Magic Lanthon

               

শফিকুল ইসলাম

প্রকাশিত ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

কার্ক ডগলাস, এক সংগ্রামী জীবনের নিঃশ্বাস-বিশ্বাস

শফিকুল ইসলাম


গতিশীল এই জীবনে ব্যক্তি কোথায় কখন গিয়ে দাঁড়ায়, তা আন্দাজ করা কঠিন। অনেকে এজন্য ‘ভাগ্যলিপির’ ওপর নির্ভর করেও পুরো জীবন কাটিয়ে দেয়। আর কেউ কেউ কঠোর অধ্যবসায়, লেগে থাকা ও সংকল্প নিয়ে ভাগ্যলিপিই বদলে ফেলে; জীবনকে পাল্টে ফেলে নিজেই। অবশ্য এই পরিবর্তনের জন্য মশাল জ্বালাতে হয় ব্যক্তিকেই। জীবনে হারাতে হারাতে পেতে হয় ‘সাফল্য’। এই জীবন পরে গিয়ে অনেক জীবনের প্রতিধ্বনি হয়ে ধরা দেয়। আর সেই মানুষ/চরিত্র যেনো সবার থেকে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, অনুকরণীয় হয়। সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ‘স্পার্টাকাস’ হিসেবে পরিচিত এমনই এক চরিত্র/ব্যক্তি ও অভিনয়শিল্পী কার্ক ডগলাস। জন্ম থেকে জ্বলতে থাকা এই শিল্পীর জীবন শেষমেষ আরো অনেককেই জ্বালিয়ে দিয়েছে। নিজে হয়ে উঠেছেন চলচ্চিত্রপাড়ার অবিসংবাদী নেতা। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া এই শিল্পীর শারীরিক জীবনের অবসান ঘটে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি। একশো তিন বছরের জীবনের মধ্যবর্তী সময়ে তিনি অনেক কিছুরই সাক্ষী হয়েছেন। নিজেও অনেক কিছু দেখিয়েছেন তথাকথিত ‘ঢাল-তলোয়ার’ ছাড়াই। মার্কিন চলচ্চিত্র শিল্পের স্বর্ণযুগের এবং চলচ্চিত্রের শত বছরের শেষ তারকা১ হিসেবে খ্যাত অভিনয়শিল্পী, নির্মাতা, প্রযোজক, সাহিত্যিক কার্ক ডগলাসকে ধরেই এই ছোট্ট প্রয়াস।


ঘুটঘুটে অন্ধকারে ফুটফুটে প্রাণ

কার্কের বাবা হার্শেল ও মা ব্রাইনা বার্থা রাশিয়ান নাগরিক। ধর্মীয় পরিচয়ে তারা ইহুদি। থাকতো রুশ সাম্রাজ্যের মগিলেভ অঞ্চলের (বর্তমান বেলারুশ) চাভুসি এলাকায়। হার্শেলের ভাই অনেক আগেই রাশিয়া থেকে আমেরিকায় অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আর হার্শেল রাশিয়ায় টিকে থাকার তাগিদে রাস্তায় রাস্তায় ধাতুর টুকরো কুড়িয়ে বেড়াতেন। একসময় ঘোড়ার ব্যবসা করেও তিনি কোনোভাবেই সংসারের ভার টানতে পারছিলেন না। অন্যদিকে জারের সেনাবাহিনীতে জোরপূর্বক ভর্তির তাগাদা তো ছিলোই।২ অবশেষে বড়োভাইয়ের পথ ধরে ‘উন্নত’ জীবনের আশায় হার্শেল পরিবারও আমেরিকায় পাড়ি জমায়। রুশ সাম্রাজ্য থেকে সেই অর্থে পালিয়ে আসা একটি ইহুদি পরিবারের জন্য নিউ ইয়র্কের জীবন মোটেও সহজ ছিলো না। ফলে আমেরিকাতেও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় না। হার্শেলের এই দুঃসময়ে বাড়তি মুখ হিসেবে আলো করে জন্ম নেন কার্ক ডগলাস; রুশ বিপ্লবের ঠিক আগের বছর ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। যার জন্ম নাম রাখা হয় ইসসুর দানিয়েলোভিচ।


অবশ্য পরে তারসহ পরিবারের সবার নামই পরিবর্তন করতে হয়। সবার নামের শেষে পদবি হিসেবে যুক্ত হয় ‘ডেমস্কি’। তখন কার্কের নতুন নাম হয় ইজি ডেমস্কি আর বাবার হ্যারি ডেমস্কি। সাত বোনের সঙ্গে কার্ক বেড়ে উঠছিলেন প্রবল অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে। চরম প্রতিযোগিতা, পরিশ্রম আর সংকল্পই সাফল্য নিয়ে আসবে, এমন ধারণা থেকেই আমেরিকায় তৈরি হয়েছিলো তার জীবনদর্শন। একসময় তিনি পরিবারের দায়িত্ব নিতে বাধ্য হন। পরিবারের রুটি-রুজির জোগান দেওয়ার জন্য তিনি শিশু বয়সেই কারখানার শ্রমিকদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেন; কখনো করেন সংবাদপত্রের হকারি। নিজের আত্মজীবনীমূলক বইতে কার্ক দাবি করেছেন, অভিনয়শিল্পী হওয়ার আগে কমপক্ষে ৪০টি ছোটোখাটো পেশায় নিজেকে জড়িয়েছেন তিনি।৩ তবে পাশাপাশি পড়ালেখাটা চালিয়ে গেছেন। কিন্ডারগার্টেনে পড়ার সময়ই বিখ্যাত কবিতা ‘দ্য রেড রবিন অব স্প্রিং’ আবৃত্তি করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ছোট্টবেলায় আবৃত্তি করার সাহস আর প্রশংসা তাকে টেনে এনেছিলো অভিনয়ের রাজ্যে। মঞ্চকে ভালোবাসার কারণও সেটি। সেখানে দর্শকের প্রতিক্রিয়া মেলে সরাসরি। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কার্ক বলেছিলেন, ‘মঞ্চে দর্শককে যতোটুকু দেওয়া হয়, তার চেয়ে বেশি তারা আপনাকে ফেরত দেয়।’৪


অভিনয়ের নেশা মূলত তাকে পেয়ে বসেছিলো সেই মাধ্যমিকের গণ্ডিতেই। স্কুল-জীবনে নাটকে অংশ নেওয়ার সময়ই হয়তো তিনি নিজের ভিতরের শক্তিটা টের পেয়েছিলেন। এ নিয়ে আত্মজীবনীতে কার্ক লিখেছেন, ‘আমার জীবন নিয়ে একটা বিষয় আমি জানতাম এবং যা কখনো বদলায়নি, তা হলো আমি অভিনেতা হতে চাই।’৫ অবশ্য কলেজে রেসলিং চ্যাম্পিয়নও ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পেশাদার রেসলার হিসেবেও কাজ করেছেন। রেসলিং যে কেবল জীবিকার প্রয়োজনে করেছেন এমন নয়, বরং শারীরিক শক্তি, সাহস সবসময়ই কার্ক ডগলাসের ব্যক্তিত্বের অংশ ছিলো। যা পরবর্তী সময়ে তার অভিনয়েও প্রতিফলিত হয়েছে ভালো মতোই। রেসলার পেশার পাশাপাশি এই সময়ে তিনি অভিনয় শিখেছেন আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব ড্রামাটিক আর্টস-এর মতো প্রতিষ্ঠানে। এখানে কোর্স করার সময়েই তার জীবনের মোড় পাল্টে যায়; পরিচিত হন লরেন বেকলে’র সঙ্গে; যিনি পরবর্তী সময়ে তার ক্যারিয়ারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছিলেন। তার আরেক সহপাঠী ছিলেন ডায়ানা ডিল; যিনি ছিলেন তার প্রথম স্ত্রীও। এভাবে দুঃসময় কাটিয়ে অভিনয়ের বড়ো পর্দার জন্য প্রস্তুত হয়েছিলেন কার্ক।


নাবিকের জীবনে ছন্দপতন এবং বড়ো পর্দায় আগমন

১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ; পৃথিবী যুদ্ধময়; বয়সে তরুণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই সময়ে ইউ এস নেভি’তে যোগ দেন কার্ক। দ্বিতীয়বারের মতো নাম বদলাতে বাধ্য হন--ইজি ডেমস্কি থেকে হয়ে যান কার্ক ডগলাস। পরে অবশ্য এই নামেই তিনি বেশি পরিচিতি পান। যদিও এয়ার ফোর্সে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো তার। কিন্তু বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নেভিতে তিনি গানারি অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। চাকরি পেয়েই সহপাঠী ডায়ানা ডিলকে বিয়ে করেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে এক সাবমেরিন দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন কার্ক। ফলে চাকরিটাও হারাতে হয়। এই দুঃসময়ে জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান মাইকেল ডগলাস।


এরপর নিউ ইয়র্কের রেডিও ও থিয়েটারগুলোতে কার্কের যাওয়া-আসা শুরু হয়। সংসারের অভাব মেটাতে সেসময় বেশকিছু বিজ্ঞাপনে ছোটোখাটো চরিত্রে কাজ করেন তিনি। থিয়েটারপাড়ায় তাকে প্রথম পরিচিতি এনে দেয় নাটক ‘কিস অ্যান্ড টেল’। এই নাটকে তাকে দেখা যায় প্রধান চরিত্রে। এভাবেই চলছিলো। সেসময়ও বড়ো পর্দায় কাজের কথা ভাবেননি তিনি। এরই মধ্যে হঠাৎ এগিয়ে আসেন তার পুরনো বন্ধু লরেন বেকল। লরেন তার প্রযোজক বন্ধু হ্যাল বি. ওয়ালিস-এর সঙ্গে কার্কের পরিচয় করিয়ে দেন। এই পরিচয়ের বদৌলতেই তার বড়ো পর্দায় আগমন সহজ হয়ে যায়। লরেনের সঙ্গে কার্কের সম্পর্কটা ছিলো বন্ধুর থেকেও বেশি কিছু। সেই ১৭ বছর বয়সে যখন তাদের প্রথম পরিচয় হয়েছিলো, কার্কের তখন নিজের জন্য একটা নতুন কোট কেনার সামর্থ্যও ছিলো না। তাকে শীতে কষ্ট পেতে দেখে নিজের চাচার কাছ থেকে দুটো নতুন কোট এনে দিয়েছিলেন লরেন। কার্কের সঙ্গে লরেন একসঙ্গে অভিনয়ের স্বপ্নও দেখতেন। তারা একসঙ্গে অভিনয় করেছিলেন ইয়ং ম্যান উইথ অ্যা হর্ন (১৯৫০) এবং ডায়মন্ডস (২০০৯) চলচ্চিত্রে। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে লরেনের হাতে সম্মানসূচক অস্কার তুলে দিয়েছিলেন এই কার্কই। সেসময় প্রিয় বন্ধুর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘লরেনের মুখের ঝাঁঝ একটু বেশি থাকলেও ওর অন্তরটা একদম নিখাদ সোনা দিয়ে তৈরি।’৬ চলচ্চিত্রপাড়ায় একজন সহযোদ্ধা-বন্ধু যে কতো বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে লরেন তার প্রমাণ।


১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্য স্ট্রেঞ্জ লাভ অব মার্থা আইভারস দিয়ে বড়ো পর্দায় যাত্রা শুরু করেন কার্ক। চলচ্চিত্রটিতে খলচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। ওই বছরই জ্যাকস টুরনিউর নির্মিত আউট অব দ্য পাস্ট-এও ছিলেন খলচরিত্রেই। প্রথম দুই চলচ্চিত্রে খলঅভিনয়শিল্পী হলেও তিনি আসলে একজন অভিনয়শিল্পী, যিনি যেকোনো চরিত্রকেই লেপ্টে নিতেন নিজের সঙ্গে।


চ্যাম্পিয়ন পাল্টে দেয় গতিপথ

বেশকিছু চলচ্চিত্রে কাজের পরও যেনো মন মতো চরিত্র পাচ্ছিলেন না কার্ক। পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে ভালো আয়ও হচ্ছিলো না অভাবী কার্কের। তার ওপর এই সময়ে অর্থাৎ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয় ডায়ানা-কার্ক দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান জোয়েল। প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন হলিউডের মতো চলচ্চিত্রপাড়ায় টিকে থাকার জন্য। অবশেষে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে চ্যাম্পিয়ন দিয়ে নিজের জাত চিনিয়ে দেন তিনি। একজন বক্সারের চরিত্র দিয়ে প্রথম অস্কার মনোনয়নও অর্জন করেন কার্ক। খুব বেশি ব্যবসাসফল না হলেও চলচ্চিত্রটি অস্কারে মোট ছয়টি মনোনয়ন পায়। এই চলচ্চিত্রে তিনি এমন এক বক্সারের চরিত্রে অভিনয় করেন, যেখানে ওই বক্সারকে যেকোনো মূল্যে জিততে হয়। যদিও বাস্তব জীবনেও কার্ক একসময় পেশাদার রেসলিং করতেন। অবশ্য এই চলচ্চিত্র করতে গিয়ে আরেকটি ত্যাগ স্বীকারও করতে হয় তাকে; হাতছাড়া করতে হয় মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার-এর মতো প্রভাবশালী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র দ্য গ্রেট সিনার-এ অভিনয়ের লোভনীয় প্রস্তাব। তবে চ্যাম্পিয়নই তার অভিনয় জীবনের পথ মসৃণ করে দিয়েছিলো। কেননা এর পর থেকেই হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে তার মূল্য বাড়তে থাকে।


পরবর্তী সময়ে একে একে অভিনয় করেন বড়ো বাজেটের ইয়ং ম্যান উইথ আ হর্ন (১৯৫০), অ্যালং দ্য গ্রেট ডিভাইড (১৯৫১), দ্য বিগ কার্নিভাল (১৯৫১), ডিটেকটিভ স্টোরি (১৯৫১), দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য বিউটিফুল (১৯৫২), ইউলেসেস (১৯৫৪), টোয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি (১৯৫৪), ম্যান উইদাউট আ স্টার (১৯৫৫), দ্য ইন্ডিয়ান ফাইটার (১৯৫৫), লাস্ট ফর লাইফ (১৯৫৬), পাথস অব গ্লোরি (১৯৫৭), দ্য ভাইকিংস (১৯৫৮), লাস্ট ট্রেন ফ্রম গান হিল (১৯৫৯), স্পার্টাকাস (১৯৬০) এ। চ্যাম্পিয়ন পরবর্তী চলচ্চিত্রের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়, সেসময়ে কার্ক ডগলাস কতোটা শক্তিমান অভিনয়শিল্পী হিসেবে হলিউডে একক আধিপত্য করেছেন; যা অব্যাহত ছিলো পরের দশকেও। তবে এই দশকে তাকে ইতিহাসে ঠাঁই করে দিয়েছে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ’কে নিয়ে নির্মিত লাস্ট ফর লাইফ ও স্টানলি কুবরিক-এর স্পার্টাকাস।


ভ্যান গঘ-এর জীবন ধারণ ও স্পার্টাকাস চরিত্র

পাথস অব গ্লোরি চলচ্চিত্রের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। আমেরিকান ‘ওয়ার ফিল্ম’ হলেও এটি বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে ভিন্ন ছিলো--অনেকটা যুদ্ধবিরোধী চলচ্চিত্র। ‘সত্য’ ঘটনার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের কাহিনি গড়ে উঠেছে একটি কোর্ট মার্শালকে কেন্দ্র করে। দুর্নীতিগ্রস্ত এক জেনারেল পদোন্নতির লোভে নিজের সৈন্যদেরকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেন। ফলে সেই মিশনে নিহত হয় অনেকে। আর যারা তার আদেশ অমান্য করে, তাদেরকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়। কোর্ট মার্শালে ওই অসহায়, হতভাগ্য সৈন্যদের পক্ষ নেওয়া কর্নেলের ভূমিকায় অভিনয় করেন কার্ক। সেসময়ে আমেরিকায় যুদ্ধের বিপক্ষে এ রকম কাহিনি হাজির করা ছিলো দুঃসাহসিক ব্যাপার। কিন্তু স্ট্যানলি কুবরিক ও কার্ক কোনোকিছুর তোয়াক্কা না করে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধবিরোধী চিত্র হাজির করেছিলেন। নির্মাতা কুবরিকের সঙ্গে এই বোঝাপড়া তার ছিলো। এই কন্ট্রাস্টেই পরবর্তী সময়ে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত স্পার্টাকাস নির্মিত হয়। রোমান সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়া বিপ্লবী স্পার্টাকাসের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেন কার্ক। সৈন্যসামন্ত ও ক্রীতদাসদের একত্র করে পাহাড়ের গভীরে সেনাবাহিনী গঠন কিংবা পদাতিক রোমান সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি যুদ্ধে বার বার হারিয়ে দেওয়ার এই চাঞ্চল্যকর কাহিনি সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথমবারের মতো বড়ো পর্দায় মানুষ দেখলো রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একশো ৯৮ মিনিটের বিদ্রোহী স্পার্টাকাস চরিত্রকে। স্পার্টাকাস-এ অভিনয়ের পর থেকে মানুষ কার্ক ডগলাসকে এক নামে চেনা শুরু করে। মূলত চলচ্চিত্রটিতে দাস বিদ্রোহের নায়কের চরিত্রে দেখা যায় কার্ককে। তিনি এই চলচ্চিত্রের নির্বাহী প্রযোজকও ছিলেন। এটির নির্মাণ ব্যয় ছিলো ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যা তখনকার যেকোনো চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি। কার্ক শুরুতে আমেরিকান নির্মাতা অ্যান্টনি মান’কে চলচ্চিত্রটি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে স্টানলি কুবরিককে নির্বাচন করেন। হয়তো শেষ পর্যন্ত কুবরিকের প্রতিই তিনি আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছিলেন।


হাওয়ার্ড ফাস্টের উপন্যাসটি আগে থেকেই কার্ক ডগলাসের খুব পছন্দের ছিলো। কার্ক নিজেকে দাসদের মতোই মনে করতেন। আত্মজীবনীতে তিনি সরাসরিই লিখেছেন--‘আমি এসেছি দাস সম্প্রদায় থেকে।’৭ কার্কের আত্মজীবনীর এই অংশটি অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠার একটা পর্যায় পর্যন্ত তিনি যে ‘ক্রীতদাসের’ জীবনই ধারণ করেছেন সেটা এই অংশে পরিষ্কার করতে চেয়েছেন। এবং সেই জীবনে বেঁচে থাকার তাগিদে তিনি মিশেছেন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে। ফলে জীবনকে আরো কাছ থেকে দেখতে পেরেছেন। সেকারণেই স্পার্টাকাস চরিত্রটি হয়তো তার জীবনের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলো।


এছাড়া বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাস অবলম্বনে লাস্ট ফর লাইফ-এ কার্কের অভিনয় তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রটিতে তিনি হুবহু ভ্যান গঘকে প্রতিফলিত করেন পর্দায়। প্রত্যেকটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জায়গায় নিজেকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে একেবারে মেলে ধরেছিলেন কার্ক।


শেষ দিকের খানিকটা ছন্দপতন আরো উজ্জ্বল

৬০-এর দশকেও বেশকিছু প্রতাপশালী চলচ্চিত্রে অভিনয় করলেও কার্ক ডগলাস ৭০-এর দশক থেকে চলচ্চিত্রে অভিনয় কিছুটা কমিয়ে দেন। এ সময়ে তাকে দুইটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে দেখা যায়। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন স্কালাওয়ে আর ১৯৭৫-এ পস। প্রথম চলচ্চিত্রে তেমন সফলতা না পেলেও দ্বিতীয়টিতে বেশ সাড়া পান তিনি। তবে এই সময়ে কার্ক বেশকিছু টেলিভিশন সিরিজে মনোযোগ দেন। আর ৮০’র দশকের শেষ দিকে মনোযোগী হন লেখালেখিতে। এ সময়ে তিনি পুরোদস্তুর সাহিত্যিক হয়ে ওঠেন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ হয় তার প্রথম আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস “দ্য র‌্যাগম্যান’স সন”। এই সময়ে তার লেখা উপন্যাস ‘ড্যান্স উইথ দ্য ডেভিল’ (১৯৯০), ‘দ্য গিফট’ (১৯৯২) এবং বই ‘লাস্ট ট্যাঙ্গো ইন ব্রুকলিন’ (১৯৯৪), ‘দ্য ব্রোকেন মিরর’ (১৯৯৭), ‘ইয়ং হিরোজ অব বাইবেল’ (১৯৯৯) প্রকাশ পায়।


১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় কোমর ভেঙে যায় কার্কের। সেই যাত্রা থেকে ফিরে আবারও কাজে ফিরেন তিনি। তবে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে স্ট্রোক হওয়া কার্ককে অনেকেই শেষ বিদায়ের ঘণ্টার সন্নিকটে দেখছিলেন। সেসময় তিনি বাকশক্তি অনেকটাই হারিয়ে ফেলেন। তিনিও ভেবেছিলেন, হয়তো আর ফিরবেন না। কিন্তু কাজ-পাগল কার্ককে কোনোভাবেই বিছানায় আটকে রাখা যায়নি! ভয়েস থেরাপিস্টের সহায়তায় তিনি আবারও কাজে ফেরেন। এই বছরই কার্ককে দেওয়া হয় সম্মানসূচক অস্কার। সেই অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে তাকে কোনোরকমে একটা ধন্যবাদ-সূচক শব্দ উচ্চারণ করতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু অস্কারের মঞ্চে হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পান কার্ক--ধন্যবাদ তো জানানই; পাশাপাশি অভিনয়জীবন ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেক কথা বলেন। এই ঘটনায় সেদিনের সেই অস্কার মঞ্চ অভূত করতালিতে ফেটে পড়ে।


তবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অভিনয় করে গেছেন এই শিল্পী। অভিনয়ের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দিয়ে তিনি কথা বলতেন না। একবার তো বলেই ফেলেছিলেন--আমাকে ‘অভিনেতা’ হিসেবে সনদ দেওয়ার জন্য কোনো সমালোচকের দরকার নেই। নিজের পথ আমি নিজেই তৈরি করি। কেউ আমার গুরু নয়। কেউ কখনোই আমার গুরু ছিলো না।৯ দুইবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া কার্কের চার সন্তানই অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে কার্ক পরিবারের তিন প্রজন্মকে একসঙ্গে পাওয়া যায় ইট রানস ইন দ্য ফ্যামিলি চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রে তার প্রথম স্ত্রী ডায়ানাও অভিনয় করেন। এরপর কার্ককে শেষবারের মতো পর্দায় দেখা যায় ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং মার্ডারস চলচ্চিত্রে।১০


শুধু অভিনয় আর লেখালেখিতেই ডুবে থাকেননি কার্ক। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের গুডউইল অ্যাম্বাসেডর নিযুক্ত হন। নিজের সংগ্রহে থাকা মূল্যবান সব পেইন্টিং বিক্রি করে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে গৃহহীন নারীদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘অ্যান ডগলাস সেন্টার’ নামে প্রতিষ্ঠান। অসহায় রোগীদের জন্য বাবার নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হ্যারিস হেভেন’।


সবমিলিয়ে জীবনভর নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছেন কার্ক। তবে সেই জীবনে হেরে যাওয়ার গল্প নেই বললেই চলে। যদিও সেটা খুব সহজ ছিলো না। সবটাই তাকে অর্জন করতে হয়েছিলো। ফলে শুধু পর্দার স্পার্টাকাস হিসেবে নন, তিনি বেঁচে থাকবেন যুগে যুগে সব স্পার্টাকাসের মাঝে। যারা এখনো পর্দায় পরিচিত হওয়া স্পার্টাকাসের মতোই লড়াই করে যাচ্ছে।


লেখক : শফিকুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে প্রথম আলোর রজশাহী প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছেন।

shafiqulislamru32@gmail.com

https://web.facebook.com/profile.php?id=100008632759356

তথ্যসূত্র

1. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1720837.bdnews; retrieved on: 10.11.2020

2. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1720837.bdnews; retrieved on: 10.11.2020

3. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1720837.bdnews; retrieved on: 10.11.2020

4. https://archive.is/py7cZ#selection-629.0-629.412; retrieved on: 15.11.2020

5. https://www.theguardian.com/film/2020/feb/06/kirk-douglas-obituary; retrieved on: 26.11.2020

6. https://roar.media/bangla/main/biography/kirk-douglas-biography; retrieved on: 10.11.2020

7. https://www.theguardian.com/film/2020/feb/06/kirk-douglas-obituary; retrieved on: 26.11.2020

8. https://roar.media/bangla/main/biography/kirk-douglas-biography; retrieved on: 10.11.2020

9. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1720837.bdnews; retrieved on: 10.11.2020

10. https://archive.is/py7cZ#selection-629.0-629.412; retrieved on: 15.11.2020

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ২০তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২১ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন