মো. হারুন-অর-রশিদ
প্রকাশিত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
পথ ভুলে যাওয়া এক রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ‘শঙ্কর মুদি’
মো. হারুন-অর-রশিদ

প্রতিটি চিন্তাই গড়ে ওঠে কোনো না কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করে; নির্দিষ্ট মতাদর্শ নিয়ে। অবশ্য এর উল্টোটাও ঘটে। শিল্পের সমন্বয়কারী মাধ্যম চলচ্চিত্রও তাই-ই। যেখানে থাকে আলাদা আলাদা ব্যক্তির মত-পথ-চিন্তা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি আলাদা হলেও চিন্তায় মিল থাকতেই পারে। তবে সামগ্রিকভাবে সেই চিন্তার সংজ্ঞায়ন তার পরিধি সীমিতই করে বটে। কেননা কোনো কিছুকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করার চেষ্টার অর্থ, তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনার দরজা-জানলা বন্ধ করে দেওয়া। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ধারা তেমনই একটি। সমাজে টিকে থাকা অন্যায়, অবিচার আর শোষণ সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দিতে, সচেতন করে তুলতে উপন্যাস-নাটক-কবিতা-সঙ্গীত-চিত্রকলার ন্যায় চলচ্চিত্রও ব্যবহৃত হয়েছে হাতিয়ার হিসেবে। চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে মানুষের শিল্প--হাস্যচ্ছলে বা কখনো নির্মল বিনোদনের মাধ্যমে, আবার কখনো সরাসরি কঠোর সমালোচনার মাধ্যমে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়েছে নিষ্ঠ্রু বাস্তবতা। সেলুলয়েডের পাতায় সময়ের প্রতি পদে সমাজে চলা শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নানাভাবে সাধারণের গল্প বোনার এই কৌশলই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ধারা বলে অভিহিত।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে রাজনৈতিক বা রাজনীতি শব্দটি সামনে আসে। তারপরও রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের ধারণাটিকে এখন অবধি কোনো বিশেষ ছাঁচে ফেলা যায়নি। বিশেষ কোনো দলীয় রাজনীতির কথা বাদ দিলেও সামগ্রিকভাবে মানুষের যাপিত জীবন কিন্তু রাজনীতির বাইরে নয়। মানুষের অধিকার প্রসঙ্গটাই রাজনৈতিক। জন্মের পর পরই কেঁদে উঠে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের রাজনীতির সূত্রপাত ঘটে।১ এরপর ভাষা-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-লিঙ্গ, অধিকার কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ইত্যাদি ইত্যাদি যাই বলা হোক না কেনো, এর পিছনে থাকে মূলত নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতা আর রাজনীতির দোলাচাল। এসব রাজনীতির রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের অধিকার থেকে যায় অন্তরালে। কেননা গণতন্ত্র-সার্বভৈৗমত্বের কথা বললেও খোদ আধুনিক রাষ্ট্রই চলে বিশেষ অনুশাসনের ছকে। ফলে ‘রাষ্ট্র বনাম মানুষ’ এখন রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্র চায় সেই আধুনিক ছকের প্রধান গুটি অনুশাসনের মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে। যা মানুষের চেতনায় কাজ করে, অচেতনে নিজের দ্বারা নিজেকে শাসন করতে বাধ্য করে। এমনকি স্বাধীন মানুষও স্বেচ্ছায় অনুশাসনের শিকল পরে তৃপ্ত হয়। অবশ্য মানুষ এর বাইরে যেতে চাইলে আধিপত্যের প্রশ্নে রাষ্ট্র তার পুরনো কৌশল অস্ত্র কিংবা ক্ষমতা ব্যবহার করে।
রাষ্ট্র বনাম মানুষের এই খেলায় কোনো গণমাধ্যম, এমনকি চলচ্চিত্রও কখনো সাধারণকে সমান চোখে দেখেনি। বরং শাসক ও সাধারণের মাঝখানে কেবল সেই নিয়ন্ত্রণ-ক্ষমতা-রাজনীতির যোগসূত্র হয়ে কাজ করেছে/করছে। যদিও দৃশ্যত চলচ্চিত্র সবসময় সাধারণের পক্ষে কাজ করার ভান ধরে থাকে। তারপরও রাজনৈতিক চলচ্চিত্র ও চলচ্চিত্রে রাজনীতি বিশ্বচলচ্চিত্রেই অন্যতম উপাদান হিসেবে আলোচিত হয়। এখন কথা হলো, এই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বলতে আসলে কী বোঝায়? কোন ধরনের চলচ্চিত্র রাজনৈতিক হয়ে উঠবে; কোন উপাদানের উপস্থিতি একটি চলচ্চিত্রকে রাজনৈতিক ধারায় রূপ দেবে?
একজন নির্মাতা তার নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে ভিন্নভাবে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করবে এটাই স্বাভাবিক। এবং সে অর্থে নির্মাতার দর্শন অনুযায়ী সব চলচ্চিত্রই রাজনৈতিক। দিনশেষে তাই কোনটি রাজনৈতিক আর কোনটি নয় সেই তর্ক থেকেই যায়। তারপরও চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকরা নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতায় এই তর্কে মোটামুটি একটা খোরাক জুগিয়েছে। মাইক ওয়েইন যেমনটা বলেন, ‘রাজনৈতিক চলচ্চিত্র সমাজে অর্থনৈতিক আর সাংস্কৃতিক সম্পদের অসম বণ্টন এবং অসম অভিগম্যতার বর্ণনা তুলে ধরে এবং সেই সাথে প্রকাশ করে কর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত সেই ব্যক্তিবর্গের পরিচয় যাঁরা এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে বৈধতা দিতে তৎপর থাকে।’২ একই সঙ্গে ‘ছবিতে রাজনীতির বিষয়টি প্রাথমিক ভাবে আঙ্গিকের কোন প্রসঙ্গ নয়, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রসঙ্গ। ... এমন ছবি দর্শককে নান্দনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করার বদলে মূলত তাকে একটা বিশেষ দৃষ্টিকোণ বা কর্মসূচিতে উদ্বুদ্ধ করে।’৩ তার মানে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নিয়ে নির্মাতা ও তাত্ত্বিকদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকলেও কিছু বিষয়ে তারা একমত৪ পোষণ করে--বাণিজ্যিক আদর্শের মূলনীতি ও উদ্দেশ্যকে প্রত্যাখান করা; বিষয়বস্তু ও অপ্রথাগত নির্মাণশৈলীর মাধ্যমে ক্ষমতাশীল গোষ্ঠীর বিরোধিতা করা; শৈল্পিকভাবে সমাজের রাজনীতি আর অনাচারের স্বরূপ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে তুলে ধরা। যেখানে নির্মাতার পরিষ্কার রাজনৈতিক অবস্থান থাকবে সাধারণের পক্ষে এবং তীব্র সমালোচনার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে উঠে আসবে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যা।
দুই.
আধুনিক রাষ্ট্র জনকল্যাণ-সার্বভৌমত্বের নামে কীভাবে সাধারণের অধিকার নিয়ে খেলে চলেছে; কীভাবে মানুষের চেতনায় রোপণ করে দিয়েছে অনুশাসনের বীজ; সেটা বেশ স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে অনিকেত চট্টোপাধ্যায় নির্মাণ করেন শঙ্কর মুদি। সঙ্গে ঘোষণা দেন, এটি একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। সে বিষয়ে পরে আলোচনা হবে। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক, শঙ্কর মুদি আসলে কী বলে।
অবশ্য গল্পটা অতিপরিচিত। একেবারে ঘরের। যার মধ্য দিয়ে বেশিরভাগ মানুষের বেড়ে ওঠা। যেখানে মিশে আছে আমি, আপনি সবার অস্তিত্ব। কেবল প্রেক্ষাপটটাই ভিন্ন। ২০০৩—২০০৯ খ্রিস্টাব্দের কলকাতার এক পাড়ার গল্প। যার শুরুটা একদম সাদামাটা। বিবর্ণ। সরু গলি। নেই কোনো ঝলমলে রঙ্গিন আলোর ঝলকানি। আছে কেবল পারস্পরিক সম্পর্ক। রক্তের নয় আত্মার। যুবকদের একটু আধটু বখাটেপনা, সারাদিন টইটই করা, নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ভোজের আয়োজন, সুযোগ পেলেই মাতলামি করা; সঙ্গে অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সমাজ সেবা আরকি। মানে একটা সামাজিক বুননের গল্প। চারদিকের এই উন্নয়ন, বাণিজ্যিক প্রগতি তথা বাজারের যুগের অসম লড়াইয়ে খোয়ানো সেই অস্তিত্বকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন অনিকেত; তুলে ধরেছেন এই একমুখী উন্নয়ন পাড়ায় কতোটা প্রভাব ফেলছে। শঙ্কর মুদির শঙ্কর, নারাণ, কালী, বিশু, সেক্সপিয়র তথা মাস্টাররা করেছেন তাদের প্রতিনিধিত্ব। যারা রাতবিরাতে ছুটে যায় অসুস্থ বৃদ্ধকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে, বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করা মেয়েকে বাঁচাতে।
আর শেষটায়, ঝাঁপি খুলে বেরিয়ে আসে ‘উন্নয়ন’। বদলাতে থাকে সবকিছুর চিত্র। জমি নিয়ে বোমাবাজি হয় পাড়াতে। চোখ ধাঁধানো রশ্মিতে জৌলস মেলে ধরে পাড়ার মাঠে গড়ে ওঠা শপিং মল। যে পলিটিকাল ‘পাতি নেতা’ ভবেন দা দোকান বন্ধ করে সবাইকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মিছিলে যেতে বলেন, সেই তিনিও শপিং মলের দালালি শুরু করেন। বিশ্বায়নের ছোঁয়া এসে পড়ে পাড়ায়। চেনা পাড়া হয়ে পড়ে অচেনা। বাড়তে থাকে মলের কদর। যে শঙ্কর দোকানে ভিজে আসা খরিদ্দারকে ছাতা মাথায় এগিয়ে দেন, অসুস্থ মানুষের ঘরে পৌঁছে দেন বাজার, রোজ অফিসফেরত মাতালকে দেখান বাড়ির পথ, ক্রেডিট কার্ড কী জিনিস না বুঝলেও তার বাকির খাতায় পাড়ার মোটামুটি সবার নামই আছে, কেউ মারা গেলে খাতা থেকেও তার নাম কেটে দেন যে শঙ্কর, বেচা-কেনার বাইরে যার সঙ্গে সবার একটা অন্যরকম সম্পর্ক; তাকেই ভুলে যেতে থাকে সবাই। মলে গিয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে থাকে দ্বিধাহীনভাবে। এমনকি অসম লড়াই যার কাছে স্পষ্ট, সেই মাস্টারও একসময় বাধ্য হন মলে যেতে। জেনে বুঝে উন্নয়নের অফারে শোরগোল-বিপদ-আপদ-উৎসবের সব সম্পর্কই ছিন্ন হয়ে যায়।
এমন চেনাজানা গল্পের একটু অন্য ধরনের উপস্থাপন করেছেন অনিকেত। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রটি রাজনৈতিক দাবি করে তিনি বলেন, ‘ভুলভাল চুটকি দেওয়াকে রাজনৈতিক ছবি বলে চালানো হচ্ছে। কিন্তু সবার বোঝা উচিত, রাজনৈতিক ছবি মানে রাজনৈতিক তত্ত্ব বা সিন্ধান্ত নিয়ে তৈরি করা সিনেমা। কারও বিরুদ্ধে চারটি চুটকি লিখে দেওয়াকে রাজনৈতিক ছবি বলে আমি মনে করি না।’৫ এই বক্তব্যের পক্ষে তার যুক্তি, ‘এটা রাজনৈতিক ছবি। কারণ, আমাদের দেশে উন্নয়নের নামে কতগুলো মল, ব্রিজ তৈরি করা হচ্ছে। সেটা উন্নয়ন নয়। কারও জমি চলে যাচ্ছে, ছোট্ট মুদির দোকান যে চালাচ্ছিল, সে বড় দোকানের সঙ্গে কীভাবে পেরে উঠবে? তারা তো সুখে-দুঃখে আমার পাশে দাঁড়ায়। এই সামাজিক সম্পর্কের বুনোটটা নষ্ট হয়ে গেছে।’৬ এটা ঠিক যে, চলচ্চিত্রটি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, ভেঙে যাওয়া সময়ের গল্প শোনায়; কীভাবে আর্থ-রাজনৈতিক অবস্থা মানুষের নৈতিক চরিত্র দুমড়ে-মুচড়ে একাকার করেছে/করছে তার সাক্ষ্য দেয়। ৯০-এর দশকে যখন সারাবিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ভারতবর্ষের বাজার। এই সময়কে কেন্দ্র করে নব্য-উদারনীতি ও মুক্তবাজার অর্থনীতি বনাম পাড়া-শহরতলীর ছোট পুঁজির দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নিউ লিবারেল দুনিয়ায়, উন্নয়নেরও উন্নয়নের যুগে চিন্তা-মত-পথ সবকিছুর ভিত্তিতে থাকছে উন্নয়নেই প্রশস্তি। মাঝেমধ্যে আসে রোহিঙ্গার দীর্ঘশ্বাস কিংবা আসামে এন আর সি’র নামে পরিচয়হীন মানুষের আর্তনাদ। একটু আধটু বিচলিত হলেও পুনরায় শুরু হয় ওই উন্নয়ন-প্রশস্তিরই গান। তারপরও এই যে উন্নয়নের ঝাঁপি খুলে বসা হয়েছে তা কিন্তু সাধারণের নয়, বরং নির্দিষ্ট শ্রেণির উন্নয়ন; এর ফলে একক শ্রেণি লাভবান হলেও প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি/ঘটবে না কখনোই। এই প্রেক্ষাপটেই অনিকেত নির্মাণ করেন শঙ্কর মুদি।
তবে রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের যে ধারণা আমরা পাই তার সঙ্গে শঙ্কর মুদির মিল ও অমিলের জায়গাটা খোঁজা দরকার। সেই সঙ্গে শঙ্কর মুদি কতোটা রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারলো এবং গত এক দশকে নির্মিত ভারতীয় অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো কেনো রাজনৈতিক হয়ে ওঠেনি বা উঠছে না? অনিকেতের ভাষায় ‘চুটকি’গুলোকে দৃশ্যত রাজনৈতিক বলা হয়ে থাকলেও সেগুলো আসলে কী বার্তা দেয় সেই সন্ধানটাও জরুরি।
তিন.
বিশ্বায়নের জোয়ারে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তালমিলিয়ে কলকাতায়ও বড়ো বড়ো শপিং মল গড়ে ওঠে। রাতারাতি খরিদ্দারে পূর্ণতা পায়। বিপরীত চিত্র দেখা যায় ছোটো পুঁজিওয়ালাদের বেলায়। একদিকে আশ্চর্য রকমের জৌলুস, অন্যদিকে শ্মশানের নীরবতা। তবুও অসম লড়াইয়ে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা। চলচ্চিত্রেও দেখা যায়, একসময় দর্জি দোকানে থান কাপড়ের পরিবর্তে তৈরি পোশাক; সেলুনে অমিতাভ বচ্চনের জায়গায় সালমান খান, ফেসিয়াল, শ্যাম্পু সেবা; আর শঙ্কর শুরু করেন সেল্ফ সার্ভিস ও হোম ডেলিভারি। তারপরও কিন্তু টিকতে পারে না শঙ্কর-নারাণরা। শেষমেশ অসম লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে শঙ্কর আত্মহত্যা করেন। কালী বনে যান বাস কন্টাক্টর; নারাণও আর দোকানে আসেন না। তাদের অনুপস্থিতিতে শূন্যতা নেমে আসে পাড়ায়। যা শিল্পবোধের সঙ্গেই উপস্থাপন করেছেন অনিকেত। কেননা চলচ্চিত্রের প্রতিটি বিষয়-ধারণা-অভিনয় ও গল্পের বুননই তার প্রাথমিক স্তম্ভ। অন্যদিকে শিল্পের শিল্পমূল্যই তার রাজনৈতিক মূল্যের পরিচয় বহন করে। কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয় উপাদান হিসেবে ব্যবহার করলেই তা রাজনৈতিক হয়ে উঠবে কি না, তার সমাধান পাওয়া কষ্টকর। একই সঙ্গে শিল্প বিচারে ব্যবহৃত উপাদানগুলো কীভাবে উপস্থাপন করা হলো, সেটাও মুন্সিয়ানার পরিচয় বহন করে। সেক্ষেত্রে নির্মাতা বেশ অমনোযোগিতার ছাপ রেখেছেন। মাত্র একবারের জন্য শঙ্করের দোকানে একজন আমেরিকান নারী, পরে সৌম্য ব্যানার্জির উপস্থিতি; মাতাল কর্মহীন যুবকের তিনবার রাতে বাড়ি ফেরা, পথ ভুলে যাওয়ার--হয়তো এক অর্থে এর মাধ্যমে নির্মাতা রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের বৈচিত্র্য ও পুঁজি বাজারের ইঁদুর দৌড়ে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। শঙ্কররা যাদের কখনো কখনো পথ দেখানোর নামে টিকে থাকার লড়াইয়ে শামিল হতে তাগিদ দেয়। যদিও শঙ্কররাও একসময় টিকতে পারে না। কিন্তু চলচ্চিত্রের বাকি চরিত্র বা গল্পের সঙ্গে এদের সম্পর্ক কী তা স্পষ্ট করেননি নির্মাতা।
ধরতে গেলে, চলচ্চিত্রটির প্রধান উপাদান বিশ্বায়ন। এর ফলে শহুরে পাড়াগুলোর যে সংস্কৃতি তাতে কী ধরনের প্রভাব ও পরিবর্তন হয়েছে তার একটা চিত্ররূপ দিয়েছেন নির্মাতা। অথচ চলচ্চিত্রে বিশ্বায়ন পূর্বাবস্থা (ঐতিহাসিকতা) সম্পর্কে কোনো কিছু না বলে তিনি সময় ও প্রেক্ষাপট ব্যবহার করেই রাজনৈতিক চলচ্চিত্র দাবি করেছেন। কিন্তু কথা হলো, শিল্প বিচারে কোনো চলচ্চিত্র তখনই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, যখন তা বক্তব্য-বিষয়-উপাদান রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করে। নির্মাতা একটা সময় তথা পুঁজির প্রসারে দুই দিকের ভিন্ন প্রভাবকে উপস্থাপন করেছেন; কিন্তু এর কারণকে রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেননি। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ যাদেরকে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে মান্য-গণ্য করে, যাদের কাছে কিছু একটা প্রত্যাশা করে, সেই সুশীল সমাজের অনেকেই নিছক নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাচ্ছে, সুবিধাভোগী শ্রেণির খাতায় নাম লেখাচ্ছে এবং তারা আর কোনোভাবেই ক্ষমতা-সরকার-সিস্টেমের সমালোচনা করতে পারছে না; সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও কিন্তু চলচ্চিত্রে একেবারেই অনুপস্থিত। নির্মাতা কেবল কথিত উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রের করা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কিছু ফাইল ফুটেজ দেখিয়ে দায় সেরেছেন।
শঙ্কর মুদি-এর একটি দৃশ্য
চলচ্চিত্রের শুরুতে ঝুমা’র অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে নিতে ছুটে যায় শঙ্কর-কালীরা। ঝুমাও একসময় আধুনিকতার ডাকে সাড়া দিয়ে শপিং মলের ক্রেতা বনে যান। এরপর একদম শেষটায় প্রচণ্ড বৃষ্টির রাতে ঝুমার বাবা আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঝুমা জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন কেউ আছে কি না; বাবাকে বাঁচাতে চিৎকার করে সাহায্য প্রার্থনা করেন। চলচ্চিত্রে এর শেষ পরিণতি না দেখা গেলেও অনুমান করা যায়, হয়তো কারো একটুখানি সহযোগিতার অভাবে হাসপাতালে না নিতে পেরে বাবাকে হারিয়েছেন ঝুমা। যদিও পুঁজিবাদ সবসময় চায় মানুষ যন্ত্রে পরিণত হোক--সেই উদ্দেশ্য একেবারেই সফল হয়নি তাও নয়, আবার পুরোপুরি সফল সেটাও বলা যায় না। তারপরও এই পুঁজিতান্ত্রিকতা কি মানুষকে এতোটাই একঘরে করতে পেরেছে? ৫৯ মিনিট ২১ সেকেন্ডে হিরণ্যকশিপু যেমনটা বলেন, ‘কেহই আমাকে বধ করিতে পারে না।’ যা এক অর্থে পুঁজিবাদের অমরতার কথাই বলে। অবশ্য এই সিস্টেমের ধারক ও বাহকরা মনে-প্রাণেই বিশ্বাস করে, পুঁজির এই বিস্তারকে কোনো মানুষ কিংবা দেবতা কেউই বধ করতে পারবে না! আসলেই কি তা সম্ভব? না। এখনো সেই পরিস্থিতি আসেনি। আসবে বলেও মনে হয় না। পৃথিবীতে সর্বশেষ পরম সত্য বলতে কিছুই নেই। পরিবর্তন আসবে, পরিবর্তন হবে এটাই পরম সত্য। তবে মানুষের পৃথিবীতে যেকোনো কিছুর ঊর্ধ্বে মানবতা, এও পরম সত্য। অথচ ঝুমার বাবার ‘মৃত্যু’ মানবতার পরাজয় ব্যতীত অন্য অর্থ নির্মাণ করে না। যা তৃতীয় বিশ্বের মানুষের চিরাচরিত আশা-প্রত্যাশা টিকিয়ে রাখতে পারে না। এমন উপস্থাপন পুঁজির করাল গ্রাসের সামনে নির্মাতার অসহায়ত্বই প্রকাশ করে।
চার.
চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম, যেখানে নির্মাতার হুকুম ছাড়া কোনো কিছুই হয় না। এই সুযোগে নির্মাতা যে অনেক সময় বিশেষ ব্যক্তি বা স্বার্থের বিজ্ঞাপনও প্রচার করে ‘পেশাদারিত্বের’ সঙ্গে, সেই কৌশলও বেশ ভালোই রপ্ত করেছেন অনিকেত। চলচ্চিত্রের ৩৮ মিনিট পাঁচ সেকেন্ডে বধূ বেশে সীতার পরা গয়না সম্পর্কে তার বন্ধুরা বলেন, বাবা, এ তো দেখছি সব ‘অঞ্জলি জুয়েলার্সের’ গয়না! এ সময় সীতা বলেন, “বাবা গিয়ে এগুলো ‘অঞ্জলি জুয়েলার্স’ থেকে এনেছেন।” এরপর কথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ সৌম্যের ‘জিনিসের’ প্যাকেটটি শরদ বোসের কাছে পৌঁছে দিতে যান শঙ্কর। এ সময় শঙ্কর রিকশা থেকে নেমে একজন পথচারীকে শরদের ঠিকানা জিজ্ঞেস করেন। এই সুযোগে এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ৩০ থেকে ৪৩ সেকেন্ড পর্যন্ত ক্যামেরা স্থির রেখে ‘অঞ্জলি জুয়েলার্সের’ একটি দোকান দেখানো হয়। এমনকি ‘অঞ্জলি জুয়েলার্সের’ সামনেই ওই পথচারীর কাছে ঠিকানা জেনে নেন শঙ্কর। তার মানে এটা পরিষ্কার যে, নির্মাতা খুব সচেতনভাবেই চলচ্চিত্রের গল্পে বিজ্ঞাপন প্রচার করেছেন। যেখানে অনিকেত নিজে বলেন, চলচ্চিত্রের নামে ভুলভাল চুটকি দিলে রাজনৈতিক দাবি করা যায় না; সেখানে বিশেষ কৌশলে উন্নয়নের সুবিধাটুকু ভোগকারী অঞ্জলি জুয়েলার্সের দোকানের অবস্থান পর্যন্ত দেখানোটা তার রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ছাড়ে না। যদিও এই কৌশল অনেক পুরনো।
চলচ্চিত্রের ৩১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড। পাতি নেতা ভবেন দা আসেন পাড়ায়। লোকজনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এফ ডি আই-এর (Foreign Direct Investment--ভারতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বা মুক্ত বাণিজ্য শুরু হয় ৯০-এর দশকে) বিরুদ্ধে মিছিলে যেতে হবে। একই সঙ্গে হুমকি দেন--মিছিলে না গেলে দোকান খুলবে না। এরপর ৩৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ড, ভবেন আর কার্তিকের লোকজন পাড়ায় বোমাবাজি করে, গুলি করে লাশ ফেলে বিরোধী পক্ষের। ৪৭ মিনিটে ভবেনদা’র কথিত গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কালীর প্রতিবাদে উঠে আসে এলাকার উন্নয়নের নামে ভবেনদারা নিজেদের উন্নয়ন নিয়েই ব্যস্ত। আচ্ছা, কথিত উন্নয়নের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন তা কি সাধারণ মানুষ বোঝে না, নাকি সাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে কখনো? তবে জোর করে হুমকি দিয়ে কেনো মিছিলে নিতে হয়? আর এফ ডি আই-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার সব নেতা কি কলকাতায় এমন প্রকৃতির? উত্তর যদি না হয়, তবে কেনো এমন উপস্থাপন? তাহলে কি এমন উপস্থাপনে নির্মাতার বিশেষ কোনো রাজনীতি আছে?
পাঁচ.
সাত মিনিট ৪০ সেকেন্ড; শঙ্করের দোকানে বাকিতে কেনাকাটা করেন মাস্টার। বেশি বাকি পড়ায় তাদের কথোপকথন--
শঙ্কর : ও বাবা! স্যার, আপনার তো পাঁচশো ছাড়িয়ে গেলো। পাঁচশো ৪৭ টাকা ৮০ পয়সা।
মাস্টার : (ভেচকি কেটে) হুম। মাত্র! এতেই তুই কেঁপে উঠছিস।
শঙ্কর : না। মানে ...
মাস্টার : রাজ্যের কতো ধার বলতো?
শঙ্কর : কতো?
মাস্টার : ২৬ হাজার কোটি!
শঙ্কর : তাহলে আরকি। গলায় দড়ি দিয়ে
ঝুঁলে মরতে বলো। অতো ধার শোধ দেওয়া যায় নাকি!
শঙ্কররা হয়তো নির্বোধ! তাই তারা জানে না, এই ধার আসলে তাদের ওপরই বর্তায়। তাদের শ্রমে-ঘামে-মেহনত করা কাঁধে রাষ্ট্র চাপিয়ে দেয় পাহাড়সম ঋণের বোঝা। সেই মেহনতের সুফল পায় স্বদেশীয় হর্তাকর্তারা। যাদের বিশেষ মর্যাদায় আগলে রাখে স্বয়ং রাষ্ট্র। অন্যদিকে মেহনতি-শ্রমজীবী-খেটে খাওয়া মানুষের গলায় ‘জনকল্যাণের’ শিকল বেঁধে ঘুরায়। চুষে নেওয়া শেষ হলে বাধ্য করে ধারদেনায় চলা ‘উন্নয়ন শিকলে’ ঝুলে পড়তে। যেকারণে আত্মহুতি দিতে হয় ভারতের দুই লাখ ৫০ হাজার ঋণগ্রস্ত কৃষককে। অথচ এক মুকেশ আম্বানির সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ২০ বিলিয়ন ডলারে। যা ভারতের মোট জাতীয় আয়ের চার ভাগের এক ভাগ!৭ ধারদেনায় চলা রাষ্ট্রের এই উন্নয়নযজ্ঞে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কতোটা শামিল হতে পারলো, সেই চিত্রও খেয়াল করার মতো। কারণ অতি ধনী বৃদ্ধির হারের দিক থেকে আগেই বিশ্বে প্রথম অবস্থান করে নিলেও এখন ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারে বিশ্বের বড়ো অর্থনীতির দেশগুলোকে পিছনে ফেলেছে বাংলাদেশ! এমনকি ২০১২ খ্রিস্টাব্দ থেকে পরবর্তী পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে।৮ যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চিন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড়ো অর্থনীতির দেশ পাত্তাই পায়নি! অথচ মধ্যম আয়ের দেশ দাবি করা বাংলাদেশ রূপপুরে দুইটি দুইশো মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার কাছে ৯১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে যাচ্ছে। যার সুদ বাবদই ফেরত দিতে হবে ৬৯ হাজার কোটি টাকা!৯
অন্যদিকে এক দশকের ব্যবধানে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ লাখ।১০ কিন্তু এই ঋণ/সুদের টাকা জোগাবে কে? অতিধনীরা? নিশ্চয় নয়। দিনরাত উন্নয়নের গল্প শুনতে শুনতে বন্যায়, ডেঙ্গুতে প্রাণ খোয়ানো জনগণকেই এই বিশাল ঋণ শোধরাতে হবে। আর এই উন্নয়নে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের চেয়ে একটা শ্রেণির হাতে বড়ো অংশের সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে; বেড়ে চলেছে কেবল বৈষম্য। কেনোইবা বাড়বে না, যে দেশে একদিনেই চার হাজার তিনশো ৫৮ কোটি টাকার লোকসান গুণতে হয় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের, বাজেট পাস হওয়ার (২০১৯—২০২০ অর্থবছরের) পর মাত্র ১৫ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীদের লোকসান হয় প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা১১; সেই দেশে তো বৈষম্য বাড়ারই কথা। অথচ নমস্য উন্নয়নতাত্ত্বিকদের কাছে যদি জানতে চাওয়া হয়, আর কতো দিন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে উন্নয়নের ভোগান্তি বহন করতে হবে? এর উত্তর মেলাতে তাদের কী অবস্থা হবে ভাবুন তাহলে! অবশ্য মার্কস বলেন, ‘পুঁজিবাদ উৎপাদন ও বণ্টনে এমন এক দানবীয় ভৌতিক পদ্ধতি বানিয়ে ফেলেছে যাতে করে মনে হচ্ছে যে জাদুকর তার সম্মোহনী বিদ্যা দিয়ে যে নারকীয় শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে তাকে আর সে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।’১২
এই ব্যক্তি মালিকানার যুগে শঙ্কর ও মাস্টারের কথোপকথনের মাধ্যমে রাজ্যের ২৬ হাজার কোটি ঋণ প্রসঙ্গ এবং ৩৩ মিনিট ৩০ সেকেন্ডে যৌন-উত্তেজক হিং প্রসঙ্গে শঙ্করকে মাস্টারের প্রশ্ন--‘হিং হচ্ছে যৌন উত্তেজনাবর্ধক; যে দেশে প্রতি সাড়ে তিন মিনিট অন্তর একটা করে রেপ হয়, সে দেশে রান্নায় কেনো হিং দেয় বলতো?’--এর মাধ্যমে নির্মাতা দর্শককে ভারতের ঋণ এবং ধর্ষণ পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান দেন। এছাড়া ৪৭ মিনিটে ভবেন দা’র কথিত গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কালীর প্রতিবাদ--‘বলেছিলো এলাকার উন্নয়ন হবে। এখন সব উন্নতি শালা মল-এ’--নির্মাতার রাজনৈতিক দাবির হালে খানিকটা পানি জোগায়। কারণ মাস্টারকে দিয়ে নির্মাতা কিন্তু কেবল শঙ্করকে প্রশ্ন করাননি। একই সঙ্গে প্রশ্ন রেখেছেন দর্শকের কাছেও। যা অন্তত একবার হলেও দর্শককে নাড়া দেয়। অবশ্য এভাবে বিশেষ কোনো চরিত্রের মাধ্যমে দর্শককে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার এই কৌশল-তত্ত্বের প্রবর্তক জার্মান নাট্যকার ও কবি বের্টোল্ট ব্রেখ্ট। এপিক থিয়েটারে এই তত্ত্বের শুরুটা হলেও পরবর্তী সময়ে তা চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হতে থাকে। দর্শককে কল্পিত বা বিনোদনের জগতের সঙ্গে নিষ্ক্রিয়ভাবে আবদ্ধ না করে, অসাড়ভাবে জড়িত না রেখে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সজাগ করার এই পদ্ধতিটি হলো--ডিসট্যানসিয়েশন বা এলিয়েনেশন অ্যাফেক্ট।১৩ এই পদ্ধতির অন্যতম কৌশল ‘ডিরেক্ট অডিয়েন্স অ্যাড্রেস বা দর্শকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা’র মাধ্যমে দর্শকের নিষ্ক্রিয়তার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে চিন্তাশীলতা ও সক্রিয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে। যা পুরোপুরি না হলেও সামান্য ছুঁয়ে যায় শঙ্কর মুদি।
ছয়.
সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। খানিক আগে বৃষ্টি-স্নান করেছে গড়াগাছা পাড়া। দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরছেন শঙ্কর। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১০ মিনিট। ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’, ‘সন্ত্রাসী’ সৌম্য ব্যানার্জী রাষ্ট্রীয় বাহিনীর শকুনের চোখ এড়িয়ে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। মোড়ে শঙ্করের সঙ্গে দেখা হয় সৌম্যের। তাদের কথোপকথন--
শঙ্কর : ওই সৌম্য না?
সৌম্য : হ্যাঁ, শঙ্কর দা।
শঙ্কর : কোণায় কোণায় কী করছিস? বাড়ির কী অবস্থা জানিস, মেসো মশাইয়ের কী অবস্থা? যা বাড়ি যা। থাকছিস কোথায় তুই? যা বাড়ি যা।
সৌম্য : বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে শালারা খবর পেয়ে গেছে।
শঙ্কর : কে খবর পেয়ে যায়, খবর পেলেইবা কী হয়েছে! কী এমন করেছিস তুই? রাজনীতি করা হচ্ছে! ঘোড়ার মাথা।
এরপর বাড়ি যাওয়ার পথে সৌম্যকে শেষ কথা বলেন শঙ্কর--‘এই তুই একবার সেই ফার্স্ট হয়েছিলি না কী হয়েছিলি! পড়াশোনা ডাটের মাথায় তুলে দিয়ে এখন দেশ উদ্ধার হচ্ছে, না?’ এক ঘণ্টা ১১ মিনিট ১০ সেকেন্ড। গাড়ি থেকে নামে রাষ্ট্রীয় বাহিনী। ৪৫ সেকেন্ডে নির্দেশ, ‘ফায়ার’; গুলির শব্দ, কুকুরের ঘেউ ঘেউ; সৌম্যের মায়ের চিৎকার, বাবান ... ! নিঃস্তব্ধ চারদিক। ধক করে ওঠে বুক। মনে পড়ে সার্বভৌমত্ব দাবি করা ভারত রাষ্ট্রের কিছু তিক্ত সত্য কথা। যেখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পড়াশোনায় ভালো হওয়া সত্ত্বেও নিজের ভবিষ্যৎ চিন্তা না করে সৌম্যরা কেনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়। রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন-শাসন-শোষণ-অনিয়মের বিরুদ্ধে সৌম্যরা কেনো শঙ্করের ভাষায় দেশ উদ্ধার করতে চায়।
এই যেমন স্বয়ং ভারত রাষ্ট্র মনে করে, নিরাপত্তা/উন্নয়নের পথে অভ্যন্তরীণ মাওবাদীরাই তাদের প্রধান ‘শত্রু’। আর মাওবাদীরা মনে করে, তাদের সংবিধান জনবিরোধী; ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে নিয়োজিত। স্বাভাবিকভাবেই তাই কংগ্রেস, বি জে পি কিংবা তৃণমূলের মতো দলের চোখে তারা রাষ্ট্রদ্রোহী। ফলে এই মাওবাদীরা সময় থেকে সময়ে ভারতে দানা বাঁধা বিদ্রোহ ও বিপ্লবের রক্তাক্ত যাত্রার অন্যতম অংশ। অবশ্য এই ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে পুলিশের গুলিতে দুই শিশুসহ নয় নারী নিহত হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামের গরিব, ভূমিহীন কৃষকরা শত বছরের চাপা বারুদে আগুন জ্বালিয়ে আওয়াজ তোলে--‘লাঙল যার জমি তার, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস’। গড়ে ওঠে সশস্ত্র আন্দোলন ‘নকশালবাড়ি’। যা ওই এলাকার নামেই পরিচিতি পায়। অধিকার আদায়ের এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, সৌরেন বসু, জঙ্গল সাঁওতালরা। পরবর্তী সময়ে চারুর লেখনীর মাধ্যমে সেই বিপ্লবী তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়ে কমপক্ষে ১০টি রাজ্যে। হাজার হাজার তরুণ শিক্ষা সনদ পুড়িয়ে, নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে সশস্ত্র লড়াইয়ে নেমে পড়ে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের কঠোর দমন নীতি আন্দোলনকারীদের কোণঠাসা করে ফেলে। এবং জুলাইয়ে চারু মজুমদারকে গ্রেপ্তার ও পরে তাকে পুলিশি হেফাজতে হত্যার মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনকে একেবারেই ‘নির্মূল’ করার চেষ্টা হয়। কিন্তু ঝরে যাওয়া রক্তে কি কখনো বিপ্লব তলিয়ে যায়? নকশালবাড়িও তেমনই। কঠোর দমন অভিযান চালিয়েও এই মতাদর্শ সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বৃটিশরা ভারত ছাড়লেও ঔপনিবেশিক নীতিকে মান্যতা দিয়েই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংবিধান পার্লামেন্টে গৃহীত হয়। যা রাষ্ট্রকে আদিবাসীদের বাসভূমির রক্ষাকর্তা, নিয়ন্ত্রক হিসেবে দাখিল করে; আদিবাসীদের জীবনপ্রবাহকেই চিহ্নিত করে অপরাধ হিসেবে। যার পিছনে ছিলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিলিয়ন ডলারের গোপন চুক্তি। মূল্যবান খনিজ, বক্সাইট, লৌহ আকরিক, টিন, গ্রানাইট, মার্বেল, তামা, সিলিকা, ইউরেনিয়াম, লাইমস্টোন; ইস্পাত-স্পঞ্জ-আয়রন কারখানা, অ্যালুমিনিয়াম শোধনাগার, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, বাঁধ ও খনির জন্য আদিবাসী তাড়িয়ে জঙ্গল দখল করা হয়। অরণ্য ‘রক্ষার’ নামে উৎখাত করা ভূমিপুত্রদের। এই পরিস্থিতিতে আদিবাসীদের ক্ষোভ রূপ নেয় প্রতিরোধে। একপর্যায়ে শোষিত এই মানুষেরা অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয় মার্কস-লেলিন-মাওয়ের দেখানো পথে। ভারত সরকারের কঠোর দমন নীতির মুখেও বিভিন্ন রাজ্যে পিপলস ওয়ার বা জনযুদ্ধ গ্রুপ সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মাওবাদী বিদ্রোহকে ভারতের সবচেয়ে বড়ো অভ্যন্তরীণ হুমকি চিহ্নিত করে দমন অভিযান শুরু করে ভারত রাষ্ট্র।
এই যে মাওবাদের নামে সাধারণ আদিবাসীদের ওপর রাষ্ট্রীয় তাণ্ডব, ভিন্ন মতাদর্শী সৌম্যদের ‘ক্রসফায়ারে’ নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা; এসবের কিন্তু একটা আলাদা অর্থনীতি রয়েছে। যে কারণে রাষ্ট্রের এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো ব্যাপ্তি থাকে না; কোনো দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। কেবল ভিন্ন তকমা দিয়ে আলাদা নামে/কৌশলে চলে। বাংলাদেশেও ২০০২ থেকে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাত্র ১৬ বছরে ‘ক্লিন হার্ট থেকে ক্রসফায়ারে’ দুই হাজার তিনশো ৯৩ জনকে হত্যা করা হয়।১৪ রাষ্ট্রের এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের গোপন অর্থনীতির বিষয়টি পরিষ্কার হয় গবেষক আ-আল মামুনের কথায়। তার মতে, ‘এটাকে বলা হয় লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার। আধুনিক সমাজে আর কোনো বড়ো যুদ্ধ হবে না। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে আর যুদ্ধ হবে না। যুদ্ধ হবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। বিভিন্ন গোষ্ঠী, দল, সংগঠন বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করবে--বিভিন্ন ধারণাকে কেন্দ্র করে।’১৫ তার মানে মাওবাদী-নকশালী দমন, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ থেকে চরমপন্থি নির্মূল, মাদক নির্মূল অভিযানের নামে ‘ক্রসফায়ার’, ‘গুম’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’; জঙ্গি/সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধগুলোই লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার। যা এই পুঁজিবাদী সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখারই কৌশল।
আজকের ভারতও কিন্তু গঙ্গা-স্নানে পবিত্র হওয়া কোনো রাষ্ট্র নয়। বরং গঙ্গার জলের মতো সর্বত্র বিরাজমান তার শোষণ এবং অধিকারের প্রশ্নে মানুষের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ; সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিধন অভিযান। আর মধ্যস্বত্বভোগীর মতো চড়চড় করে বাড়ছে পুঁজি। এমন একটি সঙ্কটময় পরিস্থিতিই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে শঙ্কর মুদিতে। নির্মাতা সেটা করেছেনও। কিন্তু ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের এক সৌম্যের ‘ক্রসফায়ার’ই কি এতো বড়ো একটি রাষ্ট্রীয় সঙ্কট পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে? কোনো ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিত ছাড়া বেখাপ্পাভাবে একটি মাত্র রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড কি কোনো অর্থ তৈরি করতে পারে? নির্মাতা হয়তো ভেবেছেন, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করবো অথচ রাষ্ট্রের এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড়ো অভ্যন্তরীণ সঙ্কটটা দেখাবো না, তা কি হয়! সেটা ভেবেই হয়তো তিনি টুকরো টুকরো করে মোটামুটি সবকিছু তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাই এক সৌম্যের ‘ক্রসফায়ারের’ মাধ্যমে এতো বড়ো একটা রাজনৈতিক সঙ্কট তুলে আনার চেষ্টাটা অযথাই বলা চলে। অথচ পুঁজির মোটাতাজাকরণের প্রভাবে একটা শান্তিময়-পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ পাড়া কীভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; এই সিস্টেম কতোটা মানুষের কিংবা মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজে প্রভাব ফেলে; সেই গল্প বলতে এক শঙ্কর মুদিই যথেষ্ট ছিলো। সেই সঙ্গে চলচ্চিত্রটিও তার দাবির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতো।
সাত.
ঝুম বৃষ্টি। মাইকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের জনসভার ডাক। সৌম্যের বৃদ্ধ মা এসেছেন শঙ্করের দোকানে। বাজার নিতে। ঘর ও সৌম্যের বাবার চিন্তায় বৃষ্টিতে ভিজেই ফিরবেন। শঙ্কর যান ছাতা মাথায় আধভেজা হয়ে তাকে পৌঁছে দিতে। ১৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। সৌম্যের বাবার আর্তনাদ, ‘কে? বাবান এলি? ... এতো পচা গন্ধ কীসের? কী পচছে? কতোদিন থেকে বলছি। ... পচছে, সব পচছে। পচে যাচ্ছে।’ দেয়ালে টাঙানো লেলিনের স্থিরচিত্র। ‘বাবান! আমি যেনো ওর গলা শুনতে পেলাম। ... ওগো কী পচছে? একটু বাবানকে দেখতে বলো না। কী গন্ধ, পচা গন্ধ!’ দেয়ালে ঠিক লেলিনের স্থানে তখন সৌম্যর ছবি; ফুলের মালা জড়ানো। এক ঘণ্টা ২৩ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। ছেলে চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবার এই হাহাকার। অনিকেতের কী চমৎকার সিম্বলিক ব্যবহার! যা না বলা অনেক কথাই বলে দেয়। উন্নয়নের ধুয়া তুলে মেহনতি মানুষের মৃত শ্রমকে পুঁজি করে যারা উন্নয়নের চরকা ঘোরায়; সেই কথিত উন্নয়ন তাত্ত্বিক/কাণ্ডারীদের নাকে এই পচা গন্ধ খুব সহজে পৌঁছে না। তারা স্বীকার করুক আর না করুক, এই গন্ধ কোনো সাধারণ গন্ধ নয়। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে পুঁজিবাদী সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমের সাহায্যে জায়েজ করে নিয়ে, অভিযান-অপারেশনের নামে, নির্বিচারে যাদের হত্যা করা হয়; তাদের শরীরের ঘাম-রক্তে স্নান করা এই সিস্টেমের তীব্র গন্ধ উন্নয়নবাদী/তাত্ত্বিকদের এতো চটজলদি স্বীকার করার নয়। তবে এই গন্ধ দমিয়ে রাখার নয়। টুকরো টুকরো প্রতিবাদ জড়ো হয়ে আওয়াজ তুলবেই; পরিবর্তন আসবেই। রাষ্ট্রের সব দুর্নীতি-অন্যায়-শোষণ-হত্যাকাণ্ডের এই সিস্টেম খুব বেশিদিন জোর করে টিকিয়ে রাখা যাবে না। এই পচা গন্ধ যেনো তারই ইঙ্গিত দেয়।
আট.
নানা মুনীর নানা মত-পথ, সব এসে মিলে যায় চলচ্চিত্রে। এক চলচ্চিত্রই তাই কখনো নিছক বিনোদন বা সময় কাটানোর মাধ্যম; কখনো শোষণ মুক্তির হাতিয়ার, শিল্পমাধ্যম। যে শিল্প জীবনের কথা বলে মানুষের জন্য। যে শিল্প মানুষকে শোষণ করে চলা এই সিস্টেম সম্পর্কে জানান দেয়। তাইতো একটা বড়ো অংশের কাছে জীবনের জটিল হিসাবনিকেশের ধারাপাত এই চলচ্চিত্রই। আর এই মাধ্যমের স্রষ্টাজন আপন মহিমায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় ধারাপাতের নিয়মকানুন। গতানুগতিক চলচ্চিত্রের বাইরে কলকাতার যে নির্মাতারা এই দায়িত্ব পালন করেছে, ধারাবাহিকভাবে তাদের কথা বললে সামনে আসে বিমল-সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের নাম। পরবর্তী সময়ে একই পথে হেঁটেছে বুদ্ধদেব-গৌতম-অপর্ণা-ঋতুপর্ণ। নতুন অনেক নির্মাতা অবশ্য সেই ধারাবাহিকতা এখনো বজায় রেখে চলেছে। সময়ের পালাবদলে অনেকে আবার চলচ্চিত্রে নতুন কিছু ধারার কথাও বলছে--প্যারালাল ফিল্ম, বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র, আর্ট ফিল্ম, রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। এসব নিয়ে নানাধরনের কথাও প্রচলিত রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক টালিগঞ্জের অনেক চলচ্চিত্রই জীবনের অঙ্ক নতুন করে কষতে বাধ্য করছে। যেমন, সন্দীপন রায়ের একলা আকাশ (২০১৩)-এ খ্যাতি-যশ-অর্থ-ক্ষমতার পিছনে ছুটে চলা অরিজিৎ ও দিশার ফিরে আসা, জীবনের কাছে জীবনের মূল্যহীন হয়ে ওঠা; অরিন্দম শীলের আবর্ততে (২০১৩) জীবনের খোঁজে ছুটে চলা, একপর্যায়ে হোঁচট খেয়ে ফিরে আসা; কমলেশের উড়োচিঠিতে (২০১১) জীবনের নানা বাঁক, টানাপড়েন ও পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা; এছাড়া বিসর্জন (২০১৭) কিংবা বিজয়া (২০১৯), বেডরুম (২০১২), প্রাক্তন (২০১৬), বেলাশেষে (২০১৫), পিউপা (২০১৮), ময়ুরাক্ষী (২০১৭), ক্রিসক্রস (২০১৮) ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে গল্প বললেও দিনশেষে একই বার্তা দেয়। জীবন নিয়ে টুকরো টুকরো প্রশ্ন তোলে। প্রশ্ন তোলে জীবনের পাওয়া না পাওয়ার। তুলে ধরে জীবনের সঙ্গে জীবনের লুকোচুরি খেলা, জেতার ভান করে হেরে যাওয়ার।
অন্যদিকে নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস অবলম্বনে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে কাঙ্গাল মালসাট নির্মাণ করেন সুমন মুখোপাধ্যায়। মানব সমাজের মুক্তির বার্তা দিয়ে শুরু হওয়া শতাব্দীর শেষটায় এসে বাজার দখলের তুঙ্গস্পর্শী লড়াই এবং রুশ বিপ্লব পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিক-আদর্শের স্খলন ও ভোগবাদের বিস্তারকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন-ক্ষমতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রটিতে। আবার মালায়লাম চলচ্চিত্র কোর্ট (২০১৪)-এ নির্মাতা চৈতন্য তামহেনা বিচার-প্রক্রিয়া দেখানোর ছলে তুলে ধরেছেন রাষ্ট্র ও তার আইনের লুকোচুরি খেলার নানাবিধ কৌশল। নাগরিকের ‘মঙ্গল কামনায়’ ব্যস্ত রাষ্ট্র কীভাবে সেই আইন ব্যবহার করে নানা কার্যক্রমকে বৈধতা দেয়। এদিকে এক আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪) পুঁজি বাজারের সঙ্কটে মানুষ কতোটা অসহায়, মানুষকে কতোটা অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করতে হয়, সেটাই মনে করিয়ে দেয়। কোনো রকম শব্দ ছাড়া চলচ্চিত্রিক ভাষা-কৌশল-উপস্থাপন আর রাজনৈতিক ভাষা, যাই বলা হোক না কেনো, এটি অনন্য সাধারণ এক শিল্পকর্ম। কিংবা দেশভাগের কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ‘পালিয়ে’ যাওয়া মানুষের বর্তমান অবস্থা এবং বাস্তুহারা এই মানুষগুলোর সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ হাসিলে বন্ধু বন্ধু খেলার সংবাদ জানানো হয় স্থানীয় সংবাদ-এ (২০০৯)।
সবকিছু ছাপিয়ে চলচ্চিত্রগুলো বাস্তবিক অর্থেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সেদিক থেকে অনিকেতের শঙ্কর মুদিও পিছিয়ে নেই। এটা ঠিক যে, কোনো চলচ্চিত্রই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। শঙ্কর মুদিও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে চলচ্চিত্রটির অনন্যতার জায়গা হলো, এটি সমাজ-রাষ্ট্রের চারপাশটা, উন্নয়নের উৎসবে অস্থির এই সময়টা, খুব সহজ ভাষায় জানার বোঝার সুযোগ করে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, এই সিস্টেমে বেঁচে থাকার আর কোনো পথ খোলা নেই। নেই কোনো আলোর দিশা। শেষ আলোটুকুও দমকা হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে কোনোরকমে টিকে আছে। যেকোনো সময় দপ করে নিভে যেতে পারে। শঙ্করের মতো হয়তো অনেককেই হারতে হবে; হারাতে হবে মরতে হবে; না হয় বেঁচে থেকেও ‘জিন্দামরা’ হয়ে থাকতে হবে। উত্তরাধুনিক যুগের মানুষের এটা বুঝতে পারা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নয়.
শঙ্কর মুদি একটি পরিবর্তনের গল্প বলে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। যার ভিত্তি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। এই পরিবর্তন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যখন মাথা উঁচু করে দেখা প্রেক্ষাগৃহ সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তবে গড়ে উঠেছে/উঠছে সিনেপ্লেক্স, আইনক্স। শপিং মলগুলো একদিকে কেনাকাটার অমায়িক পরিবেশের সঙ্গে নানারকম পণ্যের সমাহার ঘটিয়েছে, মানুষের চাহিদা বদলে দিয়ে নতুন করে যোগ করেছে ক্রেতা টানার কৌশল; অন্যদিকে নাকের ডগায় বসে চলচ্চিত্র দেখার ব্যবস্থাও করেছে। সেটা মলের উটকো গন্ধযুক্ত, পুঁজির প্রতিপত্তি সামগ্রী কিনতে কিনতে একটু বিনোদনের জন্য হোক কিংবা অন্য কারণে; পপকর্ন খাওয়া আর চলচ্চিত্র দেখা কিন্তু থেমে নেই। শঙ্কর মুদির এই উন্নয়ন-বিরোধিতা উন্নয়নের পিঠে বসে সুড়সুড়ি দেওয়া হলেও তা মানুষের যাপিত জীবন-রাজনীতির কথাই বলে। তবে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু ছোটো হলেও নির্মাতার উপস্থাপনের গুণেই তা হয়ে ওঠে শিল্পকর্ম। নির্মাণ কৌশলই এনে দেয় হৃদয় ছোঁয়া অনুভূতি। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তাই মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করতে, মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ জ্ঞান তৈরি করতে প্রয়োজন সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার যথার্থ প্রয়োগ।
সত্যজিৎ যেমন তীব্র ভাষায় না করলেও এক জন অরণ্যতেই শান্ত ও সংযতভাবে রাজনৈতিক সমালোচনা করেছেন, অব্যাহত দুর্নীতিতে ভরা অবক্ষয়গ্রস্ত অন্ধকার সমাজকে নির্দয়ভাবে তুলে এনেছেন। সেই তুলনায় অবশ্য ২১ শতকের ভারত রাষ্ট্রে নির্মিত শঙ্কর মুদিতে কৌশলে নির্মাতার বিজ্ঞাপন প্রচার, নির্মাণে অমনোযোগিতা এবং কার্যকর চিন্তার অভাবেই চলচ্চিত্রটি মূল উদ্দেশ্য থেকে খানিকটা ছিটকে গেছে। দিনশেষে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হয়েও হয়ে ওঠেনি শঙ্কর মুদি। জীবন ও সমাজের পারিপার্শ্বিকতায় বাস্তব অবস্থাকে তুলে ধরতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন নির্মাতা। অথচ কথিত উন্নয়নের যুগে অসম পুঁজির বিস্তার, একপাক্ষিক উন্নয়ন, শোষণ-মৃতশ্রম বেড়ে যাওয়া, সবমিলিয়ে সামাজিক সম্পর্ক বুননের যে গল্পটা নির্মাতা বলতে চেয়েছেন; সেখানে শেষ করলেও পুঁজির অসম স্ফুরণে পাড়া সংস্কৃতির বিরূপ পরিবর্তন-চিত্রের এক সার্থক বয়ান হতে পারতো শংকর মুদি। ক্রমশ যেখানে মানবিক আবেদনগুলো লীন হয়ে পড়ছে। যেখানে শ্রমজীবী নারীর দেহকেও বাজারের পণ্যে রূপ দিচ্ছে/দিতে বাধ্য করছে এই সিস্টেম। সেখানে শুরুতেই কলকাতা পুলিশকে ধন্যবাদ জানানো নির্মাতা শেষমেশ ব্যর্থতার পাল্লাটাই ভারী করেছেন। তবে অন্যসব বাদ দিয়ে শঙ্কর মুদিতে পাড়া সংস্কৃতির যে গল্পটা নির্মাতা বলেছেন, তাতে করে তার হাত ধরে সামনের দিনে অনেক ভালো কাজ প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।
লেখক : মো. হারুন-অর-রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ডট রিপোর্ট-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।
harunmcj25@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100005362547107
তথ্যসূত্র
১. খলিল, ইব্রাহীম ও নাজমুল রানা; ‘রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে কাজী হায়াৎ, আইজেনস্টাইন-চ্যাপলিনের ব্যর্থ উত্তরসূরি’; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; বর্ষ ৩, সংখ্যা ৬, জানুয়ারি ২০১৪, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃ. ১২১—১২২।
2. shorturl.at/beuCW; retrieved on: 24.08.2019
৩. রোবের্জ, গাস্তঁ (১৯৮৪ : ১১৫); নতুন সিনেমার সন্ধানে; অনুবাদ : সুস্মিতা ভট্টাচার্য; বাণীশিল্প, কলকাতা।
৪. জুনাইদ, নাদির (২০১৪); দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র : বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী; জনান্তিক, ঢাকা।
5. shorturl.at/yENX4; retrieved on: 30.08.2019
6. shorturl.at/yENX4; retrieved on: 05.09.2019
৭. রায়, অরুন্ধতী (২০১৩ : ৮); পুঁজিবাদ : এক ভৌতিক কাহিনী; অনুবাদক : মাধব বন্দ্যোপাধ্যায়; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।
8. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1557201; retrieved on: 07.09.2019
9.https://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2016/08/23/396743; retrieved on: 10.09.2019
10. shorturl.at/bgAPR; retrieved on: 12.09.2019
11. shorturl.at/jr168; retrieved on: 12.09.2019
১২. প্রাগুক্ত, রায়; (২০১৩ : ৮)।
১৩. জুনাইদ, নাদির (২০১৪ : ১০—১১); ‘ইন্টারভিউ : বামপন্থী বিপ্লবের পক্ষে মৃণাল সেনের ব্রেখ্টীয় ছবি’; দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র, বক্তব্য ও নির্মাণশৈলী; জনান্তিক, ঢাকা।
14. shorturl.at/qFU15; retrieved on: 24.03.2019
১৫. মামুন, আ-আল (২০১৯ : ২৩); রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও জঙ্গিবাদ; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন