রাইসুল ইসলাম আসাদ
প্রকাশিত ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা
রাইসুল ইসলাম আসাদ

কথামালা ৮
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৫ এপ্রিল ২০১৯
শেষ পর্ব.
আরেকটা বিষয়, অভিনয় করতে গেলে মনে রাখতে হয়; চলচ্চিত্রের কোনো একটা দৃশ্যের শট্ যখন পরিচালক সঠিক বলে নির্ধারণ করে দেয়, তখন ওখানে কিন্তু আর কারেকশনের কিছু থাকে না। ভুল হলেও ওটাই ঠিক, সঠিক হলেও। কারণ তখন ওখানে শোধরানোর আর কোনো জায়গা থাকে না। কিন্তু তার চলচ্চিত্রটা থেকে যায়, হারিয়ে যায় না। অতএব, যখনই আমরা অভিনয় করবো, তখন সেটাতে যাতে কোনো ভুল না হয়। আর ভুল হয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে--যদি আমি বুঝতে পারি--পরিচালককে বলা উচিত আমি এই ভুল করেছি। আবারও বলছি, একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে, চলচ্চিত্রের অভিনয়ে একটা শট্ ওকে হয়ে যাওয়ার পর কারেকশনের কোনো সুযোগ থাকে না। যে সুযোগটা থাকে থিয়েটারে। থিয়েটারে আজকে একটা প্রদর্শনী হলো, সেখানে আমি কোনো ভুল করলাম, পরের প্রদর্শনীতে সেটা শোধরাতে পারবো।
অভিনয় করতে গেলে চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। যে চরিত্রটাতে আমি অভিনয় করবো, সে চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে আমরা যেভাবে কাজ করছি, আমাদের কোনো কিছুতেই কোনো সময় নেই, আমরা একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। একটা চলচ্চিত্র আগে যখন নির্মাণ হতো, সেই চলচ্চিত্রে যেসব পাত্রপাত্রী অভিনয় করতো, তাদের নিয়ে রিহার্সেল হতো, তাদেরকে সময় দেওয়া হতো সেই চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে তৈরি করার। এখন আর সেই অবস্থা নেই, দেখিও না। এতে করে যেটা হচ্ছে শর্টকাট ওয়েতে আমরা কাজ করছি। আর সেজন্য সঠিকভাবে দর্শকের সামনে কোনো কিছুই উপস্থাপিত হচ্ছে না। অ্যান্থনি হপকিনস নামে একজন বৃটিশ অভিনয়শিল্পী আছেন--অনেক বয়স হয়ে গেছে, অনেক বড়ো অভিনয়শিল্পী; অনেক সিনেমা আছে তার। উনি যখন অভিনয়টাকে সিরিয়াসলি ভাবতে শুরু করলেন এবং কাজ করতে শুরু করলেন, তখন তিনি একটি চলচ্চিত্রের জন্য প্রস্তুতি নিতেন ছয় মাস থেকে এক বছর। সিনেমাটা করার পরে উনি গায়েব হয়ে গেলেন। পুরো পরিবার থেকে, বন্ধুবান্ধব থেকে হারিয়ে গেলেন। কোথাও কোনোভাবে তার খবর পাওয়া গেলো না। অনেক দিন, প্রায় সাত-আট মাস পর হঠাৎ উনি হাজির! কী ব্যাপার আপনি কোথায় গিয়েছিলেন? বলে, ভুলতে গিয়েছিলাম। যে চরিত্রটাকে নিজের ভিতরে ধারণ করেছি, আত্মস্থ করেছি, অন্য চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেটাকে ভুলে যাওয়ার সময় লাগবে। তাই আমি সাত-আট মাস চেনাজানা মানুষ থেকে দূরে থেকেছি। এখন যদি আবার নতুন কোনো কাজের অফার আসে, সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করবো। আবার সেই চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য, চরিত্রটাকে ভোলার জন্য সময় নেবো। একটি দৃশ্যে তার চোখের পাতাটা কীভাবে নড়বে তা ক্যারেক্টার টু ক্যারেক্টার ভ্যারি করে। প্রতিটি চরিত্রে আমি দেখি, আলাদা আলাদা মনে হয়। সেটাও কিন্তু আয়ত্ত করতে হয়। ওই পর্যন্ত যদি কেউ যেতে পারে, তাহলে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে তিনি কোথায় থাকবেন, আর আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো--সেটা ভাবার মনে হয় সময় হয়েছে।
শেখার কোনো শেষ নেই--এটা আমি শিখেছি সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর কাছে। তিনি আমার দ্বিতীয় ছবি ঘুড্ডির পরিচালক। তিনি পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে গিয়েছিলেন পরিচালনার ওপর পড়াশোনা করতে। তো তিন বছর পড়াশোনা করে তিনি যখন বাংলাদেশে ফিরলেন, তখন আমি তাকে প্রশ্ন করেছিলাম--‘জাকী ভাই, আপনি আসলে কী শিখে আসলেন?’ তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘একটা জিনিসই শিখেছি, কী করে শিখতে হয়।’ ব্যাপার কিন্তু তাই-ই। প্রথমে তো আমাকে জানতে হবে, কী করে শিখবো। সঠিক পথ না জেনে যদি এলোপাথাড়ি কাজ করতে থাকি, তাহলে ছয় মাসের কাজ ৬০ বছরেও শেখা সম্ভব না। একাডেমিক শিক্ষাটা মনে হয় এজন্যই দরকার--তারা শেখায়, কী করে শিখতে হয়।
এটা যারা অভিনয় করবে, শুধু তাদের জন্যই নয়, এটা সবার জন্য। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো, প্রচুর পড়তে হবে, জানতে হবে, দেখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতার কথা বলি, আবার ‘আমি’তে চলে যাচ্ছি। আমি অভিনয় করতে গিয়ে--সেটা হোক সিনেমা বা টেলিভিশন বা মঞ্চ--এমন এমন কিছু চরিত্র পেয়েছি, যা আমার পড়া বা দেখার মধ্যেই আসেনি। বিশেষ করে মঞ্চে, সেলিম-আল-দীন এমন কিছু চরিত্র লিখেছেন, যা আলোচনা সাপেক্ষে আমার পরিচালক নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুও ক্লিয়ার করতে পারেননি। তখন আমাকে বলেছেন, পড়তে থাকো। আমি বহু চরিত্র পেয়েছি রাস্তাঘাটে। আমার যখন অসম্ভব মানসিক ক্ষরণ হয়, অসম্ভব বিরক্তি উৎপাদন হয় বা অসম্ভব মনঃকষ্ট হয়, তখন আমি রাস্তায় হনহন করে হাঁটি আর মানুষ দেখি। এতো ধরনের মানুষ, এতো ধরনের অভিব্যক্তি, এতো ধরনের চাওয়া-আকুতি আমি দেখেছি! আমি বোঝার চেষ্টা করতাম, ওরা কী ভাবছে। আর এই করতে করতেই আমি অনেক চরিত্র পেয়েছি। তো এইভাবে অনেক কিছু খুঁজে পাওয়া যায়, পড়া হয়ে যায়।
এখন তো সমস্যা হয়ে গেছে, বই পড়া কমে গেছে। সবকিছু আমাদের ফোনে চলে এসেছে। ফলে আমরা খালি দেখি, পড়ি কম। পড়লে অনেক চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ফট করে বইটা উল্টে রেখে অনেক কিছু ভাবা যায়, আবার শুরু করা যায়। পড়ার সময়ও কিছু ভাবনা কাজ করে, বিভিন্ন দৃশ্যকল্প চোখের সামনে ভাসতে থাকে। কিন্তু সিনেমা দেখার সময় তো সেটা হয় না। সিনেমায় আনুষঙ্গিক এতো কিছু থাকে যে, দেখার সময় ভাবা যায় না, ভাবনাটা আসে দেখার পরে। কিন্তু শুধু পড়ার সময়ই ভাবা যায়। তাই পড়াটা ভীষণ জরুরি। তারপর দেখা, তারপরে জানা। এগুলোর ভিতর দিয়ে সবকিছু আবিষ্কার করতে হবে, বুঝতে হবে, জানতে হবে। তাহলে এগোনো যাবে, নইলে একই জায়গায় আমরা ঘুরপাক খেতে থাকবো। আমাদের গতি স্লথ হতে হতে রোধ হয়ে যাবে।
আরেকটা জিনিস দেখছি, ‘ও তো প্রফেশনাল অ্যাক্টর’, ‘ও তো অ্যামেচার অ্যাক্টর!’ আমি প্রথমে বুঝতাম না। পরে বুঝলাম, প্রফেশনাল বলতে বোঝানো হচ্ছে, ওরা টাকা নিয়ে, অর্থের বিনিময়ে অভিনয় করে। আবার টাকা ছাড়া অভিনয় করে, তাই ও অ্যামেচার। তো ঠিক আছে, অর্থের বিনিময়ে কাজ করে মানে এটা তার পেশা। তাই ও পেশাদার অভিনেতা। আর যে অন্য কাজ করে, তারপরে শখের বশে অভিনয় করে, এটা তার পেশা না, তাই সে অ্যামেচার। কিন্তু একটা জিনিস আমি এদের মধ্যে দেখিনি, অভিনয়ে পেশাদারিত্ব। অনেক প্রফেশনাল অ্যাক্টরকে দেখেছি, যাদের কাজের মধ্যে ন্যূনতম পেশাদারিত্বও নেই। কাজের প্রতি কোনো পেশাদারিত্ব নেই, শুধু অর্থ নেয় এজন্য সে পেশাদার। আবার এমন অ্যামেচার অ্যাক্টরকেও দেখেছি, যারা পূর্ণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজটা করছে। কোনো কাজ ভালোভাবে করতে হলে কাজটাকে পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে করতে হবে। শুধু অর্থের বিনিময়ে পেশাদার হওয়া যায় না। এটা আমি অনেক অনেক বছর পর অনুধাবন করেছি। তো এটা সবারই ভাবা উচিত, যে কাজটার জন্য আমি পয়সা নিচ্ছি, সেটা পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে করছি কি না।
একই কথা বার বার বলছি নাকি? (দর্শক : না, আলাদা মনে হচ্ছে।) প্রশ্নোত্তর পর্ব কখন? প্রশ্ন আসলে তো আমি বেঁচে যাই। আর অভিনয়ের জন্য সবচাইতে প্রয়োজনীয় জিনিস যেটা, তা হচ্ছে ধৈর্য। এটা যার নেই, সে যেনো এই পেশায় না আসে। আর কোনো কাজে-কর্মে এতো ধৈর্য লাগে কি না আমার জানা নেই। অসম্ভব ধৈর্য! এবং একসময় মনে হতে পারে, আমার ১০-২০ বছরের জেল হয়ে গেছে। আর অপেক্ষা--একটি ভালো কাজের জন্য, ভালো চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আমি এমন অনেক অভিনেতা দেখেছি, যারা ভালো চরিত্রে কাজ করার জন্য পাগল। কিন্তু যখন সেই ভালো কাজটি আসে, তখন সে এতো ব্যস্ত যে, ওই কাজটি আর তার করা হয় না। ভালো কাজের জন্য ধৈর্য ধরতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে। এটা বিশাল একটা ব্যাপার। আমার জীবনে এটা আমি শিখেছি। এই ধৈর্যটুকু যদি না ধরতে পারতাম, অপেক্ষাটুকু যদি না করতাম, তাহলে যতোটুকু করেছি, সেটুকুও হতো না। যদি আমিও ওই গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসাতাম, তাহলে এ সুযোগগুলো এলেও তার সদ্ব্যবহার করতে পারতাম না। অপেক্ষাটা ভীষণ প্রয়োজন।
যদি ৫০ বছরের অভিনয়জীবন হয়, আর পাঁচটি কাজও ভালো হয়, মানে ১০ বছরে একটি ভালো কাজ হলেও, সেটা অনেক। আমি অন্তত মনে করি। কারণ এমনও হয়েছে, ৫০ বছর অভিনয়ের পর একটি ভালো কাজও তার কপালে জোটেনি, যেটাকে সেই অভিনেতা নিজে ভালো কাজ মনে করেন। সেই আক্ষেপ অনেকের মধ্যে দেখেছি। আর এগুলো কখন কার হবে, কার হবে না--সেটা বলা যাবে না। দেখা যাবে, যে ছাত্রটির কোনো মনোযোগ নেই, সবকিছুতে বিরক্তি, যার কাছ থেকে কারো কোনো আশা নেই--সেই দেখা গেলো ভালো কাজ করছে। অন্যদিকে সিন্সিয়ার, যাকে দেখে মনে হয় অভিনয় ভিতরে টগবগ করে ফুটছে--কাজ শুরু হলে দেখা গেলো কিছুই হচ্ছে না। এটা কেনো হয় আমি জানি না। এর কোনো সদুত্তর আমার কাছে নেই। তাই কার হবে, কার হবে না, সেটা কেউ বলতে পারবে না। এবার থামি? (দর্শকের হাত তালি)
পারভেজ, ইতিহাস বিভাগ : পদ্মানদীর মাঝির কুবের চরিত্র সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
আসাদ : এ তো সারা দিনরাত লেগে যাবে। এই প্রশ্নটার উত্তর পরে দেবো।
ফারজানা, নৃবিজ্ঞান বিভাগ : প্রত্যেক মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে অভিনয় করে। মানুষের ব্যক্তিজীবনের অভিনয় আর অন্য চরিত্রে অভিনয়ের পার্থক্য কতোটুকু? আর মানুষ যদি প্রতিনিয়ত অভিনয় করেই, তাহলে অন্য চরিত্রে সবার অভিনয় করা সম্ভব নয় কেনো?
আসাদ : প্রত্যেক মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের সঙ্গে কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে অভিনয় করে থাকে--এটা সে বুঝবে কী করে? প্রথম প্রশ্ন আমার দিক থেকে, এটা যদি বোঝাই যায়, সে অভিনয় করছে, তাহলে তো সবাই ধরে ফেলবে। সে তো আর করতেই পারবে না সেটা। সে যেটা করছে, সেটা অভিনয় না, বাস্তবে যা সেটাই করছে। ব্যক্তিচরিত্রে সে যেটা করছে সেটাই সে, মানুষটাই তাই। আমি কি ভুল বললাম? এখন তাকে যদি কোনো একটা চরিত্রে অভিনয় করতে দেওয়া হয়, সে পারবে কি না নির্ভর করবে তার অভিনয় দক্ষতা কতোটুকু আছে তার ওপর।
মেহেদি হাসান, নৃবিজ্ঞান বিভাগ : কোনো চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে যদি অভিনেতার নিজের সঙ্গে অমিল হয়, অভিনয় করতে ইচ্ছে না করে--এমন চরিত্রে কীভাবে নিজেকে তুলে ধরা সম্ভব?
আসাদ : তখন পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে, সমঝোতায় আসতে হবে।
কাজী শুসমিন আফসানা, শিক্ষক, নাট্যকলা বিভাগ : যদি ঝগড়া লেগে যায়?
আসাদ : হ্যাঁ, ঝগড়া লেগে যেতে পারে, তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। সিনেমা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। একটা উদাহরণ দিই--ছবি বিশ্বাস অনেক ছবিতে অভিনয় করেছেন, বাংলা সিনেমার মহীরূহ। সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘর-এ ছিলেন। তো ঋত্বিক ঘটকের একটা ছবিতে তিনি অভিনয় করছিলেন, ছবির নামটা এখন মনে করতে পারছি না। বিশাল সেট তৈরি করা হয়েছে স্টুডিওর মধ্যে। তো এবার ছবি বিশ্বাস সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসবেন, রাশভারি মেজাজ নিয়ে কথা বলবেন, তারপর বাইরে চলে যাবেন। ছবি বিশ্বাস হেঁটে হেঁটে আসলেন, অভিনয় করলেন। ঋত্বিক এসে বললেন, ‘না না দাদা, এভাবে না, এভাবে না।’ ছবি বিশ্বাস একটু ক্ষুণ্ন হয়ে বললেন, ‘তুমিই দেখিয়ে দাও কীভাবে করতে হবে।’ ঋত্বিক দেখিয়ে দিলেন। এবার ছবি বিশ্বাস সে অনুযায়ী সিঁড়ি দিয়ে নামলেন, হেঁটে হেঁটে বাইরে গেলেন। ঋত্বিক বললেন, ‘হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে।’ ছবি বিশ্বাস সেই যে বাইরে গেলেন, আর ফিরলেন না। তিনি গাড়িতে চড়ে বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। ওই সেটে আর তিনি আসেননি কোনোদিন, ছবিটাও আর হয়নি।
এ এইচ মানিক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : একজন অভিনয়শিল্পীর কী কী গুণ থাকা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
আসাদ : আমি জানি না। আসলেই আমি জানি না। সবচেয়ে বড়ো গুণ হচ্ছে ধৈর্য আর অপেক্ষা। সৎ মানসিকতা নিয়ে--কাজটা হোক আর না হোক--চালাকি বাদ দিয়ে একাগ্রচিত্তে লেগে থাকা। তার পরেও হবে কি না জানি না। এর কোনো ফরমুলা নেই, এটা গুলিয়ে খাইয়ে দেওয়ার জিনিস না। তাহলে তো মাসে মাসে, বছরে বছরে অভিনেতা-অভিনেত্রী বের হতো। এটা অদ্ভুত একটা জগৎ আসলে। বরং একজন অভিনেতাকে দেখে বলা যায়, উনার মধ্যে এই এই গুণ আছে। কিন্তু এই এই গুণ থাকলেই তিনি ভলো অভিনেতা হবেন, বলা মুশকিল। এটা বলতে পারবো না।
সুরাইয়া সারাহ, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ : আমারে নিবা মাঝি লগে, বাস্তবে কপিলার দেখা পেয়েছেন কি? (সবার হাসি)।
আসাদ : অনেক কপিলার দেখা পেয়েছি। অনেকে বলেছে, আমারে নিবা মাঝি লগে। তবে কাউকেই নিইনি। (এক দর্শক : আপনি কাউকেই নেননি!) কাজেই এভাবে কেউ যদি বলে, তাকে না নেওয়াই ভালো। কারণ ফট করে কেউ যদি বলে, আমারে নিবা মাঝি লগে। কপিলা বলেছে কখন? কপিলার সঙ্গে কুবের মাঝির শুরুটা কখন? আমারে নিবা মাঝি কখন বলেছে? তার আগের চ্যাপ্টার বাদ দিয়ে বললে তো হবে না। একটা জার্নির সময়টুকু কতো, ওইটুকু বুঝতে হবে। ফট করে কেউ বললো, আমারে নিবা মাঝি লগে; ওটা তো নির্ভরযোগ্য নয়।
প্রদীপ দাস, সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্রশিল্পের যে অবস্থা, এ থেকে উত্তরণে কোনোধরনের ভুলের প্রয়োজন আছে কিনা? হ্যাঁ বা না--উত্তরের সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরার অনুরোধ রইলো।
আসাদ : আসলে জীবনে ভুলের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমি যে কথাটি বলতে চেয়েছি, যেহেতু সেই যুগে আমার কোনো একাডেমিক বা ফরমাল শিক্ষার সুযোগ ছিলো না; তাই আমি কাজ করেছি, সেখানে ভুল হয়েছে এবং সেই ভুল থেকে শিখেছি। ভুল করতে করতে শিখেছি। আর এখানে তুমি (প্রদীপ দাসকে উদ্দেশ করে) যেটা বলতে চেয়েছো, আমি একটি ভুল করে ফেললাম, আর তাতে করে কোনো কিছু ভালো হয়ে গেলো, বিষয়টি এমন নয়।
প্রদীপ : আমি আসলে যেটা বলতে চেয়েছি, গতানুগতিক বিদ্যমান যে ধারা চলচ্চিত্রশিল্পে আছে সব শিল্পীরাই সেখানে কাজ করছে। তার মানে তারা নতুন কোনো কাজ করছে না। সে যদি মনে করতো, সবাই এভাবে করছে, আমি এভাবে করবো না। ও যেভাবে অভিনয় করছে, আমার সেটা ভালো লাগছে না। আমি এভাবে করবো না। (আসাদ : রাইট, রাইট)। তোমরা সবাই রাইট আছো, রাইট থাকো; আমি ভুল করছি, আমি ভুল করে যাবো।
আসাদ : না, ও তো রাইট নেই। তুমিই তো বলে দিচ্ছো ওরা রাইট নেই। কারণ ওদের ছবিগুলো চলছে না। তার মানে ওরা রাইট নেই। ওরা যদি রাইট থাকতো, তাহলে তো ওদের ছবিগুলো চলতো। তুমি যেটা বলছো, ওরা যা করছে, তাতে করে ওদের ছবিগুলো চলছে। এটা কি বলতে চাচ্ছো তুমি? না, সেটা বলছো না?
প্রদীপ : আমার কাছে মনে হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অবস্থা ভালো না। এটা আমার ব্যক্তিগত মতামত ...।
আসাদ : তার মানে চলচ্চিত্রের মানুষেরা ভালো নেই। এটার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত, তারা যেটা করছে সেটা সঠিক করছে না। সঠিক যদি হতো, তাহলে তো চলতো। এই প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না যদি জানতে চাও, তাহলে বলা যায়, এটা আসলে চলছে না--এটাই সঠিক। এটা এখন কীভাবে করলে সঠিকভাবে চলবে, সেই ফরমুলা যদি জানা থাকতো, তাহলে তো এতোদিন আর বেঠিক থাকতো না। এক্ষেত্রে কোনো সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। এটা কী করলে, কীভাবে করলে, কীভাবে চললে--এটা ঠিক হয়ে যাবে--এটা আমার জানা নেই। এটুকু মনে আছে, ৯০-এর মাঝামাঝি সময়ে আমি চলচ্চিত্রের মূলধারা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কারণ তখন আমি নানা পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম। একটা উদাহরণ দিই, হঠাৎ করে একদিন সকালে এফ ডি সি’র ভিতর শুটিং করতে গেছি। ওখানে গিয়ে দেখি বিশাল মিছিল হচ্ছে। আমার বন্ধু, যারা প্রোডিউসার, ডিরেক্টর, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর, তারা মিছিলে স্লোগান দিচ্ছে--‘কপিরাইট আইন মানি না, মানবো না।’ আমি তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। ‘কপিরাইট আইন মানি না, মানবো না’ মানে কী! কপিরাইট আইন তো আন্তর্জাতিক। বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে করা একটি আইন। এটা মানি না, মানবো না কেনো? তারপর তারা যখন মিছিল ছেড়ে এফ ডি সিতে আসলো, আমি আমার বন্ধুদেরকে বললাম, কী ব্যাপার রে। তারপর তারা বললো, না, সরকার কপিরাইট আইন করতেছে। ইন্ডিয়া থেকে সব কপিরাইট নিয়ে এসে ছবি করতে হবে। আমি বললাম, অসুবিধাটা কোথায়? ওরা বলে, না, কেনো কপিরাইট লাগবে?
দর্শক সারিতে মনোবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহম্মদ নূরুল্লাহ্
কারণ ওরা সবাই চুরি করে, নকল করে ছবি বানায়। যারা আন্দোলন করছে, তারা ওই ইন্ডিয়ান ছবিগুলো নকল করে এখানে ছবি বানায়। তার মানে ওরা চুরি করবে, কিন্তু সঠিক নিয়মে অনুমতি নিয়ে ছবি বানাবে না। এটার জন্যও আন্দোলন হতে পারে একটা দেশে! কোনো দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণাগারে এ রকম আন্দোলন হতে পারে, আর সেটা আমার নিজের চোখে দেখা। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে আর সেটা ভালো ব্যবসা করেছে। সেটা ইন্ডিয়ান হোক কিংবা সাউথ ইন্ডিয়ান ভাষায় হোক; আমি সেই ছবিটা আমার দেশের দর্শকের জন্য নির্মাণ করবো। যে ছবিটি বানিয়েছে, তার কাছ থেকে কপিরাইট নিয়ে বানাও, কোনো আপত্তি নেই, সমস্যা নেই। কিন্তু সেই নিয়ম মেনে সে এটা আনবে না। সে বানাবে হুবহু নকল। যারা এটা করতে চায়, সেই ডিরেক্টর, প্রযোজকরা এখানে আন্দোলন করছে! তাহলে এটাকে আমি কি বলবো! এটা আমার মাথায় ঢোকে না। তখন থেকে দেখেছি, এই চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিটা কোথায় যাচ্ছে। এটা একটা দিক, এ রকম আরো ৮-১০টা পয়েন্ট আছে। যেগুলো দেখার পর তাদেরকে বলেছিলাম, ভাই, এভাবে হলে এ চলচ্চিত্র টিকবে না, টিকতে পারে না, বন্ধ হয়ে যাবে। আমার সেই বন্ধুরা বলেছিলো, আমি নাকি বেশি বুঝি। আবার সেই বন্ধুরাই তার ঠিক তিন-চার বছর পর জিজ্ঞাসা করছে, তুই কীভাবে এটা বুঝেছিলি। আমি বললাম, এটা তো না বোঝার মতো কিছু নয়।
আমি আমার বন্ধু পরিচালকদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাদের অ্যাসোসিয়েশনে গিয়ে--যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আড্ডা মারে ওরা। সেখানে গিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, মনে কর, তোর ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়েছে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পড়ছে। তোর একটা ছবি রিলিজ হয়েছে। এখন তোর ছেলেটা তার কিছু বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ছবিটা দেখতে যাবে। ওই ছবির ভিতরে তুই যা দিয়েছিস, যে কাটপিসগুলো লাগিয়েছিস, তোর ছেলে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ছবিটা দেখে তার মনে কী ভাবনা আসবে! আমার বাবার ছবি। তাহলে এগুলোই সঠিক, এগুলোই আমাকে করতে হবে, এগুলোই শিখবে সে। ক্ষেপে গেলো বন্ধু আমার ওপর। আরে, এখন আমাকে একটা জিনিস বোঝা, তোর ছেলে-মেয়ে, ভাগ্নি, ভাতিজি--এরাই তোর ছবিটা তাদের বন্ধুদের নিয়ে হলে যাবে দেখতে। ওই ছবি দেখে কী ভাববে ওরা। আমার বাবা এসব বানায়, এটাই সঠিক রাস্তা, এটাই সঠিক পথ। আমার বন্ধু আবার ক্ষেপে গেলো। এই হলো অবস্থা। তো সেই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে এখন যতোই চিৎকার-চেঁচামেচি করি না কেনো--এই অবস্থা হওয়ার পিছনে আমরাই তো দায়ী। ওটা থেকে এতো সহজে, এতো সরলরেখায় উত্তরণ ঘটে যাবে--যে জিনিসটাকে আমরা ধ্বংস করেছি নিজেরা সবাই মিলে। সিনেমার ইতিহাস তো বেশি দিনের না; এটার বয়স মাত্র একশো কয়েক বছর। যখন সিনেমা আবিষ্কার হয়, তার চেয়ে বেশি বয়সের মানুষ এখনো হয়তো বেঁচে আছে এই পৃথিবীতে। সিনেমাটা খুব অল্পবয়সি একটা শিল্প। সেটাকে এরই ভিতরে আমরা যা করেছি, যা করে ফেলেছি; এর উত্তরণ থেকে এতো সহজে হবে কি না আমি জানি না। এ হচ্ছে আমার বিষয়।
সুপ্ত মো. বাবু, ভাষাসাহিত্য বিভাগ : একজন অভিনয়শিল্পীর মৌলিক কাজ কী?
আসাদ : অভিনয় করা। এছাড়া আর তো কিছু নাই। তার মৌলিক কাজই হলো অভিনয় করা। অভিনয় করে গেলে, সেটা হয় ভালো হবে, হয় মন্দ হবে, নাহয় মাঝামাঝি হবে; হয়তো কিছুই হবে না।
সুমন চন্দ্র বর্মণ, ইংরেজি সাহিত্য : একজন অভিনয়শিল্পীর জীবনবোধ বা জীবন দর্শন কেমন হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আসাদ : ছোট্ট করে একটু বলি। সেটা হচ্ছে, একজন তরুণ অভিনয়শিল্পীর জীবনবোধ বা দর্শনে প্রথমত যেটা প্রয়োজন; আমি যে পরিবারে, এলাকায়, সমাজে জন্মেছি, সেটা মাথায় রাখা। আমার বর্তমান ও নিকট অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সময়টাকে মাথায় রেখে কোন অবস্থায় আমি এখানে এসেছি এবং আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থাটা কী, কোন অঞ্চলে, কোন এলাকায় আমি বসবাস করি; সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা, জীবন প্রণালি সবকিছু মাথায় রেখে এবং নিজের বোধ বুদ্ধি দিয়ে কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক--এগুলো সমন্বয় করা। এ যাবৎকালে যা দেখেছো, যা পড়েছো, যা বুঝেছো--সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে একটা ভাবনা বা বোধ নিজের কাঁধে সমর্পণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কে কি বললো, চিলে কান নিয়ে গেছে, তার পিছু না ছুটে, নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করা, প্রশ্ন করে নিজের জানাবোঝা পরিষ্কার করা। যে কাজটি আমি করতে চাচ্ছি, অভিনয়শিল্পী হতে যাচ্ছি--কেনো, কী কারণে, কীসের জন্য? আমি কেনো অভিনয়শিল্পী হতে যাচ্ছি? খুব ভালো লাগে, তাই। এ রকম সহজ একটা উত্তর পাওয়া যায়, ভালো লাগে তাই। এ রকম উত্তর যে দেয়, আমার বিশ্বাস তার ভিতরে অভিনয়ের জ্ঞান কম। আমার ভালো লাগে তাই--ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। এই উত্তরটা নিজেকে নিজে করে, নিজে বুঝে; তারপরে কী করবো, কীভাবে করবো, কোনদিক দিয়ে যাবো--এটা খুঁজে বের করতে হবে। খুঁজলে এটা পাওয়াও যায়।
আরেকটি জিনিস হচ্ছে, নিজে নিজে শিক্ষা গ্রহণ। ভালো-মন্দ নিজেই খুঁজে বের করা যায় সবার মধ্য থেকে। এর মধ্যে যাকে ভালো মনে হয়, তার/তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। প্রশ্নগুলোর উত্তর তাদের কাছ থেকে নিয়ে তারপর নিজে নিজে দিক নির্দেশনা তৈরি করে নিতে হবে। আমার মনে হয়, একটু তলিয়ে দেখলে বা ভাবলেই জীবনবোধ ও দর্শন নিজে নিজেই বের করে আনা সম্ভব।
মো. মমিনুল ইসলাম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : চলচ্চিত্রে পরিচালকের পাশাপাশি অভিনয়শিল্পীর ভূমিকা কতোখানি?
আসাদ : এটার উত্তর বোধহয় আমার আলোচনায় ভিতরে অনেকবার এসেছে। তার পরেও বলি, পরিচালকের পাশাপাশি অভিনয়শিল্পীর ভূমিকা বিশাল কিছু নয়। তবে কোনো কারণে যদি মনে হয়, পরিচালক যেভাবে ভাবছে বা আমাকে বুঝিয়েছে, তার সঙ্গে আমার ভাবনা বোধের একটু অমিল আছে। অভিনয়শিল্পী যেটা ভাবছে, সেটা পরিচালকের সঙ্গে আলোচনার পর যদি পরিচালক এটা গ্রহণ করে বা না করে, তখন দুজনের আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি তৃতীয় পথ বেরিয়ে আসতে পারে।
এর বাইরে আমি এতো দিন যেভাবে কাজ করেছি বা দেখেছি সেটা হচ্ছে, আমি পরিচালকের অভিনেতা। পরিচালক যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই কাজ করি। পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে যদি আমার মনে হয়, তার ভাবনার সঙ্গে আমার ভাবনা মিলছে না, তখন তার সঙ্গে কথা বলে নিই। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই, পদ্মা নদীর মাঝির শেষ দৃশ্য, কুবের যখন ভোর রাতে--তখনো আলো ফুটেনি আকাশে, পরিষ্কারভাবে সূর্য উঠেনি--হোসেন মিয়ার নৌকায় উঠবে, যাবে হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপে; কুবের যখন নৌকার পাটাতনে উঠবে, তখন পিছনে দেখে কপিলাকে। কুবের তাকে বলেন, ‘বাইত যা।’ পরে কুবের নৌকায় গিয়ে বসে। তখন কপিলা বলেন, ‘আমারে নিবা মাঝি লগে।’ সেই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে কুবেরের এক্সপ্রেশন কেমন হবে? এ নিয়ে দীর্ঘ ছয় মাস আমার আর পরিচালকের মধ্যে কথা হয়েছে। এমনও হয়েছে এ নিয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে রাত একটা-দুইটা বেজে গেছে। আমরা ভেবেছি, এর অভিব্যক্তিটা কী হবে, সেটা দিয়ে দর্শককে কী বোঝাবে কুবের, দর্শক কী বুঝবে। পরিচালক না আমাকে বোঝাতে পারে, না আমি তাকে পারি। এই অবস্থা ছয় মাস চলেছে।
তারপর যখন দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসলো, তখন একদিন পরিচালক বললো, এটা করে দেখাও আমাকে। তখন আমি বললাম, আমি তো বুঝতেই পারছি না, এখানে কুবেরের অভিব্যক্তিটা কী হবে! কুবের কী চাইবে, ও যাক নাকি না যাক। কারণ পুরো পরিবার, বাচ্চা-কাচ্চা ফেলে ও যাচ্ছে ময়না দ্বীপের অজানায়। যেখানে সে আগে একবার পরিবেশ দেখে এসেছে। সেখানে গিয়ে তাকে ঢুকতে হবে। সব ছেড়ে সে পালিয়ে যাচ্ছে সেখানে। এর এক্সপ্রেশন কী হবে? তখন আমি পরিচালককে বললাম, এটার একটিই উপায় আছে, কপিলা জিজ্ঞাসা করার পর চেহারা দেখানো যাবে না কুবেরের। এখানে কুবেরকে আর দেখা যাবে না। কুবের কী বলেছে, এটা দর্শক বুঝে নিক; দর্শকই এর উত্তর দিক। এখানে কুবেরের কোনো পার্ট নেই। আলোচনার ভিত্তিতে পরিচালক এটা মেনে নিয়েছিলো।
আর একটা জরুরি বিষয় ভুলে গিয়েছিলাম, সেটা হচ্ছে অ্যাকটিং কন্টিউনিটি। যেমন, একটি দৃশ্য হয়তো বেশ কয়েকটি সংলাপ আছে। এটাকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়। এক নম্বর শটে এইটুকু হবে ক্লোজআপ। দুই নম্বরটা হয়তো মাস্টার হবে। সিনেমা শুটিংয়ে যেটা দেখা যায় আরকি, অনেক সময় প্রথম শট্ নেওয়ার পরে মাঝখানেরগুলো বাদ দিয়ে ছয় নম্বরটা নেওয়া হয়। পরে আবার মাঝখানের শট্ নেওয়া হয়। মানে সকালবেলা এক নম্বর শট্ নিয়ে লাঞ্চের পর নেওয়া হলো দুই নম্বর শট্। এখন আমি এক নম্বর শটে যে অভিব্যক্তি দিয়েছি, আমার পোশাক-আশাক কী ছিলো, এটা মনে রাখার দায়িত্ব অভিনয়শিল্পীর। যদিও এর দায়িত্বে একজন নামকাওয়াস্তা সহকারী পরিচালক থাকে। কিন্তু আমার দেখা, কোনোদিন ওই দায়িত্বে থাকা সহকারী পরিচালক এটা মনে করিয়ে দিতে পারে নাই। অন্তত আমার ক্ষেত্রে তো নয়ই। অন্য কোনো দেশে বা অন্য কারো বেলায় পেরেছে কি না আমি জানি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফিল্মে এই ভুলটা হয়। ফিল্মে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হচ্ছে, এই অ্যাকটিং কন্টিউনিটি মেইনটেইন করা। আমার জানা মতে, বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো অ্যাকটিং কন্টিউনিটি মেইনটেইন করতে পারতো আমাদের কবরী ম্যাডাম। উনি এতো ভালো পারতেন, সাত দিন পরও তার মনে থাকতো।
‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ পরিবারের সঙ্গে রাইসুল ইসলাম আসাদ
তাসলিম উদ্দিন আহমেদ, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ : অভিনয়শিল্পী হিসেবে সারাজীবন এতোগুলো চরিত্র ধারণ করার পর নিজের সত্তা আর কতোটুকু থাকে?
আসাদ : আমি তো আগেই বলেছি, কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এই কাজটি দীর্ঘদিন করে যাওয়া সম্ভব নয়। এটা শুধু অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রেই নয়, একজন ভালো লেখক, পেইন্টার, গায়ক-গায়িকা--এই ধরনের যতো কর্মকাণ্ড আছে--এরা একশত ভাগ সুস্থ-সবল মানুষ বলতে যা বুঝি--এরা কী তাই? তারা যদি সুস্থই থাকতো, তাহলে এতো দীর্ঘপথ কীভাবে পাড়ি দেবে। উত্তর হয়ে গেছে।
মো. রেজাউল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগ : ভুল করা মানুষের স্বভাব। কিন্তু কতোটা ভুল করলে কারো জীবনে সফলতা আসে, বলবেন কি?
আসাদ : ভুল করা মানুষের স্বভাব। তবে ইচ্ছে করে ভুল করা তো মানুষের স্বভাব নয়। আর যে ভুলে অন্যের ক্ষতি হয়, অন্যের জীবনে বিভিন্ন ধরনের বিপদ আনে, সেই ভুল করা যাবে না। নিজের প্রতি নিজের ভুল মেনে নেওয়া যাবে। আমার নিজের ভুলের কারণে অন্য কোনো প্রাণ ক্ষতির মুখে পড়ে--সেটা মানুষ হোক বা অন্য কোনো প্রাণ হোক--সেই ভুল করা যাবে না। সেই ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।
মো. আসাদুজ্জামান, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : একজন সাধারণ অভিনেতা কীভাবে অল্প সময়ে জনপ্রিয় অভিনেতা হিসেবে পরিণত হয়? আবার অনেক অভিনেতা বহুকাল অভিনয় করার পরও কেনো জনপ্রিয় হতে পারে না?
আসাদ : অনেক আগেই এর উত্তর দিয়ে দিয়েছি। এটা কেউ বলতে পারে না। এটা কেনো হয় আর কেনো হয় না। যার হয়েছে, সেও বলতে পারবে না, কেনো হয়েছে। এটার জন্য কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। একটি কাজ করার পর দেখা গেলো, দর্শক লাফিয়ে পড়েছে, আরে কী অভিনেতা, কী পরিচালক! কিন্তু তার চেয়ে এক হাজার গুণ পরিশ্রম করে হয়তো কেউ কাজ করে যাচ্ছে, তার কোনো খবর নেই।
কাজী মামুন হায়দার, সম্পাদক, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ : এখানে উপস্থিত আছেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী। চলচ্চিত্রের খুব সমঝদার মানুষ। আমি তাকে অনুরোধ করছি অভার অল বিষয়ে একটু কথা বলার জন্য। এখন কথা বলছেন সফিকুন্নবী সামাদী।
সফিকুন্নবী সামাদী : রাইসুল ইসলাম আসাদ, আমি ভক্ত আপনার। আমি এখানে পেটের সূত্রে কাজ করে খাই। আর বাংলা বিভাগে পড়াই। সিনেমা দেখে মনের সুখ মিটাই। তরুণদের উদ্দেশে বলছি, আমরা আপনার যৌবনটা খুব কাছে থেকে দেখেছি ঢাকা শহরে। যখন এক রিকশায় তিন জন চড়তেন মালিবাগের মোড়ে। অনেকবার দেখেছি সেই উদ্দামতা। সেই থিয়েটার থেকে কীভাবে আপনি টেলিভিশনে এবং টেলিভিশন থেকে কীভাবে নিজেকে চলচ্চিত্রে নিয়ে যাচ্ছেন। ‘চলনা সখি জলসা ঘরে যাই’ স্ক্রিপ্ট পড়ছেন। সেই সময় আপনার পরিপূর্ণ যে যৌবন, সেগুলো আমার মনে আছে। কিছুদিন আগে আপনার অসুস্থতার খবর শুনে মন খারাপ ছিলো। অভিনয়শিল্পী বলতে আমার কাছে দুটো ভাগ আছে। স্বাভাবিক অভিনেতা আর বানানো অভিনেতা। স্বাভাবিক অভিনেতার ঘরে আমি আপনাকে রেখেছি। যারা বাড়িতে অভিনয় পারে, তারা আসলেই বাড়িতে অভিনয় পারে। আমরা সব সময়ই ভালো মানুষের অভিনয় করি। আমরা বাড়িতে বেশি অভিনয় করি বলেই হয়তো থিয়েটারে অভিনয় পারি না আরকি! বাড়িতে আপনার সংসারের অবস্থা জানি না। হয়তো ছেলে-মেয়েদের কাছে আপনি যা, তাই আপনি প্রকাশ করেন।
আসাদ : না, প্রকাশ করতে হয়নি, কারণ তাদের সঙ্গে আমার দেখাই হতো না। গত ১৫-১৬ বছরে মাত্র ৩০-৪০ দিন দেখা হয়। আর বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করার কোনো সময় নেই আমাদের।
সফিকুন্নবী সামাদী : এখন কয়েকটা গুরুতর প্রশ্ন আমার মনে হয়েছে, আপনার বোঝাপড়ার সঙ্গে। আমার মনে হয় না চলচ্চিত্র কোনো বিপদগ্রস্ত শিল্পমাধ্যম। আমাদের দেশে যারা বিদেশি চলচ্চিত্র আনার ব্যাপারে বাধা দেয়, তারা অক্ষমতা থেকেই বাধা দেয়। যদি ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’ সুগন্ধী বাংলাদেশে আসতে পারে। বাংলাদেশেও তো সুগন্ধী তৈরি হয়। তার পরেও কেনো আমদানি করা হয়। পৃথিবীর সব থেকে শ্রেষ্ঠ বস্ত্র যদি আসতে পারে। রাজশাহী শহরে আমার একজন সহকর্মী, যিনি রেমন্ডস এর একটি শো-রুম করেছেন। সেখানে এক লাখ টাকার স্যুট বিক্রি হচ্ছে। তো এই জিনিস যদি আমদানি হতে পারে, তবে ভালো সিনেমা কেনো আমদানি হতে পারবে না।
আমি ভারত থেকে স্থলবন্দর হয়ে আসার সময় কিছু কাপড়চোপড় ও এক বস্তা বই কিনেছিলাম। তখন ওরা আমাকে বললো, স্যার, এইগুলো নিয়ে যেতে পারবেন না। এইগুলোর জন্য আপনি জি এস পি দিয়েছেন কি না দেখান। তো আমি বললাম, আপনি তো আমার কাপড়ের জি এস পি চাইছেন না। আমি ৭৫ হাজার টাকার ফোন কিনেছি সেটা দেখতে চাইছেন না। আপনি চাইছেন আমি বইয়ের জি এস পি দিয়েছি কি না সেটা। তেমনই কোনো কিছুই আটকাচ্ছে না। চলচ্চিত্র আমদানি করলেই আটকাচ্ছে। তাও আবার হলিউডের সিনেমা আমদানি করলে আটকাচ্ছে না। নৈকট্যের কারণে যে সিনেমা আমরা ভালো বুঝি, ভারতের সিনেমা আটকাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়, অক্ষম পরিচালকদের কারণেই এটা হচ্ছে।
এখন যেটা হচ্ছে, সিনেমা প্রদর্শনের ধরনটা পাল্টে গেছে। কিন্তু এখানকার নির্মাতারা এখনো সেই ধরনটার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি অথবা তাকালেও বুঝতে পারেনি। নেটফ্লিক্সের মতো অনলাইন প্লাটফর্ম আসার আগেই তো ওরা ইনক্রিপ্টেট করে অনলাইনে সিনেমা চালিয়েছে। এটা কেউ রেকর্ডও করতে পারবে না, কেউ অন্য সময় চালাতেও পারবে না। একই সময় দুনিয়াতে শত শত সিনেমাহলে সিনেমাটা চলছে। আই টি তো আমাদেরকে শুধু কটুবুদ্ধিই শেখায়নি, কিছু সুবুদ্ধিও শিখিয়েছে। আমাদের প্রটেকশনের জায়গাটাও তৈরি করে দিয়েছে। যে হ্যাকাররা হ্যাকিং করে, তারাই হ্যাকিং বন্ধ করতে পারে। যদি আই টি’টা আমরা ঠিকমতো কাজে লাগাই। অনলাইনে যে জায়গা তৈরি হয়েছে আমেরিকা-ইউরোপে--একটা বড়ো প্রতিষ্ঠান নেটফ্লিক্স যেটা করছে, আমাজন করছে এখন। ইউটিউবও আছে, যদিও এগুলোতে বাণিজ্যিক ব্যাপার-স্যাপার আছে আরকি। সেই জায়গাগুলো আমাদের চলচ্চিত্রকার, প্রোডিউসার, ডিস্ট্রিবিউটাররাও ধরতে পারছে না এখনো। তাহলে এখানে তো দর্শকের দোষ না। সিনেমা সংশ্লিষ্টরা হলমালিককে হুমকি দিচ্ছে সিনেমা বানানো বন্ধ করে দেওয়ার। সিনেমাহল বন্ধ হয়ে যাবে, কিন্তু আমার মনে হয় না সিনেমা বন্ধ হবে।
আমি আসলে চলে যেতে চেয়েছিলাম। আমি এখন কথা বললাম, আর অমনি চলে যাবো। আপনার কথা না শুনে চলে যেতে তো পারি না। (আসাদ : আপনার কাজ থাকলে চলে যেতে পারেন।) না না আমি আপনার কথা শেষ করেই যাবো।
আসাদ : আমরা যেটা বলি, ভারতীয় চলচ্চিত্র চালানো যাবে না। কিন্তু সেই সিনেমাগুলোই ঘরে বসে টেলিভিশনে কিন্তু আমরা দেখছি। কেনো যে এটা নিয়ে এতো কথা! আমাকে তো ভারতীয় দালাল বলে বিভিন্ন সময়, এখনো গালাগাল করে। আমি তাতে কিছু মনে করি না। কারণ আমার কাছে মনে হয়েছে একটা সময় সেই ১৯৬৫ সালের আগে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি সিনেমা, পাকিস্তানের উর্দু চলচ্চিত্র, হলিউডসহ অন্যান্য চলচ্চিত্র এসেছে। এ সবই তো আমাদের ঢাকা শহরে চলেছে, আমরা দেখেছি। আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তো তখন ধ্বংস হয়ে যায়নি। চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে তারা কেনো যে সেই সময় শিশু-শিল্প শিশু-শিল্প করে বঙ্গবন্ধুকে বললো, মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিছুদিনের জন্য বন্ধ করেন। কিন্তু তিনি রাজি হলেন না। ওরা পরে বললো, অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও বন্ধ রাখা হোক, আমরা একটু পাকাপোক্ত হই, শিশুটি একটু বড়ো হোক। সেই শিশু কিন্তু--কী বলবো--বালকও হলো না, কিশোরও হলো না, সে ওই শিশু অবস্থাতেই একদম মৃত হয়ে গেলো। সেই ৭২ সাল থেকে আজ কতো বছর! সেই শিশু এখনো বালকও হলো না, কিশোরও হলো না। মানে নিজেরা কুয়োর ব্যাঙ হয়ে বাইরের কিছু দেখতে চাই না, দেখতে দিবো করে করে টানতে টানতে এ পর্যন্ত। আমার তো অবাক লাগে! এখন তো সবকিছু দেখতে পাওয়া যায়। তাহলে সমস্যাটা কোথায়? আমার বোঝার জ্ঞান নেই, এটা কেনো এবং কী কারণে। যারা আন্দোলন করে, তাদের মধ্যে এমনও পরিচালক আছে যারা গত ৪০ বছরে মাত্র একটা সিনেমা নির্মাণ করেছে এবং সেটাও চলেনি। তারপর আর কোনো সিনেমা বানায়নি। যাহোক, তাহলে আমরা আবার সেখানে ফিরে যাই।
আকবর মিরাজ, উর্দু ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ : অভিনয় জীবন নাকি ব্যক্তি জীবন--কোনটাকে বেশি উপভোগ করেন?
দর্শকের একাংশ
আসাদ : এই দুটোকে তো আর আলাদা দেখতে পারি না এখন। তবে করার চেষ্টা করেছি সারাজীবন। অভিনয় জীবন ও ব্যক্তি জীবন কখনো মিলাইনি। দুটোকে আলাদা রাখার চেষ্টা করেছি। তবে এখন আর ব্যক্তিজীবনকে টানাহ্যাঁচড়া করতে হয় না। কারণ এর বাইরে আর কোনো ভাবনার জায়গা আছে বলে মনে হয় না। তবে বাস্তবজীবন নিয়ে আমার দর্শক যারা আছে, যারা আমার অভিনয় পছন্দ করে, তারা ব্যক্তিজীবন নিয়ে প্রশ্ন করলে আমার একটু বিরক্ত লাগে। আর একটা কথা হচ্ছে, আমি সাধারণ মানুষের মতো করে চলাফেরা করতে চাই। এবং এখনো সেই চেষ্টা করে চলেছি। আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করছি, প্রচুর দর্শক আমাকে পছন্দ করে, কিন্তু এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি যে আমি বেরোলে আমাকে দেখে তারা পাগল হয়ে যাবে, উন্মাদ হয়ে যাবে। এর দুটি কারণ রয়েছে। একটা হচ্ছে, আমি এতো বেশি নিয়মিত বেরোতাম এবং যেখানে ফুটবল, ক্রিকেট খেলা হয় এসব মাঠে ঘুরে বেড়াতাম। তো আমাকে ওরা নিজেদের লোকই মনে করতো। অভিনেতা হিসেবে একেবারে আমাকে দেখতে পাওয়া যায় না, লুকিয়ে থাকা কিংবা বোরকা পরে মার্কেটে যাওয়া--এসব কিছু আমার কখনো হয় নাই। সেজন্য আমি দুটো জীবনই উপভোগ করেছি।
৭২ সাল থেকে আমি যেটা দেখি--আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম, বেঁচে আছি এখনো--আমাদেরকে কিছু বললে আমার না কেনো জানি মনে হয় ৭১-এর পর থেকে আমাদের জীবন শুরু। কেনো জানি এর আগের জীবনটা নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তা নাই। কেনো জানি কাজও করে না। কোনো কিছু বললে যেনো ওখান থেকেই আমাদেরকে শুরু করতে হবে। আমাদের জীবনটা শুরু ৭১-এ, তারপরে এ পর্যন্ত! আগেও একটা জীবন অবশ্যই আছে। জন্মেছি ৫৩ সালে, তখন থেকে ৭১। একটা মোটামুটি সময়। কিন্তু এ যুদ্ধের চলমানতায় সেটা আমাদের কাছে মুখ্য মনে হয় না। যুদ্ধ এমন একটা জিনিস--যুদ্ধের একটা সিনেমা দেখেছিলাম, হিন্দি সিনেমা, নাম মনে করতে পারছি না। ওখানে একটা সংলাপ ছিলো এ রকম--যুদ্ধ যাই হোক না কেনো, যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেনো, প্রত্যেক যোদ্ধা সেখানে কিছু না কিছু তার জীবন থেকে হারায়। যুদ্ধ এমন একটা জিনিস, যুদ্ধ মানুষকে বদলে দেয়। যুদ্ধ মানুষের বোধ-চিন্তা-বিশ্বাসসহ অনেক কিছু পাল্টে দেয়।
যুদ্ধ যারা দেখেছে, যুদ্ধে যারা সরাসরি অংশ নিয়েছে, এখন যারা বেঁচে আছে, তারা কেউই স্বাভাবিক মানুষ নয়। একটা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর--কেউ যদি যুদ্ধে অংশ নিয়ে থাকে--জীবন-মৃত্যু নিজের সামনে দেখে থাকে, জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে থাকে, তাহলে সে কখনো একটি স্বাভাবিক মানুষের বোধ-ভাবনা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না।
মো. শিমুল ইসলাম, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি : সালাম নিবেন। লালসালুতে আপনার অভিনয়ের অভিজ্ঞতাটা শেয়ার করুন।
আসাদ : ওরে বাবারে! লালসালুর অভিজ্ঞতা! থাক্, পরে দেখা যাবে। এই অভিজ্ঞতা অনেক লম্বা।
সালাহউদ্দিন নীল, সাবেক শিক্ষার্থী নৃবিজ্ঞান : দুই রকমের পাথরের মধ্যে একটা পাথর ধার হয়, অন্যটা ক্ষয়ে যায়। যেটায় ধার হয়, সেটাই ...
আসাদ : (হাসি) না। প্রশ্ন হলো ধার হওয়া পাথর বুঝবো কী করে! আমি বলিনি যে, পাথর ঘষে ধার হলে সেটা অভিনেতা হয়। আমি এটা উপমা হিসেবে বলেছি। একটি পাথর ঘষলে ধার হয়, সেটা দিয়ে অস্ত্র তৈরি হয়। এই ধারটাকেই কাজে লাগানো যায়। এখন অভিনয় করতে করতে যদি তার মধ্যে যোগ্যতা থাকে, তাহলে সে অভিনেতা হিসেবে বেরিয়ে আসবে। তা না হলে সে ঝরে পড়বে; মানুষ হিসেবে থাকবে, অসুবিধা কী! মানে ওইখানে দুই জন মানুষ মারা গেছে, আর একজন অভিনেতা মারা গেছে। অভিনেতা মানুষ না! (হাসি) এই হলো ব্যাপার। এটার জন্য কোনো পরামর্শ দেওয়ার মতো কিছু নাই। এটা করে দেখতে হবে--কারো হয়, কারো হয় না।
তানভীর শাওন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে আপনি লাল দরজা ও উত্তরায় কাজ করেছেন সেই অভিজ্ঞতা যদি ...।
আসাদ : এই যে অভিজ্ঞতায় আটকে গেছি। অনেক লম্বা।
পারভেজ, ইতিহাস বিভাগ : পদ্মা নদীর মাঝি চলচ্চিত্রে কুবের চরিত্রে আপনার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাই।
আসাদ : সুন্দর অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমি কখনো সপ্নেও দেখিনি যে, আমি এর অভিনেতা হবো। তারপরও অভিনেতা হয়ে গেছি। খবর পেলাম গৌতম ঘোষ পদ্মা নদীর মাঝি করবেন। তার সঙ্গে কোনোদিন আমার দেখা হয় নাই। তার শুধু একটা সিনেমা দেখেছিলাম আমি--পাড় (১৯৮৪)। তো সিনেমাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছিলো। যাই হোক, সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকী তখন এফ ডি সি’র ডাইরেক্টর। তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ সময়ের সম্পর্ক স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে থেকেই। উনিও ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা। উনি আমাকে ফোন করে বললেন, ব্যাপার কী তোমার, গৌতম ঘোষ এখানে এসেছেন, চলচ্চিত্র করবেন। অভিনেতা-অভিনেত্রী দেখতে এসেছেন, তুমি কোথায়? তোমাকে দেখি না কেনো? আমি বললাম, আমি গিয়ে কী করবো। আমি কি গিয়ে বলবো, ভাই, আমি অভিনয় করবো, আমাকে নিবেন? আমি কি জীবনে অভিনয় করেছি, আপনি তো জানেন। আপনাদের সঙ্গেই তো আমার কাজ শুরু। আপনারাই তো আমাকে জোর করে অভিনেতা বানাইছেন। বললাম, আমি কী হিসেবে দেখা করবো, কী বলবো গিয়ে? আপনি বরং যদি পারেন, আমাকে একটা কাজ করে দেন। উনি যখন সিনেমাটা করবেন, সেখানে যদি আমাকে সহকারী হিসেবে নেন। আমি তো ১৯৭২-৯১ সাল পর্যন্ত বেশকিছু মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। আমাকে যদি একটা সুযোগ দেন। একটি ভালো সিনেমা কীভাবে নির্মাণ হয়, আমি সেটা দেখতে চাই। আমাদের দেশে এ পর্যন্ত এমন সিনেমা তো পাই নাই। আমি অভিজ্ঞতা নিতে চাই। উনি যদি আমাকে উনার ১০-১২ নম্বর সহকারীও করেন। পুরো সিনেমাটার সঙ্গে আমি যুক্ত থাকতে চাই।
আর যদি তাও রাজি না হন। তাহলে একজন অবজারভার হিসেবে যেখানে যেখানে শুটিং হবে সেখানে আমি উপস্থিত থাকতে চাই, তাকে কোনো রকম বিরক্ত করা ছাড়াই। দূরে থেকে আমি সেটা দেখতে চাই। আমাকে খাওয়াও দিতে হবে না, থাকার জায়গাও দিতে হবে না। কোথায় থাকবো, খাবো, সেটা আমার ব্যাপার। যেখানেই শুটিং হবে বা অন্য কাজকর্ম হবে, আমি উপস্থিত হতে চাই। এইটুকু কাজ আমাকে করে দেন। জাকী ভাই বললেন, আরে আসো তো, আমার বন্ধুর সঙ্গে তুমি তো দেখা করতেই পারো। বললাম, ঠিক আছে আমি দেখতেছি। তারপরে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো।
আমি যতোগুলো কাজ করেছি, তার কিন্তু কোনো রেকর্ড আমার কাছে নেই। অনেকেই সি ডি-ডি ভি ডি করে রাখে আরকি। আমার কাছে কোনো রেকর্ড নাই। আমি কোনো রেকর্ড রাখি না; রাখার অভ্যেসও নাই। আমি কাজ করলাম, হয়ে গেলো। ভালো হলে ভালো, মন্দ হলে মন্দ। সেগুলো রেকর্ড রাখি নাই। এভাবেই আমার জীবন কাটিয়েছি। তো জাকী ভাই বললেন, দেখো না, তোমার কোনো কাজের রেকর্ড আছে কি না। আমি বললাম, পারবো না, আমার কাছে নেই।
তো আমার কিছু ভক্ত আছে। দু-একজন মাঝেমধ্যে যোগাযোগ করে। তাদের একজনকে টেলিফোন দিয়ে বললাম, তোমরা তো আমার কাজগুলো মাঝেমধ্যে সংগ্রহ করতে, কোনো রেকর্ড আছে কি না? তো একজন বললো, ভাই আমার কাছে আপনার ৮৬ সালের ‘সময়ে অসময়’ নাটকের সবগুলো এপিসোড আছে। আমি তাকে বললাম, তুমি কি এইগুলো একটা ক্যাসেট করে জাকী ভাইয়ের অফিসে গিয়ে দিয়ে আসতে পারবা। হ্যাঁ, ভাই অবশ্যই পারবো। আপনি শুধু জাকী ভাইকে এইটুকু বলে রাখতে বলেন আমি যাতে গেইট দিয়ে ঢুকতে পারি। আমি উনার রুমে গিয়ে দিয়ে আসবো। বললাম, তার আগে আপনি একটা কপি করে রাখবেন। বলে অবশ্যই কপি করে রাখবো। পরের দিন সকালে সালাউদ্দীন জাকী আমাকে ফোন দিয়েছে। শোনো, কালকে একজন ওটা দিয়ে গেছে। প্রায়ই রাতে আমি আর ও (গৌতম) দুজন বসি। কাল রাতে বসে তোমার ওইটা দেখেছি। উনি আজকে ফাঁকা আছেন। তুমি আসো। আমার অফিসে একটা কাজ দেখবেন উনি। ওইখানে তুমি আসতে পারবা। তখন আমি বললাম, দুইটা-আড়াইটার আগে আসতে পারবো না। জাকী বললো, ও এতোক্ষণ থাকবে, লাঞ্চ করবে! আমি বললাম, তাহলে থাক আমি পারবো না। জাকী বললো, সবাই তার সঙ্গে দেখা করার জন্য সময় চায়, পাগল হয়ে যায়। আর সেখানে আমি তোমাকে বলছি, আমার অফিসে এসে দেখা করে যাব--লোকটার কাছে কমিটেড আমি--আর তুমি পারবে না!
আমি বললাম, ঠিক আছে। উনাকে আপনি বসাবেন। আমি যদি গিয়ে তাকে পাই, দেখা করবো। তো গেলাম এফ ডি সি’তে। আমার সঙ্গে হুমায়ুন ফরীদির দেখা হলো এফ ডি সি’তে ঢোকার পরে। তো গিয়ে দেখি, উনি ল্যাবে বসে প্রজেকশনে একটি ছবির রাস দেখছেন। বরফ বলে একটি শর্টফিল্ম করেছিলেন সালাউদ্দীন জাকী, যেটার আমি সহকারী পরিচালক ছিলাম, সেটার একটা রিল দেখছে। ওখানে অনেক লোকজন বসা। আমাকে দেখে বসতে বললো সবাই। এরপর কিছুক্ষণের মধ্যে জাকী ভাইয়ের সঙ্গে আমার তর্ক-বিতর্ক শুরু হলো। আমি বললাম, আপনার কি মনে আছে, আমি এই জায়গায় এই ভুল ধরেছিলাম। তো যাই হোক তর্ক-বিতর্ক শেষ হলো। এদিকে লোকজন বেড়েই যাচ্ছে। এর মধ্যে প্রযোজক হাবিবুর রহমান খান হঠাৎ করে বললেন, কী ব্যাপার আপনাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমি জানতে চাইলাম, খুঁজে পাওয়া যায় না মানে কী? বললাম, ভাই আমার বাড়িতে একটা টেলিফোন আছে। টেলিফোন করলেও তো আমি কথা বলি। আর আমাকে ঢাকা শহরে খুঁজে পাওয়া যায় না, এ কথাটা সত্য নয়। তারপর আমি বের হচ্ছি আর লোকজন আমাকে আপাদমস্তক দেখছে।
আমি অবশ্য তেমন কিছুই বুঝতে পারছি না। একপর্যায়ে জাকী ভাইসহ উনারা এসে বললো, শোনো আমরা লাঞ্চে যাচ্ছি। তোমার কাল সকালে সময় হবে কি না? বললো, আমরা লোকেশন দেখতে যাবো, তুমি যেতে পারবে কি না? বললাম, কয়টার সময়? ভোর পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটা। তোমার বাসার ওই দিক দিয়ে যাবো। তুমি রেডি থেকো পল্টন থেকে তোমাকে তুলে নিবো। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমিও মনে মনে এই চাচ্ছিলাম, আমি যদি লোকেশন দেখা থেকে শুরু করতে পারি, সহকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারি। এই চিন্তা থেকে আমি চলে গেলাম। পরে অনেক ঘটনা। পরদিন ভোরবেলা আসতে না আসতেই অনেক ঝামেলা। অনেক কিছু। পরে বিরক্ত হয়ে একটা সময় যখন আমি ফিরে যাবো, হঠাৎ অনেক স্পিডে একটা গাড়ি এসে জোরে ব্রেক করলো। চিৎকার করে ডাকছে, আসাদ, আসাদ। আমি তো চিৎকার করে উত্তর দিচ্ছি, আপনাদের কোনো সময় জ্ঞান নাই, আমি একটা মানুষ প্রায় দেড়-দু ঘণ্টা এখানে দাঁড়িয়ে আছি। আমি ফিরে চলে যাবো। আমি আর যাবো না। এরপর মাইক্রো থেকে লোকজন দৌড়ে নেমে এলো। গৌতম বললো, প্লিজ আপনি রাগ করবেন না। ওদের কারো দোষ নয়। দোষটা আমার। আমি অনেক রাত পর্যন্ত কাল বাড়ি ফিরতে পারিনি। চারটা-সাড়ে চারটা বেজে গেছে আমার শুতে। আমি ঘুমাইনি। আমি সরি। আমার কারণে এমনটা হলো। একটু নাস্তা খেয়ে আসতে আসতে দেরি হয়ে গেছে। প্লিজ আপনি আসেন। এরপর আমাকে নিয়ে গাড়িতে তার পাশে বসালো। পিছনে হাবিবুর রহমান খান সাহেব বসা ছিলেন। উনি এলোমেলো কথা বলে আমাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিলেন। কারণ আমি ক্ষেপে গেলে অন্য মানুষ হয়ে যাই। এ রকম স্বাভাবিক থাকি না। আরো অনেক বেশি এলোমেলো হয়ে যাই। কোনো গুরুজন বা প্রিয়জন কোনো কিছুই আমি দেখতে পাই না। অসম্ভব খারাপ ব্যবহার করি। এখনো আমি সে রকমই।
তো যেতে যেতে বিক্রমপুর যাওয়ার পথে তখন দুটো ফেরি ছিলো--এখন ফেরি নাই, ব্রিজ হয়ে গেছে--সেটা পার হলাম। তারপর নেমে লোকেশনে যাবো। উনি (গৌতম) ফেরির সামনের কোনো একটা অংশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি জানতে চাইলাম--আপনি হোসেন মিয়াকে কীভাবে দেখছেন এই চলচ্চিত্রে? উনি হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কীভাবে দেখছেন? আমি বললাম, এই উপন্যাসের নায়ক হচ্ছে হোসেন মিয়া। হোসেন মিয়া না হলে এই উপন্যাস লেখারই প্রয়োজন হতো না। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে উনি বললেন, আপনার কী সে রকম মনে হয়? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি সেভাবেই দেখি, ভাবি। যখন শুনলাম আপনি চলচ্চিত্রটি করছেন, আমি আবারও উপন্যাসটি পড়েছি। এই নিয়ে তার সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলোচনা শুরু হলো। তারপর ওখান থেকে লোকেশনে গেলাম।
হাবিব খান সাহেব ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলো লোকেশন শুট করবে বলে। আমি বসে আছি। হাবিব খান সাহেব আমাকে ডাকলেন। বললেন, আপনাকে তো চলচ্চিত্রে কাজ করতে হবে। আমি বললাম, আমি তো শুরু করে দিয়েছি। এই যে লোকেশন দেখতে এসেছি। এখন আমাকে যদি সহকারী পরিচালক হিসেবে নেন আরকি। তারপর সে বললো, আপনি বুঝতে পারছেন না, আপনাকে কুবের চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। আমি অবাক হয়ে গেছি। আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি আমি কুবের চরিত্রে অভিনয় করবো। তারপর সে বললো, বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার? শোনেন কালকে আপনি আসার পরে অনেক লোকজন এসেছিলো দেখা করার জন্য। উনি কারো সঙ্গে দেখা করেননি। আমরা মাঝে মাঝে তার কাছে যাচ্ছিলাম, তাকিয়ে থাকেন কোনো কথা বলেন না। এমন করতে করতে জাকী প্রায় ১১টার দিকে চলে গেলো। তিনি জাকীকে বললেন, আপনি আসাদকে ফোন করে দিয়েন। তারপরে রাত দেড়টার দিকে ফোন করে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’কে বললেন, আমি কুবের চরিত্রে যার নাম দিয়েছি ওইটা বাদ। ওখানে নতুন নাম যাবে; কী নাম যাবে সেটা আমি পরে বলবো। ওই নামটি কাল ছাপা হবে না। যেটা কনফার্ম করেছিলাম, সেটি ক্যানসেল করতে হবে। সেটা যদি পত্রিকায় ছাপাও হয়ে থাকে, ওদেরকে বলো। এখনো সময় আছে, ওরা দুইটা-আড়াইটার আগে প্রিন্ট করে না। আমি জানি। এক্ষুনি তোমরা যোগাযোগ করো।
তারপরে তো শুরু হয়ে গেলো কাজ। আমাকে কিন্তু তার সঙ্গে আট-দশ দিন থাকতে হয়েছিলো। এখানে ১০ দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে। বিভিন্ন আর্টিস্টের অভিনয় দেখাতে হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়ে যেতে হয়েছে। সেখানে আগে থেকে বলে রেখে বিভিন্ন অভিনেতার কাজকর্ম, এখানকার আর্টিস্টদের বিভিন্ন ক্যারেক্টার দেখাতে হয়েছে। কন্টিনিউয়াস এভাবে একসঙ্গে থেকে কাজ করেছি।
যেদিন সকালে তিনি চলে যাবেন। আমি আর হাবিব খান তাকে এয়ারপোর্টে দিতে যাবো। হঠাৎ হাবিব খান তাকে জিজ্ঞাসা করলো, গৌতম তুমি কি আসাদকে বলেছো ও তোমার ছবিতে অভিনয় করছে। তোমার অনেক নিয়ম তো, কী করবে না করবে। বলেছো ও কুবের চরিত্রে অভিনয় করছে? আমি বললাম, আসলেই কি? বললো হ্যাঁ। এটা তো ফাইনাল আমি কলকাতায় নামটাম সব পাঠিয়ে দিয়েছি। তখন গৌতম বললো, আমাকে মধুবালাতে দেখে তার অনেক মোটা লেগেছে। মধুবালা তো করেছি ৮৬-তে। তখন ছিলাম আমি অনেক মোটা। আসলে মোটা হয়েছিলাম ক্যারেক্টারটা করার জন্য। অনেক ওজন বাড়িয়েছিলাম। কিন্তু সামনাসামনি যখন দেখছে তখন তো ঠিক লাগছে। তখন ছিলো ৮৬ সাল। আর এখন দেখছে আমাকে ৯১ এ। তখন বললো ও তো মোটা না আসলে। ঠিক আছে। এই আমি ছবিতে কাস্ট হলাম।
এই ছবির জন্য আমাকে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। জেলেপাড়ায় গিয়ে থাকতে হয়েছে। জেলেদের সঙ্গে পদ্মায় মাছ ধরতে হয়েছে। নিজেকে তৈরি করতে হয়েছে। শরীরটাকে ঠিক করতে হয়েছে; গায়ের রঙকে পোড়াতে হয়েছে। অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে এই চরিত্রের জন্য। এই ছবিটি যেদিন থেকে শুরু করলাম সেদিন থেকে ফাইনাল প্রিন্ট হওয়া পর্যন্ত বছর খানেকের মতো লেগেছে। এই এক বছর আমি আর কোনো কাজ করিনি। শুধু এই ছবিটার পিছনে দিয়েছি। শুধু অভিনয় নয় আরো অনেক কিছু করতে হয়েছে এই ছবিটিতে। একটি চলচ্চিত্র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, ফাইনাল এডিট হওয়া, ল্যাবে নিয়ে যাওয়ার জন্য যা যা লাগে সবকিছু আমি থেকে একসঙ্গে করেছি। এ ধরনের একটি চলচ্চিত্র কী করে নির্মাণ হয়, তার অভিজ্ঞতাটা আমি সঞ্চার করেছি।
তারপর আবার ছবিটা যখন রিলিজ হয়, তখন উনি একটা হিন্দি ছবি করছিলেন ৯৩-তে। সেখানে শাবানা আজমি, আমি ও ওম পুরি একসঙ্গে কাজ করেছি। সেই সময়ে পৃথিবীর চার-পাঁচটা মানুষ আমাকে খুব নাড়া দিয়েছে। এক হচ্ছে বজলুল করিম, মামা বলে ডাকতাম, আমাদের পাড়ার মামা হয়। একই পাড়ায় আমাদের বসবাস ছিলো। মামার কাছে শিখেছি কীভাবে মঞ্চে দাঁড়ায়, কীভাবে হাঁটে, নড়াচড়া কীভাবে করে, কী করে সংলাপ উপস্থাপন করে, কীভাবে অভিনয় করতে হয়। কীভাবে নিজেকে তৈরি করতে হয়। শরীরকে ঠিক করতে হয়, কীভাবে কণ্ঠ ঠিকঠাক করতে হয়। সবকিছু তার কাছ থেকে জেনেছি। আরেকজন বিসমিল্লাহ খাঁ। পদ্মা নদীর মাঝি করতে গিয়ে উৎপল দত্ত--এই রকম জ্ঞানী, বড়ো মনের মানুষ আমি পৃথিবীতে কম দেখেছি। শাবানা আজমি, এতো বুদ্ধিদীপ্ত অভিনেত্রী, এতো জ্ঞানী মানুষ--এ রকম একটা দুটো মানুষের সাহচর্যে আসতে পারলে জীবন অন্যরকম হয়ে যায়। অনেক বোধ নতুন করে জন্ম নেয় নিজের ভিতরে, অনেক সহজে জীবন চালানো যায়। অনেক কিছু প্রয়োজন হয় না কখনো জীবনে।
বিসমিল্লাহ খাঁ, শাবানা আজমি, তারপরে উৎপল দত্ত, ওম পুরি, অসাধারণ মানুষ এরা। মানে ওম পুরি যে প্রক্রিয়ায় অভিনয় জগতে এসেছে, এগুলো জানলে যারা অভিনয়ে আসতে চায়, তাদের জন্য যুদ্ধটা অনেক সহজ হয়। কাল কী হবে, এটা কে কীভাবে নেবে, এসব ভাববার দরকার হয় না। যেটা হওয়ার সেটা হবে, যেখানে যাওয়ার সেখানে যাবো। কিন্তু কাজটা সৎভাবে, বিশ্বাসের সঙ্গে, উদ্দীপনা নিয়ে, বিশ্বাস নিয়ে করে যেতে হবে। আর এটাই আমার অভিজ্ঞতা। পদ্মা নদীর মাঝির অনেক কিছু আছে, অনেক ঘটনা আছে, বলতে গেলে রাত পার হয়ে যাবে। আজকে এ পর্যন্তই থাক।
লালসালুতেও এমন একটা ব্যাপার ছিলো, এটা বোধহয় পাঠ্য ছিলো; কলেজে না স্কুলে কোথায় যেনো? এটা খুব ইন্টারেস্টিং না, পদ্মা নদীর মাঝি এবং লালসালু দুটোই পাঠ্য। দুটোতেই অভিনয়ের সুযোগ এসেছে আমার জীবনে। এটা অনেক বড়ো ব্যাপার আমার কাছে মনে হয়। আমি অনেক ছাত্রছাত্রীর কাছে শুনেছি, বলেছে আমাকে, জানেন এটা না আমাদের পড়তে হয়নি; ছবিটা আমরা দেখেছি দুই-তিন বার, তারপর যে প্রশ্ন এসেছে আমরা উত্তর দিতে পেরেছি। আমি বলতাম, উপন্যাসটা পড়লে আরো ভালো হতো। মূল উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ এবং ছবিটার পার্থক্য বোঝা যেতো। ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যেতো। লালসালু ও পদ্মা নদীর মাঝি যারা নির্মাণ করেছে, চেষ্টা করেছে যতোটা সম্ভব উপন্যাসের মধ্যে থাকার। উপন্যাস থেকে খুব বেশি বের হয়ে যায়নি বলে আমার বিশ্বাস।
লালসালুর জন্য আমাকে সময় দিতে হয়েছে এক বছর। দাড়ি রাখতে হয়েছে। এই এক বছর আমি কোনো কাজ করতে পারিনি। ভালো হবে কী হবে না ওটা পরের কথা, নিজের সবকিছু দিয়ে কাজটা করেছি। সেজন্য সময় দিয়েছি দেড় বছর দুই বছর। লালসালুতে যখন আমাকে ডাকলেন তানভীর মোকাম্মেল; বললেন, আসাদ ভাই এটা করতে হবে। আমি বলেছিলাম, সময় দিতে হবে। কারণ আমাদের দেশের মেকআপের যে সমস্যা তাতে করে লালসালু করতে গেলে দাড়ি রাখতে হবে। দাড়ি অরজিনাল লাগবে। এটা রাখার জন্য তো টাইম লাগবে। সে বললো ঠিক আছে। সময় দিবো। আপনি প্রস্তুতি নেন। তবে কতোটা ভালো ছবি হয়েছে আমি বলতে পারবো না, যারা দেখেছে তারা বলতে পারবে। কিন্তু আমার চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিলো না। আমি চেষ্টা করে গেছি। এজন্য বহু সাধনা করেছি। বহু ঘটনা আছে; বহু বিষয় আছে। অনেক কিছু হয়েছে চলচ্চিত্রটি করতে গিয়ে। তারপরেও ছবিটি হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ছবি বন্ধ করতে হয়েছে, বন্ধ হয়েছেও। শুট্ করতে দেওয়া হয়নি অনেক জায়গায়। তখন মৌলবাদীদের রমরমা অবস্থা ছিলো। আজকে আর গভীরে গেলাম না। এটুকু বলেই শেষ করছি। নাহলে টাইম অনেক লাগবে।
তারপরে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তানভীর শাওন জানতে চেয়েছিলো, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের লাল দরজা ও উত্তরায় অভিনয়ের অভিজ্ঞতা। হ্যাঁ, বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের দুটো ছবি আমি করেছি। লাল দরজা করেছি ৯৪ সালে। আর ৯৯-এ করেছি উত্তরা। দুটো দুই ধরনের চরিত্র। একটিতে আমি ছিলাম এক ডেন্টিস্ট মানে দন্ত চিকিৎসকের ড্রাইভার। আরেকটিতে আমি রিমোট এলাকায় একটি গির্জার পাদ্রী; যাকে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়। ভারতে এ রকম একটি ঘটনা ঘটেছিলো। এই ছবিতে সেই অংশটি ছিলো। তো বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত একজন কবি। খুবই বড়ো কবি তিনি। তিনি শিক্ষকও, অর্থনীতির। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি অনেক মানুষের প্রিয় হয়েছেন। প্রচুর ছবি করেছেন তিনি। উনার ছবিগুলোর ধাঁচ একেবারেই অন্যরকম। অন্যদের থেকে আলাদা। এবং উনি যে একজন কবি, উনার ছবি দেখলে বিষয়টা পরিষ্কার বোঝা যায়। একজন কবিকে আমরা যেভাবে জানি বুঝি, তার লেখা পড়ে যা বুঝতে পারি। কবির মনস্তত্ব যদি ধরতে পারি, তাহলে তার ছবিগুলো দেখলে অনেক কিছু বোঝা সহজ হয়ে যাবে।
এই লাল দরজা নিয়েও অনেক ঘটনা আছে। উনি আমাকে ডেকেছিলেন ছবি করার জন্য। তার আগে আমি উনাকে চিনতাম না। উনিও আমাকে চিনতেন না। উনি আমার পদ্মা নদীর মাঝি দেখেছিলেন। সেটা দেখেই এই চরিত্রের জন্য কাস্ট করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আমি গেলাম। গিয়ে দেখি ড্রাইভারের চরিত্র। কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি চালাতে হবে। আমি বললাম, আমি তো গাড়ি চালাতে পারি না। যাই হোক, পরে অনেক সময়-টময় দিয়ে গাড়ি চালানো শিখে নিলাম। সেই করে করে ফাইনালি চরিত্রটা করলাম। এবং আমার করা যতোগুলো চরিত্র আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার এটি। দেশীয় চলচ্চিত্রে, বাংলা ছবিতে, এ ধরনের চরিত্র সহজে পাওয়া যায় না। মানে খুবই ইন্টারেস্টিং, আলাদা ধরনের চরিত্র। যদি তোমরা দেখে থাকো তাহলে বুঝতে পারবে, বা যারা দেখোনি, দেখো আমার মনে হয় ভালো লাগবে। আবারও বলছি, এই ধরনের চরিত্র বাংলা চলচ্চিত্রে খুব একটা আসেনি।
বুদ্ধদেবের সঙ্গে আমার গভীর সম্পর্ক হয়েছিলো। যাদের সঙ্গেই কাজ করতে যাই, তাদের সঙ্গেই আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। যেমন, গৌতম ঘোষে সঙ্গে আমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছিলো। তার তিনটা ছবিতে আমি অভিনয় করেছি। পদ্মা নদীর মাঝি, কালবেলা আর মনের মানুষ। লালন নিয়ে দুটি সিনেমা হয়েছে। একটি লালনের জীবন দর্শন নিয়ে আর একটি লালনের জীবন নিয়ে। লালনের জীবন নিয়ে করেছি লালন নামে। এটা তানভীর মোকাম্মেল-এর করা। আর একটি হচ্ছে মনের মানুষ। মনের মানুষ লালনের জীবন দর্শন নিয়ে। এটা নিয়ে লোকে কনফিউজড হয়ে যায়। মনের মানুষ-এ লালনের জীবন খুঁজতে যায়। মনের মানুষ-এ লালনের জীবন খুঁজলে হবে না। লালনের দর্শন খুঁজতে হবে। লালনের জীবন খুঁজতে গেলে লালন যে ছবিটা আছে সেটা দেখতে হবে। লালনের জীবন দর্শন বোঝাতে গেলেও তার জীবনের অংশ উঠে আসে। কিন্তু পূর্ণ জীবন নয়। এটা বুঝতে হবে। এটা নিয়ে অনেক কন্ট্রোভার্সি আছে।
অনেকে আমাকে বলেছে, আপনি কেনো লালন করার পরে মনের মানুষ করতে গেলেন। কেনো আপনি মনের মানুষ-এ লালনের গুরু করতে গেলেন। আমি বলেছি, দেখো, লালনের গুরু বলে পৃথিবীতে কোনো ক্যারেক্টার নাই। এটা আমার জ্ঞান, আমার জানা। যেহেতু গৌতম ঘোষ লালনের জীবন নিয়ে কাজ করেননি, দর্শন নিয়ে কাজ করেছেন তাই সাঁইজি চরিত্রটি আসবেই। এবং লালনের অন্তর আত্মা হচ্ছে সাঁইজি। এটা তার বোধ, তার বিশ্বাস, তার অন্তর আত্মা। তার দর্শন নিয়ে কাজ করতে গেলে এই ক্যারেক্টারটা বাদ দেওয়া যায় না। তার পরেও আমি করতে চাইনি; বলেছিলাম, আমি লালন করেছি, আমি আর সিরাজ সাঁইজির চরিত্র করবো না। তবে আমাদের শ্রদ্ধেয় হাবিবুর রহমান খান, গৌতম ঘোষ আমাকে বললেন, আসাদ সাহেব এই ছবিটি করতেই হবে। সম্পর্কের একটা দাবি রয়েই যায়। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমি কাজটি করলাম।
যাই হোক, বিভিন্ন ক্যারেক্টার নিয়ে অনেক কন্ট্রোভার্সি আছে। লালসালু নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছে। একটি কাজ, একটি চলচ্চিত্র নিয়ে অনেকে ভালো বলবে, অনেকে মন্দ বলবে, কারো ভালো লাগবে, কারো লাগবে না এটাই স্বাভাবিক। সবার ভালো লাগাটাও আমার মনে হয় ঠিক হলো না। কারণ একটা কাজে সবই ভালো হয়ে যেতে পারে না, ভালো হতে পারে না। দেখার দৃষ্টি কার কেমন সেটার ওপর নির্ভর করে। ইচ্ছে আছে, ইচ্ছে হয়, যতোদিন বেঁচে থাকবো ততোদিন কাজ করবো। শরীর যদি ভালো থাকে, শরীর যদি সুস্থ থাকে, যতোদিন বেঁচে থাকা যায়, ততোদিন কাজ করে যাবো, অভিনয় করে যাবো। ভাগ্যে কী আছে জানি না, কোথায় গিয়ে থামবে। ধন্যবাদ সবাইকে। (দর্শকের হাততালি)
কাজী মামুন হায়দার : ধন্যবাদ, রাইসুল ইসলাম আসাদ ভাইকে। আমি একটু আসলে ক্ষমা চাওয়ার জন্য মঞ্চে উঠেছি। অনেকগুলো প্রশ্ন এসেছে। প্রায় একশোর কাছাকাছি। আমরা সবগুলো প্রশ্ন নিতে পারিনি। অনেকগুলো প্রশ্নের রিপিটেশন ছিলো। কিছু প্রশ্ন দেখে মনে হয়েছে, আর একটা প্রশ্ন দিয়ে হয়তো উত্তরটা দেওয়া যাবে। সবমিলিয়ে আমি উনাকে ১৮-১৯টির মতো প্রশ্ন দিয়েছিলাম। আপনারা যারা প্রশ্ন করেছেন তাদেরকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। সব প্রশ্নের উত্তরের সুযোগ না দেওয়ার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। আর এখানে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শাতিল সিরাজ স্যার আছেন। আমি স্যারকে অনুরোধ করছি মঞ্চে এসে অনুষ্ঠানটির সমাপ্তি ঘোষণার জন্য। মঞ্চে আসছেন অধ্যাপক শাতিল সিরাজ।
শাতিল সিরাজ : (হাততালি) ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা সবাইকে। আসলে এখানে আমি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই এসে পড়েছি। মামুন হায়দার ডেকেছে বলে এই মঞ্চে আসলাম। আমি আদতে শুনতে এসেছিলাম। আমি চলচ্চিত্রবোদ্ধা নই বা অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কেউও নই। আমি নিতান্তই সাধারণ একজন দর্শক এবং সাধারণ শ্রোতা। শৈশব, কৈশোরের বড়ো একটা সময় আমি যাদের অভিনয় দেখে বড়ো হয়েছি, তাদের মধ্যে একজন আজকে মঞ্চে আলোচনা করলেন, রাইসুল ইসলাম আসাদ। তার কথার মাধ্যমে আমরা বুঝলাম, একজন শিল্পীকে কতো ধরনের সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, কোন চেতনার মধ্য দিয়ে, কোন মনস্তত্বের মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে হয়। এক অর্থে একজন দর্শক হিসেবে, একজন শ্রোতা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করলাম, তার জীবন যন্ত্রণাটা কেমন হতে পারে। তার জীবন দর্শনটা কী হতে পারে। তিনি কীভাবে জীবনকে দেখে থাকেন। কীভাবে পরিপার্শ্বকে উনি বোঝার চেষ্টা করেন। দর্শক হিসেবে আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞ হয়েছি।
সমাপণী বক্তব্য রাখছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শাতিল সিরাজ
আপনারা সবাই হয়তো আলোচনা উপভোগ করেছেন। দর্শক হিসেবে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে। তারা প্রতিবছরই এ রকম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে এসে আলোচনার আয়োজন করছে। আমরা তাদের আলোচনায় সমৃদ্ধ হচ্ছি। আমরা চলচ্চিত্রবোদ্ধা নই, তারপরও এসে বোঝার চেষ্টা করছি। আমার মনে হয়, দর্শক এই বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে ভাবছে। অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি রাইসুল ইসলাম আসাদের প্রতি। আমরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। এবং প্রত্যাশা করি তার কাছ থেকে আরো অনেক ভালো অভিনয় পাবো ভবিষ্যতে। উনি আমাদের সবার জন্য প্রেরণা হয়ে থাকুন। ধন্যবাদ সবাইকে। (দর্শকের হাততালি)
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন