মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত ২২ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সিনেমা দেখার গল্প
মফিজ ইমাম মিলন

পলিমাটি দিয়ে তৈরি এই নরম ভূখণ্ডের মানুষের মনও যে কতো নরম তা হাজারো উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। প্রায় বছর ত্রিশেক আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ধারাবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’ প্রচারিত হয়েছিলো। শহীদুল্লাহ কায়সারের এটি ছিলো বিগত যুগের কাহিনি নিয়ে এ যুগের গল্প। টিভি নাট্যরূপ দিয়েছিলেন ইমদাদুল হক মিলন। নাটকের হুরমতি চরিত্রের অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী ফেরদৌসী মজুমদার। একটি দৃশ্যে হুরমতির কপালে পয়সা গরম করে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। নিরপরাধ হুরমতির ওপর সমাজপতির এমন অত্যাচার নাটকের দৃশ্য হলেও টিভি দর্শকের হৃদয়ে ঠিক দাগ পড়ে যায়। এমন করুণ দৃশ্যে তাদের মন কেঁদে ওঠে। নাটকের ভিতর বিজ্ঞাপন বিরতির সময় ঘরের মধ্যে তাকিয়ে দেখি সবার চোখই ছল ছল করছে। নাটক বা সিনেমায় মানুষের কষ্টের অভিনয় দেখে দর্শকের চোখে জল গড়িয়ে পড়ার দিন গত বহু আগেই। এখন সচেতন দর্শকের অশ্রুর বদলে অভিনয়শিল্পীর ভুল ত্রুটিই ধরা পড়ে অধিক। এবং এটাকে নিছক অভিনয় বলেই ধরে নেয়। নাটক সিনেমায় যাই হোক না কেনো, এটা নিশ্চিত অভিনয় দেখার শুরুতেই তা দর্শকের মনে জেকে বসে। সিনেমা-নাটকে অভিনয় দেখে এখন আর কোনো দর্শক-শ্রোতাকে কাঁদতে দেখি না।
সেদিন বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ কলিংবেল বাজানোর পরও আমার মেয়ে দরজা না খোলায় একটু উদ্বিগ্নই হয়েছিলাম। তার একারই থাকার কথা বাসায় তখন। চারপাশে যতো রকম দুর্ঘটনার খবর আসে তাতে দীর্ঘসময় দরজা না খুললে প্রবীণ বাবার হৃদপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি অমূলক নয়। আমাদের সিনেমা, নাটক সবকিছুতেই সেসব সহিংসতার উপস্থিতি, এখন এ উদ্বেগ আরো বেশি বদ্ধমূল করে দেয় চেতনায়। অনেকটা সময় পর মেয়ে আমার দরজা খুলে দেয়। আমি স্বস্তি পেলাম, তবে তাকিয়ে দেখি তার চোখ দুটো ফোলা। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, এ কান্নার ছাপ। দরজা দেরিতে খোলার হেতুও বুঝতে কষ্ট হলো না। জিজ্ঞেস করলাম, কী সমস্যা মা, জামাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া? শরীর খারাপ? নাকি অফিসে ঝামেলা? সবই না না না। এবার চাপাচাপি শুরু করলাম, বলতে হবে কী হয়েছে। ঘরে বসে একা একা কাঁদবা, এটা তো ভালো কথা না। একপর্যায়ে উত্তরে সে জানায়, ছবিটা না দেখলে তুমি ঠিক বুঝতে পারবা না। এটুকু বলে সে আবার ঘরের ভিতর চলে যায়। নতুন উদ্যমে কাঁদতে চললো, না আবার সে ছবি দেখতে বসলো ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে তখনকার মতো স্বস্তি পেলাম এই ভেবে যে, ঘটনা বড়ো কিছু নয়। রাতে খাবার টেবিলে জানতে চাইলাম, কোন ছবি দেখে তুমি এতো মন খারাপ করলে? সে উত্তর দিলো, মন খারাপ আর মন ভালো ছাড়াও মানুষ কাঁদে। মানবতার পরাজয় দেখলে অথবা বিজয়ে মানুষ সে ঘটনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নেয়। এসব দার্শনিক উত্তর দিয়ে খাবারের প্লেট-বাটি রান্নাঘরে নিয়ে যেতে যেতে হুকুমের সুরে বললো, সারাটা দিন ধরে তো ফেইসবুক করো, আগ্রহ হলে ইউটিউবে গিয়ে জেন জ্যাকুয়েস অ্যানাউদের টু ব্রাদার্স মুভিটা দ্যাখো। কুমাল আর সাঙ্গা নামে বনের দুই বাচ্চা বাঘের গল্প।
ধমক আর পরিচালকের ও রকম খটোমটো নাম শুনে ততোক্ষণে আমার পেটের ভাত হজম হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার সাহসও হচ্ছে না। তাই ইনিয়ে বিনিয়ে বললাম, বাঘের বাচ্চার সিনেমা দেখে তুমি এতো বড়ো মেয়ে এতোক্ষণ ধরে কাঁদলে! সত্যি বলতে কি একটু অবাকই হয়েছিলাম। যে মেয়ে এক যুগের বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতা করছে, দিনরাত নানারকম সহিংসতা, নির্যাতনের খবর সম্পাদনা করছে, সে বাঘের বাচ্চার গল্পে বিকেল ধরে কাঁদবে! আমাকে আর খুব বেশি চেষ্টা করতে হলো না। ল্যাপটপে টু ব্রাদার্স চালিয়ে দিয়ে সে পড়তে চলে গেলো।
১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কম্বোডিয়ায় ফরাসি কলোনিয়াল আমলে দুই বেঙ্গল টাইগার বনের ভিতর প্রাচীন মন্দিরে ঘরবাড়ি বানিয়ে বেশ ভালোই ছিলো। তাদের দুটো ছোটো ছোটো ছানা হলে নাম রাখা হলো কুমাল আর সাঙ্গা। তারা একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে আর পরিচিত হচ্ছে চারপাশের সঙ্গে। ছোটো ছোটো ছড়ার জলে নিজের ছায়া দেখে তারা বিস্মিত হয়। নাকের ডগায় প্রজাপতি উড়লে লাফিয়ে ধরতে চায়। গাছ থেকে ফল পড়লে সেটা দিয়ে দুই ভাই বল বানিয়ে খেলতে শুরু করে। তাদের বাবা-মা চোখে চোখে রাখে দুই ছেলেকে। এদের মধ্যে সাঙ্গা আবার একটু বেশি সাহসী। একদিন খেলতে খেলতে দুজন চলে গেলো আরো একটু বনের ভিতর। সেখানে আবার মুখোমুখি হলো শেয়ালের। বাঘ শাবক হলেও এখনো ভীষণ ছোটো, তাই কুমাল ভীষণ ভয় পেলো। গল্পকাররা অনেক সময় গল্পের গরুকে গাছে তোলে বলে একটা প্রবাদ আছে। এখানে কিন্তু পরিচালক যখন ভীত কুমালকে শেয়ালের ভয়ে গাছে তুললো, সে দৃশ্য বাস্তবের চেয়েও বেশি সত্যি মনে হলো দর্শক হিসেবে আমার। এমনকি কুমালের দুই পায়ের থাবার ভিতর গাছের ডাল আঁকড়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা ও একসময় ব্যর্থ হয়ে গাছের ডালে নখ বসে ছেঁচড়ে নামার যে দৃশ্য তা সত্যিই অকল্পনীয়! কুমাল তো গাছে উঠলো আর সাঙ্গা তখন কী করলো? তার ভাই ভয় পেয়েছে, সে তো আর বসে থাকতে পারে না। সাঙ্গা সেই শেয়ালকে ধমকে গর্তে পাঠালো। শেয়াল ফিরে গেছে নিশ্চিত হওয়ার পর অভয় দিয়ে গাছতলায় যেয়ে ছোটো ভাই কুমালকে নামতে বললো। কুমাল ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে আশ্বস্ত হলো যে, ধারের কাছে শেয়াল নেই; ভরসা পেয়ে নেমে এলো নিচে।
শাবক হিসেবে বনে বিচরণের কৌশল তখনো রপ্ত হয়নি। কুমালের এক পায়ে চোট লাগলো। মানব শিশু তো নয়, তবু পরিচালক দেখালেন, আহত ভাইকে আগে পাঠিয়ে পাহারা দিতে দিতে পিছনে পিছনে হাঁটছে সাঙ্গা। কম্বোডিয়ার আদিবাসী গ্রামের পাশে গহীন অরণ্যের ভিতর এনসিয়েন্ট মন্দিরে যখন বাঘ দম্পতির দুই ছেলে বড়ো হয়ে উঠছে, সেসময় বাইরের জগতটাও আর বসে নেই। দ্রুতই বদলে যাচ্ছে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জীবন। খেমার (কম্পোডিয়ার খেমার জনগোষ্ঠী) রাজপুত্রকে খুশি করে ফরাসিরা নানারকম ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করেছে কম্বোডিয়ায়। নিলামে উঠছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ার নানা প্রাচীন সংগ্রহ। সেসব অকশন থেকে মহামূল্যবান প্রাচীন বুদ্ধ মূর্তি, মন্দিরের স্থাপনা, কারুকার্যের নকশা করা পাত্র কিনে নিচ্ছে বিত্তবান ফরাসিরা; যাদের অধিকাংশ এসেছে কলোনি গড়ার সূত্র ধরে সরকারি কর্মকর্তা হয়ে। এমন এক নিলামের ডাকে উপস্থিত ছিলেন ম্যাক রয় নামে এক ইংরেজ যুবক। তার মাথায় বুদ্ধি এলো, যদি আদিবাসীদের হাত করা যায়, তবে অল্পমূল্যে গহীন অরণ্যের ভিতর থেকে প্রাচীন বহু মূর্তি সে সংগ্রহ করতে পারবে। সেসব বিক্রি করে যে অর্থ আসবে তা দিয়েই সে ভালোভাবে বেঁচেবর্তে চলতে পারবে।
সুতরাং লটবহর নিয়ে ম্যাক রওনা হলো আদিবাসী গ্রামে। রসদ আর নানারকম যন্ত্র নিয়ে বিশাল বহর আসা, দূরে অনেক উঁচুতে মন্দিরের সীমানা থেকে দাঁড়িয়ে দেখলো কুমাল আর সাঙ্গার বাবা-মা। বিপদ আঁচ পেয়ে তারা প্রবেশ করলো মন্দিরের আরো ভিতরে। যতো ভিতরে প্রবেশ করছে, ততোই বাঘেদের খাবার কমছে, চলাচল সংকীর্ণ হয়ে আসছে। শাবকদের কোনোভাবেই চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না বাঘ দম্পতি। বাচ্চারা দিনরাত অন্ধকারের মধ্যে মায়ের গা ঘেঁষে শুয়ে গন্ধ শোকে। বাইরে ডিনামাইট দিয়ে মূর্তি ভাঙার শব্দে চমকে ওঠে। এই গভীর অরণ্যে এমন শব্দের সঙ্গে তারা এতোদিন কখনো পরিচিত হয়নি। সামনের অংশের অন্যান্য মূর্তি সংগ্রহ শেষে কয়েক দিনের মধ্যেই শিকারি দল এগিয়ে এলো মন্দিরের ভিতর দিকে। সাঙ্গাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে পারলো মা বাঘটি, আর কুমাল ধরা পড়লো বাবার সঙ্গে। কুমালের সেই পায়ের আঘাতের জন্য সে লাফিয়ে প্রাচীরে উঠতে পারেনি, তাই ছেলের প্রাণ রক্ষায় বাবাও আর আত্মরক্ষার চেষ্টা করেনি। শিকারি দল সেই জীর্ণ প্রাচীন ঘরে প্রবেশ করে কুমালকে আক্রমণ করতে চাইলে, বাবা বাঘটি আক্রমণ চালালো শিকারির ওপর। ঠিক তখন পিছন থেকে গুলি করলো ম্যাক রয়। নিহত হলো কুমালের বাবা। কুমাল দেখলো, তার বাবার শরীর বাঁশের চাঁইতে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বড়ো বাঘটি হত্যা করলেও ছোট্ট কুমালকে জীবিত সংগ্রহ করতে চাইলো ম্যাক। নিয়ে এলো সঙ্গে করে আদিবাসী গ্রামে।
প্রথমে কুমাল কিছুই মুখে তুলতে চাইছিলো না। একপর্যায়ে ম্যাক তার পকেটে থাকা টিনের কৌটার মিষ্টি চকলেট পানিতে গুলে কুমালকে ফিডারের মতো করে খাওয়া শেখালো। পিতৃ হত্যাকারী ম্যাকের সঙ্গেই বন্ধুত্ব হলো বাঘ শাবক কুমালের। এর মধ্যে সরকারি লোক এসে ম্যাককে অবৈধভাবে মূর্তি সংগ্রহের জন্য গ্রেপ্তার করলো। আদিবাসী এক দলপতির হাতে কুমালের দায়িত্ব দিয়ে ম্যাক চলে গেলো পুলিশের সঙ্গে কারাগারে। আদিবাসী এই দলনেতা সার্কাস দলের কাছে বিক্রি করে দিলো কুমালকে। প্রথমে বন থেকে গ্রাম, তারপর গ্রাম থেকে খাঁচার ভিতর বন্দি হয়ে শহরে আসার পথে কুমাল দেখলো বিচিত্র চারপাশটা। বাজারের ভিতর দিয়ে আনার সময় তার খাঁচার ওপর রাখা হলো একটা হাঁসের খাঁচা। একটা রাজহাঁস অতি উৎসাহী হয়ে কুমালের খাঁচার ভিতর গলা বাড়িয়ে দিলো দেখতে। এই বিচিত্র জীবের ভাবভঙ্গি দেখে কুমাল খাঁচার একপাশে ভয়ে ঘাপটি মেরে রইলো।
ওদিকে, খবর পেয়ে পেট মোটা ফরাসি সরকারি কর্মকর্তা এলেন কারাগারে শিকারিকে দেখতে। বুঝলেন একে কাজে লাগিয়েই তিনি খেমার রাজপুত্রের মন জয় করতে পারবেন। ম্যাককে মুক্তি দিয়ে তাকে বাড়িতে ডেকে আতিথিয়তা করলেন, আর প্রস্তাব দিলেন সেই বনে এবার সরকারি অনুমতিপত্র নিয়ে গিয়ে অন্য দুটি বাঘকে ধরে আনতে। এবার ধরা পড়লো ভাইকে বাঁচানো সেই সাহসী শিশু সাঙ্গা। বনে একা রইলো সাঙ্গার মা। ফরাসি কর্মকর্তার ছোট্ট ছেলে রাউল দেখা মাত্র সাঙ্গাকে নেওয়ার দাবি করে বসলো; এই শাবককে সে পুষবে। অতএব, সাঙ্গার যাত্রা শুরু হলো রাউলের সঙ্গে। রাউল সত্যি সাঙ্গাকে ভালোবেসেছিলো। এক বিছানায় মশারির ভিতর রাউলের পাশে সে ঘুমাতে শুরু করলো ফিডার মুখে দিয়ে। রাউলের মা গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো দুজনকে। সাঙ্গার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধিও কম ছিলো না। দেয়ালের কাঠের তাকে রাউলের রাজ্যের খেলনা; অধিকাংশই বাঘ, ভালুক বা সিংহের পুতুল। রাউল বুঝে গিয়েছিলো, সেও দেখতে অনেকটা এসব খেলনার মতো। মাঝেমধ্যে রাউলকে হয়রান করতে সে ওসব খেলনার মধ্যে ঢুকে পাথুরে মূর্তি মুখ করে বসে থাকতো। রাউল সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজতো সাঙ্গাকে।
সাঙ্গা আর রাউলের এই সম্পর্ক সহ্য হলো না বাড়িতে আগেই পালিত কালো কুকুরটির। সে সুযোগ পেলেই ভয় দেখাতো সাঙ্গাকে। সাঙ্গা বাঘের বাচ্চা হলেও সে শিকারি হয়নি। একদিন সুযোগ পেয়ে কুকুরটি আক্রমণ করলো সাঙ্গাকে। আর সাঙ্গা প্রাণরক্ষার জন্য পাল্টা আক্রমণ করে বসলো কুকুরটিকে। এরপরের ঘটনা মর্মান্তিক। সাঙ্গা রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে, এই অভিযোগে তাকে বের করে দেওয়া হলো বাড়ি থেকে। যে গাড়িতে তাকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছিলো, সে গাড়ির পিছনে ছুটলো রাউল; কিন্তু নিরাশ হয়ে ফিরতে হলো। রাউলের বাবাও এতোদিনে মওকা পেলেন খেমার রাজপুত্রকে খুশি করার। উপহার হিসেবে সাঙ্গাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো খেমার রাজপুত্রের বাড়িতে। একটি সত্যি সত্যি জীবন্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মালিক হয়ে সাঙ্গার গলায় রাজপুত্র পরিয়ে দিলেন হীরের নেকলেস।
তবে এরও আগে এই রাজপুত্রের বনে গিয়ে বাঘ শিকার নিয়ে আছে হাস্যকর এক ঘটনা। সাঙ্গার মাকে তিনি গুলি করে মেরে ফেলেছেন ভেবে বাঘের শরীরে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে ফটো সেশনের চেষ্টা করেছিলেন। যে মুহূর্তে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ পড়লো, তখনই মৃত বাঘ উঠে দিলো দৌড়। আসলে গুলিটা বাঘের বাঁ কান দিয়ে প্রবেশ করেছিলো। সবার সামনে এই অপমানের ফলে বাঘের ওপর ছিলো খেমার রাজপুত্রের বিষম ক্ষোভ। এবার সত্যিকার বাঘ পেয়ে সে মনে হলো রাজত্ব জয় করলো। তাকে খুশি করতে ফরাসি গভর্নর সার্কাস দলের কাছ থেকে একটি বয়স্ক বাঘ হত্যা করে তার চামড়া এনে উপহার দিয়ে বললো, এই সেই বাঘ যেটাকে তিনি বনে গুলি করেছিলেন। স্ত্রীকে পাশে নিয়ে সেই বাঘের চামড়ার সঙ্গে ছবি তুলতে বসতেই রাজপুত্রের স্ত্রী বললেন, এই বাঘটার দেখি ডান কানে গুলি লেগেছে। রাজপুত্র বুঝলেন, তিনি আবারও বোকা হয়েছেন। বাঘেদের কাছে সব অপমানের প্রতিশোধ নিবেন এবার তিনি সাঙ্গাকে দিয়ে।
এদিকে সার্কাস দলের হাতে বিক্রি হওয়া ভীতু কুমাল দিনরাত নির্যাতিত হচ্ছে। যে বাঘ শৈশবে শেয়াল দেখে ভয় পেয়ে গাছে উঠে পায়ে ক্ষত তৈরি করেছিলো, আর সে কারণেই পালাতে পারেনি বলে চোখের সামনে বাবাকে হত্যার দৃশ্য দেখেছে, সেই বাঘ কোনোভাবেই আগুনকে জয় করার সাহস পেলো না। এদিকে সার্কাস দলের বড়ো ট্রেইনার সালাদিনের রোখ চেপে গেছে আগুনের রিঙের ভিতর দিয়ে কুমালকে লাফিয়ে এপাশে আসা শেখাতে। নানা রকম করে নির্যাতন চালিয়ে একসময় পরাজিত করলো কুমালকে। আগুনের ভিতর দিয়ে শেখালো লাফিয়ে পার হতে। গ্ল্যাডিয়েটর মুভির মতো এক লোহার শিক দেওয়া বড়ো মাঠে আয়োজন হলো বাঘের লড়াইয়ের। দু-পাশ থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো দুই বাঘকে। তাদের খেপিয়ে তুলতে বল্লম দিয়ে খোঁচানো হলো। এটা সার্কাস পার্টির মানসম্মানের ব্যাপার। দুই বাঘ মুখোমুখি হলো। দর্শক সারিতে স্ত্রীকে নিয়ে বসে আছেন খেমার রাজপুত্র। ফরাসি অ্যাডমিন বসেছেনে স্ত্রী আর ছেলে রাউলকে নিয়ে। বাঘের লড়াই দেখতে মানুষে থৈ থৈ গ্যালারি। বাঘ দুটো মাঠে নামতেই রাউল চিনে ফেললো তার প্রিয় বন্ধুকে। সে চেঁচিয়ে উঠলো সাঙ্গার নাম ধরে। ততোক্ষণে সাঙ্গা গলায় হীরের নেকলেস নিয়ে অন্য বাঘের সঙ্গে লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছে। একবার এ ওকে আক্রমণ করছে, আবার পাল্টা আক্রমণ সামলাচ্ছে। আকস্মিক কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। দুই বাঘ দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো। সেখানে স্পষ্ট ফুটে উঠলো সেই শেয়াল দেখে ভয় পেয়ে গাছে ওঠার সেই দৃশ্য। ভাইকে রক্ষা করতে আরেক বাঘের আচরণ দেখলো অন্যজন। এর পরের দৃশ্য দেখে গ্যালারির মানুষ প্রথমে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো, তারপর হেসে গড়াগড়ি দিতে শুরু করলো।
তারা দেখলো, লড়াই করতে এসে দুই বাঘ এখন একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। মাঠের ভিতর দুজন গড়িয়ে গড়িয়ে ধুলো ছিটিয়ে খেলছে। এদিকে সার্কাস দলের তো মাথায় হাত। বাঘ এমন আচরণ করবে কোনোদিন তারা ভাবেনি। বায়না করা টাকা ফেরতসহ রয়েছে পার্টির মানসম্মানের ব্যাপার। সুতরাং তারা খাঁচার বাইরে থেকে যতো রকম করে সম্ভব দুই বাঘকে খেপিয়ে তুলতে খোঁচাতে শুরু করলো। সাঙ্গা, কুমাল সে যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে একপর্যায় আক্রমণ করলো সার্কাস দলনেতার ওপর। যে ভাইয়ের জন্য সাঙ্গা অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করেছিলো, আজ মানুষ তার সেই ভাইকে মারতে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমন সময় গুলি করে সার্কাস দলের অন্যজন গেইটের তালা খুললো সরাসরি কুমালকে উত্তেজিত করতে। সেই সুযোগে গেইট দিয়ে লোকালয়ে বেরিয়ে পড়লো সাঙ্গা আর কুমাল। এরপর শুরু হলো তাদের বনের অভিমুখে যাত্রা। যাত্রা পথে তারা ভয় দেখাতে দেখাতে চললো। এক নারী বাথটাবে স্নানরত ছিলো, একজন যেয়ে পড়লো সে বাথটাবে। আরেকজন পেপার র্যাকে রাখা সংবাদপত্র মুখে নিয়ে দিলো দৌড়। পুরো শহর আতঙ্কিত দুই বাঘে, কিন্তু কোনোভাবেই পারছে না ধরতে। সাঙ্গা আর কুমাল ঠিক পথ চিনে চিনে রওনা হলো তাদের সেই প্রাচীন গৃহের দিকে। পথে এক কসাইয়ের মাংস বোঝাই গাড়ি থেকে খেয়ে ফেললো কয়েক কেজি মাংস। একদিন ঠিক পৌঁছে গেলো বনে। কিন্তু মানুষ অতো সহজে পরাজিত হবার নয়। ম্যাক রয় ঠিক আবার পৌঁছে গেলো বনে। এর পরের গল্প মানবিকতার পরাজয়, না জিতে যাওয়া সে অংশটুকু পাঠক দেখবে বলে আমি আর বর্ণনা দীর্ঘ করছি না। ম্যাকের পকেটে থাকা সেই টিনের কৌটার মিষ্টি চকলেট খুঁজে কুমাল সন্ধি করতে চেয়েছিলো। কৌটা বের করে আনার পর দেখা গেলো ওতে আর অবশিষ্ট কিছু নেই। ঠিক যেমন মানুষের মায়া ভালোবাসা শেষ হয়ে গেলে শুধু থাকে তার কায়া, তেমন।
বাড়ি ফিরে আমার কন্যার ভেজা চোখ দেখেছিলাম, এইটুকু শুধু বলার আছে পাঠকের উদ্দেশে। নির্মল চলচ্চিত্র এখনো মানুষের মানবিকতাকে জাগিয়ে তোলে। মানুষকে অনুরণিত করে, তা দেখে আমি এ বয়সেও চলচ্চিত্র নিয়ে আশা দেখি, আর স্বপ্ন দেখি একদিন এমন ধারার সিনেমা বাংলাদেশে, বাংলা ভাষাতেও তৈরি হবে।
(চলবে)
লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ফরিদপুর থেকে ‘উঠোন’ নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
uthon.faridpur@gmail.com
https://www.facebook.com/milan.imam
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন