প্রদীপ দাস
প্রকাশিত ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
রক্ত-মাংস-প্রকৃতি খেকোদের জয়গানে ‘অন্তর্যাত্রা’
প্রদীপ দাস

একটি সত্য ঘটনা ও কিছু প্রশ্ন
অপরাধবোধ থেকে আত্মজীবনীমূলক ‘কনফেশন অব অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান’ বইটি লিখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জন পারকিনসন। তার এই অপরাধবোধের জন্ম নিয়েছিলো কর্মজীবন থেকে, তার কাজ থেকে। পারকিনসন বিয়ে করেছিলেন ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে। স্ত্রী অ্যানের বাবার এক বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সিতে (এন এস এ) চাকরি করতেন। এই ব্যক্তির সুপারিশে পারকিনসনের চাকরি হয় এন এস এ’তে। চাকরিতে যোগ দেওয়ার আগ মুহূর্তে দক্ষিণ আমেরিকার পর্বতাঞ্চলে পিস কোর নামক একটি প্রতিষ্ঠান সেচ্ছাসেবক চাচ্ছিলো। সেখানে পারকিনসন কাজের আগ্রহ দেখালে, তাকে বাধা না দিয়ে বরং উৎসাহ দেখিয়ে চাকরিদাতা ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, এরপর অ্যামাজন হবে মূল মঞ্চ। ওই অঞ্চলে ভালো এজেন্টের দরকার হবে তাদের। তাই তাকে স্প্যানিশ ভাষা শেখা এবং ওই অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে মেশার পরামর্শ দিয়ে সেই ব্যক্তি বলেন, পরবর্তী সময়ে তার চাকরি হয়তো সরকারি নয়, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে হতে পারে। হয়েছিলোও তাই, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে চার্লস থমাস মেইন নামে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে যোগ দেন পারকিনসন।১ বইটির তথ্য মতে, এই প্রতিষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা, অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা, প্রকৌশলীরা কর্মরত ছিলো। যদিও দৃশ্যত তাদের কোনো কাজ ছিলো না। কোম্পানিটি এমনভাবে গড়ে উঠেছিলো যে, সেখানে মার্কিন সরকার, সেনাবাহিনী, ব্যবসায়ী একাকার হয়ে যেতো। ঠিক বোঝার উপায় ছিলো না, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি, বেসরকারি, নাকি যৌথভাবে চলে।
মেইন কোম্পানিটিতে জন পারকিনসনের কাজ ছিলো প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিরাট অঙ্কের আন্তর্জাতিক ঋণগুলোর যৌক্তিকতা দেখানো। সারাদেশ বিদ্যুতায়নের মতো বড়ো বড়ো প্রকল্প বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়ে বাস্তবায়ন করলে দেশটির বহুগুণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, এই নিশ্চয়তা দেওয়া। প্রয়োজনে ভুয়া তথ্য-উপাত্তও ব্যবহার করে ব্যাপক প্রবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরতেন পারকিনসন। এভাবে কোনো দেশকে বড়ো অঙ্কের ঋণ চাপিয়ে দেওয়া ছিলো পারকিনসনের দায়িত্ব। ঋণ নেওয়ার বিষয়টি বোঝাতে ব্যর্থ হলে ঘুষ কিংবা নারী দিয়ে, তাতেও কাজ নাহলে হত্যা করে, এরপরও ব্যর্থ হলে মার্কিন সেনা নামিয়ে দেওয়া হতো দেশটিতে। সেই সঙ্গে মেইনের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছেই ওই ঋণের অর্থ যেনো ফিরে আসে এবং পাওনা পরিশোধের পর ঋণগ্রহীতা দেশ যেনো দেউলিয়া হয় সেই ব্যবস্থা করা এবং যাতে অনন্তকাল ঋণদাতার কাছে জিম্মি থাকে। এর সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দিই। ঋণ শোধ করতে না পারায় কলম্বো তাদের হাম্বানটোটা বন্দরটি তুলে দিয়েছে চিন-এর হাতে। যেখানে ভারত-বিরোধী ঘাঁটি নির্মাণের প্রস্তুতি দীর্ঘদিন ধরেই নিচ্ছে চিন।২ এভাবে পশ্চিমাদের পক্ষ নিয়ে সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠাসহ জাতিসংঘ অথবা কোনো আন্তর্জাতিক ভোটাভুটি, তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ প্রয়োজনের সময় ওইসব দেশকে সহজ টার্গেটে পরিণত করা ছিলো পারকিনসনের কাজ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে এই কোম্পানির পক্ষ নিয়ে বড়ো অঙ্কের ঋণ দিতে সফল হয়েছিলেন পারকিনসন। বিনিময়ে ওসব দেশ থেকে কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। সেই সঙ্গে পারকিনসন অল্প সময়ে হয়ে উঠেছিলেন কোটিপতি, করেছেন বিলাসী জীবনযাপন।
কোটিপতি পারকিনসন ও কোম্পানি হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করলেও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উন্নয়নশীল অনেক দেশের মানুষের তিন বেলা খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে, দরিদ্রতা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ লুট হয়ে গেছে, পাহাড়-বনভূমি উজাড় হয়ে গেছে, আদিবাসীরা গৃহহীন হয়েছে, অনেকে নির্যাতন-হত্যার শিকার হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে নিরুপায় মানুষের চোখে ঘৃণা দেখেছেন পারকিনসন। যতো উপরে উঠেছেন, ততো তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নগ্নতা, নৃশংসতা দেখেছেন। চাকরি থাকা অবস্থাতেই সাধারণ মানুষের ঘৃণা ও নিজের অপরাধমূলক কাজের জন্য পারকিনসন আত্ম-পীড়নে ভুগতেন। কিন্তু তিনি ভোগবিলাসের জীবন, টাকাপয়সা, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাকে পাশ কাটিয়ে এখান থেকে সরে আসতে পারেননি। নিজেকে কিছুটা হালকা করতে, আত্ম-পীড়নের একপর্যায়ে পারকিনসন সিদ্ধান্ত নেন, কোম্পানির যতো অপকর্ম, নৃশংসতা অবসরে যাওয়ার পর তা বই আকারে প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেবেন। করেছেনও তাই, সেটারই ফল ‘কনফেশন অব অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান’ গ্রন্থটি।
চার্লস থমাস মেইন-এর মতোই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। যারা ভারতবর্ষকে দুইশো বছর দখল করে শোষণ, নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট চালিয়েছে। শত বঞ্চনা, আন্দোলন-সংগ্রাম, আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ভারতবাসী এই ভূমি থেকে বৃটিশদের বিতাড়িত করেছে। আদৌ তারা বিতাড়িত হয়েছে কি না কিংবা যে স্বাধীনতা বা মুক্তির জন্য ছিলো সেই ত্যাগ-সংগ্রাম, তা এই অঞ্চলের মানুষ পেয়েছে কি না, তা বর্তমান অধিবাসীরাই ভালো বলতে পারবে। তবে এখনো সেই দখলদার বৃটিশ ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির লুটপাট-অত্যাচার-শাসনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা অবিরত চলেছে এই বাংলায়। তাও আবার যারা চিন্তা-চেতনায় সমাজের প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে বিবেচিত, তারাই সেই কাজ করছে শিল্প ও সাহিত্যে। এ কাজের জন্য মাধ্যম হিসেবে কেউ কেউ বেছে নিয়েছে চলচ্চিত্রকে। বৃটিশ ও তাদের সেই কোম্পানির শাসন-শোষণকে বৈধতা দেওয়া বাংলাদেশি একটি চলচ্চিত্রের নাম অন্তর্যাত্রা। প্রখ্যাত নির্মাতা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ এই চলচ্চিত্রের নির্মাতা।
যে গল্প অন্তর্যাত্রায়
নাট্যকর্মী ছিলেন শিরিন। ভালো গাইতেনও। রফিকের প্রগতিশীল মানসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ভালোবেসে ছিলেন শিরিন। একপর্যায়ে রফিককে বিয়েও করেন তিনি। শিরিনের দাবি, রফিকের এই প্রগতিশীলতা কেবল তাকে পাওয়ার জন্য। আর তাই, বিয়ের পর তার গ্রুপ থিয়েটারে যাওয়া বন্ধ করে দেন রফিক। কয়েক বছর পর শিরিনের মুখ দিয়ে আর গানও বের হতো না। তার নিজের আলাদা কোনো জীবন নেই। এই রাগে, দুঃখে, ক্ষোভে হঠাৎ রফিককে ছেড়ে ছোট্ট সন্তান সোহেলকে নিয়ে শিরিন লন্ডনে পাড়ি জমান। বাবার অভাব সোহেলকে টের পেতে দেননি শিরিন। নিজেও আর বিয়ে করেননি; মা মারা গেলেও দেশে ফেরা হয়নি শিরিনের। তবে রফিক পরবর্তী সময়ে তার ছাত্রী সালমাকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের কোলজুড়ে আসে রিনি। হঠাৎ একদিন রফিক হার্ট অ্যাটাক করে বিদায় নেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে সোহেলকে নিয়ে দেশে আসেন শিরিন।
অন্তর্যাত্রা- এর একটি দৃশ্য
ততোদিনে সোহেল বেশ বড়ো হয়ে গেছে; বুঝতে শিখেছে। সিলেটে বাবার কুলখানিতে গিয়ে সোহেল দেখা পায় দাদার। বৃটিশ আমলে দাদা ইংরেজদের চা বাগানের ম্যানেজার ছিলেন। অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি তিনি। দাদার ব্যক্তিত্ব, আচার-আচরণ, চিন্তা, মানসিকতায় মুগ্ধ হয় পাশ্চাত্যে বেড়ে ওঠা সোহেল। দাদা, চাচা-চাচিসহ পরিবারের সান্নিধ্যে আসার পর সোহেল প্রথমবারের মতো তার বাবা রফিককে অনুভব করতে থাকে। একপর্যায়ে সোহেলের রাগ হয় এই ভেবে যে, তার বাবা এতো ভালো একজন বাবা পেয়েছিলেন, অথচ সে বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার বাবা কেনো তার (সোহেল) খোঁজ নেননি, তার মা কেনো তাকে তার বাবার কাছে ফিরতে দেননি--এসব ভেবে সোহেলের রাগ হয়। শিরিন তার জায়গা থেকে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন। সোহেল বুঝতে পারেন তার মায়ের বাস্তবতা। দাদা স্বপ্ন দেখতেন, সোহেল একদিন দেশে ফিরে আসবে। বাবার কুলখানি থেকে ফেরার পথে সোহেল অনুভব করেন, এ দেশে তাকে ফিরতে হবে।
অন্তর্যাত্রার সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠা
রফিকের কুলখানিতে প্রথমবারের মতো সোহেল-রিনি একই সময়ে সিলেটে দাদার বাড়িতে আসে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চা বাগানের ভিতর বিশাল জায়গা নিয়ে সোহেলের দাদার বাড়ি। কাছাকাছি অন্য কোনো ঘরবাড়ি নেই। তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন দাদা। বাকি জীবনটা তার দাদা স্বাচ্ছন্দ্যে কাটিয়ে দিতে তো পারবেনই, সেই সঙ্গে সম্পদ নষ্ট না করলে তার নাতিপুতিরাও ভালোভাবে জীবন পার করে যেতে পারবে। বৃটিশ আমলে ইংরেজদের একটি চা বাগানের ব্যবস্থাপক ছিলেন তাদের দাদা।
অন্তর্যাত্রায় দাদা একজন উচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ব্যক্তি। তিনি শুধু আর্থিকভাবে স্বচ্ছলই নন, একজন ভালো বাবা, ভালো দাদা, আবার ভালো শ্বশুরও। নাতি-নাতনিরা তাকে ভালোবাসে, ছেলের বউয়েরা সম্মান করে, বাবার বিরুদ্ধে কারোরই কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় না। তিনি সবার প্রতি যত্নশীল। পরিবারের সবার নির্ভরশীলতার জায়গায়ও তিনি; মানবিক, উদারও। তাইতো ছেলে রফিককে মাফ করে দেওয়ার জন্য প্রথম স্ত্রী শিরিনের কাছে অনুরোধ জানান তিনি। বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কাছে তার অবস্থান কোথায়, চলচ্চিত্রের কিছু কথোপকথনে টের পাওয়া যায়। এক ঘণ্টা ১২ মিনিটে সোহেলের এক প্রশ্নের জবাবে শিরিন বলেন, ‘এই মানুষডারে (সোহেলের দাদা) আমি অন্তর দিয়া ভক্তি করি। আমার খুব ইচ্ছা আছিলো, একদিন দাদার লগে তর পরিচয় অইবো।’ ৫৮ মিনিটে বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সোহেল লেখেন, ‘আব্বা, তোমাকে আমি অনুভব করছি। তোমাকে আমি প্রথম অনুভব করছি, তাও আবার তুমি চলে যাওয়ার পর। আমি জানি না, মা কেনো তোমার কাছে আসতে দেয়নি। কিন্তু তুমিও তো আমার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করোনি। তুমি একজন ভালো বাবা পেয়েছিলে। কিন্তু আমাকে কেনো এমন ছায়া থেকে বঞ্চিত করলে?’
অন্তর্যাত্রায় শিরিন, সোহেলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও নায়ক (Protagonist) মূলত দাদা। চলচ্চিত্রের নায়ক চরিত্র মানুষকে প্রভাবিত করে। মানুষ ‘নায়ক’ বা ‘সৎ’ চরিত্রকে আদর্শ, শুভ মনে করে তার চিন্তা-চেতনাকে ধারণের চেষ্টা করে। ব্যক্তিজীবনে সেসবের প্রয়োগও ঘটে। অথচ অন্তর্যাত্রায় নায়ক চরিত্রটাই বিভ্রান্তির, ভয়ঙ্কর; কখনো পুরো বিপরীত। ‘মহান নায়ক’ মানুষ যখন আধিপত্যকারী, খুনি, নির্যাতনকারী, শোষকদের পক্ষে অবস্থান নেন সুকৌশলে, তখন সাধারণের পক্ষে প্রকৃত বাস্তবতা অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ে। একটা অংশ তখন নায়কের মিথ্যাকেই সত্য বলে জ্ঞান করে।
এই ‘আদর্শ’, ‘শুভ’ নায়ক চরিত্রের বিভ্রান্তি, ভয়ঙ্কর রূপ বেরিয়ে আসে, যখন রফিকের কবর জিয়ারত শেষে সোহেলের সঙ্গে হাঁটার একপর্যায়ে দাদা বলেন, ‘আমাদের বাগানের মালিক আছিলেন মি. স্টুয়ার্ড। যে কড়া ডিসিপ্লিন আছিলো তার! ইয়া মাবুদ! আর আসলেও বৃটিশের অ্যাট লিস্ট ও-একটা গুণের প্রশংসা তো করা উচিত।’ দাদা আসলে কার, কীসের প্রশংসা করলেন, একটু ভাবা প্রয়োজন।
দাদা বৃটিশদের চা বাগানের ম্যানেজারি করে বাড়ি-গাড়ি-সম্পত্তি করেছেন। দাদার মতো হাতেগোনা কয়েকজন বৃটিশদের সঙ্গে কাজ করে এমন সম্পত্তির মালিক হয়েছে। কিন্তু বাকিদের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে, স্থানীয় যারা চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে চলেছে কিংবা যাদেরকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখিয়ে বৃটিশ আমলে চা বাগানে কাজের জন্য নিয়ে এসেছিলো বৃটিশরা? দুই দশক আগেও এই চা-শ্রমিকদের সারাদিনের পারিশ্রমিকের আর্থিক মূল্য ছিলো মাত্র ২২ টাকা। এখনো তাদের ভাগ্যে ১০২ টাকার বেশি মজুরি জোটে না।৩ কখনো এর চেয়েও কম। তাহলে বৃটিশ আমলে তাদের বেতন কতো ছিলো, তা সহজেই অনুমেয়। অর্থাৎ এ থেকে খুব সহজেই বোঝা যায়, তাদের যে আয়, তাতে বর্তমান সময়ে তো বটেই, শত বছর ধরে তারা নিয়মিত পেট ভরে খেতে পারেনি। বছরের পর বছর তারা ভুগছে অপুষ্টিতে। তারা প্রয়োজনীয় পোশাক, চিকিৎসা, শিক্ষা, এমনকি থাকার নিরাপদ ঘরও পায় না।
সদা আধা-পেট খেয়ে থাকা, অপুষ্টিতে ভোগা এই চা-শ্রমিকদের ওপর ‘কড়া ডিসিপ্লিন’ প্রয়োগ করেই তাদের দিয়ে অধিক পরিশ্রম করিয়ে প্রচুর মুনাফা করেছে বৃটিশরা। তাছাড়া কড়া ডিসিপ্লিন/আইন/নিয়ম কর্তারা তৈরি করে তার প্রজাদের/অধস্তনদের/কর্মীদের ওপর প্রয়োগের জন্য। খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কৃষকের বড়ো ক্ষতি হয়ে গেলেও এই কড়া ডিসিপ্লিনের বদৌলতেই বৃটিশরা খাজনা আদায় করেছে; দিতে না পারলে অত্যাচার, নির্যাতন করেছে।
এই কড়া ডিসিপ্লিন আরো কী দিয়েছে, তা আরেকটু বিস্তর বলার প্রয়োজন বোধ করছি। হয়তো সকালে রান্নার যোগাড় না থাকায় সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে চা-শ্রমিক স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে কিংবা স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করেছে। ঝগড়ায় কাজে যেতে হয়তো পাঁচ মিনিট দেরি হয়েছে। ফলে সেই দিন যে ক’পয়সা জুটতো, পাঁচ মিনিট দেরি করায় সেই ন্যূন পয়সাও হয়তো জোটেনি সেই চা শ্রমিকের। খাবারের যোগাড় না-থাকা চা শ্রমিককে ফের না-খেয়ে থাকার যোগাড় করেছে এই কড়া ডিসিপ্লিন। হয়তো দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগলেও এক পয়সা বেতন বেশি তো পায়ইনি, ছুটিও মেলেনি তাদের। অন্নের সংস্থানে অসুখ-বিসুখ নিয়েও চা শ্রমিকদের কাজ করতে হয়েছে। চা শ্রমিকরা খাওয়া, পরা, শিক্ষা, চিকিৎসা না পেলেও কড়া ব্যবস্থাপনার জন্য দাদা বড়ো আকারের মাইনে আর বৃটিশরা প্রচুর মুনাফা পেয়েছে চা বাগান থেকে। এসবই ছিলো কড়া ডিসিপ্লিনের ফল। আর বৃটিশদের সেই ‘কড়া ডিসিপ্লিনের’ প্রশংসায় মত্ত অন্তর্যাত্রা!
কড়া ডিসিপ্লিনের কথার পর হাঁটতে হাঁটতে সোহেলকে তার দাদা আরো বলেন, ‘আই উড লাইক টু সি আ স্পেশাল প্লেস। দিস ইজ আ ওল্ড বৃটিশ সিমেটেরি। ইংরেজরা তো কয়েক শ বছর আগে এই দেশত আইছিলো। কেউ আইছিলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরি লইয়া। আবার কেউ আসছিলো প্লান্টার্স হিসেবে। দে কেম হেয়ার ফর মেইক দেয়ার ফরচুনস। লুক অ্যাট দিস ওয়ান। (এখানে) কারো বয়সই ৪০/৪৫ বৎসরের উপরে নয়। ভাইগ্যবান যারা তারা ফির গেছে নিজর দেশ-অ। খালি দুর্ভাগা কিছু ইয়ংম্যান আর বাচ্চারা আটকা গেছন আঙর দেশ-অ।’
দাদার এই কথার ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে বলে নিচ্ছি, কারো অস্বাভাবিক মৃত্যু প্রত্যাশিত নয়। বৃটিশ ও তাদের তরুণদের ‘ত্যাগের’ কথা বর্ণনা করলেও অন্তর্যাত্রায় দাদা এড়িয়ে যান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও বৃটিশ সরকার যে এই উপমহাদেশের শত শত মানুষকে হত্যা করেছে, সেই কথা। বৃটিশদের কবরস্থান দাদার কাছে ‘স্পেশাল প্লেস’ হলেও ভারতীয়দের মৃত্যু গুরুত্ব পায় না। দাদার মুখে বৃটিশ তরুণদের ভাগ্যের সন্ধানে ভারতবর্ষে আসার কথা বেরোলেও একটিবারের জন্যও বেরোয়নি চা-শ্রমিকদের অর্ধাহারে-অনাহারে রেখে কোম্পানির অমানবিকভাবে বছরের পর বছর খাটিয়ে নেওয়ার কথা। একটিবারের জন্য বেরোয়নি ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চা-শ্রমিকরাও বৃটিশদের আমন্ত্রণে সিলেটাঞ্চলে এসে শত বছরেও তিন বেলা খাওয়ার নিশ্চয়তাটুকু পায়নি। একটিবারের জন্য বেরোয়নি দরিদ্র ভারতবাসীর বুকে পাড়া দিয়ে টাকা আদায়ের কথা। তাছাড়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন-শোষণের সহযোগী/দোসর হিসেবে এসেছিলো এই বৃটিশ তরুণরা। কোম্পানির এমন তরুণদের হাতেই বিনা-দোষে প্রাণ গেছে শত ভারতীয়র।
বৃটিশদের ত্যাগের কথা বললেও ভারতীয়দের ত্যাগের, নির্যাতিত হওয়ার বিষয়ে কিছু বলার কারণ বুঝতে হ্যারি পটার সিরিজের মাধ্যমে মাত্র নয় বছর বয়সে তারকাখ্যাতি পাওয়া বৃটিশ অভিনয়শিল্পী এমা ওয়াটসনের ভোগ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। যেখানে এমা বলেছেন,
... বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ঢুকেও আমি কিছু কিছু জায়গায় হোঁচট খেয়েছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকের সময় ইতিহাস পড়তে গিয়ে উপলব্ধি করলাম, বিষয়টা আপেক্ষিক। ... কারণ, সেখানে দাসত্ব বা বর্ণবৈষম্যের রূঢ় ইতিহাস নিয়ে তেমন কিছুই বলা হয়নি। যেখানে কিনা আমাদের পশ্চিমের গোড়াপত্তন থেকেই শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের শাসন করত নির্মমভাবে আর আমাদের সভ্যতা সেই ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যের পাঠ্যসূচিতে এসব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা নেই। ... তখন বুঝলাম, ইতিহাস নির্ভর করে স্থান, পাত্র আর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর, কার মুখ থেকে ইতিহাস বর্ণনা করা হচ্ছে তার ওপর।৪
ভারতবর্ষের নিম্নবর্গের ইতিহাসের তাত্ত্বিকরাও এমন কথাই বলেন। অর্থাৎ ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে গল্পকথক মুখ্য। এজন্য দাদার মুখে বৃটিশদের ত্যাগের গল্প শোনা গেলেও তাদের অত্যাচার-নির্যাতন-হত্যা-শোষণের কথা অবর্ণিত থেকে যায়। বাঙালি হলেও গল্পকথক দাদা বৃটিশদের প্রতিনিধি; অর্থাৎ শাসক, ক্ষমতাবান শ্রেণির প্রতিনিধি। আর তাই অন্তর্যাত্রার গল্পকথকের নির্মিত ইতিহাস, প্রতিনিধিত্ব বড়ো অংশ বা সাধারণ মানুষের নয়; ক্ষুদ্রাংশের বা শোষক-আধিপত্যকারীদের। আর এভাবেই অন্তর্যাত্রা সাম্রাজ্যবাদী, আধিপত্যবাদী হয়ে ওঠে।
যে কারণে প্রাণ-প্রকৃতিবিরোধী অবস্থানে অন্তর্যাত্রা
অন্তর্যাত্রার নির্মাতা তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ স্বামী-স্ত্রী। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে ক্যাথরিন আর তারেকের জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। পৃথিবীর দুই প্রান্তে শেকড় থাকা নির্মাতাদ্বয়ের অন্তর্যাত্রায় বার বার এসেছে পাশ্চাত্য, গুরুত্বও পেয়েছে। যদিও চলচ্চিত্রের কাহিনি, নির্মাণ স্থান প্রাচ্যের দেশ বাংলাদেশ। তবে প্রাচ্য দেশের এই চলচ্চিত্রটির অবস্থান পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে, অর্থাৎ সার্বিক সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে। বাংলাদেশ কিংবা প্রাচ্যের পক্ষে অবস্থান নেয়নি বলে প্রসঙ্গটি তোলা নয়; বরং এজন্য তোলা যে, এই চলমান চিত্রের অবস্থান দিনশেষে প্রতীচ্য-প্রাচ্য নির্বিশেষে মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে।
ক্যাথরিন মাসুদ পাশ্চাত্যের কিংবা তারেক মাসুদের স্ত্রী পাশ্চাত্যের বলেই যে, ওই অঞ্চলের সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে চলচ্চিত্রে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা, বিষয়টিকে বোধহয় এর বাইরেও ভাবনার সুযোগ আছে। তা হলো, নির্মাতাদ্বয় ও নির্মিত চলচ্চিত্রেরই সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠা। চলচ্চিত্রের শুরুতেই দেখা যায়, পশ্চিমা দ্য বৃটিশ কাউন্সিল ও দ্য হুবার্ট বালস ফান্ডের৫ (এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিভাবান তরুণ নির্মাতাদের চলচ্চিত্র নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে থাকে নেদারল্যান্ডের এই হুবার্ট ফান্ড) সহযোগিতায় অন্তর্যাত্রা নির্মিত হয়েছে। পাশ্চাত্যের এই প্রতিষ্ঠান দুটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গোত্রের; যাদের উদ্দেশ্য কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা ও তা ধরে রাখা সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক উপায়ে। এটাই স্বাভাবিক যে, স্বার্থরক্ষা করবে না, এমন চলচ্চিত্রে তাদের সহযোগিতা নিশ্চয় থাকবে না। স্বার্থরক্ষা করবে বলেই হয়তো অন্তর্যাত্রা নির্মাণ সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিলো পাশ্চাত্যের এই প্রতিষ্ঠান দুটি। আর ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার আশায় ভারতবর্ষেরই একটা অংশের সহযোগিতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে দুইশো বছর কর্তৃত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিলো; বর্তমানেও সেই দায়িত্ব পালন করেছেন তারেক-ক্যাথরিন ও তাদের নির্মিত অন্তর্যাত্রা। তাদের মতো অনেকেই এভাবে সুযোগ পেলেই সাম্রাজ্যবাদী হয়ে ওঠে। যাদেরকে বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী বা টাকায় কেনা বুদ্ধিজীবী বা সংস্কৃতিকর্মীও বলা যায়। মানসিক দীনতা আর রাষ্ট্র-পুঁজির নির্মাণ করা বাস্তবতায় কেনা বুদ্ধিজীবী/সংস্কৃতিকর্মীর কাতারে ভিড় জমে অবিরত।
তাছাড়া ভারতবর্ষ কিংবা অন্য অঞ্চলে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন হয়েছে মানে এই নয় যে, তা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো পশ্চিমাদের এখনো অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ভারতবর্ষে কাজ করছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড়ো অংশই যায় ইউরোপে। অস্ত্র-গোলাবারুদ ছাড়াও পাশ্চাত্যের নানা খাতের অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ভারতবর্ষে তাদের উচ্চ মুনাফার সন্ধানে কাজ করে চলেছে। বাজার দখলে চলছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। পুঁজি বিস্তারে বৃটিশ, আমেরিকান, রাশিয়ার পর এখন চিনা, ভারতীয় সাম্রাজ্যের (সাম্রাজ্যবাদের শিকার ভারতবর্ষের একাংশ ভারতই এখন সাম্রাজ্যবাদী/আধিপত্যবাদী) উত্থান হয়েছে। কারণ পুঁজি প্রতীচ্য-প্রাচ্য বোঝে না, শুধু বোঝে মুনাফা; তাই ছুটে চলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কখনো এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহেও। বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদ তথা যেকোনো দেশের মানুষ, গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, নদ-নদী, সমুদ্র, বাতাস প্রভৃতিতে টার্গেট পুঁজি বা পুঁজিপতি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তাই অন্তর্যাত্রা, তারেক-ক্যাথরিন মাসুদের এখনো প্রয়োজন পড়ে ভারতবর্ষে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রে। যারা আধিপত্য, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য সাংস্কৃতিক উপায়ে প্রাণ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে, অধিক মুনাফার পক্ষে কাজ করবে; মানুষ, প্রাণ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করাবে।
লেখকের অবস্থান কি বৃটিশদের বিরুদ্ধে?
অন্তর্যাত্রায় বৃটিশ রাষ্ট্র, বৃটিশ কোম্পানি, বৃটিশদের চা বাগানে ব্যবস্থাপক দাদা, দ্য বৃটিশ কাউন্সিল ও পশ্চিমের দেশ নেদারল্যান্ডের দ্য হুবার্ট বালস ফান্ডের সমালোচনা করায় কারো মনে হতে পারে, লেখকের অবস্থান বোধহয় বৃটিশদের কিংবা পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে। আসলে তা নয়। বৃটিশরা ভারতবর্ষ শাসনের সময়টাতে পশ্চিমা দেশগুলোতে শিল্পবিপ্লব ঘটেছিলো। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডসহ পশ্চিমের কয়েকটি রাষ্ট্র বিশ্বের অন্য প্রান্তের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের প্রকৃতির সঙ্গে অন্যায় করেছে। সেসব দেশের সম্পদ লুট করে, মানুষদের নির্যাতন, বঞ্চিত করে, তারা পশ্চিমে এই শিল্পবিপ্লব ঘটিয়েছে। লেখকের অবস্থান এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। যেসব প্রতিষ্ঠান এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, অবস্থানটা তাদের বিরুদ্ধে। পশ্চিমের যেসব মানুষ এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত, অবস্থানটা সেসব মানুষের এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে; কিন্তু সেসব মানুষের বিরুদ্ধে নয়। এছাড়াও পশ্চিমে অনেক মানুষ রয়েছে, যারা ক্ষমতা-কাঠামোর বাইরে, আবার সেখানে অনেকেই রয়েছে যারা পশ্চিমা কিংবা কোনো অঞ্চলেরই সাম্রাজ্যবাদকে সমর্থন করে না, এর সুবিধাও নেয় না--পশ্চিমের এসব মানুষ এই অন্যায়ের আওতামুক্ত।
আবার এই অন্যায় যে কেবল পশ্চিমের মানুষগুলোই করেছে, তা কিন্তু নয়। সাম্রাজ্যবাদের শিকার হওয়া দেশে অবস্থান করেও অন্তর্যাত্রায় দাদা ও এর নির্মাতাদের মতো যেসব ব্যক্তির কর্মকাণ্ড সাম্রাজ্যবাদকে সমর্থন করেছে, সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে এবং এর সুবিধা ভোগ করেছে--সেসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও এই অবস্থান। আবারও বলা প্রয়োজন আমার অবস্থান, অন্তর্যাত্রার দাদা ও নির্মাতাদের বিরুদ্ধে নয়, তাদের এই অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে।
বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য এই পর্যায়ে এসে আরো ব্যাখ্যার প্রয়োজন মনে করছি। অন্তর্যাত্রায় রফিককে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন শিরিন। সেই রফিকই শিরিনের প্রাণের কাজ গ্রুপ থিয়েটার, গান করা বন্ধ করে দেন। তিনি শিরিনকে বন্দি করতে চান নানান সামাজিকতায়। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১৩ মিনিটে এ বিষয়ে সোহলের কাছে শিরিনের স্বীকারোক্তি,
তোর জন্ম হইছিলো আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তোর বাবাই বিশ্বাস করতো, আমরার বাচ্চা অইলে সব তা ঠিক অই যাইবো। অ্যান্ড ইট হ্যাপেন্ড। হোয়েন ইউ আর বর্ন, আই ওয়াজ রিয়েলি টু হেভ ইউ। দেখতে দেখতে ৩/৪ বছর পার হই গেলো। তারপর আৎকা একদিন রিয়েলাইজ করলাম, আমার নিজের কোনো আলাদা জীবন নাই। গ্রুপ থিয়েটার তো দূরের কতা, দেলাম, আমার গলা দিয়া আর গানও বাইর হয় না। জানস না তো, আইজও মনে অইলে কী কষ্ট যে লাগে! একদিন আমরা এক বন্ধুর বাড়ি গেছলাম গানের আসরত। বন্ধুর বউয়ের গান হুইন্না তোর বাপর যে প্রশংসা! সবচেয়ে কষ্ট লাগছিলো, যখন আমারে পরিচয় করায় দিয়ে কইলা, এইনও একসময় বালা গান জানতা। মাথাত হেই দিন আমার আগুন ধইরা গেছিলো।
এই ঘটনার পরই রফিকের বন্ধন ছিন্ন করে সোহেলকে অবলম্বন করে শিরিন তাকে নিয়ে পাড়ি জমান পশ্চিমে।
অর্থাৎ জোর করে কাউকে ধরে রাখা যায় না। সুযোগ পেলে সে বন্ধন ছিঁড়বেই। সুযোগ না পেলে মুক্তির জন্য কাতরাবে, সংসারে বন্দি থাকবে, কিন্তু প্রাণবন্ত উপস্থিতি থাকবে না তার। মানুষকে পেতে হলে ভালোবেসেই পেতে হয়, ধরে রাখতে হলে ভালোবেসেই ধরে রাখতে হয়। অন্তর্যাত্রার শিরিন এর ভালো উদাহরণ।
শিরিনের এই বন্ধন ছেদেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, তা কিন্তু নয়। লন্ডন থেকে দেশে আসার পর শিরিন তার কলেজ জীবনের বান্ধবী বিথীর সঙ্গে দেখা করেন। তাদের কথা বলার একপর্যায়ে শিরিনকে বিথী বলেন, ‘সোহেলের কাস্টডি নিয়ে তোর সেই স্ট্রাগল, সেই ভয়ঙ্কর দিনগুলির কথা আমি ভুলিনি। সত্যিই তোর মনে জোর আছে বাবা। আমি হলে অনেক আগেই রণে ভঙ্গ দিতাম। কিন্তু তোর নিজেরও তো একটা জীবন আছে। এতো লড়াই করে তুই নিজে কী পেলি?’ শিরিনের হেসে উত্তর, ‘কেনো, স্বাধীনতা।’ আবার সেই বান্ধবীর প্রশ্ন, ‘তোর একা লাগে না?’ পাল্টা প্রশ্ন শিরিনের, ‘কেনো, তোর লাগে না?’ (কলেজ জীবনে একজনকে ভালোবাসতেন বিথী। তবে বিথী তাকে পাননি। এখন স্বামী, সন্তান, সংসার আছে তার) হালকা হেসে বিথীর উত্তর, ‘লাগে, তবে সবসময় না। মাঝে মাঝে।’ এখানেই শেষ হয় দুই বান্ধবীর আলাপ। বিথীর কাছে ইগো বজায় রাখলেও চলচ্চিত্রের শেষাংশে সন্তান সোহেল যখন জানতে চায়, তাকে কেনো বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিলো? তখন শিরিনের সহজ স্বীকারোক্তি ছিলো--শুধু সন্তানকেই বঞ্চিত করেননি, নিজেকেও করেছেন।
যদি একা থাকলেই স্বাধীনতার, মুক্তির স্বাদ পাওয়া যেতো, তাহলে পৃথিবীর সবাই হয়তো যার যার মতো করে একাই ঘুরে বেড়াতো। ঘর, সংসার হতো না, নগরী হতো না, মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াতো না; এসব হলেও অন্তত একাকিত্ব বোধ হতো না। অর্থাৎ মানব জীবনে সম্পর্কের প্রয়োজন আছে। তবে সেই সম্পর্ক মানে কাউকে অধীন করা, জোর করে ধরে রাখা নয়। সম্পর্কে সমতা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থাকলে হয়তো স্বাধীনতা, মুক্তির স্বাদ মেলে। সাম্রাজ্যবাদের সমর্থন ছাড়া এমন আরো বার্তা তারেক-ক্যাথরিন তাদের অন্তর্যাত্রায় দিয়েছে, যা প্রশংসার দাবিদার।
শেষ কথা
আবার সেই পারকিনসনের কাছে ফিরি। পারকিনসন তো জীবনের শেষবেলায় এসে নিজের আজীবন করে আসা ভুলের কথা স্বীকার করেছেন। শুধু স্বীকার করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাকৃতিক সম্পদকে করায়ত্ত করতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, আদিবাসীদের উচ্ছেদ, হত্যাসহ সব নগ্নতা, নৃশংসতার পদ্ধতি, সংস্কৃতি মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছেন তিনি। অর্থাৎ তার জায়গা থেকে তিনি সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংসের বীজ বপন করেছেন। অথচ অন্তর্যাত্রায় তারেক-ক্যাথরিন মাসুদ করেছেন উল্টো কাজ। বৃটিশ শাসন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণকে বৈধতা দিয়ে সাম্রাজ্যবাদ যেনো টিকে থাকে, তারা সেই বীজ বপন করেছেন অন্তর্যাত্রায়।
লেখক : প্রদীপ দাস, অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজ-এ নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত আছেন।
pradipru03@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100029026601444
তথ্যসূত্র
১. জন, পারকিনসন (২০১৪ : ৭—৮); কনফেশন অব অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান; বণিক বার্তা, ঢাকা।
2. https://bit.ly/2KLDFEA; retrieved on: 15.11.2019
3.https://bit.ly/2QK9S2P; retrieved on: 18.11.2019
https://bit.ly/2pPQaYC; retrieved on: 18.11.2019
৪. ওয়াটসন, এমা; ‘বিশ্ববিদ্যালয় আমার জীবনকে স্বাভাবিক করেছে’; প্রথম আলো, ১০ নভেম্বর ২০১৯।
5. https://iffr.com/; retrieved on: 19.11.2019
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন