মাহমুদুল হাসান
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
’৪৭ থেকে ’৭১ হয়ে জুলাই ’২৪
ভারতীয় চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসের কুলজীনামা, দস্তখত ও তার দাগ-খাতিয়ান
মাহমুদুল হাসান

ভূমিকা
Is liberation a blessing, or a curse? A curse disguised as blessing, or a blessing feared as curse? Such questions were to hunt thinking people through most of the modern era which put ‘liberation’ on the top of the agenda of political reform, and ‘freedom’ at the top of its list of values—once it had become abundantly clear that freedom was slow to arrive while those meant to enjoy it were reluctant to welcome to it.1
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে ১৯৪৭, ১৯৭১ যথেষ্ট জোশ আর জজবা নিয়েই প্রতীয়মান হয়ে আছে তার নাগরিকের প্রাত্যহিক যাপিত জীবনের চরা-চরিতে। জুলাই ২০২৪ আবার নতুন করে সেগুলোকে আমলে নেওয়ার দারুণ এক মওকা তৈরি করে দিয়েছে। তাই সেগুলোকে বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশের নাগরিককে তার ‘জাতিত্ব’, আত্মপরিচয় গঠন ও ধারণ করা জরুরিও বটে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দূর আকাশে উদিত জাজ্বল্যমান নক্ষত্রপুঞ্জের ন্যায় কিছু নিশানার আবির্ভাব ঘটে। সেইসব নক্ষত্রপুঞ্জের আলো-অন্ধকার কীভাবে বর্তমান আর ভবিষ্যতের যাত্রাকে নির্ধারণ করে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ’৪৭, ’৭১-এর সেই আলোকবর্তিকা (কন্সটিলেশন্স), আর তার ‘বাত্তির নীচের অন্ধকারে’র নিশানার দেখা পাওয়া সম্ভব ’২৪-এ এসেও। যেগুলোর একটা আরেকটার সঙ্গে যেমন সংযুক্ত, তেমনই কার্যকারণ সংবলিতও বটে। কাজেই এইসব গ্রহাণুপুঞ্জের আবির্ভাব ও তার ক্রিটিকাল বিবেচনাগুলো নতুন সময়ের দাবিতে নতুন করে করতে পারা জরুরি।
সেইসঙ্গে এইসব ঘটনাবলিতে যুক্ত রয়েছে ভারত এবং তৎকালীন পাকিস্তানের ঐতিহাসিকতাও। আবার পাকিস্তান থেকে বিভক্ত হওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরিতেও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের ভূমিকা (ইতিবাচক, নেতিবাচক) রয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কটা মোটেও বন্ধুত্বপূর্ণ নয়, বরং আধিপত্যের। বাংলাদেশের ওপর এই আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই কিছু বিষয়কে নাকচ করে এসেছে ভারত। এবং সেইসব বিষয়ে নিজেদের বয়ান হাজির করতে চেয়েছে সবসময়ই। এমনকি সেটা ইতিহাসেও। কারণ বর্তমান রাজনীতি হলো বয়ানের রাজনীতি, ইতিহাসের রাজনীতি। আর এটাকেই বলে ‘হিস্টোরিসিজম’। মানে যে বয়ানে ইতিহাস লেখা হয় সেই ইতিহাসের অবজেক্ট অর্থাৎ যাকে নিয়ে ইতিহাস লেখা হয়, সে-ই ওই ইতিহাসের মধ্যে থাকে না। অর্থাৎ ইতিহাসের কর্তা স্বয়ং ইতিহাসের আলাপের বিষয় (অবজেক্ট) হয়ে ওঠে। দীপেশ চক্রবর্তী ইউরোপ আর তাদের স্থাপিত কলোনিয়ালিটির পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বলেছিলেন। কিন্তু এই বাস্তবতা বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমানভাবে বিবেচ্য। কারণ বাংলাদেশ এখনো ভারতের ‘স্যাটেলাইট স্টেট’ হয়েই থেকে গেছে। যেখানে কলোনিয়ালিটির গন্ধ পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
মোদ্দা কথা, ’৪৭-কে ভারত মনে করে একটা অযাচিত ঘটনা ও ষড়যন্ত্র। যার মধ্য দিয়ে অখণ্ড ‘ভারতমাতা’কে হিন্দু-মুসলমানে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। এবং এর দায় চাপানো হয় তৎকালীন পাকিস্তানের ওপর। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ; যখন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে, সেই সংগ্রাম নিয়েও ভারত এমন এক বয়ান হাজির করে, যেখানে বাংলাদেশকে ভারতের একটা অঙ্গরাজ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আর সর্বশেষ ২৪-এর গণআন্দোলনকে তো ভারতীয় বয়ানে বলা চলে, ‘বাংলা হবে আফগান’। বলতে গেলে এগুলোই ভারতীয় চলচ্চিত্রসহ মূলধারার গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সামষ্টিক উপস্থাপন। এই আলোচনা মূলত চলচ্চিত্রের উপস্থাপনকে ধরে এগিয়ে যাবে।
আলোচনার উদ্দেশ্য-বিধেয়
‘প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস’ নিয়ে নানা বয়ান হাজির করার নানা মাধ্যম আছে সমাজ-রাষ্ট্রিক পরিসরে। চলচ্চিত্র তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যদিও বর্তমানে নতুন নতুন টেকনোলজির উদ্ভাবন হচ্ছে, তারপরও মেটা-ন্যারেটিভ তৈরির মাধ্যম হিসেবে বিংশ এবং একবিংশ শতাব্দির পুরো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকেই আমূল বদলে দিয়েছে চলচ্চিত্র। এটাই মূলত চলচ্চিত্রের মাধ্যমে হাজির হওয়া বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতীয় হিস্টোরিসিজম যাচাই করার কারণ। এই আলোচনাতে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে (অবজেক্ট) নিয়ে ভারতের হাজির করা বয়ান এবং হিস্টোরিসিজম চর্চার নানা দিক উন্মোচনের প্রয়াস থাকবে।
পূর্বপাঠ ও তাত্ত্বিক ভিত্তি
এক. তাত্ত্বিক ভিত্তি
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিকতাকে মোটাদাগে দুইটি ‘কালানুক্রমিকতা’র ভেতরে এনে যদি বিচার করা হয়, তাহলে হয়তো খুব বেশি ভুল হবে না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে ওইসব সময়পুঞ্জ এবং ঘটনাবলির ভেতরেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের নিশানা (ট্রেস) হাজির রয়েছে। এমনকি অনিবার্যতাও দেখতে পাওয়া অসম্ভব নয়। ভাগ দুইটি হলো—এক. উপনিবেশিক পর্ব; দুই. পাকিস্তান শাসনামল। উপনিবেশিক পর্বকে আরো নানা পর্বে ভাগ করা সম্ভব। কিন্তু আলোচনার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়ে কেবল বিংশ শতকের শুরুর দিকের রাজনৈতিকতার ইঙ্গিত দিয়ে পরবর্তী সময়কালে, বিশেষ করে ১৯৪৭-এর রাজনৈতিকতায় প্রবেশ করা হবে এবং পরে তার ধারাবাহিকতায় আলোচনা এগোবে। কারণ এই আলোচনার মূল নজরারোপের জায়গা ’৪৭ ও ’৭১।
বিংশ শতক, বিশেষ করে ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিকতার ভেতরেই ’৪৭-এর দেশভাগের বীজ অনেকটাই লুকায়িত আছে। ওই সময়টার একটা সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করতে পারলে হয়তোবা এই বিভক্তির (অ)ন্যায্যতা, (অ)যথার্থতা, (অ)অনিবার্যতা বুঝতে পারা সম্ভব। ১৯৪৭-এর বিভাজন নিয়ে তীব্র বিতর্কের দুটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রচলিত ‘দ্বিজাতি’ তত্ত্ব এবং ভারতীয় ইতিহাসে প্রচলিত বৃটিশ ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ তত্ত্ব। এই দুই তত্ত্বই আদর্শিক বা মতাদর্শিক সাধারণীকরণ মাত্র। এখান থেকে বেরিয়ে বরং ঔপনিবেশিক ভারতের শেষ দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোগত দ্বন্দ্বকে পাকিস্তান গঠনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা শ্রেয়।
দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক ও ইতিহাসবিদ সুগতা বোস ও আয়েশা জালাল বলছেন, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকেই মুসলমানরা ভারতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ‘পলিটিকাল কমিউনিটি’ হিসেবে গণ্য হতে থাকে।২ তবে এই গণ্যকরণকে ‘যথাযথ’ ধরে নিলেও পরবর্তী সময়ে একেবারে ৪৭-এর বিভক্তি অব্দি মুসলমানরা কেবলই সংখ্যালঘু আকারে থেকে গেছে। যার কারণে মুসলমান অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে আলাদা ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র গঠিত হওয়া অনিবার্য হয়ে পড়েছিলো। কিন্তু এই রাষ্ট্র মোটেও পাকিস্তানের ন্যারেটিভ অনুযায়ী ‘দ্বিজাতি’ এবং ভারতের ন্যারেটিভ অনুযায়ী ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’-এর কারণে হয়নি। বরং সেই সময়কার আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাই এই বিভক্তির মূল কারণ। এবং পাকিস্তানকে কোনো ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি জিন্নাহ। বরং তিনি চেয়েছিলেন, পাকিস্তানকে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এবং ’৪৭-এর বিভাজনের ফলে পাকিস্তানের যে বাসনা জনমনে ছিলো তা ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয়, বরং তাতে সেক্যুলার রাষ্ট্রের বাসনাই ছিলো।
বৃটিশ শাসন ভারতীয় রাজনীতিকে প্রাদেশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র নির্বাচনী আসনব্যবস্থা চালু করেছিলো (১৯০৯ ও ১৯১৯’র সংস্কারে)। ফলে মুসলিম নেতারা এক ধরনের সংখ্যালঘু-পরিসরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, যা তাদের জাতীয় ঐক্যবদ্ধ রাজনীতিকে দুর্বল করেছিলো। স্থানীয় পর্যায়ে তারা আঞ্চলিক স্বার্থে জোট গঠন করতে পারলেও জাতীয় স্তরে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। ১৯৩০-এর দশকে জিন্নাহ মুসলিম লীগের নেতৃত্ব নেওয়ার পর সংগঠন অনেকটাই পুনরুজ্জীবিত হয় এবং ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের কেন্দ্রীয় নির্বাচনে মুসলিম আসনের সবগুলো জিতে নেয়। তবুও তখন ‘পাকিস্তান’ ধারণাটা অস্পষ্ট ছিলো; কেবিনেট মিশন (১৯৪৬) তিন-স্তরীয় ফেডারেশনের প্রস্তাব দেয়, যেখানে মুসলিম প্রদেশগুলোকে একত্রিত করে একটি ‘মুসলিম কেন্দ্র’ তৈরির সুযোগ ছিলো। কিন্তু কংগ্রেসের তরফ থেকে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় জিন্নাহকে শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন পাকিস্তান ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প দেওয়া হয়নি।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের জুনে লর্ড মাউন্টব্যাটেন-এর পরিকল্পনায় পাঞ্জাব ও বাংলার বিভাজন চূড়ান্ত হয়। এ সময় প্রদত্ত গণভোটের ফল দেখায়, অধিকাংশ আইনপ্রণেতাই বিভাজনের পক্ষে ছিলো না; তবুও কংগ্রেস নেতারা মুসলমানদের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তেই সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে পাকিস্তানকে আবদ্ধ করতে চেয়েছিলো। এভাবেই কংগ্রেস হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে নিজেদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার বিনিময়ে বিভাজনকে মেনে নেয়। যার ফলে জিন্নাহর কাছে মাত্র দুইটা অপশন ছিলো—এক. মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই বা মুসলিম প্রতিনিধিত্বকে কুরবানি দিয়ে ভারতকে অখণ্ড রাখা বা ভারতের অখণ্ডতা মেনে নেওয়া; দুই. মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে (পাঞ্জাব ও বাংলা, এই দুই অঞ্চলই পরে পাকিস্তান গঠনের জন্য নির্ধারিত হয়) স্বয়ংসম্পূর্ণ পাকিস্তান রাষ্ট্র গড়ে তোলা। তার চেয়ে বড়ো কোনো বিকল্পও তাকে আর দেওয়া হয়নি। ফলে পাকিস্তান গঠন তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এবং বলতে গেলে পাকিস্তান ভাগ এক অপরিহার্য ঘটনাও হয়ে ওঠে; যেহেতু মুসলমান নেতৃত্ব বিকাশের কোনো সুযোগ তখন ছিলো না।
পাকিস্তানের সরকারি ইতিহাসে জিন্নাহকে ধর্মনিরপেক্ষ নায়ক হিসেবে নয়, বরং ‘ইসলামি রাষ্ট্রের পিতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, এই বিভাজন ‘ইসলামের জয়ের ইতিহাস’; অথচ বাস্তবে জিন্নাহ স্বাধীনতার পর পাকিস্তানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ার পক্ষে ছিলেন। সাম্প্রতিক পাকিস্তানের অনেক তাত্ত্বিক ভারতীয় মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশা দেখে বিষয়টিকে এভাবেই পুনর্মূল্যায়ন করছে।
অন্যদিকে স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতীয় ইতিহাসে কংগ্রেস নিজেকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের একমাত্র প্রতিনিধি’ হিসেবে উপস্থাপন করে। নেহেরু’র নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদীর একক কণ্ঠে অতীতের সব দ্বন্দ্ব ও বৈচিত্র্যকেই মুছে ফেলা হয়। এমনকি গান্ধীর বিকেন্দ্রীকৃত সমাজতান্ত্রিক আদর্শসহ বহু ভিন্ন মতও এখানে কোনো গুরুত্বই পায়নি। স্বাধীনতার পর শুধু কংগ্রেস সমর্থিত মুসলমানদেরকেই ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবে মান্য করা হয় এবং বড়ো প্রাদেশিক বা ভাষাভিত্তিক দাবি (যেমন তেলেঙ্গানা আন্দোলন) এবং বামপন্থি কৃষক-বিপ্লবকে সরাসরি রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক বিভাজনই ‘চূড়ান্ত সমাধান’ হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে। যার ফলে কেন্দ্র-প্রদেশ দ্বন্দ্ব ও সামাজিক অর্থনীতির সমস্যাগুলো আড়াল হতে থাকে।
স্বাধীনতার পর ভারতে গৃহীত একক কেন্দ্রীয় কাঠামো (যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যর্থ হয়েছে। গান্ধীর স্বচালিত গ্রাম-সমাজের স্বপ্ন পূরণ হয়নি, বরং সেখানে কংগ্রেসের উত্তরাধিকারী সরকারের একক আধিপত্য তৈরি হয়েছে। ফলে কেন্দ্র-রাজ্য বৈষম্য বেড়েছে, আর্থ-সামাজিক অবক্ষয়ও তৈরি হয়েছে, এবং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি এখনো অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় গণমনে পার্টিশনের স্মৃতি অত্যন্ত নেতিবাচক। বর্তমান সময়ে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা (যেমন ‘বিজেপি’) এটাকে ‘মাতৃভূমির বিভক্তি’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে সেখানে রামমন্দির তৈরির চলমান উদ্যোগে পার্টিশনের ‘ভূত’কে উৎখাতের প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা লক্ষণীয়। আবার পাকিস্তানও এই পার্টিশনকে ‘মুসলমানদের জয়’ হিসেবেই উপস্থাপন করে এসেছে।৩
দুই রাষ্ট্রের এই পলিটিকাল ক্রাইসিসের প্রভাব সরাসরি এসে পড়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে। এদেশের মুসলমানরা ‘খাঁটি মুসলিম’ না এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা তো এখানে বসবাসেরই অধিকার রাখে না—এমন ভাবনা পাকিস্তানের শাসকদের ছিলো, সঙ্গে কলোনিয়াল মানসিকতা তো রয়েছেই। অন্যদিকে ভারতের ‘ভাই হারানোর শোক’ আর ‘অখণ্ড ভারত’ বাসনা তো আছেই। এই দুই ইডিওলজির দাপটে বাংলাদেশের নাগরিকের স্বাধিকার আন্দোলন যে এই অঞ্চলের মানুষের মুক্তির লড়াই (সেক্যুলার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যে বাসনা ছিলো ১৯৪৭-এ), সেটাই উপস্থাপিত হয়নি কোথাও! সেটা যেমন ভারতের কাছেও হয়নি, তেমনই পাকিস্তানের কাছেও হয়নি। পাকিস্তান ভেঙেই তো বাংলাদেশ হলো, অন্যদিকে ভারত এই মুক্তিযুদ্ধকে ফ্রেমিং করেছে উল্লিখিত লেন্স ও স্পেক্টাকলে। যেখানে বাংলাদেশ তাদের ‘অঙ্গ’ ও ‘হারানো ভাই’। একইসঙ্গে তারা বাংলাদেশের পক্ষ নিয়েছে স্রেফ তাদের স্যাডিস্ট মনোবাসনা পূরণের জন্য এবং উত্তর-উপনিবেশিক কায়দায় দখলে রাখার জন্যই। এমনকি ’২৪-এর আন্দোলনকেও তারা একই ফ্রেমে আবদ্ধ করে প্রচারণা চালিয়েছে।
দুই. পূর্বপাঠে ’৪৭
২০২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘FILMS AND INDIA’S PARTITION: 1947-2024’৪ নামক গবেষণায় দেশভাগকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্য, চলচ্চিত্রসমূহকে টেক্সট হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এবং এইসব টেক্সটে দেশভাগ কীভাবে হাজির হয়েছে সেটাকে দেখার চেষ্টা করা হলেও তা কিছুটা সীমাবদ্ধ। কারণ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগ এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়েছিলো, যখন বলতে গেলে সেখানে মেজরিটির সমর্থন ছিলো। না হলে এতো বড়ো ঘটনা ঘটা সম্ভব ছিলো না। কিন্তু সেই দেশভাগকে কেবল ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্তি হিসেবে দেখলে তা মোটেও দেশভাগের প্রতি ইনসাফ হবে না। বরং তা ভারতীয় ন্যারেটিভ এবং তার আধিপত্যবাদী বয়ানকেই জারি রাখবে। এছাড়া মান্টো, ইসমত চুগতাই, রাজিন্দার সিং বেদি, অমৃতা প্রিতম, বিশাম শাহনি-এর মতো সাহিত্যিকদের রচনাতে দেশভাগ কীভাবে হাজির হয়েছে সেটাকে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কিন্তু গবেষণায় কোনো মেথোডলোজির উল্লেখ না থাকায় তা কিছুটা দুর্বল মনে হয়েছে। তবে দেশভাগকে প্রথমেই ধর্মভিত্তিক বিভক্তি হিসেবে স্বতঃসিদ্ধ মেনে নিয়েই গবেষণাটি সামনে এগিয়েছে। প্রশ্নটা আসলে সেখানেই। আদৌ এই বিভক্তি ধর্মকে কেন্দ্র করে হয়েছিলো কিনা সেটাকে খতিয়ে দেখা হয়নি।
২০২২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত ‘REPRESENTATION OF PARTITION IN HINDI FILMS OF THE NEHRUVIAN ERA’৫ নামক গবেষণা প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, জওহরলাল নেহেরু’র শাসনামলে দেশভাগকে কেন্দ্র করে কী ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে; এবং সেখানে দেশভাগকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, সেই আমলে দেশভাগ জনমনে সজীবতা নিয়েই বিরাজমান ছিলো। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই সময়টাতে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গঠিত হতে থাকে ‘জাতি’র ধারণা। কাজেই ঘটনা হিসেবে দেশভাগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। ভারতে আরো অনেক ভাষার চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি থাকলেও এই গবেষণাতে হিন্দি ভাষার চলচ্চিত্রকেই ‘জাতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে’ উল্লেখ করা হয়েছে। এবং ‘জাতীয়তা’র গঠন এবং তা চাউর হওয়ারও সময় ঠিক তখনই।
এছাড়া ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘Revisiting 1947 through Popular Cinema: A Comparative Study of India and Pakistan’৬ গবেষণাপত্রে দেশভাগ ও চলচ্চিত্রে তার উপস্থাপন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সাবলটার্ন স্টাডিজ-এর অন্যতম তাত্ত্বিক জ্ঞানেন্দ্র পাণ্ডে ইতিহাসকে কোনো ‘ইভেন্ট’ আকারে না দেখে বরং ‘ব্যাখ্যা’ আকারে পাঠ করার প্রস্তাবনা হাজির করেছেন। এই গবেষণাপত্রে পাণ্ডে’র তাত্ত্বিক অবস্থানকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত ’৪৭-কে একটি সুসংহত ব্যাখ্যাযোগ্যতার আওতায় আনা হয়েছে। এই গবেষণার আলোচিত বিষয়গুলো অনেক বিস্তৃতও বটে। যেখানে দেশভাগের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, লিঙ্গীয় পরিপ্রেক্ষিত, স্মৃতি ও সাহিত্যে দেশভাগের উপস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তা চলচ্চিত্রকে কেন্দ্র করেই। এছাড়া ভারত, পাকিস্তানের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে একই ঘটনার দুই ধরনের বয়ানের রাজনীতিও আলোচিত হয়েছে এখানে। এটাই এই গবেষণার আসল শক্তির জায়গা। তবে অনেকগুলো পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কিছুটা খেই হারিয়েছে গবেষণাটি।
মোটকথা, সর্বশেষ গবেষণাপত্রটিতে দেশভাগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইনসাইট পাওয়া যায়। এছাড়া বাকি গবেষণাগুলোতে কিছু না কিছু খামতি থেকেই গেছে। আর সেগুলোই কাটিয়ে ওঠার প্রয়াস থাকবে এই আলোচনায়।
তিন. পূর্বপাঠে ’৭১
২০২৫ খ্রিস্টাব্দে ‘Indian Narrative Setting of 1971 War: A Cinematic Memory Study’৭ নামে এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, মূলত তিনটি উপায়ে ভারতীয় মেইনস্ট্রিম চলচ্চিত্র ও তাদের ইন্ডাস্ট্রি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রে হিস্টোরিসিজমের মাধ্যমে হিস্টোরিগ্রাফির পুরো প্রক্রিয়াকেই বদলে দিতে চেয়েছে। প্রথমত, এসব চলচ্চিত্রে ভারতকে মানবিক এবং আবেগসম্পন্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যেনো বাংলাদেশকে তারা দয়া করছে; দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের যে লড়াই, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের অংশগ্রহণকেই ছোটো করে ফেলা হয়েছে। এবং বাংলাদেশ যে এই সংগ্রামে সক্রিয় এজেন্সি (কর্তা) হিসেবে হাজির ছিলো সেটাকে অস্বীকার করা হয়েছে; তৃতীয়ত, বণিজ্যিক ঘরানার এসব চলচ্চিত্রে এমন এক ধরনের জাতীয়তাবাদী ইতিহাস এবং বয়ান হাজির হয়েছে, যাতে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা হয়। এই গবেষণায় চলচ্চিত্রকে গুরুত্বপূর্ণ একটি সফট পাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে এই সফট পাওয়ার যে এক সময়ে ডিসকার্সিভ পাওয়ারে রূপ লাভ করে, সেটা অনালোচিত থেকে গেছে। গবেষণাতে দুইটি তত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছে—কালচারাল মেমোরি স্টাডিজ ও জাতীয় চলচ্চিত্র তত্ত্ব। দুটি তত্ত্ব শক্তিশালী হলেও এর মাধ্যমে পুরো বিষয়টিকে তুলে আনা কিছুটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। সেক্ষেত্রে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থেকেই গেছে।
২০১৫ খ্রিস্টাব্দে ‘চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব সোশাল সায়েন্সেস’ থেকে প্রকাশিত ‘(Mis)Representations of Liberation War of Bangladesh in Bollywood Films’৮ নামে গবেষণায় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জাতি ও তার আইডেন্টিটি গঠন, ধারণ ও উন্নয়ন ঘটানোর কথা বলা হয়েছে। সেই পরিসরের সংস্কৃতি, রাজনীতিকেও ধারণ করে চলচ্চিত্র। এতে স্টুয়ার্ট হল-এর ‘রিপ্রেজেন্টেশন তত্ত্ব’ ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে নমুনায়িত চলচ্চিত্রগুলোতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে যথাযথভাবে উপস্থান করা হয়নি। তবে কোনো কিছুকে বোঝার জন্য রিপ্রেজেন্টেশন তত্ত্বের মাধ্যমে কেবল এই পরিসরে আটকে থাকাটা যথেষ্ট নয়। বরং সমসাময়িক রাজনীতিতে ভারত-বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক যে ধরনের প্রভাব ফেলছে—বিশেষ করে ভারতের সাংস্কৃতিক আধিপত্য—তার একটি ক্রিটিকাল কালচারাল পলিটিকাল সুসংহত ব্যাখ্যাও জরুরি। এই গবেষণায় বলিউড ও তার উৎপাদিত পণ্যকে (চলচ্চিত্র) ভারতের (এবং ক্ষমতাধর কয়েকটি রাষ্ট্র, ভারতও সেই দিকে এগোচ্ছে) সবচেয়ে বড়ো সফট পাওয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২২ খ্রিস্টাব্দে ‘A Study on Portrayal of Bangladesh’s Liberation War in Bollywood Movies’৯ নামে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘কুইস্ট জার্নালস’-এ। এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় ‘The liberation war of Bangladesh or the Indo-Pak war of 1971’। গবেষণার ফলাফলে যদিও বলা হয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাস যথাযথভাবে উপস্থাপিত হয়নি; তথাপি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে যেভাবে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে সেটা সমস্যাজনক। কোন পদ্ধতিতে গবেষণাটি সম্পন্ন হয়েছে, তাও স্পষ্ট করা হয়নি। এছাড়া ১৯৪৭-এর দেশভাগকে মোটাদাগে হিন্দু-মুসলমান বিভক্তি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই গবেষণায় মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—চলচ্চিত্রগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার রাজনৈতিক পটভূমি এবং শর্তসমূহকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধ যে কেবল বাংলাদেশের নয় বরং ভারতের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে সেটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের যে অংশগ্রহণ, এবং তার যে সক্রিয়তা সেটাকে চলচ্চিত্রে কীভাবে উপস্থান করা হয়েছে তা আলোচিত হয়েছে। যদি মোটাদাগে বলতে হয়, গবেষণাটি ভারতের আধিপত্যবাদী ন্যারেটিভ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরো বেশি করে সেই ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করেছে।
সার্বিকভাবে এটা বলা যায়, গবেষণাগুলোর কিছু জায়গা যেমন খুবই শক্তিশালী; তবে সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতার জায়গা হলো, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদকে কালচারাল পলিটিক্সের জায়গা থেকে বিশ্লেষণ করা হয়নি। যদিও তত্ত্ব হিসেবে সেগুলোই গ্রহণ করা হয়েছে।
চলচ্চিত্র বাছাইকরণ এবং এর যৌক্তিকতা
১৯৪৭-কে মূল পটভূমি হিসেবে রেখে নির্মিত হে রাম (২০০০), পিঞ্জর (২০০৩) এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত গুণ্ডে (২০১৪), রাজি (২০১৮), রোমিও আকবর ওয়াল্টার (২০১৯) কে আলোচনার মূল টেক্সট হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। চলচ্চিত্রগুলোকে বাছাই করা হয়েছে উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নের মাধ্যমে। তবে প্রাসঙ্গিকভাবে অন্যান্য চলচ্চিত্রের আলাপও আসবে। এই টেক্সটগুলো বাছাইয়ের কারণ, একবিংশ শতকে এসে (বিশেষ করে ২০০০ খ্রিস্টাব্দের পরে) ভারতীয় জনপরিসরে বাংলাদেশ এবং তার নাগরিকদের নিয়ে কী ধরনের ন্যারেটোলোজি, কেনো এবং তা কীভাবে উৎপাদন হলো, তা খতিয়ে দেখা। এমনকি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে এর নির্মিতি কেমন, কীভাবে ঘটেছে সেটাও দেখা।
যেভাবে বিশ্লেষণ এগিয়েছে
চলচ্চিত্রগুলো বিশ্লেষণে রিপ্রেজেন্টেশন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রকে টেক্সট ধরে প্রথমে এর থিমেটিক ইনডেক্সিং করা হয়েছে। এর পর সেই থিমগুলোকে ধরে সেমিওটিক ও ডিসকোর্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে তা সাংস্কৃতিক পরিসরে কী ধরনের ক্ষমতাসম্পর্ক তৈরি এবং জারি রাখার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
রিপ্রেজেন্টেশন হলো মূলত একধরনের অর্থারোপমূলক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সেই অর্থের একটা সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করা হয়। এই জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিকতার ভেতর দিয়েই উৎপাদন হয়ে থাকে এবং কোনো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিসরে তার বিনিময় চলতে থাকে। সেই সাংস্কৃতিক পরিসরে কোনো বিষয় বা অবজেক্ট আসলে কী অর্থে ব্যবহার ও বিনিময় হবে তাও নির্ধারণ হয়ে থাকে। এটা নির্ভর করে সিগনিফাইং প্র্যাকটিসের ওপর। অর্থাৎ কোনো সুনির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিসরে এইসব সিগনিফিকেশন চলতে থাকে, এবং সেই সিগনিফায়ারের অর্থ ওই সাংস্কৃতিক পরিসরে বিরাজমান সবাইকে বুঝতে হয়। রিপ্রেজেন্টশন কার্যকর হয় ঠিক তখনই। আর এটাকে স্টুয়ার্ট হল বলেন, রিপ্রেজেন্টেশনের ‘কালচারাল সার্কিট’, মোটকথা ‘রেফারেন্ট’।
‘রিপ্রেজেন্টেশন’ মূলত তিন ধরনের হয়ে থাকে। এক. রিফ্লেকটিভ অ্যাপ্রোচ, দুই. ইনটেনশনাল অ্যাপ্রোচ এবং তিন. নির্মাণবাদী অ্যাপ্রোচ। স্টুয়ার্ট হল তার সম্পাদিত ‘রিপ্রেজেন্টেশন : কালচারাল রিপ্রেজেন্টেশন্স অ্যান্ড সিগনিফাইং প্র্যাকটিসেস’ বইয়ে এই তিন ধরনের রিপ্রেজেন্টেশনের কথাই বলেছেন।১০ তবে প্রাধান্য দিয়েছেন রিপ্রেজেন্টেশনের ‘নির্মাণবাদী অ্যাপ্রোচ’-এর ওপর। তার মতে, অর্থের পয়েটিক্স হলো রিফ্লেকটিভ এবং ইনটেনশনাল অ্যাপ্রোচ; আর অর্থের পলিটিক্স হাজির থাকে নির্মাণবাদী অ্যাপ্রোচের মধ্যে। সেই দিক থেকে বিবেচনা করলে যেহেতু এই আলোচনার উদ্দেশ্য চলচ্চিত্রের টেক্সটগুলোর একটা ক্রিটিকাল এবং পলিটিকাল পাঠ হাজির করা, তাই এতে রিপ্রেজেন্টেশন বলতে এর নির্মাণবাদী অ্যাপ্রোচকেই ব্যবহার করা হয়েছে।
... এবং সাতচল্লিশ
ক. দাঙ্গা এবং হিন্দু-মুসলমানের রিপ্রেজেন্টেশন
’৪৭-এর আলাপ চলচ্চিত্রে তুলতে গিয়ে প্রায় সব নির্মাতাই কোনো না কোনোভাবে দাঙ্গাকে প্রাসঙ্গিক করে তাদের গল্প বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দাঙ্গার সেই উপস্থাপনা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। হে রাম চলচ্চিত্রটি শুরু হয় একজন আর্কিওলোজিস্টের মহেঞ্জোদারো সভ্যতায় খনন কাজের দৃশ্য দিয়ে। ১৯৪৬-এ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কারণে আর্কিওলোজিস্ট রাম’কে সেই কাজ বন্ধ করে মাদ্রাজে ফিরে আসতে হয়। সঙ্গে ছিলেন তার সহকর্মী আমজাদ খান। ফিরে এসে তারা একটি পার্টির আয়োজন করে, সেখানে দেখা যায় হিন্দু-মুসলমানের এক সুদৃঢ় বন্ধন। পরে রাম তার প্রেমিকা অপর্নার সঙ্গে দেখা করতে যান কলকাতায়। সেখানে তিনি দাঙ্গার কবলে পড়েন এবং অপর্নাকে ধর্ষণের পর জবাই করে মুসলমান দাঙ্গাকারী। এই ঘটনার পর পরিস্থিতি এমন হয় যে, রাম চরমপন্থি হয়ে ওঠেন। গান্ধী হিন্দু হয়েও মুসলিম খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করায় তাকে হত্যা করাই হয়ে ওঠে তার একমাত্র লক্ষ্য।
শেষ পর্যন্ত গান্ধীকে হত্যা করতে রাম সদ্য বিবাহিত স্ত্রী এবং পরিবার ছেড়ে বের হয়ে আসেন। তবে গান্ধীকে আর হত্যা করতে পারেন না। উল্টো তার সংস্পর্শে এসে রামের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। পুরো চলচ্চিত্রটি মূলত রামের ’৪৭-এর দাঙ্গার ট্রমাকে কেন্দ্র করে। তবে সেখানে হিন্দু চরমপন্থিদের আলাপও এসেছে, সঙ্গে এসেছে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার আলাপও। কিন্তু সেটা মুসলমানদের আঘাত করার পরিপ্রেক্ষিতে। মানে মুসলমান আগে আঘাত করেছে, পরে হিন্দুরা প্রতিরোধ করতে গিয়েই চরমপন্থি হয়ে উঠেছে। মুসলমান নিয়ে এই ধরনের রিপ্রেজেন্টেশন ওয়ার অন টেরর-এর পরে খুবই চেনা বয়ান হয়ে দাঁড়ায়। চলচ্চিত্রটির নির্মাণকালও ঠিক এই সময়টাতেই। বলতে গেলে মোদীর হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা এবং ওয়ার অন টেররেরই ফুয়েল জুগিয়েছে হে রাম।
পিঞ্জর মূলত পাঞ্জাবি সাহিত্যিক অমৃতা প্রীতমের লেখা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। এর গল্প পাঞ্জাবকে কেন্দ্র করে। চলচ্চিত্রের শুরু হয় হিন্দুদের একটি অনুষ্ঠানের দৃশ্য দেখানোর মাধ্যমে। সেখানে নামকীর্তন করতে করতে যাচ্ছে কিছু লোক, ভয়েসওভারে এই পরিস্থিতিকেই ‘দেশ’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। গল্পটি মূলত পারো নামে এক হিন্দু নারীকে রশিদ শেখ নামে এক মুসলমানের তুলে নিয়ে যাওয়ার। পারিবারিক শত্রুতার জেরে পারোকে তুলে নিয়ে আটকে রাখেন রশিদ। পরে জানা যায়, পারোর পূর্বপুরুষ রশিদের পরিবারের এক নারীকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। যদিও সেটা দেখানো হয় না। কেবল মুসলমানের অপরাধকেই পোর্ট্রে হয়। এবং সেই মুসলমানের চাহনি খুবই নেতিবাচক! এমনকি গল্পে সব ধরনের সহিংসতা কেবল মুসলমানই ঘটিয়েছে। হিন্দু এখানে কেবলই ভুক্তভোগী। যদিও পাঞ্জাবের বাস্তবতাটা তখন আলাদাই ছিলো; কারণ ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের পরে পাঞ্জাব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়, ফলে সেখানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় হিন্দুরা নির্যাতিত হয়েছিলো। তবে সেটাই গোটা ভারতবর্ষের চিত্র নয়। কিন্তু চলচ্চিত্রে সেই সার্বিক চিত্রটা তুলে ধরা হয়নি। বরং মুসলমানকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ করে মুসলমানের সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে হিন্দু নারী। হিন্দুরা যে কেবল আঘাতকে প্রতিহত করে, সেই বয়ানকে স্টাবলিশ করে এই চলচ্চিত্র। কিন্তু উগ্রবাদ তো কেবল মুসলমান ইস্যুতে তৈরি হয় না, বরং যেকোনো জাতীয়তাবাদী বিষয়-আশয়ই এই উগ্রবাদের জন্ম দিতে পারে।
খ. জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং তার দায়
ভারতীয় উপমহাদেশে কখনোই কট্টর জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিলো না। এর উদ্ভব ঘটে মূলত কাস্ট সিস্টেম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবেই। উনিশ শতকে বৃটিশ কলোনিয়াল সময়ে এই মনোভঙ্গি চরম রূপ ধারণ করে। সেই জায়গাটাকে বিবেচনায় নিলে এ ধরনের কট্টর জাতীয়তাবাদী আচরণের দায় কলোনিয়াল শাসকের ঘাড়ে পড়তেই বাধ্য। তবে সেই সময়ে কলোনিয়াল শাসনকে রুখতে হলে জাতীয়তাবাদের উত্থানও জরুরি ছিলো। কিন্তু সেটাই বেশ উগ্র পন্থায় তুলে ধরা হয়েছে সবগুলো চলচ্চিত্রে। হে রাম-এ দেখা যায়, কলকাতায় রামের প্রেমিকার বাসার পাশে অনেক মুসলমান বাস করে; বাসাবাড়িতে কাজ করে তারা। কিন্তু দাঙ্গা লাগার পর ওই মুসলমানরাই তার প্রেমিকাকে ধর্ষণ ও জবাই করে। এর পর রাম হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতাদর্শে দীক্ষিত হন। এজন্য মুসলমানদের বিতাড়িত, প্রয়োজনে হত্যা করতে হবে। এটাই উগ্র জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়। যদিও রাম পরে তার জায়গা থেকে সরে আসেন। কিন্তু তিনি যে ভঙ্গিতে স্ত্রী, পরিবার ছেড়ে তার মিশন বাস্তবায়নে বেরিয়ে পড়েন, সেটাকে এখনকার অনেক বলিউডি চলচ্চিত্রের গোয়েন্দা এজেন্ট হিসেবে যোগদানের বিষয়টার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যায়। এসব এজেন্ট যেমন দেশকে রক্ষার জন্য এ ধরনের অভিযানে যুক্ত হয়, রাম ঠিক তেমনই ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার মিশনে নামেন। আর সেটাই তাদের কাছে ‘দেশপ্রেম’ হিসেবে হাজির হতে থাকে।
অন্যদিকে পিঞ্জর-এ উপন্যাসের মানবতাবাদী সুরকে ধরে রাখার চেষ্টা করে হলেও ভিজ্যুয়াল ন্যারেশন ও চরিত্র-নির্মাণের ভেতর দিয়ে বিভক্তি-পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশে কীভাবে জাতীয়তাবাদ হঠাৎই সহিংস, বাদানুবাদী ও লিঙ্গ-রাজনীতিভিত্তিক হয়ে ওঠে, তার তীব্র এবং আবেগময় বর্ণনা পাওয়া যায়। চলচ্চিত্রে উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রথম নির্মাণ দেখা যায়, সমষ্টিগত পরিচয়ভিত্তিক উত্তেজনার মাধ্যমে। যেখানে হিন্দু-মুসলিম জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন একসঙ্গে বসবাস করলেও রাজনৈতিক আন্দোলন, নেতাদের উত্তেজনাকর বক্তব্য এবং রাষ্ট্র-গঠনের প্রশ্নে আধুনিক জাতীয়তাবাদী কল্পনার উত্থান মানুষকে আকস্মিক বিভাজনের দিকে টেনে নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রে দেখায়, সাধারণ কৃষক, দরিদ্র পরিবার কিংবা শান্ত স্বভাবের মানুষও রাজনৈতিক আবহে দ্রুতই ‘আমরা বনাম ওরা’ বিভাজনের ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এতে ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদ এমনভাবে ঘনীভূত হয়, ব্যক্তির মানবিকতা, প্রেম, প্রতিবেশীসূলভ সম্পর্ক সবই একপ্রকার রাজনৈতিক ফ্রেমের ভেতর বন্দি হতে থাকে। আর এটাই মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদের ক্লাসিকাল লক্ষণ, যেখানে ব্যক্তি-পরিচয় বিলীন হয়ে যায় এবং প্রাধান্য পেতে থাকে ‘সমষ্টিগত আক্রমণ’ এবং ‘সমষ্টিগত প্রতিশোধ’-এর আবেগ।
পিঞ্জর-এ রশিদ ও পারোর সম্পর্কের মাধ্যমে নির্মাতা উগ্র জাতীয়তাবাদের বিপরীতে মানবিক টানাপড়েনকে উন্মোচনের চেষ্টাটা করেছেন। পারোকে রশিদ অপহরণ করে ঠিকই, কিন্তু চলচ্চিত্রজুড়ে রশিদই একমাত্র চরিত্র যিনি ‘হিংস্র মুসলমান পুরুষ’ হিসেবে নির্মিত হননি। বরং দর্শক বুঝতে পারে, তার এই কাজও বৃহত্তর রাজনৈতিক-সামাজিক শত্রুতায় নির্মিত, ন্যায়-অন্যায়ের অতিমাত্রিক এক যুক্তিতে চালিত। পারো হিন্দু পরিবার থেকে আসা এবং তার অপহরণ স্থানীয় হিন্দু সমাজের কাছে ‘মুসলমানদের আক্রমণ’-এর প্রতীক হয়ে ওঠে। মুসলমানের নেতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়। ব্যক্তিগত ঘটনা এখানে তৎক্ষণাৎ জাতীয়তাবাদী হিংসার প্রতীক হয়ে ওঠে। এবং যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়, নারী-দেহ তখন রাজনৈতিক প্রতিশোধ, জমি দখল, সম্মান-ধারণা সবকিছুর কেন্দ্রীয় প্রতীক হয়ে ওঠে। এই লিঙ্গ-রাজনৈতিক মাত্রাটি চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের জায়গা; এবং উগ্র জাতীয়তাবাদ নারীদের প্রথমে ‘সম্পদ’, পরে ‘প্রান্তিক’, এবং শেষে ‘মর্যাদার চিহ্ন’ হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে।
পিঞ্জর-এ জাতীয়তাবাদ শুধু অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ নয়, বরং সাধারণ মানুষের নীরব সম্মতি ও অন্ধ ভয়-মনোবৃত্তিতেও প্রকাশ পায়। যখন পারোর পরিবার তাকে অস্বীকার করে—সে মুসলিম যুবকের ঘরে ছিলো—তখন জাতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য যে কতোটা নির্মমভাবে মানবিক সম্পর্ককে অস্বীকার করতে পারে, তা উঠে আসে। আর এখানেই উগ্র জাতীয়তাবাদ পরিণত হয় সামাজিক বিশুদ্ধতা রক্ষার এক যন্ত্রে; যেখানে নারী পরিচয়কে ব্যবহার করা হয় সমষ্টিগত ‘হিন্দু পরিচয়’কে অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্য। এই প্রত্যাখ্যানের মুহূর্তটি চলচ্চিত্রে তীব্র মানবিক সঙ্কট আকারে হাজির হয়। বুঝিয়ে দেয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ শুধু ভৌগোলিক সীমানা টানে না, বরং পারিবারিক পরিসরেও তৈরি করে কঠিন দেয়াল। জাতীয়তাবাদ সাংগঠনিক রাজনীতির বাইরের আবেগ, গুজব ও সমষ্টিগত ভয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। তখন তা যেকোনো যুক্তিকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। ঐতিহাসিক সত্যের সঙ্গে মিল রেখে দেখা যায়, বিভক্তির আগে মানুষ প্রায় জানতোই না কার বিরুদ্ধে তারা ক্ষুব্ধ; শুধু সমষ্টিগত পরিচয়ের নামে ব্যক্তিগত শত্রুতা তৈরি হয়ে যেতো। পিঞ্জর-এ সেটাই তুলে ধরা হয়েছে।
গ. ’৪৭-এর রোমান্টিকতা ও ট্রমা
’৪৭-এর দেশভাগ নিয়ে যে দুটো চলচ্চিত্রকে মাঠ হিসেবে নেওয়া হয়েছে, প্রত্যেকটিতে এই ঘটনাকে ট্রমা আকারে হাজির হতে দেখা গেছে। এমনকি ভারতে নির্মিত বেশিরভাগ চলচ্চিত্রেই দেশভাগকে রোমান্টিসাইজ করা হয়েছে—যেনো কোনো এক দুষ্টু চক্রের ফাঁদে পড়ে দেশটা দুইভাগ হয়েছে। এবং চলচ্চিত্রে এর রিপ্রেজেন্টেশন দেখে মনে হয়, কেউ এসে ভারতকে দুইভাগ করে দিয়েছে। আর ভারত তার নাড়ি ছেঁড়া ভাইকে হারিয়েছে! এ কারণে চলচ্চিত্রের চরিত্রগুলোকে হাহুতাশ করতেও দেখা যায়। অথচ ভারত-পাকিস্তান বিভক্তি তখনকার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অনিবার্য পরিণতি হয়ে উঠেছিলো। সেটাকে অস্বীকারের কোনো উপায় নাই। কিন্তু বর্তমানে সেই স্মৃতি নিয়ে নির্মিত ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোতে এই ঘটনাকে অখণ্ডতার মোড়কে আবৃত করে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষ করা যায়। জাক দেরিদা তার ‘আর্কাইভ ফেভার’ বইয়ে বলছেন, স্মৃতি অনড় কোনো কিছু নয়, বরং তা অনবরত ডিকনস্ট্রাকশনের ভেতর দিয়ে যায়। এবং সেই স্মৃতিকে পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী কীভাবে ট্রেস বা নিশানা আকারে খুঁজে বের করা হবে সেটাই মূলকথা। তাই স্মৃতি কখনোই অতীত কিছু নয়। বরং তা সদা বর্তমানতায় হাজির থাকে এবং অসম্পূর্ণ এক জিনিস। পরিপ্রেক্ষিত এবং নিশানাই বলে দেয় স্মৃতিকে কীভাবে পাঠ করতে হবে। লালন ফকির বলেন, ‘বে-নিশানায় যদি ডাকো চিনবি কিরে কে আল্লাহ?’ তাই স্মৃতি একইসঙ্গে মজার, ট্রাজিক আবার কখনো প্রহসন হয়ে ওঠে। আর সেটাই ট্রমা আকারে হাজির হয়।
হে রাম-এ দেখা যায়, রামের পুরো জার্নিটাই ’৪৭-এর দেশভাগকে রোমান্টিসাইজ করেই আবর্তিত। শেষ বয়সে তিনি যখন মারা যান, তখনো বিয়ে, স্ত্রীর ছবি দেখতে দেখতে মৃত্যুবরণ করেন। প্রায়ই তিনি স্ত্রীর মধ্যে তার নিহত প্রেমিকার মুখাবয়ব দেখতে থাকেন, হ্যালুসিনেশনে ভোগেন। চলচ্চিত্রে রাম যখন মারা যান, তখন ৯০-এর দশক। তখনো দেশের পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে, পরিবর্তন হয়নি। সেটা তাকে আরো বেশি পীড়া দেয়। ফলে এই হ্যালুসিনেশন তার মধ্যে রোমান্টিসিজিমের ভাব নিয়ে আসে। হয়তো তিনি ভাবতে থাকেন, তখন দেশভাগটা না হলে এই পরিস্থিতি তাকে দেখতে হতো না। শেষমেশ তার মৃত্যু হয় নর্মদার ভেতরে।
এছাড়া রাম যখনই চারপাশের কারো কাছ থেকে দেশভাগের কথা শোনেন, তখনই আঁতকে ওঠেন। এটাই তার মধ্যে ট্রমা তৈরি করে! সেই ট্রমা ভয়ানক! এর প্রমাণ মেলে তার মৃত্যুদশাতেও; তখনো দাঙ্গাই চলছে! হাঙ্গেরিয়ান-কানাডিয়ান মনোচিকিৎসক ও দার্শনিক গাবোর ম্যাট বলছেন, ট্রমা এমন একটা মানসিক অবস্থা, যা আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে তৈরি হয় এবং সেই বাস্তবতায় কর্তা নিজেকে লোকেট করতে পারে না। এই যে নিজেকে লোকেট করতে না পারার ব্যাপারটা পুরোপুরি কর্তার নিজের ওপরই নির্ভর করে। তাই উল্টো করে বলা যায়, কর্তা নিজেই এই ট্রমার সৃজনকর্তা। এবং সে নিজেই ট্রমাকে লালন করতে পছন্দ করে। আর সেই ট্রমাকে জিইয়ে রাখার ভার যদি রাষ্ট্রের কাঁধে পড়ে তাহলে তো কোনো কথাই থাকে না। সেই ট্রমার রাজনীতিই ’৪৭-এর ঘটনাকে নিয়ে নির্মিত সবগুলো চলচ্চিত্রে দেখা যায়।
পিঞ্জর-এও একই ব্যাপার লক্ষ করা যায়। এখানে ট্রমা মূলত বিভক্তির সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিভাজন এবং নারী-দেহের প্রতি সামাজিক ও পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই রিপ্রেজেন্ট হতে থাকে। চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট পারোর অভিজ্ঞতাই এই ট্রমার প্রধান দৃষ্টান্ত। প্রথমে তার অপহরণ তাকে এক গভীর মানসিক ধাক্কা দেয়। কারণ ঘটনাটি ব্যক্তিগত আঘাত হলেও তিনি জানেন, এটাকে পুরো হিন্দু কমিউনিটি ‘ধর্মীয় আক্রমণ’ হিসেবেই পাঠ করবে। এই ঘটনার সমষ্টিগত অর্থ আরোপই পারোর ব্যক্তিগত ট্রমাকে আরো তীব্রতর করে তোলে।
এর পরে পারো পালাতে সক্ষম হলেও তার পরিবার জাত যাওয়ার ভয়ে তাকে গ্রহণ করে না। ঠিক তখনই দ্বিতীয় ধাক্কাটি খায় পারো। এই প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকৃতিই ‘সামাজিক ট্রমা’র নির্মম রূপ; যেখানে পারোকে তার অনিচ্ছাকৃত ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়। পরিবার ও সমাজের চোখে তিনি আর ‘শুদ্ধ’ নন; ফলে তার আঘাত দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। রশিদের মধ্যেও ট্রমার অনুরূপ ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। তার পারিবারের অতীতের কর্মকাণ্ড তাকে সহিংসতার প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ এবং সেই চক্রে আটকে রাখে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ট্রমা কেবলই হিন্দু নারীর। পার্টিশনের সময় ভারতবর্ষজুড়েই কেবল হিন্দু নয়, অসংখ্য মুসলমান নারীও একই ধরনের ট্রমার শিকার হয়েছে। তা পুরোপুরিই অনুপস্থিত এই চলচ্চিত্রে। যা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির জন্য বেশ বড়োসড়ো ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।
ঘ. ‘ইমোশনাল প্লে/গেমিফিকেশন’
খেয়াল করলেই দেখা যায়, পার্টিশন নিয়ে প্রত্যেকটি চলচ্চিত্রেই কোনো না কোনোভাবে ইমোশনকে জাঁকিয়ে তোলার প্রবণতা রয়েছে। সবগুলো চলচ্চিত্রেই একইরকম ইমোশনের রিপ্রেজেন্টেশন আছে। আর সেই ইমোশনের বশবর্তী হয়েই সবগুলো চরিত্রের কৃতকর্ম আবর্তিত হতে থাকে। দেশকে ভালোবাসার ইমোশন থাকবেই, কিন্তু দেশভাগ মোটেও এই ইমোশনকে কেন্দ্র করে হয়নি। বরং তার একটা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জরুরতও ছিলো। কিন্তু চলচ্চিত্রগুলোতে সেটাকে কেবল হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার ওপরই ভর করে ডিল করেছে নির্মাতারা। আর সমাধান খুঁজেছেন এই ইমোশনের ভেতরেই। এখন বিবেচ্য হলো, এই ইমোশনের রাজনীতিটা কোথায়? এই ইমোশন মূলত দেশকে একত্র করে রাখার ইমোশন, যা ‘অখণ্ড ভারতে’র বাসনাকেই প্রতিফলিত করতে থাকে। একবিংশ শতকে এসে এই ধরনের ইমোশনের উপস্থাপন স্পষ্টতই সেই ইঙ্গিতই দেয়। এটাকে পুঁজি করেই ‘ভারত-মাতা’কে বিভক্তি থেকে রক্ষার সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বাসনাও উঠে আসতে থাকে।
হে রাম-এ রামের ইমোশনকে কেন্দ্র করেই গল্প আবর্তিত হয়। ‘ভারত-মাতা’কে বিভক্তি থেকে রক্ষার ‘মহান’ ব্রত নেন তিনি। ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠাই যার মূল লক্ষ্য। কিন্তু গান্ধী খোদ হিন্দু হয়েও যখন মুসলমানের খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেন, তখন সেই ইমোশন চরম জাতীয়তাবাদে রূপ নেয়। এবং হিন্দু হয়ে হিন্দু রাষ্ট্রের বিরোধিতার জন্য তাকে হত্যা করতে চান রাম। আবার রামের পার্টিশন সংক্রান্ত যাবতীয় ইমোশনই কাজ করে তার প্রেমিকা অপর্নাকে কেন্দ্র করে। যাকে মুসলমানেরা হত্যা করে। আর সেই আবেগই তাকে চরমপন্থি করে তোলে। এর মধ্য দিয়ে এমন এক রাষ্ট্রের কল্পনা তৈরি হয়, যেখানে কেবলই হিন্দু থাকবে। আর কোনো অপর্না হত্যাকাণ্ডের শিকার হবে না। কিন্তু বাস্তবতা মোটেও তা নয়। ভারতে এখনো অসংখ্য হিন্দু নারী ধর্ষণের শিকার হয়, খোদ হিন্দুদের মাধ্যমে। কাজেই এই ধরনের মনোভঙ্গি কেবল ইমোশনের ব্যাপার নয়, বরং রাজনৈতিক। ইমোশনের আড়ালে ‘শুদ্ধ হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করাই এর মূল লক্ষ্য।
পিঞ্জর-এ ‘লাভ জিহাদের’ ব্যাপারটা স্পষ্ট না হলেও পারোকে তুলে নিয়ে গিয়ে রশিদের বিয়ে করার মধ্য দিয়ে তার কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পারো ও রশিদের এই সম্পর্ক আবেগ-রাজনীতির মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তারা ভিন্ন ধর্মের হলেও পারস্পরিক বিশ্বাস, যত্ন ও মানবিকতায় যে বন্ধন তৈরি হয়, তা রাজনৈতিকভাবে বিভক্তির অসারতাকে তুলে ধরে। দর্শককে আবেগীয় করে বোঝানো হয়, সীমান্ত ও জাতিগত বিভাজন ব্যক্তিগত জীবনের যাবতীয় সত্যাসত্য ও মানবিকতাকে নষ্ট করে। কিন্তু এই আবেগের ভেতর দিয়েই এক ধরনের মানবিক ‘অখণ্ডতা’র বোধ তৈরি করা হয়। যেখানে ধর্মীয়, রাজনৈতিক বিভেদরেখা নয়, বরং মানুষের সহাবস্থানই মূল। এই আবেগই পরোক্ষভাবে ‘অখণ্ড ভারতের’ সাংস্কৃতিক কল্পনাকে টিকিয়ে রাখে।
ঙ. নারীর প্রতি সহিংসতা ও তার আইডেন্টিটি ক্রাইসিস
ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো ধরনের সহিংস আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি সহিংসতার শিকার হয় নারী। কাজেই পার্টিশনও এর ব্যতিক্রম ছিলো না। নারীকে অরক্ষিত করে তোলার মধ্য দিয়েই নানা ধরনের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আয়োজন চলতে থাকে। আর এই ডামাডোলে সবচেয়ে বেশি সহিংসতা এবং হুমকির মুখে পড়ে নারী আইডেন্টিটি। তবে সেটার রিপ্রেজেন্টেশন কেমন, বিশেষ করে ’৪৭-কে কেন্দ্র করে নির্মিত চলচ্চিত্রে—সেটাই মূল প্রশ্ন। হে রাম-এ নারীর (অ)আইডেন্টিটির নির্মাণ হয় তিনভাবে। প্রথমত, দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িকতার সময়ে নারী-দেহের রাজনীতিকরণ; দ্বিতীয়ত, পুরুষ নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী প্রকল্পে নারীর নীরব ভূমিকা এবং বলতে গেলে অদৃশ্যতা; তৃতীয়ত, নারীর মানবিক সহাবস্থান ও অহিংসার যে সম্ভাবনা তার প্রতিনিধিত্ব করা।
রামের প্রেমিকা অপর্না, এমনকি রাম নিজেও অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু দাঙ্গার কারণে প্রথমেই আঘাত আসে অপর্নার ওপরে। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। যেমনটা শুরুতেই বলা হয়েছে। অপর্নার এই মৃত্যু রামকে ট্রমাটাইজ করে ফেলে। তিনি চরমপন্থি হয়ে ওঠেন। তার মানে নারী এখানে মোটেও অরাজনৈতিক নয়, বরং তার শরীর রাজনৈতিকতার বড়ো একটা অংশ হয়ে ওঠে। এবং সেটাকে ভোগ্য হিসেবেই বিবেচিত হতে থাকে। নারীর শরীরকে নিয়েও চলতে থাকে রাজনীতি। এর ভেতর দিয়ে নারী তার আইডেন্টিটি হারাতে থাকে। যদিও তার শরীর রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়। এছাড়া অপর্নাকে কেবল রামের প্রেম-বাসনার অবজেক্ট হিসেবেই তুলে ধরেছেন নির্মাতা। এর বাইরে নারীর আর কোনো পরিচয় নেই। এছাড়া প্রেমিকার মৃত্যুর পরে রাম যে নারীকে বিয়ে করেন, তাকেও তার স্ত্রীর যোগ্য সম্মান দিতে পারেন না একটা সময় পর্যন্ত। এবং সেখানে নারী কেবল স্বামীর দাসী হয়েই থাকে। বিভাজন-সংক্রান্ত সহিংসতা এবং রাজনৈতিকতাতে নারীর কোনো ধরনের অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হয় না। রামের স্ত্রীর গান্ধী-ভক্তির ফলে তাকে হয়তো কিছুটা রাজনৈতিক মনে হয়, কিন্তু সেখানে কেবলই অন্ধত্ব ভর করে বসে।
পিঞ্জর-এর বয়ান কিছুটা ভিন্ন। সেখানে মূল চরিত্রই নারী। নারী আইডেন্টিটি এমনভাবে সেখানে নির্মাণ হতে থাকে, পার্টিশন, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, এবং পরিবার-সমাজের সম্মান ও রাজনীতি মিলে নারীর অস্তিত্বকে একাধিক অর্থে ভঙ্গুর ও অরক্ষিত করে তোলে। পারোর অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায়, নারী আইডেন্টিটি কেবল ব্যক্তিক নয়, বরং পরিবার, সমাজ, জাতি ও ধর্মের প্রতীকী ভার বহন করে। এবং এইসব স্পেকটাকলের মধ্যস্থতার ভেতর দিয়েই নির্মাণ হতে থাকে। পারোর অপহরণের পর সমাজ তাকে ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং তার শরীরকে ‘জাতিগত সীমা লঙ্ঘন’-এর অবস্থান থেকে দেখে। ফলে নারী আইডেন্টিটি এখানে সরাসরি জাতিগত (কাস্ট) সম্মান, পবিত্রতা এবং জাতির সীমানা রক্ষার রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। চলচ্চিত্রে পারো পরিবারের কাছে ফিরলেও জাত হারানোর ভয়ে তাকে প্রত্যাখ্যানের শিকার হতে হয়, ফলে তা ভিন্ন কোনো চিত্র হাজির করে না। অর্থাৎ নারীর ব্যক্তিসত্তার আর কোনো মূল্যই থাকে না। আর এখানেই চলচ্চিত্রটি ভারতীয় উপমহাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজের নির্মমতাকে আরো বেশি স্পষ্ট করে তোলে।
অন্যদিকে রশিদের বাড়িতে পারো নতুন ধরনের পরিচয় লাভ করে। তার নতুন নাম হয় হামিদা। কিন্তু তিনি সেটা গ্রহণ করতে রাজি হন না। রশিদ তা বুঝতে পেরে, তার ওপর আর কিছু চাপিয়েও দেন না। ফলে সেখানে তিনি নিপীড়িত নন, বরং মানবিক সম্পর্কের অংশ হয়ে ওঠেন। দিনশেষে এটা স্পষ্ট যে, নারীকে অরাজনৈতিক হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও রাজনৈতিকতার ভেতর দিয়েই তার শরীর এবং আইডেন্টিটি খোদ রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। পুরো চলচ্চিত্রে মুসলমানকে মিস-রিপ্রেজেন্ট করা হলেও এখানে নির্মাতা নারী আইডেন্টিটি নির্মাণে মুসলমানের ভূমিকাকে বেশ সিদ্ধহস্তেই তুলে ধরেছেন। তবে খেয়াল করার বিষয় হলো, চলচ্চিত্রে যেসব নারী নির্যাতনের শিকার হয়, তারা সবাই হিন্দু। সেই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একাই দাঁড়ান রশিদ। পারোকে তুলে আনার অপরাধবোধ থেকে তিনি তার আইডেন্টিটি নিয়ে কখনোই প্রশ্ন তোলেন না।
... এবং একাত্তর
ক.‘মুক্তিযুদ্ধ’ নাকি ‘ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ’ : কর্তাসত্তার খোঁজে
নমুনায়িত তিনটি চলচ্চিত্রেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেনো সেখানে বাংলাদেশের জনগণের কোনো অংশগ্রহণই নেই। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সাবজেক্টিভিটিকেই নাকচ করা হয়েছে এসব চলচ্চিত্রে। বিপরীতে দেখানো হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে মূলত ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে। এবং ভারতের জয়ের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। যা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে রিপ্রেজেন্ট তো করেই না, উল্টো পুরোপুরি মুক্তিযুদ্ধকেও খারিজ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। এবং পাকিস্তানকে হারিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভারত তার সুপার ইগোকেই উদযাপন করতে থাকে। মজার ব্যাপার হলো, ভারত তার সুপার ইগোকে জারি রাখতে গিয়ে বা উদযাপন করতে গিয়ে পাকিস্তানকেও তার সমকক্ষ অলটার সুপার ইগো হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে। তাই লড়াইটাও তখন চলে সুপার ইগো-সুপার ইগোর মধ্যে। এবং চলচ্চিত্রগুলোতে দেখানো হয়, পাকিস্তানও একইভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র বলেই চালিয়ে দিচ্ছে। ফলে দুটি রাষ্ট্রেরই মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে একই ধরনের বাতিক লক্ষ্য করা যায়—একজনের ওপর আরেকজনের আধিপত্যের প্রতিষ্ঠা। আর সেটা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ এবং এর ফলে বাংলাদেশের মানুষের তৈরি হওয়া সাবজেক্টিভিটিকেই অস্বীকার করা। আর সেটারই ভিজ্যুয়াল রিপ্রেজেন্টেশন প্রায় সবগুলো চলচ্চিত্রেই উঠে এসেছে।
গুন্ডেতে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া দুই বন্ধু বিক্রম আর বালা ছেটো থাকা অবস্থাতেই রিফিউজি ক্যাম্প হয়ে ভারতে প্রবেশ করে। চলচ্চিত্রের শুরুতে ভয়েসওভারে বলে নেওয়া হয়, বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ‘ভারত-পাকিস্তানের তৃতীয় যুদ্ধ’। মজার ব্যাপার হলো, জন্ম বাংলাদেশে হওয়ার পরও ওই দুই বন্ধু হিন্দি ভাষায় কথা বলে। যেনো বাংলাদেশের মানুষের ভাষাও হিন্দি! অথচ এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই ৫২’র ভাষা আন্দোলন করেছে বাংলাদেশের নাগরিক। এবং বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আরো একটি ব্যাপার, চলচ্চিত্রজুড়ে শুরুতেই কেবল গুটিকয়েক ফুটেজের মাধ্যমে যে ‘মুক্তিযুদ্ধ’কে স্টাবলিশ করা হয়, পরে পুরো চলচ্চিত্র তথা ওই দুই বন্ধুর মানস গঠনে এবং তাদের যাবতীয় আচরণে পদে পদে ওই প্রভাব হাজির করেন নির্মাতা। কিন্তু যে ঘটনাটি ওই দুইজন ব্যক্তির জীবনে এতো গুরুত্বপূর্ণ, সেটারই স্টাবলিশমেন্ট করা হয় গুটিকয়েক ফুটেজে! আবার ওইসব ফুটেজ এবং ওই দুই বন্ধুর ভারতে পালিয়ে আসার ফলে মুক্তিযুদ্ধে কেবল হিন্দুরাই নির্যাতিত হয়েছে এবং দেশ ছেড়েছে এটাও স্টাবলিশমেন্ট পাওয়ার প্রবল আশঙ্কা থেকে যায়। যেটা আবার মোদীর ‘হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পে কাজে লাগে।
বিক্রম আর বালা ভারতে রিফিউজি হিসেবে ঢোকার পর নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হতে থাকে। একপর্যায়ে তারা ব্যবসার দিকে ধাবিত হয় এবং পরে ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে নেয়। তাদের নতুন নাম হয় বিক্রম বোস ও বালা ভট্টাচার্য। এর আগে চলচ্চিত্রর ২৮ মিনিটে ২০ সেকেন্ডের দেখা যায়, বিক্রম-বালা একজন কয়লা ব্যবসায়ীকে হত্যা করে তার ব্যবসা দখলে নিচ্ছে। তখন ওই কয়লা ব্যবসায়ী তাদেরকে তাচ্ছিল্য করে এভাবে :
বালা : বল! এই ট্রেন (কয়লার ট্রেন) কার?
দিবাকর (কয়লা-ব্যবসায়ী) : আমার! ট্রেন আমার ছিলো, আমার আছে আর আমারই থাকবে। এটা কখনোই তোদের হতে পারে না। কারণ কী জানিস? তোরা হলো বাংলাদেশি রিফিউজি!
বালা : আমরা রিফিউজি না (দিবাকরের গলা চেপে ধরে)! আমরা হিন্দুস্তানী!
বিক্রম : তোরা লাইন (বর্ডার) বানালে সেটা দেশ। আর সেই দেশ তোদের। আমরা লাইন অতিক্রম করলেই শরণার্থী! এই লাইন কি আমরা বানিয়েছি? কিন্তু এখন এই লাইনটা আমরা টানবো। আমাদের আওয়াজের প্রথম মঞ্চ হবে কলকাতা।
এখানেই আইডেন্টিটি ধারণ এবং কর্তাসত্তার প্রশ্নটা গুরুত্ব সহকারে তুলতে হয়। বিক্রম আর বালার জন্ম বাংলাদেশে তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। অথচ সেই আইডেন্টিটির আলাদা বৈশিষ্ট্য তো দূরে থাক, উল্টো তারা যখন হিন্দিতে কথা বলে, তখন তাদের মানস গঠনেও ভারত তথা হিন্দুস্তানের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। অথচ এই ‘হিন্দুস্তান’কে যদি সমগ্র ভারতবর্ষ অর্থেও ধরে নিই, তবুও সেটার প্রাসঙ্গিকতা ’৪৭-এর পরে আর তেমন থাকেনি। ’৪৭-এর পরে অন্তত বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানকে আর ‘হিন্দুস্তান’ বলা চলে না। আর যখনই ‘হিন্দুস্তান’ শব্দটা আরোপিত হতে থাকে, তখন সেটা মোদীর ‘অখণ্ড ভারত’ অর্থেই ব্যবহৃত হয়। আর বাংলাদেশের ওপর যখন এটা চাপানো হবে, বা চলচ্চিত্রে যেভাবে চাপানো হলো, তখন ওই অর্থেই তাকে বুঝে নেওয়ার জরুরত আছে। কারণ ভারত মনে করে, বাংলাদেশ হলো ভারতেরই আরেক ভাই, যাকে পাকিস্তান ছিনিয়ে নিয়েছিলো। বাংলাদেশ এতোটাই সাধাসিধা যে নিজের আইডেন্টিটিই সে বুঝে না। এবং চলচ্চিত্রে বিক্রম-বালা’র মানসিক গঠনকে ব্যাখ্যা করতে ভয়েসওভারে যখন বলে নেওয়া হয়, ‘বিক্রম আর বালার সঙ্গে যা হলো তা ঠিক না বেঠিক তা তারা বুঝে উঠতে পারে না’, তখন ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। অর্থাৎ বাংলাদেশি কর্তাসত্তাকেই পুরোপুরি খারিজ করে দেওয়া হয়! এবং চলচ্চিত্রটিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিন্তান বা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেও বিক্রম-বালা নিজেদেরকে মনেপ্রাণে ‘হিন্দুস্তানী’ দাবি করে বসে!
আর এই ‘হিন্দুস্তানী’ মনোভঙ্গি গঠনের কেন্দ্র ছিলো কলকাতা। আবার নতুন করে সেটাকেই যখন বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করা দুজন নাগরিক তাদের ‘আওয়াজের প্রথম মঞ্চ’ বানাতে চায় তখন ব্যাপারটাকে আরা বেশি জটিল বা ক্রিটিকাল লেন্স দিয়ে পাঠের দরকার পড়ে। ১৯ শতকের উপনিবেশিত ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হলো কলকাতা। এবং বাঙালি ধারণার গঠনও হতে থাকে তখনই। এবং তখন এই ‘বাঙালি’র সংজ্ঞায়ন হয়—হিন্দুরা হলো বাঙালি। ’৪৭-এর পরে একাত্তর ঘটে গেছে, কিন্তু এই চিন্তা-ভাবনার কোনো ধরনের পরিবর্তন নাই। মুসলমানও যে বাঙালি, সেটা কলকাতা স্বীকারই করে না। সেটা করতে গিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক ধারণার উদ্ভবও হয়েছে। এখন ব্যাপার হলো, যে কলকাতা হিন্দু বাদে অন্যান্য বিশেষ করে মুসলমানদেরকে বাঙালিই ভাবেনি, সেই কলকাতাকেই যখন ‘আওয়াজের প্রথম মঞ্চ’ বানানোর তাগিদ অনুভব করে বাংলাদেশে জন্মানো দুজন নাগরিক, সেটাতে যে নিঃসন্দেহে ভারতীয় ‘হিন্দুত্ববাদে’র প্রভাব আছে তা হলফ করেই বলা যায়। আবার সেটাকে অখণ্ডতা দেওয়ার জন্য বর্ডারের নেতিবাচকতাকেও নেতিবাচকভাবেই বিক্রম-বালার মুখ দিয়ে বের করে নেন নির্মাতা। আর এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশি আইডেন্টিটি এবং কর্তাসত্তাকেও নাকচ করে দেওয়া হয়।
কয়লা চোরাচালানসহ নানা অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে কলকাতায় মাফিয়াতন্ত্র কায়েম করে বিক্রম-বালা। এবং চলচ্চিত্রজুড়েই তাদের উপস্থাপনা নেতিবাচক। তাদেরকে হয়তো দূর থেকে দেখলে মায়া জন্মায়, কিন্তু তারা সন্ত্রাসী এটাই তাদের শেষ পরিচয়। যেনোবা বিক্রম-বালার ভেতরে যে অখণ্ড সত্তা, সেটা ভারত এবং এর বাইরে তাদেরকে যে দমন করা হয়, সেটা যেনোবা ভারত রাষ্ট্র হিসেবে তার করণীয়। ফলে একইসঙ্গে বিক্রম-বালার প্রতি নির্মাতা একটা সফট-কর্নার তৈরি করেন। একইসঙ্গে ভারতীয় অখণ্ডতার গল্প বলার জন্য আবার তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করা হয়, হত্যা করা হয়; কারণ এটাও দেখাতে হবে যে, ভারত রাষ্ট্র হিসেবে কতোটা সফল এবং সেই সফলতার মাপাকাঠি ‘জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমন’। বিক্রম-বালাকে হত্যার মাধ্যমে ভারত রাষ্ট্রের লিগ্যাল সিস্টেম, ল অ্যান্ড অর্ডারেরই সার্বভৌম ক্ষমতা কায়েম হয়। আর সেটাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার।
রোমিও আকবার ওয়াল্টারও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে গল্প বলার ধরন আলাদা। রহমতুল্লা আলী ওরফে রোমিও একজন ব্যাংকার। খুবই সাদামাটা জীবন তার। পরিবারে সদস্য বলতে একমাত্র মা। বাবা সুবেদার গুলরেজ আলী ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে চিন-ভারত যুদ্ধে শহীদ হন। তারই জের ধরে তাকে র’তে (রিসার্চ অ্যান্ড এনালিসিস উইং) যোগদান করতে বলা হয়। অনেক দ্বিধান্বিত থাকার পর তিনি র’তে যোগ দেন। তার কাজ হলো, পাকিস্তানে প্রবেশ করে পাকিস্তানের বাংলাদেশ আক্রমণের যে নীলনকশা তা র’এর কাছে তুলে ধরা।
চলচ্চিত্রের শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটা ফুটেজ দিয়ে, যেখানে দেখা যায় পাকিস্তানের আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশের হাজারো মানুষ ভারতে অনুপ্রবেশ করছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ এবং ইন্দিরা গান্ধীকে এক ঝলক দেখানোর পর ভয়েসওভারে বলা হয়, ভারত বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। এবং এই যুদ্ধে একজন ভারতীয় র-এর এজেন্ট কীভাবে জীবন বাজী রেখে সেই কাজটা করে যায়, সেটাই চলচ্চিত্রে তুলে ধরা হয়। এখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো উপস্থাপনই চোখে পড়ে না। শেষমেশ ভারত যখন পাকিস্তানের পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে দিতে সক্ষম হয়, তখন কেবল দেখানো হয়, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল নিয়াজী মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন।
বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের নাগরিকের যে রাজনৈতিক কর্তাসত্তার নিত্য-উপস্থিতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিলো এবং সেটা একটা রাজনৈতিক কর্তাসত্তা আকারে হাজিরও হয়েছিলো, সেই সমূহ সম্ভাবনাকেই নাকচ করে দেয় এই চলচ্চিত্র। কারণ সেখানে আকবারের গোয়েন্দা কার্যক্রমের সফলতার ফলেই জেনারেল নিয়াজী মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করছেন। আর আকবার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হয়ে গোপনে ভারতের এজেন্ট হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন। একটি দৃশ্যে দেখানো হয়, আকবার তার অফিসকক্ষ থেকেই ভারতের পতাকাকে স্যালুট জানাচ্ছেন। আর এর মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রের সমাপ্তি হয়। যা স্পষ্টতই ভারতেরই বিজয়কে উপস্থাপন করে। মানে বিজয়টা বাংলাদেশি জনগণের নয়, ভারতের। যা এখানেও বাংলাদেশের জনগণের কর্তাসত্তাকেই খারিজ করে।
রাজিও একই ধরনের বয়ান হাজির করে। রাজি মূলত হারিন্দার এস. সিক্কা নামের একজন সাহিত্যিকের লেখা ‘কলিং সেহমাত’ (২০০৮) উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। মূলত ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্বের একটা পোর্ট্রে আমরা পাবো চলচ্চিত্রটিতে। এবং পাকিস্তানের গোপন তথ্য জানার জন্য ভারত সেহমাতকে গুপ্তচর হিসেবে পাকিস্তানে প্রেরণ করে। যাতে করে তারা পাকিস্তানের গোপন পরিকল্পনা জানতে পারে এবং পূর্ব-পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পারে। আর এই চলচ্চিত্রে সেহমাত খান নামের একজন কাশ্মিরি নারী হলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার বাবা হিদায়েত খান ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর গুপ্তচর। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার (ফুসফুস-এ টিউমার) কারণে সেই কাজের দায়িত্ব এসে পড়ে সেহমাতের ওপর। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেহমাতের বিয়ে হয় তার বাবার পাকিস্তানী বন্ধু বিগ্রেডিয়ার পারভেজ সৈয়দ-এর ছোটো ছেলে ইকবাল সৈয়দের সঙ্গে। এবং সেখানে থেকেই গুপ্তচরবৃত্তি করতে থাকেন তিনি। বিয়ের পরে তিনি নানাভাবে পাকিস্তানের গোপন খবর র-এর কাছে পাঠাতে থাকেন। এবং শেষ পর্যন্ত ধরা পড়েও কোনোভাবে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। এর মধ্যে তার বাবা মারা যান।
চলচ্চিত্রটির প্রথমেই বলে নেওয়া হয়, এটা উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত। কিন্তু চলচ্চিত্রটির শেষে এসে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে সেটাকে অনেকটাই সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এবং যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্রটি নির্মিত সেটা হলো সেহমাতের দেওয়া শেষ বার্তার ফলে ভারত চট্টগ্রাম বন্দরের কাছেই বিশাখাপট্টমে পাকিস্তানের বিশাল এক সাবমেরিন (PNS-Gazi) ধ্বংস করতে সক্ষম হয় এবং যার ফলে পাকিস্তান দুর্বল হয়ে পড়ে।
কিন্তু পুরো চলচ্চিত্রের মূল নিয়ন্ত্রণ-ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু সেটা যেনো কেবলই ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যেই হয়েছে—এমনটা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। যুদ্ধের কর্তা যেনো ভারত আর পাকিস্তান। অথচ বাংলাদেশের তাতে ন্যূনতম অংশগ্রহণও লক্ষ কার যায়নি। ফলে বাংলাদেশের মানুষের গণঅংশগ্রণের ফলে তার যে কর্তাসত্তার উন্মেষ সেটাকেই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে রাজিতেও। চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে এসে সেটা আরো বেশি করে স্টাবলিশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সেহমাতের দেওয়া তথ্যের ফলে পাকিস্তানের বড়ো একটি সাবমেরিন ভারত ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। পরে সেহমাত পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে তার বাসায় অবস্থান করেন।
সেহমাত ঘরে একা বসে আছেন আর টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করছে। তার মানে পুরো ঘটনাটাকে যদি কনসিকোয়েন্স অনুযায়ী সাজানো যায় তাহলে ব্যাপারটা এমন যে, সেহমাতের ভূমিকা বংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ ভারতীয় নাগরিক হয়েও বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের জন্য সেহমাতের মতো একজন নারী তার জীবন বাজি রাখছেন। কিন্তু এই ঘটনার আড়ালে যদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কর্তাসত্তাকেই গায়েব করে দেওয়া হয় এবং সেখানে ভারত ও তার নাগরিকের অবদানকেই প্রাধ্যান্য দেওয়া হয়, সেটা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কারণ সেখানে তদের ভূমিকাটা সহাবস্থানের। কিন্তু মূল গণসার্বভৌমত্বের দাবি তো বাংলাদেশের জনগণের। কাজেই সেখানে বাংলাদেশের জনগণই কর্তা। কিন্তু চলচ্চিত্রটির ঘটনার যে পরম্পরা, সেটা দেখলে সেই কর্তার আসনে কেবল ভারতই বসে। আর চির-শত্রুতে পরিণত হয় পাকিস্তান। এবং ফলে যুদ্ধটাও হয়ে যায় ভারতের এবং তার বিপক্ষ হয় পাকিস্তান। আর তা পাকিস্তানের বিপক্ষেই স্টাবলিশমেন্ট পায়। আর মাঝখান থেকে গড়হাজির হয়ে যায় বাংলাদেশ, তার জনগণ, তার গণসার্বভৌমত্ব, তার মুক্তিসংগ্রাম এবং পুরো বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার কর্তাসত্তার উপস্থিতি।
খ. ভরতের জয় এবং তাদের আত্মত্যাগ
মোদ্দা কথা যদি বলা হয়, তাহলে তিনটি চলচ্চিত্রেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে কেন্দ্রে রেখে ভারতের গৌরব-গাথাকেই পোর্ট্রে করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে পুরোপুরি অনুপস্থিত। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান কেবল প্রথম দুই-একটা দৃশ্য আর শেষে দুই-একটা দৃশ্য দিয়েই শেষ করা হয়েছে। এর বাইরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনো অস্তিত্বই নাই।
গুন্ডেতে প্রথমেই বলে নেওয়া হয়, এই যুদ্ধ আসলে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ। এর পরে এই যুদ্ধ নিয়ে আর কোনো কথা বলা হয়নি। কেবল দেখানো হয়েছে, যুদ্ধ হচ্ছে; দুটো ছেলে রিফিউজি ক্যাম্পে এসে ভারতে থেকে গেলো এবং সেখানেই কষ্ট করে একটা সময় পুরো কলকাতার মাফিয়া বনে গেলো। চলচ্চিত্রে এই দুই চরিত্রের রিপ্রেজেন্টেশনও নেতিবাচক, যেনো বাংলাদেশের নাগরিকরাই একেকজন সম্ভাব্য গুন্ডা।
গুন্ডেতে আরো দেখানো হয়, বাংলাদেশের জনগণকে রিফিউজি ক্যাম্প মানে ভারতে পাঠাতে ভারত ও তাদের সৈন্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায়। এখন এই অবদানটা অস্বীকার করার মতো কিছু নয়। বাংলাদেশের জনগণের যে মুক্তিসংগ্রাম সেখানে ভারতের ভূমিকা যে নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেই সংগ্রামের কেন্দ্র হলো বাংলাদেশের জনগণ। তারা তাদের স্বাধিকার চেয়েছে বলেই মুক্তিগ্রাম সম্ভব হয়েছিলো। অথচ এই চলচ্চিত্রে সেই উপস্থাপনাটাকেই বাদ দেওয়া হয়েছে। একপাক্ষিক এই উপস্থাপনে যখন ভারতের অবদানকেই বড়ো করে দেখানো হয়, তখন তাদের ‘আত্মত্যাগ’ই একমাত্র বিষয় হয়ে ওঠে। আর চলচ্চিত্রে এটাও দেখানো হয়, মুক্তিযুদ্ধটা আসলে পাক-ভারত যুদ্ধ। এখানে তারাই কর্তা এবং তাদের আত্মত্যাগের ফলেই বাংলাদেশ নামে একটি দেশের জন্ম হয়েছে। ফলে মুক্তিুযুদ্ধের যে গৌরবময় মাহাত্ম্য, সেটাকেও এককভাবে কুক্ষিগত করতে চায় ভারত।
অন্যদিকে রোমিও আকবার ওয়াল্টার-এ র-এর একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশের জন্য (পাঠ করুন ভারতের বিজয়ের জন্য) জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানে গিয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতে থাকেন। জীবনের তোয়াক্কা তিনি করেন না। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি মাকে একা রেখে পাকিস্তানে চলে যান। ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক, আবেগ, ভবিষ্যৎ-ভাবনা সবকিছুই যেনো এই উদ্দেশ্যের কাছে খুবই ঠুনকো। যেনো দেশই একমাত্র মাকসাদ তার। এবং দেশকে রক্ষা করতে গিয়ে জীবন বাজি রাখেন তিনি। আবেগ, অনুভূতি, মানবীয় সব সম্পর্ককে জলাঞ্জলি দেন। লক্ষ্য একটাই ভারতকে রক্ষা করতে হবে।
প্রথম দৃষ্টিতে এই বিষয়টিকে বেশ ইতিবাচক মনে হতে পারে, কারণ ভারতীয় একজন খুবই সাধারণ নাগরিক বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে নিজের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানে গিয়ে গোপন খবরাখবর ভারতে পাঠাচ্ছেন। এবং ভারত সেটাকে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে সাহায্য করে যাচ্ছে। কিন্তু ব্যাপারটা এতো সরল নয় মোটেও। চলচ্চিত্রের ভিজ্যুয়ালের ভেতরেই তার ইঙ্গিত আছে। মানে গোপনীয়তা নাই, একেবারে স্পষ্ট করেই ভারত এটা বলে দিতে চায়, এই ন্যারেটিভ হাজির করতে চায় যে, একাত্তরে যে যুদ্ধ হয়েছে সেটা আসলে পাক-ভারত যুদ্ধ এবং সেখানে আসলে ভারতই বিজয় অর্জন করেছে। এবং এটা করতে গিয়ে ভারতকে অনেক জীবন উৎসর্গও করতে হয়েছে। নানাভাবে পাকিস্তানের ভেতর থেকে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে তাদের গোপন তথ্য বের করে আনতে হয়েছে।
মোটকথা, ভারত কেবলই বাংলাদেশেকে সহযোগিতা করেনি। বরং এই গোটা অর্জনটাই আসলে ভারতের। আর ভারত না থাকলে সেই বিজয়ের মুখ বাংলাদেশ কখনোই দেখতে পারতো না। এতোগুলো কথা বলার কারণ হলো, চলচ্চিত্রটি যখন শেষ হয়, একেবারে শেষ দৃশ্যে দেখা যায়, পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে। বাংলাদেশ নামক একটি দেশের জন্ম হয়েছে। পাকিস্তান আত্মসমর্পণও করে ফেলেছে। ঠিক তখনই আকবার দাঁড়িয়ে ভারতের পতাকাকে স্যালুট করেন। এখানেই শেষ হয় চলচ্চিত্র।
এখন ব্যাপার হলো, এই দৃশ্যের সঙ্গে আরো অনেকগুলো হিসাবনিকাশ জড়িত। কেবলই খেলো কোনো দৃশ্য এটা নয়। বরং বিজয়ী যে ভারত তার মেটাফরিক উপস্থাপনা এটা, এবং খোদ আকবার হলো ভারত রাষ্ট্রের সেই মেটাফোর, যা সেই ত্যাগ, আত্মত্যাগকে ধারণ করতে থাকে। তখন সেই বিজয়টা আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার চিন্তায় আবদ্ধ থাকে না, হয়ে ওঠে ভারতের বিজয়ের বয়ান। যেনো এর মধ্য দিয়ে ভারতই বিজয়ী হলো। এবং চলচ্চিত্রে এমন মনোভঙ্গিও লক্ষ্য করা যায়, এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও তা ভারতেরই অধীন থাকবে। এবং এই স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ভারতের অবদান সবচেয়ে বেশি, বলতে গেলে পুরোটা তাদেরই কৃতিত্ব!
রাজিও একই ঘরনার চলচ্চিত্র বলা চলে। সেখানে একজন ভারতীয় নারী কীভাবে তার জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানে গিয়ে তাদের গোপন খবর ভারতের র-এর কাছে পাঠায়, সেই গল্পই বলা হয়েছে। এতে তার জীবনের ঝুঁকি, বাবার মৃত্যু, একাকিত্ব সবই পোট্রে করেছেন নির্মাতা। অথচ যে বিষয় মানে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র সেটাই পুরোপুরি অনুপস্থিত! কেবল ভারত কীভাবে পাকিস্তানকে পরাজিত করে তাদের গোপন তথ্য নিয়ে বাংলাদেশকে হামলার হাত থেকে বাঁচিয়েছে, সেটাই উঠে আসে। ভারতের সেই আত্মত্যাগের একটা নজির হাজির করা যেতে পারে চলচ্চিত্রটিকে ধরে। সেহমাত মূলত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। সেই সময়েই তার বাবা তাকে ডেকে পাঠান এবং এই কাজে নিয়োজিত করেন। বলতে গেলে সেহমাতকে তার বাবা কোরবানি করেছেন। প্রথম প্রথম এই কাজে তার মন সায় দিচ্ছিলো না, পরে তিনি রাজি হন। এবং পাকিস্তানে যাওয়ার আগে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের শেষ দিকে ২৭ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, খেলার মাঠে বসে আছেন সেহমাত এবং ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির প্রধান খালিদ মীর। তখন খালিদ সেহমাতকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি এই কাজ করতে রাজি হলে কেনো?’ তখন সেহমাত উত্তর দেন, ‘আমার বাবা, তার বাবা (সেহমাতের দাদা) ’৪৭-এ হিন্দুস্তানের জন্য লড়াই করেছে।’ তাই তিনিও তার জন্মস্থান হিন্দুস্তানের জন্য কিছু করতে চান। তার বাবা তাকে বলেছেন, ‘দেশের সামনে আমি নিজেকে কখনোই চোখে দেখি না।’ আর সেহমাত বলেন, ‘আমি নিজেই তো দেশ, নিজেই তো হিন্দুস্তান’। তাই তার কাছে তার নিজের চাইতে ভারত বড়ো হয়ে ওঠে। এবং প্রশ্নটা তখন আর বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন থাকে না। এই চলচ্চিত্রে সেই মাহাত্ম্যকেই তুলে ধরা হয়েছে, যেটার ভেতর দিয়ে কেবল ভারতেরই মাহাত্ম্যই ফুটে ওঠে এবং ভারত তার মতো যেভাবে মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধে পরিণত করেছিলো সেই বয়ান হাজির করার সবিধার্থেই কাজ করে যায়। এবং এই কাজ করতে গিয়ে সেহমাত নিজের বাবাকে হারান, নিজের স্বামী, সংসার, পরিবার সবকিছু খোয়ান। তারপরও তিনি দেশকে বিজয়ের আসনে দেখতে চান।
চলচ্চিত্রের দুই ঘণ্টা ছয় মিনিটের দৃশ্যে যখন সেহমাত তার শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে তাদের কাছে চলে আসেন—যারা তাকে উদ্ধারের জন্য পাকিস্তানে এসেছিলো। তখন সেখানে খালিদ ও সেহমাতের মধ্যে কথোপকথন হয়। সেহমাত বলেন, ‘আপনারা তো আমাকে মেরে ফেলার আদেশ পর্যন্ত দিয়ে দিয়েছিলেন। ... আমি আমার জীবনের সবকিছু দিয়ে দিলাম, আর আপনারাই আমাকে মেরে ফেলার হুকুম দিলেন! আপনাদের এই দুনিয়া আমি বুঝি না, এখানে সম্পর্কের কোনো কদর নাই, জীবনেরও কোনো কদর নাই (কাঁদতে কাঁদতে)।’
খেয়াল করার বিষয়, এর আগেই দুই দুটো খুন সেহমাত তার শ্বশুরবাড়িতে করে এসেছেন—এক. তার স্বামীর বড়োভাইকে; দুই. ওই বাড়ির একজন বিশ্বস্ত কর্মচারি। যারা তার ব্যাপারে জেনে গিয়েছিলো। কিন্তু তখনো তার কাছে কেবল দেশই বড়ো হয়ে উঠেছিলো। পরে এই সম্পর্কগুলোর ভেতর দিয়ে যাওয়ার ফলে সেহমাতের কাছে সম্পর্ক, পরিবার একটা জায়গা তৈরি করতে পারলেও তার কিছু করার ছিলো না। শেষমেশ তাকে এই সবকিছুই কোরবানি দিতে হয়। দুই ঘণ্টা ছয় মিনিটের ওই দৃশ্যে খালিদকে বলতে দেখা যায়, ‘যুদ্ধে এমনই হয় সেহমাত, অনেক নিরাপরাধ মানুষ মারা যায়। কিন্তু যুদ্ধে সিপাহী ছাড়া আর কোনো কিছুরই কোনো অর্থ নাই। না তুমি, না আমি, কেউ না।’ অর্থাৎ এতো আত্মত্যাগ কেউ মনে রাখে না। আবার চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করা হয় তাদেরকে, যাদের নাম বেনাম হয়েই থেকে যায় জাতীয় ইতিহাসের পাতায়। সেখানে বলা হয় চলচ্চিত্রটি উৎসর্গ করা হলো, সেইসব বীর এবং মহৎহৃদয়ের প্রতি, যাদের নাম জাতীয় ইতিহাসের পাতায় বেনাম হয়ে আছে আজও।’ তো এই তিনটি টেক্সটকে একসঙ্গে পাঠ করলে যেনো নির্মাতার গোপন উদ্দেশ্য কিছুটা ধরতে পারা যায়। তিনি যেনো চোখে আঙুল দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, তারা তাদের জন্মের ইতিাহস থেকে যেভাবে ভারত ও তার অবদানের কথা মুছে ফেলতে চায় কিংবা অনেকের আত্মত্যাগের কথা ইতিহাসে লেখা নেই, অথচ সেটাকে ধারণ করতে পারা জরুরি। নির্মাতার এই চিন্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যে বয়ানে তাদেরকে স্মরণ ও প্রতিপালন করা হবে, সেই প্রেসক্রিপশনও ভারত দিয়ে দেয়। আর তা মানতে গেলে বাংলাদেশ নামক দেশটি তার সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলতে পারে। বিপরীতে ভারত তার সেই সব প্রেসক্রিপশন ও আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য মুড়িয়ে এসব চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে থাকে। মূল কথা এখানেও ভারতের জয়গাথা ছাড়া আর কিছু বলা হয়নি।
উপসংহারে জুলাই এবং তার ভারতীয় উপস্থাপনা
খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতের বয়ান হাজির করার একটা সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে, অন্তত চলচ্চিত্রগুলোকে বিশ্লেষণ করে তা ভালোভাবেই ধরা যায়। সেগুলোকে সংক্ষেপে বললে, প্রথমত, ’৪৭-কে ভারত ভাই হারানোর বেদনা হিসেবেই পাঠ করে। উগ্রবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে পাকিস্তানকে। দ্বিতীয়ত, সেখান থেকে ’৭১-কে তারা তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ বলে মনে করে। বাংলাদেশের উপস্থিতি অস্বীকার করে। অথচ ’৪৭-এ ভারতবর্ষের ভাগ এক অনিবার্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছিলো। কিন্তু সেখানে পাকিস্তানকে সেক্যুলার রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আলাপ হাজির ছিলো। সেটা পরবর্তী সময়ে না হওয়ায় তারই পরিপূর্ণ রূপ হিসেবে ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে পাঠ করা যায়। কাজেই ’৪৭ এবং ’৭১-কে মোটেও বাইনারি করে পাঠ করা যায় না। বরং পরিপূরক হিসেবেই পাঠ করতে হয়। আর সেটাই সবার আগে খারিজ করে ভারত।
’৭১-এর ফলে যে গণবাসনা তৈরি হয়েছিলো সেটাও অধরা ছিলো বাংলাদেশের জনগণের কাছে। এবং পরবর্তী সময়ে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে শাপলা-শাহবাগের ভেতর দিয়ে রিলিজিয়াস-সেক্যুলার বাইনারি রাজনীতির পরিসর তৈরি করা হয়েছিলো, সেটারই কানাগলি হিসেবে অনেকেই ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনকে পাঠ করতে চেয়েছে। সেই জায়গা থেকে বাংলাদেশের জনগণের গণসার্বভৌমত্ব এবং তার আন্দোলন-সংগ্রামের যে ইতিাহস সেখানে ’৪৭, ’৭১ এবং ’২৪ আলাদা আলাদা মাহাত্ম্য নিয়ে হাজির হয়, তবে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবেও উপস্থিত থাকে। কিন্তু এর আগের আন্দোলন-সংগ্রামকে ভারত যেভাবে ভিলিফাই করে এসেছে ’২৪-কেও ঠিক একই ফ্রেমে ফেলে প্রচারণা চালিয়েছে। ফলে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানের মূল রুহানিয়াকে ভারত চিহ্নিতই করতে পারেনি। আওয়ামী বয়ানেই কথা বলেছে ভারত। নানাভাবে এটা বলার চেষ্টা করেছে যে, এটাও পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র। ভারতীয় বিভিন্ন মিডিয়াতেও একই চিত্র উঠে এসেছে।
আগেই বলা হয়েছে, সময়টা ইতিহাস আর বয়ানের যুগ। ডমিনেন্ট ডিসকোর্স হাজির হয় এই ঐতিহাসিক বয়ানের ভেতর দিয়েই। দীপেশ চক্রবর্তী এই ইতিহাসের নির্মাণকে বলছেন, ‘হিস্টোরিসিজম’। যেখানে ইতিহাসের কর্তা যে বা যারা তারাই বা তাদেরই বয়ান অনুপস্থিত থেকে যায়। ’২৪-এ এসেও সেটা লক্ষ করা গেছে। বাংলাদেশের মানুষকে তার কর্তাসত্তার ভূমিকা থেকে বিচ্যুত সত্তা হিসেবে ভেবে এসেছে ভারত এবং তারা যেভাবে বলছে পাকিস্তানের ষড়যন্ত্র, তাতে মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ এতোটাই সরল যে পাকিস্তানের এখানে মোড়লগিরি করতে হবে। এর ভেতর দিয়ে দীপেশের যে ধারণা, ইতিহাসবাদের ভেতরে ইতিহাসের কর্তার অনুপস্থিতি সেটারই দেখা মেলে।
অর্থাৎ বলতে গেলে, বাংলাদেশের সমুদয় মুক্তি-সংগ্রামের যে ইতিহাস, তা নিয়ে নির্মিত ভারতের চলচ্চিত্রগুলোতে আসলে সেই ইতিহাসকে নুলিফাই করা হয়েছে এবং সেখানে ভারত তার মতো করে একটা বয়ান হাজির করেছে। এবং সেসব উপস্থাপনায় বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার কোনো উপস্থিতিই লক্ষ যায় না। বরং ভারত কীভাবে পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে, সেই বয়ানই হাজির করা হয়েছে। এবং পরোক্ষভাবে এটাই বলার চেষ্টা করা হয়েছে, বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নিয়েছিলো পাকিস্তান এবং সেটাকেই পুনরায় দখল করলো ভারত। ভারতের সেই মনোভঙ্গি এখনও বিশেষ করে ’২৪-এর পরে আরো নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে উত্তর-উপনিবেশিক কায়দায়।
লেখক : মাহমুদুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের শিক্ষার্থী। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও অনুবাদ করছেন।
hasanalmahmud60@gmail.com
https://www.facebook.com/mahmud.alhasan.14418
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. Bauman, Zygmund (2000: 18); ‘Emancipation’; Liquid Modernity; Polity Press, USA.
২.Bose, Sugata & Jalal, Ayesha (1998: 165); ‘The Partition of India and the Creation of Pakistan’; MODERN SOUTH ASIA: History, Culture, Political Economy; Routledge, USA.
৩. Bose & Jalal (1998: 190).
৪. Sharma, M. (2024). ‘Films and India’s Partition: 1947-2024’. ShodhKosh: Journal of Visual and Performing Arts,5(6), 1508-1516. doi:10.29121/shodhkosh.v5.i6.2024.2411.
৫. Shukla, Sambhrant (2022); ‘Representation of Partition in Hindi Films of the Nehruvian Era’; International Journal of History and Research (IJHR), ISSN (P): 2249-6963; ISSN (E): 2249-8079, Vol. 12, Issue 1, Jun 2022, p.39-46.
৬. Viswanath, Gita & Malik, Salma (2009); ‘Revisiting 1947 through Popular Cinema: A Comparative Study of India and Pakistan’; Economic and Political Weekly, Vol. 44, No. 36 (SEPTEMBER5-11, 2009), pp. 61-69, Stable URL: https://www.jstor.org/stable/25663519; retrieved on:09. 10. 2025
৭. Sanaullah, Md., Bashar, Abul & Lima, Sabina Yesmin (2025); ‘Indian Narrative Setting of 1971 War: A Cinematic Memory Study’; ISSN: 3006-9491 (Online) Volume 2, Issue 2, (2025), https://doi.org/10.69739/jahss.v2i2.721; https://journals.stecab.com/jahss;Journal of Arts, Humanities and Social Science (JAHSS);Stecab Publishing, Bangladesh.
৮. Sharma, Shudipta & Ahsan, Razib (2015); ‘(Mis)Representations of Liberation War of Bangladesh in Bollywood Films’; The Chittagong University Journal of Social Sciences; Vol: 33, 2015 (P. 115-128).
৯. Dutta, Dibyajyoti & Gupta, Dr. Sourav (2022); ‘A Study on Portrayal of Bangladesh’s Liberation War in Bollywood Movies’; Quest Journals, Journal of Research in Humanities and Social Science; Volume 10; Issue 4 (2022) pp: 81-87ISSN (Online):2321-9467; URL: www.questjournals.org
১০. Hall, Stuart (1997: 24-25); ‘THE WORK OF REPRESENTATION’; Representation: Cultural Representations and Signifying Practices; Sage Publications, UK.
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন