আলি আহমেদ নিশান
প্রকাশিত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
হলিউডের সুপারহিরো চলচ্চিত্র
ফ্যান্টাসির নামে বিশ্বজুড়ে গণসম্মতি উৎপাদনের অব্যর্থ অস্ত্র
আলি আহমেদ নিশান

ভূমিকার পরিবর্তে
অন্য সব প্রাণির চেয়ে মানুষ অনন্য, মানুষ চিন্তা করতে পারে। চিন্তা তাকে বিবর্তনের পথে নিয়ে যায়। মানুষ চিন্তা করে বলেই চড়ুই পাখির মতো লক্ষ লক্ষ বছর ধরে একই বাসা বানায় না। মানুষ দেখে, চিন্তা করে, কাজ করে, ভুল হয়, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চিন্তা করে, শ্রম দেয়। এভাবে শ্রমের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে সভ্যতা। আর এই হলো মানব ইতিহাসের সারকথা।
বাঘ হরিণকে তাড়া করলে হরিণ দৌড় দেয়। ততোক্ষণ পর্যন্ত সে দৌড়াতে থাকে যতোক্ষণ না নিরাপদ স্থানে পৌঁছে অথবা ক্লান্ত হয়ে পড়ে কিংবা বাঘের হাতে ধরা পড়ে। মানুষও বাঘ দেখামাত্র দৌড় দেয় ঠিকই, তবে কিছুদূর গিয়েই সে পিছনে তাকায়। চিন্তা করে, একই গতিতে দৌড়ালে বাঘ তাকে ধরতে পারবে কি না। সে অনুযায়ী সে হয় গাছে উঠে পড়ে, নইলে বাঘের সঙ্গে লড়াই করে নতুবা বাঘের কাছে প্রাণভিক্ষা চায়। সে যাত্রায় কোনো রকমে বেঁচে গেলে পরেরবার বনে যাওয়ার আগে বাঘের পূজা করে সে বের হয়।১ এমন বিচিত্র চিন্তা পৃথিবীতে কেবল মানুষই করতে পারে। এই চিন্তাশক্তি নিয়েই মানুষ সবকিছুকে প্রশ্ন করে। আগুনের কাছে গেলে তাপ কেনো লাগে, পানি কেনো ঠাণ্ডা, বৃষ্টি কেনো হয়, ঝড় থেকে বাঁচার উপায় কী ইত্যাদি। মানুষ কালে কালে নানাভাবে এ রকম প্রশ্ন করেছে, উত্তর খুঁজেছে। উত্তর যখন মেলেনি, তখন উত্তরের আশায় অসীমের দিকে তাকিয়ে থেকেছে, বশ মেনেছে, আত্মসমর্পণ করেছে, সঙ্গে বিদ্রোহ তো আছেই।
এভাবে আগুনের দেবতা, জলের দেবতা, খাবারের দেবতা তৈরি হয়েছে। দেবতার আসনে বসেছে বাঘ, গরু, সূর্য, সাগর, মরুভূমি, পাথর আরো কতো কী! আর মানুষ কালে কালে দেশে দেশে সেই দেবতাদের কাছে মনোবাসনা নিয়ে হাজির হয়েছে। সমাধান খুঁজেছে, উত্তর খুঁজেছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যে কাজ মানুষ পারেনি, সেগুলোর ইল্যুশন নিয়ে দেবতাদের হাজির করেছে।
এভাবেই মানুষের অপূর্ণ কামনা, আকাশে ওড়ার বাসনা, অসম্ভবকে বাস্তবে পরিণত করার ইচ্ছার প্রতিফলন হয়ে তার কল্পনায়-শিল্পে-সাহিত্যে-নাটকে-চলচ্চিত্রে হাজির হয়েছে ‘দেবতা’।‘সুপারহিরো’। এবং ‘আধুনিক’ সময়ে রাষ্ট্র থেকে পরিবার সবখানে এই চর্চা নানাভাবে, নানা পরিসরে তৈরি হয়েছে। মানুষ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে কখনো সেই দেবতা তথা সুপারহিরোর আসনে বসিয়েছে, কখনো পরিবারের ‘কর্তা’কে।
বাস্তবের গা-ঘেঁষা শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রে সুপারহিরো ধারণাটি কীভাবে এসেছে, রাজত্ব করেছে এবং টিকে আছে; আবার সেই চলচ্চিত্র বর্তমান সমাজব্যবস্থাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে তা দেখার চেষ্টা থাকবে এই লেখায়।
যে পরম্পরা জানা থাকা জরুরি
সুপারহিরো কী বা কে, সেটি বেশ ঘোলাটে এবং আপেক্ষিক প্রসঙ্গ। একজনের কাছে যিনি সুপারহিরো, অতি কাছের মানুষ--কোনো না কোনোভাবে অন্যজনের কাছে তিনি ভয়াবহ শত্রু। সহজ করে বোঝার খাতিরে সুপারহিরোর একটি সংজ্ঞা নেওয়া যেতে পারে, বিশেষ অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা, শক্তি বা আশির্বাদপ্রাপ্ত (কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিআধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারপ্রাপ্ত) যে ব্যক্তি ছদ্মবেশ ধারণ করে অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করেন তিনিই সুপারহিরো।২
সুপারহিরো ব্যাপারটি একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত। বিংশ শতকের গোড়ার দিকেই নাটকে-সাহিত্যে নানাভাবে সুপারহিরো ধারাটির চল শুরু হয়। যদি ইংরেজি লোকসাহিত্যের ‘রবিনহুড’ চরিত্রকে সুপারহিরো না বলা হয়, তাহলে ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে ‘দ্য স্কারলেট পিমপারনেট’ নাটকেই দর্শক মূলত প্রথম মুখোশ পরিহিত ছদ্মবেশধারী একজন ‘সুপারহিরো’র দেখা পায়।৩ এরপর বিখ্যাত আমেরিকান ম্যাগাজিন ‘পাল্প ফিকশন’ একের পর এক সুপারহিরো চরিত্র নির্মাণ করতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে ‘দ্য গ্রে সিল’ (১৯১৪), ‘জোরো’ (১৯১৯), ‘বুক রজার্স’ (১৯২৮), ‘হুগো ড্যানার’ (১৯৩০) উল্লেখযোগ্য।
১৯৩০-এর দশক বলতে গেলে সুপারহিরো কমিক, নাটক আর গল্প নির্মাণের স্বর্ণযুগ। এ সময়ে এসে শুরু হয় নির্দিষ্ট সুসজ্জিত পোশাক ও মুখোশধারী সুপারহিরোদের যাত্রা। সুপারম্যান, ব্যাটম্যান এবং ক্যাপ্টেন মার্ভেলদের জন্ম এই দশকেই। তারপর ৪০-এর দশকে এসে ‘ফ্ল্যাশ’, ‘গ্রিন ল্যান্টার্ন’, ‘ব্লু বিটল’-এর মতো সুপারহিরোদের আগমন ঘটে। আর এই দশকেই সুপারহিরোদের বিপরীতে প্রথম ‘ব্ল্যাক উইডো’র মতো (অ্যান্টি হিরো) নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়। এবং কিছুদিনের ব্যবধানেই ‘উইম্যান ইন রেড’ নামের সুপারহিরোইন চরিত্রটি সামনে আসে।
অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সারাবিশ্বের মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ-দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষ যখন রাজত্ব চালাচ্ছে, তার মধ্যেই সুপারহিরো কমিকের বাণিজ্য বাড়তে থাকে হু হু করে। একের পর এক কমিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে, নির্মাণ হতে থাকে সুপারহিরো চরিত্র। এই কাতারে মার্ভেল, ডি সি কমিকস, স্ট্যান্ডার্ড কমিকস-এর মতো বড়ো বড়ো নাম পাওয়া যায়, যারা বর্তমানেও দাপটের সঙ্গে টিকে আছে। এ দশকেরই প্রথম দিকে ‘ব্যাটম্যান’ টেলিভিশন সিরিজ ও শেষের দিকে ‘সুপারম্যান’ নির্মাণ হয়।
এতোক্ষণ মোটামুটি আমেরিকার কথাই হচ্ছিলো। আমেরিকা ছাড়াও কিন্তু গোটা বিশ্বে সেসময় প্রচুর সুপারহিরো চরিত্র নির্মাণ হতে থাকে। এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ না দিলেই নয়--হিটলার তখন সারাবিশ্বকে ‘অতিষ্ঠ’ করে ফেলেছে। সামরিক, বেসামরিক, বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বিষয়ই তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেই। এমন একটা সময়ে মানে বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, একটি জনশ্রুতি তৈরি হয়--চেকোস্লোভাকিয়ায় ‘পেরাক’ নামে জনৈক ব্যক্তি, যিনি হিটলার এবং গেস্টাপো বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা রকম ‘কাণ্ডকলাপ’ শুরু করেছেন। তাদের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন এবং নানাভাবে হিটলার এবং তার বাহিনীর ‘মাথাব্যথার’ কারণে পরিণত হয়েছেন। যদিও পেরাকের বিষয়ে কোনো চাক্ষুস প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু এই জনশ্রুতির ওপর ভর করে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দেই নির্মাণ হয় দ্য স্প্রিং ম্যান অ্যান্ড দ্য এস এস নামের একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র। সেখানে দেখা যায়, একজন মানুষ জুতার সঙ্গে সোফার স্প্রিং লাগিয়ে অনেক বড়ো বড়ো লাফ দিতে এবং দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পারেন। এই সহজ আবিষ্কারটিকে কাজে লাগিয়েই তিনি হিটলারকে তার ঘরের মধ্যে ঢুকে নাস্তানাবুদ করছেন। গেস্টাপো বাহিনীর কাজে বিশৃঙ্খলা ঘটাচ্ছেন। এক কথায় হিটলারের একমুখী রাজত্বের মধ্যে ‘জ্বালাতন’ সৃষ্টি করেছেন, প্রশ্নের মুখে ফেলছেন।৪ দৈর্ঘ্যে ছোটো এই চলচ্চিত্রটি কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ভূমিকা রাখে।
৫০ দশকও ছিলো তাৎপর্যপূর্ণ। এ দশকে ডি সি কমিকস দাপুটে সব সুপারহিরোদের বিপরীতে পাঠককে পরিচয় করায় ‘ব্যাট ওম্যান’, ‘সুপারগার্ল’, ‘মিস অ্যারোওয়েটে’ ও ‘ব্যাটগার্ল’-এর মতো সুপারহিরোইনদের সঙ্গে। অন্যদিকে জাপানের বিখ্যাত কমিক লেখক, কার্টুনিস্ট ও অ্যানিমেটর ওসামা তেজুকা নির্মাণ করেন ‘তেতসুয়ান (শক্তিশালী) অ্যাটম’ নামের রোবট চরিত্র। পশ্চিমে এটি পরিচিতি পায় ‘অ্যাস্ট্রো বয়’ হিসেবে। দশকের শেষের দিকে এসে ‘অ্যাস্ট্রো বয়’কে টেলিভিশনের জন্যও নির্মাণ করা হয়। টেলিভিশনেও অ্যাস্ট্রো বয় সমান দাপটে দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। অ্যাস্ট্রো বয় ছাড়াও জাপানি টেলিভিশনে ওই সময়েই ‘সুপার জায়ান্ট’, ‘মুনলাইট মাস্ক’-এর মতো কিছু চরিত্রও বেশ খ্যাতি পায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই দশকের শুরুতেই অর্থাৎ ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে সুপারম্যান অ্যান্ড দ্য মোল মেন নামে প্রথম একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়।৫ এরপর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ১৯৬০-এর দশকে--ব্যাটম্যান (১৯৬৬)। এই দশকেই দীর্ঘ কলেবরের ধারাবাহিক কমিক নির্মাণ শুরু করে মার্ভেল। এই তালিকায় থাকে স্পাইডারম্যান, হাল্ক, ডেয়ারডেভিল, আয়রন ম্যান, থর, ক্যাপ্টেন আমেরিকা’র মতো বড়ো বড়ো নাম। অন্যদিকে ডি সি কমিকসও পিছিয়ে থাকে না। তারা একই গল্পে একাধিক সুপারহিরো নিয়ে কাজ করে, অর্থাৎ একদল সুপারহিরোর অভিযান। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এই দলের মধ্যে অন্তত একজন সুপারহিরোইনও থাকতো। উদাহরণ হিসেবে এক্স-ম্যান, ফ্যান্টাস্টিক ফোর, অ্যাভেঞ্জার্স ওয়াস্প ইত্যাদি।
১৯৭০ দশকটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, এই সময়টাতে সুপারহিরোদের বিপরীতে সমানতালে দর্শকপ্রিয় কিছু সুপারভিলেন চরিত্র নির্মাণ হয়। যেমন, স্কালম্যান, ডেভিলম্যান, পানিশার ইত্যাদি। ১৯৬০-এর দশক শেষ থেকেই মূলত শুরু হয় সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজিম৬ এর কাল। এ সময় সাহিত্যে, টেলিভিশনে ভীষণভাবে নারী চরিত্র প্রাধান্যশীল কনটেন্ট নির্মাণ শুরু হয়। সমানতালে শীর্ষস্থানীয় কমিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্মাণ করে বেশকিছু সুপারহিরোইন। এদের মধ্যে ডি সি কমিকের ‘বিগ বার্ডা’, ‘পাওয়ার গার্ল’, ‘দ্য হান্ট্রেস’, মার্ভেলের ‘সেকেন্ড ব্ল্যাক উইডো’, ‘দ্য ক্যাট’রা বেশ খ্যাতি পায়। কমিক কিংবা টেলিভিশন কনটেন্টের ফাঁকে ফাঁকে কিছু চলচ্চিত্রও নির্মাণ হয়। এছাড়া হলিউডে ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ হয় সুপারম্যান। ৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেটের সুপারম্যান তিনশো মিলিয়নের উপর ব্যবসা করে।৭ এরপর থেকেই মূলত শুরু হয় সুপারহিরোদের রমরমা চলচ্চিত্রযাত্রা।
‘সুপারহিরো’ নির্মাণের রাজনৈতিক অর্থনীতি
একটি সমাজের বিশেষ সময়কালের প্রতিচ্ছবি হয়ে ধরা দেয় সেই সময়কার শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র। এগুলোর দিকে ভালো করে খেয়াল করলে খুঁজে নেওয়া সম্ভব নির্দিষ্ট সময়কালটির রাজনীতি-অর্থনীতির হালচাল। কারণ মানুষ অচেতনেই তার সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সময়ের গল্প বলে। অন্যদিকে দর্শক-পাঠক শিল্পের মধ্যে ‘নিজেকে’ খোঁজে, তার নিজের হতাশা-বেদনা-দুঃখগুলোকে ধরতে চায়, সেই যন্ত্রণার সমাধান চায়। এ দিক থেকে চিন্তা করতে গেলে, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে যদি বিশেষ কোনো ধরনের ‘শিল্প’ অত্যধিক জনপ্রিয় হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই শিল্পের মধ্যে এমন কিছু আছে যাতে মানুষ নিজেকে খুঁজে পাচ্ছে, নিজের যাপিত জীবন-সমাজ-সময়কালকে খুঁজে পাচ্ছে।
এই পরিপ্রেক্ষিত মাথায় রেখে আমেরিকান সুপারহিরো কমিকের উত্থানের সময়টা আলোচনা করা যেতে পারে। আমেরিকায় সুপারহিরো কমিকের চাহিদা ব্যাপক হারে বাড়ে ১৯৩০-এর দশকে। শিশু থেকে বুড়ো সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই বিষয়টির প্রতি আগ্রহী হয়। আর পাঠকের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান হারে নির্মাণ হতে থাকে একের পর এক সুপারহিরো চরিত্র। তার মানে কী? ১৯৩০ দশকে কী এমন ঘটছিলো যার কারণে মানুষ এতো বেশি পরিমাণে সুপারহিরোর দিকে ঝুঁকছিলো।
‘হিস্টোরি ডটকম’-এর মতো বহুল প্রচলিত কিছু ওয়েবসাইট থেকে যে ইতিহাস পাওয় যায়, তা মোটামুটি এই রকম--১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ অক্টোবর। সেদিন হঠাৎ করে আমেরিকার স্টক মার্কেটে বিশাল এক ধস নামে। এ ধসের নির্দিষ্ট কোনো কারণ ছিলো না--প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সম্পদের ভয়াবহ অসম বণ্টন, কৃষিতে অবনতি, প্রথম মহাযুদ্ধের প্রভাব, বিশ্বজুড়ে স্প্যানিশ ফ্লু’র ভয়াবহতা সব একসঙ্গে জেঁকে বসে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমেরিকায় নয় হাজার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, দেড় কোটি মানুষ চাকরি হারায়, যা তখন মোট উপার্জনক্ষমদের প্রায় এক চতুর্থাংশ। চাকরি হারানোর ফলে ক্রয়ক্ষমতা একেবারে শূন্যের কাছে চলে আসে বিশাল একটা শ্রেণির। বাজারব্যবস্থা পড়ে ভয়াবহ বিপত্তির মুখে। এর প্রভাব সমাজের প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে। অর্থনৈতিক এ ধসের প্রভাব হয় দীর্ঘমেয়াদি। লাখ লাখ মানুষকে ত্রাণের লাইনে দাঁড়াতে হয়। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি হার্বার্ট হুভারের সরকারও খুব বেশি অবদান রাখতে পারছিলো না এমন দুঃসময়ে। মোটা দাগে, আমেরিকার অর্থনীতি হাঁটুর ভরে বসে পড়ে।৮
ঠিক এমন সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। আমেরিকার মানুষ যখন সরকারের ওপর থেকে একেবারে বিশ্বাস তুলে নিয়েছিলো, তখন রুজভেল্ট ও তার সরকার ১৫টির মতো আইন পাস করে। সে আইনের মধ্যে ‘এগ্রিকালচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট অ্যাক্ট’, ‘হোম ওনার্স লোন অ্যাক্ট’, ‘ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিকভারি অ্যাক্ট’ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এবং চলতি ইতিহাস অনুযায়ী, এ আইনগুলোর ফলেই আমেরিকার অর্থনীতি হাঁটি হাঁটি পা পা করে সামনে এগোতে শুরু করে। প্রচলিত ইতিহাস থেকে এটা বোঝার আশঙ্কা তৈরি হয় যে, রুজভেল্ট ও তার কয়েকটা আইনই আসলে পুরো দেশকে সেই ভয়াবহতা থেকে বের করে এনেছে। অথচ লাখো মানুষের শ্রম-ঘাম-উদ্যোম সেখানে অনুপস্থিত। এবং রুজভেল্টের ইমেজ সুপারহিরোর মতো গরিমা নিয়ে হাজির। প্রশ্ন উঠতেই পারে--কীভাবে?
প্রতিটি সমাজব্যবস্থার মধ্যেই সেই ব্যবস্থার ধ্বংসের উপাদান থাকে, থাকে শোষণ আর নিপীড়নের গল্প। নিয়ত প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে অল্পকিছু মানুষ ব্যবস্থার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ফাঁকগুলো ধরিয়ে দেয়; জনমানুষকে তাড়িত করে নতুন সমাজ, নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। অন্যদিকে প্রচলিত ব্যবস্থার পক্ষের মানুষ থাকে প্রচুর। ক্ষমতা-পুঁজি সব থাকে তাদেরই হাতে। এমনি এমনি সবকিছু ছেড়ে, সন্ন্যাসী হয়ে সমাজব্যবস্থা পাল্টে ফেলার কোনো কারণই এই শ্রেণির হাতে থাকে না। তাই বিশেষ এই শ্রেণিটি নানা কায়দায় ক্ষমতার লাগাম হাতছাড়া করতে চায় না। আবার শুধু লাগাম টেনে তো আর ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না, প্রয়োজন পড়ে ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালন যন্ত্র’।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় এই যন্ত্র নির্দিষ্ট কোনো ‘যন্তর মন্তর’ কক্ষে থাকে না। এটি ঈশ্বরের মতো সর্বব্যাপী বিরাজমান। সংসদ ভবন থেকে শোবার ঘরে, জাতিসংঘ থেকে শুরু করে শৌচালয়ে প্রতিনিয়ত এই যন্ত্র কাজ করে চলে। এই কাজ বোঝার জন্য বিশারদ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। খালি চোখে খেয়াল করলেই বোঝা যায়, প্রতিনিয়ত লাখ লাখ বিজ্ঞাপন-পোস্টার-শিল্প-সাহিত্য-মিডিয়া-সংগঠন-ধর্ম সবকিছুর ছদ্মবেশ নিয়ে চলতে থাকে গণসম্মতি উৎপাদনের খেলা। আর সেই যন্ত্রে মস্তিষ্ককে এমন প্রক্ষালন করা হয়, এমনই আধিপত্যের পাঠ পড়ানো হয় যে, ১৬ ঘণ্টা রক্ত পানি করে আসা শ্রমিকও ‘ভরপেট নাও খাই, রাজকর দেওয়া চায়’ জাতীয় বুলি আওড়াতে থাকে।
এমন পরিস্থিতিতে যতোদূর সম্ভব ৩০-এর দশকে সুপারহিরো কমিকগুলো আসে সেই ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালন’ যন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে। সঙ্গে অন্যান্য মিডিয়া, ইতিহাসবিদ, গৃহপালিত বুদ্ধিজীবী তো ছিলোই। সবাই মিলে এমন পরিস্থিতির নির্মাণ করে যেনো জনবিরোধের সৃষ্টি না হয়। আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট জনতার সামনে হাজির হন ‘সুপারহিরো’ হিসেবে। ফলে জনগণ তাদের নিয়তিকে দুষতে দুষতে এই আকাঙ্ক্ষায় বিভোর থাকলো যে, ‘সুপারহিরো আসবে, তাদের রক্ষা করবে।’
আলোচনার স্বার্থে যে প্রক্রিয়ায় চলচ্চিত্র বাছাই
হলিউডে সুপারহিরো চলচ্চিত্রের বাণিজ্য শুরু বলতে গেলে সুপারম্যান (১৯৭৮) এর হাত ধরে। তাই নমুনা হিসেবে সেই চলচ্চিত্রটি নেওয়া হয়েছে। তারপর থেকে বিশ্বজুড়ে প্রচুর সুপারহিরো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। ১৯৭৮-এর পর শুধু হলিউডে সুপারম্যান সিরিজেরই ১৩টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। আধেয়কে খুব বেশি বিস্তৃত না করার উদ্দেশ্যে এই লেখায় তিনটি চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে এই সিরিজেরই আর দুটো চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর মুক্তি পাওয়া আরো দুটি চলচ্চিত্র নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ৯০ দশকে সুপারম্যান সিরিজের কোনো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়নি। কাজেই ৮০-র দশকের পর ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত সুপারম্যান রিটার্নসই সুপারম্যান সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র। তাই এটিকে নমুনা হিসেবে ধরা হয়েছে। তার পরের দশকে সুপারম্যান সিরিজের প্রথম চলচ্চিত্র ম্যান অব স্টিল (২০১৩)।
‘খালি’ চোখে দেখা
সুপারম্যান (১৯৭৮) এর আখ্যান
ক্রিপ্টন নামে একটি গ্রহ ছিলো। ক্রিপ্টনের অন্যতম মেধাবী বিজ্ঞানী জোর-এল গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারেন, গ্রহটি আগামী এক মাসের মধ্যেই বিষ্ফোরিত হবে। কিন্তু অন্যান্য বিজ্ঞানীরা জোর-এর কথা বিশ্বাস করে না। তারা উল্টো জোরকেই একঘরে করে দিতে চায়। একপর্যায়ে জোর তার ছেলে কাল-এল’কে তার উপযোগী আবহাওয়ার গ্রহ পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। এদিকে এক মাসের মধ্যে ক্রিপ্টন বিষ্ফোরিত হয়। কাল পৃথিবীতে এসে গ্রামের এক কৃষক দম্পতির কাছে বড়ো হতে থাকেন। পালক বাবা-মা তার নাম দেন ক্লার্ক। শুরু থেকেই ক্লার্কের মধ্যে ‘অস্বাভাবিক’ কিছু ক্ষমতা লক্ষ করেন পালক বাবা-মা। যেমন, একহাতে ট্রাক তুলে ফেলা, ট্রেনের চেয়েও দ্রুতগতিতে দৌড়ানো ইত্যাদি। এই খবর জানাজানি হলে ছেলের ক্ষতি হবে আশঙ্কা করে তিনি ক্লার্ককে নিজের ক্ষমতা লুকিয়ে রাখার পরামর্শ দেন।
একসময় ক্লার্ক গ্রাম ছেড়ে আসেন শহরে, শহরের নাম মেট্রোপলিস। অর্থগত দিক থেকে মেট্রোপলিস মানে বড়ো শহর। সেখানে ‘দ্য প্ল্যানেট’ নামের একটি প্রভাবশালী দৈনিকে তিনি কাজ শুরু করেন। ‘দ্য প্ল্যানেট’-এর সাংবাদিক লুইস লেনের সঙ্গে সখ্য তৈরি হয় ক্লার্কের। এর কিছু সময় পরে একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটে। সেখানে লুইসসহ সবাইকে উদ্ধারের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ পায় ক্লার্কের ক্ষমতা। এই ঘটনার পর সবাই তার নাম দেয় সুপারম্যান। এরপর থেকে সুপারম্যান মেট্রোপলিস শহরের ত্রাণকর্তায় পরিণত হন। যেমন, বাড়িতে চোর ঢুকেছে সুপারম্যান হাজির; ডাকাত পড়েছে সুপারম্যান হাজির। পোষা বিড়ালটা গাছ থেকে নামতে পারছে না, সুপারম্যান উড়ে এসে বিড়াল নামিয়ে দিয়ে যাবে ইত্যাদি।
এদিকে মেট্রোপলিস প্রশাসন দুটি মিসাইল পরীক্ষার পরিকল্পনা করে। সেই মিসাইলের প্রোগ্রামিং-এ সমস্যা তৈরি করেন শহরের দুর্ধর্ষ দুষ্কৃতিকারী লেক্স লুথার ও তার দল। এতে করে মিসাইল দুটি তার গতিপথ বদলে জনবসতির দিকে ছুটে যায়। ঘটনা বুঝতে পেরে সুপারম্যান ছুটে আসেন। তিনি একটি মিসাইলের গতিপথ পাল্টে মহাশূন্যের দিকে ছুড়ে দেন। কিন্তু অন্যটি জনবসতির পাশে মাটিতে আঘাত করে। এতে ভয়াবহ ভূমিকম্প শুরু হয় এবং শহরের সব অবকাঠামো, স্থাপনা ভেঙে পড়তে শুরু করে। আর এই ধ্বংসলীলার মধ্যেই সুপারম্যানের সাংবাদিক বান্ধবী লুইস মারা যান। এ ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না সুপারম্যান। তিনি পৃথিবীর চারপাশে আহ্নিক গতির বিপরীতে দ্রুতগতিতে ঘোরা শুরু করেন। তাতে পৃথিবীর ঘূর্ণন উল্টে যায়। ফলে সময় চলা শুরু করে উল্টো দিকে--দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ ... এভাবে। তাতে লুইস মারা যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে আসলে সুপারম্যান তাকে রক্ষা করেন। এবং লেক্স ও তার দলকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
সুপারম্যান রিটার্নস (২০০৬) এর আখ্যান
নিজের গ্রহ ক্রিপ্টনে প্রাণের হদিস আছে জেনে হঠাৎ একদিন সুপারম্যান পৃথিবী থেকে চলে যান। কিন্তু ক্রিপ্টনে গিয়ে কিছুই পান না তিনি। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ফিরে এসে সুপারম্যান দেখেন, অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। মানুষের মনে তার জন্য আকুতি, লুইস লেনের ভালোবাসা সবই বদলে গেছে। এমনকি তিনি ফিরে এসে দেখেন, লুইস বিয়ে করেছেন এবং তার একটি ছেলেও আছে। অবশ্য চলচ্চিত্রের শেষে তিনি জানতে পারেন, ছেলেটি সুপারম্যানের নিজের।
অন্যদিকে লেক্স লুথার এক ধনাঢ্য বুড়ির সেবা করে, ভালো মানুষি দেখিয়ে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি ক্রিপ্টন থেকে আসা বিশেষ একটি ক্রিস্টালের খোঁজ পান। এই বিশেষ ক্রিস্টালটি সমুদ্রে নিক্ষেপ করলে সে জায়গা থেকে ভূপৃষ্ঠের বুক ফুঁড়ে প্রচুর জমি বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ সেখানে নতুন একটি ভূখণ্ড তৈরি হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় প্রবল ভূমিকম্প হওয়ায় ভূপৃষ্ঠে ফাটল ধরার আশঙ্কা থাকে। লেক্স সব আশঙ্কাকে উড়িয়ে দিয়ে সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন ক্রিস্টালটি। প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প শুরু হয়, ভূপৃষ্ঠে বিশাল ফাটল ধরে, শহরের ভবন-স্থাপনা ভেঙে পড়তে শুরু করে ইত্যাদি। একই সঙ্গে পুরনো ভূখণ্ডটি বিলীন হতে শুরু করে। এমন অবস্থায় সুপারম্যান আসেন এবং নতুন সৃষ্টি হওয়া পুরো ভূখণ্ডটিকে তুলে নিয়ে মহাকাশে ছুড়ে মারেন। এভাবে ভয়াবহ এক ধ্বংসলীলা থেকে মেট্রোপলিস শহরকে বাঁচান।
ম্যান অব স্টিল (২০১৩) এর আখ্যান
ক্রিপ্টনের মানুষ প্রাযুক্তিক উন্নয়নের এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, সেখানে শিশুর জন্মও হচ্ছিলো কৃত্রিমভাবে। সে পদ্ধতি অনুযায়ী, আগে থেকেই ঠিক করা যেতো শিশুর কী কী ‘গুণ’ থাকবে, অনাগত শিশুটি কর্মীর বৈশিষ্ট্য ধারণ করবে নাকি নেতার, সৈন্যের নাকি কৃষকের। মানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কেমন হবে, কীভাবে চিন্তা করবে তা ঠিক করার ক্ষমতা ছিলো অল্প কিছু মানুষের হাতে। প্রযুক্তির এমন ‘উন্নয়নের’ উল্টো দিকে ক্রিপ্টনের সব প্রাকৃতিক সম্পদ শেষ হয়ে আসছিলো। এমন পরিস্থিতিতে ক্রিপ্টনবাসী একটি বিকল্প গ্রহের সন্ধানে ছিলো, যার প্রাকৃতিক সম্পদ তারা পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করতে পারবে।
কৃত্রিম প্রজননের এ রকম এক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেয় কাল-এল (সুপারম্যান)। কাল-এর বাবা জোর-এল ক্রিপ্টনের অন্যতম মেধাবী বিজ্ঞানী। তিনি অন্যান্য বিজ্ঞানী ও সামরিক বাহিনীর আগেই ক্রিপ্টনের বিকল্প হিসেবে পৃথিবীর খোঁজ পান। এবং কালের শরীরে এমন এক জেনেটিক কোড ইনস্টল করেন যাতে সে পৃথিবীর আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে পারে। এরপর তাকে একটি মহাকাশযানে করে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। এদিকে ক্রিপ্টন গ্রহের সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল জড জানতে পারেন জোর-এল এর আবিষ্কার করা কোড সম্পর্কে। জড কোডটি নেওয়ার উদ্দেশ্যে তার দলবল নিয়ে আসেন জোর-এল এর কাছে। কিন্তু জোর-এল কোডটি দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে খুন করেন জড। জোরকে খুন করার অপরাধে জড ও তার দলকে ক্রিপ্টন থেকে নির্বাসিত করা হয়। জড ও তার দলকে ক্রিপ্টনের বাইরে পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্রিপ্টন বিস্ফোরিত হয়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড থেকে ক্রিপ্টন মুছে যায়।
এদিকে ক্রিপ্টনের আবহাওয়া থেকে পৃথিবীর আবহাওয়া অনেকটা হালকা, বাতাস নির্মল, প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে ভরপুর। এখানে বেঁচে থাকতে গেলে ক্রিপ্টনের মতো স্ট্রাগল করতে হয় না। এর ফলে পৃথিবীতে কালের কিছু ‘অস্বাভাবিক’ ক্ষমতা দেখা দেয়। পৃথিবীতে এসে প্রচুর শারীরিক ক্ষমতার অধিকারী হয় কাল। মানুষ কোনো বিপদে পড়লেই সে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু পালক বাবার নিষেধ অনুযায়ী সে তার ক্ষমতা প্রকাশ করে না। এখানেও কালের নাম ক্লার্কই হয়।
৩৩ বছর পর জড পৃথিবীর খোঁজ পান। তিনি পৃথিবীকে নিজেদের পরবর্তী বাসস্থান বানাতে প্রবৃত্ত হন। বিশেষ একটি যন্ত্র ব্যবহার করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে ক্রিপ্টনের বায়ুমণ্ডলের মতো করতে শুরু করেন। এতে পৃথিবীর জীবেরা জীবন সঙ্কটে পড়ে। পৃথিবী তথা আমেরিকার সমস্ত সৈন্য ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জডের মোকাবিলা করতে ছুটে আসে। কিন্তু সবকিছু জডের সামনে ফিকে হয়ে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ক্লার্ক ও জডের সংঘর্ষ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত জড ও তার বাহিনীর হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করে ক্লার্ক ওরফে সুপারম্যান।
‘চশমা’ চোখে দেখা
শহরের রেপ্রিজেন্টেশন
আমেরিকান চলচ্চিত্র সুপারম্যান (১৯৭৮) এ যে সময়টি দেখানো হয়, তখন আমেরিকার ‘বিপরীতে’ সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো। এই ‘বিপরীত’ শব্দটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে অন্যান্য অনেক দিক থেকেই। পুঁজির শোষণের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব, সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব, বিজ্ঞানে অগ্রগতি সম্ভব--সোভিয়েত ইউনিয়ন সেটা দেখিয়ে চলছিলো। (সোভিয়েত ইউনিয়ন তাহলে ভেঙে গেলো কেনো, সেটা আলাদা প্রসঙ্গ) এবং যেকোনো দিক থেকেই রাশিয়ার ‘উন্নয়ন’ ছিলো পুঁজিবাদী বিশ্ব তথা আমেরিকার জন্য চপেটাঘাতের মতোই। আর অনেকটা সে কারণেই আমেরিকান শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্রে নানাভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন-বিদ্বেষ উঠে আসে। চোখে পড়ে সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার কামনা। সুপারম্যান (১৯৭৮) এর শুরুতেই দেখা যায়, ক্রিপ্টন দূষিত হয়ে পড়েছে, তা আর বসবাসের যোগ্য নয়, সেখানকার আলো-হাওয়া শ্বাস নেওয়ার মতোও নেই। এমনকি আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পুরো গ্রহটিই ধ্বংস হতে চলেছে। সমস্ত ‘খারাপে’ ভরে উঠেছে ক্রিপ্টন। আর এর বিপরীতে ‘ভালো’ গ্রহ হিসেবে হাজির হচ্ছে পৃথিবী। আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে মেট্রোপলিস শহর। এ শহর ‘হাত’ ও ‘মাথা’র সমন্বয়কারী ‘হৃদয়’ওয়ালা শ্রমিকদের মেট্রোপলিস নয়।৯ এ শহর একটু বেশিই পুঁজিপতিদের, ক্ষমতাবানদের। এ শহর আমেরিকারই নামান্তর মাত্র (তাই যতোবারই মেট্রাপলিস শহরের নাম বলা হয়, পাঠক সে জায়গায় আমেরিকারই নাম কল্পনা করে নেয় আসলে)। আর মেট্রোপলিসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ক্রিপ্টন গ্রহের নামে সামগ্রিকভাবে দর্শকের সামনে হাজির করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। যে সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্মাতার চোখে বসবাসের অযোগ্য, ভারী বাতাসওয়ালা দূষিত গ্রহ এবং যা অচিরেই ভেঙে যাবে। অথচ ক্রিপ্টনে (তথা সোভিয়েত ইউনিয়নে) মানুষ কীভাবে থাকে, তাদের বসবাসের ধরন-অর্থনীতি-রাজনীতি-সংস্কৃতি-জীবনবোধ নিয়ে কোনো আভাসই পাওয়া যায় না চলচ্চিত্রে।
সুপারম্যান রিটার্নস (২০০৬) এ এসে আবার যে মেট্রোপলিস শহর চোখে পড়ে তা আগের বারের চেয়ে ভিন্ন। এখানে লেক্স লুথার একজন অতি ধনী ক্ষমতাধর মানুষ। মেট্রোপলিস শহরটাকে তার আর ভালো লাগে না। কারণ এ শহরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ নেই। তাই তিনি একটা নতুন শহর নির্মাণ করতে চান। মেট্রোপলিসের পাশেই, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মেট্রোপলিসের উপরই। কিন্তু সেটা করতে গেলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হবে, কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে, মেট্রাপলিস ধ্বংস হয়ে যাবে--সেটা লেক্সের কাছে কোনো সমস্যাই নয়। নিঃসঙ্কোচে তিনি বলেন, ‘It's simple physics, Miss Lane. Two objects can not occupy the same space at the same time.’ (এক ঘণ্টা ২৬ মিনিট) এ যেনো বড়ো বড়ো শহরে সহায়হীনদের বস্তি উচ্ছেদের চিরন্তন ঘটনা। আর লেক্স এখানে সমাজের পুঁজিপতি-ক্ষমতাবান শ্রেণির প্রতিনিধি। যেমন করে বাংলাদেশের মতো দেশেও বস্তিতে আগুন লাগে, হাজার হাজর মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, মারা যায়; তার কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে বিশাল বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ শুরু হয়।
ম্যান অব স্টিল-এর শহর দর্শন বাকি দুটোর থেকে একেবারেই আলাদা। এখানে ক্রিপ্টন গ্রহ হাজির হয় আমেরিকার প্রতিনিধি হিসেবে। আমেরিকার মতো ক্ষমতাধর, প্রযুক্তিতে উন্নত, সাম্রাজ্যবাদী হিসেবে নির্মাতা হাজির করেন ক্রিপ্টনকে। যেমন, চলচ্চিত্রের শুরুতেই ক্রিপ্টনের প্রাকৃতিক সম্পদ শেষ হওয়ায় বিকল্প গ্রহ হিসেবে পৃথিবীর খোঁজ পায় তারা। তারপর পৃথিবীর পরিবেশ, জীব-জন্তুর কোনো রকম চিন্তা না করেই পুরো পৃথিবীকে আত্মসাৎ করতে উদ্যত হয় ক্রিপ্টনবাসী। অমেরিকার গত দুই—তিন দশকের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া তথা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং বিভিন্ন সময়ে তারা তেল-গ্যাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ তুলে আনতে চেয়েছে। অথচ সেসব দেশের নিজেদের জনগণ, তাদের দাবি-অধিকার, প্রয়োজন সবই আছে। সোজা কথায়, আমেরিকার হাতে তারা মোটেও নিজেদের সবকিছু তুলে দিতে চায়নি। কিন্তু নিজেদের প্রয়োজনে ‘আঙ্গুল বাঁকা’ করেছে আমেরিকা। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গোটা বিশ্বের চোখে পুরো একটা জাতির লিগেসিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে কখনো কখনো। ‘সন্ত্রাসী’, ‘মৌলবাদী’, ‘উগ্রপন্থি’--এমন হাজারো তকমায় পরিচয় করিয়েছে বিশ্বের সামনে। আবার সেই ‘নির্মিত মৌলাবাদ’ উচ্ছেদের মহান দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে তারা সেনা পাঠিয়েছে, মানবতার ‘সেবা’ করেছে। আর এতো কিছুর আড়ালে তাদের সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদী চেহারাটা সামনে আসতে দেয়নি।
দ্বিতীয়ত, ক্রিপ্টনে কৃত্রিম উপায়ে শিশু জন্মদানের মাধ্যমে সামান্য কিছু মানুষের পুরো প্রজন্মের ওপর নিয়ন্ত্রণের ‘পাঁয়তারা’ চোখে পড়ে। আবার আমেরিকা তথা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। এ আলোচনা অনেকাংশে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক। আগেই আলোচনা হয়েছে, শুধু পেশিশক্তি দিয়ে বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, তার জন্য সম্মতি উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে। আর সেই সম্মতি উৎপাদনের জন্য প্রোপাগান্ডা মডেল অনুসরণ করা হয়। টেলিভিশন তৈরি করা হয়, চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, শিল্প সৃষ্টি হয়, সাহিত্য হয়। এবং শেষমেষ বিশাল জনগোষ্ঠী কীভাবে চিন্তা করবে, কী খাবে, কী পরবে, কোনটাকে সুন্দর বলবে--ঠিক করে দেওয়া হয়। মানে কৃত্রিম শিশু জন্মদান হয় না ঠিকই, কিন্তু একই প্রক্রিয়া চালানো হয় সেই ক্রিপ্টনে, সেই আমেরিকায়।
তৃতীয়ত, যখন ক্রিপ্টন থেকে ভয়াবহ সব অস্ত্র নিয়ে জেনারেল জডেরা পৃথিবীতে নেমে আসে, তখন সুপারম্যানও হয়ে পড়েন অসহায়। সে অস্ত্র তো সাধারণ কোনো অস্ত্র নয়। সে অস্ত্রশস্ত্রের সামনে পৃথিবীর উন্নততম অস্ত্রগুলোও নেহাৎ বাঁশের লাঠির মতোই ফিকে হয়ে আসে।
সে অস্ত্রের বাহার দেখে চলচ্চিত্রে পৃথিবীর মানুষ হয়ে পড়ে আতঙ্কিত। অথচ প্রেক্ষাগৃহে বসা বাস্তবের মানুষগুলো কেনো জানি মনে হয়, সে আতঙ্কটা ধারণ করে না। তারা বেশ উপভোগই করে। এই অস্ত্র প্রদর্শন উপভোগ্য না হলে কি বিশ্বজুড়ে অন্যতম সফল বাণিজ্য হিসেবে অস্ত্রের বাণিজ্য দাঁড়ায়! সে বাণিজ্যে আবার আমেরিকার নাম সবার আগে। একটা সহজ সমীকরণ--যতো অস্ত্র পৃথিবীতে বাড়বে, বিশ্ব শান্তি ভঙ্গের আশঙ্কা বাড়বে, যুদ্ধের আশঙ্কা ততো বাড়বে। আর তাছাড়া অস্ত্রের বাণিজ্য এগিয়ে নিতে গেলে যুদ্ধ ছাড়া উপায় কী!
সুপারম্যানের উপস্থাপন
একটা বিষয়ে মোটামুটি ধারণা আসে, ক্রিপ্টন প্রযুক্তিগত দিক থেকে শুরু করে আরো অন্যান্য দিক থেকে ব্যাপকভাবে প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছিলো। প্রকৃতির কাছে দেওয়ার মতো আর কিছু বাকি ছিলো না। ফলস্বরূপ ক্রিপ্টন ধ্বংস হয়ে গেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পৃথিবীর যে অবস্থা ইতোমধ্যেই চোখে পড়ে, তা--রীতিমতো ভয় পাওয়ার মতো। নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে, বনভূমি শেষ হয়ে যাচ্ছে, মাটির নিচের সম্পদ কমে আসছে, জীববৈচিত্র্য সঙ্কটের মধ্যে। এতো সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কিংবা উত্তর পুঁজির কাছে নেই। এ উত্তর সুপারম্যানের কাছেও মেলে না।
সুপারম্যান পৃথিবীর আহ্নিক গতিকে উল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ ভৌতভাবেও পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে সুপারম্যান। অথচ তাকে দেখা যায়, ছিঁচকে চোর ধরতে, ডাকাত ধরতে। কিন্তু সমাজে এতো দুর্নীতি, কালোবাজারি, কেলেঙ্কারি এসবের দিকে সুপারম্যানের কোনো ভ্রুক্ষেপ থাকে না। কিংবা সমাজের মৌলিক কাঠামোগত সমস্যা নিয়েও মানুষকে সচেতন করার দিকেও তার মনোযোগ চোখে পড়ে না। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব নিয়েও ভাবতে দেখা যায় না সুপারম্যানকে।
এদিকে সুপারম্যান রিটার্নস-এ এক নারীকে গাড়ি দুর্ঘটনা থেকে বাঁচানোর পর তার সঙ্গে তিনি ছবি তোলেন। সুপারম্যান (১৯৭৮) চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৪৬ মিনিটে সুপারম্যানকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন উঠেছে, যেগুলো মানুষ জানতে আগ্রহী।’ লুইস লেনকে এই রকম সাক্ষাৎকার দেওয়ার মাধ্যমেও তিনি যেনো নিজেকে ‘নিজের ঢাক নিজে পেটানো’ মানুষের দলে ফেলেন। চলচ্চিত্রে সুপারম্যানের যে একটা ফেইসবুক পেইজ কেনো থাকে না, এটাই আশ্চর্য ব্যাপার!
মানুষের অবস্থান
সুপারম্যান-এ (১৯৭৮) লুইস লেনসহ কয়েকজন হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় পড়ে। একটি বহুতল ভবনের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারটি টেক অফ করার কথা ছিলো। কিন্তু একটি বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে প্যাঁচ লেগে তা নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে হেলিকপ্টারটি সরাসরি নিচে পড়ে যেতে শুরু করে। সেখানে উড়ে যান সুপারম্যান। জনসম্মুখে এটিই তার প্রথম আত্মপ্রকাশ। তিনি হেলিকপ্টার ও তার ভিতরে থাকা মানুষদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন অন্তত শ’খানেক মানুষ। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, একজন মানুষ আকাশে উড়ছে এ রকম ‘উদ্ভট’ ঘটনা দেখার পরও কেউ অবাক হয় না! দুয়েকজন খানিকটা চমকে গেছে বলে মনে হলেও, পরবর্তী সময়ে সবাইকে সুপারম্যানের জন্য হাততালি দিতে দেখা যায়। একই ঘটনা সেই চলচ্চিত্রেই আরো তিন জায়গায় চোখে পড়ে। তখনো পৃথিবী সুপারম্যানের সঙ্গে পরিচিত না। অথচ এমন ‘তাজ্জব’ ঘটনা দেখার পরও মানুষ স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। আর তখনই মাথায় আসে পৃথিবীজুড়ে এমনসব ‘অদ্ভুত’ সিস্টেম সমাজে কোনো রকম বাধাবিপত্তি না সৃষ্টি করে কীভাবে টিকে থাকে!
সুপারম্যানের এই চলচ্চিত্র তিনটিতে মানুষ হাজির হয় যেনো পিঁপড়ার দলের মতো--হাজারে হাজারে থাকে, কিন্তু অসহায়। যে কেউ এসে পায়ের তলায় পিষে দিতে পারে, হাত দিয়ে টিপে মেরে ফেলতে পারে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ--সবগুলো চলচ্চিত্রে সমস্যার সমাধানকারী হিসেবে হাজির হন সুপারম্যান, তিনি মানুষ নন কিন্তু মানুষের বন্ধু। মিসাইলের হাতে শহর বিপন্ন, সমুদ্র থেকে বেরোনো জমির কারণে একটা আস্ত দেশ বিপন্ন, ভিনগ্রহীদের হাতে পৃথিবী বিপন্ন--অথচ এমন সঙ্কট থেকে উত্তরণে মানুষের ভূমিকা শুধুই দর্শকের, ভুক্তভোগীর। মানুষের তৈরি এতো বিশাল বিশাল প্রযুক্তি, অস্ত্রশস্ত্র কোনো কাজেই আসে না; কাজে আসে না কোনো গবেষণা, শিক্ষা। ইরাক-আফগানিস্তানের মানুষগুলো যেমন সে অর্থে কিছুই করতে পারে না, সুপারম্যান সিরিজের মানুষগুলো হাজির হয় একইভাবে--যেনো জনগণ ক্ষমতাশূন্য-কূপমণ্ডুক দর্শকমাত্র।
তখন ম্যান অব স্টিল-এর একটি সংলাপ বার বার মনে হতে থাকে। জোর-এল সুপারম্যানকে বলেন, ‘তুমি পৃথিবীর মানুষকে বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা দেবে, তারা তোমার পিছনে পিছনে দৌড়াবে। মানুষ হোঁচট খাবে, হেরে যাবে। তারপর একটা সময় তোমার সঙ্গে যুক্ত হবে। একটা সময় বিস্ময়কে জয় করতে তুমিই তাদের সাহায্য করবে (৫১ মিনিট)।’
সুপারম্যান পরিত্রাণ চায়, পরিবর্তন নয়
তিনটি চলচ্চিত্রেই দেখা যায়, সুপারম্যান চোরকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয়, বোমার বিষ্ফোরণ থামায়, বান্ধবীকে গুণ্ডার হাত থেকে রক্ষা করে ইত্যাদি। বোঝা যায়, এই রকম কিছু ‘ঝামেলা’ থেকে মানুষকে রক্ষা করা সুপারম্যানের নিত্যকর্ম। কিন্তু বৃহৎ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ‘নিত্যকর্ম’গুলোর ওপর ভর করে সুপারম্যানের প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। আর তখন ‘নিত্যকর্মের’ আড়ালে লুকিয়ে থাকা বড়ো কিছু প্রশ্ন সামনে আসে--একটি সমাজে চুরি কেনো হয়, শহরকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতো বিধ্বংসী চিন্তা কেনো আসে কিংবা সমাজে গুণ্ডা-সন্ত্রাসীর জন্মইবা কেনো হয়?
সমাজ থেকে চুরি-বোমাবাজি-গুণ্ডাগিরি (এবং আরো অনিয়ম) দূর করতে হলে, এ প্রশ্নগুলো তোলা প্রথমে জরুরি। প্রশ্নগুলো প্রতিষ্ঠিত হলে তারপর সমাজে পরিবর্তন আসবে। অবশ্য তাতে ‘বিপদ’ সমাজের উপরতলার মানুষগুলোর। কারণ সমাজে যদি পরিবর্তন আসে, তাহলে তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কী হবে! অদ্ভুতভাবে সুপারম্যান এই মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে খুব বেশি মনোযোগী নয়। সমাজের কাঠামোগত কোনো পরিবর্তনের দিকে সুপারম্যানের মনোযোগ নেই। তিনি প্রচলিত সমাজব্যবস্থারই কিছু ‘ছোটোখাটো’ ঝামেলা থেকে শুধু পরিত্রাণ চান যেনো, পরিবর্তন নয়।
মানুষকে তথা সমাজকে ‘ছোটোখাটো’ ঝামেলা থেকে তার এই পরিত্রাণ পাইয়ে দেওয়া যেনো কেবলই মৌলিক প্রশ্নগুলো থেকে মনোযোগ সরানোর এক সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। একটু ভালো করে দেখলে, ঠিক একই রকম বৈশিষ্ট্যের ক্ষমতাবান ‘সুপারম্যান’-এর খোঁজ মেলে প্রতিটি পরিবারে, পাড়ায়, মহল্লায়, সমাজে, রাষ্ট্রে--সব জায়গায়। যেমন, দেশের মাথাপিছু আয় বাড়া আর জি ডি পি বাড়া মানেই উন্নয়ন নয়; গ্রামের দু’চারটি রাস্তা বানানো, আর গরিবদের মধ্যে দু’বস্তা গম বিতরণ করাই সব সমস্যার সমাধান নয়; মাসের শুরুতে গিন্নির হাতে কিছু টাকা তুলে দেওয়া মানেই নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়। এই প্রশ্নগুলো যদি ওঠে তাহলে রাষ্ট্রনায়ক, গ্রামের চেয়ারম্যান ও বাড়ির কর্তাদের বিপদে পড়তে হয়। সুপারম্যানদের অস্তিত্বই তখন সঙ্কটের মুখে পড়ে। কাজেই নানা কৌশলে তখন জনগণের, গ্রামবাসীর, পরিবারের সদস্যদের মগজ ধোলাই করা লাগে আরকি। সেসময় সুপারম্যান একক কোনো ব্যক্তি, চরিত্র, কমিক বা চলচ্চিত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, ‘সুপারম্যান’ হয়ে যায় সামগ্রিক একটি কনসেপ্ট। সুপারম্যান হয়ে যায় ‘মগজে কারফিউ সৃষ্টিকারী ক্ষমতাবান’ শ্রেণির প্রতিনিধি। সুপারম্যান হয়ে ওঠেন গ্রামের চেয়ারম্যান কিংবা পরিবারের কর্তাও।
ইতিহাসে ‘সুপারম্যান’-এর অবস্থান
তিনটি চলচ্চিত্রেই সুপারম্যান পৃথিবীতে এসে বেড়ে ওঠেন শহর থেকে অনেক দূরে এক বৃদ্ধ দম্পতির কাছে। তাদের হাত ধরেই চিনতে শেখেন পৃথিবী। দ্বিতীয়ত, তিনটি চলচ্চিত্রেই চরম বিপদের মুহূর্তে সুপারম্যানের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তার মৃত্যু যখন সন্নিকটে, সেসময় সুপারম্যানের রক্ষাকর্তারূপে হাজির হন কখনো লুইস লেন, কখনো লেক্স লুথারের বান্ধবী। শুধু কেউ এসে সাহায্য করে, বিষয়টা কেবলই এ রকম নয়। মানব সমাজের যে বৈশিষ্ট্য তাতে একা কারো পক্ষে বেড়ে ওঠা সম্ভব নয়, বৃহৎ পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এতে সমাজের প্রত্যেকটা মানুষ যুক্ত থাকে। প্রত্যেকটা মানুষ সেই পরিবর্তনে অংশ নেয়। তাই কারো অবদানকে ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে না। এই চলচ্চিত্রগুলোতে সেটাই বার বার দেখানো হয়। অথচ চলচ্চিত্রের শেষে যখন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, সবকিছু ‘ঠিকঠাক’ হয়ে যায়, বিপদ থেকে ‘পরিত্রাণ’ মেলে, তখন আর এই মানুষগুলোর কোনো অস্তিত্বই থাকে না। সমস্ত কার্যকারণের ওপর পর্দা ফেলে হাজির হন সুপারম্যান। এবং মানুষ তথা দর্শক তাকেই ভাবতে থাকে স্বপ্ন ও সুখের কাণ্ডারি হিসেবে।
অথচ সমাজে পরিবর্তন আনার জন্য এর উপাদানগুলোর মধ্যে পরিমাণগত এবং গুণগত উভয় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিমাণগত পরিবর্তন হতে হতে একটা সময় বিশাল গুণগত পরিবর্তন হয়। তখন মূল সমাজকাঠামোতে পরিবর্তন আসে। তার মানে গুণগত পরিবর্তন ঘটার ওই বিশেষ মুহূর্তটি সামগ্রিক পরিবর্তনের মূল কিংবা একমাত্র কারণ নয়। আসল কারণ হলো ছোটো ছোটো পরিমাণগত পরিবর্তনগুলো। একইভাবে পরিবর্তনের মুহূর্তে ‘নেতা’রূপে হাজির হওয়া মানুষটিও সেই পরিবর্তনের একমাত্র কাণ্ডারি নয়। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধকে যদি একটা পরিবর্তন ধরা হয়, তার পিছনে অনেকগুলো পরিমাণগত পরিবর্তন চোখে পড়বে। যেমন ১৯৫২-তে ভাষার ওপর আক্রমণ, চাকরির ক্ষেত্রে বাঙালিদের অবমূল্যায়ন, সম্পদের অসম বণ্টন, কলকারখানা-অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাকে অবহেলা, জনপ্রতিনিধিদের ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতা ইত্যাদি অনেক বিষয় সামনে আসে। আর এসব অন্যায় জুলুম বাংলার মানুষের মননে জাতীয় ঐক্য গঠনে ভূমিকা রাখে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১-এর ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তারপর মানুষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। দীর্ঘ নয় মাস কোটি কোটি মানুষের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, ইতিহাসে পুরো মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব যেনো বঙ্গবন্ধুর কাছেই চলে যায়। এখানে সাধারণ মানুষ তো থাকেই না, মাওলানা ভাসানী কিংবা শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরাও হারিয়ে যায়। আর বঙ্গবন্ধু হাজির হন ইতিহাসের ‘সুপারম্যান’ হিসেবে।
একইভাবে বিশাল বটবৃক্ষ গান্ধীর ছায়ায় হাজারো বিপ্লবী মানুষ অস্বীকৃত থাকে। আর পরবর্তী প্রজন্মকে শেখানো হয়, যেনো গান্ধী ছাড়া ভারত স্বাধীনই হতো না, ভারতের স্বাধীনতা ইজ ইকুয়েল টু গান্ধী! অথচ গান্ধীর ‘মহাত্মা’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটা যে অনেকাংশে রাজনৈতিক, সেই বিষয়টি অগোচরেই থেকে যায়। উদাহরণ হিসেবে একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে গান্ধী উত্তর প্রদেশের গোরখপুরে জনসভা করতে যান। রাজনৈতিকভাবে ‘অনগ্রসর’ গোরখপুরের জনমানসে প্রভাব তৈরির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়ে গান্ধী দ্রুত এলাকা ছাড়েন। পরবর্তী সময়ে তখনকার স্থানীয় সংবাদপত্রগুলোর অন্যতম গুরুত্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ‘গান্ধীকে বিশ্বাস না করলে সর্বনাশ হবে’ জাতীয় প্রতিবেদন। গুজব ছড়ানো হয়--গান্ধীকে গালি দেওয়ার কারণে বাড়িতে বিষ্ঠাবর্ষণ হয়েছে, জনৈক গুড় ব্যবসায়ির গুড়ের কড়াই ভেঙে দুই টুকরা হয়ে গেছে ইত্যাদি।১০ বলা বাহুল্য কর্মকাণ্ডগুলোর পিছনে স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও যথেষ্ট হাত-পা-মাথা ছিলো। আর এই রকম একটি লাগাতার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে অসচেতন একটি এলাকা হয়ে ওঠে ভীষণ রাজনৈতিক, আর গান্ধী হয়ে ওঠেন মহাত্মা তথা ‘সুপারম্যান’।
আর এভাবে সুপারম্যানের চলচ্চিত্রগুলো একেকটি দলিল, যেখানে সবার ওপরে ‘একজন মানুষ’কে উপরে তুলে ধরা হয়। আর বাকিরা থাকে নিতান্তই অসহায়। আর বার্ডস আই ভিউতে দেখা ইতিহাসের পাতায় ‘সুপারম্যান’ ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ে না।
উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে সবখানে ‘সে’ হাজির
মানুষের বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই কোথাও না কোথাও নিজেকে সঁপে দেওয়ার প্রবণতা যেনো থাকে। যুক্তি-বুদ্ধি-সামর্থ্য দিয়ে যখন আর কাজ হয় না, তখন মানুষের মাথায় আসে--কেউ এসে তাকে এহেন বিপদ থেকে রক্ষা করবে। কঠিন অসুখ সারানোর ক্ষমতা যখন থাকে না, ঝড়-জল থেকে রক্ষা পাওয়া যখন দুষ্কর হয়ে যায়, বা সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচতেও অনেকে সুপার-পাওয়ারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায়। আর এখানে সুপার-পাওয়ারের প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ হাজির করে আল্লাহ-ভগবান-যীশুকে। সরেজমিনে হাজির হয় অলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশ, সাধু-সন্ন্যাসী, পাদ্রীর কাছে। অথচ এরা তো মানুষের সাহায্য করতে পারে না। সবকিছুকে ছাপিয়ে মানুষকেই জয় হাসিল করতে হয়। মানুষই মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মানুষকে নিজের আখেরটা নিজেকেই গোছাতে হয়, ঈশ্বর কাউকে সাহায্য করতে আসে না। তারপরও মানুষের মধ্য থেকে আত্মসমর্পণের মনোভাব যায় না। নিজের মধ্যে থাকা অপার সম্ভাবনাকে সে অস্বীকার করে। বারংবার এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় সুপার-পাওয়ারের প্রতি আনুগত্য। এই আনুগত্য থেকেই জন্ম হয় সুপারহিরো বা সুপারম্যান ধারণার।
এই উপমহাদেশে ‘সুপারহিরো’ চলচ্চিত্র খুব বেশি হয়নি। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই প্রোটাগনিস্ট চরিত্রগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, দিনশেষে তারা সুপারম্যান। তারা ১০ তলা ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে যেমন মরে না, তেমনই ফাঁসির আদেশ হওয়ার পরও শেষ দৃশ্যে মুক্তি পায়, ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কেবল নায়কই বেঁচে থাকে, একশো জনের সঙ্গে লড়াই করে জিতে যায়, লটারি জিতে ধনী হয় ইত্যাদি ইত্যাদি। বস্তি উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ইত্যাদি হাজারো বিপদে নায়ক নিজের জীবনকে বিপন্ন করে মানুষকে বাঁচায়। কখনো তারা মন্ত্রী হয়, কখনো মাফিয়া গডফাদার। সেই নায়কই আবার কখনো পুলিশের বেশে এমনভাবে পর্দায় হাজির হয়, যেনো সমাজের সব ‘আগাছা’ সে একাই পরিষ্কার করে ফেলবে! যার মানে দাঁড়ায়, শেষ পর্যন্ত এখানকার বেশিরভাগ চলচ্চিত্র কোনো না কোনোভাবে সুপারম্যান ধারণাকে বয়ে নিয়ে যায়, ডিসকোর্স তৈরি করে। ইউরোপ-আমেরিকা তবু প্রচার করে সুপারম্যান বানায়, অথচ এখানে প্রায় প্রত্যেক চলচ্চিত্রেই ‘সুপারম্যান’ থাকে। ফলে তা সত্য-বাস্তব দুনিয়াকে দেখার ক্ষেত্রে বিভ্রম সৃষ্টি করে, ভ্রান্ত চেতনা তৈরি করে।
আলো আর আলেয়ার ফারাক করা দায়
পরিবার, রাষ্ট্র, সমাজে মানুষের অজান্তেই চলে ‘সুপারম্যান’ চর্চা। সুপারম্যান চর্চা মানে আর কিছু নয়--‘আমার’ থেকে শক্তিশালী একজন আছে, বিপদে পড়লে সে ‘আমাকে’ রক্ষা করবে। কখনো সে আমার দেখভাল করবে, শাসন করবে। কিন্তু দিনশেষে তার কাছে গেলে ‘আমার’ সমস্যার সমাধান হবেই। পরিবারের মধ্যে সেই সুপারম্যান হিসেবে বাবা হাজির হন, স্কুলে প্রধান শিক্ষক, রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী। মানুষ চিন্তা করে কাঙ্ক্ষিত সুপারম্যানের কাছে ফরিয়াদ পৌঁছালে সমাধান তো হবেই। ফলে সুপারম্যানের চর্চা মানুষের শুরু থেকে আজাবধি সমাজে চলে আসছে।
তাছাড়া সমাজের মানুষ কী ভাববে, তার একটা গতিপথ তৈরির ক্ষমতা ধারণ করে শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র। তখন সমাজের বড়ো বড়ো অনেক ফাঁক-ফোকর মানুষের চোখের সামনে ঘটে চলে, তারপরেও মানুষ শ্বাস নেওয়ার মতোই স্বাভাবিকভাবে এটিকে দেখে। ‘বর্তমান সমাজ জীবনে সিনেমা, টিভি, বিজ্ঞাপনের ইমেজগুলোর সর্বব্যাপী প্রভাবের কারণে বাস্তব এবং অবাস্তব, সত্য এবং কল্পিত, আসল এবং নকল, সারফেস এবং গভীর--এসবের স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে গেছে। যার ফলে আমরা পাই একটি ‘হাইপার-রিয়েল’ সংস্কৃতি যেখানে এই দুইয়ের ভিন্নতা ক্ষয়ে যাচ্ছে।’১১ চলচ্চিত্রের ‘সুপারম্যান’ তখন শুধু কাল্পনিক চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রবেশ করে মানুষের বাস্তব জীবনে, চিন্তা কাঠামোতে। তখন মানুষ ভালো-মন্দ-নোংরা-জঘন্য নানা রকম পরিস্থিতির সঙ্গে হয়ে ওঠে আরো বেশি ‘গা-সওয়া’।
লেখক : আলি আহমেদ নিশান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
nissan.mcj26@gmail.com
https://facebook.com/profile.php?id=10000721015129
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. ‘বোধিচিত্ত’-এর আয়োজনে জাভেদ হুসেনের ‘মার্ক্স ও মুক্তি’ শীর্ষক বক্তব্য থেকে নেওয়া; লিঙ্কে গিয়ে দেখতে পারেনhttps://youtu.be/4vP1aCt2SGc; retrived on: 30.04.2020
2. https://web.archive.org/web/20120330034735/http://ask.yahoo.com/20070503.html; retrieved on: 20.02.2020
3. Packer, Sharon (2009: 52); Superheroes and Superegos: Analyzing the Minds Behind the Masks; Greenwood Publishing Group, USA.
4. https://www.youtube.com/watch?v=7yG1PDxoSHA; retrieved on: 02.03.2020
5. https://www.quora.com/What-was-the-first-superhero-movie-to-be-made-and-when; retrieved on: 02.03.2020
৬. আমেরিকায় শুরু হয়ে দ্রুতই পশ্চিমা বিশ্বে এই আন্দোলনটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় দুই দশক ধরে চলা এই আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো নারীদের ভোটাধিকার, লৈঙ্গিক সমতা, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সমানাধিকার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ইত্যাদি।
7. https://m.the-numbers.com/movie/superman; retrieved on: 02.03.2020
8. https://www.history.com/topics/great-depression/1930s, retrived on: 02.03.2020
৯. ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে ফ্রিৎস ল্যাঙ একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন--মেট্রোপলিস। শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে নির্মিত মেট্রোপলিস শহরের উঁচুতলায় বসে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন ফ্রেডারসেন। শহরটি সুখের ছিলো না শ্রমিকদের জন্য। একপর্যায়ে শ্রমিকরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং নিজেদের অধিকার আদায় করে নেয়। নির্মাণ হয় নতুন এক মেট্রোপলিস শহর। সেখানে ‘হাত’ ও ‘মাথা’র মধ্যে সমন্বয়কারী এক ‘হৃদয়’ থাকে। অর্থাৎ শ্রমিক ও শাসকের মধ্যে সমন্বয়কারী একজন মানুষ দাঁড়ান। আর মেট্রোপলিস হয় শ্রমিকদেরও শহর।
১০. আমিন, শাহিদ (২০০৪ : ৪৭); ‘গান্ধী যখন মহাত্মা’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।
১১. জ্য বদ্রিয়া, উদ্ধৃত; আহমেদ, রেহনুমা (২০১১ : ১৭); ‘উত্তর-আধুনিকবাদ প্রসঙ্গে’; প্রবল ও প্রান্তিক ১; সিরিজ সম্পাদক : রেহনুমা আহমেদ; সন্ধি প্রকাশনী, ঢাকা।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৯তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন