মো. মমিনুল ইসলাম
প্রকাশিত ০৬ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ছোটো সিনেমার বড়ো লেখা
‘লিটল টেরোরিস্ট’ : মানবিকতার আড়ালে যুদ্ধ জিইয়ে রাখা
মো. মমিনুল ইসলাম

মানবজাতির জীবন পরিক্রমায় একসময় শোষণমুক্ত বা সাম্যবাদী সমাজ ছিলো। তখনো হিংসা মানুষকে আক্রান্ত করেনি। পরে পুঁজি সঞ্চয়ের সম্ভাবনা দেখা দিলে কিছু সংখ্যক মানুষের কাছে সমস্ত সম্পদ গচ্ছিত হতে থাকলো। শ্রেণিভিত্তিক সমাজ দেখা দিলো এবং সঞ্চিত পুঁজি রক্ষার জন্য দেখা মিললো রাষ্ট্রের। ভ্লাদিমির লেলিন বলেন, ‘রাষ্ট্র হলো একটি শ্রেণির উপর অন্য একটি শ্রেণির আধিপত্য বজায় রাখার যন্ত্র।’১ আসলে রাষ্ট্র বিশুদ্ধতার একটা মায়াজগৎ তৈরি করে। কিন্তু আদৌ রাষ্ট্র কখনো বিশুদ্ধ হতে পারে না। নীরবে লুটে নেয় জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের নামে জনগণের অপরিসীম শ্রম।২ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যুক্ত হয় শোষণ। এই শোষণকে নিভৃতে সমর্থন করে যায় রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনাময় সহোদর গণমাধ্যম এবং এর অন্যতম শাখা চলচ্চিত্র। গণমাধ্যম, চলচ্চিত্র যেটাই বলি না কেনো, তা এতোটাই সম্ভাবনাময় যে, এটি ধারণ করতে পারে না তেমন কোনো বস্তু বা মতবাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।
যেহেতু রাষ্ট্রের ধারণার মধ্যেই লুক্কায়িত আছে মিথ্যাচার, সেহেতু রাষ্ট্রের ক্ষমতা বেঁচে থাকে মিথ্যাচার ও অভিনয়কে ভর করে। আর গণমাধ্যম/চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সমস্ত মিথ্যাচারের সমর্থক। বর্তমান পৃথিবী যেনো রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমের শ্যামরাজ্য। যেনো গণমাধ্যমই রাষ্ট্র আর জনগণ হচ্ছে তার দাস-শ্রেণি। আসলে রাষ্ট্রের ছদ্মবেশে পুঁজিবাদ জনগণের রক্ত শোষণ করে। রাষ্ট্রকে যতোই গণতান্ত্রিক পোশাক পরানো হোক না কেনো, পুঁজিবাদ ছাড়া তার অস্তিত্ব প্রায় অসম্ভব। লেনিনে ফিরে যেতে হয়--
রাষ্ট্রে সর্বজনীন সমতা বিষয়ে সব পুরানো সংস্কার আমরা উড়িয়ে দেব, কারণ এ সবই শুধু ভাঁওতা : যতদিন শোষণ চলবে ততদিন সমতা আসতে পারে না। ... রাষ্ট্র নামে যন্ত্রটাকে লোকে সংস্কার ও শঙ্কামিশ্রিত শ্রদ্ধার সাথে মাথা নিচু করে মেনে নেয়, তারা সেই পুরানো গল্প বিশ্বাস করে যে এ যন্ত্রের মানে নাকি জনতার শাসন। ... [অথচ] এ হলো বুর্জোয়া মিথ্যাচার। এই মিথ্যার অপপ্রচারকারী, রাষ্ট্র ব্যবস্থারই অন্যতম সহযোগী ও সহোদর মিডিয়া [গণমাধ্যম/চলচ্চিত্র] নামি রূপসী নর্তকী।৩
আসলে রাষ্ট্র পুঁজিবাদ তথা শোষণের পাহারাদার মাত্র। আবার রাষ্ট্র সমাজবিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়, নির্দিষ্ট সমাজকাঠামোর মধ্যে রাষ্ট্রের আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সমাজের অন্য প্রতিষ্ঠানসমূহের আচরণের ওপর নির্ভরশীল। তাই নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা জনগোষ্ঠীর সার্বিক উত্থান-পতনের মাপকাঠিতে রাষ্ট্রের কার্যকলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সঙ্গত কারণে ইতিহাসের নানা ঘটনা প্রবাহের বাঁকে বাঁকে রাষ্ট্রের উপস্থিতি অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আলাদা নয়। ৪৭-এর দেশভাগ তেমনই এক ঘটনা। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে বৈরিতাও সেই উত্তরাধিকারের ফসল, যা আজও রাষ্ট্র, গণমাধ্যমকে বয়ে বেড়াতে হয়। ভারতীয় নির্মাতা আশ্বিন কুমারের (Ashvin Kumar) লিটল টেরোরিস্ট কোনো না কোনোভাবে সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করে, চর্চা করে।
দুই.
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে লিটল টেরোরিস্ট-এর গল্পটা জেনে নেওয়া দরকার। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তঘেঁষা স্থানে ক্রিকেট খেলছিলো একদল পাকিস্তানি শিশু। হঠাৎ বল চলে যায় ভারতের সীমানায়। পাহারারত সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে বল আনতে ভারত সীমানায় যায় শিশু জামাল। জামালের শরীর ভারত সীমান্তে স্পর্শ করা মাত্রই বেজে ওঠে সাইরেন। ভয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে জামাল! কোনো কিছু বুঝে না উঠতেই দৌড়াতে শুরু করে সে। চোখ কচলিয়ে বোঝার চেষ্টা করে সে আসলে কোন সীমানায় পৌঁছেছে। তবে তা আন্দাজ করার আগেই সে দেখে তার পিছু নিয়েছে দুই সীমান্তরক্ষী।
জামাল দৌড়ে গিয়ে টিলার গর্তে আশ্রয় নেয়। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি, যিনি গ্রামের ব্রাহ্মণ স্কুলশিক্ষক। সেনাদের জেরার মুখে স্কুলশিক্ষকও বাধ্য হয়ে নিজের ব্রাহ্মণ রীতিতে চুল কাটা দেখিয়ে প্রমাণ করেন, তিনি ভারতীয় নাগরিক। সেনারা তার কাছে জানতে চায়, কোনো সন্ত্রাসীকে তিনি যেতে দেখেছেন কি না? শিশুটিকে দেখেও স্কুলশিক্ষক কৌশলে উত্তর দেন, পাঁচ-দশ মিনিট আগে ওইদিকে একজনকে যেতে দেখেছেন। এরপরে সেনারা চলে যায়, তিনিও চেপে বসেন বাইসাইকেলে। কিছু না বুঝে আতঙ্কগ্রস্ত জামালও পিছু নেয় ওই শিক্ষকের। যদিও কয়েকবার জামালকে তাড়িয়ে দিতে দেখা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামালকে বাড়িতে নিতে বাধ্য হন তিনি।
এদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কথিত সন্ত্রাসীর খোঁজে ওই গ্রামে আসে। তখন জামালের জীবন বাঁচাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে ব্রাক্ষণ ও তার মেয়ে। একপর্যায়ে উপায় না দেখে ব্রাহ্মণ জামালকে তার ভাইয়ের ছেলে পরিচয় দেন এবং এর সত্যতা প্রমাণের জন্য তাড়াহুড়ো করে বাবা-মেয়ে মিলে ব্রাহ্মণ রীতিতে চুল কেটে দেয় জামালের। উপস্থিত বুদ্ধি আর মানবিকতার জোরে জামাল বেঁচে যায়।
এরপর রাতের অন্ধকারে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলশিক্ষক ও তার মেয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জামালকে পাকিস্তানে রাখতে যায়। পাকিস্তান সীমানায় ঢুকে জামালের বাড়ির কাছাকাছি আসলে দূর থেকে শোনা যায় ওর মায়ের আহাজারি। অল্প সময়ের সম্পর্কে বিদায়বেলা শিক্ষক, তার মেয়ে ও জামালের মধ্যে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তারপরও সব মায়া ত্যাগ করে জামাল চলে যায় তার মায়ের কাছে। কিন্তু জামালকে পেয়ে সন্তান হারানোর আকুতি যেনো ভিন্ন রূপ নেয়। তিনি জামালের ওপর ভীষণ রেগে যান মাথা ন্যাড়া করা নিয়ে! এমনকি এই চুল কাটার জন্য জামালকে মায়ের হাতে পিটুনি পর্যন্ত খেতে হয়!
তিন.
৪৭-এর দেশভাগ ‘নাটকের’ সুবিশাল প্রেক্ষাপটে ‘হিন্দু’ রাজনীতি, ‘মুসলিম’ রাজনীতি এবং হিন্দু-মুসলিম সংঘাত নেহাতই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা হিসেবে রূপায়িত হয়েছে। সেখানেও আসল কর্ণধার সাম্রাজ্যবাদী শাসকেরা, যারা কলকাঠি নেড়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত জিইয়ে রাখতো। অথচ দেশভাগ নামে মর্মান্তিক ট্রাজেডি ঘটা সত্ত্বেও ভারতবর্ষ ইতিহাসের মূল পথরেখাটি কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে অপরিবর্তিত থেকে গেলো। দেশভাগের ফলে দুটি, পরে তিনটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হয়। অথচ ইতিহাস পড়লে মনে হয়, ভারতবর্ষ যেনো চিরদিনই তার একান্ত বৈশিষ্ট্যের জোরে সেই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, অহিংস পথেই অগ্রসর হচ্ছে। যেখানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস একটা গৌণ ও সৃষ্ট কাহিনি মাত্র।৪
মূলত দেশভাগ ছিলো প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিক আর বৃটিশদের ষড়যন্ত্র। ইউরোপের তুলনায় ভারত উপমহাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক রঙটা অন্যরকম ছিলো। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ দ্বি-খণ্ডিত করার নায়ক মূলত তিন জন--গান্ধী, নেহেরু ও জিন্নাহ। এই তিন জনেরই পড়ালেখা ইংল্যান্ডে এবং সেখানে তাদের রাজনৈতিক দীক্ষাও ছিলো ইংরেজ প্রভাবিত।৫ এই তিন জনই ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতি দ্বারা এতোটাই আচ্ছন্ন ছিলেন যে, তাদের গোটা রাজনৈতিক জীবনে তারা ইংরেজ কূটনৈতিক চালের ক্রীড়নক হয়ে রইলেন। অথচ ইতিহাসে জিন্নাহ, যিনি কালের পুতুল হয়ে দেশভাগের অন্যতম কুশীলব মাত্র এবং ঘটনা চক্রে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা।
দেশভাগের কথা বলতে গিয়ে একা জিন্নাহ’র কথা বললে, সেটা একটা যান্ত্রিক বিশ্লেষণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ওই সময়ের পটভূমি নিয়ে খোলামেলা আলোচনার বিকল্প নেই। পটভূমি মানেই চলচ্চিত্রের ফ্ল্যাশব্যাকের মতো ডাকসাইটে সব চরিত্রের ভিড়।৬ গান্ধী চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি খুব সহজে ভারতীয় সংস্কৃতি তথা হিন্দু সংস্কৃতি নিজের মধ্যে ধারণ করতে পেরেছিলেন এবং সহজেই সমর্থন লাভ করেছিলেন প্রান্তিক জনগণের। তাই গান্ধী চরিত্র দেশভাগের সুদীর্ঘ প্লটে কিছুটা অন্যরকম দেখা যায়। এই প্লটের আরেক কুশীলব জওহরলাল নেহেরু। ব্যক্তি হিসেবে তিনি কিছুটা জেদি এবং ক্ষমতালোভী ছিলেন। আহমদ শরীফের ভাষায়, ‘মুসলিম লীগের অযৌক্তিক ছেদে বিরক্ত রাজগোপাল আচারিয়া, অবুঝ ও দুর্বল নগণ্য সংখ্যার কম্যুনিস্ট দল আর ৫৭ বছর বয়সের জওহরলালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অসংযত আগ্রহই ব্রিটিশ ভারত বিখণ্ডিত হওয়ার কারণ। এ[র] সঙ্গে জনগণের যোগ ছিলো না।’৭ আবার কংগ্রেস থেকে জিন্নাহকে উপেক্ষা না করলে দেশভাগের গল্প অন্য কিছু হতে পারতো।
আসলে জিন্নাহ শেষ বিচারে ইতিহাসের অসহায় নায়ক মাত্র। যেখানে দ্বি-জাতি তত্ত্বের কথা প্রথম বলেছিলেন হিন্দুত্ববাদের মেন্টর দামোদর সভাকর।৮ সাম্প্রদায়িকতার পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, দেশভাগের প্রশ্ন প্রথম উত্থাপন করেন যিনি, তিনি জিন্নাহ নন। আমাদের চেনা ইতিহাস যতোই জিন্নাহকে অস্বীকার করুক, প্রকৃত ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস রচনায় জিন্নাহকে একতরফা গালমন্দ করে নিছক ভিলেন করে তোলা যাবে না। ইতিহাস যে অনেকটা নদীর মতো। যতোই বাধা দেওয়া হোক না কেনো, আপন ছন্দে চলতে চলতে নিজের গতিপথ ঠিকই খুঁজে নেয়। বস্তুত, প্রাথমিকভাবে পাকিস্তান দাবির ছিলো দুই দাবিদার--সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ, পাকিস্তান চেয়েছিলো রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হওয়ার তাগিদে; অন্যদিকে বাঙালি মুসলমানের পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে সোচ্চার হওয়া অনেকটাই জমির স্বার্থে।
অবিভক্ত বাংলার অধিকাংশ জমির মালিকানা নব্য বাবু সম্প্রদায়ের হাতে কুক্ষিগত হয়। অন্তত নিম্নবর্গের হিন্দুরা অনেকটা একই অবস্থায় ছিলো। উচ্চবর্গের কাছে তাদের না ছিলো ন্যূনতম সম্মান ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। আবার পশ্চিম পাকিস্তানেও জমিদারি প্রথা বেশ শক্তপোক্তভাবে গেড়ে বসেছিলো। উচ্চবর্গের হিন্দু শ্রেণি গঠনের কিছুটা পরে মুসলমানদের মধ্যে একটা এলিট সমাজ গড়ে ওঠে; মূলত বৃটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায়। কেবল জনমনে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বুনে, ধর্মের দোহাই দিয়ে স্বার্থ হাসিল করে বৃটিশ ও তাদের দোসররা। তারা হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ে নানা বিরোধ জিইয়ে রাখতো শহুরে শিক্ষিত, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে। কিন্তু গাঁয়ে-গঞ্জে, অজ্ঞ-নিরক্ষর, নিঃস্ব বা স্বল্প আয়ের মানুষের মধ্যে তা প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়নি। মূলত সাম্প্রদায়িকতা দেশময় ছড়িয়েছে শিক্ষা-সাক্ষরতার প্রসারে এবং রেডিও-টিভি-পত্রিকা-চলচ্চিত্র আর রাজনৈতিক সভার বৃদ্ধিতে।
মুসলিম লীগের দ্বি-জাতি তত্ত্ব প্রণয়নের ঢের আগেই বৃটিশ ও ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তার একটা পূর্বতন সংস্করণ খাড়া করেছিলো, যাকে বলা যেতে পারে একজাতি তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে ভারত মানে হিন্দুস্তান, ভারতীয় জাতি মানে হিন্দু জাতি, ভারতীয় জনগণ বললে হিন্দু জনগণকেই বোঝাতো। মুসলমান শাসন ছিলো বিদেশি শাসন, সুতরাং ভারতীয় মুসলমান মাত্রই বিদেশি।৯ ইংরেজরা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে নেতৃস্থানীয় হিন্দু প্রজাদের বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলো, তারা তো হিন্দুদের দেশ মহান ভারতকে দখল করেনি; বরং অন্যায়ভাবে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে দখলদারী স্বৈরতন্ত্রী মুসলমান শাসকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে।
বর্তমান সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দিক থেকে যে ‘উদার’ ভারত-রাষ্ট্র দেখা যায়, তার সঙ্গে তো মুসলমান বিরোধিতা মেলে না। ২৯টি রাজ্য নিয়ে ভারত রাষ্ট্রে মুসলমানরা ভিন্ন জাতি মাত্র। তাহলে মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের সঙ্কট কোথায়? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তো সবাই সমান, ভারতীয় সংবিধানও সে কথাই বলে। আসল সমস্যা হলো, হিন্দুদের বিশ্বাস--ভারতীয় মুসলিমরা পাকিস্তানি। কারণ দ্বি-জাতি তত্ত্ব অনুযায়ী মুসলমানরা ভারতীয় হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছে। দেশভাগের মাধ্যমে ভারতীয় জনগণ ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়। আর এই ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে সবসময় চলচ্চিত্র বড়ো রকমের ভূমিকা পালন করেছে। সাম্প্রদায়িক চেতনার ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া ভারতে, ভারতীয় জাতীয়তাবোধ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ আলাদাভাবে দৃশ্যমান হয়। যার বিকট রূপ দেখা যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। আর রাষ্ট্রই আবার এই দাঙ্গা-ফ্যাসাদকে জিইয়ে রাখে। কারণ রাষ্ট্রে দাঙ্গা, ফ্যাসাদ, অন্যায় না থাকলে খোদ রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন ফুরায়। তাই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন পড়ে জাতীয়তাবাদের নামে মানুষকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসার। রাষ্ট্র তার নাগরিকের কাছে একান্ত আনুগত্য কামনা করে; বিপরীতে সে প্রতিশ্রুতি দেয় নাগরিকের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের; জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব নেয় সে। দৃশ্যত বৈষম্যহীনভাবে নাগরিকের সেবা করার অঙ্গীকারও করে। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র কিন্তু করে ঠিক এর উল্টোটাই। তাইতো বিশ্বে সবচেয়ে ‘ভালো’ গণতন্ত্রের দেশেও ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন হয়,স্লোগান ওঠে ‘উই আর দ্য নাইন্টি নাইন পারসেন্ট’। রাষ্ট্রভেদে শাসনের ধরন বদলালেও শোষণ বদলায় না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আদর্শিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মানুষের মধ্যে মিথ্যাচৈতন্য নির্মাণ করে।১০ যে মিথ্যাচৈতন্য মানুষকে তার সক্ষমতা, তার অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হতে দেয় না। ভারতীয় চলচ্চিত্রে যার উপস্থাপন অহরহ। জনসাধারণের মননে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে সম্মতি উৎপাদন করছে ভারত রাষ্ট্র। এই সম্মতি উৎপাদনের মোক্ষম হাতিয়ার হয় চলচ্চিত্র। লিটল টেরোরিস্ট এর ব্যতিক্রম নয়। চলচ্চিত্রে হিন্দুদের মহান হিসেবে উপস্থাপন এবং এই মহত্ত্বের নিয়ামক যে শুধু ধর্ম, তারই চিত্রায়ণ হয়েছে লিটল টেরোরিস্ট-এ। চলচ্চিত্রে জাতীয়তাবাদের এই চর্চা নতুন কিছু নয়। পার্থক্য কেবল তার ধরন, উপস্থাপন ও উদ্দেশ্যে; যদিও সেসব জাতীয়তাবাদ দেশপ্রেমের চাদরে ঢাকা থাকে। রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বহুজাতিক এবং বহু ভাষাভাষী জনগণের সমন্বিত রাষ্ট্র। কিন্তু এই বহু সংস্কৃতি ও ভাষাকে একসুতোয় গাঁথতে না পারলে ভারত রাষ্ট্র টিকে না থাকার শঙ্কা তৈরি হয়। ভারতের ব্যাপক অংশ শোষিত জনগণ যারা এখনো বেঁচে আছে ধর্ম নামের আফিমের ওপর ভর করে। জনমনে ৪৭-এর সাম্প্রদায়িকতার বিষ আজও দূর হয়নি।
রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে যেহেতু মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করা হয়, তাই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত কখনো বন্ধুত্ব করতে রাজি নয়। কারণ জনমনে সাম্প্রদায়িকতার জনরোষ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দেই ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যার প্রভাব ভারতীয় সমাজে আজও বিদ্যমান আছে। যার সুফল ভারতীয় রাষ্ট্রচালকরা আজও গ্রহণ করে। তাই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় অনেক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে তাদের পাকিস্তানকে মাথায় রাখতে হয়। অন্তত চলচ্চিত্রে ভারত-রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের চেয়ে বিশাল, ক্ষমতাবান, উদার ও সফল হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে। আসলে ভারতীয় চলচ্চিত্র এই অন্য রাষ্ট্র বলতে মূলত পাকিস্তানকেই লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করে। আর চলচ্চিত্রে নিজ জাতি অথবা দেশের বিজয় দেখে মানুষ আত্মিক প্রশান্তি লাভ করে, গর্ববোধ করে। রাষ্ট্র সুযোগ পায় সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েমের, যেটা আবার রাজনৈতিক আধিপত্যকে শক্তিশালী করে।
চার.
চলচ্চিত্রকে বলা হয় Director's Medium। তাই চলচ্চিত্রে চিত্রনাট্য, প্লট, আবহসঙ্গীত সবকিছুই নির্ভর করে নির্মাতার ওপর। তাই নির্মাতার চিন্তা-চেতনা, আচারবোধ, অভিজ্ঞতা সবকিছুতে সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ রাখতে হয়। আর নির্মাতা যখন কোনো নির্দিষ্ট জাতীয়তাবাদের পক্ষে কথা বলে, তখন চলচ্চিত্রের যে মূল বৈশিষ্ট্য সর্বজনীনতা, সেটি আর দৃশ্যায়িত হয় না। তাই যা কিছুই নির্মাতা দ্বারা আরোপিত, তাই চলচ্চিত্রকে তার মূল জায়গা থেকে বিচ্যুত করে। নির্মাতার মানবিক চরিত্র হচ্ছে একটা প্রকৃত চলচ্চিত্রের মেরুদণ্ড। এক অর্থে নির্মাতাই চলচ্চিত্রের স্রষ্টা। তার কথার বাইরে চলচ্চিত্রে কোনো গাছের পাতাও পড়ে না। নির্মাতা যা চায়, চলচ্চিত্রে তাই ঘটে থাকে।
লিটল টেরোরিস্ট-এর চার মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে ব্রাহ্মণ শিক্ষক তার বাড়িতে জামালকে নিয়ে যেতে রাজি হন। ছয় মিনিট ২৭ সেকেন্ডে সীমান্তরক্ষী তাদের কথিত সন্ত্রাসীর খোঁজে গ্রামে আসে। ঠিক এর পরের শটে দেখা যায়, ব্রাহ্মণ শিক্ষক ও তার মেয়ে মিলে তড়িঘড়ি করে জামালের মাথার চুল কেটে দিচ্ছে। তারা ব্রাহ্মণ হয়েও একজন মুসলিমকে বাড়িতে আশ্রয় দিতে এবং সেই মুসলিমের জীবন বাঁচানোর খাতিরে মাথার চুল টিকি রেখে কাটতে দ্বিধা করে না। কারণ ব্রাহ্মণ শিক্ষক ও তার মেয়ে নিশ্চিত জানতো সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে জামাল যদি ধরা পড়ে, তবে জামালের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এ রকম একটি বাস্তবতা থেকেই ব্রাহ্মণ পরিবারটি জামালের চুল কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ভুলে যায় ধর্মের সব বিধিনিষেধ। সাত মিনিট ৫৮ সেকেন্ডে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ব্রাহ্মণের বাসায় আসলে তিনি জামালকে নিজের ভাইপো হিসেবে পরিচয় দেন।
আবার চলচ্চিত্রের নয় মিনিট তিন সেকেন্ডে দেখা যায়, ব্রাহ্মণ, তার মেয়ে ও জামাল একসঙ্গে খেতে বসে। মেয়েটি জামালকে একটি রুটি দিলে, জামাল কিছু না বুঝেই তার অর্ধেক ছিড়ে ব্রাহ্মণের থালায় রাখে। এ পরিস্থিতিতে ব্রাহ্মণ ও তার মেয়ে দুজনেই অস্বস্তিতে পড়ে। এমনকি পেট ভরে যাওয়ার ভান করে ব্রাক্ষণ খাওয়া থেকে বিরত থাকেন। পরে অবশ্য ব্রাহ্মণ ও তার মেয়েকে আলাদা খেতে দেখা যায় এবং যে থালায় জামাল রুটির টুকরাটি রেখেছিলো সে থালাটি পর্যন্ত তারা ভেঙে ফেলেন।
এছাড়া ব্রাহ্মণ ও তার মেয়ের মানবিকতার অতিমাত্রায় পরিচয় ঘটে ১১ মিনিট নয় সেকেন্ডে, যখন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাতের অন্ধকারে জামালকে পাকিস্তানে ফেরত দিতে আসে। সেসময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়, অল্প সময়ের মধ্যে ব্রাহ্মণ, তার মেয়ে আর জামালের মধ্যে যেনো এক স্নেহের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মনে হয় জামালও তাদের ভালোবাসায় এতোটাই সিক্ত যে, সেও তাদেরকে ছেড়ে যেতে চায় না। কিন্তু শেষপর্যন্ত জামাল তার মায়ের কান্নার শব্দে বাড়ির দিকে দৌড় দেয়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটে ঠিক তখনই। ব্রাহ্মণ এই পরিবারটি তাদের ধর্ম নিয়ে এতোটাই সচেতন যে, জামালকে তারা ফিরিয়ে আনে এবং বাড়ি থেকে নিয়ে আসা কাঁচি দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদের চিহ্ন টিকিটি কেটে (১২ মিনিট ৫৩ সেকেন্ড) ফেলে।
১২ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে ব্রাহ্মণ ও তার মেয়ে মিলে যখন জামালকে ফেরত দিতে আসে, তখন দূর থেকে ক্ষীণ আওয়াজে জামালের মায়ের আহাজারি শোনা যায়। এরপর ১৩ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে জামাল পৌঁছে যায় তার মায়ের কাছে। জামালকে দেখে মা তৎক্ষণাৎ খুশি হন, বুকে জড়িয়ে ধরেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে যায়, যখন জামালের মায়ের চোখ পড়ে ছেলের ন্যাড়া মাথার দিকে। সন্তান হারানোর আহাজারি ও ফিরে পাওয়ার আনন্দকে হঠাৎই ম্লান করে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জামালের মাথার চুল। সারাদিন সন্তান কোথায় ছিলো সেই প্রশ্ন না করে, তার মাথার চুল কে কাটলো, কোথায় গেলো, ন্যাড়া হলো কেনো, এতোসব প্রশ্নবানে জর্জরিত হতে থাকে জামাল, সঙ্গে চলে হালকা মারধরও। বুঝতে কষ্ট হয় না, সন্তানের চেয়েও ধর্মের প্রথা ওই মুসলমান মায়ের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ!
চলচ্চিত্রে ১০ মিনিট ২১ সেকেন্ডে জামাল যখন ব্রাহ্মণের বাসায় আশ্রয় নেয়, তখন ওই বাড়ির পাশ দিয়ে এক গ্রামীণ লেটো গানের দল গান গাইতে গাইতে চলে যায়। গানের কথাগুলো অনেকটা এ রকম--‘বন্ধু কায়মনো বাক্যে তোমাকে স্বাগতম/ বন্ধুরা তোমরা সকলেই এদেশে আসো/ উষ্ণভাবে তোমাদের স্বাগতম জানাচ্ছি।’
লিটল টেরোরিস্ট-এ এতোক্ষণের হিন্দু, মুসলিমের যে রিপ্রেজেন্টেশন পরিষ্কারভাবে তা পক্ষপাতমূলক। পুরো চলচ্চিত্রে হিন্দুদের রিপ্রেজেন্টেশন যতোটা ইতিবাচক, মুসলিমদের ঠিক উল্টো।দিনে দিনে ভারত রাষ্ট্র কট্টর হিন্দুত্ববাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ভারতের বর্তমান রাজনীতিও অনেকাংশে হিন্দুত্ববাদের ওপরই নির্ভরশীল। মুসলমান বিরোধিতা সেখানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। লিটল টেরোরিস্টও শেষপর্যন্ত সে কথাই বলে; তাই জামালকে বিদায়ের সময় আর যাই হোক টিকিটা ঠিকই কেটে নেন ব্রাক্ষণ। তার মানে ভারতে থাকতে হলে ‘হিন্দু’ হয়েই থাকতে হবে, এর বিকল্প কিছু নেই। আর হিন্দুর সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্তর্জাতিক মহাসচিব চম্পত রাই এখন ভারতের হিন্দুদেরকে চারটি করে সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ, তা না হলে নাকি ২০৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভারত ভূখন্ড থাকলেও ‘হিন্দুস্তানের’ অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের পিও রিসার্চ সেন্টার তাদের এক প্রতিবেদনে বলছে, ২০৫০ খ্রিস্টাব্দে ইন্দোনেশিয়াকে পিছনে ফেলে ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করবে।১১ এতে করে স্বভাবতই হিন্দুস্তানের ‘মর্যাদা’ লুণ্ঠিত হবে। লিটল টেরোরিস্টও সেই মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে চায়।
পাঁচ.
রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক কী, রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক কী, তা একেক দেশে একেক রকম। আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে স্টেট রিলিজিয়ন। অথচ বলা হয়, ‘আমেরিকা ইজ অ্যা ক্রিশ্চিয়ান নেশন; উই আর অ্যা ক্রিশ্চিয়ান নেশন।’ আমেরিকার সংবিধানে অনেক জায়গায় এই অঙ্গীকার করা হয়েছে। অন্যদিকে ফ্রান্সে এর বিপরীত চর্চা--ধর্মকে তারা নিয়ে গেছে জনপরিসরে। তবে আধুনিক রাষ্ট্রের সিম্বলগুলো মূলত ধর্মীয় সিম্বল।১২ ক্ষমতাসীনরা এক কৃত্রিম সাম্প্রদায়িকতা তৈরি করে জনগণকে তার মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। কারণ রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা বজায় রাখতে সবসময় কোনো না কোনো ইস্যু হাজির রাখতে হয়।
আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে ধর্ম মোড় নেয় সন্ত্রাসবাদ/জঙ্গিবাদের দিকে। তবে সেটা সব ধর্ম নয়, কেবল ইসলাম। সেটাও দূর পথ দিয়ে ক্ষমতারই খেলা। আর এই খেলাকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে গণমাধ্যম। তবে রাষ্ট্র, সমাজ, দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতিকে ধর্মীয় চর্চা থেকে আলাদা করা যায় না। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যায় বিভ্রান্তি অবশ্যম্ভাবী, ধর্মের ভিতর থেকে বিভ্রান্তির উপাদানও আসে। কিংবা বলা যায়, কিছু মানুষ বা রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থে ধর্মীয় বিভ্রান্তি উদয় করে তা ব্যবহার করছে। এছাড়া রাষ্ট্র, সমাজ সৃষ্ট পরস্পর বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকেই মানুষ যুক্ত হয় সন্ত্রাসবাদে। অথচ মোড়ল রাষ্ট্রগুলো সন্ত্রাসবাদ/জঙ্গিবাদ সৃষ্টির কেন্দ্রে নজর না দিয়ে, এর থেকে রাজনৈতিক মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জঙ্গিবাদ বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে একটি জনপ্রিয় উপাদান। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের একটা অর্থনীতিও রয়েছে। এটাকে বলে লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার।১৩ এ রকম একটি ইস্যু হচ্ছে জঙ্গিবাদ যেটা নতুন ধরনের বৈশ্বিক যুদ্ধ। আধুনিক সমাজে বড়ো কোনো যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে যুদ্ধ হবে না, যুদ্ধ হবে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে। বিভিন্ন গোষ্ঠী-দল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করবে--বিভিন্ন ধারণাকে কেন্দ্র করে; মাদকবিরোধী বা সন্ত্রাসবিরোধী ইত্যাদি যুদ্ধের পতাকা উড়িয়ে।
গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে দেখানো হয় জঙ্গিদের নৈতিক অবস্থান বলে কিছু থাকে না। সন্ত্রাসবাদ/জঙ্গিবাদ ডিসকোর্সের চর্চা ও ব্যবহারের দ্বারা রাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় করে। আবার ‘লো ইনটেনসিভ ওয়ারফেয়ার’, যার ফলে রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক মুনাফা হাসিল হয়। মানে সন্ত্রাসবাদ/জঙ্গিবাদের সঙ্গে অস্ত্র ও অর্থের সূক্ষ্ম একটা সম্পর্ক রয়েছে। তাই রাষ্ট্র আজকাল চলচ্চিত্রকেও ব্যবহার করতে শিখে গেছে তাদের স্বার্থে। পাকিস্তানি শিশু ভুলক্রমে ভারতে ঢুকে পড়ে। পরে ভারতীয় নাগরিক শিশুটির প্রাণরক্ষা করে পাকিস্তানে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে লিটল টেরোরিস্ট-এর সমাপ্তি হয়। গতানুগতিকভাবে চলচ্চিত্রটির কাহিনি মানবিক হলেও নাম দেওয়া হয়েছে লিটল টেরোরিস্ট । অথচ জঙ্গিবাদ/সন্ত্রাসবাদকে ধারণ করে, এমন কোনো কিছুই লিটল টেরোরিস্ট-এ দেখা যায় না। তাহলে কি লিটল টেরোরিস্ট পাকিস্তানকে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসেবে দেখাতে চায়? সে প্রশ্ন না হয় পাঠকের ওপরই থাকলো।
লেখক :মো. মমিনুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
mominulmcj27@gmail.com
https://www.facebook.com/mominul.islam.50159
তথ্যসূত্র
১.ভ্লাদিমির লেনিন, উদ্ধৃত; সরওয়ার, জাহেদ (২০১৯ : ৬২); ‘রাষ্ট্র-মিডিয়ার সাম্রাজ্যবাদ ও রামগোপাল ভার্মার রাষ্ট্রসাধনা’; সিনেমা ও হেজিমনি; খড়িমাটি, চট্টগ্রাম।
২. প্রাগুক্ত; সরওয়ার (২০১৯ : ৬৪)।
৩. প্রাগুক্ত; সরওয়ার (২০১৯ : ৭০)।
৪. পাণ্ডে, জ্ঞানেদ্র (১৯৯৮ : ২৬১); ‘ভগ্নাংশের সমর্থনে : দাঙ্গা নিয়ে কী লেখা যায়?’; নিম্নবর্গের ইতিহাস; সম্পাদনা : গৌতম ভদ্র ও পার্থ চট্টোপাধ্যায়; আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লি., ভারত।
৫. করীম, ড. আনোয়ারুল; ‘দেশ বিভাগের দুঃখ-শোক এবং অতঃপর’; বেসবতী; সম্পাদনা : সুমন শিকদার; বর্ষ ১০, সংখ্যা ১০, ২০১৯, ঝিনাইদহ, পৃ. ১০।
৬.https://bit.ly/2DDNXD0; retrieved on: 10.04.2019
৭. শরীফ, আহমদ (২০১৭ : ২৪); আহমদ শরীফের ডায়েরি ভাব-বুদ্বুদ; আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৮.https://bit.ly/2DDNXD0; retrieved on: 10.04.2019
৯. থাপার, রোমিলা ও অন্যান্য (১৯৭৬ : ৭১); সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত ইতিহাস রচনা; কে. পি. বাগচী অ্যান্ড কোং, ভারত।
১০. মিথ্যাচৈতন্য-মার্কসীয় মতবাদ অনুসারে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র নিম্নবর্গের মানুষকে তাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে দেয় না। বিস্তারিত জানতে পারবেন (http://en.wikipedia.org/wiki/false_consciousness) এই লিঙ্ক থেকে।
১১. ‘হিন্দুরা বেশি সন্তান জন্ম না দিলে ভারত হবে মুসলমানদের’; কালের কণ্ঠ, ৫ এপ্রিল ২০১৫।
১২. মামুন, আ-আল (২০১৯ : ১২); রাষ্ট্র গণমাধ্যম ও জঙ্গিবাদ; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।
১৩. প্রাগুক্ত; মামুন (২০১৯ : ২৩)।
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ খ্রি: ১৭ সংখ্যায় ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন