Magic Lanthon

               

সারা মনামী হোসেন

প্রকাশিত ১২ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

দৃশ্যকলার সৃজনশীল কারিগর বেবী ইসলাম

সারা মনামী হোসেন


উইংস অব ফায়ার : অ্যান অটোবায়োগ্রাফি বইয়ে ভারতের সাবেক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম বলেছিলেন, স্বপ্ন তা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে, এটি সেই জিনিস যা তাকে ঘুমাতে দেয় না। তেমনই তরুণ শিক্ষার্থী আনোয়ারুল ইসলাম ঘুমাতে পারেননি। ছেলেবেলা থেকে ছবি তোলার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা মানুষটি আটকা পড়েছিলেন বিখ্যাত নির্মাতা আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্রের রহস্যের বেড়াজালে। ফলে একসময় মাথায় ঢুকে গেলো ক্যামেরার পিছনে কাজ করার ইচ্ছা। কথাটি পারিবারিক বন্ধু নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক অজয় করের কাছে পাড়তেই ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তার ডাকেই কলকাতার টালিগঞ্জের ইন্দ্রলোক স্টুডিওতে চলে যান ১৬ বছর বয়সি আনোয়ারুল। যিনি পরে বেবী ইসলাম নামে পরিচিতি পান। প্রখ্যাত এ চিত্রগ্রাহক সেলুলয়েডের ফিতায় যে নান্দনিকতার ছাপ রেখেছেন, তা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

অজয় করের সহকারী হিসেবে বেবী হারানো সুর, বড়দিদি, সাত পাকে বাঁধা, সপ্তপদী প্রভৃতি চলচ্চিত্রে চিত্রগ্রহণের কাজ করেন। কলকাতার পাশাপাশি মাদ্রাজ ও বম্বের চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন তিনি। পরে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে চলে আসেন ঢাকায়। ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে আসিয়া চলচ্চিত্রে প্রথম চিত্রগ্রহণের কাজ করার পর নেমে পড়েন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া এই চিত্রগ্রাহকের প্রথম চলচ্চিত্র তানহা ছিলো উর্দু ভাষায়। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন চরিত্রহীন। এর মধ্যে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইতালি যান চলচ্চিত্র বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য।

দুই.

মানিক, তারাশঙ্কর ও বিভূতিভূষণ--এই তিন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক তাদের রচনায় দক্ষতার সঙ্গে নিম্নবর্গের গল্পগুলোকে তুলে এনে একটি নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন। এর ধারাবাহিতায় ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটিতে যোগ হয় সমাজের অপ্রধান জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম, দুর্দশা, প্রতিরোধের গল্প। একে অবলম্বন করে কিংবদন্তি নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটক ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন একই নামে চলচ্চিত্র। বাংলাদেশের হাবিবুর রহমান খান প্রযোজিত এই চলচ্চিত্রে বেবী ইসলাম চিত্রগ্রাহকের কাজ করেছিলেন।

চলচ্চিত্রের কাহিনি গড়ে উঠেছে নদী পাড়ের দরিদ্র মালো শ্রেণির জীবনকে ঘিরে। জীবিকার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে কোনোমতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হয় তাদের। সময়ের পরিক্রমায় তিতাসে চর জেগে ওঠায় নদীতে মাছ ধরে পেট চালানো মানুষগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ে। কেউ অনাহারে মারা পড়ে, কেউবা নিরুপায় হয়ে পাড়ি জমায় দূর-দূরান্তে।

দীননাথ মালোর মেয়ে কিশোরী বাসন্তীর ছোটোবেলার খেলার সাথি কিশোর আর সুবল। তরুণ বয়সে মাছ ধরার জন্য তারা পাড়ি দেয় দূর নদীতে। এর মধ্যেই নদী পাড়ের অন্য একটি গ্রামে দোল খেলা দেখতে আমন্ত্রণ পায় কিশোররা। খেলা দেখার সময় ওই গ্রামে পূর্ব শত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষরা হামলা চালায়। সেখানে উপস্থিত মোড়লদের ঘরের এক তরুণীকে আক্রমণ করতে গেলে কিশোর তাকে রক্ষা করে। গণ্ডগোল থেমে গেলে মোড়ল খুশি হয়ে তরুণীর সঙ্গে কিশোরের বিয়ে দেয়। স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রাতের আঁধারে কিশোর-সুবলদের নৌকায় হামলা চালায় একদল ডাকাত। তারা বউকে তুলে নিয়ে যেতে চাইলে সে নিজেকে বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেয়। এদিকে স্ত্রীকে রক্ষা করতে না পারার কষ্ট এবং সে মারা গেছে ভেবে কিশোর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

১০ বছর পর কিশোরের স্ত্রী তার সন্তান অনন্তকে নিয়ে স্বামীর গ্রামে আসে। কিন্তু স্বামীর চেহারাও সে চেনে না, নামও জানা নেই। নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাকে অন্য একটি নৌকার যে জেলেরা উদ্ধার করে, তারা তাকে ভগবতী নাম দিয়ে আশ্রয় দেয়। পরে স্বামীর গ্রামে সে অনন্তের মা নামে পরিচিতি পায়। সেখানে তার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বিধবা বাসন্তীর সঙ্গে। যার স্বামী সুবল বিয়ের পর পরই মাছ ধরতে গিয়ে ঝড়ে নৌকা উল্টে মারা যান। ঘটনার পরিক্রমায় অনন্তের মায়ের সঙ্গে মানসিক ভারসাম্যহীন কিশোরের দেখা হলেও পরস্পরকে তারা চিনতে পারে না। কিন্তু অনন্তের মা তাকে যত্ন করতে শুরু করে। একপর্যায়ে কিশোর তার স্ত্রীকে চিনতে পারলেও গ্রামবাসীর আক্রমণে তিনি মারা যান। সে দুঃখে সঙ্গে সঙ্গে মারা যান অনন্তের মা।

বাসন্তীর কাছে বড়ো হতে থাকে অনন্ত। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরানোর ঘরে অনন্তকে বাড়তি বোঝা মনে করে বাসন্তীর বাবা-মা। অভাবের তাড়নায় বাচ্চাটিকে বাসন্তী তাড়িয়ে দিলে গ্রামের নিঃসন্তান নারী উদয়তারা তাকে নিয়ে যান। অনন্তকে ছাড়া বাসন্তীর বুকে হাহাকার থাকলেও তিনি শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন না। একসময় তিতাস শুকিয়ে যায়। জেগে ওঠা চর নিয়ে গ্রামের মানুষ মারামারি করে। এই সুযোগে মালোদের ঘরবাড়ি জালিয়ে দেয় একদল স্বার্থান্বেষী লোক। গ্রামে দেখা দেয় চরম অভাব। অনাহারে-অর্ধাহারে সবার মর মর দশা। একটু খাবার আর পানির অভাবে বাসন্তীও ধুঁকতে থাকে। অর্ধমৃত এই নারী তবু কল্পনায় দূরন্ত এক শিশুকে দেখতে থাকেন। একটু খাবার বা পানির চেয়ে হৃদয়ের হাহাকার যেনো বড্ড বেশি বাজে।

প্রত্যেকটি মানুষের দুনিয়াকে দেখা ও দেখানোর ভঙ্গিতে পার্থক্য থাকে। সত্যজিৎ রায় যেভাবে উপলব্ধি করেছেন, ঋত্বিক ঘটক করেছেন অন্যভাবে। মৃণাল সেন আবার তুলে ধরেছেন তার মতো করে। এজন্য প্রত্যেকের চলচ্চিত্র ভিন্ন ভিন্নভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তাই নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহকের জুটি হয় দুই দেহ এক প্রাণের মতো। নির্মাতা ক্যামেরার স্থান ঠিক করে, চিত্রগ্রাহক সে অনুযায়ী শট্ নিয়ে দৃশ্যটিকে অর্থবহ করে তোলে। তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী দর্শক চলচ্চিত্রটি নিয়ে ভাবে।

তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রে কিশোর চরিত্রে অভিনয় করেন প্রবীর মিত্র। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, যে দৃশ্যে তিনি কবরীকে পাঁজকোলে নিয়ে দৌড় দেন, সে শটটি দেওয়ার পর বেবী ইসলাম বলেছিলেন তিনি (প্রবীর মিত্র) ভুল কোণা দিয়ে ফ্রেম আউট হয়েছেন। শটটি আবার নিতে হবে। কিন্তু ঋত্বিক বলে উঠেন, অতো গ্রামার মানতে তিনি রাজি নন। শট্ ঠিক আছে। বরং তার চোখে যেটা ভালো লাগবে, সেটাই গ্রামার বলে বিবেচিত হবে। পরে শটটি সেভাবেই রাখা হয়। অর্থাৎ গতানুগতিক নিয়মের বাইরে গিয়ে নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক কাজ করেন; চাইলে সহজ বিষয়টি সহজে নাও বোঝাতে পারেন। তাই এ মেলবন্ধন দৃঢ় না হলে ঝুঁকি নেওয়া মুশকিল!

সন্তোষ সেন তার সিনেমাটোগ্রাফি বইয়ে উল্লেখ করেছেন, পরিচালকের ভাবনা মৌলিক। আর চিত্রগ্রাহক তাকে ঘিরে নিজস্ব শিল্পসত্ত্বা ও কল্পনা সৃষ্টি করেন। এই সত্ত্বা ব্যক্তি বিশেষে স্বতন্ত্র। তাই একই ভাবনা নিয়ে দুইজন চিত্রগ্রাহক কাজ করলে তাদের সৃষ্টিতে অনেক পার্থক্য থাকবে। একজন চিত্রগ্রাহক বা সিনেমাটোগ্রাফার কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক সুব্রত মিত্রের গল্প থেকে আন্দাজ করা যায়। তিনি আগে চিত্রনাট্য শুনতেন। তারপর আলাপ-আলোচনা করতেন নির্মাতার সঙ্গে। লোকেশনে গিয়ে স্থির ছবি তুলে আলোর বিষয়টি ঠিক করে নিতেন। চিত্রগ্রাহক সবসময় নির্মাতার কথামতো চলবে তা নয়। একজন সৃজনশীল চিত্রগ্রাহক সবসময় নির্মাতাকে সাহায্য করে।

চিত্রগ্রাহক হিসেবে বেবী ইসলাম তিতাস একটি নদীর নাম-এর জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। এ চলচ্চিত্রে ক্লোজ-আপ শট্, হাই অ্যাঙ্গেল শট্, লো অ্যাঙ্গেল শট্, ওভার দ্য শোল্ডার শট্ আর ডিপ ফোকাসের ব্যবহার বেশি চোখে পড়ে।

স্টাবলিশমেন্ট শট্ শুরু হয়েছে তিতাস নদী ও তার বুকে ছুটে চলা নৌকার দৃশ্য দিয়ে। এরপর আসে কিশোরী বাসন্তীর ঝুঁড়ি ঘোরানোর শট্। দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক জুড়ে দিতে ওপেন ফ্রেমে দুই জন কিশোরের হাত দেখা যায়। কিন্তু চেহারা কেউ দেখতে পায় না। তারা ঝগড়া করতে থাকায় দর্শক বুঝতে পারে একজন কিশোর আর অন্যজন সুবল। চলচ্চিত্র শুরু হয় বাসন্তীকে দিয়ে, শেষও হয় বাসন্তীকে দেখিয়ে। শুরুর বাসন্তী যেনো বুঝিয়ে দিতে চায় গল্পটি শেষমেশ তাকে ঘিরেই আবর্তিত হবে।

দৃশ্যবস্তু বা বিষয় থেকে ক্যামেরার যে দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়, তা ক্যামেরার ভাষার প্রাথমিক উপাদান। এখানে লক্ষ করার মতো একটি বিষয় হলো, এখানকার চরিত্রগুলোর নৌকাকেন্দ্রিক দৃশ্যগুলো বেবী বেশিরভাগ সময়ে ফ্রেমে কোণাকুণিভাবে রেখেছেন। এতে তিতাসের আশপাশের দৃশ্যগুলো গোচরে আসে। কয়েক জায়গায় নদীর পাড়ে মানুষের কাজ ও আনাগোনার দৃশ্য চোখে পড়ে। ছোট্ট বাসন্তী যখন রামপ্রসাদের সঙ্গে গল্প করে, তখন বিস্তীর্ণ নদীর একাংশ দৃশ্যপটে থাকে। আবার কিশোর যখন নদী থেকে জাল ওঠায় কিংবা কিশোরদের নৌকা যখন অন্য জেলে পাড়ায় বিশ্রাম নেয়, তখন নদী আর তীর দুটো ভাগই দেখা যায়। ফ্রেম হলো চলচ্চিত্রের ক্ষুদ্রতম উপাদান। একের পর এক ফ্রেমের সংযোগে গড়ে ওঠা শটে পূর্ণতা পায় একটি চলচ্চিত্র। থিম অনুযায়ী কম্পোজিশন করা হয়। তাতে ছোটো থেকে ছোটো বর্ণনাগুলো থাকে।

ক্লোজ-আপ শটের ব্যবহার অনেকবার এ চলচ্চিত্রে দেখা যায়। সাধারণত কোনো চরিত্রের অভিব্যক্তি বা কোনো বিষয়ের ডিটেইল বোঝাতে এ ধরনের শট্ চিত্রগ্রাহক নিয়ে থাকে। তথ্যমূলক (ইনফরমেশনাল) ও আবেগীয় (ইমোশনাল) দুধরনের ক্লোজ-আপের ব্যবহার চোখে পড়ে। রামপ্রসাদ যখন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে একা হয়ে পড়ার গল্প শোনায়, জীবনের দর্শন বোঝানোর চেষ্টা করে, তখন বাসন্তীকে ক্লোজ-আপে একবার দেখানো হয়। বাসন্তী যে সে দৃশ্যে রামপ্রসাদের কথার মর্ম বোঝার চেষ্টা করছে--এমনভাবে তুলে ধরা হয়। এছাড়া নদী তীরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকা কিশোরের স্ত্রী, বিধবা বাসন্তীর নিজের মুখে বলে চলা জীবনের গল্প, মৃত্যুর আগে স্বামীকে চিনতে পারা স্ত্রী, মৃত মাকে দুর্গার রূপে দেখে হাস্যোজ্জ্বল অনন্ত কিংবা অনন্তকে হারিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা বাসন্তী--এ ধরনের শটের মাধ্যমে তাদের অনুভূতিকে মেলে ধরে হাজারো রঙে।

এর মধ্যে এক্সট্রিম ক্লোজ-আপ শটের একটি ব্যবহার দেখা গেছে। কিশোর আর স্ত্রীর বাসর রাতের দৃশ্যে। দুজনই দুজনার কাছে অচেনা, অথচ নিয়তির ফেরে এক ছাদের নিচে। তরুণীর মনে অজানা ভয় আর কিশোরের চোখে কামনা। চিত্রগ্রাহক তাই কিশোরের চোখজোড়াকে নিয়ে আসেন ফ্রেমের মধ্যে। কারণ, কিছু অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার চাইতে অনুভব করানোর মাধ্যমে প্রভাবিত করে বেশি। বাসন্তী তার মায়ের সঙ্গে হাতাহাতির দৃশ্যে ক্রুদ্ধ বাসন্তীকে আর মনমরা অনন্তের দুর্গা প্রতিমার মধ্যে মাকে খুঁজে পাওয়ার দৃশ্য এক্সট্রিম ক্লোজ-আপে দেখান চিত্রগ্রাহক।

এজন্যই অনেক আলোচনায় দর্শকের সঙ্গে মিলে অনুভব করতে পারার বিষয়টি চলে আসে। এর অর্থ হলো, মানুষ যেহেতু তার আবেগের ভিত্তিতে বিভিন্ন পরিস্থিতি বিচার করে, তাই নির্মাতা এমন কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করার কথা ভাবে যা দর্শকের আবেগকে নাড়া দেবে। গল্পের সঙ্গে তাদের একাত্ম করবে।

এ চলচ্চিত্রের একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ওভার দ্য শোল্ডার শটের বার বার ব্যবহার। এ ধরনের শট্ চরিত্রদের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে ব্যবহার করা হয়। এখানে দুটি চরিত্র মুখোমুখি বসে থাকলে একজনের মুখ থাকে দর্শকের দিকে, আরেকজনের কাঁধের ওপর দিয়ে ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এটি দর্শকের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করে, যাতে তাদের মনে হয় চরিত্রগুলো একই উদ্দেশ্য নিয়ে একই ফ্রেমে অবস্থান করছে। অনন্তের মা নৌকায় করে কিশোরের গ্রামে ফিরছে, এমন একটি দৃশ্যে দর্শক ওভার দ্য শোল্ডার শট্ দেখতে পায়। আবার তরুণী বাসন্তীকে পর্দায় দেখানো শুরু হয় তার মা তাকে দোষারোপ করছে--এমন একটি দৃশ্য দিয়ে। সেখানে হাই অ্যাঙ্গেল থেকে এ শটটি নেওয়া হয়েছে। আবার কিশোরের বাবার কাছে পূজার জন্য চাঁদা চাইতে যুবকদের কথোপকথনের শট্, কিশোর, অনন্তের মা ও অনন্ত একসঙ্গে নদীতে দাঁড়িয়ে; অনন্ত যখন অন্য এক মাঝির সঙ্গে চলে যেতে চায়, কিন্তু মায়ের অনুমতি ছাড়া তাকে নেওয়া হয় না, হতাশ অনন্তর শট্ নেওয়া হয় পিছন থেকে। তবে বাসন্তী চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, সেই রোজী আফসারীর উচ্চতা অন্যান্য নারী অভিনয়শিল্পীদের তুলনায় একটু বেশি হওয়ায় ফ্রেমে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে চিত্রগ্রাহককে কিছু কিছু জায়গায় কৌশলে শট্ নিতে হয়েছে বলে মনে হতে পারে।

দূরত্ব ও কৌণিকতার ভিত্তিতে চলচ্চিত্রে লো-অ্যাঙ্গেল শট্ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মানুষের চোখের দৃষ্টি সাধারণত যে বরাবর থাকে তার নিচ থেকে শটটি নেওয়া হয়, চরিত্রদের ক্ষমতাবান ও শক্তিশালী দেখানোর উদ্দেশ্যে। এই ক্ষমতা ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে। এ চলচ্চিত্রে লো-অ্যাঙ্গেল শটের সুন্দর উপস্থাপন আছে। অনন্তের মা মারা যাওয়ার পর বাসন্তী, অনন্ত, বাসন্তীর ছোটোবেলার বান্ধবী ও উদয়তারা স্নান করতে আসে। সেসময় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিলো। একপর্যায়ে তাদের সবাইকে লো-অ্যাঙ্গেলে দেখান চিত্রগ্রাহক। দুর্বার বেগে ঝরে পড়া বৃষ্টিই যেনো তিতাস পাড়ের মানুষের জীবনের দুর্যোগ-দুর্ভোগের প্রতিচ্ছবি। এর মাঝে বাসন্তীর সই আর উদয়তারা একটু ভালো থাকে। কারণ সমাজের দৃষ্টিতে তাদের নিজেদের স্বামীর ঘর আছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে।

আবার প্রবল বৃষ্টিতে নৌকার গলুইয়ের নিচ থেকে শট্ নেওয়ায় মাঝিদের নৌকা নোঙর করার চেষ্টার দৃশ্যটিও বাস্তবসম্মত মনে হয়। অনন্ত চলে যাওয়ায় বাসন্তীর মনে যে কষ্টের ঝড় তা আকাশের কান্না দিয়ে বোঝানো হয়েছে। কাপড় পেটানোর মতো যেনো কষ্টগুলো তার মনে আছড়ে পড়ে। ঘটনার একপর্যায়ে সবজি ব্যবসায়ী কাদের মিয়ার নামে যে মিথ্যা মামলা দেয় তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে কাদেরকে দেখানো হয় লো-অ্যাঙ্গেল থেকে। কাদের মিয়ার চরিত্র অনুযায়ী তাকে পরিশ্রমী ও সৎ উপস্থাপন করা হয়। এ ধরনের শট্ তাই তাকে শক্তিশালী রূপে তুলে ধরেছে। সত্যের আশ্রয়ে যে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়ে আছে।

বেবী ইসলাম এখানে অনেকবার ডিপ ফোকাসের ব্যবহার করেছেন। গ্রাম্য জমায়েত বা পারিবারিক আলোচনায় আশপাশের পরিবেশ এতে উঠে এসেছে। ক্যামেরার লেন্সের ভিতর বেশি আলো প্রবেশ করিয়ে দৃশ্যকে উজ্জ্বল করা হয় এর মাধ্যমে। ফ্রেমে মাথার ওপরের অংশ, মাঝের অংশ ও অনেক দূরের বস্তু এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেমন, এ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, কিশোর যখন নতুন বউ নিয়ে আসার প্রস্তুতি নেয়, তখন সেখানকার মহাজন তাকে নানা পরামর্শ দেয়। এ সময় পাশের ঘরের দরজা দিয়ে ভিতরে নারীদের গোছগাছ চোখে পড়ে। পরে ঘটনার এক অংশে অনন্তের মা গ্রামে প্রবেশ করার পর সবাই মিলে সমাজ ঠিক করার আলোচনায় বসে। এ সময় লেন্সের একবারে সামনে দুই জনের কথোপকথনের পর আউট অব ফোকাসে এক নারী অনন্তের মায়ের হয়ে কথা বলতে থাকে। অরসন ওয়ালেসের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিটিজেন কেইন-এ অনেকটা এ ধরনের একটি দৃশ্য দেখা যায়। যেখানে ঘরের ভিতর কেইনের বাবা-মা অন্য ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে থাকেন, আর ছোটো কেইনকে দূরে দেখা যায় জানালা দিয়ে। বাইরে তুষারের মধ্যে সে খেলায় ব্যস্ত। ডিপ ফোকাসে এই চার জনকে একই ফ্রেমে দেখান নির্মাতা।

তিতাস একটি নদীর নাম-এর দৃ্শ্য


চলচ্চিত্রের কোনো কোনো জায়গায় প্রতীকী চিত্রায়ণ লক্ষ করা গেছে। নৌকা বাইচের দৃশ্যে যেমন দুরন্ত বেগে নৌকা চলার সঙ্গে দেখা যায় অনন্তকে ক্ষুব্ধ বাসন্তী চড় মেরে চলেছে। অন্য দিকে বৃষ্টির পানি নদীতে, জঙ্গলে ঝরে পড়ছে, ক্লোজ শটে বাসন্তী কাঁদছে। শেষের দিকে লঙ শটে তিতাসের জেগে ওঠা চরের ওপর ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত বাসন্তীকে হাঁটতে দেখা যায়। চরের মতোই যার মন ও প্রাণ শুকিয়ে গেছে। মৃত্যুর মুখে পড়েও সে কল্পনায় কোনো এক শিশুকে ক্ষেতের মধ্যে দৌড়াতে দেখে। মিড ক্লোজ আপ শটে হৃদয়ে সন্তানের হাহাকার নিয়ে অপেক্ষা করে বাসন্তী।

চলচ্চিত্রের কম্পোজিশনকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয় আলোর ব্যবহার। এখানে কিছু জায়গায় অন্ধকারে আলোর ব্যবহার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বলে মনে হতে পারে। কিশোর-সুবলের জেলে জীবনের দৃশ্যগুলোতে কুপি বা হারিকেনের আলোর কৃত্রিমভাবটা ধরা পড়ে। এছাড়া কিশোর ও অনন্তের মায়ের বাসর ঘরের দৃশ্যেও একই অবস্থা। আলো-আঁধারি ভাবটা ফুটে উঠি উঠি করেও ওঠেনি। কিশোরদের বাড়ির রান্না ঘরে পিঠা বানানোর দৃশ্যেও উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ে। অথচ সামনে খালি চুলা আর হারিকেনের আগুন দেখা গেছে। সে হিসেবে উদয়তারার বাড়িতে অনন্তের ভাত খাওয়ার দৃশ্যটি সুন্দর।

ছোটো ছোটো ডিটেইলগুলোর দিকে নির্মাতা খেয়াল রেখেছেন। ঘরের উঠানে ভেজা কাপড়, কোনোরকমে ছন দিয়ে বাঁধা নড়বড়ে ঘর, দেয়ালে ছোটো ছোটো ঝুঁড়ি ইত্যাদি ছিলো। ল্যান্ডস্কেপ ভিউগুলো বেশ চমৎকার। তিতাস পাড়ের জীবনই বেশি তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে নদীর বুকে ভেসে চলা পাল তোলা নৌকাগুলোর দৃশ্য গুমোট ভাব থেকে যেনো একটু মুক্তি দেয়।

তিন.

দ্বন্দ্ব শব্দটাই যেনো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে যুক্তি তক্কো আর গপ্পো চলচ্চিত্রজুড়ে। সমকালীন রাজনীতির দ্বন্দ্ব, শিল্পের দ্বন্দ্ব, সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব, শহুরে আর গ্রামীণ জীবনের মধ্যকার দ্বন্দ্ব--সব বিষয় নিয়েই মোটামুটি এখানে আলোচনা হয়েছে। পার্থক্য হলো, এখানে কোনো লুকোছাপা ছাড়াই ঋত্বিক ঘটক সরাসরি মূলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। বেবী তার সেসব প্রশ্ন, দ্বিধাকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে ক্যামেরার ভাষাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে নির্মাতা কী ভেবেছেন এবং কী ভাবছেন।

গল্পের পটভূমি ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতায় তখন নকশাল আন্দোলনের হাওয়া লেগেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে শরণার্থীরা ভারতে আসছে। মূল চরিত্র নীলকণ্ঠ বুদ্ধিজীবী, মদখোর-মাতাল। স্ত্রী-সন্তান তাকে রেখে চলে যায় শুরুতেই। বাড়িওয়ালাও তাকে বের করে দেয়। পাড়ার বাসিন্দা নচিকেতা আর বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা তরুণী বঙ্গবালাকে সঙ্গে নিয়ে পথে পথে ঘুরতে শুরু করেন তিনি। চেনা-অচেনা নানাধরনের মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দলের নতুন সঙ্গী এক পণ্ডিতকে নিয়ে পুরুলিয়ায় পৌঁছানোর পর ভূমিদস্যুদের গুলিতে তিনি মারা যান। এরপর তারা কাঞ্চনপুর পৌঁছালে নীলকণ্ঠ তার স্ত্রীকে অনুরোধ করেন ছেলেকে বাড়ির পাশের শালবনে নিয়ে আসতে। শালবনের ভিতর ছেলের জন্য অপেক্ষা করার সময় পুলিশ ও নকশালদের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। একপর্যায়ে ছেলে এসে নীলকণ্ঠকে ডাক দিলে পুলিশ আবারও গুলি চালায়। এতে তিনি মারা যান।

এখানে শুরুটা বেশ চমক জাগানিয়া। ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেমে প্রথমে শীর্ণকায় এক বৃদ্ধকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। এরপর পোশাকে আপাদমস্তক ঢাকা তিন জন মানুষ ধু-ধু বালুতে নাচতে শুরু করে। হঠাৎ করে মনে হতে পারে তিনটি ছায়া নাচছে। ক্যামেরা ধীরে ধীরে হাই অ্যাঙ্গেলে উঠে যায়। তারপর একসময় ফুল শট্ হয়ে ক্লোজ আপ শটে স্থির হয়। মানুষগুলো হারিয়ে সামনে পড়ে থাকে মস্ত এক পাথরের খণ্ড। যেনো বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর সামনে অশুভ কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখানে কোনো প্রাণ নেই, স্পন্দন নেই। পালাবার পথ নেই। চারপাশে শুধু দেয়াল।

নীলকণ্ঠের স্ত্রী চলে যাবে এমন একটি সময়ে নীলকণ্ঠকে দেখানো হয় হাই অ্যাঙ্গেল থেকে। মাতাল এই বুদ্ধিজীবী যে অসহায় হয়ে পড়ছেন সেটি বুঝতে কষ্ট হবে না। কিন্তু স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে টলোমলো পায়ে নীলকণ্ঠ যখন দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন ক্যামেরা চলে যায় লো অ্যাঙ্গেলে। কারণ এই ব্যক্তি মচকাবে, কিন্তু ভাঙবে না। সেই সঙ্গে সেসময়ে একজন নারী স্বামীকে ছেড়ে চাকরি নিয়ে স্বনির্ভর হচ্ছেন, মানসিক শক্তির সেই দিকটিও প্রকাশ হয়। কিছু সময় পর বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেলে আবারও একাকী নীলকণ্ঠকে হাই অ্যাঙ্গেল থেকে দেখান চিত্রগ্রাহক। এখানে যে দৃশ্যটি ভালোলাগার মতো সেটি হলো, নীলকণ্ঠ যখন জানালার ধারে বসে থাকেন, তখন এক ছটাক আলো এসে তার শরীরে পড়ে।

যুক্তি তক্কো আর গপ্পো-এর দৃশ্য


বঙ্গবালার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের দৃশ্যে দুই জনকে ক্লোজ আপ শটে দেখানো হয়। এরপর ওভার দ্য শোল্ডার শটে কথা বলতে দেখা যায় মূল চরিত্রকে। বঙ্গবালা এখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রতীক। এখানেও পরে মাথা নোয়াবার নয় বাংলাদেশকে বোঝাতেই যেনো লো অ্যাঙ্গেল শটে ফিরে যান চিত্রগ্রাহক।

যৌক্তিক ও বৈচিত্র্যময় শট্ ব্যবহারের মাধ্যমেই চলচ্চিত্রের মূল থিমটি ফুটে ওঠে। ভবঘুরের মতো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যখন দলটি যাচ্ছিলো তখন বেশ কয়েকবার ফুল শটের ব্যবহার দেখা যায়। এ ধরনের শট্ অভিব্যক্তি বা আবেগ, অনুভূতির চেয়ে চরিত্রদের নাড়াচাড়া ও কর্মকাণ্ড ভালোভাবে বোঝাতে চায়। এছাড়া আবার কিছু সময়ে মিডিয়াম শট্ও নিয়েছেন চিত্রগ্রাহক। এতে করে চরিত্রদের মুভমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের পরিবেশটাও বোঝা গেছে।

এ ধরনের শটের মধ্যেই হঠাৎ এমন কিছু চোখে পড়ে যা দর্শকের সরলরৈখিক চিন্তায় ছেদ পড়াতে বাধ্য করে। যেমন, নচিকেতা যখন রাতে নীলকণ্ঠ ও বঙ্গবালার সঙ্গে পার্কের বেঞ্চে বসে প্রসপেক্ট নিয়ে আলোচনার চেষ্টা চালান, তখন এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটে তার চোখ দেখান বেবী। এটি চরিত্র বা বিষয় সম্পর্কে ভিন্নভাবে ভাবায়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা পরিস্থিতিতে চরিত্রের মধ্যে যে অনুভূতি কাজ করে তা দর্শকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে অথবা বলা যেতে পারে, দর্শককে ওই চরিত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল করতে চিত্রগ্রাহকেরা এ শট্ ব্যবহার করে। নীলকণ্ঠ চা না খেয়ে কী খাচ্ছে, দেখতে পণ্ডিত এগিয়ে এলে নীলকণ্ঠ হঠাৎ গ্লাসটি ক্যামেরার লেন্সের সামনে তুলে ধরেন। চলচ্চিত্রের প্রায় শেষ পর্যায়ে নীলকণ্ঠ যখন তার স্ত্রীর কাছে যান তার আগে আচমকা সেই বৃদ্ধ আর ত্রিমূর্তির নৃত্য প্রর্দশিত হয়। এ যেনো আবার ঝড়ের পূর্বাভাস!

এটি এমন একটি সময়ের গল্প, যখন কলকাতার এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী সময়কে ব্যবহার করে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। আরেক শ্রেণি এ ধরনের পরিস্থিতিতে কী করা যেতে পারে, সে নিয়ে চিন্তায় মগ্ন। নীলকণ্ঠের বন্ধু ও জনপ্রিয় লেখক সত্যজিৎ বসু সেই গা বাঁচানো শ্রেণির একটি অংশ। যদিও সংগ্রামী শিল্পী হিসেবে জীবন শুরু করা এই ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে প্রায়ই দ্বন্দ্বে পড়তে দেখা যায়। সঙ্গী-সাথি মিলে মদ্যপান করার একপর্যায়ে বাংলাদেশ থেকে চোরাই পথে আমদানি করা মদ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে একজন। ডিপ ফোকাসের মাধ্যমে ওভার দ্য শোল্ডার থেকে হাই অ্যাঙ্গেলে সত্যজিৎকে গালে হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ পরেই উচ্ছ্বসিত ব্যক্তিটিকে লো অ্যাঙ্গেল থেকে তাকে পরামর্শ দিতে থাকে এ সুযোগে সে যেনো কোনো লেখা ফেঁদে ফেলে। ওই সময়ে এ ধরনের সুবিধাবাদী ব্যক্তিরাই যে তরতরিয়ে সামনে এগোচ্ছিলো আর ক্ষমতাবান হিসেবে জাহির হচ্ছিলো, তা এসব শটের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। যারা দেশ-সমাজ নিয়ে চিন্তিত না। বরং তাদের যুক্তি এসব নিয়ে ভাবার বহু লোক আছে।

তবে সত্যজিতের পাশে নীলকণ্ঠকে দেখানো হয়েছে সেই লো অ্যাঙ্গেল থেকে। মাতাল এ বুদ্ধিজীবী মেধা ও মননে অন্যরকম তাই যেনো প্রকাশ করে ক্যামেরার লেন্স। তিনি সত্য বলতে দ্বিধা করেন না, বড়ো তীক্ষ্ম ও তীব্র তার সমালোচনাভঙ্গি। তার পাশে সত্যজিতের মতো চরিত্র নুইয়ে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কাহিনির শেষের দিকেও ছৌ নাচের শিল্পীদের মঞ্চায়িত দেবী দুর্গার কাছে অসুরের পরাজয়ের গল্পে দুর্গাকে লো অ্যাঙ্গেল থেকে দেখানো হচ্ছে।

জুম ইন ও জুম আউটের ব্যবহার এ চলচ্চিত্রে দৃষ্টিগোচর হয়। বঙ্গবালা গান গাইবার দৃশ্যে বেবী ইসলাম প্রথমে মিড শটে তাকে দেখান। এরপর জুম আউট করলে দেখা যায় সামনে নীলকণ্ঠ বসে আছেন। আবার একসময় ক্যামেরার লেন্স জুম ইন হয়ে বঙ্গবালার ওপর স্থির হয়। দৃশ্যপটের পরিবর্তন কিংবা নাটকীয়তা বাড়াতে চাইলে একজন চিত্রগ্রাহক এই শট্ নিতে পারে। এখানে এ ধরনের শটগুলো গল্পে আলাদা আবহ তৈরি করে। দুঃখী এই তরুণীর কষ্ট মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধরত একটি দেশের মানুষ কতোটা অসহায়। সীমান্ত পেরিয়ে এমন অনেক বঙ্গবালা এসেছে। কেউ হয়তো আশ্রয় পেয়েছে, কেউ হারিয়ে গেছে।

ছৌ নাচের শিল্পীদের সঙ্গে ভূমিদস্যুদের সংঘর্ষের দৃশ্যগুলো মাঝে মাঝে ওয়াইড শট্ ও ফুল শটে কেঁপে ওঠে। এতে দর্শকের মনে হতে পারে সেও ঘটনার একটি অংশ। আবার শিল্পীদের নাচের দৃশ্যগুলোও একই ধরনের শটে নেওয়া। মাঠভর্তি দর্শক বোঝাতে বেবী এমন ফ্রেম ব্যবহার করেছেন, যাতে চরিত্রগুলো কোণাকুণিভাবে দৃশ্যপটে প্রবেশ করে বা বের হয়ে যায়। তিতাস একটি নদীর নাম চলচ্চিত্রেও একই পদ্ধতি প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। আবার দর্শকের ভিতর দিয়ে তিনি ফ্রেমের ভিতর ফ্রেম তৈরি করেছেন। যাতে মনে হয় ওখানে বসেই নৃত্য দেখা হচ্ছে। ওভার দ্য শোল্ডার শটে পণ্ডিত ও আশ্রয়দাতা পঞ্চাননের ঝগড়া এবং মাতাল নীলকণ্ঠকে বাড়ির উঠানে দেখান এই ফ্রেমে।

চলচ্চিত্রের অনেক দৃশ্যে ডিপ ফোকাস আছে। বঙ্গবালা-নীলকণ্ঠ-নচিকেতা, কখনো নচিকেতা-পঞ্চানন-নীলকণ্ঠ কিংবা কয়েকটি দৃশ্যে চার জন বা পাঁচ জনই এক ফ্রেমে ছিলো। চমৎকার বিষয় হলো, এতোগুলো মানুষকে ফ্রেমে দেখে গুমোট লাগে না, বিরক্তিও অনুভূত হয় না। ছোটো জায়গায় নির্মাতা এমনভাবে সবাইকে সেট করেছেন যে ক্যামেরার লেন্সে সেটি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবালাকে এক টুকরো বাংলাদেশ বলেছিলো নীলকণ্ঠ। সন্তানদের জন্য মাতৃভূমির ত্যাগের গল্প, তার দুর্দশার গল্প গানে গানে বলেছিলেন তিনি। এ সময় কোনো কোনো চিত্রগ্রাহক চোকার শট্ ব্যবহার করে। এটি এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটের অন্য একটি রূপ। চোকার শট্ ব্যবহারের ফলে চরিত্রদের মুখাভিব্যক্তি সামনে চলে আসে। পর্দার বাইরে যারা আছে, তাদের সঙ্গে চরিত্রদের অনুভূতি মিলে একাকার হয়ে যায়।

চলচ্চিত্রের শেষে নকশাল ও পুলিশের মধ্যকার গোলাগুলির দৃশ্য কিছু ধারণ করা হয় টপ শটে। এতে পুরো এলাকা ও পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব হয়। বন্দুকের নলগুলো কয়েকবার ক্লোজ শটে চলে আসে। ওপেন ফ্রেমে একটি হাতকে গুলি চালাতে দেখা যায়। তবে সেটি কার হাত তার উত্তর পাওয়া যায় না। এর মধ্যেই এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটে কারো চোখ দেখা যায় দুইবার। এক পুলিশ বোমা ছোড়ার আগে ক্লোজ শটে তার মুঠি ধরা হাতটা নেন চিত্রগ্রাহক। এরপর গুলিবিদ্ধ নীলকণ্ঠ এক্সট্রিম ক্লোজ শটের মধ্যে তার মদের বোতল উপুড় করে দেন। এমন বৈচিত্র্যময় শট্ দারুণ অস্থির পরিবেশের সৃষ্টি করে। চারপাশে ধ্বংস আর তাণ্ডবের খেলা তুলে ধরতে নান্দনিক ক্যামেরা ভাষার প্রয়োগ ঘটেছে এখানে।

তবে জোতদার মাধব হালদারের গুলিতে পণ্ডিতের মৃত্যু ও মাধবের পলায়ন এই ঘটনাটুকুতে ক্যামেরা এতো দ্রুত কাজ করেছে যে, কিছু দৃশ্য হঠাৎ করে বোঝা যায়নি। ফলে এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে যেতে যেতে ঘটনা কিছুটা এলোমেলো লাগে। আবার কয়েকটি দৃশ্যে সাবজেক্ট এমন জায়গায় ছিলো যে, আশপাশের পরিবেশ অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধরা পড়ছিলো বলে মনে হয়।

ভাবা প্র্যাকটিস করানোর রেশ চলচ্চিত্রের গানগুলোও ধরে রেখেছে। তবে এদের চিত্রায়ণ বেশ স্বস্তি দেয়। প্রেমের গানে বিশাল আকাশ, ঝরনা আর উড়ন্ত পাখির ল্যান্ডস্কেপ ভিউগুলো অন্য জগতে নিয়ে যায়। পাশাপাশি বঙ্গবালা ও নীলকন্ঠের গানের দৃশ্যগুলো হৃদয়ে হাহাকার বাড়িয়ে তোলে। চিত্রগ্রহণ দিয়েই দর্শককে ভাবা প্র্যাকটিস করার সুযোগ নির্মাতা যেভাবে করে দিয়েছেন তা প্রশংসাযোগ্য।

চার.

বেবী ইসলাম নির্মিত চরিত্রহীন ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে এটি নির্মিত হয়। এ চলচ্চিত্রের চিত্রগ্রহণের জন্য বেবী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

চলচ্চিত্রের গল্প আবর্তিত হয় তিন জন পুরুষ ও এক নারীকে ঘিরে। যাত্রাদলের সদস্য রতন নিজ গৃহে ঘৃণার পাত্র। যাত্রা করে বলে তার বাবা তাকে বাড়িতে আসতে দেন না। তিনি মদ খান বলে সমাজের লোকজন তা নিয়ে কথা শোনায়। রতনের পছন্দের মানুষ হাসু। এই মেয়েটি শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল। বিয়ে করে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার চাইতে নিজে আয় করে চলতে ইচ্ছুক। একসময় শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি পান তিনি। সেখানে আসাদ নামের এক সহকর্মীর সঙ্গে তার ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এদিকে রতনকে পছন্দ করে তার বন্ধুর বোন আনু। কিন্তু ঘটনার একপর্যায়ে রতনের কথায় অভিমান করে সে আত্মহত্যা করে।

এদিকে হাসুদের প্রতিষ্ঠানের কর্তা সোলেমান মোর্শেদের একমাত্র মেয়ে জুঁইয়ের সঙ্গে হাসুর সখ্য হয়। ঘটনাক্রমে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে সে জ্বরের ঘোরে হাসুকে ডাকতে থাকে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে অসুস্থ দাদিকে একা রেখে হাসু বাধ্য হয় জুঁইয়ের কাছে আসতে। নিজের মেয়ের স্বার্থে হাসুকে মোর্শেদ বাড়ি ফিরতে দেয় না। এমনকি বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যান করে হাসু সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। এদিকে আসাদ পরে হাসুকে চরিত্রহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন অপবাদ দিয়ে তাড়িয়ে দেন। অপমানিত হাসু রতনের কাছে চলে যান। এদিকে বোন মিনুর কাছে আসল ঘটনা শুনে আসাদ তার ভুল বুঝতে পারে। পরে রতন নিজে তাদের বিয়ে দেয়।

চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফিতে চরিত্রদের অভিব্যক্তি বা অনুভূতি বোঝানোর জন্য বেশিরভাগ সময় বেবী ইসলাম ক্লোজ আপ শট্ ও চোকার শটের ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থার প্রকাশে ছিলো লো অ্যাঙ্গেল ও হাই অ্যাঙ্গেল শট্। চরিত্রকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট করে বোঝানোর জন্য ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেম ব্যবহার করেছেন। চরিত্রদের মধ্যে সংযোগ ঘটাতে বার বার ওভার দ্য শোল্ডার শট্ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্যান শটের ব্যবহার আছে, লঙ শট্, মিড শট্, টিল্ট আপ, টিল্ট ডাউন, জুম ইন, জুম আউট, ডিপ ফোকাস, ডলি শট্ ঘটনার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে।

গল্পের শুরুর দৃশ্যটি ওভার দ্য শোল্ডার শটে। যাত্রাদলের সানাইবাদক বৃদ্ধ আলী ক্রমাগত কাশি দিয়ে বোঝাচ্ছেন তার অসুস্থতার কথা। এর কিছু পর রতন তার মায়ের হাতে টাকা দিতে গেলে বাবা ধমক দেন। এ দৃশ্যটি রতনের কষ্ট পাওয়া অভিব্যক্তি চোকার শটে দেখান চিত্রগ্রাহক। এরপর বাবার মুখটি চোকার শট্ থেকে ডলি শটে এসে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দেয়। ক্যামেরার চোখ যেহেতু দর্শকের চোখ, তাই এ ধরনের শটের মাধ্যমে বিষয় বা কনসেপ্ট পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। দর্শকের মনে হতে পারে সে কোনো কিছুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বা কোনো কিছু থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এছাড়া সামনে কিছু ঘটতে যাচ্ছে, এমন অনুভূতি দিতেও এ শট্ ব্যবহার করা হয়।

যাত্রাদলে কাজ করে বলে তার উপার্জন হারাম এমন কথা শুনে রতনের নিজেকে খারাপ মানুষ বলে মনে হতে থাকে। আহত রতনকে তখন হাই অ্যাঙ্গেল শটে দেখানো হয়। এ সময় যে বাউল তার কাছে সাহায্য চায় তাকে আবার দেখানো হয় লো অ্যাঙ্গেল থেকে। কারণ সে মনের দিক থেকে বড়ো। তার ভাষ্য ছিলো, মানুষকে আনন্দ দিয়ে আয় করা রহমত। এ কথা শুনে সে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে, এমন ইঙ্গিত দিতে আবারও ব্যবহার করা হয় লো অ্যাঙ্গেল শট্। এছাড়া হাসুর অফিসে যোগদান করার দৃশ্যগুলোতে হাই অ্যাঙ্গেল, হাসু-আসাদের প্রথম পরিচয়ে, অসুস্থ হাসু, বিছানায় অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা হাসুর দাদিকে দেখাতে লো অ্যাঙ্গেলের ব্যবহার আছে। চলচ্চিত্রের শেষে হাসুকে নিজের করে পাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে তার ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে মানুষ হিসেবে আরো বড়ো হয়ে ওঠেন তিনি। বেবী ইসলাম তাকে হিরোয়িক করে তোলেন লো অ্যাঙ্গেল শটের মাধ্যমে।


চরিত্রহীন-এর দৃশ্য

ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেমের চমৎকার ব্যবহার আছে কিছু। মৃত্যুর আগে আনু বার বার পিছনে ফিরে তাকান আর আত্মহত্যার দৃশ্যটি দেখানো হয় এ ফ্রেমে। পর্দার বাইরে যিনি দেখছেন তার মনে হবে রতনের পিছনে দাঁড়িয়ে তিনি দৃশ্যটি দেখছে। আবার পরের দৃশ্যে রতনকে ঘরের ভিতরে দেখানো হয় আনুর ঝুলন্ত দেহের পিছন থেকে। আসাদ যখন হাসুদের বাড়িতে আসে রতন তখন সবাইকে সানাই বাজিয়ে শোনায়। এর পরের দৃশ্যটিতে প্রথমে রতন আর হাসুর দাদিকে দেখানো হয়, এরপর হাসু আর আসাদকে ফ্রেমের ভিতর ফ্রেমে। সবার কষ্টগুলো যেনো আলাদা করে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন বেবী। প্রত্যেকের গল্প আলাদা করে বলতে চেয়েছিলেন।

এখানে একটি প্রতীকী দৃশ্য আছে। আনু আত্মহত্যা করার আগের রাতে ঝড় হয়। এ সময় রতনের মাথার ওপরে থাকা একটি শিকা প্রচণ্ড দুলতে থাকে। বিষয়টা অনেকটা এমন, সামনে কোনো ঝড় এসে সবকিছু তছনছ করে দেবে। পরের দিন সকালে গাছের ডাল থেকে সেই শিকাটির মতোই আনুর দেহ ঝুলছিলো। আর রতন আনুর পায়ের কাছে বসে।

এদিকে মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তায় বিমর্ষ চেহারার মোর্শেদকে গাড়ির ভিতর কিংবা তিনি যখন হাসুকে খবর দেওয়ার জন্য অফিসের ম্যানেজারকে ফোন দেন, তখন তাকে এ ফ্রেমে রাখেন চিত্রগ্রাহক। এতে আরেকটি বিষয় হয়, সেটি হলো দেখার সময় ফ্রেমে অনেকে থাকলেও ওই নির্দিষ্ট চরিত্র বা চরিত্রগুলোর দিকে আগে নজর পড়ে। মোর্শেদ ও হাসুর ডাইনিং টেবিলে বসে খাওয়ার দৃশ্যে একটি ফুলদানি দিয়ে আরেকটি ফ্রেম তৈরি করা হয়েছে। মিড শটে তারা বসে আলোচনা করে। আর একজন গৃহকর্মী খাবার পরিবেশন করে। দৃশ্যটি এমনভাবে নির্মাণ করা, যেনো বোঝা যায় তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত কথাবার্তা চলছে।

দুই জন বা তিন জন ব্যক্তির মধ্যে আলাপ-আলোচনার দৃশ্য ধারণে ওভার দ্য শোল্ডার শটের ব্যবহার প্রচলিত। বেবী এ চলচ্চিত্রে এমন ধরনের দৃশ্যে চরিত্রগুলোকে যেভাবে দেখিয়েছেন, তাতে তাদের মুখমণ্ডলের এক পাশ দেখা যায় বা সংলাপগুলো সেভাবে তারা ছোঁড়ে। এতে অনেক সময়ই মনে হয় যেনো চরিত্রগুলো দর্শককেও তাদের আলোচনায় শামিল করে নিয়েছে।

হ্যান্ড হেল্ড শট্ নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার অনুভূতি তৈরি করা হয়েছে এ চলচ্চিত্রে। জুঁইকে দেখাশোনা করার জন্য হাসুকে নিয়ে আসার পর মোর্শেদের নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়তে থাকে। কারণ হাসু দেখতে ঠিক তার মৃত স্ত্রীর মতোই। গোপনে প্রতিরাতে তিনি হাসুকে দেখার চেষ্টা করেন। সেটিই বোঝাতে ক্যামেরা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। কিন্তু সামনে কাউকে দেখা যায় না। একসময় ক্যামেরাটি একটি বন্ধ দরজার সামনে স্থির হয়। দর্শক বুঝতে পারে দরজার সামনে মোর্শেদ দাঁড়িয়ে আছেন। তবে ক্যামেরার মুভমেন্টে দর্শকও যে চরিত্রের সঙ্গে হাজির হয়েছে তাও অনুভব করতে পারে।

দারুণ একটি দৃশ্য আছে এর কিছুক্ষণ পর। অস্থির মোর্শেদ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কী করবেন। মিড শটে তাকে চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়, আর সামনের টেবিলে স্ত্রীর ছবি। আনমনে হাতে থাকা বই নিয়ে নড়াচড়া করতে করতে হঠাৎ তিনি স্ত্রীর ছবির দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকেন। দৃশ্যটির দিকে মনোযোগ দিলে মনে হবে, নীরবে তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে। মোর্শেদের ঠোঁট বার কয়েক নড়ে উঠেই পিছনে ফিরে তাকায়, ক্যামেরা সঙ্গে সঙ্গে প্যান করে ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেমে নিয়ে যায় আবার সেই বন্ধ দরজার কাছে। অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষ। এদিকে হাসুকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে তিনি তা ফিরিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এ সময় মোর্শেদ তার মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলে ক্যামেরার লেন্সে তার স্ত্রীর ছবি দেখানো হয়। এখানে মাত্র দুটি দৃশ্য দিয়ে মোর্শেদের স্ত্রী অন্যতম একটি চরিত্র হিসেবে কিছুটা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।

ডিপ ফোকাসের ব্যবহার তিনি এ চলচ্চিত্রেও করেছেন। তবে এখানে ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক দৃশ্য যোগ হয়েছে। জ্বরে আক্রান্ত হাসুর মাথায় পানি ঢালার সময় ঘরের জানালা দিয়ে দুটি শিশুকে দেখা যায়। আবার আসাদ হাসুকে দেখতে গেলে জানালা দিয়ে দূরে মুরগির ঝাঁকের হাঁটাচলা দেখা যায়। এতে দৃশ্যটি আরো বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠে।

লঙ শটের অল্পই ব্যবহার আছে এখানে। আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কারভাবে বোঝাতে এ শট্ ব্যবহার করেন নির্মাতা ও চিত্রগ্রাহক। কারণ এটি ওই পরিবেশের সঙ্গে চরিত্র বা বিষয়ের সম্পর্কের পাশাপাশি তা চরিত্র অথবা বিষয়কে প্রভাবিত করে সেটিও বোঝায়। মোর্শেদের অফিস, শেষের দৃশ্যে রেলস্টেশনে বাবার সঙ্গে জুঁইয়ের হেঁটে আসা কিংবা দূর থেকে ট্রেন আসার দৃশ্য ধারণ এ ধরনের শটের মাধ্যমে করা হয়েছে।

এছাড়া চরিত্রের মুভমেন্ট বা কোনো দৃশ্য বা এলাকাকে প্রতিষ্ঠা করতে প্যান শটের ব্যবহার একটি পরিচিত মাধ্যম। এর একটি সুবিধা হলো অনেক সময় এক ফ্রেম থেকে অন্য ফ্রেমে গল্প বলার চাইতে এক ফ্রেমে গল্পের কিছু অংশ বলে ফেলা যায়। এতে একধরনের বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। এ চলচ্চিত্রে জুঁই যখন বাবার প্রতিষ্ঠানে এসে টাইপরাইটারের দিকে এগিয়ে যায়, ক্যামেরাও অল্প প্যান করা হয়। আবার চিকিৎসকের পরামর্শে হাসুকে খুঁজে বের করার জন্য মোর্শেদ টেলিফোনের দিকে এগিয়ে গেলে ক্যামেরা প্যান হয়ে তাকে অনুসরণ করে। টিল্ট আপ-ডাউন শটও পাওয়া যায়। অসুস্থ সন্তানের দিকে মোর্শেদ ঝুঁকে এলে ক্যামেরা টিল্ট ডাউন হয়।

চরিত্রহীন চলচ্চিত্রের আলোর ব্যবহার বেশ চমৎকার। হারিকেনের বাতির যে মূল আলো রাতের দৃশ্যগুলোতে সে রকম আলো মনে হয়। একটি দৃশ্যে আনু হারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিলে রতনের মুখ আগের চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে চোখে পড়ে। কারিকুরি বেশ দক্ষতার সঙ্গে করায় এটি স্বাভাবিক মনে হয়। আর দিনের আলোও অতিমাত্রায় উজ্জ্বল বলে মনে হয়নি।

তবে ওভার দ্য শোল্ডার শটের অধিক ব্যবহার মাঝে মাঝে একঘেয়েমি ভাব নিয়ে আসে। আবার অনেক সময় আলোর ব্যবহারে চরিত্রগুলোর ছায়া দেয়ালে পড়েছে। কিছু জায়গায় সেগুলো দেখলে একটু সমস্যা মনে হতে পারে। ডিটেইলের দিকে যথেষ্ট ভালো লক্ষ্য রাখা হয়েছে। বারান্দায় ঝোলানো কাপড়, হাঁস-মুরগির ঘোরাঘুরি, বাঁশের ঘরের দেয়ালে ঝোলানো আয়না, রাতের বেলায় হারিকেন, চেয়ারে ফেলে রাখা বালিশ, ড্রেসিং টেবিলে রাখা কিছু প্রসাধনী, সাইড টেবিলের শোপিস ইত্যাদি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পাঁচ.

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ। ছয় দফা দাবিতে গণআন্দোলনে দেশ তখন উত্তাল। এর মধ্যে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে খান আতাউর রহমানের পরিচালনায় মুক্তি পায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা। জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো সিরাজউদ্দৌলার গল্প স্বাধীনতার স্বাদের জন্য মানুষকে নতুনভাবে প্রেরণা জুগিয়েছিলো। আর তাই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি প্রধান ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র হিসেবে নবাব সিরাজউদ্দৌলা জায়গা করে নিয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে বেবী চিত্রগ্রহণের কাজ করেছিলেন। সেসময়ের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের চলচ্চিত্র ফুটিয়ে তোলা নির্মাতার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জই ছিলো বটে। কারণ অনেক সময় ঐতিহাসিক ও আত্মজীবনীমূলক কাহিনি তুলে ধরতে বেশি পরিসর ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন পড়ে যায়।

চলচ্চিত্রের স্টাবলিশমেন্ট শট্ শুরু হয়, এক ঘোড়সওয়ার ইংরেজের হাতে মার খাচ্ছে এ দিয়ে। এখানে প্রথমে ফুল শটে পুরো পরিবেশ বোঝানো হয়। এরপর হ্যান্ডহেল্ড শটের (হাতে ক্যামেরা ধরে শট্) ব্যবহার করা হয়। যখন ক্লোজ আপ শটে ইংরেজটি চাবুক চালায় আর ভুক্তভোগী ব্যক্তি নিচে পড়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে, তখন ক্যামেরা বার বার ঝাঁকি খায়। চাবুক আছড়ে মারার একটি অনুভূতি এ সময় হয়। এরপরই ওয়াইড শটে এক দিকে ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও অন্যদিকে ঘোড়সওয়ার ইংরেজকে দেখানো হয়। দুই জনই শক্তিশালী। তবে সিরাজ ছিলেন মাটি ও মানুষের কাছাকাছি আর ইংরেজটি ছিলেন মাটি থেকে উঁচু স্থানে।

নবারের চলাফেরার দৃশ্যগুলোতে ওয়াইড শটের ব্যবহার আছে। যেমন, ইংরেজ বধের পর ঘোড়ায় চড়ে ওই জায়গা প্রস্থান। অবশ্য প্যান শটের মাধ্যমে দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে। নবাব আসছেন, তারপর ক্যামেরার সামনে দিয়ে দূরে চলে যাচ্ছেন। আবার দূর থেকে দেখানো হচ্ছে, রাজ দরবারে তিনি হেঁটে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাচ্ছেন। খালি দরবার ও সিংহাসনের একটি দৃশ্যও এমন শটে নেওয়া আছে। আবার দরবারে সভাসদের সামনে আসন গ্রহণের আগেও ডিপ ফোকাসে এ শট্ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ইংরেজদের সঙ্গে মীর জাফর ও অন্যান্যরা দেখা করতে গেলে একপর্যায়ে তাদের কুঠিতে নবাব আক্রমণ করে। তখন ওয়াইড শট্ ব্যবহার করে দৃশ্য ধারণ করা হয়। তবে এ শটে নেওয়া রাজ প্রাসাদের বাইরে নদী তীরে বসে থাকা সিরাজ ও মোহনলালের দৃশ্যটি বেশ সুন্দর, শান্ত। বাংলার নানা জটিলতার গল্পের মধ্যে থাকা একটু স্বস্তির মতো।

চিত্রগ্রাহক ওপেন ফ্রেমের ব্যবহারও করেছেন। আলেয়াকে রাজপুত্র মিরন মতিঝিলে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে না চাইলে আলেয়া মিরনের চোখের আড়াল হয়ে গান গাওয়া শুরু করেন। ক্যামেরা তখন মিরনের চোখ হয়ে খালি ঘরের মধ্যে প্যান শটে নড়াচড়া করে। আলেয়াকে দেখা না গেলেও তার কণ্ঠ শোনা যায়। এতে দর্শকের মধ্যেও একধরনের অপেক্ষা শুরু হয়। আলেয়াকে দেখার আশায়। ইংরেজ ব্যবসায়ী ওয়াটস্ যে ষড়যন্ত্র করেন তা লুকিয়ে শুনে ফেলে এক গৃহভৃত্য। টিল্ট ডাউন শটে মেয়েটি উপর থেকে নিচে লাফ দিয়ে নামে। এরপরের দৃশ্যে বাড়ির খালি ছাদে ক্যামেরা প্যান হতে থাকে। যেনো কোনো চোখ কিছু খুঁজছে। হঠাৎ মেয়েটিকে ছাদের সিঁড়িতে উঠে আসতে দেখা যায়।

কুঠি আক্রান্ত হওয়ার দৃশ্যগুলোতে নানা রকম শটের ব্যবহার করা হয়েছে। গোলার আঘাতের তাণ্ডব বোঝানোর জন্য বেবী বিভিন্ন ক্যামেরা কৌশল ব্যবহার করেছেন। হাই অ্যাঙ্গেল শট্, টপ শট্, মিড শট্, ক্লোজ আপ শট্, এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শট্, ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেমে ফুল শটে দৃশ্যগুলো নিয়েছেন। অবশ্য তারপরও কিছুটা সোজাসাপ্টাই মনে হয়। কারণ ক্যামেরা বেশ স্থির ছিলো। শুধু চরিত্রগুলো নড়াচড়া করছিলো। তবে শেষ গোলার আঘাতের সময় যখন ক্যামেরা কেঁপে ওঠে, তখন দৃশ্যটিতে স্বাভাবিকতা ফুটে ওঠে।

ক্ষমতা ও ক্ষমতাবান বোঝানোর সহজাত কৌশল লো অ্যাঙ্গেল ও হাই অ্যাঙ্গেল শটের বিভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়। সিরাজ যখন মায়ের কাছে তার কষ্টের কথা বলেন, তখন মাকে দেখানো হয় লো অ্যাঙ্গেল থেকে। যতো বড়ো রাজা হোক, যতো ক্ষমতাবান হোক মায়ের অবস্থান সব সময় উপরে। এরপর কুঠি আক্রমণের পর নবাব সেখানে উপস্থিত হলে ওয়াইড শট্ ও লো অ্যাঙ্গেলে সহযোদ্ধা, সৈন্যসহ তাকে দেখানো হয়।

ডলি শট্ ব্যবহার করে চরিত্রদের মধ্যকার সম্পর্ক কখনো বিছিন্ন ও কখনো বা সংযোগ সাধন করা হয়েছে। আলেয়া আর ওয়াটসের কথোপকথনের সময়; নবাবের বিরুদ্ধে মীর জাফর, জগৎ শেঠ, রাজ বল্লভের দরবারে বিদ্রোহ ঘোষণা, মুন্সির সঙ্গে নবাবের কথাবার্তা বা পলাশীর যুদ্ধের আগে আলোচনার মতো আরো কয়েকটি দৃশ্যে এ শট্ ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্রোহ ঘোষণার দৃশ্যে মিড ক্লোজ আপ শটে থাকা মীর জাফরের কাছ থেকে ক্যামেরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেতে থাকে। তখন পাশে দাঁড়িয়ে বাকি দুজন ফ্রেমে ধরা পড়েন। বোঝা যায়, এ তিন জনই নবাবের বিরুদ্ধে।

ফুল শটে অল্পসল্প ফ্রেম উইদ ইন ফ্রেম দেখা যায়। মিরন আলেয়ার বাড়িতে এলে আলেয়া থাকেন এ ফ্রেমে। গল্পের ধারাবাহিকতায় জানা যায় আলেয়া গুপ্তচরেরও কাজ করেন। তাকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া যুদ্ধে যাওয়ার আগে নবাব যখন তার স্ত্রী লুৎফুন্নেছার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখন লুৎফুন্নেছাকে দেখানো হয় ফ্রেমের ভিতর ফ্রেমে। এর আগে কাহিনির শুরুর দিকে দেখা যায় রাজ বল্লভ ও মীর জাফরকে নবাব হতে প্রলুব্ধ করছেন জগৎ শেঠ। মীর জাফরও ছিলেন এ ধরনের ফ্রেমে। কর্নেল ক্লাইভ তার সঙ্গে একপর্যায়ে দেখা করতে এলে তাকে ওই একই ফ্রেমে দেখান চিত্রগ্রাহক।

হ্যান্ডহেল্ড শটের আরেকটি সুন্দর ব্যবহার আছে। এক গুপ্তচর পলাশীর যুদ্ধের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারেন। কিন্তু পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি অনেক দূর যান। মৃত্যুর আগে তিনি টলতে থাকলে ক্যামেরাও অনবরত টলতে থাকে। কিন্তু ওই ব্যক্তিকে দেখানো হয় না। কিন্তু দর্শক বুঝতে পারে তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারছেন না।

পলাশীর যুদ্ধের দৃশ্যগুলোতে লো অ্যাঙ্গেল, হাই অ্যাঙ্গেল ও ওয়াইড শটের ব্যবহার বেশি। মোহনলালকে হিরোয়িক করে তোলার প্রচেষ্টায় তাকে যুদ্ধের সেনাপতি হিসেবে লো অ্যাঙ্গেল শট্ নেওয়া হয়েছে। আর ময়দানে অসংখ্য ঘোড়সওয়ার সৈন্যদের ওয়াইড শট্ ও মিডিয়াম ওয়াইড শটে দেখানো হয়। এছাড়া, যুদ্ধ শিবিরে নবাব ও মোহনলাল, মোহনলাল ও মীর জাফরের লড়াই, সঙ্গী-সাথিসহ ক্লাইভের আগমন ইত্যাদি দৃশ্য মিডিয়াম ওয়াইড শটে ছিলো। মোহনলালের মৃত্যুর দৃশ্যটি চিত্রগ্রাহক নিয়েছেন হাই অ্যাঙ্গেল থেকে। যাতে তার অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়। আবার টপ শটে একজন বার্তাবাহককে ঘোড়া নিয়ে মাঠের মধ্য দিয়ে দৌড়াতে দেখা যায়। সবশেষে সিরাজউদ্দৌলা ও তার পরিবারকে বহনকারী নৌকাকে লঙ শটে নদীর বুকে চলতে দেখা যায়। কিন্তু এখানে আলোর ব্যবহারে একটু অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে। নবাবের স্ত্রী ও সন্তানের চেহারা একটু বেশি উজ্জ্বল দেখায়। রাজ দরবারেও মাঝে মাঝে অতিরিক্ত আলো চোখে পড়েছে।

বন্দি নবাব ও তার সহযোগীদের দৃশ্যগুলোতে টেনশনের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। পুরো পরিবেশ বোঝানোর জন্য লঙ শটে ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে, ক্লোজ আপ শটে ফাঁসির দড়ি ও নবাবের খাস ভৃত্য গোলাম হোসেনের ফাঁসির দড়ি যন্ত্রে আটকে দেওয়া দেখানো হয়। এরপর আবারও ক্লোজ শটে দড়ির লিভার টানার দৃশ্য ও ফুল শটে মঞ্চে নতুন ফাঁসির দড়ি লাগানোর দৃশ্য কষ্টের পাশাপাশি ভীতিরও সৃষ্টি করে।

কাহিনির শেষে রাজ দরবারে ওয়াইড শটে জনগণ ও নবাবকে মুখোমুখি হতে দেখা যায়। আবার ওভার দ্য শোল্ডার শট্ এতে যুক্ত হয়ে নবাবকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে হাজির করেছেন নির্মাতা। প্রথমে তারা নবাবকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করলেও পরে সিরাজের কথা শুনে ক্লোজ আপ শটে তাদের অভিব্যক্তি তুলে ধরা হয়। সেখানে কষ্ট আর অনুশোচনা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। পরে নবাবের মৃত্যু দৃশ্যটিতে ক্লোজ আপ থেকে ডলি শটের মাধ্যমে ফুল শটে ধারণ করা হয়। পাশাপাশি আকাশে দেখা দেয় অস্তমিত সূর্য।

এ চলচ্চিত্রে আরো কিছু শটের ব্যবহার হয়েছে। যেমন, এক্সট্রিম ক্লোজ আপ শটে উমিচাঁদের ভীত চেহারা। চরিত্রগুলোর আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশে ক্লোজ আপ ও মিডিয়াম ক্লোজ আপ শটের ব্যবহার বেশি ছিলো। ডিপ ফোকাসে নেওয়া শটের সংখ্যাও কম ছিলো না। তবে এখানে বেবী কাঁধের ওপর দিয়ে ক্যামেরার ব্যবহার কম করেছেন।

৫.

২০০৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেবী ইসলাম বলছিলেন, তিনি নাকি ছোটোবেলায় অনেক পড়তেন। কিন্তু মনে রাখতে পারতেন না। বাবা-মা চাইতেন ছেলে চিকিৎসক হোক। কিংবা চিকিৎসক না হতে পারলেও অন্তত গ্রাজুয়েট হোক। অথচ সবকিছু ছেড়ে ছেলে নিলেন ক্যামেরাম্যানের চাকরি। ভাগ্যিস নিজের মনকে তিনি প্রাধান্য দিয়েছিলেন। আর তার প্রতিভাই বাংলা চলচ্চিত্রের ক্যামেরায় এনে দিয়েছে নতুন এক ভাষা।

লেখক : সারা মনামী হোসেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন-এ পড়ান।

saramonami@gmail.com

 

তথ্যসূত্র

1.http://archive.prothom-alo.com/detail/news/65967; retrieved on: 05.11.2019

2.https://www.kalerkantho.com/print-edition/kothaikothai/2018/10/26/695728; retrieved on: 05.11.2019

৩.সেন, সন্তোষ (২০০৯: ১৮৭); সিনেমাটোগ্রাফি; প্রতিভাস, কলকাতা।

৪.প্রাগুক্ত; সেন (২০০৯: ১৮৭)।

5.https://www.youtube.com/watch?v=O5ZCsw22JRk; retrieved on: 10.11.2019

6.https://www.youtube.com/watch?v=T4hfGzDtzXk; retrieved on: 10.11.2019

7.https://www.tboake.com/manipulation/Mosiadz/Mosiadz/page2.html; retrieved on: 10.11.2019

8.https://www.youtube.com/watch?v=AKOxbCx1LNc; retrieved on: 10.11.2019

9.https://www.youtube.com/watch?v=r87zg06_yag; retrieved on: 05.11.2019

 

বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন