রীতা জান্নাত
প্রকাশিত ১৯ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
তাহাদের চলচ্চিত্রকথা
রীতা জান্নাত

এক.
পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার কোলচরী গ্রামে রহিমা খাতুনের বাড়ি। ছয় ছেলে ও চার মেয়ে নিয়ে ১০ সন্তানের জননী রহিমা খাতুন। প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে আমি তাকে বড়োমা বলেই ডাকি। তার কাছে বয়স জানতে চাইলে বলেন, ওই সময় কারো জন্মের দিন-ক্ষণ-তারিখ মনে রাখার তেমন দরকার ছিলো না। তাই আমারটাও জানি না। তবে বড়োমার কথাবার্তায় আন্দাজ করতে পারি তার বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই বা পার হয়েছে এমন। আর বিয়েটা হয়েছিলো ১৩ কি ১৪ বছর বয়সে।
বাড়িতে গেলে মাঝেমধ্যেই তার সঙ্গে আমার কথা হয়। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার অন্যরকম একটা উদ্দেশ্য নিয়েই তার সঙ্গে কথা বলা। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি বড়োমা মানুষটা বেশ মজার। গল্পে গল্পে তিনি কীভাবে তার কৈশোর, যৌবন, এমনকি বিয়ের সময়ে আনন্দ-উল্লাস করেছিলেন, সেই গল্প করতে থাকেন। এটা করতে হয়তো তার ভালো লাগে, কিংবা অন্যকিছু। তবে আমার কিন্তু সেগুলো শুনতে খারাপ লাগেনি কোনো দিন। বড়োমার কৈশোর, যৌবনে বিনোদন মাধ্যমগুলো কেমন ছিলো, আগ্রহবশত এটা জানাই আমার এবারের উদ্দেশ্য ছিলো। সেসব জানার জন্য এবার অবশ্য আমি নিজ থেকে আরো আগ্রহ নিয়ে তার সঙ্গে তালমিলিয়ে গল্প করতে থাকি।
গল্পে গল্পে তার কাছে জানতে চাই, সেসময়ে তারা কীসে আনন্দ-বিনোদন পেতেন? একটু ভেবে নিয়ে বড়োমা জানান, বাড়ির উঠোনে সামান্য কিছু খেলাধুলা আর সমবয়সি মেয়েরা একসঙ্গে বসে গল্প করা ছাড়া, তখন তেমন কোনো বিনোদন ছিলো না। এর বাইরে আশপাশে মাঝে মাঝে যাত্রা-নাটক হতো। কিন্তু সেগুলো দেখার সুযোগ অবশ্য ছিলো না। আর পাবনা শহরে ‘রূপকথা’ নামে একটি প্রেক্ষাগৃহ থাকলেও সুজানগরে ছিলো না। ফলে বাড়ির বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ একেবারেই কম ছিলো। পরে অবশ্য আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম, সুজানগরের বেগুরমোড়ে (বর্তমানে জিরোপয়েন্ট মোড়) ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে ‘মুক্তি’ নামে একটা প্রেক্ষাগৃহ চালু হয়। পাবনা সদরের শ্রীপুর ইউনিয়নের মো. বাবলু হোসেন নামের এক ব্যক্তি প্রেক্ষাগৃহটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে পুরো প্রেক্ষাগৃহটি নাকি ঢেউটিন দিয়ে তৈরি ছিলো।
বড়োমা বলেন, ‘সেই সময় ওই সিনেমাহলে বেদের মেয়ে জোস্না, রহিম রূপবান, মাটির কলস নামে সিনেমা চলতো বলে আমরা শুনতাম। এলাকার লোকজন সেগুলো দেখতেও যেতো। কিন্তু মেয়েরা যেতে পারতো না। কারণ সেসময় মেয়েদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার খুব বেশি সুযোগই ছিলো না। আর সিনেমা দেখতে তো টাকা লাগে। তারা সে টাকাইবা কোথায় পাবে! তবে বাড়ির পুরুষদেরও খুব বেশি টাকা ছিলো, এমন নয়। তখন তো সবারই খুব অভাব ছিলো।’ বড়োমা জানান, কিছু মানুষের সেসময় চলচ্চিত্র সম্পর্কে অন্যরকম একটা ধারণা ছিলো। তারা চলচ্চিত্রকে খুব বেশি ভালো চোখে দেখতোও না।
‘মুক্তি’ প্রায় ১৫ বছর ধরে চলেছিলো সুজানগরে। পরে অবশ্য সুজানগর বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে ‘নন্দিতা’ নামে আরেকটা প্রেক্ষাগৃহ চালু হয়। পাবনা শহরের রতন (বর্তমানে ‘রূপকথা’ প্রেক্ষাগৃহের মালিক) বলে একজন এই প্রেক্ষাগৃহটি চালু করেন। এটা অবশ্য ইটের তৈরি, আকারেও বড়ো ছিলো। ‘নন্দিতা’ চালু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে ‘মুক্তি’ বন্ধ হয়ে যায়। ‘মুক্তি’র ভবনটি এখনো আছে। তবে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে ‘নন্দিতা’ ভেঙে ফেলা হয়, বর্তমানে সেখানে বিপণিবিতান করা হয়েছে।
কথায় কথায় আমি বড়োমাকে জিজ্ঞেস করি, আপনি কখনো চলচ্চিত্র দেখতে যাননি? আপনার কখনো চলচ্চিত্র দেখতে যেতে ইচ্ছে করেনি? তখন তার উত্তর ছিলো এ রকম--‘তোর বড়োআব্বা কী ওই ধরনের লোক ছিলো! উনি খুব রাগী ছিলেন, তাকে এ কথা বলার সাহস আমার ছিলো না। তাছাড়া খুব পরহেজগার ছিলো আমার শ্বশুরবাড়ির লোকজন। সিনেমা দেখতে যাওয়া তো দূরের কথা, তারা এগুলো পছন্দই করতো না।’ তারা চলচ্চিত্র পছন্দ করতো না, বাড়ির বাইরে যেতো না, তাহলে সেসময় তাদের বিনোদন মাধ্যম কেমন ছিলো--এ নিয়ে আমার জানার কৌতূহল হয়। মনে মনে এগুলো যখন ভাবছি, হঠাৎই বড়োমা বলে ওঠেন, ‘এখনকার সিনেমায় কোনো সামাজিকতা আছে নাকি। ছেড়া-ছেড়িরা ছোটো ছোটো জামা-কাপড় পরে গানবাজনা আর লাফালাফি করে। খালি ঢলাঢলি দেখায়, লজ্জাশরম কিছুই নাই।’
বড়োমার কাছ থেকেই জানতে পারি, তার বিয়ের পাঁচ-সাত বছর পর হাতেগোনা কয়েকটা বাড়িতে তিনি রেডিও দেখেছিলেন। তারও কিছুদিন পর এক-দুইটা বাড়িতে সাদাকালো টেলিভিশন আসে। তখন গ্রামের সবাই মিলে ওই বাড়িতে গিয়ে একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখতো। এছাড়া তেমন কোনো বিনোদন মাধ্যম ছিলো না বলেই তিনি জানান। তবে জমিতে ধান কাটার সময় কৃষকরা একসঙ্গে গান ধরতো। আর গ্রামে কারো বিয়ে হলে সেটা মেয়েদের জন্য খুবই আনন্দের ছিলো। বিশেষ করে গায়ে হলুদের দিন গ্রামের সব নারীরা গিয়ে কোমর বেঁধে বিয়ের গীত গাইতো আর নাচানাচি করতো। কথা বলতে বলতে বড়োমা গীত গাইতে শুরু করেন--‘গায়ে হলুদ দিবো কেমনে সখী, এমনে, এমনে’; ‘কোথায় গেলো অনুর মাও/ টাকাকড়ি কিছু দিয়ে যাও’। তিনি জানান, এভাবে গান গেয়ে তারা বর-কনের স্বজনদের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। এসব কথা বেশ আনন্দের সঙ্গেই বলতে থাকেন বড়োমা।
এছাড়া সেসময় নাকি আরেকটা মজার ব্যাপার ছিলো! এখনো মনে পড়লে ভয়ে বড়োমার গায়ে কাটা দেয়। তখন জাদু দেখানোর জন্য কিছু লোক আসতো। তাদের কাছে বড়ো বড়ো সাপ থাকতো। জাদু ছাড়াও সাপ দিয়ে তারা খেলা দেখাতো। একপর্যায়ে সবাইকে একটা করে তাবিজ দেওয়া হতো। সেটা হাতের মুঠোয় পাঁকিয়ে রাখতে হতো। তাবিজ না নিলে নাকি সাপ কামড়ে দিবে! চোখের সামনে কাপড়ের উপর চাল রাখতো, নিমিষেই তা মুড়ি, খই হতো। একটা মানুষকে টেবিলের উপর শুইয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতো। সবার সামনে তার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে আবার বের করে নিতো। কাপড় তুললে দেখা যেতো কিছুই হয়নি। তার পেটে কোনো ক্ষতের চিহ্নও নাই। বড়োমা বলেন, আমার তো এখনও বিষয়টা ভাবলে অবাক লাগে!
দুই.
আমরা কথা বলছিলাম বড়োমাদের বাড়ির সামনের আমবাগানে বসে। ভ্যাপসা গরম তাই খানিক স্বস্তির জন্যই সেখানে বসা। তারপরও আমি বেশ ঘামছিলাম। হঠাৎই আকাশে বিদ্যুৎ চমকানোর রেখা ভেসে ওঠে। দুজনেই একটু ভয় পেয়ে যাই। ভয়টা অবশ্য বেশিক্ষণ থাকে না। বৃষ্টি না হলেও বিকেলের মৃদু হাওয়া বইতে থাকে। শরীর শীতল হয়, বাতাসে মেঘও কেটে যায়। তবে এই বাতাসটা মনে হলো বড়োমার মনকে কিছুটা মাতিয়ে দিয়ে গেলো। তার মুখে খানিকটা হাসির রেখা আর উদাসীনতা দেখতে পাই। মনে হয় পুরনো দিনের এমন কিছু কথা তার মনে পড়েছে, যা তাকে স্মৃতিকাতর করে তুলেছে। খুব জানতে ইচ্ছা করে, কী এই রহস্যময় হাসির কারণ। মনে মনে এসব ভাবলে তো আর সেটা জানা যাবে না। তাকে জিজ্ঞেস করার জন্য ডাকি। আমার কথায় বড়োমা যেনো সম্বিত ফিরে পান। অতঃপর আমার আগ্রহের অবসান ঘটিয়ে বড়োমা বলেন--‘হঠাৎ করেই ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে গেলো। সেই সময়ে যদি ফেরত যেতে পারতাম! মাটি দিয়ে, কাপড় দিয়ে পুতুল তৈরি করে পুতুল খেলা। সেই পুতুল আরেকজনের পুতুলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া। সেই বিয়েতে মিছে মিছে নাড়ু, মুড়ি, চানাচুর খাওয়া। তখন কিন্তু এগুলো আমাদের কাছে অভিনয় মনে হতো না। এখনকার ছেলে-মেয়েদের মতো এতো দামি দামি খেলনা, পুতুল তো আমাদের ছিলো না।’ একটু থেমে বড়োমা আবার বলতে থাকেন, ‘সমবয়সি মেয়েরা সবাই মিলে গাঙে নাইতে যেতাম। নদীর ঘাট থেকে ফিরতে দেরি হলে বড়োদের কাছে বকা তো খেতেই হতো, মাঝেমধ্যে পিঠে মারও পড়তো। সবমিলিয়ে তখন আমরা ভালো সময়ই পার করেছিলাম। সেসব কথা মনে পড়লে এখনো বুকের ভিতরটা কেমন জানি কেঁপে কেঁপে ওঠে।’
রহিমা বেগমের সাথে আড্ডায় লেখক
কিছু সময় পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বড়োমা বললেন, ‘সেই সুখের সময় বেশিদিন থাকলো না। সেই যে বন্দি হলাম, এখনো পর্যন্ত তেমনই আছি।’ কথাটার মানে ঠিকমতো না বুঝতে পারায় বড়োমাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘বিয়ের পর স্বামীর হাতে, আর এখন ছেলেদের হাতে, একই রকম জীবন পার করতে হচ্ছে। আনন্দ করার আর সময় হলো কখন! একে তো আমার বয়স কম ছিলো, তার ওপর এসে পড়লাম সংসারের ঝামেলায়। কিছুই আর হলো না। অনেক সময় খেলতে, ঘোরাঘুরি করতে মন চাইতো। কিন্তু নতুন বউয়ের বাড়ির বাইরে যাওয়া, ছটফটানি, লাফালাফি তো কেউ পছন্দ করতো না। তা সত্ত্বেও ঝড় উঠলে এই বাগানে হাজির হতাম আম, জাম কুড়ানোর জন্য। কাজের ফাঁকে আনন্দ বলতে ছিলো এই।’
কথা বলতে বলতে আবারও উদাসীন হয়ে যান বড়োমা। তারপরও বলতে থাকেন, ‘মাঝে-মধ্যে বাড়ির সামনে দিয়ে সন্ধ্যার দিকে দলে দলে লোক যেতে দেখতাম। লোকমুখে শুনতাম ওরা দলবেঁধে গানবাজনা করতে যাচ্ছে। যেতে ইচ্ছা করতো, পারতাম না বাড়ির বউ বলে। একবার অবশ্য লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম; বেহুলাকে তার স্বামীর জন্য কাঁদতে দেখে চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারিনি। অবশ্য ওই প্রথম আর শেষ, আর কখনো পালাগান দেখা হয়ে ওঠেনি।’ কথাগুলো বলতে বলতে তার চোখ ছলছল করে ওঠে। আমিও বড়োমার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করি; তার অনুভূতিগুলো বোঝার চেষ্টা করি।
বড়োমাকে বললাম বিয়ের পর মন খারাপ থাকলে অবসরে কী করতেন? খানিক চুপ থেকে তিনি বললেন, ‘বিয়ের ঠিক দুই বছরের মাথায় যখন আমার প্রথম সন্তান হবে, তখন পাশের বাড়িতে একটা টেপরেকর্ডার আনলো। টেপরেকর্ডারের রেডিওতে সবাই একসঙ্গে জড়ো হয়ে সন্ধ্যার দিকে খবর শুনতো। আবার কখনো ভালো গান হলে, জোরে গান ছেড়ে শুনতো। সেই গান শুনে গ্রামের অনেকে নাচানাচিও করতো। আমার যেদিন প্রথম মেয়েটা হলো, ওই সময় টেপরেকর্ডারে রিনা খান বলে একজনের গান চলছিলো। ঠিক ওই সময় আমার এক চাচাশ্বশুর এসে বলে, কী হয়েছে ছেলে না মেয়ে? মেয়ে হয়েছে শুনে তিনি বললেন, পাশের বাড়িতে টেপরেকর্ডারে রিনা খানের গান হচ্ছে। তোর মেয়ের নাম আমি রিনা রাখলাম। এভাবেই মেয়ের নাম রাখা হলো! ওই সময় টেপরেকর্ডারে কোনো গান শুনে ভালো লাগলে অনেকে ছেলে-মেয়ের নাম রাখতো। একেক জনের একেক রকম শিল্পী বা অভিনেতার নাম পছন্দ হতো। কার দেওয়া নাম রাখা হবে, সেই নিয়ে চলতো তর্ক-বিতর্ক। শেষ পর্যন্ত সবাই মিলে একটা নাম ধরেই ডাকতো।’
বড়োমাকে বলি, শুধু কি রেডিওই ছিলো? টেলিভিশন আসলো কোন সময়? বড়োমা বললেন, ‘রেডিও আসার কয়েক বছর পর যাদের একটু অবস্থা ভালো ছিলো, তাদের বাড়িতে সাদা-কালো টেলিভিশন আসা শুরু হলো। সেটাও বড়োজোর তিন-চারটা বাড়িতে। যাদের বাড়িতে টেলিভিশন ছিলো, একসঙ্গে সবাই সেখানে গিয়ে জড়ো হতো। কারো কারো বাড়িতে আবার কালো বাক্সের মতো দেখতে কী যেনো নাম, মনে পড়ছে না।’ বললাম, ভিসিপির কথা বলছেন কি? বড়োমা বলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ ওইটাই! ওইতো সেই কালো বাক্সের মধ্যে কি একটা দিতো তখনই রাজ্জাক, শাবানা, জসিম, ববিতা, ইলিয়াস কাঞ্চন এদের ছবি শুরু হতো। আবার সাপের ছবিও হতো!’ আমি আবারও বড়োমাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কখনো প্রেক্ষাগৃহে মানে সিনেমাহলে গিয়ে ছবি বা চলচ্চিত্র দেখেননি? সেই ছবি দেখে কেমন লেগেছিলো? তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘চুপি চুপি দেখছিলাম ইলিয়াস কাঞ্চনের একটা সাপের ছবি বেদের মেয়ে জোস্না আর রহিম রূপবান। তোর বড়োআব্বা তো সেকথা এখনো জানেই না! তারপর তো একগাদা ছেলে-মেয়ে নিয়ে বড়ো সংসার সামলাতেই দিন চলে গেলো। এভাবেই জীবনটা পার করে দিলাম। আর আছিইবা কয়দিন। এখন কি এসব ভালো লাগে! এ ছেলে ও ছেলের বাড়িতে ঘুরে ঘুরে বাকি জীবনটা কোনোরকমে কেটে গেলেই হলো। একবার ছোটোছেলের বাড়িতে রাজ্জাকের বাবা কেনো চাকর ছবিটা দেখছিলাম; খুব ভালো লাগছিলো। ছেলে-মেয়েরা বাবা-মাকে এতো কষ্ট দেয় কীভাবে! রাজ্জাকের কষ্ট দেখে আমিও কেঁদে ফেলেছিলাম।’
তিন.
সেসময়ের চলচ্চিত্র তাদের কতোটা আনন্দ দিতো, প্রভাবিত করতো, বড়োমার কথাতেই তা বুঝতে থাকি। এবার দিয়ে বেশ কয়েকবারই এসব নিয়ে তার সঙ্গে আমার কথা হয়। প্রতিবারই তার কথাতে আমি একটা অদ্ভুত সারল্য পেয়েছিলাম। তার উচ্ছ্বাস, বাচনভঙ্গি, প্রাণোচ্ছ্বল হাসি যেনো এক গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্যেরই প্রকাশ। ঠিক ওই মুহূর্তে বড়োমার বয়সি মানুষদেরই আমার বেশি ভালো লাগছিলো। কথায় কথায় বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হয়। কথা যেনো শেষ হয়েও শেষ হচ্ছিলো না। তারপরও একটা কথা না জানা পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছিলাম না--বর্তমানের চলচ্চিত্র তাদের কেমন লাগে? ভাবতে থাকি এতো কথা যখন শুনলাম, এইটুকুও জানতে হবে। শেষমেশ তাকে বলেই ফেলি, এখন চলচ্চিত্র দেখেন না কেনো? উত্তরে তার কথাগুলো ছিলো এমন--এখনকার ছবি আবার ছবি হলো নাকি! টিভি দিলেই কেবল দেব, জিৎ-এর ঢলাঢলি, মারামারি, লাফালাফি! গানবাজনা তো কী কয় কিছুই বুঝি না। রেডিও নাই, ঘরে ঘরে এখন মোবাইলফোন; টেলিভিশনে এখন আর একসঙ্গে বসে কেউ ছবি দেখে না। আমার নাতি-নাতনিরা দেখি সবসময় মোবাইল নিয়ে যার যার মতো ব্যস্ত থাকে। দল বেঁধে খেলার যে কতো আনন্দ, তারা সেটা জানেই না। আমাদের সময় তো গ্রামে মশার উপদ্রব বেড়ে গেলেও সবাই একসঙ্গে মশাল আর ধোঁয়া নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সারা গ্রামে ধোঁয়া ছড়াতো মশা তাড়ানোর জন্য। এগুলোর মধ্যেও যে অন্যরকম আনন্দ তা আজকালকার ছেলে-মেয়েরা বোঝেই না। তারা মোবাইলের মধ্যেই নাকি খেলে। কী যে খেলে বুঝি না কিছু! যে ছেলের বাড়িতেই যাই, সেখানে খালি হিন্দি চ্যানেল। আর আছে ওই ‘স্টার জলসা’, ‘জি বাংলা’র নাটক; ছেলে-মেয়েগুলো দুই-তিনটা বিয়ে করে, কোর্ট-কাচারি আর শয়তানিতে ভরা। আমাদের সময় তো এসব ছিলো না। আমার তো এগুলো দেখতেই ইচ্ছা করে না। ছেলেদের বাড়িতে গেলে চার দেয়ালের মধ্যে এখন কেমন জানি দম বদ্ধ লাগে! আর ভালো লাগে না। মনে হয় পাঁচ-দশজন মিলে একসঙ্গে থাকি। কেউ এসে একটু কথা বললে আরো ভালো লাগে।
মশার জন্য গ্রামে সবাই মিলে ধোঁয়া ছড়ানোর বিষয়টা আমার কাছে বেশ অদ্ভুত লাগে। এমনটা আবার হয় নাকি। মশা তাড়ানোর জন্য সবাই মিলে এক হয়ে কতো আয়োজন। বর্তমানে শহর তো দূরের কথা, গ্রামের লোকজনও সবাই মিলে একসঙ্গে কোনো কাজ করে না। পুরো ব্যাপারটা শুনে ভাবছিলাম, আগের সময়টা মন্দ ছিলো না। সেদিনের কথাবার্তার শেষদিকে বড়োমার মুখেও কেমন জানি একটা মায়াবী ভাব আসে। এক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছিলাম। বেশিক্ষণ তার কথা শুনলে মনটা কেমন জানি করে! মনের মধ্যে অনেক জমানো কথা বলতে পেরে বড়োমা খানিকটা আবেগি হয়ে পড়েন। মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম তার চোখ দুটো ছলছল করছে, যেনো এখুনি কেঁদে ফেলবেন। বড়োমাদের চাপা কষ্টগুলো অবশ্য কেউ কোনো দিন জানার চেষ্টাও করে না। বড়োমার অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিতে পেরে নিজেরও অনেক আনন্দ হচ্ছিলো। সেদিনের মতো তার সঙ্গে আলাপ শেষ করতে হয়। বড়োমা আমাকে বিদায় দিয়ে আমবাগান থেকে বাড়ির দিকে চলে যান। আমিও বাড়ি ফিরতে থাকি, আর মাথার মধ্যে তখন কেবল বড়োমার কথাগুলোই ভাসতে থাকে।
লেখক : রীতা জান্নাত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
jannatulru.mcj@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100010314337649
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন