Magic Lanthon

               

ভাব-ভাষান্তর : আহমেদ মাসুম

প্রকাশিত ০৬ আগস্ট ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

আনিয়েস ভার্দা

চলচ্চিত্রায়ণ হলো প্রেক্ষাপট ও সময়কে পুরোপুরি ধারণের নিবিড় পথ

ভাব-ভাষান্তর : আহমেদ মাসুম


২০১৯ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্রাকাশ থেকে হারিয়ে গেছেন আনিয়েস ভার্দা নামে এক নক্ষত্র। ফরাসি এই নির্মাতা সারা পৃথিবীতে পরিচিত ফরাসি নবতরঙ্গের দাদি হিসেবে। ৬৬ বছরের চলচ্চিত্র জীবনে তিনি অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। নারী ইস্যুতে তিনি ছিলেন সবসময়ই সরব। এছাড়া চলচ্চিত্রে নিজস্ব এক ধারা তৈরি করে গেছেন এই নির্মাতা। কাহিনিচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র--এই দুই ধারাকে তিনি বেশ দক্ষতার সঙ্গে পর্দায় হাজির করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য নির্মাণগুলো হলো--লা পয়েন কোর্ট (১৯৫৪), ক্লিও ফর্ম ফাইভ টু সেভেন (১৯৬২), ড্যাগিওরিওটাইপস (১৯৭৬), ভেগাবন্ড (১৯৮৪), দ্য গ্লিনারস অ্যান্ড আই (২০০১) প্রভৃতি। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ জুন নিউ ইয়র্কভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা স্ক্রিন স্লেট-এর পক্ষে জ্যেষ্ঠ লেখক ভেনেসা ম্যাকডোনেল নিউ ইয়র্কে বসে কথা বলেন আনিয়েস ভার্দার সঙ্গে। আকারে ছোটো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ আলোচনায় উঠে আসে একাধারে চলচ্চিত্রনির্মাতা, প্রযোজক, অভিনয়শিল্পী, সিনেমাটোগ্রাফার আনিয়েস ভার্দার চলচ্চিত্র বিষয়ক নানা কথা। ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য সাক্ষাৎকারটি ভাব-ভাষান্তর করেছেন আহমেদ মাসুম


ভেনেসা ম্যাকডোনেল : আপনার একেবারে শুরুর দিকের কাহিনিচিত্রে আপনি প্রামাণ্যচিত্রের ব্যবহার করেছেন; আবার এর বিপরীতেও গেছেন। বলা চলে, আপনার বাস্তবতা আপনার অনুকূলে ছিলো। ফলে আপনি প্রামাণ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের চেয়েও ভিন্ন কিছু নির্মাণ করতে পেরেছেন। তো আপনি কি মনে করেন, এটি আপনার কাজের যে প্রক্রিয়া তার স্বাভাবিক ফলাফল, নাকি আপনি এ ধারা অর্জনে কোনো কিছু আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন?


আনিয়েস ভার্দা : আপনি এমন নিখুঁতভাবে প্রশ্নটা করেছেন যে, আপনার প্রশ্নের মধ্যেই আমার উত্তর রয়েছে। প্রামাণ্যচিত্র ও কাহিনিচিত্রের মধ্যে পার্থক্য না করতে আমি স্বস্তিবোধ করি। যখন আমি প্রমাণ্যচিত্র নির্মাণ করি, তখন আমি ওই বিষয় বা বিষয়গুলোতে নিজেকে নিয়োজিত করি। আমাদের আশপাশে যে মানুষগুলো আছে তারাও প্রামাণ্যচিত্র কিংবা কাহিনিচিত্রের চরিত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যখন আমি অভিনয়শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করি, তখন আমি বাস্তবের উপাদানগুলোকে ধরার চেষ্টা করি, যা তারা উপস্থাপন করে। এছাড়া একজন পর্যবেক্ষক, সহজাত সাক্ষী ও লেখক হিসেবে আমি নিজের কাছে সত্য থাকার চেষ্টা করি।


ভেনেসা : আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সময় সুযোগের সদ্ব্যবহারের কথা বলছেন। চারপাশের পৃথিবীর সঙ্গে আপনার উন্মুক্ততা ও আনন্দ--যা আপনার প্রকাশভঙ্গির একটি চমৎকার অংশ হয়ে ওঠে। এটা খুবই সক্রিয়, নিষ্ক্রিয় নয়; একধরনের পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে এক প্রকার খাপ খাওয়ানো।


আনিয়েস : আমি এখানে সেখানে বলি সুযোগের সদ্বব্যবহার আমার প্রথম সহকারী। আমি যা কিছুই শুট্ করি না কেনো তাতে প্রায়ই কিছু একটা চলে আসে এবং জীবন বা বিস্ময়কর কিছু যোগ করে। এছাড়া আমি অভিভূত হই এই কারণে যে, কঠিন পরিস্থিতিতেও লোকজন এক প্রকার রসবোধ ধারণ করে কিংবা আত্ম-পর্যবেক্ষণে থাকে। কারণ চলচ্চিত্রায়ণ হলো প্রেক্ষাপট ও সময়কে পুরোপুরি ধারণের নিবিড় পথ।


ভেনেসা : ড্যাগিওরিওটাইপস নির্মাণের বেলায়ও কি আপনি ওই সুযোগটা নিয়েছিলেন? আপনি তো ওই সময়ে প্যারিসে একটি বাড়িতে বাচ্চার যত্ন নিচ্ছিলেন। আর আপনি ওই সময়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য খুব বেশি বাইরেও যেতে পারেননি। হয়তো চারপাশের প্রতি আপনার দৃষ্টিই আপনাকে চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু খুঁজে পেতে সহযোগিতা করেছিলো।


আনিয়েস : আপনি দেখছি আমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। খুব ভালো। এটা সত্য যে, আমি সেসময় শিশুটিকে পেয়ে খুশি ছিলাম এবং শুটিং করার জন্য তার কাছ থেকে দূরে থাকার কোনো ইচ্ছাও আমার ছিলো না। একটি জার্মান টেলিভিশন চ্যানেল আমার দোকানদার প্রতিবেশীদের ওপর আমাকে একটি প্রজেক্ট করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। এ কারণে আমি চলচ্চিত্রটি নির্মাণে সক্ষম হই। এবং অবশ্যই সেটা আমার বাচ্চার কাছ থেকে ৯০ মিটারের বেশি দূরে গিয়ে নয়!


ভেনেসা : দুই বছর আগে আপনি অতিথি নির্মাতা হিসেবে এ এফ আই-এ (আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট) এসেছিলেন এবং সেখানে ক্যাসাভেট-এর (জন ক্যাসাভেট, আমেরিকান নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও অভিনয়শিল্পী) আ উইম্যান আন্ডার অব ইনফ্লুয়েন্স (১৯৭৪) চলচ্চিত্রটি প্রর্দশন করা হয়। এটা খুবই মজার ব্যাপার, এই চলচ্চিত্রটি ও ভেগাবন্ড-এর কথা একত্রে চিন্তা করা যায়। আপনি ভেগাবন্ড সম্পর্কে বলেছেন, একদিক থেকে আমাদের সবার মধ্যেই মনা চরিত্রটা আছে। আমাদের সবার মধ্যে একজন নারী আছে, যে রাস্তায় একা হাঁটে এবং সব নারীর মধ্যে বিদ্রোহীসুলভ কিছু আছে যা প্রকাশ হয় না। আপনি কি এই দুই চলচ্চিত্রের মধ্যে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পান?


আনিয়েস : আমি আনন্দিত এই জন্য যে, আপনি আমার এই কথাটা মনে রেখেছেন। কেননা আমিই এটা পরিষ্কারভাবে মনে করতে পারতাম না। ক্যাসাভেট খুব সুন্দরভাবে আ উইম্যান আন্ডার অব ইনফ্লুয়েন্স নির্মাণ করেছেন। তিনি ম্যাবেলকে (চলচ্চিত্রের একটি চরিত্র) অনুসরণ করে বুঝতে পেরেছিলেন, তার পিছনে অসংখ্য আত্মা রয়েছে। আমি ম্যাবেলের ব্যাপারে যত্নশীল ছিলাম এবং তার বিদ্রোহকে বিবেচনায় নিয়েছি। সে ছিলো ভঙ্গুর, হালকা অসুস্থ। কিন্তু তার হৃদয়ে প্রচুর ভালোবাসা ছিলো। অন্যদিকে ভেগাবন্ড-এর মনা কাউকে ভালোবাসে না এবং কোনো কারণ ছাড়াই সে বিদ্রোহী। আমি তার এ ধরনের আচরণেও আগ্রহী ছিলাম।


ভেনেসা : আপনি লস অ্যাঞ্জেলসে অনেকগুলো চমৎকার চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আঙ্কেল ইয়ানকো, লায়নস লাভমুর মুরস। আপনার ভিজ্যুয়াল আর্টের কাজগুলো ল্যাকমাতে (LACMA, লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্ট) তাদের স্থায়ী সংগ্রহ হিসেবে আনিয়েস ভার্দা ইন ক্যালিফোর্নিয়াল্যান্ড শিরোনামে প্রদর্শন করা হচ্ছে। তো আপনি যখন ফ্রান্স থেকে প্রথম লস অ্যাঞ্জেলসে আসেন, তখন আপনার অভিব্যক্তি কেমন ছিলো? সমসাময়িক লস অ্যাঞ্জেলসের চলচ্চিত্র এবং শিল্পসংস্কৃতির অংশ হয়ে আপনি কেমন বোধ করেন?


আনিয়েস : আমি যখন লস অ্যাঞ্জেলসে জ্যাক ডেমির (আনিয়েসের স্বামী জ্যাক ডেমি, ফরাসি নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী) সঙ্গে থাকতে আসলাম, তখন সে একটি চলচ্চিত্রের শুট্ করছিলো। আমার কোনো ধারণাই ছিলো না যে, জমকালো এই শহরের গতানুগতিকতার বাইরে যে ভিন্ন একটি সংস্কৃতি আছে আমি তার প্রেমে পড়বো! ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে এটা আমাকে তাৎক্ষণিকভাবে অনুপ্রাণিত করে লায়নস লাভ চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে। কে ভেবেছিলো যে প্রায় ৫০ বছর পর আমার শিল্পকর্ম ল্যাকমার সংগ্রহের অংশ হয়ে উঠবে। কী আনন্দ! ল্যাকমা আমার যে শিল্পকর্মগুলো প্রদর্শন করছে, সেগুলো লস অ্যাঞ্জেলসে আমার প্রথম দিকের বছরগুলোর সঙ্গে খুবই সম্পৃক্ত; সে দিনগুলোয় অ্যান্ডি ওয়ারহোল, মার্শাল ম্যাকলুহান, জিম মরিসন ছিলো; বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তখন কেবল নারীবিষয়ক অধ্যয়ন শুরু হয়েছে; বিখ্যাত মিউজিকাল অ্যালবাম হেয়ার (Hair: An American Tribal Love-Rock Musical) প্রকাশ হয়েছে। এগুলো ছিলো সেই সময়! ল্যাকমাতে প্রদর্শিত ওই শিল্পকর্মটিতে আমি লিখেছিলাম, জীবনসহ সবধরনের বিনোদনকে আমি ঘৃণা করি। এটা অবশ্য একটি রসিকতা ছিলো।


সূত্র:https://www.screenslate.com/articles/3;retrieved on: 08.09.2019

 

আহমেদ মাসুম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়ে স্নাতক শেষ করতে পারেননি। বর্তমানে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ভাষা শেখানোর কাজে নিয়োজিত আছেন। পাশাপাশি তিনি ইংরেজি ষাণ্মাসিক পত্রিকা দ্য বার্থ-এর সম্পাদক।

masumsingari@gmail.com

https://www.facebook.com/ahmed.masum.1291

 

বি.দ্র. এই সাক্ষাৎকারটি ম্যাজিক লণ্ঠন ১৮তম সংখ্যা, জানুয়ারি ২০২০ এ প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন