তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি
প্রকাশিত ০১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
সম্প্রীতির ভারত নাকি বৈচিত্র্যে ফাটল; কী দেখাতে চায় 'সোহরা ব্রিজ'
তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি

চলচ্চিত্রই যেখানে কবিতা
প্রয়াত চলচ্চিত্রনির্মাতা বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায় আলবেনিয়ান কবি ইসমেইল কাদেরির কবিতার একটি উদ্ধৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বানিয়ে ফেললেন একটি সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র সোহরা ব্রিজ ।১ চলচ্চিত্রটির শুরুও হয় সেই উদ্ধৃতির মাধ্যমে--'The memory of you dies in me day by day/ Now, I am looking everywhere for a place to drop you'। চলচ্চিত্রটিতে এক মেয়ের গল্প তুলে ধরা হয়েছে, নিখোঁজ বাবার স্মৃতি প্রতিনিয়ত যাকে তাড়া করে ফেরে। বাবা তার কাছে অর্ধমৃত আবার অর্ধজীবিত। এই ধোঁয়াশার মীমাংসা করতেই তিনি ভারতের উত্তর-পূর্ব মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জির প্রত্যন্ত একটি স্থান সোহরা ব্রিজে এসে পৌঁছান। তবে সেখানে আসার পর নিজেকে তিনি আবিষ্কার করেন বাস্তব এবং কল্পনার মিশেলে রচিত অদ্ভুত এক গোলকধাঁধায়। পর্দায় এ গল্পটি উপস্থাপনে নির্মাতা বেছে নিয়েছেন সাহিত্যের অতি জনপ্রিয় ধারা জাদুবাস্তবতা (Magic realism)।২
প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে চাইতেন বাপ্পাদিত্য, বলতে গেলে একধরনের যুদ্ধই ঘোষণা করেছিলেন বাঙালির প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র ধারার বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধের অন্যতম অস্ত্র হিসেবেই হয়তো প্রস্তুত করেছিলেন সোহরা ব্রিজকে। যেখানে অদ্ভুত সিনেমাটোগ্রাফির স্পর্শে উত্তর-পূর্ব ভারতের গোষ্ঠীগত রাজনীতি হয়ে ওঠে কাব্যিক, স্মৃতি রূপান্তরিত হয় কল্পনায়। মুহূর্তেই বাস্তব থেকে কল্পনার জগতে ভ্রমণ করে, আবার বাস্তবে ফেরত আসে দর্শক। এখানে চলচ্চিত্রই যেনো একটি কবিতা, ক্যামেরার কারসাজিতে প্রতিটি দৃশ্য দর্শক শুধু দেখতেই পাবে না, পড়তেও পারবে অনায়াসে।
বাবার প্রতি মেয়ের আবেগের
বহিঃপ্রকাশ এবং অন্য কিছুর গল্প
চলচ্চিত্রের শুরুতেই কেন্দ্রীয় চরিত্র রিয়াকে কুয়াশা ভেদ করে একা একা হেঁটে আসতে দেখা যায়। পথিমধ্যে একটি ট্যাক্সি দাঁড় করালে জানা যায় তার গন্তব্য সোহরা। স্থানীয় ট্যাক্সিচালক অয়ান ফাই-এর এক প্রশ্নের উত্তরে রিয়া জানান, এমন কোনো সস্তা হোটেল বা গেস্ট হাউজে উঠলে ভালো হয়, যেখানে পরিচয়পত্র, ঠিকানা, ফোন নম্বর দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। তাতে করে একটা জিনিস স্পষ্ট হয় যে, তিনি নিজের পরিচয় লুকাতে চান--কেনো চান তার উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে চলচ্চিত্রের পরবর্তী অংশে। ট্যাক্সিচালক শুরুতে একটু আপত্তি করলেও দ্রুতই একটু বেশি টাকার বিনিময়ে এমন একটা আস্তানা খুঁজে বের করে দেন।
সোহরা ব্রিজে রিয়ার গন্তব্যহীন ঘোরাফেরা দেখে শুরুতেই মনে হতে পারে, তিনি হয়তো কোনো পর্যটক, অবসরে কলকাতা থেকে অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা মেঘালয়ে ঘুরতে এসেছেন। তবে সেনা সদস্যদের সার্বক্ষণিক নজরদারি দর্শককে বার বার মনে করিয়ে দেয় ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর গল্প শুধু সৌন্দর্য্যরে নয়, বরং গোষ্ঠীগত বা উগ্র জাতীয়তাবাদী বিদ্রোহের গল্প, সেনাশাসনের মাধ্যমে বিদ্রোহ দমনের গল্প। এ রকম একটি এলাকায় রিয়া কেনো একা ঘুরতে এসেছেন? অবসর যাপন নাকি অন্য কিছু? চলচ্চিত্রটির গল্প যতো এগোতে থাকে দর্শক জানতে পারে, তিনি এসেছেন তার নিখোঁজ লেখক বাবার খোঁজে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা, বাবার পুরনো প্রেমিকা সবার কাছ থেকে বাবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন তিনি--সেই বাবা সম্পর্কে যিনি মৃত না জীবিত তিনি জানেন না। চলচ্চিত্রের ৪১ মিনিট ছয় সেকেন্ডে নিখোঁজ বাবার উদ্দেশে তাকে চিঠি লিখতে দেখা যায়--‘তোমাকে কি সবসময় অর্ধমৃত আর অর্ধজীবিত হিসেবেই বয়ে বেড়াতে হবে?’ অন্ততপক্ষে তিনি একটা সংবাদ চান বাবার, সেটা মৃত্যু সংবাদও হতে পারে।
কিন্তু নিরুদ্দেশ বাবার স্মৃতির যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো বড়ো বেশি কঠিন। বাবার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অদ্ভুত এক জাদুবাস্তবতার দুনিয়ায় বিচরণ করেন রিয়া। স্মৃতি, সংগৃহীত তথ্য ও কল্পনার মিশেলে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। দর্শক জানতে পারে রিয়ার বাবা কলকাতার শিল্প-সাহিত্যের জগতে খাপ খাওয়াতে না পেরে সেখান থেকে একরকম পালিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বিদ্রোহী গ্রুপের সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে ভাড়া করা লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তার প্রধান দায়িত্ব ছিলো লেখনীর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বিদ্রোহী গ্রুপের মতাদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া। লেখক (বাবা) মনে করতেন, ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের মনোযোগ কম; এতে করে সেখানে বিদ্রোহী দল দানা বেঁধেছে। পরবর্তী সময়ে সেই বিদ্রোহ মোকাবিলা করতে সরকার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে পুলিশ, সেনাবাহিনী, গণমাধ্যম ইত্যাদি ব্যবহার করে। তার মতে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে মোকাবিলা করতে সন্ত্রাসী পন্থাই বেছে নিয়েছে এখানকার মানুষ। যা তিনি সমর্থন করেছিলেন, তাইতো এদের হয়ে লিখেছেন। চলচ্চিত্রে পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, লেখক যে বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর সমর্থনে লিখেছেন, তিনি পরে সেই গ্রুপেরই বিরাগভাজন হয়ে ওঠেন। যেখানে বিদ্রোহী দলগুলোর অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিলো ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলন। সেখানে এই লেখক অভিবাসীদের পক্ষ নিয়ে লিখে ফেলেন--‘মানুষের কোনো ঘর বা ঠিকানা থাকে না’। মানুষের অবাধ স্বাধীনতার কথাই তিনি ব্যক্ত করেছিলেন তার কলমের আঁচড়ে। একজন স্বাধীন লেখক তো কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের হতে পারে না! শিল্পীকে তার লেখার বিষয়বস্তু নির্ধারণও করে দেওয়া যায় না। তাই এই লেখার কারণেই নিজের জীবন বলি দিতে হয় লেখককে, তার সেই দলের হাতেই; যাদের জন্য তিনি কলম ধরেছিলেন একদিন। রিয়া শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে তার বাবা আর বেঁচে নেই। সোহরা ব্রিজের স্বচ্ছ পানি কোনো একদিন তার বাবার রক্তে লাল হয়ে উঠেছিলো স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতির ঘেরাটোপে পড়ে।
পুঁজিবাদী কাঠামোয় শিল্প কি স্বাধীন?
‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ পত্রিকায় বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় তার বন্ধু জিনিয়া সেনের লেখায় উঠে আসে কিছু অজানা কথা। নির্মাতা বাপ্পাদিত্যের ইচ্ছে ছিলো কলকাতার চলচ্চিত্রে একটা বড়োসড়ো পরিবর্তন আনার। সেই জন্যই হয়তো কাঁটাতার, হাউসফুল, এলার চার অধ্যায়, নায়িকা সংবাদ-এর মতো চলচ্চিত্রগুলো নির্মাণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক সফলতার মুখ তো দেখেনইনি, এমনকি কাঁটাতার এবং হাউসফুল কোনো পুরস্কারের জন্যও মনোনীত না হওয়ায় তার আক্ষেপ ছিলো। নায়িকা সংবাদ ব্যবসাসফল না হওয়ায় তিনি কিছুদিনের জন্য বিরতি নেন। তারপর নিজস্ব একটি প্রোডাকশন হাউস প্রতিষ্ঠা করেন। বাপ্পাদিত্য আক্ষেপ করে বলেছিলেন--‘আমি কলকাতায় তেমন কোনো কাজ হাতে পাচ্ছিলাম না, তাই দূরে কোথাও চলে যেতে চেয়েছিলাম।’ সেই চিন্তা থেকেই তিনি উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে পাড়ি জমান। সেখানে ট্রিলজি তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যার প্রথম চলচ্চিত্রই সোহরা ব্রিজ । একক আধিপত্যবাদী কোনো ভাষার ব্যবহার না করে ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, আসামী, খাসি, পাঁচটি ভাষার সম্মিলিত অবস্থান লক্ষ করা যায় এখানে। চলচ্চিত্রে একই সঙ্গে কাজ করেছে আসামিস, খাসি এবং বাঙালি অভিনয়শিল্পীরা। অত্যন্ত কম বাজেটের এই চলচ্চিত্র সম্পর্কে নির্মাতা নিজে বলেছিলেন--‘এই ছবিটা এতোটাই কম বাজেটে তৈরি করা হয়েছে যে সব থেকে কম বাজেটের সিনেমাও এটা দেখে লজ্জা পাবে।’৩ দুঃখজনক এই যে, ট্রিলজির পরবর্তী দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণের আগেই তার প্রয়াণ ঘটে।
পাঠক হয়তো ভাবতে পারেন, চলচ্চিত্রের আলোচনা করতে গিয়ে নির্মাতা সম্পর্কে এতোগুলো কথা কেনো উত্থাপিত হবে। এর উত্তর পেতে গেলে চলচ্চিত্রটি দেখা অতি আবশ্যক। চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান চরিত্র সন্দ্বীপ চ্যাটার্জীর মুখ দিয়ে নির্মাতার নিজের জীবনেরই ছায়া দেখা যায়। চলচ্চিত্রে ৪৯ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে কল্পনায় বাবার সঙ্গে কথোপকথনে রিয়া যখন প্রশ্ন করেন, কেনো তার বাবা কলকাতা ছেড়েছে? বাবা উত্তর দেন, ‘আমি কলকাতা ছাড়তে চাইনি, কলকাতারই আর আমার প্রয়োজন ছিলো না। আমার লেখা কেউ পড়ছিলো না আর সেভাবে কেউ ছাপাতেও চাচ্ছিলো না।’ তিনি আরো বললেন, ‘দেখলাম সবাই সবকিছু ঠিক করে নিয়েছে। কী নিয়ে লেখা হবে, কে লেখক, কে লেখক না; কে সিনেমা বানাবে। সবকিছুই একটা সিস্টেমের ভিতর চলে গিয়েছিলো। ক্রমশ বুঝতে পারলাম আমার নিজের শহরে আমি নিজেই বাতিল হয়ে যাচ্ছি। এসব লড়াই-টড়াই করে কোনো লাভ নেই। তখন এখানে একটা চাকুরি পেয়ে গেলাম, কলকাতা ছেড়ে দিলাম। যে কলকাতা ছেড়ে আমি পাঁচ মিনিট থাকতে পারতাম না, সেখানে আর ফিরে যেতেই ইচ্ছে করতো না।’ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোতে আসলে শিল্প সৃষ্টির পরিসরও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বরদিউ তার প্রবন্ধ সংগ্রহ 'The Field of cultural production' এ সাহিত্য এবং শিল্পজগৎ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, বর্তমান বাজার অর্থনীতিতে শিল্প সৃষ্টি শুধু শিল্পী এবং লেখকের ওপর নির্ভর করে না, বরং এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটি (ফিল্ড) নানাধরনের প্রক্রিয়া এবং সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। লেখকের মতে, সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক জগতের কাঠামোটি আরো বিস্তৃত ক্ষমতাকাঠামোর ভিতরে স্থাপিত। একজন লেখক কী লিখবে তা অনেকাংশেই নির্ভর করে প্রকাশক, পাঠক, সমালোচক, অ্যাকাডেমিয়া ইত্যাদির ওপর অর্থাৎ শিল্প উৎপাদন, শিল্পপ্রবাহ এবং ভোগ পরস্পর সম্পর্কিত। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটির সফলতা বিফলতার মানদণ্ডে মেপে এই নির্দিষ্ট ফিল্ডে (ক্ষেত্র) একজন লেখকের অবস্থান নির্ণীত হয়।৪ উদাহরণস্বরূপ, কোনো লেখকের বই সব থেকে বেশি বিক্রি হয়েছে বলেই তার সুখ্যাতি হচ্ছে এবং তিনি সব থেকে জনপ্রিয় লেখকের তকমাটি পাচ্ছেন। এখানে শিল্প এবং সাহিত্যের জগতে সফলতা লাভের কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড গড়ে ওঠে, যা শিল্পী বা লেখক গ্রহণ করতে বাধ্য। যারা এই মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারে না, তারা সিস্টেমের বাইরে চলে যায়। আর যারা স্রোতে গা ভাসিয়ে চলে, তারাই হয়তো আসীন হয় সম্মানজনক আসনে।
তবে চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২৯ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে লেখককে বলতে শোনা যায়, ‘প্রকৃত সাহিত্য এবং স্বৈরতন্ত্র কখনোই একসঙ্গে চলতে পারে না। লেখক চিরকাল স্বৈরতন্ত্রের শত্রু। সবকিছু মেনে নিতে পারলে হয়তো আমার জীবন, তার সঙ্গে তোমারও অনেকটাই সহজ হতে পারতো। দেখতে হয়তো তোমাদেরই কোনো নিউজ চ্যানেলে আমি প্যানেলিস্ট হয়ে বসে আছি। কিন্তু অন্ততপক্ষে তুমি তোমার বাবাকে নিয়ে গর্ব করতে পারো, সে কখনো কিন্তু কারো কাছে মাথা নোয়ায়নি।’ পিয়েরে বরদিউ সেসময়ে ফ্রান্সের ‘দ্য ফিল্ড অফ নভেল’-এর উদাহরণ টেনে বলেছেন, এটি একই সঙ্গে 'a field of forces' এবং 'a field of struggle' । বিস্তৃত ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে শিল্পীরা প্রতিনিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত, অনেক সময় শিল্পী সত্ত্বাকেও বিকিয়ে দিতে হয়। আর সন্দ্বীপ নিজেকে বিক্রি করতে পারেননি বলেই হয়তো তাকে লিখতে হয়েছিলো--‘কেনা-বেচার এই শহরে আমাকেই পুড়তে হবে রাত্রিদিন।’ তাই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিল্প এবং সাহিত্য জগৎকে শুধু এককভাবে আলোচনার সুযোগ নেই, এর গতি প্রকৃতি বুঝতে হলে বিস্তৃত সমাজকাঠামোর ভিতর একে স্থাপিত করে বুঝতে হবে।৫
কল্পিত জাতি, জাতীয়তাবাদ এবং ক্ষমতার রাজনীতি
দীর্ঘদিন থেকেই উত্তর-পূর্ব ভারতের জনগণের বেশকিছু অংশ সহিংস পথ বেছে নিচ্ছে নানাবিধ কারণে--কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিরোধ, জাতিগত ভিন্নতা, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, আলাদা রাষ্ট্র গঠনের দাবি ইত্যাদি।৬ ভৌগোলিক অবস্থাগত কারণে এই অঞ্চলটি ছিলো মূল ভারত থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। এমনকি দেশ স্বাধীনের পরে আসামকে মূল ভারতের সঙ্গে রেললাইন দিয়ে সংযুক্ত করতেই এক বছর লেগে যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সেখানকার জনগণের বিশ্বাসের ফাটল ধরে আসাম থেকে উত্তোলিত খনিজ তেলের শোধনাগার বিহারে স্থাপনের সিদ্ধান্তে। সেখানকার জনগণের আপত্তির মুখে কেন্দ্রীয় সরকার একটি ছোটো শোধনাগার আসামে স্থাপনে বাধ্য হয়। মূল ভূখণ্ডের সবুজ বিপ্লবের ছোঁয়া উত্তর-পূর্বাংশে লাগেইনি কখনো।৭ ১৯৪৭-এর পর থেকেই এসব অর্থনৈতিক সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে ওঠে আসামে। স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জন্ম নেয় ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম (উলফা) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট অব বোরোল্যান্ড (এন ডি এফ বি)।
এরই ধারাবাহিকতায় উলফা আসাম, মেঘালয়, অরুণাচলে বেশকিছু প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলে। ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে এই বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার সেনাবাহিনী মোতায়েন করে সেখানে, আরোপ করা হয় আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট (আফস্পা)।৮ যা সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে বিশেষ সুবিধা দেয়। এই আইনের আওতায় সেনাবাহিনী যেকোনো সময় যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গুলি করতে পারবে, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করতে পারবে, সন্দেহবশত যে কারো বাড়িতে তল্লাশি চালাতে পারবে, সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট সেনা অধিকারিকের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না।৯ তবে প্রায়শ অভিযোগ ওঠে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এই বিশেষ আইন ব্যবহার করে অনেক সময়ই এনকাউন্টারে নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করে। সামরিক বাহিনীর এ ধরনের এনকাউন্টারের কারণ হলো, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ সম্মাননা প্রদানের উদ্দেশ্যে পয়েন্ট ব্যবস্থা রয়েছে। পয়েন্ট সিস্টেমটা হলো এ রকম--একজন সন্ত্রাসীকে হত্যা করতে পারলে পাঁচ পয়েন্ট, গ্রেপ্তারে দুই পয়েন্ট এবং আত্মসমর্পণ করাতে পারলে তিন পয়েন্ট পাওয়া যায়। অনেক সময় নির্ধারিত পয়েন্টে পৌঁছাতে কিছু ঘাটতি থেকে গেলে, তারা নিরপরাধ আদিবাসী বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে হত্যা করে। এ ব্যাপারটি উঠে আসে আসাম ও মেঘালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে কর্মরত এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসারের সাজানো এনকাউন্টার বিষয়ক জবানবন্দি থেকে।১০ যার ফলে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে আরো জটিল।
সোহরা ব্রিজ-এর এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিটে মেয়ে আর বাবার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে আসামের এই সঙ্কটময় পরিস্থিতির পুরো বর্ণনায় যেনো উঠে এসেছে লেখক সন্দ্বীপ চট্টোপাধ্যায়ের কণ্ঠে--‘বন্দুকের নলই সমস্ত শক্তির উৎস কি না আমি জানি না। তবে একেক সময় বন্দুকের মোকাবিলা বন্দুক ছাড়া হয় না। দেখো, শুধু ভয় দেখিয়ে কখনো জনপ্রিয় হওয়া যায় না। আমি গিয়ে দেখেছি, গ্রামের গরিব মানুষ, মধ্যবিত্ত, ছাত্রদের এদের পিছনে বিপুল সমর্থন রয়েছে। যেকোনো আন্দোলনকেই দূর থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে ধূলিসাৎ করে দেওয়া যায়; বাস্তব কিন্তু এতোটা সহজ নয়। দিল্লি এখান থেকে অনেকটাই দূর সেটা বোঝো?’ নির্মাতা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সঙ্কট তুলে ধরেছেন, যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে বেছে নেয় সন্ত্রাসের পথ। রাষ্ট্রীয় এ ধরনের সন্ত্রাস জনগণকে উদ্ধার করছে নাকি জনগণের অনিরাপত্তার উদ্বেগ আরো বাড়ছে, সেটা তো বোঝাই যায় বর্তমান উত্তর-পূর্ব ভারত কিংবা কাশ্মীর সঙ্কটে চোখ রাখলে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য ছাড়াও যে ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্কট অন্য মাত্রা পেয়েছে সেটি হলো, জাতি বা জাতীয়তাবাদ। বেনেডিক্ট এন্ডারসন জাতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন, 'it is an imagined political community' অর্থাৎ জাতি হলো একটি কল্পিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়। তার মতে, এটি কল্পিত এ কারণেই যে, এমনকি একটি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সদস্যরা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে একে অন্যকে চিনবে না, দেখবে না, এমনকি শুনবেও না, তারপরেও প্রত্যেকের মনেই সেই সম্প্রদায়ের একটি কল্পিত অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকবে। একটি সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যতো অসমতা, শোষণ, বৈষম্য থাকুক না কেনো, একটি জাতির সদস্যরা সবসময় নিজেদেরকে এক কাতারে কল্পনা করবে। এন্ডারসন এই সম্পর্কটিকে 'horizontal comradeship' নামে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরো মনে করেন, কোনো জাতিই পৃথিবীর সব মানুষকে সমগোত্রীয় হিসেবে কল্পনা করবে না। এমনকি অতি জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিও কখনো ভাববে না যে, পৃথিবীর সব গোষ্ঠী কখনো এক জাতিতে পরিণত হবে, যেটা পূর্বে ভাবা হতো। যেমন, খ্রিস্টানরা কল্পনা করতো সম্পূর্ণ খ্রিস্টান পৃথিবীর।১১
এখন প্রশ্ন হলো, ঠিক কবে থেকে জাতি এবং জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং ঠিক কোন উপায়ে? কারণ দর্শাতে গিয়ে এন্ডারসন দেখিয়েছেন, ইউরোপে প্রিন্ট মিডিয়া আবিষ্কার এবং খ্রিস্টীয় প্রটেস্ট্যান্ট জাগরণের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের উত্থান সম্পর্কিত। প্রিন্ট মিডিয়ার উত্থানের ফলে একটি নির্দিষ্ট ভাষার পাশাপাশি একটি বৃহত্তর পাঠক সমাজ তৈরি হয়। ধরা যাক, কেউ ফ্রান্সের উত্তরে এবং কেউ দক্ষিণে বসবাস করছে; কিন্তু একই পত্রিকা কিংবা বই পড়ার কারণে হয়তো তারা একই আইন মেনে চলছে। যার ফলে সমন্বিত যোগাযোগের প্লাটফর্ম তৈরি হয়, আবির্ভাব ঘটে কল্পিত জাতি এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার। সোহরা ব্রিজ চলচ্চিত্রেও দেখা যায়, একটি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একজন লেখককে ভাড়া করে এনেছে। চলচ্চিত্রের ২৯ মিনিটে রিয়ার সঙ্গে স্কুলশিক্ষিকার কথোপকথনে উঠে আসে--একটা সময় পার্টি বেশ সমস্যার মধ্যে পড়ে। তাদের ইস্যুগুলো মানুষের মধ্যে তারা ছড়িয়ে দিতে পারছিলো না। পার্টির নেতারা মিলে সিদ্ধান্ত নেয়, বুদ্ধিজীবী ভাড়া করতে হবে, যাতে করে সাধারণ মানুষের কাছে পার্টির ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন থাকে। তথাকথিত আধুনিক যুগে জাতীয়তাবাদী চেতনার উদ্ভবই নয়, বরং মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রিন্ট মিডিয়া হয়ে ওঠে অতি গুরুত্বপূর্ণ।
এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা পেতে গেলে চোখ রাখতে হবে ইতিহাসের পাতায়। ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দের আগে আসামের স্বতন্ত্র পরিচয় ছিলো; ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বসবাসরত এই জাতির ছিলো নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে বর্মী এবং মগদের আগ্রাসন প্রতিহত করতে ইংরেজরা আসামকে সহায়তার পর সেটি হয়ে পড়ে বৃটিশ শাসনাধীন। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে বৃটিশরাজ এবং বাঙালি রাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অধীনে বাংলা ভাষা সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। এর ফলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহারে কোণঠাসা হয়ে পড়ে আসামের নিজস্ব ভাষা। অহমীয়া ভাষাকে বাংলার একটি উপভাষা হিসেবে চালানোর অপচেষ্টা চলে। সঙ্গত কারণেই আসামের জনগণ হয়ে পড়ে বাংলা ভাষা ও বাঙালি বিদ্বেষী। পরবর্তী সময়ে আমেরিকান মিশনারিদের তৎপরতায় এবং দীর্ঘকালের আন্দোলনে অহমীয়া স্বতন্ত্র ভাষার স্বীকৃতি ফিরে পায় কিন্তু বাঙালি বিদ্বেষ রয়েই যায়। দেশ স্বাধীনের সময় আসাম স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত হতে চাইলেও নানা সমস্যা এবং ষড়যন্ত্রের মুখে সেটা সম্ভব হয়নি। তবে আসামে অহমীয়ারা হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, অফিস-আদালত-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-বিধানসভায় তারা নিজেদেরকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে অহমীয়াকে রাজ্যের একমাত্র মাতৃভাষা ঘোষণা করা হয়, এতে ক্ষোভে ফেটে পড়ে অন্য ভাষাভাষীর মানুষ। যেহেতু আসামের বরাক উপত্যকায় বাঙালি জাতিসত্তার সংখ্যাধিক্য রয়েছে, তারাও বাংলাকে অহমীয়ার পাশাপাশি সরকারি ভাষা করার দাবি তোলে। তবে সেসময়ের প্রচার মাধ্যমগুলো প্রকৃত দাবি আড়াল করে প্রকাশ করে, বাঙালিরা অহমীয়া ভাষাকে অমর্যাদা করছে। এতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেয়, বাঙালিদের ওপর আক্রমণ শুরু হয়। এমনকি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল নিজেদের স্বার্থে আসামীদের পক্ষাবলম্বন করে, বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনরত আন্দোলনকারীদের সশস্ত্রভাবে দমন করে। কাঁটাতারের ওপারেও ১১ জন আবারও বাংলা ভাষার দাবিতে প্রাণ হারায়। একসময়ে বাঙালিদের আধিপত্যে তাদের মনে হয়তো এই ধারণা জেঁকে বসেছিলো যে, বাঙালিদের আধিপত্যে তাদের অবস্থা হতে পারে ত্রিপুরা বা কাছাড়ের আদিবাসীদের মতো। আবার স্বাধীনতার পর আসাম রাজ্যের অঙ্গচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু অনেকটা ভাষা এবং জাতীয়তাবাদের অজুহাতে, নাগাল্যান্ড-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড রাজ্যগুলো স্বতন্ত্র পরিচয় পায়।১২ আর তাদের এই জাতীয়তাবাদী সঙ্কট শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যার সূত্রপাত ঘটায়।
আসামের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলার মানুষের সঙ্গে সেখানকার জনগোষ্ঠীর যোগাযোগ প্রাচীন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক বাংলাদেশিই আসামে পাড়ি দিয়েছিলো, যাদের একটা বড়ো অংশই ছিলো হিন্দু। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কারণে অনেকেই আর বাংলাদেশে ফিরে আসেনি। পরবর্তী সময়ে বেশকিছু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশ স্বাধীনের পরেও বাংলাদেশিদের অভিবাসন আসামে অব্যাহত থাকে। যেহেতু আসামে বহু জাতিসত্তার মানুষের বসবাস, অব্যাহত এই বাঙালি প্রবাহ সেটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে সেখানকার জনগণের আশঙ্কা। এছাড়া বাঙালি বিদ্বেষ তো আগে থেকেই ছিলো।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ‘বিদেশি খেদাও’ নামের একটি অসহিংস আন্দোলন শুরু হয়, যার নেতৃত্বে ছিলো A A S U (All Assam Students Union) and A A G S P (All Assam Gana Sangram Parishad) নামে দুটি সংগঠন। শুরুতে অহিংস আন্দোলন শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে United Liberation Front of Assam(ULFA) নামে একটি সহিংস গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ ঘটে সেই বছর, যার কথা আগেই আলোচনা হয়েছে। এদের আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিলো অবৈধ অভিবাসীদের খুঁজে বের করে তাদেরকে আসাম থেকে বিতাড়িত করা। এতে আবারও আসাম উত্তাল হয়ে ওঠে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে, প্রায় দেড় হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারায় বাংলাদেশি অভিযোগে। যদিও অভিযোগ ওঠে এরা সবাই বাংলাদেশি ছিলো না। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আসামের বৈধ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে পাশ হয় 'Illegal Migrants Determination by Tribunal Act (IMDT), ১৯৮৩'। যদিও আসাম গণপরিষদ পার্টি এই চুক্তিটি সই করে এবং বিদেশি অভিবাসী বিতাড়নের এজেন্ডা নিয়ে সে বছরই নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করে; কিন্তু তারা এই অ্যাক্টটি বাস্তবায়নে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি। বরং, তাদের ওপর অভিযোগ ওঠে উলফাকে ইন্ধন যোগানোর। আন্দোলনের নাম করে ফান্ড উত্তোলনের অজুহাতে উলফা বিভিন্ন ব্যবসায়ী, চা-বাগানের মালিকসহ অন্যান্যদের অপহরণ করতে থাকে। জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পরিণত হয় সন্ত্রাসবাদ, অপহরণে--আসাম গণপরিষদ এবং উলফা পরস্পরকে ব্যবহার করে ক্ষমতা পাকাপোক্তের হাতিয়ার হিসেবে।১৩
বর্তমানে আবারও নাগরিকত্ব ইস্যুটি প্রধান হয়ে উঠেছে ভারতে। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে আসামে আবারও জাতিগত কোন্দল ছড়িয়ে পড়ে, দাঙ্গায় প্রায় ৪০ জন মারা যায়। সেসময় নির্বাচনি এক প্রচারণায় নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, তিনি ক্ষমতায় এলে অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়িত করা হবে। পরবর্তী সময়ে সরকার গঠনের পর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে আসামে প্রকাশ হয় বৈধ নাগরিকদের একটা তালিকা। তবে সেই তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আসামের অনেক বৈধ নাগরিকই এখান থেকে বাদ পড়েছে। অনেকেই শঙ্কা প্রকাশ করে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় পরিচয়ের মাধ্যমে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা হচ্ছে। বি জে পি সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসে, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের আগে মুসলমান ব্যতীত অন্য যেকোনো ধর্মের সংখ্যালঘু মানুষেরা ভারতে আশ্রয় নিলে তাদের অবৈধ অভিবাসী বলে গণ্য হবে না। সরকারের দ্বিমুখী এই আচরণ থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়, জাতিগত দ্বন্দ্বকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে পরিণত করে ভোটের রাজনীতিতে বিজয়কেই পাকাপোক্ত করা হচ্ছে।১৪
সোহরা ব্রিজ-এ ‘বিদেশি খেদাও’ আন্দোলনের সেই উত্তাল সময়ের চিত্রই হয়তো নির্মাতা তুলে আনার চেষ্টা করেছেন। সন্দ্বীপ চট্টোপাধ্যায় কলকাতা ছেড়ে হাতে কলম তুলে নেন কিছু সংগ্রামী মানুষের হয়ে কাজ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, শোষণ মুক্তির থেকে বরং বিদেশি বিতাড়নের এজেন্ডাতেই তারা প্রাধান্য দিচ্ছে। আর এ কারণেই যখন লেখক মানুষের পক্ষ নিয়ে কাঁটাতারবিহীন একটি পৃথিবীর কল্পনা লেখার মাধ্যমে ব্যক্ত করেন, তখন তারই পার্টির লোকজন তাকে হত্যা করে। চলচ্চিত্রের ৩০ মিনিটে স্কুলশিক্ষিকার মুখে শোনা যায়, সন্দ্বীপ চট্টোপাধ্যায় পার্টির হয়ে বেশকিছু লেখা লিখলেও অভিবাসন সংক্রান্ত লেখাগুলো পার্টির লোকজনের অপছন্দ ছিলো। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩৭ মিনিটে লেখককে হত্যার সময় তারা আবারও মনে করিয়ে দেয়, তাদের রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য ‘বিদেশি খেদাও’ আর সে উদ্দেশ্যকেই অবহেলা করেছেন লেখক। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপট কী বার্তা দেয়? সেই রাজনীতি কি মানুষের মুক্তির জন্য? নাকি গুটিকতক মানুষের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে মানুষের বিভাজন? সেটা বিচারের ভার পাঠকের ওপরই থাকলো।
শেষকথা
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের ফলে পাকিস্তান অনেকটাই ধর্মীয় জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ থাকলেও ভারত রাষ্ট্র তার মূলমন্ত্র হিসেবে বেছে নেয় ‘বৈচিত্র্য’।১৫ কিন্তু পরবর্তী সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্কটের ওপর চোখ রাখলে দেখা যায়, সেই মূলমন্ত্র তো রক্ষা হয়ইনি বরং জাতি-বিদ্বেষকে কেন্দ্র করেই অশান্ত হয়ে উঠেছে ভারত বার বার। ভারত যে শুধুই বৈচিত্র্য এবং সম্প্রীতির রাষ্ট্র নয়, বরং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নানা জাতিতে বিভক্ত তারই এক ঝলক যেনো দেখা যায় সোহরা ব্রিজ-এ। বর্তমানে বেশিরভাগ নির্মাতাই যখন রাষ্ট্রীয় সঙ্কটকে এড়িয়ে মুখরোচক কাহিনি পরিবেশনে ব্যস্ত, ঠিক সেই সময়ে জাতিরাষ্ট্রের সঙ্কটময় চিত্র তুলে আনা বাপ্পাদিত্যের সাহসিকতারই পরিচয় বহন করে, সঙ্গে আবারও মনে করিয়ে দেয় তিনি ভিন্ন পথেরই যাত্রী।
লেখক : তানিয়াহ্ মাহমুদা তিন্নি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়ন করছেন।
taniahtinni@gmail.com
https://www.facebook.com/taniah.tinni
তথ্যসূত্র
১.https://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/bengali/movies/news/Remembering-Bappaditza-Bandopadhyay/articleshow/49721068.cms; retrieved on: 22.04.2019
২. https://www.somewhereinblog.net/blog/mshowkat/29944285; retrieved on: 22.04.2019
৩. https://timesofindia.indiatimes.com/entertainment/bengali/movies/news/
Remembering-Bappaditza-Bandopadhyay/articleshow/49721068.cms; retrieved on: 25.04.2019
৪. Bourdieu, Pierre (1993: 30); The Field of Cultural Production, Columbia Universitz Press.
৫. Bourdieu, Pierre (1993: 30-37); The Field of Cultural Production, Columbia Universitz Press.
৬. https://www.somewhereinblog.net/blog/anisurrahman2015/29976287; retrieved on: 25.04.2019
৭. Singh, Gurinder; `Illegal Migration, Insurgency, and the Political Economy of Assam’; Routledge Tylor and Francis Group; 32:2, 305-315, 2008, DOI: 10.1080/09700160801994910.
৮.https://www.somewhereinblog.net/blog/anisurrahman2015/29976287; retrieved on: 25.04.2019
৯. https://bengali.oneindia.com/news/features/what-is-afspa-act-why-irom-chanu-sharmila-did-fast-for-16-zear-manipur-009591.html; retrieved on: 10.05.2019
১০. ভট্টাচার্য, কিশোলয়; ‘ভারতে বিচারবহির্ভূত হত্যা, সাজানো এনকাউন্টারের স্বীকারোক্তি’; সর্বজনকথা; সম্পাদনা : আনু মুহাম্মদ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ৪র্থ বর্ষ, ৪র্থ সংখ্যা, আগস্ট-অক্টোবর ২০১৮, পৃ. ৪১-৪৫।
১১. ANDERSON, BENEDICT (2006: 6-7); Imagined Communities Reflections on the Origin and Spread of Nationalism; VERSO London, New York.
১২. বাবলা, মযহারুল ইসলাম; ‘আসামের ভাষিক-জাতি সঙ্কটের সেকাল-একাল’; দৈনিক আজাদী, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
১৩. Singh, Gurinder; `Illegal Migration, Insurgency, and the Political Economy of Assam’; Routledge Tylor and Francis Group; 32:2, 305-315, 2008, DOI: 10.1080/09700160801994910.
১৪. http://www.banglatribune.com/columns/opinion/280089/%E0%A6%86%E0%A6%B8%E0%A6; retrieved on: 22.05.2019
১৫.https://scroll.in/article/890206/nrc-tested-frequentlz-since-partition-the-indian-theory-of-citizenship-has-faltered-once-again; retrieved on: 22.05.2019
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন