত। এভাবেই চলে বেশ কিছুদিন। একপর্যায়ে তার কাছে আমি শিল্পনির্দেশনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করি। আমার আগ্রহ দেখে তিনিও কমবেশি উৎসাহ ও সাহস দিতে থাকেন। এভাবে চলতে চলতে আমি একদিন তাকে সাহস করে বলে ফেলি, ‘স্যার আমি আপনার কাছে কাজ শিখতে চাই’। উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘আগে লেখাপড়া শেষ করো, তারপর এখানে চলে আসো, সমস্যা হবে না’।

এই সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি দেশি-বিদেশি প্রচুর সিনেমা দেখার সুযোগ পাই সিনেমাবিষয়ক পত্রিকা ও সংগঠন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে। আমি প্রতি সপ্তাহে তাদের বিশাল সিনেমাভাণ্ডার থেকে পেনড্রাইভে করে নানা দেশের, নানাধরনের সিনেমা এনে দেখতে শুরু করি। এভাবেই চলছিলো, একদিকে নিয়মিত সিনেমা দেখা; অন্যদিকে তন্ময় চক্রবর্তীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা চালাচালি। এরই মধ্যে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক জীবনের ইতি টানি মানে অনার্স শেষ করে ফেলি। এরপর তন্ময় চক্রবর্তীর সেই আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তার সঙ্গে কথা বলে শিল্পনির্দেশনায় হাতেকলমে শিক্ষা নেওয়ার জন্য কলকাতায় চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করি। তন্ময় স্যারও আমার এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান; আমাকে কলকাতায় চলে আসতে বলেন। আমি তখন যেকোনো কিছুর বিনিময়ে কলকাতায় যাওয়ার জন্য পাগলপ্রায়! ব্যবস্থাও হয়ে যায়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে আমি টুরিস্ট ভিসা নিয়ে চলে যাই টালিগঞ্জে।

তো কলকাতায় পৌঁছে কোনোকিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি রাজদ্বীপ ঘোষের সিনেমা ‘শুভ শারদীয়’র শুটিংয়ে কাজ শুরু করি। এই সিনেমার কাজ শেষ হতে না হতেই অপর্ণা সেনের ঘরে বাইরে আজ-এর প্রিপ্রোডাকশনের কাজ শুরু হয়। একই সঙ্গে দ্য ডেড ম্যানস মাউন্ড নামে একটি যৌথ প্রযোজনার ইংরেজি ভাষার সিনেমার জন্য কথা চলতে থাকে। ওটার নির্মাতা ছিলেন চন্দ্রদ্বীপ দাশ। আমি তন্ময় দাদার কথা মতো সেটাতেও কাজ শুরু করি। ততোদিনে অবশ্য আমি স্যার থেকে তন্ময় দাদা ডাকতে শুরু করেছি। ওখানে গিয়ে দুই-একদিনের মধ্যেই বুঝেছিলাম স্যার ডাকার চল এখানে নেই। বরং প্রথম যখন আমি তন্ময় দাকে স্যার ডাকতাম ওরা হাসাহাসি করতো, ফলে পরে দাদা ডাকতে শুরু করি।

দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন-এর সেটে লেখক (ডানে) ও অন্যান্য কলাকুশলীরা

যাইহোক নিকিতা (Nikita Ivanenko) নামে একজন লেখকের ‘দ্য ডেড ম্যানস মাউন্ড’ নামে গল্প নিয়ে একই নামে সিনেমাটার স্ক্রিপ্ট করা হয়েছিলো। সুইডেন ও হলিউড যৌথভাবে সিনেমাটা প্রযোজনা করছে। এর প্রোডাকশন ডিজাইনের কাজ করার কথা ছিলো আমাদের। এজন্য আমাদের দলে সবাইকে ইংরেজিতে লেখা বিশাল এক স্ক্রিপ্ট ধরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা সারাদিন সেটা নিয়ে পড়াশোনা, আলোচনা করি আর প্রতিদিন বিকেলে স্কাইপ-এ ডিরেক্টরসহ ওই সিনেমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশের টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলি। অবশ্য এই সিনেমাটার শুটিং এখনো শুরু হয়নি, প্রিপ্রোডাকশন এখনো চলছে। এভাবেই শুরু থেকে কলকাতায় চরম ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে চলছিলো আমার সবকিছু।

তবে পেশাগতভাবে রীনা দি মানে অপর্ণা সেনের ঘরে বাইরে আজ সিনেমার মধ্য দিয়ে আমি প্রবেশ করি টালিগঞ্জ পাড়ায়। এটা আমার সারাজীবনের জন্য একটা বড়ো পাওয়া। সিনেমাটিতে কাজ করে আমার নানা রকম অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। চিত্রকলা নিয়ে লেখাপড়ার কারণে কাজের বোঝাপড়ায় আমাকে খুব যে সমস্যা পোহাতে হয়েছে এমন নয়। তবে সিনেমা বলে কথা! আর আমাদের কাজও ক্যামেরার পিছনে। তাই অতো সহজও ছিলো না কাজটা, যতোটা সহজেই মুখে বলে ফেললাম। এর পর দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন, পাসওয়ার্ড, লক্ষ্মী ছেলে--এসব সিনেমাতে পুরোদমে আমার কাজ চলতে থাকে। এছাড়া আরো কিছু সিনেমায় কমবেশি আমার অংশগ্রহণ ছিলো। এর মধ্যে অন্যতম জ্যেষ্ঠপুত্র, গুপী গাএন। আরো কিছু বিজ্ঞাপন ও ওয়েব সিরিজসহ বেশকিছু কাজ করে ফেলেছিলাম অল্প সময়ের মধ্যে। অনেক নির্মাতা, অনেক সিনেমা, অনেক প্রোডাকশন। সবার সঙ্গেই ভালো-মন্দ নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। পাশাপাশি আস্তে আস্তে শিল্পনির্দেশনা শিখতে থাকা; এর মধ্যে দেশেও কিছু কাজ করেছি আমি--অমিতাভ রেজার রিকশাগার্ল।

আমি যেহেতু অন্য দেশ থেকে টালিগঞ্জে গিয়েছি, তাই প্রথম দিকে কিছু সমস্যা যে একেবারেই ছিলো না, এমন নয়। এর মধ্যে ছিলো ভাষা, নতুন জায়গা এবং কাজ সম্পর্কে একেবারে শূন্য অভিজ্ঞতা। এছাড়া সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কিছু বিষয় তো আছেই। তবে এগুলোর কোনোটাই আমাকে খুব বেশি সমস্যায় ফেলতে পারেনি। ধীরে ধীরে সবকিছুই কেটে যাচ্ছিলো। আসলে সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার চেয়ে আমি তখন শেখা নিয়ে চরম ব্যস্ত; তার মানে শিখছিলাম। কাজ করে করেই আসলে শেখাটা পোক্ত হয়। তবে সিনেমার শিল্পনির্দেশনা নিয়ে প্রথম দিকে যে ধারণা ছিলো, সেটা এইসব কাজের মধ্যে দিয়ে মনে হয় কিছুটা হলেও এখন আমার কাছে পরিষ্কার। তারপরও নিরন্তর শেখার কাজ চলছে, চলবে।

আমি সুভংকর; তনি আমার ডাকনাম; এবং দুইটা মিলে তনি সুভংকর। স্বপ্নের পথযাত্রাটা খুব ভালো এবং খানিকটা সহজই ছিলো আমার জন্য। তবে সময়টা কিন্তু কম ছিলো না; সেই ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হয়ে প্রথম পর্ব শেষ হয় ২০১৮-এর মাঝামাঝিতে। ফলে লম্বা সময় ধরে একটা স্বপ্ন এবং আশা মনের মধ্যে পুষে রেখে এগিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। তার পর কিন্তু স্বপ্নটা বাস্তবের হাত ধরে। এই কাজে মায়ের অনেক সমর্থন ও বিশ্বাস ছিলো আমার প্রতি। তাই পথচলাটা খুব একটা জটিলতার সামনে পড়েনি কখনো। এইসব কিছু আমি জানাতে চাই।

এই লেখা এক তরুণ শিল্পনির্দেশকের পথচলার কথা বলবে। আমার কাজের অভিজ্ঞতা ধারাবাহিকভাবে এতে তুলে ধরার ইচ্ছে আছে। মূলত এভাবেই আমার শিল্পনির্দেশনার যাত্রাটা টালিগঞ্জে পৌঁছায়; আর সিনেমার যাত্রাটা শুরু হয়।

(চলবে)

লেখক : তনি সুভংকর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে চিত্রকলায় স্নাতক করেছেন। বর্তমানে চলচ্চিত্রের শিল্পনির্দেশনায় কাজ করছেন।

tonisuvanker@gmail.com

https://www.facebook.com/bhadratoni

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন