Magic Lanthon

               

অনিক ইসলাম

প্রকাশিত ২৫ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘আ কোয়াইট প্লেইস’

রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে একফালি শৈল্পিক প্রতিবাদ

অনিক ইসলাম


আ কোয়াইট প্লেইস চলচ্চিত্রটিকে কেউ বলছেন বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, কেউ বলছেন হরর। আবার কেউ বলছেন, এটি দুটো জনরাকেই ছুঁয়েছে। তবে মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটি একজন নির্মাতার নিছক গল্প বলতে চাওয়া। তারপর সেই গল্প নিয়ে কী হবে, সেটা একান্তই দর্শকের ব্যাপার। যদি এটি কাউকে ভয় দেখায়, তবে তার কাছে এটি হরর, আবার কারো কাছে তা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি হিসেবে ধরা দেবে, আবার কারো কাছে এটি দুটোর মিশ্রণও মনে হতে পারে। আমার কাছে আবার এটিকে ভীষণভাবে ভালোবাসার গল্প বলেও ঠাওর হয়। এ রকম নানা অনুভূতি দানা বাঁধে চলচ্চিত্রটি দেখতে বসলে। এটি নিশ্চয় চলচ্চিত্রটির জন্য সুখবর এবং যেটির সফলতার পিছনে সবচেয়ে বড়ো কারণ হলো আরোপিত দৃশ্যের উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি। শুধু গল্পটিই বলতে চাই এই সরলতাই চলচ্চিত্রটিকে দিয়েছে বহুমাত্রিকতা, যার কারণে নানা প্রকৃতির দর্শকের সঙ্গে নিজেকে কানেক্ট করতে পেরেছে, ভিন্ন ভিন্ন উপসংহার টানতে পেরেছে।


একটি চলচ্চিত্র সত্যিকার অর্থে সফল হয় দর্শকের প্রতি নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। দর্শককে বোকা ভাবলে, দর্শক সেই চলচ্চিত্রকে স্মৃতিতে স্থান দেয় না। দর্শক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে চায়, সে চায় চলচ্চিত্র তাকে প্রশ্ন করুক, তার পরীক্ষা নিক। সে কেবল নির্মাতার বলা গল্পের শ্রোতা হয়েই সন্তুষ্ট হতে পারে না, সে চায় নির্মাতার অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গী হতে। দর্শক চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে সঙ্গে এগোতে চায়, তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া কিংবা তাকে গল্পের থেকে আগে চলে যেতে দেওয়া দুটোই ঠাঁসা বুননের চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে না। যাহোক, যে বন্দরেই আপনি থাকুন না কেনো, জন ক্রাজিন্সকি নির্মিত-অভিনীত এবং এমিলি ব্লান্ট অভিনীত চলচ্চিত্রটি তাদের গল্পের জাহাজে আপনাকে তুলে নেবে তাতে কোনো সংশয় নেই।


চলচ্চিত্রটি এমন একসময়ের গল্প বলছে যার ৮৮ দিন আগে কোনো এক অদ্ভুত প্রজাতি পৃথিবীকে আক্রমণ করেছে। কারা সেই প্রজাতি, কোথা থেকেইবা তারা এসেছে, এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয় না দর্শককে। এটি সেই বেসিক থ্রিলার ঘরানার চলচ্চিত্রের মতো, যেখানে আক্রমণকারী প্রজাতি দেখতে কেমন সেদিকে কম নজর দেওয়া হয় বরং ঘটনা, ঘটনা পরম্পরা ও প্রতিক্রিয়াই এদের ট্রেডমার্ক। প্রথম দিকে কেবল প্রজাতিটির ঝাপসা কিছু দৃশ্য দর্শক দেখে, যেটি চোখে দেখে না কিন্তু উন্নততর শ্রবণশক্তির অধিকারী। যতো দূরেই থাকুক এরা, সামান্যতম শব্দও এদের আকর্ষণ করে। একদম শেষের দিকে দর্শক এটিকে পরিষ্কারভাবে দেখার সুযোগ পায়। অন্যান্য হরর বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো প্রজাতির ডিটেইল তথ্য এখানে দেওয়া হয় না, যে কারণে দর্শকের সেসব নিয়ে ভাববার সুযোগ হয় না। ফলে ওই মুহূর্তে পর্দায় যা দেখানো হয়, দর্শককে কেবল সেখানেই ফোকাস্ড থাকতে হয়।


শুরুতে দেখা যায়, একটি পরিত্যক্ত শহরে পাঁচ জনের একটি পরিবার এক ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী খুঁজছে। প্রত্যেককে অত্যন্ত সন্তর্পণে চলতে দেখা যায়। বাতাসে পাতা নড়াচড়ার শব্দ ছাড়া কোথাও কোনো শব্দ নেই। পরিবারটির সবচেয়ে ছোটো সদস্য, দুই-তিন বছরের ছেলেটি স্টোর থেকে একটি খেলনা বিমান নিতে চায়, কিন্তু তার বাবা এমনভাবে তার হাত থেকে এটি নিয়ে নেয় যেনো বোমা ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্য কোনো বোমা কারো হাত থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। এই দৃশ্যের ধনুকের ছিলার মতো উত্তেজনা একটি নির্বিবাদ ধারণা দিয়ে দেয় যে, গোটা চলচ্চিত্রে প্রোটাগনিস্ট চরিত্র হতে যাচ্ছে শব্দ। দর্শক প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রটির সিরিয়াসনেসের স্বাদ পায়। এই যে তীব্র নাটকীয় মুহূর্তের শুরু হলো, চলচ্চিত্র শেষ হয়ে গেলেও এর যেনো শেষ হয় না। একটু পরেই দেখা যায়, সেই খেলনা বিমানটি ছোট্ট শিশুটির মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং অবশিষ্ট দুই সন্তানকে রক্ষায় বাবা ও মায়ের জীবনের প্রধানতম সংগ্রাম শুরু হয়। চলচ্চিত্রের পরবর্তী অংশ মূলত লি (ক্রাজিন্সকি) এবং এভলিনের (এমিলি ব্লান্ট) নিজেদের দুই সন্তান মার্কাস (নোয়াহ জুপ) ও রেগান (মিলিসেন্ট সিমন্ডস) এবং তাদের সদ্যোজাত শিশুকে নিরাপদ রাখার নানা রকম ঘটনা সামলে নেওয়ার রোমহর্ষক চেষ্টা করে যাওয়া। বেশিরভাগ হরর চলচ্চিত্রের সঙ্গে এটির বৈপরীত্য হলো, চলচ্চিত্রের চরিত্রেরা জানে, তারা কীসের সঙ্গে লড়ছে; আর এক্ষেত্রে মৃত্যু এতোবার তাদের সন্নিকটে উপস্থিত হয় যে তা দর্শককে পুরো প্যারালাইজ্ড করে রাখে।


দুই.

বলা হয় সঙ্গীতের একটি আলাদা ভাষা আছে, যা পৃথিবীর সব স্থানের মানুষ অনুভব করতে পারে। দুর্দান্ত মিউজিশিয়ানরা শুধু সুর দিয়েই একটি কাহিনি বর্ণনা করার সামর্থ্য রাখে, কিন্তু তুলনামূলক দুর্বল মিউজিশিয়ানদের দরকার পড়ে ভাষার। একই রকমভাবে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা রয়েছে। কোনো বাস্তবতাকে যখন ক্যামেরা কোলে তুলে নেয়, তখন তা ভিন্ন রকম অভিঘাত তৈরি করে। কিন্তু বর্তমান নির্মাতাদের মধ্যে চলচ্চিত্রের সেই ভাষাকে ব্যবহার করে গল্প বলার প্রবণতা কম দেখা যায়। তার বদলে চলমান চিত্রের পাশাপাশি বাচিক ভাষার সাহায্য নিয়ে কোনো গল্প বলা শুধু সহজই নয়, অনেক কম শ্রমসাধ্য। শুধু দৃশ্যের পর দৃশ্য বুনে বলা কোনো গল্প মানুষের মননে যে ভারী ছাপ রেখে যায় তা তুলনারহিত, সহজে মুছে যায় না। বাচিক ভাষাযুক্ত চলচ্চিত্রকে যদি গদ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে নিখাঁদ চলচ্চিত্র হবে কবিতা। কোনো অনুভূতিকে আশ্রয় দিতে যখন শব্দেরা হয়রান হয়ে যায়, তখন গদ্য এক পা পিছনে সরে দাঁড়ায়; তখন কবিতা সামনে এগিয়ে আসে, ধারণ করে নেয় মানব মনের সেই ব্যাখ্যাতীত অনুভূতিকে। তাই এলিয়ট যখন বলেন,


সন্ধ্যা ছড়িয়ে আছে আকাশের পরে

যেন ইথারাইজড কোনো রোগী পড়ে আছে টেবিলের বুকে।


কিংবা জীবনানন্দ যখন বলেন,

সুরঞ্জনা,

তোমার হৃদয় আজ ঘাস:

বাতাসের ওপারে বাতাস--

আকাশের ওপারে আকাশ


তখন গদ্যের ন্যায় স্পষ্ট কোনো তথ্য আমাদের হাতে থাকে না, না থাকে নিরেট নিশ্ছিদ্র কোনো বক্তব্য, কিন্তু আমরা সঙ্কেত পাই, কী যেনো আছে! কী যেনো কবি আমাদের বলতে চান, আমরা ধরতে পারি না, আমরা টের পাই।


গল্পের প্লটের কারণেই এই চলচ্চিত্রে আমরা বাচিক শব্দের উল্লেখযোগ্য অনুপস্থিতি দেখতে পাই, যা চলচ্চিত্রটিকে চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা নিয়ে কাজ করার একটি সুযোগ করে দেয়। যদিও নির্মাতা আবহসঙ্গীত ও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের সহায়তা নিয়েছেন। তবুও সমসাময়িক অনেক চলচ্চিত্রের তুলনায় এই চলচ্চিত্র অনেক কথা বলেছে ক্যামেরায়। চলচ্চিত্রে অনেকগুলো তীব্র টেনশন তৈরি করা সাসপেন্স দৃশ্য আছে, যা দর্শকের নার্ভের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়। এর একটি হলো এমিলি ব্লান্টের সন্তান জন্ম মুহূর্তের দৃশ্যটি। এমিলির লেবার যন্ত্রণা যখন শুরু হয়, তখন বাড়িতে কেউ ছিলো না। তিনি পায়ের মধ্যে পেরেক বিঁধিয়ে শব্দ করে ফেলেন। সেই শব্দ পেয়ে অদ্ভুত সেই প্রজাতি ঘরে ঢুকে পড়ে। এমিলি তখন প্রসব ব্যথার সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান করছেন, আর তার দুই হাত দূরত্বের মধ্যে সামান্যতম শব্দের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই প্রাণী। যেকোনো মুহূর্তে যন্ত্রণার চিৎকার বেরিয়ে আসবে এমিলির মুখ দিয়ে আর তিনি শেষ হয়ে যাবেন অনাগত সন্তানসমেত। এই ধরনের চলচ্চিত্রে এ রকম দৃশ্য বিরল নয়, তবে নির্মাতা এটিকে যথেষ্ট সফলভাবে দৃশ্যায়ন করতে পেরেছেন।


হরর কিংবা সাসপেন্স কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি যা-ই উপস্থিত থাক না কেনো, চলচ্চিত্রে সত্যিকার মনোনিবেশ করলে একটি জিনিস হীরের মতো চকচক করে; আর তা হলো কোনো পরিবারের গল্প। শব্দহীনতার এই নির্মম, নির্দয় ও ভয়ঙ্কর দিনগুলোতে একটি পরিবারের টিকে থাকার চেষ্টার এক অবিস্মরণীয় খেরোখাতা এটি। নিজেদের ইতিহাসের শুরু থেকেই মানুষ যেভাবে একে অন্যকে আগলে রেখেছে এবং পুঁজির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে সে তার উত্তরাধিকারদের সংরক্ষণ করছে, এই চলচ্চিত্রটি সেই ধারাবাহিকতারই আরেক পর্ব। তবে অবিশ্বাস্য প্রতিবন্ধকতা, নিশ্চিত আশাহীনতা দেখেও বেঁচে থাকার এবং অন্যদের বাঁচিয়ে রাখার এই যে প্রয়াস তা মানুষের দুর্লভ প্রাণিবৈশিষ্ট্যই বটে।


সন্তান, স্ত্রী, স্বামীর জন্য সর্বোপরি পরিবারের জন্য মানুষ কতোটা যুদ্ধ করে এই চলচ্চিত্রটি তার আরেক টুকরো উদাহরণ। গল্পের প্লট আমেরিকার পরিত্যক্ত কোনো শহর থেকে তুলে এনে আজকের এই পৃথিবীতে বসিয়ে দিলেও বাবা-মায়ের এই সংগ্রামটা ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক ও পরিচিত ঠেকবে দর্শকের কাছে। চলচ্চিত্রটি যেনো সন্তানের প্রতি কোনো বাবা-মায়ের লাভ লেটার। এই নিরাশাজনক সময়েও পরিবারটি ছোটো ছোটো সুখ একে অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেয়, যেনো সব বৈপরীত্যের মধ্যে যতোটুকু সম্ভব নিজেদের স্বাভাবিকত্বটুকুকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। তাই ভাইবোনদের তুলোয় জড়ানো ঘুঁটি দিয়ে মনোপলি খেলা কিংবা পুরনো দিনের মতো খাবার টেবিলে খাবার শুরুর আগে প্রার্থনা করা। এ দৃশ্যগুলো বোঝায় বাবা-মায়েরা কখনো হাল ছেড়ে দেয় না। তবে পরিবারের সবচেয়ে ছোট্ট সদস্যকে হারানোর অনিঃশেষ দুঃখ চলচ্চিত্রজুড়েই জারি থাকতে দেখা যায় বেঁচে থাকা সদস্যদের মধ্যে। বিশেষ করে বাবা-মা, যারা সন্তানকে বাঁচাতে না পারার জন্য ক্রমাগত নিজেদের দায়ী করে যেতে থাকে। এ রকম নরকসম পরিস্থিতিতে আরেকটি সন্তানকে পৃথিবীতে আনার যে আপাত অযৌক্তিক ঘটনা দেখা যায়, তার পিছনে নিজেদের হারানো সন্তানকে আবার ফিরে পাওয়ার কোনো বাসনা হয়তো কাজ করে ওই দম্পতির মধ্যে।


শুধু একটি পরিবারের সুখ-দুঃখের সংগ্রাম গাঁথা নয়, একে অন্যের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে চলচ্চিত্রটিতে। ছোট্ট সন্তানটির মৃত্যু যে খেলনা বিমানটির কারণে হয়, তা বড়বোন রেগানই তুলে দিয়েছিলো তার হাতে; যে কারণে সে নিজেকে ওই মৃত্যুর জন্য দায়ী ভাবে। একই সঙ্গে ভাবে এ কারণে তার বাবা তাকে আর ভালোবাসে না। একটা পর্যায়ে দর্শকও একটু হয়রান হয়ে পড়ে, সত্যিই কি বাবা ওই মৃত্যুর জন্য মেয়েকে দায়ী ভাবে কি না! অবিরত মৃত্যুর আগমনের আশঙ্কার মতো এ রকম একটি টেনশনও নির্মাতা তৈরি করে রাখেন চলচ্চিত্রজুড়ে। তবে কেবল উচ্চমাত্রার সাসপেন্সই নয়, মন ছুঁয়ে যাওয়া কিছু দৃশ্যও চলচ্চিত্রটিকে আরো আলাদা করেছে; যে কারণে চলচ্চিত্রটি কেবল হরর কিংবা সায়েন্স ফিকশন হয়ে থাকেনি। এ রকম একটি দৃশ্য হলো বাবা-ছেলের ঝরনার ধারে কথা বলার মুহূর্ত। ছেলেটি অনেক দিন ঠিকমতো কোনো শব্দ উচ্চারণই করেনি, তাই বাবা যখন তাকে বোঝান যে ঝরনার উচ্চ শব্দে তাদের কথা কেউ শুনতে পাবে না, তখন ছেলেটির যুগপৎ ভয়-অবিশ্বাস-বিস্ময়-বিহব্বলতা ও সবশেষে চিৎকার--দৃশ্যটিকে করে তোলে অদ্ভুত আবেদনময়। এছাড়াও রেগান ভাবে গোটা পরিবার তার ছোটো ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য তাকে দায়ী করছে; তাই একদিন বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে সে মৃত ভাইয়ের খেলনা বিমানটি নিয়ে চলে যায় সেই জায়গায়, যেখান থেকে তার ভাইকে তুলে নিয়েছিলো অদ্ভুত সেই প্রাণীটি। সেখানে খেলনা বিমানটিকে সে যেনো অর্ঘ্য হিসেবে অর্পণ করে। তার আগে খেলনা বিমানটির শব্দ করার যে তারটি তা কেটে দেয়ও বটে, শব্দহীন বিমানটি ওই নিঃশব্দে ঝিকিমিকি করতে থাকে। বিষয়-পরিস্থিতি মিলিয়ে প্রিয়জন হারানোর বেদনা বোঝানোর জন্য হয়তো এটি একটি আইকনিক দৃশ্য হয়ে থাকবে। সাই-ফাই/হররের মোড়কে এটি আসলে সুস্বাদু পারিবারিক কাব্য।


তিন.

চলচ্চিত্রে একটি দুর্দান্ত সাব-প্লটের ব্যবহার দেখা যায়, তা হলো লি দম্পতির বড়ো মেয়ে রেগান জন্ম থেকেই মূক ও বধির। তাই তার সঙ্গে যোগাযোগের স্বার্থেই গোটা পরিবারকে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে হয়। মেয়েটির অক্ষমতায় শেষ পর্যন্ত শব্দহীনতার এই নতুন বাস্তবতাই তার পরিবারটিকে বাঁচিয়ে দেয়। আশ্চর্য হলেও সত্য যে রেগান চরিত্রে অভিনয় করা মিলিসেন্ট সিমন্ডস সত্যিকারই মূক ও বধির। আমি নিশ্চিত একজন মূক ও বধির সন্তানের বাবা-মায়ের সত্যিকার ভূমিকা বুঝতে মিলিসেন্ট সিমন্ডসের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছে।


চলচ্চিত্রটির চিত্রনাট্যে অনেক ফাঁকফোকর আছে, যা যৌক্তিক মনকে বিরক্ত করবে নিশ্চিত, যেটাকে ইংরেজিতে বলে প্লটহোল। তবে বিষয়বস্তুর আবেদন ও চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সামগ্রিক নিয়তের কারণে সেগুলোকে অনেকেই হয়তো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে চাইবে। কেউ কেউ হয়তো চাইবেও না। তবে এ নিয়ে কোনো সংশয় নেই যে, এ রকম দারুণ একটি গল্প পাওয়ার পর সেটিকে আরেকটু সচেতনভাবে ঘষামাজা করলেই হতো। শুধু চিত্রনাট্যের কিছু আলগা বাঁধনের কারণে চলচ্চিত্রটি হয়তোবা কালোত্তীর্ণ হতে হতে হলো না। অনেক সময় দেখা যায় নির্মাতা গল্পের ইউনিকনেসে এতোটাই মজে যান যে, অনেক আলগা সুতো তার চোখ এড়িয়ে যায়। চলচ্চিত্রটি আমাকে বানাতেই হবে নির্মাতাদের সেই ক্লাসিক তাড়াহুড়োটি হয়তো এখানে হয়েছে। অল্প কয়েকজন অভিনয়শিল্পীর প্রত্যেকেই এখানে ভালো অভিনয় করেছে। তবে আলাদা করে মিলিসেন্ট সিমন্ডস ও এমিলি ব্লান্ট-এর কথা বলতেই হয়। এমিলি ব্লান্ট যে দারুণ অভিনয়শিল্পী সেটা আবারও তিনি প্রমাণ করলেন। আর দর্শককে নিজের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য করলেন মিলিসেন্ট সিমন্ডস। একজন মূক-বধিরের ভূমিকায় অভিব্যক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, চেহারাতে কী অসাধারণ নিস্পাপ অভিব্যক্তি! কতো লম্বা লম্বা বাক্য যে মেয়েটি শুধু তার চোখ দিয়ে বলে গেলো!


চলচ্চিত্রে স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করা জন ক্রাজিন্সকির নির্মাতা হিসেবে এটি তার তৃতীয় নির্মাণ। গল্পটি বলতে চাওয়ার তার যে আকাঙ্ক্ষা সেটি অনুভব করা গেছে। বলে রাখা ভালো, ক্রাজিন্সকি ও ব্লান্ট বাস্তব জীবনেও স্বামী-স্ত্রী। চলচ্চিত্রে ক্যামেরার কাজ ভালো, তবে আবহসঙ্গীত একটু বেশিই গতানুগতিক মনে হয়েছে। চলচ্চিত্রের সেটটি নিউ ইয়র্কের একটি খামারে নির্মাণ করা হয়, সেটাও দারুণ ছিলো।


চার.

মানুষের ইতিহাসটাই এমন যে সে জন্মগতভাবেই অ্যানার্কিস্ট। তাই হাজার বছর ধরেই শাসককে খেয়াল রাখতে হয়েছে, সতর্ক থাকতে হয়েছে, অধীনস্ত মানুষ যেনো স্বর খুঁজে না পায়; আর যারা পায় তাদেরকে চুপ করিয়ে রাখা। পৃথিবীর সব শাসনের ইতিহাসেই কমবেশি এটি দেখা গেছে। তো দমিয়ে রাখা মানুষ কী করে, তারা কি পুরোপুরি নিশ্চুপ হয়ে যায়? না, তা হয় না। কিছুদিনের জন্য তাদের চুপ করিয়ে রাখা গেলেও তারা ঠিকই ভিন্ন উপায় খুঁজে নেয়। কোনো কোনো জাতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তাদের কণ্ঠ যতো রোধ করা হয়েছে, সে জাতির কৌতুকবোধ ততো শাণিত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক মৌলবাদের তীক্ষ্ম নজরে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রুশ কৌতুক তার উদাহরণ। বেদুঈন সমাজে দেখা যায়, পুরুষতন্ত্রের ভারে পিষ্ট নারীরা তাদের গানের মধ্য দিয়ে পুরুষদের নানা দুর্বলতা নিয়ে খোঁচা দেয়, এটা তাদের প্রতিবাদের ভাষা। মোদ্দা কথা হলো, জনগণকে খুঁজে বের করতে হয় শাসকের দুর্বলতা, ভয় ও আতঙ্কের জায়গাটি। বর্তমান বিশ্বের সব শাসকের ভয়ের একটি সাধারণ ক্ষেত্র হলো শব্দ। শব্দ বা সাউন্ডকে তারা ভয় পায়। কোথাও তাদের সামান্যতম বিরুদ্ধাচরণ করা মাত্রই তারা বিদ্যুৎ গতিতে হামলে পড়ছে সেই শব্দকারকের ওপর। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, চলচ্চিত্রের সেই অদ্ভুত প্রজাতিটির সঙ্গে বর্তমান শাসকদের কোনো মিল কি খুঁজে পাওয়া যায়? ওই প্রজাতিটির মতোই এই পৃথিবীর শাসকেরা চায় সবাইকে চুপ করিয়ে রাখতে। যতোক্ষণ তুমি চুপ করে সয়ে যাবে সব যন্ত্রণা, বেদনা ও কষ্ট, ততোদিন তুমি নিরাপদ। কিন্তু শব্দ করলে, প্রশ্ন করলে, তাদের নির্মিত নিয়ম ভেঙে ফেললেই তারা তোমাকে আক্রমণ করবে।


প্রভুদের চাওয়া মতোই সবাই চুপ করে থাকছে, আসন্ন প্রতিটি বিপদেই নিজেকে খাপ খাইয়ে তার মধ্য দিয়েই বাঁচার নতুন নতুন উপায় খুঁজে বের করছে। কিন্তু তাতে কী হচ্ছে, আখেরে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। নানা উপায় বাতলেও চলচ্চিত্রে বাবা কি পেরেছেন তার সন্তানকে বাঁচাতে, কিংবা নিজে বাঁচতে? শাসক সবসময় তার পথ ঠিকই খুঁজে নেয়। চলচ্চিত্রের শেষটি একটি দারুণ সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়, চিন্তাতে জ্বালানি দেয়। দেখা যায়, কোথাও বিন্দুমাত্র শব্দ পেলে তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া প্রজাতিটি আসলে নিজেই শব্দের ভয়ে ভীত! কোনো শব্দ সে সহ্য করতে পারে না। তাই রেগান যখন উপলব্ধি করেন, এই শব্দই আসলে প্রজাতিটির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা, তাই একে দমিয়ে রাখতে তার এতো নিষ্ঠুরতা; তখন সে এতো জোরে শব্দ তৈরি করে যে এতেই পতন ঘটে ওই প্রজাতির।


চলচ্চিত্রের শেষটি আসলে কী বলে? সবাই এমন এক পরিস্থিতিতে বাস করছে, যেখানে ভেঙে পড়ছে একটির পর একটি মানবীয় বৈশিষ্ট্য। মানুষের বাঁচার বৃত্ত ছোটো থেকে আরো ছোটো হয়ে আসছে, তারা কোনো শব্দ করছে না। আর যারা শব্দ করছে, তারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। যারা বেঁচে আছে তারা মিউমিউ করে কথা বলছে, এ যেনো চলচ্চিত্রের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মতো। কিন্তু চুপ করে থেকেও কি মানুষ ভালো আছে? প্রতিদিন একেকটা নতুন নিয়ম, নতুন পরিবর্তিত গজব নেমে আসছে মানুষের ওপর। মানুষ কি বুঝতে পারছে না শব্দকে কেনো এতো ভয় শাসকের; কারণ চলচ্চিত্রের ওই প্রজাতিটির মতোই শব্দ তার সবচেয়ে দুর্বলতম জায়গা? এর থেকে নিষ্কৃতির পথ কিন্তু স্পষ্ট করে দেখিয়ে গেছে আ কোয়াইট প্লেইস


লেখক : অনিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

anikislam.ru@gmail.com

https://www.facebook.com/aislam.ru


বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন