রাইসুল ইসলাম আসাদ
প্রকাশিত ২৬ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা
রাইসুল ইসলাম আসাদ

ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৮
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
২৫ এপ্রিল ২০১৯
প্রথম পর্ব.
সঞ্চালক : শুভ বিকেল। আজ ২৫ এপ্রিল ২০১৯ খ্রিস্টাব্দ। ১৪২৬ বঙ্গাব্দের ১২ বৈশাখ। উপস্থিত সবাইকে ফুলেল শুভেচ্ছা। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা' সঞ্চালনায় আছি আমি আনতারা সোনিয়া।
সঞ্চালক : সঙ্গে আছি তানভীর শাওন। আজ ‘ম্যাজিক লণ্ঠন' বছরের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ৮' আরম্ভ করতে চলেছে। শুরু করার আগে স্মরণ করছি, চলচ্চিত্র জগতের সেইসব ব্যক্তিদের, যাদের আমরা সম্প্রতি হারিয়েছি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের প্রাণপুরুষ মুহম্মদ খসরু, সিনেমাটোগ্রাফার আনোয়ার হোসেন, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী আমজাদ হোসেন, নির্মাতা সাইদুল আনাম টুটুল, অভিনয়শিল্পী টেলি সামাদ, সঙ্গীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, সঙ্গীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ ও ভারতীয় নির্মাতা মৃণাল সেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
আনতারা সোনিয়া : চলচ্চিত্রবিষয়ক গবেষণা পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন' যাত্রা শুরু করে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। চলতি বছর জানুয়ারিতে প্রকাশ হয়েছে এর ১৬তম সংখ্যা।
তানভীর শাওন : প্রতিবছর চলচ্চিত্রের একজন পেশাদার ব্যক্তিকে নিয়ে কথামালার আয়োজন করে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন'। প্রথমবার কথামালা অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে। সেই কথামালায় অতিথি ছিলেন নির্মাতা নূরুল আলম আতিক। এরপর ‘ম্যাজিক লণ্ঠন' সফলভাবে সাতটি কথামালা আয়োজন করে।
সোনিয়া : এর আগে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন'-এর আমন্ত্রণে আমাদের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন নির্মাতা আবু সাইয়ীদ, গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী কাজী হায়াৎ, অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী। সর্বশেষ কথামালায় নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী কথা উপস্থাপন করেন ‘চলচ্চিত্রের ভাষা ও নির্মাণশৈলী' নিয়ে।
শাওন : এবারে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন'-এর আমন্ত্রণে কথামালা ৮-এ উপস্থিত হয়েছেন অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদ। তিনি কথা উপস্থাপন করবেন ‘অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা' বিষয়ে। চলচ্চিত্র এমন একটি শিল্পমাধ্যম, যা সব শিল্পকেই ধারণ করার ক্ষমতা রাখে। আর চলচ্চিত্রের একেকটি চরিত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে অভিনয়শিল্পীর দক্ষতায়। তাই অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্ক নিবিড়। তাকে পরিণত শিল্পী হয়ে ওঠার পথে অনবরত ভাঙাগড়ার ভিতর দিয়ে যেতে হয়। তাই একজন অভিনয়শিল্পী বহুমাত্রিক এই শিল্পমাধ্যমটির এমন এক উপাদান, যাকে ভুল করতে করতেই শিখতে হয়।
সোনিয়া : আমাদের আজকের অতিথি অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদ চলচ্চিত্র জগতে যাত্রা শুরু করেন ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র আবার তোরা মানুষ হ। চলচ্চিত্রে তার ৪৫ বছরের কর্মজীবনে ঘুড্ডি, সুরুজ মিয়া, পদ্মা নদীর মাঝি, অন্য জীবন, লাল দরজা, দুখাই, কীত্তনখোলা, উত্তরা, লালসালু, লালন, মনের মানুষ, আমার বন্ধু রাশেদ উল্লেখযোগ্য। গুণী এ অভিনয়শিল্পী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন চার বার। আর এর বাইরে সবচেয়ে গর্বের বিষয় হচ্ছে তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা।
শাওন : আয়োজনের এ পর্যায়ে আজকের অতিথি রাইসুল ইসলাম আসাদকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। এবার অতিথিকে স্মারক প্রদান করবেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সাবেক সহকারী সম্পাদক ইমরান হোসেন মিলন। মঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ইমরান হোসেন মিলনকে।
সোনিয়া : স্মারক প্রদান পর্ব শেষ হলো। আজকের আয়োজনের মূল আকর্ষণ অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদের কথা উপস্থাপন। আয়োজনের মূল অংশে যাওয়ার আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসছেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন'-এর সহকারী সম্পাদক শফিকুল ইসলাম। মঞ্চে আহ্বান জানাচ্ছি শফিকুল ইসলামকে।
শফিকুল ইসলাম : ‘ম্যাজিক লণ্ঠন' আয়োজিত কথামালা ৮-এ যারা উপস্থিত হয়েছেন, আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। অভিনন্দন জানাই আমাদের অতিথি অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদকেও; যিনি ঢাকা থেকে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে কথা উপস্থাপনের জন্য হাজির হয়েছেন। আজকের আলোচনার বিষয় ‘অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা'।
কর্মময় জীবনে আমরা অসংখ্য ভুল করি। কাজ করলে ভুল হয় না, এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। আবার কোনটা ভুল আর কোনটা ঠিক, তা নিয়েও রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে আমাদের ভাঙাগড়ার এই জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পাড়ি দিতে হয়। জীবনকে অন্যের কাজে নিয়োজিত করতে হয়। জীবনকে ব্যবহার করেই সমাজ ও মানুষকে কিছু দিতে হয়। এই কথাগুলো বলছি এ কারণেই যে, দেওয়া-নেওয়ার এ খেলা চলছে সেই আদিকাল থেকেই।
এই দেওয়ার কাজটি চলচ্চিত্র কলাকুশলীরাই বেশি করে থাকেন। সমাজের, দেশের প্রতি তাদের দায়িত্ব অনেক। কারণ চলচ্চিত্রের একটি সংলাপ অনেক মানুষের জীবনকে পাল্টে দিতে পারে। অনেক সময় মানুষকে ভিন্নভাবে ভাবায়, সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। তাছাড়া চলচ্চিত্রকে যদি শিল্পও বলি, তাহলেও এ শিল্পে নিয়োজিত মানুষের দায়িত্ব অনেক। আর চলচ্চিত্র তো কোনো না কোনোভাবে জীবনের প্রতিফলন। কোনো চলচ্চিত্রের গল্প ডালপালা ছড়িয়ে আমাদের জীবনকেই ছুঁয়ে যায়, প্রভাবিত করে, আলোড়িত করে। অভিনয়শিল্পীরা এই কাজে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তারা নির্মাতার চিন্তাকে যথাযথভাবে পর্দায় তুলে ধরে। আর এখানেই একজন অভিনয়শিল্পীর গুরুত্বের জায়গা।
সবারই ভুল হয়; একজন অভিনয়শিল্পীও ভুল করেন। কিন্তু একজন অভিনয়শিল্পীর ভুল অন্যদের ভুল থেকে খানিকটা আলাদা। কারণ তার দ্বারা বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রভাবিত হয়। তারপরও সেই অভিনয়শিল্পী ভুল থেকে শিক্ষা নেন, হয়তো আবারও ভুল করেন। অবশ্য এটা সবারই, সব পেশাজীবীর ক্ষেত্রেই অনেকখানি প্রযোজ্য।
বাংলাদেশে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির আজকের যে অবস্থা, এর জন্য দায়ী আমাদের সম্মিলিত ভুল শোধরানোর অভাব। আমরা যে ভুলগুলো করি, সেটাই বার বার করি; শিক্ষা নিই না। আর এখানে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের ভুল শোধরানোর পরিবেশও নাই। সবাই প্রায় একই রকমভাবেই ভুল করে যাচ্ছে। এখানে স্বাধীনতার এতো বছর পরও কোনো চলচ্চিত্র ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা হয়নি। এখানে অনেকেই বাইরের দেশ থেকে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়ে এসেছে। তারাও যে ভালো কিছু করতে পেরেছে, এমন নয়। বর্তমানে তরুণদের একটা বড়ো অংশের মধ্যে চলচ্চিত্র নিয়ে নতুন নতুন ভাবনা আছে--তারা গল্প লিখছে, চলচ্চিত্র বানাচ্ছে। এদের অধিকাংশেরই চলচ্চিত্র নিয়ে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার ব্যবস্থা নেই। আমরা আশা করি, এই অবস্থার নিরসন হবে খুব শিগগিরই; চলচ্চিত্র বোঝাপড়ার একটা পরিবেশ খুব দ্রুতই তৈরি হবে বাংলাদেশে।
‘ম্যাজিক লণ্ঠন' সেই ২০১১ খ্রিস্টাব্দ থেকেই চলচ্চিত্র নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা-আলোচনা-সমালোচনা করে আসছে। আমরা মনে করি, সমালোচনা-আলোচনাও চলচ্চিত্রিক পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা'।
কথা আর বাড়াচ্ছি না। সবাই আমাদের অতিথি রাইসুল ইসলাম আসাদের কথা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।
শাওন : ধন্যবাদ শফিকুল ইসলামকে। আমরা আর বিলম্ব না করে আয়োজনের মূল অংশে চলে যাবো। আর একটি বিষয় জানিয়ে রাখি, কথা উপস্থাপনের পর সবার অংশগ্রহণে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কথা উপস্থাপন চলাকালে আপনাদের সবার কাছে একটি সাদা কাগজ পৌঁছে যাবে। সেখানে আপনার প্রশ্ন, নাম ও নিজের বিভাগ লিখে আমাদের সদস্যদের হাতে দিয়ে দিবেন। সবশেষে সেইসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করবেন আমাদের আজকের অতিথি। এ পর্যায়ে ‘অভিনয় জীবন : ভুল করতে করতে শেখা, আবার নতুন ভুল করা' নিয়ে কথা উপস্থাপন করবেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। তাকে অনুরোধ করছি কথা উপস্থাপনের জন্য।
রাইসুল ইসলাম আসাদ : এভাবে এখানে দাঁড়িয়ে, সবাইকে সামনে রেখে নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয়। কারণ এ দায়িত্ব নিতে গেলে বা এ কর্মটি করতে গেলে একটি মানুষের যা যা করা দরকার, তার কিছুই আমি করতে পারিনি এখনো। তার চেয়ে বরং এর পিছনে যদি একটা পর্দা থাকতো এবং সেই পর্দায় ভুল করতে করতে যা শিখেছি তার কিছু ছায়া, চলমান চিত্র যদি দেখানো হতো; যে কর্মগুলো করেছি তার কিছু অংশ, তার ভিতরে হয়তো আরো নতুন ভুল থাকতো; তাহলে আমার জন্য এই কাজটি সহজ হতো। সেটা দেখে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সহজ হতো।
দাঁড়িয়ে কথা বলা, বক্তৃতা করা, এখান থেকে যা বলবো সবাই শুনবে, ভালো লাগলেও শুনবে, না লাগলেও হয়তো শুনতে হবে--এ রকম একটা বাধ্যবাধকতা দাঁড়িয়ে যায় এ ধরনের পরিস্থিতিতে। আমি কথায় বিশ্বাস করি না, কর্মে বিশ্বাস করি। আর কর্ম করলেই ভুল হয়, কর্ম না করলে ভুল হওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকে না।
স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে বেঁচে ফিরে আসার পর যাদের সঙ্গে এই যুদ্ধে ছিলাম, যারা বেঁচে রইলো, তারা অনেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত ছিলো। আমি তার আগ পর্যন্ত কখনো স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্নও দেখিনি, এই রকম একটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করবো। এই ফাঁকে একটু বলে রাখি, সব কথার মধ্যে আমি আমি চলে আসছে; জীবনে আমি আমি বা আমিত্বটা বাদ দিয়ে যদি আমরা হয়ে যাই, তাহলে আমাদের জন্য ভালো হবে; আমরা এগোতে পারবো; আমাদের কর্মকাণ্ড সুন্দর ও সঠিকভাবে করতে পারবো। শুধু আমি বা আমিত্ব যদি চলে আসে, তাহলে সেখানে এগিয়ে যাওয়ার যে ব্যাপার, সেগুলো সমস্যায় জর্জরিত হতে পারে। আমাদের সমাজে, আমরা যে বাঙালি জাতি, তাদের মধ্যে এই একটা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে বর্তমানে--এই আমি আমি। সবাইকে অনুরোধ করবো, ভালো লাগুক আর না লাগুক এই ‘আমি' থেকে বেরিয়ে আসবেন দয়া করে।
যাই হোক, যা স্বপ্ন দেখিনি কোনোদিন, দুঃস্বপ্নও দেখিনি, সেই কাজটিতে আমাকে জবরদস্তিভাবে যুক্ত করা হলো--থিয়েটারে। সেটা মঞ্চের কোনো কাজ নয়, মঞ্চের পিছনে যে কাজ থাকে সেখানে। তারপর একদিন হঠাৎ করে এক শিল্পীর অনুপস্থিতিতে আমাকে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় একটি দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য। সেটা তেমন কিছুই নয়, একটি চায়ের দোকানের দৃশ্য। যে ছেলেটি চা দেয় সবাইকে, সে একটি চায়ের কাপ রাখবে এবং চলে যাবে। আমি তাদের অনেক অনুরোধ করলাম, কাজটি আমাকে দিয়ে হবে না। কারণ এ রকম কাজ আমি জীবনে কোনোদিন করিনি এবং আমার পক্ষে সম্ভবও নয়। বরং এমনিতেই সবাইকে চা খাওয়ানো, রিহার্সেলের জায়গা ঝাড়ু দেওয়া, অন্য যেসব কর্মকাণ্ড আমি করছি নিয়মিত, সেটাই আমার কাজ। তারা শুনলো না, কারণ তাদের কাজ বন্ধ হয়ে আছে, এটা করতেই হবে। শেষমেষ রাজি হলাম; কিন্তু বললাম, আমি করবো তবে যারা রিহার্সেল করছে আমি তাদের পিছন দিয়ে ঢুকবো, সামনাসামনি করতে পারবো না। তারা বললো, তাই করো, রিহার্সেল আটকে আছে। আমি ঢুকলাম, চায়ের কাপটা রাখলাম, চলে গেলাম। পরের দিন আবার গেলাম, সেদিনও সে আসেনি। এবার আমাকে বললো, তুমি যাবে এবং বের হওয়ার সময় জিজ্ঞেস করবে, এই কতো হয়েছে রে? তুমি বলবে, এতো। আমি বললাম, আমি কথা বলতে পারবো না। তারা বললো, রিহার্সেল আটকে আছে, তাড়াতাড়ি করো! আমি বললাম, আমি এটা বলবো কিন্তু বাইরে গিয়ে। বললো ঠিক আছে, তাই করো। বাইরে গিয়ে কথাটা উচ্চারণ করলাম। এভাবে প্রতিদিন যাই, একটু করে বদলে যাই, একটু একটু করে সংলাপ বেড়ে যায়। এই করতে করতে যেদিন নাটকটি মঞ্চস্থ হলো, সেদিন সেই নাটকে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এটা কেনো করলাম, কী কারণে করলাম, আজও তার হিসাব মেলাতে পারি না।
এভাবেই শুরু। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ। মঞ্চে কাজ করতে করতে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে খান আতাউর রহমান নির্মাণ করলেন আবার তোরা মানুষ হ। তাতে জোর করে ধরে নিয়ে গেলো আমাদের কয়েকজনকে এবং অভিনয় করতে হলো। এই হলো অভিনয়ের শুরু। না জেনে, না বুঝে, না শিখে আমরা তখন কাজ শুরু করেছিলাম; সেসময় স্বাধীন বাংলাদেশে অবশ্য এই কাজটি শিখে করার মতো অবস্থা বা ব্যবস্থাও ছিলো না। এর পরে অনেকেই বিভিন্ন দেশে গেছে শিখতে, ভারতে গেছে, বিভিন্ন জায়গায় গেছে। কিন্তু তখন আমরা এমনভাবে কর্মে যুক্ত হয়ে গেছি, জড়িয়ে গেছি; এরই মধ্যে দল তৈরি হয়ে গেছে, চলচ্চিত্রে কাজ করছি; আমার আর জীবনে এটি শেখা হলো না। তাই ভুল করতে করতে শেখা এবং এখনো ভুল করছি। ভুল করে যাচ্ছি এবং শিখছি। এ শেখার কোনো শেষ নেই, আর অভিনয়েরও কোনো শেষ নেই।
অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। এখন যখন পিছনের দিকে তাকাই, মনে হয় যা করলাম, যতো ভুল করেছি, তা থেকে যা শিখেছি, তাতে করে আমি কতো নম্বর পাবো? নিজেকে পাস মার্ক দিতে পারি না। সেই জন্য যে কথাটা বললাম, এখানে এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে নিজেকে বড়ো অপরাধী মনে হয়। কারণ না শিখে, না জেনে-বুঝে যে পথ অতিক্রম করে এসেছি তাতে বোধ হয় ভুলের সংখ্যাই অনেক বেশি। সেই ভুল থেকে বেরোতে জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আর কতোদিন আছে জানি না। আরো কতো ভুল করবো, তাও জানি না।
আমার সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয় বলতে। কারণ আমরা যে অভিনয় করি তাতে আমাদের একটি স্ক্রিপ্ট থাকে, সংলাপ লেখা থাকে, পরিচালক বুঝিয়ে দেয়, সে অনুযায়ী সে কথাগুলো আমরা আওড়াই। এভাবেই আমরা কাজ করি। ফলে নিজে কথা বলার জন্য যে চর্চার প্রয়োজন হয়, সেটা নেই। আর অভ্যাস না থাকাতে, চর্চা না থাকাতে একই কথা বার বার ঘুরেফিরে বলি। এটা আমার নিজের কাছে মনে হয়। এখানে আমাকে জবরদস্তি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, আমাকে এ কাজটা না করিয়ে একটা সিনেমা বা আমার কোনো কাজ দেখিয়ে দেওয়া হোক। তার পরে আমি দাঁড়াই, আমার ভুলগুলো ধরুক, আমাকে জিজ্ঞেস করুক কেনো এই ভুলটা হয়েছে বা এই জায়গাটা ভালো লেগেছে; সেটা কেনো হলো কেমন করে হলো, তার উত্তর দেওয়া আমার জন্য অনেক সহজ ছিলো। কিন্তু কথাই বলতে হবে! যেটুকু বুঝেছি এই ক’বছর কাজ করতে করতে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে--পরিচালকদের সঙ্গে, অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে, যারা অন্যান্য কাজ করে, ক্যামেরাম্যান থেকে মেকআপম্যান, লাইটম্যান, প্রোডাকশন বয়--তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্র উৎসবে গিয়েছি, সেখানে অনেক পরিচালক-অভিনয়শিল্পীর সঙ্গে মিশে শিখেছি। অনেক সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, সেখান থেকে কিছু কিছু জিনিস বুঝতে পেরেছি। এখনো অনেক কিছু বোঝার বাকি।
তবে একটা জিনিস বুঝেছি, অভিনয় শিখিয়ে দেওয়া যায় না; অভিনয় গুলিয়ে খাইয়ে দেওয়া যায় না; ওটা করতে হয়। করতে করতে শিখতে হয়। এখন অভিনয় পাঠ অনেক জায়গায় অনেক রকমভাবে হচ্ছে। শিক্ষকরা অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু একটা জিনিস বুঝেছি, অভিনয় যারা পড়ছে বা অভিনয় নিয়ে পড়ে অনেক ভালো ফল করছে; কিন্তু যখন সরাসরি অভিনয় করতে আসছে, তাদের অনেকেই অভিনয়টা ঠিকমতো করতে পারছে না। আরেকটা জিনিস বুঝেছি, পাথর দুই রকমের হয়--একটা ঘষলে ধার হয়, আরেকটা ঘষলে ক্ষয় হয়। এ রকম অনেক অভিনয়শিল্পী আছে যারা ভুল করার জন্য নিজেকে ঘষতে থাকে। তাদের কেউ ক্ষয়ে যায়, আবার কেউ কেউ ধার হয়। যে ধার হয় সে অভিনয়শিল্পী হতে পারে; যে ধার হয় না সে কখনো অভিনয়শিল্পী হতে পারে না। এটা আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা।
শুধু পড়ে অভিনয় করা যায় না। তবে পড়াটা থাকলে, জানা থাকলে এবং সেটা একটা সিস্টেমেটিক ওয়েতে জানা থাকলে কাজটা করতে সুবিধা হয়। ভুলের সংখ্যাও কম হয়। আর আমরা যারা শুধুই ঘষতে ঘষতে, করতে করতে এ পর্যন্ত এসেছি, তাদের ভুলের সংখ্যাটা একটু বেশিই হয়। ঘষতে সময় লাগে। আর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, এটি পরিচালকের মাধ্যম। পরিচালক একটি চলচ্চিত্রে কী করবেন, কীভাবে করবেন, সেটার মাধ্যমে কী তুলে ধরবেন, কীভাবে তুলে ধরবেন, সবকিছু তার নিজের ইচ্ছা ও চাওয়া অনুযায়ী হয়। এজন্য বলা হয়, একটি চলচ্চিত্রের সত্যিকারের পিতা হচ্ছে পরিচালক। আমরা যারা অভিনয়শিল্পী চলচ্চিত্রে অভিনয় করি, তারা কেবল এর অংশ মাত্র। পরিচালক যেভাবে চাইবেন, করাবেন, সেভাবেই আমাদের করতে হয়। তবে হ্যাঁ, সেখানেও কথা আছে। যেমন, অনেক সময় মনে হয়, উনি যেটা বলছেন, সেটার সঙ্গে হয়তো আমার ভাবনার দ্বিমত আছে। সেই সময় যেটা হয়, তার সঙ্গে আলোচনা করা যায়; যদি সেই আলোচনাটা করার সুযোগ তিনি দেন। আবার এমন পরিচালকও আছেন, যারা বলবেন না, আমি কিছু শুনতে চাই না, শুনতে রাজি না। আমি এইভাবে ভেবেছি, এইভাবেই করতে হবে। কারণ তার মাথায়, তার ভাবনায়, বোধে পুরো চলচ্চিত্রটি। আমার অভিনয় বা চরিত্রটি একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তবে এমন অনেক পরিচালক আছে, কিছু বলতে চাইলে তা শোনে। তখন তার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, আদান-প্রদান হয় এবং তার মধ্যে দিয়ে হয়তো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়। অথবা উনি যেটা বলেন, সেটাই করতে হয়। একজন অভিনয়শিল্পীর একশো ভাগ দায়িত্ব হচ্ছে পরিচালক যেভাবে চাইছে, সেভাবে কাজ করা; সেভাবে চরিত্রটাকে তুলে ধরা। এটা আমি এতো বছর ধরে শিখেছি। পরিচালকই সর্বেসর্বা। উনি যেভাবে চাইবেন, যেভাবে বলবেন, তা আমাকে মেনে নিয়ে সেইভাবে চরিত্রকে তুলে ধরতে হবে। কখনো সেটা ভুল হয়, তখন আবার করতে হয়।
এমনও হয়েছে একটি দৃশ্যের কোনো একটি শট্ ৩০-৩৫ বার করেছি। হঠাৎ করে পরিচালক থামিয়ে দিয়ে চিন্তা করে বললেন, ওই দুই নম্বর শটটা রেখে দাও। ওটাই ঠিক আছে। তখন মনে মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে এতোক্ষণ ধরে একই কাজ কেনো করলাম? কী কারণে করলাম? উনি হয়তো এর চাইতে আরো ভালো কাজ চাইছেন; নতুন কিছু চাইছিলেন কিন্তু পাচ্ছেন না। আমি করতে পারছি না, তাই সেটা হচ্ছে না। এগুলো নিয়ে যখন পরিচালকের সঙ্গে কথা বলেছি, তখন অনেক সময় দেখা গেছে উনি বলেন, আমি ভাবছিলাম ওটাই ঠিক ছিলো, কিন্তু দেখছিলাম তোমরা অন্য আরো কিছু করতে পারো কি না। আসলে ব্যাপারটা এ রকমই। এতো বছর পর কাজ করে এটুকু বলতে পারি, অভিনয়টা সহজ কাজ নয়। এটা সঠিকভাবে তুলে ধরা অত্যন্ত কঠিন। কারণ আমি একজন মানুষ। ব্যক্তি হিসেবে আমার চিন্তাভাবনা, বোধ, চলমানতা একরকম। রাইসুল ইসলাম আসাদ একরকম। কিন্তু যখন আরেকটি চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন বা স্থাপন করি, তখন সেটি কঠিন কাজ, দুরূহ কাজ। সেটি সেই চরিত্র মোতাবেক হবে কি না বা হচ্ছে কি না সেটি নির্ধারণ করবে পরিচালক। এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের পর যখন এটি মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে তখন দর্শক নির্ধারণ করবে, এটি বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে কি না?
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, একই চরিত্র একেকজন অভিনয়শিল্পী একেক রকমভাবে করতে পারে। একেকজন পরিচালক একেক রকমভাবে করিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এমনও হয়েছে, একই চরিত্রে একজন অভিনয়শিল্পী কিছুদিন অভিনয় করার পরে তা পরিচালকের কাছে পছন্দ হচ্ছে না, তখন আরেকজন অভিনয়শিল্পীকে দিয়ে করায়। সেটা আবার আরেক রকম হয়ে যায়। অভিনয় এমন একটি কাজ, যার শেষ বলে কিছু নেই, শুরু বলেও কিছু নেই। এটি একটি চলমানতা।
আরেকটা জিনিস বুঝেছি, এই কাজটি আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে করি, তারা কেউই শতভাগ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ নই। একজন একশো ভাগ সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ বলতে আমরা বিজ্ঞানসম্মতভাবে যা বুঝি, তার পক্ষে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করে তা থাকা সম্ভব নয়। অতএব তার ভিতরে কিছু এলোমেলো ব্যাপার থাকেই। একেবারে সরাসরি বললে পাগলাটে ব্যাপার থাকে। সে কারণেই বোধ হয় দীর্ঘ সময় ধরে আমরা বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করে যেতে পারি, অভিনয় করে যেতে পারি। এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত, যা অনেকের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। অনেকের সঙ্গে এও মেলে না যে, সবাইকে দিয়ে অভিনয় করানো যায় না, সবাই অভিনয় করতে পারে না। ওই যে বললাম, পাথর দুই রকম--ঘষলে একটা ক্ষয় হয়, একটা ধার হয়। পৃথিবীর অনেক অভিনয়শিল্পীর সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে, কেউ এটাকে মানে, কেউ মানে না। তাদের বিশ্বাস, ধ্যানধারণা অন্যরকম। আবার আমি এখানে দাঁড়িয়ে যে কথাগুলো বলে যাচ্ছি, তা একেবারে সত্য নাও হতে পারে। আমি শুধু আমার অভিজ্ঞতা, বোধ, চিন্তা এবং এতো দিনে অভিনয় করতে করতে যা শিখেছি তাই-ই বলছি। তার ভিতরেও আবার নতুন ভুল হয়ে যেতে পারে। কিছুই করার নেই। ওই একই কথা আবার, কাজ করলে ভুল হয়, কাজ না করলে ভুল হয় না। এখন আমরা সিদ্ধান্ত নেবো, আমরা কাজ করবো, নাকি ভুল করার ভয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে একা একা কাটিয়ে দিবো।
বেশি বিরক্ত হলে আমাকে বলবেন, আমি থেমে যাবো। কারণ আমি একই কথা বার বার ঘুরেফিরে বলি। এবং যখন এ রকম কোথাও শুনতে হয়, তখন আমিও বিরক্তবোধ করি, পিছন দিয়ে পালিয়ে যাই। (দর্শক : না, চালিয়ে যান।)
আমি আরেকটা বিষয় বুঝেছি, সবমিলিয়ে যেহেতু আমি মানুষ, অভিনয় করতে গেলে প্রথমে মানুষ হতে হয়। শুধু চোখ, কান, হাত, মুখ থাকলেই তো মানুষ হয় না; অনেক কিছু মিলেই একজন মানুষ। মানুষ হওয়ার চেষ্টাটা করে উঠতে হয় নিজেকে। সেই মানুষ হতে পারলে, তারপর চর্চা করে গেলে হয়তো অভিনেতা হওয়া যায়। এবং তারপর চর্চা করতে থাকলে হয়তো একজন শিল্পী হয়ে ওঠা যায়। তারপর হয়তো ঋষি হওয়া যায়। যার উদাহরণ, সানাইবাদক বিসমিল্লাহ খাঁ। আমার জীবনে যতো শিল্পী, ঋষি বা মানুষ দেখেছি তার মতো এতো বড়ো মাপের শিল্পী খুব কমই দেখেছি। উনি মানুষের অনেক অনেক ওপরে চলে গেছেন। উনার ওপর একটা ডকুমেন্টরি ফিল্ম আছে, মিটিং অ্যা মাইলস্টোন। আমার ধারণা, ওটা এখনো পাওয়া যায়--এখন তো ইন্টারনেটের যুগ, অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে--সম্ভব হলে দেখবেন। আমি এই কারণে বলছি, আমার ওপর যখন অভিনয় বিষয়টা চাপিয়ে দেওয়া হলো এবং প্রথমদিকে অভিনয় করছিলাম, কেউ ভালো বললো, কেউ মন্দ বললো। তারপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কাজটা করতে করতে আমার একসময় ভালো লেগে গেলো। এবং একটা সময় আমার দায়িত্ববোধ জন্মালো। সেই দায়িত্ববোধ, ভালোলাগা, ভালোবাসা থেকে সেই কাজটা ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো করে যাচ্ছি।
এই কাজ করতে করতে অনেক প্রশ্ন আমার মনে এসেছিলো। অনেককে জিজ্ঞেস করেছি, মনে হয়েছে এরা উত্তর দিতে পারবে; কিন্তু সঠিক বা সদুত্তর আমি সেভাবে পাইনি; খুঁজছিলাম। হঠাৎ করে বিসমিল্লাহ সাহেবের ওপর করা ফিল্মটা আমি দেখি। এবং তার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিলো, আমার প্রশ্নের উত্তর তার কাছে পাবো। অনেক চেষ্টা করে তার সঙ্গে দেখা করি; তার বাড়িতে গিয়ে অর্থাৎ বেনারস, কাশীতে গিয়ে। আমি তার সঙ্গে দেখা না করলে বা দেখা না হলে, মানুষ বলতে কী বোঝায় হয়তো কোনোদিন বুঝতেই পারতাম না! উনি অনেক প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিয়েছেন এবং তার জন্য আমাকে থাকতে হয়েছে ওখানে। উনি আমাকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বলেছেন, এই পর্যন্তই আপাতত। এরপরে ভাবতে থাকো, চিন্তা করতে থাকো, কাজ করতে থাকো; এর বেশি বলা যাবে না, এর বেশি বুঝতেও পারবে না; সমস্যা নাই থাকো। আর একটি কথা বলে দিয়েছেন, কাউকে কোনোদিন এই কথাগুলো বলবে না। শুধু যখন বুঝবে আর বেশি সময় নেই জীবনে--যদি চর্চাগুলো করো একসময় বুঝতে পারবে, তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে--তখন যদি তোমার মনে হয় কাউকে বলে যাওয়া দরকার তাহলে বলবে; আর তা না হলে সঙ্গে করে নিয়ে চলে যাবে। এর পরে দ্বিতীয়বার দেখা করবার চেষ্টা করেছি। উনি না করেছেন; বলেছেন, না, এখনো সময় হয়নি। তারপরে উনার আর সময় হয়ইনি; উনি চলে গেছেন। আমিও আর সময় পাইনি। ওই অবস্থাতেই ঝুলছি।
চলচ্চিত্র নিয়ে বা চলচ্চিত্রের অভিনয় নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়, অনেক আলোচনাই করা যায়। তবে আমার জীবনে দেখা চলচ্চিত্র দুই রকম; মানে যেগুলো সিনেমাহলে রিলিজ হয় সেগুলো দুই রকমের। এর একটাকে কমার্শিয়াল, আরেকটাকে বলা হয় আর্টফিল্ম। তবে এটাও ঠিক, এইভাবে ভাগ হয় না চলচ্চিত্রের। ভাগটা আমি যতোটুকু বুঝেছি অনেকের সঙ্গে কথা বলে--নির্মাতা মৃণাল সেন, কিছুদিন আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন--উনার দুটো কথা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি বলতেন সিনেমা দুই রকম--একটি ফরমুলা ফিল্ম, আরেকটি ডিরেক্টরস ফিল্ম। ফরমুলা ফিল্ম হচ্ছে, চলচ্চিত্র নির্মাণের কিছু ফরমুলা থাকে--এতোটুকু হাসি, এতোটুকু কান্না, একটু লড়াই--এগুলো দর্শক পছন্দ করে। সেভাবেই সিনেমা বানানো হয় এবং তা কমার্শিয়ালি সাকসেসফুল হয়। আরেকটি হচ্ছে, পরিচালক তার চিন্তাভাবনা, বিশ্বাস, বোধ নিয়ে তার মতো করে চলচ্চিত্র নির্মাণ করে; সেটা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করে; দর্শক পছন্দ করে বা করে না। এই দুটো ভাগ আমারও মনে হয়। এছাড়া আরো বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র যেমন ডকুমেন্টরি, অ্যানিমেশন আছে। সে কথা না হয় বাদই দিলাম। এই দুই ধরনের চলচ্চিত্রই নির্মাণ করা হয় সিনেমাহলে রিলিজ দেওয়ার জন্য; যে টাকা লগ্নি করা হয়, তা কিছু লভ্যাংশসহ উঠে আসে। এই চিন্তা থেকেই সবাই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। অতএব আমার মনে হয়, সব চলচ্চিত্রই কমার্শিয়াল। যারা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত, সবাই নিশ্চয় এ কথায় একমত হবে।
অভিনয় করতে গিয়ে আর একটা বিষয় দেখতে পাই, অনেকে কথায় কথায় বলে স্টার। অভিনয়শিল্পী ও স্টারের মধ্যে আমি পার্থক্য করি এভাবে--স্টার হতে গেলে বিভিন্ন চরিত্রে একই রকমভাবে, একই ঢঙে অভিনয় করতে হয় এবং সেগুলো দর্শক আবার পছন্দও করে। এই সব অভিনেতার অভিব্যক্তি নকল করে, তাদের ঢঙে কথা বলে, বুঝিয়ে দেওয়া যায় তারা এভাবে অভিনয় করে। আর একজন অভিনয়শিল্পী একেকটি চরিত্রে চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী অভিনয় করে। স্টাররা কোনো চরিত্রে নিজের মতো করে, নিজের ঢঙে ফেলে অভিনয় করে বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করে। এমনও দেখা গেছে, অসম্ভব জনপ্রিয় একজন অভিনেতা, নাম বলছি না, একই ঢঙে অভিনয় করে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে সারাজীবন অভিনয় করে গেছে। এবং ৪০, ৫০, ৮০টা চলচ্চিত্র করার পরও তার কোনো চলচ্চিত্র ফ্লপ নেই, সব হিট। কিন্তু সেই একই ঢঙে তার অভিব্যক্তিগুলো দিয়ে গেছে প্রত্যেকটা চরিত্রের ক্ষেত্রে; সেটাও কিন্তু অনেক বড়ো ক্ষমতার ব্যাপার। অবশ্য দর্শক সেটাই পছন্দ করেছে। দর্শক সেটাই চেয়েছে বোধ হয় তার কাছে। কারণ তা না হলে তিনি একই জিনিস কেনো করে গেলেন? এর বাইরে কেনো কিছু করলেন না? এর উত্তর আমি আজও দিতে পারি না।
আমি যেটা মনে করি, একটি চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য যতোটুকু সম্ভব, সেই চরিত্রের কাছাকাছি যেতে হয়। সেটা কীভাবে হবে--পরিচালক সেই চরিত্রটাকে কীভাবে ভাবছে, কীভাবে দেখছে, সেই চরিত্র আমার জানা আছে কি না, দেখা আছে কি না, করা আছে কি না। তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে, অভিনয় করতে হলে আমাকে পড়তে হবে, জানতে হবে, দেখতে হবে। পৃথিবীতে যতো চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে তার থেকে যতোগুলো সম্ভব দেখে ফেলা দরকার এবং সেটা নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের আলোচনা করা দরকার। দলগতভাবে অথবা কাউকে না পেলে একাই আলোচনা করা দরকার। আমি যখন অভিনয় শুরু করি, সেই সময় ‘ড্রামা সার্কেল' নামে একটি নাটকের দল ছিলো। তৎকালীন পাকিস্তানে এই বাংলায় প্রথম গ্রুপ থিয়েটার সেটি। তাতে যারা কাজ করতো, তাদের অনেকেই ভালো ভালো থিয়েটার করেছে। বেশ কয়েক বছর যাওয়ার পর তারা বিভিন্ন জন বিভিন্ন দিকে চলে যায় এবং পরবর্তী সময়ে এর কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ফজলুল করিম সাহেব বলে একজন ছিলেন। স্বাধীনতার পরে ফিরে এসে তিনি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে নাটক করেছিলেন বার্নাড শ'র ‘আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান'। সেই নাটকে উনি আমাকে নিয়োগ দেন। আমার এই চলমান অভিনয় জীবনে এই একজনকে পেয়েছি, ছয় মাস একটানা সকাল ১০টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত প্রতিদিন সব কাজকর্ম বাদ দিয়ে, ইউনিভার্সিটির সব ফেলে তার সঙ্গে ছিলাম। পাঁচটার পরে রিহার্সেল শুরু হতো; করতাম রাত নয়টা পর্যন্ত। উনার কাছ থেকে ওই ছয় মাসে যা পেয়েছি, সেই পুঁজি নিয়ে, সেটাকে চর্চা করে এখনো চলছি। উনি বলতেন, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তুমি চর্চা করবে, কণ্ঠ ঠিক করবে, শরীর ঠিক করবে, মঞ্চের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে, অভিনয়ের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে, ততোক্ষণ পর্যন্ত হবে না। যা যা শিখিয়েছি এগুলো তুমি চর্চা করতে থাকবে যতোক্ষণ পর্যন্ত তোমার বাড়ির আশপাশের যতো ভাড়াটিয়া আছে, তারা বাড়ি ছেড়ে চলে না যায়! অথবা রিকশা দিয়ে কোথাও যাচ্ছো, রিকশাওয়ালা বার বার পিছনে তাকাতে তাকাতে তোমাকে পাগল ভেবে একসময় অ্যাকসিডেন্ট হলে তুমিসহ পড়ে যাবে--এ রকম কয়েকটা কথা বলেছিলেন। এগুলো যদি হয়, যদি দেখো জীবনে ঘটছে, তাহলে বুঝবে তুমি আস্তে আস্তে শেখার কাছে পৌঁছাতে পারছো, শেখা শুরু হয়েছে। এভাবে পড়তে হয়, যেটা আমি দেখেছি। এখন এটা কি বর্তমান বিশ্বে, আমাদের পরিবেশে, সমাজে, অবস্থানে সম্ভব? আমি জানি না। এ রকম হলে, পাগল হিসেবে ধরে পাগলাগারদে পাঠিয়ে দিতে পারে; এর জন্য কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে! এইভাবে অনেক কিছুর ভিতর দিয়ে আস্তে আস্তে সেই অভিনয়ের জায়গাটায় পৌঁছার চেষ্টা করতে হয়।
আমার দেখা মতে, বাংলা চলচ্চিত্রে আমরা যারা অভিনয় করি--একটা সময় ছিলো একধরনের ঢঙে অভিনয় করতো আমাদের এই দুই বাংলার জনগোষ্ঠীতে, একটু উচ্চস্বরে অভিনয় করতো, অন্য ঢঙে অভিনয় করতো। আমার দেখা একমাত্র উত্তম কুমার সেই জায়গাটা ভেঙে স্বাভাবিক অভিনয়ের জায়গাতে নিয়ে গেছেন। আর এজন্য তার পর পর সাত-আটটা সিনেমা ফ্লপ হয়েছিলো। দর্শক দেখেনি, নেয়নি; কারণ যে ঢঙে অভিনয় দেখে দর্শক অভ্যস্ত, সেটাকে ভাঙতে গেলে, ভেঙে অন্য জায়গায় স্বাভাবিকতায় নিয়ে যেতে গেলে সহজে তা দর্শক গ্রহণ করে না। তার পরেও তাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে উত্তম কুমার, উত্তম কুমার হয়েছেন। এখন কোনো অভিনয়শিল্পীর দুই-চারটা সিনেমা পর পর ফ্লপ হলে তাকে দিয়ে কেউ আর সিনেমা বানাবে? তাই সেই সময়ের অবস্থা এবং এখনকার অবস্থা অনেক বদলে গেছে। এখন আমাদের ধৈর্য নেই কোনো কিছুতে। কারণ আমরা সব কালকেই চাই, বড়জোর পরশু। এর পরে হলে আর হয় না। এই যে চাওয়া, আমাদের আকুতি--এখনই সব পেতে হবে, সব করতে হবে। যেমন, অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করে, কী ব্যাপার আপনি পরিচালনা, প্রযোজনা করছেন না কেনো? আমি তখন এইটুকু বলে উত্তর দেই, কেনো আমার প্রয়োজনটা কী? যে কাজটা করছি, যে কাজটা ভালো লেগেছে, যেটা দায়িত্ব মনে হয়েছে, সেটাই করে যাচ্ছি, এখনো করছি। সেটা কেনো বাদ দিয়ে আমাকে আরেকটি কাজ করতে হবে? তাহলে তো আমাকে নতুন করে সব শিখতে হবে। বলে না না, আপনি এতোদিন ধরে অভিনয় করছেন, আপনি তো সবই জানেন। আমি বুঝি না, যারা এসব আমাকে বলছে, তাদের সঙ্গে আমি তর্ক করবো কি না। একসময় তর্ক করতাম কিন্তু এখন আর করি না। বলি, ভাই কী করবো বলেন, আমি তো আসলে এটাই পারি না, আবার ওটা কী করে করবো। তো তারা এতে করে আমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে।
একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে একজন পরিচালককে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ পর্যন্ত সব জানতে হয়। আর আমি তো সেই জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠের মাঝখানে যদি একশোটি কাজ থাকে, তার মধ্যে একটিও জানি না। যে একটা জানি, সেটাও ঠিকমতো করতে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। তাহলে অতো ঝামেলায় যাবো কেনো? কিন্তু আমাদের এখানে এখন দেখি, যিনি পরিচালক তিনিই অভিনেতা, তিনিই প্রযোজক, তিনিই সব! সবাই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়ে যাচ্ছি! হাজার বছরেও এই রকম একজন জন্মায় কি না সন্দেহ, অথচ আমরা সবাই সেটা করার জন্যই কতো চেষ্টা করছি! জানি না আমরা কোথায় যাচ্ছি, আমাদের কী হবে! আর কথা বলার দরকার আছে এই প্রসঙ্গে?চলচ্চিত্র যে নির্মাণ হয়, সেটা আসলে কী? উনারা ঠিক কী দেখায়? চলচ্চিত্র বাস্তবতা নয়, কিন্তু বাস্তবতা। মানে যা যা দেখানো হচ্ছে, সেটা বিশ্বাসযোগ্য কি না বাস্তবতার সঙ্গে, সেটাই মুখ্য বিষয়। অর্থাৎ এটাকে বলা হয় সিলেক্টিভ রিয়েলিটি। মানে একটা বাস্তব বিষয় বা বাস্তব ঘটনা যাই হোক না কেনো, সেটাকে বাস্তবসঙ্গত করে তুলে ধরতে হয় দর্শকের সামনে। আমাদের দেশের একটি বাস্তব উদাহরণ দিই, সেই ৫০-এর দশকে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলো এখানে। এক পরিচালকের নায়ক ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যাবে, উনি তো মহা চিন্তায় পড়ে গেলেন; ঢাকা থেকে যেতে তো অনেক শুটিং করা লাগবে। তখন সেলুলয়েডে শুটিং হতো। সেলুলয়েড ফিল্মের দাম কম ছিলো, ক্যামেরার ভাড়াও অনেক কম ছিলো। উনি সব লোকলস্কর জোগাড় করে ফিল্মের নেগেটিভ কিনে ক্যামেরাম্যান, আর্টিস্ট নিয়ে ঢাকা থেকে বাসে উঠে রওনা হলেন শুটিং করতে। বাসে উঠতে শুটিং করলেন, বাসে উঠে করলেন, মাঝেমধ্যে বাস থামিয়ে করলেন। এই রকমভাবে শুটিং করতে করতে কক্সবাজারে গেলেন। তিন-চার দিন পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারে যাওয়ার শুটিং করলেন। এতে করে প্রায় কয়েক হাজার ফুট শুট হয়ে গেলো! আড়াই ঘণ্টা তিন ঘণ্টা শুটিং হয়ে গেছে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়াতেই! অথচ তার গল্পে এটা কিছুই না। নায়ক ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাবে, তারপর নায়িকার সঙ্গে তার দেখা হবে। কিন্তু উনি তো তার আগেই একটা সিনেমার যা দৈর্ঘ্য তার থেকে বেশি শুট করে ফেলেছেন! একই অবস্থা হয়েছিলো রাজেন তরফদারের গঙ্গার ক্ষেত্রে। সেই সিনেমাও এক লাখ কতো হাজার ফুট ফুটেজ যেনো শুট করা হয়েছিলো! কিন্তু দেখানো হয় মাত্র ১২-১৪ হাজার ফুট ফুটেজ।
যাই হোক, যখন এই পরিস্থিতি, তখন তো ওই পরিচালকের মাথা খারাপ হওয়ার অবস্থা। তিনি ঢাকায় ফিরে এসে ঠিক কী করবেন বুঝতে পারছেন না। তখন তার এডিটরকে বললেন, আমি তো এই অবস্থায় পড়ে গেছি, এখন কীভাবে কী করবো। এডিটর বললেন, কোনো অসুবিধা নেই, তুমি তোমার বাদবাকি যা দৃশ্য সব শুটিং করে নিয়ে আসো, তারপর আমি ঠিক করবো। তোমাকে এটা নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। উনি সব শুটিং করার পর এডিটর বললেন, কোথায় কী শুটিং করেছো দাও। এডিটিং টেবিলে বসে উনি পরিচালককে বললেন, একটা ছেলে দাও, যে আমাকে সহযোগিতা করতে পারবে। এডিটর পরদিন সবকিছু ঠিকঠাক করে পরিচালককে ডাকলেন--দেখো তো, তোমার নায়ক ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে কক্সবাজারে নেমেছে, এটা বোঝা যায় কি না? নায়কের বাসে ওঠার একটা শট্, সিটে বসার শট্, বাইরে তাকানোর শট্, বাস চলার শট্, বাস কক্সবাজারে ঢুকছে এই রকম একটা শট্, বাসটি থামার একটা শট্। মোট ছয়টি শটে এক মিনিট বা তারও কম সময়ের ভিতরে কাজটি করা হলো। এডিটর বললেন, বোঝা যায় নায়ক ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে বাসে করে কক্সবাজারে নেমে বিচের দিকে চলে যাচ্ছে? পরিচালক বললেন, হ্যাঁ, সবই তো বোঝা যাচ্ছে। এডিটর বললেন, এটাই হচ্ছে তোমার চিত্রনাট্য, আর এ অনুযায়ীই তোমাকে শুটিং করতে হবে। এই যে ব্যাপারটা, তার মানে কী? এর মধ্যে কিন্তু রিয়েলিটি আছে। টোটাল রিয়েলিটি তো ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া পর্যন্ত। এখন আমি যখন ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাবো বাসে করে, তখন আমাকে তো সব বাস্তবতা পার করে ওখানে পৌঁছাতে হবে। এজন্য আমাকে তখন কী করতে হবে? চলচ্চিত্র করতে গেলে আমাকে সিলেক্ট করতে হবে, আমি কোন কোন জিনিস দিয়ে আমার দর্শককে বুঝাবো, আমি কক্সবাজারে পৌঁছেছি। আমি কী দেখাবো, তার মধ্যে কী করবো, এটা সিলেক্ট করতে হবে। এটা ডকুমেন্টেশন বা ডকুমেন্টরি না।
আর একটা ব্যাপার আছে, দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি। দর্শকও এগুলো দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়। অনেক সময় কিছু জিনিস ফ্লাশব্যাকে দেখানো হয়। যখনই ফ্লাশব্যাকে যাবো, তখনই ধীরে ধীরে ক্যামেরাটি নায়ক বা নায়িকার কাছাকাছি চলে যেতো, তারপর সেখান থেকে কেটে ফ্লাশব্যাক করা হতো। আবার যখন ফিরে আসতো, তখন তার মুখের উপর ফিরে আসতো। সেখান থেকে আবার পরবর্তী শট্। এখন কিন্তু এটা আর লাগে না। এখন এ রকম ক্লোজে না গিয়ে ডাইরেক্ট কেটে সোজা চলে যায়। দর্শকও বুঝতে পারে; কারণ আস্তে আস্তে দেখতে দেখতে তারও শিক্ষা হতে থাকে, সে অভ্যস্ত হয়, তারও বিশ্বাসযোগ্যতা জন্মায়--এটা সিলেক্টিভ রিয়েলিটির কারণে। ফলে ফিল্ম হচ্ছে সিলেক্টিভ রিয়েলিটি।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও কী করবো, কী দিয়ে জিনিসটাকে তুলে ধরবো, সেটাও নির্ধারণ করতে হবে পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে। এভাবে একটি চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হলে সিলেক্টিভ করতে হয়। আরেকটা উদাহরণ দিই, ভারতের দুই জন খুব বিখ্যাত নারী অভিনয়শিল্পী। একজন স্মিতা পাতিল, উনি পৃথিবীতে নেই; আরেকজন শাবানা আজমি। দুজনই অসম্ভব ক্ষমতাধর, শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী। একই সিনেমায় দুই জন অভিনয়ও করেছেন। কেউ কারো চেয়ে কম না। একেবারে যাকে বলে, সেয়ানে সেয়ান। এই দুই জনের অভিনয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। দুই জন দুইভাবে অভিনয় করেন। এর আগে অনেককেই আমি প্রশ্ন করেছি, কখনো কেউই তা বলতে পারেনি। আমি শাবানা আজমির সঙ্গে একটা কাজ করেছি, সেটা হিন্দি সিনেমা বাতান-এ। সেই সময়ে উনার সঙ্গে প্রায় এক বছরের বেশি আমি কাজ করেছি, একসঙ্গে থেকেছি, কথা বলেছি, জেনেছি। এই সব প্রশ্ন, এই সব আলোচনা, তার সঙ্গে আমি করেছি। আমি যখন প্রশ্নগুলো করেছিলাম, তখন উনি বলেছিলেন, তোমার কী মনে হয়? আমি বলেছিলাম, বলবো না। আমি তোমার কাছ থেকে পার্থক্য জানতে চাচ্ছি। তুমি তো তার সঙ্গে অভিনয় করেছো, তুমি নিজেও এতো বড়ো অভিনয়শিল্পী, সেও বড়ো অভিনয়শিল্পী। আমি তোমার কাছ থেকেই জানতে চাই। শাবানা আজমি বললেন, তুমি এক কাজ করো, কাগজে লিখে আনো, আমি কাগজে লিখে রাখবো, দেখি মিলে কি না। তাই করলাম, আমাদের মত মিলে গিয়েছিলো। দুই জনের পার্থক্য হচ্ছে--একটি সেটে তাদেরকে যদি বলা হয় এখান থেকে হেঁটে ওখানে যাবে, তারপর একটি জিনিস তুলে এনে এখানে রাখবে। একই জিনিস যখন দুই জনকে করতে দেওয়া হলে, স্মিতা এই কাজটার ভিতর আরো ১০টা জিনিস করবে এবং সেগুলো পারফেক্টলি করবে। কিন্তু শাবানা আজমি একই শটে ওই কাজটার ভিতরে তিন-চারটার বেশি কোনো কাজ করবে না। আমি শাবানাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এটা কেনো? তখন উনি বলেছিলেন, আমি অসম্ভব অলস শিল্পী, আমি বেশি কাজ করতে রাজি না। আর আমি এও জানি, বেশি কাজ করলে ভুল হবে। আর স্মিতা আমার চেয়ে বড়ো মাপের অভিনয়শিল্পী। কারণ ও প্রত্যেকটা কাজ পারফেক্টলি করতে পারে। সেখানে যদি ২০টাও অ্যাক্টিভিটিস থাকে, ২০টা মুভমেন্ট থাকে, ও প্রতিটি পারফেক্টলি করবে। আর আমি ২০টি করতে গেলে ছয়টিই ভুল হয়ে যাবে। সেই জন্য আমাকে দিয়ে যতো কম কাজ করা যায়, আর ওকে দিয়ে যতো বেশি করা যায়। এই হচ্ছে তাদের বেসিক পার্থক্য। কিন্তু দিনশেষে দুই জনই কিন্তু বিশাল অভিনয়শিল্পী।
অভিনয়ের তো কোনো ফরমুলা নাই, কোনো শর্টকাট নাই। কে কীভাবে অভিনয় করছে, পরিচালক তাকে দিয়ে কীভাবে করাচ্ছে, সেটাকে কতোটুকু বিশ্বাসযোগ্য করে দর্শকের সামনে উপস্থাপন হলো এবং দর্শক কীভাবে গ্রহণ করলো, তার ওপর নির্ভর করে। এর শেষ কথা বলে কিছু নেই। অভিনয় এমন একটা জিনিস--অভিনয় করতে হবে, করে অভিনয় শিখতে হবে। অভিনয় না করে অভিনয় শেখা যায় না। আরেকটা জিনিস হচ্ছে অভিনয়টা অঙ্ক করার মতো। আমার মনে আছে, ছোটোবেলায় অ্যালজেবরা, জ্যামিতি করেছি, কতো কী করেছি। এখন যদি সেগুলো আমাকে দেওয়া হয়, আমার কাছে তো হিব্রু ভাষা মনে হবে! অথচ তখন তো অনেক বেশি বেশি নম্বর পেয়ে পাস করেছি এস এস সি, এইচ এস সি। অনেক নম্বর পেয়েছি অঙ্কে। কেনো এখন কিছু পারবো না? কারণ আমার চর্চা নেই। অভিনয়টাও তাই; এটা চর্চা করতে হয়। চর্চা না করে যদি দূরে চলে যাই তাহলে পরে কিন্তু অভিনয়টা ওই অঙ্ক ভুলে যাওয়ার মতোই হবে।
এ তো গেলো একটা দিক; আরেকটা দিক হচ্ছে, হঠাৎ করে একজনকে নিয়ে আসা হলো অভিনয় করার জন্য। কোনোদিন অভিনয় করেনি সে। এখন শুটিং করবে, করলো। সবাই খুব পছন্দ করলো, ভালোবাসলো, বাহবা দিলো। ওরে বাবা এ তো অনেক বড়ো আর্টিস্ট! এই রকমও হয়, হচ্ছে। তাকে আবার আরেকটা চরিত্র দেওয়া হলো। হ্যাঁ, সব ঠিক আছে। তারপর তিন-চারটা করার পর দেখা গেলো, ওই প্রথমটাতে সে যে অভিনয় করেছিলো, ওই একই অভিনয় সবটাতেই করছে। এর বাইরে সে কিছু পারে না। তাহলে সে অভিনয়শিল্পী নয়। কোনো একটা বিশেষ চরিত্র অনুযায়ী তাকে হয়তো মানিয়েছে, তাকে নিয়ে এসেছে, তাকে দিয়ে করিয়েছে, হয়ে গেছে। এখন সব চরিত্র তো আর একরকম হবে না। একেকটা চরিত্র একেক রকম করতে হবে। তখন বোঝা যায়, সে আসলে অভিনয়শিল্পী নাকি অভিনয়শিল্পী নয়। এ রকম অনেক অভিনয়শিল্পী আছে, যারা একটি-দুটি কাজ করার পর আর কোনো কাজ করতে পারেনি বা হয়নি। অনেকেরই ভালো লাগেনি, পছন্দ হয়নি বলে ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু অনেকের একেবারেই হয়নি। কারণ সে যেটুকু করে, যা করে, ওর বাইরে আর কিছুই করতে পারেনি। এটাই হচ্ছে বড়ো ব্যাপার।
(চলবে)
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন