Magic Lanthon

               

মো. হারুন-অর-রশিদ

প্রকাশিত ১১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘কমলা রকেট’ : সেলুলয়েডে বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ

মো. হারুন-অর-রশিদ

 

অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা কীরূপ শক্তিশালী হবে, সেটা আপাতত অনুমান-সম্ভাবনার মধ্যে রেখে অন্তত এ কথা অকপটে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশ ভয়ঙ্কর এক সাংঘর্ষিক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক পক্ষের কেবলই উন্নয়ন আর বিমোচনের বাণী--যেখানে অভাব-আকাঙ্ক্ষা-চাহিদা-দুর্বলতা-ব্যর্থতা-দুরবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি বিমোচন করে উন্নয়নেরও ক্রমাগত উন্নয়ন চলছে। অন্যদিকে উন্নয়নের চোটে বদহজম হওয়ার উপক্রম! মোদ্দাকথা হলো, এক পক্ষ উন্নয়নের ধাঁধায় চোখে সরষে ফুল দেখিয়ে ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে; এর জন্য ‘জন-বিরোধী’ যতো কর্ম করা দরকার কোনোটাই করতে বাদ রাখেনি তারা। আর মসনদ পুনরুদ্ধারে অন্য পক্ষগুলোর অধ্যবসায়েরও যেনো শেষ নেই। এই যে উন্নয়নবাদী-অধ্যবসায়কারীদের কথা বলা হচ্ছে, তারা আর যাই বলুক, যাদের কাঁধে বসে তারা তাদের গল্প বলে চলেছে সেই মানুষগুলোর কথা কিন্তু কেউ কখনো বলছে না। রাষ্ট্রের মানুষকে কেবল ইস্যু বানিয়ে তারা তাদের চর্চা চালিয়ে যায়। অথচ হাহাকারের ধ্বনি আর শোষণের গল্প যেনো ফুরায় না। তবে গল্পকাররা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেনো, দিনশেষে তারা ওই ভদ্র পল্লীর ঈশ্বর।

   এসবের বাইরে আরেকটা ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আছে, যারা আপাতদৃষ্টিতে গোটা অর্থনীতির চালক, নিয়ন্ত্রক--যাদের ইচ্ছা অনিচ্ছায় ঘোরে অর্থনীতির চাকা। যদিও সেই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাকায় পিষ্ট হয় অর্থনীতির প্রকৃত চালকেরা। একমুখী হয় অর্থনীতির গতিপথ। যদিও গতি সঞ্চারকারী এই গোষ্ঠী--প্রকৃত চালকের হেল্পার হওয়ার কথা যাদের, বিশেষ এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তারাই হয়েছে রক্ত-ঘামচোষা চালক। তারপরও খুব সহজে এসব কৃতকর্মের নোংরা পচা দুর্গন্ধ তাদের নাকে পৌঁছায় না। তবে যতোটুকু পৌঁছায় সেটাও তারা সহ্য করতে পারে না। তখন স্পষ্ট হয় প্রকৃত চালকদের গল্প। দিনশেষে কিন্তু উন্নয়ন-অধ্যবসায়বাদী ও অর্থনীতির কথিত চালকরা একপাতেই খায়। পূরণ হয় না কেবল খাবার যোগানদাতাদের মৌলিক চাহিদাটুকু। এমন অবস্থাতেও যখন উন্নয়নের ঢেকুর তোলা হয়, এসব বয়ানে তখন বাংলাদেশের গতিপথ সাংঘর্ষিকই বটে। এরই মধ্যে ১৬ জুন ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পায় চলচ্চিত্র কমলা রকেট। নির্মাতা নূর ইমরান মিঠুর ভাষায়, ‘এই ছবিটা দেখলে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের, মানুষের কিংবা অন্য কারো ছবির মতো মনে হবে না। ... এই সিনেমায় ছোট্ট একটা বাংলাদেশ দেখা যাবে।’ তাই মিঠু যে বাংলাদেশ দেখিয়েছেন, এর বাইরে আর কোনো বাংলাদেশ আছে কি না কিংবা তার বাংলাদেশের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের মিল-অমিল কোথায় সেই অনুসন্ধানটা জরুরি।

দুই.

তুলে দাও, সব ভার সামনে দিলে হবে না।

তুলছি ভাই। এবার ঠিক আছে?

এ ভাই সরেন সরেন, সাইডে ভাই সাইডে। আরে এটা কফিন ভাই, দেখেন একটু।

এরপর কমলা রকেট-এর যাত্রা শুরু। আর দশটা স্টিমারের মতোই ‘কমলা রকেট’ও একটি। নানা পেশা আর শ্রেণি-বৈচিত্র্যের যাত্রী সেখানে। এরই একজন আতিক। পেশায় ব্যবসায়ী। যিনি ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়ার জন্য নিজেরই একটি পুরনো কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটান। অবস্থা বেগতিক বুঝে গা ঢাকা দিতে রওনা হন মংলায় বন্ধুর বাড়ির উদ্দেশে। একই স্টিমারের যাত্রী মনসুর। আতিকের লাগানো আগুনে পুড়ে যাওয়া স্ত্রীর লাশ নিয়ে ফিরছেন গ্রামের বাড়ি। প্রথম শ্রেণিতে আতিকের পাশের কেবিনে ওঠে একটি সদ্য ধনী পরিবার। পরিবারের কর্তা গাড়ির ব্যবসা করেন। অবস্থা বুঝে কানাডায় বসতি গড়ার বাসনা তার মনে। ওই পরিবারেরই একজন দিসি, ব্যবসায়ীর ছোটো শ্যালিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেছেন। এখনই চাকরি করবেন না, বিদেশে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছা। তবে মানুষের জন্যও কাজ করতে চান। আবার ব্যবসাতেও তার গভীর কৌতুহল। অন্যদিকে স্টিমারের সর্বত্র যার অবাধ বিচরণ, তিনি মফিজুল। যিনি একই সঙ্গে স্টিমারে চলা সার্কাস, বেশ্যাবৃত্তি, শাস্ত্রীয় বই বিক্রি সবকিছু দেখাশোনা করেন। বহুমুখী গুণের অধিকারী মফিজুলই চলচ্চিত্রটির অন্যান্য চরিত্রের যোগসূত্রকারী। এসব চরিত্রের বাইরেও স্টিমারের চিরচেনা প্রায় সব চরিত্রই উঠে আসে। একটি গল্পেই শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসে অনেকগুলো জীবনের না বলা গল্প।

   চলচ্চিত্রে সাধারণত মূল চরিত্র বলতে যা বোঝায় কমলা রকেট-এ তা ঠিক নেই। প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাতা যেহেতু চলচ্চিত্রটির মাধ্যমে বাংলাদেশ দেখতে/দেখাতে চেয়েছেন, তাই হয়তো চরিত্রগুলো এমন। বরং বাংলাদেশই সেখানে মূল চরিত্র। যেখানে প্রতিটি চরিত্রই একেকটি শ্রেণি হয়ে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। কারণ সাপেক্ষ বিচারে পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম্পর্কের ভিত্তিতেই সামগ্রিক কোনো অস্তিত্বের বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট হয়। তাই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির রূপও প্রতিটি শ্রেণির ওপরই নির্ভরশীল। তাই চরিত্র/শ্রেণি প্রধান না হয়ে বরং একটি অন্যটির পরিপূরক।

তিন.

যেকোনো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেখানকার তরুণ-যুবকরা। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক করা দিসি তাদেরই একজন। যিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘টিপিকাল জব’ করবেন না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি নানামুখী পরিকল্পনায় ব্যস্ত--মানুষের জন্য কাজ করতে চান আবার বিদেশেও পড়তে যেতে চান। দুলাভাইয়ের গাড়ির ব্যবসাকে তার গ্যারেজ মনে হয়, কিন্তু দুলাভাইয়ের বন্ধুর কোম্পানিতে বসতে তার আপত্তি নেই। ব্যবসায়ী আতিকের মাল্টিপল বিজনেসেও তার দারুণ কৌতুহল, আগ্রহ ভরে খোঁজ নেন--সেই ব্যবসায় অনেক বেশি বিদেশ সফর করতে হয় কি না; অন্যদিকে বি সি এস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ হওয়াতেও উচ্ছ্বলতার শেষ নেই। এমনকি চরম সঙ্কটেও স্বাচ্ছন্দ্যে থাকেন দিসি। চরিত্রটির এই যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা, আত্মপ্রেম--সবমিলিয়ে বললে নানা ‘অবক্ষয়ের’ চিত্র, তা বাংলাদেশের বর্তমান তরুণ সমাজের সঙ্কটগুলোর যেনো প্রতিরূপ।

   চলচ্চিত্রের ২৮ মিনিট ২২ সেকেন্ড। পরিচয় পর্ব শেষে ‘চাকরি করবেন না?’; আতিকের এমন প্রশ্নের উত্তরে দিসি বলেন, ‘ঠিক জানি না। আই অ্যাম কনফিউজড! মানে আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডু অ্যা টিপিকাল জব। আই ওয়ান্ট টু ডু সামথিঙ ফর দ্য পিপল।’ সে কারণেই ‘হোপ’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তিনি। যেটি মানুষের জন্য কাজ করে থাকে। কিন্তু যে দিসি মানুষের জন্য কাজ করবেন, তিনি জানেন না নিজে কী করবেন! নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধাহীন হয়েও মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা তার! এরপর হোপ সম্পর্কে আতিক জানতে চাইলে দিসির উত্তর দেওয়ার ধরনই বলে দেয়, তিনি এ নিয়ে কতোটা ভাসাভাসা ধারণা রাখেন। দিসির মতো অনেকেই অবশ্য এখন জীবনবৃত্তান্তে (সি ভি) উপস্থাপনের জন্য নানামুখী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনে যুক্ত হয়। যারা একই সঙ্গে কয়েকটি সংগঠনে যুক্ত হয় ঠিকই, কিন্তু কোনোটিতেই সক্রিয় থাকে না। বরং তারা কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিচয়ে বিশেষ ক্ষেত্রে সুবিধাটুকু নিতে চায়।

   আবার মানুষের জন্য কাজ করতে যে মানসিক অবস্থা থাকা প্রয়োজন, সেটাও দিসি চরিত্রে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং অবাধ্য প্রেমিকের বাধ্য প্রেমিকার মতো ‘মানুষের পরোয়া না করে’ দিসি সম্মতি দেন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে। জৈবিক চাহিদা পূরণে তার ব্যক্তি স্বাধীনতা/দৃষ্টিভঙ্গি থাকতেই পারে। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। তবে ‘এভাবে আর কতোদিন’--সকাল হওয়া মাত্র তড়িঘড়ি করে চলে যাওয়া প্রেমিককে দিসির প্রশ্ন; এবং ‘এসব নিয়ে ভাববার অনেক সময় আছে বেবি। আমাকে এখন যেতে হবে’প্রেমিকের উত্তরে বিপর্যস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, অন্য এক দিসিকেই নির্দেশ করে। যার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অন্যের ওপর। ভালোবাসা মানে পারস্পরিক বিশ্বাস, বোঝাপড়া--একজন পুরুষের নারীর কর্তা হয়ে ওঠা নয় নিশ্চয়। তাই পুরুষ দ্বারা অবদমিত কোনো নারী, যিনি নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ব্যর্থ, তার পক্ষে নিজের সাধ-আহ্লাদ ফেলে মানুষের জন্য কাজের ইচ্ছেটা কথার কথা ছাড়া আর কীইবা হতে পারে। নানা কারণেই দিসির মতো তরুণ-তরুণীদের বিশাল একটা অংশই হয়তো জানেই না তারা কী করছে, কী করবে, কী করা উচিত কিংবা যা করছে তা নিয়েও তারা দ্বিধাহীন নয়।

   আবার বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কর্মজীবনের পরিকল্পনা নিয়ে একটু পরিষ্কার করে বললে, তাদের শেকড় থেকে শিখরে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে বি সি এস, না হয় যেকোনো মানের একটা সরকারি চাকরি। সীমিত সংখ্যক সুযোগের বিপরীতে বি সি এস-এর লোভে শিক্ষার্থীরা তাদের দীর্ঘ কর্ম সময় অপচয় করছে। নিজের সক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে চলতে গিয়ে, একটা সময় পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রের এমনকি নিজের কাছে নিজেকেই বোঝা মনে করছে তারা। শেষমেষ তাদের গ্রাস করছে হতাশা। এই ব্যাধির সংক্রমণ এতো বেশি যে তারা ভুলে যাচ্ছে বি সি এস-ও আর দশটার মতো একটা চাকরি। যা কখনোই সম্মানের চাবিকাঠি নয়। বিবর্তনের ধারায় প্রতিটি বিষয়ের মতো সম্মান শব্দটাও ষোল আনাই আপেক্ষিক। এই যেমন ধরুন, একটা সময় গ্রামে গ্রামে স্কুল শিক্ষকের অবস্থান--তাকে অনেক বেশি সম্মান দেওয়া হতো, তার কথা মান্য করতো সবাই, ছোটোখাটো বিচার-সালিশে তার সিদ্ধান্তই ছিলো চূড়ান্ত। আর এখন সেই গ্রামে স্কুল শিক্ষকের অবস্থান আলাদা করে বলার দরকার পড়ে না।

   বি সি এস আর যাই হোক সম্মানের মাপকাঠি নয়। কোনো কিছুর মাপকাঠি কোনো কিছুই নয়। এটা নির্ভর করে অর্থনৈতিক মানের ওপর। এখানে বি সি এস বিরোধিতা করা হচ্ছে, ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়। বরং প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, শুধু বি সি এস এর পিছনে ছুটে নিজের সক্ষমতাকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ক্রমানুসারে উঁচু আসনগুলো তো শোষকেরই বিন্যাস। সিস্টেমের দাসত্বই যখন করবো, তখন বড়ো মাপের শোষকই হতে হবে--এই যে নির্বোধ মানসিকতা গড়ে উঠেছে এখানে তার বিরোধিতা করা হচ্ছে। নিজের মেধা-মনন খুইয়ে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন-চাওয়া-লক্ষ্য-আকাঙ্ক্ষা একমাত্র বি সি এস হয়ে দাঁড়ানোর কোনো মানে হয় না।

   ৪৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। রেডিওতে ৩৭তম বি সি এস-এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সংবাদ সম্প্রচার হচ্ছে। মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখ ৪৩ হাজার চারশো ৭৬ জন। উত্তীর্ণ আট হাজার পাঁচশো ২৩ জনের একজন দিসি। কনফিউজড দিসির বিদেশে পড়ার ইচ্ছা, চাকরি না করার ইচ্ছা, মানুষের জন্য কাজ করার ইচ্ছা--সব ভুলিয়ে বিভোর করে তোলে বি সি এস পরীক্ষার ফল। মুহূর্তেই দিসি পরিবর্তন করেন নিজের সিদ্ধান্ত। ঘটনা এমনই, কতো শিক্ষার্থী জীবনে ভিন্ন কিছু করবে বলে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা-গান-নাটক-কবিতার চর্চা করে; গল্প-উপন্যাস লিখবে বলে রাতের পর রাত ঝিম মেরে বসে থাকে; কেউ চলচ্চিত্র বানাবে বলে নিজ বিভাগের পড়াটাও ঠিকঠাক করে না; বছরের পর বছর এভাবে কাটিয়ে দিয়ে হাজারো স্বপ্নবান আজ হতাশাগ্রস্ত! তারা সব সৃজনশীলতার বলি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘সাধারণ জ্ঞান’ নিয়ে টেবিলে বসে থাকে; মূল বই না পড়ে কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স পড়ে, মুখস্থ করে ইংরেজি শব্দ। এটা ঠিক, এর পিছনে ভিন্ন বাস্তবতাও আছে। দায়টা কেবল ওই তরুণ-তরুণীর নয়। তাই বলে হাল ছেড়ে, সম্ভাবনাটুকু ঝেড়ে ফেলে, স্বপ্নভ্রষ্ট হয়ে, বাধা না ডিঙিয়ে, নিজ সত্তার বিপরীতে একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা তো কখনই কাম্য নয়। অথচ আবশ্যক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা। নিজেকে জাহির করা। স্বপ্নটা জিইয়ে রাখা। স্রোতের বিপরীতে চলা।

   যাইহোক, যে শিক্ষাকে জাতির শিরদাঁড়া ভাবা হয়, সেটাই এখন গৌণ। চাকরির বাজারের কথাই যদি বলা হয়, অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা দেখা হয় বেশকিছু শর্ত পূরণের পর। যেখানে স্বপ্নবানের স্বপ্নভ্রষ্ট হওয়ার পিছনের কারণ উঠে আসে। চলচ্চিত্রের ২৬ মিনিট ১২ সেকেন্ড। মোবাইল ফোনসেটে একজন চাকরিদাতা ও প্রার্থী সাইফুলের কথোপকথন,

সাইফুল : বস, আট লাখে হইবো না বস?

চাকরিদাতা : আট লাখে তো পিয়নের চাকরিও হয় না। শুধু তোমার জন্য আমি একটা পোস্ট ধরে রাখছি।

সাইফুল : বস, ঠিক আছে ১০ লাখই দিমুনে। কিন্তু, চাকরি হওয়ার পরে বস।

চাকরিদাতা : ধুর মিয়া, তুমি তো কথাই বুঝলা না, রাখো।

সাইফুল : বস বস ...।

লাইন কেটে যায়। সাইফুল মোবাইল ফোনসেটে ক্যালকুলেটর চেপে হিসাব মেলান, চার বছর লাগবে ঘুষের টাকা ওঠাতে। শর্তানুযায়ী ঘুষের অর্ধেক দিতে হবে চাকরির আগে; বাকিটা চাকরি জুটলে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু বাংলাদেশের চাকরির বাজার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা শেষ হলেই শিক্ষার্থী পরিণত হয় বেকারে। এমনকি শুনতে হয়, আট লাখে পিয়নের চাকরিও হয় না। মনে পড়ে যায় একটি মিথ, চাকরি পেতে প্রয়োজন এম কিউবম্যান, মেরিট, মানি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য দুটিতেই কাজ হয়ে যায়। ওই মেরিটটা তখন মাইনোর হয়ে পড়ে। সাইফুলের কথায়‘কারে আর কী কমু! আজিজের মতো ৩৩ নাম্বার ছাত্রও আজকে ভার্সিটির টিচার।’ কথিত উঁচুতলায় যখন পচন ধরে, নিচুতলা তখন পচে যাওয়ারই কথা। তারুণ্যের ওপর সেই প্রভাব কিন্তু জোরেসোরে পড়ারই কথা।

   ৩০ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড। স্টিমার তার গতিতে চলছে। খাবার নিয়ে ফিরছেন সাইফুল। দেখা হয় শামসুলের সঙ্গে। একে অন্যের খোঁজখবর নেওয়া শেষে সাইফুলকে নিজ অফিসের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিয়ে চলে যান শামসুল। বিড়বিড় করে সাইফুল বলতে থাকেন, ‘কালা শামসুলও আজ বউ নিয়া কেবিনে! ... ঢাকায় থাকার জায়গা আছিলো না। একলগে এক বেড শেয়ার করছি এক বছর। আজকে সে আমারে আমিন টাওয়ার দেখায়।’ তার মানে কাগজে-কলমে পিছিয়ে থাকলেও আমিন টাওয়ারে (উচ্চশ্রেণির, করপোরেট চাকরিজীবীদের অফিস বোঝাতে) বসা যায়; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়া যায়। সাইফুলদের আক্ষেপ করতে হয়, ‘পাস করার পর পরই যদি ঘুষ দিয়া চাকরিটা নিয়া নিতাম!’ এমন অনেক সাইফুল আছে, যাদের ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তারা এ বাজারে ঠিক টিকতে পারে না। আবার দিনশেষে অনেক সাইফুলকে এক কাতারে আসতেই হয়, যখন চাকরি পাওয়ার আগে অর্ধেক টাকা দিয়েও চাকরিটা মেলে না। কিংবা সোনার হরিণ ধরবে বলে ভিটেমাটি বিক্রি করে তুলে দেয় দালালের হাতে। নিজ গুণে চাকরি হলে হলো, নয়তো গেলো!

   সুবিধাভোগী পরিবারের দিসিও এর বাইরে আসতে পারেন না। লিখিত পরীক্ষার আর মাত্র তিন মাস হাতে আছে জেনে তার অনুশোচনা--‘ইস! কেনো যে আগে থেকে প্রিপারেশন নেওয়া শুরু করলাম না।’ তার মানে দিসি এতোদিন যা করেছেন, যেভাবে সময় ব্যবহার করেছেন তা ভুল ছিলো। ভুল ছিলো মানুষের জন্য কাজ করাটাও! অথচ দিসি তথা তারুণ্যের এই অনুশোচনা রাষ্ট্রের অবস্থা/অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ে হলে পরিবর্তনের পথ আরো সুগম হতো। যে পরিবর্তন ঘটলে আর কোনো দিসিকে জেনে নিতে হতো না লিখিত পরীক্ষার জন্য কোনটি ভালো মানের গাইড হবে।

রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত যে ওই ‘আমিন টাওয়ার’ দেখিয়েই চলছে, তা শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেও বোঝা যায়। এখানে স্নাতক-স্নাতকোত্তরের গণ্ডি পেরিয়েও বিষয়ভিত্তিক চাকরির সুযোগ নেই। নেই পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান। চাকরি পাওয়ার পথে সৃজনশীলতা-জ্ঞান খুব বেশি কাজে আসে তাও না। ফলে চিকিৎসাবিদ্যায় পড়েও, প্রকৌশলী হয়েও করতে হয় ভিন্ন চিন্তা। তাই তো দিনশেষে জব সলুশনটাই সঙ্গী। এই যে শিক্ষার্থীরা দিসি হয়ে উঠছে, এর পিছনে তাদেরও যুক্তি আছে। দিসিও দেখিয়েছেন। এক ঘণ্টা এক মিনিট। আতিক ও দিসির কথোপকথন,

দিসি : আমি বি সি এস প্রিলিতে টিকেছি!

আতিক : কনগ্রেচুলেশনস।

দিসি : থ্যাঙ্ক ইউ।

আতিক : কিন্তু আপনি না টিপিকাল জব করবেন না, বিদেশে পড়তে যাবেন।

দিসি : এখনো তো আসলে রিটেনটা দেইনি। দেখা যাক। তাছাড়া গভমেন্ট জব করলেও তো বাইরে পড়তে যাওয়া যায়।

আতিক : আপনার ওই যে হোপ না কি যেনো একটা অর্গানাইজেশন আছে না?

দিসি : হুঁ।

আতিক : সেটার কী হবে?

দিসি : আমি ভেবে দেখলাম, মাস পিপলের জন্য কিছু করতে হলে, পাওয়ার লাগে। আমি যদি অ্যাডমিন ক্যাডারে ঢুকতে পারি, আই ক্যান ইউজ দ্য পাওয়ার প্রোপারলি।

এই যে একটা ধারণা--গণমানুষের জন্য কিছু করতে হলে ক্ষমতা লাগে, আগে ক্ষমতাটা নিয়ে নিই, তারপর দেখা যাবে কী করা যায়--যা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় একটা যুক্তি দেখানোর চেষ্টা মাত্র। মানুষের এই সুপ্ত ইচ্ছাটাই মানবিক বোধগুলোকে ভোঁতা করে। তখন তারা লোভে পড়ে ক্ষমতার পিছনে ছোটে আর বুলি আওড়ায় একবার সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারলেই সব পরিবর্তন করে ফেলবে! নির্বাচনের সময় নেতারা যেমন প্রতিশ্রুতি দেয় আর কী। ভোটারের অন্নসংস্থান থেকে টয়লেট পরিষ্কার, সব দায়িত্বই নেতা নিয়ে নেয়। নির্বাচিত হওয়ার পর, পারলে ভোটারকে দিয়েই নিজের বাড়ির টয়লেট পরিষ্কার করিয়ে নেয়। ক্ষমতায় যাওয়ার পথে প্রতিশ্রুতির প্রথায় দিসির এই ধারণা টেকে না। তখন সামনে আসে সেই মানসিকতা--গোলামি করে একটা সময় প্রভু হবে বলে কিংবা শোষিত হয় শাসক হবে তাই। ক্ষমতার মোহ, ক্ষমতায় আসীন হওয়ার লোভ মানুষের আজকের নয়। ক্ষমতাবান হওয়ার আদিম সেই প্রবৃত্তি দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ক্ষমতার অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মহড়াও বাড়ছে। কতো মানুষ না খেয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে তা না ভেবে বিশেষ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, অস্ত্র কেনা কিন্তু চলছেই। তারপরও দিসির মূল ইচ্ছা কিন্তু ক্ষমতার চর্চা করা। দিসি তথা তরুণ সমাজে এই ধারণার পোকা বাসা বেঁধেছে, মানুষের সেবা করতেও প্রয়োজন ক্ষমতার!

   অন্যদিকে তারুণ্যের ভয়ঙ্কর প্রবণতা, কতো সহজে দ্রুত উপরে ওঠা যায়। এক লাফে উঠতে পারলেই যেনো হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। অথচ উপরে ওঠার জন্য শক্ত মনোবল নেই, যা থাকে তা কেবলই অস্থিরতা। চলচ্চিত্রের প্রথম শটে ফেইসবুক চালাতে ব্যস্ত দিসি দুলাভাইয়ের কাছে আবদার জানান, ‘এবার কিন্তু হরিণের মাংস খাওয়াতেই হবে।’ ‘অবশ্যই, খাওয়াব।’ শুনে দিসির অট্টহাসিটাও দেখার মতো। বাংলাদেশে হরিণ শিকার ও হরিণের মাংস বাজারজাতকরণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হলেও দিসির মধ্যে ন্যূনতম বোধ দেখা যায় না। এর পরের শটে যখন দিসিকে দেখানো হয়, তিনি ফেইসবুক চালাচ্ছেন, কানে এয়ারফোন লাগিয়ে হেলেদুলে চলা আর আয়নায় মুখ দেখে রূপচর্চা--বাজে লাগছে না তো! তারপর প্রেমিকের সঙ্গে মেসেঞ্জারে চ্যাটিং। এমন অস্থির দিসি পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই হাতে তিন মাস সময় নিয়ে স্বপ্ন দেখেন অ্যাডমিন ক্যাডার হওয়ার। যার মধ্য দিয়ে তরুণ সমাজের মধ্যে কেবল জব সলুশন পড়ে বি সি এস ক্যাডার হওয়ার বা চাকরির বাজারে শক্ত অবস্থান করে নেওয়ার যে বাসনা তা-ই তুলে ধরেছেন নির্মাতা।

   অবশ্য তরুণ সমাজের অস্থিরতার পিছনে তাদের অপেক্ষা রাষ্ট্র-শিক্ষা ব্যবস্থার অস্থিরতার দায়টাই বেশি। রাষ্ট্রের একপক্ষীয়ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্থির হয়ে থাকার সুযোগ খুব কমই। কেননা একপক্ষীয় অর্থব্যবস্থার নানা রূপ থাকে--সামগ্রিকতা ভুলে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া, চারপাশের আবেগ না ছুঁয়ে সামাজিক চৈতন্য ভুলে যাওয়া, মানবসত্তাকে ভুলে নিছক যন্ত্রে পরিণত হওয়া। সমাজের নানা ‘অবক্ষয়ের’ পিছনে যে উপাদানগুলো কাজ করে তার অন্যতম এই শোষণকামী অর্থব্যবস্থা। যেখানে প্রতিষ্ঠা পায় ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ ধারণা। যা চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা চার মিনিটে দেখা যায়। কুয়াশায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকা স্টিমারে তীব্র খাদ্য সঙ্কট। দাম বেড়ে চরমে। শেষবারের মতো খাবার জোগাড়ে দুলাভাইয়ের সঙ্গে যান দিসি। দাম বাড়ানোয় দোকানির সঙ্গে কথা চালাচালিতে তিনি ব্যস্ত। দিসি ব্যস্ত প্রচলিত নানা ভঙ্গিতে, মুখ আঁকাবাঁকা করে সেলফি তুলতে। এই যে চারপাশের তীব্র খাদ্য সঙ্কট, মানুষের কষ্ট, দিসি তার বাইরে! এমন সঙ্কটেও দিসি স্বাভাবিক! যে দিসি মানুষের সেবা করতে চান, মানুষের সেবায় নিয়োজিত সংগঠনে যুক্ত, সেই দিসিকে মানুষের কষ্ট স্পর্শ করে না! যে মানুষকে মানুষের সঙ্কট নাড়া দিতে পারে না, তার মধ্যে কতোটা মানবীয় বোধ কাজ করে! মানবিক বোধ হারালেই তো মানবিক মানুষের মৃত্যু হয়। আর মহান এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তো তাই চায়, মানুষ যন্ত্রে পরিণত হোক। দিসিও হয়েছেন। বাংলাদেশে স্নাতক পড়ুয়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই কিন্তু দিসির ব্যক্তিত্ব সঙ্কটের একেকটা উদাহরণ।

চার.

স্বাধীনতার ৪৮ বছরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে আর কোনোভাবে শিশুরাষ্ট্র বলার সুযোগ নেই। বরং রাষ্ট্র হিসেবে তা পরিপক্কই বটে। কথা হলো, প্রতিটি রাষ্ট্রই তো কোনো না কোনো স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে। বাংলাদেশ আদৌ সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে কি? স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট যে শোষণ থেকে বাঁচার কথা বলে, যে স্বপ্নের কথা বলে, যে জীবনের কথা বলে, তা কি আদৌ পূরণ হয়েছে? বরং স্বাধীন সার্বভৌম দেশটি সেই স্বপ্নের পথে না হেঁটে উল্টোপথে হেঁটেছে, হাঁটছে। স্বাধীনতার আতুরঘর থেকেই দেশীয় আমলা/শাসকরা এই রাষ্ট্রকে নিয়ে আগুন খেলায় মেতে উঠেছে। নিজেদের স্বার্থ হাসিলে এহেন কোনো কাজ নেই তারা করেনি। বাস্তবতা এই যে,

আসলে ‘স্বাধীনতা’ ধনতান্ত্রিক যুগের অভ্যুদয়কালের জারজ সন্তান। যেমন আর্থিক বাণিজ্যিক স্বাধীনতার নামে সমাজে দারিদ্র্যের প্রসার এবং শোষণযন্ত্রের বিস্তার হয়েছে, যার ফলে সমাজে ও মানুষের জীবনের স্তরে স্তরে পরাধীনতার নাগবন্ধন দৃঢ় হয়েছে। ধনতন্ত্রের ক্রমবিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতার মুখোশ পরে ব্যক্তিদাসত্বের অভিনব নৃত্য চলেছে।

যে নৃত্যের ছন্দে-তালে আটকা পড়েছে স্বাধীনতার মূল স্বপ্নটুকু। গুটিকয়েক ব্যক্তির এই আগুন খেলার হল্কা কিন্তু ভয়ঙ্কর থেকে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে চলেছে।

কমলা রকেট-এ ইন্সুরেন্সের টাকা পাওয়ার আশায় নিজ কারখানায় আগুন লাগিয়ে অবস্থা বুঝে গা ঢাকা দিতে চান আতিক। ধরাছোঁয়ার বাইরে নিরাপদে থাকবেন ভেবে স্টিমারের সময়টুকুর জন্য খাবার সঙ্গে নেন। স্টিমারের খাবারে তার অরুচি। বলতে গেলে আতিক এক প্রকার নিশ্চিতই ছিলেন যে, কোনো ঝামেলা ছাড়াই তিনি পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। স্টিমারে বসে ম্যানেজারকে নির্দেশনা দিয়ে যান, কীভাবে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোবে। সবকিছু যেনো তার মতো করে চলছিলো। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেননি, শহরে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না; বুঝতে পারেননি, অতিরিক্ত লোভই ধ্বংসের কারণ।

   যাই হোক, গণমাধ্যমে প্রকাশ হতে শুরু করে আগুন লাগার রহস্য। ম্যানেজারকে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। সারারাত তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে আতিকের দম যেনো আটকে যায়! সকালে যখন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা হয়, আতিক জানতে পারেন তার সব কৌশল ফাঁস হয়ে গেছে। চারদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর। ভয়ে কুকড়ে যান আতিক। স্বপ্ন দেখেন, একটি সাপ তার গলা পেচিয়ে ধরেছে, চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে দেশ-বিদেশের সব ব্র্যান্ডের লোগো আর ডলার। বাঁচার জন্য তিনি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না; পানিতে ডুবে যাচ্ছেন; নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। হঠাৎ মফিজুলের ডাকে স্বপ্ন ভেঙে যায় আতিকের। মফিজ জানান, কুয়াশায় পাঁচ ঘণ্টা আটকে থাকা স্টিমার এবার চরে আটকে গেছে। কখন চলবে কেউ জানে না! স্টিমারে খাবার শেষ হয়ে গেছে। শেষবারের মতো রান্না চলছে। আতিক সেদিকে খেয়াল না করে মফিজুলের কাছে জানতে চান সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা। কেননা সেই স্বপ্ন তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তারই কারণে। মফিজুল সেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারেন না। দেবেনইবা কী করে। এই ব্যাখ্যা তো আতিক ছাড়া অন্য কারো জানার কথা নয়। তবে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায় সহজেই। ফ্রয়েড বলছেন, ‘স্বপ্ন হচ্ছে আকাঙ্ক্ষা পূরণের প্রয়াস মাত্র। বাস্তবে যে আকাঙ্ক্ষাগুলো পূর্ণ হয় না, সেগুলোই স্বপ্নরূপ ধারণ করে পরিতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করে।’ তার মানে স্বপ্নে আতিকের চারপাশে ছড়ানো লোগো-ডলার তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা; আর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে আতিক যা কিছু করেছেন তা-ই সাপ হয়ে গলায় পেচিয়ে ধরেছে এবং তার পানিতে ডুবে যাওয়া, এমনকি প্রাণপণ চেষ্টা করেও নিজেকে বাঁচাতে না পারা, এসব কর্মের ফল।

   মানুষের কোনো জাত, শ্রেণি নেই। জাত-বর্ণ-শ্রেণি-বিদ্বেষ সব মনুষ্য সৃষ্টি। বিভক্ত করতে পারলেই যেনো শোষণ করতে সুবিধা হয়। পুরনো সেই তত্ত্ব--ডিভাইড অ্যান্ড রুল। তবে সমস্যা-সঙ্কট প্রতিটি শ্রেণির ওপরে সমানভাবে আছে। রাষ্ট্রের একটি অংশে প্রভাব/পরিবর্তন আসলে অন্য অংশেও আসবে এটা স্বাভাবিক। প্রতিটি অংশ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তো সামগ্রিক পরিবর্তন ঘটে। দিনশেষে মানুষ কিন্তু সব ভেদ ভুলে আদিমেই ফেরে। ক্ষুধার্ত যাত্রীদের দীর্ঘ সারি; অবশিষ্ট ভাত-ডাল চড়া দামে বিক্রি; আতিকের কাছে থাকা খাবার শেষ হওয়া; খাবার খোঁজা--সব ঘটতে থাকে। হঠাৎ মফিজুল এসে আতিককে নিয়ে যান স্টিমারে তার থাকার ঘরে। সেখানে গিয়ে মনসুরের পাশে বসেন আতিক। বিশেষ ব্যবস্থায় মফিজুলের সংগ্রহ করে দেওয়া খাবারে ক্ষুধা মেটানোর চেষ্টা করেন আতিক। ওদিকে লাশ ক্রমশ পচছে। দুর্গন্ধ! চরম উত্তেজনা! মফিজুলের কথায় আতিক জানতে পারেন, গার্মেন্টে আগুনে পুড়ে যাওয়া স্ত্রীর লাশ নিয়ে ফিরছেন মনসুর। দুর্গন্ধ আরো বাড়ছে। নীরবে আতিক সব বুঝতে পারেন, যদিও মনসুর কিছুই বোঝেন না। চারদিকে ছড়ানো গন্ধ যেনো নিমিষেই আতিকের নাকে পৌঁছায়। তিনিও বমি করতে থাকেন। বুঝতে কষ্ট হয় না, মানুষের কোনো শ্রেণি নেই। রাষ্ট্রের সামগ্রিক সঙ্কট কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির ওপর পড়ে না। আতিকদের শোষণের ফল এই লাশ। যে ফল প্রভাব ফেলে আতিকদের ওপরও।

   আতিকের বমি আটকাতে আতর বের করে দেন মফিজুল। জিহ্বায় স্বাদ ফেরাতে মনসুর নিজের প্লেটে থাকা কাঁচামরিচ তাকে এগিয়ে দেন। স্বাদ/স্বস্তি কি আর ফেরে! পচে গলে যাওয়া ব্যবস্থা কি কীটনাশকে সারে! বরং লাশের বোঝা, দুর্গন্ধ সবকিছুই আকড়ে ধরে আতিককে। মরিচ আর আতরও পারে না তার বমি আটকাতে! রাষ্ট্রের কোনো সঙ্কট কি এভাবে ধামাচাপা দেওয়া যায়! সন্ত্রাস দমন ও মাদক নির্মূল অভিযানের নামে ক্রসফায়ার, গুম, বিচারহীনতা, নষ্ট রাজনীতি, প্রতিদিন দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ইত্যাদি নিয়েও তো কথা বলা যায়। রাষ্ট্র কি সেকথা বলতে দেয়? তার ফল ভালো হয় না। তবুও কথা থেমে থাকে না, চলতেই থাকে। মাদক নির্মূল অভিযানের নামে শত শত মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়, অথচ খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে নাম উঠে আসে সরকার দলীয় সাংসদের নাম। এই অভিযানের প্রথম ১৮ দিনেই দুই হাজার দুইশো ব্যক্তিকে আটক করা হয়, প্রাণ হারায় ১৬ জন। আর সেই সাংসদ সসম্মানে হজ্জব্রত পালন করেন। এ গল্প সবারই জানা।

   আবার শত শত মানুষকে হত্যার পর মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের নাটক সাজায় রাষ্ট্র। ততোক্ষণে একরামুলের পরিবারের দীর্ঘশ্বাস পৌঁছে গেছে বাংলার ঘরে ঘরে। এ থেকে বোঝা যায়, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ। রাষ্ট্র মাদকের উৎস বন্ধ না করে, সরকার দলীয় সাংসদ ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীনদের গুলি করে হত্যা করে। এরপর আত্মসমর্পণ নামক আতর দিয়ে সেই বিভৎস হত্যাযজ্ঞের গন্ধ ঢাকতে চায়! সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে কথা ওঠে না। দিনশেষে যেকোনোভাবেই হোক, গুনতে হয় মানুষের লাশ। আর আতর দিয়ে কতোদিন সেই লাশের গন্ধ আটকানো যাবে সেটা সময়ই বলে দেবে। লাশ কিন্তু পচতে শুরু করেছে, ক্রমশ পচে গলে যাচ্ছে।

   তারপরও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে উচ্ছেদ অভিযান, চার লেন সড়ক, পদ্মা সেতু নির্মাণ ও অন্যসব ‘উন্নয়ন’ বটিকাকে আতরই মনে হয়। ক্ষমতাবানরা হয়তো ধরেই নিয়েছে, মানুষ তার সব ক্ষোভ ভুলে যাবে আতরের সুগন্ধে। আতর দিয়ে না হয় মানুষ ভোলানো গেলো, কিন্তু মাছির ভনভন শব্দ! কিংবা আতর, কাঁচামরিচ কি আতিকের বমি আটকাতে পেরেছিলো?

পাঁচ.

কমলা রকেটজুড়ে নানাভাবে লাশবাহী কফিনের একটি ফুটো চোখে পড়ে। একাধিকবার ফুটো দিয়ে দেখানো হয় বাইরের জগৎটাকে। তবে তিন মিনিট ১৩ সেকেন্ডে শট্টি দেখে গা শিউরে ওঠে! স্টিমারের লাশঘরে স্ত্রীর লাশ রেখে বাইরে বসেন মনসুর। মফিজুল এসে হাত ধরে তুলে নিয়ে যান তাকে। হঠাৎ হাজির হয় একটি ইঁদুর। ধীরে ধীরে ইঁদুরটি কান খাড়া করতে থাকে। আবহে শোনা যায়, স্বামীর সঙ্গে মোবাইল ফোনসেটে সেই নারী শ্রমিকের শেষ কথোপকথন, ‘মোরে মাফ কইরা দিও। ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগছে। কেচি গেটটা বন্ধ ...।’ ‘খোল, খোল, তোর আল্লার দোহাই লাগে গেট খোল। দারোয়ান ভাই, দারোয়ান ভাই ...।’ বাঁচার করুণ আর্তনাদে ভরা পুরুষ কণ্ঠে হাহাকার। একপর্যায়ে ইঁদুরটি দ্রুত চলে যায়।

   আতিকরা যে স্বার্থ হাসিলে স্বেচ্ছায় কারখানায় আগুন লাগিয়ে থাকে, তা পুড়ে মরা শ্রমিকের কথায় তুলে ধরেছেন নির্মাতা। প্রশ্ন রেখেছেন, আগুন যদি দুর্ঘটনাবশত লাগবে তবে বের হওয়ার পথ কেনো বন্ধ? তারপরও পরিকল্পিত এসব হত্যাযজ্ঞে রাষ্ট্রযন্ত্র নির্বাক। অন্যদিকে কফিনের ফুটোটিও বিভিন্ন অর্থ দাঁড় করায়। প্রথমত, শ্রমিকের এই লাশের পিছনের হর্তাকর্তাদের প্রকৃত রূপটাই হয়তো কৌশলে দেখিয়েছেন নির্মাতা, লাশের সামনে তাদের ঠিক কতোটা নোংরা-নীচু ইঁদুর মনে হয়। তারা যেনো ইঁদুরের দৌড়ে মেতেছে। এই দৌড়ে টিকে থাকতে, মুনাফার লোভে তারা গেইট বন্ধ করে আগুন লাগায়! যাদের কানে মানুষের করুণ আর্তনাদ আঘাত করে না। অন্যদিকে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা যতো পচেই যাক না কেনো, তারা ইঁদুর হয়ে কুটকুট করে শোষণ চালিয়ে যাবে। মানুষ হিসেবে সে যতো নীচেই নামুক, তাতে কী, মুনাফা চাই। হাসান আজিজুল হক যেমন বলেন, ‘টাকার দাম যদি এক টাকা হয় তাহলে ওই টাকাটা কেউ কাদা থেকে তুলুক কি মানুষের বিষ্ঠা থেকেই তুলুক দাম তার এক টাকাই থেকে যাচ্ছে।’ এই মন্তব্যের সঙ্গে মুনাফালোভীদের ভিন্নমত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

   ক্ষমতাবান-করপোরেট কর্তাদের দুর্বলতার রূপও কিন্তু এই ফুটো। যারা স্বার্থ হাসিলে গোপনে, যতো মজবুত পরিকল্পনা করুক না কেনো, ফুটো সামলানো দায় হয়ে যায়। যা পরবর্তী সময়ে তাদের বড়ো সঙ্কট সৃষ্টির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। আতিকের লাগানো আগুনে পুড়ে শ্রমিকের লাশ একসময় পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। এই যে লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়া কিংবা গন্ধ ছড়িয়ে মালিকের বমি করা, শ্রেণিবৈষম্য ভেঙে চুরমার করার ইঙ্গিত দেয়। আর ফুটোটি এই প্রতিবাদের জ্বালামুখ। অন্য অর্থে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শোষিত শ্রমজীবী মানুষ লাশ হলে একটা মজবুত কফিন কেনারও সামর্থ্য থাকে না। যাতে করে অন্তত গন্তব্যের পথে লাশের সুরক্ষা হয়। এতোটাই বৈষম্যময় এই ব্যবস্থা যে, শ্রমজীবী মানুষ জীবিত হোক আর মৃত, শোষণ তাদের পিছু ছাড়ে না! যে কারণে স্ত্রীর লাশের সুরক্ষায় চা পাতার কথা বলার পরও তা পান না মনসুর!

ছয়.

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি হোসেন মিয়া। সহজসরল হলেও জটিলতায় ভরা এই চরিত্রটির ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে গিয়ে সমালোচকদেরও কম ঘাম ঝরাতে হয় না। বাংলা সাহিত্যে এই একটি চরিত্রই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান যথেষ্ট পোক্ত করেছে। কমলা রকেট-এ মফিজুল চরিত্রটিও নির্মাতার এমনই এক অনবদ্য সৃষ্টি। স্টিমারের সর্বত্র অবাধ বিচরণকারী মফিজুল একই সঙ্গে স্টিমারে চলা সার্কাস, বেশ্যাবৃত্তি, শাস্ত্রীয় বই বিক্রি সবকিছু দেখাশোনা করেন। অন্যান্য চরিত্রের যোগসূত্রকারীও তিনি। যার গালগল্পও লোকজন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে। আবার ছদ্ম পরিচয়েও লেখালেখি করেন মফিজুলের। তীব্র সঙ্কটে যখন লোকজন খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, তখনো বিশেষ ব্যবস্থায় খাবার সংগ্রহের ক্ষমতা রাখেন তিনি। আহমদ ছফার ‘মরণ বিলাস’-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফজলে ইলাহী যেমন অনুশোচনা বোধ করলেও মাওলানা ডেকে প্রথাগত পদ্ধতিতে পাপ স্বীকার করেন না। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নানা অপকর্মে তার আত্ম-উপলব্ধি হলেও ঠিক পাপবোধ থাকে না। তেমনই মফিজুলেরও কিন্তু কোনো ন্যায়-অন্যায় বোধ নেই। ছফার মতে, রাজনীতিতে যেমন বিদ্যাবুদ্ধির চাইতে ঘ্রাণশক্তির প্রয়োজনই বেশি, সেই শক্তি থেকেই বলা যায়, মফিজুল মূলত রাষ্ট্রের রাজনীতিকই।

   ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, আপনি যতো ব্যবসাই করুন না কেনো, দিনশেষে নিরাপদ আশ্রয় রাজনীতি; নিরাপদ ব্যবসাও বটে। যেখানে আপনি মফিজুলের মতো যৌনকর্মীর দালাল থেকে শাস্ত্রীয় বই বিক্রেতা কিংবা অন্য অনেকের মতো সরকারি আমলা হতে পারেন। আবার প্রয়োজনে যখন যেভাবে ইচ্ছা সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেন রাজনীতিতে। নানা পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের রাজনীতিবিদ বনে যাওয়ার এই প্রবণতাকে খোদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গ্রামের ‘গরিবের বউয়ের মতো’ বলে কটাক্ষ করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, অন্যান্য পেশায় চাইলে যাওয়ার সুযোগ না থাকলেও রাজনীতি সেদিক থেকে উন্মুক্ত! নির্মাতার দেখানো বাংলাদেশ নিশ্চয় এমন নয় যে, সেখানে রাজনীতি, রাজনীতিবিদ থাকবে না। সময়ের বিচারে মফিজুলই সেই পদের দাবি রাখেন।

   মধ্যবিত্ত শ্রেণির সাধারণ সব বৈশিষ্ট্য উঠে এসেছে কমলা রকেট-এ--এ শ্রেণি কখনো সমাজ-রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা চায় না, চায় নিরাপদ জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা। মধ্যবিত্ত নিয়ে অনেক কথাই হয়। নতুন করে বলার তেমন কিছু নেই। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্যবিত্তের সম্পর্ক। কমলা রকেট-এ অন্য সব শ্রেণির সঙ্গে মফিজুলের সম্পর্ক থাকলেও নব্য ধনিক পরিবারটির সঙ্গে নেই। আগেই বলা হয়েছে, পরিবারটি মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি এবং শ্রেণি বিচারে মধ্যবিত্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মধ্যবিত্ত শ্রেণি সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, ছোটো বড়ো উপার্জনকারী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা হয়ে থাকে। যাই হোক, এখানে মফিজুলের সঙ্গে মধ্যবিত্তের সম্পর্ক না থাকায় বিপরীতমুখী কারণ কাজ করে। এক, রাষ্ট্রকাঠামো-ক্ষমতা নিয়ে মধ্যবিত্তের তেমন কোনো ভাবনা নেই। দুই, মধ্যবিত্ত নিয়ে রাষ্ট্রেরও অতো মাথা ঘামাতে হয় না। চলচ্চিত্রে পরিবারের কর্তা গাড়ির ব্যবসা করেন। ঢাকা ক্লাবের সদস্য। অবশ্য এ নিয়ে তিনি বেশ গর্বিতও। পরকীয়া করেন। স্ত্রীর সন্দেহে চলে কলহ। সুযোগ বুঝে কানাডায় অভিবাসনের ধান্দাও আছে কর্তার। আর গিন্নি নিজের সব গয়না-অলঙ্কার বিক্রি করে স্বামীকে দিয়েছেন ব্যবসা করতে। একসময় পরিবারটির মধ্যে কাজ করেছে কীভাবে অনেক বেশি টাকার মালিক হওয়া যায়। সেটা হয়েছেও। সেখান থেকে আজকের অবস্থান। এখন গিন্নি উদ্বিগ্ন স্বামীর পরকীয়া নিয়ে, বাচ্চার পরীক্ষার ফল নিয়ে--অবশ্য প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় বাচ্চাকে নিয়ে দৌড়ানোটা প্রতিটি শ্রেণিরই সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা বাচ্চাকে দিয়ে পুষিয়ে নেওয়ার প্রতিযোগিতাও বটে। কীভাবে অন্যের কাছে নিজেকে প্রমাণ করা যায় তা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। নিজেদের স্ট্যান্ডার্ড প্রমাণে উদ্বিগ্ন। যেমন, বাচ্চার পরীক্ষার ফল অন্য অভিভাবকের সামনে জাহির করা। আর কর্তা ব্যস্ত ঘর-ব্যবসা সামলাতে আর লুকিয়ে পরকীয়া চালিয়ে জীবন উপভোগ করতে। আতিকের লাগানো আগুনের আঁচ তারা অনুভব করতে পারে না, করতে চায়ও না। তথ্য পেয়ে অল্প আহা-উহুতেই তার সমাপ্তি।

তার মানে মধ্যবিত্তের মধ্যে সবসময় কোনো না কোনো ‘উত্তেজনা’ কাজ করে। যা তাকে বাধ্য করে নিজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে না ভাবতে। রাষ্ট্র-ক্ষমতা, শাসন-শোষণ কোনদিকে যাচ্ছে, সেদিকে মাথা না ঘামিয়ে তারা ব্যক্তিজীবনের চাওয়া-পাওয়া আর স্ট্যাটাস রক্ষায় ব্যস্ত। ফলস্বরূপ নিজের বাইরে রাষ্ট্রকাঠামো, ক্ষমতা কিংবা সমাজের অন্য কোনো শ্রেণি নিয়ে চিন্তা করার সময় তাদের হয়ে ওঠে না। অবশ্য তারা উচ্চশ্রেণির সঙ্গে তুলনা করে, তাদের পিছনে ছুটে চলে। আর এটাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগায় রাষ্ট্র। যে কারণে মধ্যবিত্ত নিয়েও রাষ্ট্রের অতো মাথা ঘামাতে হয় না। নির্মাতা হয়তো মফিজুলের মধ্যে দিয়ে স্বয়ং রাষ্ট্রকেও ধরতে চেয়েছেন। মফিজুলের সঙ্গে নব্য ধনী পরিবারটির সম্পর্ক না দেখানোর পিছনে এটাও একটি কারণ হতে পারে।

   তবে রাজনীতিবিদ বিচারে মফিজুলের সঙ্গে মধ্যবিত্তের সম্পর্ক না দেখানোটা নির্মাতার একটি দুর্বলতার ছাপ। যেখানে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি শ্রেণির সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে রাজনীতির ছায়া। আর রাজনীতিবিদরা মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষিত নিরাপদ জীবনের স্বপ্নসিঁড়ি হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। রাজনীতিকের সঙ্গে তাই নিম্নশ্রেণির ভোটের বাইরে সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও মধ্যবিত্তের সঙ্গে সুসম্পর্কই দেখা যায়। তারপরও এই বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে মনে প্রশ্ন ওঠে। আবার মনসুরের প্রতি মফিজুলের অতোটা বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার কোনো কারণ নেই। রাষ্ট্র এতোটা উদার নয় যে, নিম্নশ্রেণিকে এতো আপন করে নেবে, তার এতো খোঁজখবর রাখবে। যদিও রাজনীতিকরা পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতিটুকু দিয়ে থাকে। এছাড়াও চলচ্চিত্রে লক্ষণীয় যে, একজন অন্ধ গায়ক মফিজুলের ওস্তাদ। তাকে বেশ সমীহও করেন মফিজুল। ঠিক এই রাষ্ট্র যেমন কিছু বুদ্ধিজীবী লালন-পালন করে আর কি। তাই দিনশেষে মফিজুল চরিত্র হিসেবে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকের ছায়া হয়েই থাকে।

সাত.

শিল্প সময়কে ধারণ করে। মানুষের কথা বলে। আর চলচ্চিত্রে থাকে শিল্পের বিভিন্ন রূপের সমাহার। মহাকালের বিচারে চলচ্চিত্রশিল্প গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তখনই, যখন তা সময়কে ব্যাখ্যা করে। কমলা রকেট অবশ্যই সেই কাতারে পড়ে। তবে নির্মাতা নূর ইমরান মিঠুর রাজনৈতিক অবস্থান (বিশেষ কোনো দলীয় পরিচয়ের কথা বোঝানো হচ্ছে না) বোঝাটাও জরুরি। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২০ মিনিট। আতিককে ম্যানেজার জানান, রাতে পুলিশ আতিকের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। চারদিকে সোর্স লাগিয়েছে। ম্যানেজারকেও সারারাত জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এমনকি অনেকভাবে চেষ্টা করেও পুলিশকে সামলানো যাচ্ছে না। অবশ্য গণমাধ্যমের কারণে পুলিশের ওপর চাপ বাড়ছে এমনটাই জানান ম্যানেজার। যেখানে রানা প্লাজা ধস, তাজরীন গার্মেন্টস, বনানী টাওয়ার, পুরান ঢাকায় আগুন লাগাসহ সাম্প্রতিক এমন অনেক ঘটনাই ঘটেছে এবং রাষ্ট্র যেগুলোর দায় কোনোভাবেই এড়াতে পারে না; অথচ ঘটনাগুলোর পিছনের কারিগরদের ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ে না। সেখানে চলচ্চিত্রে এতো অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা, পাঁচ বছর আগে ঢাকা ক্লাবের সদস্য পদ বাতিল করা আতিকের পক্ষে রাষ্ট্রের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে না পারাটাই খটকা লাগে। এমনকি আতিকের আগুন লাগানো কেবলই তার ইচ্ছায়, এর পিছনে অন্য কোনো শক্তি থাকতে পারে কি না এমন কোনো ইঙ্গিতও দেখা যায় না চলচ্চিত্রে। তার মানে কি নির্মাতা কৌশলে এই রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিরাপদ রেখেছেন? রাষ্ট্রে যা কিছু ঘটে তাতে বিশেষ শ্রেণির দায় থাকতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের কোনো দায় নেই! রাষ্ট্র যে সিস্টেমে চলছে তাতে কোনো সমস্যা নেই!

   এটা ঠিক যে, নির্মাতা রাষ্ট্রের বিশেষ দিক উন্মোচন করেছেন। মুনাফালোভী মালিকশ্রেণির দুর্বৃত্তায়ন চলচ্চিত্রে সাবলীলভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে শ্রমিকের মৃতশ্রমকে পুঁজি করে মালিকশ্রেণির প্রতিপত্তি যেভাবে পৎপৎ করে বেড়ে উঠছে, সেটাও সহজেই বোঝা যায়। আর অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে তো শীর্ষে বাংলাদেশেরই অবস্থান। তবে বর্তমান বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থার কথা বললেও নির্মাতা কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন। এমনকি ক্ষমতার প্রসঙ্গটি স্পর্শই করেননি। বাংলাদেশের চিত্র তো কেবল অর্থনৈতিক অবস্থা নয়। একদিকে আঘাত করে অন্য বিষয়ে ছাড় দিয়ে নির্মাতা নিজেকে নিরাপদে রাখার যে কৌশল পেতেছেন, তা দিনশেষে তার অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কারণ চলচ্চিত্রে পুলিশ তথা এই রাষ্ট্রযন্ত্রের অবস্থান বহাল তবিয়তেই থেকে যায়। আবার রাষ্ট্র দায় এড়াতে কীভাবে ‘আই ওয়াশ’ করে এবং জনমত পক্ষে রাখতে বিশেষ অভিযান পরিচালনা, শোক প্রকাশ, রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা--এসব দেখানো প্রয়োজন বলেই দেখায়।--নির্মাতার নিজেকে নিরাপদ রাখার কৌশল কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের সুপরিকল্পনার দিকটিও উন্মোচন করে। যে রাষ্ট্রের কোনো কিছু বিনা কারণে ঘটে না, যে রাষ্ট্র মানুষের সবকিছুতেই জড়িত, সেখানে কোনো ঘটনা ঘটলে দুই একদিন রাষ্ট্রযন্ত্রের অমন একটু ছটফটানি না দেখালে কি চলে! রাষ্ট্র তো সবসময় জনগণের পক্ষে! নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে কেবল অবস্থান পাল্টায়।

আট.

কমলা রকেট-এর শুরুটা বেশ চমৎকারই বলতে হয়। সেই সঙ্গে পোশাক কারখানায় আগুন, বিদেশপ্রীতি, বিশেষ ক্লাবের সদস্য, বি সি এস-এর প্রতি ঝোঁক ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে তুলে ধরার বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয়। চলচ্চিত্রের মূল আবহসঙ্গীতটি বিশেষ মোহ জাগায়। এছাড়াও সুনীল কর্মকারের ভরাট গলায় ‘কে যেনো আমারে’ শিরোনামের গানটির ব্যবহার নির্মাতার রুচিবোধ প্রকাশ করে। এমনকি ক্রমশ লাশ পচা, মাছির ভনভন--শৈব তালুকদারের শব্দগ্রহণে অসাধারণ লেগেছে।

নয়.

কুয়াশা ও চরে স্টিমার আটকে যাওয়া, খাদ্য সঙ্কট, লাশে পচন, মাছির ভনভন, দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠা--যেনো থমকে গেছে জীবন, থমকে গেছে বাংলাদেশ। বাঁচার লড়াইয়ে শ্রেণি ভেদাভেদ ভুলে এক লাইনে দাঁড়িয়ে সব শ্রেণির যাত্রী। এটাই যেনো ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ। মানুষের শাসক-শোষক হয়ে ওঠার গল্প; কিন্তু শাসক আর শোষিতের গল্প কতোদিন? শোষণের রাস্তায় পচন ধরেছে। মনসুর যেমন স্ত্রীর লাশ পচা রোধে চা পাতা পাননি, আতিকরাও তেমনই এই অরক্ষিত ব্যবস্থার সুরক্ষার কোনো উপায় পান না। পচন ধরা এই রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে উটকো গন্ধ বের হবেই। তাই যতোই উন্নয়নের গল্প বোনা হোক না কেনো, রাষ্ট্রনীতি-অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। মানুষের কোনো জাত নেই, মানুষের কোনো শ্রেণি নেই, মানুষের কোনো কর্তৃপক্ষ থাকতে পারে না। মানুষ তো মানুষই। নির্মাতাও কিছুটা হলেও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশ এক ভয়ঙ্কর সঙ্কটের মুখে।

 

লেখক :মো. হারুন-অর-রশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ডট রিপোর্ট-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত।

harunmcj25@gmail.com

https://www.facebook.com/profile.php?id=100005362547107

 

তথ্যসূত্র

1. shorturl.at/lMPS6; retrieved on: 05.02.2019   

২. ঘোষ, বিনয় (১৯৯৯ : ১৪৪); ‘বিপ্লব মহানগর মধ্যবিত্ত এবং মার্কসবাদ (১৯৬৯)’; মেট্রোপলিটন মন. মধ্যবিত্ত. বিদ্রোহ; ওরিয়েন্ট লংম্যান প্রকাশন, ভারত।

৩. মঞ্জুর আহ্মদ ও অন্যান্য (১৯৯২ : ২৬); মনঃসমীক্ষণ অভিধা; ইমপিরিয়্যাল বুকস্, রাজশাহী।

4. https://www.bbc.com/bengali/news-44218313; retrieved on: 05.03.2019

৫. হক, হাসান আজিজুল; ‘পথ জুড়ে কি শুধুই কাঁটাবলি?’; প্রথম আলো; ২য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সংখ্যা, ৪ নভেম্বর ২০০০।

6. shorturl.at/aGHU1; retrieved on: 24.03.2019

বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

 

 

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন