Magic Lanthon

               

তাসনিয়া মিন্নি

প্রকাশিত ০৮ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

ইফতেখারুল আলম কিসলু

চলচ্চিত্রে ইতিহাস গড়া এক মানুষ ইতিহাসে বিস্মৃতের পথে

তাসনিয়া মিন্নি


এক.

ইফতেখারুল আলম কিসলুর জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে। ৫০-এর দশক থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শক হিসেবে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কিসলু। ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রযোজনা ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরসস্টার ফিল্ম করপোরেশন এর স্বত্বাধিকারী। চলচ্চিত্রের প্রতি কিসলুর ভালোবাসা জন্মে তার নানা মুন্সি আব্দুল লতিফের হাত ধরে। চলচ্চিত্রের প্রতি আকর্ষণ থেকে আব্দুল লতিফ--তখন কোথাও তেমন প্রেক্ষাগৃহ ছিলো না--সেসময় আসানসোলে প্রথম প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ করেছিলেন। নানার এমন চলচ্চিত্রপ্রেমের কারণেই তখন থেকে কিসলু স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন বড়ো হয়ে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার। কিছুদিনের মধ্যে চলচ্চিত্র সবাক হলে তার আগ্রহ যেনো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। একপর্যায়ে পড়াশোনা শেষ করে পরিবেশক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। তারপর একে একে কিসলু প্রযোজক ও প্রদর্শক হিসেবে নাম লেখান।

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়নি, তখন কিসলু ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চলচ্চিত্রের সূত্র ধরে পূর্ব পাকিস্তানে আসতেন। সেসময় ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র আমদানি করা হতো। সেরকমই একটি পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন কিসলু। এক সাক্ষাৎকারে কিসলু বলেন,

কবি শামসুর রাহমানের চাচা সোসাইটি পিকচারস্ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে আমি ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে একশো টাকা বেতনে প্রথম পূর্ব পাকিস্তানে আসি। তখন আমার মনে হয়েছিলো, এই একশো টাকা আমার জন্য যথেষ্ট নয়, আমি নিজে প্রতিষ্ঠান করলে হয়তো আরো বেশি টাকা উপার্জন করতে পারবো। তখনই প্রতিষ্ঠা করলাম স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরস।

কিসলু কখন কোন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্থায়ী হয়েছিলেন, সে সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে স্থায়ী হওয়ার পর তিনি স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরসের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। এছাড়া চলচ্চিত্রের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছেন। এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের আগেই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে বগুড়া থেকে সিনেমা নামে চলচ্চিত্রবিষয়ক একটি পত্রিকা বের হতো। যার সম্পাদক ছিলেন চলচ্চিত্র সাংবাদিকতার পথিকৃৎ এবং বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র প্রেসিডেন্ট-এর নির্মাতা ফজলুল হক। তার সঙ্গেও কিসলুর বন্ধুত্ব ছিলো।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক ও পূর্ণদৈঘ্য চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ মুক্তি পেলে কিসলু খুব বেশি উৎসাহ কিংবা আগ্রহ দেখাননি। কারণ আব্দুল জব্বার খান নির্মিত এই চলচ্চিত্রের টেকনিকাল কোয়ালিটি কেমন হবে, সেটা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন তিনি। শুরুতে কিসলু চলচ্চিত্র নির্মাণের চেয়ে পরিবেশক হিসেবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে তিনি স্বীকার করেছিলেন, কোয়ালিটি যেমনই হোক আব্দুল জব্বার খানের মুখ ও মুখোশ সেই সময় এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। কারণ এ চলচ্চিত্রের পরই এদেশে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে এবং মানুষ সেটা নির্মাণের সাহসও পেয়েছে।

জীবদ্দশায় দীর্ঘদিন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র সমিতির সভাপতি ছিলেন কিসলু। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি ব্যবসায়ী হিসেবেও সফল ছিলেন। একসময় তিনি জার্মান কোডাক ফিল্মের বাংলাদেশের এজেন্টও ছিলেন। এছাড়া নানাবিধ ব্যবসাতেও বিনিয়োগ করেন তিনি। সেই সূত্র ধরেই ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে কিসলু ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হন। এছাড়া তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডেরও আজীবন সদস্য ছিলেন। কর্মজীবনে সফল হলেও ব্যক্তি জীবনে নানা চড়াই-উৎরাই পার করতে হয়েছে কিসলুকে। কিসলু বিয়ে করেন অভিনয়শিল্পী আহমেদ শরীফের ফুফু বেগম খোরশেদা আলমকে। কিসলুর বেশ কয়েক বছর আগেই গত হন খোরশেদা। আর একমাত্র সন্তান ফেরদৌস আলমেরও অকাল মৃত্যু হয়। এরপর ছেলের বউ ফৌজিয়া আলম আর দুই নাতিকে আকড়েই কিসলু বেঁচে ছিলেন। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ জানুয়ারি ৯১ বছর বয়সে জীবনমঞ্চ ত্যাগ করেন কিসলু।

দুই.

১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরস প্রথম পূর্ব পাকিস্তানের একটি চলচ্চিত্র পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়--মহিউদ্দিনের মাটির পাহাড় (১৯৫৯)। একই বছর কিসলু পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজেকে যুক্ত করেন প্রদর্শক হিসেবে। রাজধানীর মায়ামুকুল নামের দুটি প্রেক্ষাগৃহ কিনে নাম দেন স্টারআজাদ। কিছুদিন পর কিনে নেন রূপমহলতাজমহল নামে আরো দুটি প্রেক্ষাগৃহ। এছাড়া চট্টগ্রামের উজালা, খুলনার মিরাক্ষ্মী, চাঁদপুরে চিত্রলেখা, রংপুরের বিজলী প্রেক্ষাগৃহের স্বত্বাধিকারী ছিলেন কিসলু। এসব প্রেক্ষাগৃহ দিয়েই তিনি সম্প্রসারণ করেন তার প্রদর্শন ব্যবসা। কারণ তার মনে হয়েছিলো, যদি নিজস্ব প্রেক্ষাগৃহ না থাকে তাহলে পরিবেশক হয়েও নিজের চলচ্চিত্র পরিদর্শনেই সীমাবদ্ধতা নেমে আসবে। একের পর এক প্রেক্ষাগৃহের মালিক হওয়া প্রসঙ্গে তার ভাষ্য ছিলো--

পরিবেশক হিসেবে আমার মনে হলো, আমাদের যদি নিজস্ব প্রেক্ষাগৃহ না থাকে তাহলে চলচ্চিত্র দেখাবো কোথায়? এভাবেই আমার প্রেক্ষাগৃহের যাত্রা শুরু। প্রদর্শক হিসেবে আমরা প্রথম কিনলাম পুরান ঢাকার মায়া সিনেমাহল। মায়া তখনকার দিনে অত্যন্ত প্রেস্টিজিয়াস সিনেমাহল ছিলো। সেজন্য ওই হল কিনে আমাদের খুব ভালো লেগেছিলো। এই প্রেক্ষাগৃহটি কিনেই আমরা এটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করে ফেলি। এটাই ছিলো পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমাহল।

১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে স্টার ফিল্ম করপোরেশন নামে নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে পরিবেশক ও প্রদর্শক কিসলু হাজির হন প্রযোজক হিসেবে। কারণ তিনি ভেবে দেখলেন নিজের প্রেক্ষাগৃহ বাঁচিয়ে রাখতে হলে অন্যের চলচ্চিত্র দেখানোর পাশাপাশি নিজেকেও প্রযোজনা করতে হবে। কেবল পরিবেশকদের ওপর নির্ভর করলে ব্যবসায় সফল হওয়ার বাসনা স্বপ্নই থেকে যাবে। কিসলুর ভাষ্য, বেশকিছু সিনেমাহলের মালিক হবার পর প্রশ্ন উঠলো, সিনেমাহলে কী দেখাবো; কেবল পরিবেশকদের ছবি? নিজেদের সিনেমাহলে নিজস্ব চলচ্চিত্র থাকবে না, এটা কীরকম কথা! সেসূত্র ধরেই প্রযোজনায় আসা। তবে প্রযোজনায় এসেই কিসলু স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। আর সেজন্য ব্যবসাপটু এ মানুষটি প্রথমেই বেছে নিলেন তার বন্ধু ও অন্যতম সফল নির্মাতা এহতেশামকে। তবে বন্ধুর ওপর শর্ত জুড়ে দিলেন, তার পছন্দের নায়িকাকে বাদ দিয়ে নতুন কাউকে নিতে হবে। কারণ কিসলু মনে করেছিলেন, চলচ্চিত্রের স্বার্থেই নতুন ছেলে-মেয়েদের সুযোগ দিতে হবে। একপর্যায়ে মেডিকেল পড়ুয়া রওশন আরাকে রাজি করিয়ে কিসলু তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্মাণ করলেন নতুন সুর। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল না হলেও কিসলু ঠিকই সামনে এগোনোর পথ পেয়ে যান।

তিন.

কিসলুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে জহির রায়হানের চলচ্চিত্রিক জীবন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে জহির রায়হানের পরিচালনায় মুক্তি পাওয়া কাঁচের দেয়াল-এর মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ শুরু করে স্টার ফিল্ম করপোরেশন। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পাকিস্তানের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে কাঁচের দেয়াল-এর জন্য শ্রেষ্ঠ নির্মাতা ও সংলাপ লেখকের পুরস্কার পান জহির রায়হান। এছাড়া চলচ্চিত্রটির সম্পাদক এনামুল হক, চিত্রগ্রাহক এম এ জহুর, সুরকার খান আতাউর রহমান, নারী অভিনয়শিল্পী সুমিতা জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। জহির রায়হান ও কাঁচের দেয়াল-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া প্রসঙ্গে কিসলু বলেন,

আমি তখন চলচ্চিত্র প্রযোজনায় ভীষণ ব্যস্ত। এমনই একদিন এফ ডি সিতে গিয়েছিলাম, তখন এফ ডি সির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন খায়রুল কবির। তার সামনে তখন একটি ছেলে অত্যন্ত মলিন মুখে, বিষণ্ন চিত্তে বসেছিলেন। আমি প্রশ্ন করলাম ঘটনাটা কী? খায়রুল কবির সাহেব জানালেন, তার ছবিতে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা বিল হয়েছে এবং এই বিল পুরোপুরি না দেওয়া পর্যন্ত এ ছবিটি ছাড় দেওয়া যাবে না। যেরকমভাবে জহির রায়হান সাহেব তাকে অনুরোধ করছিলেন, তা দেখে আমি হঠাৎ করেই বলে ফেললাম ছবিটি আমি নেবো। জহির রায়হান তখন অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। তারপর জহির রায়হান আমাকে বললেন, আমি আপনাকে ছবিটি দেখাবো। ছবিটি দেখে আমার অত্যন্ত ভালো লাগলো। এতো ভালো লাগলো যে, তখন আমি আর অন্য কিছু ভাবলাম না। জহির রায়হানকে জিজ্ঞেস করলাম, আমি এ ছবিটি এক লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে নিলাম, আপনি কতো টাকা পাবেন বলে মনে করেন? উনি বললেন, ২৫ হাজার টাকা! পরে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শিত হলো, প্রচুর প্রশংসা পেলাম। কিন্তু টাকা পেলাম না। তবে এর জন্য আমার মনে কোনো দুঃখ বা অনুশোচনা ছিলো না।

এ ঘটনার পর জহির রায়হান আর কিসলুর জন্য অপেক্ষা করছিলো আরো সব অদ্ভুত ঘটনা। কারণ কাঁচের দেয়াল ব্যাপকভাবে ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হলে কিসলু কিছুটা চিন্তায় পড়েন। এ রকম পরিস্থিতিতে হঠাৎই একদিন কিসলুর কাছে পরবর্তী চলচ্চিত্রের জন্য অর্থায়ন চান জহির রায়হান! শুধু তাই নয়, তিনি প্রস্তাবিত চলচ্চিত্রটি উর্দু ভাষায় ও রঙিন হিসেবে নির্মাণ করতে চান। কিন্তু তিনি নিজে উর্দু জানেন কি না কিসলুর এমন প্রশ্নের উত্তরে না সূচক জবাব দেন জহির রায়হান! শুরুতেই জহিরের এহেন প্রস্তাবে কিসলু কিংকর্তব্যবিমুঢ় হলেও তার তারুণ্য, উদ্যম ও সাহসিকতা তাকে মুগ্ধ করে। একইসঙ্গে তিনি সিদ্ধান্ত নেন জহিরের এই চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করবেন। এর কিছুদিন পর পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে গেলে নির্মাতা আগা গুলের কাছ থেকে কিসলু জানতে পারেন তারা ইতোমধ্যেই রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেছেন। আর সেটাই হবে পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র। পাকিস্তান থেকে ফিরে সংবাদটি জহিরকে জানালে অত্যন্ত মর্মাহত হন তিনি। তবে নিজের জেদ ধরে রেখে রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ শুরু করেন জহির। এতে সমান তালে সমর্থন দিয়ে যান কিসলু। অবশেষে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রটি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র হিসেবেই মুক্তি পায়।

সঙ্গম মুক্তির সেই স্মৃতি সম্পর্কে কিসলুর ভাষ্য ছিলো এমন--তখন কিন্তু এখানে কালার ল্যাবরেটরি ছিলো না। ভিনা কালার ল্যাবরেটরিতে তখন খালেদ সরোয়ার উদ্দিন নামে একজন টেকনিশিয়ান ছিলেন; তিনি পরীক্ষামূলকভাবে পরিস্ফুটন করলেন এবং সফল হলেন। এরপর সঙ্গম কেবল মুক্তিই পায়নি, করাচিতে টানা ৫২ সপ্তাহ ধরে চলেছে এবং তখন এটা রেকর্ড। যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও অহংকারের বিষয় ছিলো। সেসময় পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ডন এক শিরোনাম লিখেছিলো, চেঞ্জ কামস ফ্রম দ্য ইস্ট

সঙ্গম (১৯৬৪) চলচ্চিত্রের পোস্টার


১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে কিসলুর প্রযোজনা ও পরিবেশনায় মুক্তি পায় দুটি চলচ্চিত্র। একটি নজরুল ইসলামের কাজল অন্যটি জহির রায়হানের বাহানা। দুটি চলচ্চিত্রই ছিলো উর্দু ভাষায়। জহিরের বাহানা ছিলো পুরো পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ। সবমিলে বাহানা নতুন একধরনের চলচ্চিত্র ছিলো, যা প্রচুর প্রশংসা পায়। তবে কাঙ্ক্ষিত ব্যবসায়িক সফলতা আসেনি। তারপরও সিনেমাস্কোপের চিন্তার ক্ষেত্রে জহিরের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের যে আগ্রহ, তাতে সায় দিয়ে গেছেন কিসলু। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে স্টার ফিল্ম ডিস্টিবিটরস সফদর আলী ভূঁইয়াকে দিয়ে রহিম বাদশারূপবান এবং জহিরকে দিয়ে বেহুলা নির্মাণ করে। মূলত রূপবান-এর অভাবনীয় সাফল্যের পরই নির্মাণ হয় রহিম বাদশারূপবান; তারপর পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক বেহুলা

ব্যবসায়িকভাবে সফল পরিবেশক, প্রদর্শক ও প্রযোজক কিসলু সবকিছুতেই ঝুঁকি নিতে পছন্দ করতেন। একই সঙ্গে তিনি নতুন নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী তৈরিতেও যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। তার অন্যতম উদাহরণ সফদর আলী ভূঁইয়া, জহির রায়হান ও রাজ্জাক। তাদের সম্পর্কে কিসলু বলেন,

চলচ্চিত্রে সফদর আলী একেবারে নতুন লোক ছিলেন। তিনি যেভাবে কাহিনি সাজিয়েছিলেন তাতে আমার মনে হয়েছিলো, রূপবান যেহেতু সফল হয়েছে, তাহলে রহিম বাদশা ও রূপবানও সফল হবে। অন্যদিকে সঙ্গম-এর পর আমি প্রস্তুত ছিলাম, জহির রায়হান অদ্ভূত সব প্রস্তাব নিয়ে আসবেন। উনি একদিন এসে বললেন, আমি হিন্দু মিথোলজিক্যাল চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাই। কোন ছবি বানাবেন? বললেন, বেহুলা। আমি বললাম, এটা মনসা দেবির কাহিনি। যদি ঠিকঠাক তৈরি করা না যায়, তাহলে কিন্তু একটি গোষ্ঠী অসন্তুষ্ট হবে। ফলে আমি এটা তৈরিতে কিছুটা দ্বিধা বোধ করলাম। উনি বললেন, আপনি কি দুই লক্ষ টাকা খরচ করতে রাজি? আমি বললাম রাজি। তখন উনি বললেন, ঠিক আছে আমি এতে অংশ রাখবো। আপনার কাছ থেকে আমি কোনো পারিশ্রমিক নেবো না। আমার বিশ্বাস, এ চলচ্চিত্রটি ব্যবসা করবে। তখন বললাম কাকে নিবেন নায়ক হিসেবে। উনি বললেন, একজন নতুন লোককে নিতে চাই। আপনি তাকে দেখেননি। এর আগে তেমন কোনো অভিনয় করেননি। তখন রাজ্জাকের নাম বললেন। আমি আবারও অত্যন্ত দ্বিধাগ্রস্ত হলাম, নতুন লোক; তারপর আবার পৌরাণিক কাহিনি। রাজ্জাককে আমি দেখলাম। তখন আমার মনে হলো, এতোদিন আমরা যাদেরকে নায়ক হিসেবে দেখে আসছি তাদের মধ্যে রাজ্জাক অনেক ভালো হবার কথা। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর মানুষের সাড়া দেখে মনে হলো, তারা এরকম নায়কই খুঁজছিলেন। অনবদ্য অভিনয়। মুক্তির আগে যেহেতু জহির রায়হান এই চলচ্চিত্রে শেয়ার রাখতে চাইলেন, সুতরাং আমরা ২৫ শতাংশ তাকে শেয়ার দিলাম। কিন্তু চলচ্চিত্রটি মুক্তির মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তিনি জানালেন, নাহ, আমি আর শেয়ার রাখতে চাই না। আপনি আমার শেয়ার কিনে নেন। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর সেটা জনসমুদ্রে পরিণত হলো এবং প্রচুর টাকা এনে দিয়েছিলো। তবে জহির রায়হান নিজের শেয়ারটি বিক্রি করে দেওয়ায় আমি বেশ দুঃখ পেয়েছিলাম।

চার.

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে কিসলুর প্রযোজনায় মুক্তি পেলো তিনটি চলচ্চিত্র। এগুলো হলো, নজরুল ইসলামের আলীবাবা, আমজাদ হোসেন ও নুরুল হক বাচ্চুর আগুন নিয়ে খেলা ও জহির রায়হানের সাহিত্যভিত্তিক চলচ্চিত্র আনোয়ারা আনোয়ারা নিয়ে জীবনভর গর্ব করে গেছেন কিসলু। চলচ্চিত্র নিয়ে কথা উঠলে তিনি প্রায়ই বলতেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আনোয়ারার অবস্থান সবসময়ই থাকবে। এটি একটি অনবদ্য চলচ্চিত্র এবং এখানে যারা অভিনয় করেছেন প্রত্যেকেই তাদের অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। আমি মনে করি আমি যতোগুলো চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি তার মধ্যে আনোয়ারার বিশেষ একটি স্থান রয়েছে। এর পরের বছরই কিসলু নতুন চমক দেখান। ওই বছর তার পরিবেশনায় মুক্তি পায় আরো তিনটি চলচ্চিত্র। এর মধ্যে জহির রায়হান প্রযোজিত আমজাদ হোসেন, নুরুল হক বাচ্চু ও মস্তফা মেহমুদ পরিচালিত দুই ভাই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। কারণ এটি ছিলো স্বল্প সময়ে নির্মিত প্রথম কোনো চলচ্চিত্র। কিসলুর ভাষায়,

সেই সময়ে আমরা যেহেতু পরিবেশক হিসেবে সবচেয়ে বেশি অগ্রণী ভূমিকা পালন করছিলাম, তখন আমাদের ঈদে নতুন চলচ্চিত্র মুক্তি দেওয়া অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সেবার যে চলচ্চিত্রটি আমরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আশা করছিলাম, তারা হঠাৎই জানালো, চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। তখন জহির রায়হানকে বললাম, আমাদের ভীষণ বিপদ। এ বছরে ঈদে স্টারের কোনো চলচ্চিত্র থাকবে না এটা কীভাবে হয়! আপনি কি এ বিষয়ে কোনো সাহায্য করতে পারেন? উনি বললেন, পারবেন। এক মাস সময় ছিলো হাতে। রোজার ঈদের পর আমরা আরম্ভ করলাম। জহির রায়হানের সার্বিক তত্ত্বাবধায়নে ১৯ দিনের মধ্যে চলচ্চিত্রটির কাজ সমাপ্ত হলো। একইসঙ্গে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাবার পর ব্যবসায়িকভাবে সফলও হয়।

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে কিসলুর পরিবেশনায় মুক্তি পায় সফদর আলী ভূঁইয়ার চম্পাকলি, রহিম নেওয়াজের শুয়ো রানি দুয়ো রানি। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্র বাবুল চৌধুরির আগন্তুক। যেটার মাধ্যমে কিসলুর হাত ধরে আজাদ রহমান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিসলু অনুমান করেছিলেন, আজাদ রহমানের যে প্রতিভা রয়েছে, সেটা যদি চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে এ খাতটি আরো সমৃদ্ধ হবে। আজাদ রহমানও সেই কথা রেখেছেন। তিনি চলচ্চিত্রটিতে এমন সুরের জাল সৃষ্টি করলেন, যা আগন্তুককে সমৃদ্ধ করেছে।

পাঁচ.

তখন সবে মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফিরেছেন চাষী নজরুল ইসলাম, সোহেল রানা ও খসরুসহ একদল তরুণ যুবক। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে তারা প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চায়; যার মূল উপজীব্যও থাকবে মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ, অভিনয়ে তাদের কারো কোনো অভিজ্ঞতা নেই। আবার নিজেদের টাকায় যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করবেন সেটাও নেই। পরে শেষমেশ উপায় না দেখে ইচ্ছা পূরণে তারা হানা দেয় ইফতেখারুল আলম কিসলুর কাছে। এই স্মরণীয় ঘটনাটি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গর্বের সঙ্গে বলে গেছেন কিসলু। তার ভাষায়,

আমি আমার অফিসে কাজ করছিলাম। হঠাৎ চাষী নজরুল, মাসুদ পারভেজ ও খসরু আমার অফিসে ঢুকলেন। আমার সামনের চেয়ারে বসে বললেন, আমরা একটা ছবি বানাতে চাই। আপনাকে পুরো অর্থ দিতে হবে! জিজ্ঞেস করলাম কী ছবি বানাবেন? বললেন, স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের উপর ছবি বানাতে চাই। আগে কখনো ছবি করেছেন? জানালেন না। আর্টিস্ট কে হবে সেটাও তারা বলতে পারলেন না। খসরু বললেন, আমিই আর্টিস্ট। চাষী বললেন, আমি পরিচালক। আমি বললাম, কোনো গল্প কিংবা স্ক্রিপ্ট আছে? তারা জানালেন, হয়নি, হয়ে যাবে! তবে আপনাকে তিন লক্ষ টাকা দিতে হবে! তারা একদিন সময় দিয়ে চলে গেলেন। পরদিন সকাল ১০ টায় নির্ধারিত সময়ে তারা আবার এলেন। বললেন, আপনার সিদ্ধান্ত কী?

অনেক ভাবার পর ওরা ১১ জন চলচ্চিত্রে পরিবেশক হিসেবে কাজ করার সম্মতি দিলেন কিসলু। তবে তাদের একরোখা ভাব দেখে শর্ত জুড়ে দিলেন তিনি। শর্ত অনুযায়ী, তিন লাখ টাকা তিনি তিন কিস্তিতে দিবেন। কারণ তাদেরকে প্রথম দেখায় কিসলুর ধারণা হয়েছিলো তিনি এই চলচ্চিত্রে যে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা আদৌ নির্মাণ হবে না। ফলে বিনিয়োগ করা টাকা পানিতে ফেলা হচ্ছে বলেই ভেবে নিয়েছিলেন কিসলু। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার ধারণাকেও ভুল প্রমাণ করে দিলেন চাষী নজরুল ইসলামরা। এক স্মৃতিচারণে কিসলু বলেন,

তারা টাকা নিয়ে চলে যাওয়ার পর হঠাৎ করে আরেকদিন উদয় হলেন। এসেই বলেন, পরের বাজেটের টাকা দেন। আমি বললাম ছবির কিছু শুটিং হয়েছে? বলল হয়েছে। আমিও লোকের কাছ থেকে খবর নেওয়ার চেষ্টা করলাম, আসলেই শুটিং হচ্ছে কিনা। তারা জানালেন, হচ্ছে। ফলে তাদেরকে আমি দ্বিতীয় কিস্তির টাকাও দিলাম। পরের বার যখন এলেন তখন জানালেন, তিন লাখ টাকায় তো ছবি হবে না। আমি বললাম, কতো হলে হবে? তারা জানালেন, পাঁচ লাখ টাকা দিলে হবে। ফলে আমি যেহেতু শুটিংয়ের নিয়মিত খবর পাচ্ছি, তাই তাদেরকে পাঁচ লাখ টাকা দিলাম। ছবির কাজ হলো, সেন্সরে পাশ হলো এবং ছবিটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মাণ করা এ চলচ্চিত্রটি অদ্ভূত সুন্দর হয়েছে। আমি তাদেরকে মোবারকবাদ দিবো নাকি অভিনন্দন জানাবো, সেটার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমার তো এটা ভালো লেগেছেই, আমি নিশ্চিত ছিলাম অন্যদেরও সেটা ভালো লাগবে এবং সেটাই হয়েছে। অনবদ্য এই চলচ্চিত্রটিকে আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র।

ওরা ১১ জন চলচ্চিত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাই মূল চরিত্রে অভিনয় করেন। একই সঙ্গে চলচ্চিত্রে যেসব অস্ত্র-গোলা-গ্রেনেড ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলো মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরার পর মজুদ থাকা গোলাবারুদ বলেই জানান চলচ্চিত্রটির প্রযোজক মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)। তার ভাষ্যমতে,

একটি দৃশ্যে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ দিয়ে একটি ঘর ধ্বংস করার প্রয়োজন ছিলো। সেই দৃশ্যে ঘরটি প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া সময় সেখানে একশো একটি স্টেনগান ছিলো। কিন্তু দৃশ্য ধারণ শেষে যখন অস্ত্র গণনা শুরু হলো, তখন একটি কম পাওয়া গেলো। একটি গান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। তখন তো সবার মাথা গরম। আমার মাথা গরম, খসরুর মাথা গরম। অনেক খোঁজ করার পরে হঠাৎ একজন সেই স্টেনগানটির পাওয়ার খবর দিলেন। আরেকটি ঘটনা হলো, সাভারের জয়দেবপুর অতিক্রম করার পরে কালিয়াকৈরের কড্ডায় একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিজ ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ই সেই ব্রিজটি অর্ধেক ভাঙ্গা ছিলো। বতর্মানে সেই ব্রিজটি নেই। আমরা সিনেমার একটি যুদ্ধের দৃশ্যের জন্য সেই ব্রিজটিকে প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ দিয়ে ধ্বংস করে ফেলি। ... বঙ্গবন্ধু সিনেমাটি দেখে আমাকে বলেছিলেন, ভালোই তো বানাইছিস ... ফিল্মেই থাক।

ছয়.

১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে কিসলুর পরিবেশনা ও এফ কবিরের পরিচালনায় মুক্তি পেলো আবেহায়াত। তবে আবেহায়াত স্টার ফিল্ম ডিস্ট্রিবিউটরের ব্যানারে নয়, মুক্তি পেলো ড্রিমল্যান্ড স্টার-এর ব্যানারে। এই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিলো, এখান থেকে যেসব চলচ্চিত্র নির্মাণ হবে, সেগুলোর লাভের একটা অংশ নির্মাতাদের দেওয়া হবে। নির্মাতাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সেই সাহসও দেখিয়ে গেছেন কিসলু। তবে ৯০ দশকের পর প্রযোজনা-পরিবেশনা থেকে দূরে সরে আসেন কিসলু। তিনি একের পর এক প্রেক্ষাগৃহ বিক্রি করে দেন। কারণ তিনি অনুভব করছিলেন, পরিবেশনা ও প্রযোজনার পরিবেশ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেকের মতো তিনিও চলচ্চিত্র ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকেন। তার অভিযোগ ছিলো,

আমরা যখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলম, তখন পরিবেশনা ও প্রযোজনা সম্পূর্ণ পৃথক দুটি অঙ্গন ছিলো। সম্প্রতি এ দুটিই একীভূত হয়েছে। ফলে প্রযোজনার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। একটা ছবি যদি মার খায়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যদি দায়িত্বটা ভাগাভাগি হতো, তাহলে আর্থিক দায়িত্বটাও ভাগাভাগি হতো। আমি মনে করি, বাংলাদেশে একটা ফিল্ম ফেডারেশন থাকা উচিত এবং পৃথক ফিল্ম ড্রিস্টিবিউটর থাকা উচিত। তাহলে ইন্ডাস্ট্রিতে স্থিতিশীলতা আসবে, বর্তমানে যেটার অভাব রয়েছে। দর্শক সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। কারণ দর্শকের কাছে আরো অনেক মিডিয়াম রয়েছে। টেলিভিশন একটি বড়ো আকর্ষণ। আমার মনে হয়, ক্রমশই টিভির প্রভাব আরো বাড়বে এবং ফিল্মের সঙ্গে টেলিভিশনের প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে। এখন যদি আমরা উৎসাহী, প্রতিভাবান ও পরিশ্রমী পরিচালক ও প্রযোজক না পাই, তাহলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ক্রমশই বিপদ সঙ্কুল হয়ে পড়বে।

দীর্ঘ এ চলচ্চিত্রিক জীবনে কিসলুকে সহায়তা করে গেছেন তার ব্যবসায়িক অংশীদার ও সহকর্মী এ ইউ এম খলিলুল্লাহ ও আব্দুল মুহিত। একসঙ্গে ৫০ বছর কাজ করার এক বিরল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তারা। তবে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিসলুকে সবসময় সামনে রেখেছিলেন তারা। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে প্রথম নারী পরিবেশক ও প্রেক্ষাগৃহের মালিক মালতি দের বড়ো সন্তান অশোক কুমার দে বলেন, দুষ্টু ছেলে মিষ্টি মেয়েসাবাস বাঙালি চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় ফিল্ম ও অর্থ সঙ্কটে পড়ে ইফতেখারুল আলমের কাছে আমার মা সহায়তা চান। তিনি জার্মান কোডাক ফিল্মের এজেন্ট হওয়ায় কাউকে বাকিতে ফিল্ম না দেওয়ার অভিযোগ ছিলো। কিন্তু তিনি আমাদেরকে সাড়ে তিন লাখ টাকার ফিল্ম কোনো বাক্য ব্যয় ছাড়াই দিয়েছিলেন। একইসঙ্গে আশ্বস্ত করেছিলেন ফিল্মের জন্য কোনো চিন্তা না করার।

সাত.

ইফতেখারুল আলম কিসলু মৃত্যুবরণ করেছেন এখনো এক বছরও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মলিন হতে শুরু করেছেন তিনি। কিসলু চলচ্চিত্র নিয়ে প্রায় পুরো জীবন কাটিয়ে দিলেও, তিনি কী কী কাজ করে গেছেন সেটাই জানে না কেউ। এটা কেবল সাধারণ মানুষ নয়, জানে না দেশের বাঘা বাঘা চলচ্চিত্র সমালোচক থেকে শুরু করে তার অনেক সহকর্মীও! সবার কাছ থেকেই গড় উত্তর--তিনি বড়ো ভালো লোক ছিলেন, চলচ্চিত্রের জন্য তার অনেক অবদান আছে; আরো কতো কী! কিন্তু হাতেগোনা কয়েকটি তথ্য ছাড়া তার সম্পর্কে কেউই বিস্তারিত কিছু বলতে পারেনি।

অনেকে আবার বিশেষ কিছু মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করার পরামর্শ দিলেও তাদের কাছে দিনের পর দিন কল করে, এমনকি  খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের আজীবন সদস্য থাকলেও তার সম্পর্কে উল্লেখ করার মতো কোনো তথ্য সেখানকার ওয়েব সাইটেও নেই। যদিও সেখানকার শিক্ষকদের সম্পর্কে চুলচেরা তথ্য রয়েছে। কিসলু সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি সভাপতির দায়িত্বে থাকা ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কিংবা বাংলাদেশে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট কোনো সমিতির ওয়েব সাইটেও।

অন্যদিকে ইন্টারনেটে ইফতেখারুল আলম কিসলু সম্পর্কে নানাভাবে সার্চ করলেও কেবল ঘুরেফিরে তার মৃত্যুর সংবাদই সামনে আসে। একজন মানুষ জন্মের পর জহির রায়হানের সঙ্গমসহ কয়েকটি চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ করলেন, পাশাপাশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করার পর মারা গেলেন। সবমিলে এটুকু ছাড়া তার সম্পর্কে আর কোনো তথ্যই মেলে না! অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষে ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে চ্যানেল আইয়ে সম্প্রচারিত চলচ্চিত্রবিষয়ক অনুষ্ঠান আমার ছবিতে তার দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের হদিস মেলে। সাক্ষাৎকার দুটি না থাকলে হয়তো এ প্রবন্ধটি দাঁড় করানো আরো দুরূহ হয়ে পড়তো।

লেখক : তাসনিয়া মিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দুই বছর যাবৎ চাকরি খুঁজছেন।

tasniyaminnimcj@gmail.com

https://www.facebook.com/tasniya.minni


তথ্যসূত্র

1. https://bangla.bdnews24.com/glitz/article1258164.bdnews; retrieved on: 10.10.2019

2. https://www.youtube.com/watch?v=q4i4eA-2vwE; retrieved on: 10.10.2019

পাঠ সহায়িকা

এই প্রবন্ধটি রচনার ক্ষেত্রে ইউটিউবে পাওয়া ইফতেখারুল আলম কিসলুর এই সাক্ষাৎকারটির সর্বাত্মক সহায়তা নেওয়া হয়েছে, যে কেউ চাইলে এই লিঙ্কে ঘুরে আসতে পারে--https://www.youtube.com/watch?v=IurXR9PYesE; retrieved on: 10.10.2019


বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন