Magic Lanthon

               

সোহাগ আব্দুল্লাহ

প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

চলচ্চিত্রে সহিংসতা : বৈশ্বিক যুদ্ধের জামানায় পুঁজির আগ্রাসী রূপায়ণ

সোহাগ আব্দুল্লাহ


ভিজ্যুয়াল ও সহিংসতার কথকতা

যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে এটা দাবি করেই বলা যায়, বর্তমানে মানুষ বাস করছে ভিজ্যুয়াল কালচারের দুনিয়ায়। ইন্টারনেট, সামাজিক মাধ্যম, ওটিটি প্লাটফর্ম ও কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা এই কালচারে বিচরণের পরিসর দিনকে দিন প্রসারিত করে চলেছে। ফলে সহজতর হয়েছে পাবলিক ও ব্যক্তিগত পরিসরে দেখা ও দেখানোর প্রক্রিয়া। এতো এতো ভিজ্যুয়ালের জামানায় কোনটা রেখে কোনটা দেখবে এই ভেবে দর্শক-ভোক্তা বিভ্রান্ত হওয়ার উপক্রম। দর্শক আর ভোক্তাকে বাস্তবের কতো কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়, সেই কাজটাই করে চলেছে দৃশ্যমাধ্যম। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে দর্শককে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা সঞ্চারের সুযোগ করে দিয়ে এসব ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে সবকিছু সয়লাব হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিকে তাত্ত্বিকরা দেখছে পিক্টোরিয়াল বা ভিজ্যুয়াল টার্ন হিসেবে।


এদিকে দৃশ্যমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমের নানা কনটেন্ট দেখে মানুষ বাস্তব জীবনে সেগুলোর মতো করার চেষ্টা যেমন করে; অন্যদিকে গণমাধ্যম-দৃশ্যমাধ্যমও মানুষের যাপিত জীবনের বিষয়-আশয়কে কনটেন্ট আকারে তুলে ধরে। মানে একটা আরেকটার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই বাস্তবতায়, বাস্তব জগতে মানুষ প্রতিনিয়ত যে সহিংসতা প্রত্যক্ষ করে সেই সহিংসতাও নানাভাবে হাজির হয় ভিজ্যুয়ালে। এই কারণে দৃশ্যমাধ্যম, গণমাধ্যম ও ভিডিও গেমের সহিংসতার উপস্থাপন এবং সেটা দর্শক কিংবা শ্রোতাদের ওপর কোন ধরনের প্রভাব ফেলে তা নিয়ে বৈশ্বিকভাবে বেশকিছু গবেষণাকর্ম সম্পন্ন হয়েছে; প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নানা তত্ত্বও। নিত্যনতুন গবেষণাও হচ্ছে। এসব গবেষণার ফলাফলে মোটাদাগে যেটা জানা যায়দৃশ্যমাধ্যম ও গণমাধ্যম বাহিত হয়ে মানুষজন সহিংসতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। শুধু তাই নয়, বাস্তব জীবনেও সেটাকে প্রয়োগযোগ্য করে তোলে। এর ফলে হরহামেশাই সংবাদমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন চোখে পড়েসিনেমাটিক স্টাইলে কাউকে হত্যা কিংবা আক্রমণ করা।


সব জনরার চলচ্চিত্রেই কমবেশি সহিংসতা থাকেহোক সেটা কমেডি, অ্যাকশন, ক্রাইম, রোমান্টিক, থ্রিলার, হরর, সাইফাই। দৃশ্যমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে সহিংসতা গুরুত্ব পেতে থাকে এর শুরুর সময়টা থেকেই। সাধারণ অনুমানে বলা যায়, করোনা মহামারি পরবর্তী সময়ে দৃশ্যমাধ্যমের গল্প বলার কৌশল হিসেবে সহিংসতার ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সুযোগ তৈরি করে দেয় ওটিটি প্লাটফর্ম। বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট দেখার সুযোগ থাকা ওটিটি যদিও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের প্রাইভেট ও পারসোনাল বিনোদন চাহিদা পূরণের কাজটা করে চলেছে। এবং ওটিটির কনটেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে সহিংসতা ও যৌনতাকে নানাভাবে ব্যবহারের। বাংলাদেশি চলচ্চিত্রনির্মাতা নূরুল আলম আতিক মনে করেন, নতুন ও জীবনঘনিষ্ঠ গল্প দেখার বাসনা থেকেই ওটিটির কনটেন্ট নিয়ে দর্শকের এতো আগ্রহ। নীতিমালার বাধ্যবাধকতা না থাকায় ওটিটি তাদের কনটেন্টে (ওয়েব ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ) দর্শককে একটু পর পর হুক করতে নানা কৌশল কাজে লাগাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রেক্ষাগৃহের জন্য নির্মিত চলচ্চিত্রেও। কেননা প্রেক্ষাগৃহের জন্য নির্মিত হলেও পরবর্তী সময়ে অল্প দিনের ব্যবধানেই ওটিটিতে চলে আসছে সেসব চলচ্চিত্র। এর ফলে ওটিটি ও প্রেক্ষাগৃহ দুই মাধ্যমকে বিবেচনায় রেখে নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের কনটেন্ট সাজাতে হচ্ছে।


এমন পরিস্থিতিতেই আসলে এই প্রবন্ধের সূত্রপাত। মোটাদাগে বললে, এই প্রবন্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কেনো ব্যাপকহারে চলচ্চিত্রে সহিংসতা হাজির হচ্ছে তা অনুসন্ধান করা। অনুমেয় যে, অত্যধিক ব্যবহারে সহিংসতাই হয়ে উঠেছে চলচ্চিত্রের ভাষা ও কৌশল। সেইসঙ্গে চলচ্চিত্রে সহিংসতা উপস্থাপনের ধরনটা কেমন মানে কীভাবে সহিংসতা দেখানো হচ্ছে তাও আলোকপাত করা। এছাড়া সহিংসতাকে হাজির না করেও কিছু চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হচ্ছে। এসব চলচ্চিত্র কীভাবে ব্যবসা করতে পারছে, তাও খতিয়ে দেখার চেষ্টা থাকবে এই প্রবন্ধে।


সহিংসতার উপস্থাপন এবং তাত্ত্বিক পরিসর

এই আলোচনা কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে এবং কোন কোন বিষয় প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে এই অংশে সেই কাঠামোটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। বলা যায়, যোগাযোগের বাচনিক ভাষার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় সংস্কৃতি ভেদে। সংস্কৃতির এই ভেদাভেদ সহজেই অতিক্রম করে অবাচনিক ভাষা সহিংসতা হয়ে ওঠে সর্বজনীন; যেটা বোধগম্য হয় কোনো ধরনের রূপান্তরকরণ ব্যতিরেকেই। এ কারণেই সহিংসতাকে যোগাযোগের মৌলিক, প্রায় সহজাত রূপ হিসেবে দেখা হয়; বিশেষ করে এমন সব পরিস্থিতিতে যেখানে বাচনিক আলোচনা অনেকটাই অকার্যকর।


একইভাবে দৃশ্যমাধ্যম চলচ্চিত্রের ভাষাও সাংস্কৃতিক ভেদ অতিক্রম করে অনেকটা বোধগম্যযোগ্য হয়ে ওঠে। অবশ্য দৃশ্যমাধ্যমের ভাষা দর্শকের সামনে হাজির হয় ক্যামেরার চোখ দিয়ে। পরে সেখানে শব্দ, শব্দহীনতা, সঙ্গীত, কথোপকথন, আলো, রঙ ও সম্পাদনা যুক্ত হয়ে এই ভাষাকে আরো দৃঢ় করে তোলে। তার মানে দৃশ্যের যেমন ভাষা আছে সহিংসতারও একটা ভাষা আছে, যা হাজির হয় ভিজ্যুয়ালের মধ্য দিয়ে। তবে সহিংসতার এই ভাষা ও অর্থ সবসময় একরকম হয় না; পরিবর্তন হয় জনরা, নির্মাতার আগ্রহ ও বর্ণনার ধরনের ওপর। এবং চেষ্টা চলে সেই গল্পটাকে কতোটা বাস্তবসম্মতভাবে হাজির করা যায়।



সহিংসতা বাস্তবে কিংবা দৃশ্যমাধ্যমে কীভাবে ব্যবহার হয় তার ধারণা পাওয়া যায় ওয়াল্টার বেঞ্জামিন-এর Critique of Violence প্রবন্ধে। সেখানে বেঞ্জামিন পৌরাণিক সহিংসতা (Mythic Violence) ও রুহানি সহিংসতার (Divine Violence) উল্লেখ করেন। চলচ্চিত্রে ও বাস্তবে নানাভাবে এই পৌরাণিক সহিংসতার ব্যবহার হয় মূলত আইন প্রতিষ্ঠাকারী সহিংসতা ও আইন সংরক্ষণকারীর সহিংসতার সমন্বয়ে; যা রাষ্ট্র ও সরকার আইন প্রয়োগকারী এজেন্সির মাধ্যমে প্রয়োগ করে। অবশ্য এটাও বলা যায়, এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তি নিজেও সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। চলচ্চিত্রের সহিংসতায় যা হরহামেশাই দেখা যায়। এদিকে স্লাভোজ জিজেক তার Violence: Six Sideways Reflections বইয়ে বর্তমান জামানার সহিংসতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হাজির করেন। বইটির SOS Violence অধ্যায়ে জিজেক সহিংসতাকে কেবল কোনো হামলা বা যুদ্ধ হিসেবে না দেখে, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের যে কাঠামোগত শরীর তার মধ্যকার বাস্তবতা হিসেবে দেখতে বলেন। যার উপস্থিতি লক্ষ করা যায় নানা জায়গায় দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান, কাঠামোগত-প্রাতিষ্ঠানিক, স্থিতাবস্থা, ভাষা ও প্রতীকের মধ্যে। এবং জিজেক এও জানান, সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে সহিংসতাও তার রূপ বদল করে। এর ফলেই হয়তো রূপ বদলিয়ে সহিংসতা আরো বেশি নৃশংসভাবে দর্শকের সামনে হাজির হচ্ছে চলচ্চিত্রে, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের নানা কনটেন্টে। কাছাকাছি চিন্তাভাবনা লক্ষ করা যায় বিয়ং-চুল হান-এর Topology of Violence বইয়ে। তিনি বলছেন,


এমন কিছু বিষয় আছে যা বিলুপ্ত হয় না; সহিংসতা তার মধ্যে একটি। ... এটা সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করে। আজকাল এটা দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যে, প্রত্যক্ষ থেকে বিষমূলে, নৃশংস শক্তি থেকে মধ্যস্থতাকারী শক্তিতে, বাস্তব থেকে ভার্চুয়ালে, শারীরিক থেকে মানসিকে এবং নেতিবাচক থেকে ইতিবাচকতায় সরে যাচ্ছে ত্বকের নিচে, যোগাযোগের আড়ালে; ...। ফলে সহিংসতা বিলুপ্ত হচ্ছেএমন মিথ্যা ধারণার তৈরি হচ্ছে।


আসলে সহিংসতা বিলুপ্ত হয় না। নিওলিবারেল পুঁজির জামানায় বাস্তব-অবাস্তব থেকে সব জায়গাতে এখন সহিংসতার দেখা মেলে অত্যন্ত নগ্নভাবে। পুঁজির আগ্রাসী বিকাশের পন্থাই এখন হয়ে উঠেছে যুদ্ধ ও সহিংসতা। এই বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে ভিডিও গেমের সহিংসতাকে। ফ্রি ফায়ার, পাবজি ও ব্যাটলগ্রাউন্ডস মোবাইল ইন্ডিয়া (বি জে এম আই) এর মতো অসংখ্য ভিডিও গেম ব্যাপকভাবে সহিংস আচরণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয় এর ব্যবহারকারীকে। কেননা এইসব গেমের মৌলিক নিয়ম বা উদ্দেশ্যেই হচ্ছে সহিংসতার মাধ্যমে বেঁচে থাকা। অন্যকে হত্যা করা ছাড়া যেখানে লক্ষ্য পূরণ হয় না। আর হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গেই নানা পুরস্কার জমা হতে থাকে তালিকায়। এই গেম কেমন হতে পারে, তার দৃষ্টান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুইড গেম ওয়েব সিরিজটি। ভার্চুয়ালি সহিংসতায় ভরপুর এ ধরনের গেম এমনভাবে তৈরি করা, যেখানে খেলোয়াড় বাস্তবে অংশগ্রহণ করছে এমন অনুভূত হয়। মানে তারা মনস্তাত্ত্বিকভাবে নিমগ্ন হতে পারে পুরোপুরি। এবং খেলোয়াড়কে এমন একটা ধারণা দেয় যে, শত্রু আছে সব জায়গাতেই; তাকে মেরেই বেঁচে থাকতে হবে। এইসব গেম সেভাবেই উদ্বিগ্নতা, ভয় ও উত্তেজনা তৈরি করে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের গেম দলগত (গ্যাঙ) আক্রমণকেও উৎসাহিত করে।


আবার এখন সামরিক প্রশিক্ষণ ও যেকোনো যুদ্ধের আক্রমণ সরাসরি দেখা যায়। কোথায় পারমাণবিক অস্ত্র আঘাত হানছে সেটা প্রত্যক্ষ করানোর আগ্রহে সংবাদমাধ্যমের কমতি নেই। কেননা সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভিউ কালচার। ফলে যতো মানুষ দেখবে ততো বেশি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে। মনোযোগ অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে এই জায়গায় সামাজিক মাধ্যম ও তার মডেল, পুঁজি প্রবাহে সব শ্রেণির মানুষকে অংশ নিতে নানাভাবে প্রলুব্ধ করছে। সামরিক প্রশিক্ষণ, যুদ্ধের সরাসরি ফুটেজ, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে যুদ্ধের সরাসরি স্ট্রিমিং-এর ফলে সমসাময়িক সহিংসতা দেখার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর সমসাময়িক সামরিক প্রশিক্ষণ ও তাদের আক্রমণ কৌশল দেখতে তো অনেকটা ভিডিও গেমের মতোই। এখানে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে উইকিলিকস-এ ফাঁস হওয়া কোলেটারেল ডেমেজ শিরোনামের ডকুমেন্টারির কথা। সহিংস এই ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ এপ্রিল বাগদাদে মার্কিন সেনাসদস্যদের অ্যাপাসি হেলিকপ্টার থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে ১২ জন বেসামরিককে হত্যা করতে। নিহতদের মধ্যে দুইজন রয়টার্স-এর সাংবাদিকও ছিলো। হত্যার এই ঘটনাটি হেলিকপ্টারের অ্যাভিয়েশন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছিলো অডিও রেকর্ডসহ। হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর সময় সেনাসদস্যদের কথা অনেকটা ভিডিও গেমের মতোই শোনায়। সেসময় এক আর্মির ভাষ্য, Come on, let us shoot!, Look at those dead bastards.। ফলে এই পরিস্থিতিতে নানাভাবে, নানা মাধ্যমেই নৃশংস সহিংসতার সাক্ষী হচ্ছে দর্শক ও ভোক্তা।


ইতোমধ্যে দৃশ্যমাধ্যম-গণমাধ্যম ও সহিংসতার মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য সমালোচনাও আছে এসব তত্ত্ব নিয়ে। তবে এইসব তত্ত্বকে একেবারে খারিজ করে দেওয়া যায় না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে সামাজিক শিখন তত্ত্বের প্রসঙ্গ। এই তত্ত্বের মূল বিষয়, মানুষ কেবল প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা দিয়েই শিখে না, বরং অন্যদের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেও শিখে। তার মানে দৃশ্যমাধ্যম-গণমাধ্যমে দেখানো ক্যারেক্টারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কোনো কিছু মানুষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আয়ত্ত আনতে পারে। এদিকে সংস্কৃতি গঠন তত্ত্বের ধারণা অনুযায়ী, দৃশ্যমাধ্যমের সহিংস কনটেন্ট দীর্ঘদিন ধরে দেখার ফলে বাস্তব জগতকে ভয়ানক ও সহিংস হিসেবে দেখার আশঙ্কা থাকে। অবশ্য অনুঘটক মডেল১০ (ক্যাটালিস্ট মডেল) একটু ভিন্ন প্রসঙ্গের দিকে মনোযোগ দেয়। এই মডেলের ভাষ্য, গণমাধ্যমের দেখানো সহিংসতাই কেবল সহিংসতার প্রতি আগ্রহ তৈরির প্রাথমিক কারণ নয়। এখানে উদ্দীপক (ক্যাটালিস্ট) হিসেবে কাজ করতে পারে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য, পারিবারিক পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা।


এছাড়া সংবেদনশীলতা হ্রাস তত্ত্ব১১ (ডিসেনসিটাইজেশন থিউরি) মতে, গণমাধ্যম-দৃশ্যমাধ্যমে সহিংসতা বার বার দেখার ফলে বাস্তব জগতের সহিংসতার প্রতি সংবেদনশীল প্রতিক্রিয়া যেমন, উদ্বেগ, ভয়, করুণা কমতে থাকে। এই জায়গা থেকে বলা যায়, চলচ্চিত্রে একই ধরনের সহিংসতা দেখে যাতে দর্শক বিরক্ত না হয়, সেজন্য আরো কতোটা সহিংসতা যুক্ত করলে দর্শককে বিনোদিত করা যায়, সেই চেষ্টাটাই হয়তো করা হয়। আবার উদ্দীপনা তত্ত্ব১২ (অ্যারাউজাল থিউরি) গুরুত্ব দেয় কীভাবে গণমাধ্যমে দেখা সহিংস কনটেন্ট দর্শককে শরীরবৃত্তীয়ভাবে উত্তেজিত করতে পারে; যেমন, হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ও অ্যাড্রেনালিন বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি পরবর্তী সময়ে যেকোনো আবেগ কিংবা আচরণকে তীব্র করতে পারে। অ্যাড্রেনালিন হরমোন শরীরে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং শারীরিকভাবে বিপদের সঙ্কেত দেয়। অ্যাড্রেনালিন কমে যাওয়া মানুষকে কৌতূহলি করে ও বিনোদনের তীব্র অভিজ্ঞতা দিয়ে থাকে। এসব তত্ত্ব ও তার প্রভাব নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্য পাঠককে এটা পরিষ্কার করা যে, মানুষ যেমন গণমাধ্যম-দৃশ্যমাধ্যম দেখে শিখে, আবার মানুষের যাপিত জীবনের ঘটনাবলিকে দৃশ্যমাধ্যম-গণমাধ্যম গুরুত্ব সহকারে বেছে নেয় কনটেন্ট হিসেবে।


এছাড়া দৃশ্যমাধ্যমের প্রভাব ও সক্ষমতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে এমনটা দাবি করাই যায়, চলচ্চিত্র মানুষকে এক জীবনে বহু চরিত্রযাপনের অভিজ্ঞতা দিতে পারে। বাস্তব জীবনে যেটা অসম্ভব। এই জায়গায় বলা চলে, সহিংসতাযুক্ত চলচ্চিত্র মানুষকে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ভিন্ন একটা জগৎ (দৃশ্যের জগৎ, অনেকটা কল্পনার জগৎও বলা চলে) তৈরি করে। এর মধ্য দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিতে মানুষ যেসব অভিজ্ঞতা নিতে পারে না, কিংবা সুযোগ কম, সহিংসতা সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেয়। ভিজ্যুয়ালের এই জগতে মানুষ নিজেকে মশগুল করে রাখে এবং এমন এক অতিবাস্তবতার মধ্যে বাস্তবতাকে কল্পনা করে, যেখানে প্রাত্যহিক নানাবিধ সমস্যা থেকে দূরে থাকা যায়। যা মূলত মানুষকে বাস্তবতা থেকে সাময়িক পালানোর সুযোগ এনে দেয়।


এতোসব আলোচনার উদ্দেশ্য, মানুষের বাস্তব জগতে যে এতো সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটছে, তা সহজেই মানুষকে প্রত্যক্ষদর্শীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করছে, সেটা বোঝানো। এর ফলে বার বার চলচ্চিত্রে সহিংস কোনো বিষয় দেখার মাধ্যমে মানুষের আক্রমণাত্মক মনোভাব যেমন তৈরি হয়, তেমনই ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতির পরিমাণ কমতে থাকে; বাড়তে থাকে উদাসীনতা। একটা পর্যায়ে সহিংস কোনো ঘটনা দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রনির্মাতা কিংবা চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যেহেতু বাস্তব এই জগতেই বাস করে এবং এটাও হয়তো অনুধাবন করে, বাস্তবের এসব সহিংসতা খুব বেশি চলচ্চিত্রের দর্শককে প্রভাবিত করতে পারে না। অথবা কতোটুকু পারবে সেটা নিয়ে ভাবতে হয় চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের। এর ফলে নির্মাতাকে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে মনোযোগ দিতে হয়। যেহেতু বাস্তব ও ভার্চুয়াল দুই জগতেই দর্শকের সহিংসতা দেখার সুযোগ আছে, এ কারণেই এসব দৃশ্য যাতে বাস্তবসম্মত এবং দর্শক যেনো অংশগ্রহণকারী হিসেবে নিজেদের অনুভব করে, সেজন্য যেসব ইন্ডাস্ট্রি সহিংসতা রিপ্রেজেন্টেশনে অপেক্ষাকৃত এগিয়ে তাদের বেশ কদর তৈরি হয়েছে। ফলে এমনটা বলা যেতেই পারে, সহিংসতা চলচ্চিত্রে রিপ্রেজেন্ট হচ্ছে না, বরং সহিংসতা ইন্ডাস্ট্রির অংশ হয়ে উঠছে।


এই বাস্তবতাতেই সমসাময়িক চলচ্চিত্রের সহিংসতা বিশ্লেষণে আধেয় বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে এ প্রবন্ধে। উদ্দেশ্যমূলক নমুনায়নের মাধ্যমে ২০২০ খ্রিস্টাব্দের পর যেসব চলচ্চিত্রে সহিংসতা মাত্রাতিরিক্তভাবে এসেছে এবং ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়েছে, সেগুলোকে নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় হলিউড নির্মাতা চ্যাড স্ট্যাহেলস্কিজন উইক : চ্যাপ্টার ফোর (২০২৩), বলিউড নির্মাতা সন্দিপ রেডি ভঙ্গাঅ্যানিমেল (২০২৩), দক্ষিণ ভারতীয় নির্মাতা হানিফ আদেনি’র মার্কো (২০২৪) ও বাংলাদেশি নির্মাতা রায়হান রাফী’র তুফান (২০২৪) স্থান পেয়েছে। অবশ্য এটাও বলা প্রয়োজন, আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির নানা সময়কার চলচ্চিত্রও স্থান পাবে।


চলচ্চিত্রে সহিংসতার উপস্থাপন ও প্রবণতা

নমুনায়িত চলচ্চিত্রে সহিংসতা কীভাবে হাজির হয়েছে এবং সেসবের প্রবণতা কী, তা বুঝতে চলচ্চিত্রকে টেক্সট ধরে কাছাকাছি ধরনের থিম বিন্যাস করে, তার বিশ্লেষণ নিচে হাজির করা হলো।


ক. প্রতিশোধ ও গ্যাঙ যুদ্ধের গল্প

মানব ইতিহাসে কিংবা মানবিক বৈশিষ্ট্যে প্রতিশোধ প্রবণতা সৃষ্টির আদি থেকেই। প্রতিশোধের মধ্য দিয়ে রাগ ও মানসিক মুক্তি যেমন ঘটে আবার ক্ষতিপূরণ, ন্যায়বিচার কিংবা ক্ষমতার প্রদর্শনও করা যায়। এই প্রতিশোধ কোনো ব্যক্তি এককভাবে নিতে পারে, আবার দলগত (গ্যাঙয়ের) মাধ্যমে নিয়ে থাকে। এ প্রবন্ধে নমুনায়িত চারটি চলচ্চিত্রই প্রতিশোধের গল্প এবং তা এক গ্যাঙের বিরুদ্ধে আরেক গ্যাঙয়ের লড়াই।


তুফান-এ গালিব বিন গণি ওরফে তুফান, বাবা হত্যার বদলা নিতে গিয়ে হয়ে ওঠেন দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী। তিনি ও তার গ্যাঙ প্রতিদ্বন্দ্বী সব গ্যাঙকে এবং রাজনৈতিক দলের সদস্যদেরকে নিজেদের ক্ষমতা বলে মেরে ফেলেন। একইভাবে তুফানকে দমন করতে সরকারও তার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আইনবহির্ভূত হত্যার অনুমতি দেওয়ার মাধ্যমে বিচারের অপারগতা ও ক্ষমতা দেখানোর পথকে বেছে নেয়। এদিকে অ্যানিমেল বাবার হামলাকারীকে হত্যার গল্প, মানে প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই আরকি। প্রোটাগনিস্ট রণবিজয় সিংয়ের বাবাকে অ্যান্টাগনিস্ট আবরার হক হত্যার চেষ্টা চালায়, তার বাবার আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে। তাদের মধ্যকার এই প্রতিশোধের ঘাত-প্রতিঘাত চলতে থাকে গ্যাঙ ধরে।



অন্যদিকে জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ কিলার জনাথন উইক ওরফে জনকে তার বিরোধী গ্যাঙ থেকে শুরু করে নিজ গ্যাঙয়ের মাফিয়ারা মারতে চায়, মাফিয়াদের শীর্ষ অ্যাসোসিয়েশন হাই টেবিলের এক সদস্যকে নীতিবহির্ভূত হত্যার কারণে। জনের ক্ষমা প্রার্থনা হাই টেবিল প্রধান ইলডার প্রত্যাখ্যান করলে, তাকে হত্যা করেই শুরু হয় জনের প্রতিশোধের লড়াই। এর ফলে হাই টেবিল জনকে হত্যার হুলিয়া জারি করে। এ লড়াইয়ে জনকে সঙ্গ দেয় জাপানের ওসাকা কন্টিনেন্টাল-এর মালিক সিমাজু কোজি, বাওরি কিং, হোটেল নিউ ইয়র্ক কন্টিনেন্টালের ব্যবস্থাপক উইনস্টন; এবং পরে শর্তসাপেক্ষে সৎ বোন কাটিয়া ও তার মাফিয়া গ্যাঙও সহায়তা করে। অবশ্য কাটিয়া তার বাবার হত্যাকারীকে হত্যার শর্তে জনকে পরিবারের সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি হয়। আর মার্কো ভাই হত্যার প্রতিশোধের গল্প। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলতে থাকে সহিংস গ্যাঙ লড়াই। শুধু প্রোটাগনিস্ট চরিত্রই এই প্রতিশোধ নিতে চায় ব্যাপারটা এমন নয়। একপর্যায়ে মার্কোকে তার বড়ো ভাই জর্জও মরার আগে অসিয়ত করে যান, তাদের পরিবারের হত্যাকারীকে মেরে ফেলতে, যাতে করে পরপারে গিয়ে তিনি সবাইকে বলতে পারেন মার্কো তাদের ঋণ শোধ করে দিয়েছে।


মোটাদাগে এসব চলচ্চিত্রে কোনো না কোনোভাবে মুখ্য হয়ে হাজির হয়েছে সহিংস প্রতিশোধ স্পৃহা। যা অনেকটা বৈশ্বিক যুদ্ধ বাস্তবতারই প্রতিফলন, নিজেদের ক্ষমতার জানান দেওয়া ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতার প্রকাশ। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সব জায়গাতেই এখন কেবল প্রতিশোধের লড়াই। যে লড়াই শেষ হওয়ার নয়! এ পরিস্থিতি অনেকটা সহিংস ভিডিও গেমের মতোও। চারদিকে কেবল শত্রু আর শত্রু। তাই সেই শত্রুকে মেরে ফেলতে হবে কোনো না কোনোভাবে। কারণ ক্ষমা ও দয়া দেখাতে গেলে ওই শত্রুই যে তাকে মারবে না তার নিশ্চয়তা কী?


খ. সহিংস চলচ্চিত্রে দেশের প্রচলিত আইন-প্রশাসন নস্যি ও বৈধতার প্রসঙ্গ

চলচ্চিত্রের পরিবেশিত সহিংসতায় অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে হাজির হয়েছে, দেশের প্রচলিত আইনকে প্রাধান্য না দেওয়া। এবং এমন এক সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের কথা বলা হচ্ছে, যেখানে আইন থাকলেও, সহিংসতা ঘটলেও সেসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। যা দেশের সার্বভৌমত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে কিংবা সহিংস চরিত্র নিজেই হয়ে ওঠে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। শুধু তাই-ই নয়, চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত সরকার ও প্রশাসনকেও দেখা যায় এসব সহিংস কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে।


চলচ্চিত্রে প্রকাশ্যে তুফানের বাবাকে দা দিয়ে নৃশংসভাবে জবাই করা হয় 


বাবার হত্যাকারীকে পরক্ষণেই কিশোর তুফান দ্বিখণ্ডিত করেন দায়ের এক কোপে


তুফান-এ তুফান বিরোধী দলের সবাইকে প্রকাশ্য পানশালায় ব্রাশফায়ারে হত্যা করে তাকে কটূক্তির কারণে; পুলিশের সামনেই জনসভার মঞ্চে তুফান নেতাকে গুলি করে মেরে জনতার উদ্দেশে বলেন, ভোট দিবেন কাকে? তুফানকে। উপস্থিত দর্শক তখন তুফান তুফান স্লোগান তোলে। এভাবে তুফান একচ্ছত্র আধিপত্যের অধিকারী হয়ে ওঠেজোর দাবি তোলেন তার সব ধরনের কর্মকাণ্ড সবাইকে মেনে নিতে হবে। কারণ তিনি নতুন সরকার ক্ষমতায় এনেছেন। ক্ষমতায় আনার বিনিময়ে তুফান সরকারের কাছে কী চান, এই প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী আরেফিনকে তুফান জানিয়ে দেন, তার দেশটাই চাই। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের অধিকারী হয়ে ওঠার যে ইশতেহার, সেটা তুফান সরকারকে সাফ জানিয়ে দেন। তুফানের এই আধিপত্য সব সেক্টরে চলতে থাকলে দলের বৈঠকে এক নেতা/এম পি’কে বলতে শোনা যায়, তুফান সব সেক্টর একাই খেয়ে ফেলছে!


তুফানের আরেকটা ঘটনাও সরকারকে বিপদে ফেলে। দুষ্টু কোকিল গানে বার ড্যান্সার সূচনার সঙ্গে নাচতে মানা করার আদেশ অমান্য করায় সোহান চৌধুরী নামে এক অভিনয়শিল্পীকে তুফান গুলি করেন। এবং তার লাশ সেখানে রেখেই সবাইকে নাচতে বলেন। এই ঘটনার নিন্দা জানাতে দেখা যায় মন্ত্রী আরেফিন ও তার পি এস’কে। পরক্ষণেই সূচনার পায়ের জুতা খুলে তুফান পি এসকে পেটান এবং মন্ত্রীর হাতে প্রেস রিলিজ ধরিয়ে দেন। সাংবাদিকদের সামনে মন্ত্রী তাই পড়েনসোহান চৌধুরীর মৃত্যুর সঙ্গে তুফানের কোনো সম্পর্ক নাই। এবং তুফান নামে কেউ নাই; এটা গণমাধ্যমকর্মীদের সৃষ্টি।


তুফান মন্ত্রীর মুখ দিয়ে এ কথা বলিয়ে নিয়ে তার সার্বভৌমত্বের কথা জানান দেন, বিপরীতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেন। সরকার/রাষ্ট্র একটা সময় পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে তুফানের সব ধরনের সহযোগিতা নিলেও একপর্যায়ে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে তাকে দমনে বেছে নেয় আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ক্রসফায়ারকে। দল ও সরকারে থাকা সর্বোচ্চ নেতার আদেশক্রমেই তুফানকে মারতে এ সি আকরামকে বলা হয়। তিনি ও তার দল চারটি গুলি করলেও শেষ পর্যন্ত তুফানকে বেঁচে থাকতে দেখা যায়। অবশ্য এটাও অস্পষ্ট, ওই ব্যক্তি তুফান, নাকি তার বডি ডাবল অভিনয়শিল্পী শান্ত। যাইহোক, তুফানকে গোপনে রাখতে এ সি আকরাম নার্স, পুলিশ ও ডাক্তারকে হত্যা করেন। লুই আলথুসার রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যে কলকব্জা বা রিপ্রেসিভ স্টেইট অ্যাপারেটাস-এর কথা বলেন তারই ব্যবহার ঘটে এখানে।১৩ রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকার ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী মূলত এখানে কাজ করে সহিংসতার মাধ্যমে। ম্যাক্স বেবার ও ফ্রিডরিখ নীৎশে রাষ্ট্র সম্পর্কে যে ধারণা দেয়, রাষ্ট্রের মৌলিক উপাদান সন্ত্রাস ও ত্রাসতারই দেখা মেলে এখানে। আবার মনু সংহিতাতেও রাষ্ট্রের যে পরিচয় পাওয়া যায়রাষ্ট্রং বাহুবলাশ্রিতম; মানে রাষ্ট্র টিকে থাকে বাহুবলে আশ্রিত শক্তি হিসেবে।১৪ তুফানকে আইনবহির্ভূত হত্যা চেষ্টার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার বলপ্রয়োগের পথটাই বেছে নেয়। একইসঙ্গে তুফানকে হত্যা করে সন্ত্রাস নির্মূলের ব্যাপারটা নির্বাচন ইশতেহারে যুক্ত করার কথা ভাবে সরকার। রাষ্ট্র-সরকার ও তার নানা এজেন্সির যৌথতার এমন হাজারো হত্যার সাক্ষী নিওলিবারেল সমাজের প্রত্যেক নাগরিক। যা অনেকটাই মিলে যায় ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের পৌরাণিক সহিংসতার সঙ্গেও। এখানে আইন রক্ষাকারী ও আইন সংরক্ষণকারীর হাতেই ব্যত্যয় ঘটে আইনের।


এদিকে অ্যানিমেল-এ বিলিয়নিয়ার বলবীর সিং-এর উপর গুলি চালানো ব্যক্তিকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দেন তার ছেলে রণবিজয় সিং। তাকে বলতে শোনা যায়, আকাশ পাতাল, মানুষ কিংবা রাক্ষস যাইহোক না কেনো, দুনিয়ার যেই জায়গাতে থাকুক না কেনো, খুঁজে এনে ওই হামলাকারীকে তিনি নিজ হাতে গলা কাটবেন। জ্বালাময়ী এই ভাষণ শুনে উপস্থিত শ্রমিকরা জয়োধ্বনিতে ফেটে পড়ে। সংবাদমাধ্যমেও হত্যার হুমকি প্রচারের মধ্য দিয়ে বিষয়টিকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়। যার প্রতিফলন ঘটে বাবাকে গুলি করার ঘটনায় সম্পৃক্ততার কারণে প্রকাশ্যে বোনের স্বামীকে হত্যা করায়। শুধু তাকেই নয়, ওখানকার বেশ কয়েকজন গার্ডকেও হত্যা করা হয়। আবার হোটেলে সহিংসভাবে ৩০০র মতো মানুষকে মেরে ফেললেও তা নিয়ে কোনো নিউজ কিংবা আলোচনাই চোখে পড়ে না। সেইসঙ্গে রণবিজয় ও তার দল অত্যাধুনিক অস্ত্রসহ স্কটল্যান্ডে বিমানযাত্রা করে আবরার হক ও তার গ্যাঙকে মেরে ভারতে ফেরত আসলেও, দুই দেশের প্রশাসন সেটা দেখে না! আবরার স্কটল্যান্ডে একের পর হত্যা করলেও তার কিছু হয় না! এর মধ্য দিয়ে রণবিজয় কিংবা আবরার নিজেরাই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, কিংবা তারা এমন একটা রাষ্ট্রকল্প হাজির করে যেটা বাস্তবে নেই। বিষয়টি তুলনা করা যায় ফিলিস্তিনের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনের ঘটনার সঙ্গে। সবাই এই বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হলেও ইসরায়েলকে থামানোর সাহস কেউই যেনো রাখে না!


হোটেলে ৩০০’র অধিক অস্ত্রধারীকে এই বিশেষ ধরনের মেশিনগানের সাহায্যে মোকাবিলা করেন রণবিজয়। মুহূর্তেই কক্ষটি পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে।


অন্যদিকে মার্কোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকলেও কয়েকজন মাফিয়া সার্বভৌমত্ব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। প্রথমত, মার্কো ও তার ভাই জর্জ, একের পর এক হত্যা করলেও সেটা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। দ্বিতীয়ত, বিরোধী গ্যাঙের সদস্যরা মার্কোর পরিবারকে মেরে ফেললেও কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা যায় না। বরং পুলিশ মার্কো ও তার মতো যারা এ ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে যুক্ত, তাদের বৈধতা দেয় মার্কোকে জন্মগত ক্রিমিনাল বলার মধ্য দিয়ে। এছাড়া চার্চে সবার উপস্থিতিতেই মার্কো তার ভাই ভিক্টোরের হত্যাকারীকে হত্যা করবে বলে জানান। এ কথাই প্রতিধ্বনি করে জর্জ বলেন, হত্যাকারী যখন মিলবে তাকে পুলিশে কিংবা আইনের কাছে দিবে না। যা মূলত তাদের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হওয়ারই ইশতেহার।


জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এও এমন একটা রাষ্ট্রের দেখা মেলে, যেখানে কোনো আইন কিংবা প্রশাসন নেই। বরং এমন রাষ্ট্রের কথা বলা হয়, যা চলে নির্দিষ্ট মাফিয়া গ্যাঙ ও তাদের নিয়মানুসারে। এক গ্যাঙ আরেক গ্যাঙয়ের সঙ্গে কখনো প্যারিস, কখনো নিউ ইয়র্ক, মরক্কো কিংবা অন্য কোনো শহরে হত্যাযজ্ঞ চালালেও সেখানে রাষ্ট্র ও তার আইন-প্রশাসনের কোনো উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। এমনকি রেডিওতে জনসহ অনেককে হত্যার হুলিয়া জারি এবং প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তায় ছোটো বড়ো সব গ্যাঙ গোলাগুলি করলেও রাষ্ট্র ও তার বাহিনী অনুপস্থিতই থেকে যায়।


এইসব চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠা কিংবা আইন-প্রশাসনকে অগ্রাহ্যের যে বয়ান সেটা দিনশেষে দর্শক-ভোক্তাকে একটা রাষ্ট্রহীন জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়। যেখানে একজনই হয়ে ওঠে সর্বেসর্বা বা সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী কিংবা ওই চরিত্র যা-ই করুক না কেনো, তাকে কোনোভাবেই ধরাছোঁয়া যায় না! হানা আরেন্ট তার On Violence গ্রন্থে মূলত এরই ইঙ্গিত দেন। ক্ষমতা ও সহিংসতা পারস্পরিক বিপরীততিনি এমন ধারণা দেন। তার মতে, সহিংসতার উদ্ভব ক্ষমতার অনুপস্থিতি থেকে, আর সহিংসতা হলো বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও পাবলিক পরিসর যতো বেশি আমলাতান্ত্রিক হবে, সহিংসতার প্রতি আকর্ষণ ততোই বাড়বে।১৫ এ কারণে বলা যায়, রাষ্ট্রের ও তার এজেন্সির অনুপস্থিতিতে প্রোটাগনিস্ট চরিত্রগুলো সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে বলে মনে হয়। সেইসঙ্গে এইসব চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের হাতে যেসব হত্যা বা আক্রমণের ঘটনা ঘটে, সেসব মানুষের উপস্থাপন অনেকটাই হোমো সাকের, মানে অভিশপ্ত রূপেই। কারণ এইসব মানুষের কোনো নাগরিক অধিকার আছে বলে মনে হয় না। কারণ তারা আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। ফলে তাদের যখন তখন চাইলেই হত্যা করা যায়। অবশ্য আধুনিক রাষ্ট্র চাইলে যে কাউকেই তার আইনের মাধ্যমেই এই হোমো সাকের বানিয়ে হত্যা করতে পারে।


গ. পুরুষ প্রাধান্যশীলতার আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য সহিংসতা

সহিংসতা নির্ভর এসব চলচ্চিত্র দেখে দর্শক কিংবা পাঠকের ভাবার সুযোগ আছে পুরুষ (আলফা মেইল) নিজেই হয়ে উঠছে সহিংসতার প্রতীক। আর পুরুষের সহিংসতা দেখাতে গিয়ে নারীর উপস্থাপন এই ধরনের চলচ্চিত্রে একেবারেই কম। কিংবা থাকলেও সেখানে পার্শ্বচরিত্রে প্রেমিকা-স্ত্রী আকারে; যারা কিনা এ ধরনের সহিংসতাকে কোনোভাবেই পছন্দ করে না। বরং এ থেকে পুরুষ সঙ্গীকে দূরে থাকতে বলে; কিন্তু কোনোভাবেই পুরুষ সঙ্গীকে তারা ছেড়ে যেতে পারে না। অবশ্য এসব চলচ্চিত্র পুরুষকে প্রাধান্যের জায়গাতে রেখেই নির্মিত।



অ্যানিমেল-এর রণবিজয় সিং শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হাজির থাকেন পুরুষ প্রাধান্যশীলতা ও সহিংসতার অবতার রূপে। এই চলচ্চিত্রের অন্যান্য পুরুষ চরিত্রও একই সিলসিলার ধারকবাহক। রণবিজয় ছোটো থেকেই তার বাবাকে নিয়ে কিছু বললে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। এবং কলেজে পড়াকালীন মা ও বড়ো বোনকে ছাপিয়ে নিজেকে বাবার পর পরিবারের ম্যান ইন চার্জ দাবি করেন। এছাড়া নারীর কাজই সন্তান জন্ম দেওয়া আর লালন করা, এটা তার স্ত্রী গীতাঞ্জলিকে জানিয়ে দেন এভাবেইউ হ্যাভ বিগ প্যালভিস। ইউ ক্যান অ্যাকোমোডেট হেলদি বেবিস। শুধু তাই নয়, নারীরা পুরুষের চেয়ে শারীরিকভাবে কতো দুর্বল সেটারও বর্ণনা করেন রণবিজয়। কেননা স্ত্রীর বাইসেপস, চেস্ট তার থেকে দুর্বল। এবং গীতাঞ্জলির সঙ্গে তর্কে রণবিজয় তাকে পুরুষের মতো চিন্তাও করতে বলেন। কারণ পুরুষরা হাজার বছর ধরে লড়াই করে আসছে। তিনি শেষে চিৎকার করে আরো স্পষ্ট করেনএটা পুরুষের দুনিয়া। যেখানে তার স্ত্রী পুতুল, তিনি দানব (মনস্টার)।


এর বাইরে নারীকে পুরুষের জন্য অনেক কিছুই করতে হয়, কিন্তু পুরুষ কিছুই করে নারণবিজয় ও অন্যান্য পুরুষ চরিত্র এমন ধারণাই প্রতিষ্ঠা করে। গীতাঞ্জলিকে একবার রণবিজয় জানান, তাকে কখনো ধোঁকা দিবেন না। এবং নারীদের নিয়ে তার ভাইদের ফুর্তি করতে দেখলে রণবিজয় তাদের বলেন, স্ত্রী দূরে থাকায় এমনটা করা যাবে না। কিন্তু চলচ্চিত্রে তাকেই দেখা যায় অন্য নারীর সঙ্গে (জয়া রিয়াজ) একাধিকবার যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে। পরে ওই নারীকেও হেয় করেন রণবিজয়জিহ্বা দিয়ে তার জুতা চাটতে বলেন। জয়া কথা মতো তা করতে গেলে রণবিজয় স্থান ত্যাগ করেন। পরে স্ত্রীর কাছে এ কথা স্বীকারও করেন তিনি। দাবি করেন, বাবার জন্য এমনটা করেছেন। কিন্তু জয়া পরিচয় প্রকাশ করলে তাকে আবার বলেন, প্রতিপক্ষই যে তাকে পাঠিয়েছে শুরু থেকেই সবটা তিনি জানতেন! এই ঘটনার পর গীতাঞ্জলি যখন বলেন, আমিও অন্যের সঙ্গে শোবো, তখন তিনি জানিয়ে দেন, এটা পারবে না। তার কাছেই আসতে দেবে না কাউকে; যে আসবে তাকে মেরে ফেলা হবে।


কাউকে সহিংসভাবে হত্যা ও কোনো নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়ানোর বিষয়টিকেও এক করে বৈধতা তৈরির চেষ্টা করেন রণবিজয়। গীতাঞ্জলির উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, তুমি অনেককে হত্যার পরেও আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছো। আর একজন নারীর সঙ্গে শোয়াটা মাফ করতে পারছো না? অবশ্য পরে তিনি স্ত্রীর পা ধরে বসে থাকলে সব ঠিক হয়ে যায়! আসলেই কি মানবিক সম্পর্কে এতো দ্রুত সব ঠিক হয়ে যায়? এরপরেই রণবিজয় ভাইদেরকে স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে বলেন। যার মধ্য দিয়ে এই চলচ্চিত্র কেবল নারীদের আয়েশি জিনিস ও পুরুষ প্রাধান্যশীলতাকে সহিংসতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে হাজির করে।

কুকুরকে এভাবেই নৃশংসভাবে টেনে ছিঁড়ে ফেলেন মার্কো।


রণবিজয় ছাড়াও তার বোনের স্বামী বরুণ, বাবা, অ্যান্টাগনিস্ট আবরার হক, আবরারের কসাই ভাই (যার চেহারা সার্জারি করে রণবিজয়ের মতো করা হয়) নারীদের হেয় করে সহিংস আচরণের মাধ্যমে। একপর্যায়ে রণবিজয়কে তার বোনজামাই বরুণ পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে বলেন, স্পোর্টস কার ক্রাশ করে এবং দুই-চারজন নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে। বরুণ তার স্ত্রীকে সিগারেটের আগুন দিয়েও ভয় দেখান। বাবা বলবীর সিংও ধমকিয়ে তার স্ত্রীকে থামিয়ে দেওয়াসহ ছেলের গায়ে একাধিকবার হাত তোলেন। অন্যদিকে নিজের তৃতীয় বিয়ের অনুষ্ঠানে রণবিজয়ের হাতে ভাইয়ের (আসরার হক) মৃত্যুর খবর শোনার পর নীরবতা পালন করেন আবরার। সেখানে একজনকে খুন করার পর পরই সবার সামনেই আবরার তার স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। সেসময় অন্য স্ত্রীদেরও পেটাতে ও তাদের সঙ্গে জোর করে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে দেখা যায় তাকে। চলচ্চিত্রের একেবারে শেষ দিকে আবরারের এক কসাই ভাই দুইজনকে খুনের পর সবার সামনেই জয়াকে তার যৌনাঙ্গের দিকে ইশারা করে হেয় করেন। এতো কিছুর পরও কোনো নারী এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলে না। সব মেনে নেয়।


মার্কোতে নারী চরিত্রের দেখা মেলে প্রেমিকা, বোন, স্ত্রী আর নার্স হিসেবেই। তারা কোনোভাবেই সহিংস কোনো আচরণের সঙ্গে জড়িত নয়। বরং সহিংসতায় যুক্ত থাকার কারণে মার্কোকে একবার তার প্রেমিকা ছেড়ে চলে যান। কিন্তু শেষে আবার ফিরে আসেন। মার্কোর ভাই জর্জ, প্রতিদ্বন্দ্বী গ্যাঙয়ের সব পুরুষ চরিত্রই সহিংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। চলচ্চিত্রজুড়ে মার্কো চরিত্রের সহিংসতাকে যেভাবে হাজির করা হয়, সেখানে তিনি একাই তার প্রতিপক্ষ গ্যাঙয়ের সবাইকে মেরে ফেলেন। যতোগুলো গ্যাঙ লড়াইয়ের দৃশ্য আছে, সবগুলোতেই মার্কো একাই অবতীর্ণ হন তার মহিমা প্রকাশ করতে। অন্যদিকে জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ মাফিয়া হিসেবে দুই নারী চরিত্র (কাটিয়া ও সিমাজু কোজির মেয়ে আকিরা), হোটেল ডেস্কে নারী সহকারী ও রেডিওতে অ্যানাউন্সার হিসেবে নারী চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। চলচ্চিত্রজুড়ে চোখে পড়ে কেবল পুরুষের সহিংসতা। এবং সেখানে জনকে এককভাবে কতোটা মহিমান্বিত করে তোলা যায় তারই প্রতিফলন ঘটে অসংখ্য অস্ত্রধারীর সঙ্গে অস্ত্রসমেত একাধিক দীর্ঘ দৃশ্যের মারামারিতে।

চলচ্চিত্রের এ দৃশ্যে হাইডোক্লোরিক এসিডে ফেলে মার্কোর ভাইকে হত্যা করা হয়। মুহূর্তেই তার শরীর থেকে মাংস বিচ্ছিন্ন হয়ে অবশিষ্ট থাকে কেবল কঙ্কাল। 


তুফান-এ দুই প্রোটাগনিস্ট নারী চরিত্র (যদিও তাদের উপস্থিতি কেবল প্রেমিকা হিসেবে) থাকলেও পুরো চলচ্চিত্রে আধিপত্য কেবল পুরুষের। তুফান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে সহিংসতার মাধ্যমে। বার ড্যান্সার সূচনাকে তুফান নিয়ে আসে একপ্রকার জবরদস্তি করে। আবার তুফানের সহিংসতাকে মহিমান্বিত করার দৃষ্টান্ত দেখা যায়, হাসপাতালে যখন গ্যাঙবিহীন তুফান তার আশ্রিত বাবা জালালুদ্দিনকে উদ্ধার করতে যান। পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলি করে বীরদর্পে বাবাকে উদ্ধার করে এনে তিনিই তাকে হত্যা করেন। পরিশেষে এটাই বলা যায়, এসবের মধ্য দিয়ে সহিংস চলচ্চিত্র আদতে যে পুরুষের দুনিয়া, নির্মাতারা সেটাই জানান দেয় দর্শককে। এবং যেই দুনিয়ায় পুরুষ টিকে থাকবে তাদের সহিংস আচরণের মধ্য দিয়ে; আর নারী থাকবে অধীন কিংবা প্রেমিকা-প্রেয়সী হয়ে। এর ফলে চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যে পুরুষের দুনিয়া এই ধারণাই আরো দৃঢ় হবে। তথ্য-উপাত্ত অন্তত তাই বলে।১৬


ঘ. সহিংসতাপূর্ণ মৃত্যু ও অনুভূতিহীন মানুষ

দৃশ্যমাধ্যম ও গণমাধ্যমে অবিরত সহিংসতা দেখার ফলে বাস্তবের একই ধরনের সহিংসতা মানুষের মধ্যে সেভাবে আবেগ তৈরি করতে পারে নাসংবেদনশীলতা হ্রাস তত্ত্ব এমন ধারণাই প্রদান করে। চলচ্চিত্রের সহিংসতাকে এই জায়গা থেকে পাঠের সুযোগ আছে। কারণ এসব চলচ্চিত্রে মৃত্যুকে এতো স্বাভাবিক করে তোলা হয়, সেটা সহিংস মৃত্যু হলেও তা মানুষের মধ্যে কোনো ধরনের অনুভূতি তৈরি করে না, উল্টো উল্লাস করতেই দেখা যায়। এসব চলচ্চিত্রে একজন মানুষকে হত্যা করতে সহিংসতার নানা কৌশলকে একত্রে প্রয়োগ করা হয়।


কিল্লাকে হত্যার পর প্রমাণস্বরূপ তার বিশেষ দাঁত খুলে নিতে দেখা যায় জন উইককে। সেসময় মৃত কিল্লা ভয়ঙ্করভাবে তাকিয়ে থাকেন। 


এ দৃশ্যে প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তায় জন উইক হত্যার জন্য অনেকেই জড়ো হয়। সবাইকে হত্যা করে জন নিজেকে রক্ষা করেন।


শুরুতেই বলা যায় জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এর কথা। চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নব্য হাই টেবিলের প্রধান হওয়া মারকুইস তার কয়েকজন কর্মচারীর সামনে উইনস্টনের বিশ্বস্ত কর্মচারী চেরনকে গুলি করে মারলেও তাদের কোনো অনুভূতি তৈরি হয় না। এছাড়া চলচ্চিত্রের এক ঘণ্টা ২১ মিনিটে ক্লাবের পার্টিতে অসংখ্য মানুষের সামনে মারামারি, গুলি করে একাধিক মানুষকে হত্যা করা হলেও যে যার মতো উল্লাস করতে ব্যস্ত! এ সময় উপর থেকে মাফিয়া কিললাকে সিঁড়িতে ফেলে হত্যার পর, প্রমাণ হিসেবে তার স্বর্ণের দাঁত ভেঙে নিয়ে যান জন। চোখ খোলা অবস্থায় ভয়ঙ্করভাবে তাকিয়ে থাকে মৃত কিললা! উপস্থিত মানুষের মধ্যে এই দৃশ্য কোনো অনুভূতি তৈরি করে না! সেইসঙ্গে হাই টেবিলের রেডিও স্টেশন থেকে হুলিয়া জারির পর প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তাতে যখন হত্যা, গোলাগুলি, গাড়ির সংঘর্ষ হতে থাকে কেউ সেখানে থামে না। কেউ যেনো এই ঘটনায় ভীত নয়। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চলচ্চিত্রে একটি গুলিতে খুব কম মানুষেরই মৃত্যু হয়। আবার কাউকে মারতে হুলিয়া জারি করলে মূল্য বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গেই একদল মানুষ হন্য হয়ে ওইসব হোমো সাকেরকে খুঁজতে থাকে।


অ্যানিমেল-এ রণবিজয় তার বোনজামাই বরুণকে ৪৮ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের দিকে হোটেলে প্রকাশ্যে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যার পরও একাধিক গুলি করে। অস্ত্র দিয়ে সেখানে উপস্থিত সবাইকে জিম্মি করলে ভয়ে তারা কোনো কিছুই বলে না। চলচ্চিত্রে ৩০০ জনকে হত্যার কথা বলে রণবিজয়; যেটাকে তিনি স্ত্রীর সঙ্গে গর্ব করে হত্যা না বলে প্রোগ্রেস আখ্যা দেন। এরপর বিয়ের অনুষ্ঠানে ভাইয়ের খুন হওয়ার কথা আবরারকে জানানো হয়। প্রতিক্রিয়াতে আবরার ওই তথ্য সরবরাহকারীকে অতিথিদের সামনেই কাটা চামচ দিয়ে গলায় ও চোখে একাধিক আঘাতে হত্যা করেন। এটুকুতেই ক্ষান্ত হন না; পরে দেয়ালের সঙ্গে মাথা আঘাত করতে থাকেন। এ ঘটনায় উপস্থিত অতিথিরা খুব একটা বিচলিত হয় না। চলচ্চিত্রের শেষ দিকে আবরারকে হত্যা করে রণবিজয় ফিরলে বাড়িতে আনন্দের আবহ তৈরি হয়। রঙবেরঙয়ের আলোয় সজ্জিত বাড়িতে ফুটতে থাকে আতশবাজি। যার মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষের মৃত্যু হয়ে ওঠে উল্লাসের বিষয়।


সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে জোর পূর্বক অ্যানিমেল চলচ্চিত্রের আবরার হক এভাবেই সবার সামনে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন।


এদিকে মার্কো শুরু হয় বক্সিং রিংয়ে মারামারিতে রক্ত ঝরছে, এমন দৃশ্য দিয়ে। যা দেখে সবাই উল্লাসিত এবং টাকা বাজি ধরছে। এই সহিংসতা প্রত্যক্ষকারীরা তখন অনেকটাই ভাবলেশহীন। আবার মার্কোর ভাই ভিক্টোরকে যখন হাইডোক্লোরিক এসিডে ফেলে হত্যা করা হয়, এ ঘটনা একজন মোবাইল ফোনসেটে ধারণা করেন। এই ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে উপস্থিত সবাই অনেকটাই বিনোদিত। চলচ্চিত্রজুড়ে মানুষ হত্যাকারী মার্কো একপর্যায়ে কুকুরের মুখ টেনে ছিঁড়ে ফেলে নিজেকে পরিচয় করিয়ে দেন ডগ লাভার বলে! এতে তার চরিত্রের দ্বৈততা প্রকাশ পায়। অন্যদিকে তুফান-এও একাধিক দৃশ্যে হত্যা ও ত্রাসের পরের মুহূর্তে উল্লাস করা হয়। সেইসঙ্গে জনসভায় প্রকাশ্যে হত্যা, পানশালায় রাজনৈতিক দলের সবাইকে মেরে ফেলাতে কাউকে সেভাবে বিচলিত হতে দেখা যায় না; বরং বিরোধী রাজনৈতিক দল এতে খুশিই হয়, ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায়।


আরেকটা লক্ষণীয় বিষয়, এসব গ্যাঙ সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হলেও তারা তাদের গ্যাঙকে ছেড়ে যায় না! রাষ্ট্রীয় নানা বাহিনী জীবনের বিনিময়ে দেশকে রক্ষার যেভাবে শপথ নেয়, এই সদস্যরা সেভাবেই তার গ্যাঙকে রক্ষা করে চলে। এসবের মধ্য দিয়ে হত্যা খুব স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ধরা দেয়। নিওলিবারেল এই সময়ে এসে পুঁজি কীভাবে মানবিক সম্পর্কগুলোর মধ্যে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে আসেকার্ল মার্কস যেই ধারণা দেনএসব চলচ্চিত্রে তারই বর্হিপ্রকাশ ঘটে। বিচ্ছিন্নতার এতোটাই গভীরে মানুষ প্রোথিত হয়েছে যে, সামনে অন্যের মৃত্যুও কাউকে বিচলিত করে না। বরং উল্লাস করার সুযোগ করে দেয়।


ঙ. অস্ত্র প্রদর্শন ও নিজেদের যুদ্ধলীলার সক্ষমতা

কোন দেশ অস্ত্রে কতোটা সমৃদ্ধ কিংবা কোন অস্ত্র অনন্য ও ব্যাপক ধ্বংসে সক্ষম, এটা ফলাও করে প্রচার করা বৈশ্বিক বাস্তবতায় সেকেলে বিষয় নয়। সক্ষমতার জানান দেওয়ার চেষ্টা নানাভাবেই দৃষ্টিগোচরে আসে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাজেটে মৌলিক অধিকার উপেক্ষিত হলেও গুরুত্ব পায় কেবল সামরিক খাতই। বৈশ্বিক চলমান যুদ্ধলীলায় সামরিক সরঞ্জামের চাহিদা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি এটা সবর্জন জ্ঞাত। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন থেকে অস্ত্র তৈরিতে সর্বোচ্চ স্থান দখল করে রেখেছে। রাশিয়া, চিন, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রতিনিয়ত সামরিক খাতে বরাদ্দ বাড়াচ্ছে। সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এস আই পি আর আই) ২০২০ থেকে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোন দেশ বেশি অস্ত্র রপ্তানি করে তার তালিকা প্রকাশ করেছে।১৭ সেখান থেকে জানা যায়, বিশ্বে বছরজুড়ে ৪৩ শতাংশ অস্ত্র রপ্তানি করে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে আছে যথাক্রমে ফ্রান্স (নয় দশমিক ছয় শতাংশ), রাশিয়া (সাত দশমিক আট শতাংশ), চিন (পাঁচ দশমিক নয় শতাংশ) ও জার্মানি (পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ) অংশীদারিত্ব করে। এই তালিকায় ১০-এর মধ্যে আরো আছে ইতালি, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, স্পেন ও দক্ষিণ কোরিয়া। ফলে এসব দেশের গণমাধ্যম ও চলচ্চিত্রেও নানাভাবে তাদের তৈরি করা অস্ত্র ও প্রযুক্তির নানা প্রদর্শন চলে। এই জায়গা থেকেও নমুনায়িত সহিংস চলচ্চিত্রগুলোতে অস্ত্রের ব্যবহার ও প্রযুক্তিকে পাঠ করা যেতে পারে।


জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ জনাথনের জন্য নিয়ে আসা স্যুটটিকে বাওরি কিং পরিচয় করিয়ে দেন, এটা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি বলে। যা শক্তিশালী বুলেটের আঘাত প্রতিরোধে সক্ষম। চলচ্চিত্রজুড়েই এর প্রমাণ মেলে। খুব কাছ থেকে উন্নত পিস্তল দিয়ে গুলি করলেও জনাথন কিংবা প্রতিপক্ষ গ্যাঙয়ের স্যুট পরিহিত কারো শরীরে বুলেট ভেদ করতে পারে না। চলচ্চিত্রজুড়েই নানা অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রদর্শন করে জনাথন ও বাকি গ্যাঙয়ের সদস্যরা। এদিকে অ্যানিমেল-এ বলবীর সিংয়ের বডি ডাবলকে হত্যা করতে অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে বুলেট প্রুফ গাড়িতে যে পরিমাণ গুলি করা হয় তা অস্ত্র ও প্রযুক্তি সক্ষমতাই জানান দেয়। এক ঘণ্টা ২৯ মিনিটে হোটেলের গোলাগুলির দৃশ্যও সেসবের ইঙ্গিত দেয়। সেসময় এসব অস্ত্রকে অস্ত্র ব্যবসায়ী ফ্রেডি প্যাটেল পরিচয় করিয়ে দেনক্লিন, লোডেড, নো রেকর্ডেড মানে একেবারেই নতুন। আবার এক ঘণ্টা ৩৮ মিনিটে ফ্রেডি ৫০০ কেজি ওজনের চলমান মোটর মেশিনগানের (গাড়ির মতো দেখতে) বর্ণনা দেয় এভাবেম্যানুফ্যাকচারড ইন বেঙ্গালুরু, অ্যাসাম্বেলড ইন মহারাষ্ট্র, হান্ডেড পারসেন্ট মেড ইন ইন্ডিয়া; আত্মনির্ভর ভারত। অস্ত্রের গায়েও লেখামেইড ইন ইন্ডিয়া। তখন প্রতিপক্ষকেও দেখা যায়, অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। কিন্তু ভারতের মেশিনগানের সামনে কেউই টিকতে পারে না! মুহূর্তেই বিল্ডিং ঝাঁঝরা করে ফেলে এ মেশিনগান। পড়ে থাকে কেবল ক্ষতবিক্ষত লাশ ও ওখানকার ধ্বংসস্তুপ। অন্যদিকে মার্কোতেও নানা অস্ত্রের ব্যবহার লক্ষণীয়। তুফান-এও তা-ই। একই ধরনের মোটরগানের ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায় মার্কোতুফান-এ। ফলে অস্ত্রের ও প্রযুক্তির এই উপস্থাপন দেশগুলোর আধিপত্যেরই ধারকবাহক হয়ে ওঠে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায় হলিউডের মিশন ইমপসিবল সিরিজের চলচ্চিত্রগুলোকে। এসব চলচ্চিত্র দেখা দর্শক সহজেই টের পাবে, তাদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি কতোটা উন্নত ও অত্যাধুনিক। যা প্রতিপক্ষের (আদতে গোটা বিশ্বই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ) প্রযুক্তি ও অস্ত্রকে সহজেই নাস্তানাবুদ করতে সক্ষম। আবার হরহামেশাই দেখা যায়, যেসব ব্যক্তি কোনো দেশকে অস্ত্র সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদের জীবনীনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ হতে। এ তালিকায় বলা যায় হলিউডের ওপেনহেইমার (২০২৩) ও ভারতের ড. এ পি জে আব্দুল কালাম (মুক্তির অপেক্ষায়) এর কথা। একইভাবে বিভিন্ন যুদ্ধের ঘটনাও সব দেশে মোটামুটি চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হয়েছে/হচ্ছে, যা আদতে যুদ্ধলীলা ও প্রযুক্তির সক্ষমতাকেই গৌরবান্বিত করছে।


পানশালার এই দৃশ্যে মেশিনগানের সাহায্য তুফান সবাইকে হত্যা করে নিজের সহিংস আধিপত্যের জানান দেন।


চ. রাষ্ট্র-সমাজ কিংবা পরিবারে নেতিবাচক চরিত্রকে মহিমান্বিতকরণ

আগেই বলা হয়েছে, সহিংস চলচ্চিত্রে এমন রাষ্ট্র হাজির হচ্ছে যেখানে কোনো আইন-প্রশাসন নেই, কিংবা থাকলেও অকার্যকর। ফলে আইনভঙ্গকারী প্রোটাগনিস্টই হয়ে উঠছে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। যার মাধ্যমে প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের আইনবহির্ভূত কাজকে বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি সাধারণীকরণ করা হচ্ছে সমাজের অ্যান্টাগনিস্ট চরিত্রকে। এখন গল্প বলার ধরন ও সিনেমাটিক ভাষারও বদল ঘটেছে এটা স্বীকার করেই বলা যায়, সমাজে যেসব চরিত্র আগে অ্যান্টাগনিস্ট ভাবা হতো, সেসব চরিত্র এখন গুরুত্ব পাচ্ছে চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রাকারে।


মার্কোর এ দৃশ্যে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে একজনের শরীরকে কয়েক টুকরো করতে দেখা যায়। 


তুফান-এর তুফান, অ্যানিমেল-এর রণবিজয় সিং, মার্কোতে মার্কো হয়ে ওঠার পেছনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অস্পষ্ট। এসব সহিংস চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তুফান ও মার্কো দুইজনই গ্যাঙস্টার, রণবিজয় অসংখ্য মানুষ হত্যাকারী এবং জনাথন প্রফেশনাল কিলার; যা সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারে নেতিবাচক চরিত্র বিবেচনা করা হয়। সেইসঙ্গে সহিংস চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রকে নানাভাবে অতিমানবীয় কিংবা অন্য কোনো অবতারে হাজির করার প্রচেষ্টাও লক্ষণীয়। তুফানকে একাধিক জায়গায় পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় রাক্ষস বলে। জন্মের সময় মা মারা গেলে ধাত্রী তুফানকে সম্বোধন করেন রাক্ষস জন্ম হয়েছে বলে। আবার পালক বাবা জালালুদ্দিনও বলেন, তুফান মানুষ না, রাক্ষস। মার্কোকেও শয়তান/ডেভিল সত্তা বলে পরিবারের শিশুরা ও বড়ো ভাই জর্জ। এর ব্যতিক্রম ঘটে না অ্যানিমেলও। চার্চে রণবিজয় কনফেশন করতে গিয়ে ফাদারকে আঘাত করলে তিনি কাতরাতে কাতরাতে বলেন, তোমার ভাই শয়তান। একটা ধ্বংসকারী শক্তি। এছাড়া রণবিজয়ও নিজেকে শয়তান আখ্যা দেন। অন্যদিকে জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ জনাথনকে চলচ্চিত্রের চরিত্রসমূহের বিপরীতে অতিমানবীয় হিসেবে হাজির করা হয়; যার কাছে সবাই কেবল পরাজয়ই হয়।


নেতিবাচক চরিত্রকে উপস্থাপনের তালিকা যে দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে তারই উদাহরণ স্প্যানিস ওয়েব সিরিজ মানি হায়েস্ট-এর প্রফেসরসহ বাকি চরিত্রগুলো, যারা সবাই ব্যাংক ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত; ভারতীয় চলচ্চিত্র পুষ্পার পুষ্পা রাজ, সালার-এর সালার চরিত্র, কেজিএফ-এর রকি ভাই, বিক্রম-এর রেলেক্স চরিত্র, কাইথির দিলি, ধুম-এ চোরের চরিত্র, ডন-এ দাগী আসামির চরিত্র, রইস-এর মাফিয়া, কুরুপ-এর (২০২১) গ্যাঙস্টার চরিত্র, লাকি ভাস্কার-এ (২০২৪) ব্যাংক কর্মকর্তার দুর্নীতিকে মহিমান্বিত করে হাজির করা হয়। একই কথা বলা যায় বাংলাদেশের সুড়ঙ্গ, বরবাদতাণ্ডব-এর প্রোটাগনিস্ট চরিত্রের বেলাতেও। এসব চরিত্রকে কীভাবে মহিমান্বিত করা হয় তার উদাহরণ হতে পারে শাহরুখ খান অভিনীত কিং চলচ্চিত্রের ট্রিজার মুক্তির পরের ঘটনা। শাহরুখ খান নিজেই চরিত্রের বর্ণনা দেন এভাবেকিং আদতে একজন মন্দ লোক। অনেক মানুষ খুন করেছে সে। চরিত্রটা একদমই নেগেটিভ ও ডার্ক শেডের। মারাত্মক নির্মম ও দয়া-মায়া ছাড়া একজন মানুষ। সবাই আমাকে নতুন রূপে দেখতে পারবে আশা করি।১৮ খানের এই বক্তব্য নেতিবাচক চরিত্রকে একপ্রকার বৈধতাই দেয়। বৈশ্বিক চলমান যুদ্ধ বাস্তবতায় পুঁজির প্রবাহকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের ডার্ক শেডের চরিত্রের উপস্থিতি যে বড়ো পর্দায় আরো বাড়বে সেটা অনুমেয়। যা দিনশেষে শাহরুখ খানের মতো অভিনয়শিল্পীদের কিংবা অন্যান্য পুঁজি মাফিয়াদের বিলিয়নিয়ার থেকে ট্রিলিয়নিয়ার করে তুলবে যুদ্ধের এ মহামারিতে তাদের অতিধনী হওয়া তারই ইঙ্গিত দেয়।১৯


ছ. ধ্বংসলীলায় টিকে থাকা অতিমানবীয় প্রোটাগনিস্ট চরিত্র

সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্রে প্রোটাগনিস্ট চরিত্রকে এতোটাই অতিমানবীয়/সর্বেসর্বা করে তোলা হয় যে, তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে চলে যায়। আরো স্পষ্ট করে বললে, প্রোটাগনিস্ট শেষ পর্যন্ত মৃত্যুক জয় করবে কোনো না কোনোভাবেই। তিনি অন্যদের যে কায়দায় হত্যা করবে, বিপরীত চরিত্রগুলো একই কৌশল অবলম্বন করেও তাকে মারতে পারবে না। যা এ ধরনের চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।


অ্যানিমেল-এ ডাক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী ৩০০ জনকে হত্যা করতে গিয়ে রণবিজয়ের শরীরে ছয়টা গুলি লাগে। তার বেঁচে থাকার আশা ডাক্তাররা একপর্যায়ে ছেড়ে দেন। তবে রণবিজয়ের ভাষ্য মতে, তিনি মৃত্যুকে পরাজিত করবেন। তেমনটাই হয়। সুস্থ হয়ে তিনি আবরারকে হত্যা করেন। এ চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্টকে অতিমানবীয় করে তোলা হয় ৩০০ জন অস্ত্রধারীর সঙ্গে একা লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, কিংবা শেষ দিকে রানওয়েতে মারামারির দৃশ্যে। সেসময় দুইপক্ষের গ্যাঙ ও অস্ত্র থাকলেও কেবল দুইজন রিক্ত হাতে মারামারি করে। সেখানকার একজন এই ঘটনাকে আরো মহিমান্বিত করেন এভাবে যেতারা দুই ঘণ্টা ধরে একজন আরেকজনকে ইচ্ছামতো মারছে।


তুফান চলচ্চিত্রের এ দৃশ্যে তুফান পয়েন্ট ব্লাঙ্ক থেকে একজনকে হেডশট করেন। তখন রক্ত ফিনকি দিয়ে তার মুখে এসে পড়ে।


এদিকে মার্কোর শরীরে একাধিক অস্ত্রের আঘাতে অবিরত রক্ত ঝরলেও পরক্ষণেই নিজেই শরীর সেলাই করে শেষ দিকে হাজির হন প্রতিশোধ নিতে। প্রতিপক্ষ গ্যাঙের সঙ্গে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাই লড়ে যান। নানাভাবে হত্যা করেন অসংখ্য মানুষকে। আর তুফান-এ এ সি আকরাম ও তার দল তুফানকে চারটি গুলি করলেও শেষ দৃশ্যে দেখা যায় তিনি বেঁচে আছেন! এসব চরিত্রকে ছাপিয়ে যায় জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এর জনাথন ও অন্যান্য চরিত্র। তিন-চার তালার উপর থেকে পড়েও কারো কিছু না হওয়া এবং খুব কাছ থেকে গুলি করেও জনাথনকে হত্যা করা যায় না। তিনি তার স্যুটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবারই গুলি প্রতিহত করেন। এদিকে জনের প্রাক্তন বন্ধু কিলার কেইন অন্ধ হয়েও যেভাবে বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহারে নিজের নৈপণ্যতা দেখানযে কেউ ভাবতে বাধ্য হবে এটা নিশ্চয়ই অতিমানবীয় কোনো ব্যাপার! ফলে দর্শকের এমনটা মনে হতে পারে এসব চরিত্র অনেকটা ভিডিও গেমের আদলে করা; যেখানে চাইলেই বার বার জীবন ফেরত পাওয়া সম্ভব, নতুন করে হত্যা ও প্রতিশোধ নিতে।


জ. নিকট সম্পর্ক ও দীর্ঘ মারামারি দৃশ্যে চলমান যুদ্ধ বাস্তবতা

ইউরোপীয় রেনেসাঁস, আলোকায়ন কিংবা আধুনিকতার ধারণা নানা সময়ের তাদের হাত ধরে হওয়া যুদ্ধ-সংঘাতের কারণে আলো ছড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্বব্যাপী বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হওয়া ও চলমান যুদ্ধের কোনো মীমাংসায় পৌঁছাতে না পারা, জাতিসংঘের মতো যেসব প্রতিষ্ঠান কিংবা জোট রয়েছে তাদেরকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। প্রভাব-প্রতিপত্তি, অর্থ ও সামর্থ্যের মানদণ্ডে নিজেদের সভ্য দাবিকারীদের স্বার্থগত দ্বন্দ্বেই যে বিশ্বে একাধিক যুদ্ধ-সংঘাত চলমান, সেটা যে কেউ স্বীকার করে নিবে। ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ (যুদ্ধবিরতি চললেও ৪৪ দিনে ৪৯৭ বার বিধি লঙ্ঘন করে মানুষ হত্যা চলছেই২০) রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ (আদতে এটা রাশিয়ার সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রক্সি যুদ্ধ), আফ্রিকার দেশগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের যখন-তখন আক্রমণ, মিয়ানমার, কিংবা অন্যান্য দেশে দীর্ঘদিন থেকে নানাভাবে যুদ্ধ চলমান। যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। এখন নানা সময়ের মিত্রদের সঙ্গেও স্বার্থগত কারণে যুদ্ধে জড়াতে কারো কার্পণ্য নেই। সহিংস চলচ্চিত্রের দীর্ঘ মারামারির দৃশ্যকে চলমান সম্পর্ক ও যুদ্ধ বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে হাজির করা যায়।


জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ একাধিক দীর্ঘ মারামারির দৃশ্য রয়েছে। জাপানিজ হোটেলে আগ্নেয়াস্ত্র বনাম তীর-ছুরির যে লড়াই তা ২৯ মিনিটে শুরু হয়ে সমাপ্তি ঘটে ৫৫ মিনিটে; ২৬ মিনিট চলে সহিংস সংঘাত। আবার এক ঘণ্টা ২১ মিনিটে শুরু সহিংস মারামারি শেষ হয় এক ঘণ্টা ২৯ মিনিটে। পার্টিতে উপস্থিত মানুষজনের এ দৃশ্য দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখানো চলমান বৈশ্বিক যুদ্ধে কারোরই ভ্রুক্ষেপ না করার নামান্তর বলা চলে। এদিকে এক ঘণ্টা ৫৬ মিনিটে আরম্ভ হওয়া হত্যাযজ্ঞ মোটামুটি পরের ৩০ মিনিট চলে। দীর্ঘ এই সহিংস সংঘাতের আগে-পরে ছোটো খাটো আরো বেশ কয়েকটি মারামারির দৃশ্যও রয়েছে। চারদিকেই শত্রু, তাই লড়াই করেই টিকে থাকতে হবে, জনাথনের অন্ধ বন্ধু কেইনকে এ কথা বলতে শোনা যায়। তিনি আরো বলেন, দুনিয়ায় জনাথনের বন্ধুর সংখ্যা কম, শত্রুই বেশি। এ যেনো চারদিকে কেবল শত্রু শত্রু খেলা। সংলাপটা ভিডিও গেইমের মতোই শোনায়। দুই বন্ধুর মধ্যে মারামারি চলে বেশ কয়েকবার। এছাড়া চলচ্চিত্রে কেবল শরীরের উপরের অংশেই গুলি করতে দেখা যায়। যাকে হেডশট বলে আরকি। আর মারামারিরও কিছু রুলস আছে গেইমের মতো। তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে মেনে চলে সেসব। লড়াইয়ে আমন্ত্রণ জানানোর দৃশ্যে মারকুইস ও জন একটা গেইম খেলে। ওই গেইমে যে বেশি পয়েন্ট পায় সে তার পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয় মারামারির স্থান কোথায় হবে, অস্ত্র থাকবে কোন ধরনের। এর বাইরেও বলা যায়, ভিডিও গেইমের আদলে এ চলচ্চিত্রের বেশ কয়েকটা মারামারির দৃশ্য চিত্রায়ণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে একেবারে শেষ দৃশ্যের কথা বলা যায়; যেখানে জন ও কেইন মৃত্যু খেলায় অবতীর্ণ হয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে একে অন্যকে গুলি করতে থাকে। একেবারে মেরে ফেলার আগ পর্যন্ত চলতে থাকে এ খেলা। নির্মাতা চ্যাড স্ট্যাহেলস্কি অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে ভিডিও গেইম থেকে বেশ কয়েকটা দৃশ্যের অনুপ্রেরণা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং চলচ্চিত্রে তার প্রয়োগ ঘটানোর কথাও জানান।২১


এক সময়কার বন্ধু কেনের সঙ্গে জন উইক হাই টেবিলের গেমের রুলস মেনে লড়াইয়ে সামিল হন। বন্ধুকে হত্যা করে নিজেকে তিনি হাই টেবিলের নিয়মের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করেন। 


মার্কোতেও এমন দীর্ঘ সংঘাতের একাধিক দৃশ্য আছে। এক ঘণ্টা ১২ মিনিট থেকে ২১ মিনিট পর্যন্ত চলে জঙ্গলের মধ্যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ; আর এক ঘণ্টা ২৯ মিনিটে শুরু হওয়া সহিংস হত্যাকাণ্ড চলে পরবর্তী মিনিট ছয়েক ধরে। শেষ দিকে বাড়িতে এসে মার্কোর পরিবারকে মারার দৃশ্যটা ১২ মিনিটের। তখন মার্কো বাদে সবাই নৃশংস হত্যার শিকার হয়। পরক্ষণেই বদলা নিতে মার্কো ছোটে প্রতিপক্ষের আস্তানায়। সেখানেও মিনিট নয় চলে সহিংস সংঘাত। এদিকে তুফান-এ হাসপাতালে বাবাকে উদ্ধারের কয়েক মিনিটের মারামারির দৃশ্যের পাশাপাশি আরো বেশ কয়েকটা মারামারির দীর্ঘ দৃশ্য রয়েছে। অ্যানিমেল-এও বেশ কয়েকটা দীর্ঘ মারামারির দৃশ্য লক্ষণীয়। হোটেলে ৩০০ জনের সঙ্গে মারামারির দৃশ্য শুরু হয় এক ঘণ্টা ২৯ মিনিটে, শেষ হয় এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিটে এসে; আর রানওয়ের সংঘাত দুই ঘণ্টা ৫৭ মিনিটে আরম্ভ হয়ে আট মিনিট ধরে চলতে থাকে।


শত্রুতার এ লড়াইয়ে কাছের মানুষগুলো যেকোনো সময় শক্রতে পরিণত হতে পারেতুফান-এ বাবাকে হত্যা, মার্কোতে ব্যবসায়িক পার্টনার, অ্যানিমেল-এ ভাইদের মধ্যে মারামারি আর জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এ নিজ গ্যাঙ ও বন্ধুর সঙ্গে সংঘাত তাই প্রমাণ করে। বৈশ্বিক যুদ্ধগুলো খেয়াল করলেও পাঠক এই পরিস্থিতিটা সহজে অনুধাবন করতে পারবেএখন যে বন্ধু, স্বার্থ সংঘাতে পরক্ষণই সে শত্রু হতে পারে!


ঝ. অতিমাত্রায় চলমান সহিংসতা ও অত্যধিক বলপ্রয়োগের হালচাল

সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের এক ভিডিওতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান খান কামাল-এর সঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটানের এক পুলিশ সদস্যের কথোপকথন ছিলো এমনগুলি করে করে লাশ নামানো লাগছে স্যার। গুলি করলে মরে একটা, কিংবা আহত হয় একটা। একটাই যায় স্যার, বাকিডি যায় না। এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।২২ রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে থাকতে হাসিনা সরকারের অত্যধিক বলপ্রয়োগের কথা এ দেশের জনগণের অজানা নয়; কিংবা ফিলিস্তিনিদের গাজা ত্যাগ করাতে ইসরায়েলি গণহত্যা ও সুদানিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চলছে, সেটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার। সহিংস চলচ্চিত্র চলমান বাস্তবের অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ ও সহিংসতারই প্রতিধ্বনি করে বলে মনে হয়।


মার্কো চলচ্চিত্রের এই দুটি নৃশংস দৃশ্যের একটিতে লক্ষ করা যায় গাছ কাটার যন্ত্র দিয়ে মার্কো মানুষ কাটছে।অন্যটিতে ধারালো ছুড়ি দিয়ে হাত কেটে ফেলে।  


নমুনায়িত চারটি চলচ্চিত্রেই একজনকে মারতে একাধিক গুলি কিংবা অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। পুলিশের কাছে সবকিছু বলে দিয়েছে সন্দেহে তুফান তার বাবাকে একের পর এক গুলি করেন। মরে যাওয়ার পরও পিস্তলের ম্যাগজিন খালি না হওয়া পর্যন্ত চলে গুলি চলে। সেইসঙ্গে কথা বলাতে ঘুমের ব্যাঘাত হওয়ায় গুলি করে হত্যা, তুফানের আদেশ অমান্য করে মডেল সূচনার সঙ্গে নাচার কারণে অভিনয়শিল্পীকে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে। আবার হত্যা ও অস্ত্র ব্যবসা কম হওয়ায় দুইজনকে গুলি করে হত্যা করেন তুফান। এছাড়া হোটেলে তিরস্কার করায় রাজনৈতিক দলের সদস্যদের মারতে যেই মেশিনগান ব্যবহৃত হয়, তা অত্যধিক বলপ্রয়োগের নমুনা হিসেবেই চোখে পড়ে।


এদিকে মার্কোর সময় এগোতে থাকলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে নানামাত্রিক সহিংসতাও। জঙ্গলে মারামারির দৃশ্যে শুধু রক্ত আর অঙ্গবিহীন মানুষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। আধমরা ওই মানুষদের মার্কো কাঠকাটার মেশিন দিয়ে কাটতে থাকেন! এছাড়া শেষ দিকে মার্কোর প্রেমিকার কপাল দেয়ালে থেতলানো, পরে স্ক্রড্রাইভার জাতীয় কিছু পেটে ঢুকিয়ে তাকে মারা হয়। অন্যদিকে জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এও বেশ কয়েকটি দৃশ্যে একাধিক গুলির পর ছুরির ব্যবহার করা হয় হত্যার ঘটনায়। এখানে নানা চরিত্রের যে উপস্থাপন, অস্ত্র দিয়ে আঘাত ছাড়া লাথি কিংবা ঘুষিতে কারো শরীরের যেনো রক্তই বের হয় না! আর অ্যানিমেল-এ হোটেলের মধ্যে অত্যাধিক গুলির কারণে রক্ত ও মানুষ তুলার মতো উড়তে থাকে। সবাইকে হত্যার পরও চলতে থাকে গোলাগুলি। এতে দেয়ালের বেশকিছু অংশ ভেঙে পড়ে! আবার কলেজে বোনকে র‍্যাগিংয়ের কারণে এ কে ফোরটি সেভেন নিয়ে যাওয়া এবং ক্লাস রুমে গুলি চালিয়ে সবাইকে ভয় দেখানোর মতো ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়। এছাড়া বলবীর সিংয়ের বডি ডাবলকেও ২৫-৩০ জন অত্যাধুনিক পিস্তল দিয়ে অগণিত গুলি করে হত্যা করে। এসব যে কেবল ক্ষমতা প্রদর্শন ও বলপ্রয়োগের নমুনা সেটা স্পষ্ট হওয়া যায় রণবিজয়ের কথায়। যখন তিনি বলেন, এতো সম্পদ থেকে লাভ কী যদি নিজেদের কলেজেই র‌্যাগিংয়ের শিকার হতে হয়! তাই বলা চলে ক্ষমতা ও সক্ষমতার কারণে বাস্তবে বলপ্রয়োগের যে চিত্র হরহামেশাই দেখা যায় নানা যুদ্ধ ও সংঘাতে, তারই প্রতিফলন ঘটছে সহিংস চলচ্চিত্রে।


ঞ. বীভৎস সহিংসতায় অভ্যস্ত হচ্ছে দর্শক

চলচ্চিত্রে সহিংসতা যেভাবে আসছে তা অনেক দর্শকের জন্য দেখা কঠিন। হয়তো এর মধ্য দিয়েই দর্শক সহিংসতা দেখাতে আরো অভ্যস্ত হবে! এসব না দেখা দর্শকের ট্রমাটাইজ হওয়ার কারণও হতে পারে, এই ধরনের দৃশ্য। নমুনায়িত চলচ্চিত্রে একই ধরনের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটায় প্রোটাগনিস্ট চরিত্রগুলোকে আলাদা করা কঠিন।


গ্যাসের সিলিন্ডার দিয়ে মার্কোর পরিবারের এক শিশুকে এভাবেই মাথা থেতলিয়ে নৃশংসতার সঙ্গে হত্যার করা হয়।



মার্কোতে নবজাতককে জোর পূর্বক মায়ের গর্ভ থেকে বের করে তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায় এ দৃশ্যে। স্থান ত্যাগের আগে অ্যান্টাগনিস্ট বর্বরভাবে মুখের ভেতরে চাকু ঢুকিয়ে মাকে হত্যা করে। 


শুরুতেই হাজির করা যাক জন উইক : চ্যাপ্টার ফোর-এর বীভৎসতা। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হওয়া, কুকুর দিয়ে মানুষকে ছিড়ে খাওয়ানো, হাতে চাকু ঢুকিয়ে দিলে চাকু না তুলে হাত টেনে বের করে আনার দৃশ্য, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে মাথায় কোপ দেওয়ার দৃশ্য লক্ষ করা যায়। সেইসঙ্গে হাই টেবিলের সদস্যপদ ফিরে পেতে জন ও তার সৎ বোন কাটিয়া’র ফুটন্ত লোহা গরম করে একসঙ্গে নিজেদের হাতে ট্যাটু করা, গাড়ি চাপায় বীভৎসভাবে মারা ও আগুনে পুড়ে দৌড়ানোর দৃশ্যগুলোকী নৃশংস, কী বীভৎস! আর তুফান-এ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা, দা দিয়ে জবাই করা, এক কোপে ঘাড় থেকে মাথা দ্বিখণ্ডিত করা এবং শটগানে পয়েন্ট ব্ল্যাংক থেকে গুলির পর রক্ত শরীরে ঝাপটে পড়ার দৃশের মাধ্যমে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সহিংসতাকে শৈল্পিকভাবে দেখানোর নতুন যাত্রা শুরু করেছে। তুফান পরবর্তী বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে তা আরো সহিংসতর হয়েছে।


এদিকে বলিউডের অ্যানিমেল-এ গ্রেনেড ব্লাস্টে সারা শরীর রক্তাক্ত হওয়া, হাত কেটে নেওয়া, মুখের ভেতরে গুলি করা, তিন শতাধিক মানুষকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা, দুই পাশে লাশের স্তুপ জমা হওয়া, কাটা চামচ দিয়ে শরীর ও চোখে আঘাত করে মারা, গলা কেটে হত্যা এবং মুখ হাত বেধে চাপাতি দিয়ে দুইজনকে কোপাতে কোপাতে পুরো ঘরের দেয়াল রক্তাক্ত করার দৃশ্য রয়েছে; যা দেখে জয়া বমি করে দেন! বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের শটে দর্শককে এসব দৃশ্য দেখানোর চেষ্টা চলে। অবশ্য দক্ষিণ ভারতের মার্কো উপরে বর্ণিত সব ধরনের সহিংসতাকেই ছাপিয়ে যায়। হাইড্রোফ্লোরিক এসিডে ভিক্টোরকে ফেলতেই শরীরের কঙ্কাল থেকে মাংস গলে আলাদা হয়ে যায়! মাংস ও রক্ত পড়ার এ দৃশ্য ক্লোজশটে দেখানো হয়। ক্ষতবিক্ষত এই কঙ্কাল পুলিশ যখন পায়, তখন দেখা যায় সেখান থেকে পোকা বের হচ্ছে! এছাড়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ সহিংসভাবে কেটে ফেলে রাখা, একাধিক কুকুরের মুখ টেনে ছেড়া ও চোখ উপড়ে ফেলার বীভৎস দৃশ্যও আছে এ চলচ্চিত্রে। কাঠকাটার মেশিনে হাত-পা কাটা, কামড়ে কান ছিড়ে ফেলা, ছুরি দিয়ে গলা কাটা, পেটের নাড়িভুড়ি বের করে ফেলার মতো সহিংসতাও লক্ষ করা যায়।


সেইসঙ্গে বোমা ব্লাস্ট করে শরীর দ্বিখণ্ডিত হয়ে যাওয়া, আরেক দৃশ্যে বোমার আঘাতে শরীরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া, টেবিলের উপরে রেখে একজনকে চাপাতি দিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটার ভয়ঙ্কর দৃশ্যও চোখে পড়ে। পাশাপাশি মার্কোর পরিবারকে হত্যার দৃশ্যগ্যাস সিলিন্ডারের বোতল দিয়ে একাধিক বার বাচ্চাদের মাথা থেতলানো, বাচ্চাদের ফাঁসি দেওয়া, চাকু গিয়ে মুখে কেটে ফেলা, উপর থেকে সিঁড়ির রেলিংয়ে ফেলাবীভৎসভাবে হাজির হয়। এসব দেখে জর্জের স্ত্রী কান্না করলে তার গাল ছিড়ে ফেলা হয়। যা দর্শক দেখতে থাকে ক্লোজ শটে। ওই দৃশ্যে আরো দেখা যায়, বাচ্চা প্রসবের সময় নার্সদের গলায়, মুখে চাকু ঢুকিয়ে মেরে ফেলতে। বাচ্চা প্রসবে দেরি হওয়ায় সজোরে মায়ের পেটে আঘাত করে নবজাতককে টেনে বের করে চাকু দিয়ে নাড়ি কাটা হয়। পরে নবজাতককে উল্টো করে পায়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে মায়ের মুখে চাকু ঢুকিয়ে মেরে ফেলা হয়! এই সহিংসতায় বেঁচে থাকা মার্কোকে দেখা যায়, প্রতিশোধ নিতে যাওয়ার আগে নিজের শরীর নিজেই সেলাই করতে। তিনি একজনের গলা কাটা মাথা হাতে সেখানে উপস্থিত হন। যেখানে মেশিনগানের গুলিতে প্রতিপক্ষের রক্ত ও শরীরের অঙ্গপ্রতঙ্গ বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। শেষ পর্যায়ে মার্কো হাত টেনে ছিড়ে ফেলার পাশাপাশি হাত দিয়ে বুক চিড়ে একজনের কলিজা বের করে আনেন। পরে অ্যান্টাগনিস্ট সাইরাসের গলা কেটে ফেলার মধ্য দিয়ে মার্কো চলচ্চিত্রের সহিংসতা শেষ হয়।


এই মেশিনগানটি দেখতে অনেকটা গাড়ির মতো। নাড়াচাড়া করার সুবিধা ও অধিক গুলি বের হওয়ার কারণে রণবিজয় প্রতিপক্ষকে সহজেই এর মাধ্যমে কুপোকাত করতে পারেন। 


মানুষের মধ্যে পশুসুলভ যে বৈশিষ্ট্য ও প্রবৃত্তি, কার্ল ইউং যাকে পশু আদিরূপ (শ্যাডো আর্কিটাইপ)২৩ বলে সম্বোধন করেছেন। মানুষের মধ্যে নীতিবহির্ভূত কোনো কিছু করার যে প্রবণতা তা মূলত এই আর্কিটাইপ থেকে জন্ম নেয়। ইউং আদতে বলতে চান, এই আকির্টাইপ পূর্ব পুরুষদের কালেক্টিভ আনকনশাসে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সহিংস চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্ট থেকে অন্যান্য পুরুষ চরিত্রে তারই দেখা মেলে। যেনো তারা তাদের পূর্ব প্রজন্মের সহিংসতার সিলসিলাকেই বহন করছে। এদিকে অহিংস যোগাযোগবিদ হিসেবে খ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী মার্শাল রোজেনবার্গ বলেন, মানুষ জন্মগতভাবে সহিংস নয়। চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতিই মানুষকে সহিংস করে তোলে।২৪ যার মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে মিন ওয়ার্ল্ড সিনড্রোম তৈরি হয়। এর ফলে মানুষ মাত্রই সহিংসতাপূর্ণ, পৃথিবী খারাপ জায়গা এই ধারণা পোষণ করে ভয়, সন্দেহ ও অনাস্থা বাড়াতে থাকে। বাস্তব ও দৃশ্যমাধ্যমে সহিংসতা দেখার ফলে এই পরিস্থিতি যে মানুষের মধ্যে তৈরি হবে/হচ্ছে, সেটা অস্বীকার করা কঠিন।


চলচ্চিত্র অংশীজনদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সহিংসতার উপস্থাপন ও দর্শকের মনস্তত্ত্ব

একজন চলচ্চিত্রনির্মাতা কাজ দিয়েই দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। তারা কাজের যদি নিজস্ব ধারা তৈরি করতে পারে, সেটার মধ্য দিয়ে পেতে পারে অত্যর নির্মাতার তকমা। চলচ্চিত্র ইতিহাসে খুব কম নির্মাতাই নিজস্বতার ছাপ দর্শক মনে স্মরণীয় করে রাখতে পেরেছে/পারছে। এর বিপরীতে এমন নির্মাতাও আছে, যারা ট্রেন্ডকে অনুসরণ করে ব্যবসায়িক সাফল্য পেলেও একটা সময় বিস্মৃতি হয়ে গেছে। কিংবা কেউ কেউ ব্যবসায়িক সফলতা অথবা খ্যাতি কোনোটাই পায়নি। এখন প্রযুক্তির কারণে ভিজ্যুয়ালের সঙ্গে দর্শকের নিয়মিত মোলাকাতের সুযোগ অনেক বেড়েছে। দীর্ঘদিন এই ভিজ্যুয়াল কালচারে থাকার ফলে দর্শকেরও ভিজ্যুয়াল সম্পর্কে এক ধরনের বোধ তৈরি হয়। যদিও এই তালিকার দর্শকের সংখ্যা হাতেগোনা। সহিংসতার আলাপ রেখে এই ভণিতার উদ্দেশ্য একটাই, যেসব নির্মাতারা চলচ্চিত্রে সহিংসতা দেখায় তাদের মনস্তত্ত্বে দর্শকের অবস্থান কেমন, দর্শককে তারা কী বার্তা দিতে চায়, তা পাঠের চেষ্টায় অগ্রসর হওয়া।


সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র ও সহিংসতার প্রসঙ্গ আসলেই শুরুতেই দক্ষিণ কোরিয়ান চলচ্চিত্রনির্মাতা কিম কি-দুককে স্মরণে নিতে হয়। তিনি চলচ্চিত্রে সহিংসতা, নীরবতা ও ভিজ্যুয়ালের ব্যবহারের জন্য জগদ্খ্যাত। সহিংসতাকে আড়াল না করে বরং শিল্পের মধ্য দিয়ে প্রকাশকে কিম জোর দেন; যার মাধ্যমে তিনি দর্শকের সামনে বাস্তবতাকে তুলে ধরতে চান।২৫ যেখানে সহিংসতার ভেতরে নীরবতা ও এক ধরনের মানবিক বেদনা কিংবা নৈতিক প্রশ্ন লুকানো থাকে। কিমের নির্মিত দ্য ইজেল, অ্যাড্রেস আননোন, ব্যাড গাই কিংবা মবিয়াস দিনশেষে দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টেশন নিয়ে। তার দেখানো সহিংস দৃশ্যগুলো একেবারেই র, অস্বস্তিকর ও দীর্ঘস্থায়ী; যা দর্শক হিসেবে দেখতে বসলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। যে জীবন তিনি যাপন করেছেন তার আত্মসমালোচনারও বহিঃপ্রকাশ ঘটে এসব সহিংসতায়। যার কারণে তার চলচ্চিত্রের সহিংসতা শৈল্পিক নয় বরং সমাজ, সম্পর্ক আর মানবিক যন্ত্রণার নগ্ন রূপকে হাজির করে। নিজে গল্প বলার ক্ষেত্রে সহিংসতার আশ্রয় নিলেও কিম হলিউডের শৈল্পিক কিংবা বিনোদনমূলক সহিংসতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।


হলিউড নির্মাতা মার্টিন স্করসিস-এর চলচ্চিত্রসফর দীর্ঘদিনের। তিনি কিমের আগের প্রজন্মের হলেও বর্তমানে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। সহিংসতা নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা কিমের মতোই। স্করসিস মনে করেন, সহিংসতা গল্পের চরিত্রের বাস্তবতার অংশ। যার কারণে তিনি এটাকে গ্ল্যামারাইজ করতে চান না।২৬ ফলে তার চলচ্চিত্রে যেসব সহিংস দৃশ্য আসে সেগুলো খুব সুশৃঙ্খলিতও নয়; যেনো বাস্তব জীবনের অংশ। এদের থেকে অনেকটা বিপরীত চিন্তাভাবনা লক্ষণীয় যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক চলচ্চিত্রনির্মাতা কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর সহিংসতা রিপ্রেজেন্টেশনে। তিনি সহিংসতাকে শৈল্পিক বিনোদন হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। তার কিল বিলডিজেনগো আনচেইনজড চলচ্চিত্রে সহিংসতার দেখা মেলে প্রায় কার্টুনের মতো অতিরঞ্জিত আকারে। তার মতে, তিনি সহিংসতায় আনন্দ পান। এবং চলচ্চিত্রে সহিংসতা দেখানো মানেই সমাজে সহিংসতা বাড়ানো নয়।২৭ একই ধরনের চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় ভারতীয় নির্মাতা সন্দীপ রেড্ডি ভঙ্গার ভাবনায়। ভঙ্গা বর্তমান প্রজন্মের দর্শকের কাছে পরিচিত আর্জুন রেড্ডি (২০১৭) ও এর হিন্দি রিমেক কাবির সিং (২০১৯) দিয়ে। রোমান্টিক সম্পর্কে শারীরিক ও মানসিক সহিংসতাকে তিনি হাজির করেছেন এই দুটি চলচ্চিত্রে। অবশ্য শৈল্পিক সহিংসতার দৃষ্টান্ত তার অ্যানিমেল ও ওই দুইটি চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রে দেখানো সহিংসতা নিয়ে ভঙ্গার দৃষ্টিভঙ্গি এমনপ্রেম মানে শুধু মিষ্টি অনুভূতি নয়; এতে ঝগড়া, দখলদারি, আঘাত ও তীব্র আবেগ সবই মিশে থাকে। তাই তিনি মনে করেন, চরিত্র যদি সত্যিকারেরপ্যাশনেট হয়, তার আচরণে সহিংসতা স্বাভাবিক। ভঙ্গা বলতে চান, তার চরিত্রগুলো বাস্তব জীবনের মানুষের মতো। সেই বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলতেই তিনি সহিংসতা ব্যবহার করেন। ভঙ্গা এই কথা বললেও তার চলচ্চিত্রে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টেশন অনেকটা আরোপ করা কিংবা শৈল্পিকই মনে হয়। কাবির সিং মুক্তির পর ভঙ্গার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে নারীর প্রতি পুরুষের সহিংস আচরণকে বৈধতা দেওয়ার। এর জবাবে তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যদি কোনো সম্পর্কে মারামারি, তর্ক বা চড়-থাপ্পড় না থাকে, তবে সেটা আসল প্রেম নয়।২৮ এর মধ্য দিয়ে তিনি আসলে সহিংসতাকে রোমান্টিসাইজ করেন বলেই মনে হয়।


অন্যদিকে ভারতের দৃশ্যমাধ্যমে সহিংসতার গল্প বলতে গেলে গ্যাংস অব ওয়াসেপুরমির্জাপুর ওয়েব সিরিজের প্রসঙ্গ আসবেই। এইসব সহিংস কনটেন্ট দেখা দর্শক স্বীকার করে নিবে এটা কেবল এই অঞ্চলের মানুষেরই সহিংসতা গল্প। অন্যান্য জায়গার সঙ্গে খুব সহজেই এই অঞ্চলের সহিংসতার পার্থক্য করা যায়। কিন্তু বর্তমান চলচ্চিত্রে কিংবা ওয়েব সিরিজে সহিংসতার নামে যা দেখানো হয় সেখানে আঞ্চলিকতার টোন একেবারে পাওয়া যায় না। এ ধরনের সহিংসতা উপস্থাপনের কারণ হিসেবে গ্যাংস অব ওয়াসেপুর নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ যুক্তি দেন, তার চলচ্চিত্রে দেখানো সহিংসতা হিংসাকে মহিমান্বিত না করে বরং ভারতীয় সমাজের বাস্তবতারই প্রতিফলন ঘটায়। তিনি আরো বলেন, চলচ্চিত্রে সামাজিক বাস্তবতাকে আড়াল করা উচিত নয়।২৯ এই জায়গা থেকে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টেশন লক্ষ করা যায় তার চরিত্রগুলোতে; যেখানে নেই কোনো বাড়াবাড়ি কিংবা শৈল্পিকভাবে আরো মহিমান্বিত করার ব্যাপার।


অ্যানিমেল-এর পোস্ট ক্রেডিট দৃশ্যে সহিংস অবতারে হাজির হন রণবিজয় সিংয়ের বডিডাবল এই চরিত্র (আবরার হকের ভাই)।


অনেকটাই অনুরাগ কাশ্যপের চিন্তার প্রতিধ্বনি লক্ষ করা যায় ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা সৃজিত মুখার্জী’র সহিংসতা রিপ্রেজেন্টেশনে। সহিংসতা সৃজিতের অনেক চলচ্চিত্রে গুরুত্ব সহকারে এসেছে যাপিত জীবনের অংশ হিসেবে। এর কারণ সৃজিতের মতে,


আমার মধ্যেই তো প্রচুর ভায়োলেন্স। অনেক ভায়োলেন্ট জিনিস পড়েছি। ... দেখেছি। আমি যে পাড়ায় বড় হয়েছি সেটাই বেশ ভায়োলেন্ট ছিল। ভবানীপুরের গলির মধ্যে গ্যাং-ওয়ার দেখেছি ...। লিঙ্গুইস্টিক ভায়োলেন্স আমি বাংলা সিনেমায় এনেছি। ... আই কাম ফ্রম আ ব্রোকেন হোম। তাই বাড়িতেও প্রচুর ভায়োলেন্ট সিনস দেখতে হয়েছে। অতএব আমার পৃথিবীটাই আমার সিনেমায় ধরা পড়েছে। ... আমার জীবনটা অ্যাকচুয়ালি বাইশে শ্রাবণ (হাসি)। বাংলা কবিতাও আছে, খিস্তিও আছে, রক্তপাত, নৃশংসতা সব আছে।৩০


সৃজিতের চলচ্চিত্রে সহিংসতা আসলেও সেটা শৈল্পিকভাবে আসে নাই বলেই মনে হয়। যা অনেকটা গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে, বাস্তবের মতো করে। এদিক থেকে এ সময়কার বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় নির্মাতা রায়হান রাফীর চলচ্চিত্রে দেখানো সহিংসতায় একটু ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। তার চলচ্চিত্রে দুইভাবেই সহিংসতা হাজির হয়েছে। ফ্রাইডে, জানোয়ার কিংবা অমীমাংসিততে সহিংসতা এসেছে বাস্তবের মতো করে। আর পরাণ, তুফানতাণ্ডব-এ সহিংসতা অনেকটা শৈল্পিকভাবেই হাজির হয়। তুফান-এ রাফী যে ধরনের সহিংসতা দেখিয়েছিলেন তাণ্ডব-এর ফরকাস্ট/ট্রিজার মুক্তির পর রাফী বলেছিলেন, ফোরকাস্টে যা দেখিয়েছি সেটা তো কিছুই না। দর্শকরা ধারণাও করতে পারবেন না যে তাদের জন্য আরো কী কী রয়েছে।৩১ প্রযুক্তির ব্যবহার ও সহিংসতাপূর্ণ দৃশ্যের রিপ্রেজেন্টেশনে যে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছেন, সেই ইঙ্গিতই মূলত রাফী এ আলাপে দিয়েছিলেন। তিনি তাণ্ডব-এ সেটা করেও দেখিয়েছেন। তুফান কিংবা তাণ্ডব-এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সহিংসতার মাধ্যমে গল্প বলার যে প্রক্রিয়া সেটারই প্রতিফলন দেখা যায় বরবাদ কিংবা ইনসাফ-এও। যেখানে নির্মাতাদের মধ্য এক ধরনের প্রতিযোগিতা লক্ষণীয় কে কার থেকে সহিংসতাকে শৈল্পিক ভাবে হাজির করবে। এসব চলচ্চিত্র দেখলে মনে হবে গল্পের প্রযোজনে সহিংসতা না এসে বরং সহিংসতাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে গল্প রেপ্রিজেন্টেশনের কৌশল হিসেবে।


যাইহোক, নির্মাতাদের কিংবা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের সহিংসতা দেখানো নিয়ে যেমন এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তেমনই দর্শকেরও এক ধরনের চাহিদা আছে এই ধরনের চলচ্চিত্রে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জন উইক, বাহুবলি, কে জি এফ, সালার, ওয়ার, কিল, গাদার, অ্যানিমেল, পুষ্পা, বিক্রম, কাইথি, মার্কোতুফান-এর মতো শৈল্পিক ও নান্দনিক সহিংস চলচ্চিত্রের সিক্যুয়াল নিয়ে দর্শকের আগ্রহের কথা। এসব চলচ্চিত্র ব্যবসাসফল হলে দর্শকও নির্মাতাদের এক ধরনের তাগিদ বোধ করায় সেটার সিক্যুয়াল নির্মাণের। কিংবা সোশাল মিডিয়া কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও নিজেদের জায়গা থেকে তাদের ফ্যান-ফলোয়ারদের জন্য ট্রেইলার, টিজার কিংবা মোশন পোস্টার তৈরি করে থাকে। এসব কনটেন্টের ভিউ যে কম হয় এমনও নয়। কিংবা সহিংস এসব চলচ্চিত্রের, ওয়েব ফিল্ম-সিরিজের কোনো ট্রেইলার, টিজার ও পোস্টার কনটেন্ট প্রমোশনের উদ্দেশ্যে অনলাইনে প্রকাশ করলে সেখানকার কমেন্টে সহজেই দেখা যায়, এই ধরনের সহিংস কনটেন্টের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কিংবা অনাগ্রহ। এছাড়া এসব সহিংস কনটেন্টের কতো সেকেন্ডের শট্ কিংবা বিশেষ কোন দৃশ্যটি দর্শকের মনোযোগ কেড়েছে, কেনো কেড়েছে কিংবা না পারলে কেনো পারেনি, সহিংসতার ধরনটা কোন চলচ্চিত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে অথবা কীভাবে আলাদা হয়ে হাজির হলোতার ব্যাখ্যামূলক মতামত জানাতেও দেখা যায় কমেন্টে। কতো ভিউ হলো, রিয়েকশন কেমন কিংবা কমেন্ট কোন ধরনের সেটা থেকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা এক ধরনের তথ্য পেয়ে যায় চলচ্চিত্রটি অথবা সিরিজটি নিয়ে দর্শকের আগ্রহ কতোটুকু কিংবা তারা কেমন সহিংসতা চায়।


সম্প্রতি সহিংস চলচ্চিত্র মার্কো ব্যবসাসফল হলে দর্শকের আগ্রহের কমতি দেখা যায় না এর সিক্যুয়াল নিয়ে। দর্শক অনলাইনে বিভিন্নভাবে জানতে চায় এর সিক্যুয়াল আসবে কিনা, কিংবা কবে আসবে। এই পরিস্থিতিতে এই চলচ্চিত্রে প্রোটাগনিস্ট চরিত্রে অভিনয় করা উন্নি মোকাদ্দাম তার ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে জানিয়ে দেন, ... মাফ করবেন আমি মার্কো সিরিজাকারে করার চিন্তা বাদ দিয়েছি। এটাকে ঘিরে নানা রকম নেতিবাচক বিষয় রয়েছে। আমি মার্কোর থেকে আরো বড়ো ও ভালো জিনিস নিয়ে হাজির হবো।৩২আরো বড়ো কিংবা আরো ভালোর সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে, দর্শক আরো সহিংস কনটেন্ট দেখার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করছে নির্মাতা ও চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে, আর তারাও সেভাবে কনটেন্ট সাজাচ্ছে। এই জায়গাতে নির্মাতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে, কে কার থেকে বেশি সহিংসতা নিয়ে হাজির হবে। দিনশেষে এই ধরনের পরিস্থিতি দর্শকের মনস্তত্ত্বে যেমন প্রভাব ফেলছে, একইভাবে গল্প যাইহোক না কেনো সেখানে অতিমাত্রায় সহিংসতা যুক্ত করার দিকে নির্মাতারা ঝুঁকছে। ফলে এটার সমাধান কোন দিক থেকে আসবে, সেটা নিয়ে মন্তব্য করা কঠিনই মনে হচ্ছে।


সহিংসতাহীন চলচ্চিত্র, কয়েকটি উদাহরণ ও কতিপয় বাতচিত

গল্পের প্রয়োজনে সহিংসতাকে ব্যবহার না করে, বরং সহিংসতার মাধ্যমেই গল্প বলার ট্রেন্ড বৈশ্বিক চলচ্চিত্রে বৃদ্ধি পেয়েছে/শক্ত জায়গা করে নিয়েছে, এটা নিশ্চয় পাঠক সার্বিক আলোচনা থেকে অনুধাবন করতে পারছে। এ সময়টাতে সহিংসতামূলক থ্রিলার, অ্যাকশন ও হরর জনরার চলচ্চিত্রকেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হয়তো, যে পরিসরে মানুষ বাস করছে সেখানকার মানবিক সম্পর্কসহ পারিপাশ্বিক সম্পর্ক নানা মাত্রিক জটিলতায় আক্রান্ত। যুদ্ধ, রক্তপাত, হানাহানির মতো যতোসব সহিংসতামূলক বিষয়আশয় আছে, এটা মানুষ প্রতিমুহূর্তেই প্রত্যক্ষ করছে ভিজ্যুয়ালি। এ কারণে বাস্তবের সম্পর্ক/রিপ্রেজেন্টেশন যতোটা না গুরুত্ব পাচ্ছে, তার থেকে ভার্চুয়াল কিংবা ভিজ্যুয়াল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে; এবং দেখা ও দেখানোর কালচারে একজন আরেকজনের মাধ্যমে সহজেই প্রভাবিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানুষ বাস্তবতা থেকে এক ধরনের পালানোর চেষ্টাও করছে।


যাইহোক, দর্শক যেমন চাচ্ছে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টেশনটা আরেকটু নিখুঁতভাবে পরখ করতেভিজ্যুয়ালি চারপাশের সহিংসতা মানুষ তো দেখছেই, চলচ্চিত্রে সেই সহিংসতার নতুন কী রিপ্রেজেন্টেশন পাচ্ছেতেমনি নির্মাতারাও চেষ্টা করছে একজন আরেকজনের থেকে সহিংসতা উপস্থাপনে ছাড়িয়ে যেতে! এতে করে চারপাশের যে জটিলতা কিংবা অস্থিরতা, সেখান থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে হাজির হচ্ছে ক্যাথারসিস প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ায় ভীতিকর বা হিংসাত্মক কোনো কিছু দেখার মাধ্যমে মানুষ ভয় ও আগ্রাসনের মতো নেতিবাচক আবেগের মুক্তি ঘটায়। ফলে চলচ্চিত্রের জনরা হিসেবে এই উদ্বেগ ও আবেগের মুক্তি ঘটাতে ভূমিকা রাখছে সহিংস থ্রিলার, অ্যাকশন ও হরর চলচ্চিত্র।


তবে এতো কিছুর পরেও কোনো কোনো নির্মাতা চলচ্চিত্রে সহিংসতা না দেখিয়েও দর্শকের কাছে জনপ্রিয় হয়েছে। নাতিদীর্ঘ এ তালিকার শুরুতেই স্মরণে নিতে হয় ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের একমাত্র অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রনির্মাতা সত্যজিৎ রায়কে। তার চলচ্চিত্রে সহিংসতার বাহ্যিক উপস্থিতি একেবারেই কম। সত্যজিতের চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হয়েছে মানবীয় আবেগ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মতো বিষয়গুলো। এসব তিনি দেখালেও কোনো ধরনের সহিংসতার আশ্রয় নেননি। কেননা তিনি মনে করতেন মানুষের আবেগ, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে চলচ্চিত্রে দেখানোর জন্য সহিংসতা অপরিহার্য নয়।


একই ধরনের কথা বলা যায়, বাঙালি নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটক, মৃণাল সেন ও বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের বেলাতেও। তারা তাদের গল্প বলার ক্ষেত্রে শৈল্পিক সহিংসতা সেভাবে আশ্রয় নেয়নি বললেই চলে। এই জায়গাতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে ভারতীয় অভিনয়শিল্পী ও প্রযোজক আমির খানের মন্তব্য। তিনি সহিংসতা দেখানোর পুরোপুরি বিপক্ষে নন। তিনি মনে করেন, যেখানে সাবজেক্ট, কাহিনি ও প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, সেখানে সহিংসতার দরকার আছে কিনা। নির্মাতারা কেনো সহিংসতা দেখায় তা নিয়ে আমিরের ভাষ্য হলো, দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণের উপায় হিসেবে সহিংসতা অন্যতম, যৌনতাও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই দুইটা বিষয় দিয়ে মানুষকে প্ররোচিত করা সহজ।৩৩ তার মতে, যে নির্মাতারা গল্প তৈরিতে খুব বেশি সৃজনশীল নয়, দর্শকের মধ্যে আবেগ সঞ্চার করতে পারে না, তারাই মূলত সহিংসতা ও যৌনতার ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল। তারা মনে করে এর মধ্য দিয়ে ব্যবসা করতে পারবে। এজন্য চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমিরকে অনেকখানি সচেতন থাকতে দেখা যায়। যদিও তিনি এই জায়গায় পুরোপুরি অটল থাকতে পারেননি। অন্যান্য নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়।


সম্প্রতি এতো এতো সহিংসতাপূর্ণ চলচ্চিত্রের সমান্তরালে বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র আলোচিত, সমালোচিত ও ব্যবসাসফল হয়েছে। এ তালিকায় আছে হলিউডের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র ইন সাইড আউট পার্ট ওয়ান ও টু, সিন্ডেরোলা, কিংবা টাইটানিক; বলিউডের থ্রি ইডিয়টস, পিকে, দঙ্গল, লাপাত্তা লেডিস, টুয়েলভ ফেল, সাইয়ারা; বাংলাদেশের আয়নাবাজি, মনপুরা, সুড়ঙ্গ, উৎসব; দক্ষিণ ভারতের চার্লি, দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন, মিয়া জগান, প্রেমালু মাঞ্জুমাল বয়েজ-এর কথা। এসব চলচ্চিত্র সহিংসতার বাইরে গিয়ে জনপ্রিয়, একইসঙ্গে ব্যবসাসফলও হয়েছে। কিংবা এককভাবে বলা যায় মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রির কথা। সেখানকার বর্তমান বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে সহিংসতার উপস্থিতি একেবারেই কম। যতোটুকিু সহিংসতা আছে, তা গল্পের সঙ্গে সামঞ্জ্যতা রেখেই। কোনো কিছুকে আরোপ করা, কিংবা অতিমানবীয় করে তোলার প্রচেষ্টা নেই এসব চলচ্চিত্রে সহিংসতার রিপ্রেজেন্টশনে।


এই জায়গাতে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি দর্শককে কী দেখাতে এবং কীভাবে দেখাতে চায়, এটাই মুখ্য। এই বিষয়টাকে মিলিয়ে পাঠ করা যেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের একটা ঘটনা দিয়ে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে মিনিস্ট্রি অব ওয়ার। কেনো, কোন বাস্তবতাতে মন্ত্রণালয়ের নামের পরিবর্তন আনা লাগে সেটা নিওলিবারেল এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকিয়ে যে কেউ বলতে পারবে। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে নির্মাতা সহিংসতাকে তার ডিফেন্স আকারে নিবে, নাকি সহিংসতার ওয়ারে নিজেকে যুক্ত করবে!


পরিশেষে বলা যায়, চলচ্চিত্রে অবিরত এসব সহিংসতা দেখতে গিয়ে দর্শক ভাবতে পারে, সে কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতির সাক্ষী হচ্ছে। প্রতিনিয়ত এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে বাস্তবে চলমান এতো এতো যুদ্ধ ও সংঘাতের সহিংসতা একটা সময় গিয়ে দর্শক ও পাঠকের জীবনে কোনো অনুভূতি তৈরি করতে পারবে কিনা, তা প্রশ্ন আকারেই রাখা থাকলো। সেইসঙ্গে চলচ্চিত্রের এসব সহিংসতা নির্মাতা ও দর্শক কীভাবে ডিল করবে, সেটা হয়তো ভবিষ্যৎ গবেষণার বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে।


লেখক : সোহাগ আব্দুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেছেন। বর্তমানে রাজশাহীর একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান।

abdshohag.bd@gmail.com

https://www.facebook.com/abd.shohag.3

 

তথ্যসূত্র ও টীকা

১. পিক্টোরিয়াল বা ভিজ্যুয়াল টার্ন : ১৯৯০ দশকের পর থেকে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ইন্টারনেট এবং বর্তমান সময়ের সামাজিক মাধ্যম মানুষের যাপিত জীবনের কালচারকে অঢেল ইমেজ ও ভিজ্যুয়ালের সমারোহে একপ্রকার প্লাবিতই করে চলেছে। যার প্রভাবে বৈশ্বিকভাবেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কালচারে নানা বাকবদল ঘটছে। এ পরিস্থিতিকেই সমাজবিজ্ঞানীরা আখ্যা দিচ্ছে পিক্টোরিয়াল বা ভিজ্যুয়াল টার্ন হিসেবে। এটা টার্মটি মূলত ১৯২০-এর দশকে ঘটা লিঙ্গুইস্টিক টার্ন (এ সময় সমাজবিজ্ঞানীরা ভাষাকে সমাজ ও সংগঠনের নিয়ামক হিসেবে ভাবতো) ও ৭০-এর দশকের কালচারাল টার্নের পরিপ্রেক্ষিতে আসে। বিস্তারিত জানতে পারবেন এখান থেকে : Mitchell, W J T (2010); ‘Reading Images’; Critical Terms for Media Studies; Edited by: Mitchell, W J T & Hansen, Mark B N; University of Chicago Press.


২. মামুন, আ-আল ও হায়দার, কাজী মামুন (২০২৫ : ১২৪); বাংলাদেশের দৃশ্যসংস্কৃতি : ওটিটি পর্ব; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।


৩. Benjamin, Walter (2004: 236); ‘Critique of Violence’; Walter Benjamin: Selected Writings, Vol. 1, 1913-1926, Edited by: Marcus Bullock and Michael W Jennings; Harvard University Press, USA.


৪. Zizek, Slavoj (2008: 9-39); ‘SOS Violence’; Violence: Six Sideways Reflections; Picador, USA. 


৫. Han, Byung-Chul (2017: vii); ‘Introduction’; Topology of violence; Translated by: Amanda DeMarco; MIT Press, Cambridge.


৬. স্কুইড গেম : নেটফ্লিক্স-এ এখন পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ান এই সিরিজটির তিনটি সিজন মুক্তি পেয়েছে। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে শুরু হওয়া এই সিরিজের প্রতিটি সিজনেই দেখা যায় অর্থসঙ্কটে পড়া মানুষজনদের জীবন বাজি রেখে হরেক খেলায় অবতীর্ণ হতে। এ গেমে শেষ পর্যন্ত একজনই বিজয়ী হবেন; যিনি পাবেন ৪৬ বিলিয়ন ওন (দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা)। বাকি ৪৫৫ জন অংশগ্রহণকারীকে গেমের বিভিন্ন পর্যায়ে নৃশস মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয়।


৭. ‘WikiLeaks video: 'Collateral murder' in Iraq”; দেখুন : https://youtu.be/zYTxuW2vmzk?si=vdssNC5ONNSvuvGl; retrieved on: 11.11.25


৮. Albert Bandura’s Social Learning Theory’; দেখুন : https://www.simplypsychology.org/bandura.html; retrieved on: 14.11.25


৯. Cultivation Theory In Media’; দেখুন : https://www.simplypsychology.org/cultivation-theory.html; retrieved on: 15.11.25


১০. Ferguson, Christopher J (2023); ‘An evolutionary model for aggression in youth: Rethinking aggression in terms of the Catalyst Model’; New Ideas in Psychology, Volume 7; https://doi.org/10.1016/j.newideapsych.2023.101029


১১. ‘Desensitization to Violence: A Parent’s Role’;দেখুন : https://thrive.psu.edu/blog/desensitization-to-violence-a-parents-role/; retrieved on: 25.11.25


১২. Huesmann LR (2007); ‘The impact of electronic media violence: scientific theory and research’; J Adolesc Health; doi: 10.1016/j.jadohealth.2007.09.005


১৩. আলথুসের, লুই (২০২০); রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ; ভূমিকা, ভাবানুবাদ ও পর্যালোচনা : আলতাফ পারভেজ, সংহতি, ঢাকা।


১৪. আহমেদ, বখতিয়ার (২০২২: ১১৬-১১৮); গুম-খুন-আতঙ্ক : শাসনপ্রণালী ও হত্যার কথকতা; বিদ্যায়তনিক সফরনামা; ম্যাজিক লণ্ঠন প্রকাশন, রাজশাহী।


১৫. Arendt, Hannah (1970); On Violence; A Harvest/HBJ Book, USA.


১৬. আব্দুল্লাহ, সোহাগ; প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র প্রযোজনা : পুরুষ প্রাধান্যশীল চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিদ্বন্দ্বী নারী আগমন এবং; ম্যাজিক লণ্ঠন; সম্পাদনা : কাজী মামুন হায়দার; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, সংখ্যা ২৩, বর্ষ ১২, জুলাই ২০২২, পৃ.৮৫-১০৪।


১৭.কোন দেশ, কেন সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করে; প্রথম আলো; দেখুন : https://www.prothomalo.com/world/fa9f6pvzhs; retrieved on: 18.11.25


১৮. “Shah Rukh Khan reveals his King character is ‘ruthless and dark’, ‘Khooni hai, logo ko maar deta hai aur poochta bhi nehi’”; দেখুন : https://shorturl.at/xXzAO; retrieved on: 16.11.25


১৯. Essa, Azad(2025);‘Shah Rukh Khan: What it means to become a billionaire during a genocide’; Middle East Eye; দেখুন : https://www.middleeasteye.net/opinion/shah-rukh-khan-now-billionaire-what-cost;retrieved on: 18.11.25


২০.ইসরায়েল ৪৪ দিনে অন্তত ৫০০ বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে, হত্যা কয়েক শ ফিলিস্তিনিকে; প্রথম আলা; দেখুন : https://www.prothomalo.com/world/middle-east/ogmgm1ebn7; retrieved on: 20.11.25


২১.How video games influenced JOHN WICK CHAPTER 4’; দেখুন : https://youtu.be/1mxO2dNu4uI?si=SUBgMmcpg0o2cbYw; retrieved on: 15.11.25


২২.গুলি করি মরে একটা বাকিডি যায় না স্যার : সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পুলিশ সদস্য; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা; দেখুন : https://youtu.be/exsMSLpfyFw?si=LhNrUyZOq6Yxt7zO; retrieved on: 11.11.25


২৩. শ্যাডো আর্কিটাইপ ও কার্ল ইউং বর্ণিত অন্যান্য আর্কিটাইপ নিয়ে আলোচনা দেখতে পারেন এই শিরোনামের অধীনে : কার্ল ইয়ুং (১৮৭৫-১৯৬১) ও তার বিশ্লেষণাত্মক মনোবিজ্ঞান; দেখুন : https://www.bibortonpoth.com/14981; retrieved on: 20.11.25


২৪. বেশি বেশি সহিংস সিনেমা দেখলে মানসিক স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হয়; প্রথম আলো; দেখুন : https://www.prothomalo.com/lifestyle/q9nhgn0utn; retrieved on: 16.11.25


২৫. Interview with Kim Ki-Duk; দেখুন : https://www.sensesofcinema.com/2002/feature-articles/kim_ki-duk/; retrieved on: 23.11.25


২৬. ‘Martin Scorsese isn’t glorifying violence. He’s reckoning with it’; দেখুন : https://www.washingtonpost.com/entertainment/movies/2023/10/13/scorsese-killers-flower-moon/; retrieved on: 14.11.25


২৭. Quentin Tarantino’s use of Violence and Profanity is Justified;Medium; দেখুন : https://medium.com/%40tristanarroyave/quentin-tarantinos-use-of-violence-and-profanity-is-justified-1b24a57b9de5; retrieved on: 21.11.25


২৮. “Sandeep Reddy Vanga defends his comment ‘being in love means freedom to hit your partner’: ‘It depends…’”; The Indian Express;দেখুন : https://shorturl.at/GpctM; retrieved on: 25.11.25


২৯. ‘Anurag Kashyap: Bollywood is to blame for India's inability to deal with reality’; দেখুন : https://www.theguardian.com/film/2013/feb/28/anurag-kashyap-gangs-of-wasseypur; retrieved on: 19.11.25


৩০. প্রথম পুরুষ : সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে একান্ত আড্ডায় প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; দেখুন : https://banglalive.com/interview-of-eminent-and-hit-bengali-filmmaker-srijit-mukherjee/; retrieved on: 20.11.25


৩১. দর্শকরা ধারণাও করতে পারবেন না তাণ্ডব-এ কী রয়েছে : রায়হান রাফী; কালের কণ্ঠ;দেখুন : https://www.kalerkantho.com/online/entertainment/2025/05/18/1519231; retrieved on: 21.11.25


৩২. Lord Marco Sequel Announced: Makers Drop Unni Mukundan, Fans Speculate New Lead’; দেখুন : https://shorturl.at/gEDP6; retrieved on: 22.11.25


৩৩. Amir Khan Unveils the Raw Emotions: Sex and Violence in Bollywood Cinema’; দেখুন : https://youtu.be/3PMKBtmp7Bk?si=6VCcJQznNTUWlYPZ; retrieved on: 20.11.25

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন