Magic Lanthon

               

মামুন হুসাইন

প্রকাশিত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

তারেক মাসুদ : অনন্তকাল ও ক্ষীণকাল

মামুন হুসাইন


আজকের এই সভার সম্মানিত সভাপতি--প্রচলিত অর্থে সভাপতির নাম ঘোষিত হয়েছে কি না স্মরণ করতে পারছি না। এই সমাবেশে উপস্থিত সকল পর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিবর্গ, অভ্যাগতবৃন্দ এবং এই সমাবেশের সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য, যারা আমার সামনে উপবিষ্ট আছেন, আমার সমস্ত তরুণ বন্ধুরা; বিশেষ করে যাকে উপলক্ষ্য করে আজকে আমাদের এই উপস্থিতি, সম্মিলন, আমাদের সবার জননী, তারেক মাসুদের জননী তো বটেই, সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন আমাদের আর আর বন্ধুরা, আপনাদের সবাইকে আমার প্রীতি-শুভেচ্ছা ও সম্মাননা জ্ঞাপন করছি।

বইপুস্তকের প্রকাশনা উৎসবে মনে হয় আমি ইতিপূর্বে কদাচিৎ উপস্থিত হওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। কাজী মামুন১কে না বলার সাহস আমার খুব কম, আমি ঠিক পারিনি এ যাত্রায়। আমার যে সাংঘাতিক যোগ্যতা আছে এমন নয়; যারা এখানে আলোচক আছেন তারা তারেক মাসুদকে এতো কাছ থেকে স্পর্শ করেছেন, এতো কাছ থেকে দেখেছেন, আমার সেই রকম অভিজ্ঞতা খুবই ক্ষীণ। আমি যখন ঢাকায় একটু লম্বা সময় অর্থাৎ ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০--থাকতে শুরু করি, আমার যখন কলেজ পর্ব সদ্য শেষ হলো আরকি--যেটাকে বলে ঢাকাতে চাকরি খুঁজতে যাওয়া--আমি তখন তারেক মাসুদকে প্রথম দেখি।

আগেই বলেছি, এই সভায় তারেক মাসুদের জননী এবং সহোদর উপস্থিত আছেন, আর তাদের সামনেই তারেক মাসুদ সম্পর্কে আমাদের অস্পষ্ট কথা বলার সাহস সংগ্রহ করতে হবে। জননীর সামনে, সহোদরের সামনে আমাদের বক্তব্যে যেনো যথেষ্ট ‘বুদ্ধিমত্তা’র ছাপ প্রকাশ পায়। যে মা তারেকের মৃত্যু হয়েছে জেনেও জগতের অমোঘ সত্যটি অস্বীকার করে বসেন, তারেক মাসুদ ‘এখনো জীবিত’--তার সামনেই আমাদের বলতে হবে, তারেক মাসুদ ২০১১-এর আগস্টে মারা গেছেন। শব্দ বদল করি--এলিয়টের বাক্য--এপ্রিলের পরিবর্তে বলি; আগস্ট ইজ দ্য ক্রয়েলেস্ট মান্থ ...! কখনো ভেবেছি, তারেক মাসুদ সম্পর্কে আমার কথা বলার যোগ্যতা কী? প্রথম ব্যাখ্যা, ওর সিনেমাগুলো কখনো আমরা একদিন দেখেছিলাম, অর্থাৎ আমি তার একজন অচিন দর্শক-শ্রোতা; আর দ্বিতীয় ব্যাখ্যা, আমরা দুজনই, বিগত কালের ঢাকা শহরে ‘মুহম্মদ খসরু’ নামক দীর্ণ-বিদীর্ণ এক-আশ্চর্য চলচ্চিত্র চাক্ষুষ করি একত্রে--আমি বলতাম মুহম্মদ খসরু আমাদের চলচ্চিত্র দেখার চক্ষুদান করেছিলেন; আর তারেক মাসুদ বলতেন, মুহম্মদ খসরু বলে একজন আছেন, আমরা সেই খসরুর ওভারকোট থেকে বেরিয়ে এসেছি। এটা আমার মনে হয় যে, চেখভ-এর ওই জায়গা থেকে পুনর্নির্মাণ--তিনি বলতেন, আমরা গোগল-এর ওভারকোট থেকে বেরিয়ে এসেছি। মুহম্মদ খসরু ভাইকে নিয়ে আজকে এক্ষনি কথা বলার অবকাশ কম; তার সম্পর্কে হয়তো অন্য কোনোদিন বলা যাবে। এই আমার তারেক মাসুদের সঙ্গে পরিচয়। নতুন নতুন ছবি, আলোচনা, রেটট্রোস্পেকটিভ, ... তখন আমাদের নানা উত্তেজনা--ছবি করতে পারবো কি না জানি না, কিন্তু ছবি তো দেখতে পারবো! জার্মান কালচারাল সেন্টার, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার ও আলিয়স ফ্রাঁসিস--এসব জায়গায় ছবি দেখে, অথবা এমন হয়েছে, যারা খুবই বিদগ্ধ মানুষ, যারা চমৎকার ফিল্ম সেন্স নিয়ে কথা বলছেন, আলোচনা করছেন, কখনো ইউরোপের বা ভারতের গুরুত্বপূর্ণ ফিল্মক্রিটিক বা ফিল্মমেকার এসেছেন, সেইসব সভাতে তারেক মাসুদকে কখনো দেখেছি। তরুণ মেধাবীদের আলোচনায় সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-আদুর-নিহালনী দ্রবীভূত হয়ে আঁদ্রে বাঁযা, অরসন ওয়েলস, জ্যঁ রেঁনোয়া, ফেলিনি, আন্তনিওনি হয়ে আরো বহু দূরে আলো-ছায়া ছড়িয়ে গেছে। শেষে যথারীতি মহান খসরু ভাইয়ের আশ্চর্য, অপরূপ খিস্তিদান পর্ব, হয়তো চা ভাগ করে তার সঙ্গে খাওয়া হয়েছে, এতোটুকুই। আর তখন জানতাম যে, ও ছবি করার পরিকল্পনা করছে।

অনেক পরে তার আত্মজন, প্রিয় শিল্পনিদের্শক--এখানে আমাদের আরেক শিল্পী বন্ধু আছেন মাসুদ চৌধুরী২--ঢালী আল মামুন ভাইয়ের কথা বলছি; ছবি দেখার উপলক্ষ্যে তার সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে, মামুন ভাই তারেকের জন্য শিল্পনির্দেশনায় কাজ করতেন। এবং শেষ প্রস্তাবিত ছবি, কাগজের ফুল-এর লোকেশন দেখতে গিয়ে ঢালী মামুন ভাইও আক্রান্ত হন। ঢালী ভাইয়ের সঙ্গে আমার সেসময় প্রায়শই দেখা হতো এবং তার সঙ্গে আলোচনায় খানিকটা ছবির কলকব্জা বুঝতে চাইতাম। তারেককে এতোটুকুই আমার স্পর্শ করা। অনেক পরে জার্মান কালচার সেন্টারে যখন এস এম সুলতানের শেষ প্রদর্শনী হয়, আমাদের আহমদ ছফা ভাই ছিলেন--তখন আমরা যারা একটু ভবঘুরে, যারা প্রায়ই ক্ষুধার্ত থাকতাম--আপনারা জানেন যে ঢাকাতে যখন বড়ো বড়ো প্রদর্শনীর উদ্বোধন শেষ হয়; বিশেষ করে, দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে, তখন দূতাবাসের বারান্দায় আমাদের জন্য অপেক্ষমান বিপুল বুফে, চা-চক্র, অনেক খাবার; নান্দনিক মানুষেরা খেয়েছেন সামান্যই আর আমরা ক্ষুধার্ত মানুষরা খাদ্যের নন্দনতত্ত্ব খুঁজতে খুঁজতে দেখি এস এম সুলতানের প্রদর্শনী হচ্ছে, সেখানে তারেক মাসুদকে তো দেখলামই, ছফা ভাইকেও দেখলাম এবং সেই বারান্দায় এসে অনেক খাবার খেলাম; যেটা ভব্যতার বাইরে--একের অধিক খাবার, একের অধিক কেক নেওয়া, যেটা সবসময় শোভন নয়, আপনারা নিশ্চয় সেটা করেন না। কিন্তু আমার মতো যারা পেটমোটা মানুষ; আপনারা জানেন যে, না খেয়ে তো আর পৃথুল হয়নি! এইটুকুই হয়তো বলা যেতে পারে একেবারে দলছুট কথা।

আমি আমার বন্ধুদের বলি, আমি আসলে খুব দুর্বল চিত্তের মানুষ, প্রায়শ চোখ ভিজে যায়, মন খারাপ হয়ে যায়। একটু আগে আমাদের কাজী মামুন যখন কথা বলছিলেন, আমি সত্যিই আক্রান্ত বোধ করছিলাম। আজকে আমাদের কথা বলার বিষয় ‘তারেক মাসুদ, শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ : জননী ও সখার স্মৃতি’ বইটি নিয়ে। কেউ কেউ বলেন, জীবন নিজেই একটা চলচ্চিত্র। আজকে চলচ্চিত্রবিষয়ক কথা হচ্ছে, চলচ্চিত্রকার সম্পর্কে কথা হচ্ছে; আবার সেই চলচ্চিত্রকারকে আরেকজন চলচ্চিত্রকার উপস্থাপন করলেন, ফিল্ম উইথইন ফিল্ম, ফিল্ম উইথইন ফিল্ম; সিরিজ অব ফিল্মসের মধ্যে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি।

তারেক মাসুদ স্মরণ অনুষ্ঠানে আলোচনা পর্বে মামুন হুসাইন

আমাদের শৈশবে সিনেমা দেখাকে লোকে বলতো, চলো ‘বই’ দেখে আসি। সিনেমা কি ‘বই’ হয়? সিনেমা কি ‘বই’ শব্দের প্রতিরূপ? তবে এ রকম বাক্য পড়েছি কখনো--রিডিং সিনেমা। আমি মাঝে মাঝে ভাবি; এ কথাটা আজকে বলা যাবে কি না জানি না। এই যে তারেক মাসুদ কতো রকমের কাজ করেছেন--ছবির মধ্য দিয়ে চারপাশ দেখার চেষ্টা করেছেন, কেনো সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? সিনেমা প্রদর্শনের সময় সেখানে গিয়ে কথা বলছেন। বাংলাদেশের আর সব চলচ্চিত্রকার এগুলো করেন না! সেদিন একজন বলছিলেন, আজকালকার তরুণরা--আমরা বুড়োরা অবশ্য সবসময় তরুণদের গালমন্দ করি--ছবি দেখছে সবসময় মাথা নুইয়ে! ছবি তো সিনেমাহলে দেখার কথা মাথা উঁচু করে। ছবি আর আমরা মাথা উঁচু করে দেখতে পারি না। আপনাদের সবার কাছে এতো এতো ব্যক্তিগত চৌকস যন্ত্র এবং এসব ব্যক্তিগত যন্ত্রের ভিতর, বলতে কী, ক্রমাগত চলচ্চিত্র উৎপাদিত হয়ে চলেছে কোনো শলাপরামর্শ ছাড়াই।

চলচ্চিত্র নামক এই ‘জীবন’ অথবা ‘বই’ দেখতে দেখতে আমাদের নাগালে আসে তারেক মাসুদ, তারেকের জীবনযাপন ও তার বৃত্তান্ত নিয়ে রচিত পুস্তিকা--‘শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ’। এই বইটি সম্পর্কে কী বলা যায় আমি এখনো খুব ভেবে পাইনি। ভেবেছিলাম এখান থেকে দুই-একটা অংশ পড়ে শোনাবো, সেটা হয়তো করাই যায়। এই বইয়ের মধ্যে অনেকগুলো মানুষ যুক্ত হয়ে গেছেন, ইব্রাহীম খলিলের কথা আসছে। আমি ভেবেছিলাম, সম্পাদক ইব্রাহীম খলিলকে নিয়ে একটু কথা বলবো; আমাদের নুরুন্নাহার মাসুদ, তারেক মাসুদের জননী, তিনি এখানে তার জীবনের অনেকটা কথা বলে ফেলেছেন--বিবাহ, পর্দা, বোরখা, সংসার ইত্যাদি--সেইটা থেকে কিছু ধারকর্য করবো; আলম খোরশেদকে নিয়ে কিছু বলবো; আর ভেবেছিলাম যে, বইটা পড়তে পড়তে আমার খানিকটা কথা জমা হয়ে গেছে, সেগুলো কিছুটা বলা যায় কি না। যেমন, তারেক মাসুদ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন, এখানে দেখি আমাদের ইব্রাহীম খলিলও মাদ্রাসার ছাত্র! কোনো একজন মাদ্রাসার ছাত্র মওলানা হওয়ার স্বপ্ন এড়িয়ে কী করে চলচ্চিত্র, গণমাধ্যম হয়ে নতুন এক প্রতিবেশে নাম লেখান--আমি ভাবি যে এটা একটা কম চলচ্চিত্র নয়! এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে রচিত হতে পারে বাংলাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষা নামক নতুন এক পর্যবেক্ষণ, সমীক্ষণ ও সমাজতত্ত্ব।

আবার শৈশব-কৈশোরে ফিরি, আমাদের পাড়াতে যে আত্মীয়-স্বজনরা থাকে, তাদের অনেককে আমরা মামা বলে ডাকি, এ রকম এক মামার হাতে আমার সিনেমা দেখার হাতেখড়ি। উনি আমাদের কুষ্টিয়ায় আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। সেই মামা ছবি ভালোবাসতেন অসাধারণ! শীতকালে মাফলার দিয়ে মুখ জড়িয়ে ফেললে তার দাড়ি হারিয়ে যেতো এবং তখন বোঝা যেতো না উনি মাদ্রাসার ছাত্র কি না। তিনি সেসময় প্রচুর ছবি দেখতেন। আমাদেরকেও কখনো কখনো সেই ছবি সঙ্গে করে দেখাতে নিয়ে যেতেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত তিনি আর মাদ্রাসার ছাত্র থাকেননি। বুঝতেই পারছেন, চলচ্চিত্রের অঘটনঘটনপটীয়সী প্রক্রিয়ায় ছবি ভালোবাসতে ভালোবাসতে মাদ্রাসার বারান্দা থেকে ড্রপ আউট হয়ে কোথায় যেনো হারিয়ে গেছেন, নিখোঁজ হয়ে গেছেন!

আজকে যদি এই মাদ্রাসা-ছাত্রের যৌথ প্রযোজনায় উৎপাদিত এ বইটি স্পর্শ করি, বইয়ের মধ্যে কী খুঁজে পাওয়া যাবে? বইয়ের মধ্যে ইব্রাহীম খলিলের একটা পরিচিতি পাওয়া যায়--তারেক মাসুদের বাড়িতে ঢোকার পথে একটা চিহ্ন আছে সেখানে লেখা ‘আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের বাড়ি’, আমরা সেইভাবেও যেতে পারি। খলিল এই বইয়ের ভূমিকায় খুব শেষে বলছেন, তিনি কোনোভাবেই আর অশ্রু দমন করতে পারছেন না, তার মনে হচ্ছে তারেক মাসুদ মারা যান নাই। আমাদের কাজী মামুন বলেছেন, একজন মা কী করে তার সন্তানবিষয়ক দাহ ও ক্ষত ধারণ করেন--যে সন্তান এক্ষণে তার সামনে নেই, তিনি প্রতিদিন স্বপ্নের ভিতর তার সন্তানকে দেখেন, প্রতিদিন অনুভব করেন জানালায় তারেক মাসুদের কণ্ঠস্বর কথা বলে, তিনি শোককে কোন রসায়ন শক্তিতে রূপান্তরিত করেন!

আমি যে বিষয়ে লেখাপড়া করেছি সেখানে শোক আত্মস্থ করার কথা আছে--মানুষ যখন শোকের মধ্যে যায়, তখন কতোগুলো ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে যায়; প্রথমে মানুষের সাংঘাতিক ক্ষতি ও শূন্যতা আসে। মানুষ তারপর এই ক্ষতিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করে। মানুষের তখন আবেগের পরিবর্তন হয়। তারপর আস্তে আস্তে সে মনে করে, না মৃত্যুটা হয়তো শেষ পর্যন্ত সত্য। আমি জানি, তারেক মাসুদের জননী সেই রকম একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। এখন তিনি আমাদের এই মঞ্চে সন্তের মতো বসে আছেন। খুব মুখস্ত কথা বলি--বেদনা কী করে ধারণ করতে হয়, বেদনা কী করে মানুষকে জাগ্রত করে--আমার মনে হয়, এই অসাধারণ জননীকে আমরা যদি স্পর্শ করি তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ পাবো। আমি আমার জীবনে আরেকজন এমন অসাধারণ মানুষকে দেখেছিলাম--জাহানারা ইমাম। ৮০-৮৫ সালের দিকে মোটরগাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন, অথচ তার শরীরে তখন কর্কট রোগের গোপন ছায়া। আমি তো অবাক হতাম, কী করে একজন মানুষ, যার ঘরে এতোগুলো মৃত্যু, তারপরও কী দাপটের সঙ্গে হেঁটে বেড়ান। মানুষের এই যে বেদনা ধারণ করার শক্তি, এই বোধ দুর্দিনে-দুঃসময়ে আমাদেরকে জাগ্রত করে, প্রাণিত করে।

এই বইয়ের মধ্যে মায়ের অংশটা যদি আপনারা দেখেন, তাহলে দেখবেন ছোট্ট ৬২ পৃষ্ঠার একটা বই। ৬২ পৃষ্ঠার এই বইয়ের মধ্যে সেই নড়াইল শহর, সেই ফরিদপুর, সেই কলকাতা, ১৯৪৭, দেশভাগ, দাঙ্গা--নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ--অনুষঙ্গ ছড়িয়ে আছে। ১৯৪৭-এ দেশভাগের সঙ্গে স্মৃতি এবং স্তব্ধতা মিলিয়ে, ... অফিসিয়াল হিস্ট্রির বাইরে অন্য এক ইতিহাসের নির্মাণ এই পুস্তিকার ১২ নম্বর পৃষ্ঠায় আপনারা খুঁজে পাবেন—কলকাতার ‘রাস্তায় বেশ কয়েকজন মানুষকে কুপিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে, পাশ দিয়ে রক্তের স্রোত বইছে।’ অধুনা এসব প্রসঙ্গ ধরে উদ্বোধিত হয়েছে পার্টিশন সাহিত্য বর্ণনা ও তত্ত্ব--জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডের ‘রিমেমবারিং পার্টিশন’ স্মরণ করুন। উদ্বাস্তু হওয়ার এই ট্রমা নিয়ে নতুন আখ্যান রচনার ইশারা তৈরি হয় এভাবে। তারেকের প্রস্তাবিত শেষ ছবি কাগজের ফুল--এই পরিপ্রেক্ষিত ধরে অনেকখানি ব্যাখ্যা করা সম্ভব। আপনাদের স্মরণে আছে--কলিম শরাফী, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী তখন কলকাতায়--আশ্রয় নিয়েছেন জর্জদা অর্থাৎ দেবব্রত বিশ্বাসের পন্তিতিয়া রোডের বাড়িতে; তিনি কলিমকে দ্রুত তক্তপোষের নিচে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ বাদে হেমন্ত এসেছেন—চিন্তিত ও উ্দ্ভ্রান্ত--কলিম কোথায়? জর্জদা মজা করছেন--মাইরা ফালাই দিছে বোধ অয়!

তারেকের বাবা ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’-এর ওই শহর থেকে পড়াশোনা করেছেন, ইংরেজির মাস্টার হচ্ছেন; আবার তাবলীগ জামায়াতেও চলে যাচ্ছেন। এবং কোনোভাবেই কিন্তু ছেলেকে স্কুলে লেখাপড়া করানো যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিজ্ঞাই করেছিলেন--তারেককে তিনি মাদ্রাসাতে পড়ালেখা করাবেন। আমরা অনেক সময় বেগম রোকেয়ার কথা বলি, মহীয়সী বেগম রোকেয়া; রাতের আঁধারে লেখাপড়া শিখছেন। তারেকের মা বলছেন, আমি চুরি করে--‘চুরি করে’ শব্দটিই উনি ব্যবহার করেছেন--তারেক মাসুদকে অ আ ক খ, এ বি সি ডি শেখাচ্ছি। উনি বলছেন, এই যে মাটির ময়না সেটা তারেকের জীবন দিয়ে তৈরি। তার বোন আসমা মারা যায়। আসমার চিকিৎসা-তৎপরতার ক্ষেত্রে বাবা কেবলই হোমিওপ্যাথির দিকে ধাবিত হচ্ছেন। বাবা বলছেন, অ্যালোপ্যাথি নয়। আপনারা যদি তারাশংকরের ‘আরোগ্য নিকেতন’ পড়েন, সেখানে একটি বিষয় আছে ‘জীবন এবং জগৎ’। আমার এখানে অনেক সাহিত্যের বন্ধুরা আছেন, ভুল করে ফেলি কি না জানি না! সেখানে তিনি বলছেন, ‘তুই জীবন খাবি নাকি জগৎ খাবি?’ অসুখ হওয়ার কারণে জিজ্ঞাসা করছেন। কারণ পাড়াগাঁয়ের দুই চিকিৎসকের একজন কবিরাজি করছেন, আরেকজন নতুন আধুনিক চিকিৎসায় যাচ্ছেন--কবিরাজ জগদ্বন্ধু না ডাক্তার-কবিরাজ জীবন মশাই--এখানেও এই দ্বন্দ্বগুলো আমার কাছে তীব্র দৃশ্যমান হয়। আসমার মৃত্যুর পর তারেক মাসুদরা সেই লাশ নিয়ে চলে যাচ্ছেন। তীব্র জল, বন্যা--কোনোভাবেই বোনকে আর কোথাও স্থিত করা যাচ্ছে না। বোন যখন যাচ্ছে, একটু পর পরই তারেক মাসুদ বার বার নৌকা টপকে ওখানে চলে যাচ্ছেন। বোনকে একটু দেখে আসি; কফিনটিকে একটু সরিয়ে এক ঝলক দেখে আসি। তারেক চিৎকার করছে--আমি ওই নৌকায় যাবো। আম্মা, ওই নৌকায় গিয়ে আসমা আপাকে কাঠের বাক্সের ফাঁক দিয়ে দেখবো। আমার কাছে হঠাৎ মনে হয়, বরিস পাস্তারনাক-এর একটা অসাধারণ লেখা আছে ‘লাইফ মাই সিস্টার’-- ... মাই সিস্টার লাইফ ইজ ওভারফ্লোয়িং টুডে ..., বাট পিপল উইথ মনোকল স্টিল কমপ্লেন অ্যান্ড স্টিং পোলাইটলি, লাইক স্নেক্স ইন দ্য গ্লাস। পাস্তারনাক নোবেল বিজয়ী হন ১৯৫৮-তে, যখন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে আইয়ুবী সামরিকতন্ত্র। মাহমুদুল হকেরও একটা উপন্যাস আছে ‘জীবন আমার বোন’। টনি মরিসনের একটি লেখায় তিনি বলছেন--বোন একাধারে আমার অংশ এবং অপর অংশ-- ... অন্য প্রকারের দ্বৈত সম্পর্ক বটে! আমি এসব নিয়ে মাঝে মাঝে আক্রান্ত বোধ করে ফেলি। নৃতত্ত্বের মার্গারেট মিড বলতেন--বোনের আগমন আমাদের সবচেয়ে দৃঢ় সম্পর্কের প্রকাশ--বইয়ের ২০ পৃষ্ঠায় দেখবেন, মা বলছেন--তখন তারেকের খেলার সাথি বলতে ওর এই বোনই ছিলো, একজনের আরেকজনের প্রতি টান ছিলো ভীষণ।


বইয়ের এই অংশ থেকে বেরিয়ে দেখি, এবার তারেক চলেছেন বিদ্যাচর্চার খেলাধুলায়--কওমি মাদ্রাসা, তারপর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট, নটরডেম হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের ছাত্রকাল পর্যন্ত এই ভ্রমণ, তারেকের নিজস্ব উজান স্রোত। তারেক ১৯৭১-এ ১৫-১৬ বছরের তরুণ যুবা, দেখা যাবে মুক্তিযোদ্ধা কাজিনের সঙ্গে মাঝে মাঝে পলায়ন করছেন। মা বলছেন, তার মামাশ্বশুর ছিলেন রাজাকার, কিন্তু ‘ভালো রাজাকার’। ভালো রাজাকারের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘মুক্তিযোদ্ধাদের কোথায় যেতে হবে, কোথায় যাওয়া যাবে না, সেটা তিনি আগে থেকেই তাদের বলে দিবেন।’ মেজর যখন বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তিনি তখন পাক সেনাদের হাত-পা ধরে বলেন, দয়া করে আপনারা এখানে কোনোকিছু করবেন না। এই দাদাকে বাঁচাতে পারেননি তারেক। মা বলছেন, ‘বাচ্চারা যাতে ছবিওয়ালা কাপড় না পরে’ সে ব্যাপারে ওর বাবা সজাগ থাকতেন। একবার সেজো মেয়ের গায়ে হাঁসের ছবি দেখে, সেই জামা তিনি আগুনে পুড়িয়ে ছিলেন। ‘সত্যজিতের পথের পাঁচালীর সিডি এনে তারেক একবার বাড়ির সবাইকে দেখিয়েছিলো। দেখানোর আগে আমাকে বলে গিয়েছিলো মা তুমি কাঁদবা না। কারণ ওখানে অপুর বোন দূর্গা মারা গিয়েছে। ঠিক এ রকমই আমার মেয়ে আসমা মারা গিয়েছিলো। তারেক সেটা অনুভব করে ভেবেছে আমি হয়তো কাঁদবো।’

মা কি সেদিন ফুঁপিয়ে উঠেছিলেন সামান্য, নাকি তিনি আরো শক্তি ধারণ করেছিলেন? মা চোখের জল আড়াল করতে করতে তখন বললেন, ‘তারেকের বিয়েটা আরেক ঘটনা।’ আমরা এই অঘটন-ঘটনের পুরোহিত হিসেবে পাই মহাত্মা আহমদ ছফাকে। তারেক এক লাখ এক টাকা কাবিনে ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্যাথরিন-এর সঙ্গে জড়িয়ে ফেললেন জীবনগাঁথা। আলম খোরশেদের ভাষ্য--‘ক্যাথরিন আসলে একটা আশির্বাদ হিসেবে এসেছে তারেকের জীবনে।’ দু’জনে অর্থ জোগাড়ে নেমেছেন। জমি বিক্রি হলো মিরপুরের সাড়ে তিন কাঠা। সব সঞ্চয়ের টাকা একত্র করেছেন চলচ্চিত্রের জন্য। ২৫ বছর পর ওদের সন্তান নিষাদ। ঘরের-বাইরের কাজ দু’জনা ভাগ করে নিয়েছে। এর মধ্যেই ক্যাথরিনের পিয়ানো বাদন--সেই দৃশ্যে মা বলেন, ‘ও রকম মেয়ে কী বাংলাদেশে আছে!’

তারেক মাসুদের বাবার কথা বলছিলাম; ৭১ সাল এসেছে; উনি বলছেন, আমরাও তো মুসলমান ওরাও মুসলমান, তাহলে আমাদেরকে কেনো আক্রান্ত করবে! অনেক পরে উনি বুঝতে পারছেন বিষয়টা এতো সহজ হিসাবের মতো নয়। মসজিদের মধ্যেই দোয়া হচ্ছে, যাতে করে আমরা স্বাধীনতার দিকে যেতে পারি। এই জায়গা থেকে একটা ছোট্ট ইঙ্গিত মেলে, মানুষের ধর্মীয় চেতনার মধ্যেও যেনো আরেকটি অপ্রকাশিত-লুক্কায়িত বোধ থাকে, যেটা রাষ্ট্রের কল্যাণের দিকে কখনো চলে যায়। যারা লিবারেশন থিওলজির কথা জানেন, তারা এই বিষয়ে পূর্ণ অবহিত : ১৯৬০-এ দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পর এই ধারণা বিকাশ পাচ্ছিলো--দারিদ্র্যপীড়িত মানুষদের মুক্তি ঘটাতে হবে, সরাসরি রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও, ওরা ধর্মীয় চৈতন্যের নতুন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিপ্লবের পথের কাজ করেন। খুব মোটাদাগে--আমাদের দেশের তিতুমীরসহ মওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, কিংবা মওলানা ভাসানীর বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডকে আমরা কখনো আলোচনায় আনতে পারি প্রাসঙ্গিকতা বোঝানোর জন্য। এ সম্পর্কে আমাদের সবার চেনা আর্নেস্তা কারদেনাল’কে উদ্ধৃত করা আরো সহজ। বলতেন--খ্রাইস্ট লেড মি টু মার্ক্স। কারদেনাল পুরোহিত ছিলেন, কবি ছিলেন এবং উনি নিকারাগুয়ার সোলেনতিনেম নামক একটি দ্বীপে আলাদা চার্চ তৈরি করেন। ফলে তিনি জনগণ দ্বারা নিষিদ্ধ হন। তিনি লিখলেন--গোসপেল ইন সোলেনতিনেম--বলা হলো বাইবেলের ঈশ্বর দরিদ্রদের পক্ষে। কারণ ভালোবাসাই ঈশ্বর এবং ভালোবাসা বাঁচে সমতা ও ন্যায্যতায়। এটা কিন্তু আমার কাছে নতুন ইঙ্গিত মনে হয়। সেই সঙ্গে আরেকটা বড়ো ব্যাপার দেখবেন যে, তারেক এক জায়গায় বলছেন--বাবার সঙ্গে কথা হচ্ছে, তর্ক হচ্ছে। তারেক বলছেন, সিনেমাকেই আমি ধর্ম মনে করি। দেখবেন তারেক মাসুদ তার ছবির মধ্যে মাদ্রাসার ছাত্রদের কথা বলছেন। এই জায়গা থেকে আমার কয়েকটা কথা মনে হচ্ছে, আমি হয়তো খানিকটা বলবোও, যেটাকে আমরা আমাদের ভাষায় বলি ‘ফাদার কমপ্লেক্স’।

‘ফাদার কমপ্লেক্স’ বলে একটা বিষয় আছে। আমরা মানে বাচ্চারা যখন বড়ো হয়, তখন হয় কী, কারো কারোর প্রতি আমাদের একটা সম্পর্ক, সংযুক্তি তৈরি হয়। এই জায়গাগুলো আমার কাছে খুব অসাধারণ লাগে। তারেক কিন্তু বাবার আচরণে নানাভাবে তার স্বাধীন চিন্তা, মতামতকে বিঘ্নিত হতে দেখছেন। মা বলছেন, একশো বছর বয়সি বাবা স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে গেছে; বাবাকে স্নান করিয়ে দিচ্ছেন তারেক মাসুদ। আমি চিন্তা করি, কীভাবে একশো বছরের একটা মানুষকে সরিষার তেলে ডুবিয়ে তিনি স্নান করাচ্ছেন! যিনি ঢাকা নামক হতশ্রী রাজধানী ফেরত, চলচ্চিত্র বানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের একজন রাজকন্যার সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন; আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে বাবাকে নিজ হাতে স্নান করাচ্ছেন, কীভাবে!

মায়ের জবানে, তারেক মাসুদকে এবার আমি নানান বয়ানে ভাবতে শুরু করি; নানান অনুষঙ্গ সামনে আসতে শুরু করে--বাবা-মা একত্রে তাহাজ্জুদ পড়ছেন, আর তারেক বলছেন সিনেমা আমার ধর্ম। অধিক সখ্যতা থাকলে, কখনো কী ওর ‘ফাদার কমপ্লেক্স’ নিয়ে প্রশ্ন করতাম? প্রতিবছর সেইন্ট যোসেফ-এর সম্মানে ১৯ মার্চ ‘ফাদার্স ডে’ আসে, আর গ্রিটিংস-ইন্ডাস্ট্রি কয়েক লক্ষ কোটি মুদ্রার ব্যবসা ছড়িয়ে দেয় জগৎ-সংসারে। নিৎসের কথা--ভালো বাবা না থাকলে, অবশ্যই তোমাকে একজনকে সৃষ্টি করতে হবে। তারেক সামনে থাকলে, ওকে তুর্গেনিভের ‘ফাদার অ্যান্ড সন্স’ এর পাঠ-প্রতিক্রিয়া জিজ্ঞেস করতাম; হয়তো কৃত্রিম পাণ্ডিত্য প্রকাশের জন্য বলতাম, সাড়ে ৪৭ পৃষ্ঠার ওই চিঠির কথা মনে পড়ে?

আপনারা অনেকেই কাফকার কথা জানেন। তার সাড়ে ৪৭ পৃষ্ঠার একটা লেখা আছে ‘লেটার্স টু ফাদার’। বাবার প্রতি তার অভিমানের শেষ নাই। কোনোদিন তাকে ক্ষমা করতে পারে নাই। কাফকা সেখানে (লেটার্স টু ফাদার)--বাবা সম্পর্কে এক জায়গায় লিখছেন, ... dearest Father, … what was always incomprehensible to me was your total lack of feeling for the suffering and shame you could inflict on me with yours words and judgement; অথবা The First Man-এর প্রথম পরিচ্ছেদ--আলবেয়ার কামু বাবাকে খুঁজছেন ... Search for father--জিজ্ঞেস করা হয় না; দেখি, জগৎ সংসার ঘুরে এসে তারেক তার একশো বছরের বাবার গায়ে সরিষার তেল মেখে স্নান করাতে বসেছেন। বাবাকে ক্ষমা করার এই শক্তিই হয়তো, আমার ধারণা, তারেককে দেয় অপার জীবনীশক্তি। এই গ্রন্থের ৩০ পৃষ্ঠায় তারেক এক বৈপরীত্যমূলক বয়ানে জড়িয়ে গেছেন। সিনেমাকে ধর্ম বিবেচনার পর বাবার সঙ্গে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছেন--‘ইনশাল্লাহ আমি একদিন না একদিন তোমার দেখানো পথে আসবো। কিছু কাজ আছে সেগুলো শেষ করার পর দ্বীনের পথেই থাকবো।’ বাবাকে দাফনের সময় হুজুরদের কাছে ওয়াদা করছেন--‘আমার আব্বা যে পথে ছিলো, আমিও সেই পথে ফিরে আসবো। ... আমার আব্বা মসজিদ মাদ্রাসায় যেভাবে সহযোগিতা করেছেন এখন থেকে আমিই আপনাদের সেভাবে সহযোগিতা করবো। আমি আব্বার লাইনে জীবনযাপন করি না সেজন্য ভীষণ কষ্ট হয়।’ এই বিপরীত কথোপকথনের পর বাবা এবং সন্তানের সম্পর্ক এখন কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আজকে যদিও এইসব বিষয়ে বলবার খুব অবকাশ নেই। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো, নানান তীর্যক-বৈরী সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার পরেও তারেক অনায়াসে বাবাকে স্পর্শ করার মেধা অর্জন করেছিলেন।

তারেক মাসুদকে বার বার বলা হচ্ছে ছবিওয়ালা। তিনি নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে ছবি নিয়ে যাচ্ছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলি--আমার যতোটুকু ধারণা, ছবির একটি কো-অপারেটিভ মুভমেন্ট কিন্তু তৈরি হয়েছিলো ভারতের কেরালাতে। অনেকেই এখানে আদুর গোপালকৃষ্ণান, আব্রাহাম-এর নাম জানেন, তারাই মূলত এই কো-অপারেটিভ মুভমেন্ট করেন। ওনারা আন্তরিক অর্থেই বন্ধুদের কাছে টাকা চেয়েছিলেন--আমাকে পয়সা দাও, এক পয়সা, পাঁচ পয়সা। তারা কিন্তু এইভাবে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। নিকারাগুয়াতে যখন বিপ্লব হয়, তখনো কিন্তু ছবি নিয়ে গ্রামের মধ্যে গিয়ে এসব কাজগুলো করা হয়েছে।

তারেক মাসুদ স্মরণ অনুষ্ঠানে তারেক মাসুদ, শূন্যের ‘ভিতর এতো ঢেউ’ বইয়ের পাঠ-উন্মোচন পর্বে মামুন হুসাইন, তারেক মাসুদ-এর মা নুরুন্নাহার মাসুদ ও অন্যান্যরা

এই বইয়ে তারেকের আরেকজন প্রিয় সখা আলম খোরশেদের লেখাও আছে; ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। খোরশেদ বলছেন, নিকারাগুয়ার বিপ্লব যেদিন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে বসে তারেক মাসুদ কেবল ফুঁপিয়ে চলেছেন। তীব্র কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। আমি কখনো কখনো এটা বুঝবার চেষ্টা করেছি--তাহলে কী করে, কীভাবে চিন্তনের এই রহস্যগুলো বর্ণনা করা যায়। খোরশেদ কিন্তু এখানে তারেকের যুক্তরাষ্ট্র, মানে প্রবাস জীবন নিয়ে অনেকগুলো কথা বলেছেন। তার স্ত্রীর কথা বলেছেন। মানুষের প্যারালাল লাইফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৃজনশীল মানুষের মানসিক চাপ! সৃজনশীল মানুষ যে অসুস্থতা বহন করে! সৃজনশীল মানুষের রক্তপাত! কতোদূরের একজন মানুষ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে এসেছেন; যিনি পিয়ানো বাজাতে পারেন; যার পরিবারের মধ্যে একজন ভারততত্ত্ব বুঝতে পারেন, এমন আকর গ্রন্থের জনক। সেই ‘সব পেয়েছি’--বাড়ির একটি মেয়ে কাঁদামাটিতে ডুবে থাকা জনপদের তারেককে কী করে সারাজীবন সঙ্গ দিলেন, আশ্রয় দিলেন! মানুষের এই প্যারালাল লাইফ আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মনে হয়। আলম খোরশেদ আরেক জায়গায় কথা বলতে চেষ্টা করছিলেন--সুলতানকে নিয়ে তারেক চলচ্চিত্র করেছেন--তারেক মাসুদ বলতেন, আমি এবার তিনজন ‘দিন’ নিয়ে ছবি করতে চাই।

তারেকের এই প্রস্তাবনা আপনারা এই বইয়ের মধ্যেই পাবেন। এই তিন ‘দিন’ এর একজন জসীম উদ্দীন, আরেকজন জয়নুল আবেদিন এবং অন্যজন আব্বাসউদ্দীন। আমার ধারণায় এই আয়োজনের অন্য নাম ‘বাঙালি মুসলমানের মন--পুনর্বিবেচনা’। এই অভিমুখেই তারেকের ঐতিহাসিক সত্তা কী ধাবিত হচ্ছিলো? আমার আরো মনে হয়, এই তিন ‘দিন’ আসলেই গভীর এক অভিনিবেশ দাবি করে--বাঙালি মুসলমান বলি আর আমাদের ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ্যবাদী বিকাশের জায়গায় বলি, কীভাবে একজন মানুষ উজান স্রোতে ডুবসাঁতার দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত নিজেকে ধারণ করে বেড়ে ওঠে! ... সেলফ অ্যাকচুলাইজেশন, যাকে বলি। বাঙালি হিসেবেই আমাদের এই যাত্রাটা কি না। এখানে একটা ছোট্ট তর্ক আছে, বাঙালি বড়ো নাকি বাঙালি মুসলমানিত্ব বড়ো। এটা নিয়ে বাংলাদেশে একটা বড়ো তর্কের জায়গাই তৈরি হয়ে গেছে। সেটা হয়তো আজকে বলবার বিষয় নয়। কিন্তু এই আলোচনা, এই আখ্যানের রকমফের তারেক মাসুদ ভিতরে ভিতরে ধারণ করতেন।

তারেক মাসুদ বার বার বলছেন, চলচ্চিত্র আমার কাছে ধর্মের মতো। চলচ্চিত্র তাহলে কী করে? এই বইয়ের মলাটে একটা শিরোনাম আছে, আপনারা দেখছেন ‘শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ’। আমি মনে করি, এই শূন্যতাকে সিনেমা আসলে পূর্ণ করে। গদার বলতেন, পুরো জীবন সিনেমা দেখার মতো। আবার কেউ কেউ বলেন, ছবি দেখা মানে সঙ্গীত তৈরি করা। কেউ আরো বাড়িয়ে বলেন, চলচ্চিত্র কিন্তু শিল্প নয়; জীবন ও শিল্পের মধ্যবর্তী একটা জায়গা। বইটি পড়তে পড়তে এইসব কথাগুলো আমার কাছে আবারও ক্ষণে ক্ষণে মনে হতে থাকে।

ছবি করতে গিয়ে তারেক মাসুদ বার বার বলছেন, আমার ধনসম্পদ হারিয়ে যাচ্ছে; প্রচুর লোন হয়ে যাচ্ছে। তার মানে এটা প্রায় একটা যুদ্ধযাত্রার মতো! কী করে সেটা সম্ভব হয়! অরসন ওয়েলস-এর একটা কথা আছে--আসলে যিনি ছবি বানাতে চান তার ক্যামেরা হবে কবির চোখের মতো। কবি মানে তো পদ্য লেখা না যে, দুই লাইন পদ্য লিখেছেন আর সব সুসমাধা হয়ে গেছে। পদ্য না লিখেও কবি হয়। কবি ভবিষ্যতকে দেখতে পারেন; বহুদূর পর্যন্ত দেখতে পারেন। স্পিলবার্গের চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে একটা কথা আছে, মানুষ গল্প বলতেই চায়। মানুষ তাহলে বাঁচে কেনো? মানুষের বেঁচে থাকার জন্যই গল্প বলা দরকার। গল্পের আসলে শেষ মাথা বলে কোনোকিছু থাকে না। গল্প নানাভাবে বিকশিত হতে থাকে; যেখানে শুরু হয় সেখানেই শেষ হয়ে যেতে পারে। সুবার্ট নামে একজন সঙ্গীত কম্পোজার ছিলেন। তিনি একবার খুব আক্ষেপ করছিলেন এ বলে যে, আমি যখন ভালোবাসার সঙ্গীত রচনা করতে যাই কোথা থেকে জানি কী হয় এতো এতো বেদনা চলে আসে! আবার যখন বেদনার সঙ্গীত রচনা করতে যাই, বুক ভরে হু হু করে ভালোবাসা তৈরি হয়ে যায়। এইসব কথা আমার আজ এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে।

তাহলে আমার কাছে সিনেমা শেষ পর্যন্ত কী? যেহেতু আমাদের সামান্য লেখাজোখার অভ্যাস এখনো অবশিষ্ট, তাতে কী মনে হয়--সিনেমা হচ্ছে সেই চলমান ইমেজ এবং শব্দ অর্থাৎ ধ্বনি--এই দুই অনুপান মিলিয়েই হয়তো ‘সিনেমা’ নামক লেখা তৈরি করা। মানুষ তাহলে কেনো লেখে? মানুষ হয়তো তার বেঁচে থাকাটা প্রমাণ করে; মানুষ তো মারা যায় বটে, কিন্তু তার ভাষাও তৈরি করে। চলচ্চিত্রকাররাও এইভাবে ক্যামেরা দিয়েই হয়তো তার একটা ‘ভাষা’ তৈরির চেষ্টা করে। লেখক আসলে কেউ হতে চায় না। আমরা বলি যে, আমরা লিখিত হতে চাই। কান্না তখনই শব্দ হয়, যখন তা লেখা হয়। আমরা বার বার মনে করি আমাদের কাছের মানুষ যখন হারিয়ে যায়, আমাদের খানিকটা অংশই বোধহয় হারিয়ে যায়। আজকে এখানে ভাষণ তৈরির এই আপাত নিরীহ বিপদজনক খেলাধুলার কথাই আমি বলছি। কাজেই এই ৬২ পৃষ্ঠার বইটিকে যদি এক কথায় বলি, তাহলে এ দিয়ে আমরা খানিকটা জীবন ও মৃত্যু স্পর্শ করতে পারি। তারেক কী অগ্রীম মৃত্যুসংবাদ জেনেছিলেন? নিজের ছেলে সম্পর্কে বলছেন, এই ছেলেটিকে আমি পালতে পারবো না। ও আমার কবরে দুর্বাঘাস দেখবে। আমার লাশ তো রাস্তায়! জীবন মৃত্যুকে জিজ্ঞাসা করছে, কেনো মানুষ আমাকে ভালোবাসে, আর তোমাকে ঘৃণা করে? মৃত্যু বলছে, কারণ তুমি এক অপরূপ মিথ্যা, আর আমি বেদনাদায়ক সত্য। আমরা মনে করি, সেই সত্যের মধ্যে আমরাও কখনো প্রবিষ্ট হবো। একটা কথা আছে, জীবনে যখন এসেছিস একটা দাগ কেটে যা। আমার মনে হয় সুলতান তো বটেই--সুলতানের প্রসঙ্গ বার বার এসেছে--তারেক মাসুদ সেই দাগ কেটে যাওয়া এক আশ্চর্য-অলীক মানুষ।

আমরা এখানেই শেষ করি। একটি কথা খুব শেষে আমি বই থেকে পাঠ করছি, যেটা আমাদের জননীর বক্তব্য। উনি বলছেন, ‘স্বপ্নে দেখলাম তারেক জানলার পাশ দিয়ে হাঁটছে। আমি বললাম তারেক ঘরে আসো। ও ঘরে এসে আমার কাছে বসলো। আমি বললাম, কী হয়ে গেলো বাবা এতো লোক এসে তোমাকে মাটিতে শুইয়ে দিলো। তারেক বললো, না আম্মা আমি বেঁচে আছি। আমার কী হচ্ছে কিচ্ছু জানি না। আমি বেঁচে আছি। মৃত্যু, অ্যাকসিডেন্ট বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না।’ জননীর আরেকটা কথা উল্লেখ করি, উনি ‘ছেলেদের জন্য এই দোয়া করতেন--মানুষ হবে কি না জানি না, দোয়া করি তুমি দুনিয়া এবং আখিরাতে সম্মান পাও।’ উনি এক জায়গায় বলছেন, ‘তারেকের দেখানো পথে চলো ভালো থাকবা।’ তারেকের এই মৃত্যু ওনার কাছে এখনো মনে হয় হত্যা। মা বলেন, রানওয়ে ছবি দেখার পর তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার ছেলে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়। মা যখন বলেন, ‘রানওয়ে’র জন্যই ওর মৃত্যু অথবা হত্যাযজ্ঞ--আমরা বলি ওর মৃত্যু আমাদের খানিকটা অংশের মৃত্যুও বটে! ফলে কোনো মানুষেরই ‘পূর্ণ’ মৃত্যু হয় না কখনো, বড়ো অংশ কবর-ঘাস-কফিন ভেদ করে বাইরে আসে; জীবনের ইতি হয় বটে, কিন্তু সম্পর্কের জগৎ শেষ হয় না। তারেক মাসুদ যা চিন্তা করেছিলেন, যা হতে চাইতেন, যা হতে পারতেন, যা একদিন ভেবেছিলেন, যা তার সম্পর্কে অন্যরা ভাবতো--এর সবকটা পরীক্ষা উতরে, তিনি বেঁচে ছিলেন; ভীষণভাবে বেঁচে ছিলেন। কারণ বেশিরভাগ মানুষই জানে না সে বেঁচে ছিলো কি না! আমাদের এইসব হোঁচট খাওয়া এলোমেলো শূন্যস্থান, আমি ভেবেছি, অপরাপর বিবিধ সৃজনশীল প্রকরণের মতো পূরণ করে সিনেমা।

তারেক কি জীবনের স্বপ্ন প্রসঙ্গে কখনো ভেবেছিলেন? ‘টু মেক আ ফিল্ম অ্যান্ড গো-ব্যাক টু মাই মাদার্স উম্ব’--গুণীশিল্পী হিরন মিত্র, এ রকম করে ভাবলেও, তারেক মাসুদকে সহসা জিজ্ঞেস করার অবকাশ হয় না। হয়তো এই নিখোঁজ গল্প বলার জন্যই আমরা বেঁচে থাকি, বেঁচে থাকার অমলিন স্বপ্ন নির্মাণ করি। ‘শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ’--আবিষ্কার করার জন্য অন্য মাদ্রাসা ত্যাগী, ‘মিডিয়া ইজ দ্য ম্যাসেজ’ পড়ুয়া যুবক ইব্রাহীম খলিলকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে।

অযুত কৃতজ্ঞতা জননী নুরুন্নাহার মাসুদকে, যিনি তাবৎ ক্ষতি-শূন্যতা স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে ধারণ করে আমাদেরকে বুঝিয়েছেন--পুরো জীবন একটি চলচ্চিত্র বটে, যখন প্রায়শ ভালোবাসার সঙ্গীত হয়ে যায় বেদনার, আর বেদনার সঙ্গীত হয়ে যায় ভালোবাসার। ‘তারেকের দেখানো পথে চলো, ভালো থাকবা’--মায়ের এই পরামর্শপত্র এবার আমরা বুক পকেটে সঞ্চয় করি।

দায়স্বীকার : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ আয়োজিত ‘ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন’ এর বই ‘তারেক মাসুদ, শূন্যের ভিতরে এতো ঢেউ’-এর পাঠ-উন্মোচন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতার পরিবর্ধিত, পরিমার্জিত অনুলিখন।

মামুন হুসাইন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও কথাসাহিত্যিক।

টীকা

১. কাজী মামুন হায়দার, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ সম্পাদক।

২. মাসুদ চৌধুরীর পুরো নাম টি এম নূরুল মোদ্দাসের চৌধুরী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন