সৌমিত্র দস্তিদার ও অন্যান্য
প্রকাশিত ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত-২
দেশভাগের অন্য একটা দিক দেখার বোঝার চেষ্টা করা দরকার
সৌমিত্র দস্তিদার ও অন্যান্য

১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, মঙ্গলবার, বিকেল পাঁচটা
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর এই আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’। এখানে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর আয়োজনে একজন নির্মাতা তার চলচ্চিত্র নিয়ে দর্শকের সামনে হাজির হন। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী শেষে তিনি বাতচিতে অংশ নেন দর্শকের সঙ্গে। দ্বিতীয় আয়োজনে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার তার সীমান্ত আখ্যান নিয়ে। [সম্পাদক]
দ্বিতীয় পর্ব.
অমিত রুদ্র, শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ : স্যার আমার দুটো প্রশ্ন আছে। প্রথমটা হচ্ছে, প্রামাণ্যচিত্রটির মধ্যে লিটন ভাই মানে রাজশাহীর আহ্সান কবীর লিটন যখন কথা বলেন ওনার নামটা দেখানো হয়েছে এহসান কবীর লিটন। আমি যতোদূর জানি তার নাম আহ্সান কবীর। নাম ভুল লেখার এই প্রবণতাটা আমি আগেও লক্ষ্য করেছি। আমাদের জয়া আহসান বা আহসান হাবীবরা ওখানে এহসান হয়ে যান। নামের তো একটা সঠিক স্পেলিং থাকে। তারপরও এটা ওখানে কেনো এ রকম বা আপনার ফিল্মে কেনো এভাবে এলো? এটা ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত?
আর দ্বিতীয় প্রশ্নটা হচ্ছে, একজন বললেন দেশভাগের জন্য কে বেশি দায়ী? দেখলাম জওহরলাল নেহেরুর নাম এসেছে। বিষয়টা মোটামুটি স্পষ্টভাবেই তিনি বললেন। এখানে যদি আমাদের এখানকার মানে বাংলাদেশের কারো নাম এভাবে ডিরেক্ট আসতো, আমি জানি না এই ঘরের প্রতিক্রিয়াটা একই রকম থাকতো কি না! ভারতে সীমান্ত আখ্যান-এর যখন শো হয়েছে সেখানকার প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিলো? বা এইটা নিয়ে তাদের কোনো র্যাডিকেল অবস্থান ছিলো কি না? বা তারা ব্যাপারটাকে সহজভাবেই নিয়েছে কি না?
সৌমিত্র দস্তিদার : প্রথমত ধন্যবাদ। একেবারে স্ট্রেইট, কাজের প্রশ্ন আরকি। প্রথমটার জন্য অপরাধ আমি নিজেই স্বীকার করছি। এটা আমার অন্যায়, অপরাধ ও দীর্ঘদিনের চর্চার অভাবে হয়েছে। যেটা আমি প্রথমেই বললাম, আমাদের পশ্চিম বাংলায় ‘সোহরাওয়ার্দী’ এখন কেউ বলে না। আমার মুসলমানের কথাতেও (সৌমিত্রের আরেকটি আলোচিত প্রামাণ্যচিত্র) আমি ‘সুরাওর্দী’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলাম। ঘটনাচক্রে আমি পরে সেটা পাল্টেছি। আমি নিজেকে ডিফেন্ড করবো না; এডিটরের অনেক সময় মনে হয়, নামটা বুঝি এ রকমই। এটা অজ্ঞতাবশত। এটা নিয়ে সাফাই গাইবার কিছু নেই, এটা অপরাধ। আপাত তুচ্ছ কিন্তু এই ছোটোখাটো ভুলের জন্যই কিন্তু দূরত্ব ক্রমশ বেড়ে যায়। এই যে সংশোধন তুমি করে দিচ্ছো, এই সংশোধন যতো হবে আমাদের দূরত্ব ততো কমবে। আমাদের অনেক পণ্ডিতও কিন্তু ‘সুরাওর্দী’ লিখে গেছে। এটা কিন্তু ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটাই তো বলছি। এই যে মিথ তৈরি হয়ে গেছে, এটাই তো ভাঙতে হবে। সময় লাগবে, কিন্তু যারা নতুন ছেলে-মেয়ে তারা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে এটা ভুল, এটা অন্যায়। যেমনটা তুমি আমাকে দেখিয়ে দিয়েছো। আমি অপরাধ স্বীকার করছি।
আর দ্বিতীয়ত তুমি যেটা বলছো; দেখো, যেহেতু কংগ্রেস ক্ষমতায় নেই তাই নেহেরুকে নিয়ে বললে এখন খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না। কিন্তু প্যাটেলকে (ভারতীয় পণ্ডিত ও জাতীয়তাবাদী নেতা সরদার বল্লভভাই প্যাটেল) নিয়ে বললে বিষয়টা খুব সহজ হতো না। এটা একটা সত্যি কথা। আর আমাদের পশ্চিম বাংলার ভিলেন নাম্বার ওয়ান হলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এই জিন্নাহকে নিয়ে কথা বলা মানেই পশ্চিম বাংলায় একটা বিপদ ডেকে আনা। বাংলাদেশ থেকেও ফেইসবুকে আমি এমন প্রতিক্রিয়া পেয়েছি। আমি যখন ওপারে বসে জিন্নাহর মেয়ের মৃত্যুর পর একটা লেখা লিখি, নাম বলবো না, অনেক পরিচিত সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলো। এই যে বললাম আজকে জিন্নাহর মৃত্যুদিন। জিন্নাহকে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছিলো; আশপাশে মাছি ভনভন করছিলো। ইতিহাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হয়তো জানেন, এক বাঙালিই তাকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আমি যতোদূর জানি, জিন্নাহকে নিয়ে বি জে পি নেতা যশবন্ত সিং তার বইয়ে লিখেছিলেন, জিন্নাহ মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ‘দেশভাগটা আমার কাছে ঠিক হয়নি’। এই যে বলছি না, ইতিহাসের অনেক জায়গা খুঁজে দেখার সময় এসে গেছে। ইভেন আমরা নেহেরুর কথা বলছি; আসামে গিয়ে আমি দেখেছি, সেখানকার কংগ্রেসের একটা বিশাল অংশের কিন্তু নেহেরু সম্পর্কে অ্যালার্জি আছে। নেহেরু কিন্তু দুটো কাজ করেছিলেন। একটা কাজ দেখবে আমার ছবিতেও আছে--একজন আর এস এস-এর লোক বলছেন, ২০ কিলোমিটারের মধ্যে যেনো মুসলমানরা অবস্থান না করতে পারে। এটা ঘটনাচক্রে বিধান রায়ের মতো লোকও কিন্তু রাজি হয়ে গিয়েছিলেন ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে যে, ‘সীমান্ত থেকে বের করে দাও মুসলমানদের’। অন্নদাশঙ্কর রায় এটার প্রতিবাদে রিজাইন দিয়েছিলেন। এবং নেহেরু ধমকে দিয়েছিলেন। নেহেরু ধমক দিয়েছিলেন বলেই কিন্তু ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে লিয়াকতের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিলো। আসাম থেকে যখন ট্রাকে বোঝাই করে রাতারাতি মুসলমানদের সীমান্তের ওপারে ফেলে রাখা হয়েছিলো; নেহেরু কিন্তু চেষ্টা করেছিলেন তারা যেনো ফিরে আসে। নেহেরুর অনুগামী কংগ্রেসের ভলান্টিয়াররা বলেছিলো, তোমরা থাকবে। কিন্তু তারা যখন ফিরে এসেছিলো তখন অব্দি প্রথম সেন্সাসটা (আদমশুমারি) হয়ে গিয়েছিলো। ফলে তাদের নাম ওঠেনি। তার প্রতিক্রিয়ায় কিন্তু আজকে অনেক নাম বাদ চলে যাচ্ছে। তাই নেহেরু নিয়ে আমার জিজ্ঞাসা নতুন করে বাড়ছে।
নেহেরুর একটা অসাধারণ বই আছে, ‘লেটার টু নেশন’। দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে আমার মনে হয়, জিন্নাহর যেমন একটা আফসোস ছিলো, নেহেরু বোধ হয় এতোটা ভাবেননি। নেহেরুর মনে হয়েছিলো, হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি ভাব-ভালোবাসা করেই থাকবে। অতো কিছু হবে-টবে না আরকি। এটা নেহেরুর একটা বিশ্বাস ছিলো মনে হয়। ফলে নেহেরু খানিকটা রোমান্টিক জায়গা থেকেই দেশভাগটাকে দেখেছিলেন। এবং তার একটা আপ্রাণ চেষ্টা ছিলো--বাবা নিজে তো আগে বাঁচি, আগে তো প্রধানমন্ত্রী হই।
আর নেহেরুকে নিয়ে এখন সমালোচনা করা সহজ। কারণ এখন নেহেরু বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে। কিন্তু আমাকে জিজ্ঞাসা করলে এখানে বলতে কোনো দ্বিধা নেই, সেটা হচ্ছে আমার যেটুকু স্টাডি, এই যে ছোটো ছোটো রাজ্যগুলোকে একত্রীকরণ করা--যাকে লৌহমানব বলা হয় মানে প্যাটেল--তার একটা বিরাট অবদান ছিলো। কংগ্রেসের যে দক্ষিণপন্থি অংশ ছিলো, দেশভাগে এরা সক্রিয় ছিলো। তার মধ্য থেকে তো মুসলমান অংশ বেরিয়ে গিয়েছিলো। মওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো দুয়েকজন ছাড়া বেরিয়ে গিয়েছিলো সবাই। কিন্তু যারা ছিলো তারা দেশভাগের বিরোধীতা করেছিলো। কিন্তু প্যাটেল লড়াই করেছিলেন--দেশভাগটাকে সমর্থন করতেই হবে আরকি। প্যাটেলের অনুগামীরাই আজকে ভারতবর্ষে ক্ষমতায় এসেছে। নেহেরু কিন্তু তবুও একটা সেক্যুলারিজমের কথা বলতেন। আজকে অস্বীকার করে লাভ নেই, আমি বামপন্থি পরিবেশে বড়ো হয়েছি। কিন্তু আজকে যখন নতুন করে নেহেরুকে দেখছি, আমার মনে হচ্ছে সত্যি লোকটাকে আমরা অকারণে অনেক ভুল বুঝেছি, গালাগালি করেছি। উনি ক্ষমতালোলুপ ছিলেন ঠিকই, কিন্তু দেশ দাঙ্গা বিধ্বস্ত হোক আর সেখানে সমস্ত মুসলমানকে খুন করা হোক, এটা নেহেরু বোধ হয় চাননি।
সোহরাব হোসেন, কর্মী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট : আমি সোহরাব হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স ও ব্যাংকিং বিভাগে পড়তাম। এখন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত আছি। আপনার ফিল্মটা খুব ভালো লাগলো। তবে একটা বিষয় আমার মনে হয়, দেশভাগের ক্ষেত্রে ৪৭-এর পরে ভারতের এক রকম চিত্র, বাংলাদেশের আরেক রকম চিত্র। ভারতের ক্ষেত্রে ৭০ বছরের একটা ফেইজ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুইটা ফেইজ--২৩ বছরের একটা ফেইজ আর ৪৭ বছরের একটা ফেইজ। দুই ফেইজে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটা আলোচনায় আসেনি। একটা হচ্ছে পাকিস্তানের ২৩ বছর এবং স্বাধিকার আন্দোলন। এই স্বাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে ৪৭-এর দেশভাগ যে ভুল তার প্র্যাকটিকাল উদাহরণ হচ্ছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ। এই বিষয়টা এখানে আসেনি। এটা আসা উচিত ছিলো। আরেকটা বিষয় ...।
সৌমিত্র : আমি ভাই এখানেই থামাচ্ছি আপনাকে। আর এক মিনিট বলছি, আমার ছবির যে পার্সপেক্টিভ সেখানে ১৯৭১ আসার কথা নয়। আপনিও ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখবেন বিষয়টা।
সোহরাব : আরেকটা অভাব বোধ করেছি, সেটা হলো, আলোচনার মধ্যে ভারতের কংগ্রেস, বি জে পি, আর এস এস’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার আগের একটা চিত্র ছিলো। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এখন যদি দেখি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে--আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ইত্যাদি। তাদের ভূমিকাগুলো এখানে আসেনি। ওটা নিয়ে একটু কিছু থাকলে ভালো হতো। অভাব বোধ করেছি। ধন্যবাদ।
সৌমিত্র : আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তর তো দিয়েই দিয়েছি। মাঝপথেই থামিয়ে দিয়েছিলাম, স্যরি। কিন্তু দ্বিতীয় উত্তরটা আমি চাইবো আপনারা যারা সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে বা মিডিয়ায় যুক্ত আছেন, তারা দিন। দেখুন, আমি কিন্তু ভারতের পরিচালক। তাই আমার পার্সপেক্টিভটা খানিকটা হলেও ভারতই হবে। এখানে আজকে কী দ্বন্দ্ব আছে না আছে সেটা আমার পক্ষে সাত দিনের শুটিংয়ে কতোটা জানা সম্ভব বলুন। আমি আজকে যেভাবে নেহেরুর স্টাডি করতে পারছি, সেই সুযোগটা কিন্তু এখানে আমার নেই। ভেবে দেখবেন আপনারা, অনেক সমস্যা আছে। এখন তো দুই বাংলাকে নিয়ে ফিচার ছবিও হচ্ছে, শঙ্খচিল-এর মতো ছবি হচ্ছে। তেমনই আপনারা এপারে যারা আছেন তারাও করুন। আমরা ওখানে যারা আছি তারাও করবো আরকি। দুটো মেলালেই আপনাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে, দুই বাংলার ছবিটা কী হচ্ছে। আমার এমনই মনে হচ্ছে। কারণ এখানকার রাজনৈতিক যে পরিস্থিতি তা আমার কাছে তো খুব বেশি স্পষ্ট নয়, তাই আমি এই ছবিটা করতে পারবো না, এক্ষুনি পারবো না। আরো দিন গেলে আস্তে আস্তে মিশতে মিশতে হয়তো ইচ্ছে হতেই পারে। আমি এটাই বলতে চেয়েছি।
সুজাউদ্দৌলা, দর্শক : আমার বাড়ি পুঠিয়ায়। প্রথমেই এতো সুন্দর একটা চলচ্চিত্র তৈরির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। চলচ্চিত্রটি দেখতে দেখতে আমার একটা কথা মনে হচ্ছিলো। বাংলাদেশের অনেকেই মনে করে, দ্বি-জাতি তত্ত্ব কোরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক। কিন্তু আসলে দ্বি-জাতি তত্ত্ব এ রকম কোনো তত্ত্ব নয় এবং জিন্নাহর কোরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে কোনো ধারণাও ছিলো না। আবার যারা হিন্দু ধর্ম নিয়ে অনেক কথা বলেন, তারাও কিন্তু ধর্মটা ভালোমতো জানে না। তো আমার মনে হয়েছে, দ্বি-জাতি তত্ত্বটা চলচ্চিত্রের মধ্যে আসতে পারতো। আমার আর্জিটা হচ্ছে, যদি ভবিষ্যতে কখনো পারেন তাহলে দ্বি-জাতি তত্ত্ব যে কোনো ধর্মভিত্তিক তত্ত্ব না, এটা একটু বলবেন।
সৌমিত্র : আপনি বলতে চাইছেন, দ্বি-জাতি তত্ত্বটা কোনোভাবে পরের ছবিতে আসলে ভালো হয়, তাইতো? সেটা নিয়ে ভাবা যেতেই পারে। আপনাকে ধন্যবাদ। আর মামুন সাহেব (আ-আল মামুন) কোথায় গেলেন? তিনি কী বলছেন, শুনি।
আ-আল মামুন, শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : প্রথমেই ধন্যবাদ। আপনার একটা লেখা পড়ার পরে এবং মুসলমানের কথা দেখার পর যোগাযোগ হলো। তারপরে আপনি বললেন, এই রকম একটা ফিল্ম করেছেন। আমরা যোগাযোগ করলাম এবং আজকে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর এই আয়োজন। তাই বিভাগের পক্ষ থেকে এবং ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পক্ষ থেকেও আপনাকে ধন্যবাদ। আমি ভিন্ন একটা পজিশন থেকে একটু কিউরিয়াস। সেটা হলো, মেমোরির জায়গা থেকে যদি দেখি, স্মৃতি কী? কোন স্মৃতিটা কার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? সেখানে আমাদের কাছে ৪৭-এর পরে, ৭১ তো অনেক বড়ো। ৪৭-এর যে রেজোলেন্ট, যে মিনিং ওয়েস্ট বেঙ্গলে বা পুরো ভারতে তৈরি করছে, সেটা বাংলাদেশে করেনি। যদিও হিস্টরিকাল কারণেই আমাদের এখানে একটা বড়ো সমস্যা আছে যে, ৪৭-এ একটা ভুল হয়েছিলো এবং সেই ভুলের সংশোধন অতি হাস্যকর একটা সেক্যুলার যুক্তি। এবং ওপারের আরেকটা জিনিস, এই ফিল্মটা বাংলাদেশে যদিও দেখানো হচ্ছে, কিন্তু এই ফিল্ম ওখানকার অডিয়েন্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বেশি। এবং ওখানকার দুইটা মেজর ন্যারেটিভ--একটা হচ্ছে বি জে পি ও আর এস এস-এর মতো দলের ন্যারেটিভ, আরেকটা হচ্ছে সেক্যুলার ন্যারেটিভ। এই দুইটা ন্যারেটিভের কনটেস্ট এবং এর মিনিং। কী মিনিং তৈরি করে মুসলমানদের প্রসঙ্গে? এবং পরে যখন কাঁটাতার এবং অনুপ্রবেশের প্রসঙ্গটা এলো, এই দুইটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণভাবে বি জে পি সরকারেরই কাজ। তো সিনেমাটা এই প্রসঙ্গগুলোর মধ্যেই ঘুরপাক খেয়েছে।
আ-আল মামুন,শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাতিকতা বিভাগ
এর চেয়েও ফারদার আরেকটা জায়গা আছে, যেটা বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ সর্বশেষ স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদী মুভমেন্ট করেছে এবং স্বাধীন হয়েছে। ফলে এই তিনটা পোস্ট কলোনিয়াল রাষ্ট্র ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান, এর মধ্যে বাংলাদেশ অনেকখানি এগিয়ে। বাংলাদেশ হচ্ছে অনেক বেশি আধুনিক রাষ্ট্র। ওখানকার কলোনিয়াল হ্যাং ওভার এখনো কাটেনি। ফলে সেখানে এই মেমোরি এক ধরনের, ৪৭-কে গ্রাউন্ডিং করে সেই মেমোরির মধ্যে সেই প্রজেকশন, সেই ইন্টারপ্রেটেশন, সেই মিনিংগুলো আরোপের একটা ব্যাপার থাকে।
কিন্তু আমার কাছে যেটা মনে হয়, পুরো সাব-কন্টিনেন্টের মানুষের মুক্তির প্রশ্ন যদি আমি ভাবি, তাহলে কীভাবে কলোনিয়ালিজম কাজ করেছে, কীভাবে পলিটিকস্গুলো কাজ করেছে, এবং কীভাবে এই বিভেদের রাজনীতি--রক্তগঙ্গা বয়ে গেলো বর্ডারে বর্ডারে, এখনো বয়ে চলেছে দু’পাশেই। এই প্রসঙ্গগুলো বোধ হয় আসা দরকার।
আমি সৌমিত্র দা’কে জিজ্ঞাসা করবো, আপনি এই প্রসঙ্গগুলো ভেবেছেন কি না বা আমার কথা আপনার কেমন মনে হয়? মনে হচ্ছে কিনা যে, পোস্ট কলোনিয়াল একটা পজিশন থেকে আমরা দেখতে পারি কি না? শুধু পোস্ট কলোনিয়াল যে মুভমেন্ট চলছে নানা দেশে সেখান থেকে না, বরং এটাকে বলতে পারেন যদি আমরা অন্যভাবেও বলি ডি-কলোনিয়াল। আমাদের কলোনিয়াল যে শিক্ষাদীক্ষা এবং প্রগতিশীল লোকজনও আছে, যারা ভাবে, ধর্মের কারণেই এসব ঘটেছে। ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা না। সেক্যুলাররাও ঘটিয়েছে, কংগ্রেস ঘটিয়েছে, আওয়ামী লীগ ঘটিয়েছে, সবাই ঘটিয়েছে; এবং ঘটিয়ে চলেছে। ফলে আরো ভিন্ন জায়গা থেকে, ধর্মের জায়গা থেকে সরে এসে আরো প্রবলেম্যাটিক জায়গা তৈরি করা যায় কি না? সেটা ভেবেছেন কি না? ধন্যবাদ।
সৌমিত্র : আমি কন্টোর্ট করবো অনেকটা অর্থনৈতিক জায়গা থেকে। অর্থনীতিই তো একটা মূল কারণ ছিলো দেশভাগের। হিন্দু-মুসলমান ইস্যু তো নানাভাবে পরে তৈরি করা হলো। এই সময়ে এসে ইন্ডিয়ায় দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো আবার আসা উচিত, কেনো? আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, ৪৭-এর পোলারাইজেশনের যে ব্যাপারটা সেটা কিন্তু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে মানুষের মনে। ওপারে যারা গেছে, বিভিন্ন জায়গায় সেট্ল করেছে; তাদের মনের মধ্যে তীব্র একটা জায়গা তৈরি করা হয়েছে, এপারটা (বাংলাদেশ) অন্ধকারই থেকে গেছে। ফলে বাংলাদেশের যে এতো উন্নতি হয়েছে, সেটা মানুষের মনোযোগেই আসেনি। তাই আমার মনে হয়েছে, প্রথম পর্বে এটা একটু ছুঁয়ে যাওয়া উচিত।
দ্বিতীয় পর্বে আমি সিলেটটা ধরবো। সিলেট এই কারণে যে, আমার কাছে মনে হয়েছে আজকে এন আর সি’র সঙ্গে সিলেট ভাগেরও একটা কোথাও সম্পর্ক আছে। তৃতীয় পর্বটা আমি সত্যি একেবারেই আর্থিক জায়গা থেকে ধরবো এবং এখনকার জুনিয়র বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা সেটাকে কীভাবে দেখছে তা দেখবো। এটাও ঠিক কথা, কলোনিয়াল জায়গা থেকে দেখবো যে, ৪৭ এক হলে কী হতে পারতো। এই জায়গাগুলো অবশ্যই আনবো। যখন ৪৭ হলো তখন ওই মুসলমানদের কী হলো? মুসলমানদের ক্ষতি হলো, না লাভ হলো--এই সরা-সরির জায়গাগুলো কিন্তু আমি আনার চেষ্টা করবো।
ওপারের জায়গাগুলোও আমি ছুঁয়ে গেছি, মুসলমানের কথা যদি দেখা হয় তাহলে বোঝা যাবে, দেশভাগটা কিন্তু ওপারের মুসলমানদের বিপদে ফেলে দিয়েছে। এপারে কিন্তু আমি ঠাট্টা করে অনেককে বলি, তোমরা লিফটওয়ালা বাড়িতে থাকছো অথচ ওপারের হাড়োয়ার একটা লোক জানেও না; তুমি অস্ট্রেলিয়া চলে যাচ্ছো, কানাডায় চলে যাচ্ছো। আমার মনে হয়, দেশভাগ না হলে এটা হয়তো হতো না। এই জমিটা পাওয়ার একটা ব্যাপার ছিলো, আর এই জমি পাওয়ার জন্যেই তো দীর্ঘদিন ধরে একটা দাবি ওঠার ব্যাপার ছিলো। এই দাবিটা মেনে নেয়নি কারা? দাবিটা মেনে নেয়নি তখনকার যারা পাওয়ারফুল ছিলো তারা; কংগ্রেস ছিলো এবং কংগ্রেসের যে দক্ষিণপন্থি অংশটা। ফলে আজকের দক্ষিণপন্থি অংশটা কিন্তু উল্টো বলছে যে আমরা ধোয়া তুলসি পাতা, উল্টোদিকে লোকজনই আমাদের বাধ্য করলো আরকি। আমরা অনেক কষ্ট করে নিজেদের জায়গাটুকু বাঁচালাম। শ্যামাপ্রসাদ অনেক চেষ্টা-তুষ্টি করে আগলে রেখে আমাদেরকে পায়ের তলায় খানিকটা জমি দিলেন। এই তো আমি যা বুঝেছি।
ফলে দ্বিতীয় পর্বে আমি যখন সামারাইজ করবো, তখন আমি অর্থনীতি আনবো, আজকের জায়গায় দাঁড়িয়ে মুসলমানদের লাভ-ক্ষতির বিষয়টা আনবো। বাংলাদেশের মুসলমানরা কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে অন্যদিকের মুসলমানদের দেখছে, সেটা আনার চেষ্টা করবো। আপনার এই জায়গাগুলো কিন্তু সত্যিই আছে। কিছুক্ষণ আগেই বলছিলাম, আমি অনেকগুলো কঠিন কঠিন ছবি হয়তো করেছি--গুজরাট নিয়ে করেছি, মণিপুর নিয়ে করেছি, ড্যাম নিয়ে করেছি। কিন্তু মুসলমানের কথা করার পর থেকেই এই ব্যাপারগুলো আমার পক্ষে কঠিন হয়ে গেছে। বিশেষ করে আমরা এমন একটা সংবেদনশীল, স্পর্শকাতর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি--সব পক্ষই--কোথাও একটা শব্দ চয়নের ভুল হলেও কিন্তু সমস্যা আছে। তারপরও আমি চেষ্টা করবো এই জায়গাগুলো আলোয় নেওয়ার। এই জায়গার সবার কাছে আমার অনুরোধ থাকলো, যারা পিছনে আছেন আবার চেয়ারম্যান সাহেবের মতো সামনের দিকেও আছেন, তারা সবাই আমাকে সাজেস্ট করুন। আমার মনে হয়েছে এই এক্সচেঞ্জগুলো ভেরি ইম্পর্টেন্ট। আমি সবসময়ই সাহায্য নেওয়ার জন্য আগ্রহী। আমি তো আমার মতো করতে করতে এগোচ্ছি, না? উল্টো দিকটাও আমাকে দেখতে হবে, ভাবতে হবে।
আমি কি মোটামুটি কমিউনিকেট করতে পারছি? নাকি প্রশ্ন একভাবে আসছে আর আমি একভাবে পাশ কাটাচ্ছি। আমি কিন্তু সচেতনভাবে পাশ কাটাতে চাচ্ছি না। বরং আমি ফেইস করতে চাচ্ছি। বাংলাদেশের তরুণরা, বিশেষ করে বিশিষ্ট জনেরা কীভাবে দেখছে ব্যাপারটা। একটু চা খাওয়ালে ভালো হতো। এটা দুই দেশেরই একটা সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, সেমিনারে চা খাওয়া যাচ্ছে না।
সফিকুন্নবী সামাদী, শিক্ষক, বাংলা বিভাগ : আজ সকালবেলা সৌমিত্র বাবুর সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিলো। ভুল বোঝাবুঝির কারণে সেটা হয়নি, আমি অপেক্ষা করছিলাম। বোধ হয়, মামুন (কাজী মামুন হায়দার) ষড়যন্ত্রকারী ছিলো, দেখা করতে দেয়নি আমার সঙ্গে। অথবা মামুন ভেবেছে, আমার অতিথিকে সামাদী স্যার ধরে মারে কি না (হাসি)।
দেশভাগ, সীমান্ত এবং মানুষের দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে এতো কিছু বলার আছে যে, কোথা থেকে শুরু করবো সেটা নিয়ে সমস্যা হয়; এক। দুই নম্বর কথা হলো, আমি দু’য়েকটা সূত্র বলবো, আমি কোনো প্রশ্ন করবো না। আমি শুধু সৌমিত্র বাবুকে উসকে দিতে চাই, পরে এগুলো যদি আসে ভালো হয়। সেটা হলো এই যে, আরে ভাই মুসলমানদের কী ক্ষতি হলো, হিন্দুদের কী ক্ষতি হলো--তাতে আমার কী যায় আসে? আমি বলি ভারতবর্ষের মানুষের কী ক্ষতি হলো, লাভ হলো। আর যদি লাভ হয়, ক্ষতি হয়, এখন কি সেটা পোষানোর কোনো সুযোগ আছে? আমি জানি না সুযোগ আছে কি না। আমি বুঝি, নেই। কিন্তু বেদনা থাকে। বেদনা থাকে, বেদনার কতোগুলো কারণ আছে। আমরা প্রাচীন রাজবংশের বাড়িগুলোকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করি। তারা তো অত্যাচারী ছিলো। কিন্তু তাদের বাড়িগুলোকে আমরা হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করি, আর্কিওলজিকাল সার্ভের অধীনে নিয়ে যাই। আমাদের নেতাদের যে ভুলটুলগুলো ছিলো, সেগুলোও আর্কাইভ হওয়া দরকার আছে।
সফিকুন্নবী সামাদী, শিক্ষক, বাংলা বিভাগ
আমার নেতারা ভুল করেছিলো নাকি চাতুর্য করেছিলো, সেটা এখন মূল্যায়নের দরকার আছে। সৌমিত্র বাবু সেই কাজটা করছেন ফিল্মের মাধ্যমে। তিনি নিজে বলছেন, ফিল্ম আর্টিকেল অথবা মুভি আর্টিকেল অথবা এ রকম কিছু বলতে চাইছেন। এই অভিধাটি হয়তো আগে থেকেই প্রচলিত। আমি আজকেই শুনলাম, স্বীকার করছি। আমার ভালো লেগেছে। এখন কথা হলো, আসলেই কি দেশভাগটা কোনো সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে হয়েছিলো? একদমই না। কতোগুলো লোক, রাজনীতিবিদ শকুনের মতো সাধারণ মানুষকে খাবলে খেয়েছে। সেখানে এক কাতারে আমি ফেলছি নেহেরুজী, জিন্নাহ সাহেব, প্যাটেল আর আশু বাবুর কুলাঙ্গার ছেলেটা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি--এই রকম কতোগুলো মানুষ খাবলে খেয়েছে। এর মধ্যে ফজলুল হকও ছিলেন। তখন বঙ্গবন্ধু সবেমাত্র কিশোর। তার কোনো ভূমিকা ছিলো না। একদিন তো সোহরাওয়ার্দী তাকে বাড়ি থেকে বেরও করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, তুমি কে জিজ্ঞেস করার? বঙ্গবন্ধু বলছেন যে, ‘তুমি যদি বলো যে আমি কে জিজ্ঞেস করার, তাহলে তুমি আমাকে ডেকেছো কেনো? তুমি ডেকেছো তাই আমি কথা বলেছি। কথা বলবো না তোমার সাথে।’ চলে গেছেন। আবার তাকে ডেকে এনেছেন সোহরাওয়ার্দী। এসব এখন নানা স্মৃতিকথা থেকে পাচ্ছি। বোঝা যায় যে, দেশভাগ বিষয়ে খুব বেশি কিছু করার ছিলো না সেই সময়কার বঙ্গবন্ধুর লেভেলের নেতাদের।
দেশভাগের এই যে স্মৃতিকথা বলি, যাই বলি--আমরাও একটা প্রজেক্ট নিচ্ছি নেতাজি সুভাষ বোস বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাবরেশনে। ওরা একটা ভালো কাজ, বড়ো কাজ করছে। সৌমিত্র বাবু যেটা ফিল্মে করছেন, ওরা দুটো মাধ্যমেই করছে। অডিও-ভিডিও এবং তার পরে রাইট আপ হবে, একটা আর্কাইভ করার চেষ্টা করছে; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগও তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পার্টনার হিসেবে। এই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা কাজ করছি ঠিক আছে; কিন্তু আমি বলছি, মূল সমস্যাটা কোথায়? সেই সমস্যাটা আজকে চলে গেছে কি না? আমি মাফ চাইছি, অপুর (জাবীদ অপু, রাজশাহীর সাংবাদিক, সীমান্ত অ্যাখান-এ তার একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।) মতো ইমোশনাল আমি হবো না। কারণ আমি দেশভাগ দ্বারা অ্যাফেক্টেড নই। বদরুদ্দীন উমরের মতো অতো কৌশলেও আমি কথা বলতে পারবো না। হাসান (কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক) স্যারের মতোও এতোটা ইমোশনাল হতে পারবো না।
আমি মানলাম না কাঁটাতার। কিন্তু কাঁটাতার আছে, কাঁটাতার না থাকলেও আছে; এটা বাস্তবতা। এখন প্রশ্ন হলো, এই কাঁটাতারটা মনের ভিতরে আছে নাকি বাস্তবে আছে? মনের ভিতরে তো কাঁটাতার পড়েই গেছে। এখন বাস্তবে কতোগুলো কাঁটাতার দিলে কী এমন আসে যায়! এখন এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আমি কয়েকটা প্রশ্ন তুলছি। খেয়াল করুন, আমি কয়েকটা অপ্রিয় কথা বলছি, আই হ্যাভ বিন মিসআন্ডারস্টুড থ্রুআউট দ্য ইয়ারস, থ্রুআউট দ্য ডিকেডস। কিন্তু আমি আমার সত্য কথাটা বলবো, যেটা আমি সত্য মনে করি। আপনি বলুন তো, আগৈলঝড়ার হিন্দু পরিবারগুলো যেভাবে নির্যাতিত হয়, বাগেরহাটের নমঃশূদ্র হিন্দু যেভাবে নির্যাতিত হয়, বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত হিন্দু সেভাবে নির্যাতিত হয় কি না? হয় না। বরং তারা এই সুবিধাটা ভোগ করে। বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতিত হচ্ছে বলে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে মায়াকান্না কেঁদে এই সুবিধাটুকু ভোগ করে। আপনি দেখতে চান, আমি দেখাতে পারি, এখানে বসে এখানকার মাইনে নিচ্ছে, পরিবারের কাছে ওখানে পাঠাচ্ছে, স্পষ্ট মানি লন্ডারিং হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকারও তাদের চেনে, পশ্চিমবঙ্গের সরকারও তাদের চেনে। তাদের ধরা হচ্ছে না। কিন্তু আসামে ৪০ লাখ হিন্দুকে এন আর সি’তে (ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস) একদম খারিজ করে দেওয়া হলো। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে সেই খারিজ হওয়াদের মধ্যে ফখরুদ্দীন আলি আহমেদের সন্তানরা আছেন, আসামের প্রথম নারী ও মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তার নামও আছে। তপোধীর ভট্টাচার্য, আসাম ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলার ছিলেন, তার নামও আছে।
ওই যে দেশভাগ হয়েছে না, দেশভাগটা আসলে আর কারো হয়নি। আমি এভাবে আন্তর্জাতিক মন নিয়ে বলতে পারি, মেক্সিকোর সঙ্গে যে সীমান্ত সেখানে যন্ত্রণা আছে; কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সীমান্ত সেখানে যন্ত্রণা আছে; দুই কোরিয়া ভাগ হয়ে গেছে সেখানে যন্ত্রণা আছে। ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়া ভাগ হয়ে গেছে--স্ত্রী থেকে গেছেন আদ্দিস আবাবায় আর স্বামী আসমারাতে। আমার বন্ধু দুলালের (দুলাল চন্দ্র রায়, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক) কাছে শুনেছি, তাদের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই পাঁচ বছর। তার পরেও বলবো, এতোসব ভাগাভাগির বেদনার চেয়েও বাংলার ভাগটা সবচেয়ে বেশি। খেয়াল করে দেখুন ষড়যন্ত্রটা কোথায়, ১৯১১ সালের বাংলা কতো বড়ো ছিলো! সেই বাংলাকে ভোটাভুটির হিসাবনিকাশ করে অর্ধেক বাংলাকে আসামের সঙ্গে দিয়ে দেওয়া হলো। শিলচর, গোয়ালপাড়া, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি সবাই বাঙালি--মুসলিম বাঙালি, হিন্দু বাঙালি। আমি হিন্দু-মুসলিম তুলতে চাচ্ছি না। কেটে দেওয়া হলো আসামের সঙ্গে।
বিহার বাংলার সঙ্গে ছিলো, বাঙালির আধিপত্য ছিলো, কেটে নেওয়া হলো। উড়িষ্যার কিছু অংশ ছিলো, কেটে নেওয়া হলো। কেটে নিয়ে যতোটা ছোটো করা যায়--এবার ভাগ করো। আমরা ছোটোবেলায় খেলাধুলা করতাম, মারামারি করতাম, পাড়ার ছোটোটাকে কোনো রকম ঠেসিয়ে ধরলে বাকিগুলো দৌড় মেরে পালাতো। আমরা রাজনীতির খেলায় বলি না, ‘সিঙ্গেল আউট করো’‘সিঙ্গেল আউট করো’। বাংলাকে যতোভাবে সিঙ্গেল আউট করা যায়, করা হলো। গান্ধীজির মতো মহাত্মা--সুভাষ বসু যখন দাঁড়ালেন কংগ্রেস কমিটির সভাপতি পদে তখন তিনি সিতারামাইয়াকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। গান্ধীজি বললেন, ‘সিতারামাইয়া ইজ মাই ক্যান্ডিডেট।’ আরে আপনি যদি বাপু হন, তাহলে তো সবার বাপু। তাহলে আপনি সিতারামাইয়াকে কেনো সাপোর্ট করছেন? সেবার সুভাষ বসুকে ফেইল করালেন। পরের বার সুভাষ বসু জিতলেন। তখন গান্ধীজি বললেন, ‘সিতারামাইয়া’জ ডিফিট ইজ মাই ডিফিট।’ এবং সি ডব্লিউ সি-এর মিটিং করতে দেওয়া হয়নি অনেক দিন পর্যন্ত। গান্ধীজির নেতৃত্বে এটা হয়েছে। শরৎচন্দ্রের লেখা পড়লে দেখতে পাবেন দেশবন্ধু মারা যাওয়ার পর উনি গান্ধীজিকে বলছেন, ‘আপনি বাংলায় বাংলার মানুষের মনে দেশবন্ধুর জায়গা নিতে চান? পারবেন না কখনো।’ উনি গান্ধী ভক্ত ছিলেন তারপরেও বলছেন।
ফলে বাংলার সঙ্গে ষড়যন্ত্র সবসময়ই হয়েছে; হয়েছে জ্যোতি বাবুর সঙ্গেও। আবার সি পি এম-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তখন সর্দারজি হরকিশান সিং সুরজিত, তিনিও ষড়যন্ত্র করেছেন--বাংলা থেকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেবেন না। জ্যোতি বাবু কষ্ট পেয়েছেন। আমরা আর কিছু চাইনি। বাংলা থেকে প্রণব মুখার্জি এতোদিনে প্রেসিডেন্ট হলেন। বাংলার সঙ্গে কবে ষড়যন্ত্র হয়নি? অথচ ভারতের স্বাধীনতাযুদ্ধে মারাঠি, পাঞ্জাবি আর বাঙালিরা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। বাংলাকে ভাগ করো, পাঞ্জাবকে ভাগ করো, মারাঠিদের ভাগ করতে পারেনি। আমি কিন্তু সাদা দিলে বলছি, মারাঠিরা এখন কী করছে সেটা আমার কাছে বড়ো কথা নয়। এই যে ভারতের ভিতরে আরেকটা ‘জয় মহারাষ্ট্র’ বলে স্লোগান তুলছে, সেটাও আমার কাছে ইয়ে লাগে। আর পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আগাগোড়া--সৌমিত্র বাবু আপনাকে কিন্তু বলছি না ভাই, মোটেও ব্যক্তিগতভাবে বলছি না--ন্যাকা ছিলো, ন্যাকাই আছে। ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি’, ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি’ বলে একদম গলা শুকিয়ে ফেললো, মুখের ফেনা তুলে ফেললো। ‘ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি’ বলে কিছু বলা যাবে না। আর এই ৪০ লাখ লোকের পক্ষে যে মমতা দাঁড়ালেন, সেটাও তো বুঝতেই পারছেন তার পলিটিকস্। এখন জিও-পলিটিকস্টা বুঝতে হবে। ভারতবর্ষ একটা বড়ো দেশ এবং বাংলাদেশের তিন দিকে। সেটার সমস্ত সুবিধা ভারত নিচ্ছে। আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি। মানে ইতিহাসকে কীভাবে খণ্ডিত করা হচ্ছে, ভারত করছে--ধর্মশালায় শহীদ স্মারক কবে করা হয়েছে আমি জানি না, কংগ্রেস আমলে নাকি বি জে পি আমলে? (সৌমিত্র বললেন, কংগ্রেস) কংগ্রেস আমলে! ভাবুন একবার, সেখানে লেখা আছে ১৯৭১ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ! নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছে আরোরার কাছে, সেটা নাকি পাক-ভারত যুদ্ধ! একটা বড়ো রাষ্ট্রের যা যা কৌশল করা দরকার, সব করছে একটা ছোটো রাষ্ট্রের সঙ্গে।
আমার সড়ক দিয়ে যাবে কোনো ট্যাক্স দেবে না। বাংলাদেশও লজ্জায় চাইতে পারে না। আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘বন্ধুর কাছে কী চাইবো, বন্ধুর কাছে কি টাকা চাওয়া যায়!’ আরে এটা একটা কূটনৈতিক ডিল হচ্ছে। আপনার সড়ক দিয়ে যাবে, সড়ক ক্ষয় হবে। আপনি টাকা নেবেন না! আপনি দেখান কোথায় বি জি বি (আগের বি ডি আর) গুলি করেছে; একটা ফায়ার করেছে বি জি বি? অবশ্য একটা ঘটনা আছে। সেটার প্রতিবাদও আমি করেছি, পাঁচজন বি এস এফ জওয়ানকে শুধু মারেইনি, বাঁশে করে টেনে নিয়ে এসেছে। সেটা নিঃসন্দেহে অবমাননাকর মানবতার প্রতি। আমি সেটার প্রতিবাদ করেছি। তাছাড়া একদিন একটা গুলি করেনি বি জি বি। বি এস এফ প্রতিদিন গুলি করছে। কে মারা যাচ্ছে, মারা যাচ্ছে দরিদ্র গরুর দালাল। কোনো ধর্ম নেই তার। একটাই ধর্ম খিদে। এই খিদের জন্য মারা যাচ্ছে সে।
আর আরেকটা প্রসঙ্গ আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি, কতো হাজার কোটি টাকা করপোরেট হাউজগুলোর মাধ্যমে এখান থেকে নিয়ে যাচ্ছে ভারত। সেটা দেখুন আপনি, গার্মেন্ট সেক্টরের ম্যানেজেরিয়াল লেভেলে, সেকেন্ড লেভেলে বেশিরভাগ ভারতীয় এক্সিকিউটিভ। আমার পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি তাও যদি এখান থেকে দুটো পয়সা নিয়ে যেতো, তাহলে আমার ভালো লাগতো যে বাঙালি নিচ্ছে। আমি হিন্দু বুঝি না, মুসলমান বুঝি না। তা নয়, আপার ইন্ডিয়ার লোকজন নিচ্ছে। আরে কোনোদিন আপার ইন্ডিয়ার ব্রাহ্মণরা বঙ্গদেশের ব্রাহ্মণদের ব্রাহ্মণই মনে করেনি। আপার ইন্ডিয়ার মুসলমানরা বঙ্গদেশের মুসলমানদের মুসলমান মনে করেনি। দেখেন আপনি ইতিহাস পড়ে। মির্জা গালিব যখন কলকাতায় এলেন, সেখানে নেমেই বললেন, এই বাঙালি এমন এক জাতি যারা পাঁচশো বছর পিছনে চলে, একই সঙ্গে একশো বছর সামনে চলে। অনেক অর্থ আছে হয়তো তার। গালিব হয়তো বাঙালিদের চিনেছিলেন। কিন্তু গালিবও হয়তো সবটা চিনতে পারেননি। কারণ বাঙালি নিজেকেই চিনতে পারেনি।
প্রতিবারই পূর্ববঙ্গের বাঙালি অর্থাৎ বাংলাদেশের বাঙালি এখন দিয়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষকে, আবার পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি আবার ওই ছুরিটা মারছে। পানি দিতে কে রাজি হচ্ছে না, মমতা। ভিতরে ভিতরে কোনো একটা আঁতাত মোদিজির সঙ্গে মমতার নেই, সেটা ভাবি কী করে? লোকসান দিচ্ছে কে, বাঙালি। এই হচ্ছে দেশভাগের চূড়ান্ত ফল। একবারও প্রতিবাদ করেনি বাংলাদেশ--৪০ লাখ লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে গেছে! একবারও প্রতিবাদ করেনি বি এস এফ--না বাংলাদেশ থেকে এতো লোক যায়নি। আমরা ডিউটি করেছি। তার মানে তোমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী ঘুমিয়েছে! আর ৪০ লাখ লোক ঢুকে গেছে। কারা ঢুকেছে? তপোধীর ভট্টাচার্য ঢুকে গেছে, ফখরুদ্দীন আলি আহমেদ ঢুকে গেছে। আর বাবা-মায়ের কার্ড আছে, দুই বছরের ছেলের কার্ড নেই। দুই বছরের ছেলে কেউ পয়দা করে পাঠিয়ে দিয়েছে! মানেটা কী দাঁড়াচ্ছে? যা-ই বলেন, যেদিক দিয়েই বলেন, এই রকম করে কাটছে, ওই রকম করে কাটছে--কাটছে বাঙালিই। আমি এভাবেই দেখি, দেশভাগে কাটছে বাঙালি, আর কেউ না। তরমুজ ছুরির ওপর পড়ুক বা ছুরি তরমুজের ওপর পড়ুক, কাটবে তরমুজই। বাঙালি এখন তরমুজ। ধন্যবাদ।
সৌমিত্র : আমি সত্যিই খুব উপকৃত এবং একটু শ্লাঘাও অনুভব করছি যে, ওনার সঙ্গে তখন দেখা হয়নি। কিন্তু আজকে উনি যা বললেন, তাতে মনে হয় পয়েন্ট ওয়ান হলেও হয়তো আমার ছবিটা কোথাও একটা ওনাকে আলোড়িত করেছে। তাই পুরোপুরি ফেইল করেছি বলা যাবে না। হয়তো কম নম্বর পেয়েছি। যদি একটু গ্রেস-ট্রেস দেন, তাহলে একটু বেশি নম্বর পেতে পারি। তবে হ্যাঁ, এটা আমারও প্রশ্ন-- দেশভাগটা নিয়ে যখন ছবি করবো বলে ঠিক করি, তখন ভাবিনি, খড়ের গাদায় সুচ খুঁজতে যাওয়ার মতো অবস্থা হবে।
সামাদী : আপনাকে থামিয়ে দিয়ে আরেকটা কথা বলছি, আমি বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। গুজরাট নিয়ে আপনি কাজ করেছেন, আমি সেটা দেখিনি। আমার বন্ধু নিশরিন জাফরি হোসেন বাবা--এহসান জাফরি কংগ্রেসের সাংসদ ছিলেন--সেই মানুষটিকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসে প্রথমে পিটিয়ে, পরে পুড়িয়ে মারা হয়। এহসান জাফরির আমেরিকা প্রবাসী মেয়ে এবার বলেছেন, তার বাবা যেভাবে মারা গেছেন, ভারতের কোনো মানুষ যেনো সেভাবে মারা না যায়। আপনিও নিশ্চয় সেই আবেদনে সাড়া দিয়েছেন, আপনিও অংশগ্রহণ করেছেন। তাহলে আমাদের এখানে দরিদ্র হিন্দুরা মারা যাচ্ছে এবং সেটার ফল ভোগ করছে কিছু মধ্যবিত্ত হিন্দু, শিক্ষিত হিন্দু, চাতুর্য করে। ভারতবর্ষে কিন্তু মুসলিম মারা যাচ্ছে সবাই। এই জিনিসটা কিন্তু আমার চোখ এড়ায়নি। এবং তপোধীর ভট্টাচার্যকে শিলচর থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, কেনো তিনি বাঙালির পক্ষ থেকে কথা বলবেন?
সৌমিত্র : না, আমি সেদিন ছিলাম। ওদের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। ওইটা একটা গুজব রটেছিলো যে, তাকে গোয়ারিতে ডেকে আনা হয়েছে। (সামাদী : না, তাকে গ্রেফতার করা হয়নি। কিন্তু ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।) সেদিন ডেকে নিয়ে গেলেও তাকে কিছু করেনি।
সামাদী : কিছু করেনি, কিন্তু কথাবার্তা বলেছে। এটা একধরনের ত্রাস সৃষ্টি করা। তপোধীর দা’র সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে ৩০ তারিখে কলকাতায়। তার সমস্ত ঘটনাটা আমি শুনেছি। তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। এটা জনমনে একটা ত্রাস সৃষ্টি করা, দেখো আমি তপোধীর ভট্টাচার্যকেও ডাকতে পারি। সুতরাং তোমাকে কেনো ছাড় দেবো!
সৌমিত্র : এটা বলতে গেলে তো আরেকটা সেশন হয়ে যাবে। জনমনে এমন ত্রাস তৈরি করা হচ্ছে, এমন মিলিটারাইজেশন করা হচ্ছে, যার ফলেই তো আমি এই প্রশ্নগুলো তুলতে বাধ্য হচ্ছি। আপনি যদি করিমগঞ্জের দিকে যান, ভাঙা’তে যান, লালা’তে যান, যদি বদরপুরে যান--দেখবেন কারণে-অকারণে সেখানে ফ্ল্যাগমার্চ চলছে। পাঁচটার পরে আপনাকে ঘরে ঢুকে যেতে হচ্ছে, হোটেলে ঢুকে যেতে হচ্ছে। ওই এলাকাগুলোর আমি নাম বলছি না, জায়গাগুলো কাদের অধিষ্ঠিত? আমি এমন একটা পরিবারে বড়ো হয়েছি যেখান থেকে কখনো ধর্ম-হিন্দু-মুসলমান ইত্যাদি নিয়ে আমাকে খুব বেশি সচেতন থাকতে হয়নি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই মেরুকরণটা করা হচ্ছে। আপনি ঘটনাচক্রে ‘দাঙ্গা’ বললেন গুজরাটে। কিন্তু আমি বলবো, গুজরাটে আসলে কখনো দাঙ্গা হয়নি। একসময়ে দাঙ্গা হয়েছিলো, ভবিষ্যতেও হতে পারে। কিন্তু ২০০২ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটে জেনোসাইড হয়েছিলো, গণহত্যা হয়েছিলো। কিন্তু আমরা কথায় কথায় এই যে ‘দাঙ্গা’ শব্দটা বলে ফেলছি, এটাও কিন্তু অদ্ভুতভাবে একটা মিডিয়া কয়েনড। অনেকেই এটাকে দাঙ্গা বলেন। কিন্তু যেহেতু আমি ওখানে ছিলাম--শাহ আলম দরগা বলুন, কালুপুরা বলুন, জহুপুরা বলুন, প্রত্যেকটা জায়গা আমার দেখা--সেখানে অনেক ঘটনা আমার সামনে ঘটে, এবং এখনো চোখের সামনে ভাসে। আমি সত্যি সেই জায়গা নিয়ে আলোচনা করবো।
আমি যেটা বলতে চেয়েছি, হিন্দু বাঙালি, মুসলমান বাঙালির প্রসঙ্গ আমি কেনো এনেছি, শিলচরের মধ্যেও যদি আপনি দেখেন, আজকে তপোধীর দা’রা যে স্ট্যান্ডটা নিচ্ছেন, যদি তপোধীর দা’র মতো আরো অনেকেই আগে থেকেই এই স্ট্যান্ডটা নিতেন, তাহলে কিন্তু হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে এই লড়াইটা করতে পারতো। কিন্তু মুশকিলটা হয়েছে--তপোধীর দা নন, তিনি চিরকালই অন্যরকম মানুষ--অনেককেই আমি দেখেছি দু’দিন আগেও যে মানুষটি অত্যন্ত প্রগতিবাদী লেখক ছিলেন, এবার গিয়ে দেখি তিনি আমাকে বলছেন, বাংলাদেশে কিন্তু হিন্দু নির্যাতন প্রবল। আমি বললাম, এটা আপনি কবে ঠিক করলেন, কবে জানলেন, আপনি গিয়েছিলেন ওখানে? তিনি বলেন, না আমি খবর পাচ্ছি। তো আমি কেনো ধর্মের কথা আনছি--যেটা নতুনদের বার বার বলছি--ধর্ম সত্যি কোনো নির্ণয়ের শক্তি নয়। কিন্তু ধর্মের মধ্য থেকে এই মেরুকরণ ঘটানো হচ্ছে। গুজবের মধ্য দিয়ে, অপপ্রচারের মধ্য দিয়ে মেরুকরণ ঘটানো হচ্ছে। আপনি যদি খেয়াল করে থাকেন, ছবিতে দেখবেন, আর এস এস নেতা ফেলানির মতো ঘটনাকেও বলছেন, ‘ও তো একটা ফেলানি হয়েছে।’ ওরা ৪০ লাখ বলুন আর একটা ফেলানি বলুন, গোটা জিনিসটাকেই সংখ্যা দিয়ে বিচার করে। সংখ্যা আর মানবতাটা যে এক হতে পারে না, এটা ওরা বোঝেই না। আমি বি জে পি নেতাদের কাছে জিজ্ঞাসা করেছি, ৪০ লাখের মধ্যে হয়তো ৩৯ লাখ বাদ যাবে বা ফিরে আসবে। তো এক লাখ লোক তো থাকবে। তারা যাবে কোথায়?
দর্শকের একাংশ
সামাদী : আমি আপনাকে সাপ্লিমেন্ট করছি। আপনি সত্য বলছেন। আমার ফেইসবুকে এক বন্ধু আছে আকবর হোসেন। তিনি কলেজে ইংরেজি পড়ান, বোধ হয় পয়সা-কড়িও আছে। আমি যখন ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, ‘শুধু বাঙালির পক্ষে কথা বলার জন্যেই তপোধীর ভট্টাচার্যকে হয়রান করা হচ্ছে।’ তখন সে বললো, ‘মশাই আসলে ব্যাপারটা তা নয়।’ আমি একটু রেগে গিয়ে বললাম, ‘তাহলে আপনি বলুন আপনার ভাষ্যটা শুনি, ব্যাপারটা আসলে কী? আমার সঙ্গে সঙ্গে অন্যরাও শুনবে।’ তখন সে আর কথা বললো না। আমি বুঝলাম, এখানে হিন্দু-মুসলিম খুব বেশি বড়ো কথা নয়, অর্থনীতিও জড়িয়ে আছে। ওখানে কোনো কোনো মুসলিম বুদ্ধিজীবী কিন্তু এই বাঙালি খেতাবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাহলে ব্যাপারটা কিন্তু বাঙালিই থাকছে।
সৌমিত্র : না, অন্য দিকটাও আছে। আপনি তো জানেন স্বাধীনতার পরে মুসলমানদের মধ্যে যারা ওপারে থেকে গেলো, তারা প্রত্যেকেই যখন সেন্সরড হতে লাগলো, তারা নিজেদের অসমীয়া দাবি করলো। মাতৃভাষাও অসমীয়া বললো। ৬১’র ভাষা আন্দোলনও তারা সেই অর্থে সমর্থন করেনি, দু’চার জন বাদ দিয়ে। কিন্তু আজকে নতুন জেনারেশন, নতুন জেনারেশন শব্দটা বলছি, কারণ আসামে মুসলমানদের নতুন জেনারেশন কিন্তু বলছে আমার মাতৃভাষা বাংলা। আমি বাংলাতেই কথা বলবো। এই যে বাঙাল খেতাবটার দাবি উঠছে, তার একটা বড়ো কারণ কিন্তু অসমীয়া। এখন উগ্র জাতীয়তাবাদীরা ভয় পাচ্ছে, কারণ কোথাও সত্যি যদি বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দু এক হয়, তাহলে সংখ্যার জায়গায় দাঁড়িয়েও হয়তো বরাক ভ্যালিতে তারা মাইনোরিটি হয়ে যাবে।
সামাদী : আমি সে জন্যই বলছি, হিন্দুত্ব-মুসলমানিত্ব আমার কাছে ক্ষীণ হয়ে যায়, যখন দেখছি, এহসান জাফরির মতো ইনোসেন্ট লোককে মারা হচ্ছে; সেটাকে আকবর হোসেনের মতো একজন মুসলিম সমর্থন করছে। আমার বয়েই গেছে, বসনিয়ায় মুসলমান মরছে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। কিন্তু সেখানে মানুষ মরছে, আমার যায় আসে। রাখাইনে মুসলিম মারা যাচ্ছে, আমার কিচ্ছু যায় আসে না; মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে সেটা হলো ব্যাপার। আমি ব্যাপারটাকে সেভাবেই দেখতে চাই। আমি একটি পয়সাও দিইনি যখন মওলানারা বলেছে, রাখাইনে মুসলিমকে মেরে ফেলছে, তাদের সাহায্য করার জন্য টাকা দাও। আমি বলেছি, ‘দেবো না। তুমি যেদিন বলবে রাখাইনে মানুষ মারা হচ্ছে। আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই, সেদিন দেবো।’ ওই জায়গাটায় গণ্ডগোল কিছু হচ্ছে, সেই জন্যে আমি বলছি। আশা করি আপনি সেটা ...।
সৌমিত্র : না না, আমি পুরোটাই আপনার সঙ্গে একমত। আমাকে কেনো মুসলমান শব্দটি ব্যবহার করতে হয়েছে সেটা বলি। ঘটনাচক্রে এখানে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন করে দেওয়া হচ্ছে নানাভাবে। নানান প্রচারের মধ্য দিয়ে। ফলে আমরা যদি ধাক্কা না মারি, এরা দেখবেন আরো অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে বেরিয়ে পড়বে রাস্তায়। এবং ঘটনাচক্রে মুসলমান শব্দটি যদি আমি ব্যবহার নাও করি, আপনি দেখবেন সবচেয়ে সাফার করছে মুসলিম, দলিত, আদিবাসীরা। ইন দ্য নেইম অব ডেভেলপমেন্ট, সবচেয়ে বেশি উচ্ছেদ হচ্ছে কারা--মুসলমান, দলিত, আদিবাসীরা। গুজরাটের দাঙ্গায়--আমি বলবো গণহত্যা--দেখবেন অর্থনীতি একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছে। আজকে যদি ৮৪ সালে আসামের নেলি’র ঘটনা দেখেন, দেখবেন সেখানে অন্যান্য বাজার তৈরি করা হয়েছে। গুজরাট নিয়ে আমার দুটো ছবি আছে। একটা হচ্ছে জেনোসাইড অ্যান্ড আফটার; তখন আজকের ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কিছুই হচ্ছে না, নাথিং হ্যাপেন্ড ইন গুজরাট।’ ফলে ভারতবর্ষটাও পাল্টে যাচ্ছে। অসমীয়া মুসলমানদের একটা বিশাল অংশ আজকে কিন্তু রিহোল্ড করছে। ফলে এই ভয়টা বাড়ছে।
আরেকটা কথা বলে আমি শেষ করবো। আমার ছবির শুরুতেও এসেছে, শরণার্থী আর অনুপ্রবেশকারী। এবার আসামের ক্ষেত্রে শরণার্থীর দুটো শর্ত দেওয়া হচ্ছে। একটা আমি মনে করতে পারছি না। অন্যটি হচ্ছে, ‘তোমাকে আগে অ্যাপ্লাই করতে হবে, তুমি নাগরিক হতে পারো কি পারো না।’ তার মানে আপনাকে ডিক্লেয়ার করতে হচ্ছে, আপনি মশাই বিদেশ থেকে এসেছেন, তা যেখান থেকেই হোক। তার পরে বিবেচনা করা হবে, আপনি নাগরিক হওয়ার যোগ্য অথবা যোগ্য না। তার মানে আপনি আমার সঙ্গে না থাকলে নাগরিক নন। আর আমার সঙ্গে থাকলে আপনি নাগরিক হতেও পারেন, নাও হতে পারেন। এবং সেই বিবেচনাটা কিন্তু ১১ বছর পরে। এই ১১ বছর আপনি কিন্তু শরণার্থী। ভোট দেওয়া ছাড়া আপনি কিন্তু কোনো অধিকার পাচ্ছেন না, খালি ভোটটা দিতে পারছেন।
সামাদী : দাদা, আপনাকে একটু ভিতরের কথা বলি। আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করছি, মামুনদের (কাজী মামুন হায়দার) কাছ থেকে উত্তর নেবেন। এই বাংলাদেশে এখন শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, সেক্যুলার বাঙালি মুসলমান ছাড়া সত্যিকার মাইনোরিটি কি কেউ আছে? শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, সেক্যুলার মুসলিম বাঙালি ছাড়া আর কোনো মাইনোরিটি সত্যিকার অর্থে নেই বাংলাদেশে। আমি কিন্তু জানি, কার গলাটা কাটবে। মামুনের গলাটা আগে কাটবে, আমার গলাটা আগে কাটবে, নাকি মারুফের গলাটা আগে কাটবে। আমি জানি, অনেকের গলা কাটবে না, যারা নিজেদের মাইনোরিটি বলছে। যারা বলতে পারছে না আগৈলঝড়া কিংবা বাগেরহাটের হিন্দুদের কথা আলাদা। যারা নিজেদেরকে মাইনোরিটি বলে খানিকটা সুড়সুড়ি দিয়ে, কিছু সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে, তাদের গলা কাটবে না ধর্মান্ধরা। আমার গলা কাটবে, ওই মামুনের গলা কাটবে। ফলে আমাদের চেয়ে মাইনোরিটি এই বাংলাদেশে এখন আর কেউ নেই। ক’দিন বাদে থুথু ছিটাবে, নাহয় দেখে হাসবে, এই দেখো এই লোকটা, এই ফালতু লোকটা হলো সেক্যুলার। আমরা সেই পর্যায়ে চলে গেছি।
সৌমিত্র : চলো আজকে শেষ করি। অনেকক্ষণ ধরে কঠিন কঠিন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হলো। আমার সামনে অনেক অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েরা বসে আছে। আমি দুঃখিত অনেক সময় নিয়েছি। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে তো বটেই, যারা এসেছেন, যারা প্রশ্ন তুলেছেন, যারা তোলেননি, যারা ভালো বলছেন বা যারা ভালো বলছেন না, সবাইকে ধন্যবাদ, অভিনন্দন। আপনারা সবাই ভালো থাকুন।
অধরা মাধুরী, সঞ্চালক : অসংখ্য ধন্যবাদ নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদারকে। এখানে উপস্থিত সম্মানিত দর্শক, অংশগ্রহণকারী এবং ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সবার পক্ষ থেকে আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আপনি আমাদের সময় দিয়েছেন বলে। আমরা আয়োজনের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এই পর্যায়ে আমি মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সম্পাদক এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী মামুন হায়দারকে।
কাজী মামুন হায়দার : শুভেচ্ছা সবাইকে। আমি এক মিনিটে শেষ করে ফেলবো। আমি ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছি আসলে। অনেক দূর থেকে দাদা এসেছেন। তাকে আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের ডাকে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা এসেছেন, অনেকক্ষণ ধরে আছেন এখানে। তাদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর যে কথাটি বলে শেষ করতে চাই, আমরা এই অনুষ্ঠানটির নাম দিয়েছিলাম ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’। আমার মনে হয়, নামটি সার্থকতা পেয়েছে। আমরা বাতচিতটি করতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রশ্ন করা, বিশ্ববিদ্যালয় মানে প্রশ্ন করতে শেখা। প্রশ্ন তোলার সেই বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হয়ে গেছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আর নাই। এখন যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা আছি সেখানে প্রশ্ন করা যায় না। সেখানে প্রশ্ন করাই অপরাধ। সেখানে শিক্ষকের নিয়মিত ধমক খেতে হয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় আমরা চাইনি। আপনারা দেখতে পারছেন, আমরা দাদাকে যে শুভেচ্ছা স্মারকটি দিয়েছি, সেটি একটি প্রশ্ন এবং নিচে একটি টিক চিহ্ন আছে। আমরা প্রশ্নকে সবসময় সমর্থন করি। আমরা প্রশ্নকে ইয়েস বলি, আমরা প্রশ্নকে হ্যাঁ বলি। আপনারা সামনের দিনে আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। আমাদের স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় আবার ফিরে আসুক, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্ন করার জায়গা হয়ে উঠুক। সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেই শেষ করছি। ধন্যবাদ সবাইকে।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন