Magic Lanthon

               

মাহফুজুর রহমান খান

প্রকাশিত ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘ডিরেক্টরকে অসম্মান করার কোনো অধিকার আমার নেই’

মাহফুজুর রহমান খান


ঘোরতর কুয়াশা--এক হাত সামনে কী ঘটছে তা ঠাওর করতে না পারা, সেই ফাঁদে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ নাগরিকের চোখই পড়েছিলো ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বরের সকালটিতে। তারপরও পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী এদিন এফ ডি সি (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন) প্রাঙ্গণে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওনা দেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি জগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মাহফুজুর রহমান খান। শেষ পর্যন্ত তীব্র শীত আর কুয়াশার বাধা পেরিয়ে সাত সকালেই হাজির হন তিনি। মাহফুজুর রহমান খান এতো ভোরে এফ ডি সি'তে আসলেও তা চাউর হতে সময় লাগেনি। প্রোডাকশন বয়, ট্রলিম্যান, দারোয়ান থেকে শুরু করে ওখানকার সবাই প্রখ্যাত এ নির্মাতার কাছে বার বার ঘুরেফিরে আসছিলেন, কেউ তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে, কেউ শরীরের অবস্থা জানতে চাচ্ছে, কেউবা একটু পর শুটিং শুরু হতে যাওয়া শাকিব-ববি অভিনীত শাহেনশাহ-এর সিনেমাটোগ্রাফি কেমন চলছে তারও খোঁজখবর নিচ্ছে। সোজা ভাষায় বললে, মাহফুজুর রহমানকে নিয়ে আগতদের অতি সযত্ন আগ্রহ সাক্ষাৎকারপর্বকে অনেকটা সময় ঝুলিয়ে রেখেছিলো। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সামনে বসে তার সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।

মাহফুজুর রহমান খানের জন্ম ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে। তিনি পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন স্বাধীনতাযুদ্ধের পরের বছর থেকে। এরপর বিরতিহীনভাবে অসংখ্য চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তিনি; অর্জন করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সর্বাধিক বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের খেতাব। শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া আটবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। মাহফুজুর কাজ করেছেন আলমগীর কবির, আলমগীর কুমকুম, হুমায়ূন আহমেদ ও শিবলি সাদিকের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে। তার সিনেমাটোগ্রাফিতে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অভিযান, পোকা মাকড়ের ঘরবসতি, সহযাত্রী, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, হাজার বছর ধরে, আমার আছে জল, ঘেটুপুত্র কমলা ও পদ্ম পাতার জল।

চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও মাহফুজুর সফলতা লাভ করেছিলেন। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দিশা ইন্টারন্যাশনালের ব্যানারে নির্মাণ করেন নীতিবান, সম্মান, দুর্নাম ও কারফিউ নামে চারটি চলচ্চিত্র। অভিনয়শিল্পী হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে; আবদুল্লাহ আল মামুনের জল্লাদের দরবার, আলমগীর কুমকুমের জন্মভূমি, মুস্তাফিজুর রহমানের আলো ছায়ায় মাহফুজুর অভিনয় করেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর মাহফুজুর রহমান খান হঠাৎই আমাদের ছেড়ে চলে যান। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর হয়ে মাহফুজুর রহমান খানের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবেল পারভেজ। চলতি সংখ্যায় সেই আলোচনার দ্বিতীয় ও শেষ কিস্তি প্রকাশ করা হলো।

রুবেল পারভেজ : মাত্রই বললেন আপনি ভুল করেছিলেন। কেনো মনে হলো ভুল করেছেন?

মাহফুজুর রহমান খান : ভুল মানে কী, আসলে অনুধাবন করেছিলাম, যাই করি না কেনো, যতো বেশিই দক্ষ হই না কেনো, অ্যাকাডেমিক শিক্ষার খুব প্রয়োজন, খুবই প্রয়োজন। এ শিক্ষা ছাড়া যেকোনো কাজ অপূর্ণ থাকে।

রুবেল : কেনো এতো প্রয়োজন মনে করছেন অ্যাকাডেমিক শিক্ষার?

মাহফুজুর : এ কারণে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার প্রয়োজন যে, কিছু একটা পড়া থাকলে কাজটিকে আরো বেশি রিফাইন্ড করতে পারতাম। আমরা দেখে শিখেছি, এখানে সবকিছু ঠিক ছিলো, এমনটা তো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, সবকিছুই যে সঠিক ছিলো তাও তো না। আনোয়ার ভাই (সূর্য দীঘল বাড়ী চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন), শফিকুল ইসলাম স্বপন (ঘুড্ডির সিনেমাটোগ্রাফার) যখন আসলেন, তাদের কাছে গিয়েও দেখার চেষ্টা করলাম তাদের স্টাইলটা কী। আমাদের এখানে টোটাল ফটোগ্রাফির লাইটিং কিন্তু একজন ক্যামেরাম্যানই করে। লাইটিংটা তারা নিজে করে, নিজের মতো করে, গল্প হিসেবে, তার চয়েজ হিসেবে।

উনারা মেইনলি ছিলেন--দে আর ভেরি মাচ এডুকেটেড, দে নো দ্য ক্যামেরা। ক্যামেরাকে কীভাবে সর্বোচ্চ ইউটিলাইজ করা যায় এটা উনারা জানতেন। আমরা তখন ‘এ প্লাস বি হোল স্কয়ার’ শিখলাম, উনাদের ওটুকু দেখে দেখে।

রুবেল : আপনার কী মনে হয়, অ্যাকাডেমিক পরিসরে আমাদের দেশে সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে এখন যে পঠনপাঠন কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তা যদি আরো আগে থেকে শুরু করা যেতো, তাহলে সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে এখানে একটা অন্য রকম জায়গা তৈরি হতো?

মাহফুজুর : তা হয়তো হতো। কিন্তু যতো আয়োজন বিয়োজনের পসরাই সাজানো হোক না কেনো, ক্যামেরাম্যানকে অপার সুযোগ করে দিতে হবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্বটি সুচারুভাবে পালন করার জন্য। ওই যে হঠাৎ করে শুটিং শেষ করার ঘোষণা আসবে, আর্টিস্ট চলে যাবে, কাল পুরো শুটিংই বন্ধ হয়ে যাবে, শুটিং করতে পারবো না, বাজেট কম--এসব বিষয় করেই তো ছবির ক্ষতি হয়ে যায়, সিনেমাটোগ্রাফারের ক্ষতি হয়ে যায়।

রুবেল : পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে আনোয়ার হোসেন, শফিকুল ইসলাম স্বপনরা পড়ে আসলেন। সেটে গিয়ে আপনি তাদের কাজের সঙ্গে নিজের কাজের পার্থক্যগুলো কেমন দেখেছিলেন? কখনো কি এমন মনে হয়েছিলো, উনারা বাইরে থেকে পড়ালেখা করে এসেছেন এই বিষয়ে, উনাদের ওটা হয়েছে আপনার এটা হয়নি। কিংবা ওমুক বিষয়টি যদি আরো একটু জানতে পারতেন, তাহলে যারা সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে পড়তে চায় না, শুধু প্র্যাকটিকাল কাজই করতে চায়, তাদের তা পড়তে আরেকটু উৎসাহী করতে পারতেন?

মাহফুজুর : পড়াশোনার প্রয়োজন অবশ্যই আছে, এটা তো অ্যাসেনশিয়াল। কিন্তু এর সঙ্গে প্র্যাকটিকাল থাকলে দ্যাট ইজ সামথিং এক্সট্রা অর্ডিনারি। আমাদের এখানে শুধু একটিই হয়ে গেছে। উনারা পড়াশোনা করে এসেছেন। দে আর নট প্র্যাকটিকাল। অন্যদিকে আমরা প্র্যাকটিকাল ছিলাম, কিন্তু আমরা পড়াশোনা করিনি। এটাই ডিফারেন্স ছিলো। কিন্তু তারাও ভালো কাজ করেছে।

রুবেল : শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক হিসেবে আনোয়ার হোসেন পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এই চলচ্চিত্রগুলোর বেশিরভাগকেই ‘আর্ট’ ঘরানার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেনকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মাহফুজুর : উনাদের প্রমাণ করার দরকার নেই, উনারা গ্রেট। স্বপন অনেক কমার্শিয়াল ছবি করেছে, ভালো কাজ করেছে। আনোয়ার হোসেনের কাজ খুব ডিফারেন্ট ছিলো। এজন্য আনোয়ার হোসেনের এতো তাড়াতাড়ি চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য গ্রেট লস। তার চলে যাওয়াটা কতো স্যাড, একটা হোটেল রুমে!

রুবেল : তিনি মারা যাওয়ার দুই দিন আগে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘চলচ্চিত্রনির্মাতা শেখ নিয়ামত আলীর স্মরণ সভায়’ এসেছিলেন। সবাইকে চমকে দিয়ে এ অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন তিনি। কাউকে না জানিয়ে তার হঠাৎ এমন আগমন ছিলো অন্য রকম, বিস্ময়ের। তার সঙ্গে আমার সেখানে দেখা হয়েছিলো, আমরা অনেকক্ষণ কথা বলেছিলাম। ওই দিনই মূলত তার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। কখনো ঘাড়ে হাত রেখে আবার কখনো কানে কানে ফিস ফিস করে এদেশের সাম্প্রতিক সিনেমাটোগ্রাফি চর্চার নানা বিষয় নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে অনেক কথা বলেছিলেন সেদিন। আমাকে তিনি তার শরীয়তপুরের বাড়িতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যেদিন আমার যাওয়ার কথা ছিলো সেদিনই তার মৃত্যু সংবাদ শুনলাম।

মাহফুজুর : তাই তো, আমি জানতামই না উনি দেশে এসেছেন। উনার সঙ্গে আমি আমার নিজের ইন্টারেস্ট থেকেই দেখা করতাম। উনার সেটে যেতাম। উনি প্রচুর এক্সপেরিমেন্ট করতেন। ওই যে পড়াশোনা করে এসেছেন তো। এক্সপ্লেইনেশনগুলো শোনাতেন, ফটোগ্রাফিতে কী করা উচিত, ক্যামেরা প্লেসমেন্টটা কী হওয়া হওয়া উচিত, লাইটিংটা কী হওয়া উচিত। বিপরীতে আমরা তো এক রকমভাবে ক্রিয়েট করতে করতে হয়ে গেলাম ক্যামেরাম্যান। সাধন রায় নাইট ফটোগ্রাফি করতেন, আমরা ওটা ফলো করতাম। বাচ্চু ভাই গ্লামার ফটোগ্রাফি করতেন, আমরা ওটাও ফলো করতাম। আর রফিকুল বারী চৌধুরী দুটোই করতেন, অ্যাকোরডিং টু সিকোয়েন্স উনি লাইট করতেন। সোর্স কাকে বলে উনি দেখাতেন। তো এভাবে শিখে শিখেই কিন্তু আজকে এখানে আমি। তবে এডুকেশনটা সত্যিই অনেক অনেক অনেক ইম্পরটেন্ট, অনেক ইম্পরটেন্ট।

রুবেল : নতুন যারা কাজ শিখতে চায়, তাদের শেখানোর ব্যাপারে আপনার আগ্রহ কতোটুকু?

মাহফুজুর : আমার আগ্রহ নেই। কারণ আই অ্যাম আ প্লেয়ার। আই অ্যাম নট আ কোচ। আমি ম্যারাডোনা না।

রুবেল : কেনো এটা মনে হয়?

মাহফুজুর : আমার মনে হয় এটা। টিচিং ইজ সামথিং গ্রেট। অনেক বড়ো জিনিস, টিচিং মানে কাউকে শেখানো। আমার কাছে অনেক অফার আসে, আপনি আসেন একটু শিখিয়ে দেন, পরামর্শ দেন। আমি বলি, বাপ আই অ্যাম আ প্লেয়ার, আই অ্যাম নট আ কোচ। কোচরা ভালো খেলা শেখাতে পারে।

রুবেল : কোচরা তাহলে ভালো খেলতে পারে না বোঝাতে চাইছেন?

মাহফুজুর : হ্যাঁ, কোচরা ভালো খেলতে পারে না। পারে না কেনো? ম্যারাডোনাও তো কোচ হয়েছে। কোচ হয়ে কী লাভ হলো? তো আমাকে শেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়াতেও কোনো লাভ হবে না।

রুবেল : আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় সিনেমাটোগ্রাফির চর্চা কেমন হওয়া দরকার। আপনার অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে বলুন।

মাহফুজুর : ফটোগ্রাফি অ্যাবসোলুটলি ডায়ালগস এর ব্যাপার না, গ্রাফের ব্যাপার না; প্র্যাকটিসেরও ব্যাপার। যতো প্র্যাকটিস করবে ততো ভালো রেজাল্ট আসবে। তো কোথায় করাচ্ছে? যখন থার্টি ফাইভ নিয়ে এরা পড়ানো আরম্ভ করলো, তখন কেবল থার্টি ফাইভ ক্যামেরাই দেখলো, শুট তো করলো না। কারণ অনেক কস্টলি নেগেটিভ পজেটিভ প্রিন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন তো অনেক সস্তা হয়ে গেছে। কারণ এটাতে অনেক ম্যাটেরিয়াল আছে, সুবিধার ঝুলি আছে। তো আপনি করেন না কেনো? আপনাকে তো প্র্যাকটিকালি ছবি বানাতে হবে। আইডিয়াস আর ওয়ান্ডারফুল। আমি রিসেন্টলি শর্ট ফিল্ম ফোরামের কয়েকটি ছবি দেখলাম। বিশ্বাস করো, আমার কাছে মনে হয়েছে, দে আর ফুল অব ট্যালেন্ট। এতো সুন্দর মেকিং, এতো সুন্দর চিন্তাভাবনা। আসলে আপনি কীসের ওপর কাজ করেন। কাজ করেন চিন্তার ওপর। একটা সাবজেক্ট ক্রিয়েট করেন, একটা মুড ক্রিয়েট করেন। ওটাকে আপনি পিকচারাইজ করেন। তো ওই মুডটার যে ক্রিয়েট, এরা তা করতে পারছে। সুন্দর সুন্দর আইডিয়ার অনেক ছবি দেখলাম। আসলে প্রশংসা কীভাবে করবো আমি বুঝতে পারি না। আমার কাছে মনে হয়, দে আর ট্যালেন্ট বয়েজ কামিং।

রুবেল : ভালো বলেছেন।

মাহফুজুর : হ্যাঁ সত্যি; আমার কাছে সত্যিই ভালো লেগেছে। বেশ কয়েকবার আমি নিজে নিজে গিয়ে দেখলাম।

রুবেল : আপনি তো অ্যানালগের সেই শুরু থেকে কাজ করতে করতে আজ ডিজিটাল ক্যামেরা ধরেছেন। পুরনো ক্যামেরার সেই স্পর্শ আর আজকের এই স্পর্শের মধ্যে কোনো পার্থক্য ধরা পড়ে আপনার কাছে?

মাহফুজুর : ওহ! আর বলো না। অনেক ডিফারেন্স আছে। ডিফারেন্সটা হচ্ছে, ক্যামেরাম্যানের ওপর এভরিওয়ান ডিপেন্ড করছে, নট অনলি ডিপেন্ড বাট লয়াল, ক্যামেরাম্যান মাহফুজ লয়াল কতোটুকু। মাহফুজকে আমি (নির্মাতা) যে শটটা দিলাম সে কি লয়ালিটির সঙ্গে শটটা নিয়েছে? বিশ্বাসের একটা ব্যাপার ছিলো। আর এখন তো আপনি দেখে নিচ্ছেন। আগে আমাদের হতো কী, এই শুটিং করলাম, ডিরেক্টর বুঝিয়ে দিলো কী লেন্স হবে না হবে। এখন কোনোভাবেই ছবি খারাপ হওয়ার কথা নয়, আমার কথা হলো এটা। আপনি সবকিছু দেখছেন, কারেকশন করে নিচ্ছেন। কেনো আপনার ছবি খারাপ হবে? তখন হতো কী একটা ছবির শুট করলাম, ডেভেলপ হবে, এই ল্যাবে কখন ডেভেলপ হবে, আমাদের সিরিয়াল আসতো ১৫ দিন পর। ল্যাবে গেলাম, ল্যাবে গিয়ে ডেভেলপ করলাম, নেগেটিভ দেখলাম, না ঠিক আছে। আবার নেগেটিভ দেখলেই তো সবকিছু কারেক্ট না। তারপর রাশ কী হবে। রাশ হলো, দেখলাম যে, না ফোকাস ইজ ফেয়ার। ট্রলি প্রোপার হয়েছে, জার্ক নেই। এসব দেখে বাসায় গিয়ে ঘুম দিলাম।

কিন্তু ঘুম কী আর হতো ঠিক মতো, যতোদিন পর্যন্ত নেগেটিভ পজেটিভ না হতো, ততোদিন পর্যন্ত আমাদের ঘুম আসতো না। বেশ টেনশন, কী হলো, কী হবে। ক্যামেরাও তো ফল করতে পারে। আউট অব ফোকাস হতে পারে। প্রোপার এক্সপোজার নাও হতে পারে। এখন তো সেরকম কোনো বিষয়ই নেই। এখন তো শুট করলাম ডিরেক্টর হ্যাপি, আমিও হ্যাপি, রাতে ঘুম দিলাম। যদি এটা আগে থাকতো আমাদের হার্টের রোগ হতো না। খুব টেনশন ছিলো? ওহ! কী বলবো, আমি এখনো সেসব দিনের কথা মনে পড়লে আঁতকে উঠি। খোকা ভাইয়ের কাছে যেতাম, বলতাম খোকা ভাই ডেভেলপ কখন হবে। উনারা তো অনেক জ্ঞানী লোক ছিলেন। জাহাঙ্গীর রাব্বানী, উনার কাছেও যেতাম। প্রিন্ট করলে কী হবে, ঠিক আছে কি না উনারা দেখতেন। উনাদের চোখটাই হয়ে গিয়েছিলো একেকটা প্রিন্টিং মেশিন। কাজ করতে করতে তারা এতোটাই দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।

রুবেল : এই যে আপনি লয়ালটির প্রসঙ্গ আনলেন। এই যে সিনেমাটোগ্রাফার আর ডিরেক্টরের মধ্যে যে সম্পর্ক ...

মাহফুজুর : অনেক অনেক মানে নট লেস দ্যান হাজব্যান্ড অ্যান্ড ওয়াইফ। এই রকম একটা রিলেশন। কেননা ডিরেক্টরকে অসম্মান করার কোনো অধিকার আমার নেই। কোনো ওয়াইফ তার হাজব্যান্ডকে অসম্মান সহ্য করতে পারে না, না খেয়ে থাকবে প্রয়োজনে। আসলে অনেক কিছুই নেই, অনেক সঙ্কট, তারপরও কিন্তু ডিরেক্টরকে অবজ্ঞা করা যাবে না। যতো কষ্টই হোক না কেনো তাকে খুশি রাখতে হবে, এটাই আমার নৈতিক দায়িত্ব। কারণ আমি তো তার কাজ করছি। তার সম্মানটাই আমার কাছে বড়ো।

রুবেল : আমাদের দেশে অনেক নির্মাতা আছে, আবু সাইয়ীদ বলেন ...

মাহফুজুর : আবু সাইয়ীদের কাজ আমি করেছি। হি ইজ আ গুড ডিরেক্টর, ভেরি ফ্যান্টাসটিক।

রুবেল : বলতে চাচ্ছিলাম, উনার মতো অনেক নির্মাতা নিজেই নিজের ছবির ক্যামেরা চালান। পৃথিবীর অনেক নির্মাতাই নিজেই ক্যামেরা চালান। সেক্ষেত্রে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আপনার কী মনে হয়, এটা তারা কেনো করে?

মাহফুজুর : এটা উনারাই ভালো জানেন। আমি তো জানি না। কিন্তু আমি তার কাজ করেছি। আমার সময়ে উনি ক্যামেরা চালাননি। হয়তো পরে উনি ক্যামেরা নিয়ে অনেক কিছু শিখেছেন।

রুবেল : শুধু উনাকে নিয়ে নয়, সামগ্রিকতার জায়গা থেকেই বলুন?

মাহফুজুর : আমার কাছে মনে হয়, সবার কাজ এটা নয়। আপনি আপনার কাজটি করেন। ডিরেক্টরকে ডিরেক্টরের কাজ, ক্যামেরাম্যানকে ক্যামেরার কাজ, লাইটম্যানকে লাইটিংয়ের কাজ করা উচিত। ইফ ইউ প্রোপার; ডিপার্টমেন্ট যদি প্রোপার ওয়েতে কাজ করে তাহলে প্রবলেমই হবে না। যার যা কাজ তা তারই করা উচিত। যার জন্য ডিভিশন অব ওয়ার্ক ইজ দেয়ার। এটা ক্যামেরাম্যানের জব, এটা লাইটম্যানের জব, এটা প্রোডাকশন ম্যানেজারের জব, এটা প্রোডাকশন বয়ের জব, এটা চিফ অ্যাসিসট্যান্টের জব। এটা পরিষ্কারভাবে ডিসাইড করা আছে।

রুবেল : প্রত্যেকটি দশকে আমাদের কোনো না কোনো পরিবর্তন এসেছে চলচ্চিত্রের ভাষায়, উপস্থাপন শৈলীতে। মানে ৭০-এর দশকের ছবির সঙ্গে ৮০’র দশকের ছবি মিলবে না। ৮০’র দশকের সঙ্গে থেকে ৯০-এর মিলবে না, ৯০ থেকে ...।

মাহফুজুর : ওই সময়টায় এনভায়রনমেন্টের ওপর ছবি তৈরি হতো। ৮০’র দশকে বাংলাদেশের কালচারাল ও সোশ্যাল যে অবস্থান ছিলো, তার ওপর ছবি হয়েছে। এখন তো কালচারালি, সোশ্যালি অনেক কিছু চেঞ্জ হয়ে গেছে। তো যুগের সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সিনেমাও চেঞ্জ হয়েছে।

রুবেল : সিনেমাটোগ্রাফির পরিবর্তন এক্ষেত্রে কতোটা ঘটেছে?

মাহফুজুর : সিনেমাটোগ্রাফিসহ সবকিছুতেই এই পরিবর্তন এসেছে। অ্যাকোরডিং টু দ্য টাইম এটা হচ্ছে। এখন আপনি যদি ৬০-এর দশকের লাইটিংটা করেন, ওই আস্তে আস্তে হেঁটে আসতেছে, কুপি হাতে নিয়ে; ওই সময়টাকে যদি টার্গেট করে করেন তাহলে ঠিক আছে। ইটস অল রাইট। কিন্তু এটা এখনকার টাইমের ওপর অ্যাপ্লাই করতে পারবেন না। এখন তো সবকিছু অস্থির। আমরা যুগ যন্ত্রণায় ভুগছি সবাই। টু ক্রিয়েট সামথিং কোনোটাই করতে পারছি না। আমাকে একটা কোশ্চেনের উত্তর দাও তো, তোমার চেয়ে কম জানে এমন দুটো লোকের নাম বলো?

রুবেল : আমরা সবাই বেশি জানি।

মাহফুজুর : এটাই মনের কথা। এখানে সবাই যখন বেশি জানে, তখন ওখানে কীভাবে তার চেয়ে একটা ভালো জিনিস তৈরি হবে?

রুবেল : জানি না--এই স্বীকারোক্তি করে জানার আগ্রহ নিয়ে এগোলেই তো নতুন কিছু তৈরি হয়।

মাহফুজুর : সবাই জানে; তো আমি কী করবো। আগে ডিরেক্টরের জব ডিরেক্টর জানতো, ক্যামেরাম্যানের জব ক্যামেরাম্যান জানতো, লাইটম্যানের জব লাইটম্যান জানতো। প্রোডাকশন বয়ের জব প্রোডাকশন বয় জানতো। ও জানতো কীভাবে চা দিতে হয়, কীভাবে খোঁজ নিতে হয়, কীভাবে ডাকতে হয়। ডিভিশন অব ওয়ার্ক ছিলো, অ্যাকোরডিং টু দ্যাট মানুষ কাজ করতো। এখন একজন সব করছে, কীভাবে হবে বলো?

রুবেল : সবজান্তা শমসের হলে তো সমস্যা।

মাহফুজুর : আমি তো তোমাকে একটা কোশ্চেনেই বললাম, তুমি আমাকে দুটো লোকের নাম বলো যাদের চেয়ে তুমি একটু কম জানো। তো ওখানে তুমি কী করবে? তুমি তো অলওয়েজ কনফিউজড থাকবে। বিকজ হি নোউজ বেটার, উনি ভালো জানেন, ওরা জানে, সবাই জানে।

রুবেল : জ্যঁ ককতো বলেছিলেন, একদিন ক্যামেরা হবে কলমের মতো সস্তা আর রিল হবে কাগজের মতো; সেই যুগটা এখন এসেছে। কিন্তু তারপরও তো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই এই বেশি জানার কারণে কিংবা আরো নানাবিধ কারণে। সেই কারণগুলোর মধ্যে আপনার দেখায় আর কী কী আছে?

মাহফুজুর : আরেকটু সময় যাক, এতো তাড়াতাড়ি তো আর একটা জিনিস হবে না। ভালো হচ্ছে না, হচ্ছে তো, ডিজিটালি অনেক ভালো ছবি হচ্ছে। তুমি অমিতাভের (নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী) আয়নাবাজি ছবিটা দেখো, এক্সট্রা অর্ডিনারি ছবি। তারপর আরো বেশ কয়েকটা ভালো ছবি হয়েছে। থার্টি ফাইভে প্রচুর ভালো ছবি হয়েছে। তারা চেষ্টা করেছে। এখন অমিতাভদের আরো বেশি ছবি বানাতে হবে। দে আর রিয়েলি ক্রিয়েটর। অমিতাভ ভাই ক্রিয়েটর। ফারুকীর ছবিগুলো হচ্ছে না (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী)? হচ্ছে না বললে হবে না, সবাই চেষ্টা করছে। আস্তে আস্তে একটা সুন্দর পরিস্থিতি হবে।

রুবেল : ক্যামেরার ভিতর থেকে দেখা আর খালি চোখে দেখা--এই দুই দেখার সঙ্গে আপনার অনুভূতির সম্পর্ক কী?

মাহফুজুর : আমার অনুভূতির সম্পর্ক বললে আল্লাহ রাগ হয়ে যাবেন। ক্যামেরাতে চোখ রাখার পর যা দেখি, ওই সময় আমার বাবার নাম মনে থাকে না, আমার মায়ের নাম মনে থাকে না। আমার বউকে আমি চিনি না, আমার সন্তানকে আমি চিনি না। দ্যাট ইজ দ্য ওনলি প্লেস আই এনজয় অ্যান্ড আই অ্যাম ফ্রি ম্যান টু ক্রিয়েট সামথিং এলস; ভালো কিছু ক্রিয়েট করা জন্য। এই রকমভাবে আমি যদি একটা রাকাত নামাজ পড়তে পারতাম তাহলে আল্লাহ আমার অনেক কাছে এসে বলতেন, তুমি অনেক ভালো লোক। সত্যি ওই সময় আমার কিছু মনে থাকে না। শুধু মনে থাকে আমি একটা অন্য জগতে আছি। আমি কী দেখছি এবং সামথিং এক্সট্রা অর্ডিনারি কাম আউট ফ্রম মাই ক্যামেরা। ওই সিনসিয়ারিটি আমার প্রত্যেকটা শটে, এটা কিন্তু একটা শটের জন্য নয়। এভরি শট্ ইজ লাস্ট শট্। সো ইউ হ্যাভ টু ডু দ্য বেস্ট, ইউ হ্যাভ। এখানে কোনো কম্প্রোমাইজ নাই।

রুবেল : এই চর্চাটা তো আপনার ভিতর ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা নিশ্চয়?

মাহফুজুর : হ্যাঁ যতো জানতে পারছি ততো শিখছি। এভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছি। এখনো শিখছি, নিজেকে থামিয়ে রাখতে চাই না একটি মুহূর্তের জন্য। আমি আরো শিখতে চাই।

রুবেল : এই অধ্যবসায়টা কীভাবে গড়ে উঠলো?

মাহফুজুর : এটা হয়ে যায়। আপনি একটা গল্প বলছেন, সমান্তরালে আমি কিন্তু সেই গল্পটা দেখতে পাচ্ছি। হুমায়ূন আহমেদ ভাই যখন বলতেন আমি তো সব দেখতাম। এরপর যখন ডিসকাস করতাম, তখন বলতাম আমি এই এই জিনিসগুলো দেখলাম, কি ঠিক আছে? ভাবনার কাছাকাছি হলে তিনি বলতেন, ‘হ্যাঁ ঠিক আছে। কী কী লাগবে আপনি বলেন।’ তো গল্পটাকে ফিল করতে হবে এবং দেখতে হবে।

রুবেল : মানে একদম স্বচ্ছ আয়নার মতো।

মাহফুজুর : ইয়েস। আমরা লোকেশনে যাই কেনো, একটা ছবি করার আগে লোকেশন খুঁজি কেনো? এই যে শাহ আলম কিরণের ছবি করলাম। আমরা কতো গ্রাম খুঁজলাম, যে গ্রামে ইলেকট্রিসিটি নাই। এখন তো পুরো বাংলাদেশের সবদিকে টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। ভেরি রেয়ার গ্রাম আছে যেখানে টাওয়ার নাই, ইলেকট্রিসিটি নাই। তখন তো ছিলো না, ৭১-এ খুব কম ছিলো। তখন আপনাকে ছবি করতে হতো, ওই এনভায়রনমেন্টে যেতে হতো। এগুলো টোটালটাই, ইট ইজ আ ডিরেক্টর মিডিয়াম। ডিরেক্টরের ওই ফিলিংস থাকতে হবে, আমি কী করতে চাচ্ছি।

রুবেল : কিন্তু ডিরেক্টরের যে জায়গাটা আপনি নিজেই বলছেন, ডিরেক্টর পুরো সিনেমাটা তার মতো করে ভাবেন। কিন্তু যখন তিনি ক্যামেরাম্যান হিসেবে আপনাকে ব্যাখ্যা করছেন, আপনার হাত ধরেই পুরো ইমেজটা আসছে। আপনি হচ্ছেন তার ভাবনার ধারক।

মাহফুজুর : আপনি যতোই এ কথাগুলো বলেন, আমি এ কথা বিশ্বাস করি না। আমি প্রত্যেকটা শট্ ডিরেক্টরকে দেখিয়ে আনি। আর এখন তো ইজি হচ্ছে, সে তো দেখছেই মনিটরে। ফ্রেম করলাম, না মাহফুজ ভাই আরেকটু কমপ্যাক্ট করেন। কমপ্যাপ্ট করলাম। উনি কী চাচ্ছেন আমি ওটাই কিন্তু বানাচ্ছি শেষ পর্যন্ত। কিন্তু যেটা উনি চাচ্ছেন, ওটা আমাকে বেস্ট করতে হচ্ছে। ওই শটটা উনি ওকে বলার পর তো আমি জীবনে আরেকবার নিতে পারবো না। সো এভরি শট্ ইজ লাস্ট শট্ অ্যান্ড ইউ হ্যাভ টু বি ভেরি লয়াল ফর দ্যাট।

রুবেল : ক্যামেরার সামনে যখন পুরো আয়োজন থাকে, তখন আপনার কাছে সাবজেক্ট এবং অবজেক্টের ভাবনাগুলো কীভাবে খেলা করে?

মাহফুজুর : ও সময় না আমি কেবল ওই জিনিসটাই দেখি যেটা ডিরেক্টর দেখান আমাকে। আমি তখন ওই জিনিসটার প্রতি কনসেনট্রেড করি। এবং ওই শটটা যখন বোঝান তখন আমি চিন্তা করি কোথা থেকে এর সোর্সটা আসবে। যদি ক্যান্ডেল থাকে তখন বোঝার চেষ্টা করি ক্যান্ডেলে কী সোর্স হবে বা একটা কুপি থাকলে কুপির সোর্সটা কী রকম হবে। যদি এ রকম হয় তাহলে আরেকটা লাইট তো ব্যাকলাইট হিসেবে আমাকে দিতে হবে, সেটা কোথা থেকে আসছে, বাইরের কোথা থেকে আসছে? আসলে ওটা তো মেইনটেইন করতে হবে এবং শটের কন্টিনিউটি থাকতে হবে। সোর্স লাইট একবার রাইট থেকে করলাম একবার লেফট থেকে করলাম, তা তো হবে না। সোর্স মেইনটেইন করতে হবে। এটা এক টাইপের ছবি। আর গ্লামার ছবিতে গ্লামার করতে হবে, কতো সুন্দর করে করা যায়।

রুবেল : একটা সময় গেছে যখন ক্যামেরায় ডিটেইলের ব্যবহার করা হতো বাংলা বাণিজ্যিক ছবিতেও। কিন্তু এখন বাণিজ্যিক ছবিগুলোয় জুম ইন জুম আউটের আধিক্য বেশি।

মাহফুজুর : ফিল্ম ইজ ডিটেইলিং। ডিটেইলিং ছাড়া হোয়াট ইজ দ্য ডিফারেন্স বিটুইন টুডেজ মুভি অ্যান্ড ইয়েসটারডেস মুভি। তখন ডিটেইলিং ছিলো এখন ডিটেইলিং নাই। একটা লোক বিদেশে আছে, ওর কী ক্যারেক্টার, বিদেশে ও কী করতে পারে; সে যদি শ্রমিক হয় তাহলে তার বিহ্যাব এক ধরনের থাকবে, ইফ হি ইজ আ ইঞ্জিনিয়ার হি উইল সামথিং, ইফ হি ইজ আ ডক্টর, তার ওয়ে অব ডিফারেন্স হবে। তো এগুলো কিন্তু স্ক্রিপ্টেই থাকতো, ডিটেইলিং থাকতো। ডিটেইলিংটাই এখন ল্যাক হয়ে গেছে। ও চলে আসলো, এসে মারতেছে। কেনো চলে আসলো, কোথাকার সে, আমার দেশের, না শ্রীলংকার, না তামিলের, কোথাকার, তা আমি জানি না। তো আমার দেশটা যেখানে না থাকবে, সেখানে তো হলো না।

রুবেল : এই যে তামিলের কথা বলছিলেন। আমাদের ছবি প্রচণ্ড মাত্রায় নকল, ক্যামেরার শটের ব্যবহারেও এর প্রভাব লক্ষণীয়।

মাহফুজুর : যার কিছু নাই সেই তো নকল করে, তাই না! যার নিজস্ব কিছু নাই সেই তো নকল করবে। এতে তো সুবিধা আছে, এভাবে এভাবে করে দিলাম, চলে গেলাম, এতে নিজস্ব কিছু থাকে না।

রুবেল : একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনি বলছিলেন আপনার জন্ম এফ ডি সি’তে। আপনার আবেগের অনেকটা জুড়ে এই এফ ডি সি। তো সেই এফ ডি সি আর আজকের এফ ডি সি নিয়ে এখন কী মনে হয়?

মাহফুজুর : খুব কষ্ট লাগে জানো! আর এটা বানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এফ ডি সি মানেই বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ বানাবার আগে কিন্তু এফ ডি সি বানিয়েছিলেন। তখন তিনি চিন্তা করেছিলেন প্রত্যেকটি কালচারাল সাইট বাংলাদেশে থাকা উচিত। চিন্তা করো তার মতো গ্রেট লোক আর আসবে না পৃথিবীতে। মানে কতোটা বাঙালিয়ানা ছিলো, কতোটা ফিলিংস ছিলো বাংলাদেশ নিয়ে, কী ধরনের বাংলাদেশ বানাবেন তা আগে থেকেই উনি ভেবে রেখেছিলেন। প্রথমত, এখানে একটি কালচারাল উইং করলেন এফ ডি সি। ওই এফ ডি সি কী হওয়া উচিত ছিলো এখন! এখন কী হয়ে গেছে, দেখতেই পাচ্ছো! তুমি ভাবতে পারবে, তোমার সঙ্গে এতোক্ষণ ধরে কথা বলার সুযোগ এখানে আমার ছিলো না। তোমার সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্ট নিতে হতো আমাকে। সেখানে এখন আটটা নয়টা ছবির শুটিং। আমার নিজেরই দুই ছবির শুটিং একটা এই ট্র্যাকে, আরেকটা ওই ট্র্যাকে হতো। একই সময়ে এটা করে ওটা করতাম। এখন তো কিছুই নেই। মনে হয় ডেড সিটি একটা, স্থবির সিটি, আমার তো রীতিমতো ভয় লাগে।

তার পরও আমি ফ্রাস্টেডেড না। ডেজ উইল কাম। একদিন এসবের পরিবর্তন আসবে। চেষ্টা চলছে কিন্তু। আমি তো দেখলাম, তৌকীর ভাই (নির্মাতা তৌকীর আহমেদ) আছেন, অমিতাভ ভাই আছেন, ফারুকী ভাই আছেন, বিপ্লব (নির্মাতা গোলাম রাব্বানী বিপ্লব) আছেন। আবু সাইয়ীদ ভাইও চেষ্টা করেছেন। আমার মনে হয়, ইট উইল বি ওভারকাম। কিন্তু একটু টাইম লাগবে। এফ ডি সি’তে একসময় ক্যামেরা ছিলো না, এখন তো আছে; লাইটও আছে; কিন্তু শুটিং পার্টি নেই; এই হচ্ছে ডিফারেন্স। এখন সবকিছু আছে শুধু ছবিটাই নেই।

রুবেল : আগে সব ছিলো?

মাহফুজুর : আগে সবই ছিলো, হয়তো টেকনিকালি আমরা অতোটা রিচ ছিলাম না। বাট একদম বিগিনিং কিন্তু ভেরি রিচ। আমাদের জেনারেটর ছিলো, জেনারেটর ভ্যান ছিলো। সবকিছু ছিলো, শুটিংয়ের যা প্রয়োজন হতো, যখন প্রথম আরম্ভ হলো। আস্তে আস্তে সব কিছু নষ্ট হতে থাকলো। তারপরও থার্টি ফাইভে আমরা ওয়ার্ল্ড আপডেট ছিলাম। এমন ক্যামেরাও ছিলো, যা ইন্ডিয়াতে যখন চারটা আমাদের এখানে তখন ছয়টা। তো আমরা সবসময় এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু কাজে এগিয়ে নেই।

রুবেল : প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আপনার কেমন ছিলো?

মাহফুজুর : অনেক অনেক; আমার বাসার সামনেই তো সিনেমাহল ছিলো। এভরিডে না হলেও সপ্তাহে দুই-তিন দিন যেতাম। ‘লায়ন’ সিনেমা, ‘মুন’ সিনেমা, ‘সাবিস্তান’ সিনেমাহলে। এখন তো এই সিনেমাহলগুলো নেই। আমরা ওখানেই ব্রট আপ হলাম। স্যাটারডে, সানডে মর্নিং শো ইংলিশ মুভিগুলো দেখতাম।

রুবেল : বিদেশি নির্মাতাদের মধ্যে আপনাকে প্রভাবিত করে এমন কারা রয়েছেন?

মাহফুজুর : বহু বহু ডিরেক্টর আছেন যাদের দ্বারা আমি প্রভাবিত হয়েছি। নাম বলে তো শেষ করা যাবে না। ইদানীংকালে আমার কাছে ইরানি ছবিগুলো এক্সট্রা অর্ডিনারি মনে হয়। আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মাজিদ মাজিদি, জাফর পানাহি--দে আর ভেরি রিয়াল ক্রিয়েটর। এখন আমার কাছে তারা ওয়েস্টের চেয়ে বেটার মেকার।

রুবেল : ডিটেইলের ব্যবহারেও ইরানি সিনেমা অনেকটা এগিয়ে কিন্তু।

মাহফুজুর : হ্যাঁ, ওদের ছবিতে প্রচুর ডিটেইলের ব্যবহার আছে। বিপরীতে আমি বললাম তো আমাদের দেশের সিনেমায় নাই শুধু ডিটেইলিংটা। হিরো চলে আসলো, হিরো কোথাকার, ওর স্টাইলটা কী, হিরোইন রাস্তায় পাওয়া গেলো--ডিটেইলিংটা একদম নাই! হোয়াট ইজ দ্য ডিফারেন্স বিটুইন দ্য ইয়েসটারডেজ মুভি অ্যান্ড টুডেজ মুভি। তখনকার ছবিতে ডিটেইলিংটা থাকতো। এখনো ওই ডিটেইলিংটা যদি প্রোপারলি ব্যবহার করা যায়, তাহলে কাজে দেবে। তবে আমি কিন্তু ফ্রাস্টেটেড নই বিকজ আমি খুব আশাবাদী।

রুবেল : আমারও তাই মনে হয়, আপনি ভীষণ আশাবাদী। আমি যখন পত্রিকা থেকে (‘বণিক বার্তা’) আপনার কাছে ফোন করে জানতে চাইলাম, আপনাকে দেওয়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের স্মারকে মরিচা ধরে গেছে। আপনি তখন অন্যের দোষ না ধরে নিজের ওপর দোষ নিয়ে নিলেন। বললেন, আমার অযত্নের কারণেই ওতে মরিচা ধরেছে। অথচ এটা প্রমাণিত যে, স্মারকে নির্ধারিত সোনার চেয়ে ভেজালের পরিমাণ বেশি ছিলো। এ রকমভাবে আপনাকে কেউ কোনো প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে আপনি সবসময় ইতিবাচক কথা বলেন। আপনি বলেন, সরকার চেষ্টা করছে ঠিক করার। ইতিবাচকভাবে দেখা ভালো কিন্তু তারপরও তো কিছু ব্যর্থতার জায়গা আছে, যেগুলো নিয়ে আপনার কথা বলা প্রয়োজন।

মাহফুজুর : ব্যর্থতা তো সরকারের একার নয়, ব্যর্থতা আমার আর আপনারও। আমার কাছে মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী তো পাষাণ নন। তিনি আমজাদ হোসেনের চিকিৎসার জন্য ৪০-৪২ লাখ টাকা দিলেন। একে দিলেন, ওকে দিলেন, উনি তো সবাইকেই দেন। প্রোপার ওয়েতে উনার কাছে গিয়ে যদি সবাই বলে, আপা আমাদের সিনেমাহলগুলো ডিজিটাল করে দেন, তিনি করবেন না?

রুবেল : হ্যাঁ, আমাদের উদ্দেশ্যেরই তো ঠিক নেই।

মাহফুজুর : আমরা যাইও না; গেলেও নিজের স্বার্থটুকু নিয়ে যাই। আর যাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তারা আই ডোন্ট নো হোয়াট হ্যাপেন পলিটিক্স, এগুলো তো বুঝি না ভাই। যে কারণে এগুলো নিয়ে ভাবতেই অবাক লাগে। তোমার সঙ্গে তো আমার খুব একটা আলাপ ছিলো না, কিন্তু উই আর টকিং। একটা মানুষ অ্যাপ্রোচ করলে হবে না, আই ডোন্ট বিলিভ ইট। চাইলে হবে না এমন কোনো জিনিস নাই, অবশ্যই হবে। উই হ্যাভ টু ট্রাই ইট। আমি বসে বসে শুধু গল্প করলাম আর মিটিং করলাম লাভ হবে না কিছু।

রুবেল : স্মারকে খাঁদ নিয়ে কিছু বলবেন?

মাহফুজুর : না না, ওটা যা আছে ঠিকই আছে। আসলে ওটাতে আমার দোষ ছিলো। বিকজ আই অ্যাম লিভিং অ্যালোন। আমি একা মানুষ কতো দিকে তাকাবো বলেন। ওটা নিয়ে আর বলার কিছু নেই, লেখালেখিরও প্রয়োজন নেই। ওটা গন গন।

রুবেল : শুরু থেকে এ পর্যন্ত কতোগুলো ছবি আপনি করছেন?

মাহফুজুর : দেড়শোর নিচে না, বরঞ্চ বেশি। অনেকে বলে আরো বেশি। কিন্তু আমি তো হিসাব রাখিনি, তাই জানি না। আমি অনেক দিন ধরে ভেবেছি প্রোডিউসার অ্যাসোসিয়েশনে গিয়ে লিস্টটা বের করবো। কিন্তু যাওয়া হয় না। আমি এটা করবো কয়েকদিনের ভিতর।

রুবেল : জীবনযাপন করছেন কীভাবে?

মাহফুজুর : এখন আমার সবচেয়ে তৃপ্তির জায়গা হচ্ছে আমার অনেক অ্যাসোসিয়েটস আর নাউ ক্যামেরাম্যান। তারপর আরো দু-তিনজন বড়ো ডিগ্রি নিয়ে আসলো। চ্যানেলগুলোতে আমার ছেলেপেলেরা আছে। আর কী চাওয়ার আছে বলো তো! এখন সম্মানের সঙ্গে চলে গেলাম, ওটাই বেস্ট। কিন্তু একটা ভালো কাজ না করে আমি যাবো না। আই অ্যাম ওয়েটিং ফর দ্যাট। আমি জানি না ওটা কোনটা। বাট আই অ্যাম ওয়েটিং ফর। আচ্ছা একটা কথা আমাকে বলতে পারেন মান্নান ভাই (নির্মাতা মান্নান হীরা) কোন হসপিটালে আছেন?

রুবেল : সম্ভবত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মাহফুজুর : আমি উনাকে দেখতে যেতে চাই। উনি আমার অন অফ ডিরেক্টর। উনার একটা কাজ করেছি আমি একাত্তরের ক্ষুদিরাম। আমি কল্পনাই করতে পারি না একটা মানুষ ক্ষুদিরামকে একাত্তরে নিয়ে আসবে। ব্যাডলাক ছবিটা লোকজন দেখেনি।

রুবেল : দেখার সুযোগ কোথায়?

মাহফুজুর : সিনেমাহলটা প্রোপার না হলে আমার কাছে মনে হয় না ছবি চলবে। এতোকিছু করছে, সিনেমাহলটা ভালো হলে ভালো হতো। উঠি আমি, সবাই অপেক্ষা করছে শুট শুরু করতে হবে। সরি রুবেল, আমরা আরেকদিন সময় করে বসবো। তোমার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগলো। অনেক দিন পর নিজেকে মনে হচ্ছে ঝালিয়ে নিলাম। এখন একটু হালকা লাগছে।

রুবেল : ঠিক আছে।

মাহফুজুর : থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। সো নাইস টু মিট ইউ। প্রে ফর মি।

রুবেল : অবশ্যই। আপনি ভালো থাকবেন আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে।

রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। সহ-সম্পাদক ও প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন জাতীয় দৈনিক বণিক বার্তায়। বর্তমানে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক-এর মাইগ্রেশন প্রোগ্রামে ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত।

rubelmcj@gmail.com

https://www.facebook.com/rubel.pervez.14

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন