Magic Lanthon

               

এ এইচ মানিক

প্রকাশিত ২৪ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ঢাকাই চলচ্চিত্রের সত্য-বাস্তব আখ্যান ‘দি ডিরেক্টর’

এ এইচ মানিক


পরীক্ষান্তে দেখা যায় যে, চলচ্চিত্রটিতে মূল কাহিনী অপর্যাপ্ত, এতে অশ্লীল সংলাপের ব্যবহার রয়েছে, একটি সাংস্কৃতিক পেশার গোষ্ঠিকে হেয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা জন্মায় এমনভাবে কাহিনীর চিত্রায়ন করা হয়েছে, আগ্নোয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার আছে এতে, নির্বিকারে মানুষ হত্যা, আইনহীনতা ও লাম্পট্যপূর্ণ জীবন যাপনকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন হয়েছে।

দি ডিরেক্টরকে ছাড়পত্র না দেওয়ার ব্যাপারে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে সেন্সর বোর্ড যে যুক্তি দিয়েছিলো, সেখানে এমনই মন্তব্য করা হয়। তবে চলচ্চিত্রটি দেখার পর দর্শক হিসেবে মনে হয়েছে, নির্মাতা কামরুজ্জামান কামু এতে চলচ্চিত্রনির্মাতা, নির্মাণ কৌশল, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়ে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন, যা ঢাকাই চলচ্চিত্রশিল্পকে রিপ্রেজেন্ট করে। যার অনেক কিছুই--আমরা যারা চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রক্রিয়া থেকে অনেক দূরে অবস্থান করি, মানে যারা সাধারণ দর্শক--খুব বেশি অহেতুক বাড়াবাড়ি মনে হয়নি। এখন প্রশ্ন, কেনো এমন মনে হলো না? এমন হতে পারে গত এক দশকে এফ ডি সিকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের মান যেখানে গিয়ে পৌঁছেছে, সেই চলচ্চিত্র দেখার পর যেকোনো দর্শক দি ডিরেক্টর দেখলে তার কাছে এর ন্যারেটিভ সত্যের অপলাপ মনে হওয়ার খুব বেশি কারণ নেই। কিন্তু তারপরও একটি সাংস্কৃতিক পেশার গোষ্ঠীকে হেয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এই যুক্তি দিয়ে সেন্সরবোর্ডের এই বাড়াবাড়ি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উল্টো করে চিন্তা করলে, চলচ্চিত্রটির ন্যারেটিভের সঙ্গে যদি বাস্তব অবস্থার মিল না থাকে তাহলে এটিকে ছাড়পত্র দিলেইবা কী সমস্যা! আর ছাড়পত্র না দেওয়ার যুক্তি হিসেবে উপস্থাপনের আরো যেসব যুক্তি যেমন, অশ্লীলতা, আইনহীনতা, নির্বিকারে মানুষ হত্যালাম্পট্যপূর্ণ জীবনযাপন সেন্সর বোর্ড দিয়েছে, তা আরো দেড় যুগ আগে ঢাকাই চলচ্চিত্র দেখিয়ে শেষ করেছে।

এই রকম একটি বাস্তবতায় দর্শক ও গণমাধ্যমের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে দি ডিরেক্টর দেখার পর আমার মনে এর টেক্সটের নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্যই এই প্রবন্ধের অবতারণা। তার আগে একটি কথা বলে নেওয়া জরুরি, শেষ পর্যন্ত কয়েক সেকেন্ডের একটি দৃশ্য কর্তন করে দি ডিরেক্টর কিন্তু ছাড়পত্র পায়। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পার করে অবশেষে চলচ্চিত্রটিকে ইউটিউবে মুক্তি দিয়ে দর্শকের সামনে আনেন নির্মাতা। দেশে প্রথমবারের মতো পূর্ণদৈর্ঘ্য এই চলচ্চিত্রটি কোনো প্রেক্ষাগৃহ বা টেলিভিশন ছাড়া ইউটিউবে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে নির্মাতা দাবি করেন। নির্মাতা কামু আরো দাবি করেন, তিনি পেশাদার নির্মাতা নন, বানাতে বানাতে হয়ে যাওয়া ছবি দি ডিরেক্টর ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটির কাজ শুরু করেন নির্মাতা। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে তিনি ২০১৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে চলচ্চিত্রটি সেন্সর বোর্ডে জমা দেন। ছাড়পত্র পাওয়ার পর নির্মাতা চলচ্চিত্রটিকে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোনো প্রেক্ষাগৃহই চলচ্চিত্রটিকে নিতে রাজি হয়নি। পরে টিভি চ্যানেলে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন।

এসব দেখি কানার হাটবাজার

চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য একজন নির্মাতার অবশ্যই চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত খুঁটিনাটি জ্ঞান থাকতে হয়। পড়াশোনা করতে হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক নানান বইপুস্তক। শুধু পড়াশোনা নয়, এর জন্য দরকার হয় চলচ্চিত্রবিষয়ক বহুমুখী প্রশিক্ষণেরও। কিন্তু এতোসব পদক্ষেপ অনুসরণ করে কজন নির্মাতা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে? ঢাকাই চলচ্চিত্রের অধিকাংশ নির্মাতারই না আছে চলচ্চিত্রবিষয়ক পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা; না আছে এর সম্পর্কিত জ্ঞান। অথচ একদল নির্মাতা, যারা শুধু নিজেকে নির্মাতা হিসেবে পরিচিত করার জন্যই চলচ্চিত্র সম্পর্কিত ন্যূনতম জ্ঞান না থাকার পরও সরাসরি চলচ্চিত্র নির্মাণে নিয়োজিত হয়। আরেকটি পক্ষ কোনো একজন নির্মাতার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের একপর্যায়ে একক নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অবশ্য এর বাইরে আরেক ধরনের নির্মাতা আছে, যারা পূর্বপরিকল্পনার মাধ্যমে সময় নিয়ে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ ও পড়ালেখার মধ্য দিয়ে নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা চালায়। বলতে গেলে প্রথম দুই ধরনের নির্মাতার বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ঘটেছে দি ডিরেক্টর-এ কামু নামের নির্মাতা চরিত্রটির মধ্যে।

চলচ্চিত্রের দুই মিনিট ২৮ সেকেন্ডে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখা শেষ করে কামু ও পূর্ণিমা নৌকায় বেড়াতে যায়। নৌকায় ভাসতে ভাসতে তারা চলচ্চিত্রবিষয়ক নানা কথাবার্তা বলতে থাকে। এ সময় পূর্ণিমা সদ্য দেখে ফেরা চলচ্চিত্রটির নির্মাতার প্রশংসা করতে থাকেন। একপর্যায়ে কামুকে উদ্দেশ করে পূর্ণিমা বলেন, ডিরেক্টরটা কী আসলে দেখো! ডিরেক্টরটা মানুষ নাকি দেবতা? কামু হেয়ালি করে জবাব দেন, ধুর! ছবি বানানো কোনো ব্যাপার নাকি! আমি ও রকম অনেক ছবি বানাইতে পারবো। তখন পূর্ণিমা মুচকি হেসে বলেন, শোনো, এ রকম, এখানে বসে থেকে অনেক ছবি বানিয়ে দেওয়া যায়, বুঝেছো? মুখে সবকিছু বলা যায় কিন্তু আসলে সম্ভব না। এসব কথা বলতে বলতে তারা নিজেদের গন্তব্যে যেতে থাকে। চলচ্চিত্রের ছয় মিনিট তিন সেকেন্ড। পূর্ণিমাকে কামু বলেন, আমি তোমাকে বিয়ে করবো পূর্ণিমা। পূর্ণিমা খানিকটা হেসে বলেন, একটা শর্ত আছে। কামু তার শর্তের কথা জানতে চাইলে পূর্ণিমা বলেন, তুমি যদি ডিরেক্টর হতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো। এরপর কামু খানিক চিন্তা করে বলেন, ঠিক আছে, তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি ডিরেক্টরই হবো। ডিরেক্টর হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত পূর্ণিমাকে অপেক্ষা করতে বলেন কামু।

অন্যদিকে চলচ্চিত্রের আট মিনিট ৪০ সেকেন্ডে কামুকে দেখা যায় ঢাকায়। বুঝতে কষ্ট হয় না প্রেমিকাকে পেতেই চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার নেশায় ঢাকায় কামুর পদার্পণ। এর একটু পরেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বি এফ ডি সি) প্রধান ফটকের সামনে কামুকে দেখতে পেয়ে ডেকে নেন একক নায়িকা হতে চাওয়া চৈতি। নয় মিনিট ৪৩ সেকেন্ডে চৈতি উচ্ছ্বাস নিয়ে কামুকে বলেন, আর আপনাকে সহকারী হয়ে থাকতে হবে না। এখন থেকে আপনি ডিরেক্টর হয়ে থাকতে পারবেন। এ কথায় স্পষ্ট, ঢাকায় এসে কামু সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

পর পর এই দৃশ্য দুটির মধ্য দিয়ে নির্মাতা কামরুজ্জামান কামু দর্শক, নির্মাতা ও নতুন নির্মাতাদের যে বার্তা দিতে চেয়েছেন তা খালি চোখে স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কোনোধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেবল প্রেমিকার কথা রাখতে কীভাবে একজন সাধারণ মানুষ পরিচালক হয়ে ওঠে! এমনকি কামুর শিক্ষাগত যোগ্যতা, চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো আগ্রহ, কোনো পড়ালেখা এগুলোর কিছুই দেখানো হয় না! রাতারাতি কামু যেনো আলাদিনের চেরাগ পেয়ে পরিচালক বনে যান! আর কামুদের মতো পরিচালকদের নির্মিত চলচ্চিত্রের হাল ঠিক কেমন হবে, তাও বোঝা যায় এর পরবর্তী অংশে। এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্রের বেহাল দশা দেখেও।

অথচ চলচ্চিত্র এমন একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম, যেখানে বহুমাত্রিক শিল্পের সমন্বয় ঘটে। সঙ্গে ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি তো আছেই। এর সঙ্গে টেকনিকাল নানা বিষয় যেমন, ক্যামেরা, শিল্পনির্দেশনা, আলোকবিন্যাস, শব্দ, সম্পাদনা, কালার, অভিনয়, সঙ্গীত সব বিষয়ে একজন নির্মাতার জ্ঞান থাকাও জরুরি। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ সম্পর্কে প্রখ্যাত নির্মাতা ও চলচ্চিত্রশিক্ষক আলমগীর কবির বলেন, চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ থাকা উচিত। অভিনেতা, ক্যামেরাম্যান, সম্পাদক--সবারই এই শিক্ষা থাকা প্রয়োজন। চলচ্চিত্র একটা কৌশল (ক্রাফট)। অন্তত কাঠামোগত পরিপূর্ণতার (স্ট্রাকচারাল পারফেকশন) জন্য এ শিক্ষা একান্ত দরকার। চলচ্চিত্রের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখতে নির্মাতা বা এর সংশ্লিষ্টদের স্বনামখ্যাত হওয়া জরুরি নয়, বরং মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণই আসল কথা। অথচ ঢাকাই চলচ্চিত্র নির্মাণের গল্প অন্য কথা বলে। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশীয় বাজারে চলছে ভয়াবহ মন্দাবস্থা। তারই ফল হিসেবে ঢাকাই চলচ্চিত্র কারখানা এখন বন্ধ প্রায়। এই পরিস্থিতির আরো সমর্থন পাওয়া যায় আলমগীর কবিরের কথায়--

চলচ্চিত্র পরিচালকের মাধ্যম। অথচ ঢাকায় কি দেখছেন আপনি? স্ক্রিপ্ট যোগাড় করা হল, সম্পাদক নিজের খুশিমত কাটল, ক্যামেরাম্যান নিজের মত ছবি তুলল, সঙ্গীত পরিচালক নিজের মত গান তৈরি করল, তারপর সব জুড়ে দিয়ে ছবি হল। আর হিট করলে তিনি পরিচালক হয়ে গেলেন। ফলে দেখবেন বছরে এখানে ত্রিশটি ছবি মুক্তি পেলেও মনে হবে সব ছবিই যেন এক। একটার সঙ্গে আরেকটার পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যাবে না।

যদি ভাবো কিনছো আমায়, ভুল ভেবেছো

আগেই বলা হয়েছে, চৈতি এফ ডি সির সামনে কামুকে উচ্ছ্বসিত হয়ে প্রযোজক পাওয়ার খবর দেন। তার এই উচ্ছ্বাসে বোঝা যায়, ঢাকাই চলচ্চিত্রে প্রযোজক পাওয়া সত্যিই সোনার হরিণ পাওয়ার মতোই! কেননা প্রযোজকই চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করে। তবে শুধু অর্থলগ্নির সামর্থ্য থাকলেই প্রযোজক হওয়া যায় না। প্রযোজক হতে হলেও শিল্প (ব্যবসা ও শিল্প উভয় অর্থে) হিসেবে চলচ্চিত্রকে বুঝতে হয়, জানতে হয়। এটা এমন ব্যবসা, যা বাজারের আর দশটা ব্যবসার মতো টাকা থাকলেই করা যায় না। প্রযোজককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তিনি কোন চলচ্চিত্রটিতে অর্থ বিনিয়োগ করবেন আর কোনটাতে করবেন না।

চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে শিল্প ও ব্যবসা দুই দিকেই নজর রাখতে হয়। তবে সবাই যে এই সমন্বয়টা করতে পারে, এমন নয়। অনেকে কেবল পুঁজি বিনিয়োগ করে তা বাড়াতে চায়, অনেকে পুঁজির সঙ্গে শিল্পকেও সঙ্গে রাখে। আবার কেউ কেউ পুঁজি বাড়িয়ে নিয়ে, সেই পুঁজির কিছু অংশ শিল্প-চলচ্চিত্র নির্মাণে বিনিয়োগ করে। তবে প্রযোজক যাই করুক না কেনো, চলচ্চিত্র কিন্তু দিনশেষে নির্মাণ করে নির্মাতাই। একজন নির্মাতাই চলচ্চিত্রের সৃষ্টিকর্তা। কিন্তু এই সৃষ্টিকর্তাকে কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে চায় ব্যবসায়ী প্রযোজক। তখন চলচ্চিত্র তার সাধারণ গতি হারিয়ে ফেলে। এ নিয়ে কালজয়ী নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ভাষ্য এমন--

প্রযোজকের দৃষ্টিতে ছবির সার্থকতা তাঁর আর্থিক সাফল্যে। ছবি শিল্পসস্মত হলো-কি-না হলো--তাতে তাঁর একটা বড় এসে যায় না। ছবিতে, পয়সা হলো-কি-না-হলো সেটাই তাঁর প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। এই ব্যবসায়ীর উপরেই যখন পরিচালকের নির্ভর, তখন তাঁর দিকটা সে অগ্রাহ্য করবে কোন্ সাহসে? কেবলমাত্র আপন খেয়াল-খুশিকে চরিতার্থ করবার জন্য শিল্প সৃষ্টি--এ সুযোগ কবির আছে সঙ্গীতকার বা যন্ত্রশিল্পীর আছে; কিন্তু চলচ্চিত্র পরিচালকের নেই। তাঁকে যেমন দেখতে হবে শিল্পের দিক, তেমনি দেখতে হবে ব্যবসার প্রয়োজনটা, জনসাধারণের চাহিদাটা। এই চাহিদা মেটাতে গিয়ে যদি আর্টকে বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে অবশ্য আক্ষেপের কারণ ঘটে। কিন্তু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন অনেক দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে শিল্পের সঙ্গে জনপ্রিয়তার একটা চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। উদাহরণস্বরূপ চার্লি চ্যাপলিনের ছবির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। অবশ্য এই সমন্বয় সহজ নয় এবং এর কোনো ফর্মূলাও নেই। কিন্তু অতীতে দৃষ্টান্ত আছে বলেই ভবিষ্যতে সম্ভাবনাও আছে।

দি ডিরেক্টর-এর ১০ মিনিট ১৮ সেকেন্ড থেকে ১২ মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর্যন্ত কামুকে প্রযোজক কচি খন্দকার চলচ্চিত্রে কয়টা গান লাগবে, কাহিনি কী হবে এ নিয়ে নির্দেশনা দেন। কামুকে প্রযোজক বলেন, কবিতা যখন লেখো ছবিও খুব ভালো বানাতে পারবা আরকি। এখানে কামু ও প্রযোজকের কথোপকথন এমন,

নায়িকা : শুধু কবিতা না, উনি তো গানও লেখে। ওই যে আমার বাড়ি রঙের মেলায় গানটা আছে নাহ? ওটা তো উনারই লেখা।

কামু : তোমার বাড়ি রঙের মেলায়

কচি খন্দকার : ওহ আচ্ছা। শোনো, ছবিতে গানের ভূমিকা ব্যাপক। মানে আমি প্রথমে আমার ছবির জন্য কয়টা গান, মানে যে ছবিতে যা গান লাগে [সেটা ঠিক করি]। আমি বললাম সত্যদাকে, কিছু গান লেখেন। সত্যদা ছবির জন্য গান লিখলো। গান লেখার পরে ওই গান ধরে আমি কাহিনি ঠিক করলাম। মানে, কাহিনি কীভাবে হবে আরকি। কাহিনি যখন ঠিক হয়ে গেলো, তারপরে কিন্তু আমি ডিরেক্টরকে বললাম ছবি বানাও। এই ছবির নাম দিয়েছিলাম চুড়িওয়ালা। সে অসম্ভব ব্যাপার! মানে সেসময় এ ছবি তো হিট একেবারে। সুপার ডুপার হিট আরকি! দেখো, গান ছবির জন্য কী ভূমিকা রাখতে পারে! তো যেমন গান লেখো, তাহলে আমার মনে হয়, এই ছবি বানাতে তোমার ভূমিকা অনেক ভালো হয়ে উঠবে আরকি। এই ছবিটা যথেষ্ট সুন্দর হবে। ... আর একটা কথা বলি, সেটি হচ্ছে যে, প্রেম। মানে প্রেমের গল্প কিন্তু শেষ হয়ে যায় না। এটা কিন্তু আছে কিন্তু। এই যে এতো ছবি হচ্ছে, বেশিরভাগ ছবি কিন্তু প্রেমের ওপর নির্ভর করেই হয় কিন্তু।

কামু : ওই যে ভাই, আমি একটা প্রেমের ছবি বানাতে চাই। হিন্দু-মুসলমান প্রেম। বর্ডারের ওই পাড়ের নায়িকা, এপাড়ের নায়ক। এটা একদম বর্ডারেই শুট করতে চাই। ছবির নাম প্রেমের বর্ডার

কচি খন্দকার : প্রেমের বর্ডার; অসাধারণ নাম কিন্তু! নামের মধ্যেই তো কৌতূহল। মানে প্রেমের বর্ডার নাম দেখেই কিন্তু মানুষ ছুটে যাবে হলে। ছবির জন্য গান লিখে ফেলো। তারপর কাহিনি লিখে নিয়ে এসো। আমি দেখি। তোমার মধ্যে তো একটা উত্তেজনা আছেই, আমার ভিতরে উত্তেজনা ছড়িয়ে যাক। আমি দেখার পরে বুঝতে পারি, কেমন লিখলে তুমি। ঠিক আছে নাহ? আমি আশা করি, তোমার এই চিন্তাগুলো যদি সত্যিকার অর্থে প্রয়োগ করতে পারো, ছবি আমরা সঠিকভাবে সবার কাছে নিয়ে যেতে পারবো।

প্রযোজকের এমন বক্তব্যে সহজেই বোঝা যায়, নবীণ নির্মাতা কামুকে তার চলচ্চিত্রের জন্য কয়টা গান বা চলচ্চিত্রের কাহিনি ঠিক কী হবে তার নির্দেশনা তিনি দিচ্ছেন। এবং ওই গান ধরেই নাকি চলচ্চিত্রের কাহিনি নির্ধারণ করতে হবে। এখন নির্মাতা প্রাধান্যশীল গণমাধ্যম চলচ্চিত্রে যদি প্রযোজক কোনো নির্মাতাকে ঠিক করে দেন, চলচ্চিত্রের কোনটা কী হবে, তাহলে তা আর যাই হোক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না। সেটা হয় প্রযোজকের ব্যবসা। আর প্রযোজকের এই ব্যবসায় যদি নির্মাতা নিজেকে বিকিয়ে দেয়, তাহলে আর চলচ্চিত্র থাকে না। প্রযোজককে ঠেকিয়ে দেওয়ার জন্য একজন নির্মাতার যে ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতা প্রয়োজন, তা গড়ে ওঠে শিল্প-সাহিত্য-কবিতা-দেশবিদেশি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র দেখা এবং তার চর্চার মধ্য দিয়ে। আর এভাবেই একপর্যায়ে কোনো নির্মাতার মাথায় রূপকল্পের সৃষ্টি হয়, পরে তারই প্রকাশ ঘটে সেলুলয়েডে। এখানে প্রযোজক নির্মাতার সেই রূপকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা নিয়ে হাজির থাকে মাত্র। আবার একজন নির্মাতার কাজ প্রযোজককে খুঁজে ফেরা, আর প্রযোজক খুঁজে ফেরে একজন ভালো নির্মাতাকে। দুজনের পারস্পরিক বোঝাপড়া দিয়েই একটা চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো নায়িকা যদি কোনো নির্মাতাকে প্রযোজক ঠিক করে দেয়, তাহলে এর মধ্যে প্রযোজক কচি খন্দকারের মতো বলতে হয়, একটা কিন্তু আছে।

চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩৭ মিনিট আট সেকেন্ডে দেখা যায়, কামু তার বাল্যকালের বন্ধু জি এম নজুকে পরিচালক না হতে পারার কথা জানান। দুই বন্ধুর কথোপকথন এমন--

নজু : ডিরেক্টর হতে তোর অসুবিধাটা কোথায়?

কামু : প্রোডিউসার পাই নাই দোস্ত।

নজু : তুই ডিরেক্টর হবি। আমি তোর ছবি প্রোডিউস করবো।

কামু : সত্যি দোস্ত!

নজু : হ্যাঁ।

কামু : আমি ছবি বানাবো!

নজু : হ্যাঁ। তুই ছবি বানাবি। ডিরেক্টর তোকে হতেই হবে। ডিরেক্টর তুই হবিই।

একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, যে কামু প্রেমিকাকে খুশি করার জন্য ডিরেক্টর হতে এসেছে, সেই কামু এখন চলচ্চিত্র বানাচ্ছে বন্ধু জি এম নজুর প্রযোজনায়, যিনি কিনা একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসী নজু জানে না একজন প্রযোজক কে, কী তার যোগ্যতা, তার কাজইবা কী? অথবা একজন চলচ্চিত্রনির্মাতাইবা কে, কীভাবে একজন নির্মাতা হয়ে ওঠে! নজু যা জানে তা হলো শুধু ডিরেক্টর শব্দটা আর চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থ লাগে। এবং এর ওপর ভর করেই তিনি বন্ধু কামুর চলচ্চিত্রে অর্থলগ্নি করে তাকে ডিরেক্টর হতে সাহায্য করতে চান!

চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১০ মিনিট ১৮ সেকেন্ডে দেখা যায়, প্রযোজক কচি খন্দকার সকালে খবরের কাগজ মারফত জানতে পারেন, তার প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্রের নির্মাতা নায়িকাসহ রহস্যজনকভাবে উধাও হয়েছে। এমন সংবাদে অস্থির হয়ে কামুকে প্রযোজক কচি মুঠোফোনে বলতে থাকেন, ডিরেক্টর রতন আমাকে ধ্বংস করে গেছে, আমার লাখ লাখ টাকা পানিতে গেছে। কামু কচিকে টেনশন করতে নিষেধ করলে তিনি উল্টো বলতে থাকেন, টেনশন নেবো না মানে? আমার প্রথম ছবি। আমার এতো বড়ো সর্বনাশ যে করলো আর টেনশন নেবো না? টেনশন কেনো নেবো না বলো? উত্তরে কামু প্রযোজককে অভয় দিয়ে নিজের কাছে ডাকেন। বলেন, আপনার ছবি শেষ হয়ে যাবে, ঈদে শুভমুক্তিও হবে। এর একটু পরেই প্রযোজক কচির দেখা হয় আরেক নির্মাতা মারজুক রাসেলের সঙ্গে। সহজেই বোঝা যায়, কচি তার লোকসান হওয়া টাকা ফেরাতে মারজুকের সঙ্গে কথা বলেন, যেনো ঈদে তার চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডে প্রযোজকের সঙ্গে মারজুকের কথোপকথন এমন--

মারজুক : ছবি কইরা দিমু কিন্তু আমার তো আইটেম গান লাগবো। নায়িকা হইতে হইবো সেই রকম!

কচি : কী গান?

মারজুক : আরে আইটেম গান। আইটেম গান বোঝেন নাহ! নায়িকা লাগবো সেই রকম!

কচি : কী রকম নায়িকা লাগবো, বলেন?

মারজুক : সেরকম মানে সেরকম!

উপরের সংলাপ থেকে বোঝা যায়, কচির প্রযোজনায় নির্মিত সেই চলচ্চিত্রের কাহিনি, চিত্রনাট্য, বর্তমান অবস্থা, নির্মাতার দার্শনিক অবস্থান, অভিনয়শিল্পীদের অবস্থা কোনো কিছু নিয়েই নতুন দায়িত্ব পাওয়া নির্মাতা মারজুকের কোনো চিন্তা নেই। তার চিন্তা কেবল সেই রকম নায়িকা (!) আর আইটেম গান নিয়ে। বুঝতে কষ্ট হয় না, এই অবস্থাই এখন চলচ্চিত্রশিল্পে চলছে। মূল চলচ্চিত্রের চেয়ে বেশি আলোচনা আইটেম গান আর তার নারী শরীর নিয়ে। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে। সম্প্রতি বিক্ষোভ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন শামীম আহমেদ রনি নামে এক নির্মাতা। চলচ্চিত্র নিয়ে মূল কাজ শুরুর আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর আসতে থাকে তাতে ব্যবহৃত একটি আইটেম গান নিয়ে। প্রতিবেদনে খুব দম্ভ নিয়ে বলা হয়, বলিউড তারকা সানি লিওনি এই আইটেম গানের সঙ্গে নাচবেন। বুঝতে কষ্ট হয় না, কোনো একটি বিশেষ চলচ্চিত্রের চেয়ে, একটি আইটেম গান কতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে! তার মানে দিনশেষে চলচ্চিত্র মানেই এক শ্রেণির নির্মাতার কাছে কেবল নারী শরীর।

তবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে নারীর এই শরীরী উপস্থাপন নতুন নয়। ৬০-এর দশকের শেষ দিকে এবং ৭০ দশকে চলচ্চিত্রে নারী শরীরের উপস্থাপন নানাভাবেই আলোচনায় এসেছে। সেই ধারাবাহিকতায় ৮০র দশকে পোশাকি-ফ্যান্টাসি ধারার চলচ্চিত্রেও তা ছিলো। তবে এটি ঢাকাই চলচ্চিত্রে চরম আকার ধারণ করে ৯০ দশকের শেষ দিকে এবং শূন্য দশকের প্রথমে। বিশেষ করে এই সময়টাতে বাংলাদেশে যৌনতানির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে থাকে। যা কাটপিসওয়ালা চলচ্চিত্র নামেও পরিচিত। এখানে নারী শরীরকে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করা হয়। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব আমস্টারডাম-এর নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী লোটে হুক বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণার সার্বিক ফলাফলে লোটে হুক বলেন, ছয়টা গান + দশটা মারপিট + একটা প্রেম = বাংলা ছবি। আর এই গানের চিত্রায়ণে নারী শরীর প্রাধান্য পায়। যদিও আইটেম গান ধারণাটি বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে বলিউড থেকে। সেখানে এর শুরু সেই ১৯৪০-এর দশকে। সেসময় নির্মাতারা চলচ্চিত্রের গতানুগতিক কাহিনি ও গানের বাইরে গিয়ে দর্শককে একটু ভিন্ন বিনোদন দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। সেই চিন্তা থেকেই আইটেম সঙ জাতীয় গানের শুরু। কিন্তু

সে সময় বিশেষ ধরনের এ গানে পারফর্ম করার জন্য অভিনেতা-অভিনেত্রী পাওয়া সহজ ছিল না। তখন সাধারণ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বাইরে এ ধরনের পারফরম্যান্সের জন্য বিশেষ ধরনের অভিনেতা-অভিনেত্রীর প্রয়োজন পড়ল। তাদের জন্য সিনেমায় সৃষ্টি করা হলো নতুন ধরনের চরিত্র। যাদেরকে প্রচলিত ভাষায় বলা হলো ভ্যাম্প(vamp)। এসব চরিত্রের মূল কাজ ছিল সিনেমার খলনায়কের আস্তানায়, মদের দোকানে, পতিতালয়ে, ক্যাবারে যৌনাবেদনময়ী অঙ্গভঙ্গির উপস্থাপনে নাচ করা।

এই ভ্যাম্প ও তাদের চিত্রায়িত গানই সময়ের বিবর্তনে বলিউডে আইটেম সঙ নাম পেয়েছে। এটাই সীমানা পেরিয়ে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে। আর সময়ের সঙ্গে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে চলচ্চিত্রের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে!

আবার ফিরে আসি নির্মাতার উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় আরেকজন নির্মাতার সেই চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রসঙ্গে। কোনো নির্মাতার চলচ্চিত্র নির্মাণের মাঝপথে গিয়ে মৃত্যু কিংবা যেকোনো কারণে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়। সেক্ষেত্রে নতুন করে যিনি এই দায়িত্বটা নেবে, তার সেই চলচ্চিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হয়। যদিও প্রত্যেকের শিল্প সৃষ্টির ধরন আলাদা, তাই চিন্তাও আলাদা। ফলে হঠাৎ করে এ ধরনের দায়িত্ব নেওয়া হঠকারি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আগের নির্মাতার প্রধান সহকারী পরিচালককেই এ ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কারণ মূল নির্মাতার সঙ্গে তার সহকারীর মাথাতেও চলচ্চিত্রটি পরিচ্ছন্নভাবে থাকে। কিন্তু এর কোনোটাই দি ডিরেক্টর-এ দেখা যায় না। দি ডিরেক্টর দেখে এটিকে স্যাটায়ারধর্মী চলচ্চিত্র মনে হয়েছে। একই সঙ্গে মনে হয়েছে চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে এ উপস্থাপন যথাযথই।

শরীরী নায়িকা

চলচ্চিত্রে চৈতির আগ্রহ প্রধান নায়িকা হওয়ার। তাই চলচ্চিত্রের ১০ মিনিটে প্রযোজক কচির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় গাড়ির ভিতর চৈতি কামুকে বলেন, আমাকে সাইড নায়িকা করলে হবে না, আমাকে মেইন নায়িকা করতে হবে। আবার চলচ্চিত্রের ২০ মিনিটে কামুকে চৈতি অনেকটা রাগান্বিত সুরে বলতে থাকেন, রতন তো সিনেমার শুটিং শুরু কইরা দিলো, আর তোমার প্রোডিউসার তোমারে তো পাত্তাই দিলো না। দেখো, আমারে ঝুলাই রেখো না কামু। নায়িকা আমাকে হতেই হবে। সেটা যেভাবেই হোক, তুমি না পারলে আমি গিয়াস উদ্দিন সেলিমের কাছে যামু। চৈতির এ কথায় স্পষ্ট বোঝা যায়, তাকে যেকোনো মূল্যে নায়িকা হতেই হবে।

চলচ্চিত্রের ২৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে কামুকে চৈতি আবারও বলতে থাকেন, তোমার রেফারি কবে বাঁশি বাজাবে? যা করার তাড়াতাড়ি করো কামু। নায়িকা হতে না পারলে আমি বাঁচবো না। এক ঘণ্টা আট মিনিট ১০ সেকেন্ডে আবারও চৈতির নায়িকা হওয়া প্রসঙ্গে কামুর সঙ্গে তার কথোপকথন এমন,

চৈতি : কামু ভাই, আপনি এখন পর্যন্ত আমার নায়িকা হওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন নাহ, ধুর!

কামু : দেবো, দেবো।

চৈতি : কবে? রূপ যৌবন শেষ হয়ে গেলে নাকি, ধুর!

কামু : হবে, হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, অভিনয়শিল্পী, নায়িকা হওয়ার জন্য ঠিক কী ধরনের গুণ থাকতে হয়? কিংবা এ প্রশ্নও উঠতে পারে, নায়িকাই হতে হবে কেনো? প্রথম প্রশ্নের উত্তর এককথায় হলো--অভিনয় গুণ। এই অভিনয় গুণ দেখেই একজন নির্মাতা তার স্বপ্নের/কল্পনার কোনো চরিত্রের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অভিনয়শিল্পীকে বেছে নেয়। এখানে বিশেষ সেই চরিত্র এবং তা পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারার যে দক্ষতা সেটা গুরুত্বপূর্ণ, নায়িকার সঙ্গে নির্মাতার সম্পর্ক কিংবা তার শরীরী রূপ-গুণ গুরুত্বপূর্ণ নয়। উদ্ভাবনের পর থেকেই চলচ্চিত্রে পুঁজির ব্যবহার ছিলো। দিনে দিনে সেই পুঁজির ব্যবহার বেড়েছে বই কমেনি। চলচ্চিত্রের যে গ্রান্ড-ন্যারেটিভ একশো বছরে নির্মিত হয়েছে সেখানে চলচ্চিত্র ব্যয়বহুল; অতএব শিল্প ও বাণিজ্যের সমঝোতা এক্ষেত্রে অনিবার্য। চলচ্চিত্র পুরুষ-দৃষ্টিসর্বস্ব দৃশ্যমাধ্যম।১০ ফলে পুঁজি ও পুরুষ-দৃষ্টিসর্বস্ব অবস্থান থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে গিয়ে দিনশেষে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারী শরীর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীর চলচ্চিত্র কারখানাতেও। তবে সব নারী অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রেই যে এমনটা ঘটে, তা নয়। এই বাস্তবতায় নির্মাতা কামরুজ্জামান কামু নারী শরীর নিয়ে যে আধেয় দি ডিরেক্টর-এ রিপ্রেজেন্ট করেছেন তা কোনোভাবেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

ডিপজল প্রপঞ্চ : গুরু-শিষ্য সমাচার

চলচ্চিত্রের শুরুতেই প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় দেখা যায়, মান্না অভিনীত কোনো এক চলচ্চিত্রের মারামারি-রক্তপাতের দৃশ্য। কামু ও পূর্ণিমা সেই চলচ্চিত্র উপভোগ করেন। এরপর প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হয়ে পূর্ণিমার মুখে শোনা যায় সেই চলচ্চিত্রনির্মাতার প্রশংসা। এর কিছু পরেই কামু শুধু তার প্রেমিকার কথা রাখতেই ডিরেক্টর হওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় পাড়ি জমান। ৩৭ মিনিট সাত সেকেন্ডে ডিপজলের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কামু হাতজোড় করে বলতে থাকেন, ওস্তাদ, আপনি দোয়া রাখবেন, দোয়া। কামুর ঘরের দেয়ালজুড়ে দেখা যায় ডিপজল অভিনীত চলচ্চিত্রের পোস্টার। আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না, ডিপজলের একনিষ্ঠ ভক্ত একজন নির্মাতা ঠিক কী ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তাভাবনা করতে পারে।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের এক আলোচিত নাম ডিপজল। ৯০ দশকের শেষ থেকে শূন্য দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকাই চলচ্চিত্রে ডিপজল অনেকটা একাই নেতৃত্ব দেন। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবরের টাকার পাহাড় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নায়ক হিসেবে ব্যবসায়ী থেকে চলচ্চিত্রজগতে আসেন ডিপজল। অল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকর বিশু চলচ্চিত্রে খল অভিনয়শিল্পী হিসেবে খ্যাতি পান তিনি। এরপর এ ধরনের চরিত্রে তিনি দুই ডজনেরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ৯০ দশকের শেষের দিক হতে ডিপজল অভিনীত যে চলচ্চিত্রগুলো এসেছে তার বেশিরভাগই ছিলো মারামারি, রক্তপাত, সহিংসতাপূর্ণ। এ সময়ে মান্না-ডিপজল জুটিকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে নির্মাতা কাজী হায়াৎ পর্দায় সহিংসতার মাত্রা আরো বাড়িয়ে তোলেন। ডিপজল এই সময় মূলত নিজেকে খল অভিনয়শিল্পী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেন এবং জনপ্রিয় হন। চলচ্চিত্রে ডিপজলের ভূমিকা নিয়ে গবেষক গীতি আরা নাসরীন ও ফাহমিদুল হক বলেন,

মান্না-ডিপজল জুটিনির্ভর সহিংসতা-গোলাগুলি-ঢাকাইয়া স্ল্যাং মার্কা এ্যাকশন ছবিগুলো টিন-এজ প্রেম, পারিবারিক সেন্টিমেন্ট, মার্শাল আর্টনির্ভর খোকনীয় চলচ্চিত্র--সবকিছুকে ম্ল্যান করে দেয়। শূন্য দশকে নির্মিত বেশিরভাগ ছবিই সহিংস ছবি, বলা যায়, এগুলো সবই কাজী হায়াৎ প্রবর্তিত ফর্মুলার ব্যর্থ সংস্করণ। হাত-পা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলা, শ্বাসরোধ করে হত্যা, আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, গলায় কামড় দিয়ে হৃদপিণ্ডসহ কণ্ঠনালী বের করে আনা, শিশুকে পুড়িয়ে নির্যাতন ইত্যাদি নানান কায়দায় সহিংসতা কায়েম করা হয় এবং ছবিগুলোর মধ্যে এর প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। বলা যায়, এই সহস্রাব্দের শুরুতে বাংলাদেশী চলচ্চিত্র সফ্ট পর্নোগ্রাফি এবং হার্ড ভায়োলেন্সের সমাহার।১১

চলচ্চিত্রে ডিপজলের ছবির সামনে হাতজোর করে দোয়া চাচ্ছেন কামু

এছাড়া ডিপজলকে নিয়ে নৃবিজ্ঞানী মানস চৌধুরী ভাষ্য এমন--ডিপজল রূপায়িত নিষ্ঠুরতা পূর্ববর্তী সকল খল ইমেজ থেকে ছাপিয়ে গেছে।১২ তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো ডিপজল খলনায়ক হিসেবে কাজ করেছেন এমন বহু চলচ্চিত্রের পোস্টার বা বিজ্ঞাপনী কার্যক্রম তিনি নায়ককেও ছায়ার তলে নিয়ে ফেলেছিলেন। অন্য কিছু বাদ দিলেও, পোস্টারে তাঁর মুখটাই বড় করে ছাপা হবার একাধিক নজির অতীতে ছিল।১৩ তার মানে ঢাকাই চলচ্চিত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ডিপজল তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে রাজত্ব করেছেন, যেখানে জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকারাও তার কাছে ম্লান হয়েছে।

একবিংশ শতকের শুরুতে যখন ঢাকাই চলচ্চিত্র যৌনতায় ছেয়ে যেতে থাকে, সেসময়েও ডিপজলকে নিয়ে বেশকিছু যৌনতানির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। এবং এই চলচ্চিত্রগুলোর সিংহভাগই নারী প্রধানত যৌন উপকরণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এতে খোলামেলা নাচগানের পাশাপাশি ডিপজলের সংলাপও ছিলো খুব কুরুচিপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে চলচ্চিত্রবোদ্ধারা যৌনতানির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণে ডিপজলকে অভিযুক্ত করতে থাকলে, একসময় তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেন। ঢাকাই চলচ্চিত্রে ডিপজলের অবস্থান যখন এমন, ঠিক তখন ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে ডিপজল হঠাৎ করেই নিজের আমূল পরিবর্তন করে ফেলেন। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে নিজের প্রযোজনায় কোটি টাকার কাবিন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি এক অন্য ডিপজলকে উপস্থাপন করেন।

খলচরিত্রের কাঠামো থেকে নিজেকে বের করে চাচ্চু (২০০৬), দাদীমা (২০০৬), কাজের মানুষ (২০০৯), রিকশাওয়ালার ছেলেসহ (২০১০) বেশকিছু চলচ্চিত্রে ইতিবাচক চরিত্রে ডিপজল অভিনয় করেন। এবং ডিপজল নিজেই অর্থলগ্নিকার হয়ে চরিত্রাভিনেতা হওয়ার জন্য পোস্টারে নিজের বিশাল জায়গা ছেড়ে শরীরীভাবে অংশ নিয়েছেন রাজ্জাকের সঙ্গে কিংবা একজন শিশুর সঙ্গে। ডিপজলের এই খলচরিত্র থেকে নিজেকে সরিয়ে হঠাৎই ভালোমানুষ হয়ে ওঠা যেনো দর্শকের কাছে তার নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে আসার সামিল। সাম্প্রতিক ডিপজলের এই ভালোমানুষী চরিত্রের পোস্টার দেখে মানস চৌধুরী বলেন, এসব ছবির পোস্টারে ডিপজলের অবয়ব দেখে বোঝা যায় চরিত্রভিনেতা বলতে যা বোঝানো হয়ে থাকে ডিপজল এখন সেখানে স্বাক্ষর রাখতে চাইছেন।১৪

৯০ দশকে ডিপজল ব্যবসায়ী থেকে চলচ্চিত্র জগতে পা দিয়েই খুব অল্প সময়ের মধ্যে চলচ্চিত্রের সব খল অভিনয়শিল্পীকে ছাপিয়ে নিজেকে ভয়ঙ্কর, লোমহর্ষক, নিষ্ঠুর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর তিনি যৌনতানির্ভর চলচ্চিত্রে জড়িয়ে যান এবং সবশেষে অর্থলগ্নিকারক হিসেবে বেশকিছু চলচ্চিত্রে ইতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে ইন্ডাস্ট্রিতে সুবাতাস ফিরিয়ে আনার প্রয়াস চালান।

পাঠক, এই ডিপজলকে ওস্তাদ মেনেছেন কামু। তার দোয়া নিয়েই তিনি সামনে এগোতে চান। আবার কামুর বন্ধু শীর্ষ সন্ত্রাসী নজু। সবকিছু মিলিয়ে নির্মাতা ঠিক কী বোঝাতে চান, তা দি ডিরেক্টর দেখে কারো কাছে পরিষ্কার না হলেও, এতোক্ষণে অনেকখানিই পরিষ্কার হওয়ার কথা।

শেষ কথা

শেষ করছি শুরুতে উল্লেখ করা সেন্সর বোর্ডের বক্তব্য দিয়ে। সেন্সর বোর্ড শুরুর দিকে দি ডিরেক্টরকে ছাড়পত্র দেয়নি এই বলে যে, চলচ্চিত্রটিতে মূল কাহিনী অপর্যাপ্ত, এতে অশ্লীল সংলাপের ব্যবহার রয়েছে, একটি সাংস্কৃতিক পেশার গোষ্ঠিকে হেয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা জন্মায় এমনভাবে কাহিনীর চিত্রায়ন করা হয়েছে। সেন্সর বোর্ডের এই বক্তব্য হয়তো ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক নেই যেটা, সেটা হলো, স্যাটায়ারধর্মী কোনো চলচ্চিত্রকে সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের বুঝতে পারার অক্ষমতা। শুধু সেন্সর বোর্ড নয়, চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবগুলো বিভাগে (চলচ্চিত্র নির্মাণ, সিনেমাটোগ্রাফি, চিত্রনাট্য, সঙ্গীত, সম্পাদনা, শিল্পনির্দেশনা এবং প্রেক্ষাগৃহ ও প্রচার) এই বুঝতে পারার অক্ষমতাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে আজ এখানে নিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে নিজের দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে এমন চলচ্চিত্র নির্মাণে বাধ্য করেছে নির্মাতা কামরুজ্জামান কামুকে।

লেখক : এ এইচ মানিক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

ahmanikrumcj26@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100012199353572

 তথ্যসূত্র ও টীকা

1.https://bit.ly/35aCDuB; retrieved on: 07.08.2019

2. https://bit.ly/2AStPeF; retrieved on: 26.08.2019

৩. কবির, আলমগীর (২০১৮ : ২২৮); ‘পদ্ধতিগত শিক্ষা থাকলে সাহস এবং শক্তি দুটোই বাড়ে; চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি : রচনা সংগ্রহ প্রথম খণ্ড; সম্পাদনা : আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান ও প্রিয়ম প্রীতিম পাল; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৪. কবির, আলমগীর (২০১৮ : ৭০); ‘আজ ও কালের প্রেক্ষণে বাংলাদেশের ছবি; চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি : রচনা সংগ্রহ প্রথম খণ্ড; সম্পাদনা : আবুল খায়ের মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান ও প্রিয়ম প্রীতিম পাল; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।

৫. যদিও ইতিহাসের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে চলচ্চিত্র শিল্প হয়ে উঠেছে। কিন্তু কখনো কখনো সেখানে শিল্পের চেয়ে ব্যবসা প্রধান হয়ে ওঠে। আর তখনই চলচ্চিত্রে শিল্পকে ফেরাতে হয়। এ রকম একটা অবস্থায় শিল্প-চলচ্চিত্র প্রপঞ্চটি ব্যবহার করা হয়েছে। যে চলচ্চিত্রে শিল্প প্রাধান্য পাবে।

৬. রায়, সত্যজিৎ (২০০২ : ৪৪); বিষয় : চলচ্চিত্র; আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।

7. https://bit.ly/2Z7fDx8; retrieved on: 06.10.2019

৮. ‘ছয়টা গান + দশটা মারপিট + একটা প্রেম = বাংলা ছবি?; প্রথম আলো, ২৭ আগস্ট ২০০৯।

৯. জন, জাহিদুল ইসলাম; “রাজকীয় আইটেম সঙ, দৈন্য চলচ্চিত্র; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পা : কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই ২০১১, পৃ. ৫৭।

১০. হোসেন, মাহমুদুল (২০১০ : ৮৪); সিনেমা; ধানমণ্ডি, ঢাকা।

১১. নাসরীন, গীতি আরা ও ফাহমিদুল হক (২০০৮ : ৭৩-৭৪); বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্প : সংকটে জনসংস্কৃতি; শ্রাবণ প্রকাশনী, ঢাকা।

12. http://eprokash.com/article/12; retrieved on: 11.10.2019

13. http://eprokash.com/article/12; retrieved on: 13.10.2019

14. http://eprokash.com/article/12; retrieved on: 15.10.2019

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 


 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন