অনিক ইসলাম
প্রকাশিত ১১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘মান্টো’ : কেবল মান্টোকে নয় একটা সময়কেও দেখা
অনিক ইসলাম

Here lies Sadat Hasan Manto and with him lie buried all the secrets and mysteries of the art of short-story writing.
যে মানুষটি সম্বন্ধে আজ আমি লিখতে চলেছি তা আমার মতো মানুষের জন্য এক প্রকার ধৃষ্টতা। তাকে নিয়ে আমি সর্বোচ্চ আমার অনুভূতি জানাতে পারি, এর বেশি নয়। প্রথমেই আমার স্বীকার করে নেওয়া উচিত যে, মান্টোকে নিয়ে লেখার যোগ্য আমি নই। তবু কী যেনো একটা বার বার আমাকে লেখার টেবিলে আছড়ে আছড়ে ফেলেছে, আর আমিও সেই কী এর উত্তর খোঁজার জন্য শুরু করেছি আজকের লেখা। মূলত নন্দিতা দাসের পরিচালনায় ২০১৮-তে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র মান্টোকে কেন্দ্র করেই এ লেখার সূত্রপাত, সে প্রসঙ্গে আমি লেখার দ্বিতীয় ভাগে কথা বলবো। তার আগে মান্টোর সঙ্গে আমার পরিচয় এবং মান্টোকে নিয়ে আমার যে বোঝাপড়া তা আলোচনার লোভ সামলাতে পারছি না।
মান্টোর নাম প্রথম শুনি ২০১০-২০১১ খ্রিস্টাব্দের দিকে। যখন পৃথিবীর নানা হিসাবগুলো কেবল একটু আধটু করে জানতে শুরু করেছি, বোঝাবুঝি শুরু হয়েছে আরো অনেক পরে। সেই সময় পরিচিত একজন বললেন, মান্টোকে পড়তে। পাকিস্তানে পড়ার মতো কোনো লেখক থাকতে পারে এটা জেনেই তো আমি অবাক। তখন পর্যন্ত পাকিস্তান সম্পর্কে শোনা ওটাই আমার প্রথম ইতিবাচক কোনো কথা! আমার ধারণা পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ তো বটেই, সম্ভবত পাকিস্তানের ঘাস, লতা, পাতাও পৃথিবীর আর সব দেশ থেকে আলাদা! এতোটাই পূর্ণ ছিলো আমার ঘৃণার কলস। তো কেমন হতে পারে পাকিস্তানের কোনো লেখকের বই, কী লেখা থাকতে পারে তাতে; সেই আগ্রহ থেকেই আমি জোরেসোরে খোঁজা শুরু করলাম সাদাত হাসান মান্টোকে। অনেক খুঁজে মান্টোর একটা বই পেলাম, কিন্তু কেনো জানি সেভাবে পড়া হলো না, হয়তো মান্টোর ইংরেজি অনুবাদটা বুঝতে অসুবিধা হয়েছিলো। তাই মান্টোর ভারত-যোগ এবং ১৯৪৭-এ তার পাকিস্তান চলে যাওয়াটা জানতে সময় লেগেছে আরো কয়েক বছর।
দুই.
না হিন্দুস্তান না পাকিস্তান, না পণ্ডিত, না ইমাম, না রক্ষণশীল, না প্রগতিশীল, না কমিউনিস্ট, কেউই হজম করতে পারেনি সাদাত হাসান মান্টোকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনন্য অপাঙক্তেয় আর খুব বেশি লেখক নেই। নির্মম সত্য সহজে পরিপাক হয় না, তাইতো মান্টো বলেছিলেন, ‘তোমরা যদি আমার গল্পকে সহ্য করতে না পারো, তবে মনে করতে হবে যে পৃথিবীই সহ্য করার মতো অবস্থাতে নেই।’ নিজেকে সমাজের সামনে অবিচল দাঁড়িয়ে থাকা এক আয়না ভাবতেন মান্টো। তার লেখায় কেউ অসন্তুষ্ট হলে তিনি ব্যঙ্গ করে বলতেন, ‘বাজে চেহারার কোনো ব্যক্তি সামনে দাঁড়ালে আয়নার কী দোষ!’ এই হলেন সাদাত হাসান মান্টো, সত্যকে সত্য ভাবতে পারার দুর্লভ স্থিতিস্থাপকতা এবং সেখান থেকে গজানো সাহস যার মধ্যে এনেছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে আন্তরিকতম অহংকার।
৪৭-এর দেশভাগ যে শরীরকে কলমের আগা দিয়ে চিরে দুই ভাগ করে ফেলেছিলো তারা হলো, বাংলা এবং পাঞ্জাব। অর্থাৎ অন্যান্য প্রদেশগুলো অখণ্ডভাবে ভারত-পাকিস্তানে ভাগ হয়ে গেলেও এই দুই প্রদেশের মানুষকে যেমন অবাক নির্মমতা সইতে হয়েছিলো তা অন্যদের হয়নি। হঠাৎ এক সকালে ঘুম থেকে উঠে কেউ হয়তো শুনেছিলো, উঠানের অন্য পাশে যেখানে তার বাবা-মায়ের ঘর তা পাকিস্তান হয়ে গেছে। কিংবা তার বাড়ি থেকে ওই তো দেখা যায় যে নদী, যে নদীর ফোঁটা ফোঁটা পানি তার রক্তের সঙ্গে দৌড়ায়, স্মৃতি এ মাথা থেকে ও মাথা অবধি, তার অর্ধেক অংশ নাকি ভারত হয়ে গেছে। কিছু মানুষের রক্ত হিম করা ক্ষমতার খেলায় সে তার অর্ধেক নদী আর অর্ধেক স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছে! তাই দেশভাগের যে শিহরণ এবং অব্যবহিত যন্ত্রণা এই দুই প্রদেশের মানুষের আছে, তা অন্য কারোর কাছে বিরল। তো এই পাঞ্জাবের যে অংশটা ভারতের ভাগে পড়েছিলো, সেই অমৃতসরের এক মধ্যবিত্ত কাশ্মীরি পরিবারে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন মান্টো। এটা সেই অমৃতসর, যেখানে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশ সরকার নির্মম জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলো। এ রকম একটা মানস নিয়ে বড়ো হয়েছেন মান্টো, যাকে উপমহাদেশের দাঙ্গা ও দেশভাগের শ্রেষ্ঠতম গল্পকার হিসেবে মেনে নিতে এখন অন্তত আর কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। যিনি স্পঞ্জের মতো শুষে নিয়েছেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো অভিবাসনের দুঃখ, যন্ত্রণা আর তা চিপে দিয়েছেন সাদা কাগজে, যার উপরে সবসময় লেখা থাকতো ৭৮৬।
দেশভাগ যদি আর সবার মধ্যে ক্ষত তৈরি করে থাকে, তবে মান্টোকে তা ধরেছিলো ক্যান্সার হয়ে। ছিন্নমূল মানুষেরা প্রায় সবকিছু হারিয়েছিলো দাঙ্গায়। তবে মান্টো যা হারিয়েছিলো তা ছিলো ব্যতিক্রমী ও অভিনব। মান্টো গোটা এক শহর হারিয়ে ফেলেছিলেন; হারিয়েছিলেন তার সাধের মুম্বাইকে (বোম্বে)। যে শহর সাদাত হাসানকে ‘মান্টো’ বানিয়েছে, যে শহরে তার পাগলামী অতি যত্নে বেড়ে উঠেছে, যে শহরে তার লেখালেখি-চলচ্চিত্র-বন্ধু-আড্ডা এবং যে শহর মান্টোকে কখনো প্রশ্ন করেনি। আমরা আজও ঠিক মতো থই পাই না ভেবে যে, মান্টো কেনো মুম্বাই ছেড়ে পাকিস্তান চলে গেলেন! শুধুই কি প্রিয়তম বন্ধু শ্যাম চাড্ডার ওই কথাতে কষ্ট পেয়ে, যা আমরা চলচ্চিত্র মান্টোতে দেখি? ভারত সরকার এই নিয়ে টু শব্দ করে না; কারণ ততোদিনে ভারত তার ধর্মনিরপেক্ষ আব্রুর আড়ালে মুসলমানদের ছলে-বলে-কৌশলে বের করে দেওয়ার তাল শুরু করে দিয়েছিলো। তবে কারণ যাই হোক, নিজের প্রাণের মুম্বাই হারানোর ব্যথা আমৃত্যু মান্টো বয়ে বেড়িয়েছেন।
তিন.
বর্তমানে যখন দেখি ক্রমান্বয়ে নিজেদের সভ্য দাবি করা মানুষেরা ও রাজনীতিকেরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়েছে এবং অতীতের শাসকদের মনে যতোটুকু দায়বদ্ধতা ছিলো সেটুকুও নিজেদের মধ্য থেকে বিসর্জন দিয়ে নিজেকে নিখুঁত শাসকে পরিণত করছে, তখন মান্টোকে মনে পড়ে। অনুভূত হয় ৪০-এর দশকের লেখক এখনো কী দুর্দান্তভাবে প্রাসঙ্গিক। যখন দেখি বিভাজনের রাজনীতি সপ্তমে সুর চড়িয়েছে, থামার কোনো নাম-গন্ধ নেই, তখন বুঝি মান্টো সেই সময়ে বসে এই সময়ের কথা লিখে গেছেন। মান্টোর প্রতিটি গল্পই ভীষণভাবে আধুনিক। ভারতে যখন এই ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে এসে দেখি নাগরিক তালিকা হচ্ছে এবং মূল লক্ষ্য মুসলমানদের সেখান থেকে তাড়ানো, তখন মনে হয় এটা কি ৪৭-এর থেকে খুব বেশি আলাদা কোনো ঘটনা। ভারতে যখন দেখি গো-হত্যার মিথ্যে গুজব ছড়িয়ে সংখ্যালঘুদের গণপিটুনি দিয়ে হত্যা বা উচ্ছেদ করা হচ্ছে এবং তা রাষ্ট্রীয় মদদে, তখন মান্টোকে মনে পড়ে, মান্টোর গল্পদের মনে পড়ে। এমনকি যখন এক ভুয়া ফেইসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে বৌদ্ধ মন্দির পোড়ানো হয়, আরাকান থেকে ১০ লাখের উপর মানুষকে খেদিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তখন দাঙ্গা-স্বাধীনতা-দেশভাগকে নিয়ে করা মান্টোর বিশ্লেষণ বড়ো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। উপমহাদেশের এই ঘুণে ধরা স্বাধীনতা ও জাতীয়তাবাদকে যেনো কটাক্ষ করে মান্টোর গল্পেরা, তার চরিত্ররা।
নিজের ৪২ বছরের ছোট্ট জীবনে মান্টো লিখে গেছেন ঘোরলাগা মানুষের মতো। এতো অল্প সময়ে তিনশোর মতো ছোটোগল্প, অনেক গদ্য, চলচ্চিত্র-রেডিওর জন্য অসংখ্য স্ক্রিপ্ট তিনি লিখেছেন। কিন্তু আর দশটা জিনিয়াসের বেলায় যেমন হয় মান্টোর সঙ্গেও সেটাই হয়েছিলো; তাকে বুঝতে পারেনি তার সমকালীন সমাজ। তারা তাকে বাতিলই শুধু করেনি, নানা অভিযোগে বিদ্ধ করেছে। তারা তার লেখার স্পর্শকাতরতাটুকু ধরতে পারতো না। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, সেসময়ের প্রগতিশীল লেখক শিবির মান্টোকে বয়কট করেছিলো। বোধ হয় পৃথিবীকে দেখার তাদের যে ছকে বাঁধা চোখ, তা মান্টোকে পছন্দ করে উঠতে পারেনি। যে কারণে তাদের সঙ্গে কখনোই নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারেননি তিনি। সমাজ-বাস্তবতাকে সর্বদা শ্রেণি সংগ্রামের বৃহত্তর লেন্সে দেখার রোমান্টিক স্বপ্নে আটকে থাকেননি মান্টো। প্রথম জীবনে তীব্রভাবে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ছাঁচে ভারতে আন্দোলনের যে ঘোর, মান্টোর সে ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগেনি। বড্ড বেশি নিয়মতান্ত্রিক এই বিপ্লবে হয়তো জীবনের অনিশ্চয়তা ও স্বতঃস্ফূর্ততার অনুপস্থিতি তার চোখে পড়েছিলো। তার বদলে সমাজের ছিন্নমূল মানুষের প্রতিনিয়ত সয়ে যাওয়া ছোটো ছোটো কিন্তু কুঠারাঘাতের মতো যন্ত্রণা তার লেখাতে বেশি আসতে থাকলো। যে কারণে যৌনকর্মী থেকে শুরু করে কোচোয়ান, পাগল থেকে শুরু করে ইমাম, এসব প্রান্তিক চরিত্রই তার লেখাতে বেশি করে উঠে এসেছে। নিজেদের প্রয়োজন মেটা মাত্রই আরেকবার প্রয়োজনের আগমুহূর্ত পর্যন্ত যে মানুষদের আমরা ভুলে থাকতে পারলে বাঁচি, সেই যৌনকর্মীরা তার লেখায় উঠে এসেছে বার বার। তাদেরকে নিজের গল্পের চরিত্র করে যে আঘাতটা মান্টো সমাজের বুকে করতেন, স্বভাবতই তা সমাজের রক্তক্ষরণ করাতো। যৌনকর্মীদের সঙ্গে করা তাদের অমানবিক আচরণ যখন তারা মান্টোর গল্পে দেখতে পেতো, তখন ভিতরে ভিতরে নিশ্চয় তারা কুকঁড়ে যেতো। ক্ষেপে উঠতো সেই লেখকের বিরুদ্ধে, যে তাদেরকে তাদের নিজেদের সামনে বেআব্রু করে দিতো। নিজেদের অসাধারণ ভাবার অনুভূতি তাদের থমকে যেতো। তারা ভয় পেতো কী করে মান্টো তাদের হৃদয়ের ভণ্ডামি ধরে ফেলেছেন! নিজের জীবদ্দশায় সর্বদা সমাজকে এভাবে অস্বস্তিতে রেখেছেন মান্টো।
মান্টো জানতেন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে, তবে একসময় মানুষ তাকে বুঝতে শুরু করবে। একবার তিনি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রুপ করে লিখলেন, একদিন পাকিস্তান সরকার হয়তো আমার কফিনে মেডেল ঝুলিয়ে দেবে এবং সেটাই হবে আমার কাজের প্রতি চরমতম অপমান। মান্টোর মৃত্যুর ৫৫ বছর পর পাকিস্তান সরকার হুবহু সেই কাজটিই করেছে, মান্টোকে তারা ভূষিত করেছে নিশান-ই-ইমতিয়াজ উপাধিতে।
চার.
নিজের লেখাতে নারীদের প্রতি প্রগাঢ় মমতা ধারণ করেছেন মান্টো। মান্টোর বাবার তুলনায় মা ছিলেন অত্যন্ত কোমল আচরণের এক নারী; যিনি এক স্নিগ্ধতায় বরাবর আগলে রাখতেন তাকে। কে জানে হয়তো এই ব্যাপারটি মান্টোকে স্পর্শ করে গিয়েছিলো। শুধু নিজের লেখাতেই নয়, ব্যক্তি জীবনেও মান্টোর সংস্পর্শে আসা প্রত্যেক নারীর সঙ্গে কোমল আচরণ করেছেন। স্ত্রীর শাড়ি আয়রন থেকে শুরু করে দরকারে বাড়ির রান্না পর্যন্ত মান্টো করতেন অবলীলায়। যা দক্ষিণ এশিয়ার পুরুষ কল্পনাও করতে পারেনি ৭০ বছর আগে। মান্টো জীবনে কখনো নিজের স্ত্রীর সঙ্গে কটু কথা বলেননি। নিজের মেয়েদের পাগলের মতো ভালোবাসতেন। স্ত্রী-কন্যাদের ভালো রাখতে চাইতেন সর্বদা, কিন্তু কোথায় যেনো কী হয়ে যেতো! তিনি জানতেন, প্রতিবার তিনি কোনো গল্প লিখলে তা তার পরিবারের জন্য, নিজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়। তবুও নিজেকে আটকাতে পারতেন না, সত্যগুলো তার মাথায় এসে ধাক্কাতে থাকতো, তিনি সব ভুলে যেতেন। ডুবে যেতেন তার গল্পে এবং মদে; হ্যাঁ বৈপরীত্য মান্টোর মধ্যে ছিলো। আমাদের কার মধ্যেইবা তা নেই!
মান্টোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রত্যেকেই মান্টোকে ঠকানোর তালে থাকতো। কী তার বেশিরভাগ প্রকাশক, চলচ্চিত্রের প্রযোজক বা ব্যবসায়িক অংশীদার। একটা সময় নিজের লেখা দিয়ে আর সংসারটা সামলাতে পারছিলেন না মান্টো। তার বেশিরভাগ লেখা ছাপতে সাহসও পেতো না প্রকাশকরা। আর যদিও বা ছাপতো, তার জন্য মূল্য দিতো একেবারে নগণ্য; মদের খরচেই যার বেশিরভাগ চলে যেতো। এ অবস্থায় মান্টো তার শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নেন। এর আগে সংসারের অনেকটা সামলিয়েছেন তার প্রাণপ্রিয় ভাগনে হামিদ জালাল।
নিজের এ অবস্থায় আত্মসম্মানবোধে আঘাত পেতে পেতে অনেকটা কুঁকড়ে থাকতেন মান্টো। অন্যান্য লেখকরা যখন রাষ্ট্রের কাছে নিজেকে বিক্রি করে দিয়ে অনেক কিছু বরাদ্দ নিচ্ছিলো, তখনো লেখা ছাড়া আর কিছুই না বোঝা এই লেখক কেবলই লিখে গেছেন। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, পৃথিবীর কোনো কিছুই মান্টোকে কিনতে পারেনি। যাহোক সবকিছুর চাপে পড়ে একসময় বাধ্য হয়ে মান্টো একটি প্রিন্টিং প্রেসের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, তার বেশিরভাগ লেখাই যেহেতু ছাপাতে সবার অরুচি, তাই নিজেই ছাপাবেন সেসব। কিন্তু পৃথিবীর কী নির্মম পরিহাস, মৃত্যুর পরে যিনি হাজার হাজার মানুষের হৃদয়কে আগ্নেয়গিরির মতো জ্বালাতে থাকবেন, সেই মান্টোকে কিনা সরকার দিলো বরফ কলের লাইসেন্স!
জীবনে তখন মান্টোর এমনই দুর্দশা চলছে যে, তিনি বাধ্য হলেন বরফ কলের ব্যবসা শুরু করতে। কিন্তু ব্যবসার ‘ব’ না বোঝা মান্টোকে তার অংশীদারেরা এমনভাবে ঠকিয়েছিলো যে, মান্টো অল্পদিনেই বাধ্য হয়েছিলেন সেই লাইসেন্স ফেরত দিতে। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মান্টো তার স্ত্রীকে চিৎকার করে বলে উঠেন, ‘সাফিয়া আমি বরফ বিক্রি করবো, বরফ? আমি তো আগুন বিক্রি করি।’ নিশ্চিত হওয়া যায় না, তবে ধারণা করি এ থেকেই হয়তোবা মান্টো লিখেছিলেন তার ছোটোগল্প ‘লাইসেন্স’। যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর তার ঘোড়ায় টানা টাঙ্গা চালাতে চাওয়া স্ত্রীর কাছ থেকে টাঙ্গার লাইসেন্স কেড়ে নিয়ে তাকে দেহ ব্যবসার লাইসেন্স দিয়েছিলো নগর কর্তৃপক্ষ। যেখানে মান্টো লিখেছিলেন, ‘মেয়েটি নিজেকে বেচতে চায়নি, কিন্তু মানুষ তাকে ক্রমশ কিনে চলেছিলো।’
মান্টোকে তার লেখার জন্য ছোট্ট জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় একাধিক মামলা লড়তে হয়েছে, বস্তুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। কী ভারত, কী পাকিস্তান, মান্টোর লেখায় ‘অশ্লীলতা’ খুঁজে পেতো উভয় দেশই। মান্টো দুঃখ করে বলতেন, ‘যে সমাজ আগে থেকেই বেআব্রু তাকে আমি আর নতুন করে কী নগ্ন করবো। আমার কাজ কারো কাপড় খোলা বা কাউকে জামা পরানো না, ওটা দর্জির কাজ।’ ছোট্ট জীবনে কখনোই শান্তি মতো লিখে যেতে পারেননি মান্টো। একে তো সংসারের নিদারুণ অভাব, তিন মেয়েকে বড়ো করা, তাদের অসুস্থতা, নিজের ভয়াবহ মদ্য আসক্তি এবং সর্বোপরি একের পর এক মামলা লড়া। শেষের দিকে উকিল নিয়োগ দেওয়ার সামর্থ্য হারানো মান্টোকে আদালতে নিজের কথা নিজেকেই বলতে হয়েছে। তবে একটা জায়গায় ভাগ্যবান ছিলেন মান্টো, তিনি সাফিয়ার মতো একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন স্ত্রী পেয়েছিলেন, যিনি বিয়ের দিন থেকে শেষ জীবন পর্যন্ত সম্পূর্ণ বেসামাল মান্টোর পাশে ছিলেন। বোঝা খুব একটা কঠিন নয় যে, মান্টোর মতো কোনো মানুষের ঘর করা কতোটা কঠিন হতে পারে কোনো নারীর জন্য! হয়তো অপ্রাসঙ্গিক শোনাবে তবুও বলে রাখি হয়তো বুঝতে সুবিধে হবে, এ রকম স্ত্রী-ভাগ্য কিন্তু জীবনানন্দের ছিলো না।
পাঁচ.
তর্কাতীতভাবেই উর্দু ভাষার শ্রেষ্ঠ গল্পকার সাদাত হাসান মান্টো। কিন্তু এই মান্টোই স্কুল ফাইনালে (এস এস সি) পর পর দুবার ফেইল করেছিলেন এবং দুবারই উর্দুতে। পরে সেই তিনিই উর্দু ভাষাতে জাদুকরি সব ছোটোগল্প লিখলেন। উর্দুর নতুন এক রূপ হয়ে দেখা দিয়েছিলো মান্টোর লেখা। কিন্তু ‘দুশমন’ দেশ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হওয়ার কারণে এবং বাংলা-উর্দু ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বের কারণে আমরা এখন যতোটা সম্ভব ভুলে থাকার চেষ্টা করি উর্দুকে। তাই অনুবাদ সাহিত্যের বাইরে মান্টোকে খুব বেশি পড়াই হলো না আমাদের। সত্যিকার উর্দুতে মান্টো পড়তে পারলে তা হয়তো হতো এক অন্যরকম অনুভূতি, সেই শব্দের আঘাত ভিন্নভাবে মননে আছড়ে পড়তো সন্দেহ নেই!
১৯৪৭-এর দাঙ্গা, দেশভাগ থেকে উৎসারিত দুঃখ, ব্যথা, ক্লেশ, হাহাকার, অবর্ণনীয় অমানবিকতা, যুক্তি রহিত মানব আচরণ মান্টোর থেকে বেশি আর কারো পেন্সিলে জমা হয়নি। জন্মভূমি ছাড়ার যন্ত্রণা, এক লহমায় নিজের শৈশব-স্মৃতি-পরিচয় হারিয়ে ফেলা টালমাটাল অস্তিত্বের বোঝা, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত ধোঁকা, দাঙ্গার অসীম আতঙ্ক, অবহেলিত মানুষের অপার্থিব বেদনা, সবকিছু মানে সবকিছু হারিয়ে ফেলার সহ্যাতীত যন্ত্রণা এমন পেলব মমতায়-বা আর কে বুনে গেছেন! মান্টো যেনো নিখুঁত ফটোগ্রাফি করে গেছেন, তবে মান্টোর এই ফটোগ্রাফি সুররিয়াল বা অ্যাবস্ট্রাকট আর্টের অনুভূতি দেয়। দাঙ্গার বীভৎসতার গন্ধ যেনো পাওয়া যায় এই লেখাগুলো থেকে। অনেক লেখকের লেখায় ১৯৪৭ এবং তৎকালীন দাঙ্গা উঠে আসতে দেখেছি; কিংবা একটা বিরাট সংখ্যার লেখকের গোটা জীবন ও তাদের লেখাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪৭ দ্বারা প্রভাবিত হতে দেখেছি; তবে আর অন্য অনেকের মতো মান্টো যেটা করেননি তা হলো, দাঙ্গার বাহ্যিক রূপ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকা। মান্টো বরং দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত মানুষের মনস্তত্ত্বে ঢুকতে চেয়েছেন। যতোটা না বাহ্যিক, তার চেয়ে অনেক বেশি তার অভ্যন্তরীণ ক্ষত মান্টোকে বেশি আকর্ষণ করেছে। তিনি নিজেও যেনো প্রবেশ করেছেন সেই সমস্ত গভীরে এবং সেখানে যা দেখেছেন তা ব্যক্তি মান্টোকেও ক্ষতবিক্ষত করেছে নানাভাবে। মান্টো দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে মননের প্রতিক্রিয়া ধরতে চেয়েছেন তার নানা গল্পে।
মান্টো কাউকে রেয়াত করেননি, হিন্দু-মুসলিম-শিখ-জৈন কাউকে না। দায়ী সবাইকে তাদের কর্মের ফল তিনি তার লেখাতে দিয়েছেন। তাই এমন লেখকের জন্য স্থান কারো কাছেই ছিলো না। যেমন, মান্টোর অন্যতম অসাধারণ গল্প ‘ফিরে আসা’; যেখানে সব হারিয়ে মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের নিজের একমাত্র মেয়ে সাকিনাকে উদ্ধারের অনুরোধ করেন সিরাজুদ্দিন। হিন্দুদের হাতে অজস্রবার ধর্ষিত হওয়া সাকিনাকে উদ্ধারের পর আরেক দফা বলাৎকার করে ওই স্বেচ্ছাসেবকেরা। তারপর যখন হাসপাতালে সিরাজুদ্দিন তার মেয়েকে খুঁজে পান, তখন তার অবস্থা মরে গিয়ে বেঁচে থাকার মতো। সেখানে সিরাজুদ্দিনকে জানালা দেখিয়ে চিকিৎসক বলে খুলে দাও। এই শব্দ শুনে সাকিনা অচেতনেই নিজের পায়জামার ফিতে ধরে খুলে পা ফাঁক করে দেয়। এই গল্পের উত্তর কি রাষ্ট্র দিতে পারে?
শুধু নিচুতলার মানুষের অপ্রাপ্তি, পাপ, হিংসায় নয়, উঁচুতলার মানুষের ফাঁপা শান-শওকত, ভণ্ডামি আর অনিঃশেষ বিচিত্র কামও মান্টোকে টেনেছে। সেই যে তার ‘উপর নিচে দারমিয়ান’ নামের অদ্ভুত বিদ্রুপের গল্পটি, যেখানে এক বছর ধরে এক ধনী মধ্যবয়ষ্ক দম্পতির শুধু একটিবার সঙ্গমের জন্য অপেক্ষা ও নানাবিধ প্রস্তুতি এবং শেষে ব্যর্থ হওয়া; কিংবা ‘গন্ধ’ গল্পটি যেখানে বর্ষণমুখর এক রাতে বিত্তবান তরুণের এক মজদুরণীর সঙ্গে সারারাত সঙ্গম। তরুণীর আদিম ঘামে মাখামাখি হয়ে যে বিচিত্র ও নতুন এক গন্ধ তরুণটি পায়, তা তার মননে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। পরে জেলাশাসকের পেলব শরীরের দামি সুগন্ধি মাখা গ্রাজুয়েট মেয়ের সঙ্গে বাসর রাতেও ওই গন্ধের অনুপস্থিতিতে কামাতুর হয়ে উঠতে ব্যর্থ হন তরুণ। কোথায় যেনো তিনি এক আদিমতাকে খুঁজতে থাকেন। কিংবা ‘টোবাটেক সিং’ গল্পটি। স্বাধীনতার দুই-তিন বছর পর দুই দেশেরই খেয়াল হলো, তাদের পাগলাগারদে এখনো বিধর্মী পাগলেরা আছে, তাদের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এক বৃদ্ধ পাগল বলে তিনি তার গ্রাম টোবাটেক সিং এ যাবেন। পাকিস্তান থেকে তাকে বলা হয় টোবাটেক সিং ভারতে, কিন্তু সীমান্তে গিয়ে তিনি শোনেন টোবাটেক সিং পাকিস্তানে। কী করবেন, কোন দেশে যাবেন, ভাবতে ভাবতে দুই দেশের সীমান্তের মধ্যে নো ম্যানস ল্যান্ডে চিৎ হয়ে পড়ে থাকেন তিনি। যেনো ওখানেই আছে তার টোবাটেক সিং। এমন সূক্ষ্ম মানবতার খোঁজ পেয়ে যাওয়া লেখককে কী করে হজম করবে--কী ভারত, কী পাকিস্তান!
ছয়.
চলচ্চিত্র মান্টো ঠিক বায়োপিক নয়। এটা অনুমান করা নিশ্চয় কষ্টসাধ্য নয় যে, মান্টোর মতো ঘটনাবহুল লেখকের জীবন একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ধারণ করা কখনোই সম্ভব নয়। পরিচালক হিসেবে নন্দিতা দাস সেই চেষ্টাটাও করেননি, তাকে ধন্যবাদ। নন্দিতা তার জীবনের প্রায় ছয়টা বছর এই চলচ্চিত্রের পিছনে দিয়েছেন। এর মধ্যে চার বছর গেছে মান্টোকে নিয়ে নানা গবেষণায় এবং দুই বছর লেগেছে চিত্রনাট্য তৈরিতে। খুবই আশ্চর্য লেগেছে, যখন দেখি মাত্র ৪৪ দিনে শেষ হয়েছিলো মান্টোর শুটিং। কারণ চলচ্চিত্রের একটা বড়ো অংশ জুড়ে লাহোর আছে, তাই প্রায় হুবহু লাহোর তৈরি করতে হয়েছে ভারতে, কাজটি মোটেও সহজ ছিলো না। বিশেষত এটি সেই সময়, যা নির্মাতা নন্দিতা নিজের চোখে দেখেননি; নিশ্চয় খুব ভালো একটি দল ছিলো নন্দিতার। ভারত সরকার নন্দিতাকে অনুমতিও দেয়নি পাকিস্তানে চলচ্চিত্রটির শুটিং করতে।
মান্টো নিয়ে আলোচনা শুরুর আগে নির্মাতা নন্দিতা দাস নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। অভিনয়শিল্পী থেকে নির্মাতা হওয়া নন্দিতা নিজেই একজন যোদ্ধা। একে তো নারী, গায়ের রঙ শ্যামলা; তাই পুরুষশাসিত পৃথিবী তথা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে টিকতে একটা ভয়াবহ অনিঃশেষ যুদ্ধ জারি রাখতে হয়েছে তাকে। পরবর্তী সময়ে যখন তিনি নির্মাতা হন, তখন সংগ্রামটা বেড়েছে বই কমেনি। ভীষণভাবে রাজনীতি সচেতন নন্দিতাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, কীভাবে তিনি মান্টোর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন, কীভাবে মান্টো তার হৃদয়ের এতো কাছাকাছি চলে এসেছিলো? নন্দিতা বলেছিলেন, তার কাছে মান্টো হলো সত্যি বলার সাহস, নিজের ভাবনা সম্পর্কে এতোটাই নিঃসংশয় থাকা যে, ফলাফল যতো নির্মমই হোক না কেনো নিজের বক্তব্যে অবিচল থাকার দুর্দমনীয় সাহস। নন্দিতা আরো বলেন, আমার বাবাও ঠিক এমন চরিত্রের ছিলেন এবং এটা তাকে মান্টো সম্পর্কে আরো আগ্রহী করেছিলো। এছাড়াও তিনি যখন গভীরভাবে মান্টো পড়তে শুরু করেছিলেন, তখন তার কাছে মনে হয়েছিলো, বর্তমান ভারত তথা পৃথিবীজুড়ে যে অসহিষ্ণুতা, মুক্তচিন্তা ও কথা বলার অধিকারের ওপর ক্রমাগত আঘাত, এর বিরুদ্ধে লড়তে গেলে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর দরকার, তা সাদাত হাসান মান্টোতে আছে। নন্দিতা ভেবেছেন, এই সাম্প্রদায়িকতার গোলকধাঁধা থেকে বের হতে উত্তরগুলো সবার কাছে উন্মুক্ত করতে হবে।
বস্তুত নন্দিতা এমন এক সময়ে মান্টো নির্মাণে হাত লাগালেন, যখন সত্যিকার ‘মান্টোয়ানার’ চর্চা দরকার। ভারতে এখন এমন এক সরকার দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যারা ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টর ও রক্ষণশীল জাতীয়বাদের প্রচারক। এ যেনো সাম্প্রদায়িকতার ফেরিওয়ালা। যে লড়াইটা মান্টো লড়ছিলেন ধর্মীয় বিভেদ ও জাতপাতের বিরুদ্ধে, তা এতোদিন কিছুটা ধিকিধিকি আঁচে জ্বলছিলো ভারতের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কার্পেটের নিচে। এই সরকার তা খুঁচিয়ে তুলে ফেলেছে এবং এই আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দাউ দাউ করে গোটা দেশে। যে পরিমাণ ঘৃণা তারা তৈরি করেছে ভারতের অভ্যন্তরে, এতে আশু কোনো শিকল পরানো না গেলে, তা শুধু ভারত নয়, আমি নিশ্চিত এর গনগনে আঁচ গোটা উপমহাদেশ অনুভব করবে। যেখানে সামান্যতম সুযোগ পেয়েছে সেখানেই ঘৃণা ঢুকিয়েছে এই সরকার; কী হিন্দু-মুসলমান, কী ধনী-গরিব, কী জাঠ-অজাঠের (জাঠ : পাঞ্জাব ও রাজপুতনা অঞ্চলের জাতিবিশেষ) মধ্যে। বর্তমান ভারতে গোটা জাতীয়তাবাদের ধারণা পাকিস্তান প্রশ্নে আটকে আছে। মানুষের ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে তাকে শোষণ করা হচ্ছে। কিন্তু এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে বলা হচ্ছে অ্যান্টি-ন্যাশনাল, আরবান নকশাল। এই করে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা, এবং তাতেও না হলে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। যেমন, ভারতের অন্যতম মুক্তবুদ্ধির সাংবাদিক গৌরি লঙ্কেশকে অনেক দিন ধরে হুমকি দিয়েও না থামাতে পেরে অবশেষে বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। স্বাধীন ভারত যে অখণ্ড চেতনা নিয়ে এগোতে চেয়েছে তা এখন ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন। এই পরিস্থিতি তো মান্টোর চেনা মাঠ; তাই এ অবস্থা বিশ্লেষণে মান্টো অবধারিত হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছে নন্দিতা দাসের হাতে।
চলচ্চিত্র মান্টো মূলত ৪৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী চার বছর সময়ের গল্প। যে সময়ে মান্টো তার জীবনের সবচেয়ে উথালপাথাল সময়টা কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে তাকে ভারত ছেড়ে পাকিস্তান চলে যেতে হয়েছে, গোটা ক্যারিয়ারটাই আবার নতুন হিসাবনিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চলচ্চিত্রে মূলত মান্টোর গল্পের মধ্য দিয়ে মান্টোর মননকে বর্ণনার চেষ্টা করেছেন নন্দিতা। যেখানে পাঁচটি গল্পের সরাসরি চিত্রায়ণ ছাড়াও আরো অনেক গল্প এখানে সেখানে মান্টোর মুখ দিয়ে এসেছে। তবে এই পাঁচটি গল্পের চিত্রায়ণই এই চলচ্চিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। দেশভাগের যে যন্ত্রণা ও বীভৎসতা যেটা ছাড়া মান্টোকে বোঝা বড়ো দুষ্কর, সেই ব্যাপারটি যেনো এক রোমান্টিক মুডে ছুঁয়ে গেছেন নির্মাতা; দেশ স্বাধীন হওয়ার দৃশ্য পটকা ফুটিয়ে দেখিয়ে কিংবা দাঙ্গার ভয়াবহতা মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর সংবাদ শুনিয়ে। নন্দিতা আসলে ফোকাসটা অন্য কোথাও করেছেন। আসলে চলচ্চিত্রে মান্টোর অস্থিরতাটা দেখা যায়, তবে সেই অস্থিরতাটার সৃষ্টি বা উত্থান পর্বটা আরেকটু ভালোভাবে দেখতে পেলে ভালো হতো। এর থেকে বেশি আগ্রহ নন্দিতার ছিলো, মুম্বাইয়ে মান্টোর যতো বিখ্যাত বন্ধু ছিলো তাদের সবাইকে একটার পর একটা পর্দায় আনা। এতে কোথাও চলচ্চিত্রটিকে টিপিকাল হিন্দি চলচ্চিত্র করে বাজারের কথাও মাথায় রাখা ছিলো কি না বলতে পারি না।
চলচ্চিত্রের প্রথম পর্বে দেখি মান্টো কেমন যেনো ভীতু হয়ে উঠছেন। যে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি কাজ করতেন, সেখানে মুসলমানদের হটানোর জন্য একটার পর একটা হুমকি ভিতরে ভিতরে ভীষণ অভিমানী মান্টোকে এমনিতে ভেঙেচুরে ফেলছিলো; তবে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিলো বন্ধু শ্যামের একটি কথা। অভিমানী মান্টো আর এক মুহূর্তও মুম্বাই থাকলেন না, রওনা দিলেন লাহোরে। এক আপাত নিরাপদ কিন্তু অনিশ্চিত জীবনে।
চলচ্চিত্রের দ্বিতীয়ার্ধে আমরা মান্টোর লাহোরে থিতু হওয়ার আপ্রাণ কিন্তু নিস্ফল দৃশ্য দেখি। ভারতের মতো লাহোরেও তার ছোটোগল্পকে ‘অশ্লীলতার’ দায়ে অভিযুক্ত হতে দেখি। তার গল্প ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’ এর ওপর ‘অশ্লীলতার’ অভিযোগ আনা হয়। যেখানে দেখা যায়, গল্পের চরিত্র ঈশ্বর সিং বাড়ি ফিরে প্রেমিকার সঙ্গে কামাতুর হয়ে উঠতে ব্যর্থ হওয়ায়, প্রেমিকা সন্দেহ করে তিনি হয়তো অন্য কারো প্রেমে পড়েছেন। ঈর্ষার জ্বালায় অন্ধ হয়ে ঈশ্বর সিংয়ের তরবারি দিয়ে তাকে ক্ষতবিক্ষত করে বোধ হারিয়ে ফেলেন প্রেমিকা। এ সময় ঈশ্বর সিং স্বীকার করেন, দাঙ্গায় আর সবার মতো তিনিও অংশ নিয়েছিলেন এবং এক অজ্ঞান মুসলিম মেয়েকে ধর্ষণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আবিষ্কার করেন, আসলে মেয়েটি মৃত ছিলো। তৎকালীন পাকিস্তানি মুসলিমরা এ গল্পের সংবেদনশীলতা বুঝতে পারেনি। তাদের আত্মমর্যাদা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলো, তারা ভেবেছিলো আমরা এতোটাই নপুংসক যে এক শিখ এসে আমাদের মৃত মেয়েকে ধর্ষণ করে যাবে!
তারা এর পরে ঈশ্বর সিংয়ের মানসিক অসুস্থতার খোঁজ রাখেনি। এবং এমন বিবেক বহির্ভূত সময়েও ঈশ্বর সিং যে এ ঘটনা ঘটিয়ে বিবেকের তাড়নায় সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক মানুষে পরিণত হয়েছিলো। তারা ঈশ্বর সিংয়ের মানবিকতার খোঁজ পায়নি। আসলে ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’ হজম করার মতো পাকস্থলী তখনো উপমহাদেশের মানুষের তৈরিই হয়নি। ‘ঠাণ্ডা গোশ্ত’ এর মামলা চলাকালীন কবি ফৈয়জ যখন বলেন, এই গল্পটিকে ‘অশ্লীলতা’ বলা যায় না, তবে এটি ঠিক সত্যিকারের সাহিত্যও নয়। এ কথাটি মান্টোকে ভীষণভাবে কষ্ট দিয়েছিলো। কখনো কারো কথার ধার না ধারা মান্টো ভেবেছিলেন, ফৈয়জের মতো কবি হয়তো তার গল্পের পরিহাস ও বিদ্রুপটুকু বুঝবেন।
যাহোক, মান্টো এমন একটি চলচ্চিত্র, যেটির টেকনিকাল সমালোচনা করতে হৃদয় সায় দেয় না। এমন একটি টপিক বাছার জন্যই নন্দিতার জন্য ভালোবাসার পুষ্প বর্ষিত হতে থাকে। তাবে চলচ্চিত্রটি টেকনিকালিও দুর্দান্ত। প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য কার্তিক বিজয়ের চিত্রগ্রহণ কিংবা রীতা ঘোষের প্রোডাকশন ডিজাইনিং, যা এই চলচ্চিত্রের জন্য সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিলো। এমনিতে পিরিয়ডিকাল চলচ্চিত্র নির্মাণ চাট্টিখানি কথা নয়। তবে যার কথা না বললে আলোচনায় ভীষণভাবে খামতি থেকে যাবে তিনি নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী; যিনি আজীবনের জন্য একটা প্রজন্মের মননে মান্টো হিসেবে থেকে যাবেন। মান্টোর কথা ভাবলেই মান্টোর থেকে বেশি তার মুখ ভাসবে। নওয়াজের কাছে আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই আসলে। নওয়াজ সত্যিকারভাবেই যেনো মান্টো হয়ে উঠেছেন। চেহারায় একটা মিল তো আছেই, তবে নওয়াজ মান্টোর মস্তিষ্কেও যেনো ঢুকতে পেরেছিলেন। আর মান্টোর স্ত্রী সাফিয়া চরিত্রে অভিনয় করা রসিকা দুগ্গাল’কে ভালো লেগেছে। কেমন যেনো এক গম্ভীর আত্মমর্যাদাবোধ ছিলো তার অভিনয়ে। তবে কিছু উত্তাল সময়েও মান্টোর সঙ্গে তার অতি শান্ত অভিনয় কেমন আরোপিত মনে হয়েছে। তবে নওয়াজ বাদে যদি সত্যিকারভাবে ক্যামেরার আলো নিজের দিকে কেউ ঘুরিয়ে নিয়ে থাকেন তিনি মান্টোর স্বঘোষিত সবচেয়ে বড়ো বন্ধু ও শত্রু, ইসমাত চুগতাই এর চরিত্রে অভিনয় করা জয়শ্রী। যতোবার ক্যামেরা ঘুরেছে, জয়শ্রী বাধ্য করেছেন আর সবাইকে বাদ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে।
মান্টোতে একটা আক্ষেপ থেকে যায়, ব্যক্তি মান্টোকে আরো বেশি ব্যাপ্তি নিয়ে না দেখতে পারার। যেটি পাকিস্তানি নির্মাতা সারমাদ খুসতের পরিচালনায় নির্মিত মান্টোতে অনেকখানি পাওয়া যায়। তবে এটাও মাথায় রাখতে হবে, ভিন্ন নির্মাতা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মান্টোকে আবিষ্কার করবে, মান্টো বেঁচে থাকলে নিশ্চিত সেটাই চাইতেন। তবে সবকিছু মিলিয়ে মান্টো কোথাও একটি আগুনে পোড়া ছাপ রেখে শেষ হয়, যেটি নন্দিতা দাসের মান্টো নির্মাণের প্রধানতম উদ্দেশ্যও বটে। মান্টো কখনোই তার লেখাকে উচ্চমার্গের ভোগের জন্য তৈরি করেননি, না সেই চেষ্টা নন্দিতা করেছেন তার চলচ্চিত্র নিয়ে। এই চলচ্চিত্র কোনো টার্গেট বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণিকে মাথায় রেখে করা না, আর সেটি মান্টোর স্পিরিটের সঙ্গেও যায় না। মান্টো একটি বেনামি আকরিকের মতো, আমরা কোন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মান্টো চর্চা করবো, তা ঠিক করে দেবে আকরিক ছেনে আমরা কোন খনিজ পাবো।
রাষ্ট্র মান্টো নামক ইনসোমনিয়া’য় ভুগেছে, তখনো এখনো। আমাদের প্রশ্ন করা জারি রাখতে হবে, থামা চলবে না। প্রশ্ন করতে হবে, এতো সাহস মান্টো কোথায় পেতো, তার উৎস কী? মান্টোর একটি নিষ্পাপ অ্যারোগেন্স ছিলো, যা মনুষ্যত্বের প্রতি সত্য ও সূক্ষ্মতম সহানুভূতি থেকে উৎসারিত হয়, সেই অ্যারোগেন্সটার চর্চা করতে হবে। আসলে সব বাধা, লোভ উপেক্ষা করে ভেঙেচুরে নিস্পৃহভাবে নির্মম সত্য বলা একটি রোগ, যে রোগের নাম সাদাত হাসান মান্টো। চলুন সেই রোগে আক্রান্ত হই।
লেখক : অনিক ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
anikislam.ru@gmail.com
https://www.facebook.com/aislam.ru
পাঠ সহায়িকা
1. Hasan, Khalid (2007); Sadat Hasan Manto: kingdoms End; Penguin Books, India.
২. মান্টো, সাদাত হাসান (২০১৯); কালো সীমানা; অনুবাদ : জাভেদ হুসেন; প্রথমা পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
৩. মান্টো, সাদাত হাসান (২০১৫); টোবাটেক সিং ও অন্যান্য গল্প; অনুবাদ : জাফর আলম; প্রথমা পাবলিকেশন্স, ঢাকা।
4.http://archives.anandabazar.com/archive/1130521/21edit3.html; retrieved on: 04.05.2019
5. https://www.aajkaal.in/news/review/manto-review-3l4u; retrieved on: 05.05.2019
6. https://www.youtube.com/watch?v=-0fGsv09uHw; retrieved on: 06.05.2019
7. https://www.youtube.com/watch?v=GYkDZe8y600&t=1430s; retrieved on: 10.05.2019
8. https://www.youtube.com/watch?v=Kq8uzGmroyI; retrieved on: 12.05.2019
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন