Magic Lanthon

               

রাশেদুল ইসলাম শিখর রায়

প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ছোটো সিনেমার বড়ো লেখা

গুজব : কেবল কার্যকারণ ধরে গুজব বোঝার ব্যর্থ চেষ্টা

রাশেদুল ইসলাম শিখর রায়


ভূমিকা

সমাজ-রাষ্ট্রে এমন কিছু স্পর্শকাতর শব্দ প্রচলিত আছে, যেগুলো মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব শব্দ বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে নানা অর্থ তৈরি করলেও কখনো কখনো এগুলো মানুষকে নিয়ন্ত্রণ ও হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কখনোবা এই শব্দগুলোই প্রাণহানির মতো ঘটনাও ডেকে আনে। অবশ্য এর পিছনে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতা-কাঠামো কাজ করে। ক্ষমতাকে সঙ্গে নিয়ে স্পর্শকাতর বিষয়কে হাতিয়ার করে সমাজ-রাষ্ট্রে নানাধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে। এসবের পিছনে কাজ করে নানা উপাদান--ধর্ম, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, রাষ্ট্র ইত্যাদি। বর্তমান বাংলাদেশে দাঁড়িয়েও এমন অসংখ্য শব্দের সঙ্গে মানুষ পরিচিত--গুজব এমনই একটি শব্দ। তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান এ সময়ে খুব সহজেই গুজব ছড়ানো যায়। আর এ দিয়ে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর হামলা, নির্যাতন, প্রতিমা ভাঙচুর, লুটপাট, আতঙ্ক সৃষ্টি পেয়েছে নতুন মাত্রা। ইসলাম ও নবীকে নিয়ে কটূক্তির গুজব রটিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, সাঈদীকে চাঁদে দেখতে পাওয়া, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কর্মীকে হত্যা, পদ্মা সেতুতে শিশুর মুণ্ড লাগা ইত্যাদি গুজব ছড়ানোর পিছনে ফেইসবুক, ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে ইউটিউবভিত্তিক প্লাটফর্ম প্রজন্ম ওয়েভ মুক্তি দেয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র গুজব; এটি নির্মাণ করেন বদরুল আনাম সৌদ। ১২ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডের এই চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায়, স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে গুজব ছড়ায় এবং স্বার্থোদ্ধার করে। এই আলোচনা গুজব ও তার পরিপ্রেক্ষিতের নানা দিক নিয়ে এগোবে।

গুজব যা বলে

গুজব-এ প্রধান চরিত্র হিসেবে এসেছে তিন জন। চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন তার গ্রামের তরিকুল নামে এক শিক্ষকের জায়গা কিনতে চান। তরিকুল জমি বিক্রি করতে না চাইলে তাকে নানারকম হুমকি-ধামকি দিতে থাকেন তিনি। তরিকুল তাতেও রাজি না হলে জমি দখলে চেয়ারম্যান ক্ষমতার সঙ্গে ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। একপর্যায়ে চেয়ারম্যানের প্রণোদনায় তরিকুলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেন ওসমান। জনরোষের মুখে এরপর তরিকুলকে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে ভিটেবাড়ি ছাড়তে হয়। প্রকৃতির নির্মম পরিহাস এই যে, পরবর্তী সময়ে একই ঘটনার শিকার হন চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন নিজেও। এবার তার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ তুলে স্ট্যাটাস দেওয়ার ব্যবস্থা করান স্থানীয় ক্ষমতাধর সাংসদ। যিনি একই কায়দায় শামসুদ্দিনের জমি দখলের পায়তারা করেন।

গুজব-এর অর্থ ও গণমাধ্যম

গুজব নিয়ে এই উপমহাদেশে নানা কথার প্রচলন আছে। বিভিন্ন সময়ে নানাভাবেই এখানে গুজব সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যাই হোক, গুজব সৃষ্টির পিছনে সেখানকার সমাজ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের একটা প্রভাব থাকে। কারণ পরিকল্পনা করে গুজব তৈরি করা যায় না। গুজব স্বতঃস্ফুর্ত [স্বতঃস্ফূর্ত]। এটা গণচরিত্রের। এর কন্টেন্ট বদলাতে থাকে। এর ওপর কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এটা স্ট্রাকচার অফ ফিলিঙের সাথে সম্পর্কিত। এটা ম্যানুফ্যাকচার করা যায় না। ... গুজব হলো জনরব। ... গণমানুষের স্বর। আবার বলা হয়--গুজব ভুয়া সংবাদের মতোই। গুজব হচ্ছে--বানানো অথচ গুরুত্বপূর্ণ গল্প-কাহিনি, যার কোনো প্রমাণ থাকে না। ... বিষয়টি ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বা অমীমাংসিতও থাকে অর্থাৎ সত্য না মিথ্যা কোনো সিদ্ধান্তেই আসা যায় না। তবে রাষ্ট্র ও আইনের চোখে সেই তথ্যই সত্য, যা দলিল আকারে থাকে। লোকপ্রচার যতোই শক্তিশালী হোক না কেনো, যদি দলিল না থাকে তাহলে সেটা মিথ্যা, কখনো কখনো গুজব। মানে মানুষ আছে, কাগজ নেই; তাহলে মানুষই নেই! অর্থাৎ যেখানে কর্তৃত্ব থাকে না, যা রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত হয় না; যার কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই, লিখিত রূপও নেই, কিন্তু দ্রুত ছড়ায়--তাই গুজব।

অন্যদিকে স্বভাবজাতভাবেই মানুষের তথ্য ক্ষুধা রয়েছে। এই তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া গণমাধ্যমের যে চর্চা সারা পৃথিবীতে দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে, তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, গণমাধ্যম কখনোই গণমানুষের হয়ে ওঠেনি। সাধারণ মানুষ সেখানে উপেক্ষিত থেকেছে। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তথ্য দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণই করে বেশি। আর যেটুকু প্রকাশ করে, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মানুষদের রক্ষা করতেই। এ কারণেই তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে বিশাল সংখ্যক মানুষ আস্থাহীন হয়ে বিকল্প মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আশ্রয় নিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের। ফেইসবুক তার অন্যতম। যেখানে কমবেশি সবাই অপেক্ষাকৃত স্বাধীনভাবে মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে। তবে এই মাধ্যমের একটা বড়ো দুর্বলতা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর কন্টেন্টগুলো যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। অবশ্য ব্যবহারকারীরা যাচাই-বাছাইয়ের দিকেও যেতে চায় না। ফলে কোনো রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই তারা ছড়িয়ে দেয় ভালো-মন্দ সব ঘটনা। যা অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে একটা বিষয় জোর দিয়েই বলা যায়, গুজব ছড়ানোর পিছনে গণমাধ্যমের দায়কে একেবারে অস্বীকার করা যায় না। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে হওয়া কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও গণমাধ্যমকে সঠিক ভূমিকায় দেখা যায়নি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের একপর্যায়ে ৮ এপ্রিল রাতে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা ও কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। এ ঘটনার পর পুলিশের গুলিতে আশিকুর রহমান নামের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। গভীর রাতে রাস্তায় নেমে আসে সারাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী।

একই বছর ৪ আগস্ট নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ফেইসবুকে খবর ছড়িয়ে পড়ে, ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়ে চার জন শিক্ষার্থীকে হত্যা এবং চার নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। এমনকি অভিনয়শিল্পী কাজী নওশাবা আহমেদও কোনোধরনের বাছবিচার ছাড়াই ওই সময় এই তথ্যটি ফেইসবুক লাইভে এসে ছড়িয়ে দেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই খবরগুলো ফেইসবুকে কীভাবে আসে? কেনো আসে? আন্দোলনের সময় মূলধারার গণমাধ্যমগুলো তাহলে কী করছিলো? তারা কি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেনি? বাস্তবতা বলে, মূলধারার গণমাধ্যমগুলো যথাযথ তথ্য পরিবেশনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দুটি আন্দোলনেই জনগণ চোখ/আস্থা রাখে ফেইসবুকে।

মাধ্যম হিসেবে ফেইসবুক বর্তমানে এক গণমঞ্চ হয়ে উঠেছে। যেখানে মানুষ তার ব্যক্তিগত চিন্তা-মত-উপলব্ধি কিংবা যেকোনো তথ্য খুব সহজেই দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। নানা কারণে দিনকে দিন তার গ্রহণযোগ্যতাও বেড়ে চলেছে। আর এই গ্রহণযোগ্যতাকে পুঁজি করে অনেকেই গুজব রটিয়ে স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। চলচ্চিত্র গুজব-এ যেমন চেয়ারম্যানের নির্দেশে তরিকুলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্ট্যাটাস দেন ওসমান। সেখানে জনগণ কোনো রকম বিচার-বিবেচনা করে দেখেনি আসলেই তরিকুল ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে কি না। এসব যাচাইয়ের যেনো কোনো সময়ই মানুষের হাতে নেই। বরং মানুষ ব্যস্ত হয়ে ওঠে ধর্ম রক্ষায়; তরিকুলকে মারতে হবে, শাস্তি দিতে হবে; নইলে যে ধর্ম নষ্ট হয়ে গেলো! ফলে যা হয়, সব হারিয়ে জীবন নিয়ে পালাতে বাধ্য হন নির্দোষ তরিকুল।

কেনো মানুষ গুজব বিশ্বাস করে?

গুজব-এ প্রথম দফায় তরিকুল মাস্টারের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ায় শামসুদ্দিন চেয়ারম্যান। আর দ্বিতীয় দফায় শামসুদ্দিন নিজেই একই রকম গুজবের শিকার হন ক্ষমতাধর সাংসদের হাতে। মাঝখানে থাকা সাধারণ মানুষ কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই কোনো কিছু বিবেচনা না করে এই ছড়ানো তথ্য বিশ্বাস করে। এই যে ফেইসবুকে ছড়ানো দুইএকটি স্ট্যাটাসের ওপর নির্ভর করে কোনো ঘটনাকে সত্য বলে বিশ্বাসের প্রবণতা, তা কি হঠাৎ করেই তৈরি হয়? ব্যাপারটি মোটেও অতো সহজ নয়। ব্যক্তির সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পক্ষপাতিত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অক্ষমতা যেমন যেকোনো তথ্য বিশ্বাসে প্ররোচিত করে; আবার আবহমান কাল ধরে চলে আসা জনশ্রুতি এবং স্থানীয় সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন গল্পগুজবের ওপর মানুষের বিশ্বাসও গুজব ছড়ানোর পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৌলভীবাজারের কমলার দীঘি তৈরির মিথটির কথাই বলা যাক। দীঘিটি খননের সময় নাকি পানি উঠছিলো না। রাজা স্বপ্নে দেখতে পান, তার সহধর্মিণীকে দীঘিতে বিসর্জন দিলেই পানি উঠবে। দিনাজপুরের রামসাগর নিয়েও একই ধরনের বিশ্বাস এখনো বিদ্যমান। কোনো কিছুর সফলতায় আত্মাহুতি দেওয়ার এই গল্প কিন্তু বর্তমানেও প্রচলিত আছে।

পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে--এমন গুজব সহজে ছড়ানোর পিছনে মানুষের শত বছরের এই সংস্কৃতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। ঠিক যেনো শামসুর রাহমানের এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে/ চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে কবিতার লাইনের মতো। হয়তো এ কারণেই মানুষ গুজবে কান দিয়ে পৈশাচিকভাবে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে--প্রাণ হারাতে হয় রেনুদের, অবুঝ শিশু তুবারা হারায় মাকে, বলি হতে হয় মানসিক প্রতিবন্ধী ও নিরীহ মানুষদের। গুজবের হাত-পা-কান বলে কিছু না থাকলেও তা টর্নেডো কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের থেকেও শক্তিশালী। যা অল্প সময়েই পৌঁছে যায় হাজারো মানুষের কানে। আর পরিবেশটাও এমনভাবে গুজবের অনুকূলে থাকে যে, কানে পৌঁছানো মাত্র গুজবরূপী এই বৃক্ষকে নানা ডালপালা দিয়ে, ম্যাজিকের মতো আরো রাঙিয়ে ছড়িয়ে দেয় মানুষ। তার মানে গুজব এমনি এমনি সৃষ্টি হয় না, এতে সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রভাব থাকে। সঙ্গে যদি গণতন্ত্রের চর্চা না থাকে; নাগরিক সুবিধা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। আবার ক্ষমতাবানরা কোনো ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে সেটাকে গুজব বলে চালিয়ে দেয় এবং কার্যকরী পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্লেইম গেইম করে, তাহলে তো গুজব রটনাকারীরা বেপরোয়াভাবে গুজব ছড়াবে এটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি এমন যে, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে ডেঙ্গু প্রকোপ রোধে নিজেদের অক্ষমতা, অদক্ষতা ঢাকতে ডেঙ্গুকেই গুজব বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন ঢাকার মেয়র।

পরিপ্রেক্ষিত গুজব এবং গুজব

ভারতে বৃটিশ শাসনকালে এনফিল্ড রাইফেলের কার্তুজ দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে ভরতে হতো। সেই সময় গুজব ছড়ানো হয়, এই কার্তুজ তৈরিতে গরু ও শুকরের চর্বি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু তথ্যটি সত্য ছিলো না। তারপরও স্রেফ এ রকম গুজবের ওপর ভিত্তি করেই ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। গুজবটি এতোই শক্তিশালী ছিলো যে, ভারতের প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সিপাহী বিদ্রোহ মহাবিদ্রোহে রূপ নেয়। এরপর ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে গোরখপুরে গান্ধীকে কেন্দ্র করে যেসব গুজব ছড়িয়ে পড়ে, পরবর্তী সময়ে পত্রপত্রিকা তা আরো ফলাও করে প্রচার করে। যা সেখানকার মানুষের মনে গান্ধীর দেবতার আসন প্রাপ্তির রাস্তা পরিষ্কার করে দেয়। অথচ এর পিছনে ছিলো কংগ্রেসের হাত। এবং এই ঘটনায়ও গুজব ছিলো পরিকল্পিত এবং ক্ষমতাধরদের হাতে সৃষ্ট। গুজব-এও গুজবের উৎস ওই ক্ষমতাধররাই। তবে পার্থক্য হলো, গুজব কখনো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়, আবার কখনো কাউকে দেবতার আসনে বসিয়ে ক্ষমতার পতন ঘটাতে সহযোগিতা করে। জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সেসময় পত্রিকাগুলো যেভাবে গান্ধীকে মহান করার জন্য গোরখপুরের মানুষের সরল বিশ্বাস ও অনুভূতিকে ব্যবহার করে, বর্তমান সময়ের স্বার্থান্বেষী মহলও ঠিক একই পন্থা বেছে নেয়। মানুষের এই বিশ্বাসের যাচ্ছেতাই ব্যবহারই ডেকে আনে চরম বিপর্যয়। কখনো তা সংখ্যালঘু নির্যাতন এমনকি জাতিগত দাঙ্গার কারণও হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশেও গত কয়েক দশকে নানা রকম গুজব ছড়িয়েছে। এর কারণে ঘটেছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মতো মারাত্মক ঘটনা। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উত্তম বড়ুয়া নামে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এক যুবকের ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ইসলাম ধর্ম, কোরআন অথবা নবীকে অবমাননা করা হয়েছে বলে গুজব রটানো হয়। এই গুজবকে কেন্দ্র করে রামুতে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ মন্দির পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। তবে যে তরুণের ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট ঘিরে ওই হামলার ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, এতোদিন পরেও তেমন কোনো তরুণের খোঁজ পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লার হোমনা উপজেলার বাকসীতারামপুর গ্রামে ও পাবনার সাঁথিয়ায় মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করার খবর ছড়ানো হয়। সেখানেও মন্দিরসহ বহু হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ মার্চ একটি মঞ্চনাটকে ইসলাম অবমাননা করা হয়েছে অভিযোগে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় ১৫টি হিন্দু বাড়ি।১০ অথচ এই ঘটনার আগে হামলাকারীদের কেউই যাচাই করার প্রয়োজন মনে করেনি; সত্যিই কেউ নবীকে নিয়ে কটূক্তি কিংবা ইসলাম অবমাননা করেছে কি না। চলচ্চিত্রে তরিকুলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় যে গুজব ছড়ানো হয় তাতে শামসুদ্দিনের যেমন হাত আছে, তেমনই শামসুদ্দিনের ওপর গুজব ছড়াতে সাংসদের হাত থাকার বিষয়টিও পরিষ্কার। তার মানে প্রত্যেক গুজবের পিছনেই ক্ষমতাবানদের হাত থাকে। রামু কিংবা কুমিল্লার ঘটনাতেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

ধর্ম ও গুজব

প্রাক্তন চেয়ারম্যান শামসউদ্দিন ইসলামের দুশমন। সে আল্লাহ-নবীরে নিয়ে খারাপ কথা বলছে, তাদের অবমাননা করছে। শামসউদ্দিনের উপযুক্ত শাস্তি চাই। ইসলাম ধর্মের উপর কোন রকম আঘাত সহ্য করা হবে না। শামসউদ্দিনের মত কাফেরদের এই দেশের মাটিতে কোন জায়গা হতে পারে না। নিজের বিরুদ্ধে ফেইসবুকে ছড়ানো গুজব পড়তে থাকেন শামসুদ্দিন--এ দিয়েই শুরু হয় গুজব। স্বল্পদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রটিতে এরপর একে একে উঠে এসেছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধর্মকে ব্যবহারের চিত্র; স্বার্থ হাসিলে ধর্মের নামে গুজব ছড়ানো। চেয়ারম্যান থাকাকালীন শামসুদ্দিন চেয়েছিলেন তরিকুল মাস্টারের ভিটেমাটি কিনে নিতে। তরিকুল তাতে অসম্মতি জানালে ওসমানকে দিয়ে ফেইসবুকে তার নামে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে স্ট্যাটাস দেওয়া হয়--ইসলাম ধর্ম হুমকির মুখে। তরিকুল মাস্টার একটা কাফের। নবী করীমকে নিয়ে সে কটুক্তি [কটূক্তি] করে, গালি-গালাজ করে। এই রকম কাফেরদের এই দেশের মাটিতে জায়গা হতে পারে না। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আমরা মুসলমানই না। ইসলাম ধর্মের সম্মান এখন আমাদের হাতে। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে। রূপ নেয় গুজবে। বাধ্য হয়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে যান তরিকুল। ভুয়া দলিলপত্র করে তার ভিটেমাটি নিজের নামে করে নেন চেয়ারম্যান। একসময় স্থানীয় সাংসদও শামসুদ্দিনের জমি দখলে নিতে ঠিক একই পদ্ধতি অবলম্বন করেন।

চলচ্চিত্রে তরিকুলের ওপর শামসুদ্দিন আর শামসুদ্দিনের ওপর সাংসদ একইভাবে ক্ষমতা ও ধর্মকে ব্যবহার করে গুজব ছড়ায়। নিজ নিজ স্বার্থোদ্ধার করে। প্রতিটি গুজবের বিষয় হিসেবে ধর্মের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠা কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদিও ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের পক্ষপাতমূলক ব্যবহার অনেক পুরনো। এর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুভূতির ব্যবহারও নতুন নয়। সেটা এই আলোচনার অংশ নয়। তবে এই চর্চা নিয়ে ধর্ম কী বলে? গুজবকে সমর্থন করে? না। ধর্মকে ব্যবহার করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও গুজব রটানোর মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হলেও পৃথিবীর কোনো ধর্মই কখনো গুজবের সমর্থন করেনি। চলচ্চিত্রে যে ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে, তাও গুজবের ঘোর বিরোধিতা করে। যেমন, মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো মানুষ মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়।১১ এ বিষয়ে সূরা বনি ইসরাইল-এ বলা হয়েছে, যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তার পিছনে পড়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।১২ সুরা বাকারায় উল্লেখ আছে, তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে তোমরা গোপন করো না।১৩ তারপরও ধর্মই হয়ে উঠেছে গুজব রটানোর অন্যতম হাতিয়ার!

ধর্মের কানাগলিতে আবদ্ধ গুজব

চলচ্চিত্র গুজব-এ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। ধর্ম, ক্ষমতা নিয়ে আলাপ তোলা এই চলচ্চিত্রটিতে উঠে এসেছে রাষ্ট্রে কোন কোন পরিস্থিতিতে গুজব ছড়ায়। তবে নির্মাতা কোথায় যেনো কিছু একটা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। চলচ্চিত্রে গুজব ছড়ানোর ক্ষেত্রে বার বার শুধু ধর্মকে নিয়েই টানাহ্যাঁচড়া করা হয়েছে। গুজব ছড়ানোয় অন্য অনুষঙ্গ যেমন গণমাধ্যমের তথ্য চেপে যাওয়া, রাষ্ট্রের সমর্থন এগুলোর কোনো ইঙ্গিতই নেই। ধর্মের বাইরে শত বছরের ঐতিহ্যগত ধারণাও যে গুজব ছড়াতে সহায় হয়, তারও ইঙ্গিত আসেনি চলচ্চিত্রটিতে। এখানে কেবল কার্যকারণ তুলে ধরে ব্যক্তিমানুষের ফল ভোগ করার যে নৈতিক অবস্থান তার একটি সাদামাটা চিত্রই তুলে ধরেছেন নির্মাতা। কিন্তু কেবল কার্যকারণ দিয়েই কি সবসময় সবকিছু ব্যাখ্যা করা সঠিক হয়। এর সঙ্গে সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের আরো অনেক উপাদানই নানাভাবে ঘটনাকে এগিয়ে নেয়। আর এখানেই চলচ্চিত্র হিসেবে গুজব-এর সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

 

লেখক : রাশেদুল ইসলাম ও শিখর রায়, যথাক্রমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।

rashed73635@gmail.com

https://www.facebook.com/md.rashedulislam.5036459

shikharroymcj28@gmail.com

https://www.facebook.com/shikhar.roy.92102

 

তথ্যসূত্র

১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সেলিম রেজা নিউটনের অপ্রকাশিত খসড়া প্রবন্ধ ‘যোগাযোগের গুজবতত্ত্ব’ থেকে নেওয়া।

২. হক, মাহামুদুল (২০১৯ : ১১); “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভুয়া সংবাদ’ : ধারণায়ন, শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের উপায় অন্বেষণ”; নিরীক্ষা, ২২৩তম সংখ্যা জুলাইসেপ্টেম্বর, ঢাকা।

3. https://www.samakal.com/bangladesh/article/1804714; retrieved on: 08.08.2019

4. http://archive.fo/7rrt7; retrieved on: 08.08.2019

5. https://www.bbc.com/bengali/news-48932695; retrieved on: 10.08.2019

6. https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1605412/; retrieved on: 20.08.2019

7. https://www.kalerkantho.com/online/national/2019/07/25/795751; retrieved on: 05.09.2019

৮. আমিন, শাহিদ (২০১১ : ৪৭৬৬); ‘গান্ধী যখন মহাত্মা’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স লি., ভারত।

9. https://www.bbc.com/bengali/news-46126648; retrieved on: 05.09.2019

10. http://www.sylhettoday24.news/opinion/details/8/728; retrieved on: 05.09.2019

11. http://archive.fo/dhun0; retrieved on: 20.09.2019

12. http://www.quraanshareef.org/Surah-Israel; retrieved on: 09.10.2019

13. https://habibur.com/quran/2/; retrieved on: 09.10.2019

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন