Magic Lanthon

               

মোহসিবা মিম

প্রকাশিত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

শিল্পনির্দেশনায় দাগ কেটেছে ‘আলফা’

মোহসিবা মিম


চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক উপাদান, উপকরণ। দৃশ্যগত মাধ্যমের সঙ্গে জীবন সমন্বিত থাকার কারণে তা সহজে মানুষকে স্পর্শ করে। তাই চলচ্চিত্র জীবনবোধের ভিন্ন এক পন্থা। তবে চলচ্চিত্র এমন এক শিল্প, যা নির্মাতার একা হাতে সম্পূর্ণ করা প্রায় অসম্ভব।

একটা চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে অনেক ধরনের, অনেক পেশার মানুষের সমন্বয় করতে হয়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাগ হলো শিল্পনির্দেশনা। যা চলচ্চিত্রকে জীবন্ত আর বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। কারণ শিল্পনির্দেশনা পর্দায় বাস্তব বা বাস্তবের কাছাকাছি কিছু একটা নির্মাণ করতে চায়। আর এই নির্মাণের ফলেই চলচ্চিত্র খুঁজে পায় প্রকাশের ভঙ্গি। তাই চলচ্চিত্র আর শিল্পনির্দেশনা একে অন্যের পরিপূরক। তবে নির্মাতা যা যা তুলে ধরতে চায়, তার সবটাই করতে বাধ্য শিল্পনির্দেশক। বাধ্য বলতে অনেকগুলো ভাগে, অনেক মানুষ, এই কাজ সম্পন্ন করলেও নির্মাতার ইচ্ছার বাইরে তাদের কিছুই করার থাকে না। তাই অতি প্রয়োজনীয় এই ভাগটিও দায়বদ্ধ নির্মাতার কাছে।

শিল্পনির্দেশনার অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছে মেকআপ, গেটআপ, পোশাক, পরিবেশ ও সময়। এর প্রত্যেকটার সমন্বয়ে চলচ্চিত্রে কোথাও চোখ আটকে না গেলে, সেটাই হয় সঠিক শিল্পনির্দেশনা। এবং এই শিল্পনির্দেশনার ফলেই চলচ্চিত্র তার গ্রহণযোগ্যতা পায়। তাই কখনো কখনো শিল্পনির্দেশনাকে চলচ্চিত্রের প্রাণও বলা হয়।

শিল্পনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করতে বেছে নেওয়া হয়েছে নির্মাতা নাসির উদ্দীন ইউসুফের আলফা (২০১৯)। চলচ্চিত্রটিতে একজন চিত্রশিল্পীর গল্প বলা হয়েছে। মূলত আলফা রিকশা পেইন্টার, খালের পানির উপর একটা ঘরে থাকেন; সেখানেই গড়ে তুলেছেন তার শিল্পপল্লী। জীবিকার তাগিদে সব কাজকর্ম সেরে নৌকায় করে ফিরে যান সেখানেই। আর তাকে ঘিরেই উঠে এসেছে সমাজের অন্য অনেকগুলো চরিত্র।

তার পরম বন্ধু একজন হিজড়া কালীমা/কালী, তিনি সবার বিপদে ছুটে যান, খেয়াল রাখেন আলফার। সবমিলিয়ে ভিন্ন এক হিজড়ার অবয়বে মূর্ত হন চলচ্চিত্রে। আলফার ভালোবাসার মানুষ গোলেনূর। তার স্বামী-সংসার আছে। তিনি খাবারের ব্যবসা করেন। আলফার সঙ্গে তার সম্পর্কের পরিণতি না ঘটলেও, তাদের সন্তান তার গর্ভে, আর তাকে নিয়েই স্বাধীনভাবে বাঁচার কথা ভাবেন গোলেনূর। এরা সবাই বস্তিতে থাকে, তবে অদ্ভুত এক যোগসূত্রে আবদ্ধ তারা। সেখানেই থাকেন এক বৃদ্ধ অন্ধ দোকানদার, সম্পর্কে যিনি সবার দাদা। তিনিও সবার খেয়াল রাখেন ওই দোকানে বসেই। তবে এদের সবার চেয়ে একটু আলাদা করে ভালো থাকা আর সমাজের সমস্যাগুলো সমাধানের কথা ভাবেন আলফা। তাই হয়তো রঙের বিচ্ছুরণেই তার প্রশান্তি মেলে। এই লেখায় আলফা’কে ধরে শিল্পনির্দেশনার খুঁটিনাটি আলোচনার চেষ্টা থাকবে।

একটি ‘অগোছালো’ ঘর এবং একজন শিল্পী

আলফার কেন্দ্রীয় চরিত্র আলফা। একজন শিল্পী। ছোটো একটা খালের মাঝখানে ঘর করে থাকেন তিনি। তার ঘরটাই চলচ্চিত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট যেমন আলফা, তেমনই তার ঘরটাও চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়। খালের মধ্যে বাঁশের খুঁটির উপর বাঁশের চাটাই দিয়ে তৈরি ঘর। ঘরের নিচে জমে গেছে কচুরিপানা। নৌকা থেকে ঘরে ওঠার জন্য রয়েছে কাঠের তক্তার সিঁড়ি। ঘরের পাটাতন বানানো কাঠ দিয়ে, পুরো পাটাতনের একপাশে ঘর আর সামনের অংশটা খানিক ফাঁকা; বাঁশ দিয়ে ঘেরা। সেখানে একটা পানির ট্যাঙ্ক রাখা। আলফাকে পানি এনে দেয় সামনের বস্তিতে থাকা কয়েকটি শিশু। তারা নৌকায় করে বালতি বালতি পানি এনে আলফাকে ডাকে। এরপর তিনি একটা লম্বা রশি নামিয়ে একের পর এক বালতি তুলে সেই পানি সংগ্রহ করেন ট্যাঙ্কে।

এই পুরো প্রক্রিয়া আলফার সংসার সম্পর্কে ধারণা দেয়। ঘরের অবস্থানের যৌক্তিকতা তৈরি করে। অন্যদিকে আলফার ঘরে খাবার আসে গোলেনূরের কাছ থেকে। গোলেনূর অন্য অনেকের মতো আলফার বাড়িতেও খাবার সরবরাহ করেন। অবশ্য আলফার সঙ্গে তার সম্পর্কের একটা ভিন্ন দিক আছে, সেটা আগেই বলেছি।

আলফার ঘরের একপাশটায়, দেয়ালের বদলে রয়েছে তার নিজের কিছু কাঁচের বোতল পেইন্টিং। বাতাসে দুলতে থাকা এইসব বোতলের টুঙ টাঙ শব্দ এক শৈল্পিক আবহের সৃষ্টি করে তার ‘অগোছালো’ ঘরে। শিল্পনির্দেশক খুবই কৌশলে ব্যবহার করেছেন এই বোতলগুলো। যার কারণে শিল্পীর ঘর হিসেবে ওই ঘরটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। বোতল পেইন্টিংয়ের পাশের দেয়ালে রয়েছে দুইটি জানালা, সেই জানালা ঘিরে রয়েছে কিছু লতানো গাছ, তার পাশে কিছু সুতার জাল।

এবার ঘরের ভিতরের অন্যান্য উপাদানের দিকে খেয়াল করা যাক। ঠিক যে পাশে বোতল পেইন্টিং তার সামনে রয়েছে একটা ছোটো চৌকি, আর ঘরের মাঝে একটা কাঠের বড়ো চৌকি। বড়ো চৌকিতে শীতলপাটি বিছানো আর একটা বালিশ। এটাতেই ঘুমান আলফা। চৌকির পাশে, জানালার ধারে একটা ছোটো কাঠের আলমারি রাখা। সেখানে থাকে আলফার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আলমারির উপর রয়েছে তার রিকশা পেইন্টিং রাখার কাঠের বাক্স। ঘরের একপাশে ঝোলানো ব্যবহৃত কিছু কাপড়, সেখানে প্রতিদিন আলফার পোষা পায়রারা এসে বসে। তার পাশে একটা টেবিল, টেবিলের উপর রাখা পুরনো সিডি প্লেয়ার, কয়েকটা সিডি আর অনেকগুলো বাঁশি। টেবিলের উপরে দেয়ালে ঝোলানো একটা ছোটো গিটার। অবশ্য একটা বড়ো গিটারও দেখা যায় সেই ঘরে। ঘরের অন্যান্য দেয়ালজুড়ে ঝোলানো একটা মাথাল, ছিকায় ঝোলানো মাটির হাড়ি, টিনের উপর রঙ করা ফুল। আবার চৌকির উপর ঝোলানো একটা টেবিল ফ্যান, যার সামনের ঢাকনা নেই।

আলফার পুরো ঘরে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে অনেকগুলো ক্যানভাস। ঘরের মাঝখানে একটা বড়ো ইজেল। তার সামনেই কাঠের বড়ো টুল, তার উপর রাখা বিভিন্ন রঙের কৌটা। ক্যানভাস পেইন্টিং থেকে শুরু করে নানারকমের শিল্পকর্ম রয়েছে তার ঘরে। তবে বেশিরভাগ চিত্রকর্মে উঠে এসেছে বিমূর্ত ঘোড়ার চিত্র। কখনো কাঁচের বোতলে আঁকছেন দুরন্ত ঘোড়া, কখনো ক্যানভাসে উড়ন্ত ঘোড়া। প্রতীকী অর্থে এইসব ঘোড়াকে দেখে মুক্ত জীবনের প্রতীক বলেই মনে হয়; কারণ শেষবারের মতো আলফার ক্যানভাসে ফুটে ওঠে শরীরী ঘোড়ার মুখে মানুষের অবয়ব। যা অনেকটা সমাজের মানুষের সুপ্ত বাসনাকেই হয়তো ধরা দেয়। সবমিলিয়ে ছড়ানো ছিটানো এই ‘অগোছালো’ ঘরটাই যেনো শিল্পী আলফার অস্তিত্বের জানান দেয়। এবং শিল্পীর ঘর হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা পায়।

আলফার ঘরের সেটটিকে শিল্পনিদের্শনার ভাষায় বলে বক্স টাইপ সেট। মূলত চার দেয়ালবিশিষ্ট সেটকে বলা হয় বক্সটাইপ সেট। এই ধরনের সেটে বিভিন্ন দিক থেকে শট্ নেওয়া যায়। বিভিন্ন সময়েই চলচ্চিত্রে এই ঘরটাকে নানা দিক থেকে দেখানোর প্রয়োজন পড়েছে--কখনো হাই অ্যাঙ্গেল, লো অ্যাঙ্গেল, কখনো টপ শটে। তাই এখানে বক্স সেটটাই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

আলফার ঘর দেখতে দেখতে কিম কি দুক-এর স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং-এর সেই ঘরটা চোখে ভাসে। যেখানে আলফার মতোই একাকী এক বৌদ্ধভিক্ষু থাকতেন। তবে ওই ঘর আলফার ঘরের মতো ছনের কিংবা বাঁশের নয় বরং ওটা তৈরি হয়েছে কাঠের কারুকার্যে। অসাধারণ এই ঘরের কারুকার্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। একমাত্র বাইরে থেকে দেখলেই বোঝা যায় পানির মধ্যে এই ঘর! আলফার মতো এই চলচ্চিত্রেও ঘর থেকে যাতায়াতের মাধ্যম ব্যবহার করা হয় নৌকা। বাহ্যিক কিছু মিল থাকলেও ঘর দুটোর আলাদা ইমেজ ফুটে উঠেছে।

 আলফা ও স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং-এ অনেকটা একিইভাবে বক্স সেট ব্যবহার হয়েছে


পোশাক-আশাক কেবলই দেহের বসন!

পরিশ্রমী গোলেনূর বস্তিতে থাকেন। টিফিন ক্যারিয়ারে করে তিনি খাবার সরবরাহ করেন ঘরে ঘরে; দিনের বেশিরভাগ সময় তার রান্নাঘরেই কাটে। রান্না করা, সেই খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং সংসারের অন্যান্য কাজের ফাঁকে আরো একটা কাজ তিনি খুব মনোযোগের সঙ্গে করেন তা হলো, আলফার দেখাশোনা, খাওয়ার ব্যবস্থা। অবশ্য আলফা তার কাছে অন্য আর দশজনের মতো সাধারণ কাস্টমার নন, তাকে তিনি ভালোবাসেন। এমনকি তাদের দুজনের সন্তানও গোলেনূরের গর্ভে। যদিও চলচ্চিত্রজুড়ে এই সম্পর্ক, সন্তান নিয়ে আলফার খুব বেশি আবেগ, আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি। অবশ্য এতে খুব বেশি কিছু এসে যায় না গোলেনূরেরও, সবমিলিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন তার সন্তান বড়ো হবে তার পরিচয়েই। একজন মানুষ, একজন মা, একজন নারী হিসেবে গোলেনূর নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

অন্যদিকে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো না তার, কারণটা অস্পষ্ট হলেও, বোঝা যায় সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারে স্বামীর অক্ষমতা একটা বড়ো কারণ। কিন্তু গর্ভের সন্তানের ব্যাপারে সেই স্বামীকে যে খুব বেশি ভয় পান গোলেনূর এমনও নয়। তবে স্বামীর অবহেলা, ‘পিতাহীন’ সন্তানকে গর্ভে ধারণ, প্রেমিক আলফা, সবকিছু মিলে গোলেনূরের চরিত্রে একটা জটিলতা আছে। এই জটিলতা শুধু শরীরী ভাষায় পর্দায় হাজির রাখা নির্মাতার জন্য নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। তবে সেখানে নির্মাতা অনেকখানিই উতরে গেছেন। চলচ্চিত্রজুড়ে গোলেনূরের জীর্ণ শাড়ি, চাপা মেকআপ, হাসিহীন মুখ অনেকখানি তার এই মানসিক জটিলতাকে পর্দায় হাজির রাখে।

চলচ্চিত্রজুড়ে তিনটা শাড়ি পরতে দেখা যায় গোলেনূরকে। পুরনো, মলিন, পাতলা চেকের তাঁতের শাড়ি, সুতি হাফহাতা ব্লাউজ, আর তার উপর উলের প্রিন্ট করা হাতকাটা সোয়েটার। তবে শাড়ি তিন রকমের হলেও সব শাড়ির সঙ্গে তাকে একই সোয়েটারই পরতে দেখা যায়। সামান্য ভিন্নতা দেখা যায় কেবল ব্লাউজে। তার রুক্ষ চুল সবসময় টেনে খোঁপা করা পিছনে, কখনো মাঝে সিঁথি। সার্বিক ওই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, রুক্ষ চুল আর ময়লা ব্লাউজটাও গোলেনূরের জীবনের সত্যি বার্তাটা দেয়।

গোলেনূরের ডান হাতের কবজিতে একই সুতায় দুইটা তাবিজ বাঁধা; কান ফোঁড়ানো দুই জায়গায়। নিচের কানে গোল কানের দুল, উপরে ছোটো টপ, নাকে মাঝারি নাকফুল, দুই হাতে প্লাস্টিকের চুড়ি। বাম হাতের চুড়ির মধ্যে একটা সেফটিপিন রাখা। বাড়িতে বেশিরভাগ সময় খালি পায়ে দেখা গেলেও, বাড়ির বাইরে তিনি স্যান্ডেলই পরেন। তবে তার শাড়ি পরার মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা যায়, যা তার পরিশ্রমী চরিত্রটাকেই ধারণ এবং সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তার অবস্থানকে অনেকখানি মানানসই করে। শাড়ির আঁচলে সবসময় কিছু একটা বাঁধা থাকে গোলেনূরের, যেটা বার বারই ধরা পড়ে ক্যামেরায়। শাড়ির আঁচলের এই গিট, গোলেনূরের সংসারে সম্পর্কের টানাপড়েনকেই হয়তো স্মরণ করিয়ে দেয়।

সবমিলে এই রকম একটি জটিল চরিত্রকে ধারণ করতে গোলেনূরের মেকআপ, গেটআপের দিকে যথেষ্ট নজর দিতে হয়েছে শিল্পনির্দেশককে। কম বয়স, হাড়ভাঙা পরিশ্রম, চাপা গায়ের রঙ, কাজলটানা নিরুপায় চোখ, জীর্ণ শাড়ি, রুক্ষ চুল, সেই চুলের আবছায়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ--সব যেনো জীবন্ত করে তুলেছে তাকে। শরৎচন্দ্রের ভাষায়, ‘ঠিক যেন ফুলদানিতে ভিজাইয়ে রাখা বাসি ফুলের মতো।’ সৌন্দর্য আছে, কিন্তু তা সামান্য স্পর্শেই ঝরে পড়বে।

পেশার জন্য বাড়ি নাকি বাড়ির জন্য পেশা ...

যে খালের মধ্যে আলফার ঘর, ঠিক সেই খালের পাড় ঘেঁষে গোলেনূরের ঘর। বস্তির মধ্যে সেই ঘর বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে। চিকন কাঠের তক্তা আর টুকরো টিন দিয়ে তৈরি সেই ঘর দেখে বস্তির ঘর বলে মেনে নিতে খানিকটা কষ্টই হয়েছে। কারণ বস্তিতে ঘর থাকে; কিন্তু ওটা দেখে বাড়ি মনে হয়, সেখানে বেশ খানিকটা উঠোনও আছে। তবে অন্যান্য আসবাবপত্রের বিন্যাস হয়েছে বস্তির ঘরের মতো করেই। তাই ঢাকা পরেছে খানিক অসামঞ্জস্য। যেমন, ঘরের দরজা অনেকটাই ছোটো; খানিক কষ্ট করেই ঘরে ঢুকতে হয় গোলেনূরের স্বামীকে। যা ক্যামেরায় ধরা পড়ে বার বার। এবার ঘরে ঢোকা যাক। ভিতরে আসবাবপত্র বলতে চোখে পড়ে তোশক ছাড়া একটি খাট, কাঠের র‌্যাক আর কাঠের একটা বেঞ্চ। খাটের উপর পুরনো, জীর্ণ বেডশিট আর বালিশ। এককোণায় মশারি ঝোলানো। অন্যদিকে র‌্যাকজুড়ে রান্নার সরঞ্জাম, একপাশে দুটো বাক্সও আছে। খাটের পায়ের সঙ্গে হেলানো দিয়ে রাখা শিলপাটা।

থাকার ঘরের সামনেই ছোটো উঠোন। উঠোনের পাশেই আঙিনার মতো অল্প একটু ফাঁকা জায়গা, এই পুরো জায়গায় ছাউনি হিসেবে কাজ করেছে লাউয়ের মাচা। এর এককোণায় টিন, কাঠ আর কাপড় দিয়ে ঘেরা গোসলখানা, তার পাশেই কয়েকটা সিলভারের পানির কলস আর বালতি। আর অন্যপাশে পাটি বিছিয়ে সবার জন্য টিফিন বাটিতে খাবার বাড়েন গোলেনূর। কালী সেগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে ছোটো বাচ্চাদের হাতে দেয়। তারা খাবার পৌঁছে দেয় সবার কাছে, তবে কিছু বাটি গোলেনূর নিজেও পৌঁছে দেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ব্যবসায়ী গোলেনূর নিজের ব্যবসাটাকেও চরিত্রের মধ্যে ধারণ করেন।

উঠোনের সামনেই পুরনো টিন দিয়ে ঘেরা একটি রান্নাঘর। জঙ ধরা টিনে ফুটো হয়ে গেছে। রান্নাঘরের একপাশে চুলায় রান্না চলে, সেখানেই দরজার সামনে বসে তরকারি কাটেন গোলেনূর। আর বাকি অংশজুড়ে রান্নার নানা জিনিসপত্র--হাঁড়ি, টিফিন বাটি, বিভিন্ন আকারের রান্নার সস্পেন, সবজির ডালা; উঠোনজুড়ে ছড়ানো ছিটানো অনেকগুলো সিলভারের টিফিন বাটি। বাড়ি, রান্নাঘর আর উঠোনজুড়ে যা চোখে পড়ে তার বেশিরভাগই রান্নার সরঞ্জাম। এতো রান্নার জিনিসপত্র ওই বাড়িটাকে যেমন স্টাবলিশ করে তেমনই বার বার মনে করিয়ে দেয়, গোলেনূরের সংসার, জীবন জীবিকা সবকিছুই চলে এই রান্নাকে কেন্দ্র করে।

চোখের আলোয় একই রকম, বাইরে আলোয় ভিন্ন

কালীমা রূপান্তরকামী। টিন আর বাঁশ দিয়ে ঘেরা বস্তির একটা ঘরে তিনি থাকেন। সেখানে তার বেঁচে থাকার সঙ্গী একটা কুকুর, গাধা আর চার পথশিশু। এরা সবাই কালীর সন্তান। শিশুদের গোসল থেকে খাইয়ে দেওয়া সব যেমন কালী নিজ হাতে করেন, তেমনই বুলু (কুকুর) আর মনু মিয়ার (গাধা) শরীর খারাপ হলেও একই রকম উদ্বিগ্ন হন তিনি। শুধু এরা নয়, বস্তিতে সব বয়সের মানুষের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক। গোলেনূরের ব্যবসার টিফিন বাটি গুছিয়ে দেওয়া, আলফার ঘরে বাচ্চাদের দিয়ে পানি পৌঁছানো, সবদিকে তার সমান খেয়াল।

ঘরের সামনে সামান্য ফাঁকা জায়গায়, বাঁশ-টিনের ছাউনি, সেখানেই বসে রান্না করেন কালী। পাশেই বসে থাকে বুলু। রান্না শেষে নিজ হাতে খাবার বেড়ে দেন বাচ্চাদের। তারা চুলার পাড়েই পিঁড়িতে বসে খায়। এর ঠিক সামনেই বাঁশ দিয়ে ঘেরা অল্প জায়গা, সেখানে বাঁধা থাকে গাধা মনু মিয়া। প্লাস্টিকের বড়ো বালতিতে করে খাবার দেওয়া হয় তাকে। অবশ্য মনু মিয়া কেবল বসে বসে খায় না, শিল্পী আলফার চিত্রকর্ম বহনে সহায়তা করে। বেমানান লাগলেও যান্ত্রিক এই শহরে আলফার চলাচলের সঙ্গী মনু। তার পিঠে করে চিত্রকর্ম নিয়েই শহরজুড়ে আলফা ঘুরে বেড়ান। নির্মাতার এ এক আসাধারণ চিন্তা, সঙ্গে হয়তো প্রতিবাদও। আলফা তার বোতল পেইন্টিং, রিকশা পেইন্টিংয়ের প্লেট, কাঠের বাক্সে ভরে চাপিয়ে দেন মনু মিয়ার কাঁধে, এরপর তাকে নিয়ে পাড়ি দেন শহরের রিকশা গ্যারেজগুলোতে। সারাদিনের বেচাকেনা শেষে বস্তিতে ফিরে তাকে আবার ফিরিয়ে দেন কালীমার হাতে। এসবের মধ্য দিয়ে অনেকটাই পরিষ্কার হয়, আলফার একাকী জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ--কালীমা, মনু মিয়া আর ওই বাচ্চারা।

কালী কুচি করে শাড়ি পরেন। শাড়িটা বেশ খানিকটা উঁচু করেই পরেন, নিচের পেটিকোটটা দেখা যায়। শাড়ি পরার এই ঢঙটা তার সঙ্গে বেশ মানানসই হলেও, শাড়ির ভাঁজগুলো একেবারেই নতুন দেখায়। নতুন প্রিন্টের শাড়ির চকচকে ভাবটাও চোখে লাগে। পারিপার্শ্বিক বিবেচনায় কালীর পোশাকের যে রিপ্রেজেন্টেশন তা অনেক ক্ষেত্রেই বেমানান মনে হয়েছে।

তবে চলচ্চিত্রজুড়ে রূপান্তরকামী কালীর যে রিপ্রেজেন্টেশন তা উল্লেখ না করলেই নয়। কারণ গত দুই দশকে গণমাধ্যমে রূপান্তরকামীদের যে রিপ্রেজেন্টেশন এবং তার মধ্য দিয়ে যে ডিসকোর্স নির্মাণ হয়েছে, তার সঙ্গে কালী ঠিক যান না। তাদের আচরণ, পোশাক, সাজের সঙ্গে কালীর রাত-দিন ফারাক। যদিও একজন রূপান্তরকামী যে ধরনের অমানবিক আচরণ পরিবেশ ও সমাজ থেকে পায় এবং তার মধ্য দিয়ে এই সমাজে যেভাবে বেড়ে ওঠে, তা বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অজ্ঞাত। ফলে গণমাধ্যম নির্মিত সেই ডিসকোর্সই প্রাধান্যশীল হয়। এর বিপরীতে একেবারে নতুন এক রূপান্তরকামীকে আলফায় হাজির করা হয়েছে; এজন্য নির্মাতা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

চলচ্চিত্রজুড়ে দুইটা শাড়ি পরতে দেখা যায় কালীমাকে। শাড়ির সঙ্গে পাতলা উল কাপড়ের হাফহাতা ব্লাউজ, সবুজ রঙয়ের ব্লাউজের হাতে এবং গলায় লাল রঙের চিকন পাইপেন। শাড়ি সবসময় পরলেও কখনো আবার ছোটো হাতের মেক্সিতেও দেখা যায় তাকে। দুই হাতে সোনালী রঙের চিকন চুড়ি, কানে লম্বাটে দুল, নাকে মাঝারি নাকফুল, চোখে গাঢ় কাজল আর কপালে ছোটো টিপ। সোজা চুল কখনো টেনে খোঁপা করা কখনো বিনুনি। চোখের কাজল আর কপালের টিপ যতোটা মানানসই, ঠিক ততোটাই বেমানান তার চুলের গঠন। সোজা চুলটা একবারে কৃত্রিম মনে হয়েছে, বিশ্বাসযোগ্যতাও ছিলো খুব সামান্য। যা এই চরিত্রটাকে প্রাণবন্ত করে তুলতে বাধা সৃষ্টি করে।

অন্যদিকে সমাজের অন্যান্য রূপান্তরকামীদের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই নারী হয়ে উঠতে চায়। কারণ রূপান্তরকামীদের যেহেতু কোনো লৈঙ্গিক পরিচয় থাকে না, তাই তারা কোনো একপক্ষে যেতে চায়; এই পক্ষটা তাদের মানসিক গঠনের ওপর নির্ভর করে। তবে অধিকাংশ রূপান্তরকামী হিজড়া পেশায় জড়িত থাকায় নিজেদেরকে নারী হিসেবে অনুভব করে; তাদের নারী হওয়ার দিকেই ঝোঁক বেশি দেখা যায়। এছাড়া হিজড়া পেশায় জড়িত রূপান্তরকামীদের অনেকে যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে। এতে নারীর সাজে তাদের সুবিধা হয়। এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন, লৈঙ্গিকভাবে সংশয়ে থাকা এমন মানুষেরা সবাই কিন্তু হিজড়া নয়। হিজড়া একটি বৃত্তি বা পেশার নাম; যার মাধ্যমে তারা একটি বিশেষ শ্রেণির জীবনধারণ করে। ফলে যারা এ পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় তাদের মানসিক পরিস্থিতির কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয় না। কারণ তারা মানসিকভাবে বাহ্যিক লৈঙ্গিক চরিত্র ধারণ করে না। ফলে বাহ্যিকভাবে দেখতে নারী হলেও আপাতদৃষ্টিতে তারা পুরুষ। আবার বাইরের অবয়ব পুরুষ হলেও মানসিকভাবে তারা নারী। ফলে যারা মানসিকভাবে নিজেকে নারী বলে অনুভব করে, তাদের চেষ্টা থাকে সবসময় নারী হওয়ার।

একটু খেয়াল করলেই চোখে ভাসে ঋতুপর্ণের চিত্রাঙ্গদা (২০১২)। সেখানে রুদ্রের চরিত্রে অভিনয় করেন ঋতুপর্ণ নিজেই। রুদ্র শারীরিকভাবে পুরুষ, কিন্তু তার ভিতরের সত্তাটা নারীর। তাই দিনশেষে রুদ্রও নারী হতে চেয়েছেন। এমনকি চিত্রাঙ্গদার টাইটেলে বলা হচ্ছে, এটা ইচ্ছে পূরণের গল্প। তার মানে একজন মানুষের, তার লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারণের অধিকার আছে। তার নিজের শরীর সে তার মতো করে গড়ে নিতে পারে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র তা সহজে মেনে নিতে চায় না। একই রকম দৃশ্য লক্ষ করা যায় চলতি সমাজের রূপান্তকামীদের মধ্যে। তারাও হয়ে উঠতে চায় নারী। তবে নারী হতে চাওয়ার মানসিক ইচ্ছার পাশাপাশি সেই ছোঁয়াও লক্ষ করা যায় তাদের পোশাক আর সাজগোজে। তবে নারী হয়ে ওঠার সব চেষ্টার ভিতরেও কোথায় যেনো একটা অসামঞ্জস্য থাকে। চোখে পড়ে তাদের ভিন্নতা। এর ব্যতিক্রম নয় কালীমা। তিনি গোলেনূরের মা হওয়া দেখে নিজে স্বপ্নের জাল বুনেন; মাতৃত্বের তাগিদে পালন করেন পথশিশুদের। তবে মাতৃত্ব আর নারী হয়ে ওঠাটা রূপান্তরকামীদের মতো হলেও, তার পোশাক মেকআপ ছিলো ভিন্ন। যা আগেই আলোচনা হয়েছে। তাই কালী হয়তো তার কাজলটানা চোখের মধ্যে দিয়েই সমাজের পরিবর্তনকে লালন করেন, ধারণ করেন ভিন্ন এক রূপান্তরকামীর অবয়ব।

পরোপকারী কালীমা সবার বিপদে ছুটে আসলেও, আলফার ব্যাপারে একটু বেশিই সচেতন থাকেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করেন শিল্পী আলফার অনুভূতি, তার কর্মযজ্ঞ। আলফাও অন্য সবার চেয়ে একটু বেশিই ভরসা করেন কালীকে। সবটা তার চরিত্রের মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন শিল্পনির্দেশক। তবে সামান্য কিছু অসামঞ্জস্য ব্যতিরেকে জীবন্ত হয়েছে এই চরিত্র।

পোশাকে মেকআপে দাদা

বৃদ্ধ, অন্ধ দাদা বস্তির প্রাণ; পেশায় বস্তির ঝুপড়ির দোকানদার। চোখে দেখতে না পেলেও পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অন্যগুলোর ক্ষমতায় তিনি সবাইকে চিনতে পারেন, বুঝতে পারেন। যারা দেখতে পায়, তাদের চেয়ে তিনি একটু বেশিই ‘দেখেন’, বেশিই বোঝেন। বস্তির সবার হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ সবদিকে নজর তার। বস্তির মধ্যে পাশাপাশি অনেকগুলো দোকান, এমনি একটা দোকানের সামনে চৌকি পেতে দোকান বানিয়ে সারাক্ষণ বসে থাকেন তিনি। সেখানে বসেই তিনি খেয়াল রাখেন সবার। দোকানের সামনে দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেই, হাঁটার শব্দে চিনে ফেলেন তাকে। এরপরেই ডেকে গল্প করেন, খোঁজ নেন। গোলেনূরের গর্ভের কয় মাস, শিউলীর কেনো চাকরি হয় না, আলফা কার ঠিকানা খুঁজে বেড়ান, তার কাছেই যেনো সব খবর। অন্যদিকে সবার ভালোবাসা আর পরম নির্ভরতার জায়গাও দাদা।

পাটি বিছানো চৌকির উপর টিনের ছাউনি। চৌকির সামনে অনেকগুলো আচার আর চকলেটের কৌটা, তার পিছনে একটা ঢোল নিয়ে তিনি বসে থাকেন। মাঝে মাঝেই ঢোলটাকে গলায় ঝুলিয়ে বাজাতে শুরু করেন মনের আনন্দে। ঢোলের পাশেই থাকে তার লাঠি কারণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না তিনি। সবসময়ই গলায় তাবিজ ঝোলানো থাকে তার, এক সুতায় ঝোলানো অনেকগুলো তাবিজ। দাদার দোকানের সামনে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স দেখা যায়, সেখানেই বসে সবাই গল্প করেন দাদার সঙ্গে।

দাদাকে সবসময় ছোটো চেকের লুঙ্গিতেই দেখা যায়; সঙ্গে গেরুয়া রঙের শার্ট, তার নিচে আরেকটা সাদা শার্ট, তার নিচে গেঞ্জি। আর মাথায় ছেঁড়া টুপি। দুইটা শার্টের বোতামই খোলা, তাই নিচের গেঞ্জিটা স্পষ্ট দেখা যায়।

প্রাণচঞ্চল দাদাকে ফুটিয়ে তুলতে শিল্পনির্দেশক খুব সচেতনভাবেই তার মেকআপ করেছেন বলে মনে হয়। কারণ তার অন্ধ চোখের আকুতি, সবার জন্য দুশ্চিন্তা, এমনকি সবার খুশিতে গা ভাসানো, সবটা ভেসে ওঠে তার চেহারায়, চলচ্চিত্রের ভাষা মেকআপে। যা এই চরিত্রটাকে অনেকখানি বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। তবে মেকআপ তার সঙ্গে মানানসই হলেও পোশাকে কিছুটা অসামঞ্জস্য চোখে পড়ে। কারণ তার গেরুয়া রঙের শার্টের নিচে সাদা রঙের শার্টটা চোখে লেগেছে। যেটা একেবারেই নতুন, অন্যদিকে তার টুপিতে জায়গায় জায়গায় ছিলো তালি মারা, যার পুরোটায় কৃত্রিম মনে হয়েছে। ফলে পারিপার্শিকতার সঙ্গে মিল রেখে তাকে কিছুটা বেমানান লেগেছে। তবে পোশাকটা বেমানান হলেও, মেকআপ তাকে জীবন্ত করেছে। যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। ধীমান দাশগুপ্তের মতে, চলচ্চিত্র এমন একটা মাধ্যম যেখানে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের মতো স্রষ্টা আর ভোক্তার সম্পর্ক বিপ্রতীপ সূত্রে নিবন্ধ। রূপকল্পনা আর কল্পরূপের ক্ষেত্রে শিল্পী প্রথমে যে কোনো বিষয়কে তার বোধে আনেন, তারপর সেটা দৃশ্য আর প্রতিমার মাধ্যমে আনেন দর্শকের সামনে। কিন্তু দর্শকের ক্ষেত্রে ঘটে উল্টো ঘটনা। তারা আগে দৃশ্যরূপ আর প্রতিমা দেখে, তারপর সেটা বোধে আনে।১ এই সূত্র মেনে নিলে, খানিকটা অমিল চোখে পড়ে দাদার ব্যাপারে। কারণ দাদার মেকআপ, গেটআপ আর কথাবার্তায় বার বারই উঠে আসে এক ধরনের দার্শনিক কিংবা আধ্যাত্মিক ভাব। কিন্তু তার চারপাশের পরিবেশটা এটাকে কেমন জানি সমর্থন করে না। তাই ওই দৃশ্যরূপে এই বিষয়টা বোধে আনতে কষ্ট হয় দর্শকের। ফলে শিল্পী তার বোধে আনার চেষ্টা করলেও দৃশ্যরূপে তা হারিয়ে যায়। তাই কোনো পরিবেশ ছাড়া হঠাৎ তার এই আচরণ কিছুটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো, খাপছাড়া, বেমানান লাগে।

নীড় হারা পাখি, শেকড়ের সন্ধানে

চলচ্চিত্রে আলফা, গোলেনূর আর পারিপার্শ্বিক অন্যান্য অবস্থার সঙ্গে আরো একটা জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর তা হলো রাতের অন্ধকারে আলফার ঘরের নিচে ভেসে আসা লাশ। সেই লাশকে কেন্দ্র করেই অন্যদিকে মোড় নেয় চলচ্চিত্রের গল্প। ৩৫ মিনিট ২৩ সেকেন্ডে আলফা ঘরে ছবি আঁকছিলেন, এমন সময় হঠাৎ শব্দে তার মনোযোগ নষ্ট হয়। তিনি কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে দেখতে পান, কচুরিপানার মধ্যে উপুড় হয়ে থাকা একটা লাশ। দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না মৃতদেহটি পুরুষের। পরনে ধূসর রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট, কোমরে বেল্ট; গায়ে-পায়ে কাদার ছোপ ছোপ দাগ, হাত দুটো পিছনে বাঁধা। আলফা ভয় পেয়ে লাঠি দিয়ে মৃতদেহটাকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন ঘরের নিচ থেকে। তবে বার বার সেই লাশটি ফিরে আসতে চায় তার কাছেই। তাই হয়তো ভেসে যাওয়ার সময় সে সঙ্গে নিয়ে যায় আলফার ঘরের নিচের কচুরিপানা।

পরের দিন সকালে আবারও আগের জায়গায় দেখা যায় মৃতদেহটি। আলফা বাধ্য হয়ে পুলিশে খবর দেন, তবে পুলিশ এসে আর লাশ খুঁজে পায় না। পুলিশ খুঁজে না পেলেও রাতে আবার লাশ আসে আলফার কাছে। আলফা তখন কথা বলতে শুরু করেন লাশের সঙ্গে। একপর্যায়ে তার পকেট থেকে উদ্ধার করেন সন্তানের ছবি; সেই ছবির পিছনে লেখা থেকেই জানা যায় লাশের নাম সোলায়মান।

খোঁজ নিয়ে আলফা ছুটে যান তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। ফিরে এসে তিনি জানতে পারেন, ঘরের নিচে থেকে পুলিশ লাশ পেয়ে থানায় নিয়ে গেছে। সেখানে গিয়ে তিনি পুলিশ আর ডোমের সঙ্গে কথা বলেন। সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা থানের লুঙ্গি পরা ডোম। গলায় লাল গামছা ঝোলানো, মাথায় কোঁকড়া, লম্বা চুল ছেড়ে দেওয়া। তার চোখে মুখে ফুটে উঠেছে ভিন্ন এক নির্মমতা। ‘নির্মমতা’ শব্দটা আক্ষরিক অর্থে বলা যেতে পারে, কারণ যাকে জীবিকার তাগিদে সারাক্ষণ লাশের সঙ্গে থাকতে হয়, তার কাছে কষ্ট পাওয়া সত্যিই বেমানান। তবে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দিষ্ট কোনো অবয়ব নেই ডোমের। তাদের কারও চরিত্রে রহস্যময়তা দেখা গেলেও, কারও মাঝে পাওয়া যায় নিষ্ক্রিয়তা। কেউবা নির্মম, নিষ্প্রভ। তাই চলচ্চিত্রের এই ডোমের মধ্যে কিছুটা নির্মমতা চোখে পড়লেও, খানিকটা ঘাটতি থেকে যায় অন্যান্য উপাদানের। যা ওই চরিত্রটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বাধা দেয়।

ডোমের সঙ্গে কথা বলে আলফা মর্গে গিয়ে দেখতে পান সাদা কাপড়ে ঢাকা সোলায়মানের লাশ। সেখান থেকে লাশ বের করে গাধা মনুর পিঠে করে আলফা নিয়ে আসেন। এরপর সাদা কাফনের কাপড়ে মুড়ে মাথায় দড়ি বেঁধে নৌকায় করে নিয়ে যান মাঝ নদীতে। চারদিকে শান্ত, নিস্তব্ধ নদীর মাঝে ভাসিয়ে দেন লাশ।

এই লাশটা দেখার পর মাথায় আসে নির্মাতা মেল গিবসনের এপোক্যালিপ্টো (২০০৬) চলচ্চিত্রের কথা। একইসঙ্গে এপিক, হিস্টোরিকাল ও অ্যাডভেন্সারধর্মী এই চলচ্চিত্রটি প্রত্যেকটা শটে বুঁদ করে রাখে দর্শককে। সেখানেও নানাভাবে উঠে আসে অনেকগুলো লাশের শট্। একপর্যায়ে দেখানো হয় লাশের একটা ভাগার। ভাগারের পঁচা লাশ, লাশের উপরে মাছি, সব যেনো চোখের সামনে জীবন্ত মনে হয়। কোনো কোনো সময় এতো বেশি জীবন্ত হয়ে উঠে, যেনো মনে হয় দর্শক স্ক্রিনে দেখা লাশের গন্ধ পাচ্ছে। সেই দিক বিবেচনা করলে আলফার কাফনে মোড়া লাশটাকে খানিকটা খেলো মনে হয়। নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার সময় দড়ির মাথায় বাঁধা লাশটাকে মৃত ব্যক্তির লাশ হিসেবে মেনে নিতে মন সায় দেয় না। কারণ কাফনে মোড়ানোর পরে ওই বস্তুটি লাশ হিসেবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। তবে কিছুটা স্বস্তি দেয় খালের পানিতে ভেসে থাকা লাশটি। শার্ট, প্যান্ট, কাদার ছোপ ছোপ দাগ আর পিছনের হাত বাঁধা থাকলেও তা মৃত ব্যক্তির অস্তিত্বের জানান দেয়।

একটু খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা

সাধুখালি, সেখানেই থাকে মৃত সোলায়মানের বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া বৃদ্ধ মা। মাটির ভাঙা, ধসে পড়া ঘরে একা বসে অপেক্ষা করেন ছেলে সোলায়মানের জন্য। ছোটো ঘর তার সামনেই একটা বারান্দা; সিমেন্টের পিলার, তবে বারান্দায় ওঠার জায়গাটায় মাটি ভেঙে পড়েছে। তাই সেখানে কিছু ইট ছড়ানো ছিটানো। বারান্দার এক কোণে চৌকি পাতা, তার পাশেই ঘরের দরজা। অন্য কোণে মাটির চুলা, পাশে রাখা প্লাস্টিকের ডালা, আর বাসন-কোসন। মা প্রতিদিন সকালে ছেলের জন্য পিঠা ভাজেন, কারণ ছেলে ফিরে আসবে। তাই আলফা যখন ওই বাড়িতে যায় মা বলে ওঠেন, ‘কে, সোলায়মান!’ ঠিক যেনো আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সেই কবিতার পঙক্তির মতো--“‘খোকা এলি’ ঝাপসা চোখে মা তাকায়”। কিন্তু খোকা আর ফেরে না, এই সমাজে হাজারো খোকারা এভাবেই নিরুদ্দেশ হয়ে যায়।

এই মায়েদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতেই হয়তো আলফাদের আগমন। তাই আলফা জানান না, সোলায়মান আর নেই। তিনি রাতে থাকেন সোলায়মানের মায়ের কাছে। বারান্দার চৌকিতে ঘুমান আলফা, আর সারারাত ধরে পাহারা দেন মা। মাথার উপর হারিকেনের হালকা আলো, আর পাশের দেয়ালেই বাঁশ ঝাড়ের ছায়া। এই সবটা অন্যরকম এক শৈল্পিক আবহের সৃষ্টি করে বাড়িটিতে। যা গ্রামের ভাঙা, জীর্ণ বাড়ি হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু মাটির ভাঙা বাড়ির সিমেন্টের পিলার খানিকটা খাপছাড়া লাগে। কোথাও যেনো আম-দুধ মিশে গেলেও আঁটিটা থেকেই গেছে!

তবে বাড়িতে সামান্য ঘাটতি থাকলেও নির্মাতা তা পুষিয়ে নিয়েছেন মায়ের মেকআপ গেটআপে। তার পরনে সাদা থান কাপড়ের শাড়ি। শাড়িটা বাঙালি ঢঙে পরা, মাথায় এমন করে ঘোমটা দেওয়া যাতে চুল খানিকটা দেখা যায়। পাকা চুল টেনে খোঁপা করা, চাপা গায়ের রঙ, চোখের ভাঁজে সন্তান ফিরে পাওয়ার আশা। কারণ শুধু সোলায়মান নয়, এর আগেও তিনি হারিয়েছেন তিন সন্তান। আগের সন্তানরা মারা যাওয়ার পর ১২ বছর রোজা রেখে, মানত করে তবেই পেয়েছেন সোলায়মানকে। তার এই আকুতি, আবেগ, অনুভূতি সবটার আভাসই পাওয়া যায় তার মেকআপ গেটআপে। তার চোখ মুখ, চলাফেরা, এমনকি কথাবার্তার মধ্যেও তা ভেসে ওঠে বার বার। সবমিলিয়ে তার মধ্যে ফুটে উঠেছে সন্তান হারা এক মায়ের বেদনা।

রঙের কারিগরের রঙ নিয়ে কারবার

রঙ শিল্পীর অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। আলফার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। চলচ্চিত্রে ৪৫ মিনিটে দেখা যায়, বস্তির মধ্যে সবাই একটা দোকানে টিভিতে খবর শুনছে--রাস্তায় বাসে পেট্রোল বোমা মেরেছে দুর্বৃত্তরা, দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে বাসে। সে খবর শেষ হতে না হতেই জানা যায়, টোলারবাগে পোশাক কারখানায় আগুন লেগেছে। এই ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে বস্তিতে; কারণ বস্তির কয়েকজন মেয়ে কাজ করে ওই কারখানায়। আলফা এক কোণে দাঁড়িয়ে খেয়াল করছিলেন সবটা। কালী এসে তাকে জানান, রুপা-মালাদের গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগেছে। এসব শুনে নীরব, নিস্তব্ধ আলফা হঠাৎ করেই একটা বড়ো সাদা কাপড় ছড়িয়ে দেন বস্তির মধ্যে, এরপর জোরে জোরে চিৎকার করতে থাকেন, একপর্যায়ে বসে পড়েন মাটিতে।

শিল্পীরা স্পর্শকাতর হয়, এর ব্যতিক্রম নন আলফাও। তাই পেট্রোল বোমা আর কারখানার আগুন তাকে নীরব থাকতে দেয় না। তার চোখে মুখে ভেসে ওঠে তীব্র আর্তনাদ আর ক্ষোভ। চলচ্চিত্রজুড়ে এই একটা শটেই আলফাকে এতোটা উদ্বিগ্ন দেখায়। তার উদ্বিগ্নতার মধ্যে দিয়েই সমাজ-রাষ্ট্রের নিরীহ নিরুপায় মানুষের দুঃখ, কষ্ট আর আহাজারির বহিঃপ্রকাশ ঘটান নির্মাতা। যা চলচ্চিত্রটিকে ভিন্ন এক রূপ দান করে।

এ সময় তার লম্বা চুল ছিলো ছেড়ে দেওয়া আর চোখে মুখে রুক্ষতার ছাপ। সবমিলিয়ে তার লম্বা চুলের রুক্ষতা প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। এরপর আলফা ছুটে গিয়ে মনু মিয়ার (গাধা) গায়ে ঝুলে থাকা বড়ো বড়ো রঙয়ের কৌটা এনে ছড়িয়ে দিতে থাকেন কাপড়ের উপর। প্রথমে লাল রঙ এরপর তার উপর একে একে সবুজ, হলুদ, নীল রঙ ছড়িয়ে দেন তিনি। প্রত্যেকটা রঙ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক। তারপর তিনি গড়াগড়ি শুরু করেন সেই রঙয়ের উপর, সঙ্গে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার। তার চিৎকারে নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ, সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকেন তাকে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ রঙে ডুবে যান আলফা; নিজেই হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মূর্তি। রঙে ভেজা, নিস্তব্ধ আলফা শিল্পীর আবেগে তার রাগ, ক্ষোভের প্রকাশ ঘটান। তাই সচেতনভাবে শিল্পনির্দেশক রঙের বিচ্ছুরণে শৈল্পিক আবহ তৈরির পাশাপাশি, রঙকে প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ফুটিয়ে তুলতেও সক্ষম হন।

শেষকথা

শিল্পনির্দেশনা চলচ্চিত্রের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে তখনই যখন যোগ্য শিল্পনির্দেশকের সমন্বয়ে তা বাস্তবিক হয়ে ওঠে। তাই একজন পরিপূর্ণ শিল্পনির্দেশকের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প ও গ্রাফিক, পোশাক-পরিচ্ছদ, মেকআপ এমনকি চিত্রগ্রহণ ও আলোকসম্পাত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ শুধু দৃশ্যগুণ নয়, ছবির মেজাজ ও অ্যাটমসফেয়ারও এনে দেন তিনি। সবমিলিয়ে শৈল্পিক, কারিগরি ও অর্থগত তিন বিবেচনাকে মাথায় রেখে চলচ্চিত্রে পরিপূর্ণতা আনে সে-ই। তবে এতো গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করলেও; স্বাভাবিকভাবে তার স্বীকৃতি খুবই সামান্য। চলচ্চিত্রের অন্যান্য কলাকুশলীদের সঙ্গে তার বৈষম্যের জায়গা থেকেই যায়। তবে দিনে দিনে চলচ্চিত্রে অনেক পরিবর্তন, পরিবর্ধন এসেছে/আসছে, সেই সঙ্গে শিল্পনির্দেশনাতেও। কোনো কোনো বিদেশি চলচ্চিত্রে শুধু শিল্পনির্দেশনায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। আলফার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, শিল্পনির্দেশক সমীরণ দত্ত ভিন্নধর্মী কিছু একটা করার চেষ্টা করেছেন। কখনো পানির মধ্যে শিল্পীর ঘর থেকে শুরু করে শহরের বস্তি, কখনো লাশ, সাধারণ মানুষ। সবটা খুবই নিপুণ হাতেই করেছেন তিনি। যা আলফাকে অনন্য করেছে।

লেখক : মোহসিবা মিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

mohsibamostary@gmail.com

https://www.facebook.com/mohsibamim

তথ্যসূত্র

১. দাশগুপ্ত, ধীমান (২০০৪ : ২০); ‘কম্পোজিশন ও ইমেজের সম্পর্ক : দৃশ্যরূপ থেকে ভাবানুভূতি’; সিনেমায় ইমেজ; বাণীশিল্প, কলকাতা, ভারত।

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন