মো. হারুন-অর-রশিদ
প্রকাশিত ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বাংলাদেশের নতুন চলচ্চিত্র
প্রত্যাশিত অন্ধকারের মধ্যে আলোর হাতছানি
মো. হারুন-অর-রশিদ

এক পথ, তিন প্রজন্ম
প্রযুক্তির বদৌলতে গত দুই দশকে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বড়ো ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। যা চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন কিছু ইঙ্গিত করে। যদিও এই সময়ে দেশীয় ইন্ডাস্ট্রি নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার চাপা কষ্ট রয়ে গেছে। সাধারণত চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সাম্প্রতিক আলোচনায় অতীত বিচার, সেই অনুযায়ী বর্তমানের পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ চিন্তায় অন্ধকার নেমে আসার প্রবণতা দেখা যায়। তারপরও ধ্বংসের ছাই-ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো চলচ্চিত্রে নতুন এক দিশা সঞ্চার হতে চলেছে বলে মনে হয়। অবশ্য শুরুটা অনেক আগেই হয়েছিলো। সেই ৭০ দশকে স্বাধীন দেশের চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯)। সেই ধারাবাহিকতায় নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে ৮০’র দশকে চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের হাতে জন্ম নিয়েছিলো বিকল্পধারা নামের আন্দোলন। সেখান থেকেই মূলত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে এফ ডি সি কেন্দ্রিক লোকজনেরা প্রতিষ্ঠানটিকে আঁকড়ে ধরে থাকার চেষ্টা করেছে; অন্যরা প্রতিষ্ঠানের বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন করতে থাকে। এই বিভক্তি দিনশেষে যে কারো জন্যই ভালো কিছু বয়ে আনেনি তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা দেখে অনেকখানিই বোঝা যায়।
ঢাকাই চলচ্চিত্র নিয়ে এই দুই ভাগের বাইরে নতুন আরেকটি প্রজন্মও রয়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে প্রযুক্তির সুবিধা-সহজলভ্যতায় একেবারে নতুন এই প্রজন্মটির সম্ভাবনা জোরালো হচ্ছে। যারা সামান্য মোবাইল ফোনসেট, ছোটো ছোটো ক্যামেরা থেকে ডি এস এল আর, হাতের নাগালে যা পাচ্ছে তা-ই দিয়ে প্রচুর ভিডিও নির্মাণ এবং প্রচার করছে। এর শুরুটা ‘ইউটিউব’ কেন্দ্রিক হলেও পরবর্তী সময়ে তা ফেইসবুক ও ওয়েবভিত্তিক নানা প্লাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। এ দৃশ্য এখন শহর থেকে গ্রাম, সর্বত্র। তবে প্রযুক্তি সর্বস্ব হলেও চলচ্চিত্র নিয়ে কিন্তু এই প্রজন্মের আগ্রহের কমতি নেই। বরং এটি এমন এক প্রজন্ম যাদের সামনে প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রযুক্তি হাজির হয়ে থাকে। দিনে দিনে প্রযুক্তি-ব্যয়ও হাতের নাগালে চলে আসে। এক দশকেরও বেশি আগে চলচ্চিত্রনির্মাতা নূরুল আলম আতিক যেমনটা বলেছিলেন,
... ডিজিটাল মুভিমেকিং দিনকে দিন সহজ পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সময়ের অন্যসব অনুষঙ্গের মতো এটিও সহজলভ্য হওয়ায় সিনেমাও বনেদি জমিদারের হাবভাব ছেড়ে গণমানুষের কাঁতারে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রাখে। এক্সপেরিমেন্টেশনের অপার সম্ভাবনা। জাঁ কঁকত যেরকমটা আশা করেছিলেন--ছবি তৈরির ব্যাপারটা কাগজ-কলমের মতোই সস্তা হতে যাচ্ছে। অন্তত এই ডিজিটাল ফর্ম্যাটে।১
নতুন এই প্রজন্মটি সেই এক্সপেরিমেন্টই করে চলেছে।
অবশ্য ৮০’র দশকে এফ ডি সির বাইরে যাওয়া অংশটির মধ্যে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে এক ধরনের চিন্তা ছিলো/আছে। সাংস্কৃতিক দায় নিয়েই তারা স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করে। সেদিক থেকে নতুন প্রজন্মটি বলতে গেলে এফ ডি সির আবহই পায়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তাদের কোনোধরনের চিন্তা নেই বললেই চলে। তারা নিজেদের মতো করে চলচ্চিত্র নিয়ে ভাবে, নির্মাণ করে। ৮০’র দশকের স্বাধীন নির্মাতারা হয়তো সেই অনুপ্রেরণা-উৎসাহের যোগান দেয়। তবে এরা মোটেও তাদের উত্তরাধিকার নয়। আবার নতুন এই প্রজন্ম গড়ে ওঠার পিছনে কেবল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা কাজ করছে তা-ও নয়। বরং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানে চলচ্চিত্রের নতুন ঢেউ তথা চলচ্চিত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি হতে চলেছে। এই পরিবর্তনটা ধরতে, তাদের স্বপ্ন দেখার সাহস, ইমেজের প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি সাধারণ ভাবনার বাইরে নিয়ে বুঝতে হবে। ঠিক যেমন, ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দলের ভালো খেলার সঙ্গে সেই দেশের সংস্কৃতিতে ক্রিকেট সম্পৃক্ততাও গুরুত্ব রাখে। যদিও এর সঙ্গে ক্রিকেটের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য জড়িত। একইভাবে প্রচণ্ড রকমের ইমেজ পাগল এই প্রজন্মের চোখে এক ধরনের আগ্রহ লক্ষ করা যায়।
এছাড়া সময়ের সঙ্গে একদিকে একক প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে গড়ে উঠছে সিনেপ্লেক্স-মাল্টিপ্লেক্স। অন্যদিকে এতে করে সব শ্রেণির দর্শকের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ কমে আসছে। সবমিলিয়ে এই পরিস্থিতি পরবর্তী এক দশকে চলচ্চিত্রকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা অনুমেয় নয়। এই লেখায় মূলত সেই পরিবর্তন-সঙ্কট-সম্ভাবনাকে ধরার চেষ্টা থাকবে।
স্বাধীন ধারার উন্নয়ন
স্বাধীনতা-উত্তর দশকটিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই সময়ে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে ঘিরে একযোগে নানা ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। প্রথমত, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে সালাউদ্দিন নির্মিত রূপবান-এর সাফল্য পরবর্তী দশকে সামান্য হলেও প্রভাব বিস্তার করে। এর বাইরে শুরু হয় রোমান্টিক, অ্যাকশন ও পোশাকি-ফ্যান্টাসি ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ। সেখানে নকল গল্পেরও প্রাধান্য ছিলো। এ সময় মুক্তিযুদ্ধও চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। এছাড়া আরো কিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে, যেখানে নতুন একটি রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরার চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। এসব চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য গল্প বলা হলেও তা ছিলো গতানুগতিকতার বাইরে। যেমন, আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্যকন্যা (১৯৭৫), সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭) ও রূপালী সৈকতে (১৯৭৯); ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), বেবী ইসলামের চরিত্রহীন (১৯৭৫), হারুনর রশীদের মেঘের অনেক রং (১৯৭৬), আব্দুস সামাদের সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬) ও সূর্যসংগ্রাম (১৯৭৯), রাজেন তরফদারের পালঙ্ক (১৯৭৬), কবীর আনোয়ারের সুপ্রভাত (১৯৭৬), সুভাষ দত্তের বসুন্ধরা (১৯৭৭) ও ডুমুরের ফুল (১৯৭৮), মসিহ্উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯)। এর মধ্যে সূর্য দীঘল বাড়ী এই ধারার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। কারণ, চলচ্চিত্রটি প্রথম সরকারি অনুদানে নির্মিত এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়।
যাহোক, একটা বিষয় পরিষ্কার যে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের সমান্তরালে একটা ভিন্ন ধারাও গড়ে উঠতে থাকে। নানা সংঘাতের মধ্যেও সবমিলিয়ে এফ ডি সি জমজমাট অবস্থার মধ্য দিয়েই যাচ্ছিলো। বিপত্তিটা হয় ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে হারুনর রশীদ তার মেঘের অনেক রং নির্মাণের পর। চলচ্চিত্রটি সেসময় প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রদর্শন বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রদর্শন বন্ধ হওয়া স্বাভাবিকভাবে সংশ্লিষ্ট কিছু মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করে। তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিলো। কিন্তু ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই, ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী মসিহ্উদ্দিন শাকের-শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ীও একই সঙ্কটে পড়ে। চলচ্চিত্রটি সেসময় নাটোরের একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও ঢাকায় মুক্তি পেতে প্রায় এক বছর লেগে যায়। অবশ্য চলচ্চিত্র দুটি দেখার ব্যাপারে দর্শকও যে খুব বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলো এমন নয়। তবে খেয়াল করার বিষয় হলো, পর পর দুটি চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে প্রদর্শন সঙ্কট সৃষ্টি হয়, তা কোনো বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে ঘটেনি! এবং এই সঙ্কট সৃষ্টির পিছনে প্রদর্শক সমিতির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই ছিলো প্রধান কারণ। বলতে গেলে প্রদর্শক সমিতির কারণেই এমনটি হয়। এভাবে প্রযোজক-পরিবেশক-প্রেক্ষাগৃহ মালিকদের এফ ডি সি নিয়ন্ত্রণে কিছু মানুষের ক্ষোভ প্রকট হয়। ফলে তারা নতুন করে ভাবতে থাকে নির্মাণ ও প্রদর্শনব্যবস্থা নিয়ে।
এই ধরনের চিন্তা থেকেই ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্র সংসদ করা কিছু তরুণ সিদ্ধান্ত নেয় এফ ডি সির বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের। যার নাম দেওয়া হয় বিকল্প ধারা চলচ্চিত্র আন্দোলন। যে ধারার সঙ্গে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, কিছু সচেতন ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিও লক্ষ করা যায়। যার অন্যতম ছিলো স্বল্প ব্যয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও নিজেদের মতো করে প্রদর্শন। এবং সেই লক্ষ্যে ১৬ মি মি ফরম্যাট বেছে নেওয়া। যে ফরম্যাটে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আগামী নির্মাণ করেন মোরশেদুল ইসলাম। এরপর নির্মিত হয় হুলিয়া, শরৎ’৭১, আদম সুরত ইত্যাদি। এগুলো প্রদর্শন করা হয় দেশের বিভিন্ন মিলনায়তন, পাবলিক লাইব্রেরি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষ, এমনকি খোলা মাঠে; ব্যক্তি উদ্যোগে সহজে বহনযোগ্য প্রজেক্টরের মাধ্যমে। অর্থাৎ স্টুডিওবিমুখতার মধ্য দিয়ে শুরু থেকেই এই আন্দোলন হয়ে ওঠে স্বাধীন ধারার পরিপূরক। যে ধারায় মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, তারেক শাহরিয়ার, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী, মানজারে হাসান মুরাদ, জুনায়েদ হালিম, আবু সাইয়ীদ, জাহিদুর রহমান অঞ্জন, সৈয়দা নিগার বানু, নূরুল আলম আতিক, গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের মতো নির্মাতারা যুক্ত হন।
৯০ দশক পর্যন্ত আন্দোলনের এই ধারা টিকে থাকলেও শূন্য দশকে এসে নানা কারণে তা সমান প্রভাব রাখতে পারেনি। তবে অন্যভাবে হলেও সেই উত্তরাধিকার ধরে রেখেছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, তৌকির আহমেদ পরবর্তী সময়ে এনামুল করিম নির্ঝর, কামার আহমাদ সাইমন, রুবাইয়াত হোসেন, ফখরুল আরেফীন, নিয়ামুল হাসান মুক্তা, ইমতিয়াজ আহমেদ বিজনরা। কৌশলগত কারণে এদের অনেকেই স্টুডিও-নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করছে, ফিরেছে ৩৫ মি মি ফরম্যাটেও। তারপরও মনন ও চিন্তায় তারা স্বাধীন ধারাকেই ধারণ করছে। একইভাবে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও এফ ডি সি কেন্দ্রিক নির্মাতা হলেও তার চলচ্চিত্রের আধেয় অনেকটা স্বাধীন ধারার উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে বেড়ায়। এসব বিষয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ভাষ্য হলো,
এই যে পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে, এটা হুট করে আকাশ থেকে পড়া এই দশকের কোনো ঘটনা নয়। এর ওপর আশির দশকের বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রভাব আছে, নব্বই দশকের শেষ ভাগে বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রভাব আছে; যার মূলে ছিল, নিজেদের গল্প নিজেদের মতো করে বলার তাড়না। ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করার একটা তাড়না নতুন শতাব্দীর শুরু থেকে নির্মাতা ও দর্শক দুই দলের মধ্যেই কাজ করেছে। এই তাড়না সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ এবং অন্যদের কল্যাণে আরও আগে শুরু হয়ে গেলেও চলচ্চিত্রে এটা ঘটতে একটু সময় লেগেছে।২
ফারুকীর এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হওয়ার কারণ নেই। তবে একটি বিষয় খেয়ালের গুরুত্ব রাখে, তা হলো, ওই আন্দোলনটার কারণে কিন্তু এফ ডি সি তথা দেশীয় চলচ্চিত্রের পাইপলাইনটাই দ্বি-খণ্ডিত হয়ে যায়। সাংস্কৃতিক দায় নিয়ে সংসদ কর্মীরা স্টুডিও ত্যাগ করায় স্বাভাবিকভাবে সেখানকার মেধা ভাগ হয়ে যায়। আবার আন্দোলনের শুরুতে চলচ্চিত্র নিয়ে তাদের সংগঠিত মনোভাব থাকলেও একটা সময় পর তা ব্যক্তিগত প্রত্যাশায় পরিণত হয়। তারপরও তারা আর এফ ডি সিতে ফিরে আসেনি। অন্যদিকে নানা কারণে এফ ডি সি আঁকড়ে ধরে থাকা অংশটিও পরিস্থিতি সামলাতে না পারার সুযোগে ‘পুরো ফ্যাক্টরিটাই একটি সংবেদনহীন, দেশকাল-ভাবনাহীন, দুই নম্বরির আখড়ায় পরিণত হলো। এদিকে এখানেও তৈরি হলো না সত্যিকারের প্যারালাল কোনো স্ট্রিম।’৩
৭০ দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যে ভিন্ন চিন্তার উন্মেষ ঘটে, তা ভারতে শুরু হয় ৪০-এর দশকেই। যার আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন ঘটে নিমাই ঘোষের ছিন্নমূল (১৯৫১), সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৬), ঋত্বিক ঘটকের অযান্ত্রিক (১৯৫৮) দিয়ে। সেই আবহে যুক্ত হয় চিদানন্দ দাশগুপ্ত, রাধাপ্রসাদ গুপ্ত, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদাররা। পরবর্তী সময়ে তা দৃশ্যমান হয় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত-গৌতম ঘোষ-অপর্ণা সেন-ঋতুপর্ণ ঘোষদের চলচ্চিত্রে। হাল আমলের সুমন মুখোপাধ্যায়, কৌশিক গাঙ্গুলি, অতনু ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, সৃজিত মুখার্জি, শিবপ্রসাদ, নন্দিতা রায়, মৈনাক ভৌমিকরাও একই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যাচ্ছে। তবে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীকে নব্য-বাস্তববাদ ধারায় নির্মিত প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র ধরা হলেও বিমল রায় এর আগেই নির্মাণ করেন দো বিঘা জামিন (১৯৫৩)। এমনকি ১৯৪৮ এ বাইসাইকেল থিভস্ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভিত্তোরিও ডি সিকা নব্য-বাস্তববাদ ধারার সূচনা করলেও ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দেই শ্রেণি সংগ্রামকে কেন্দ্র করে বিমল নির্মাণ করেন উদয়ের পথে। নির্মিত হয় চেতন আনন্দের নিচা নগর (১৯৪৬)-এর মতো চলচ্চিত্র। এরপর ৬০-এর দশকে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের রমরমা অবস্থার মধ্যেও একেবারে বিপরীতে দাঁড়িয়ে গুরু দত্ত নির্মাণ করেন পিয়াসা (১৯৫৭) ও কাগাজ কি ফুল (১৯৫৯)। যদিও তখন অবধি বলিউডে ‘সমান্তরাল চলচ্চিত্র’ নামে ভিন্ন চিন্তার চলচ্চিত্র সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে ৭০-৮০’র দশক জুড়ে মনি কাউল, কুমার সাহানি, শ্যাম বেনেগাল, কেতন মেহতা, বিজয় মেহতা, মিরা নায়ার প্রমুখ নির্মাতার হাত ধরে সেই চিত্র পাল্টে যায়। ৯০ দশকের শুরুতে পুনরায় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের দাপটসহ নানা কারণে সেই গতি মন্থর হয়ে পড়লেও দশকের শেষ দিক থেকে রাম গোপাল ভার্মা, আশুতোষ গোয়ারিকর, মণি রত্নম, নাগেশ কুকুনুর, জানু বড়ুয়া, অনুরাগ কশ্যপ, একতা কাপুররা ভিন্ন চিন্তার চলচ্চিত্রের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে থাকে। দিনে দিনে বাণিজ্য প্রাধান্যশীল ও ভিন্ন ধারার দূরত্ব ঘুচে যেতে থাকায় আমির খানের মতো সুপার স্টার অভিনয় করেন তারে জমিন পার (২০০৭) এর মতো চলচ্চিত্রে। আর চলতি দশকে রীতেশ বাতরা, মেঘনা গুলজার, সাকেট চৌধুরী, সুজিত সরকার, রাজা কৃষ্ণ মেনন, রাজকুমার হিরানী, হানসাল মেহতাদের মতো তরুণ নির্মাতারা তো বলতে গেলে সমান্তরাল চলচ্চিত্রের নিরঙ্কুশ শাসন জারি রেখেছে।
খেয়াল করার বিষয় হলো, স্বাধীন বা সমান্তরাল ধারার এসব চলচ্চিত্রে কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তার আধেয়। নির্মাতারা এমন এমন সব বিষয় নিয়ে হাজির হচ্ছে, যা গতানুগতিক পর্দায় দেখানো হয় না। তারপরও এসব চলচ্চিত্র দর্শক-সমালোচক-ব্যবসা সব দিক সমানভাবে সামাল দিয়ে চলছে। এর ফলে কিছু পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে; প্রথমত, বৈচিত্র্যময় কনটেন্টের এসব চলচ্চিত্রে গতানুগতিক একক নায়ক হয়ে ওঠার ব্যাপারটি একেবারে থাকছে না বলা চলে। বরং চলচ্চিত্রের গল্পই হয়ে উঠছে নায়ক। সেকারণে অভিনয়শিল্পীদেরও নায়কের কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যেমন, ভারতীয় বাণিজ্য প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্রে ‘নায়কের’ প্রচলিত ভাবমূর্তি চর্চা করা অমিতাভ বচ্চন বর্তমান চলচ্চিত্রের গল্পের ছোঁয়ায় নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেছেন। বিপরীতে সালমান-শাহরুখের মতো সুপারস্টার নতুন করে আলোচনায় আসতে পারছে না। আর আমির খান, অক্ষয় কুমারের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রেও এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অর্থাৎ পর্দায় খেটে খাওয়া মানুষের যাপিত জীবনের প্রেম-ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো প্রসেনজিৎ-অমিতাভরা নতুন রূপে নিজেদের উপস্থাপনে মনোযোগী হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কনটেন্টের প্রভাবে নায়কের কাঠামোগত যে পরিবর্তন হচ্ছে/হয়েছে, তাতে করে চলচ্চিত্র হয়ে উঠছে/উঠেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের প্লাটফর্ম। হারিয়ে যেতে বসেছে/গেছে চলচ্চিত্রের গণবিনোদনের চরিত্র।
আবার এতো সব পরিবর্তনের মধ্যেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একটা বড়ো ধরনের পার্থক্য রয়েছে; তা হলো, ভারতে যা কিছু ঘটেছে, সবটাই ইন্ডাস্ট্রিকে ঘিরে, সময়ের আবর্তে। আর বাংলাদেশে কখনো ইন্ডাস্ট্রির বাইরে, কখনো ভিতরে। পরিবর্তনের এই ধারায় দেশীয় নির্মাতাদের আলাদা কিছু প্রবণতাও লক্ষ করা যায়--দেশে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে এক ধরনের অনাগ্রহ, বিদেশি ফান্ড সংগ্রহ, উৎসবকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঝোঁক এবং এফ ডি সি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নিয়ে নাক উঁচু ভাব। এ পর্বে এই প্রবণতাগুলোয় চোখ ফেরানো যাক।
সম্ভাবনা তৈরি হলেও কাটেনি সঙ্কট
‘বাংলাদেশি চলচ্চিত্র এখনও আন্তর্জাতিক মূলধারায় আসতে পারেনি। কিন্তু আমি জানি, বাংলাদেশি তরুণ নির্মাতারা বিশ্ব চলচ্চিত্রে একটি নতুন ধারা তৈরির চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে গভীর সম্ভাবনা আছে। টেলিভিশন একটি ভালো উদাহরণ এবং এ বছর এশিয়ায় প্রযোজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ছবি।’৪ ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ৪ থেকে ১৩ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে সমাপনী প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয় ফারুকীর টেলিভিশন। চলচ্চিত্রটি দেখার পর উৎসবের প্রোগ্রাম পরিচালক কিম জি শুক এভাবেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মূল্যায়ন করেন। যা এক অর্থে স্বাধীন চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার কথাই বলে। শুধু ফারুকী বা টেলিভিশনই নয়, অন্য অনেকে এই সম্ভাবনার সঙ্গী হয়েছে। তবে দেশে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে কেনো জানি তাদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখা যায় না। তাদের আগ্রহ বরং বিদেশি ফান্ড নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করায়। আবার বিভিন্ন উৎসবে চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারেও তারা দারুণ উৎসাহী! কেবল উৎসবকে মাথায় রেখেও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এর বাইরে এফ ডি সি কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের নাক উঁচু ভাব। অবশ্য এই ধারার নির্মাতাদের ক্ষেত্রে এসব প্রবণতা নতুন নয়। এর আগেও এমনটা ছিলো। বিশেষ করে চলচ্চিত্র সংসদকর্মীরা--যারা শুধু নির্মাণ নয়, চলচ্চিত্র সমালোচনাও করতো--যে চলচ্চিত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিলো, সেখানে ৬০-৭০ দশকে দেশীয় চলচ্চিত্রের আলোচনা-সমালোচনা স্থান পায়নি বললেই চলে।
যাহোক, স্বাধীন চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার জায়গাটি আগামী দিয়ে তৈরি হলেও মোরশেদুল ইসলামের চাকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি এনে দেয়। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত চলচ্চিত্রটি জার্মানির ম্যানহেইম-হেইডেলবার্গ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ পরিচালনায় জুরি পুরস্কার এবং ফ্রান্সের ডানকর্কে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রে ‘গ্রাঁ প্রিঁ’ পায়। এরপর তারেক মাসুদের মাটির ময়না (২০০২) কান চলচ্চিত্র উৎসবসহ আন্তর্জাতিক বড়ো বড়ো সব উৎসবে দেশীয় চলচ্চিত্রকে পরিচিত করে। এটি বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় ইউরোপ ও আমেরিকায়। ২০০৭-এ গোলাম রাব্বানী বিপ্লব নির্মিত স্বপ্ন ডানায় ওই বছরই দেশে প্রশংসার পাশাপাশি সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এশিয়ান নতুন প্রতিভা পুরস্কার ও ভারতে বিশেষ জুরি পুরস্কার পায়। মনোনীত হয় শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, ‘গোল্ড হুগো’ পুরস্কারের জন্য।
২০১১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরে সেকেন্ড লন্ডন ফেস্টিভাল-এ অংশ নিয়ে প্রশংসিত হয় আনিসুল ইসলাম হিরুর প্রামাণ্যচিত্র রিফ্লেকশন। একই সময়ে এশিয়ান প্রজেক্ট মার্কেট থেকে অনুদান পায় আবু শাহেদ ইমনের দ্য টেল অব অ্যা পুলিশম্যান ও ইশতিয়াক জিকোর সাউথইস্ট লাভ নামে দুটি চলচ্চিত্র। পরের বছর বুসান ছাড়াও নবম দুবাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগের জন্য নির্বাচিত এবং একই সঙ্গে ৫৫তম এশিয়া প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কারের জন্য টেলিভিশন দুটি এবং হুমায়ূন আহমেদের ঘেটুপুত্র কমলা একটি বিভাগে মনোনীত হয়। ওই বছর বিশ্বের প্রাচীনতম প্রামাণ্যচিত্র উৎসব জার্মানির ‘ডক-লাইপজিগ’-এর উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয় কামার আহমাদ সাইমন ও সারা আফরিনের শুনতে কি পাও (২০১২)। চলচ্চিত্রটি উৎসবের মূল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বিভাগে সারা বিশ্ব থেকে বাছাই করা মাত্র ১২টির একটি। বিশ্বের বৃহত্তম প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের আসর নেদারল্যান্ডসের ‘ইডফা’তেও শুনতে কি পাও চিত্রনাট্য ও প্রযোজনায় পুরস্কার পায়। এছাড়াও বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের বিশেষ আসর ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের সম্পাদনা ল্যাবে আমন্ত্রণসহ সম্পাদনার জন্য সুইজারল্যান্ডের ‘ভিশন সুদ ইস্ট’ থেকে পুরস্কৃত হয় শুনতে কি পাও।
এদিকে মধ্যবিত্ত এক নারী ও পোশাক শ্রমিকের মর্মগাথা নিয়ে রুবাইয়াত হোসেন নির্মিত আন্ডার কনস্ট্রাকশন ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে সিয়াটল চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর, পরের বছর ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশে মুক্তি পায়। ওই বছর ৭ জুন ফ্রান্সে মুক্তি পাওয়ার পর রাজধানী প্যারিসসহ পাঁচটি শহরে ২০টির বেশি প্রেক্ষাগৃহে কয়েক সপ্তাহব্যাপী প্রদর্শিত হয় চলচ্চিত্রটি। পায় ফ্রান্সের এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার। এছাড়াও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয় আন্ডার কনস্ট্রাকশন। এরপর বাংলাদেশ-ফ্রান্স-ডেনমার্ক-পর্তুগালের যৌথ প্রযোজনায় রুবাইয়াত নির্মাণ করেন মেইড ইন বাংলাদেশ (২০১৯)। ফরাসি প্রযোজক ফ্রাঁসোয়া দ্য আক্তেমেয়ার এবং পরিবেশক ও আন্তর্জাতিক বিক্রয় প্রতিনিধি পিরামিড ফিল্মস-এর কল্যাণে বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে এটি প্রদর্শিত হয়। ইতোমধ্যে পাঁচটি পুরস্কার বিজয়ী মেইড ইন বাংলাদেশ ফ্রান্সের ৫৩টি, ডেনমার্কের সাতটি ও পর্তুগালের একটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়েছে। ওই বছরই টরেন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে কনটেম্পোরারি ওয়ার্ল্ড সিনেমা বিভাগে প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হওয়ার পর ৪ ডিসেম্বর চলচ্চিত্রটি নিউ ইয়র্ক আফ্রিকান ডায়াসপোরা ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয়। সেখানে চলচ্চিত্রটি দেখার পর আফ্রিকান এক নারী নির্মাতা রুবাইয়াতকে বলেন, ‘আমি চাই, আপনি জীবনভর ছবি বানান। প্রয়োজনে আমি খরচ জোগাব। কিন্তু আপনি কখনো ছবি বানানো বন্ধ করবেন না।’৫ মাটির ময়নার পর দেশের বাইরে সর্বাধিক প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রটিকে মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯) ও খারিজ (১৯৮২)-এর সঙ্গে তুলনা করেন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চলচ্চিত্র সমালোচক ও বিশ্লেষক চার্লস টেসন।৬
আবু শাহেদ ইমনের জালালের গল্প বাংলাদেশে মুক্তির বছর খানেক আগে ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরে অনুষ্ঠিত ১৯তম বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে এশিয়ান সিনেমা ফান্ড পায়। এবং প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে উৎসবের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘নিউ কারেন্টস’-এ এটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়।৭ পরের বছর জালালের গল্প পর্তুগালে অনুষ্ঠিত ১৯তম আভাঙ্কা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয়। এর বাইরেও একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা পায় জালালের গল্প। তৌকির আহমেদ নির্মিত অজ্ঞাতনামা (২০১৮) মুক্তির এক বছরের মাথায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নেয়। মুক্তির বছরে কম্বোডিয়ায় ৫৭তম এশিয়া-প্যাসিফিক চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপনী দিনে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায় অজ্ঞাতনামা। ২০টি দেশের ৫৪টি চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণে ১৭টি বিভাগে প্রতিযোগিতা করে শ্রেষ্ঠ খেতাব পায় চলচ্চিত্রটি। এর আগে সপ্তম সার্ক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চিত্রনাট্যে অজ্ঞাতনামা এবং অষ্টম উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রসহ চারটি বিভাগে পুরস্কার পায় তৌকিরের হালদা। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে নূর ইমরান মিঠু নির্মাণ করেন প্রথম চলচ্চিত্র কমলা রকেট। পরের বছর ১২ ফেব্রুয়ারি উপমহাদেশের বেশকিছু আলোচিত চলচ্চিত্রের সমন্বয়ে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়া চলচ্চিত্র উৎসবের ষষ্ঠ আসরে কমলা রকেট পায় জুরি পুরস্কার। এছাড়াও শ্রীলঙ্কা-ভারতসহ বিভিন্ন দেশে প্রদর্শন ও পুরস্কৃত হয় চলচ্চিত্রটি।
পূর্ণদৈর্ঘ্যরে পাশাপাশি ইতোমধ্যে বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাড়া ফেলেছে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তাসমিয়াহ আফরিন মৌয়ের কবি স্বামীর মৃত্যুর পর আমার জবানবন্দি ১৪তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবে ‘তারেক শাহরিয়ার বেস্ট ইনডিপেনডেন্ট শর্ট ফিল্ম’ পুরস্কার পায়। যার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয় ফ্রান্সের ৩৪তম ত্যুউস ক্যুওর চলচ্চিত্র উৎসবে। এর দুই বছর আগে তার প্রামাণ্য চলচ্চিত্র টোকাই ২০১২ চিনের গুয়াংজু ইন্টারন্যাশনাল ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভালে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে নরওয়েতে অনুষ্ঠিত রিঙ্গেরিক ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘জুরি মেনশন অ্যাওয়ার্ড’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের হলিউডে আয়োজিত গ্লোবাল ইয়ুথ ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘বেস্ট ড্রামা অ্যাওয়ার্ড’ পায় হেমন্ত সাদিকের আ লেটার টু গড। এছাড়াও ঢাকায় অনুষ্ঠিত দশম আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা তরুণ নির্মাতা ও সিলেট চলচ্চিত্র উৎসবেও সেরার পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রটি চিন, মিসর, ইতালি, ফিলিপাইন, মরক্কো, মেক্সিকো, জর্ডান ও বাহামা’য় আয়োজিত উৎসবে বিভিন্ন বিভাগে একাধিক মনোনয়ন পায়।
করোনার ভয়াল গ্রাসে থমকে গেছে বিশ্বচলচ্চিত্র। অনেক ইন্ডাস্ট্রি প্রেক্ষাগৃহ না পেয়ে টিকে থাকার তাগিদে বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছে অনলাইন স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম। যদিও বাংলাদেশে এখনো সেই পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এই পরিস্থিতিতেও ৭-১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৬৪তম বি এফ আই লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভালে প্রদর্শিত হয় রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নোনা জলের কাব্য। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য সিটি লাইফ নির্মাণের মাধ্যমে বার্লিনেল ট্যালেন্টসে জায়গা করে নেওয়া সুমিতের চলচ্চিত্রটি এ বছর ‘ফিচার ফিল্ম স্ট্র্যান্ডস’ বিভাগে সারা বিশ্বের বাছাই করা মাত্র ৫৮টি চলচ্চিত্রের একটি। জেলেপাড়ার জীবননির্ভর গল্পে নির্মিত চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্য পায় ‘স্পাইক লি রাইটিং গ্রান্ট’।
সবমিলিয়ে এদিকে ভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রের এই অবস্থা; অন্যদিকে করোনায় দীর্ঘ সাত মাস প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ থাকার পর চলচ্চিত্রপাড়ায় যখন হাহাকার চলছে, তখন হিরো আলম ছাড়া কেউ চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। ২৩ অক্টোবর মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ঊনপঞ্চাশ বাতাস মুক্তি পেলেও ১৬ অক্টোবর মুক্তি পায় সাহসী হিরো আলম। ঊনপঞ্চাশ বাতাস সমালোচকদের প্রশংসা পেলেও তা কেবল সাতটি মাল্টিপ্লেক্সসহ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। যেমনটা স্বাধীন নির্মাতারা করে থাকে আরকি। যাদের চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার হয় আন্তর্জাতিক কোনো উৎসবে। যারা দেশের প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র মুক্তি দেয় আন্তর্জাতিক নানা উৎসব ঘুরে আসার পর। আবার সব চলচ্চিত্রই যে দেশে মুক্তি দেওয়া হয় তা-ও নয়। হাতেগোনা দু-চারটি মুক্তি পেলেও সীমিত পরিসরে, বিশেষ কোনো সিনেপ্লেক্সে, দায়সারা ভাবে মুক্তি দেওয়া হয়; কখনোবা নির্দিষ্ট টেলিভিশন চ্যানেলে। যদিও স্বাধীন নির্মাতাদের অনেক চলচ্চিত্রই এখন অবধি দেশের কোনো প্রেক্ষাগৃহ বা অন্তর্জালে মুক্তি পায়নি। এর ফলে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির অপেক্ষাকৃত সচেতন দর্শক, যারা চলচ্চিত্র নিয়ে একটু অন্যভাবে চিন্তা করে, তাদের একটা অংশ হয়তো কিছু চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ পায়; তবে বেশিরভাগই সেই সুযোগ পায় না। অবশ্য নির্মাতা নূরুল আলম আতিক স্বাধীন নির্মাতাদের এসব প্রবণতা ও এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির একেবারে বিপক্ষে কথা বলেছেন। তার মতে,
অলটারনেটিভ ছবি যতটা আমাদের দর্শকদের মূলস্রোত থেকে দূরবর্তী করেছে, বিদেশে প্রশংসিত বা বিদেশের পয়সায় নির্মিত ছবি আমাদের নৃতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিচয়কে বিদেশিদের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে দিয়েছে তারো চেয়ে বেশি। এটা এমন একটা গোলামগিরি--যা দেশের অশ্লীল ছবির জোয়ারের চেয়েও বেশি প্রাণঘাতী। ... বিদেশনির্ভর ও ফেস্টিভ্যাল ভিত্তিক সিনেমা নির্মাণ প্রক্রিয়া ছোট ছোট দেশের বড়-ছোট নির্মাতাদের সম্ভাবনাকে একটা চোরাস্রোতের মধ্যে টেনে এনেছে হারহামেশাই। ... [অথচ] এদেশের মাটিতে একসময় যে পরিমাণ ছবি নির্মাণ হয়েছে, এই দেশেরই দর্শকের পয়সায়, সেটা পৃথিবীর দশ-বারোটির বেশি দেশে হতো না।৮
হয়তো আন্তর্জাতিক উৎসব প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ায় একজন নির্মাতাকে পরিশীলিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে; আন্তর্জাতিক পরিসরে মুক্তির মাধ্যমে লগ্নির অর্থ সহজে ফিরে পাওয়ারও সুযোগ থাকে; কিন্তু নিজস্ব বিনোদনশিল্পকে উপেক্ষা করে তো আর কোনোকিছুর সামগ্রিক বিকাশ সম্ভব নয়। বরং সীমিত পরিবেশনা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে চলচ্চিত্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি-সর্বস্ব প্রজন্ম নির্মিত চলচ্চিত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেলেও তারা কিন্তু অনেকগুলো প্রবণতার বাইরে গিয়ে কাজ করছে। তারা উৎসবে অংশ নিলেও তা প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠেনি। যদিও এফ ডি সি নিয়ে নাক উঁচু ভাবটা এখনো কাটেনি।
সিনেপ্লেক্স কালচার ও সঙ্কট-সম্ভাবনার লুকোচুরি খেলা
চলচ্চিত্র একই সঙ্গে যেমন শিল্প, তেমনই ব্যবসাও। যার সাফল্য নির্ভর করে দর্শক কতোটা ভোগ করলো তার ওপর। চলচ্চিত্র ভোগ করার অনেক মাধ্যম থাকলেও প্রেক্ষাগৃহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা প্রেক্ষাগৃহের আলো-আঁধারি পরিবেশে প্রদর্শন না হওয়া পর্যন্ত চলচ্চিত্র যেমন পূর্ণতা পায় না, তেমনই জাদুময় দর্শন-সুখ থেকে বিরত থাকে দর্শক। তারপরও শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র প্রেক্ষাগৃহ আজ বিলুপ্তপ্রায়। অথচ ২০০১-২০০২ খ্রিস্টাব্দেও সারাদেশে প্রেক্ষাগৃহ ছিলো প্রায় এক হাজার তিনশো। এমনকি ২০০৭ পর্যন্তও সেই সংখ্যা ছিলো এক হাজার একশো ৫৪টি। এরপর গত এক দশকে ভয়াবহ হারে সেই সংখ্যা কমতে থাকে। সক্রিয় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় একশোর ঘরে।৯ অন্যান্য অনেক কারণের সঙ্গে মূলত মানসম্মত চলচ্চিত্র ও দর্শক সঙ্কটে ক্রমশ বন্ধ হয়ে যেতে থাকে দীর্ঘদিনের পুঁজির স্বর্ণমহল। এখন অবধি যে কটি অবশিষ্ট, তাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
তবে চলতি দশকে একক প্রেক্ষাগৃহের বিকল্প হিসেবে যাত্রা করে সিনেপ্লেক্স। যা একই ছাদের নিচে একাধিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিপণন বাণিজ্যে নিয়ে এসেছে নতুনত্ব। সিনেপ্লেক্সগুলো শপিংমল কেন্দ্রিক হওয়ায় আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধায় কেনাকাটা, খাওয়া-দাওয়া, শিশুর খেলাধুলার ব্যবস্থার পাশাপাশি উন্নত প্রযুক্তি ও মানসম্মত পরিবেশে চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যা দর্শক আকর্ষণেরও মূলমন্ত্র। এই সম্ভাবনা থেকেই ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে তিনটি পর্দা নিয়ে বসুন্ধরা শপিংমলে চালু হয় দেশের প্রথম মাল্টিপ্লেক্স--‘স্টার সিনেপ্লেক্স’। এরপর ২০১২ খ্রিস্টাব্দে বসুন্ধরার সিনেপ্লেক্সে একটি পর্দা এবং ২০১৫ তে এসে আরো দুটি পর্দা যোগ হয়। পরের বছর একসঙ্গে সাতটি পর্দা নিয়ে যমুনা ফিউচার পার্কে যাত্রা করে ‘ব্লকবাস্টার সিনেমাস’। এরপর ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি ধানমন্ডির ‘সীমান্ত সম্ভার’-এ ‘স্টার সিনেপ্লেক্স’-এর দ্বিতীয় শাখা এবং কয়েক মাসের ব্যবধানে ২০ অক্টোবর মহাখালীর সেনাকল্যাণ সংস্থা টাওয়ারে তৃতীয় শাখা চালু হয়। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে ঢাকার মিরপুর, উত্তরা, পূর্বাচলসহ বিভিন্ন স্থানে আরো ২০টিসহ দেশব্যাপী একশোটি মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করছে ‘স্টার সিনেপ্লেক্স’।১০ ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে যাত্রা শুরু করে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘পিক্স সিনেপ্লেক্স’। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলেও মাল্টিপ্লেক্সটিতে রয়েছে একশো আসনের দুটি প্রেক্ষাগৃহ। যেখানে প্রতিদিন দুটি চলচ্চিত্রের তিনটি করে শো হতো। এছাড়াও ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামে ‘সিলভার স্ক্রিন’, নারায়ণগঞ্জে ‘সিনেস্কোপ’ রয়েছে। এদিকে করোনার সঙ্কটে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হতে থাকলেও বগুড়ায় উদ্বোধনের প্রহর গুনছে ‘মধুবন সিনেপ্লেক্স’। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী ‘মধুবন সিনেমা হল’টিই সিনেপ্লেক্স রূপে ফিরে আসছে।
এখন অবধি প্রয়োজনের তুলনায় সিনেপ্লেক্সের সংখ্যা যথেষ্ট না হলেও দেশের জেলা শহরগুলোতে এই সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলা যেতে পারে। এই সম্ভাবনার মধ্যেও ব্যবসা ও দর্শক সঙ্কটের প্রসঙ্গই বার বার উঠে আসছে, যদিও স্বাধীন নির্মাতারা আন্তর্জাতিকভাবে বেশ নাম করছে। আবার গত এক দশকে বেশকিছু স্টুডিও-নির্ভর চলচ্চিত্রও দর্শক-সমালোচক প্রিয় হতে দেখা যায়। যেগুলো মোটামুটি ব্যবসাও করেছে। তারপরও স্বাধীন নির্মাতারা ওইসব প্রবণতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার চিন্তা করছে বলে মনে হয় না। অন্যদিকে প্রেক্ষাগৃহের শীতল অন্ধকার ছেড়ে দর্শন-সুখ চলে গেছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আরামে। যে আরাম কেনার সামর্থ্য সব দর্শকের থাকছে না। বরং তা এখন নির্দিষ্ট শ্রেণির দর্শকের জন্য। সেখানে থাকছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত; স্থান নেই সাধারণের। একজন শ্রমিক, রিকশাচালক তথা নিম্ন আয়ের মানুষ চাইলেও দুইশো টাকায় টিকিট করে চলচ্চিত্র দেখতে পারছে না। দিনশেষে মাল্টিপ্লেক্সের প্রদর্শন ব্যবস্থাকে কম বাজেটের বুদ্ধিদীপ্ত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের অক্সিজেন মনে করা হলেও সেখানে একটা অদৃশ্য ‘প্রবেশ নিষেধ’ বোর্ড ঝোলানো থাকছেই।
শেষ হয়েও হয় না শেষ
বলা যেতে পারে, চলচ্চিত্র ও তার আধেয় এখন আর সাধারণ মানুষের নেই। বিশেষ করে গত এক দশকে সেই পরিস্থিতি জোরালো হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহের সঙ্গে চলচ্চিত্রের গণবিনোদনের চরিত্রটিও আজ বিলুপ্তপ্রায়। চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের বিনোদন মাধ্যম। সিনেপ্লেক্স সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি এদেশেও অনলাইন বাজার গড়ে উঠেছে/উঠছে। কেবল নিম্ন আয়ের মানুষগুলো বঞ্চিত হচ্ছে সেই দর্শন-সুখ থেকে। হয়তো অন্য কিছুও ঘটতে পারে। পরিবর্তনের ধারায় যা অনুমেয় নয়। তবে এতো সব সঙ্কট-সম্ভাবনার মধ্যেও প্রযুক্তি-সময়-পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়ে অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত বলা যেতে পারে, চলচ্চিত্র অমর।
লেখক : মো. হারুন-অর-রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। পাশাপাশি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ডট রিপোর্ট-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
harunmcj25@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100005362547107
তথ্যসূত্র
১. আতিক, নূরুল আলম (২০০৯ : ৩৭); ‘অন্তরের নীলাভ আলো দিয়ে মুদ্রিত হোক নবীন ছবিমালা’; নতুন সিনেমা, সময়ের প্রয়োজন; ঐতিহ্য প্রকাশনী, ঢাকা।
2. ttps://www.prothomalo.com/entertainment/dhallywood/বেড়েছে-সম্ভাবনা-কমেছে-সিনেমা-হল;retrieved on: 24.08.2020
৩. প্রাগুক্ত; আতিক (২০০৯ : ৩৩-৩৪)।
৪. হায়দার, কাজী মামুন; ‘টেলিভিশন’-এর জয়ধ্বনি ‘শুনতে কি পাও’; দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ ডিসেম্বর ২০১২।
5. https://www.prothomalo.com/entertainment/সীমানা-পেরিয়ে-‘মেড-ইন-বাংলাদেশ’; retrieved on: 10.09.2020
6. https://www.prothomalo.com/entertainment/সীমানা-পেরিয়ে-‘মেড-ইন-বাংলাদেশ’; retrieved on: 10.09.2020
7. https://www.banglanews24.com/cat/news/bd/427686.details; retrieved on: 15.09.2020
৮. প্রাগুক্ত; আতিক (২০০৯ : ৩১)।
9. https://www.prothomalo.com/entertainment/dhallywood/বেড়েছে-সম্ভাবনা-কমেছে-সিনেমা-হল; retrieved on: 24.08.2020
10. https://www.prothomalo.com/entertainment/dhallywood/শহরে-আসছে-নতুন-সিনেপ্লেক্স; retrieved on: 24.08.2020
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন