Magic Lanthon

               

তানভীর শাওন

প্রকাশিত ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ওং কার-ওয়াই এর চলচ্চিত্র

অপশাসনের চৌকাঠ মাড়িয়ে স্বপ্ন দেখায় লাখো মানুষকে

তানভীর শাওন


হংকংয়ে ওং মেলে

একবিংশ শতাব্দীর ঠিক এই সময়ে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে একপেশে প্রতিষ্ঠানের খেতাব, সে বিচারিক বোধে নতুবা যথেচ্ছাচার ফলানোর ভূমিকায় রাষ্ট্রকেই বোধহয় দেওয়া যায়। একই সঙ্গে বলা ভালো, সাম্প্রতিক সময়ে অধিকতর সর্বগ্রাসী বনে যাওয়া এ প্রতিষ্ঠানটি টিকেই থাকে তার আন্ডার কনস্ট্রাকশন নীতির সার্বক্ষণিক প্রয়োগ ও সেই মাফিক কর্মযজ্ঞ চালানোর মধ্য দিয়ে। সম্ভবত সে কারণেই চলমান দুনিয়ার যে প্রান্তেই পদধারীর চোখে না দেখে স্রেফ মানুষের চোখ দিয়ে তাকাই; সেখানেই দেখতে পাই নানান বয়সি, নানান আকারের নাক-কান-গাল কুঁচকে যাওয়া রাষ্ট্র নামক বীভৎস যন্ত্রের মদদে কিংবা বলাই যায় উলঙ্গ নির্দেশে, সবকিছু একে একে আন্ডার কনস্ট্রাকশন-এ চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের ভূখণ্ড, মানুষ, সমাজনীতি, রাজনীতি, মূল্যবোধ, আইন এ থেকে কিচ্ছু রেহাই পায় না। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের নিয়োগ করা অনুচররা বিশেষ সময়ে বিশেষ জিনিস কন্সট্রাকশনের অনুমোদন পায়। তারপর কার্যবিবরণী মেনে তারা অনবরত ছুরি-কাঁচি চালাতে থাকে। যা খুশি পাল্টে ফেলে ওই জিনিসের; আমূল অথবা আংশিক। সময়ের ফোঁড় ধরে রাষ্ট্র কিন্তু এভাবেই উতরে যায়। ঠিক এভাবেই হয়তো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সুন্দরবন পাল্টে হবে কয়লার ভাগাড়, নিউক্লিয়ার দানবের বীজ বপিত হবে নিষ্পাপ মাটিতে। জ্বলন্ত জন্মভূমির পোড়া গন্ধ আর কালো ধোঁয়ায় যখন নাক-চোখ-মুখ বন্ধ হয়ে আসে, তখন পাশের বাড়িতে তাকিয়ে দেখি ওখানেও কী যেনো পুড়ছে! এই ঘটনা যখন কালো হরফে ভাষা পাচ্ছে, ঠিক সেসময়ে রাষ্ট্রের বদলে দেওয়ার এই খেল-খবর পাচ্ছি সারাবিশ্বেই। কিন্তু এ আলোচনা যে পথের নাগাল পেতে চায়, সে পথের ঘটনাই উল্লেখ করা দরকার সর্বাগ্রে।


পুঁজির অসহনীয় স্ফুরণের সঙ্গে রাষ্ট্র হয়ে উঠছে প্রকৃতি-বিরুদ্ধ। আর প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণে লিপ্ত হলে বৈচিত্র্য সহনক্ষমতা যে হারাতে হয়, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তারই প্রমাণ। তারা সব মানুষের জন্য করছে একই আইন। অথচ একেকজন মানুষ কী ভীষণ অনন্য! রাষ্ট্র প্রয়োজনে তারই চাপিয়ে দেওয়া এসব আইনকে সময়োপযোগী করার নামে করছে মানবগ্রাসী। আজ চিন নিয়ন্ত্রিত হংকং-এর দিকে যখন তাকাই তখন তা আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হংকংজুড়ে এ মুহূর্তে চলমান আসামি প্রত্যার্পণ আইনের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ চলছে তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ, এ আইন অনুযায়ী চিন হংকংয়ের যেকোনো নাগরিককে শুধুই সন্দেহের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় বিচারিক পরিবেশে নিয়ে সাইজ করতে পারবে। এ থেকে বোঝা যায়, আলোচ্য অনুচ্ছেদে কথিত রাষ্ট্রের একপেশে ধর্মচর্চার উপায়। রাষ্ট্র সব মানুষকে একই ছাঁচে-ফর্মায় ফেলে এক সাইজের করে ছেড়ে দিতে চায়। যেনো কেউ দূরে গিয়ে ভেঙচি কাটতে না পারে।


এখন প্রশ্ন হলো, বিখ্যাত মার্শাল আর্টিস্ট ও অভিনয়শিল্পী ব্রুস লির আবক্ষ মূর্তি বুকে ধরা হংকং যেখানে চলচ্চিত্রশিল্পে তার নিয়ন্ত্রক দেশ চিনের থেকে নিজের স্বতন্ত্র এক উজ্জ্বল আত্মপরিচয় খুঁজে নিয়েছে, সেখানে হংকং ওই কালো আইন মেনে নিয়ে পুনরায় আত্মপরিচয় খোয়াবে কেনো? ঠিক সেজন্যই লাখো মানুষ জমায়েত হয়েছে রাজপথে। তারা এ আইন আসলেই চায় না। তাদের স্বরাজ পাওয়ার যে লুক্কায়িত স্বপ্ন আছে, তারই খানিক ঝলকানি বলে অনুভূত হচ্ছে এ প্রতিবাদ। এই লড়াকু জাতির অর্থনীতি, শিক্ষা, বাণিজ্যের মতো চলচ্চিত্রশিল্পও অগ্রসর। তাদের চলচ্চিত্রের অতীত এক মর্যাদাবান অধ্যায়ে খচিত। ফ্রেঞ্চ নিউ ওয়েভের দ্বিতীয় সংস্করণ ঘটানো এই হংকং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যে কজন চলচ্চিত্রের মাঝি-মল্লার পেয়েছে তার মধ্যে একটি নাম জ্বলজ্বল করছে। তিনি ওং কার-ওয়াই। আলোচ্য প্রবন্ধে থাকবে এ নির্মাতার বেড়ে ওঠা, চলচ্চিত্রজগতে প্রবেশসহ তার কর্মপরিধির বর্তমান সক্রিয়তা। এছাড়াও তার চলচ্চিত্রের ভাষা অনুসন্ধানের চেষ্টায় থাকবে উল্লেখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্রের বিশ্লেষণ।


ভাষা যার চলচ্চিত্র

ওং জন্ম নেন চিনের সাংহাই শহরে ১৭ জুলাই ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে। তিন সহোদরের মধ্যে কনিষ্ঠ ওংয়ের বাবা ছিলেন একজন জাহাজী, মা গৃহিনী। ছোট্ট ওং যখন মায়ের কোলে বসে সাংহাইনিজ শিখছিলো, মাতৃভাষার পরম তৃষ্ণা মেটাচ্ছিলো ওই ভাষার অঞ্জলি পান করে, ঠিক তখনো সে জানতো না যে, অচিরেই এই ভাষা, এই আধো বোল তাকে ভুলতে হবে। যখন ওংয়ের বয়স ঠিক পাঁচ, সময়টা ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি, চিনজুড়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পূর্বাভাস। বিপ্লবী মাও চালাচ্ছেন তার সাম্যবাদী শিক্ষা আন্দোলন। বোঝা যাচ্ছিলো সময় আর পরিবেশ অস্থির। ওং সবে হাঁটতে শিখে নিয়ে সাংহাইয়ের অলিগলি চেনা আরম্ভ করছে। ঠিক তখন ওংয়ের বাবা-মা, শিশু ওং ও তার সহোদরদের নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন ছাড়বেন বলে ভাবলেন। স্থির হলো তারা যাবেন হংকং। হংকং তখন বৃটিশ রাজ শাসিত এক উপনিবেশ। হংকংয়ের বাতাসে পরাধীনতার সঙ্গীত ধ্বনিত হলেও পরিস্থিতিটা চিনের মতো শ্বাসরুদ্ধকর ছিলো না। তাই ওংয়ের পরিবার স্থায়ীভাবে চলে আসে হংকংয়ে। শুরু হলো তাদের অভিবাসী জীবন।


অভিবাসী জীবনে ওংয়ের মা-বাবা পড়লেন এক ভয়ানক সমস্যায়। সাংহাইনিজ আর হংকংয়ের ভাষা ক্যান্টোনিজ একেবারে ভিন্ন। এ দুই ভাষার মধ্যে অমিল ছাড়া একচুল মিল নেই। এর ওপর চেপে বসেছে আবার বৃটিশদের বেঁধে দেওয়া ভাষা ইংরেজি। পারিবারিক নানা প্রয়োজনে দোকান-ঘাটসহ যেখানেই যাচ্ছেন অর্থোদ্ধার করতেই যেনো জীবন বেরিয়ে যাচ্ছিলো তাদের। ওংয়ের অবস্থা আরো খারাপ। অতোটুকুন বয়সে মাতৃভাষার পাঠই যেখানে অর্ধেক বাকি, সেখানে নতুন একটা ভাষার দুর্বোধ্য দেয়াল সামনে এসে ওং-কে সত্যিই ভয় পাইয়ে দিলো। বিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে শিক্ষকের কথাই বোঝে না তার ওপর সহপাঠীদের কিচিরমিচির শুনে তার ভাষার প্রতি যে একটা আতঙ্ক জন্মালো, তা না বললেও অনুমান করা যায়। এর ওপর সে ফেলে এসেছে তার ছোট্ট দুনিয়ার অন্তত কয়েক গোণ্ডা চেনা দোকান, রাস্তা, লাল-নীল-সবুজ বাড়ি। সে তুলনায় হংকং যেনো পুরোটাই একরঙা। এখানকার প্রত্যেকটা রাস্তা তার অচেনা।


এতো অসুবিধার মাঝেও ওং যখন মায়ের হাত ধরে নতুন শহরটা ঘুরতে বেরোতো, তখন সে সত্যিই এই সব অচেনা রাস্তা, গলি, দোকানকে একেকদিন চ্যালেঞ্জ জানাতো। প্রতিদিন অন্তত সেগুলোর কিছু কিছু চিনে নিতো--কোনোদিন কেবল একটা রাস্তা, কোনোদিন হংকং-এর বিখ্যাত খাবার, কখনোবা ওই খাবারটির ক্যান্টোনিজ নাম উচ্চারণসহ। এর ফাঁকে শিশু ওং তার মায়ের সাহায্য ছাড়াই অনেকটা অজান্তেই আরো একটা কাজে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো। সেটা হলো ভাষা-ঠিকানা-পরিচিতি সব না জেনে, না বুঝেও এ বিশ্বকে দেখা। ভাষার অজ্ঞানতা ওংয়ের দুরন্ত চোখ দুটোকে থামিয়ে দিতে পারেনি মোটেও। সে সবকিছুকে তার চোখ দিয়ে গিলে নিতে শিখেছিলো। দিনের সব কাজ শেষে কিংবা সপ্তাহান্তে ছুটির দিনগুলোয় ওং যখন মার সঙ্গে প্রেক্ষাগৃহে যেতো চলচ্চিত্র দেখতে, একমাত্র সেই সময়টায় তার ভাষাগত বিভ্রান্তিতে পড়তে হতো না। সহজেই বুঝে ফেলতেন পর্দার ভিতরের গল্প। তখন সেই ছোট্ট ওংয়ের মনে হতো চলচ্চিত্রের ভাষা যেনো শ্রবণানুভূতির অতীত এক ভাষা।


চলচ্চিত্রের প্রতি এই ভালোলাগা থেকেই ওংয়ের ইচ্ছে হয় চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা করার। কিন্তু ঠিক সেই সময়ে চলচ্চিত্র নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিতে গেলে যেতে হতো ইউরোপ কিংবা আমেরিকায়। এদিকে তার পরিবার ছিলো অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা নাজুক। তাই তাকে বাধ্য হয়েই হংকং-এ ভর্তি হতে হয়; বিষয় হিসেবে বেছে নেন গ্রাফিক্স ডিজাইনকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার পাশাপাশি জিইয়ে রাখেন চলচ্চিত্র নিয়ে নিজের আগ্রহ আর সে সম্পর্কিত পড়ালেখা।


নবতরঙ্গের ঢেউয়ে ভাসান দিলো ওংয়ের জাহাজ

পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে ওং যখন শ্রমবাজারে ঢুকবেন বলে ভাবছেন, ততোদিনে তার সমসাময়িকরা চলচ্চিত্র বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। ওং কর্মজীবন শুরু করেন চিত্রনাট্য রচনার মধ্য দিয়ে। চিত্রনাট্য লেখেন টানা ১০ বছর। মাঝে এক বছর কাজ করেন একটি টিভি স্টেশনে। প্রবাসফেরত চলচ্চিত্রপড়ুয়া ওই দলটি হংকং-এ আসার পর থেকেই চেষ্টা করছিলো দেশটির শিল্পী ও কলাকুশলীদের মধ্যে নবতরঙ্গের উন্মেষ ঘটানোর। ওংয়ের চোখ যেহেতু ওই ক্ষেত্রটিতেই নিবদ্ধ ছিলো তাই এ প্রচেষ্টা তার নজর এড়িয়ে যায়নি। ফরাসি নবতরঙ্গের হাওয়া হংকংয়ের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে লাগে ১৯৭০ দশকের শেষদিকে। কিন্তু প্রথমদিকে এ ধারা ছিলো ঝিমিয়ে। কারণ তখন হংকংজুড়ে ছিলো কুংফু চলচ্চিত্র ও পাঁচমিশালি ধরনের (যে ঘরানায় কমেডি, যৌনতা, অতিনাটকীয়তা, মারপিট, অতিপ্রাকৃতিক নানা প্রপঞ্চ থাকতো) চলচ্চিত্র।


বাণিজ্যনির্ভর এই মূলধারাটির সঙ্গে অর্থ কামানো আর চরিত্রগত দুদিক দিয়েই নবতরঙ্গের ছিলো গগনবিদারী ফারাক। আগেই বলেছি ওং বাদে তাবৎ নবতারঙ্গিকগণ ছিলেন পাশ্চাত্য থেকে চলচ্চিত্রের এলেম নিয়ে আসা। এদের মধ্যে কিছু নির্মাতা প্রথমেই দেশীয় চলচ্চিত্রিক ভাষা, নির্মাণ কৌশল বাদ দিয়ে একেবারে নতুন চলচ্চিত্র রীতির গোড়াপত্তন করেন। তারা চলচ্চিত্রে আনে নতুন প্রযুক্তি, ভিন্ন রকম সম্পাদনা কৌশল, স্টুডিওকেন্দ্রিক শুটিং বাদ দিয়ে লোকেশনকেন্দ্রিক শুটিং। এই পরিবর্তনটা সুপ্রবিষ্ট হয় টিসুই হার্ক, অ্যান হুই, ওং জিং-এর হাত ধরে। পরবর্তী সময়ে ওং কার-ওয়াই তো বটেই এই নির্মাতাগণ নবতরঙ্গকে পাল্টে দিলো মূলধারায়। ওং এই ধারাটিকে আরো সুস্থিতকরণে ভূমিকা রাখলেন তার অ্যাজ টিয়ারস্ গো বাই (১৯৮৮), ডেজ অব বিয়িং ওয়াইল্ড (১৯৯০)-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে। ফলে নবতরঙ্গের আরো বিস্তৃত এ রূপ হয়ে গেলো সেকেন্ড ওয়েভ। এ ধারায় ওং-এর সঙ্গী হিসেবে আরো ছিলেন স্টানলি কোয়ান, ম্যাবেল চিউং, অ্যালেক্স ল-এর মতো নির্মাতারা।


চলচ্চিত্রের জমিনে ফোটা এক পারিজাত

ওং চলচ্চিত্রনির্মাতা হয়ে ওঠেন পাঁচ বছরের শিশু থাকাতেই। আক্ষরিক অর্থে কথাখানি খেলো শোনালেও এটাই সত্যি। একটা ছোট্ট শিশু যে কিনা শৈশবের প্রারম্ভেই আচমকা এক নয়া শহরে এলো, তারপর হারিয়ে ফেললো জননীর সঙ্গে তার অধ্যবসায়জাত একমাত্র সম্বল ভাষাখানিও। ফলে যা হলো, সে কিন্তু ওইটুকুন বয়স থেকেই অবিরাম ইমেজ পড়তে শুরু করলো। দেখতে থাকলো মানুষের মুখ, মুখের ভঙ্গি, অসংখ্য ঠোঁটের নড়চড়। যেনো চারপাশে ভেসে বেড়ানো ভাষার অতীত কিছু গল্প দেখতে থাকলো ওই শিশুটি। সে জানলো, না বুঝেও কতো কিছুই না বোঝা যায়! বাকরহিত এক জাদুকরি নৈঃশব্দে ভরা প্রত্যেকটা ইমেজের যে ভাষা, যে গল্প তাই তো চলচ্চিত্রভাষা। দুর্বোধ্যতার মধ্যেও বোঝার মতো কতো কিছু থাকে কিংবা একেকটা নিস্তব্ধতার যে কতো প্রকট চিৎকার থাকে তা তো চলচ্চিত্রে দেখা যায় নানাভাবেই। এই ভাষ্যের স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় স্বয়ং ওংয়ের কথাতেই। ওং বলছেন, ... মা-বেটা প্রায়ই ছবিঘরে যেতাম ছবি দেখতে ... মূলত মা-ই আমাকে নিয়ে যেতেন। শুধু এইখানেই সংজ্ঞাপনের জন্য কোনো মাধ্যমিক ভাষা উপভাষা জানতে হয়নি কখনও। এটি এক জবান কোলাহল অতীত ভাষা। বোঝা যায়, ওং তার চারপাশটা তখন থেকেই দেখতে শিখেছিলেন চলচ্চিত্রের চোখ দিয়ে। ওংয়ের চলচ্চিত্রের যে ভাষা তা অন্য নির্মাতাদের থেকে কতোখানি আলাদা তা বুঝতে গেলে তার এই মৌলিক বাল্যকাল স্মরণে রাখতে হয়। সেজন্যই এ ভাষ্যটুকু হয়ে গেলো আলোচ্য প্রবন্ধের জড়োয়া।


তার চলচ্চিত্রিক বয়ানশৈলীতে কয়েকটি ঝোঁক খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি প্রায় চলচ্চিত্রেই হতে চেয়েছেন তার শৈশবমুখী। সেটা নানাভাবেই। অমনতরো শৈশবকে তিনি শুধু স্মৃতির প্রকোষ্ঠে সাজিয়ে সন্তুষ্টি পাননি। সেই শৈশবে পাওয়া নানা দর্শন, যাতনা, উপলব্ধির সমরেখীয় সুর ধরে বাজাতে চেয়েছেন তার চলচ্চিত্রবাঁশি। কোনো চলচ্চিত্রে শৈশবের সেই সময়টাকে ধরতে চেয়েছেন সম্পূর্ণ অন্য কোনো সম্পর্কের তাগাদা দিয়ে। কখনো দেখাচ্ছেন শহুরে একাকিত্ব, যেমনটা তিনি নতুন এক শহরবাসী হয়ে অনুভব করেছিলেন। কোনো গল্পে আবার দেখাচ্ছেন জীবন-জীবিকার খাতিরে ভিন্ন শহরে যাওয়া কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষের কড়চা। তিনি এসবের মধ্য দিয়ে আসলে সম্পর্কের গল্পই বলতে চেয়েছেন। মানুষের সম্পর্কগুলো অনেকটা ধ্রুব সত্য হয়ে ধরা দেয় তার চলচ্চিত্রে। এই সত্যের একদিকে খুঁজে পাওয়া যায় স্বাধীনতা যেকোনো সম্পর্কের প্রাণ--এ রকম সমবর্গীয় ইঙ্গিত; অন্যদিকে খুঁজে পাই সম্পর্ক-যাপনের ভিতরে কতো ত্যাগ আর আকুলতায় ঠাঁসা তার এক দস্তাবেজ। এসব মিলিয়ে যেনো সম্পর্ক বয়ানের এক মহাফেজখানা হয়ে উঠতে চায় ওংয়ের চলচ্চিত্রসকল। শুধু তাই নয়, তার চলচ্চিত্র প্রগতিশীলতারও প্রগতিশীল। সমাজে চর্চিত যে বিষয়গুলো মানুষ কোনো রকম বাগাড়ম্বর ছাড়াই মেনে নেয়, তিনি এক অদ্ভুত সূক্ষ্মদর্শী হয়ে তার ভিতরেও খুঁত খুঁজে পেয়েছেন। তিনি প্রগতিশীল বলে চালিত নানা বিষয়গুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন তোলেন। তারপর তিনি সচেষ্ট হন সঠিক ভাবাদর্শ বেঁধে দিতে।


একই ওং রাজনৈতিকভাবেও দারুণ সচেতন। বুর্জোয়া অর্থনীতিবিদ কিংবা রাষ্ট্রের হর্তাকর্তাদের মুখ থেকে বর্ষিত বাণী মতে হংকংয়ের বানভাসি অর্থনীতিকে তিনি সবসময়ই মেনে নেননি। তিনি দেখান, ফুলের ভিতরেও কীভাবে কীট বড়ো হয়। তিনি আরো দেখাতে চান, প্রচলিত ব্যবস্থায়, দানবিক অর্থনীতিতেও কিছু মানুষকে কাজের খোঁজে হংকং ছাড়তে হয় রোজ। অথবা যখন তিনি এটা মেনেও নেন যে হংকং অর্থনৈতিকভাবে প্রচণ্ড ভারবাহী, তখনো তিনি এই অবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন নানাভাবে। তিনি দেখান, এহেন অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাতেও মানুষের অস্তিত্ব কী ভীষণ ঠুনকো। তিনি বোঝাতে চান, পুঁজির কড়াল গ্রাসে কতো নরনারী কাতরায় শহরজুড়ে। তাদের চিৎকার, একাকিত্ব পর্দায় ভাসিয়ে দিয়ে তিনি হয়ে যান সিনেমাকবি


সম্পর্কের সিলেবাস পাল্টে দেওয়া চিত্ররাশি

হংকং বংশোদ্ভুত দুজন সমকামী পুরুষ, পরিবার কিংবা সম্পর্কের পিছুটান যাদের কোনোভাবেই টানে না, তারা হয়ে যান আর্জেন্টিনার অভিবাসী। এখানে তারা দুজনে মিলে পা রাখেন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার এক সম্পর্কের বেলাভূমিতে। যে বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে তারা নিয়মিত সমুদ্র-স্নান করেন। একজন অসুস্থ হলে অন্যজন সমুদ্র হয়ে গভীর মমতায় পা ভিজিয়ে দেন। ভরসার বাতাস হয়ে একে অন্যের ওপর বয়ে যান। কিন্তু তারপরও কথা থাকে, এ গল্পে কারো কথা না রাখার। তবু শেষে বোঝা যায় সেই না থাকাও তো ভীষণভাবে থাকা।


হ্যাপি টুগেদার নামে এই চলচ্চিত্রে সমকামী, লিভ ইন রিলেশন-এর এক চাচাছোলা উপস্থাপনা দেখিয়েছেন ওং। তিনি এ সম্পর্কের পুরো মাত্রার এক সুস্থ বিকাশ ঘটিয়ে দেখিয়েছেন যে তা পরিবার থেকে কম নয়। এর মধ্য দিয়ে পারলে তিনি যেনো সমাজ-স্বীকৃত অন্যান্য সম্পর্ক যেগুলো পরিবার গঠনে ওস্তাদ, সেসবের ওপরেই সংশয়ের খড়গ ওঠান। আর যাদের সংশয়ী নাসিকার কল্যাণে এই সম্পর্ক কখনো কোনো সম্পর্কই হয়ে ওঠে না, তাদের ওই চিন্তায় তা (তাপ) দেওয়ার জন্য এই গল্প এক আবশ্যকীয় উনুন। বিশেষত আমাদের উপমহাদেশীয় সম্পর্কের পাটাতন ধরে নির্মিত চলচ্চিত্রে সমকামিতা প্রস্তাবিত কিংবা আবেদনধর্মীতা নিয়ে হাজির হয় মাত্র, সেখানে হ্যাপি টুগেদার বুঝিয়ে দেয় এই সম্পর্ক মোটেও শিশু সম্পর্ক নয়। এর উত্থান সভ্যতার শুরু থেকেই। একটা যন্ত্রণাদায়ক সত্য বার বার অনুভূত হয়, যখন আমাদের আধুনিক নামধারী সভ্যতায় সমকামিতা নিয়ে নানাবিধ অজ্ঞানতাকে এই সম্পর্কের হঠাৎ উদয় হওয়ার দিশা দেয়। এ সত্যিই হতাশাজনক।


ইন দ্য মুড ফর লাভ-এ ওং দেখাচ্ছেন ১৯৬২র হংকংকে। ঠিক যে সময়ে তিনি এই শহরে এসেছিলেন অভিবাসী হয়ে। সেই কচি চোখে দেখা হংকংকে এই চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন এক নান্দনিক মাত্রায়। যেখানে তার বাল্যস্মৃতির হংকং আর পরিণত বয়সের ইরোটিক অনুভূতি মিলেমিশে একাকার। এ চলচ্চিত্রে তিনি বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দেখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে কোনোরূপ বাহাসে যাননি। এই সম্পর্কে তিনি কোনো ভায়োলেন্স খোঁজেননি। বরং এই সম্পর্ককে দেখেছেন ভিন্ন দ্যোতনায়। সমাজে নানামুখী চাপে বা আকস্মিকতায় গড়ে ওঠা একত্রবাসগুলোকে যা কখনো সখনো চ্যালেঞ্জ করে বসে। প্রশ্ন তোলে সেসবের টিকে থাকার কিংবা না থাকার। গল্প কিন্তু এখানেই থেমে যায় না। গল্পের ঘনীভবনে আমরা দেখতে পাই দুটি চরিত্রের মধ্যে পরকীয়া চলমান, সেই বিবাদীপক্ষের ছোড়া এই প্রশ্নকে নাকচ না করে বাদীপক্ষ একপ্রকার অভিনন্দন জানিয়ে নিজেরাও এক হয়ে যাচ্ছেন। তাদের মনেও চলতে থাকে অবিরাম উৎসব। ফলে যেখানে ভায়োলেন্স অবশ্যম্ভাবী ছিলো সেখানে দর্শক খুঁজে পায় এক অপরূপ জলকেলি। যার জুড়ি মেলা ভার। তবে শেষোক্ত অভিনব সম্পর্কটির তিনি কোনো নাম দিচ্ছেন না। তিনি বরং নামওয়ালা নানা সম্পর্কগুলোর হাজারখানেক সীমাবদ্ধতা দর্শককে বাতলে দিতে থাকেন। দর্শক হিসেবে তখন অনুমান করতে পারি, বন্ধু-স্বামী-প্রেমিক এই ধাঁচের প্রচলিত শব্দগুলো সমাজে চলমান সম্ভাবনায় ভরপুর নানা সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে একটা নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা টেনে দেয়। ফলে সম্পর্কগুলোর গতিমুখে একটা শাসনের বলয় চেপে বসে। সেই সঙ্গে সম্পর্কগুলোর যাবতীয় কর্মকাণ্ড হয়ে ওঠে পূর্বনির্ধারিত আর একঘেয়ে। যেনো নামহীন কোনো সম্পর্ক হতেই পারে না। ফলে যা হয়, এই সম্পর্কে এটা ঠিক না, ওটা এ সম্পর্কে হতেই পারে না, তুমি আমার অমুক হও তাই অমুকের মতোই থাকো--এ রকম নানা শাসন সম্পর্কের অভ্যন্তরে চলতে থাকে। এতে করে সম্পর্কগুলো ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সম্পর্কের ভিতরে সম্মান-মর্যাদাবোধ, বিশ্বাস হ্রাস পেতে পেতে কাছের মানুষগুলোর সুশ্রী চেহারা হঠাৎ যেনো হয়ে ওঠে অন্যরকম। ওং এ রকম বিষম এক ইঙ্গিত টেনে দিয়েছেন তার এই কর্মটিতে।


ইন দ্য মুড ফর লাভ-এ ওং মূলত প্রেম এঁকেছেন। যথেষ্ট পরিমিতিবোধ বজায় রেখে পর্দায় আলোছায়ার খেলা খেলে যদি প্রেম আঁকা যায়, তবে তা হয় মহৎ শিল্প। চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তারই লাগসই এক হাজিরা ওংয়ের এই চলচ্চিত্রখানি। এই চলচ্চিত্রে আরো দেখা যায়, এক ভিন্নরকম মোটিফের খেলা। যা আলোছায়ায় তৈরি। মানব সম্পর্কে, বিশেষত নারী-পুরুষের সম্পর্কগুলোতে অসংখ্য অনুভূতি দাগাঙ্কিত করা থাকে। যা ওং আলো কমিয়ে বাড়িয়ে দৃশ্যায়িত করতে চেয়েছেন। কিংবা বিষাদের মুহূর্তগুলোতে লাল-নীলের মিশেলে এক অদ্ভুত আলোর প্রবাহমুখে চরিত্রগুলোকে এমনভাবে বসিয়ে রেখেছেন, যেনো তাদের ভিতরের সব অনুভূতি ওইসব আলোকবিন্দু চুইয়ে বের করে আনছে। এই বিষাদী মোটিফ চলচ্চিত্রজুড়ে এক করুণ সুরের মতো বেজে চলে। সবশেষে এই চলচ্চিত্র শিক্ষা দেয় নিজের একাকিত্বকে ছুঁইয়ে দেখার। কেননা সেটুকুতেই নিজেকে দারুণভাবে খুঁজে পাওয়া যায়। সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দেয়, এই একাকিত্বটুকুই আসলে যার যার অস্তিত্বের নির্যাস; একাকিত্ব যাপন যেনো অস্তিত্বের স্বায়ত্তশাসন।


ইমেজের গুলিস্তানে শোনা যায় নিঃসঙ্গ মানুষের হাসফাঁস

চুংকিং এক্সপ্রেস (১৯৯৪) ওংয়ের আরেক বিস্ময় সৃষ্টি। এই চলচ্চিত্র কয়েকজন একাকী মানুষের রোজনামচার সংকলন। তা সত্ত্বেও এ গল্প একঘেয়ে নয়। শহরের কর্মগামী নানা মুখের যে চঞ্চলতা তার তাগিদে ওং একাকিত্বকে হারিয়ে যেতে দেননি। বরং প্রত্যেকটা ছুটে চলা মানবদেহের খোলসের আবরণে একাকিত্বের যে ঘৃত আগুন হয়ে ঝলসাচ্ছে তা-ই তিনি পর্দায় টেনে এনেছেন। যেনো শহরে মানুষের ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলা, নিঃসঙ্গতার গহীন অরণ্যে হারিয়ে ফেলার মতনই। এই একাকিত্বের ব্যবচ্ছেদ ঘটিয়ে তিনি দেখাতে চেয়েছেন তা চিরস্থায়ী কি না। একপর্যায়ে সবকিছুরই কি মেয়াদ ফুরিয়ে যায়? প্রশ্নকে জিইয়ে তুলে তিনি একাকিত্বের এই আগুন নিভিয়ে দেন। বোঝা যায়, নিঃসঙ্গতার শেষ আলবত আছে। তখনই এই চলচ্চিত্র ধ্রুপদী হয়ে ওঠে। ওং দেখান মানুষের জীবনে এই একাকী অবস্থার সমান্তরালে চলতে থাকে নিরন্তর আত্মোৎসব। কে যেনো একটা ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করে। এ দর্শন স্পষ্ট হয়, একা হতে গেলে আগে সমগ্রে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হয়। সে অর্থে কে মানুষকে একা বলবে? তাই মানুষ একই সঙ্গে একা ও দারুণ সঙ্গীন। যেনো না ছুঁয়েও অনেকে মানুষকে আদর করতে থাকে। তাই এই চলচ্চিত্রকে যে শহুরে একাকিত্বের কবিতা নামে দর্শক ডাকে তা যথার্থই।



এই চলচ্চিত্রে মানবিক ল্যান্ডস্কেপ চিত্রায়ণের একটা চেষ্টা লক্ষ করা যায়। এটা ঠিক করে দেয় শহরের এই বিশাল বক্ষে ওই একাকী মানুষগুলোই যেনো একেকটি ল্যান্ডস্কেপ। যাদেরকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে ব্যক্তি দেখে। চলচ্চিত্রজুড়ে যে কয়টি লঙ শট্ প্রত্যক্ষ করা যায়, তার সবকটিতেই যেনো একটা বিস্ময় তোলা প্রশ্ন তাড়া করে দর্শককে। সেটা হলো, এই শহর একজন মানুষকে ধারণ করতে পারে কি না। কিংবা কথিত সেই একাকী মানুষটি কি শহরের অলিগলির সঙ্গে মানানসই? এ প্রশ্ন মানুষকে শহুরে উত্তাপে সভ্যতার যে নানামুখী পরিবর্তন তা নিয়ে ভাবায়।


চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতে ফ্রেমের বৈচিত্র্যময় কিছু ব্যবহার চোখে পড়ে। অধিকাংশ চরিত্রকে ফ্রেম উইদিন দ্য ফ্রেম দিয়ে দেখানো হয়। এর মাধ্যমে নির্মাতা হয়তো বোঝাতে চান, এইসব নিঃসঙ্গ লোকগুলোকে শহুরে মেজাজ নিয়ে দেখলে তাদের একাকিত্ব অনুভব করা সম্ভব নয়। এদেরকে দেখতে হবে, তাই দেখার ভিতরের দেখা দিয়ে। এদেরকে চিনে নিতে হবে অতি সাবধানে। অন্য কোথাও চোখ ফেললে এরাও হয়ে যাবে যেকোনো সুখী মানুষ। তখন ঘটনার আড়ালের সত্যটা রয়ে যাবে অধরা।


মাই ব্লুবেরি নাইটস্ (২০০৭)-এ ওং খুলে বসেছেন জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়ার এক মহাজনী কারবার। যেখানে দামি শস্যের মদে আসক্ত কিছু মানুষও জীবনের জন্য লক্ষ্য ধার করতে আসে। ওং কাউকেই ফিরিয়ে দেন না। তিনি এই চলচ্চিত্রের গল্প বুনেছেন এক পেস্ট্রি শপের বাহারি খাদ্যের ওমে এবং এক শুঁড়িবাড়ির (মদের দোকান) উঠোনে বসে। পেস্ট্রি শপের খাবারে তিনি উদরপূর্তি করেছেন বটে, কিন্তু অতি ভোজনে পেট ফুলিয়ে তোলেননি। তেমনই মদের দোকানে স্থিত চরিত্রগুলোকে মদ খাইয়েছেন বটে, পাড় মাতাল হতে দেননি। মানুষের জীবন অবিচ্ছিন্ন এক জার্নি শুধু তা বলেই ক্ষান্ত নয় এ চলচ্চিত্র, বরং আরো বেশি করে বলে দেয় এই জার্নিটা কোনো একটা কারণ খোঁজার। তারই নজির হিসেবে চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট চরিত্রকে দেখা যায় জীবনের কাছে বেদম কিল খেয়ে মদের দোকানে কাজ নিতে। তার কাছে বেঁচে থাকাটা একটা কারণ ছাড়া ঠিক হালাল হয়ে ওঠে না। তাই সে ঠিক করে প্রাইভেট কার কিনবে। সেজন্যই এই চাকরি। সেজন্যই চাকরির পিছনে লেগে থাকা জীবন।


পেস্ট্রি শপে তৈরি হওয়া খাবারগুলোর মধ্যে চিজকেক, অ্যাপলপাই দিন শেষের আগেই ফুরিয়ে যায়, ক্রিম চকলেট প্রায় ফুরোয় আর ব্লুবেরি পাই প্রায় পুরোটাই রয়ে যায়, বিক্রি হয় না। ওং প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি ব্লুরেরি পাই বাজে? উত্তর পেতে দেরি হয় না, কোনোটাই বাজে নয়, বরং ব্যাপারটা যার যার পছন্দের। পেস্ট্রি শপারের সঙ্গে এমন এক আলাপচারিতায় জীবন নিয়ে হতাশ এক তরুণীর একটা রাত শুরু হয় ব্লুবেরি পাই খেতে খেতে।


এই শিল্পকর্ম মানুষকে বিশেষভাবে আশাবাদী করে তোলে। পেস্ট্রি শপে একটি কৌটায় রক্ষিত অসংখ্য চাবির গোঁছা দেখিয়ে দোকানি তরুণীকে বলে, এগুলোর প্রত্যেকটিই একেকজন মানুষ কাঙ্ক্ষিত সঙ্গীর ঘরে ফেরার আশায় তার কাছে আমানত রেখেছে। যেনো সঙ্গীরা কখনো ওই দোকানে এলে দোকানি তাদের চাবি দিয়ে দেয়, আর অপেক্ষায় থাকা সঙ্গীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তরুণী জিজ্ঞেস করেন, এদের কেউ কি চাবি নিতে আসে? উত্তরে দোকানি না সূচক জবাবটি টেনে বলেন, তবুও তিনি চাবিগুলো ফেলে দেন না। কারণ, একটি চাবি ফেলে দেওয়ার মানে হলো একটি দরজা কারো জন্য চিরতরে বন্ধ হওয়া। এই ভাষ্য দর্শককে জীবন নিয়ে স্বস্তি দেয়। বোঝা যায়, কেউই ঘরহারা নয়।


এই চলচ্চিত্র সব অসহনীয়র সমাপ্তি ঘোষণা করে দর্শকের উঠতি স্নায়ুচাপ নিকাশ করে দেয়। চলচ্চিত্রের শেষ ভাগে যখন দেখি, ওই তরুণী তার প্রেমিকের ওই অভিশপ্ত জানালা (যে জানালায় একদিন সে তার প্রেমিককে অন্য নারীর সঙ্গে চুম্বনরত দেখেছিলো) ফাঁকা দেখতে পায়। আর ওই বাড়ির সামনে টু লেট লেখা একটা বোর্ড দেখে সে মুখে মৃদু নিশ্চিন্তির এক হাসি ঝলকায়। দর্শক হিসেবে তখন বুঝতে পারা যায়, সব অসহনীয়তার শেষ হয়। কোনো কষ্টই চিরস্থায়ী নয়। শেষে ওই ফাঁকা বাড়ি যেভাবে কিছু নতুন চুম্বনের আশ্রয়স্থল হয়ে নতুন কোনো জুটির জন্য অপেক্ষায় থাকে, সেভাবেই ওই তরুণীকেও দর্শক সুখের জন্য অপেক্ষারত দেখে; স্বস্তি পায়।


শিল্পের বাজারে ওংয়ের খোলা জানালা

সবদিক বিবেচনায় ওং একজন সর্বঘরানায় খেয়ালী চৌকস নির্মাতা। এ কথা স্পষ্ট হয় তার নির্মাণসূচিতে চোখ রাখলেই। তার প্রত্যেকটা চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলীতে আলাদা কৌশল খুঁজে পাওয়া যাবে। যদিও তার চলচ্চিত্রের গল্প ঘুরেফিরে সম্পর্কের জাল বুনতেই ওস্তাদ, তবুও কী বলছি নয় বরং কোন উপায়ে বলছি--এই বোধ তাকে আজ অবধি শাসনে রেখেছে। সর্বশেষ নির্মিত চলচ্চিত্র গ্রান্ডমাস্টার (২০১৩)-এ খুঁজে পাই তার অসাধারণ চাতুরি। মার্শাল আর্টকে উপজীব্য করে বানানো এই চলচ্চিত্র যেনো বিশ্বে হংকংয়ের অসাধারণ এক ঐতিহ্যিক দলিল আর সারা দুনিয়ায় হংকং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির এক বিশ্বস্ত প্রতিনিধি; হয়েছেও তাই। হংকংয়ের চলচ্চিত্র হিসেবে এ চলচ্চিত্রই প্রথম অস্কারে সেরা বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলো।


ওংয়ের চলচ্চিত্র নির্মাণে বড়ো ভূমিকা রাখে যে দুটো জিনিস তার একটি চিত্রনাট্য, অন্যটি সঙ্গীত। চিত্রনাট্য তিনি নিজে লেখেন। তার মতে, এ মোটেও ডিরেক্টরস ইগোর কারণে না। তার চিন্তায়, যে নির্মাতাদের মগজে লেখনীর সামান্য উৎপাতও থাকে, চলচ্চিত্র বানানোর কালে তার সঙ্গে চিত্রনাট্যকারের কোথাও সামান্য ক্যাঁচাল লাগবেই। তাই এ ঝামেলাটুকু তার কাঁধেই তুলে নিতে দেখা যায় তার প্রায় চলচ্চিত্রেই। আর সঙ্গীত, এটা তার কাছে স্বর্গীয় সুধার মতো। তিনি সঙ্গীতকে যতোটা কাজে লাগান তা অত্যন্ত আশ্চর্যের। শুটিংকালীন চিত্রগ্রাহক কিংবা শব্দযন্ত্রী কোনো নির্দেশ বুঝতে না পারলে, তিনি নির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষবাহী কোনো নির্দিষ্ট দ্যোতনার সঙ্গীত তাদের শোনান। এরপর কাজ হয় কি না সে তো ওংয়ের চলচ্চিত্র দর্শনেই উপলব্ধ হয়।


চলচ্চিত্রে আবহসঙ্গীতের যা কাজ, তা কিন্তু ইমেজ আর সংলাপের পরে আসে। কিন্তু ওংয়ের চলচ্চিত্রে কেনো জানি কিছু আবহসঙ্গীত সংলাপকে একেবারে লীন করে দেয়। বলাই বাহুল্য, ওংয়ের চলচ্চিত্রে সংলাপের বাড়াবাড়ি একদমই নেই। তারপরও সেই সঙ্গীত দ্যোতনার বদলে যেনো বয়ে আনে টুকরো কোনো দুঃখবোধ, আনন্দ কিংবা সহনের ভাষিক সূচফোঁড়। তারপর সেই সূচের ফোঁড়ের নেশায় চলচ্চিত্রের পরবর্তী দৃশ্যগুলো দেখে ঢুলতে থাকে দর্শক। চলচ্চিত্র তখন সত্যিই আর চলচ্চিত্র থাকে না, হয়ে যায় অবিরাম আনন্দরাশি খুঁটে নেওয়ার এক দয়াময়ী হামহাম। ঠিক তখনই চলচ্চিত্রের দীর্ঘায়ু প্রার্থনা করা দুটো চোখ সান্ত্বনা খুঁজে পায়, আশায় বুকে চাপড় দেয়। ঠোঁটগুলো ভুল করে বলে ওঠে, চলচ্চিত্র আজও নতুন।


একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ নির্মাতা হিসেবে ওং যে প্রথম শ্রেণির একজন সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তা কেউ না বললেও তার কাজ যুগ যুগ ধরে সাক্ষ্য দিয়ে যাবে। তবুও বলা, অন্তর্জালের এপাশ-ওপাশ নেড়ে ওংয়ের হাওয়া গায়ে এসে লাগে কখনো কখনো। যখন দেখি গার্ডিয়ান-এর করা একবিংশ শতাব্দীর সেরা একশো চলচ্চিত্রের তালিকায় ওংয়ের ইন দ্য মুড ফর লাভ (২০০০) পাঁচের ঘর আলোকিত করছে, তখন নিজের এ আরোপিত বলার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই ওই দূর পাহাড়ে।


লেখক : তানভীর শাওন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

Shawonmcj26@gmail.com

https://www.facebook.com/tanveeshawon

 

তথ্যসূত্র

১.ফিরদাউস, ইমরান; ওং কার-ওয়াইয়ের মাস্টার কামরায়; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা: কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ষ ২, সংখ্যা ২, পৃ. ৯৩।

2.https://bit.ly/2lSdpPa; retrieved on: 04.11.2019

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 


 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন