তানভীর শাওন
প্রকাশিত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রের সিলেবাস পাল্টে দেওয়া এক নির্মাতা মায়া ডেরেন
তানভীর শাওন

ফের যদি চিনে নেওয়া যায়
তার সবিশেষ জুড়ে ধর্মের আঁকশি হয়তো ততোটা গেঁড়ে বসেনি কোনো কালেই। জীবনকে তাড়িয়ে বেড়ানো যে চারটে দশক তার আয়ুরেখা ছুঁয়ে ছিলো তার সবটাতেই তো তিনি ছিলেন বড্ড স্বাধীন। শুধু নিজের অধীনে কিন্তু থাকা নয়, তার থেকেও একটু বেশি। পরাধীন যতো ক্ষেত্র ছিলো তার জ্ঞাত, সবখানেই ক্ষেত্রজ্ঞ হয়ে ছড়াতে চেয়েছেন স্বাধীনতার বীজ। ফলেছেও নানা রকম শস্য। তাইতো যখন দেহ রাখলেন, তখন তা পোড়ানো হলো। তারপর সেই ছাই কিংবা ‘শরীরী মায়া’র ধ্বংসাবশেষ সমুদ্রে ভাসান দেওয়া গেলো না, হলো না পুঁতে ফেলাও। সেই ভস্ম রাখা হলো সূর্য যার পাত-এ প্রথম আলোটুকু বেড়ে দেয়, জাপানের সেই অত্যুচ্চ পর্বত ফুজি-তে। শোনা যায়, একটা বড়ো সময়জুড়ে, সম্ভবত মায়া’র জীবদ্দশার পুরো সময়টাতেই মাউন্ট ফুজি ছিলো নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। কোনো নারী পর্বতারোহী চাইলেই ছুঁতে পারতো না ফুজির পরাঙ্কমুখ আর উদর। যেনো সেজন্যই, মায়া ফুজিতে উঠলেন১, শারীরিক আপ্তকণায় নিজেকে পাল্টে ফেলে; নিজেকে পুড়িয়ে ‘শুদ্ধ’ করলেন; তবুও উঠলেন। গ্রিক পুরাণে মায়া (Maya) হলেন হার্মিসের মা, যিনি পাহাড় ও ক্ষেতের দেবী। তাই পাহাড় যার, তাকে ভূমিদশায় চিরকাল আটকে রাখে কার সাধ্য!
পাহাড়ের দেবীকেই যে সমাজ-সভ্যতা পাহাড়ে চড়তে দেয় না, পুরুষের ফর্দে চলা সেই দুনিয়ায় ওই ‘দেবী’রা তাই হাঁটতে থাকে একটা অপরাধ করে ফেলবার গুরু পাপের সম্ভাবনার সঙ্গে আপস করতে করতে। একপর্যায়ে তাদের পা টলতে থাকে, মাথার কাপড় ঢলে যায়, চুল হাওয়ায় ওড়ে, হাঁটায় অসংযম আসে। এভাবেই তাদের শুধু ‘ভুল’ বেড়ে যায়। আর কিছু ‘চোখ’, আসলে সেগুলো চোখ নয়, চোখের মতো দেখতে একেকটা ‘সাংস্কৃতিক খামির’, তাদের ভুলগুলোকে দেখতে থাকে ক্রোধ ভরে। ময়দার খামির থেকে যেভাবে কারিগর যেমন আকৃতির ইচ্ছে মিস্টান্ন তৈরি করে থাকে, ঠিক তেমনিভাবেই সমাজের এইসব ‘সাংস্কৃতিক খামির’ নারীর চলন-বলন-করণ-সহন-ধরণ কেমন হবে তা মেপেজুখে দেয়, আকৃতি হুবহুত্ব না পেলে অর্থাৎ ভুল বেড়ে গেলে এভাবেই নিষিদ্ধ হতে থাকে একটা করে ফুজি।
কথা হচ্ছে যার জীবনের শেষকৃত্য নিয়ে, জীবনের উদয়াস্তে তিনি পরিচিত ছিলেন মায়া ডেরেন নামে। জীবনের নানা সময়ে নানা রকম গরজে পড়ে যিনি হয়েছিলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা, কবি, শিক্ষক, লেখক, আলোকচিত্রী ও নৃত্যশিল্পী। এতোগুলো পরিচয় ছাড়িয়ে যদিও তিনি অনেকের ভাবনায় রয়ে গেলেন চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে, তবুও এ কথা স্বীকার না করলে চলবে না, তিনি তার অন্য কর্মদশাগুলো থেকে জীবনের শেষ অবধি বিচ্যুত হননি। তবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে তার নাম একাত্ম হওয়ার কারণ রয়েছে অসংখ্য। ‘চলচ্চিত্রে নারী আর নারীর চলচ্চিত্র’--এ রকম কোনো ভাবনাশৈলী মেনে নিয়ে চলচ্চিত্রকে যদি বুঝতে চাই, তবে বোধ হয় মায়াকে বোঝাই সবচেয়ে জরুরি আজকের সময়ে।
একটা বড়ো সময়ব্যাপী অন্যান্য আর্ট ফর্মের যে মহতী’রা চলচ্চিত্রকে দেখেছে আনাড়ি নজরে--যে নজরে ছিলো কিছুটা বুজরুকিওয়ালা বাছবিচার, মাস্টার মশাইয়ের মতো নিতান্ত অনিচ্ছায় জোর করে পাশ মার্কস দিয়ে শিল্পের কাতারে বসিয়ে দেওয়া। তারপর সযত্নে চলচ্চিত্রের কপালে ‘মা’ হয়ে পরিয়ে দিয়েছিলো কালো একটা ঢাউস সাইজের টিপ, যেনো কারো ‘নজর’ না লাগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রে সবার নজর যে লাগলো শুধু তা নয়, অনেকের চোখ হয়ে গেলো ছানাবড়া। এসব জানা আলাপ। কিন্তু যেটা জানা নয়, মানে একজন নারী হিসেবে বলি কিংবা একজন চলচ্চিত্রকার হিসেবে মায়া এসে চলচ্চিত্রের কয়েকটা জায়গায় ঘটালেন ওলটপালট। প্রথমত, তিনি চলচ্চিত্রকে এক্সপেরিমেন্টাল দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠ শুরু করলেন। এ পাঠ কিন্তু ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম’কে পাঠ করা নয়, এ যেনো ফিল্মেরই লাগাতার এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকা। সে পর্যন্ত নতুন শিল্প হিসেবে চলচ্চিত্রে যেসব কালা-কানুনের ডিসিপ্লিন চড়চড় করে ঘুরছিলো ফিল্ম-রিলের ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গেই, তাতে করে কিছু কিছু যান্ত্রিক ব্যাখ্যা, আইন ঠিক হওয়া মোটেও অসম্ভব ব্যাপার ছিলো না। যেমন, এভাবেই আসলে ফিল্ম হয়, এমন করলে ফিল্মটা এমন হয়, এমন হওয়াই ভালো, অমনটা উচিত নয়--এ রকম সম্ভাব্য নানা যান্ত্রিক ভাবনা, ঝোঁক--যেগুলো শুধু তখনকার দিনেই চলচ্চিত্রকারদের মগজ বোঝাই হয়নি বরং আজকের চলচ্চিত্র দুনিয়াতেও এটাই ঘটে চলেছে।
আজকাল লোকে চলচ্চিত্র নির্মাণে ভয় পায়। প্রথাগত উপায়ে, চলতি গল্পকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও অনেকে আশঙ্কা করে বাণিজ্যিক ব্যর্থতার। এহেন অবস্থায় চলচ্চিত্রে চলতি সব ভারিক্কি প্রথা গুঁড়িয়ে দিয়ে নয়া গল্প অথবা নির্মাণশৈলী আনার কথা কারো ভাবনায় আসছে বলে মনে হয় না। কিন্তু এ সময়ে যে সেটাই বড়ো প্রয়োজন। কিন্তু সে প্রয়োজনটা মনে হলেই সবাইকে ওই ‘ভুল’ এর ফাল পাড়তে শুনি। অথচ এ সময়টাতে চলচ্চিত্রে, বিশেষত দেশজ ইন্ডাস্ট্রিতে ‘ভুল’ করাটাই কতো দরকার! রবীন্দ্রনাথ এ সম্পর্কে ‘অরাজ’২ গলায় বলেছিলেন, ‘অবিরত কাজ করে যাওয়া নির্ভুল যন্ত্র আর ভুল করতে থাকা মানুষের মধ্যে আমি মানুষকে বেছে নেবো।’
সেই কবেই ফিল্মি দুনিয়ার একজন নারী, মায়া ডেরেন, চলচ্চিত্র নিয়ে বেসাতি করবার সব লোভ সামলে শিল্পটাকে স্রেফ ‘ভুল’ করবার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কারণ একমাত্র ভুল করলেই নতুন কিছু করা হয়। নতুন কিছু থেকেই তো নতুন পথ, নতুন সম্ভাবনা। তিনি চলচ্চিত্রকে পরীক্ষামূলক ব্যবহারের বাইরে কখনোই দেখতে চাননি। উপরন্তু তাতে আবার ঢেলে দিয়েছিলেন মনস্তাত্ত্বিক, পরাবাস্তবিক, নৃতাত্ত্বিক নানা ‘তেতো’৩ ফরমুলা। যার চলচ্চিত্রিক সাহস আর ‘ভুল’ করবার ধাত থেকে আজকের দিনের নবীন নির্মাতারা গ্রহণ করতে পারে অকাতরে। তাই মায়াকে নিয়ে এই লেখা মোটেও মায়াবী জগতকে ধরবার চেষ্টা নয়, বরং নবীন নির্মাতাদের সব ভয়, শঙ্কার মায়া কাটিয়ে উঠবার।
বৃত্তচেরা ফুল ফুটলো যেমন করে
মায়ার জন্ম ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২৯ এপ্রিল ইউক্রেনের কিয়েভ শহরে। অর্থাৎ মহান রুশ বিপ্লবের প্রথম পার্বণ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সম্পন্ন হওয়ার কিছু পরেই। পরিবার মায়াকে দেয় ইহুদি ধর্ম; মনোবিজ্ঞানী বাবা আর এক রোমান্টিক মা। বোধ হয় সেজন্যই মা তার নাম রাখলেন ইতালিয়ান অভিনয়শিল্পী ইলিয়েনোরা ডুস এর নামের খাতিরে ইলেয়েনোরা ডেরেনকোওস্কা। এভাবে মায়ার শুরুটা যেনো কয়েকটা অনুষঙ্গ মেনে শুরু হলো। পারিবারিকভাবে ইহুদি ধর্মের একটা সংস্কার, বাবার মনোবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আশ্রুত সঙ্গ, মা’র চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পীর নাম রাখা--এসব মায়াকে যে পারিবারিক অবয়ব দিতে থাকলো তা সম্ভাবনায় মোড়ানোই বটে।
এমনই করে ছাট্ট মায়া কথা বলতে শিখলো, আরো শিখতে থাকলো চলতে-ফিরতে। পারিবারিক এক সৌষ্ঠবের পুষ্পসজ্জায় হেঁটে হেঁটে মায়া যে সময়টায় বেড়ে উঠছিলো খুবই নিবিড় করে, সেসময়ে সোভিয়েতের অবস্থা ততোটা নিবিড় ছিলো না। রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েতজুড়ে তখন গৃহযুদ্ধ। বিপ্লবের পর পরই ‘হোয়াইট মুভমেন্ট’র ধ্বজা উড়িয়ে ‘সাদা’রা৪ (White Army) প্রতিবিপ্লবী চেতনা নিয়ে ‘লাল’দের৫ (Red Army) বিরুদ্ধে দানা বাঁধছিলো। কিন্তু ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে এসে সাদাদের সেমিটিক বিদ্বেষ যেনো চরমে পৌঁছালো। মায়ার বয়স তখন ছয়। বিপ্লব যেনো গরম ভাতের মতো দেখা দিলো মায়ার জন্মভূমি ইউক্রেনেও। রান্নার পর পরই তপ্ত ভাত গলাধঃকরণে গলা, জিভ পুড়ে যায়, সেজন্যই তো ভাত থালায় বেড়ে অপেক্ষা করতে হয়। তারপরই তা খাওয়া যায়, ক্ষুধা নিবৃত্তি হয়। মায়া ডেরেনের বাবা যেনো এ সত্যটা ধরে ফেলেছিলেন বিপ্লবের চেহারা-সুরত উপলব্ধ করেই। তাই তো এক সেমিটিক পরিবারকে কাঁধে নিয়ে ‘সেই দিনটার অপেক্ষা করছিলেন। এমনি করেই গৃহযুদ্ধের প্রথম চারটি বছর অতিবাহিত করেও শেষ বছরে এসে আর পারলেন না মনোবিজ্ঞানী বাবা সলোমন ডেরেনকোওস্কা। সেমিটিক বিদ্বেষ চরমে উঠলে বাধ্য হয়ে সপরিবারে চললেন নিউ ইয়র্কের সিরাকিউসে। বিপ্লবের জ্বালানীর যে আঁচ তা যেনো মায়া ডেরেনের চেতনা ব্যেপে না আসে, তারই বাস্তবিক পদক্ষেপ যেনো মনোবিজ্ঞানীর আমেরিকায় অভিবাসন।
নিউ ইয়র্কে এসে মায়ার পরিবার পদবি সংক্ষিপ্ত করে। ফলে মায়া হয়ে যান ডেরেনকোওস্কা থেকে ডেরেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ডেরেন পরিবার’ যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী নাগরিকত্ব পায়। এর কিছু সময় পর মায়া তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা আরম্ভ করেন সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি সাংবাদিকতা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান উভয় বিষয়ে বিদ্যাশিক্ষা করেন। ৩০-এর দশকে ট্রটস্কিপন্থি আন্দোলন জোরদার হলে মায়া ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। হয়ে ওঠেন সক্রিয় সমাজতান্ত্রিক কর্মী। মায়া এ সময় আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির ইয়াং পিপল সোশ্যালিস্ট লিগের সচিবের দায়িত্ব পান। এছাড়া শুরু থেকেই মায়া সমাজ, শিল্প, সংস্কৃতিতে আগ্রহের নিমিত্তে বিভিন্ন সামাজিক ক্লাবে সক্রিয় ছিলেন। এমনিভাবেই ‘সোশ্যাল প্রবলেমস্ ক্লাব’ নামের একটি সংগঠনের সূত্রে তার সঙ্গে সখ্য হয় গ্রেগরি বারদেক নামের এক ব্যক্তির। যার সঙ্গে মায়া ১৮ বছর বয়সে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে বিবাহ সম্পর্কে জড়িয়ে যান। যদিও নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করার কিছুকাল পর তাদের বিচ্ছেদ হয়।
স্নাতকোত্তর শেষে মায়া গ্রিনউইচে ফিরে কিছুকাল তার পরিবারের সঙ্গে কাটান। এ সময় মায়াকে তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া বোধে তাড়িত হতে দেখা যায়। তিনি ‘ইউরোপিয়ান ইমিগ্রান্ট আর্ট সিন’ প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। যে মায়া নিজে একজন অভিবাসী, তিনিই অভিবাসীদের শিল্পীতকরণের কাজে নিজেকে জড়ান। এখান থেকেই আত্মসচেতন এক মায়া যেনো শিল্পের দুনিয়ায় জাল বিস্তার করতে শুরু করেন। এর পরের দু’বছর অর্থাৎ ১৯৩৭—৩৯ পর্যন্ত মায়ার কর্মজীবনটা ছিলো আরো শাব্দিক, পদ্ধতিগত বিস্তারের-সম্প্রসারণের। এ সময়ে তিনি ফ্রিল্যান্স সাংবাদিকতার সঙ্গে নিজেকে ব্যাপৃত রাখেন। একই সময়ে মার্কিন লেখক এডা লু ওয়ালটন, ম্যাক্স ইস্টম্যান প্রভৃতি লেখকের সম্পাদনা সহকারী হিসেবেও কাজ করেন।
এই অভিজ্ঞতাগুলো যেনো মায়ার স্থানান্তরিত জীবনে আরেকটা জীবন যোগ করতে থাকে। একদিকে তিনি ছাত্রজীবন জুড়ে এবং পরিবারে শিল্প, সাহিত্য, মনোবিজ্ঞানের বুনিয়াদ পেয়েছিলেন, অন্যদিকে জীবনের যে বাঁকগুলো, অর্থাৎ জন্মভূমি ফেলে আসা, কমবয়সি নাকাল দাম্পত্যের অবসানের মতো অস্বাভাবিক বদলগুলোর কারণে এক বৈশ্বিক বোধে পূর্ণ জীবনের খোঁজ পেতে শুরু করলেন। ব্যাপারটা ফুটে উঠলো তার বাহ্যিক চেহারাতেও। একদিকে পরতে শুরু করলেন ইউরোপিয় শৈলীর তৈরি পোশাক; অন্যদিকে বন্য, কোঁকড়ানো চুল রাখলেন কাঁধ অবধি।
মায়ার স্নাতকোত্তরের গবেষণাকর্মটি ছিলো আমেরিকান কবিতার ওপর। কবিতা নিয়ে আগ্রহের কারণে কর্মজীবনে এসে তার কাব্যচর্চার ক্ষেত্রটাও মেলতে থাকে। তাতে সায় দিয়ে মায়া ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে কবিতা ও ফ্রিল্যান্স আলোকচিত্রে মনোযোগী হতেই লস এঞ্জেলসে আসেন। এখানে এসেই মায়ার নজর পড়ে মার্কিন নৃত্যশিল্পের ওপর। এছাড়া কিছুদিন পড়াশোনা করেন ক্যারিবীয় সংস্কৃতি, হাইতির সংস্কৃতি ও ভুডু পুরাণের ওপর। আলোকচিত্রশিল্পে কাজের সূত্রেই মায়ার পরিচয় হয় চেকোস্লোভাকিয়ান চিত্রগ্রাহক, আলোকচিত্রী আলেকজান্ডার হ্যাকেন্সমিড-এর সঙ্গে। যিনি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মায়ার সঙ্গে দাম্পত্যে লিপ্ত হন। এই হ্যাকেন্সমিডই তার নাম রাখেন মায়া।
মায়া ডেরেন
মায়া তো বয়ে যান চলচ্চিত্রের ফিতে’য়
একজন নির্মাতা কীভাবে বেড়ে ওঠে, জীবনের কোন বছরটা ছুঁয়ে ফেলার পর তার হঠাৎ মনে হয় সে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে--এটা এক বড়ো জিজ্ঞাসা। আসলে চলচ্চিত্রচর্চা তো কোনো গণ্ডিবদ্ধ ব্যাপার নয়। অন্যান্য শিল্প শাখার মতো চলচ্চিত্রের কোনো একক ক্যানভাস থাকে না। সাদা পর্দায় হয়তো একটা চলন্ত চিত্রের জার্নি নির্মাতাকে টেনে যেতে হয়, হয়তো তা থামার অবকাশ পায় না; কিন্তু সেই চলন্ত চিত্রের অনেকগুলো মাত্রা থাকে। তার রঙ, সুর, চিত্রময়তা আছে, আরো আছে চাহনি। এর প্রত্যেকটার জন্যই লাগে একেকটা ক্যানভাস; ফুটিয়ে তুলতে হয় আলাদা কতো মাত্রা! তাতেই কী শেষ হয়! তারপর থাকে সেই মাত্রাগুলোর যোগসাজশে এক সর্বজনীন ভাষা সৃষ্টির তাগিদ। তবেই তো একজন নির্মাতার কাজ দর্শকের মননে ছাপ ফেলে।
তাই শিল্পের সবগুলো শাখার সঙ্গে নির্মাতার শুধু পরিচয় থাকলেই চলে না; থাকতে হয় মনের যোগ, ভিন্ন ভিন্ন শিল্পের জন্য মনের ভিতরে একটা করে আলাদা চোরাস্রোত নিরন্তর বয়ে যেতে হয় নির্মাতার। প্রত্যেক শিল্পে নির্মাতার শিল্পী হয়ে ওঠার চেয়ে সমজদার হয়ে ওঠা বেশি জরুরি। যেনো সে তার দলের সবার কাজকে খুঁটিয়ে পরখ করতে পারে, সপ্রযুক্ত উপাদানগুলি তার চলচ্চিত্রে সেঁটে দিতে পারে।
এইদিক থেকে দেখতে গেলে মায়ার জীবনটা এক অদ্ভুত চলচ্চিত্র-শৃঙ্খলায় বন্দি। মায়ার ছোটোকালের পারিবারিক দিনগুলোতে গাঁইতি চালালে পাওয়া যায় মনস্তাত্ত্বিক হাতেখড়ি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে সাংবাদিকতার জ্ঞান এবং সেটা সম্বল করে পরে আলোকচিত্রী হয়ে ওঠা, সাহিত্য নিয়ে গবেষণা থেকে কবিতাচর্চার ধারা; সবশেষে তার নিজের গরজে নানা দেশীয় সংস্কৃতি, আদিবাসী ধর্মতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞানের পাঠ রপ্ত করা--এ সবকিছুই যেনো চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠার জন্য তার আত্মজৈবনিক এক দীর্ঘ প্রস্তুতির শরিকানা। যদিও অন্তর্জাল ছেঁচে তার সম্পর্কে পাওয়া নিতান্ত খুঁচরো কিছু তথ্যে এটা জানা মুশকিল যে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার তাগাদা তিনি কবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই ধরে নেওয়া চলে, তিনি চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার বাসনা যখন থেকেই পুষে রাখেন না কেনো, আসলে তিনি তো সেজন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন তারও বহু আগে থেকেই। কেননা তার সমস্ত পড়াশোনা, অভিজ্ঞতা, চলচ্চিত্রশিল্পী হওয়ার এক নিরন্তর অভিপ্রায়ে ভরা।
হ্যাকেন্সমিডের সঙ্গে মায়ার দাম্পত্য সম্পর্ক যখন বছর ঘুরতে চললো, পাশাপাশি কাব্যচর্চা ও আলোকচিত্রের চর্চাও সমানতালে এগোচ্ছিলো, ঠিক সেসময়ে হৃদরোগ মায়াকে করলো বাবা-হারা। এর পর যা হলো, বাবার রেখে যাওয়া যে অর্থটুকু ছিলো তা থেকে মায়া কিনলেন ১৬ মিলিমিটার রোলেক্স ক্যামেরা। অনেকটা নাটকীয় আকস্মিকতায় সে বছরই হ্যাকেন্সমিডের সহায়তায় তার লস এঞ্জেলসের বাড়িতে ২৫০ ডলার বাজেটে নির্মাণ করলেন তার প্রথম ও সর্বাধিক পরিচিত চলচ্চিত্র মেশেজ অব দ্য আফটারনুন (১৯৪৩)।
মায়া একই বছর পেগি গেগেনহেইম নামে এক নারী শিল্পসংগ্রাহকের সঙ্গে পরিচিত হন। পেগির আর্ট অব দ্য সেঞ্চুরি গ্যালারিতে সহকারী ডুচাম্পকে নিয়ে সে বছরই তিনি নির্মাণ করেন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র দ্য উইচ’স ক্রেডল (১৯৪৩)। পরের বছর গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্কের পোর্ট জেফারসন ও আমাগানসেটে তিনি অ্যাট ল্যান্ড (১৯৪৪) এর চিত্রধারণ করেন। এই চলচ্চিত্রটি নানা কারণেই সমালোচনার দাবি রাখে। এভাবেই সেই দশকটি জুড়ে ফি-বছর একেকটি চলচ্চিত্র মায়া নির্মাণ করে চলেন। এ সময় আ স্টাডি ইন কোরিওগ্রাফি ফর ক্যামেরা (১৯৪৫), রিচুয়্যাল ইন ট্রান্সফিগার্ড টাইম (১৯৪৬), দ্য প্রাইভেট লাইফ অফ আ ক্যাট (১৯৪৭), মেডিটেশন অন ভায়োলেন্স (১৯৪৮), মেদ্যুসা (১৯৪৯) প্রভৃতি একে একে নির্মাণ হয়।
মায়ার এসব সৃষ্টিতে তার বাবার থেকে উত্তরাধিকারজাত প্রভাব নানাভাবেই জারি ছিলো। অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে বাবার থেকে মায়া পেয়েছিলেন উচ্চ রক্তচাপের নিদারুণ দৈহিক গোলযোগটাও। এছাড়াও আরো নানা অজানা সমস্যায় মায়া স্লিপিং পিল, অ্যাম্ফিটামিন এর মতো ড্রাগে ভর দিয়ে চলেছেন অনেকটা সময়। একটা মগজের পুরোটাই যখন তার সৃষ্টিকর্মে জারিত থেকেছে, সেসময় হয়তো খাবারেও করেছেন অনিয়ম। শেষ দিকে এ কারণে অপুষ্টিজনিত সমস্যাতেও ভুগেছেন। এ অবস্থা নিয়ে মায়া যখন অবস্থান করছিলেন নিউ ইয়র্কে, হয়তো নতুন কোনো কাজের জন্য মনকে তৈরি করছিলেন, তখনই দেহ তাকে আর সঙ্গ দিলো না। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর শেষ অঘটনটা ঘটলো। মায়ার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলো। তাকে আর ফেরানো গেলো না। মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই তিনি চলে গেলেন।
মায়ার যতো লেখাজোখা তার সবগুলোকে এক করে পুস্তকাবদ্ধ করা হয়নি অনেককালেও। শেষাবধি ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ‘দ্য লিজেন্ড অব মায়া ডেরেন’ নামে দুই খণ্ডে পুস্তক বের হয়। যেখানে মায়ার শতাধিক নথি, সাক্ষাৎকার, মৌখিক ইতিহাস, চিঠি এবং আত্মজীবনীমূলক স্মৃতি রয়েছে। এছাড়াও আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মমেকারদের বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে ‘মায়া ডেরেন পুরস্কার’ দিয়ে আসছে।
পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র নয়; চলচ্চিত্রই যেনো এক পরীক্ষাগার
চলচ্চিত্র মোটের ওপর ‘গল্প বলিয়ে কোনো পাড়ার মাসি’--এ ধারণাটি চলচ্চিত্রজনের ওপর চেপে বসা একটা খেয়াল হয়েছিলো এই শিল্পের শুরুর অনেক বছর ধরেই। আজও কিন্তু অনেকেই চলচ্চিত্র দেখার নাম করে গল্প দেখতেই বসে। চলচ্চিত্র দেখা মানে অনেকের কাছে একটা গল্পই গলাধঃকরণ করা। মানে সর্বাগ্রে চাই ন্যারেটিভ। দেখা চাই ন্যারেটিভে ঘটনার চমৎকারিত্বের কতোখানি ঠাসবুনুনি আছে। গল্পের মাঝে কোনো দুর্বোধ্য কাট্ অথবা ট্রানজিশন থাকা চলবে না। গল্পটি হবে রৈখিক চালচলনের। গল্পে তা-ই থাকবে, যা দেখতে বসা দর্শকের মাথায় থাকা চিত্রনাট্যের আদিম ফ্রেমে ভাষা পায়। কোনোভাবে সুর কেটে গেলেই সব গেলো!
আসলে চলচ্চিত্রে যেদিন থেকে সম্পাদনা শুরু হলো সেদিন থেকেই কিন্তু ‘গল্প বলা সেই মাসি’র মুখের সংখ্যা গেলো বেড়ে। মাসি এখন একটা মুখে হয়তো বলেন গল্প, আরেকটাতে একই সঙ্গে তোলেন সুরধ্বনি, কিংবা আরেকটা দিয়ে সেই গল্পের ব্যাখ্যা। ফলে সব চলচ্চিত্রেই ফিটফাট ন্যারেটিভ খুঁজতে যাওয়ার অবসান ঘটলো। এজন্যই মায়া বিশ্বাস করতেন, চলচ্চিত্র সম্পাদনার জন্মই হয়েছিলো আসলে অভিজ্ঞতা পরীক্ষার জন্য।৬ অর্থাৎ সম্পাদনার মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে দৃশ্যগত ব্যাপারের সঙ্গে ধ্বনি প্রযুক্ত হয়, ফলে দুটো মিলে একটা দারুণ রেসিপি হয়ে যায়। নির্মাতা যখন একটা বোবা (ধ্বনিহীন অর্থে) শটের সঙ্গে কোনো সঙ্গীত জুড়ে দেয়, তখন আসলে দুটো মিলে সম্পূর্ণ নতুন কিছু একটা হয়ে যায়। এটা সম্পাদনার খুবই গোড়ার কথা। এছাড়াও সম্পাদনায় আরো আসে কাট্, ট্রানজিশন, মন্তাজসহ নানা ব্যাপার। ফলে বলা যায়, সম্পাদনা কিন্তু একটা পরীক্ষামূলক ব্যাপার। নির্মাতা তার গল্প ক্যামেরাবদ্ধ করলেন, পরে পোস্ট-প্রোডাকশনের এই কাজখানি দিয়ে তিনি সেই গল্পের ভাবগত দ্যোতনা, নান্দনিক শৈলী পুরোই পাল্টে দিতে পারেন। তারপর প্রশ্ন আসবে, একই গল্প পৃথক পৃথক সম্পাদনায় যে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যতা পায়, তার সবকয়টাই দর্শকের পছন্দ বা বোধগম্য হবে কি না।
সুতরাং নন-ন্যারেটিভ ভঙ্গিতেও চলচ্চিত্রে কোনো গল্প বলা যায়। এটুকুই নয় শুধু, কখনো কখনো তা হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন। ঐতিহ্যিক, ক্লিশে ন্যারেটিভ আর নির্মাণকৌশল দুটোই তাই ভেঙে যায় এখানে। মায়ার মতো পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রনির্মাতা (Experimental Filmmaker) তাই চলচ্চিত্রের ঐতিহ্যময়তায় বাঁধা পড়েন না। তারা নতুনের খোঁজে সওয়ার হয়। মায়ার প্রায় চলচ্চিত্রেই তাই দেখা যায় সম্পাদনাগত বা সিনেম্যাটিক উপাদানগত যে সম্মেলনগুলো ঘটে, সচরাচর তার পুনর্মূল্যায়ন করে নতুনভাবে সেই ‘গল্প’ বলার একটা চেষ্টা থাকে। এছাড়াও পরীক্ষামূলক চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য মেনেই তার চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যান্য শাখাগুলোর সঙ্গে দেওয়া-নেওয়া করেছে খুব বেশি। ফলে প্রথাগত বাঁধানো একটা সংলাপনির্ভর চিত্রনাট্যকে প্রাণ করে তার চলচ্চিত্রে গল্প বলার চেষ্টা একদমই ছিলো না। বরং ভিন্নমাত্রিক দৃশ্যের অবতারণা করে তাতে পোয়েটিক যোজনা মিশিয়ে তিনি গল্প বলতেন। সেই দৃশ্যগুলো বেশিরভাগই ছিলো সিম্বলিক আর নির্বাক। তার সঙ্গে পরাবাস্তবতা মেশাতেন কখনো কখনো। ফলে যে ব্যাপারটা ঘটতো তাতে, বাঁধা ঠাসবুনুনির গল্পের ছকে মিলিয়ে তার চলচ্চিত্র দর্শনে কিছু পাওয়া যাবে না। বরং পরাবাস্তবতা, পোয়েটিক এক্সপ্রেশন, সিম্বল আর সঙ্গে দৃশ্যকল্প এসব একত্রে পাঠ করলে তবেই একটা গল্প পাওয়া যায় তার চলচ্চিত্রে। মায়া যেনো তার প্রতিভাবহুল জীবনে প্রতিভার সবকটা ক্ষেত্র একযোগে চলচ্চিত্রে ব্যবহারের প্রত্যয়েই পরীক্ষানির্ভর চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেছিলেন।
চেরি তো ছড়ায় চেরির সুবাস
মায়ার প্রথম চলচ্চিত্র মেশেজ অব দ্য আফটারনুন (১৯৪৩)। এর বিশেষত্ব হলো, এটি ন্যারেটিভধর্মী প্রথম মার্কিন আঁভ গার্দ চলচ্চিত্র। প্রথম আঁভ গার্দ মার্কিন চলচ্চিত্র হিসেবে এটিতেই সফল আখ্যান রচিত হয়েছিলো। যদিও মায়ার পরীক্ষানির্ভর অন্যান্য চলচ্চিত্রে আখ্যান কখনোই আলোচ্য হয়ে ওঠেনি; তবে এটি ব্যতিক্রম। অন্যভাবে বলা যায়, মার্কিন আঁভ গার্দ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আখ্যান রচনা করাটাও এক অর্থে পরীক্ষানির্ভর ব্যাপার। তার মানে এই চলচ্চিত্রে মায়া পরীক্ষানির্ভরতার গণ্ডিটার বিস্তৃতি ঘটিয়ে পরীক্ষানির্ভর নির্মাতাই থেকেছেন আসলে।
চলচ্চিত্রটিতে আত্মজীবনীমূলক কিছু উপাদানের পাশাপাশি ব্যক্তি হিসেবে একজন নারীর মনোজগৎ উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, একজন নারী তার বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এরপরেই স্বপ্নে তিনি এক রহস্যময় ছায়ামূর্তিকে অনুসরণ করতে করতে ছায়াময় পথের পাশে সিঁড়ি ভেঙে পুনরায় একই বাড়িতে উঠে আসেন। এভাবে স্বপ্নের ভিতরে সেই নারীর একাধিক অবয়ব গড়ে উঠতে থাকে। যেনো মনে হয় ফ্রয়েডিয়ান চেতনার বিভাজন মেনে ওই নারীর চেতন, অর্ধচেতন আর অচেতন বৃত্তে তিনি যেভাবে ভিন্ন ভিন্ন অবয়বে জারি থাকেন, তার সবকটির প্রতিনিধিত্ব মেনে তিনটি অবয়বই সিঁড়ি ভেঙে এসে একটি কক্ষে মিলিত হয়। চলচ্চিত্রে এই তিনটি অবয়বকে মায়া ধরিয়ে দেন ফুল, চাবি ও ধারালো চাকুর মাধ্যমে। এভাবে মায়া ফ্রয়েডিয়ান চিন্তাকাঠামোয় থেকে, রাস্তাটা যেনো সামান্য একা হাঁটতে চেয়েছেন।
ফুল, চাবি, চাকু’কে যদি টেক্সট বিশ্লেষণে রূপকের মাত্রিকতা ধরে আপাত অর্থে প্রেম, সমাধান, হিংসা হিসেবে ভেবে নেওয়া হয়; তবে চেতনার তিনটি স্তরে এরা কিন্তু মিলেমিশেই এক হয়ে থাকে। ফ্রয়েড এ অবধি সমর্থন করে মায়াকে। কিন্তু মায়া যখন ঘুমন্ত নারীর তিনটি যোজনার সৃষ্টি করেন, তাদের হাতে এগুলো ধরিয়ে দেন, তখন বোঝা যায় নারীকে তার সামাজিক অবস্থিতিতে প্রেম, সমাধান আর হিংসা এ তিনের ভিতরে বেঁচে থাকতে হয়। নানা পরিস্থিতিতে নানা মানুষের মোকাবিলায় তাদেরকে যেনো এ তিন থেকে কিছু একটা বেছে নিতে হয়। মায়ার এই চলচ্চিত্রে সার্থকতার জায়গাটা কিন্তু চমৎকার। তিনি ওই তিন লক্ষণা একত্রে টেনে হয়তো এটাই বোঝাতে চেয়েছেন, নারীর সঙ্গে ঘটে চলা নানা ঘটনায় তার ভিতরে তিনটিই তৈরি হয়। তবে নারী প্রেম, সমাধান নাকি হিংসা বাছবে, সেটাই তার অবস্থান ধার্য করে দেয়। অথবা, এই বাছাবাছির যে বাড়-বাড়ন্ত নারীর জীবনব্যাপী নারীকে তাড়া করে বেড়ায় তা কিন্তু তাকেই সয়ে যেতে হয়।
খোয়াবে যার সিনেমা আসে
জীবদ্দশায় মায়া সমকালীন চলচ্চিত্রবিশ্ব নিয়ে কখনোই উদাসীন ছিলেন না। আত্মসৃষ্টিমগ্ন এক নারী যে দুনিয়াদারী ভুলে বসে থাকবেন কখনোই তেমনটিও হতে চাননি। তিনি বিশ্বচলচ্চিত্রের হকিকত দেখেই তৃপ্ত হতেন না বরং পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন, রাখতে চাইতেন নিজের স্বাক্ষরও। তার জীবনকালের পুরোটাই (১৯১৭—১৯৬১) মূলত ছিলো ইউরোপিয় চলচ্চিত্রের রেঁনেসাসের কাল। এ সময়েই সোভিয়েত চলচ্চিত্রজগত সংহত হয়, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক ফিল্মিয়ানা লক্ষ করা যায়। এছাড়া গড়ে ওঠে নব্যবাস্তববাদ, নবতরঙ্গ, সিনেমা ভেরিতে’র মতো নানা চলচ্চিত্রধারা। তবে এসবের পাশ ছুঁয়ে চলচ্চিত্র-কাঁথায় আরো একটি ফোঁড় সুতো বুনতে থাকে, যেটির শৈল্পিক দীনতা বা সর্বনাশ ঘটাবার প্রাচুর্যতা সম্ভবত মায়াই প্রথম ভীষণভাবে অনুভব করেছিলেন। সেই ফোঁড়টিই হলিউডি চলচ্চিত্রের ফোঁড়। মায়ার নানা বক্তৃতা, রচনায় কিংবা আলংকারিকভাবে চলচ্চিত্রেও তার এই সমালোচনার অবস্থানটা স্পষ্ট।
১৯৪০ ও ৫০-এর দশকজুড়ে বিশ্বজোড়া মার্কিন চলচ্চিত্রের শৈল্পিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক একচেটিয়া আচরণ মায়ার কখনোই সহ্য হয়নি। যদিও তার সমসাময়িক অনেক নির্মাতার কাছেই এটা হয়েছিলো চোখ সওয়া একটা ব্যাপার। কিন্তু মায়া তাদের মতো চুপ থাকতে পারেননি। এক রচনায় মায়া স্পষ্টতই বলছেন, ‘হলিউড যে পরিমাণ অর্থ লিপস্টিকের জন্য ব্যয় করে, তা দিয়ে আমি আমার চলচ্চিত্র নির্মাণ করি।’৭ মশা মারতে কামান দাগানো কিংবা শৈল্পিক দীনতা নিয়ে শিল্পবিশ্বে আধিপত্য খাটানোর এক ক্রুর চালাকি মায়ার এই কথাটা ধরিয়ে দেয়। শৈল্পিক ধ্যান বা বিশ্বজনীন বার্তা যেখানে থাকে না, সেখানে পয়সা ঢেলে অর্থহীন চাকচিক্য সৃষ্টি না করলে যে অন্যের চোখ নিবদ্ধ করা যায় না, একই সঙ্গে সেই ইঙ্গিত ও মার্কিন চলচ্চিত্র সম্পর্কে মায়ার অবস্থান যেনো এই কথাতেই পরিষ্কার। তিনি এখানে আরো ইঙ্গিত করছেন দেশে দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র বিকাশের সম্ভাবনার দিকে। কেননা শুধু লিপস্টিকের টাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করে হলিউডের চলচ্চিত্রের অর্থনৈতিক যথেচ্ছাচার থেকে নিজের চলচ্চিত্রকে মুক্তি দেওয়ার অর্থ হলো নিজভূমের চলচ্চিত্রের ভিন্ন এক আইডেন্টিটির জন্ম দেওয়া। যা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য প্রকৃতই জাতীয় চলচ্চিত্র ধারা পুষ্টতার প্রথম ধাপ হতে পারে।
হলিউডি চলচ্চিত্রের আরেক সমালোচনায় মায়া বলছেন, ‘সৃজনশীল, সূক্ষ্ম শিল্পরূপ হিসেবে মোশন চলচ্চিত্রগুলোর সংজ্ঞা নির্ধারণ ও বিকাশে প্রধান বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে হলিউড।’৮ বোঝাই যাচ্ছে, চলচ্চিত্রের মতো সব সম্ভবের এক শিল্পকে হলিউডি ঘেরাটোপে বন্দি থাকতে হয়েছে দীর্ঘসময়। সে কারণেই এই শিল্পের বৈচিত্র্যময় কিংবা সামর্থ্য চিনতে অনেক দেশই দেরি করে ফেলেছিলো যথেষ্ট। মার্কিন চলচ্চিত্রিক সাম্রাজ্যবাদ চলচ্চিত্রশিল্পকে উপনিবেশিত মগজে জারি রেখেছিলো স্রেফ এক ভিজ্যুয়াল মাধ্যম করে। এর শৈল্পিক বুঝ উপনিবেশিতরা নিতে সমর্থ হয়নি মার্কিন চলচ্চিত্রের বিশ্বব্যাপী এক উচ্ছৃঙ্খল বুনিয়াদ রচিত হওয়ার ফলে। মায়ার এই কথায় আরো ইঙ্গিত মেলে চলচ্চিত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণে মার্কিন চলচ্চিত্রের মুশকিল হওয়ার ব্যাপারে। চলচ্চিত্র তো শুরুর দিকে ছিলো মুভিং পিকচার (মুভি); তা থেকে চলচ্চিত্রের সিনেমা হয়ে ওঠার পথটা কিন্তু মার্কিন চলচ্চিত্রের বিশ্বব্যাপী বিকল্প তৈরি হওয়ারও একটা পথ। কেননা একটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি পুরো দুনিয়ার চলচ্চিত্র বাজার হয়তো দখলে নিয়েছিলো, তবে সেটা কিন্তু বৈচিত্র্য থেকে সরে এসেই, যথেষ্ট একধর্মী পণ্য ছড়ানোর ইন্ডাস্ট্রি হয়েই ছিলো অনেকটা সময়। মুভিং পিকচার থেকে সিনেমা হয়ে ওঠার জার্নিটা কিন্তু একক ইন্ডাস্ট্রিধর্মী সহজ ব্যাপার ছিলো না।
স্বল্পব্যয়ে চলচ্চিত্র বানানোর দিক বিবেচনাতেই মায়া অনেকের কাছে হয়ে ওঠেন একজন স্বপ্নসুন্দর ইনডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার। তার সহজাত মার্কিনবিরোধী অবস্থানের সবটুকু দিয়েই তিনি স্বাধীন চলচ্চিত্রনির্মাতাদেরকে দিয়ে গেছেন চলচ্চিত্র সৃষ্টির সাহস আর নানা দিকনির্দেশনা; বলে গেছেন স্বাধীন চলচ্চিত্রের স্বাধীনতার কথা। অনেকেই ভাবেন স্বাধীন চলচ্চিত্র মানে বুঝি শুধুই ইন্ডাস্ট্রির প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজ উদ্যোগে চলচ্চিত্রনির্মাণ ও তার প্রদর্শন। কিন্তু স্বাধীন চলচ্চিত্রের মানে শুধু এটুকু বললেই শেষ হয়ে যায় না। মায়া বোঝান, স্বাধীন চলচ্চিত্র হতে গেলে তার ন্যারেটিভ কিংবা নির্মাণশৈলীও হতে হবে স্বাধীন। প্রথাগত কোনো ভাবালুতা তাতে থাকা চলবে না। ইন্ডাস্ট্রির প্রভাব থেকে অর্থনৈতিকভাবে মুক্ত থাকার চেয়ে বরং চলচ্চিত্রের অভ্যন্তরীণ ভাবাদর্শের জায়গায় মুক্তি অর্জন করাই স্বাধীন চলচ্চিত্রের স্বাধীনতা রক্ষার মূল কাজ। তাই মায়া নবীন নির্মাতাদের বলেন,
শৈল্পিক স্বাধীনতার অর্থ হলো, একজন নবীন চলচ্চিত্রনির্মাতাকে দৃশ্যগত নাটক ও তার সৌন্দর্যকে কখনোই সংলাপের স্রোতে বিসর্জন দিতে বাধ্য না করা। ... একটি প্লট নিয়ে নিরলস কর্মকাণ্ড ও ব্যাখ্যা করার সুযোগ ... মাত্র ৯০ মিনিটেই একটি বিশাল দর্শকশ্রেণির মনোযোগ আকর্ষণ করে অপেশাদার উৎপাদনের দ্বারা বিশাল মুনাফা অর্জনের আশা না করা ... একটি প্লট উদ্ভাবনের চেষ্টা করার পরিবর্তে বাতাস, জল, শিশু, মানুষ, লিফ্ট, বল ইত্যাদির চলাচলকেই বরং চলচ্চিত্রে কবিতা হিসেবে উদ্যাপন করতে পারার সুযোগ। ভিজ্যুয়াল আইডিয়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে আপনার স্বাধীনতা ব্যবহার করুন; আপনার ভুলগুলো আপনাকে বরখাস্ত করবে না।৯
পাখা ঝাপটানো বিহঙ্গের কোনো দেশ থাকে না
মায়া সময়ের অগ্রভাবিত সব চলচ্চিত্রিক বোধ পর্দায় প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে সমসাময়িক নির্মাতাদের থেকে চলচ্চিত্রদৌড়ে ছিলেন সবসময়ই অনেক পা এগিয়ে। তিনি ছিলেন আগাগোড়া আঁভ গার্দ নির্মাতা। কুর্তিস হ্যারিংটন, স্টান ব্রাকেজ, কেনেথ অ্যাঙ্গারের মতো আঁভ গার্দ নির্মাতাদের কাছে ধ্যান আর অনুপ্রেরণার নাম তিনি। যারা মায়ার স্বাধীন উদ্যোক্তা চেতনার অনুবর্তী হয়েছিলেন ব্যাপকভাবে। সেসময় ব্রাকেজ তো মায়ার কর্মপন্থার অনুসারী হয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্মে পোক্ত ভিত গড়ে তুলেছিলেন। আঁভ গার্দ নির্মাতাদের পথ দেখনেওয়ালা হওয়ার মধ্যেই যে একটা ‘মেটা আঁভ গার্দ’-এর মুন্সিয়ানা লুকিয়ে থাকে তা বুঝে নিলেই বরং মায়া দর্শক-সমালোচকের ‘অ্যাপ্রেশিয়েশনাল স্পটলাইট’ এ ভালোভাবে ছায়া ফেলেন। তখনই বোঝা যায়, তার চলচ্চিত্রের মহাবয়ানের ধারাভাষ্য করা কতো কঠিন।
তবে মায়া তার পরবর্তী আত্মজৈবনিক অধ্যায়ে এই সিনেম্যাটিক স্ট্যান্ড পাল্টে ফেলেন। ১৯৪০-এর দশকের শুরু থেকে আঁভ গার্দ নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকলেও ওই দশকের শেষভাগে তাকে ওই আদর্শ থেকে সরে আসতে দেখা যায়। এই অন্তর্হিতির কারণ মায়া পরিষ্কার করেননি। এজন্যই বোধহয় তাকে সমালোচিত হতেও দেখা গেছে প্রচুর। আসলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় স্বামী হ্যাকেন্সমিডের সঙ্গে মায়ার বিচ্ছেদের পর তিনি আচমকাই তার চলচ্চিত্রের সিলেবাস পাল্টে দেন। এক্ষেত্রে কারণ হিসেবে একটা ব্যাপার ধারণা করা যায়। মায়ার প্রথম দিকের কাজগুলোতে হ্যাকেন্সমিডের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিলো। তাই হয়তো বিচ্ছেদ পরবর্তী মায়া তার নিজস্বতার আলাদা কোনো মাত্রার খোঁজে এই পালা সাঙ্গ করেছিলেন। মায়ার নৃতাত্ত্বিক অধ্যয়ন কর্মজীবনের অনেকটা জুড়ে থাকলেও সেই সূত্রকে কাজে লাগিয়ে চলচ্চিত্রিক সম্ভাবনা দাঁড় করবার ভাবনা আগে আসেনি। সেটাই তার মনোজগতে আসন কাড়লো হ্যাকেন্সমিডের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই। যেনো সঙ্গীর প্রস্থান তাকে অন্যকিছু শিখিয়ে গেলো। সে বছরই তিনি ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ নিয়ে গ্রেগরি বেটসনের করা নৃতাত্ত্বিক ফুটেজ অধ্যয়ন করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন ফুটেজটি তার পরবর্তী চলচ্চিত্রে জুড়ে দেবেন।
‘গুগেনহাইম ফেলোশিপ’-এর অনুদানে সে বছরেই মায়া নয় মাসের জন্য হাইতি’তে যান। এ সময় তিনি সম্পন্ন করেন তার মেডিটেশন অন ভায়োলেন্স (১৯৪৮)। প্রথমবার হাইতি গিয়ে তিনি পরিচিত হন ভুডু (Voudou; A Syncretic Religion) ধর্মাচারের সঙ্গে। তিনি লক্ষ করেন, প্রথাগত ধর্মগুলোর সঙ্গে এই ধর্মের কতো অমিল। এই ধর্ম নানা বিশ্বাস, চিন্তা, অনুশীলনগুলো নিজের ভেতরে আত্মীগত করে যেভাবে একটা মানুষের ধর্ম হয়ে উঠেছে, তার তুলনা ভুডু একমাত্র নিজেই। এরপর এই ধর্মের এথনোগ্রাফি সম্পন্ন করতেই তিনি তিন বার হাইতি গিয়েছেন। মায়া ১৮ হাজার ফুট রিল ভুডু ধর্মাচার ও তার সঙ্গে পরিচিত হাইতি অধিবাসীদের চিত্রায়িত করেন। ফুটেজটি তার মৃত্যুর পর ডিভাইন হর্সম্যান : দ্য লিভিং গড্স অব হাইতি (১৯৭৭) নামে প্রামাণ্যচিত্র হিসেবে প্রকাশ পায়।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মায়া সেখানকার আচার-অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে অসংখ্য আলোকচিত্র তোলেন। ভুডু সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নিয়ে তার লেখা বই ‘ডিভাইন হর্সম্যান : দ্য লিভিং গড্স অব হাইতি’, ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে তার জীবদ্দশাতেই প্রকাশ পায়। এই বইয়ে মায়া ভুডু অধিকৃত অনুষ্ঠান, তাদের রূপান্তর, নাচ, নাটক, খেলা ও বিশেষত তাদের আচার সম্পর্কে তিনি তার আগ্রহের কথা বলেছেন। বইটিতে আত্ম, অহং ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রচলিত চিন্তাকাঠামো ভাঙার ওপর দৃঢ় অবস্থানের এক সুন্দর নিকেশ ছাড়তে দেখা যায় মায়াকে।১০
ফুটনোটে মায়ার বিস্তরণ
মায়ার গোটা জীবনটাকে একটা ল্যান্ডস্কেপ ধরে যদি তাকিয়ে থাকা যায় কিছুক্ষণ তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। যিনি নারী হয়েও একেবারে আর্থসামাজিক গড়াপেটায় চিরায়ত নারী হয়ে যাননি; বরং সেই বেঁধে দেওয়া গণ্ডি ছেড়ে চলেছেন বহুদূর, আবার পুরুষতান্ত্রিকতাকেও ছুঁতে ভুলে গেছেন এবং সেটা খুব সচেতনভাবেই। সবদিক মিলে মায়া হয়েছিলেন একজন মানুষ। তার জীবনে একই সঙ্গে যেমন পাওয়া যায় ক্রমাগত ঘর ছাড়ার, দেশ ছাড়ার নানা জৈবনিক প্লট, তেমনই একটু ভাবনার বার্ধক্যে গিয়ে তার সেই ‘ঘরছাড়া’গুলোই আবার যেনো হয়ে ওঠে তার পরিকল্পিত জার্নি। এমনও মনে হয়, মায়া যেনো নতুন নতুন পথে হাঁটবেন বলে পুরনোর দিকে তাকাননি। অথবা পুরো দুনিয়াটাই যেনো তার পথ।
আবার মায়ার শিল্পীসত্তার চতুর্বেদ মেপে নিয়ে তার দিকে তাকালেও একটা ‘ঘরছাড়া’ স্বপ্ন যেটা বাসি হয়ে ঝরে কিংবা পচেঁগলে যায়নি, তার সঙ্গে বসবাস করতে দেখা যায়। মায়া জীবনে কী হতে চেয়েছেন তার ঠাহর একটি প্রবন্ধে করবার মতো সাহস অথবা প্ররোচনা তার ‘রহস্য’যাপিত ওই একটা জীবন দুনিয়াকে দিয়ে যায়নি। চলচ্চিত্র ছাড়াও যেভাবে তিনি অবিরত নৃত্য, কবিতা, নৃতত্ত্ব, সংস্কৃতি এসবের দিকে ছুটেছেন, তাতে একদিকে যেমন তার রঙচোরা শিল্পবোধের দর্শন হয় সরুচোখে, তেমনই বসে বসে ভাবি এই সবকিছুর যোগ তিনি চলচ্চিত্রে যেভাবে ঘটিয়েছেন তাতে চলচ্চিত্রে অবিমিশ্র শিল্পবোধ যেনো তিনিই অনুভব করেছিলেন প্রথম। চলচ্চিত্র তো আসলে এক জীবনের কোনো শিল্প খোরাকি মাধ্যম নয়। এ তো বহু জীবন দর্শন করে, বহু জীবনের সহায়তায়, বহু মানুষের কথা বহুভাবে বলার এক মাধ্যম। এই কথনটুকু মায়া বুঝতে পেরেছিলেন যেনো অনেক আগেই। চলচ্চিত্রের ‘বুড়ো’ হবার আগেই শেষ জীবনের মানবীয় পৌঢ়ত্ব ঢেলে দিয়ে চলচ্চিত্রের এই সত্য তুলে ধরতে মায়া হয়েছিলেন একাগ্রমনা।
জীবনে ঠিকানার মতো করে সঙ্গীও বদলেছেন মায়া বহু। তিনজন পুরুষকে করেছিলেন স্বামী। দুজনের সঙ্গে বোঝাপড়ায় টান ধরে রাখা হয়ে ওঠেনি; উঠবার কথাও হয়তো নয়। এতো শিল্পীত মননে সবার মন রক্ষা করে একজন শিল্পী একটি চারাগাছের মতো একজীবনকে ফুলে-ফলে পরিপূর্ণ করবার স্থৈর্য্য (স্থিরতা) পান কমই। তাই তিনি বহু কিছু ছেড়ে আসা মানুষ। ছোটোবেলায় ছেড়েছেন দেশ, তারপর কমবয়সেই বাবাকে, এরপর একে একে পুরনো সব বোঝাপড়ার সঙ্গেও হিসাব চুকিয়ে হয়েছেন বিবর্তিত। সেদিক থেকে মায়ার এই জীবন-ল্যান্ডস্কেপটা যেনো একই সময়ে এতো সুন্দর অথচ বেদনায় পরিপূর্ণ। যেখানে সৌন্দর্যটা স্থায়ী, বেদনাটা বিস্মৃতির।
লেখক : তানভীর শাওন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
shawonmcj26@gmail.com
https://www.facebook.com/tanveeshawon
তথ্যসূত্র ও পাদটীকা
১. মায়া ডেরেনের শেষকৃত্যের ভস্ম ফুজি পর্বতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিলো।
২. শব্দটি Anarcy শব্দের বাংলা অনুবাদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটনের কাছে ঋণ করা।
৩. অভূতপূর্ব অর্থে।
৪. সোভিয়েত ইউনিয়নে গৃহযুদ্ধে কমিউনিস্ট বিরোধী সেনা, যারা হোয়াইট আর্মি বা হোয়াইট গার্ড নামে পরিচিত।
৫. সোভিয়েত ইউনিয়নে গৃহযুদ্ধে বলশেভিক সমর্থকদের সংক্ষেপে রেড আর্মি বলা হয়। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরের বিপ্লবের পর পরই এই আর্মি গঠন করা হয়।
6. Deren, Maya (1946); An Anagram of Ideas on Art, Form and Film; Barkly: Alicante Book Shop Press.
৭. জোয়ারদার, কৌশিক; ‘সিনেমায় উপেক্ষিতা’; আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৫ নভেম্বর ২০১৮।
8.Deren (1946).
9. Deren, Maya; `Amateur Versus Professional’; Film Culture; Editor: Nicolas Rapold; Film at Lincoln Center,Vol: 39, Year: 1965, Page: 45-46.
10. Nichols, Bill (2001: 3-10); `Maya Deren and the American Avant-Grade: Includes the complete text of An Anagram of ideas on Art, Form, and Film’; Berkeley: University of California Press.
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন