হাবিবুর রহমান খান
প্রকাশিত ০৪ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক-স্মৃতি
‘ঋত্বিক না হলে যেমন তিতাস হতো না তেমনই আমি না হলেও তিতাস হতো না’
হাবিবুর রহমান খান

আমাকে এখানে গল্প বলতে বলা হয়েছে। আমি গল্পই বলবো, গল্পের বাইরে আমার কিছু বলারও নেই। আজকের সভার সভাপতি, মাননীয় প্রধান অতিথি, চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল, আকরাম খান এবং উপস্থিত সুধীবৃন্দ। আমি সিনেমাতে আসার গল্প বলবো মানে আমি কীভাবে সিনেমায় আসলাম। আজকে সিনেমাতে আমার প্রায় ৪৭ বছর কেটে যাচ্ছে; আমি সিনেমায় এখনো আছি। সিনেমায় আসার কারণ আজকে আপনারা যার জন্মদিন করছেন সেই ঋত্বিক কুমার ঘটক। ঋত্বিক কুমার ঘটকের সিনেমা দেখে আমি ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেই অনেক ছোটোকালে। আমার তখন মনে হতো, এই ঋত্বিক কুমার ঘটককে আমাদের দেশে নিয়ে এসে আমি সিনেমা করবো। এটা নিয়ে আমি আমার বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আলাপ করতাম; ওরা বলতো, এটা একটা অবাস্তব কথা; কারণ ঋত্বিক কুমার ঘটক পাকিস্তানে এসে সিনেমা করতে পারবে না। আমি বলতাম, আমি এটা করবো। ওরা তখন বলতো, তুই এটা কেমন করে করবি! আমি তাদেরকে বলতাম, আমি করবোই।
এখানে আর একটি কথা বলে রাখি, ১৯৬৩-৬৪ সালে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে যে সংগঠনটি ছিলো--যার নাম ছিলো ‘নিউক্লিয়াস’--আমি এর কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলাম। সুতরাং আমি বিশ্বাস করতাম, এদেশ থাকতে পারে না, পাকিস্তান নামে একটি দেশ অবাস্তব দেশ, এটা থাকবে না। আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে থাকবো, আমাদের একটা দেশ হবে। সেই বিশ্বাসের ওপরে থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যুদ্ধ শেষ হয়, তখন আমার সেই ঋত্বিক কুমার ঘটককে নিয়ে সিনেমা করার যে স্বপ্ন, তা নিয়ে আমি কাজ শুরু করি।
১৯৭২ সালে ১৬ জুলাই আমি আমার সিনেমার শুটিং শুরু করি। আর সিনেমাটা মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই। আমি যখন সিনেমাটা করি, তখন আমার বয়স খুবই কম ২৫২৬ বছর হবে। ঋত্বিক ঘটক এই তিতাস (তিতাস একটি নদীর নাম) করার আগে তার শেষ সিনেমা ছিলো কোমল গান্ধার। এই সিনেমাটা উনি ১৯৬২ সালে করেছিলেন, এরপর ১০ বছর গ্যাপে উনি আর কোনো সিনেমা করেন নাই। এবং আমি যখন উনাকে নিয়ে সিনেমা করতে যাই, উনি তখন একটা রোগে আক্রান্ত, সেটাকে বলে অ্যালকোহোলিক।
উনার সঙ্গে কথা বলে সিনেমা করার ইচ্ছা পোষণ করায়, উনি সানন্দে রাজি হলেন এবং বললেন, আমি তিতাস একটি নদীর নাম করবো। আমি বললাম, করেন। এরপরে গল্পের রাইট নেওয়া হলো, সিনেমা শুরু হলো। এই সিনেমা করার জন্য আমাকে ব্যক্তিগতভাবে যে পরিশ্রমটা করতে হয়েছে পৃথিবীতে কোনো সিনেমার জন্য কোনো প্রযোজক এই পরিশ্রম করে নাই! আমি একটি বছর ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে এক রুম শেয়ার করে শুয়েছি। উনাকে আমি একদিনের জন্যও একা ছাড়ি নাই। কারণ উনি মাঝেমধ্যেই একটুখানি এলোমেলো হয়ে যেতেন। সর্বক্ষণ আমি উনার সঙ্গে ছিলাম। এইভাবে আমি এই সিনেমা শেষ করলাম। সিনেমাটা শেষ হওয়ার পরে ঋত্বিক দা আমাকে একবার বললেন, হাবিব, টোয়েন্টি ইয়ারস এহেড সিনেমাটা করে ফেললাম। উনি ১৯৭৩ সালে আমাকে বললেন, টোয়েন্টি ইয়ারস এহেড! এটাই হলো তিতাস একটি নদীর নাম। এবং এই তিতাস আজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভীষণভাবে আলোচিত সিনেমা। এটা বাঙালির সিনেমা, বাংলাদেশের সিনেমা।
অনেকে মনে করে, তিতাস কো-প্রোডাকশন; কিন্তু তিতাস কো-প্রোডাকশন নয়; এটা বাংলাদেশের সিনেমা। ভারত থেকে শুধু ঋত্বিক ঘটক এসেছিলেন সিনেমাটি পরিচালনা করার জন্য; আর সব শিল্পী, কলাকুশলী সব বাংলাদেশের এবং এই ছবি বাংলাদেশেই তৈরি হয়েছে।
আজকে এই সিনেমা নিয়ে দিনের পর দিন ভীষণ আলোচনা হচ্ছে--অ্যাজ আ সিনেমা। এই আলোচনাটা ফোরটি সেভেন ইয়ারস পরে। ঋত্বিক দা বলেছিলেন, তিনি সময়ের চেয়ে ২০ বছর আগে সিনেমাটা করেছেন। এখন আমার মনে হয়, তিনি ঠিকই বলেছিলেন। এই সিনেমাটার যে বিষয়বস্তু--সিনেমাটা আমি অনেকবার দেখেছি, এখনো মাঝে মাঝে দেখি--এটা আমার কাছে মনে হয় বাঙালি জীবনের একটা কমপ্লিট লাইফ। এই সিনেমাটার এমন কোনো জায়গা নাই, যেখানে জীবনকে টাচ করা হয় নাই--আমাদের সমাজব্যবস্থার প্রত্যেকটা জায়গাকে এটা টাচ করেছে। যার জন্য এই সিনেমার ওপরে কয়েকজন পিএইচ ডি করেছে--মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নারী এসেছিলেন পিএইচ ডি করতে, উনি এর টাইটেল দিয়েছিলেন, ‘তিতাস, মহাকাব্য’।
এই তিতাস একটা অদ্ভুত ব্যাপার; প্রথম যেদিন শুটিং করতে গেলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে, ঋত্বিক দা হঠাৎ গাড়ি থেকে নেমে নদীতে চলে গেলেন, হাঁটু জলে গিয়ে চশমাটা খুলে জল দিয়ে মুখটাকে ভেজাচ্ছিলেন। ততোদিনে তার সঙ্গে আমার খানিকটা হৃদ্যতা হয়েছে; আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম--‘এইটা দিয়ে আপনি নতুন কী ভঙ্গি করছেন, একটু বুঝি তো।’ তখন উনি বললেন, ‘আরে তুই এটা বুঝবি না; আজকে আমি তিতাসে যে দাঁড়াইয়া আছি, এই জলের অনুভূতিটা আমি দেখছি, সত্যিই তিতাসে আছি কি না!’ আরো অনেক গল্প আছে, যে গল্প বললে হয়তো রাত শেষ হয়ে যাবে। শুধু একটি কথা বলতে পারি, এই সিনেমা তৈরি করার ব্যাপারে একজন প্রযোজক হিসেবে আমি ভীষণ গর্ব করে বলি, ঋত্বিক না হলে যেমন তিতাস হতো না; তেমনই আমি না হলেও তিতাস হতো না। কারণ এই সিনেমার সঙ্গে আমার যে সংশ্লিষ্টতা ছিলো--একটা দিন আমি উনাকে ছাড়ি নাই। এবং এইভাবে না করলে এই সিনেমাও শেষ করা যেতো না। সেই কারণে আমি বলি, এই ছবির যতোখানি সুনাম, যতোখানি অ্যাসিভমেন্ট, সেটা ঋত্বিক ঘটক ও আমার। এটা আমি খুব গর্ব করে বলি।
অনেকে বলে, আমি হয়তো বেশি বলি, কিন্তু মোটেও আমি বেশি বলি না। এই সিনেমাটা আমি যখন করেছিলাম, তখন অনেক রকম সমস্যা হয়েছে, এতো সমস্যা যে সেটা বিশ্বাস করা যায় না! আমি তখন সদ্য মুক্তিয্দ্ধু করে এসেছি, আমাদের গ্রুপের সঙ্গে তখনো আর্মস ছিলো। আমরা তখন আর্মস নিয়ে ঘুরতাম, যেখানে যেতাম, যা প্রয়োজন হতো সেটা সরকারি অফিস থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসতাম। ওরা বলতো, কী হলো, কী হলো--এইটা আমাদের সিনেমার জন্য লাগবে, এইটা দেন, আইনি কী বেআইনি এতো বুঝি না।
ঋত্বিক কুমার ঘটক
একবার ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে শুটিংয়ে বৃষ্টি তৈরির জন্য ফায়ার সার্ভিসের মেশিনের দরকার হলো। তো আমরা ফায়ার সার্ভিসে গিয়ে বললাম, মেশিন দেন। তখন ওরা বললো, আপনাকে মেশিন দেবো, লোক দেবো, কোনো সমস্যা নাই; কিন্তু আমাদের এখানে মেশিন তো একটাই, যদি ওই সময়ে এখানে কোথাও আগুন লাগে তখন কী হবে? আমি তখন বললাম, প্রয়োজনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আগুন লেগে পুড়ে যাবে, কিন্তু আমার সিনেমাটা হতে হবে। তাই আপনাকে এখনই উঠতে হবে। আমার কথা শুনে ফায়ার সার্ভিসের সেই অফিসার তো মুখের দিয়ে তাকিয়ে আছে--আমার সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের একটা চিঠি ছিলো, সেখানে আমাকে সাহায্য করার ব্যাপারে সুপারিশ করা ছিলো। আমি তাকে সেই চিঠির একটা কপি দিয়ে বললাম, এখন বাকি কাজ আপনার, আমি লোকেশনে যাচ্ছি, আপনি লোকজন দেন। উনি তারপরও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, একপর্যায়ে তার লোকজনকে যাওয়ার জন্য অর্ডার দিলেন, আমরা সেই লোকজন নিয়ে লোকেশনে আসলাম।
এই সিনেমাটা করার জন্য অনেক অন্যায় করেছি, বেআইনি কাজ করেছি; তখন হয়তো এগুলো করতে পারছি, ওই বয়স, মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিট; তখন কেবল একটা কথাই মনে হতো আমার, দেশ স্বাধীন হয়েছে, একটা মানুষকে দিয়ে একটা সিনেমা করতে পারবো না, এটা তো হতে পারে না! তিতাস ছিলো আমার কাছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ; যে কারণে আমি তিতাস করতে পেরেছি। তিতাস একটি মহাকাব্য--তাই তিতাস-এর গল্প, তিতাস-এর শুটিংয়ের গল্প--আমরা শুটিং করতেছিলাম আরিচাতে, আমাদের একটা স্পিডবোট ছিলো, হঠাৎ সন্ধ্যার পর দেখি স্পিডবোটটা নাই, তারপর দেখি আমার ডিরেক্টরও নাই। এই পরিস্থিতিতে আমি তো খুবই ঘাবড়ে গেলাম। এদিক-ওদিক খুঁজি ডিরেক্টরকেও পাচ্ছি না, স্পিডবোট পাচ্ছি না, সে কী টেনশন! ভোর রাত্রে দেখি স্পিডবোট নিয়ে ঋত্বিক দা ফিরে আসলেন; আমার মাথা ঠিক নাই, আমি তো ড্রাইভারকে মারতে গেছি। ড্রাইভার তখন বলে, স্যার, আমি কী করবো, উনি তো আমারে নিয়ে গেছে। আমি উনাকে (ঋত্বিক দা) গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আমাকে না বলে কীভাবে এটা করতে পারলেন! তখন উনি বললেন, ‘তোরে বলতে হবে কী, ওই পাড়ে তো আমার বাড়ি।’ উনার বাড়ি নাকি পাবনায়, উনি সেখানে বাড়ি খুঁজতে গিয়েছিলেন। উনি ঠিক জানেন না কোথায় বাড়ি, আরিচার ওই পাড়ে পাবনা, সেখানে উনি বাড়ি খুঁজতে গিয়েছিলেন। এ রকম অনেক ঘটনা আছে এই সিনেমার সঙ্গে। আমার জীবনের পথচলার সঙ্গে এই সিনেমা গেঁথে আছে। এতোদিন হয়ে গেছে, তারপরও এই সিনেমার অনেক সংলাপ আমার এখনো মুখস্থ। আমি প্রত্যেক বছর নতুন করে তিতাস দেখি, আর ভাবি এই সিনেমায় আমাদের সভ্যতার এমন কিছু নাই যা টাচ করা হয় নাই! এই হলো আমার তিতাস-এর গল্প। আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
লেখক : হাবিবুর রহমান খান, তিতাস একটি নদীর নাম-এর প্রযোজক।
দায়স্বীকার : রাজশাহীর ‘ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি’ নিয়মিতভাবে ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা প্রদান ও চলচ্চিত্র উৎসব করে আসছে। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ৪-৬ নভেম্বর, ৭ম ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক প্রদান ও চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহী শহরের মিয়াপাড়ার ঋত্বিক ঘটকের বাবার ভিটায় ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ছয়টায় সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে ঋত্বিক কুমার ঘটককে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন হাবিবুর রহমান খান। এই লেখাটি তার সেই স্মৃতিচারণের অনুলিখন।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন