আনতারা সোনিয়া
প্রকাশিত ০১ জুলাই ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ক্ষমতা লিপ্সা আর আমিত্বের মন্ত্র নিয়ে ‘উধাও’
আনতারা সোনিয়া

আমিত্বের শুরু যেখানে
পুঁজিবাদ আর বর্তমানের ভার্চুয়াল জগৎ মানুষকে ‘আমি’তে বন্দি করে ফেলেছে। আজকের দিনে মানুষে মানুষে পারস্পরিক বোঝাপড়া প্রায় শূন্যের কোঠায়। ব্যক্তি-মানুষ ‘আমরা’, ‘আমাদের’ শব্দগুলো থেকে প্রতিনিয়ত বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবার থেকে পৃথক হয়ে ‘আমি’ হয়ে ওঠার জোরালো চর্চা চলছে পৃথিবীজুড়ে। এই ‘আমি’ হয়ে ওঠার জন্যই মানুষ মানুষকে পণ্য করছে। ‘আমি’ হওয়ার জন্যই বাড়ছে ধোকাবাজি, ঠগবাজি। এই প্রক্রিয়ায় যেনো মায়া-দয়া-মমতার কোনো ঠাঁই নেই। ‘আমি’র ধান্ধার কাছে মানবতা বড়ো অপ্রতুল। সেখানে নিজের অস্তিত্বটাই মুখ্য। নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই পাশের মানুষকে নিষ্পেষণ করতে হয়। কারণ অন্যের অস্তিত্বের বিনাশই নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় বেশি করে।
‘আমি’ হয়ে ওঠার এই পথে সবচেয়ে বড়ো ভয় হচ্ছে প্রতিপক্ষ এবং প্রতিপক্ষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা। তাই বেশিরভাগ সময় ‘আমিবাদী’দের প্রথম কাজ হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করা। শুধু সরাসরি প্রতিপক্ষ নয়, কখনো কখনো থাবা পড়ে এমন ব্যক্তির ওপর যারা প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সাময়িকভাবে নিজের ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ জাহির হলেও দিনশেষে এর ফল ঠিক ইতিবাচক জায়গায় থাকে না। এই বিচ্ছিন্নতায় সারাক্ষণ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বিচলিত থাকতে হয়; পুঁজির জয়জয়কার চলতে থাকে; হুমকির মুখে পড়ে জীবনের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো। অথচ এর বিপরীত চিন্তা অনেক কিছুকেই সহজ করে ফেলতে পারে। অমিত আশরাফের চলচ্চিত্র উধাও মানুষের এই বাইনারি অবস্থানের গল্প। উধাও-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র আকবরও সেই ‘আমি’ হয়ে ওঠার চর্চায় মগ্ন। কিন্তু এই আমিত্বের শেষ পরিণতি যে শেষ পর্যন্ত শূন্য, সেটা ব্যক্তি আকবরও বুঝতে চায় না। তাই হয়তো এতো বছর পর সন্তানদের ফিরে পাওয়ার পরও শুধু নিরঙ্কুশ ‘আমি’ হয়ে ওঠার জন্য আকবর সবাইকে খুন করান। প্রতিপক্ষের কোনো আশঙ্কা রাখেন না।
উধাও এবং তার গল্পকথা
উধাও-এর গল্পের মূল উপজীব্য ক্ষমতালিপ্সু আকবর, যার আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, নারী নিগ্রহ আর আত্মপরিচয়ের সঙ্কট। গ্রামের গরিব কৃষক আকবর। তিনি গ্রামের হাটে সবজি বিক্রি করতেন আর জুয়া খেলতেন। হঠাৎ-ই এক রাতে স্ত্রী-সন্তান ছেড়ে উচ্চাকাক্সক্ষী আকবর পাড়ি জমান শহরে। শহরে গিয়েও রাস্তায় রাস্তায় জুয়া খেলে এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে তিনি অনেক টাকার মালিক হন। উপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে আবারও বিয়ে করেন রিমি নামের একজনকে। আকবরের সব কাজের সঙ্গী রাজ, সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীও। এদিকে আকবরের ফেলে আসা সন্তান বাবু হাসান আর মিতা, পরিস্থিতির শিকারে একজন স্কুলভ্যান চালক, অন্যজন যৌনকর্মী। বাবার অবর্তমানে মায়ের কায়ক্লেশে জীবনযাপন, বোনের যৌনকর্মী হওয়া, পরিবারের দরিদ্রতা, বাবুর মনে একধরনের ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ফলে বাবু স্ত্রী-সন্তান ফেলে যাওয়া পুরুষদের একদমই সহ্য করতে পারেন না। এমন মানুষ পেলেই তাদের শাস্তি দিতে চান বাবু। এজন্য বাবুকে সবাই রবিনহুড নামে ডাকে। অন্যদিকে ছোটোবেলা থেকে দেখা নারীর প্রতি অবহেলায় বাবু নিজের মেয়ে বিন্তিকে ছেলে হিসেবে বড়ো করে তুলতে চান। বিন্তি ছেলে হলেই যেনো সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে!
শহরে একদিন নির্বাচনি পোস্টারে ছবি দেখে বাবাকে চিনে ফেলেন বাবু। তার বাবা তখন সংসদ সদস্য প্রার্থী, ক্ষমতার মোহে বন্দি। আর রবিনহুড বাবু প্রতিশোধের নেশায় ব্যস্ত। একপর্যায়ে বাবাকে অপহরণ করেন বাবু। তারপর আগের সব ঘটনা মনে করিয়ে দিতে আকবরের ওপর বাবু নানা কৌশল প্রয়োগ করতে থাকেন। একসময় আকবর সব স্বীকারও করে নেন। তিনি সন্তানদের নিয়ে একসঙ্গে থাকতে চান। একদিন সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যান সাগরে। তখনো বোঝা যায় না মনের ভিতরের ক্ষমতাবান পশুটাকে ঠিকই আকবর বাঁচিয়ে রেখেছেন। সাগরপাড়েই রাজকে দিয়ে এতোদিন পর ফিরে পাওয়া সন্তানদের হত্যা করান আকবর। তাদের হত্যার মধ্যে দিয়ে ধুয়ে-মুছে যায় তার অতীত। অতীত মুছে ফেলার এই খেলায় শেষপর্যন্ত বাদ পড়েন না আকবরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী রাজও। সবশেষে নিজ হাতে আকবর হত্যা করেন রাজকে। আকবরের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার রাজ্যে তখন আর কারো প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কোনো শঙ্কাই থাকে না।
উধাও-এর নারীপাঠ
উধাও-এ বেশ কয়েকটি নারী চরিত্রের দেখা পাওয়া যায়। তারা নানা কারণে চলচ্চিত্রের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে চলচ্চিত্রে তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা থাকলেও সমাজ-বাস্তবতায় তাদের অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন সেই অর্থে দেখা যায় না। সেদিক বিবেচনায় ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত উধাও-এর নারীপাঠ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রে মোট ছয় জন নারীকে দেখা যায়--আকবরের প্রথম স্ত্রী মিনা, দ্বিতীয় স্ত্রী রিমি, প্রথম ঘরের মেয়ে মিতা, বাবুর স্ত্রী, বাবুর মেয়ে বিন্তি ও স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়া নার্গিস। পুরো চলচ্চিত্রে মিনাকে না দেখা গেলেও তাকে ঘিরেই উধাও। মিনা-আকবরের সংসারে দুই সন্তান। রাতের আধারে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে ফেলে আকবর শহরে পাড়ি জমান। দুই সন্তানকে নিয়ে মিনার জীবন কাটতে থাকে। দুইজন মানুষ একসঙ্গে থাকলে যেরকম হয় আর কী, তাদের মধ্যে একটা নির্ভরতা সৃষ্টি হয়, আবার একজনের অনুপস্থিতিতে অন্যজন কিছুটা সমস্যায় পড়ে। মিনাও হয়তো নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন; স্বামী না থাকলে বাংলাদেশের বাস্তবতায় নারীরা যে ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। দুই সন্তানকে ঠিকঠাক বড়ো করতে পারেননি। বিশেষ করে মেয়ে মিতার যৌনকর্মী বনে যাওয়ার মধ্যে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এ কথা ঠিক, চলচ্চিত্রজুড়ে মিনা থাকলেও তার অবস্থান ঠিক পরিষ্কার নয়।
এবার আসা যাক রিমির প্রসঙ্গে। চলচ্চিত্রে রিমির সম্পদ হলো তার সৌন্দর্য। পুরুষ আকবরের যেমন অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা আছে; রিমির আছে রূপ, অন্যকে আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। তিনি রূপে ভোলান। রিমির সেই রূপকে ব্যবহার করেন আকবর; আর আকবরের অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতা রিমির উপভোগের বিষয়। দৃশ্যত রিমি ও আকবর একে অন্যের মিথোজীবী; কিন্তু বাস্তবে নয়। কারণ রিমিরা শেষ পর্যন্ত পুরুষের রক্ষিতা; যাকে চাইলেই পুরুষ বদল করতে পারে। চলচ্চিত্রে বদলের ইঙ্গিতও রয়েছে। রিমির উপস্থিতিতেও আকবর অন্যান্য নারীদের সঙ্গ করেন। আবার সেই আকবরই নির্বাচনের সময় চেষ্টা করেন সাধু সাজার। চলচ্চিত্রের সাত মিনিট ১০ সেকেন্ডে রাজকে উদ্দেশ করে আকবরকে বলতে শোনা যায়, ‘রাজ, তুই আমার বাড়িতে মাগি আনছোস, তার আবার ছবিও তোলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি ব্যাপারটারে ঠিক কর।’ প্রয়োজন শেষে আকবর বা যেকোনো পুরুষের কাছেই নারী যেনো কেবলই যৌনবস্তু।
এই পরিস্থিতির একটু গভীরে যাওয়ার জন্য সুন্দরী প্রতিযোগিতা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজকরা এর স্বপক্ষে দুটি যুক্তি দিয়ে থাকেন--এক. এটি নারীর ক্ষমতায়ন ঘটায়; দুই. এখানে সৌন্দর্য মূলকথা নয়, তার বুদ্ধিমত্তা বা ট্যালেন্টই তাকে জিতিয়ে দেয়। নৃবিজ্ঞানী সুসান রাঙ্কল বলেন, “মিস ওয়ার্ল্ড হয়ে-ওঠার প্রক্রিয়াটাতে তিনি [নারী] নিজে অবদান রাখেন সামান্যই। বরং, ‘এক্সপার্ট’রাই হচ্ছেন আসল লোক যারা মোট কাজের বেশিরভাগটা সম্পাদন করেন। খোদাই করে করে তারা তাকে একজন মিস ওয়ার্ল্ড যেমন হওয়া উচিত সেরকম আদর্শ-বস্তুতে রূপান্তর করে ফেলেন।”১ নিজের শরীরকে ঘষে মেজে চাহিদা অনুযায়ী নির্দিষ্ট আকারের এক সুন্দরী হয়ে উঠতে হয় নারীকে। কারণ এই সুন্দরের বাণিজ্যে দিনশেষে তাদের ক্ষমতায়ন নয়, শরীরটাই মোক্ষম বস্তু হয়ে ওঠে। অর্থাৎ নারীর শরীরকে পণ্য করে পুরুষ সম্পদ করেন আর নারীও সামান্য খ্যাতি, অর্থের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দেয়। তথাকথিত সৌন্দর্যের খেতাব নিয়েই তাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। যে সৌন্দর্যের খেতাব নিয়ে নারী সন্তুষ্ট থাকে, সেই সৌন্দর্য কিন্তু পুরুষই নির্ধারণ করে। উধাও-এ জীবনের একটা পর্যায়ে মিনাকে বিয়ে করেছিলেন আকবর। তাদের দীর্ঘদিনের সংসারে দুটো সন্তান, প্রেম, ভালোবাসা সবই ছিলো নিশ্চয়। তারপরও একদিন অবলীলায় সেই সংসার ছেড়ে আকবর চলে গেছেন। একবারও ভাবেননি স্ত্রী মিনা, সন্তানদের কী হবে! তারপর ঠিকই তিনি শহরে গিয়ে অন্য নারীর সঙ্গ নিয়েছেন, বিয়ে করেছেন। একসময়ের জীবনসঙ্গী, সুখ-দুঃখের অংশীদার মিনা তার কাছে তখন হয়ে পড়েছে অপ্রয়োজনীয়। তিনি আবার নতুন এক মিনাকে খুঁজে নিয়েছেন তার প্রয়োজনে। রিমির মতো আরো আরো মিনাদের খুঁজে নিতে আকবরের কোনো সমস্যা হয় না।
বাবা আকবরের অবর্তমানে অভাব অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠে মিতা আর তার ভাই বাবু। বাবা না থাকলে সন্তানদের অনেক চড়াই উৎরাইয়ের মধ্যে বড়ো হতে হয়, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় অন্তত এটাই স্বাভাবিক। সেজন্যই হয়তো প্রথমে বাবা পরে মা-হীন মিতাকে দিনশেষে যৌনকর্মী হতে হয়। মিতার যেনো শরীর বিক্রি করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। তাই মিতা রাস্তায় দাঁড়িয়ে শরীর বিক্রি করেন। অথচ একই সঙ্গে বেড়ে ওঠা বাবু ভ্যান চালান। তার সাজানো গোছানো একটা সংসার আছে, সন্তান আছে। তিনি মায়ের প্রতি বাবার আচরণের প্রতিশোধ নিতে চান, নেনও। কিন্তু মিতার যেনো সেই বোধ-ই নেই। তার প্রতিবাদ করার মতো অবস্থা নেই!
এবার যাকে নিয়ে আলোচনা করা হবে তিনি বাবুর স্ত্রী। পুরো চলচ্চিত্রে তাকে কখনো নাম ধরে ডাকতে শোনা যায় না। তিনি শুধু ‘বউ’ নামেই সন্তুষ্ট ছিলেন চলচ্চিত্রজুড়ে। বউ ডাকের আড়ালে তিনি নিজের নামটাই যেনো হারিয়ে ফেলেছেন। তার পরিচয় তিনি ‘বাবুর বউ’। ‘বাবুর বউ’ খানিকটা রাগী, আবেগীও বটে। তবে বাবুর কিছু কাজ তিনি পছন্দ করেন না--মাতাল হয়ে রাতে ঘরে ফেরা, স্ত্রী-সন্তান ফেলে যাওয়া পুরুষদের ধরে এনে শাস্তি দেওয়া, মেয়ে বিন্তিকে ছেলে সাজিয়ে রাখা। এলাকার মানুষের ভাষায় যাকে বলে ‘রবিনহুডগিরি’। এসব অপছন্দ করলেও ‘বাবুর বউ’ কখনো জোরালো প্রতিবাদ করেন না। স্বামীর এসব কাজে তিনি রাগ করেন, স্বামীর সোহাগে আবার সব ভুলেও যান। তবে সবমিলিয়ে ঘরকন্না নিয়েই তিনি বেশি ব্যস্ত। সংসারেই সীমাবদ্ধ ‘বাবুর বউয়ের’ জীবন।
চলচ্চিত্রজুড়ে বাবু তার মেয়ে বিন্তিকে ছেলে সাজিয়ে রাখেন। বাবু ছেলেদের মতো করে বিন্তির চুল কাটিয়ে দেন, শার্ট পরান; সাধারণত ছেলেশিশুরা যে ধরনের খেলনা পছন্দ করে বিন্তির জন্য বাবু সেই ধরনের খেলনা কিনে আনেন। বউ এ নিয়ে বাবুর সঙ্গে কিছুটা রাগারাগি করলেও গায়ে মাখেন না তিনি। ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম যে, বাবু আসলে বিন্তিকে নারী হিসেবে বড়ো করতে চান না। বাবুর চারপাশ হয়তো তাকে সেটা শেখায়নি। ছোটোবেলায় মা, একটু বড়ো হয়ে বোন--সবমিলে নারীর যে জীবন বাবু দেখেছেন সেটা হয়তো তাকে আরেকজন নারীকে বড়ো করে তুলতে উৎসাহিত করে না। কিংবা পুরুষ বাবুর যে ‘শ্রেষ্ঠত্ব’, সেটা তিনি জারি রাখতে চান মেয়ে বিন্তির ওপর। কিন্তু লৈঙ্গিক সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে বিন্তিও যে মানুষ হয়ে উঠতে পারে, সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে, তার কোনো ইঙ্গিতও নির্মাতা করেন না।
চলচ্চিত্রে নার্গিস এসেছে মিনার প্রতিচ্ছবি হয়ে। মিনার মতো নার্গিসকেও তার স্বামী ফেলে চলে গিয়েছিলেন। তবে নার্গিসের স্বামীকে বাবু ধরে এনে তার সামনে হাজির করেন। এটা রবিনহুড বাবুর এক ধরনের নেশা। যারাই বউ-বাচ্চা ছেড়ে চলে যায়, তাদেরকেই ধরে এনে রবিনহুড শাস্তি দেন। একটা স্কুলভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন রবিনহুড। অপরাধীকে ওই স্কুলভ্যানে করেই তিনি গ্রামে ধরে নিয়ে আসেন। তারপর শিকল দিয়ে বেঁধে শাস্তি দেন। নার্গিসের স্বামীকেও একইভাবে বেঁধে রাখেন তিনি। নার্গিসের স্বামী পালাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু চতুর রবিনহুডের হাত থেকে পালানো এতো সহজ হয় না। তারপর নার্গিসের স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। এদিকে নার্গিস দীর্ঘদিন পর স্বামীকে পেয়ে রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। দুই মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে স্বামীকে প্রশ্ন করেন নার্গিস--‘ক্যান হালায়া (ফেলে) গেছিলি আমারে? কুত্তা, কী পাইছিস শহরে? কচি মাইয়া পাইছিস? একটা টাকাও তো পাঠাইলি না!’ নার্গিসের এ কথায় বোঝা যায়, স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটা কেবল জৈবিক আর টাকার! স্ত্রী কেবল স্বামীর জৈবিক চাহিদা পূরণ করেন। বিনিময়ে স্বামী ভরণপোষণ দেন। কারণ নার্গিসের ভাষায় শহরে কচি মেয়ে পাওয়ার সঙ্গে বাড়িতে টাকা না পাঠানো সম্পর্কিত। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে এর বাইরেও একটা সম্পর্ক থাকে, তার ইঙ্গিত কিন্তু চলচ্চিত্রে নেই।
‘মারতে হইবো নইলে মরতে হইবো’
ক্ষমতালিপ্সু আকবরের টিকে থাকার তত্ত্বই হচ্ছে--‘মারতে হইবো নইলে মরতে হইবো’। এই তত্ত্বের ওপর ভর করেই আকবর গরিব কৃষক থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হয়েছেন। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা সাত মিনিট ১৭ সেকেন্ডে আকবরকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার কিচ্ছু ছিলো না, আমি রাস্তায় রাস্তায় জুয়া খেলাইয়া জিততাম।’ তারপর এক ঘণ্টা আট মিনিট ৫৪ সেকেন্ডে তাকে গুলি করতে দেখা যায় রিভলবার হাতে। পরের শটেই তিনি গাড়ি থেকে একটা স্যুটকেস নিয়ে পালাতে থাকেন। এক ঘণ্টা নয় মিনিট ৩০ সেকেন্ডে আকবরকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়। তার অপরাধ তিনি এক লোকের মাল চুরি করেছেন, মানে ওই স্যুটকেসটা। একপর্যায়ে রাগে-ক্ষোভে ওই লোকটা আকবরের মুখে গুলি করে দেন। গুলি আকবরের গাল দিয়ে বেরিয়ে যায়, বেঁচে যান আকবর। এভাবেই আকবর বনে যান ‘মারা আর মরার’ খেলার নায়ক।
চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, আকবরই ওই ব্যক্তিকে (আকবরকে যিনি গুলি করেছিলেন) গুলি করে মেরে ফেলেন। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ১২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে আকবরকে উদ্দেশ করে বাবু হাসানকে বলতে শোনা যায়, ‘কয়জনরে মারছো তুমি জানো, নিজে জানো, বড়ো নেতা হইতে চাও তুমি, কয়জনরে মারতে হয় ওই হানে যাইতে হইলে?’ প্রত্যুত্তরে আকবর বলেন, ‘মারতে হইবো নইলে মরতে হইবো।’ আকবর নিজে টিকে থাকার জন্য, সমাজে নিজের জায়গাটা শক্ত করার জন্য, ‘নাম্বার ওয়ান’ হওয়ার খেলায় হাজার জনকে মারতেও সামান্য দ্বিধা করেন না। তিনি আসলে সবাইকে মেরে একক ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে চান।
এই একজন হয়ে ওঠার পথে তার পরিবারই একসময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আকবরের ফেলে আসা ছেলে বাবু নির্বাচনের পোস্টার দেখে তাকে চিনতে পারেন। একপর্যায়ে আকবরকে অপহরণ করেন বাবু। তারপর ধীরে ধীরে নানা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আকবরকে তার অতীতে নিতে থাকেন বাবু। কৌশলী আকবর বাবুর সব কথা মেনেও নেন। বাবুর সঙ্গে তিনি বাড়িতে যান। আগের মতোই একসঙ্গে খাবার খান। থাকতে চান পরিবারের সবার সঙ্গে। ছেলের বউ, নাতনি, মেয়ে সবাইকে আপন করে নেন। বাপ-ছেলে মিলে একসঙ্গে সিগারেটও খান। মনে হতে থাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ৩১ মিনিট ২৫ সেকেন্ডে আকবরসহ বাবুর পরিবারের সবাই সমুদ্র তীরে বেড়াতে যায়। সবাই যখন সমুদ্র উদযাপন ব্যস্ত, আকবর তখন দূরে দাঁড়িয়ে তা উপভোগ করেন। একপর্যায়ে নিজেও হাঁটতে হাঁটতে সবার কাছাকাছি চলে যান। পর্দায় ভেসে ওঠে বাবুর একচিলতে হাসি মুখ। আকবর গাড়ির কাছে ফিরে এক মুহূর্তের জন্য রাজের চোখে চোখ রাখেন। বদলে যায় পরিস্থিতি। এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডে দেখা যায়, রাজের হাতে পিস্তল। এরপর এক ঘণ্টা ৩৩ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে বালুচরে পড়ে থাকে আকবর ও রাজ ছাড়া অন্যদের মৃতদেহ।
রাজ বালু খুড়ে এক এক করে সবার মৃতদেহ পুঁতে রাখেন। আকবরের লালসার জিহ্বায় ক্ষমতার স্বাদ এতোটাই কড়া যে আপন রক্তের অস্তিত্ব মুছে ফেলতেও তার বুক কাঁপে না। নতুন করে ফিরে পাওয়া পরিবারের সদস্যদের হত্যার মধ্য দিয়ে আকবর হয়তো মুছে ফেলতে চান তার অতীত। এখানেই ঘটনার শেষ হয় না। পরের ঘটনা দেখার জন্য হয়তো দর্শক হিসেবে অনেকেই প্রস্তুত থাকে না। এক ঘণ্টা ৩৪ মিনিট ১১ সেকেন্ডে এবার পিস্তল দেখা যায় আকবরের হাতে। পরের শটে গাড়ির ডিক্কিতে রাজের পা ঝুলে থাকতে দেখা যায়। বোঝা যায়, আকবর নিজে গুলি করে হত্যা করেছেন তার বিশ্বস্ত, একনিষ্ঠ সঙ্গী রাজকে। অতঃপর আকবর গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরেন। এবার আকবরের আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। বাবুর মতো কেউ আর তাকে অপহরণ করে পুরনো দিনের কথা বলে ভয় দেখাবে না, যাবতীয় খারাপ কাজের সাক্ষী হিসেবে থাকবে না রাজ। অবশ্য ক্ষমতাবানরা এমনই করে। তারা সবাইকে প্রতিপক্ষ মনে করে, কাউকে নিয়ে সামান্য আশঙ্কা থাকলেও। দেশে দেশে সব শাসকরা এমনটাই করেছে।
মুসোলিনি কিংবা হিটলার থেকে শুরু করে সমসাময়িক বাংলাদেশেও এর প্রমাণ ভূরিভূরি। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে খুব নির্মমভাবে প্রতিপক্ষ নিধনের এই খেলা চলেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকেই প্রতিপক্ষ নিধনের খেলায় নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে একের পর এক ক্ষমতাবানকে। তার পরের দশকের রাজনীতি আরো ভয়াবহ; সেখানে কেবল অবিশ্বাস আর রক্ত স্নান। আর মাঝখানের দুই দশকে চলেছে গণতন্ত্র গণতন্ত্র খেলা! এই খেলা অবশ্য বোঝা যেতো না, যদি না শূন্য দশকের শেষার্ধে গণতন্ত্র নিয়ে নতুন খেলা শুরু না হতো। বর্তমানের বাংলাদেশে তো প্রতিপক্ষের কথা চিন্তাই করা যায় না। সেখানে এখন নিজ মানুষই সবচেয়ে বড়ো প্রতিপক্ষ, যেনো আকবর আর রাজ। তবে বর্তমানের আকবররা খুবই দূরদর্শী, সঙ্গে সাবধানও। তারপরও কথা থেকে যায়। উধাও-এ এক ঘণ্টা নয় মিনিট নয় সেকেন্ডে আকবরকে বাবু প্রশ্ন করেন, ‘তুমি কি কখনো ফিরবার কথা ভাবছিলা?’ আকবর বলেন, ‘ভাবছিলাম ভাবছিলাম, তার জন্য আমারে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে।’ বস্তুতই রক্তচোষা একক ক্ষমতাবানদের ফেরার কোনো পথ থাকে না। কারণ একেকটা লাশের ওপর পা রেখেই উপরে উঠতে হয় তাদের। তবে সেই ওঠারও শেষ আছে। যদিও আকবরের শেষটা আড়ালেই রেখে দেন নির্মাতা।
এক রবিনহুডের গল্প
বাবা আকবর আর মা মিনার অবর্তমানে বেড়ে ওঠা বালক বাবু। তিনি শৈশবে লুকিয়ে বাবার জুয়াখেলা দেখেছেন। তারপর একদিন রাতের আঁধারে বাবার চলে যাওয়ার একমাত্র সাক্ষীও তিনি। মায়ের হঠাৎ মৃত্যু, বোনের যৌনকর্মী হওয়া এসব তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। এ ধরনের নানা ঘটনা তাকে রবিনহুড বানিয়েছে। সেই রবিনহুড নির্ভীক, সাহসী। পরিবারহীনভাবে বেড়ে ওঠা এই মানুষটির পরিবারের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা। রবিনহুড স্কুলভ্যান চালান। সকালে শিশুদের নিয়ে যাওয়া সেই স্কুলভ্যানেই অন্য সময় স্ত্রী-সন্তান ফেলে যাওয়া মানুষদের ধরে নিয়ে আসেন তিনি। এই মানুষগুলো বাবুর কাছে ‘ক্ষুধার জ্বালায় নিজের বাচ্চা চিবিয়ে খাওয়ার চেয়েও অধম’।
একদিন সেই স্কুলভ্যানে নিজের বাবাকেই তুলে নেন বাবু। বাবু বাবাকে চিনলেও বাবা আকবর তো আর সেই রাতে ফেলে আসা ছেলেকে চেনেন না। এদিকে জন্মদাতা, অন্যদিকে স্ত্রী-সন্তান ফেলে যাওয়া অপরাধী; দুটো সম্পর্ক বাবুকে সমস্যায় ফেলে। সবমিলিয়ে বাবু যেনো একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন। বাবাকে কঠোর শাস্তিও দিতে পারেন না; আবার ছেড়ে দিতেও পারেন না। ছেলেবেলায় বাবার ভালোবাসা পাননি বলে বড্ড আকাক্সক্ষা তার সেই ভালোবাসার প্রতি। তাই হয়তো দিনশেষে বাবাকে সঙ্গে নিয়েই থাকতে চান তিনি। শেষবেলা হলেও বাবাহীনতার কষ্ট যেনো তিনি ঘোচাতে চান।
দরদি রবিনহুডের কাছে সবাই আপনজন। তাই হয়তো একজন অসহায় নারীকে দেখে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে মানুষগুলা দেখতেছো ওরা কেউ আমার মা, কেউ আমার বোন, ওরা খাইতে পারে না, ঘুমাইতে পারে না, ঘুমের ঘোরে কাইন্দা ওঠে; আর এই যে বাচ্চাগুলা দেখতেছো ওদের জন্য আমি এই কাজগুলো করি।’ কেউ যেনো মিতা আর মিনার মতো পরিস্থিতিতে না পড়ে এজন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন। শৈশবে বাবার চলে যাওয়া যেনো বাবু কোনোভাবেই মানতে পারেন না। তিনি কষ্ট ভুলতে নেশা করেন। অতীত মনে করতেই বাবার লুকিয়ে জুয়াখেলা আর রাতের আঁধারে চলে যাওয়া বার বার তার চোখে ভাসে। মায়ের জন্য কষ্টটাও তার অনুভবে বোঝা যায়। চারপাশের ডিসকোর্স নারী সম্পর্কে তাকে শুধু নেতিবাচক ধারণাই দেয়। এজন্য নিজের মেয়েটাকেও তিনি মানুষ নয়, পুরুষ বানাতে চান।
বাবুর শৈশবের নির্মমতা তার মধ্যে এক ধরনের রাগ ক্ষোভের সৃষ্টি করে। অতীতের কষ্টটা ভুলে থাকতেই হয়তো তিনি এইসব কর্মকাণ্ড করেন। আপাত দৃষ্টিতে বাবুকে কেউ দস্যু, কেউ পাগল, কেউ মাতাল মনে করতে পারে। কিন্তু বাবুর ভিতরের মানুষটাকে কেউ বোঝে না, বোঝার চেষ্টাও করে না। অথচ সমাজে বাবুরা বিদ্যমান। তাদের কেউ টোকাই, কেউ পেটের দায়ে চোর হয়, হরতালে পিকেটিং করে, গাড়ির কাচ ভাঙে, পেট্রোল বোমা মারে। চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাদের এই কর্মের দিকে ঠেলে দেয়। কেবল বেঁচে থাকার জন্যই তাদের এ সংগ্রাম। এই সমাজ, রাষ্ট্র কখনো তাদের অপরাধের কারণ খোঁজে না।
শেষকথা
উধাও কোনো একরৈখিক ন্যারেটিভ নয়। হঠাৎ করেই অবিচ্ছিন্নভাবে ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যাওয়া হয় চলচ্চিত্রটিতে। অবিচ্ছিন্ন ন্যারেটিভই এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। গল্পের এই অবিচ্ছিন্নতা উধাও-এ ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে দেখার সময় হঠাৎ অন্যমনস্ক হলে পুরো চলচ্চিত্র বুঝে ওঠা খানিকটা কঠিনই হয়। তাই নিশ্ছিদ্র মনোযোগ দিয়ে উধাও দেখা আবশ্যক। একরৈখিক ন্যারেটিভ না হওয়ায় এর গল্পটা আন্দাজ করা যায় না। গল্প বোঝার জন্য দর্শককে আটকে থাকতে হয় চলচ্চিত্রের শেষ পর্যন্ত। উধাও দর্শককে ধরে রাখার সে ক্ষমতা রাখেও। তারপরও দিনশেষে গল্পটি হয়ে ওঠে ক্ষমতা আর সেই নিরুঙ্কুশ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার বয়ান। সেই বয়ানে জীবনের গল্প যেমন আছে, আছে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার গল্প। কেবল ক্ষমতার জন্য সবকিছু ধ্বংস করে জীবন থেকে পালিয়ে কি মানুষ বাঁচে? চলচ্চিত্রজুড়ে সেই ইঙ্গিত অবশ্য নির্মাতা করেননি। আর সেখানেই উধাও-এর উধাও হওয়ার শঙ্কা আছে।
লেখক : আনতারা সোনিয়া, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
soniaislam.kgc@gmail.com
https://www.facebook.com/profile.php?id=100010523371229
তথ্যসূত্র
১. সুসান রাঙ্কেল (২০০৪), উদ্ধৃত; হক, ফাহমিদুল (২০১১ : ৫৪); “‘আদিবাসী প্রিয়দর্শিনী’ ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার রাজনৈতিক অর্থনীতি”; অসম্মতি উৎপাদন; সংহতি প্রকাশন, ঢাকা।
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন