ইব্রাহীম খলিল
প্রকাশিত ০২ অক্টোবর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
প্রশ্ন তুলতে গিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ‘ফর সামা’
ইব্রাহীম খলিল

ঘটনার আগের ঘটনা
ঘটনাটি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের। বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে তিন বছরের এক সিরিয় শিশু বলেছিলো, ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেবো।’ অসম্ভব অভিমান নিয়ে মরে যাওয়া ওই শিশু ঈশ্বরকে কী বলেছিলো জানি না। কিন্তু সে কী বলতে চেয়েছিলো তা সবারই অনুমেয়। জীবন বাঁচাতে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে তুরস্কের উপকূলের সৈকতে উপুড় হয়ে পড়েছিলো আরেক সিরিয় শরণার্থী শিশু আয়লান কুর্দির লাশ। যুদ্ধের শিকার হয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া তার নিথর দেহের ছবিও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। তারপর আলেপ্পোর ছোট্ট ওমরান দাকনিশের নিজের রক্ত দেখে হচকচিত হওয়া মর্মস্পর্শী ভিডিও নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। কিন্তু এসবের প্রতিক্রিয়ার স্থায়িত্ব ছিলো ক্ষণস্থায়ী। কারণ যারা এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত তারা সবাই মহাপরাক্রমশালী। তাদের সবারই আছে নির্দিষ্ট স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য; আছে প্রচার-প্রোপাগান্ডা চালানো এবং তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। ফলে ঘটনা যেটাই ঘটুক সেটা কোনোভাবেই সিরিয়ার পরিস্থিতি পরিবর্তনে এতোটুকু কাজে আসেনি।
২০১১ খ্রিস্টাব্দের ‘ব্যর্থ’ আরব বসন্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে তছনছ করে ফেলেছে। লাখ লাখ মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি শরণার্থী বানিয়েছে কোটির বেশি মানুষকে। ক্ষুধার কষ্টে জীবনযাপন করতে হচ্ছে প্রতিটি মুহূর্ত; আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম তো আছেই। মধ্যপ্রাচ্যের কথিত এ আরব বসন্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশ সিরিয়া, লিবিয়া ও ইয়েমেন। যার জের এখনো বিরাজমান। তবে এ প্রবন্ধ কেবলই সিরিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধ কেন্দ্র আলেপ্পো নিয়ে। যার নিয়ন্ত্রণ গত নয় বছরে কখনো পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠী, কখনো আই এস, আবার কখনো সরকারি বাহিনীর হাতে হাত বদল হয়েছে। ফলে নানা সময়ে আলেপ্পো নিয়ে বিচিত্র নৃশংস ঘটনা শোনা গেলেও সেখানকার প্রকৃত তথ্য জানা ছিলো একেবারেই দুরূহ। সম্প্রতি এই আলেপ্পোর ওপরই নির্মাণ হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র ফর সামা (২০১৯)। সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে এ ধরনের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ একেবারেই বিরল। ফলে প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে সত্য-বাস্তবতার নিরীক্ষে ফর সামাকে জানা এবং সিরিয়া নিয়ে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে একটু আগ্রহও আছে বৈকি।
ওয়াদ ও ফর সামা
ফর সামা প্রামাণ্যচিত্রটি নিজের সন্তানের প্রতি একজন মায়ের চিঠি। মা ওয়াদ আল কাতিব আলেপ্পোতে ঠিক কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, সেটা নিজের বর্ণনায় ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। যাতে তার মেয়ে সামা একদিন এসব দেখে আঁচ করতে পারে তার বাবা-মা তাকে নিয়ে কতোটা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে এবং সিরিয়ার পরিস্থিতিইবা কী ছিলো। ওয়াদ পেশায় একজন সাংবাদিক। পশ্চিমা বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে তিনি যুক্ত। সিরিয়ায় আরব বসন্তের প্রভাবে আন্দোলন শুরু হবার এক বছর পর তিনি আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন। তখন তার বয়স ১৮ বছর। এর পর তিনি আর কখনো বাড়িতে ফিরতে পারেননি। ততোদিনে পুরো আলেপ্পো সরকার বিদ্রোহীরা দখলে নিলে তিনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। প্রামাণ্যচিত্রের শুরুতে তিনি বলেন, ‘২০১২ খ্রিস্টাব্দে বাড়ি ছাড়ার আগে আমার বাবা-মা প্রায় বলতেন, আমি উদ্ধত, এমনকি বেপরোয়া। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা কী বোঝাতে চাইতেন সেটা আমি কখনো বুঝিনি, যতোক্ষণ না পর্যন্ত আমার মেয়ে জন্ম নিলো। আর সেটা হলে তুমি; সামা।’
এরপর ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ এপ্রিল সকাল থেকে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আলেপ্পোতে তিনি উল্লেখযোগ্য যতো ধরনের ঘটনার মধ্য দিয়ে গিয়েছেন সবকিছু ধারণ করা দৃশ্যের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন। শুরুতে আলেপ্পো বিশ্ববিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কীভাবে সহিংসতায় রূপ নিলো; কীভাবে সরকারি বাহিনী কয়েকশো মানুষকে রাতের আঁধারে হাত-পা বেঁধে মাথায় গুলি করে মরদেহ নদীতে ফেলে দিলো; কীভাবে এমন পরিস্থিতির মধ্যে স্থানীয় চিকিৎসক হামজা আল কাতিবের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং প্রথম সন্তানের জন্ম দিলেন; এইসব দৃশ্যই ফর সামাতে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে আলেপ্পোর নারী ও শিশুরা কতোটা অনিরাপদভাবে অবস্থান করছে, শিশুরা কতোটা নিষ্ঠুরভাবে বাবা-মায়ের চোখের সামনে বোমার আঘাতে মৃত্যুবরণ করছে, কীভাবে সরকারি বাহিনীর বোমার আঘাতে একের পর এক হাসপাতালগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিণত হচ্ছে, সবকিছুরই বিশদ বর্ণনা করেছেন ওয়াদ। অবশেষে সরকারের অবরোধের মুখে কীভাবে প্রিয় ভূমি আলেপ্পো ছেড়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন সেই দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমেই শেষ হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র ফর সামা।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রামাণ্যচিত্রটির সব দৃশ্য ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের সময়কাল পর্যন্ত ধারণ করা হলেও এটি নির্মাণ করে মুক্তি দেওয়া হয়েছে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে। ফলে ওয়াদের ধারণ করা ফুটেজ সংযোজন করে পরে চিঠি আকারে চিত্রনাট্যে রূপ দেওয়া হয়েছে সেটা স্পষ্ট। প্রামাণ্যচিত্রটি দর্শকের জন্য উন্মুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য পরিচিত ফ্রন্টলাইন। যারা সাধারণত বিভিন্ন অনুসন্ধানমূলক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ও সম্প্রচার করে থাকে। তারাই মূলত প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের দাবিদার। ওয়াদের পাশাপাশি খ্যাতনামা প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা অ্যাডওয়ার্ড ওয়াটস প্রামাণ্যচিত্রটির অন্যতম পরিচালক। অর্থায়ন ও প্রযোজনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের খ্যাতনামা মোট ১০টি প্রতিষ্ঠান। ফর সামা বৃটিশ অ্যাকাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্রের পুরস্কার, বৃটিশ ইন্ডিপেনডেন্ট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসে শ্রেষ্ঠ পরিচালক, শ্রেষ্ঠ বৃটিশ ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম, শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্যচিত্র ও শ্রেষ্ঠ সম্পাদনার পুরস্কারসহ বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছে। এছাড়া ৯২তম অস্কারেও মনোনয়ন পায় ফর সামা।
প্রামাণ্যচিত্র ও সত্য-বাস্তবতা নিরুপণে জটিলতা
সাধারণত যেকোনো প্রামাণ্যচিত্র দেখার আগে দর্শকের হৃদয়জুড়ে কোনো সত্যদর্শনে প্রত্যাশা থাকে। কারণ নির্মাতা সেটি একটি সত্য উন্মোচনের অংশ হিসেবে নির্মাণ করেন বলেই ধারণা করা হয়। যদিও সত্য একেবারেই আপেক্ষিক, তারপরও সেটা নিয়ে দর্শক-মনে যাতে কোনো ধরনের সন্দেহের উদয় না হয় সেজন্য নির্মাতা নানাধরনের তথ্য ও চিত্রের আশ্রয় নেয়। আবার একজন প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা যে সত্য অনুসন্ধান করে বা যা সত্য বলে জানে এবং জানাতে চায় তার বাইরের কোনো সত্যকে তার প্রাম্যাণ্যচিত্রে ধারণ সম্ভব কি না সেটাও ভাবার বিষয়। যদি কোনো প্রামাণ্যচিত্র তেমনটি করেও ফেলে তাহলে সেটা ওই প্রামাণ্যচিত্রের বাই-প্রোডাক্ট, মূল উপস্থাপনা নয়!১
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডের একাংশ দখলে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। কিছুদিন পর আত্মসমর্পণ করা ২২ হাজার চারশো ৩৬ জন পোলিশ সৈন্যকে মাত্র কয়েকদিনে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে রাশিয়ান সশস্ত্র বাহিনী। ঘটনাটি ভিন্ন দিকে ঘোরাতে তাদেরকে হত্যা করা হয় জার্মানির তৈরি ‘ওয়ালথার পিপি’ পিস্তল দিয়ে। রাশিয়ান গুপ্ত পুলিশের চিফ এক্সিকিউশনার ভাসিলি মিখাইলোভিচ ব্লোখিন একাই গুলি করে ছয় হাজার পোলিশ সৈন্যকে হত্যা করেছিলেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কিছু পোলিশ রেলশ্রমিক কাতিন গণকবর আবিষ্কার করলেও বিষয়টি ধামাচাপা দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। এর পরের বছর কাতিন জার্মানির দখলে চলে গেলে তারাই ওই গণকবর আবিষ্কার করে। একই সঙ্গে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে জার্মানি একটি কমিশন গঠন করে। এ কমিশনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে, কাতিন তখন ছিলো সোভিয়েত দখলে। ফলে সবাই একমত হয় এই ঘটনার জন্য দায়ী সোভিয়েত। এ নিয়ে জার্মানি একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে ব্যাপকভাবে প্রচারও করে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তা অস্বীকার করে।২
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর, কাতিন আবার সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে চলে গেলে পুরো ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে তারাও তদন্ত কমিটি গঠন করে। তাদের গঠিত তদন্ত কমিটি জানায়, এ গণহত্যা জার্মানির কাজ এবং সেটি ঘটেছে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে। শুধু তাই নয়, তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে জার্মানিরই ‘ওয়ালথার পিপি’ পিস্তল দিয়ে। পাশাপাশি মৃতদেহ উত্তোলন করে, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য নিয়ে তারাও একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে ব্যাপকভাবে প্রচার করে।
এখানে প্রামাণ্যচিত্রে দুই পক্ষের সত্যই বাস্তবতার উপাত্তে নির্মিত এবং এসব কিছুই এক কথায় সুনির্মিত। যেখানে প্রতিটি সত্যে নির্মাতার নিজস্ব সত্যের পক্ষপাতিত্ব কাজ করেছে। যে পক্ষপাতিত্ব দর্শককে প্রভাবিত করার পাশাপাশি প্রোপাগান্ডাও চালিয়েছে। সত্যের ক্ষেত্রে প্রামাণ্যচিত্রের এটি একটি গড়পড়তা সমস্যা।৩ তবে ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে ১৫টি রাষ্ট্রের জন্ম হলে ফের আলোচনায় আসে কাতিন হত্যাকাণ্ড। অবশেষে সোভিয়েত ইউনিয়ন ওই বছরই প্রথমবারের মতো স্বীকার করে, কাতিন হত্যাকাণ্ডের জন্য তারাই দায়ী!৪ ফলে জার্মানি আপাতদৃষ্টিতে সত্য জানালেও সেটা কিন্তু ওই প্রামাণ্যচিত্রের বাই-প্রোডাক্ট, মোটেই মূল উপস্থাপনা নয়। কারণ সাধারণ মানুষ যেটা ধারণা করেছে তারাও সেটার বাইরে কিছু জানাতে পারেনি। তারা কেবল নিজেরা হত্যা করেনি এটার স্বপক্ষেই নানা তথ্য উপস্থাপন করে ওই প্রামাণ্যচিত্র প্রতিষ্ঠিত করছে। ফলে কোনো কিছু প্রমাণ করা বা প্রামাণ্যকরণের ভিতর যে এক ধরনের অসৃষ্টিশীলতার গন্ধ থাকে, সেটা তাদের উভয়ের প্রামাণ্যচিত্রেই পাওয়া যায়।
আসলে বাস্তবের নানাধরনের চিত্রায়ণের ভিতর দিয়ে নির্মাতা দর্শকের জন্য যা হাজির করে তা শেষ পর্যন্ত নির্মাতার নিজস্ব ভাষ্য বা নিজস্ব সত্য। কারণ বাস্তবতা নিঃন্দেহে ব্যক্তি নিরপেক্ষ একটি ভৌত বিষয়, একই সঙ্গে সত্যও আপেক্ষিক।৫ প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে কি প্রামাণ্যচিত্রের ক্ষেত্রে সত্যের সন্ধান পাওয়া আসলেই ইউটোপিয়া? একান্ত নিজস্ব মতামত, হ্যাঁ। প্রকৃত সত্য বলে কিছু হয় না। তবে সত্য থাকুক আর না থাকুক বাস্তবতার একটি ত্রিমাত্রিকতা থাকে। যেটা প্রকৃত বা অবিমিশ্র সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একই সঙ্গে নির্মাতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ফলে ফর সামায় নির্মাতার চিত্রায়িত সত্যের সঙ্গে বাস্তবতার সঙ্গতি কতোখানি সেটা আমরা মিলিয়ে দেখতে পারি।
মানুষ মারার গল্প বলে ফর সামা
যেকোনো সশস্ত্র যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী ও শিশুরা। ফর সামাতে সেটাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে। কখনো বাবা-মায়ের সঙ্গে বাড়িতে সময় কাটানোর সময়, কখনো সমবয়সিদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে চোখের সামনে বোমার আঘাতে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। এসব শিশুকে নিরাপদে কোথাও রাখা যায় এমন জায়গাও যেনো আলেপ্পোতে নেই। মুহুর্মুহু চলছে সিরিয়ার পক্ষে রাশিয়ার বিমান হামলা। অনেক শিশুর বাবা-মা বেঁচে নেই, কারো একমাত্র ভাই/বোনটিও নিহত হয়েছে। বেঁচে থাকা মায়ের একমাত্র অবলম্বন যখন তার ছোট্ট সন্তানটি চোখের সামনে মারা যায়, তখন তার পরিস্থিতি কেমন হয় সেই আবেগকেও তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন ওয়াদ। এখানকার অনেক শিশুই জানে না, অবরোধ কী, বোমা হামলা কী। ফলে একে একে যখন নিজেদের খেলার সাথি হারাতে থাকে, সেটা যেনো তাদের কাছে আরো অসহনীয় হয়ে ওঠে।
ওয়াদ ও তার স্বামী হামজার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আফরা ও সেলিম দম্পতি। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড়ো ছেলে উসাইম কাগজ দিয়ে হারানো বন্ধুদের ছবি বানায়; সেগুলোর উপর হাত বুলিয়ে আনমনে কথা বলে। এসব বন্ধুদের কেউ আলেপ্পো ছেড়ে গেছে, কেউ বোমার আঘাতে মারা গেছে। বন্ধুদের ছেড়ে যাওয়ার যে কষ্ট সে সম্পর্কে উসাইম বলেন, ‘আমি আমার সব বন্ধুদের ভীষণ অনুভব করি। ... আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি আমাকে এখানে একাকী ছেড়ে যাওয়ার জন্য তিনি যাতে তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।’ অন্যদিকে সেলিমের ছোটো মেয়ে নায়া এখনো জানে না বোমা হামলা কী। ফলে সে যাতে বোমার শব্দে ভয় না পায় সেজন্য কোনো বোমার শব্দ হলেই মেয়েকে খিলখিল করে হাসতে শেখান। মেয়েও বোমা পড়ার শব্দ পেয়ে বাবার সঙ্গে হেসে ‘পটকা ফোটার’ আনন্দ উদ্যাপন করে।
টানা পাঁচ মাসের বেশি অবরোধ আর বোমা হামলায় আলেপ্পোর জনজীবনের দুর্দশার অসংখ্য সংবাদ বিশ্বজুড়ে প্রকাশ হয়েছে। সেগুলো নিয়ে অনেক মানবিকধর্মী লেখা, ছবি, ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু তার মাধ্যমে সেখানকার প্রকৃত পরিস্থিতি অনুভব করা বরাবরের মতোই সহানুভূতির পর্যায়ে। কিন্তু ফর সামার দৃশ্য ক্ষণিকের জন্য হলেও হৃদয়ে তাদের জন্য সমানুভূতি তৈরি করে। অবরোধের মধ্যে দীর্ঘদিন সবজি চোখে না দেখা আফরাকে যখন তার স্বামী সেলিম একটি টমেটো এনে দেন তখন মনে হয় তিনি যেনো চাঁদ হাতে পেয়েছেন। একের পর এক হাসপাতালে বোমা নিক্ষেপের পর যখন নয়টি হাসপাতালের শেষ হাসপাতালটিও বোমার আঘাতে ধ্বংস করে দেওয়া হয় তখন অসুস্থ সিরিয়দের জন্য মন হাহাকার করে ওঠে। অদম্য নবীন চিকিৎসক হামজার নেতৃত্বে যখন ফের পরিত্যক্ত ভবনে হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়, তাদের চোখেমুখে তখন মানুষকে বাঁচানোর আনন্দ খেলা করে। আসাদের বিরোধীতা করায় ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা কয়েকশো নিরীহ মানুষের মৃতদেহ যখন একে একে নদী থেকে মাছ ধরার মতো ওঠানো হয়, তখন একজন স্বৈরাচার শাসকের আসল রূপ দেখতে পাওয়া যায়। ফলে প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে ফর সামায় যেসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বাস্তবতার ভিত্তিতে সেগুলো সত্য বলেই বোধ হয়।
তবে প্রামাণ্যচিত্রের ৪৩ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে বোমায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি স্কুলবাসে শিশুরা যখন রঙ করে, ওয়াদ তখন সেলিমের ছোটো মেয়ে নায়াকে প্রশ্ন করেন, স্কুলবাসটি কীভাবে পুড়ে গেছে? নায়া উত্তর দেয়, বোমার আঘাতে। তাকে ফের প্রশ্ন করা হয়, এটা কোন ধরনের বোমার আঘাতে হয়েছে? তখন সে উত্তর দেয় ক্লাস্টার বোমা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে শিশু বোমা কি জিনিস বোঝে না, যাকে বোমার শব্দকে পটকা মনে করে বাবা হাসতে শেখান, এতোটুকু বয়সের একটি শিশুর পক্ষে সেটা কোন বোমায় ধ্বংস হয়েছে সেটা বলা কি সম্ভব? আসলে আলেপ্পোর দখলে থাকা বিদ্রোহীরা অবরোধের শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছিলো সেখানে ক্লাস্টারসহ সবধরনের বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কিন্তু আসাদ সরকার সে অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করে আসছে। ফলে একটি শিশুর মুখ থেকে ক্লাস্টার বোমা ফেলার কথা বলানোর মাধ্যমে তিনি ঠিক কি বার্তা দিতে চান সেটা স্পষ্ট। তারপরও এ দৃশ্য প্রামাণ্যচিত্রের সত্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কি না সেটা একটু অন্তরালেই থাক।
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ
পুরো প্রামাণ্যচিত্রে বিধ্বস্ত আলেপ্পো শহর দেখানো হয়েছে। দেখানো হয়েছে মুহুর্মুহু চলা বোমা হামলার দৃশ্যও। একই সঙ্গে বলা হয়েছে এসব বোমা হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া এবং তাদেরকে সহায়তা করছে সিরিয় বাহিনী ও তার মিত্ররা। এর বাইরে ওয়াদ তার মেয়েকে আর কোনো দেশের কথাই বলেননি। এসব দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধে কেবল আসাদ সরকার ও বিদ্রোহী জনগণের মধ্যেই হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে সেটা মনে হলেও এ লড়াই মোটেও আসাদ সরকার ও তার জনগণের মধ্যকার লড়াই নয়। বিষয়টি পরিষ্কার হতে একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে তিউনিশিয়ায় কথিত আরব বসন্ত শুরু হলে আস্তে আস্তে সেটা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে দীর্ঘদিন বংশ পরম্পরায় ক্ষমতায় থাকা বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিক্ষোভ শুরু করে সরকার বিরোধীরা।
২০১২ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে সিরিয়ায় সরকার বিদ্রোহীরা (সুন্নি মতাবলম্বী) সশস্ত্র হয়ে ওঠে। নিজেদের নাম দেয় ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। ইরান ও রাশিয়ার মিত্র হিসেবে পরিচিত আসাদকে সরাতে বিদ্রোহীদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করতে থাকে প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইসরায়েল। সঙ্গে শিয়াবিরোধী সৌদি আরবও তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ইরানের প্রভাব কমাতে। যুক্তরাষ্ট্র এ সময় বিদ্রোহীদের পিছনে প্রায় ৫০ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করে। এছাড়া শুধু বৃটেন কমপক্ষে ৭০ হাজার বিদ্রোহীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।৬ শুধু তাই নয়, ভূ-রাজনৈতিক কারণে এ সময় ইসরায়েল, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদে আই এস নামে একটি সশস্ত্র দল (যদিও বর্তমানে আই এস সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃত) গঠনেরও অভিযোগ উঠেছে। যারা মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সিরিয়া ও ইরাকে (ইরাকে যে সরকার ক্ষমতাসীন তা ইরান সমর্থিত) তাণ্ডব শুরু করে একের পর এক বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিজেদের খেলাফত ঘোষণা শুরু করে। একপর্যায়ে সিরিয়ার আলেপ্পো শহরও তারা দখলে নেয়। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় আল কায়েদাও। ঠিক সেই সময় আই এস দমনের অজুহাতে সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনী প্রবেশ করে। যাদের প্রধান লক্ষ্য আসলে সিরিয়ার তেল চুরি করে নিজেদের দেশে পাচার করা এবং আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাহায্য করা।
মার্কিন বাহিনীর সহায়তায় বিদ্রোহীরা ও আই এস যখন সিরিয়া দখল করতে থাকে, ঠিক তখনই আসাদের দীর্ঘদিনের মিত্র ইরান ও রাশিয়া এগিয়ে আসে। বলা বাহুল্য এরই মধ্যে রাশিয়ার বিমান হামলা ও ইরানের স্থল সেনাদের সহায়তায় অনেক এলাকা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয় সিরিয় সেনাবাহিনী। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তারা বিভিন্ন এলাকার পর যখন আলেপ্পো পুনরুদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসে, তখন পশ্চিমাদের সাহায্যে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলে বিদ্রোহীরা। একপর্যায়ে পুরো আলেপ্পো দীর্ঘ পাঁচ মাসের বেশি সময় অবরোধ করে রাখার পাশাপাশি রাশিয়ার সহায়তায় বিমান হামলা চালায় সিরিয় বাহিনী। আর ঠিক সেই সময়কালের পরিস্থিতিই নিজের প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরেছেন ওয়াদ।
ইরান, সিরিয়া ও রাশিয়া বরাবরই দাবি করে এসেছে বিদ্রোহীদের ওপর নয় তারা আই এস ও আল কায়েদার সন্ত্রাসীর ওপর হামলা চালাচ্ছে। তবে ওয়াদের প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, আসলে সাধারণ মানুষের ওপরই হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু আলেপ্পো শহর যে আই এস দখলে নিয়েছিলো এবং তারাও যে সেখানে তাণ্ডব চালিয়েছে সে বিষয়ে কোনো কথা বলেননি ওয়াদ। ফলে তারা সেখানে আছে কি নেই সে বিষয়েও ফর সামাতে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তার মানে তিনি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন আই এস-এর কোনো উপস্থিতি সেখানে নেই এবং কখনো ছিলোও না। কিন্তু বিশ্বের নানা গণমাধ্যম আলেপ্পোতে যেখানে আই এস-এর উপস্থিতির কথা জানিয়েছে, আই এস-ও স্বয়ং যেখানে আলেপ্পোর অসংখ্য কার্যক্রমের ভিডিও প্রকাশ করে নিজেদের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ ও নৃশংসতার কথা জানিয়েছে, ফর সামাতে তাদেরকে নিয়ে কোনো তথ্য না থাকায় মনে খটকা লাগে। অথচ ওয়াদরা আলেপ্পো ছাড়ার কয়েক মাস পরও আই এস যোদ্ধারা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে সেখানে যুদ্ধ করেছে।৭ একপর্যায়ে উপায়ন্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত আলেপ্পোর এসব আই এস যোদ্ধারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
ফলে নির্মাতার এভাবে সত্য এড়িয়ে যাওয়া উদ্দেশ্যমূলক বলেই মনে হয়। যেখানে বাস্তবের সঙ্গে তার নির্মিত সত্যের কোনো মিল পাওয়া যায় না। আসলে সিরিয়ার বিদ্রোহী ও আই এস যোদ্ধারা উভয়েই সুন্নি মতাবলম্বী। ফলে সুন্নি ব্যতীত অন্যদের ওপর হাজারো নৃশংসতা চালালেও ‘আদর্শিক’ কারণেই এখানে আই এস-এর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে কি না সে সন্দেহ থেকেই যায়। একই সঙ্গে সত্য-বাস্তবতার নিরীক্ষে ফর সামাকে যদি কেউ প্রোপাগ্রান্ডার মাধ্যম বলেও অভিযোগ করে তাহলেও তার উত্তর দেওয়া ভার। তবে প্রামাণ্যচিত্রে হয়তো এভাবে সত্যকে পুনর্বিবেচনা করা অনেকের কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু নির্মাতা কেনো সত্যকে এড়িয়ে গেছেন বা মিথ্যার সৃজনশীল বিস্তার করেছেন, সেটা বিবেচনার দাবি রাখে।
শাকের ভিতর মাছ নয়, সত্যের উকিঁঝুঁকি
প্রামাণ্যচিত্রের ২৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে দেখানো হয়, ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১৮ মার্চ রাতে বিদ্রোহীরা আতশবাজি ফুটিয়ে আনন্দ মিছিল করছে। ওয়াদ জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তারা আলেপ্পোতে যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলো। এ মিছিল ওই নিশ্চয়তা অনুভবেরই একটি মুহূর্ত। কিন্তু কীভাবে নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি এলাকা জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটা তিনি বলেননি। আসলে ২০১২ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে আলেপ্পো থেকে সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলে বিদ্রোহীরা। কিন্তু তারা নিজেদেরকে কীভাবে ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করলো কিংবা বিভিন্ন মিছিলে ভারী অস্ত্র হাতে মিছিল করা ব্যক্তিরা কারা, সেটার উত্তরও ফর সামাতে মেলে না।
প্রামাণ্যচিত্রের ৫১ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে দেখানো হয়, ওয়াদ পরিবার সড়ক পথে তুরস্ক থেকে আলেপ্পোতে ফিরছেন। ওয়াদ বলেন, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে তারা তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া অসুস্থ বাবাকে দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে কয়েকদিন থাকার পর জানতে পারেন সিরিয় বাহিনী আলেপ্পোতে প্রবেশের শেষ রাস্তাটিও দখলে নিয়েছে। এমতাবস্থায় তারা যেকোনোভাবে আলেপ্পোতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ সেখানে তাদের সহযোগীরা রয়েছে, যারা একসঙ্গে স্বপ্ন দেখছে আলেপ্পো স্বাধীনের। কিন্তু তারা কখন কীভাবে তুরস্কে যায় সেটা প্রামাণ্যচিত্রে দেখানো হয় না। তারা আলেপ্পোতে ফেরার সময় তাদের গাড়িতে একটি ওয়াকিটকি দেখা যায়। রাশিয়ার বিমান কোথায় আছে, সিরিয় সেনারা ঠিক কোথায় অবস্থান করছে সবকিছুই ওই ওয়াকিটকি থেকে শোনা যায়। পরের দৃশ্যেই দেখা যায়, সামনের সিটের পিছনে একটি একে-৪৭ রাইফেলের বাট! নিজেদের গাড়ির ভিতরে কেনো এ অস্ত্র, সেই ব্যাখ্যা দেন না ওয়াদ। গাড়ি থেকে নামার সময় ওই অস্ত্র হামজাকেই সরাতে দেখা যায়। সন্ধ্যায় যখন সিরিয় বাহিনীকে এড়িয়ে হাঁটা পথে তারা আলেপ্পোর দিকে আসে, তখন তাদের সঙ্গে আরো কয়েকজনকে দেখা যায়। ওয়াদ জানান, হাসপাতালের কয়েক কর্মী তাদেরকে এগিয়ে নিতে এসেছে। কিন্তু হাসপাতালের কর্মীদের কাছে কেনো ভারী অস্ত্র, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেন না। সবমিলিয়ে ওয়াদ ও হামজাকে নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।
আলেপ্পোতে সিরিয় সরকার অবরোধের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে ক্লোরিন গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে। হাসপাতালে কীভাবে শিশুসহ বড়োরা ওই গ্যাসের কারণে দুর্ভোগে ভুগছে সেসব দেখাতে থাকেন ওয়াদ। এর মধ্যেই প্রামাণ্যচিত্রের এক ঘণ্টা ছয় মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে হামজা সম্পর্কে ওয়াদ তার মেয়ে সামার উদ্দেশে বলেন, তোমার বাবা সবসময়ই বিভিন্ন নিউজ চ্যনেলের সঙ্গে আলেপ্পো পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো দেশই এ হামলা ঠেকাতে কিছুই করেনি।
একপর্যায়ে দেখা যায়, জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা হামজার সঙ্গে স্কাইপে কথা বলছে। পরে হামজার সঙ্গে সমন্বয় করে আলেপ্পো থেকে সাধারণ মানুষকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ দিতে তারা রাশিয়াকে রাজি করিয়েছে। ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রাশিয়া সেখানে কোনো হামলা করবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অবশেষে সাধারণ মানুষকে নিয়ে আলেপ্পো ছাড়ে হামজা-ওয়াদ দম্পতি। আর ঠিক তখনই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়। হামজা চিকিৎসক হলেও তিনি আসলে ফ্রি সিরিয়ান আর্মির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ফলে জাতিসংঘ তার সঙ্গেই কথা বলে এবং সেটা কার্যকরও হয়। শুধু তাই নয়, হামজা চিকিৎসক পরিচয়ে বিদেশি গণমাধ্যমকে আলেপ্পো বিষয়ে সারাক্ষণ খবরাখবর দিয়েছেন, তিনি গণমাধ্যমের একজন পরিচিত মুখ। আর সিরিয় বাহিনীর চেকপোস্ট তাকে সহজেই চিনে ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হওয়ায় এবং জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণেই সেখান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে তার কোনো সমস্যা হয় না। বরং চেকপোস্ট পেরোনোর সময় তারা যে পরিস্থিতির অবতারণা করে সেটাকেই অস্বাভাবিক মনে হয়। সবমিলিয়ে একজন প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতার সত্যে পৌঁছানোর যে প্রধান লক্ষ্য থাকে এবং দর্শক হিসেবে সত্য দর্শনের যে প্রত্যাশা থাকে সেটাতে ছেদ পড়ে।
একপাক্ষিক বয়ানের আরো কিছু কারণ অনুসন্ধান
পুরো প্রামাণ্যচিত্র দেখে আপাতদৃষ্টিতে এখানে কোনো অসত্য তথ্য থাকতে পারে সে সিদ্ধান্তে আসা একটু কষ্টকরই বটে। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মেলালে শেষ বিচারে এটি একটি একপাক্ষিক প্রামাণ্যচিত্র বলেই মনে হয়। সত্য ও বাস্তবতার একেবারে কাছে থেকেও ওয়াদ নির্মিত সত্য প্রশ্নবিদ্ধ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রে তিনি কেনো সত্যকে এড়িয়ে যাবার এমন সৃজনশীল কাজ করেছেন সেটার কারণ খোঁজা জরুরি। তবে প্রামাণ্যচিত্রে সত্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান সীমাবদ্ধতা নির্মাতার নিজস্ব সত্য। মনে রাখতে হবে, ফর সামার কোনো দৃশ্যে তিনি কোনো অসত্য তথ্য দেননি। কিন্তু তিনি অত্যন্ত কৌশলে সত্যকে গোপন করেছেন। এর প্রধান কারণ আসলে নিজেদের মতাদর্শ। কারণ তারা নিজেরাই সরকার বিদ্রোহীদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ফলে তারা সেটা স্বীকার করে নিলে নানাধরনের প্রশ্ন সামনে চলে আসে। আলেপ্পোতে আই এস-এর প্রসঙ্গে কথা বললে তারা কীভাবে জঙ্গিদের সঙ্গে সমঝোতা করে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তবে প্রামাণ্যচিত্র সত্য থেকে দূরে সরে যাবার পিছনে অন্য গুরুত্বপূর্ণ আরো যেসব কারণ আছে সেগুলো হলো, প্রজেক্টের ধারণা, তহবিল, গবেষণা, ভিজ্যুয়াল রিয়েলাইজেশন এবং আবেগজাত সাবজেক্টিজম।৮ ফর সামাতে এ সবগুলো কারণই কাজ করেছে বলে মনে হয়েছে। কারণ ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে ওয়াদ-হামজা দম্পতি আলেপ্পো ছেড়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর তারা এ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করে। যার প্রযোজনা করেছে ১০টি প্রতিষ্ঠান। যেগুলোর সবগুলোই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা প্রযোজনা ও সাহায্যকারী প্রতিষ্ঠান। ফলে ফর সামায় কেনো সিরিয়া যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ও আলেপ্পোর বিদ্রোহীদের সাহায্য করা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমার কোনো দেশ নিয়ে কোনো কথা নেই সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারে নির্মাতা সত্য বলতে বাধ্য কি না? কিংবা এটা তার জন্য অপরিহার্য কি না? কিন্তু দর্শক হিসেবে সত্য দেখতে চাওয়ার প্রত্যাশা তো থাকতেই পারে। তা না হলে প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে তার নিজস্ব যে বৈশিষ্ট্য সেটা আর থাকে কই?
শেষ বিচার
শেষ করছি সিরিয়ার তিন বছরের সেই শিশুটির কথা দিয়ে। বোমায় ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে মারা যাবার আগে যে বলেছিলো, ‘আমি ঈশ্বরকে সব বলে দেবো।’ ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এই শিশুকে নিয়ে নির্মিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেভ পিন আকা ভাসু পিননামারাজু আই অ্যাম গনা টেল গড এভরিথিং নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে থাকা এ নির্মাতা তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে দেখিয়েছেন দামেস্কের অধিবাসী ওই শিশুটির বাবা-মা-বোনকে অস্ত্রধারী বিদ্রোহীরাই হত্যা করেছে। একই সঙ্গে ওই শিশুকেও তারা বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে না ফেরার দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যমে ‘মিথ্যা’ তথ্য দেওয়ার অভিযোগে পুরো পরিবারকে এভাবে শেষ করে দেওয়া হয়েছিলো।
হাসপাতালে কাতর শিশুটি জানিয়েছিলো, একদিন পিঁপড়াদের নিয়ে খেলার সময় মা তাকে সতর্ক করে বলেছিলো, ‘তুমি যদি পিঁপড়াদের ব্যথা দাও তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ঈশ্বরের কাছে বিচার দেবে।’ ফলে শিশুটি হয়তো এও মনে করেছিলো ওই পিঁপড়াদের ব্যথা দেওয়ার কারণেই ঈশ্বর তাকে এভাবে শাস্তি দিচ্ছে। তবে সে এটাও জানায়, যেভাবে তার বাবা-মা-বোনকে হত্যা করা হয়েছে, তাকেও বোমার আঘাতে জর্জরিত করা হয়েছে এ সবকিছুই সে ঈশ্বররের কাছে বলে দেবে। এ ঘটনা ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে ঘটলেও শিশুটির রক্তাক্ত ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় ২০১৫-তে। যেটা সারাবিশ্বে আলোড়ন তোলে। আলেপ্পোতে ওয়াদ-হামজা দম্পতি তখন নিজেদের যুদ্ধে জয়ী হওয়ার বিশ্বাস নিয়ে প্রায় নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করছে। ওয়াদ নিজে সাংবাদিক হওয়ায় এবং তার কাজের জগৎ ইন্টারনেটনির্ভর হওয়ায়, তিনি নিশ্চয় ওই শিশুর আর্তনাদ শুনেছেন। কিন্তু তার প্রামাণ্যচিত্র থেকে বিদ্রোহীদের কোনো অপরাধের কথা জানা যায় না। ফলে প্রামাণ্যচিত্রে চিঠি আকারে তিনি যেসব তথ্য তার মেয়ে সামা’কে জানিয়েছেন, সেও হয়তো কোনোদিন এসব কথা জানতে পারবে না। প্রশ্ন জাগে, তাহলে রক্তাক্ত ওই শিশুটি ওয়াদের বিরুদ্ধেও কি ঈশ্বরকে সব বলে দেবে? পরে আশ্বস্ত হই, নাম না জানা ওই শিশুটি তো আহত হবার কয়েকদিন পরেই মারা গেছে! সে হয়তো ফর সামা সম্পর্কে ওয়াকিবহালই নয়!
লেখক : ইব্রাহীম খলিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ব্যুরো অব ইকোনোমিক রিসার্চের টোব্যাকো ট্যাক্স প্রজেক্টের প্রকল্প কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
ibrahimrumcj@gmail.com
https://www.facebook.com/ibrahimrumcj
তথ্যসূত্র
১. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ১১০); ‘প্রামাণ্যচিত্র : সত্যবিষয়ক সমস্যা ও কিছু বিবেচনা’; সিনেমা; ফ্ল্যাট ১/বি, বাড়ি ২৮, সড়ক ১৫ (নতুন), ধানমণ্ডি, ঢাকা।
২. মিন্নি, তাসনিয়া; “ভাইদা’র কাতিন : একবিংশ শতকের গণহত্যা নিয়ে ঠাণ্ডা লড়াই”; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ১২, বর্ষ ৭, জানুয়ারি ২০১৭, পৃ. ১৭।
৩. প্রাগুক্ত; হোসেন (২০১০ : ১১১)।
৪. প্রাগুক্ত; মিন্নি (২০১৭ : ১৭)।
৫. প্রাগুক্ত; হোসেন (২০১০ : ১১০)।
6. https://bit.ly/2X16LFb; retrieved on: 20.04.2020
7. https://www.priyo.com/articles/is-is-stucked-in-aleppo-syria-201727; retrieved on: 20.04.2020
৮. প্রাগুক্ত; হোসেন (২০১০ : ১১১)।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন