বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভময় মুখার্জি
প্রকাশিত ২৭ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
একজন পরিচালক খুব ভালো প্রযোজক হতে পারে
বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভময় মুখার্জি

প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে একেবারে ভিন্ন ধাঁচের চলচ্চিত্র নিয়ে ইন্ডাস্ট্রিতে হাজির হয়েছিলেন বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়।সম্প্রদান (১৯৯৯) থেকে সোহরা ব্রিজ (২০১৬) পর্যন্ত তার প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রই বিষয়বস্তুর দিক থেকে অনন্য ছিলো। সংখ্যা বিবেচনায় তার চলচ্চিত্র ১০টি। কিন্তু প্রত্যেকটিই দর্শককে হতচকিত করে, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিলো। এতে করে অল্প সময়ের মধ্যেই চলচ্চিত্র দুনিয়ায় নিজের একটা অবস্থান তৈরি করতে পেরেছিলেন তিনি। কিন্তু সবমিলিয়ে চলচ্চিত্র জগৎটা তাকে ধরে রাখতে পারেনি খুব বেশিদিন। তাই তো মাত্র ৪৫ বছর বয়সে কর্মনাশা জীবন থেকে একেবারে বিদায় নেন তিনি। তবে দর্শকের জন্য রেখে গেছেন তার চলচ্চিত্রগুলো--শিল্পান্তর (২০০২),দেবকি (২০০৫), কাঁটাতার (২০০৬), কাল (২০০৭), হাউসফুল (২০০৯), কাগজের বউ (২০১১), এলার চার অধ্যায় (২০১২) ও নায়িকা সংবাদ (২০১৩)।
২০১০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে ‘ওয়াশিংটন বাংলা রেডিও’র শুভময় মুখার্জির সঙ্গে আড্ডায় মাতেন বাপ্পাদিত্য। এই আড্ডায় বিস্তারিতভাবে উঠে আসে বাপ্পাদিত্যের জীবন, দর্শন ও চলচ্চিত্রভাবনা। আড্ডাটির ভিডিও ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে ম্যাজিক লণ্ঠন-এর পাঠকের জন্য অনুলিখন করা হয়েছে। যে কেউ চাইলে এই লিঙ্কে https://www.youtube.com/watch?v=5H5CeRafO3Q&t=13s; retrieved on: 15.01.2019 ঢু মেরে আসতে পারেন মূল ভিডিওটি দেখার জন্য।
শুভময় মুখার্জি : ‘ওয়াশিংটন বাংলা রেডিও’ থেকে আমি শুভময়। আজকে একটা রবিবারের সকালে ‘শুভর সাথে আড্ডা’য় একজনকে পেয়েছি, যার সঙ্গে আমার পরিচয় লাস্ট মিলেনিয়ামের একদম লাস্টের দিকে একটি সিনেমার মাধ্যমে শিল্পান্তর। সিনেমাটার যখন পোস্টার দেখেছিলাম, তখন পোস্টার এবং তার মধ্যে দেবশ্রী দি’র মুখ আমার মধ্যে একটা অন্যরকম দ্যোতনা এনেছিলো; যা থেকে কোনো এক বিকেলে পৌঁছে গিয়েছিলাম সিনেমাহলে সিনেমাটা দেখার জন্য। তো আজকে আমরা পেয়েছি তার পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বাপ্পাদিত্য দা স্বাগত। অনেক ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে আসার জন্যে, সুপ্রভাত।
বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় : সুপ্রভাত।
শুভ : যেটা বললাম, শিল্পান্তর-এর মাধ্যমে আপনার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তো শিল্পান্তর-এর সময়ে আপনার যে কাজগুলো হয়েছিলো বা তার আগে যেরকমভাবে শিল্পান্তর-এ পৌঁছালেন, সেই পথটা সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।
বাপ্পাদিত্য : শিল্পান্তর আমার দ্বিতীয় ছবি, মানে দ্বিতীয় ফিচারফিল্ম। আমার প্রথম ছবি সম্প্রদান, যেটা আমি করেছিলাম ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে। ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে। ছবিটায় ছিলো অনুসূয়া মজুমদার, সব্যসাচী চক্রবর্তী, ইন্দ্রানী হালদার, জয় সেনগুপ্ত, পাপিয়া অধিকারী। জয় দা এখন আর নেই, মারা গেছেন। সেই অর্থে এটা আমার প্রথম ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি। তার আগে আমি টেলিভিশনে কিছু কাজ করেছিলাম, ‘দূরদর্শন’-এ। তারও আগে বেশ কিছুদিন আমি অ্যাসিস্ট করেছি। তো সেই ফেইজটার মধ্যে উল্লেখযোগ্য টার্নিং পয়েন্ট আমার মনে হয় গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ও তার সংস্পর্শে আসা। এবং ‘মহীনের ঘোড়াগুলির’ শুরুটাও এক অর্থে আমাদের বাড়িতে, ওদের ‘ইতি’ নামে যে রেকর্ডটা বেরিয়েছিলো, তার ঠিকানাটাও আমাদের বাড়ি। ফলে আমি খুব ছোটোবেলা থেকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গান শুনে বড়ো হয়েছি। যেহেতু গৌতম দা নিজে একজন অসাধারণ চলচ্চিত্রকার ছিলেন, চারটি ছবি করেছেন, ফলে আমার সঙ্গে ছোটোবেলা থেকেই সিনেমার একটা যোগাযোগ ছিলো। ছবি করতে এসে অবশ্য পরিস্থিতিটা খুব সহজ হয়নি।সম্প্রদান ডিস্ট্রিবিউশনে যাওয়া, ছবি চালানো--আস্তে আস্তে আমি সিনেমার ইকোনমিক্সটা বুঝতে পারছিলাম।
শিল্পান্তর আমার দ্বিতীয় ছবি, তোমার সঙ্গে হয়তো পরিচয় হয়েছে ওই ছবিটার মাধ্যমে। কিন্তু আমার মনে হয় শিল্পান্তর সেই সময় খুব সমালোচনার মুখে পড়েছিলো। যথেষ্ট সাহসী ছিলো ছবিটা। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা ছোটোগল্প নিয়ে করা--‘কটুয়া নিবারণ’। শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এখানে একেবারে অন্য ধরনের একটি চরিত্রে অভিনয় করেন। শুভাশিস তার আগে খুব ব্র্যান্ডেড কমেডিয়ান ছিলেন--বাংলা সিনেমায় খুব মোটাদাগে যে ধরনের কমেডি হয় আর কি। সেখান থেকে ওই রকম একটা চরিত্রে আসা এবং দেবশ্রীকে পাওয়া! শিল্পান্তর-এর পরে দীর্ঘ একটা সময় আমি কলকাতায় ছিলাম না। খুব যে কাজ পেয়েছি তাও না। আমি বাইরে ছিলাম। ওই সময় আমি একটা হিন্দি ছবি করেছিলাম--দেবকি। এতে অভিনয় করেছিলো পারিজাত জোরাবিয়ান, রাম কাপুর, সুমান রাঙ্গানাথান, অরবিন্দ কাক্কাড়। এ ছবিটা অবশ্য খুব বেশি আলোচিত হয়নি। কিন্তু বেশ কয়েকটা ফিল্ম ফেস্টিভালে দেখানো হয়েছিলো।
শুভ : কিন্তু ছবিটা বোধ হয় বাইরে খুব আলোচিত হয়েছিলো?
বাপ্পাদিত্য : হ্যাঁ, আমেরিকায় পুরস্কার পায়; এছাড়া মন্ট্রিয়ালে ও সাও পাওলোতে দেখানো হয় ছবিটা। মেজর ফেস্টিভালে কম্পিটিটিভ বিভাগে ছবিটি ছিলো। সেটার পর আমি দেখলাম, আমি যেমন ছবি করতে চাই, সেটা মুম্বাইতে না, কলকাতায় বাংলা সিনেমায় করা সম্ভব।
শুভ : তারপর কি কাঁটাতার ?
বাপ্পাদিত্য : কাঁটাতার আমাদের করার কথা ছিলো অনেক আগে, ২০০২-এর দিকে।
শুভ : কারণ আমার মনে হয়,শিল্পান্তর, সম্প্রদান বা দেবকি বাপ্পাদিত্যকে যতোটা না পরিচিতি দিয়েছিলো, কাঁটাতার তার চেয়ে বেশি দিয়েছে।
বাপ্পাদিত্য : হয়তো। কিন্তু আমি বলবো, কাঁটাতার-এর পর থেকে সিনেমার পরিবেশটা আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করে। তোমরা তো এটা মানবে যে, উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর একটা দীর্ঘ সময় বাংলা সিনেমায় খারাপ গেছে। ছবির গুণগত মান অত্যন্ত পড়ে গিয়েছিলো। ছবি চলেছে, বাণিজ্যিকভাবে আস্তে আস্তে সেটা রিভাইভ করেছে, তবে গুণগত মান কিন্তু আর ঠিক থাকেনি। বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের ছবিগুলোই রিমেইক হতো। এখন যেমন তামিল-তেলেগু সিনেমার রিমেইক হয়। তখন ধারাটা ওটাই ছিলো। ফলে উত্তম কুমারের সময় যেমন ছিলো, আমাদের মেইনস্ট্রিম সিনেমাটা কিন্তু কখনোই আর তেমন হয়নি। মেইনস্ট্রিম সিনেমাটা একেবারে অনুকরণ সর্বস্ব সিনেমা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার মনে হয় কাঁটাতার আমরা অনেক বেশি ডিস্ট্রিবিউট করতে পেরেছিলাম। ছবিটা অনেক বেশি সিনেমাহলে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম। প্রায় দুইশো ৫০টির মতো সিনেমাহলে চলেছিলো এটা।কাঁটাতার দিয়েই হয়তো অনেক বেশি লোকে আমাদের চেনে।কালও অনেকগুলো সিনেমাহলে চলেছিলো।
শুভ : কাঁটাতার-এ যারা অভিনেতা-অভিনেত্রী ছিলো লিড রোলে, তাদেরও যে এ রকমভাবেও ভাবা যায়, সেটা বোধ হয় কাঁটাতার দেখিয়েছিলো। যেমন, শিল্পান্তর শুভাশিস মুখোপাধ্যায়কে দেখায়।
বাপ্পাদিত্য : কাঁটাতার থেকে কিন্তু রুদ্রনীলের যাত্রা শুরু। ওর এটাই প্রথম ছবি, তখন ও ইয়াঙ ছিলো, কোনো ছবি-টবি করেনি। দুয়েকটা সিরিয়াল করেছিলো। সেই অর্থে ওর মেজর ছবি কিন্তু কাঁটাতার। শ্রীলেখার কথা বলতে গেলে, শ্রীলেখা এখনো আমাকে বলে, সে যখন মঞ্চে অনুষ্ঠান করে, এখনো কাঁটাতার-এর সংলাপ বলতে হয়। দর্শকের কাছ থেকে অনুরোধ আসে। সুদীপ ছিলো, সেও খুব ভালো অভিনয় করেছিলো।
আমার মনে হয়, আমরা বার বার বাইরে থেকে মুম্বাই থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে আসি, গানের ক্ষেত্রেও। কিন্তু আমাদের টেলিভিশনে যারা কাজ করে, তারা কিন্তু ভীষণ প্রতিভাবান। আমার মনে হয়, তারা আরো সুযোগ ডিজার্ভ করে।
শুভ : আপনার সিনেমার পরিক্রমা দেখলে বোঝা যায়, টালিগঞ্জের লোকজনদের নিয়ে কাজ করতে আপনি ভালোবাসেন। আবার শ্রীলেখা-শুভাশিসের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যে অন্যরকম করে ভাবা যায়--সেটাও আপনি দেখিয়েছেন। গানের ক্ষেত্রেও গাবু বা এদের মতো যারা আছে, তাদের আপনি নিয়ে আসছেন।
বাপ্পাদিত্য : এটাই গাবুর মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে প্রথম ছবি। অভিজিৎ বসু, কাঁটাতার থেকে আমাদের প্রায় সব ছবিতে জড়িয়ে আছে অভিজিৎ। আমি অভিজিতের অসম্ভব ফ্যান--ওর গানের, ওর ফোক মিউজিকের, ওর গবেষণার, সংগ্রহের।
আরেকটা কথা এই প্রসঙ্গে বলে রাখি। আমরা যখন হাউসফুল করি, তখন প্রসেনজিৎ একটা কথা আমাকে বলতেন, দেখো আমি সে অর্থে কখনো ব্যর্থতার মুখোমুখি হইনি।
শুভ : বুম্বা দা’র (প্রসেনজিৎ) ব্যর্থতার কথা যদি আমরা বলি তাহলে তো ...।
বাপ্পাদিত্য : সেটা বেশি বলা হবে। কিন্তু বুম্বা দা একটা কথা বলতেন, ‘এই যে একজন পরিচালক যার ছবি চলে না; সে ব্যর্থ, প্রতি মুহূর্তে লোকে তাকে নিয়ে মজা করছে; এই চরিত্রটা আমি করবো কীভাবে? এই পরিস্থিতির সঙ্গে তো আমি পরিচিত নই।’ বুম্বা দার এভাবে বেরিয়ে এসে হাউসফুল করা কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং। বুম্বা দা হয়তো পরিচালকের রোল আরো দুয়েকটা ছবিতে করেছে, কিন্তু সেখানে কিন্তু তাকে সফল দেখানো হয়েছে। খেলাতে করেছে বা কবি হিসেবে সব চরিত্র কাল্পনিক-এ করেছে। কবিও কিন্তু বিদেশে যায়, সে কবিরও স্বীকৃতি আছে। এই প্রথম বুম্বা দা কোনো চরিত্র করলো, যে লোকটা স্বীকৃতি পায়নি, যে লোকটা নিজের জগতে বাস করে।
শুভ : যখন হাউসফুল-এর প্রসঙ্গটা এলোই--এটা নাকি আপনার অটোবায়োগ্রাফিকাল ফিল্ম। কিন্তু আপনি তো কিছুটা সফল, বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়কে তো লোকে চেনে। বুম্বা দার চরিত্রটা একটু অন্য ধরনের, আমার মনে হয়।
বাপ্পাদিত্য : বাস্তব জীবন আর সিনেমা তো এক হয় না। কিন্তু আমার অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা আছে। যে চরিত্রটা নিত্য বাবু করেছেন--যিনি বলেন আপনি তামিল ছবি দেখুন, তেলেগু ছবি দেখুন--এই রকম একজন মানুষের সঙ্গে কিন্তু আমি তিন চার বছর কাটিয়েছি। উনি কিন্তু আমাকে ঠিক এই কথাগুলোই বলতেন। বা পরবর্তী সময়ে আগস্ট মাস থেকে যে ছবিটা করছি, তার চরিত্রগুলোও কিন্তু আমার আশপাশে আছে। মনে হয়, এটা আমার খুব জানা জগৎ, পরিচিত বিষয়।
শুভ : হাউসফুল এবং কাঁটাতার-এর মাঝখানে আরেকটি ছবি করলেন--কাল। এখানে একটা অন্য ধরনের পেশা আছে; সেটাকে খুব বিস্তারিত দেখিয়েছিলেন বা সেই ট্রেডিংটা খুব ভালোভাবে দেখিয়েছিলেন। তো এই সিনেমাটা করতে গিয়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
বাপ্পাদিত্য : কাল দেখে অনেকে খুব শকড্ হয়েছিলো, যেমনটা শিল্পান্তর-এর ক্ষেত্রে হয়েছে। কারণ শিল্পান্তর-এ মেয়েটা কাঁচা মুরগি খায়, সাপ খায়, নর-রাক্ষসীর খেলা দেখায়--সেটা ভিজ্যুয়ালি খুব শকিং ছিলো।কাল আবার অনেককে খুব শক করেছে। কাল-এ অ্যাবরশনের একটা সিন ছিলো, আর্মি নিয়ে প্রশ্ন ছিলো।
শুভ : সেখানে আপনি অলটারনেটিভ সেক্সুয়ালিটি থেকে একটি ছেলে ও তার প্রেমটা দেখিয়েছিলেন। বা ফেইস ট্রেইনিং যেটা দেখান, এ রকমভাবে নারীরা পাচার হয়ে যাচ্ছে অভাবের তাড়নায়। এর পিছনে আপনার ওয়ার্কটা বলুন, কীভাবে প্ল্যানিংটা আপনার মাথায় আসলো।
বাপ্পাদিত্য : আরেকটা দিক ছিলো ছবিটার দ্বিতীয়ার্ধে--এই যে কনজিউমারিজম, একটি মেয়ে সেখানে যাওয়ার পর যখন সে একটা মোবাইল ফোনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে, সে একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। অথচ স্বাচ্ছন্দ্যটা কিন্তু স্বাচ্ছন্দ্য নয়। এর মধ্যে অনেক নিপীড়ন আছে, অনেক অত্যাচার আছে। কিন্তু সে মোবাইল ফোনটাও আবার ছাড়তে পারছে না। সেই ডায়কোটমি, সেই প্যারাডক্স--এটা নিয়েই কিন্তু কাল। আমরা যখন কাঁটাতার শুট করছি, তখন আমরা এ রকম কিছু চরিত্র দেখেছিলাম। যেহেতু কাঁটাতার-এ মেয়েটি ইমিগ্রান্ট ছিলো--কখনো হিন্দু, কখনো মুসলমান, এই মেয়েটির যে জার্নি সেটা শুট করতে গিয়ে আমি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি; অনেক এন জি ও’র সঙ্গে। এই চরিত্রটা কিন্তু আমাদের দেখা। তো কথা বলতে বলতে ওরা অনেকগুলো কেইস স্টাডি দিয়েছিলো আমাদের। এই যে চারটি মেয়ে যাদের নিয়ে কাল তৈরি, তারা কিন্তু বাস্তবে এক্সিস্ট করে।
শুভ : এবং সেজন্যই মনে হয় গল্পটা এতো শকিং!
বাপ্পাদিত্য : হ্যাঁ, বিশেষ করে বিধবা মেয়েটিকে অনেকের কাছে খুব শকিং লেগেছে। কিন্তু এরা এক্সিস্ট করে এবং ওদের (এন জি ও) কেইস স্টাডি থেকে আমরা এটা নিয়েছি। বাকিটা যেটুকু ফিকশন করার করেছি। তারা কিন্তু এখন কলকাতায় থাকে না। তারা এখন থাকে পুনে’তে। মেয়েগুলোর মধ্যে থেকে একজন পুলিশের কাছে ডায়েরি করেছিলো, পরে তুলে নেয়। অর্থাৎ তারা কিন্তু সেই অর্থে পাচারই হয়ে গেছে। এবং আমি জানি না, অন্য কোনো জীবনে তারা ফিরে আসবে কি না। এটা আমার কাছে সিনেমাটিকালি ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিলো। ওদের কেইস স্টাডি থেকে চার জন মেয়েকে আমরা বেছে নিয়েছিলাম। এবং ওরাই আমাদেরকে বলেছিলো, এ রকম একটা ছবি করতে। কিন্তু এটা কোনো প্রোপাগান্ডা ফিল্ম নয়, কোনো অনুদানের টাকায় নির্মিত নয়। আমি চেয়েছিলাম একদম আমজনতা, সাধারণ দর্শক ছবিটা দেখুক। আমাকে মেসেজ দিতে হবে, কিংবা কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে কথা বলতে হবে, সেটা এর আগে আমার কোনো ছবিতেই মনে হয়নি। তবে ইস্যু নিয়ে কথা বলাটা খুব জরুরি। ইস্যুগুলো জড়িয়ে থাকে কোথাও না কোথাও।
শুভ : আচ্ছা, আমার একটা কৌতুহল আছে,কাঁটাতার-এ কি কোথাও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘জোছনা কুমারী’ লেখাটির প্রভাব ছিলো?
বাপ্পাদিত্য : না গো। কাঁটাতার দেবাশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে নেওয়া। সেই উপন্যাসের চরিত্র এই মেয়েটি, সুধা।
শুভ : কাঁটাতার, কাল এবং হাউসফুল-এর মাঝে আরেকটি সিনেমা আপনি করে ফেললেন, যেখানে ক্যামেরার পিছনে আপনি ছিলেন না। কিন্তু পুরো ছবিটা আপনিই কন্ট্রোল করলেন--হ্যালো কলকাতা। প্রযোজক হিসেবে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন।
বাপ্পাদিত্য : এটা খুব ইন্টারেস্টিং এবং অন্যরকম একটা অভিজ্ঞতা। একটা কথা বলি, আমি কিন্তু সবসময় প্রযোজক হতে চেয়েছি। একটা প্রোডাকশন কোম্পানিও আমার আছে। আমি নতুন পরিচালকদের প্রোডিউস করতে চাই। কারণ আমার মনে হয়, একজন পরিচালক খুব ভালো প্রযোজক হতে পারে। কারণ সেই আরেকজন পরিচালকের কষ্ট, সমস্যাগুলো বুঝতে পারে বেশি। হ্যালো কলকাতা মনোজ মিশিগানের ছবি। ও আমার সঙ্গে দেবকি থেকে কাজ করছে, ও অ্যাসিস্ট করতে এসেছিলো। মনোজ একটা খুব ভালো চাকরি করতো। আমি অনেকবার বারণ করলাম, চাকরিটা ছেড়ো না। কিন্তু শুনলো না। ও সিনেমাপাগল একটা ছেলে।
ও যখন স্ক্রিপ্টটা লিখলো, তখন আমি বললাম, চলো ছবিটা করে ফেলি। আমার একজন প্রযোজক ছিলেন, তাকে আমি বললাম, আপনি ছবিটা করুন, আমি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার হিসেবে থাকছি। মোসার-বিয়ার ছবিটার ডি ভি ডি বের করেছে। ভালোই বিক্রি হয়েছে। হয়তো কমার্শিয়ালি আরেকটু চলতে পারতো। ছবিটা একটু আস্তে আস্তে অ্যাপ্রিসিয়েটেড হয়েছে। কিন্তু মনোজের প্রথম কাজ হিসেবে বেশ ভালো। বেশ প্রশংসিত হয়েছে।
শুভ : আপনার ছবি কাগজের বউ মুক্তির অপেক্ষায়, সে প্রসঙ্গে আরেকটু পরে আসবো। কিন্তু তার আগে দুয়েকটা ছোট্ট প্রশ্ন--পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় পরিচালক কে, বা কে কে?
বাপ্পাদিত্য : এটা তো একটা দীর্ঘ তালিকা। তবে প্রথমত ঋত্বিক কুমার ঘটক। আমি জানি না, কনসাসলি, আন-কনসাসলি ভারতীয় সিনেমাকে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তিনি ঋত্বিক ঘটক। সেটা মেইনস্ট্রিম সিনেমাই হোক আর যে সিনেমাই হোক। তার একটা ভীষণ প্রভাব সবার মধ্যে কাজ করে। আমার মধ্যেও কাজ করে। ঋত্বিকের যে বৈশিষ্ট্যটা সবচেয়ে বেশি টানে--একটা ইউনিক সিনেমা ল্যাঙ্গুয়েজ, যেটা একান্তভাবে আমাদের নিজেদের; বাংলা সিনেমার যে ভাষা হওয়া উচিত। আমি কেনো এটা বলছি জানো তো--বাংলা সিনেমা তো আজকে তার নিজস্বতাকে হারিয়ে তামিল, তেলেগু সিনেমার অনুকরণ করছে। বা অনেক বিদেশি ছবির অনুকরণে হচ্ছে। সত্যজিৎ রায়ও বলতেন, ‘ঋত্বিক একটা একান্ত নিজস্ব সিনেমা ভাষা তৈরি করেছিলেন। এটা ইউনিকলি উনার মধ্যে ছিলো।’ এই রকম একটা সিনেমাভাষা, বললেই তো আর তৈরি হয় না। একটা মেঘে ঢাকা তারা, একটা তিতাস একটি নদীর নাম করা সহজ নয়। এটা আমি ছবি করতে এসেই বুঝতে পেরেছি। এবং তার দর্শন, সেই লেখাপড়া ...।
মাত্র আটটা ছবি করেছেন। আটটা ছবিই রিমার্কেবল ছবি। কিন্তু ঋত্বিক ঘটক ছাড়াও আমার ভীষণ প্রিয় রাজেন তরফদার। বাংলা ছবির কথা বলতে গেলে হয়তো রাজেন বাবুর কথা ওভাবে আসে না। উনার একটা ছবি জীবনকাহিনী আমার ভীষণ প্রিয়। বারিন সাহার একটা ছবি তেরো নদীর পাড়ে--এটার প্রভাব হয়তো অনেকের মধ্যেই কাজ করেছে। ভারতবর্ষের অন্য পরিচালকদের মধ্যে রয়েছে মনি কাউল, কুমার সাহানী, গিরিশ। আমি গিরিশের ছবির ভীষণ ভক্ত। এগুলোও আমার মধ্যে কাজ করেছে। এ তালিকায় বিদেশি পরিচালকও অনেক। তুমি জানো বাংলার পরিচালকদের সঙ্গে বিদেশি পরিচালকদের খুব ভালো যোগ আছে। বাংলা ছবি যেহেতেু অনেক বেশি আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে যায়, আমারও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে; ফলে বিদেশি পরিচালকদের সঙ্গে কিন্তু একটা নিবিড় সম্পর্ক আমাদের বাঙালি পরিচালকদের আছে, প্রায় সবার। এখন যেমন কলকাতায় কিম কি দুকের বিরাট ফলোয়ার আছে। হয়তো সাউথ কোরিয়াতেও তা নেই, কলকাতায় আছে। কোরিয়ায় কতোজন দুকের ছবি দেখে আমি জানি না, কিন্তু কলকাতায় অনেক লোক দেখে।
নুভেলভাগ ছবির যে প্রভাব কলকাতায় ছিলো, সেটা তো এখনো আছে। এখনো জ্যঁ লুক গদারের ছবির জন্য কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভালে লাইন পড়ে। জেএলজি বাই জেএলজি প্রথমবার দেখতেই পারিনি, এতো ভিড় ছিলো! কিসলস্কি’কে (Krzysztof Kieślowski) বাদ দিয়ে তো আধুনিক ছবি ভাবাই যায় না। থ্রি কালারস সিরিজ তো ডেফিনেটলি। আমার আরো দুজন প্রিয় পরিচালকের কথা বলি--একজন বাংলাদেশের তারেক মাসুদ। তার মাটির ময়না ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে আমাকে। আরেকজন আমার থেকে বয়সে ছোটো, কিন্তু আমি তাকে এই সময়ের খুব মেজর ফিল্মমেকার মনে করি। সে হচ্ছে বিমুক্তি জয়সুন্দরা। তার ছবি দ্য ফরসেকেন ল্যান্ড (The Forsaken Land) গোল্ডেন ক্যামেরা পেয়েছে কান-এ। ও অসম্ভব ভালো, কলকাতা আসছে কয়েকদিনের মধ্যে কলকাতা ফেস্টিভালে। এছাড়া ইরানের ছবি কার না ভালো লাগে! আব্বাস কিয়ারোস্তামি, মহসিন মাখমালবাফ, সমিরা মাখমালবাফ, মাজিদ মাজিদি এরা তো কলকাতার ঘরের মানুষ।
শুভ : আমরা তো ফেস্টিভালগুলো ছাড়া এদের ছবি দেখার সুযোগ কম পাই।
বাপ্পাদিত্য : না এখন ডি ভি ডি’র বদৌলতে কিন্তু আমরা অনেক সিনেমাই দেখতে পাই। মনোজ (মিশিগান) বলছিলো, হংকং-এ গিয়ে ওঙ কার ওয়াই-এর সিনেমার ডি ভি ডি পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু কলকাতায় একেবারে তার নতুন ছবির ডি ভি ডি পাওয়া যায়।
শুভ : তবে যা-ই বলেন, বড়ো পর্দায় দেখার অভিজ্ঞতাটা কিন্তু একটু অন্যরকম।
বাপ্পাদিত্য : নিশ্চয়। দেখো মাঝখানে কিন্তু একটা চেষ্টা শুরু হয়েছিলো, ওয়ার্ল্ড সিনেমা এখানে রিলিজ করা যায় কি না। সেটা যে কেনো সফল হচ্ছে না, আমি বুঝতে পারছি না। দুটো চ্যানেল তৈরি হয়েছে ওয়ার্ল্ড মুভিজ দেখার জন্য। একটা স্ট্রং অডিয়েন্স আছে বলেই তো হচ্ছে। কিন্তু এই অডিয়েন্সটা বাংলা সিনেমার মতো এতো ডিসাইসিভ অডিয়েন্স নয়। যে পরিমাণ দর্শক হলে একটা সিনেমা মুভমেন্ট হয়ে যেতে পারে, সেটা হচ্ছে না।
শুভ : বড়ো পর্দায় সবার সঙ্গে বসে, সবার সঙ্গে শেয়ার করে যে ইফেক্টটা আসে, সেটা মনে হয় অন্য ধরনের দ্যোতনা তৈরি করে। ডি ভি ডি মনে হয় দুধের সাধ ঘোলে মেটাচ্ছে।
বাপ্পাদিত্য : আমি তোমার সঙ্গে একশো ভাগ একমত। কিন্তু কিছু করার নেই। বড়ো পর্দায় যে ছবিগুলো দেখার সুযোগ হয় আমাদের, তার থেকে ওই ছবিগুলো অনেক ভালো, এটা একটা দিক। আরেকটা দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, পাকিস্তান ভারতীয় ছবি রিলিজ করছে; ইন্টারঅ্যাকশনটা হচ্ছে। কিন্তু তুমি ভাবতে পারো, যদি এপার বাংলা ওপার বাংলার বাজারটা খুলে যেতো, তাহলে কতো বাঙালি অডিয়েন্স তৈরি হতো!
শুভ : ঢাকা এবং টালিগঞ্জ দুই ইন্ডাস্ট্রির জন্যই খুব ভালো হতো।
বাপ্পাদিত্য : শুধু ইন্ডাস্ট্রিই নয়। বাংলাভাষী যে জনসংখ্যা পুরো বিশ্বে, কাঁটাতারের জন্য সেই দর্শক কিন্তু ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু এমনটা নয় যে আমরা বাংলাদেশের সিনেমা দেখছি না। আমরা কিন্তু ডি ভি ডি’তে বাংলাদেশের যে কটা ভালো কাজ সব দেখি। আবার ওরাও দেখছে। ফেইসবুকে তো আমার অনেক বাংলাদেশি বন্ধু--ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ফিল্ম ইন্সটিটিউটের ছাত্র। আমি ওদের জিজ্ঞেস করি, তোমাদের নতুন কোন ছবি ভালো লাগছে। কিন্তু এটাকে আমরা কোনোরকম অফিসিয়াল করতে পারলাম না। এখন যেমন তামিল সিনেমা একটা মেজর ফোর্স। তামিল-তেলেগু সিনেমার বাজেট কিন্তু হিন্দি সিনেমার থেকেও বেশি। এটা যদি অফিসিয়াল হয়, তাহলে হয়তো বাংলা সিনেমাও একটা শক্তিশালী জায়গায় যেতে পারতো। এই একটা মেজর কারণে বাংলা সিনেমা বড়ো ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হতে পারছে না। হয়তো প্রবাসীরা যারা বাইরে আছেন, তারা এটা নিয়ে ভাবতে পারেন, কোনো একটা রাস্তা বের করা যায় কি না। রাস্তা একটা বেরোনো উচিত।
শুভ : আপনি এখন কাজ করছেন কাগজের বউ নিয়ে। এটার লেখক শীর্ষেন্দু। আপনার শিল্পান্তরও শীর্ষেন্দুর।কাগজের বউ-এ আবার শীর্ষেন্দু ফিরে এলেন। তো শীর্ষেন্দু কি আপনার সবচেয়ে প্রিয় লেখক?
বাপ্পাদিত্য : অন্যতম প্রিয় লেখক তো বটেই। এবং খুব ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক সূত্রে আমি তাকে চিনি। উনার অনেকগুলো লেখা নিয়ে আমার ছবি করার ইচ্ছে আছে। একটা তো প্রায় করতেই গেছিলাম, কাজও শুরু হয়েছিলো। কিন্তু হয়নি। ‘কাগজের বউ’ উপন্যাস হিসেবে কিন্তু খুব জনপ্রিয়। এমনটা নয় যে, এটা নিয়ে আগে ছবি করার চেষ্টা হয়নি। মুম্বাইয়ের একজন খুব বিখ্যাত অভিনেত্রী রাইটটা কিনে রেখেছিলেন। উনি করতে পারলেন না। একজন পরিচালক ছবিটা শুরু করার আগেই মারা গেলেন। তো এই ছবিটা সামহাউ হয়ে উঠছিলো না।
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, হিন্দি ছবি যদি আবার করি কাগজের বউ-ই করবো। এ নিয়ে বুম্বা দার সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছে, কাগজের বউ কী করে হিন্দিতে করা যায়। উনি খুব ইন্টারেস্টেড ছিলেন। তারপরে সুযোগ হলো বাংলায় করার। উপন্যাস হিসেবে এটা একটু বিতর্কিতও ছিলো। এবং মজার ব্যাপার হলো, ৩৫/৪০ বছর আগে লেখা এই উপন্যাসে কিছু কিছু চমকে যাওয়ার মতো ফেনোমেনা আছে। আর সেগুলো আজকের সময়ে এসেও এতো প্রাসঙ্গিক। যেমন ধরো সারভেইলেন্স--গোপনে ছবি তোলা। এই যে এম এম এস, এগুলো তো ভাবাই যেতো না। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় যেহেতু সায়েন্স ফিকশনও লিখতেন, উনি কল্পনা করেছিলেন, গোপনে ছবি তোলা, সেগুলোকে আবার ডকুমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা। এগুলো কিন্তু আমার আকৃষ্ট হওয়ার মূল জায়গা ‘কাগজের বউ’-এর প্রতি। আমরা যেটা করেছি, আজকের কলকাতা তো বদলে গেছে, ৪০ বছর আগের কলকাতা তো এমন ছিলো না। তখন শপিং মল ছিলো না, মাল্টিপ্লেক্স ছিলো না, এই রকম লাইফস্টাইল ছিলো না। আজকের কনটেক্সটে উপন্যাসটাকে ইন্টারপ্রেট করেছি। আমি পরিচালক হিসেবে এটুকুই করেছি।
শুভ : কাগজের বউ-এর কিছু কিছু অভিজ্ঞতা যদি আমাদের বলেন।
বাপ্পাদিত্য : প্রথম যেটা আমার মনে হয়, এতো ইয়াঙ কাস্ট নিয়ে আগে কখনো কাজ করিনি। আমার প্রথম ছবিতে যাদের নিয়ে কাজ করেছি, তারা খুব ম্যাচিউরড অ্যাকটরস। মানে সেটা অনুসূয়া মজুমদারই হোক, ইন্দ্রানী হালদারই হোক বা দেবশ্রী, পারিজাত, বুম্বা দা। সবাই খুব ম্যাচিউরড, ইভেন শ্রীলেখা। এবার একটা নতুন প্রজন্ম যেমন, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, পাওলি দাম, রিমঝিম এদের নিয়ে কাজ করেছি। ফলে এইটা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা। ওদের ইমোশনগুলোর সঙ্গে আমি এতোটা অভ্যস্ত না। ওদের ইমোশনগুলো হঠাৎ হঠাৎ সুইং করে--এই খুব আনন্দে লাফাচ্ছে, এই খুব দুঃখ পাচ্ছে। এই রকম কাস্ট হ্যান্ডল করা আমার কাছে একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আমাদের বাকি ইউনিটটা তো দীর্ঘদিন ধরেই এক।
আরেকজনের কথা আমি বার বার বলি, আমার সিনেমা করার একটা আনন্দের দিক হচ্ছে আমার সিনেমাটোগ্রাফার রানা দা। উনার সঙ্গে আমি প্রায় ১৬-১৮ বছর কাজ করছি। ওর প্রথম সিরিয়াল আমার সঙ্গে, ওর প্রথম ছবি আমার সঙ্গে। ফলে লম্বা আড্ডা ওর সঙ্গে আমার চলেই। কালকেও হরিদ্বার গেলো, আমার সঙ্গে ট্রেনে আড্ডা মারতে মারতেই গেছে ফোনে। এই যে আড্ডাটা চলে, সিনেমাটা তারই কনটিনিউয়েশন। বরং যে ছবিগুলো আমরা করিনি, সেগুলোই ভালো হতে পারতো। যে শট্গুলো আমরা প্ল্যান করেছি কিন্তু নিতে পারিনি, সে ছবিগুলো অনেক ভালো হতে পারতো।
শুভ : কাগজের বউ-এ যেটা আলোচিত বা ফোকাসড হয়েছে, পাওলির চরিত্র। পাওলি যদিও খুব বেশিদিন ছবি করেনি, কিন্তু ও খুব শক্তিশালী অভিনেত্রী। সে হিসেবে এখনই পরিচিত ও। ও যে চরিত্রটা করছে সেটা একটু অন্য ধরনের। এ ধরনের চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তোলা যেমন গর্বের, তেমনই শক্ত। এবং ইচ্ছে থাকলেও অনেকেই এ রকম চরিত্র করতে চান না।
এই বিষয়টা নিয়ে আপনি একটু বলবেন, আপনি পাওলির দিক থেকে কোনো সমস্যায় পড়েছেন কি না। বা পাওলি চরিত্রটির সঙ্গে কতোটা সহজ ছিলো।
বাপ্পাদিত্য : পাওলি খুব বেশিদিন অভিনয় করছে না। কিন্তু সে শুরুই করেছে অনেক ম্যাচিউরড একটা চরিত্র দিয়ে। অন্য সবার ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা উল্টো হয়। এখন আমাদের এখানে, ভারতীয় সিনেমার ক্ষেত্রে বেশি হয়, একজন অভিনেতাকে খুব স্টেরিওটাইপ ইমেজে বন্দি করে ফেলা হয়। একবার সিরিয়াস রোল করতে শুরু করলে সবাই তাকে সিরিয়াস রোলের জন্যই ডাকে। ইন্টারেস্টিংলি অন্যদিকে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার একটা অন্যরকম ইমেজ আছে। চিরদিনই তুমি যে আমার, কমার্শিয়াল পেয়ার! আমরা প্রথমে ওই অঙ্কটাকে ভাঙার চেষ্টা করলাম। প্রিয়াঙ্কাকে অন্যদিকে ঠেললাম, পাওলিকে একটু অন্য দিকে ঠেলে দেখলাম কী হয়। পাওলিকে বললাম, দেখো পাওলি তুমি আগে তো ‘এই’ রকম চরিত্র করেছো, এবার ‘এই’ রকম করো। পাওলি খুব উত্তেজিত, ও ওটাই করতে চায়।
যেকোনো পরিবর্তন নিশ্চয় একজন অভিনেত্রীকেও নাড়া দেয়। কিন্তু পাওলি খুব এফর্টলেস। আমার ধারণা, আগামী দিনের বাংলা সিনেমায় পাওলি খুব গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হতে চলেছে। ও যদি ফোকাসড থাকে, হয়তো বাংলা সিনেমা আরেকজন খুব ভালো অভিনেত্রী পেতে চলেছে।
শুভ : কাগজের বউ সম্পর্কে আমরা তো জানলামই। পরবর্তী সময়ে আপনি যে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, সেটা নিয়ে যদি একটু বলেন।
বাপ্পাদিত্য : এটা আবারও আমার খুব কম বাজেটের একটা সিনেমা। একদিক থেকে আমি আমার চেনা জগতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। এখানে ইন্টারেস্টিংলি একই কাস্ট কিন্তু। মানে কাগজের বউ-এ যারা ছিলো, তারাই এখানে আছে। পাওলি, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, ব্রাত্য সবাই আছে। কিন্তু জগৎটা সম্পূর্ণ আলাদা। এই ছবিটার দিকে আমি খুব তাকিয়ে আছি। ১৫ আগস্ট থেকে শুটিং শুরু।
শুভ : সিনেমার মধ্যে সিনেমা!
বাপ্পাদিত্য : হ্যাঁ সিনেমার মধ্যে সিনেমা!
শুভ : তো দাদা
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সঙ্গে আসার জন্য। ‘ওয়াশিংটন বাংলা রেডিও’কে সময় দেওয়ার
জন্য। শুভর সঙ্গে কিছু সময় শেয়ার করার জন্য। অনেক ধন্যবাদ; পরবর্তী সময়ে আপনাকে
নিশ্চয় আমরা বারে বারে আমাদের সঙ্গে পাবো। আজকের আড্ডা এখানেই শেষ করতে হচ্ছে।
অনেক ধন্যবাদ।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন