মুহাম্মদ হাসান ইমাম
প্রকাশিত ২৩ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ধারাবাহিক পাঠ
চলচ্চিত্রের কথা
মুহাম্মদ হাসান ইমাম

পর্ব. ৭
জনরা
শ্রেণিবদ্ধকরণ যেকোনো বিজ্ঞানের প্রাথমিক কাজ। এতে বিজ্ঞানসম্মত আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। জীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান--এই একই ধারায় অগ্রসর হয়। সে কারণে আমরা দেখতে পাই, ক্লাসিফিকেশন, টাইপিফিকেশন, স্পেসিস বা ক্যাটাগরি প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা প্রথমেই আসে। জনরা চলচ্চিত্রের প্রকারভেদ বা টাইপ বোঝায়। সুতরাং এটি একটি ধারণা বিষয়ক প্রত্যয়। জনরা পর্যবেক্ষণের মানসিক ব্যাপার। এগুলো আবিষ্কার করা যায়, পরিবর্তিত করা যায়, অন্যকিছুর সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, পুনর্সংজ্ঞায়িত করা যায় এবং অস্বীকার করা যায়। মোটকথা, এগুলো সবসময় দর্শককে ছুঁয়ে যায়; এগুলো আমাদেরকে কোনো কিছুর সম্পর্কে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা বস্তুনিষ্ঠ ক্যাটাগরি তৈরি করে, যেগুলো আমাদের বিষয়ী বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান প্রদানে সাহায্য করে। গ্রীক ভাষায় এসব শাস্ত্রকে ÔOlogyÕ বা Knowledge of Something বলা হয়। যেমন, সোসিওলজি, জিনিওলজি বা বায়োলজি। বলা হয়েছে,
A synthesis of Euro-US research, cinema Genre offers a compact and clear review of inquiries into explaining the production, textual features, and social functions of films that industry workers, consumers, and scholars feel compelled to grow up together.69
The concept of genre¾a French word meaning `type’ or `kind’¾is used throughout film culture; in film production in the popular consumption and reception of films and in academic film studies. Yet the ways is which genre is understood are anything but consistent across those different constituencies. At a more fundamental level too, genre remains a perplexingly evasive and, philosophically speaking, idealistic entity. On the one hand, no individual genre film can ever embody the full range of attributes said to typify its genre; by the same token¾as volumes of frustrated critical effort attest¾no definition of a genre, however flexible, can account equally well for every genre film. For newcomers to the field, it must often seem that, as with Gertrude Stein’s Oakland, `when you get there, there’s no ``there” there.’70
ল্যাংফোর্ডের মতে, জনরা স্টাডি ঐতিহাসিকভাবে হলিউড জনরা বিশ্লেষণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তিনি তার গ্রন্থে হলিউড জনরার আলোকেই বিশ্লেষণে অগ্রসর হোন। জনরার ভূমিকা দুভাবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রথমত, কোনো সাংস্কৃতিক অর্থের উৎপাদনকারী হিসেবে। দ্বিতীয়ত, চলচ্চিত্র তৈরির অনুশীলন হিসেবে। জনরার আবেদন সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য, কিন্তু সমার্থক নয়। যেমন, চলচ্চিত্রকারদের কাছে জনরা এবং এর আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, মূলত দর্শকের আকর্ষণকে ধরে রাখার জন্য। এতে করে বাণিজ্যিক ঝুঁকিও কমে আসে। অন্যদিকে দর্শকের কাছে জনরা পণ্য বিভাজনের প্রাথমিক ধারণা দেয়। স্কলারদের কাছে জনরা ঐতিহাসিকভাবে গ্রাউন্ড পদ্ধতি উপস্থাপন করে। বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, মুক্তি দেওয়া এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির বিভিন্ন দিকের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।
সাধারণত চলচ্চিত্রে যেভাবে শ্রেণিকরণ করা হয়--হরর, কমেডি, ফ্যামিলি, ক্লাসিক, কাল্ট ও ওয়ার্ল্ড সিনেমা, অ্যাকশন সিনেমা, থ্রিলার, সায়েন্স ফিকশন ইত্যাদি। জনরা চলচ্চিত্রের শ্রেণিবিভাগকে নির্ণয়ে ব্যবহৃত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই একটি চলচ্চিত্র সম্পূর্ণভাবে একটি জনরার অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে। মেলোড্রামা এক্ষেত্রে একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ, মেলোড্রামার বৈশিষ্ট্য এতো বিস্তৃত ও সূক্ষ্ম যে, অনেক সমালোচকই একে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকতে আগ্রহী হয়েছে। বলা হয়েছে,
Feminist criticism located melodrama in the intense pathos generated by narratives of maternal and romantic sacrifice in films such `women’s’ film as Stella Dallas (1937) and Now, Voyager (1942), and has fiercely debated the genre politics of these text¾the gendered social rolls created by and for their female protagonists, and the `viewing positions’ they offer female spectators. Melodrama has also been identified with a rather different body films, the emotionally wrought of family conflict in the 1950.71 Altman (1996: 276) states that Melodrama was, along with comedy, one of the two foundational strains of the American narrative cinema that formed the basic `content categories’ used by early film distributors in their catalogues to distinguish releases for exhibitors. The later `substantival’ generic categories of Hollywood cinema originated as `adjectival’ modifiers¾`Western melodrama’, musical comedy¾of this parent genres.72
সুতরাং জনরার মধ্যে ওয়েস্টার্ন বিশেষভাবে দীর্ঘজীবী এবং প্রধান চলচ্চিত্র জনরা হিসেবে বিখ্যাত। একজন নব্য দর্শকের চোখেও ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র সহজেই চিহ্নিত হতে পারে। ওয়েস্টার্ন গুণাগুণের আলোকে যুদ্ধক্ষেত্র, মরুভূমি ও বাগান, মৃত অথবা জীবিত প্রভৃতি চিত্রকল্প জনপ্রিয় কল্পনার অংশ বিশেষ। ওয়েস্টার্ন সততই কৌতূহলোদ্দীপক। আধুনিক চলচ্চিত্র প্রযুক্তির ব্যবহারে পুরাতনের নতুন আবিষ্কার অথবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি এবং প্রযুক্তিগত ব্লকবাস্টারের সমন্বয় এখানে লক্ষ করা যায়। আমেরিকার নিজস্ব পরিচয়ে উপাদানগত দিক বোঝার এবং আবিষ্কারের জন্য ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র উপজীব্য ছিলো। ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের নিপীড়নমূলক চরিত্র, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও চরম হিংসাত্মক প্রতিশোধ পরায়ণতা আর যাই হোক মার্কিন সমাজের স্বাভাবিক প্রতিচ্ছবি নয়। এর কতোটুকু স্বাভাবিক আর কতোটুকু চলচ্চিত্র তা বোঝা মুশকিল।
Of all genres it has been perhaps the most releiable to the widest audience for the longest period of time. This long and continuous history of a historical genre makes history itself and appropriate frame for considering the genre.73
ওয়েস্টার্ন শব্দটির স্বাধীন বিকাশ ঐতিহাসিকভাবে পূর্বতন বলা যায়। চলচ্চিত্রের জনরার আগে ওয়েস্টার্নের আবির্ভাব সেকারণেই এডুইন এস পোর্টারের আট মিনিটের চলচ্চিত্র The Great Train Robbery (১৯০৩) বর্ণনামূলক চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে পরিগণিত হয়। একে প্রথম ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বেআইনি কাজ কারবার, চলন্ত ট্রেনের উপর মারামারি, বিভিন্ন ধরনের কসরত ও অ্যাকশন, ঘোড়া নিয়ে পিছু ধাওয়া করা ইত্যাদি বিষয়গুলো ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য।Once Upon a Time in The West অনুরূপ ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্র, যা ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায়। জনরা হিসেবে ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের শুরু ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। নির্বাক চলচ্চিত্রের সময় তো বটেই, অধিকন্তু ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকে ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। তবে ১৯৫০-এর দশকে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ওয়েস্টার্ন লক্ষ করা যায়। আর ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের দর্শক কমে আসতে থাকে। ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের অনেক বৈশিষ্ট্য সমালোচক ভেদে প্রাধান্য পেয়েছে। যেমন, সীমান্তের মরুময় প্রান্তর এবং তাদের পৌরাণিক কাহিনি, যুদ্ধ পরবর্তী ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রে প্রাধান্য পায়। বিজয়ী শক্তি হিসেবে পুরুষতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার চেষ্টা এ সময়ের ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়।
মিউজিকাল জনরাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র বলা হয়েছে। যেমন,The Jazz Singer (১৯২৭) প্রথম এ ধরনের চলচ্চিত্র (এই ধরনের চলচ্চিত্রকে তখন ‘টকি’ বলা হতো। কারণ চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলো কথা বলতো)। সঙ্গীত ও সাঙ্গীতিক প্রযুক্তির ব্যবহার এ ধরনের চলচ্চিত্রের ধ্রুপদী সময়েই লক্ষ করা যায়। মিউজিকাল জনরা ব্যক্তিগত বা নিরীক্ষাধর্মী বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে অভিনয় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। তবে এই মিউজিকাল জনরার নাটকীয় পতন লক্ষ করা যায় ৫০-এর দশকের ধ্রুপদী হলিউড স্টাইল ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে। অনেক সমালোচকের মতে, ৫০-এর দশকের মধ্যভাগে মিউজিকাল জনরা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
চলচ্চিত্রের শুরু থেকেই যুদ্ধবিগ্রহ একটি প্রধান বিষয় হিসেবে বিরাজ করছিলো। বলা যায়, চলচ্চিত্রের সাম্রাজ্যবাদী সামরিক সংঘাতের দশক (১৮৯৮-১৮৯৯ স্পেন-আমেরিকা যুদ্ধ, ১৯০২ বোয়ার যুদ্ধ, ১৯০৪-১৯০৫ রুশ-জাপান যুদ্ধ) এর সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণতা লাভ করে। যুদ্ধ/সংঘাত-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্র সেকারণে চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি পুরাতন জনরা হিসেবে পরিগণিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র রমরমা বাজার পায়। যেমন, All Quiet On the Western Front (১৯৩০) থেকে শুরু করে Platoon (১৯৮৬),Saving Private Ryan (১৯৯৮) পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যাপক সংখ্যক চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। যুদ্ধের চলচ্চিত্রের মধ্যে ভিয়েতনাম-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রগুলো বিষয় বৈচিত্র্যে অবিস্মরণীয়।
গ্যাংস্টার আরেকটি জনরা, যা নিজস্ব কোড এবং কনভেনশনের সমন্বয়ে কৌতূহলোদ্দীপক পরিবেশ তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে The Killers (১৯৬৪), Thief (১৯৮১), Things to Do in Denver When You’r Dead (১৯৯৫), Heat (১৯৯৫), Godfather (১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৯০) এর নাম বলা যায়। চলচ্চিত্রের ধ্রুপদী সময় থেকেই গ্যাংস্টার চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব ছিলো এবং এই চলচ্চিত্রগুলো যথেষ্ট জনপ্রিয়তাও পায়। এড়ফভধঃযবৎ এমনই একটি জনপ্রিয় ট্রিলজি। গ্যাংস্টার চলচ্চিত্রের সঙ্গে পুঁজিবাদী সমাজের পচনশীল মাফিয়াদের অধিষ্ঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা একদিকে আকর্ষণীয়, অন্যদিকে ঘৃণাবোধের জন্ম দেয়। দর্শক এই মিশ্র অনুভূতির আদলে এখনো এ ধরনের চলচ্চিত্র উপভোগ করে।
The Innocents(1961), On The Haunting(1963), To The Sixth Sense (1999), The Others(2001) এগুলো হরর চলচ্চিত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম।
The experience of limits, and the transgression of limits, is central to the horror film: The boundaries of sanity and madness, of the conscious and unconscious minds, of the external surfaces of the body and the flesh and organs within, pre-eminently the boundaries of life and death.74
সায়েন্স ফিকশন আরেকটি উল্লেখযোগ্য জনরা যা আজকের হলিউডেও সমান দাপটে চলছে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে স্টার ওয়ারস সায়েন্স ফিকশন ও অ্যাকশন ব্লকবাস্টারের সমন্বয়ে নতুন প্রজন্মের সৃষ্টি করে। Alien (১৯৭৯), Terminator (১৯৮৪), The Matrix (১৯৯৯) ইত্যাদি নামকরা সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্রের কথা সবাই জানি। এছাড়া Spider-Man (২০০২) ক্লাসিক কমিক চলচ্চিত্র হিসেবে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ফিল্ম নয়ারকেও একটি জনরা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এই জনরা সম্পর্কে আমরা আগে আলোচনা করেছি।
লেখক : প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান ইমাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
himam_ru@yahoo.com
তথ্যসূত্র
69. Raphaelle, Moine (2008: viii); Cinema Genre; Translated by Alistair Fox and Hilary Radner, Blackwell Publishing, Oxford, UK.
70. Langford, Barry (2005: vii); Film Genre: Hollywood and Beyond; Edinburgh University Press, Edinburgh.
71. Langford, Barry (2005: 29-30); `Before Genre: Melodrama’; Film Genre: Hollywood and Beyond; Edinburgh University Press, Edinburgh.
72. Langford, Barry (2005: 32); `Melodram as Genre and as Mode’; Film Genre: Hollywood and Beyond; Edinburgh University Press, Edinburgh.
73. Langford, Barry (2005: 55); `The Western: Genra and History’; Film Genre: Hollywood and Beyond; Edinburgh University Press, Edinburgh.
74. Langford, Barry (2005: 158); `The Horror Film’; Film Genre: Hollywood and Beyond; Edinburgh University Press, Edinburgh.
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন