Magic Lanthon

               

মাহফুজুর রহমান খান

প্রকাশিত ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘একজন সিনেমাটোগ্রাফারের ফার্স্ট কাজ হচ্ছে টু স্যাটিসফাই মাই ডিরেক্টর অ্যান্ড টু স্যাটিসফাই মাই স্ক্রিপ্ট’

মাহফুজুর রহমান খান


ঘোরতর কুয়াশা--এক হাত সামনে কী ঘটছে তা ঠাওর করতে না পারা, সেই ফাঁদে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ নাগরিকের চোখই পড়েছিলো ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বরের সকালটিতে। তারপরও পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী এদিন এফ ডি সি (বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন) প্রাঙ্গণে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য রওনা দেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি জগতের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব মাহফুজুর রহমান খান। শেষ পর্যন্ত তীব্র শীত আর কুয়াশার বাধা পেরিয়ে সাত সকালেই হাজির হন তিনি। মাহফুজুর রহমান খান এতো ভোরে এফ ডি সি'তে আসলেও তা চাউর হতে সময় লাগেনি। প্রোডাকশন বয়, ট্রলিম্যান, দারোয়ান থেকে শুরু করে ওখানকার সবাই প্রখ্যাত এ নির্মাতার কাছে বার বার ঘুরেফিরে আসছিলেন, কেউ তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে, কেউ শরীরের অবস্থা জানতে চাচ্ছে, কেউবা একটু পর শুটিং শুরু হতে যাওয়া শাকিব-ববি অভিনীত শাহেনশাহ-এর সিনেমাটোগ্রাফি কেমন চলছে তারও খোঁজখবর নিচ্ছে। সোজা ভাষায় বললে, মাহফুজুর রহমানকে নিয়ে আগতদের অতি সযত্ন আগ্রহ সাক্ষাৎকারপর্বকে অনেকটা সময় ঝুলিয়ে রেখেছিলো। শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সামনে বসে তার সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়।

মাহফুজুর রহমান খান পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ শুরু করেন স্বাধীনতাযুদ্ধের পরের বছর থেকে। এরপর বিরতিহীনভাবে অসংখ্য চলচ্চিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তিনি; অর্জন করেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সর্বাধিক বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জনের খেতাব। শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে তার ঝুলিতে রয়েছে ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এছাড়া আটবার বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন তিনি। তিনি কাজ করেছেন আলমগীর কবির, আলমগীর কুমকুম, হুমায়ূন আহমেদ ও শিবলি সাদিকের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে। তার সিনেমাটোগ্রাফিতে নির্মিত চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অভিযান, পোকা মাকড়ের ঘরবসতি, সহযাত্রী, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারি, হাজার বছর ধরে, আমার আছে জল, ঘেটুপুত্র কমলাপদ্ম পাতার জল

চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবেও মাহফুজুর সফলতা লাভ করেছিলেন। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান দিশা ইন্টারন্যাশনালের ব্যানারে নির্মাণ করেন নীতিবান, সম্মান, দুর্নামকারফিউ নামে চারটি চলচ্চিত্র। অভিনয়শিল্পী হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে; আবদুল্লাহ আল মামুনের জল্লাদের দরবার, আলমগীর কুমকুমের জন্মভূমি, মুস্তাফিজুর রহমানের আলো ছায়ায় মাহফুজুর অভিনয় করেন। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর হয়ে মাহফুজুর রহমান খানের সঙ্গে কথা বলেছেন রুবেল পারভেজ। চলতি সংখ্যায় সেই আলোচনার প্রথম কিস্তি প্রকাশ করা হলো।

মাহফুজুর রহমান খান : তুমি কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র?

রুবেল পারভেজ : হ্যাঁ, আমি সেখানকার গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়েছি।

মাহফুজুর : আমার ওয়াইফও (ড. নিরাফাত আলম শিপ্রা) ওখানে পড়তো, প্রাণিবিদ্যায়। সে ওখান থেকে চলে আসলো, বার্মিংহাম থেকে পিএইচ ডি করলো এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলো। এরপর ২০০১ সালে সে পৃথিবী থেকে চলে গেল।

রুবেল : আপনি এফ ডি সিতে আসার সঙ্গে সঙ্গে আজ এতো মানুষ আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসছে, কুশল বিনিময় করছে ...।

মাহফুজুর : না; আসলে কী, আমার জন্ম তো এফ ডি সিতে, এফ ডি সিই আমার জন্মস্থান। এখানেই আমি বড়ো হয়েছি। তাই এখানকার সবাই আমার আপনজন। রক্তের না হলেও কোনো অংশে এ সম্পর্ক কম নয়। আমি ভাগ্যবান যে, এখানকার মানুষজন আমাকে ভালোবাসে, সম্মান করে, বুকে টেনে নেয়।

রুবেল : ক্যামেরাকে আপনি ঠিক কীভাবে আত্মস্থ করেছিলেন?

মাহফুজুর : আমাদের পুর্বসূরীদের অনেকেই বাইরে থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসেছে। কোনো বিষয়ে এডুকেশন একটা বিরাট ব্যাপার। আনোয়ার হোসেন ভাই, আব্দুস সামাদ ভাই, তারা তো সবাই বাইরে থেকে পড়াশোনা করে এসেছে। উনাদের পড়া আর আমার পড়া এক নয়, আমার তো শেখা ওস্তাদের কাছ থেকে। আমি প্রথম যার কাছে কাজ শিখি তিনি বদরে আলম, উনি চলে গেলেন পাকিস্তানে। তারপর আমি আবদুল লতিফ বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গেই কাজ করি। তিনিই আমার গুরু। এছাড়া আফজাল চৌধুরী, অরুণ রায়, সাধন রায়, সামাদ ভাই, কিরণ জামান ভাই, রফিকুল বারী চৌধুরী অনেকের কাছে আমি শিখেছি। এরা তো লিজেন্ড, সবাই পিলার। উনাদের কাজে যে শুধু অ্যাসিস্ট করেছি তা নয়, কাজ দেখেছি সবার। আর আমাকে যারা সাহায্য করেছে টু বিকাম আ ক্যামেরাম্যান--তাদের ভিতর আখতার, উনি ক্যামেরাম্যান--উনিও আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছেন। তারপর হারুনুর রশীদ, উনি শিখিয়েছেন জুম কীভাবে করতে হয়, প্যান কীভাবে করতে হয়। সুযোগ পেলে এহতেশাম, মুস্তাফিজ ভাইদের সঙ্গে আউটডোরে যেতাম; তারা আমাকে শেখাতো, এ রকম করবা, এ রকম জুম করবা, শুটিং স্টার্ট করানো আরকি। আর ইসহাক, উনিও ক্যামেরাম্যান, এখনো আছেন। উনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। উনারা কিন্তু আমাকে সুযোগ করে দিয়েছেন। আর লাইটে ছিলো আকবর, মোশারফ, কাসেম--বহু বহু লোক। তারা আমাকে অনেক অনেক সাহায্য করেছে টু বিকাম আ ক্যামেরাম্যান।

রুবেল : পেশাদার ক্যামেরাম্যান হিসেবে শুরুটা করলেন কখন থেকে?

মাহফুজুর : ১৯৭২ সাল থেকে কাজ করছি। এখনো চলছে। তবে ১৯৬৯-এ আমি প্রথম ফিল্মে এসেছি অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে এহতেশাম ভাইয়ের হয়ে।

রুবেল : অ্যাসিস্ট্যান্ট?

মাহফুজুর : প্রথম আমাকে ক্লাপ-ট্লাপ দেওয়ার জন্য নিয়েছিলো। তারপর উনারা বললো, নাউ ইউ শিফট ইন ক্যামেরা। তুমি এখানেই ভালো করবে। এই আরকি আমার শুরু। শুরুতে আমি ফোর্থ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম, ক্লাপ দিতাম। তারপর উনারা বললো, ডোন্ট গো ফর দ্যাট, তুমি ক্যামেরায় যাও। ক্যামেরায় কাজ শুরুর পর ভালো লাগলো। আমার ছোটোবেলা থেকে শখ ছিলো ক্যামেরা চালানোর। আমি বেড়ে উঠেছি সিদ্ধেশ্বরী মডেল স্কুলে। আমার বাবার একটি বক্স ক্যামেরা ছিলো। ছোটোবেলায় ওটাই ছিলো আমার হবি। তো হবি সামটাইমস লেটার বিকাম আ প্রফেশন।

রুবেল : আপনার বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন?

মাহফুজুর : আমি ঢাকার লোকাল ছেলে--ওল্ড টাউন, চকবাজার--আমি যে এলাকায় বেড়ে উঠেছি সেটা হাকিম হাবিবুর রহমান রোড, ছোটো কাটরা। হাবিবুর রহমান হলেন আমার দাদা। উনার নামেই এ রাস্তা, উনি সমাজকর্মী ও পলিটিশিয়ান ছিলেন। আমার দাদার এডুকেশনাল ব্যাকগ্রাউন্ড শক্তিশালী ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন হলো, তখন তিনি ছিলেন এর ওয়ান অব দ্য মেম্বার। ইস্ট পাকিস্তানে তিনি নামকরা লোকই ছিলেন। যাহোক, আমি ওখান থেকে হোস্টেলে চলে গেলাম, সেখানেই বড়ো হয়েছি। ওখান থেকে চলে গেলাম ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল কুমিল্লায়। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে আবার ঢাকায় এসে তৎকালীন কায়েদে আজম কলেজ মানে এখনকার সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। আর ফিল্মে ঢোকার পর আমি বি এ পরীক্ষা দিই। আবার ফিল্মে ফিরে আসি ১৯৬৯-এ। আমি প্রথম অ্যাসিস্টটেন্ট হিসেবে কাজ করি যে সিনেমায়, সেখানে জাহাজে করে চিটাগাং থেকে কক্সবাজার যেতে হয়েছিলো। ছবিটার নাম ঠিক মনে নেই। এরপর আমি বাচ্চু (আবদুল লতিফ বাচ্চু) ভাইয়ের অনেক ছবিতে কাজ করি--দর্পচূর্ণ, ময়নামতি

রুবেল : স্বাধীনতাযুদ্ধের পর পর যখন কাজ শুরু করলেন পুনরায় ...।

মাহফুজুর : স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এ আমি প্রথম ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করলাম কাঁচের স্বর্গ নামের একটি ছবিতে। এর পরিচালক ছিলেন আউয়াল বাশার চুন্নু, উনি মুক্তিযোদ্ধা। এরপর বিভিন্ন ছবিতে কাজ করতে থাকি। বাবুল চৌধুরীর ছবি করলাম, উনি ওই সময়ের হাইলি টেকনিকাল ডিরেক্টর ছিলেন। তারপর কাজ করতে করতে তো এখন এখানে এসে দাঁড়িয়েছি।

রুবেল : আপনি তো অভিনয়ও করতেন।

মাহফুজুর : ঠিক অভিনয় করতাম না; আমাকে ওই সময় আবদুল্লাহ আল মামুন আর আজমল হুদা মিঠু ভাই বললেন আমাদের সেটে কাজ করতে হবে। তো কী আর করা, শুরু করে দিলাম।

রুবেল : তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আপনাকে জার্মান ভাষা শিখতে হয়েছিলো, তাই না?

মাহফুজুর : হ্যাঁ, আমি জানতাম না। আমাকে জার্মান ভাষা শেখানো হয়েছিলো। জার্মান অ্যাম্বাসিতে গিয়ে শিখলাম। তারপর আমার কস্টিউম বানানোর জন্য বোম্বে (মুম্বাই) যাওয়া হলো। কিছু ট্রেনিং দেওয়া হলো। তারপর শুটিংও করলাম। একপর্যায়ে অজ্ঞাত কারণে ছবিটির ব্যাপারে অনেক জায়গা থেকে হুমকি-ধামকি আসলো। তখন ছবিটা বন্ধ হয়ে গেলো। তারপর মুস্তাফিজ ভাইয়ের একটা ছবি করলাম; দিলীপ বিশ্বাসের একটা দাবি করলাম; সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার এ কালের নায়ক নামে একটা ছবি করলাম। ধীরে ধীরে দেখলাম, না আমার কাছে ফটোগ্রাফিই মোর সুইটেবল এবং এটিই হয়তো ভালো করতে পারবো।

রুবেল : অভিনয়টা টানলো না কোন জায়গা থেকে?

মাহফুজুর : টানলো না মানে প্রথমত, আমি নিজেকে এতো রিজার্ভ রাখতে পারি না। আমি ফ্রেন্ডলি টু এভরিবডি। কিন্তু এসব বিষয় কোনো না কোনোভাবে আর্টিস্টদের একটু মেইনটেইন করতে হয়। যেটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। ডিসট্যান্স মেইনটেইন করা, পশ রাখা, আই কুডেন্ট ডু ইট। এতো পরিচিত ছেলেপেলে, আমি এখানকার লোকাল, আমাকে সবাই চেনে, এর ফলে আমার পক্ষে এটা সম্ভব ছিলো না, ওই জগতে ওসব বিষয় মেনে বিচরণ করা। তাছাড়া দ্যাট ইজ ভেরি টাফ, ওটা গড গিফটেড হয়। অভিনয় করাটা গিফটেড, ওটার ওপর জোর দিয়ে কিছু করা যায় না। তারপর চিন্তা করলাম, আই কুড ডু বেটার ফটোগ্রাফি। এরপর আমি এখানেই চলে আসি।

রুবেল : এরপর তো দিশা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রোডাকশন হাউজও করেছিলেন।

মাহফুজুর : হ্যাঁ, আমি দিশা ইন্টারন্যাশনাল নামে প্রোডাকশন হাউজ করেছিলাম। ওখান থেকে চারটি ছবি প্রযোজনা করেছিলাম।

রুবেল : প্রযোজক হিসেবে ছবিগুলো থেকে কেমন সফলতা পেয়েছিলেন?

মাহফুজুর : অনেক অনেক সফলতা পেয়েছি। চারটি ছবিই ওই সময়ের সুপারহিট ছিলো। ছবিগুলো হলো--নীতিবান, দুর্নাম, সম্মানকারফিউ। আমি ছবিগুলোর শুটিং করেছিলাম ব্যাংককে। প্রথম ছবি, যেটি ফুল লেন্থ, ব্যাংককে এর শুটিং করি। অনেক অ্যাপ্রিসিয়েট করেছিলো সবাই। প্রযোজক হিসেবে আমি সফল ছিলাম।

রুবেল : ব্যাংককে শুটিং করেছিলেন কোন কোন ছবির?

মাহফুজুর : নীতিবানদুর্নাম ছবির শুটিং হয়েছিলো ব্যাংককে; সম্মান ও কারফিউ ঢাকায় করেছিলাম। মোটামুটি আমার সবগুলো ছবি ভালোভাবে গ্রহণ করেছে দর্শক; শিবলি সাদিক ছিলেন, শাহ আলম কিরণ এগুলো নির্মাণ করেন। এর কিছুদিন পর তো বড়ো দুর্ঘটনা ঘটে গেলো আমার জীবনে।

রুবেল : কী সেটা?

মাহফুজুর : আমি আমার স্ত্রীকে হারালাম ২০০১ সালে। তারপর থেকে আর ভালো লাগে না এতো কিছু করতে। শুধু নিজেকে কনসেন্ট্রেট করলাম ফটোগ্রাফিতে।

রুবেল : আপনি ঠিক কোন জায়গা থেকে প্রযোজনায় নেমেছিলেন?

মাহফুজুর : ওয়ান অব মাই ফ্রেন্ড হি ওয়ান্টস, আই গো ফর আ প্রডাকশন। তো আমি গেলাম এবং মোটামুটি সাকসেসফুলও হলাম। এভাবে চলতে চলতে, অনেক বড়ো বড়ো নির্মাতার সঙ্গে কাজ করলাম, হুমায়ূন ভাই, মামুন ভাই। বাবুল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করলাম, আওয়াল কবীর পিন্টুর ও সোহানুর রহমান সোহানসহ আরো অনেকের সঙ্গেই ছবি করলাম।

রুবেল : গত ছয় দশক ধরে একটা লম্বা জার্নি করছে বাংলাদেশের সিনেমাটোগ্রাফি। যদি মুখ ও মুখোশ থেকেই ধরা হয়, এই দীর্ঘ সময়ের সিনেমাটোগ্রাফির জার্নিটাকে আপনার কাছে কেমন মনে হয়?

মাহফুজুর : এক্সসেলেন্ট।

রুবেল : সেটা কেমন?

মাহফুজুর : আমি যখন ক্যামেরাম্যান হলাম, তখন বি এন সি এন সি ওয়ান থাউজেন্ড ফিটের ম্যাগাজিনওয়ালা বড়ো ক্যামেরায় কাজ করতাম। আমরা তখন কাজ করতাম ডিরেক্ট সাউন্ডে। এর মাধ্যমে প্রথম ছবি নিয়ে ক্যারিয়ার আরম্ভ করলাম আমি। তারপর ধীরে ধীরে এরি (Arri camera) আসলো, এরি ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর ও ফাইভ আসলো। তারপর আসলো রেড ক্যামেরা, তারপর এরি অ্যালেক্সা (Arri Alexa digital motion picture camera)। এখন তো ওটাই চলছে। তাছাড়া আমি ১৬ মি মি ফরমেটেও কাজ করেছি। গত পাঁচ-সাত বছর হলো টোটাল ফরমেটই চেইঞ্জ হয়ে গেছে--ডিজিটাল। ডিজিটালেও আমি কাজ করছি। আমরা যেকোনো ক্যামেরাতেই কাজ করতে পারি এবং কাজ করছি; সনিতেও কাজ করেছি। এর মধ্য দিয়ে একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে আমাকে আপডেট থাকতে হচ্ছে।

রুবেল : একজন ক্যামেরাপারসন নিজস্ব শিল্পসত্ত্বার জায়গা থেকে তার মতো করে শট্ নিতে পারে?

মাহফুজুর : আই সি এভরিথিং থ্রু ডিরেক্টর; আমার নিজের কিছু থাকে না; আমি জানিও না বেশি কিছু; আমি শুধু গল্পটা জানি। ডিরেক্টর আমাকে বলেন, ভাই আমি এখানে এই শটটা নিতে চাই, এই মুহূর্তটা এভাবে দেখতে চাই, এখন একটু ব্রাইট চাচ্ছি সিকোয়েন্সটা, এখন একটু ডার্ক।

আমি বেসিকালি, ভেরি ওবিডিয়েন্ট টু ডিরেক্টর অ্যান্ড স্ক্রিপ্ট। আই ওয়ান্ট টু স্যাটিসফাই মাই ডিরেক্টর, ওয়ান্ট টু স্যাটিসফাই স্ক্রিপ্ট, দ্যাটস অল। আমি যা দেখি, তার সবকিছু দেখি ডিরেক্টরের চোখ দিয়ে। ডিরেক্টর আমাকে দেখিয়ে দেন, আমি এই এই করবো। এরপর আমি তাকে দেখানোর চেষ্টা করি, আপনি কি এভাবে চান? তিনি যদি বলেন না, শটটা এভাবে একটু ক্লোজ করে নেন, তাহলে ঠিক ওভাবেই ক্লোজ করি। তিনি যদি বলেন ওয়াইড করতে, আমিও ওয়াইড করি। কারণ সিনেমা অ্যাবসুলিটলি ডিরেক্টরস মিডিয়াম। নির্মাতারা আমাদের চেয়ে বেশি চিন্তা করে। উনারা ফার্স্ট ডে অব মুভি; লেখা দেখার চিন্তা থেকে শুরু করে সবকিছুই তারা আগে ভেবে রাখে। যদি আমরা তার কথা মতো কাজ করি, তাহলেই হ্যাপি। মোদ্দাকথা, একজন সিনেমাটোগ্রাফারের ফার্স্ট কাজ হচ্ছে টু স্যাটিসফাই মাই ডিরেক্টর অ্যান্ড টু স্যাটিসফাই মাই স্ক্রিপ্ট।

রুবেল : আপনার কাছে ফটোগ্রাফি বিষয়টি কেমন মনে হয়?

মাহফুজুর : ওহ, হোয়াট ইজ ফটোগ্রাফি? ফটোগ্রাফি ইজ আ ল্যাটিন ওয়ার্ড। ফটো ইজ লাইট, গ্রাফি ইজ পেইন্টিং। পেইন্টিং অব লাইটই হলো ফটোগ্রাফি। ফিল্মে এটা সব জায়গায় আপনি অ্যাপ্লাই করতে পারবেন। কিছু সিকোয়েন্সেস থাকে, মুভ থাকে, যেখানে ফটোগ্রাফির খুব ভ্যালিউ। আদারওয়াইজ, আমরা যেসব কমার্শিয়াল মুভি করি, এন্টারটেইনমেন্ট মুভি করি, সেখানে তো এগুলোর সুযোগ নেই; এই সুযোগগুলো আছে, যারা মুভি ফর দ্য ক্লাস বানান তাদের কাছে। মুভি ফর দ্য মাস-এ আপনি এগুলো পারবেন না; ওখানে গ্ল্যামারটাই মেইন। কতো সুন্দর, কতো চাকচিক্য, এগুলোই এখানে চলে। কিন্তু যখন আমরা মুভি ফর দ্য ক্লাস করি, তখন আমাদেরকে অনেক সচেতন থাকতে হয়। লাইটের সোর্স নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়, এগুলো মেইনটেইন করতে হয়।

রুবেল : আপনি বলছিলেন, বাণিজ্যিক সিনেমাটোগ্রাফির ধারা একধরনের, অবাণিজ্যিকের ধারা আরেক ধরনের। জুম ইন, জুম আউট, প্যানিং থেকে সবকিছুতেই এই পার্থক্য লক্ষণীয়। এটাকে আপনি ঠিক কীভাবে দেখেন?

মাহফুজুর : আমার কাছে মনে হয়, উই আর ওয়ার্কিং উইথ দ্য ক্যামেরা। সেটা যেকোনো ফরম্যাটেই হোক। অনেকে অনেক ধরনের রেফারেন্স দেয়, কিন্তু আমি যেটা ফিল করি, মাত্রই বলেছি, দেয়ার আর টু টাইপস অব মুভি--ওয়ান ফর দ্য ক্লাস, ওয়ান ফর দ্য মাস। মাস যেটা সেটা কমার্শিয়াল মুভি। আর ক্লাসের মূল চরিত্রে থাকে, কিছু সিলেকটিভ, কিছু রিপ্রেজেন্ট করতে পারে বাংলাদেশকে; অস্কারে চেষ্টা করতে পারে বা কোনো উৎসবে যেতে পারে। এই ছবিটা (শাহেনশাহ, ওই সময় শুটিং চলছিলো ছবিটির) অ্যাবসুলটলি আ কমার্শিয়াল মুভি। এখানে আমার কোনো স্কোপই নেই ক্লাস-এর জন্য কিছু করার। এটা আসলে মাস পিপলের জন্য। একেকটি ছবির স্টাইল থাকে একেক রকম। আমি কার জন্য বানাচ্ছি, কেনো বানাচ্ছি। আমার ডিরেক্টর চিন্তা করছে--হি উইল মেইক ইট ফর দ্য পিপল। যারা সিনেমা দেখে বিনোদিত হতে পারে। যেমন ধরেন, মোরশেদুল ইসলাম বা তানভীর মোকাম্মেলরা যেমন ছবি করে। মোরশেদ ভাই কমার্শিয়ালও করেন, আবার ক্লাস ছবিও করেন। তানভীর ভাই অ্যাবসুলটলি ক্লাস-এর জন্য ছবি করেন। এই তো আমি তার নতুন ছবি রূপসা নদীর বাঁকে করে এলাম কিছুদিন আগে। ১৯৪২ থেকে আরম্ভ করে ১৯৭১ পর্যন্ত ওই সময়ের ড্রেস ওই সময়কার সাইকেল ...। তো এগুলো উনি করেন, উনার এটা পছন্দ। হি ইজ ভেরি মাস হিস্ট্রি ওরিয়েন্টেড। দেশকে নিয়ে দেশভাগের ওপর নির্মাণ করেছেন সীমান্তরেখা। রাজশাহীতেও বোধহয় উনি এ ছবিটি দেখিয়েছেন।

রুবেল : ছবি করার সূত্রে রাজশাহীতে কেমন যেতেন?

মাহফুজুর : একসময় রাজ্জাক ভাই (নায়ক রাজ রাজ্জাক) খুব রাজশাহী যেতেন, আমিও যেতাম। আজহার ভাই, মজনু ভাইসহ ওখানকার কালচারাল যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে আমার খুব ভালো রিলেশন ছিলো। ওখান থেকে অনেক আর্টিস্টের সঙ্গে আমরা কাজ করতাম। এই লিজেন্ডরা তো চলে গেছে। রাজ্জাক ভাই, চিন্তা করেন তার প্রোডাকশনে আমি প্রায় ২০টি বছর কাজ করেছি।

রুবেল : রাজ্জাকের সঙ্গে ২০ বছরের জার্নিটা কেমন ছিলো আপনার?

মাহফুজুর : অনেক সুন্দর, অনেক সুন্দর। একদিনও তিনি আমাদের সঙ্গে জোরে কোনো কথা বলেননি; একদিনও বকাবকি করেননি। রাগ হতেন, কিন্তু অনেক মুডি ছিলেন। আমাদের সঙ্গে আজ পর্যন্ত কোনো দিন উনার মিসআন্ডারস্টান্ডিং হয়নি। বিকজ হি সামথিং এক্সট্রাঅর্ডিনারি পারসন। উনি তো আমাদের মতো লোক নন। আর হুমায়ূন ভাই গিফটেড পারসন। তার সম্পর্কে আমি কি বলতে পারি! মামুন ভাই, তাকে নিয়েও বলার দুঃসাধ্য আমার নেই! তাদের কাজগুলোই তো অন্য রকম। উনাদের সম্পর্কে আমি মনে হয় না ক্লিয়ারলি কিছু বলতে পারবো। দে আর গ্রেট, দ্যাটস ট্রুথ। আলমগীর কুমকুম, আপনি ভাবেন তার কথা! দে অল আর গ্রেট।

রুবেল : বাণিজ্যিক, অবাণিজ্যিক জায়গায় সিনেমাটোগ্রাফির আঙ্গিকগত যে ভিন্নতা, তা নিয়ে আপনার ভাবনা বলুন। আমরা যখন হলিউডের ছবি দেখি, তখন কি আমাদের ছবির মতো এতোটা পার্থক্য মনে হয়, এটা আর্ট না কমার্শিয়াল?

মাহফুজুর : হ্যাঁ, মনে হয়। মুভমেন্টটা যখন লক্ষ করবেন, দেখবেন ওখানে ফারাক আছে। ওদের চলা, হাঁটা, শট্ নেওয়ার স্টাইলটাই ডিফারেন্ট হয়। কমার্শিয়াল ছবির ব্যাপারটাই একটু ডিফারেন্টে। গ্লামার, হাই-হুই অনেক সফ্ট। অ্যাকোরডিং টু স্ক্রিপ্ট, কমার্শিয়াল ছবির লাভ স্টোরির মতো আর্ট ফিল্মের লাভ স্টোরি হয় না। সফ্ট একটা মেকিং হয়। আমার কাছে মনে হয়, ইট ইজ আ স্টোরি উইথ হাউ টু উইল উই মেইক। গল্পটাই মুড ক্রিয়েট করে দেয় এনভায়রনমেন্টটা কী হবে।

রুবেল : ই আর খান আপনার চাচা; এহতেশাম, মুস্তাফিজ আপনার ফুফাতো ভাই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাদের গুরুত্ব অপরিসীম। তাদের নিয়ে কিছু বলুন।

মাহফুজুর : ই আর খান আমার চাচা; উনি তো গ্রেট। উনার জন্যই কিন্তু আমার ফিল্মে আসা।

রুবেল : তাদের নিয়ে বলুন। এ সময়কার অনেকেই হয়তো তাদের সম্পর্কে জানে না।

মাহফুজুর : খান চাচা অনেক মুডি ছিলেন, বেশ স্মার্টও। আমি তার বেশ কয়েকটা কাজ করেছি। মুস্তাফিজ ভাই, উনি ভালো ক্যামেরা চালাতেন, সফ্ট পারসন বাট মেকার। উনি অতো কথা বাড়াতেন না, উনার কাছে কাজই মেইন। আর এহতেশাম ভাই তো অ্যাবসুলটলি আ গড গিফটেড পারসন। চোখ দেখেই উনি বলে দিতে পারতেন, কে কী করতে পারবে কিংবা পারবে না। সামথিং এক্সট্রা অর্ডিনারি।

আপনি আবদুল্লাহ আল মামুন ভাইকে দেখেন, উনি সফ্ট, কিন্তু তার কাজগুলো দেখেন, ধীর-স্থির, খুব সাজানো গোছানো। হুমায়ূন আহমেদ ভাই ক্রিয়েটর। উনি যখন আমাদের স্ক্রিপ্ট পড়াতেন, তখনই আমরা জানতাম ক্যামেরাটা কোথায় হবে, লাইটিং কী হবে। আমি আজ পর্যন্ত উনার পাঁচটি ছবিতে কাজ করেছি ক্যামেরাম্যান হিসেবে। চারটিতে অ্যাওয়ার্ড (জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার) পেয়েছি। আরেকটাতে না পাওয়ার কারণ ছবিটি জমা দেওয়া হয়নি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডে, ওটা আমার জন্য খুব কষ্টকর ছিলো।

রুবেল : কোন ছবি এটা?

মাহফুজুর : চন্দ্রকথা। দ্যাট ইজ ওয়ান অব দ্য ফাইনেস্ট মুভি আমার ক্যারিয়ারের। তো ওই স্ক্রিপ্টেই তো ওই রকম থাকতো--কী হবে, কী করতে হবে, মুডটা কী। ক্যান্ডেল লাইট, সোর্স লাইট, সানলাইটে কাজ করবো নাকি হ্যাজাক লাইটে কাজ করতে হবে, সবই স্ক্রিপ্টে লেখা থাকতো। হুমায়ূন ভাই বললেই আমরা পুরো ছবিটি দেখতে পারতাম।


রুবেল : তার সিনেমায় ইমেজ, সংলাপের ব্যবহার নিয়ে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অনেকেই মনে করে, চলচ্চিত্র বলতে যা বোঝায় তিনি ওই মানের ছবি বানাতে পারতেন না। আপনার কী মনে হয়?

মাহফুজুর : মনে করে, ভাবে, এগুলো কোনো কথা নয়। ইউ সি স্ক্রিন অ্যান্ড ইউ ডিসাইড ইট। তুমি একটা ছবি আনো তার, শ্রাবণ মেঘের দিন কিংবা দুই দুয়ারি; দেখো মুভি অর নট। দেখো কোন জায়গায় তার ল্যাক আছে। এখানে আসলে পার্সোনাল লাইক ডিজলাইকটা চলে আসছে। যেটা নট ফেয়ার। আমি আপনাকে দেখতে পারি না, আপনাকে একটা খারাপ কথা বলবো। আরেকটা ব্যাপার হলো, আমি আপনার সঙ্গে একটা কিছু বলে ভাব দেখালাম। দিস ইজ নট ফেয়ার। তুমি দেখো আমাকে একটি শট্ নেওয়ার জন্য কী পরিমাণ প্রিপারেশন নিতে হয়। কালকে সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত কাজ করলাম। শুটিং তো হবে মাত্র আধা ঘণ্টা। আর স্ক্রিন ডিউরেশন হবে কতো, ম্যাক্সিমাম টেন মিনিট। আয়োজন তো দেখলে (এফ ডি সিতে চলা শাহেনশাহ-এর শুটিং নিয়ে)। আরো তিন-চার দিন কাজ করতে হবে। তারপর গিয়ে এই টেন মিনিটের ফুটেজটা পাবো। তো বলা খুব সহজ, কিন্তু ভেরি ভেরি টাফ টু মেইক ইট টু ক্রিয়েট ইট। আমার তো মনে হয় হুমায়ূন ভাইয়ের প্রতিটি ছবি নিয়ে তুমি আলাপ করতে পারো।

আমি মিতার একটি ছবি করেছিলাম জীবন মৃত্যু। আমার এ ছবিগুলো দেখতে পারছি না এখন। কিন্তু ওটা কী দারুণ ছবিই না! আলমগীর কুমকুমের তো অনেক ছবি করেছি। এই লোকগুলোও নাই। এবং এটাই স্বাভাবিক। আমজাদ ভাইয়ের কথা ভাবো একটু।

রুবেল : আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আপনার কোনো কাজ নেই?

মাহফুজুর : না, তার সঙ্গে আমার কোনো কাজ নেই।

রুবেল : এটা কেনো হলো না?

মাহফুজুর : কারণ তার তো একটা টিম ছিলো। তার কাজ করতো রফিকুল বারী চৌধুরী। আমার অডাসিটি আছে, আমি ওখানে গিয়ে বলি আমাকে কাজ দেন। আমরা তো উল্টো অপেক্ষা করতাম, এই টিমটা কিছু করবে আমরা কিছু শিখবো। আমি অনেক শট্ শিখেছি তাদের কাছে। গোলাপী এখন ট্রেনের একটা শট্ আছে না, ট্রেনটা যাচ্ছে, আমি ওই শটটা কতো চেষ্টা করেছি, বহু চেষ্টা করেছি, কই ওটা তো হয় না! ওটার মতো তো আর পারিনি। এটাতে লাক ফেবার করতে হয়। উনি যখন শটটা নিলেন, আকাশটা কী গোধুলী লগ্ন ছিলো, ধীরে ধীরে সানটা ডুবে যাচ্ছে। আমি যখন শটটা নিলাম, তখন ওই আকাশটা পাইনি। তাহলে কী দাড়াচ্ছে, দেয়ার ইজ আ গড, ও হেল্প করে। এটা ক্রিয়েটরকে হেল্প করে, ইউ ওয়ান্ট টু গুড, আই উইল গিভ ইউ গুড। টোটাল ক্রিয়েটিভ গোজ টু অলমাইটি। আমরা যতো চেষ্টা করি, প্রোপার সান পেলাম না; প্রোপার লাইট পেলাম না; প্রোপার লোকেশন নাই, কালার টেম্পারেচার পেলাম না--খুব কঠিন ব্যাপার।

রুবেল : আপনি বড়ো পর্দা তথা সিনেমার বিশাল পর্দার জন্য সিনেমাটোগ্রাফি করেন। এরপর ওই একই কাজ যখন টিভিতে দেখেন, তখন কেমন লাগে?

মাহফুজুর : সত্যি কথা বলতে, আমার কাছে খারাপ লাগে না। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমি তো অনেক টিভি নাটকও করেছি। আমার কাছে ফটোগ্রাফি ফটোগ্রাফিই। টিভি মিডিয়াম, ফিল্ম মিডিয়াম, এসব নিয়ে আমি ভাবি না। যে ভালো কাজ করবে, ভালো কাজ করতে চাইবে, আমি তারটাই করবো।

রুবেল : বড়ো পর্দার তো অবশ্যই একটা অন্য রকম বিষয় আছে।

মাহফুজুর : ওটা তো স্বাভাবিক, কিন্তু টিভিতে দেখতেও খারাপ লাগে না। আমার অনেক ছবি আমি টিভিতে দেখি। প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো টিভিতে আমার ছবি চলে। এটা দেখতে মজা লাগে; এই সুযোগে ঘরে বসেই আমি আমার ভুলগুলো দেখতে পারি, আমি আমার ভুলগুলো দেখি; আমি যা ভুল করেছি যা আমি জানতাম না, অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে এখন হয়তো একটু বেশি জানি; আগে তো অনেক কিছুই জানতাম না। যখন জানতাম না তখনো ঠিক ছিলাম, মানে যতোটুকু জানতাম তা দিয়েই বেস্টটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

রুবেল : কিন্তু টিভি ও বড়ো পর্দার সঙ্গে সিনেমার একটা দ্বন্দ্ব নিয়ে তো আলোচনা আছে এবং তা বেশিরভাগ সময় করেন চলচ্চিত্রনির্মাতারাই।

মাহফুজুর : তা থাকতে পারে। কিন্তু আই ডোন্ট ফাইন্ড এনিথিং, বিকজ ওখানেও লাইট, ক্যামেরা, অ্যাক্টর, মেকআপ আছে। সবকিছুই এক। কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে ওটা ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা আর আমরা আড়াই ঘণ্টার জন্য চিন্তা করি। আমার কাছে এটাই ডিফারেন্স।

রুবেল : হলিউড বা বিশ্ব সিনেমার অন্যান্য জায়গার কথা যদি ধরা হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের সিনেমাটোগ্রাফির চর্চার মধ্যে কোন কোন জায়গা থেকে পার্থক্য মনে হয়?

মাহফুজুর : আমার কাছে কোনো কিছুই পার্থক্য মনে হয় না। দে হ্যাভ প্রোপার ইকুইপমেন্ট, দে হ্যাভ টাইম, দে মেইক মুভি; আর আমরা ইদানীং যারা ছবি বানাচ্ছি, আমরা শুধু ছবির কাজ শেষ করছি। তাড়াতাড়ি শেষ করো, আজকে ২০টা কাজ শেষ করে ফেললাম। কিন্তু দে ডোন্ট ডু ইট। দে মেইক ইট প্রোপারলি। আমাদের বাজেটের একটা ব্যাপার আছে, এই টাকার মধ্যে শেষ করতে হবে। ম্যাক্সিমাম লোক এখন এভাবেই ছবি শেষ করছে। ছবি মেইক করাটা কিন্তু ডিফারেন্ট বিষয়। ইফ ইউ মেইক ইট প্রোপারলি, রেজাল্ট উইল বি বেটার। এজন্য উই হ্যাভ টু মেইক।

রুবেল : বড়ো পর্দার জন্য সিনেমাটোগ্রাফির সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ কোনটি মনে হয় আপনার কাছে?

মাহফুজুর : ফিল্মের চ্যালেঞ্জ হলো, এভরি শট্ ইজ লাস্ট শট্। এ শটটা আর কোনো ছবিতে নিতে পারবো না। আরেকটা ছবিতে আরেকটা শট্ নিবো, কিন্তু আজ যে শটটি নিচ্ছি এটাই আমার জীবনের লাস্ট শট্। আর ডিরেক্টর যদি বলে, শট্ ওকে, তাহলে আপনার কোনো ক্ষমতাই নেই রিটেক নেওয়ার, যদি কোনো ভুল হয়েও থাকে। সো উই হ্যাভ টু বি ভেরি কেয়ারফুল।

রুবেল : এখন ভার্চুয়াল রিয়ালিটির যুগ চলছে। সিনেমায় বিষয়টির হরহামেশা ব্যবহার হচ্ছে। আমরা চোখে চশমা পড়ে থ্রি ডি, ফোর ডি, ফাইভ ডি ছবি দেখছি, মনে হচ্ছে আমরা ছবিরই একটি অংশ। ভার্চুয়াল রিয়ালিটি তৈরির সঙ্গে সিনেমাটোগ্রাফির সম্পর্কটাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

মাহফুজুর : দেখো, থ্রি ডি অনেক আগেই এসেছে। কিন্তু কয়টা ছবির নাম দর্শক বলতে পারবে? এটা একটা সাময়িক ইয়ে ...। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, আই সি ইট মাই ওপেন আইজ। এসব কি অ্যাবনরমাল হয়ে যাচ্ছে না? এই একটা চশমা চোখে লাগিয়ে অন অব দেম হয়ে গেলাম, ইজ ইট নট আ রিয়ালিটি। আমরা যখন উপন্যাস, গল্প পড়ি, তখন কে হিরো কে হিরোইন এসব দেখি! এই বিষয়টিই আমরা ফিল্মে নিয়ে আসি। এটার রিয়ালিটি আছে। আর আমার কাছে ওটা আউট অব রিয়ালিটি মনে হয়। ইট কান্ট বি ভেরি পপুলার। কখনোই দেখবে না এতে ম্যাক্সিমাম ছবি হচ্ছে; এক্সপেরিমেন্টাল বা একটা-দুইটা ছবি হয়তোবা করা হয়।

রুবেল : তাহলে আপনার বক্তব্য অনুযায়ী, যে গল্পগুলো ভার্চুয়াল রিয়ালিটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, তা মূলত বা জোর করিয়ে বলা হচ্ছে, এটা থ্রি ডি ছবি; আপনাকে এটা এভাবেই দেখতে হবে। অর্থাৎ দর্শক কোন রিয়ালিটিতে যেতে চায় সেটা নয়, বরং তাকে বলা হচ্ছে আপনি এই রিয়ালিটির মধ্যে ঢুকুন।

মাহফুজুর : এক্সাক্টলি। আমার কাছেও তাই মনে হয়। আমি নরমালি দেখবো, গল্পের দৃশ্যের সঙ্গে এমনিতেই যুক্ত হবো। তা না করে আমাকে শুরুতেই চশমা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমার তো আই গ্লাসের দরকার নাই রে বাবা। একটা জিনিসই হচ্ছে, ওখানে সবাই কনসেন্ট্রেট করতে পারে। ফিল্মে আগে যেটা ছিলো, প্রেক্ষাগৃহে ফার্স্ট বেল্টে পাকিস্তানি খবর, সেকেন্ড বেল্টে বাংলাদেশি খবর, তারপর থার্ড বেল্টে গিয়ে ছবি। এর মানে আগের দুই ধাপ পেরিয়ে তৃতীয় ধাপে এসে দর্শক বুঝে গেলো নাউ উই আর গোয়িং টু মুভি। এখন অস্থিরতা এতো বেশি থাকে যে, ছবি দেখার জন্য একটু সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করারও সময় নেই। এখন আপনি টিভিতে ছবি দেখছেন, চা খাচ্ছেন, গেস্টের সঙ্গে আলাপ করছেন। সো উই আর নট কনসেন্ট্রেট অন আওয়ার মুভি। কিন্তু আগে সিনেমাহলে গেলে ছবি ছাড়া আর কোনো চিন্তা মাথায় থাকতো না। এই রিয়ালিটিটা এখন আর মানুষের মধ্যে নেই। তার ওপর আবার বাইরের দেশে এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টার ছবি হয়; কিন্তু আমাদের এখানে তিন ঘণ্টা না হলে ছবি হয় না। দর্শক এর নিচে হলে সেটিকে সিনেমা হিসেবেই ভাবতে চায় না।

রুবেল : আপনি তো পুনেতে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন।

মাহফুজুর : ওটা হলো কী, তখন তো আমি ক্যামেরাম্যান হয়ে গেলাম।

রুবেল : পরে চলে এসেছিলেন এই ভেবে যে আপনি এসব পারেন; সে ভাবনাটা কি ঠিক ছিলো?

মাহফুজুর : সেটা হচ্ছে, আমি তখন ক্যামেরাম্যান হয়ে গেলাম! সবাই বললো আরে তুমি আর ওখানে কী শিখবে। আসলে ক্যামেরাম্যান সামথিং, এতো কিছু। এতো কষ্ট করে এখানে ক্যামেরাম্যান হিসেবে জায়গা তৈরি করে চলে যাবো, আবার আসবো তিন সাড়ে তিন বছর পর, এই ভেবেই থামিয়ে দিলাম। কিন্তু আমি আসলে ভুল করেছিলাম। এটা ১৯৭২ সালের কথা।

(চলবে)

রুবেল পারভেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি বণিক বার্তায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত।

rubelmcj@gmail.com

https://www.facebook.com/rubel.pervez.14


বি.দ্র. এই সাক্ষাৎকারটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন