এ কে এম কৌশিক আহমেদ
প্রকাশিত ০৭ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ঠোঁটের আড়ালে গায় আরো দুটো ঠোঁট
চলচ্চিত্র-সঙ্গীতে ভাস্বর শাহনাজ ও সুবীর
এ কে এম কৌশিক আহমেদ

চলচ্চিত্র, সঙ্গীত ও শিল্পী
নির্বাক চলচ্চিত্রে পর্দার আড়ালের সেই কট কট, ঘট ঘট শব্দ একটা সময় পর বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই বিরক্তি থেকে মুক্তির প্রয়াসেই চলচ্চিত্রে প্রথম সঙ্গীতের ব্যবহার। অথচ বর্তমানে সেই সঙ্গীত ব্যতীত চলচ্চিত্র মানুষের কাছে কল্পনাতীত। একটি স্বার্থক চলচ্চিত্রে সংলাপ, সিকোয়েন্স, দৃশ্য যতোখানি গুরুত্ব বহন করে; সঙ্গীতও তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব বহন করে। তার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে। চলচ্চিত্রে যেভাবে কোনো দেশের সংস্কৃতি, সমাজ-বাস্তবতা, অভ্যাস, আচরণ ইত্যাদি স্থান করে নেয়, তেমনই সেগুলোর সঙ্গে সঙ্গীতও প্রযুক্ত থাকে। গানপাগল মানসিকতাই এদেশের মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। বাস্তবিক জীবনে প্রত্যেক বিষয়ের সঙ্গে গান যেমন ওতোপ্রোতভাবে জড়িত, তারই প্রকাশ ঘটে চলচ্চিত্রেও। আর চলচ্চিত্রের ভিতরে সঙ্গীত, আবহসঙ্গীতের রূপ নিয়ে দৃশ্য, সিকোয়েন্স এবং সংলাপকে রঞ্জিত করে তোলে।
চলচ্চিত্রে গীতিচিত্র অংশ বছরের পর বছরের দীর্ঘ গল্পকে সংক্ষিপ্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু তাই নয়, চলচ্চিত্রের গল্পের স্বার্থকতা, দর্শক ও শ্রোতা চিত্তের চাওয়া-পাওয়ার স্বার্থকতা চলচ্চিত্রের গানের মধ্যেই যেনো প্রাণ খুঁজে পায়। চলচ্চিত্রে পর্দার আড়াল থেকে যে মানুষগুলো কণ্ঠ দিয়ে নায়ক-নায়িকাকে গীতিচিত্র অংশে সহযোগিতা করে, তাদের প্লেব্যাক সিঙ্গার বলা হয়। এই প্লেব্যাক সিঙ্গাররাই চলচ্চিত্রের গানের প্রাণ। তাদের কণ্ঠ ছাড়া চলচ্চিত্রের গানের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় না। প্রেক্ষাগৃহের পর্দায় তাদের কণ্ঠ নায়ক-নায়িকার ঠোঁটের মধ্য দিয়ে যখন দৃশ্যায়িত হয়; তখন দর্শক মেতে ওঠে, কখনো কখনো সেই গানের ভিতর দিয়েই চলচ্চিত্রের দৃশ্য কল্পনায় আস্বাদন করে। কিন্তু পর্দার আড়ালের কণ্ঠশিল্পী পর্দার আড়ালেই রয়ে যায়। পর্দার আড়ালের সেই কণ্ঠশিল্পীদের কজনইবা মনে রাখে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জানা হয় না পর্দার আড়ালের সেই কণ্ঠশিল্পী কে? অথচ এরা ব্যতীত চলচ্চিত্র পূর্ণতা পায় না। বাংলা চলচ্চিত্রে এ রকম অসংখ্য কণ্ঠশিল্পী আছে, যাদের গানে চলচ্চিত্রশিল্প পূর্ণতা পেয়েছে। তেমনই দুজন কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও সুবীর নন্দী। যাদের অসংখ্য কালজয়ী গানে চলচ্চিত্রশিল্প কানায় কানায় পূর্ণ। এ দুজন খ্যাতিমানের সঙ্গীতকর্ম থেকে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠশিল্পীদের অনেক কিছুই নেওয়ার আছে।
চলচ্চিত্রে সঙ্গীতের গুরুত্ব
নির্বাক চলচ্চিত্রের সূচনার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রশিল্পের যাত্রা শুরু হলেও নির্বাক ও সবাক দুই চলচ্চিত্রের মধ্যেই সঙ্গীতের ব্যবহার সেই গোড়া থেকেই ছিলো। প্রেক্ষাগৃহে শিল্পীদের দিয়ে গান করানো এবং পর্দার নেপথ্যে যন্ত্রসঙ্গীতের সুর কিংবা অভিনয়শিল্পী বা বিবেকের নিরিখে জীবন্ত গানের সুর ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাই বলে দেয় চলচ্চিত্রে সঙ্গীত কতোখানি গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে সবাক চলচ্চিত্র অতঃপর চলচ্চিত্রে সংলাপ সংযোজন হলেও গান সংযোজন সম্ভব হয়নি। কিন্তু চলচ্চিত্রে গান সংযোজনের প্রয়োজনীয়তা চলচ্চিত্রনির্মাতা এবং কলাকুশলীদের উদ্বুদ্ধ করে। ফলে চলচ্চিত্রে গান যুক্ত করার অকৃত্রিম প্রচেষ্টা, জ্ঞান-বিজ্ঞান তথা প্রযুক্তির উৎকর্ষে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের শেষ পর্যায়ে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক বা চিত্রের সাহায্যে গান সংযুক্ত হয়। এই ধারাবাহিকতায় চলচ্চিত্রশিল্পে গান নিজস্ব অবস্থান পাকাপোক্ত করে নেয়। এদেশের সঙ্গীতময় সংস্কৃতির কারণেই সঙ্গীত ব্যতীত চলচ্চিত্র কল্পনাতীত। কারণ চলচ্চিত্র বাস্তবের কাছাকাছি যেতে চায়। চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার অনেক সময় সংলাপের থেকেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাংলা চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার সম্পর্কে কমল কুমার মজুমদারের ভাষ্য,
আমাদের দেশের ছবিতে যে গান থাকবে এ আর এমন আশ্চর্য কি। আমাদের দেশের ছবিতেই তো গান থাকবে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের ছবিতেই [আমাদের] মতো গান নেই। তারা গানের জন্য, বিশেষ করে গানের জন্যই, আলাদা করে ছবি তোলে, তার নাম দেয় ‘গীতিচিত্র’। তারা গান বলতে বোঝে যতো চটুল আনন্দের রূপকে। আমাদের গানে আনন্দের চটুলতাও আছে, গভীরতাও আছে। আবার বেদনার অতলস্পর্শী স্তব্ধতাও আছে সুরে। তখন অবাক হয়ে কথা হারায়। তাই আমরা যেখানে সেখানে যখন তখন কথার আগে গান খুঁজে পাই, কিছু বা বলি, কিছু বা শুনি গানে। আমাদের ছবির এটা নিজস্ব রূপ, একমাত্র রূপ বলতে পারি, যাকে কেন্দ্র করে আমরা ডুবে থাকতে পারি। হোক না হাসির ছবি, হোক সুখের কী দুঃখের, গান আছে কী না জানতে চাই সবার আগে আমরা। পরিচালনার অভাব হলে ক্ষমা করি, ফটোগ্রাফি আশ্বর্য না হলেও বসে থাকি; তারপরেও একটা গানও যদি ভালো না হয়, সহ্য হয় না আমাদের। এ স্বকীয় রূপটাই আসলে আমাদের ছবির প্রাণ।১
বাংলা চলচ্চিত্রের বিভিন্ন সিকোয়েন্স গানের প্রয়োজনীয়তা দাবি করে। দাবি করা সেই গানের বাণী এবং সিকোয়েন্সের সঙ্গে সমন্বয় করে চলচ্চিত্রের দীর্ঘ গল্পকে সংক্ষেপতর করে। সুরের সমন্বয়, আনন্দ-হাসি-কান্না বিভিন্ন সিকোয়েন্সকে রঞ্জিত করে। এভাবেই চলচ্চিত্র অবয়বে গান প্রতিষ্ঠা করে প্রাণ। বাংলা চলচ্চিত্রে গান সংযুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা এবং কৌশল সম্পর্কে ঋত্বিক ঘটক বলেন,
সংগীত এটি ছবিতে একটি বিপুল অস্ত্র, সময় সময় ব্রহ্মাস্ত্র। সংগীতের মধ্যে দিয়ে আমরা অপর একটি স্তরে সমান্তরালভাবে ছবির বক্তব্য প্রকাশ করার চেষ্টা করি। নানা রকম আছে যেমন ধরুন সংগীতের পুরো দৃশ্যটিকে মনের মধ্যে গেথে নিয়ে তার প্রথম সুরটিকে বসানো হয়। ... শেষ পরিণতিতে সেই বিশিষ্ট সুরটিই বক্তব্যে দ্যোতক রূপে কীভাবে ব্যবহার করা হবে সেটা ভেবে সুর তৈরী করা। ... সংগীত অত্যন্ত সংকেতবহ। সেই সংকেত স্বাভাবিকভাবে চিত্র স্রষ্টার। কাজেই তা ব্যবহৃত হয় বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে। তার পেছনে একটা সচেতন নক্সা থাকে।২
যা বাংলা চলচ্চিত্রে গানের বৈচিত্র্য সংযুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। আর এই গুরুত্ব কিংবা প্রয়োজনীয়তার মধ্য দিয়ে প্লেব্যাক সিঙ্গার বা নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী চলচ্চিত্রে গুরুত্বের সঙ্গে অসামান্য অবদান রাখে। বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পে গানে অসামান্য অবদান রাখার মাধ্যমে যারা নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে তাদের মধ্যে সদ্য প্রয়াত শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও সুবীর নন্দী চিরস্মরণীয়।
কিংবদন্তির আবির্ভাব
শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পিছনে বলতে গেলে পারিবারিক সাঙ্গীতিক পরিবেশ অনেকটাই ভূমিকা পালন করে। শাহনাজ বেগম ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এম ফজলুল হক ও মা আসিয়া হক। শাহনাজের ভাই আনোয়ার পারভেজ সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক এবং আরেক ভাই জাফর ইকবাল ছিলেন চলচ্চিত্রাভিনেতা ও গায়ক। শাহনাজ বিখ্যাত গজলশিল্পী মেহেদী হাসানের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। পরিবারের সাঙ্গীতিক আবহের সূত্র ধরেই হয়তো শাহনাজের চলচ্চিত্রে আবির্ভূত হওয়া সহজ হয়েছিলো। কিন্তু এ রকম মন্তব্য একজন শিল্পীকে খানিকটা অবমূল্যায়ন করে। পারিবারিক পরিবেশ তার শিল্পী মনন তৈরিতে সাহায্য করেছে হয়তো, কিন্তু নিজ মেধা, মনন, যোগ্যতার জোরেই তিনি চলচ্চিত্রশিল্পে প্রদীপের মতো আবির্ভূত হন।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেন। এত কম বয়সে বাংলাদেশের সংগীত জগতে কেউ প্লে-ব্যাক করেছেন কিনা আমার জানা নেই। জীবন্ত কিংবদন্তি রুনা লায়লা ১২ বছর বয়সে একটি শিশু শিল্পীর চরিত্রের জন্য প্লে-ব্যাক করেন। কিন্তু এত অল্প বয়সেও শাহনাজের গলার পরিপক্কতায় মুগ্ধ হয়ে সংগীত পরিচালক নায়িকার জন্যই প্লে-ব্যাক করান তাকে দিয়ে।৩
সঙ্গীতের শুদ্ধ তালিম, সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব, সামগ্রিক অর্থে সঙ্গীতের পারঙ্গমতায় তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আবির্ভূত হন বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পে। তার কণ্ঠ যেমন গৌরবে অসংখ্য চলচ্চিত্রপিপাসু, সঙ্গীতপিপাসুদের চিত্তের স্মরণ কোঠায় জায়গা করে নিয়েছে, তেমনই টানা ৫০ বছর তিনি গান করেছেন। জীবনের শেষ বেলায় এসে না জানা কোনো অভিমান, না সত্যি ধর্ম-কর্মের ব্যস্ততায় ছয় থেকে সাত বছর গান ছেড়ে দিয়েছিলেন এই গুণী শিল্পী। তা আজও রহস্যময়। লাখো দর্শকের কাছে সেই রহস্যময়তা রেখেই ২৩ মার্চ ২০১৯ চির বিদায় নেন শাহনাজ। গুণী এই শিল্পী ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে ছুটির ফাঁদে চলচ্চিত্রে গান করে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এছাড়াও ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে অর্জন করেন একুশে পদক।
একই বছরে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সঙ্গীতাঙ্গন তথা চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে চির বিদায় নেন আরেক কিংবদন্তি শিল্পী সুবীর নন্দী। ৭ মে ২০১৯ তিনি পরপারে পাড়ি জমান। সঙ্গীতাঙ্গন ও চলচ্চিত্রে আশীর্বাদ হিসেবে জন্ম হয়েছিলো সুবীর নন্দীর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সঙ্গীতপ্রেমী বাবা সুধাংশু নন্দী ও সুর পূজারী মা পুতুল রানীর স্নেহ-মমতায় বেড়ে ওঠা সুবীর শারীরিকভাবে যেমন পরিপুষ্ট হয়ে বেড়ে উঠেছেন, তেমনই মানসিক সৃজনশীলতা ও সঙ্গীতেও পরিপুষ্ট হয়েছেন। ওস্তাদ বাবর আলীর কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম তাকে সুশিক্ষিত সচেতন সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে গড়ে উঠতে ভূমিকা রাখে। মূলত পারিবারিক চর্চা ও সঙ্গীত প্রতিভার সমন্বয় ঘটে তার ব্যক্তিত্বে; আর এরই নির্যাস তার সঙ্গীত। আর এর মধ্য দিয়েই তিনি বাঙালি কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য গানের স্বার্থক প্লেব্যাক সিঙ্গার সুবীর নন্দী। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার প্লেব্যাকের শুরু। সুবীর নন্দীর চলচ্চিত্রের গান সম্পর্কে সব্যসাচী দাশ বলেন, ‘একটা সময় ঢাকাই সিনেমার গান ছিল অগণিত সংগীতপ্রেমীর ভীষণ পছন্দের। এর পেছনে অনেক শক্ত কারণও ছিল। বিশেষ করে যে সময় বাংলা সিনেমার সোনালি যুগ, সে সময় সুবীর নন্দীর মতো উচ্চমার্গীয় শিল্পীর নিয়মিত গান করা শ্রোতার মুগ্ধ হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল বৈকি।’৪
সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য সুবীর নন্দী একুশে পদক, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া চলচ্চিত্রগুলো হলো--মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫)।
চলচ্চিত্রের গান বৈচিত্র্যে শাহনাজ রহমতুল্লাহ
বাংলা চলচ্চিত্রে নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে শাহনাজ রহমতুল্লাহর গান বৈচিত্র্য উচ্চমার্গীয়। চলচ্চিত্র কিংবা এর বাইরে যেকোনো গান যথাযথ পরিবেশন করা, অন্যভাবে বললে গানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে দুরুহ বিষয়। প্রাণহীন গান মানুষের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না। সেক্ষেত্রে সুর ও সুরের উঁচু-নিচু স্বরের প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্প যেমন মানুষের ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রকাশ করে, অনুরূপভাবে একজন সঙ্গীতশিল্পীর ব্যক্তিত্বও তার কণ্ঠ নিসৃত গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। সুরের বিশেষত্ব নমনীয়তা, উপাসনা, আত্মসর্মপণ এবং তার সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করার মধ্যে নিহিত। সুরের এমন বিশেষত্বকে ধারণ ও লালন করেই শাহনাজ রহমতুল্লাহ জীবনের প্রত্যেকটি গানে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। তার মাধুর্যপূর্ণ কণ্ঠ ও সুরের সাবলীলতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের অভিনয়শিল্পীরা ঠোঁট মিলিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের গানে শাহনাজ অবিচ্ছেদ্য পাঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা পেলেও, চলচ্চিত্রের গানের জনপ্রিয়তায় তার কোনো কমতি হয়নি। দেশগান, আধুনিক গান যাই বলি না কেনো, সারা জীবনের সাঙ্গীতিক বৈচিত্র্য প্রকাশ হয়েছে তার চলচ্চিত্রের গানে।
ক. দেশাত্মবোধক গান
ঢাকাই চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশাত্মবোধক বেশকিছু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়। সেগুলোর বিশেষত্ব বজায় রেখে শাহনাজ বেশকিছু প্লেব্যাক করেন। এসব গানের মাধ্যমে শ্রোতা মনে জায়গা করে নেন। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র আবার তোরা মানুষ হ। এটি পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতায়োজন করেন খান আতাউর রহমান নিজে। এই চলচ্চিত্রে শাহনাজ একটি গানে কণ্ঠ দেন। তার এই গানটি বাঙালির রন্ধ্রে জায়গা করে নিয়েছে। গানটিতে কী আছে দেখা যাক,
এক নদী রক্ত পেরিয়ে
বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা
তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না ॥
গানের কথা ও সুরের মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ না করলে কোনো শিল্পী গানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। খান আতা যে চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে গানটি রচনা ও সুর করেন; সেই চেতনা কোন শিল্পীর মধ্যে না থাকলে তার দ্বারা এই গানের প্রাণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। অস্থিতিশীল একটা পরিস্থিতির সমাপ্তির পর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর নিমিত্তেই গানটির সৃষ্টি। শাহনাজের কণ্ঠে সেই কৃতজ্ঞতা জানানোর আকুতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার কণ্ঠ যেনো অকুতোভয় বিজয়ী মুক্তি সেনানী সন্তানকে মাতৃস্নেহে অভিবাদন জানাচ্ছে।
২০০৫-এ বি বি সি জরিপে শ্রেষ্ঠ ২০টি গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ গাওয়া চারটি গান ছিলো। এই চারটি গানই দেশাত্মবোধক--‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা’, ‘একবার যেতে দেনা আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ ইত্যাদি। দেশাত্মবোধক গানের শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে স্বাভাবিকভাবে অনুমান হয়, কতোটা দেশপ্রেম নিয়ে তিনি গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।
খ. পাশ্চাত্য সুরের সম্মিলন
বাংলা গানের ধারায় বিদেশি সুরের প্রভাব, কখনো কখনো গানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। চলচ্চিত্রের গানের বৈচিত্র্যে পাশ্চাত্য সুরের প্রভাব দর্শক-শ্রোতাকে আপ্লুত করেছে। এ ধরনের গানে শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠের থ্রোয়িং, বিশেষ করে সুরের রেশ এবং পাশ্চাত্য তাল লয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা এক অসাধারণ আবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ঘুড্ডি চলচ্চিত্রে কাওসার আহমেদ চৌধুরীর কথায় এবং লাকী আখন্দের সুরে তিনি কণ্ঠ দেন--
ঘুম ঘুম ঘুম
চোখে দেয় চুম
এই মন বোঝেনা তো কেউ
এই যৌবন যেন মৌবন
মধুকর খোঁজেনাতো মন ॥
গানটিতে ওয়েস্টার্ন ড্রামবিট ব্যবহার করা হয়েছে; যার সঙ্গে শিল্পীর গায়কীর সমন্বয় আধুনিক গায়নরীতির এক বিস্ময়কর উদাহরণ। আরো বিস্মিত হওয়ার মতো বিষয় হলো, বর্তমানে যে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের প্রভাব সুরে-বেসুরে ছেঁয়ে গেছে; শাহনাজ ৩৫-৩৬ বছর আগে সেই সুরের দক্ষতা ও পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন। সঙ্গীতে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বিষয় হলো বাণীর সঙ্গে সুর ও গায়কীর সমন্বয়। এই গানটিতে, ‘এই যৌবন যেন মৌবন’ কথাগুলোতে শিল্পীর আবেদনময়ী কণ্ঠ নিঃসরণের বিষয়টি একটি নান্দনিক প্রয়োগ। কণ্ঠের হাঁচকি টোন, শ্রোতার মনকে আন্দোলিত করে।
গ. রাগাশ্রয়ী সুরের বৈচিত্র্য
শত শত বছরের সঙ্গীত ধারায় রাগ-রাগিনীর ব্যবহার হয়েছে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে। দেশাত্মবোধক ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার নিরিখে শাহনাজ রহমতুল্লাহর রাগ-সঙ্গীতের জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তিনি বাংলা গান তথা বাংলা চলচ্চিত্রে যে সব গানে কণ্ঠ দিয়েছেন, সেসব গানের সাঙ্গীতিক অলঙ্কারে রাগ-রাগিনীর শুদ্ধাশুদ্ধি ভাব প্রকাশ পেয়েছে। ফলে চলচ্চিত্রের গানে উচ্চমার্গীয় এক নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। যে কারণে দর্শক অসচেতনভাবেই তার কণ্ঠের মাধুর্যে আপ্লুত হয়েছে। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া পিচঢালা পথ-এ ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’ প্লেব্যাক করেন শাহনাজ।
ফুলের কানে ভ্রমর এসে
চুপি চুপি বলে যায়
তোমায় আমার সারাটি হৃদয়
নীরবে জড়াতে চায় ॥
কথা : কে.জি. মুস্তফা; সুরকার : রবিন ঘোষ; তাল : দাদরা; রাগ : ভৈরবী
গানটি ভৈরবী রাগের আশ্রয়ে সুরারোপিত হয়েছে। এই গানে শাহনাজ প্রথম বাণীতেই ‘ফুলের কানে’তে ষড়জ থেকে একদম মধ্য সপ্তকের কোমল ধৈবতের ব্যবহার অসাধারণভাবে দেখিয়েছেন। এই সুর শুনে মনে হতে পারে পাশাপাশি ব্যবহৃত কোনো স্বর; কিন্তু মধ্য সপ্তকের ষড়জ থেকে মধ্যম সপ্তকের কোমল ধৈবতের স্বাভাবিক ব্যবহার শিল্পীর অপূর্ব সাঙ্গীতিক কৌশল। মূলত মেহেদী হাসানের শিষ্যত্ব পাওয়ার কারণে শাহনাজের গায়নরীতিতে তার প্রভাব কিছুটা হলেও লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্রের গানে রাগের প্রভাব এবং তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিল্পীর অসাধারণ গায়কী এতে নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছিলো। অথচ চলচ্চিত্রের গানের সে জৌলুস এখন শূন্যের কোঠায়। তবে শাহনাজ তার সুমিষ্ট কণ্ঠ ও সাঙ্গীতিক কৌশল মিলিয়ে চলচ্চিত্রের গান বৈভবে অসাধারণ যে সৃষ্টি রেখে গেছেন, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ এ গানটি।
ঘ. চলচ্চিত্রের গান
শাহনাজ মূলত আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবেই সর্বজন পরিচিত। তবে দেশাত্মবোধক গানে তার অবদান এবং খ্যাতি উচ্চ স্থানে। কিন্তু বাংলা রোমান্টিক প্রেমের গানে তার কণ্ঠের ব্যাপ্তি ও আলঙ্কারিক প্রয়োগ সত্যি নান্দনিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। এক্সপ্রেশনের সঙ্গে কণ্ঠেরও বিভিন্ন এক্সপ্রেশন থাকে; কণ্ঠের সেই ব্যাপারগুলো শাহনাজের কণ্ঠে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠতো। যে কারণে চলচ্চিত্রের সিকোয়েন্সের সঙ্গে সমন্বয় রেখে তিনি যেকোনো গানে খুব সাবলীলভাবে কণ্ঠ দিতে পারতেন। চলচ্চিত্রে বিশেষ করে প্রেমের সিকোয়েন্সে গানে কণ্ঠের ব্যাপ্তির সঙ্গে সিকোয়েন্সের স্বচ্ছ সমন্বয় হতো। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে নারায়ণ ঘোষ মিতার নীল আকাশের নীচেতে শাহনাজ অসাধারণ এক প্রেমের গানে কণ্ঠ দেন--
প্রেমের নাম বাসনা
সে কথা বুঝিনি আগে
দুটি প্রাণের সাধনা
তাইতো মধুর লাগে
কথা : মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; সুর : সত্য সাহা; তাল : কাহারবা; শিল্পী : শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও মাহমুদুন্নবী
৬০-এর দশকে চলচ্চিত্রে যতো জনপ্রিয় রোমান্টিক গান হয়েছে, তার মধ্যে এই গানটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। গানটি এখনো সঙ্গীত পিপাসু শ্রোতাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। গানটির কথা চঞ্চলা প্রেম উদ্রেকের সুর হওয়ার ভাব প্রকাশ করলেও স্থির সুরের মাধ্যমে তা পাত্র-পাত্রীর মধ্যে ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলে। সহশিল্পী মাহমুদুন্নবীর সঙ্গে দ্বৈত কণ্ঠে ব্যক্তিত্বপূর্ণ প্রেমের অভিব্যক্তি প্রকাশে শাহনাজের ভূমিকা ছিলো অনবদ্য।
ঙ. লোকজ সুরের আবেশ
শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠ বৈচিত্র্যপূর্ণ, যে কারণে যেকোনো ধারার গানই তার সঙ্গে মানিয়ে যেতো। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে দীলিপ সোমের পরিচালনায় এবং খান আতার চিত্রনাট্য ও সংলাপে মুক্তি পায় সাত ভাই চম্পা চলচ্চিত্রটি। আমির আলীর সঙ্গীতায়োজনে এতে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে শাহনাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ চলচ্চিত্রে শাহনাজ ‘শোনেন শোনেন জাহাপনা’ শিরোনামে গানটির মাধ্যমে শ্রোতাদের সামনে ভিন্ন স্বাদের এক কণ্ঠ উপস্থাপন করেন,
শোনেন শোনেন জাহাপনা
শোনেন রানী ছয় জনা
শোনেন বলি নতুন করে
পুরান ঘটনা ॥
এক যে ছিল বাদশা
তাহার ঘরে ছিল সাতটি রানী
ছোট রানী মা হইবে
লোকে করে কানাকানি
ছয় রানী কুবুদ্ধি করে
বাদশাহ্ তাহা জানে না
শোনেন বলি নতুন করে
পুরান ঘটনা ॥
এই গানটি মূলত গল্প অবলম্বনে; ফলে লোক-কেচ্ছা বা জারির সুরে প্রভাবিত। মূলত লোক-কেচ্ছা বা জারি অল্প সংখ্যক স্বরের রচনায় সুরের প্রকাশ হয়; তেমনই এই গানে অনেক বড়ো গল্পকথা বা কাহিনি স্বল্প সংখ্যক স্বর রচনায় প্রকাশ হয়েছে। ফলে লোকজ সুরের বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে। গানের স্বর বিন্যাসটা এমন--
স্থায়ী
+ ০ + ০
পাপা পাপা -আ। পাদা পাদা পামা। পাদা পামা জ্ঞা-আ। রা-আ জ্ঞামা পা-আ।
শোনেন শোনেন ০। জাহা পনা ০ ০। শোনেন বলি ০ ০। ঘ ট না ০ ০।
জ্ঞা রাসা ন্আ -আ। সাসা মামা -আ। জ্ঞামা জ্ঞারা সা-আ। -আ-আ -আ ।।
শোনেন বলি ০ ০। নতুন করে ০। পুরান ঘট না ০। ০ ০ ০।।
অন্তরা
+ ০ + ০
পাপা পাধা -আ। নানা র্সার্সা -আ। নার্সা ন্ধামা -আ। পাপা পাপা -আ।।
এক যে ছিল ০। রানী তাহার -০। ঘরে ছিল ০। সাতটি রানী -০।।
পাপা পাপা -আ। পাদা পাদা পামা। মাপা মাজ্ঞা -অ। রাজ্ঞা মাপা -আ।।
ছয় রা নী কু -০। বুদ্ধি করে ০ ০। বাদশা তাহা -০। জানে না ০ -০।।
গানটিতে এমন স্বর বিন্যাসের মাধ্যমে পুরো গানের সুরের প্রকাশ হয়েছে। শাহনাজ উঁচুমানের বোদ্ধা শিল্পী হলেও এমন সহজ সুরের গানেও সাবলীলভাবে কণ্ঠের প্রয়োগ করেছেন।
চলচ্চিত্রের গান বৈচিত্র্যে সুবীর
পারিবারিকভাবে সঙ্গীত চর্চা ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম সুবীর নন্দীকে নানা দিক থেকেই সমৃদ্ধ করে। সিলেট বেতার কেন্দ্রে নজরুল সঙ্গীতে অডিশনের মাধ্যমে তিনি তালিকাভুক্ত হন। বৈচিত্র্যময় এই সাঙ্গীতিক পরিবেশ তাকে সুরের বৈচিত্র্য ধারায় প্রবাহিত করে। যার ফলে তার সঙ্গীত সম্ভার বাংলা চলচ্চিত্রের গানের মানকে উচ্চ শিখরে উন্নীত করে। সুবীরের গানে মিশ্র প্রভাব লক্ষ করা যায়। যেগুলো তার সামগ্রিক সঙ্গীত ধারার বৈচিত্র্য প্রকাশ করে। সুবীর আধুনিক গানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, আধুনিক ধারার লোক-সুরেও তার বিশেষ ধরনের সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়। লোক সুরের সংমিশ্রণ সাধারণ দর্শকের কাছে অত্যন্ত চমকপ্রদভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ধারায় তিনি এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।
ক. অত্যাধুনিক আধুনিক গানের স্বাদ
ধারাবাহিক সঙ্গীত চর্চার মধ্য দিয়ে সুবীর শিল্পী হয়ে উঠেছেন। তিনি একাধারে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত, পল্লীগীতি, ভজন ও কীর্তন করলেও পরবর্তী সময়ে আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তার আধুনিক গানের ধারার সঙ্গে অত্যাধুনিকতার একটা বিশেষ ঢঙ লক্ষ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে খান আতার চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় দিন যায় কথা থাকে চলচ্চিত্রে ‘দিন যায় কথা থাকে’ শিরোনামে গানটির কথা বলা যেতে পারে।
দিন যায় কথা থাকে
সে যে কথা দিয়ে রাখলোনা
ভুলে যাবার আগে ভাবলো না
সে কথা লেখা আছে বুকে ॥
গানটিতে কাহারবা ৮ মাত্রা তালের ব্যবহার হলেও তা ওয়েস্টার্ন ড্রামবিটের মাধ্যমে গীত হয়েছে। ছন্দের নতুনত্ব ও অসাধারণ থ্রোয়িং-এর মাধ্যমে এতে অত্যাধুনিক এক নতুন স্বাদের সঞ্চার হয়েছে। তাছাড়াও গানের ভিতরে নতুন নতুন সব অত্যাধুনিক সঙ্গীতযন্ত্র যেমন, বেইজ গিটার, লিড গিটার, অক্টোপ্যাড, ড্রামস, কিবোর্ড ও বঙ্গ ইত্যাদির ব্যবহার গানটিকে অত্যাধুনিক করতে যথেষ্ট সহযোগিতা করে। যার ফল হিসেবে তার গানের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রেও নতুন ধারা প্রযুক্ত হয়।
খ. শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বাদ
সুবীর আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে দর্শক মনে জনপ্রিয়তার আসন গড়লেও; শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ভাবধারা ও অলঙ্কারের শুদ্ধাশুদ্ধি প্রয়োগ করেছেন। যেগুলো তার গানের মধ্যে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এ কথা ঠিক যে, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম ব্যতীত কেউ পূর্ণাঙ্গ শিল্পী হতে পারে না; সুবীর তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে একনিষ্ঠভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম সুবীরকে সুশিক্ষিত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। ফলে একনিষ্ঠ সাধনা, প্রজ্ঞা আর সাঙ্গীতিক চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় তার সামগ্রিক সঙ্গীত জীবনে। সুবীরের গভীর সাঙ্গীতিক ভাবনার একটি বড়ো অংশজুড়ে রয়েছে চলচ্চিত্রের গান। তার কণ্ঠের উচ্চমার্গীয় সুর বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে এক উঁচু আসনে আসীন করেছে। চলচ্চিত্রে রাগ-প্রধান গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি যেমন শ্রোতাকে আপ্লুত করেন, তেমনই নতুন শ্রোতা তৈরিতে অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রাচার্য আলমগীর কবিরের মহানায়ক-এ দুইটি গানে কণ্ঠ দেন সুবীর--১. ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ২. ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’। প্রথম গানটির জন্য সুবীর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে পুরস্কৃত হন। তার অসংখ্য গানে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বাদ থাকলেও এই গানটির কথা, সুর ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আলঙ্কারিক প্রয়োগগুলো আলোচনার প্রয়াস রাখে।
আমার এ দুটি চোখ
পাথর তো নয়
তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়
কখনো নদীর মত
তোমার চোখের পানে
বয়ে বয়ে যায় ॥
আমি তো বাগান নই
তবু কেন ফোটে ফুল
ফাগুনে ফিরে আসে
ভ্রমরের মত ভুল
কত বরষায়
আমার হৃদয় শুধু মেঘ হয়ে যায় ॥
গীতিকার : মাসুদ করিম; সুরকার : শেখ সাদী খান; তাল : কাহারবা
গানটি চারুকেশী রাগের ভাবে সুরারোপিত হলেও মিশ্র কিছু স্বরের প্রয়োগে অসাধারণ সুরের প্রকাশ হয়েছে। রাগের প্রধান বিষয় ভাব প্রকাশ করা। একটি রাগ শুদ্ধাশুদ্ধিভাবে পরিবেশন করতে হলে, সেই রাগের নির্দিষ্ট একটি চলন থাকে। সুতরাং সেই রাগের স্বরের চলনের আদলে রাগ পরিবেশন কিংবা তার ভাব প্রকাশ সহজ হয়।
কিন্তু যখনই একটি রাগে মিশ্র স্বরের ব্যবহার হয়, তখন এক রাগ থেকে অন্য আরেকটি রাগের স্বরে সুর লাগানো অত্যন্ত কঠিন বিষয়। তেমনই চারুকেশী রাগে শুদ্ধ নিষাদের ব্যবহার নেই কিন্তু গানটির মধ্যে বিবাদী স্বর হিসেবে শুদ্ধ নিষাদের ব্যবহার হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে গানটির নান্দনিক প্রকাশ ঘটেছে। মহানায়ক-এ ব্যবহৃত এ গানটির মধ্য দিয়ে সুবীর অসাধারণ সাঙ্গীতিক পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছেন। গানের শুরুতেই হামিং-এর মাধ্যমে চারুকেশী রাগের আবহ চলচ্চিত্রে সুরের অপূর্ব মায়া সৃষ্টি করেছে। চারুকেশী রাগের স্বরের আরোহ এবং অবরোহী গতি--সা রা গা মা পা দা না র্সা/র্সা না দা পা মা গা রা সা।
গানের প্রথমে হামিং অংশের স্বরসমূহ
পা-আ-আ পামা পাগা-আ-আ-আ।গাগা মামা দা-আ। সা দা পা-আ
হু-০-০ হু হু হু হু-০-০-০। হু হু হু ০ ০-০। হো হো হো-০।
হামিং-এর এই অংশে লক্ষ করা যায়, রাগ চারুকেশীর একদম শুদ্ধ প্রকাশ। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জ্ঞানশূন্য শিল্পীদের সচেতনভাবে এর ভাব ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। হামিং-এর শেষ অংশে ষড়জ থেকে মধ্য সপ্তকের কোমল ধৈবত ব্যবহার করে পঞ্চম স্বরে ন্যাস (যে স্বরে এসে বিশ্রাম নেওয়া হয়) করা অসাধারণ এক সাঙ্গীতিক স্বাদ।
গানটির স্থায়ী অংশে ‘তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’ এখানে ‘ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’ বাণীতে--‘সারা গামা গা-আ, রাসা ক্ষয়ে ০ ০ ০ ০ ০, যা ০, নাদা নাদা ০ ০ য় ০’--এই স্বর সমষ্টির মাধ্যমে উদারা সপ্তকে এসে কোমল ধৈবতে ন্যাস বাণীর সঙ্গে সুর, আর সুরের সঙ্গে রাগ ভাবের সমন্বয়ের এক অপূর্ব শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বাদ।
অন্তরা অংশে ‘কত বরষায়’ বাণীতে
পা দা র্সা র্রা র্সানা-আ-আ-আ
ক ত ব র ষা য়-০-০-০
স্বর সমষ্টিতে বিবাদী স্বর হিসেবে শুদ্ধ নিষাদের ব্যবহার এবং নিষাদেই ন্যাস করা এক অপূর্ব সাঙ্গীতিক সৌন্দর্য। গানটিতে আরেকটি বিশেষ অংশ বেশ পাণ্ডিত্যপূর্ণ, অন্তরা শুরুর আগে আরেকটি হামিং-এর কাজ।
পা দা -আ -আ -আ-আ আ -আ র্সা দাপা
আ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ আ ০ ০ ০
পা দা র্রা -আ -আ -আ -আ -আআ -আ র্সানা দাপারাগা রাগা মা -আ
আ আ আ -০ ০ ০ ০ ০ ০ আ আ আ ০ ০ আ আ আ ০
আ আ গামা পা -আ রা গা মা দা -আ পা -আ
ও ও ও ও -০ ও ও ও ও ও ০ ও -০
উপরের স্বর সমষ্টিতে হামিং অলঙ্কারে যেভাবে স্বরের ব্যবহার করা হয়েছে সঙ্গীত শাস্ত্রে তা অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ। সঠিক স্বরজ্ঞান এবং সাধনা ব্যতীত এ গানে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা সাধারণ শিল্পীর পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং সুবীর যে অসাধারণ পাণ্ডিত্য সম্পন্ন গুণী শিল্পী তাতে কোনো সংশয় থাকে না। এমন গুণী শিল্পীর আবির্ভাবে বাংলা চলচ্চিত্রের গানেরও গুণগত মান বৃদ্ধি পেয়েছে। এই যান্ত্রিক যুগে এ ধরনের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ধাঁচের চলচ্চিত্রের গানের মাধ্যমে কিঞ্চিৎ হলেও হাজারও দর্শক শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের স্বাদ আস্বাদন করেছে। এই গানটি ছাড়াও চলচ্চিত্রে সুবীর অসংখ্য রাগ-প্রধান গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। উদাহরণ হিসেবে ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’ গানগুলোর কথা বলা যেতে পারে।
গ. লোক সুরের প্রাচুর্যতা
প্রকৃতিগত কারণেই বাংলাদেশের চারদিকে ছড়িয়ে আছে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, জারি, সারি, কীর্তন, বাউল গান। কেউ না চাইলেও এদেশের মানুষের ওপর গানের এ বিচিত্র ধরনের প্রভাব পড়ে। চলচ্চিত্রও এর বাইরে নয়। এদেশের অসংখ্য চলচ্চিত্রের কাহিনি, সঙ্গীতে লোক প্রভাব চোখে পড়ার মতো। আর সিলেট অঞ্চলে জন্ম নেওয়া সুবীর তো জন্মগতভাবেই লোকগানের এক পূণ্যভূমির মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত শ্রাবণ মেঘের দিন। গ্রামীণ জীবনের কাহিনি নিয়ে গড়ে ওঠা এই চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন মকসুদ জামিল মিন্টু। এই চলচ্চিত্রে ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ শিরোনামের গানে প্লেব্যাক করেন সুবীর। লোকগানের আঙ্গিকে সৃষ্টি এই গানটি সেসময় অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।
একটা ছিল সোনার কন্যা
মেঘ বরণ কেশ
ভাটি অঞ্চলে ছিল
সেই কন্যার দেশ
দুই চোখে তার আহারে কি মায়া
নদীর জলে পড়লো কন্যার ছাঁয়া।
তাহার কথা বলি
তাহার কথা বলতে বলতে
নাও দোড়াইয়া চলি ॥
কথা : হুমায়ুন আহমেদ; তাল : কাহারবা
গানটির কথায় যেভাবে লোক জীবনের প্রেমের ছবি ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে সুরকার যেভাবে সুরারোপ করেছেন; সুবীরের কণ্ঠে তার একটি সামগ্রিকতা পাওয়া যায়। বর্তমান গ্রামীণ লোক সমাজে আধুনিকতা ও লৌকিকতা মিলে যে পরিবেশ লক্ষ করা যায়, এ গানের মাধ্যমে সুবীর সুন্দরভাবে তা ফুটিয়ে তুলেছেন। এছাড়া ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত চন্দ্রকথাতেও মকসুদ জামিল মিন্টুর সুরে সুবীর ‘ও আমার উড়াল পঙ্খি রে’ শিরোনামে আরেকটি লোক সুরের গান করেন। চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে মিল রেখে যেমন গানটির কথা ও সুর সংযোজন করা হয়; তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে সুবীরের কণ্ঠও গানটিকে সুখ শ্রাব্য করেছে। গানটি চন্দ্রকথায় যোগ করেছে এক অপূর্ব নান্দনিক মাত্রা।
যে শিল্পের কথাই বলি না কেনো, তার সামগ্রিক প্রকাশ নির্ভর করে শিল্প মনের অভিব্যক্তির ওপর। আর এই অভিব্যক্তি সৃষ্টি হয় শিল্পীর ব্যক্তিত্বে। সুবীরের পারিপার্শ্বিক প্রকৃতি এবং তার পারিবারিক পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে তাকে সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। সমৃদ্ধ ব্যক্তিত্ব, সাধনা ও সুরের সামগ্রিক রূপই তার গান। কারণ গানের ভিতর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকে, যাকে বলা হয় প্রাণ। প্রাণহীন গান কখনো অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করতে পারে না। সুবীরের গানে প্রাণ প্রতিষ্ঠাই তাকে হাজার মানুষের প্রাণে জায়গা দিয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন ধারার গানে তিনি ভিন্নতা রক্ষা করেই কণ্ঠের ব্যবহার করেছেন। সুতরাং তার গানের ধারায় অপূর্ব বৈচিত্র্য রয়েছে।
সামগ্রিক ভাবনা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের ধারায় শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও সুবীর নন্দীকে নির্ণয়ের নিরিখে বিচারের কিছু নেই। তারা দুজনই স্ব-স্ব অবস্থানে গানের কিংবদন্তি। তবে তাদের সঙ্গীত সম্ভারে সুরের বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে দুজনার অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। চলচ্চিত্রের গানের ধারায় তাদের অবদান আমৃত্যু বেঁচে থাকবে। সেই অবদানকে আশ্রয় করে আগামী প্রজন্মও বাংলা গান এবং বাংলা গানের মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পকে আরো সমৃদ্ধ করার স্বপ্ন ও সাহস জোগাবে।
লেখক : এ কে এম কৌশিক আহমেদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে পড়ান।
koushikrubel99@gmail.com
https://www.facebook.com/kaushikahmedru
তথ্যসূত্র
১. মজুমদার, কমল কুমার (২০১১ : ৩০-৩১); চলচ্চিত্রে গানের ব্যবহার, সম্পাদনা : উৎপল সরকার; কলকাতা।
২. বাগচী, তপন (২০১০ : ২৬); চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ, ঢাকা।
৩. মামুন, ড. আব্দুল্লাহ আল; ‘একজন কালজয়ী কণ্ঠশিল্পীর বিদায়’; দৈনিক ইত্তেফাক, ২৫ মার্চ ২০১৯।
৪. দাশ, সব্যসাচী; ‘দিন যায় কথা থাকে’; দৈনিক জনকণ্ঠ, ৯ মে ২০১৯।
বি.দ্র. এই প্রবন্ধটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন