আসাদ লাবলু
প্রকাশিত ১১ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
বাংলার ‘শেষ স্বাধীন নায়ক’ মান্না
আসাদ লাবলু

১.
ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুহূর্ত থেকে হিসাব করলে ‘আমিত্ব’ ও ‘অপর’ সমবয়সি। ‘আধিপত্য’ ও ‘দলিত’র বয়সের বিচারের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। এই ‘আমিত্ব’ ও ‘আধিপত্যের’ বিরুদ্ধে ‘অপর’ কিংবা ‘দলিত’র প্রতিবাদী একটা কর্মসূচি সবসময় থাকে; থাকবেই। এই বিক্ষোভ কর্মসূচি সমাজের নানা জায়গা থেকে, নানা শ্রেণি থেকে পালিত হয়। সব বিক্ষোভের স্লোগানের আওয়াজ আবার সমাজের সব জায়গা থেকে সমানভাবে শোনা যায় না। আওয়াজের তীব্রতার হেরফেরই যে সমানভাবে শোনা না যাওয়ার মূল কারণ, সেটা বলার সুযোগ নেই। আওয়াজের উৎপত্তিস্থল থেকে শ্রোতার দূরত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবাদী স্লোগান দেওয়ার সময় কারো মুখের সামনে মাইক্রোফোন না থাকলে সে আওয়াজ বেশি দূর যেতে পারে না। তখন আশপাশের গুটিকয়েক মনোযোগী মানুষই তা কেবল শুনতে পায়।
দাবির ন্যায্যতা কতোটুকু কিংবা অভিযোগের তীব্রতা কতোখানি, সেটি এই সমাজের মনোযোগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে না। বরং কর্মসূচি কোথায় পালিত হলো, সেটাই অনেক সময় বড়ো মানদণ্ড হয়ে ওঠে। জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে মোমবাতি প্রজ্জলন করে কয়েকজন ‘সুশীল’ দাঁড়িয়ে পড়লেই গণমাধ্যমের মারফতে তাদের আওয়াজ অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া কৃষকের বিক্ষুব্ধ চিৎকার মৌসুমের বেশিরভাগ সময়ই তার ‘দুই বিঘা জমি’র মধ্যে অবরুদ্ধ থাকতে থাকতে একসময় বাষ্প হয়ে আকাশে মিশে যায়। ফসলের ন্যায্যতার দাবি সম্বলিত পোস্টারে ক্যামেরা কিংবা সমাজের খুব একটা ‘ক্লিক’ পড়ে না।
এই রকম মাইক্রোফোন ছাড়া একজন বক্তা কিংবা অবহেলিত একজন বিক্ষুব্ধ কৃষকের মতো সব চলচ্চিত্রের আওয়াজও সবার কানে পৌঁছায় না। যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে না পড়েই ‘সস্তা’ আর ‘মানহীন’ বলে অনেক সাহিত্যকে যেমন নির্বিচারে রুচি বহির্ভূত আখ্যা দেওয়ার বদ অভ্যাস সমাজে আছে, তেমনই চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও আছে। কিন্তু সেই চলচ্চিত্রগুলো কেউ না কেউ দেখে; কেউ না কেউ বানায়; কোনো না কোনো নায়ক তাতে অভিনয় করে। কিন্তু মানুষ এসব চলচ্চিত্র কেনো দেখে; কেনো বানায়; কেনো কোনো নায়ক তাতে অভিনয় করে--বাংলা চলচ্চিত্রের দুর্দিন পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এগুলো একেবারে মৌলিক প্রশ্ন।
এ ধরনের চলচ্চিত্রের একজন নায়ক হিসেবেই মান্নাকে নিয়ে এই আলোচনা। কেনো এবং কীভাবে মান্নার একটা আলাদা দর্শক শ্রেণি তৈরি হলো, কোন কোন গুণাবলী মান্নাকে অনেকের প্রিয় নায়ক হওয়ার ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করলো--সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হবে। এও জানা দরকার, মান্না কি কারো শূন্য হওয়া জায়গায় বসার সুযোগ পেয়েছিলো? বাংলা চলচ্চিত্র পর্যালোচনায় এ আলোচনাও গুরুত্বপূর্ণ যে, মান্নার মৃত্যুর পর আর কেউ তার উত্তরসূরি হতে পারবে কি না, কিংবা সেই পরিস্থিতি আছে কি না!
২.
এস এম আসলাম তালুকদারের (মান্না) জন্ম ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর; টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায়। ঢাকা কলেজের এই শিক্ষার্থী রুপালি পর্দায় পা রাখেন এফ ডি সি’র ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। মান্নার প্রথম চলচ্চিত্র তওবা (১৯৮৫)। শেষ চলচ্চিত্র লীলা মন্থন মুক্তি পায় ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যুর প্রায় সাত বছর পর। মান্নার মৃত্যু ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি। ২৪ বছরের অভিনয়জীবনে দুই শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন মান্না। প্রযোজনা করেছেন আটটি চলচ্চিত্র।
মান্না প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে দাঙ্গা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। দাঙ্গায় মান্নার যে রূপ (সৎ ও প্রতিবাদী পুলিশ কর্মকর্তা) দেখে দর্শক আকৃষ্ট হয়েছিলো, সেই রূপের চর্চাই মান্না জীবনের শেষ পর্যন্ত করে গেছেন। দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দর্শক মান্নাকে পেয়েছে একজন প্রতিবাদী নায়ক হিসেবে। কিন্তু একজন পাক্কা অভিনয়শিল্পী বিচারে তাকে কেবল একটা বিশেষ ধরনের চরিত্রে পারদর্শিতা দিয়ে মূল্যায়ন করা হয় না। মান্না কি কেবল ‘মারমুখী’ কিংবা ‘প্রতিবাদী’ অভিনয়শিল্পী ছিলেন? মোটেও না। ডিসকো ড্যান্সার, প্রেম দিওয়ানা, মনের সাথে যুদ্ধ, রাজা বাংলাদেশি, শত্রু শত্রু খেলা’র মতো রোমান্টিক ধারার অ্যাকশন চলচ্চিত্রেও মান্না উত্তীর্ণ হয়েছেন ভালোভাবেই। সাক্ষাৎ, শেষ খেলা, আম্মা, জীবনের গল্প, ভাইয়া, মায়ের আবদার, বাপ বেটার লড়াই, ছোট বৌ কিংবা পালকি’র মতো ফ্যামিলি ড্রামার মান্নাকেও দর্শক স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া তিনি করেছেন কাসেম মালার প্রেম, কাবুলিওয়ালা, মুঘল-ই-আজম, দরিয়া পারের দৌলতি কিংবা লীলা মন্থন’র মতো ভিন্নধারার চলচ্চিত্রও। তবে যে মান্নাকে মানুষ সবচেয়ে উপভোগ করেছে, সে বিষয়ে আলোচনার আগে ব্যক্তি মান্না সম্পর্কেও খানিকটা আলোচনা জরুরি।
মান্না অভিনয় ভালোবাসতেন, নিজের চরিত্রকে উপভোগ করতেন। উদাহরণ হিসেবে স্ট্যান্টম্যান আরমানের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রায় ৪০টি চলচ্চিত্রে মান্নার স্ট্যান্টম্যান হিসেবে কাজ করা আরমানের ভাষায়,
ডিসকো ড্যান্সার ছবিতে মান্নার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একটি দৃশ্যের কথা খুব মনে পড়ে। ছবির খলনায়ক রাজীব নায়িকা চম্পাকে ধরে মাটি থেকে প্রায় দ্ইু হাজার ফুট উঁচুতে তার দিয়ে ঝুলিয়ে রাখেন, দুই পাহাড়ের মধ্যে। নায়ক এক পাহাড় থেকে তার বেয়ে বেয়ে নায়িকাকে উদ্ধার করবেন। আমি ছিলাম স্ট্যান্টম্যান। কিন্তু মান্না কাজটি করতেই দিলেন না আমাকে। তিনি নিজেই ওই উচ্চতায় উঠে তার বেয়ে বেয়ে গিয়ে চম্পাকে উদ্ধার করার দৃশ্যটি করলেন।১
চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে যৌনদৃশ্য সমৃদ্ধ কিছু চলচ্চিত্র ঢাকাই ইন্ডাস্ট্রিকে ডুবিয়েছিলো, নাকি শিল্পগুণের অভাবে চলচ্চিত্রই ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকার লোভে যৌনদৃশ্যকে কাছে টেনেছিলো--এই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক। এর উত্তর খোঁজা এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু এসব যৌনদৃশ্য যে ঢাকাই চলচ্চিত্রকে অন্ধকার থেকে আরো অন্ধকারে নিয়ে গেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। যেসব কুশীলব এই চক্র থেকে বের হতে মনেপ্রাণে চেষ্টা চালিয়ে আসছিলো, মান্না তাদের একজন। মান্নার সঙ্গে নায়িকা হিসেবে সবচেয়ে বেশি অভিনয় করা শিল্পীদের তালিকায় চম্পা অবশ্যই থাকবেন। তার ভাষায়, ‘মান্না সব সময় চাইত, চলচ্চিত্রাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ ফিরে আসুক। এ জন্য সে অনেক যুদ্ধও করেছে। মান্নার সে স্বপ্ন আজ পূরণ হয়েছে। আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গন এখন অশ্লীলতামুক্ত। আমার কাছে মান্না একজন মহানায়ক।’২ মান্না সম্পর্কে একই মূল্যায়ন পূর্ণিমারও, ‘তিনি আমাদের দেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি চলচ্চিত্রের সুখে-দুঃখে সবসময় সাহস করে এগিয়ে গেছেন মান্না ভাই। অশ্লীলতাবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি নানারকম হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। তারপরও তিনি থেমে থাকেননি। আজ চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা যতটুকু কমেছে সে কৃতিত্বও অনেকটাই মান্না ভাইয়ের।’৩ আরেকটা গুণ মান্নার ছিলো। সেটা ছোটো বলে মনে হতে পারে; কিন্তু অনেকের কাছে সেটা অনেক বড়ো গুণ। চলচ্চিত্রনির্মাতা মনতাজুর রহমান আকবরের ভাষায়, ‘স্পটে মান্না সময় মেনে আসত।’৪
৩.
এবার আসা যাক নায়ক মান্নার আলোচনায়। নায়ক হিসেবে মান্নার ধরন বোঝার জন্য কেউ যদি তার চলচ্চিত্রগুলো না দেখে কেবল চলচ্চিত্রগুলোর নামের দিকে চোখ রাখে, তাতেও অনেকটা ধারণা পেয়ে যাবে। গরিবের বন্ধু, অবুঝ সন্তান, দাঙ্গা, ত্রাশ, চাঁদাবাজ, গরম হাওয়া, দেশ প্রেমিক, খলনায়ক, দেশদ্রোহী, লুটতরাজ, তেজী, শান্ত কেন মাস্তান, ধর, ঝড়, কষ্ট, বর্তমান, গুণ্ডা নাম্বার ওয়ান, কুখ্যাত খুনী, পাঞ্জা, রংবাজ বাদশা, তাণ্ডব লীলা, ভয়ানক সংঘর্ষ, আবার একটি যুদ্ধ, মাস্তানের ওপর মাস্তান, ঢাকাইয়া মাস্তান, আঘাত পাল্টা আঘাত, ক্ষত বিক্ষত, বীর সৈনিক, বিগ বস, মিনিস্টার, টপ সম্রাট, ভিলেন, মান্না ভাই, ভাইয়ের শত্রু ভাই, আমি জেল থেকে বলছি, সমাজকে বদলে দাও, সিটি টেরর--মান্না অভিনীত এ রকম আরো শতাধিক চলচ্চিত্রের কথা বলা যাবে, যেগুলোর নামের মধ্যেই গল্পের বিষয়বস্তু স্পষ্ট করা আছে।
যাই হোক, মান্না যে ‘অ্যাকশন হিরো’ ছিলেন তা নিয়ে কারো দ্বিমত থাকার কথা নয়। কিন্তু প্রথম প্রশ্ন হলো, উল্লিখিত চলচ্চিত্রগুলোতে নায়ক হিসেবে যে কেউ অভিনয় করলেই কি মান্নার সমান জনপ্রিয় হতো? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, কেবল কি অ্যাকশন হিরো হিসেবে অভিনয়-দক্ষতাই মান্নার মূল অস্ত্র ছিলো? এখানে প্রশ্ন দুটি হলেও উত্তর একই ব্যাখ্যায় বিরাজমান।
প্রথম কথা হলো, যে নায়কই অভিনয় করুক না কেনো, অভিনয়ে দক্ষতা অপরিহার্য। মান্নার সেটি ছিলো। কিন্তু সেটাই তার একমাত্র যোগ্যতা নয়। অধিকাংশ চলচ্চিত্রেই মান্না ছিলেন খেটে খাওয়া, রোদে পড়া, বৈষম্যের স্বীকার হওয়া, সুশাসন না পাওয়া, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়া, ক্ষমতার বলি হওয়া, ন্যায়বিচার না পাওয়া কিংবা দুর্নীতির চক্রে পড়া মানুষের ‘ভুক্তভোগী প্রতিনিধি’। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এসব চলচ্চিত্রে কখনো এমনটা মনে হয়নি যে, রক্ত-মাংসের বস্তু মান্নাকে সমাজের অন্য কোনো শ্রেণি থেকে তুলে এনে অভিনয়ের জন্য অন্য শ্রেণির প্রতিনিধি সাজানো হয়েছে। এ কথা ঠিক যে, চরিত্রের যথার্থ রূপ ধরার জন্য অনেক অভিনয়শিল্পীই নিজেকে পাল্টিয়েছে। বলিউডের আমির খানকেই অনেকবার দেখা গেছে, চরিত্রের প্রয়োজনে কখনো তিনি মাসের পর মাস রোদে পুড়েছেন; কখনো নিজের ওজন বাড়িয়ে ৮০ কেজি বানিয়েছেন, আবার কখনো ‘সিক্স প্যাক’ সেজেছেন। এসব ক্ষেত্রে নিয়মিত অনুশীলন ও সাধনা প্রয়োজন হয়।
চলচ্চিত্রে যারা বিশ্ব শাসন করছেন, তাদের মধ্যে সেই অনুশীলন ও সাধনা রয়েছে। কিন্তু ঢাকাই চলচ্চিত্রে সেই অনুশীলন ও সাধনা খুব একটা দেখা যায় না বললেই চলে। মান্নার ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, সেটা হলো, তাকে ‘ছোটোলোক’ সাজার জন্য কোনো সাধনা করতে হয়নি। রক্তমাংসের মান্না দেখতে ‘ছোটোলোকের’ মতোই। এ কারণে মান্নার মতো নায়ক কেউ হতে চাইলে অবশ্যই ‘ছোটলোকের’ চেহারা থাকতে হবে। শাকিব খান অনেক অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু তিনি ‘ছোটলোকদের’ মধ্যে ‘ছোটোলোক’ সেজে মান্নার মতো পুরোপুরি মিশে যেতে পারেননি। নিম্নবৃত্তের চেয়ে শাকিব খানের চেহারার মধ্যে মধ্যবৃত্তের নায়কের ছাপই বেশি চোখে পড়ে।
বড়লোকেরা ভালোমন্দ খায়, এ কারণে তাদের চেহারা সুন্দর হয়--এমন ধারণা অনেকেই ধারণ করে। সমাজে যাদের মধ্যে এই ধারণা রয়েছে, তাদের কাছে শাকিব খান সর্বোচ্চ ভালো অভিনয়শিল্পী হতে পারবে, সেসব মানুষের নায়ক হয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু মান্নার চেহারার পোড়খাওয়া ভাব তাকে অনেকের কাছে নায়ক হয়ে উঠতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে, অনেকটা জসিমের মতো, কিংবা ভারতের মিঠুন চক্রবর্তীর মতো।
আরেকটি আলোচনা জরুরি। মান্না কি হিরো ছিলেন, নাকি অ্যান্টি-হিরো? নায়কের যে সংজ্ঞা, তাতে মান্নাকে ‘পারফেক্ট হিরো’ বলার কোনো উপায় নেই। এই ধরনের নায়ককে শারীরিক-মানসিকভাবে কিংবা রূপেগুণে হতে হয় কল্পনার সমান। বলা হয়, বাস্তব সমাজে পারফেক্ট হিরোর মানদণ্ড অর্জন করা সম্ভব নয়। পারফেক্ট হিরোকে সমাজের সমস্ত গুণের অধিকারী হতে হয়। সেই হিসেবে কিন্তু মান্নাকে পারফেক্ট হিরো বলার কোনো উপায় নেই। বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই মান্না সমাজের একটা সাধারণ নাগরিক। আবার এমন অনেক চলচ্চিত্র আছে, যেগুলোতে মান্না ছিলেন গুন্ডা, খুনি, গডফাদার, কোনো সংসদ সদস্যের সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কিংবা হতাশা থেকে বিপথগামী যুবক। কিন্তু এটা লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, ভিলেন সাজলেও সবক্ষেত্রেই মান্নার প্রতি দর্শকমনের সহানুভূতি ছিলো। কারণ, সমাজের নানারকমের ধারাবাহিক শোষণ মানুষের মধ্যে কেবল অসন্তোষ তৈরি করে না, সেই সঙ্গে প্রতিহিংসার একটা সুপ্ত বীজও রোপন করে। ফলে শোষণ থেকে মুক্তির জন্য যেকোনো উপায়কেই মানুষ স্বীকৃতি দেয়। মান্না অভিনীত দুই শতাধিক চলচ্চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হিরো হিসেবে মান্না যতো না জনপ্রিয়, তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় অ্যান্টি-হিরো হিসেবে।
৪.
মান্নাকে নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে সালমান শাহ ও শাকিব খানকে নিয়ে কথা বলা জরুরি। কারণ বাংলা চলচ্চিত্রে মান্নার একচ্ছত্র আধিপত্যের সময়কালের সঙ্গে এই দুই নায়কের সময়কালের সম্পর্ক রয়েছে। অনেকেই বলেন বা মনে করেন, সালমান শাহ’র মৃত্যু মান্নার জন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এই মন্তব্য কিংবা ধারণা এক অর্থে সত্য, আরেক অর্থে ভুল। সালমান শাহ’র সময়টিতে দৃশ্যত মান্নার আধিপত্য ছিলো না, সেই আধিপত্য সালমান শাহর মৃত্যুর পর তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু সালমান শাহর সময়টি মান্নাকে লুপ্ত করতে পারেনি, সুপ্ত করে রেখেছিলো; যেমন ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’। প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, সালমান শাহর সময়টিতে ডিসকো ড্যান্সার (১৯৯৩), চাঁদাবাজ (১৯৯৩), সিপাহী (১৯৯৪), শেষ খেলার (১৯৯৫) মতো অনেক দর্শকপ্রিয় এবং ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র মান্না উপহার দিয়েছেন।
আরেকটি বিষয় হলো, সালমান শাহ জনপ্রিয় ছিলেন রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। কিন্তু মান্না ছিলেন অ্যাকশন হিরো। সালমানের মৃত্যুর আগে মান্না যে ঘরানার ছিলেন, সালমানের মৃত্যুর পরও তিনি সেই ঘরানাতেই ছিলেন। কারো মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আসনের লোভে মান্না নিজের ঘরানা পাল্টাননি। বাংলা চলচ্চিত্রে সালমান শাহর অনুপস্থিতি দূর করার চেষ্টা করা হয়েছে শাকিল খান, রিয়াজ, ফেরদৌসকে দিয়ে; মান্না সেই দৌড়ে ছিলেন না। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সালমানের যে স্বকীয়তা ছিলো, অ্যাকশন হিরো হিসেবে মান্নার স্বকীয়তা কোনো অংশেই কম ছিলো না। বরং ক্যারিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার যে লড়াই মান্নাকে করতে হয়েছে, সে ধরনের লড়াইয়ের মুখে খুব কম নায়ককেই পড়তে হয়েছে। আর সেই লড়াইয়ে কখনোই মান্না হারিয়ে যায়নি। ১৯৮৫ থেকে ২০০৮--এই ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকভাবে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ছিলো তার।
মান্নাকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শাকিব খানও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে একটা লম্বা সময় পার্শ্ব নায়ক হিসেবে সময় পার করেছেন শাকিব। বাংলা চলচ্চিত্রে পার্শ্ব নায়ক খুব একটা গুরুত্ব পায় না। একেক চলচ্চিত্রে একেক রূপে হাজির হন তিনি। কোনো চলচ্চিত্রে নায়কের কলেজ-পড়ুয়া ছোটোভাই, কোনো চলচ্চিত্রে আবার বখে যাওয়া যুবক। সালমান শাহ এবং বিশেষ করে মান্নার মৃত্যুর পর শাকিবকে নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একটা দোটানা ভাব তৈরি হয়। শাকিব কি মান্নার উত্তরসূরি হবেন, নাকি সালমান শাহ’র! রোমান্টিক নায়ক হবেন, নাকি ‘অ্যাকশন হিরো’। দুটোই হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় শাকিবের মধ্যে। ফলে তিনি না হতে পেরেছেন সালমানের উত্তরসূরি, না হতে পেরেছেন মান্নার স্থলাভিষিক্ত।
মান্না হতে না পারার আলোচনা উপরে খানিকটা করা হয়েছে। আর সালমান হতে না পারার কারণ হলো, মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে খাপ খাইয়ে শাকিব নিজেকে বদলাতে পারেননি। কেবল সালমানের চেহারাই মধ্যবিত্তকে টানতো না; আরো কী একটা ছিলো। কিন্তু শাকিবের চেহারা থাকলেও এখন পর্যন্ত ‘কী একটা’র ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে মান্নার মধ্যে কী ছিল, সেটা বোঝা যায় রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার লাশ দেখতে আসা জনতার ঢল দেখে। জনতার ঢল জনপ্রিয়তা পরিমাপের ‘আবেগী মাপকাঠি’ হতে পারে। কিন্তু বাস্তব মাপকাঠিও আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক গীতি আরা নাসরীন এক লেখায় মান্নার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন,
গবেষণার কাজে আমরা যখন ঢাকা ও আশপাশের সিনেমা হলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রেক্ষাগৃহে গিয়েছি, তখন দেখতে পেয়েছি, মান্না হচ্ছেন একমাত্র অভিনেতা, যাঁকে পর্দায় দেখা গেলে তুমুল করতালি পড়ে। প্রেক্ষাগৃহে যে দর্শকদের ওপর আমরা জরিপ করেছি, তাঁদের শতকরা ৪৫ জন বলেছেন, তাঁদের প্রিয় নায়ক হলেন মান্না। জনপ্রিয়তার বিচারে আর কোনো নায়ক বা নায়িকা মান্নার মতো এত সমর্থন পাননি।৫
এখন প্রশ্ন হলো, মান্নার উত্তরসূরি বাংলা চলচ্চিত্রে তৈরি হবে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব অবশ্যই সময়ের। কিন্তু এখন পর্যন্ত মান্নার ভক্তদের ‘শোক’ কেউ ভোলাতে পারেনি। দেশে একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পিছনে মান্নার মৃত্যুও একটা বড়ো কারণ কি না, সেটা মৌলিক একটা প্রশ্ন হয়ে উঠতেই পারে। জীর্ণ প্রেক্ষাগৃহের ভাঙা চেয়ারে বসে, ছারপোকার কামড় খেয়ে এবং শৌচাগারের দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থেকেও একটা শ্রেণি মান্নার চলচ্চিত্র দেখে করতালি দিয়েছে। কিন্তু মান্নার মৃত্যুর প্রায় এক যুগ পরও তার উত্তরসূরি কেউ হতে পারেনি। শাকিব খান যখন শহুরে এবং উচ্চ মধ্যবিত্তের নায়ক হওয়ার জন্য টালিগঞ্জে ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন ‘মান্নার’ অভাবে মান্নার ভক্তরা মৃতপ্রায় অবস্থায়। শেষমেশ তাদের মৃত্যু হলে, মান্নার ফিরে আসার এতোটুকু সম্ভাবনাও আর থাকবে না।
৫.
মনে রাখতে হবে, মান্না কোনো বিশেষ শ্রেণির দর্শকের নায়ক ছিলেন না; বরং বলা যায় একটা সাধারণ শ্রেণির নায়ক ছিলেন। ভালো চলচ্চিত্রের জন্য সমাজে আজ যারা চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী সেজে বসে আছে, তাদের অধিকাংশের রুচিবোধের আওতায় মান্নার চলচ্চিত্র কিংবা মান্নার ভক্তরা পড়ে না। ঢাকাই চলচ্চিত্রের দিন ফেরাতে এদের একেক জন একেক চলচ্চিত্রের স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এসব স্বপ্নের চলচ্চিত্র বাস্তবে নির্মিত হয়ে গেলে সেগুলো কারা কারা দেখবে কিংবা বুঝবে, সেই আলোচনা পর্যন্ত অনেক চলচ্চিত্রবোদ্ধাই যেতে চান না। যে কারণে অনেক ভালো চলচ্চিত্রে পুরস্কার মেলে, ‘শিল্পগুণের’ জন্য সমালোচকদের বাহবাও মেলে, কিন্তু দর্শক মেলে না।
উল্টো ঘটনাও আছে। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, চলচ্চিত্রের গতিপথ কোন দিকে প্রবাহিত হবে। দর্শকের দিকে, নাকি শিল্পগুণের দিকে? সবাইকে খুশি করার চলচ্চিত্র বানানো অত্যন্ত কঠিন এবং কোনো নির্মাতা এই শর্ত পূরণে বাধ্য নয়। কিন্তু চলচ্চিত্রের দিন ফেরাতে যখন চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মী কিংবা সমালোচকরা নানাধরনের ‘ভালো’ চলচ্চিত্রের ফর্দ তৈরি করে, তখন মান্নার মতো নায়কদের ভক্তকূলের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। এদের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে যতো উচ্চমার্গীয় চলচ্চিত্রই বানানো হোক না কেনো, সেটা কোনো দিনই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। সেটার পরিণতি হবে মার্কসবাদের মতো, যে মতাদর্শ তত্ত্বে কিংবা বুদ্ধিমানের ব্যাখ্যায় শ্রমিক শ্রেণির জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু শ্রমিকরাই জানে না যে, মার্কসবাদ খায় না মাথায় দেয়। চলচ্চিত্র নিয়েও আজ একই ভয় তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তার বহিঃপ্রকাশ মানুষ যেভাবে করতে চায়, ঠিক সেভাবেই হতে হবে। মান্নার বিশেষত্ব সেখানেই। কিন্তু সেই অভিব্যক্তি আজ ভালো চলচ্চিত্রের সংজ্ঞায় ক্রমেই সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। মান্নার মতো কোনো নায়ককে এখন আর চিৎকার করে ক্ষমতাকে গালি দিতে শোনা যায় না। এখনকার নায়করা অনেক ‘আস্তে’ কথা বলে, কণ্ঠের মধ্যে আছে আপোসের আভাসও।
লেখক : আসাদ লাবলু, দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।
asadmcru@gmail.com
https://www.facebook.com/asadur.lablu
তথ্যসূত্র
১. ‘মান্না একজনই হয়’; প্রথম আলো, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭।
২. ‘মান্নাকে মিস করি’; সমকাল, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।
৩. ‘চলে যাওয়া মানেই কী প্রস্থান’; সমকাল, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩।
4.https://www.kalerkantho.com/print-edition/ronger-mela/2017/06/01/503557; retrieved on: 13/07/2019
৫.‘একজন নায়কের মৃত্যু, অসংখ্য ভক্তের মুখ’; প্রথম আলো, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৮।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন