শামীম আখতার
প্রকাশিত ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রে অমীমাংসিত নারী
শামীম আখতার

ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৯
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন
১১ মার্চ ২০২০
তানভীর শাওন : শুভ বিকেল। আমরা অনুষ্ঠান শুরু করছি একটি কবিতা দিয়ে--
তুমি দেবী, তবে পুষ্পার্ঘ্য পাবে না,
পাবে খানিক শয্যাকামনা।
তুমি বৃষ্টিস্নাত আকাশের রামধনু, তবে সাতরঙা হতে পারবে না,
থাকবে ফিকে হয়ে।
তোমাকে আরো বলা হবে, তুমি হাওয়ার মতোই উদ্দাম,
কিন্তু বয়ে যেতে দেওয়া হবে না তোমায়।
অবশেষে বলা হবে তোমাকে, আরো কিছুক্ষণ থেকে যাও এদিকটায়,
বদ্ধ কুঠুরীটায় বড্ড দম বন্ধ হওয়ার চলাচল,
তুমি বরং তার সাথে করো কিছুক্ষণ বিচরণ,
পাছে সুবাস বেরোলে ডেকো আমায়।
রীতা জান্নাত : শুভ বিকেল। আজ ১১ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দের ২৮ ফাল্গুন। আজকের আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৯’ সঞ্চালনায় আছি, আমি রীতা জান্নাত। উপস্থিত সবাইকে বসন্তের শুভেচ্ছা।
তানভীর শাওন : সঙ্গে আছি আমি তানভীর শাওন। প্রতিবছরের মতো চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ বছরের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৯’ শুরু করতে চলেছে।
রীতা জান্নাত :‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পথচলা শুরু ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রকাশ হয়েছে এর ১৮তম সংখ্যা।
তানভীর শাওন : এর আগে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আমন্ত্রণে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয়েছেন নির্মাতা নূরুল আলম আতিক, আবু সাইয়ীদ, গোলাম রব্বানী বিপ্লব, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী কাজী হায়াৎ, অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী, নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী। সর্বশেষ কথামালায় অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদ কথা উপস্থাপন করেন ‘অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা’ বিষয়ে।
রীতা জান্নাত : চলচ্চিত্রকে বলা হয় লাইফ অ্যাজ ইট ইজ--জীবন যেখানে যেমন। জীবন আর জগতের সমরূপতা নির্মাণে এই মাধ্যমের নেপথ্যে সবকিছুর সমন্বয় ঘটাতে হয় একজন ব্যক্তিকে। তাই এটি ডিরেক্টর’স মিডিয়াম। চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভ কিংবা বিষয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে নির্মাণ পর্যন্ত প্রত্যেকটি কাজে নির্মাতাকে সক্রিয় থাকতে হয়। এমনই করেই কিছু নির্মাতা তার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হয়ে ওঠেন অঁত্যর।
তানভীর শাওন : আজকের অতিথি বাংলাদেশের মুক্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলন ও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব শামীম আখতার। ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে সে, দ্য কনভারসেশন চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তিনি মূলত চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। চলচ্চিত্রের ৩০ বছরের কর্মজীবনে কাহিনিচিত্র ইতিহাসকন্যা, শিলালিপি, রীনা ব্রাউন এবং নগর নির্মাতা, পাহাড় থেকে সমতল, বাল্যবিবাহ, বীর থেকে বীরাঙ্গনার মতো ২০টির বেশি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেন। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র গ্রহণকাল বাংলাদেশ ফেস্টিভাল-১৯৯৪ এ বেস্ট ভিডিও অ্যাওয়ার্ড পায়।
রীতা জান্নাত : আয়োজনের এ পর্যায়ে আজকের অতিথি নির্মাতা শামীম আখতারকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ শামীম আখতারকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য। এবার অতিথিকে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা-স্মারক ও সর্বশেষ দুটি সংখ্যা তুলে দিবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সফিকুন্নবী সামাদী। মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি ড. সফিকুন্নবী সামাদীকে।
শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দিচ্ছেন অধ্যাপক ড.সফিকুন্নবী সামাদী
তানভীর শাওন : ধন্যবাদ ড. সফিকুন্নবী সামাদীকে। স্মারক প্রদান সম্পন্ন হলো। এবারে অতিথিকে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেবে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর কনিষ্ঠতম সদস্য রাফিয়া রিন্ত।
এ আয়োজনের মূল আকর্ষণ চলচ্চিত্রনির্মাতা শামীম আখতারের কথা উপস্থাপন। আয়োজনের মূল অংশে যাবার আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসছেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সহকারী সম্পাদক মো. হারুন-অর-রশিদ।
মো. হারুন-অর-রশিদ : একটা চরম সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছি আমরা। যাপিত জীবনে যারা সামান্য হলেও চোখ কান খোলা রাখার চেষ্টাটুকু চালিয়ে যান, নিশ্চয় এ বিষয়ে তাদের দ্বিমত হবে না। যখন চারদিকে ঠিক চুপ করে থাকার চর্চা করা হচ্ছে, চুপ থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়েও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ নিয়মিত এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে চলেছে। কথা বলার, প্রশ্ন তোলার অনুষ্ঠান--কথামালা। যাহোক ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৯’ এ সবাইকে শুভেচ্ছা।
আজকের কথামালার বিষয় ‘চলচ্চিত্রে অমীমাংসিত নারী’। এক অর্থে তা কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর অবস্থানকেই নির্দেশ করে। হাল আমলে নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সদর্পণে অগ্রসর। পুরুষ অপেক্ষা কোনো অংশে তারা কম ভূমিকা রাখছে না। তারপরও নারীকে দেখা হচ্ছে স্রেফ পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেই। এখনো নারীকে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে নিছক পুরুষের ভোগ্য পণ্য হিসেবে। আর চলচ্চিত্র তো সমাজবাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি, যেখানে নারীকে বিনোদনের উপকরণের বাইরে চিন্তা করা হচ্ছে না। নারীর পোশাক, মেকআপ, কথা বলার ভঙ্গি তথা সার্বিক উপস্থাপন সামাজিকভাবে নারী সত্তার অবমাননাই বটে।
আমরা এই সময়ের জনপ্রিয় ও চলচ্চিত্রে অবশ্য ব্যবহার্য হয়ে ওঠা ‘আইটেম সঙ’ প্রপঞ্চটার কথা বলতে পারি। যা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট হলো কি না, সেই চিন্তা না করে বরং চলচ্চিত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিবেচনা করা হচ্ছে। যেনো নারীকে আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপন করার একটা বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। অবশ্য এই যৌন সহিংসতা পুরুষেরই সৃষ্টি। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোও কিন্তু পুরুষ প্রাধান্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। যেখানে একজন পুরুষ চাইলে একাধিক নারীকে ভোগ করতে পারে। নারীও যেনো নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার জন্যই পর্দায় হাজির হয়। নারী মানেই যেনো পোড় খাওয়া, সবকিছু সহ্য করার অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো এক মানবসত্তা। অন্যদিকে অল্প সংখ্যক নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণ হলেও দিনশেষে নারীকে পুরুষে বন্দিই থাকতে হচ্ছে। নারীও নিজেকে পুরুষ দৃষ্টির বাইরে ভাবতে পারছে না। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি দেখা একটি চলচ্চিত্র, সুতপার ঠিকানা’র কথা বলা যেতে পারে। চলচ্চিত্রটিতে নারীর যে উপস্থাপন তাতে নারীর মতামত-বোধ-ভাবনা-সুখ-মুক্তি যেনো পুরুষেরই হাতে।
বাংলাদেশে নারীনির্মাতার সংখ্যাও খুব বেশি নয়; হাতেগোনা কয়েকজন। আবার নারীর সংখ্যা বাড়লেই যে চলচ্চিত্রে নারীর এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে তাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কিন্তু কথা হলো, নারীরা যখন প্রতিটি ক্ষেত্রে দাপটের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে; তবে চলচ্চিত্রে কেনো নয়। তার মানে কোথাও একটা কিন্তু রয়েছে। তবে এটুকু বলাই যায়, প্রয়োজন চেতনার বিকাশ ও উন্নতির। এই বিষয়ে আমাদের আজকের অতিথি শামীম আখতারও নিশ্চয় বলবেন। আমরা তার মুখ থেকে শোনার, জানার অপেক্ষায়। আবারও সবাইকে শুভেচ্ছা।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দিচ্ছেন ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সহকারী সম্পাদক মো.হারুন-অর-রশিদ
রীতা জান্নাত : ধন্যবাদ হারুন-অর-রশিদকে। এবারে আমরা আয়োজনের মূল অংশে চলে যাবো। একটি বিষয় জানিয়ে রাখি, কথা উপস্থাপনের পর সবার অংশগ্রহণে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কথা উপস্থাপনকালে আপনাদের সবার কাছে একটি সাদা কাগজ চলে যাবে। সেখানে আপনার নাম, বিভাগ ও প্রশ্ন লিখে আমাদের সদস্যদের হাতে দেবেন। সবশেষে সেইসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করবেন আজকের অতিথি।
এ পর্যায়ে ‘চলচ্চিত্রে অমীমাংসিত নারী’ বিষয়ে কথা উপস্থাপন করবেন শামীম আখতার। তাকে অনুরোধ করছি কথা উপস্থাপনের জন্য।
শামীম আখতার : অনেক ধন্যবাদ জান্নাত। আমাকে প্রায় তিন মাস আগে বা তারও একটু বেশি হবে হয়তো ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ থেকে ফোন করা হয়েছিলো। আমাকে জানানো হলো যে, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ থেকে আপনাকে আমরা চাইছি। রাজশাহীতে আপনার পক্ষে আসা সম্ভব কি না? আমি এর আগে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ পড়েছি, দেখেছি এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে জানি। তাৎক্ষণিক চাক্ষুস দেখার ইচ্ছে হলো। এবং আমার মনে হলো, এই ধরনের একটা আহ্বান আমি চাচ্ছিলাম--আমাকে কেউ এভাবে ডাকুক। হায়দার রিজভী [চলচ্চিত্রশিক্ষক ও নির্মাতা] এসেছিলেন এখানে। উনি গিয়ে এ বিষয়ে অনেক গল্প করেছেন। কোনো এক সন্ধ্যায় আমরা আলাপ করছিলাম, এই ধরনের আয়োজন হওয়া দরকার, যেটা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ করছে। রাজশাহীতে তারা করছে, ঢাকায় কিন্তু সেভাবে হচ্ছে না। আজকে সেই ঘটনা ঘটলো, আমাকে ডাকা হলো, আমি আসলাম, সমাদৃত হলাম, অনেক ভালোবাসায় সিক্ত হলাম। আজকে আপনারা ঘরভরা যারা এসেছেন, তাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা আমার দিক থেকে। এটা আমার জন্য একটা দুর্লভ সুযোগ, আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলছি; আমার জন্য এটা সৌভাগ্য, আপনাদের কতোটা আমি জানি না।
একটা টপিক আমাকে নির্ধারণ করার জন্য বলা হয়েছিলো। তখন আমি আকণ্ঠ ডুবে আছি অসংখ্য কাজের মধ্যে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো, আমার জন্য নারী বিষয়ে কথা বলাই বোধহয় বেশি সুবিধার। যেহেতু এই চর্চাটা আমার রয়ে গেছে। এবং আমার নিজের উপলব্ধি, আমার কর্মক্ষেত্র ধরে এই কথাগুলো সবার সামনে বলা উচিতও। বিশেষ করে চলচ্চিত্র এবং নারী, এখানে তাদের যে অবস্থান। আমরা জানি, চলচ্চিত্র বাণিজ্যিক উপাদান, সেখানে নারীকে যখন নিয়ে আসা হচ্ছে, আমাদের বন্ধু বলে গেলো, কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ভাবলাম এই ইস্যুতেই কথা বলা যায়। তাৎক্ষণিক কথা বলার টাইটেলটা ভেবে উঠতে পারিনি। পরে ভাবলাম, ‘চলচ্চিত্রে অমীমাংসিত নারী’। কেনো অমীমাংসিত সেটা পর্যায়ক্রমে উঠে আসবে হয়তো। তারপর প্রশ্ন থাকলে আলোচনা করবো।
তার আগে একটু বলে রাখি, এই ধরনের আলোচনার সঙ্গে আপনারা বিভিন্নভাবে অভ্যস্ত। নানা রকমভাবে বহুমাত্রিক, তাত্ত্বিক আলোচনা আপনারা করেন। আমি শুনছিলাম, আপনারা নিয়মিত পাঠচক্র করেন। এটা একসময় আমরা করতাম। খুব দুঃখের সঙ্গে ভাবি, এখন কেনো সেভাবে আর হয় না। টি এস সি’র আশপাশে এই অনুশীলনগুলো চলে--নাটকের, কবিতার--সেখানে কিন্তু চলচ্চিত্রের পাঠটা কিছুটা হলেও ম্রিয়মান। আগের মতো সেই উদ্দীপনাটা নেই। এটা যে এখানে আপনারা নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটা যখন চাক্ষুস দেখলাম, আমার খুব ভালো লাগলো। টপিকগুলো নির্ধারিত, একদিন আপনারা চলচ্চিত্র নিয়ে পাঠ করছেন এবং আরেকদিন সমাজ-রাষ্ট্র-রাজনীতির নানা দিক বোঝার জন্য আলাদা একটা পাঠচক্র করছেন। এর চাইতে ভালো আর কিছু হতে পারে না, সত্যি কথা। আমি তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে গেলাম, এখানে আমি খুব সহজভাবে অনেকগুলো বন্ধু পাবো, যাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবো। এবার হয়তো সূত্রপাত ঘটাচ্ছি।
আজকে যে প্রসঙ্গ, এই নিয়ে অনেক ভাবনা চলছে বাইরে। এটা এমন নতুন কোনো বিষয় নয়। ‘চলচ্চিত্রে নারী’ ইস্যুতে বহুদিন কথা হয়েছে। দেখবেন প্রতিবার ঢাকা ফেস্টিভালে দেশ-বিদেশের নারীরা যারা চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত আছে তারা সবাই আসে। আলোচনা চলে।
আমরা দীর্ঘদিন চর্চার মধ্য দিয়ে একটা অবস্থানে পৌঁছেছি। তাই মনে হয় সবাই বুঝি ওই চর্চার মধ্যে আছে। এই যে ছেদ পড়ে যাচ্ছে, এটা ভুলে যাই মাঝে মাঝে। আমি তো চর্চা করছি, অন্যরাও এই চর্চাটা করছে কি না, তা আর ভাবা হয় না। ধরেই নিই যে এটা তো অমুক পত্রিকায় এসেছে, নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র, এটা নিয়ে তাহলে নিশ্চয় বিস্তর বিশ্লেষণ হয়েছে। পরে যখন কথা বলতে যাই, তখন কিন্তু একটু হোঁচট খাই।
হোঁচটটা কোন জায়গায়--সেটা হলো গিয়ে খুব মোটাদাগে উপস্থাপনায়। মোটাদাগে এই কারণে বলবো, কতোগুলো শব্দ আছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পুরুষতন্ত্র তারপরে পিতৃতন্ত্র--এই শব্দগুলো বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু আদৌ এটা কতোটুকু উপলব্ধ, তা আমি জানি না। কারণ যখন বিশ্লেষণ আসে তখন এক ধরনের ধাক্কা খাই। ধাক্কা ঠিক বলবো না, বুঝতে পারি একটা স্ববিরোধিতা আছে বোধের ক্ষেত্রে। তখন মনে হয়, যদি সত্যি বুঝিয়ে দিতে পারতাম পিতৃতন্ত্র কী অথবা পুরুষতন্ত্র কী! পিতৃতন্ত্র যে শুধু পুরুষ ধারণ করে তা নয়, নারীও ধারণ করে। এটা বুঝতে পারলে বোধহয় মীমাংসিত হতো অনেক কিছু। সুতরাং আমি যেটা বলবো, যেহেতু আমাদের ওই তাত্ত্বিক জায়গাটা অনুশীলন হয় না বা ওটা খুব একটা আলোচনা হয় না, সে কারণে আমরা কিন্তু কিছুটা পিছিয়ে আছি। আমরা যখন নারী ইস্যুতে কথা বলতাম, যখন এই বিষয়টার সূত্রপাত হলো, তখন কিন্তু এই কথাগুলোর চর্চা ছিলো, নিয়মিত আলোচনা ছিলো। আজকাল যখন কিছু বলতে যাই, তখন অনেকেই বলে এখন তো ইকুয়ালনেসের সময়, সমতার সময়। নারী দিবস থাকলে পুরুষ দিবসও থাকতে হবে ইত্যাদি। এই কথাগুলো বোগাস। এটা হলমার্ক আর আর্চিজ এর খেলা। তারা খেলা খেলছে আর আমরা তাদের সঙ্গে ওঠা-পড়া করছি। বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই কিন্তু একেকটা দিবস হয়ে যায়। সে কারণে ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন হয়, নারী দিবস একপর্যায়ে ‘পন্ডস নারী দিবস’, ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি নারী দিবস’ হয়ে যায়। ‘হুইসপার নারী দিবস’ [‘হুইসপার’ স্যানিটারি প্যাড কোম্পানি] হয়।
এখন আমরা এগিয়ে গেছি, আমাদের ‘গোপনতম’ শারীরিক ব্যাপারগুলো নিয়েও এখন প্রকাশ্যে কথা বলি। সুতরাং ‘হুইসপার নারী দিবস’ হয়ে গেছে! আমার তাতে কোনো আপত্তি নেই। যে যার মতো বাণিজ্য বা যাই করুক না কেনো, সেটা পরে আলোচিত-বিবেচিত হতে পারে ভিন্নভাবে। আমার কথাটা অন্য জায়গায়, চলচ্চিত্রে নারী যখন নাচছে তখন কি আমরা বলবো, সে কেবল বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই নাচছে? আমিও আসলে মোটাদাগে উপস্থাপন করে ফেলছি, কিন্তু এটা সূচনা করার জন্য। যখন সে স্বল্পবসনা হয়ে ঘুরছে বা হেঁটে বেড়াচ্ছে, তখন তাকে কতোগুলো ক্যারেক্টারাইজ্ড ছকে বাঁধা চিত্রের মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আমরা তাহলে কীভাবে এটাকে বিবেচনা করবো? যেমন একসময় ছিলো ‘ভ্যাম্প’[Vamp]--তারা সিগারেট ধরায়, হাত কাটা ব্লাউজ পরে। তখন পোশাক নিয়ে বিবেচনা হতো, তারা খুব সাজগোজ করতো, কানে বিশাল বড়ো দুল ইত্যাদি ইত্যাদি শরীরে নানান গহনা, দু-একটা ইংরেজি শব্দ ছুঁড়ে দিতো--এদের বলা হতো ভ্যাম্প।
সঞ্চালনায় রীতা জান্নাত ও তানভীর শাওন
আবার নায়িকা দেখেছি--যে ভীষণ ঠকে যাচ্ছে জীবনের কাছে, বার বার পদানত, বার বার পরাভূত হচ্ছে। ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা আপনারা সবাই দেখেছেন সম্ভবত। সিন্দাবাদ নাবিকের মতো নিতা কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছেন সংসার জোয়াল। সুতরাং নায়িকা, যাকে বলা হতো ‘ট্রাজিক পিন’। তখন চোখের সামনে মিনা কুমারীর চেহারা ভেসে উঠতো। আরো ছিলো, পাকিস্তান আমলের কথা বলছি, মানে ওই সময়টা আমার বোধের প্রেক্ষাপট, বা আমার নারী ইস্যুতে কথা বলার সূচনার প্রেক্ষাপট যদি ধরি। তো এই রকম কতোগুলো ছক ছিলো, সে ছকের বাইরে একজন নারীকে কখনো দেখা যেতো না। আপনারা দেখে থাকবেন, এক নারী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে কারো দিকে তাকাচ্ছে না, হাতে কয়েকটা বই, ধাক্কা খেলো নায়কের সঙ্গে, দুদিন পরেই দেখা গেলো ...। আরো দেখবেন, সে শালীনতা বজায় রাখছে কঠোর একটা বেড়াজালের মধ্যে। আবার বাড়ির বউ বা কারো ভাবী, সে দেখা গেলো গোটা সংসারটাকে দিয়েই যাচ্ছে, রান্না করে খাওয়াচ্ছে, যাবতীয় ত্যাগ একাই করছে। এ রকম কতোগুলো খোলস ছিলো, যে খোলসের মধ্যে উপস্থাপন করা হতো নারীকে। সচরাচর মধ্যবিত্তের চেহারাগুলো আমরা যেভাবে দেখে থাকি তারই প্রতিফলন এবং বৃত্তের একটা টানাপড়েন ছিলো তখন। বৃত্তের টানাপড়েন মানে কী---যে বৈষম্যের শিকার খুব সহজেই বোঝা যেতো, এই নারী বৈষম্যের শিকার এবং যে নারী তাকে ব্যবহার করছে তাকেও চেনা যেতো।
কিন্তু এই ছকবদ্ধ নারী সেখান থেকে বের হতে শুরু করে; ইমেজগুলো বদলাতে শুরু করে; নারী সম্পর্কে ধারণাগত জায়গাগুলো বদলাতে শুরু করে। সাহিত্যে বদলায়, গানের কথায় বদলায়, উপলব্ধিতে বদলায়, তারপরে অনেক কিছুতেই বদলায়। রবীন্দ্রাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’য় পুরুষের বেশে একজন নারীকে দেখতে পাই। চিত্রাঙ্গদা নারী, তার অন্য একটা অবয়ব নিয়ে সে আস্তে আস্তে জায়গা করে নিতে থাকে চলচ্চিত্রে। আমার মূল প্রতিপাদ্য এখানেই। এই যে নতুন নারী, যে আজকে পুরনো হয়ে গেছে অথচ অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তার কী রোল হওয়া উচিত এখনো আমরা নির্ধারণ করতে পারছি না।
কতোগুলো ঘটনাপট আছে, যেগুলো উল্লেখ না করলেই নয়। আমাদের যে কাহিনি-কাঠামো সেটা বদলে যাচ্ছে এবং নারীর সেন্ট্রাল ফিগারগুলোও বদলে যাচ্ছে। আমাদের ধারণায় আছে, আমাদের মায়েরা কখনো প্রেমে পড়তে পারে না। আমাদের বোনেরা আদর্শের বাইরে যেতে পারে না। এছাড়া আমরা অ্যান্টিহিরোদের চলচ্চিত্রে আসতে দেখেছি। তারা কিন্তু খলনায়ক হিসেবেই জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু খলনায়িকারা নায়িকা হিসেবে কারো মণিকোঠরে জায়গা করেছে এমনটা দেখতে পাইনি।
এছাড়া যে নারীরা সত্যিকার ‘শিরোঃ’, তাদের নিয়েও খুব বেশি চলচ্চিত্র হয়নি। যেমন, আমার প্রীতিলতাকে নিয়ে চলচ্চিত্র করতে ভীষণ ইচ্ছে করে। আমার ইচ্ছেও আছে কোনো একদিন করবো। তার সেই রোল আমরা কিন্তু কখনো সেভাবে দেখিইনি। তারপরে আমি যদি তাকিয়ে দেখি--বেগম রোকেয়া--তিনি অবশ্য বেগম শব্দটা পছন্দ করতেন না। তাকে রোকেয়া সাখাওয়াত বলা হতো, মিসেস সাখাওয়াত হোসেন বলা হতো--তার যে রোল, আমার কাছে মনে হয় ভীষণ ইন্টারেস্টিং একটা গল্প হতে পারে। লীলা নাগ--আমরা ভুলে গেছি তার নাম। এই মহীয়সী নারী তখন কী-ই না করেছেন এবং আজকে ঢাকায় যে নারী শিক্ষা মন্দির, সেটা কিন্তু তার অবদান। অথচ তিনি স্বীকৃত হননি, আলোচনায়ও আসেননি। আবার যদি দেখি জগদীশ চন্দ্র বসুর স্ত্রী অবলা বসু--তিনি খুব ডানপিটে নারী ছিলেন। বলা হয় সেসময়ের ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী চিন্তনের অগ্রদূত ছিলেন তিনি। সেসময় তিনি বাংলার বিভিন্ন জায়গায় ৯৯টা নাকি ৯৪টা স্কুল খুলেছিলেন, জোর করে। আমরা ১৮৫০-এ বেথুন স্কুলে নারীদের অভিযাত্রার সূচনা দেখছি। তখন পালকিতে চড়ে মেয়েরা ক্লাসে যেতো। সর্বসাকুল্যে মনে হয় ২৩ জন ভর্তি হয়েছিলো। পথের মধ্যে ইট খেয়ে মাথা ফাটিয়ে ১১ জন টিকেছিলো। সেই ১১ জন দিয়েই শুরু হয় বেথুন স্কুল। এবং সেখান থেকেই দিনে দিনে বেড়ে আজকে কোথায় গেছে! নারীর জন্য আলাদা কোনো সুযোগ ছিলো না। রীতিমতো চিৎকার করেই নিতে হয়েছিলো, আমার জন্য কেনো ডাক্তার হওয়ার সুযোগ থাকবে না? কেনো আমাকে জায়গা দেওয়া হবে না শিক্ষালয়ে? ওই যে অভিযাত্রা অতিক্রম করেছে যেসব নারীরা, তাদের নিয়ে ভীষণভাবে লিখতে ইচ্ছে করে। চলচ্চিত্র বানাতে ইচ্ছে করে। আমার কাছে তারা শিরোঃ এবং সত্যিকার অর্থে গোয়েন্দা চলচ্চিত্র বা অ্যাকশন চলচ্চিত্রের নায়িকাদের মতোই প্রচণ্ড দাপুটে। এই কনটেক্সট থেকেই আমার মাথায় চিন্তা আসে যে, নারী হয়ে কেনো চলচ্চিত্রে আসা যাবে না!
কালকেই আমাকে জান্নাত (রীতা জান্নাত, দ্বিতীয় বর্ষ, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাবি) ও আরো অনেকেই প্রশ্ন করছিলো, আপনি কোন আগ্রহে চলচ্চিত্রে যুক্ত হলেন, কীভাবে এই আসাটা? বাড়ি থেকে তো মোটেই কোনো উৎসাহ ছিলো না। আমি যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী, তাই ধরেই নেওয়া হয়েছিলো, আমি যাবো ডিপ্লোমেসির খোঁজে। কিংবা খুব বেশি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবো। অথবা এমন কিছু করবো যা সবার মুখ উজ্জ্বল করবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। তা না, আমি যাচ্ছি চলচ্চিত্রে। নাই নাই করে যা হলো, আমি ঢুকলাম সাংবাদিকতায়। আপনারা জানেন কি না জানি না, আমার কিন্তু দীর্ঘ ইতিহাস সাংবাদিকতার সঙ্গে বসবাসের। আমি ‘সংবাদ’ এ চাকরি করেছি ১৪ বছর। এর আগে কবি বেলাল চৌধুরীর কাছে আমার হাতেখড়ি। বলা যায়, উনিই আমার মেন্টর। উনার কারণেই আমি লিখতে শিখেছি এবং উনাদের সাহচর্যে এই ইস্যুগুলোতে আমার চোখ খোলা।
এ কারণে এই কথাটা বললাম, কারণ যখন চলচ্চিত্রে ঢুকলাম, ভাবিনি চলচ্চিত্র বানাবো। ভেবেছিলাম, চলচ্চিত্র নিয়ে চর্চা করবো। সেই চর্চার মধ্যে যুক্ত হয়েছিলাম। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কিন্তু সেই জায়গাটা তৈরি করতো। আমরা যেভাবে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনকে দেখে থাকি, তা কিন্তু নয়। এটা মুক্তচর্চার একটা জায়গা ছিলো। মুক্তচর্চা এই কারণে বলছি, কারণ যে সময়ে আমি এসবের সঙ্গে যুক্ত হই, সেসময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা হয়ে গেছে এবং জিয়া--শুধু জিয়া নয়--সামরিকতন্ত্রের প্রবল প্রতাপ। সেই সময় কিন্তু--১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে--‘সচিত্র সন্ধানী’ নামের একটা পত্রিকা ছিলো। আগে সেটা চলচ্চিত্র পত্রিকা ছিলো, পরে পাক্ষিক ম্যাগাজিন হিসেবে অন্য একটা আঙ্গিক নিয়ে বের হতে শুরু করে। সেখানে আমি লিখতে শুরু করি। বেলাল ভাই-ই মূলত আমাকে সেখানে দুটো টপিকে কাজ করতে হবে বলে জায়গা দিয়েছিলেন। ওখানেই একটা চলচ্চিত্র দেখে রিভিউ লিখেছিলাম। বেলাল ভাই সেটা দেখেই বললেন, এটা দারুণ হয়েছে, সবাই বেশ প্রশংসা করছে। মোহাম্মদ খসরুর নাম আপনারা অনেকেই শুনেছেন--তো সেখান থেকেই মোহাম্মদ খসরু আমাকে খপ করে ধরে বসলেন--তুমি আসো তো, আমার জন্য ছোটোখাটো রিভিউ লিখো। আমার মনে আছে, আন্দ্রে ভাইদার দ্য প্রমিসড ল্যান্ড (১৯৭৫) চলচ্চিত্রটি দেখানো হয় রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে। দ্য প্রমিসড ল্যান্ড এমন একটা ইন্টারেস্টিং টপিক যে, শিল্পবিপ্লবের কারণে যে বিবর্তন--সামন্ততন্ত্র থেকে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটছে--এমন একটা অস্থির সময়ের প্রেক্ষাপটে একটা গল্প। এবং এই প্রমিসড ল্যান্ড-এর মধ্য দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন উঠে দাঁড়াচ্ছে, সমাজতন্ত্রের বিষয়গুলো, একেবারে নির্যাতিত মানুষের চিত্রগুলো নিয়ে একটা দুর্দান্ত ডকুমেন্ট হলো দ্য প্রমিসড ল্যান্ড। এই চলচ্চিত্রটি দেখার পরে আমি একটা রিভিউ লিখেছিলাম। খসরু ভাই বললেন, আমার জন্য তুমি নিয়মিত লেখো। এই করতে করতেই আমরা সবাই একসঙ্গে বসে আড্ডা দিতাম চলচ্চিত্র বিষয়ে। তখন আমাদের আলাপ কেবল শুরু হচ্ছে। তানভীর মোকাম্মেল ইংরেজি বিভাগ থেকে, আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে, মানজারে হাসান মুরাদ--আপনারা নিশ্চয় নাম শুনেছেন--তারেক মাসুদ ইতিহাস বিভাগ থেকে আস্তে আস্তে এই আলোচনার জায়গায় যুক্ত হয়। আমরা বসতাম টি এস সি’র মোড়ে নাহয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে। সেখানে কিন্তু পুরুষদের মধ্যে একমাত্র নারী তখন আমিই। টিমটিম করে তখন আমাদের প্রায় হাতাহাতি পর্যায়ের তর্ক-বিতর্ক চলে। ওই সময়ই আমাদের তিনজনকে কো-অপ্ট করে নেওয়া হয় এবং আমরা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাই, জেনারেল বডিতে। কে কে--তানভীর মোকাম্মেল, আমি এবং মানজারে হাসান মুরাদ।
আমাদের কাজই ছিলো বিভিন্ন জায়গা থেকে চলচ্চিত্রগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আনা। আপনারা জানেন যদিও, তখন দূতাবাসগুলো থেকে চলচ্চিত্র টুকিয়ে আনা হতো, পরে সেগুলো দেখানো হতো। সেসময় একটা কালা-কানুন জারি করা হয় এবং বলা হয়, সেন্সরশিপ ছাড়া চলচ্চিত্র দেখানো যাবে না। সেদিন লেনিনের জন্মদিন উপলক্ষে একটা বেশ চমৎকার চলচ্চিত্র দেখানো হচ্ছিলো। তার মধ্যেই সেনাবাহিনী ঢুকে পড়ে এবং বলে এটা নিষিদ্ধ। সেন্সরশিপ ছাড়া চলচ্চিত্র দেখালে তিন মাসের জেল আর ১০ হাজার টাকা জরিমানা। আমাদের মতো কপর্দকহীনদের ১০ হাজার টাকা জরিমানা! সুতরাং সবাই একটু সংযত হয়ে যাই। শুধু তাই নয়, এটা নিয়ে প্রতিবাদে নামা হয়। তারেকের সঙ্গে সে সময়টাতে আমার ভীষণ সখ্য হয়। এবং আমরা সবাই রাস্তায় মিছিল-মিটিং করে একাকার। পুলিশের পিটুনি আর টিয়ার গ্যাস দিয়ে আমাদের গুটিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের আন্দোলন দমে যায় না। এই আইন চলেই আসছিলো। মাত্র কিছুদিন আগে এই আইন রদ করা হয়েছে। ওই সময়টাতেই তারেক মাসুদসহ আরো অনেকের সঙ্গে আমার জোটবদ্ধ হয়ে যাওয়া।
সন্ধ্যার পরে বাড়ি ফেরা হচ্ছে না। বাড়িতে গেলে অনেক শাসানো হচ্ছে। নারী মানেই তো তাকে বাড়ি ফিরতে হবে সন্ধ্যার আজানের সঙ্গে সঙ্গে। এই রেস্ট্রিকশন থেকে আস্তে আস্তে আমাকে বের হয়ে আসতে হয়েছে। এবং ধীরে ধীরে নিয়মিত চর্চার মধ্যে আমরা চলে যাই। আর এগুলোর মধ্য দিয়ে আর কিছু হোক না হোক এটা বুঝতে পারছিলাম, মানুষ হিসেবে নিজেদের পরিবর্তন ঘটছে; চেতনার বদল ঘটছে। নিজেদের বদল ঘটছে। এখান থেকে ওখান থেকে লিখতে গিয়ে, এর ভাষ্য ওর ভাষ্য টুকতে গিয়ে, নানাধরনের চলচ্চিত্র দেখা, সেগুলোকে ভেঙেচুরে বোঝার মধ্য দিয়ে কিন্তু একটা বিবর্তন ঘটে গেলো। মজার ব্যাপার যেটা খেয়াল করলাম, তার কিছুদিন পরেই আরো নারীবিষয়ক চলচ্চিত্র আসতে শুরু করলো। যেমন, আমি বলবো বার্তোলুচির ইতালিয় একটা চলচ্চিত্র ছিলো। (দর্শক : লাস্ট ট্যাংগো ইন প্যারিস?) না লাস্ট ট্যাঙগো ইন প্যারিস না। এটা একদম সপ্তদশ শতকের নারীদের নিয়ে নির্মিত, সেই কনটেক্সেটের গল্প। আমি নামটা ভুলে গেছি। এটা ছিলো একেবারেই নারীর সেক্সুয়ালিটিকে কেন্দ্র করে, যৌনতাকে কেন্দ্র করে। এতোটা প্রকটভাবে বিষয়টা বুঝিয়ে বলা খুব কম চলচ্চিত্রে আমি দেখেছি।
আরেকটা ফ্রেঞ্চ চলচ্চিত্র আমি দেখেছি--হু ইজ জর্জ সাঁদ। জর্জ সাঁদ নামের একটি মেয়ে পুরুষের পোশাক পরে সেসময়ে (প্যারি কমিউনের সময়ে) অনেক নিয়ম ভেঙে বিচরণ করেছে। মেয়েটি খুব জাঁদরেল ছিলো। এবং ঘটনাটা সত্যি, এমন একটা মেয়ে সত্যি সত্যিই ছিলো। তিনি কিন্তু সেসময় অনেক কিছু করেছেন। নারীর পরিসর বিস্তৃত করার জন্য অনেক কাজ করা শুরু করেছিলেন। এই বিষয়গুলো আসলে আমরা তখন বুঝতে শুরু করি। যেহেতু প্রশ্নোত্তর পর্ব আছে, তাই এই বিষয়গুলো আমি রেখে দিচ্ছি। যদি কেউ মনে করে জানতে চান, তাহলে আমি বলবো। কারণ আমি রিপিট করছি কি না তা তো জানি না। এখানে অ্যানথ্রোপলজির অনেকেই আছেন। যার ফলে হওয়া আলোচনা পুনরাবৃত্তি করতে চাইছি না। পরে প্রশ্ন আসলে আমি উত্তর দেবো।
নিশ্চয় সবার জন্য খুব সহজ একটা বোঝা, সেটা হলো সেক্সুয়ালিটি। যা আমার শারীরিক, ফাংশনাল এবং অনেক কিছুকেই ডিফাইন করে। এবং সামাজিকভাবে যে কারণে আমি আলাদা হয়ে যাই। আমার রোল মডেলও আলাদা হয়ে যায়। এই ইস্যুগুলো পরিষ্কার হতে থাকে সেসময়। মৃণাল সেনের একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯) চলচ্চিত্রটা আপনারা দেখেছেন কি না? ওটাতে একটু মোটাদাগে উপস্থাপিত, খুব সূক্ষ্ম জায়গায় যাননি। কিন্তু বুঝিয়ে দিয়েছেন, পিতৃতন্ত্র কাকে বলে এবং নারীর যৌনতা কাকে বলে। একজন নারীকে ঘিরে, তার শরীরকে কেন্দ্র করে, তার রোলকে কেন্দ্র করে যে ধরনের ধারণাগুলো জমে ওঠে, সে যখন রাতে ফেরে না, তাকে নিয়ে কী তুলকালাম কাণ্ড হতে পারে, তা একদিন প্রতিদিন-এ দেখতে পারবেন। যেকোনো নারী, এখানে যারা বসে আছেন, তারা সবাই একই অভিঘাতের শিকার আমি বলবো। তারা সবাই একাত্ম হয়ে যাবে সেই নারীটির সঙ্গে, পুরুষেরাও। সমমর্মিতা, সংবেদনশীলতা এবং স্পর্শকাতর মন যদি থাকে নিশ্চয়ই তারাও বুঝবে যে কতো দুরূহ একটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে নিজের জায়াগাটা সমুন্নত রেখে, নিজের চেহারা, মর্যাদা সবকিছু রেখে অতো রাতে দাপটে পথচলা এবং বাড়িতে ফেরা। এটা যদি আদৌ এতো সহজ হতো, তাহলে কিন্তু আজকে ব্যাপক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারতো।
নারী হিসেবে আমি যখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হলাম, তখন বুঝতে পারলাম, আমার নেশা চড়ে গেছে--আমি যদি চলচ্চিত্র বুঝতে পারি তাহলে অসুবিধা কোথায়।--কিন্তু সেটা তো সমাদৃত হচ্ছে না আমার পরিবারে। তারা বলছে, তুমি দরকার হলে ফরেইন মিনিস্ট্রিতে ঢোকার চেষ্টা করো বা স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বলে আরেকটা বিভাগ আছে সেখানে নারীদের চাচ্ছে, তুমি সেখানে যাও। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, আমি চলচ্চিত্রে কেনো এতো সময় ব্যয় করছি, সেটা কারো পছন্দ হচ্ছে না! তারপরে ইউনিসেফে বিশাল বড়ো অঙ্কের টাকার একটা চাকরি পেয়ে গেলাম। ওটা ছিলো আরবান এডুকেশন নিয়ে। কিন্তু আমার মন সেখানে নেই। কারণ ওখানে অনেক সময় দিতে হতো এবং খুব করপোরেট চাকরি। সবসময় চকচকে ঝকঝকে হয়ে থাকতে হতো, যেটা আমার ধোপেই টেকে না। একপর্যায়ে সে চাকরিটা আমি ছেড়ে দিলাম। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আরেকটা বড়ো কারণ ছিলো, আমার লেখার জন্য অনুমোদন ছিলো না--ইউ এন’কে না জানিয়ে কোনো লেখা লিখা যাবে না। যখন চাকরিটা ছেড়ে দিলাম, আমার বাড়িতে তো প্রচণ্ড রকমের বজ্রপাত হলো--তুমি এটা কী করে পারলে, গাড়ি পাচ্ছো, এটা পাচ্ছো, ওটা পাচ্ছো, এতো অল্প বয়সে এতো সমাদর, বিদেশি অফিসারদের আন্ডারে চাকরি!--সুতরাং ভাবমূর্তি নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। সেখানে আমি মাত্র পাঁচশো টাকা মাইনের চাকরি নিলাম ‘সংবাদ’-এ।
দর্শকের একাংশ
সেটারও ইতিহাস আছে। আমার তখন চাকরি নেই। কিন্তু আগের চাকরির কিছু টাকা জমানো ছিলো, তাই দিয়ে দিন চলছে। আবার চলচ্চিত্র নিয়ে লেগে পড়া, সন্ধ্যার পর বাড়িতে ফেরা। বাড়িতে সবার তখন গোমরা মুখ--এটা হতে পারে না! কে যেনো একজন খবর দিলো, ‘সংবাদ’-এ লোক নিচ্ছে। ওখানে গিয়ে কী করে যেনো বেশ ভালো করে ফেলেছিলাম! তখন বজলু ভাই--বজলুর রহমান, মতিয়া চৌধুরীর স্বামী--ছিলেন ‘সংবাদ’-এর নির্বাহী সম্পাদক। বজলু ভাই তখন বললেন, ভালো করেছো। ভাইভাও ছিলো। যেহেতু আমার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ব্যাকগ্রাউন্ড, তাই আন্তর্জাতিক কোনো বিষয় নিয়ে কথা উঠলেই তো আমি কথা বলতে পারতাম। তখন তো ফিদেল কাস্ত্রো আছে, কিউবা আছে, লাতিন আমেরিকা তখন উত্তপ্ত--সুতরাং যেটা হয়েছে, উত্তর বোধহয় টাস টাস করে দেওয়া হয়েছিলো। তার জন্য চাকরিটা হয়ে গেলো। বজলু ভাই বললেন, কালই ডেস্কে আসো। আমি প্রশ্ন করলাম, ডেস্কে? না আমি ডেস্কে ঢুকবো না। তিনি বললেন, হ্যাঁ ডেস্কে। তোমার বেশি দিন লাগবে না। ছয় মাসের মধ্যে তোমার উন্নতি হয়ে যাবে। আমি বললাম, আমি তো ওগুলো করতে চাই না। আমি ফিচার-টিচার লিখতে চাই। তখন বজলু ভাই বললেন, না না হাসনাত দেখছে (আবুল হাসনাত ভাই) ওই পাতা। তুমি কী করবে ওখানে, ওর লোক লাগে না, সাহিত্য পাতা হাসনাত একাই দেখে। তখন আমি প্রশ্ন করলাম, অন্য কোনো ফিচার পাতায়, সিনেমা পাতায় হবে না? তখন তিনি বললেন, না ওটাও একজনের দায়িত্বে আছে। আমি তখন বললাম, তাহলে আমি চাকরি করবো না। তিনি বললেন, পাগলামি কোরো না, ঢুকে যাও, তারপরে দেখা যাবে। আমি শেষবারের মতো প্রশ্ন করলাম, মেয়েদের পাতা? আপনাদের নারী পাতা বলে কিছু নেই। তখন নারী বিষয়ে আমার মধ্যে প্রশ্ন জাগছে, ওটা লিখতে চাই তখন। বজলু ভাই বললেন, না না ওগুলো বোকা বোকা লেখা, ওগুলো বন্ধ। আমি তখন তাকে বলেই ফেললাম, যদি আপনি এটা চালু করেন, তাহলে আমি আসবো। এই বলে আমি চলে এলাম।
সাত দিন পরে বজলু ভাই আমাকে ফোন দিয়ে ডাকলেন। ওখানে গেলে তিনি আমাকে বললেন, ‘আমি তোমাকে টাকা দিতে পারবো না, কিছু দিতে পারবো না। তুমি চালাতে পারবে? যদি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নাও, তাহলে শুরু করো। আমি দেখতে চাই, কী এমন নতুন জিনিস দিচ্ছো!’ আমি চ্যালেঞ্জটা নিলাম। মাত্র সাত দিনে পাতার চেহারা বদলে দিয়ে রূপচর্চা-টর্চা সব ঝেড়ে ফেলে পলিটিকাল জায়গাটা, নারীর পলিটিক্স, সেক্সুয়ালিটি--এই জায়গাটা ধরলাম। এবং যেসব বিষয় ওখানে দিলাম, তাতে প্রথমেই তিনি চমকে গেলেন। তারপর সেই পাতাটা ১৪ বছর আমি চালিয়েছি। আমাকে যাতায়াতের জন্য পাঁচশো টাকা দেওয়া হতো। সেই পাঁচশো টাকা দিয়ে শুরু। এটা ১৯৮২’র কথা বলছি। আমি ১৯৯৬-তে ছাড়ি, ছাড়ি মানে বন্ধ হয়ে যায় ‘সংবাদ’। ততোদিন পর্যন্ত চালিয়েছি। আমার পাতায় তসলিমা নাসরিনের জয়যাত্রা, মানে ওর কবিতাগুলোর। আমি ওর অন্যগুলো নিতাম না, বা ভালোও লাগতো না। কিন্তু দুর্দান্ত সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখতো তসলিমা, ‘নারী-১’, ‘নারী-২’ এইসব নামে। আমার এখানে অনেকেই--সোনিয়া নিশাত, মালেকা বেগম, আয়েশা খানম, পূরবী বসু--এদের সবার যে নারীবাদী চিন্তা-চেতনার বিষয়গুলো এখানে লিখতেন। ‘সানডিনো ডটার’ খসরু ভাই লিখতেন। আমি যেটা করলাম, পুরুষ এবং নারী উভয়কেই লেখার সুযোগটা দিলাম। যেমন, সীমন দ্য ব্যোভওয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’ নিয়ে যদি একজন পুরুষ লিখতে পারে, সার্ত্রে নিয়ে লিখলে একজন নারী লিখবে। তো এ রকমভাবে রোল রিভার্সাল, ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে এই ইস্যুগুলো বিবেচনা করা, দেখা এবং সেগুলো উপস্থাপন করা, একটা ভিন্ন মাত্রা নিয়ে আসলো। এখান থেকেই তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেলসহ আরো অনেকেই লেখা শুরু করলো। এবং এই পাতার চেহারাটা পাল্টে গেলো। সেসময় তো ভীষণ উদ্দীপ্ত একটা সময়। যতো রিভল্যুশনারি কবিতা এখানে লেখা শুরু হলো। আমরা অনেক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি--পৃথিবীটা সুন্দর হবে, সমতা আসবে--এসব নিয়ে অনেক রকম জল্পনা-কল্পনা করা শুরু করেছি। ওই স্বপ্ন-জল্পনা-কল্পনাগুলোর প্রতিফলন লেখার মধ্যে ঘটতো। আমি অন্য একটা নামে ধারাবাহিকভাবে লিখতাম, নিজের নামে লিখিনি কখনো। সেজন্য কেউ জানতো না, পারিজাত চৌধুরী নামে আসলে কে লেখে? ওটা খুব পপুলার হয়েছিলো।
দেখুন, আমার কথা বলছি মানে এই নয় যে, আমি নিজেকে একটা টেস্ট কেইস হিসেবে জায়গাটা বোঝাতে চাচ্ছি। তো এই করে করে যেটা হলো, আমরা যখন একদিন প্রতিদিন নিয়ে লিখছি, তখন বুঝিয়ে দিচ্ছি, কীভাবে সমাজ কন্ট্রোল ওভার মাই বডি। কীভাবে নানা উপায়ে আমার পলিটিক্স, আমার বেঁচে থাকা, আমার তৃতীয় পৃথিবী নির্ধারিত হয়। আমার অবস্থানটি কীভাবে নির্ধারিত হয়। আমি সমাজে কোন স্তরে গিয়ে দাঁড়াই। সমকক্ষতায় নারী একটা পুরুষের সমান হলেও চিন্তা চেতনে কোথায় যেনো তারই অধঃস্তন। এই যে বিষয়গুলো চিন্তা করতাম, যখন চলচ্চিত্র বিবেচনা করতাম এই বিশ্লেষণগুলো চলে আসতো। তখন যে চলচ্চিত্রগুলো হয়েছে, আমরা যদি সেগুলো দেখে থাকি বা মনে রাখতে পারি, এখানে হয়তো অনেকে দেখেছেন যেমন, ভূমিকা (১৯৭৭)। এই চলচ্চিত্রটিতে স্মিতা পাতিল অভিনয় করেছিলেন। এ রকমই আরেকটি চলচ্চিত্র শ্যাম বেনেগালের জুনুন (১৯৭৮)। তারপর আরো অনেক চমৎকার চমৎকার চলচ্চিত্র সেসময় হচ্ছিলো যেখানে নারী প্রশ্নটি অগ্রাধিকার পাচ্ছিলো। [দর্শক : সুরাজ কা সাথ হুয়া সাভেরা] হ্যাঁ সেটাই। ততোদিনে কিন্তু টপিকাল হয়ে গেছে নারী ইস্যুগুলো। আমরা যদি সেই সময়কার পত্রপত্রিকা ঘাঁটি তাহলে দেখতে পাবো ভালো রকমের ফোকাসে আনা হয়েছিলো এই নারী ইস্যুটাকে।
এখন যেটা বলতে চাই সেটা হলো, ঠিক সেই সময়টাতে আমার স্ক্রিপ্ট লেখা শুরু। আলাদা করে নারী ইস্যুতেও অনেক লেখা লিখতাম। তবে সেটা খাটের নিচে, মানে একটা বাক্সের মধ্যেই জমা পড়ে থাকতো। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করলাম, অহ না ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে। যখন তারেক আসলো আমেরিকা থেকে তখন একটা ফিল্ম ফেস্টিভাল চলছে ঢাকাতে, ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভাল। সেখানে বিভিন্নজন এসেছেন বিভিন্ন দেশ থেকে। পাকিস্তান থেকে এসেছেন সাবিহা সুমার, আর বসুধা জোশি কলকাতা থেকে। যদিও বসুধা জোশি অবাঙালি, তবে কলকাতাতেই উনার অবস্থান। বিভিন্ন জায়গা থেকে চলচ্চিত্র নিয়ে এসেছে অনেকে। কিন্তু বাংলদেশ থেকে কোনো নারী নির্মাতার চলচ্চিত্র নাই। আমি যখন ফিল্ম ফেস্টিভালে গিয়েছি আমি খেয়ালও করিনি, আমি ঢুকতেই তারেক দৌড়ে এসে হাতটা খপ করে ধরে বলে এদিকে আসো। আমি জিজ্ঞাসা করি কোথায়? সে হিড়হিড় করে টানতে টানতে আমাকে নিয়ে চলে গেলো টেন্টের ভিতরে। টেন্টের মধ্যে তখন জাকী ভাই (সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী), বেবী ইসলাম ও খায়ের ভাইয়ের (আবুল খায়ের) সঙ্গে আরো কয়েকজন বসে ছিলেন। তারেক গিয়ে তাদের বললো, এই দেখেন কালপ্রিট ধরে এনেছি। আপনারা একটু আগে বলেছিলেন না, কোনো নারী নির্মাতা নেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। এই দেখেন ইনি সকাল-বিকাল স্ক্রিপ্ট লেখেন কিন্তু চলচ্চিত্র বানাবেন না। তারেক তো বলছে দুষ্টামি করে, খোঁচা দিয়ে, কান মুচড়ে প্রায়। খায়ের ভাই বললেন, তোর কাছে কী আছে বের কর। জাকী ভাই বললেন, শামীম সত্যি সত্যি দাও না একটা স্ক্রিপ্ট। জিজ্ঞাসা করলেন, করবে তুমি চলচ্চিত্র? সঙ্গে সঙ্গেই আমি বললাম, আচ্ছা ঠিক আছে। ‘ও ছেরি তোর বিয়ে’ এই জাতীয় একটা ব্যাপার! তখনই বেবী ভাই বললেন, তুমি যদি চলচ্চিত্র করো তাহলো আমি আছি ক্যামেরায়। এই হচ্ছে ব্যাপার, আধ ঘণ্টার একটা স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিলাম। চলচ্চিত্রটা আপনারা ইউটিউবে গেলে পাবেন--তারেক আর আমার নামে, আমাদের যৌথ পরিচালনায়। চলচ্চিত্রটির নাম হলো সে, দ্য কনভারসেশন (১৯৯১)। আধ ঘণ্টার একটা চলচ্চিত্র ছিলো, শর্টফিল্ম।
চলচ্চিত্রটি আমি ৩৫ মিলিমিটারে ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ক্যামেরায় করবো বলে ভেবেছিলাম। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্টক তখন আর পাওয়া যায় না, কালার চলে এসেছে। তখন জাকী ভাই এফ ডি সি’তে আছেন। আমরা এফ ডি সি’তে রোজ ধরনা দিই। কী করা যায় কী করা যায়! এফ ডি সির মাধ্যমে হয়েছে কিন্তু চলচ্চিত্রটি। একদিন জাকী ভাই ফোন দিলেন আমাকে এফ ডি সি থেকে। সেদিনই আবার চাষী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন সেখানে। চাষী ভাই দেখে বলেন, ও ফিমেল ডিরেক্টর, ভেরি গুড ভেরি গুড--উনি সেসময় বোধহয় শরৎচন্দ্রের কোনো গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র করেছিলেন--তো বললেন, আমার একটা রিল বেঁচে গেছে; ওটা তোমাকে দিতে পারবো। তখন একটা রিল মানে বুঝতেই পারছেন। জাকী ভাই বললেন, এটুকুতে হবে না শামীম? তারপর তিনি উজ্জ্বলকে (নায়ক) ফোন দিলেন। উজ্জ্বল বলে, আমার কাছে তো পড়ে আছে দুইখান। কিন্তু এ সি’তে ছিলো না, দেখেন কাজে লাগে কি না। জাকী ভাই আমাকে বললেন তুমি ওর কাছে যাও। আমি দৌড়ে ওখানে গেলাম। উজ্জ্বল আমাকে বলে, ‘আপনারা সিনেমায় আসবেন না অথচ বড়ো বড়ো কথা বলবেন!’ হুইচ ইজ ট্রু, আমরা তো ওই ধরনের কাজ করি, নাক উঁচিয়ে থাকি এফ ডি সির চলচ্চিত্র ভেবে; একটা অবজ্ঞা ভাব। এটা নিয়ে আজকে আমাদের অনেক কথা চলছিলো দুপুরে মামুনের (কাজী মামুন হায়দার) বাসায়।
যাহোক তারপর আমরা লোকেশনের বিষয়টি ভাবতে লাগলাম। চলচ্চিত্রের লোকেশন ঠিক করলাম ফরাসগঞ্জে বেশ পুরনো একটা বাড়িতে। চারশো বছরের পুরনো একটা পরিসর, সেখানে একটা বাড়ি। বেবী ভাইকে যখন লোকেশন দেখানোর জন্য নিয়ে গেলাম উনি বলেন, তুই কি পাগল হয়েছিস, আমি এখানে ৩৫ মিলিমিটারের ক্যামেরা কোথায় বসাবো আর ডেফ্থ পাবিইবা কী! এই ছিলো উনার হিসাবনিকাশ। আমি জোর দিয়ে বললাম আপনি হয় এখানেই করবেন, না হয় করবেন না। বেবী ভাই, আচ্ছা ঠিক আছে বলে সঙ্গে সঙ্গে লেন্স নিয়ে হিসাব কষতে শুরু করে দিলেন। আরেকটা বিষয় এফ ডি সি থেকে আমরা বিনা পয়সায়, না ঠিক বিনা পয়সায় নয়--বাকিতে ক্যামেরা ভাড়া পেলাম। সোলার আসলো, বেবী (বিশেষ ধরনের লাইট) আসলো, সবই আসলো। টেনেটুনে দুদিন সকাল-বিকাল শুটিং করা হলো। শুধু বিকাল পর্যন্ত সময় পেতাম সেটাও আবার ঠিক মতো না। পীযুস দা’কে আনা হলো। যে নায়িকাকে নিয়ে আসা হয়েছিলো সে ক্যামেরার সামনে ভ্যাকাচ্যাকা খেয়ে গেছে। এদিকে রিল বদলাতে গিয়ে বেবী ভাই হাত দিয়ে দেখেন আঠা আঠা লাগছে। তখন তিনি বলেন, আঠা আঠা লাগছে শামীম, যদি ছবি না হয় কিছু বলিস না। বলে রাখি সেই সময় এফ ডি সিতে ছবিটি কেটেছিলেন সুতরাং (১৯৬৪) খ্যাত নুরুন্নবী ভাই। দুর্দান্ত ভালো এডিটর, অনেক চলচ্চিত্র এডিট করেছেন। স্টাইনব্যাকে বসে বসে কাটতেন আর জোড়া দিতেন, পরে আমরা দেখি বেবী ভাইয়ের কথাই ঠিক, সত্যি সত্যি ভালো ভালো দৃশ্যগুলো ফাঙ্গাস পড়া, স্পটস। ওখান থেকে বেছে বেছে নিয়েই আট মিনিটের চলচ্চিত্রটা হয়েছে। আমাদের ডাবিং-এর সময় ভিডিও দেখে দেখে লিপসিঙ করতে হতো। এখন যেমন গাইডট্র্যাক পাওয়া যায়, তখন তা ছিলো না। দেখে দেখে লিপসিঙ করা হতো, অভিব্যক্তিটাও ওভাবেই দিতে হতো। যিনি লিপসিঙ করতেন তার গলার অবস্থা খারাপ থাকলে সেই অবস্থাতেই করে দিতে হতো। দেয়ার ওয়াজ নো চয়েস। খুব আঁটোসাঁটো একটা অবস্থা।
এইভাবেই আমার সূচনা হলো চলচ্চিত্রে। ছোট্ট একটা গল্প, আপনারা দেখে নিবেন যদি দরকার মনে করেন। এরপর দেখলাম ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে ফতোয়া দেওয়া হচ্ছে নারীদের বিরুদ্ধে। ছাতকছড়ার নূরজাহানকে দোররা মারা হয়েছিলো, পরে সে আত্মহত্যা করে। এছাড়া আরেকজনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো, তারও নাম নূরজাহান। এদেরকে নিয়ে আমরা একটা কম্পাইলেশন করি। তখন কিন্তু ক্যামেরা নেই, কিছু নেই, তবে ভি এইচ এস ছিলো। এতে করে আমার ৩৫ মিলিমিটার থেকে শুরু করে সব রকম ক্যামেরায় কাজ করা হয়েছে। এই কাজটা করার পর ছবিটা কিন্তু বেস্ট ভিডিও অ্যাওয়ার্ড পেলো। ভি এইচ এস মানে হলো বিয়ে বাড়ির ক্যামেরা। ওগুলাতে কী রেজ্যুলেশন থাকে ভাবুন একবার, খুবই ভয়াবহ। যখন টিপ দেওয়া হয়, তখন ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হয় পুরনো জং ধরার কারণে। আমরা বুঝতে পারছিলাম ফিতায় বোধহয় স্ক্র্যাচ পড়ে যাচ্ছে। এই টেকনিকাল ঝামেলার মধ্যে আস্তে আস্তে আমাদের অভিযাত্রা।
১৯৯৪-এ আরেকটা কাজ পেলাম। ব্রডকাস্ট পাইলিং ইনভেস্টিগেশন রিপোর্টিং। কাজটা খুবই ইন্টারেস্টিং ছিলো। নারী চেতনার কনটেক্সটের পাশাপাশি আমি বলবো, ‘সংবাদ’-এর লেখালেখি, বিপুল পড়ালেখা, খসরু ভাইয়ের সিনেমার ভাণ্ডার, এগুলো সবমিলিয়ে নারী চেতনার এক ধরনের বিবর্তন হতে শুরু করলো। কী বিবর্তন হলো কালে কালে, যেটা এখনো করতে চাই, যে ইচ্ছেটা এখনো রয়ে গেছে, সেটা হলো যে, চলচ্চিত্রে যেভাবে নারীকে উপস্থাপন করা হয়--তাকে যদি আজকাল দেখা যায় স্বাধীনচেতা নারী, তো সেভাবেই পূর্ণাঙ্গ নারীকে আমরা দেখতে পাই কি না? আরেকটি প্রশ্ন হলো, তাহলে গলদটা কোথায়? কেনো নারীকে আমরা চিনতে পারছি না বা চিনতে গেলে কোথায় হোঁচট খাচ্ছি। সঙ্কটটা আসলে কোথায়? নারীইবা নারীকে কতোটুকু চেনে। নারীইবা তার পরিসরটা কতোটুকু বাড়িয়ে দিচ্ছে। পুরুষ তো বাড়াচ্ছে, ডেফিনেটলি আমরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে যদি না পেতাম, রাজা রামমোহনকে না পেতাম, তাহলে সতীদাহ যেতো না, বাল্যবিবাহও রদ হতো না। পাশাপাশি আরো অনেক কিছুই হতো না। পরবর্তী সময়ে আরো অনেকজনকে পেয়েছিলাম যাদের কারণে আমরা আজকে এতোটুকু এসেছি।
নারী হিসেবে যারা কাজ করেছেন, যে বোধ থেকে কাজ করেছেন, তাদের কতোটা চর্চা হয়? না চলচ্চিত্রে হয়, না আমরা তাদের পাঠ করি। আমি যতোবার “সুলতানা’স ড্রিম” পড়ি বা রোকেয়ার ‘পদ্মরাগ’ পড়ি, ততোবার উদ্বুদ্ধ হই। ইশ যদি সেই গল্পটা নিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে পারতাম! তিনি কীভাবে ওই সময়টাতে এতো ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছেন, যা আজকের নারী হয়েও আমরা পারছি না! এখন আরো আধুনিকতা, টেকনোলজি, ফেইসবুকে এতো ইন্টারঅ্যাকশন এতো চেনা-জানা--তারপরেও নারী কেনো আজকে নিজেকে চিনতে পারছে না। কোন সে অবগুণ্ঠিতা, কোন অবগুণ্ঠনের কারণে সে এতো গুটিয়ে আছে যে নিজের চেহারা সে বোঝে না। আয়নাতেও সে যে চেহারা দেখে সেখানে নিজেকে সে শনাক্ত করতে পারে না। মোটাদাগে বলে মানুষ। খুব জোর দিয়েই বলুক না, আমি নারী। এ সমাজে নারী হওয়াটা ভীষণ রকমের একটা পজিটিভ ব্যাপার। সে পাওয়ারফুল, তার অন্তর্নিহিত একটা শক্তি আছে। সে লড়াই করছে এবং সে লড়াকু নারী এতোদূর এসেছে। তাকে যদিও তার রোল মডেল বদলানোর অনেক রকম প্রণোদনা অনেক রকম ছলে পুঁজিবাদ দিয়েছে। পুঁজিবাদ তাকে নানাভাবে ব্যবহার করতে চায়। নারী কিন্তু পজিটিভিটির জায়গাটা ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু সামাজিক একটা বেড়াজাল তৈরি হয়ে যায়।
‘তোমার কর্পোরেট একটা ছাওয়াল তৈরি করতে হবে!’ ছেলেপিলেকে চৌকস বানাতে হবে। চৌকসের যে মানদণ্ড সেটা নির্ধারণ হয় কার মাধ্যমে, মায়েরা তার পিছনে দৌড়াতে বাধ্য হয়? যদি যোগ্য ছেলে তৈরি করতে না পারে তাহলে সে ব্যর্থ ছেলেটাকে কেউ গ্রহণ করবে না। আরো বেশি গ্রহণ করবে না মাকে। সুতরাং যতো অপবাদ বলি, আর যা কিছু বলি না কেনো, এটা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আর পিতৃতন্ত্র বলে যে কথাটি বলা হয় আজ অবধি--আমি আমার পিতার লিনিয়েজ বহন করি। আমার বাবা, আমার দাদা তারাই অগ্রাধিকার পায়। আমার মা কিন্তু পায় না। সুতরাং আমি আজ অবধি আমার বাবার কাছে ঋণী। আমি তার লিনিয়েজটাই বহন করে যাচ্ছি এবং আমার বিয়ে হয়ে গেলে আমি আমার শ্বশুরবাড়ি চলে যাই। পুরুষরা যদি কেউ এসে থাকে তাহলে তাকে ভাউরা বলে ফেলে কেউ কেউ। কোনো একটা গালি দিয়ে ফেলে। বলে, ‘আরে বোঝো না বউয়ের স্ত্রৈণ হাজির হয়েছে’।
তাহলে দেখেন এই যে নির্ধারণগুলো কীভাবে এসেছে, তার জন্য পুরনো সমাজ বোঝার দরকার আছে, সেই সামাজিকতা বোঝার দরকার আছে। নারী কেনো অসূর্র্যস্পর্শা হয়ে গেলো, কী করে তাকে গুটিয়ে ফেলতে হলো, কেনো এতো বছর পর তাকে এডুকেশনে জায়গা করতে হলো রীতিমতো যুদ্ধ করে? দীর্ঘ সময় সে অন্ধকারে ছিলো। যুগ যুগ ধরে তাকে শাসিয়েছে একটি অন্ধকার। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সে যখন দাঁড়াচ্ছে, সে কিন্তু শক্তিশালী হয়ে সমকক্ষতা নিয়েই দাঁড়াতে পারছে। কিন্তু তারপরেও একটা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ইজ জাজিং হার। আর এখন সেটাই প্রতিফলিত হয় চলচ্চিত্রে এবং সেই পুরনো ফরম্যাটটাই রাখা হয়। সমাজ এগিয়ে গেলে তখন কেউ সাহস করে চলচ্চিত্রে তার প্রতিফলন ঘটায়। কেউ আগে চলচ্চিত্রে আনে না। সাহিত্যে আনে। সাহিত্যে ভাঙচুর করা নারীকে এনে উপস্থাপন করা যায়। চলচ্চিত্রের যে শক্তি, সেখানে সেটা যদি দেখানো হয়, তাহলে হয়তো তুলকালাম কাণ্ড ঘটে যাবে। সুতরাং এটা নিয়ে অনেক দ্বিধাদন্দ্ব, অনেক কিছু রয়ে গেছে।
আরো অনেক কিছু আলোচনার আছে, জানি না আমি বেশি সময় নিয়ে ফেলছি কি না। আমি কি কন্টিনিউ করবো? (দর্শক : হ্যাঁ অবশ্যই) আমি জানি না আমার আলোচনা কার কেমন লাগছে কিন্তু প্রশ্নগুলো হলে খুব ভালো হতো আমার জন্য, সহজ হতো। আমি বলবো চলচ্চিত্রে নারী যেমন অমীমাংসিত, তেমনই যে ক্যামেরার পিছনে আছে সেও অমীমাংসিত। কারণ সমাজ তাকে সেই রোলে ...। নির্মাতা হিসেবে আমি অনেক জায়গায় যেতে পারি, কিন্তু রাতে ফিরলে আমার ভ্রুকুটি হয়। এই বয়সে অবশ্য আর হয় না, একটুখানি শান্ত হয়েছে সব। কিন্তু একটা সময় ছিলো যখন পাশের বাড়ির অনেকেই বলতো, কী ব্যাপার এতো রাতে ফেরে কেনো, কী এমন কাজ করে? সুতরাং আমাকে বেশ্যা নারীর সমকক্ষই ধরা হতো। ‘এতো রাতে যখন ফিরছে, না জানি কোন কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছে!’ সরি, আমি সবার সামনে এ কথাগুলো বলছি। আপনারা সবাই অ্যাডাল্ট, তাই কথাগুলো বলাই যায়। আমার কন্যাকে যখন জন্ম দিলাম, আমি ভাবলাম অন্তত তার পরিসরটা যেনো ব্যাপৃত হয়। রীনা ব্রাউন-এ সে কিন্তু অভিনয় করেছে। ছোটোবেলা থেকেই ওকে আমি দিয়ে দিয়েছিলাম ফারুকীর (মোস্তফা সরয়ার ফারুকী) হাতে। ফারুকীই এসে চেয়ে নিয়েছিলো, ও বলেছিলো যে, শামীম আপা তোমার সন্তান দুটোকে আমাকে দিয়ে দাও। ওদের নিয়ে চলচ্চিত্র করেছে প্রত্যাবর্তন নামে। ওরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমার এক মেয়ের নাম প্রমা, ও দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রের সঙ্গে ছিলো। বিয়ে হয়ে গেছে ওর। বিয়ের জন্য যে চলচ্চিত্র ছেড়েছে বিষয়টা এমন নয়, ওর শ্বাশুড়ি এখনো ওকে বলে, প্লিজ তুমি আবার অভিনয়ে ফিরে যাও। তো আমি যেটা বলতে চাই, অল ইজ নট ওয়েল। আমি বলবো না যে সবকিছু খুব মধুর। এর পরেও নাই নাই করেও কিন্তু আমাদের অনেকগুলো পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন কোন কোন ক্ষেত্রে? এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি নারীর অবস্থানগত একটা বদল হয়েছে। সে এখন অনেক কিছু চাইতে পারে, বলতে পারে অকপটে। এবং পুরুষ সেটায় সহযোগিতা করার চেষ্টা করে। সে অন্তত এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করে সেও ভালো পুরুষ। এই জায়গাটা এখন এসে দাঁড়িয়েছে। আমি বলবো, বর্তমানে ইন্টেলেকচুয়াল একটা এক্সারসাইজ হচ্ছে নারী ইস্যুগুলোকে নিয়ে। আবার চলচ্চিত্রে যারা আসছেন, আমরা দেখছি তারাও চেষ্টা করছে তাদের মতো করে। নারী ইস্যু নিয়ে কিন্তু রুবাইয়াত (রুবাইয়াত হোসেন) ভালো ভালো চলচ্চিত্র করছে। এগুলা দেখে খুব উৎসাহ বোধ করি। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, তারপরে নূরুল আলম আতিক কাজ করেছে। আমরা অনেকের ক্ষেত্রে দেখছি, নারী বদলে যাচ্ছে। আমরা জানি, সবকিছু নিয়েই তো চলচ্চিত্র। সুতরাং ওই ক্ষেত্রগুলোতে যদি বদল ঘটে থাকে, নাই নাই করেও অনেক হচ্ছে কিন্তু। আমরা যতোটা চর্চা ফেইসবুক নিয়ে করি, লিখতে অতোটা ভালোবাসি না। এই বিষয়টা কিন্তু খুবই দুঃখজনক। তখন লেখাটা ছিলো পেশা নয়, যেনো নেশা। ঠিক চলচ্চিত্র করার নেশা যেমন মাথায় একবার চেপে বসলে আর ছাড়ে না। নাই নাই করেও তো ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ আছে। ওরা ডেকেছে বলে আমি বলছি না। এই চর্চাটা খুব জরুরি। আজকে এটা বুঝবো না, বেশকিছু সময় অতিবাহিত হলে ঠিকই বুঝবো এটা কতোটা জরুরি।
আমি বিভিন্ন জায়গায় চলচ্চিত্র পড়াই। যেমন, বি সি টি আই (বাংলাদেশ সিনেমা অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট) এ আছি। ডিরেকশন, নান্দনিকতা এগুলো নিয়ে সেখানে পড়াই। শহিদুল আলমের ‘পাঠশালা’তে পড়াই। এখন অবশ্য সেটা একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলে গেছে এবং একটা পি জি ডি (পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা) কোর্স ওরা ইন্ট্রোডিউস করেছে। ওখানেও ডিরেকশন, ফিল্ম মেকিং এগুলো পড়িয়ে থাকি। এছাড়া বি ইউ পি’তে (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল) আমাকে পড়াতে হয় স্ক্রিপ্টটিং। বিভিন্ন জায়গাতে পড়াতে গিয়ে যে বিষয়টা দেখছি, মেয়েরা সে অনুপাতে চলচ্চিত্রে আসছে না। এ বিষয়টা আমাকে খুব হতাশ করে। আমি কিন্তু চাইছি আরো রুবাইয়াত হয়ে উঠুক। ওরা আরো অনেকে আসুক। এই ইন্ডাস্ট্রিটা কিন্তু ব্যাপকভাবে ঘুরে দাঁড়াবে। সেখানে নানা ক্ষেত্রে মেয়েদের আসা দরকার।
(চলবে)
shameemakhtar18@gmail.com
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন