Magic Lanthon

               

সৈয়দ ইকরামুল হাসান

প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

বিচিত্র চিত্রের কল্পনা ও বাস্তবতা : মানুষ ও মানুষের ঊর্ধ্বের চিত্র নিয়ে অ্যানিমেশন

সৈয়দ ইকরামুল হাসান

উপক্রমনিকা

প্রকৃতিতে যা কিছু ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ,মহাকালের অতি ক্ষুদ্র অংশ মানুষকে নিয়ে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত নক্ষত্রবীথির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ জীব; সেই জীবের অতি ক্ষুদ্র অংশজুড়ে মানুষ। শত সহস্র কোটি প্রজাতির মধ্যে মানুষ পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী জীব, যারা চিন্তা করতে সক্ষম। বলা হয়ে থাকে, একমাত্র মানুষেরই ভাষা রয়েছে, যা অন্যদের ভাষা থেকে উৎকৃষ্ট। আর সফলভাবে ভাষা ব্যবহারের এই সক্ষমতাই গড়ে দিয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে জয়ের ভিত। সম্ভাবনাময় মানুষ তার নিজের কাছে শ্রেষ্ঠ, তথা আশরাফুল মাখলুকাত। সেখানে মানুষের দূর প্রতিদ্বন্দ্বীও কেউ নেই। মানুষ ভাবতে শিখেছে, উড়তে শিখেছে, সময়কে জয় করেছে। তবে আদৌ মানুষ কি সব জয় করেছে? নাকি মানুষের জয়ধ্বনি কেবল মানুষের স্বরেই সীমাবদ্ধ? মানুষ নিজ প্রয়োজনে আবিষ্কার করেছে ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, চিত্রকর্ম ইত্যাদি। সেগুলো মানুষের জয়ধ্বনি করে ইতিহাসের খেরো খাতায়। তবে এই যাত্রা ততোটা মসৃণ ছিলো না মানুষের জন্য। মানুষকে মোকাবিলা করতে হয়েছে মানবকুলের বাইরের জগতকে, অর্থাৎ অন্যান্য প্রাণীদের। মানুষের তৈরি সভ্যতায় একপর্যায়ে আগমন ঘটে ঈশ্বরের। সময়ের সঙ্গে ঈশ্বর প্রাধান্য পেতে শুরু করে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। শিল্প সাহিত্য থেকে সবখানে ঈশ্বর প্রাধান্য পেলেও মানুষ কখনো গুরুত্বহীন হয়ে ওঠেনি। তবে মানুষ পুরোপুরি গুরুত্বপূর্ণও ছিলো না। মানুষ তার প্রয়োজনেই ঈশ্বরের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে অবিরত, যার পূর্ণ বিকাশ ঘটে রেনেসাঁয় এসে। অতঃপর রেনেসাঁয় মানুষ ঐশ্বরিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে পুনর্জাগরণের চেতনায় মানবতাবাদী হয়ে বিকশিত হতে থাকে। অর্থাৎ মানবকেন্দ্রিক বিশ্ব স্বীকৃতি পায় রেনেসাঁয় এসে।

বর্তমান তথা এই একুশ শতকেও মানুষ নির্মাণ করে চলেছে মানুষকে। তারা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। এআই, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংসের জগৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মিশে যেতে শুরু করেছে। অর্থাৎ মানুষের প্রযুক্তিগত সাফল্য এখানে অসামান্য। মানুষ রেনেসাঁর মানবতাবাদ কালের যাত্রাও অতিক্রম করেছে। সেই পথে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি, তথ্য ও ন্যারেটিভ। অর্থাৎ মানুষের সৃষ্ট দুনিয়ায় কেবল মানুষ বাস করে না। মানুষ এখন মানবকেন্দ্রিক জগতকেও অতিক্রম করার পথে। মানে মানুষের বসবাস পোস্ট হিউম্যানিজম-এর দুনিয়ায়। এখানে মানুষই সব নয়। মানবিক শৃঙ্খলার বাইরের দুনিয়াও সেখানে প্রাধান্য পায়। কেবল মানুষকে নিয়েই যে সমগ্র দুনিয়া নয়, এর বার্তাই মুখ্য হয়ে ওঠে এখানে। ফলে পরিবেশ ও অন্যান্য প্রাণীর প্রতি সহমর্মিতার জায়গাটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করে এই যুগ। তবে প্রশ্ন আসে এই যুগের চাহিদা তৈরি হলোইবা কেনো? অর্থাৎ শুধু মানুষকেন্দ্রিক মানবতাবাদী বিশ্ব কালক্রমে গড়ে ওঠা মানুষের আশার প্রতিদান দিতে পারেনি। তাই শুরু হয় পোস্ট হিউম্যানিজমের যাত্রা, যেখানে মানুষের সঙ্গে অন্যসব উপাদানগুলোর সীমানা নিরর্থক।

মধ্যযুগের বিকাশমান সংস্কৃতিতে মানবতা ও ধর্মীয় মতবাদের সঙ্কট একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো। মানবকেন্দ্রিক কবিতা, চিত্রকলা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মকে ধর্মীয় আগ্রাসনের শিকার হতে হয়। ধীরে ধীরে মানুষ সেসব কাটিয়ে ওঠে। পপুলার কালচারের বদৌলতে সবকিছু যেনো মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে। ধর্মীয় পুরাণগুলোও মানবিক গুণাবলি দিয়ে নতুনভাবে আলোচিত হয়। অর্থাৎ মানুষই বিশ্ব। পপুলার কালচারের ভিজ্যুয়াল গল্পগুলো মানুষকে প্রাধান্য দিয়েই নির্মিত। ভিজ্যুয়ালে অন্যতম সাফল্য চলচ্চিত্র, যার বয়সও শতের অধিক। চলচ্চিত্র যার জয়গান সবচেয়ে বেশি করতে সক্ষম হয়েছে, তা হলো মানবতা। যখন চলচ্চিত্রে মানুষ যুক্ত হয়, তখন সেই মানুষ চরিত্রের প্রতি দর্শকের আগ্রহ সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছায়। শিল্পবিপ্লবের প্রভাবে যখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের জয়জয়কার, তখন সেই দুনিয়ায় চলচ্চিত্রের আবির্ভাব নানাভাবে মানুষের উপস্থিতি নিয়ে ভেবেছে। তবে পূর্ববর্তী আর্ট-কালচার বিবেচনায় মানুষের দুনিয়া এতো বড়ো পরিসরে মানুষকেন্দ্রিক ছিলো না। বর্তমানে মানুষের বিচরণ অনেকটাই সর্বজনীন। বিশেষ করে উনিশ শতকের শেষভাগের সামাজিক ও আর্থিক পট পরিবর্তন মানবিক দুনিয়ার চিত্রায়ণে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে। সেই ধারাবাহিকতা মানুষের চিত্রায়ণে ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তি তখন থেকে আর থেমে থাকেনি। বর্তমানে যার সর্বশেষ সংযোজন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এআই কীভাবে এই যুগের পদযাত্রায় ভিজ্যুয়ালের জগতে স্বতন্ত্রভাবে যুক্ত হয়েছে, পাশাপাশি কীভাবে মানবকেন্দ্রিক ও মানবহীন দুনিয়ায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম, তা এই আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।

তবে মানুষ নিয়ে এই আলোচনার প্রেক্ষাপট হলো মানুষের সঙ্গে ভিজ্যুয়ালের সম্পর্ক বিশ্লেষণ। বিশেষ করে ভিজ্যুয়ালের এমন এক শাখা অ্যানিমেশন, যা মানুষ ও তার দুনিয়াকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করছে। ভিজ্যুয়ালে বিকশিত ইন্ডাস্ট্রিতে চলচ্চিত্রের সাফল্য অনস্বীকার্য। তবে লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্র ছাড়াও যে মাধ্যম অনেক বেশি প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়েছে, তা হলো অ্যানিমেশন। পোস্ট হিউম্যানিজমকে ভিজ্যুয়াল দুনিয়ায় ত্বরান্বিত করতে যার ভূমিকা অন্যতম, তা হলো অ্যানিমেশন। অ্যানিমেশন বিভিন্ন ধাঁচের মোশন ফর্ম নিয়ে কাজ করছে, যা আধুনিক চলচ্চিত্রের বিকাশকেও প্রভাবিত করে। সময়ের সঙ্গে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে বিকাশ ঘটে অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রির। এক্ষেত্রে কীভাবে অ্যানিমেশনের যাত্রা শুরু হলো এবং কীভাবে এর নানা ফর্ম সময়ের সঙ্গে বিকাশ হয়েছে, তা এই আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। মূলত অ্যানিমেশনের দুনিয়া এবং মানুষের দেখার দুনিয়া উভয়ই মানুষের দেখার দর্শনকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। মানুষের সঙ্গে ভিজ্যুয়ালের সম্পর্ক কীরূপ হওয়া সম্ভব, তা নিয়েও অ্যানিমেশন প্রশ্ন তোলে। কারণ অ্যানিমেশন মানুষ ছাড়াই মানুষের গল্প বলে। অর্থাৎ অ্যানথ্রোপসেন্ট্রিক তথা মানবকেন্দ্রিক দুনিয়ার ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করে অ্যানিমেশন। মানুষের আধিপত্যের বাইরে এটা মানবকেন্দ্রিক দুনিয়াকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখায়।

অ্যানিমেশনের দুনিয়া বিশেষভাবে যে ব্যাপার সামনে আনে তা হলো মানুষ ও মানুষহীনতার দৃশ্যকল্পের কথকতা। অ্যানিমেশন মানুষের অনুপস্থিতিতে মানুষের গল্প বলে, আবার তা অতিক্রমও করে। চলচ্চিত্রের ইন্ডাস্ট্রি এখন ব্যাপক। তবে চলচ্চিত্রের সমান্তরালে অ্যানিমেশনের ইন্ডাস্ট্রিও আক্ষরিকভাবে পিছিয়ে থাকেনি। বরং চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে নানা আঙ্গিকে বিকশিত হয়েছে। এক্ষেত্রে মানবমনে ও মানবমনকে ঘিরে ইন্ডাস্ট্রিতে চলচ্চিত্র থেকে অ্যানিমেশন কীভাবে আলাদা? এছাড়া ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এই ইন্ডাস্ট্রি কতোটা বিকশিত হয়েছে তাও আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।

পাশাপাশি বর্তমানে এআই এসে নানা আর্ট ফর্মকে চ্যালেঞ্জ করছে। আর্ট ও আর্টিস্টের সম্পর্কের ধারণা এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যেই এআইয়ের বৈপ্লবিক আগমন নানাভাবে মানুষের কার্যক্রমকে নতুনভাবে দেখতে বাধ্য করেছে। সঙ্গে সৃজনশীলতা নিয়ে পূর্ববর্তী ধারণাগুলোকেও বদলে দিতে শুরু করেছে। প্রশ্ন জাগে, সৃষ্টিশীলতার ধারণাটুকুও মানবকেন্দ্রিক থাকবে কি না? নাকি এটা মানুষের অধীনতাকে অতিক্রম করবে! ইতোমধ্যে এআই দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের অসংখ্য প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে এআই কি প্রচলিত আর্টের ধারণাকে গ্রাস করে ফেলতে সক্ষম? অ্যানিমেশন ইন্ডাস্ট্রি কি এআইয়ের কবলে সৃষ্টিশীলতাটুকু হারাতে বসেছে? এখানে এই সূত্রগুলো নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরার প্রয়াস থাকবে। মানবকেন্দ্রিক দুনিয়ার সঙ্গে এআইয়ের বিরোধইবা কতোখানি? অ্যানিমেশন সংক্রান্ত সবকিছুই প্রাধান্য পেয়েছে এই আলোচনায়।

মানুষ, অ্যানিমেশন এবং অন্যান্য শিল্পমাধ্যম

অ্যানিমেশন ব্যাপারটা আসলে কী? কীভাবে অ্যানিমেশন কাজ করে? আক্ষরিক অর্থে অ্যানিমেশন মূলত ইনঅ্যানিমেট তথা নির্জীব কোনো চিত্রকে জীবন বা মোশন দেওয়া। নরম্যান ম্যাকলারেন বলেন, Animation is not the art of drawings that move but the art of movements that are drawn. তার মানে অ্যানিমেশন শূন্য থেকে তৈরি হওয়া কিছু নয়। এটাকে একেবারে স্বতন্ত্র কোনো আর্ট ফর্ম হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না। নানা আর্ট ফর্মের সম্মিলন এখানে ঘটে। পেইন্টিং, ভাস্কর্য, থিয়েটার, ফটোগ্রাফি কিংবা চলচ্চিত্র সবকিছুই অ্যানিমেশনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এই অংশে অ্যানিমেশনের সঙ্গে বিভিন্ন আর্ট ফর্মের মধ্যকার সম্পর্ক ও ঐতিহাসিকতার আলোচনা প্রাধান্য পাবে।

প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের অন্যতম ইচ্ছে অদেখাকে দেখা। সেই অদেখাকে দেখার প্রয়াসের আধুনিক রূপায়ণ ঘটে অ্যানিমেশনে এসে। যা মানুষ দেখে না, তা মূলত অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখা সম্ভব। চেক অ্যানিমেটর শ্যাঙ্কমের-এর ভাষ্য হলো, Animation enables me to give magical powers to things. In my films, I move many objects, real objects. Suddenly, everyday contact with things which people are used to acquires a new dimension and in this way casts a doubt over reality. In other words, I use animation as a means of subversion.এক্ষেত্রে বলা চলে, শিল্পের অন্যতম সার্থকতা হলো মানুষের ভেতরকার শক্তি ও ভাবনাকে দৃশ্যমান করার সক্ষমতা। অ্যানিমেশন মূলত এই প্রাচীন আকাক্সক্ষারই এক আধুনিক রূপ। ফলে বোঝা যায়, অ্যানিমেশনের এই যাত্রাপথে রয়েছে ইতিহাসের নানা দিক। অ্যানিমেশনের সঙ্গে অন্যান্য আর্ট ফর্মের সম্পর্ক বিবেচনায় আর্টের সামগ্রিকতার ঐতিহাসিকতা পর্যালোচনাও আবশ্যক।

অ্যানিমেশনের শিকড় খুঁজতে গেলে যেতে হবে প্রাচীন গুহাশিল্পে। ভিজ্যুয়াল আর্টের জন্মও মূলত সেখানে। এজন্য এটাকে প্রি-অ্যানিমেশন যুগও বলা যেতে পারে। বলা চলে শুরুর সম্পর্কটা পেইন্টিং ও ভাস্কর্যের সঙ্গেই ছিলো। চিত্রকর্ম ছাড়াও মোশন তৈরির আকাক্সক্ষা প্রাচীনকালেই বিকশিত হয়। প্রাথমিক যুগে মোশন তৈরি করা ছবিগুলো দেখা যায় প্রায় ৩০,০০০ বছর আগের গুহাচিত্রে। ফ্রান্সের lascaux cave-এ পাওয়া একটা প্রাণীর অনেকগুলো পায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে এই সিদ্ধান্তে আসা যায়, এগুলো মোশনেরই নির্দেশক। এটা বলা যেতে পারে প্রি-সিনেম্যাটিক অ্যানিমেশনের ফর্ম তথা অ্যানিমেশনের আগেকার দুনিয়া। যেখানে শিল্পী তার চিত্রকলার মুভমেন্টকে সময়ের আদলে ধরার চেষ্টা করেছেন। মানুষের প্রাচীন ভাষা মূলত ছবি। আগে মানুষ ছবি দিয়েই কথা বলতো, লিখতো, হিসাব করতো। প্রাচীন গুহায় কতো শত চিত্রকর্ম তারই বার্তা দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রাচীন লিপিতে ছবির প্রাধান্যই থাকে সবচেয়ে বেশি। মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপি কিংবা মেসোপটেমীয় লিপি, সবটাই মূলত ছবিকে কেন্দ্র করেই। এই ছবিকে ঘিরেই গড়ে ওঠে মানুষের কথা বলার ভাষা। রচিত হয় সাহিত্য ও নানা কল্পকথা। কখনো লেখায়, কখনো রঙতুলিতে মানুষ সবসময়ই ছবি এঁকেছে। ঈশপের গল্প থেকে প্লেটোর দার্শনিক গল্পগুলোর নির্মাণও এই ছবি আঁকার ধাঁচেই হয়েছে। এই ছবি আঁকার সূচনাকেই অ্যানিমেশনের আদিম দুনিয়া বলা যেতে পারে। গুহার সেই চিত্রকর্ম, তাদের না বলা গল্প ও মিথের সম্মিলন এই ছবিকে ধরেই উঠে আসে। সভ্যতার বিকাশে চিত্রের বিকাশ আরো বৃদ্ধি পায়। মিশরীয় টম্ব ম্যুরালে রিপিটেড চিত্র দেখা যায় বিভিন্ন আঙ্গিকে। যেগুলো অনেকটা ভিজ্যুয়াল রিদম তৈরি করে অ্যানিমেশনের মতো করেই। গ্রিক মৃৎশিল্পেও দেখা যায় ধারাবাহিক অ্যাকশনের চিত্র। অ্যাথলেট, যোদ্ধা আরো কতো কী! যেগুলো ফ্রেম-বাই-ফ্রেম ছবির নির্দেশক। ভাস্কর্যেও একই রকম নির্দেশনা পাওয়া যায়। অ্যাথেনীয় ভাস্কর মাইরন-এর ‘ডিস্কোবোলাস’ কিংবা মাইকেল অ্যাঞ্জেলোর ‘ডেভিড’, সম্ভাব্য মোশনকেই নির্দেশ করে। প্রাচীন আর্ট স্থিরতাকে অ্যানিমেট করতে চেয়েছে। অ্যানিমেশন তথা মোশন নিয়ে মানুষের আগ্রহ একদিনের নয়, বরং প্রাচীনকাল থেকেই তা বিদ্যমান ছিলো। অর্থাৎ মানুষের কাছে মোশনের জীবন এক প্রাচীন বাস্তবতারই অংশ। যার ধারাবাহিকতা দেখা যায় মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে এসেও।

মধ্যযুগে মোশনের ধারণা অনেকটা ধর্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। মধ্যযুগীয় চিন্তায় ঈশ্বরই অ্যানিমেটর এবং তার ঊর্ধ্বে কেউ নেই। তিনিই এক টুকরো মাটিতে প্রাণসঞ্চার করেন। মানে মানুষ সেই যুগে অ্যানিমেশনকে এক ধর্মতাত্ত্বিক ফর্মে বিকশিত হতে দেখেঅ্যানিমেটেড চিত্রগুলো ঈশ্বরের নিমিত্তে হতে হবে। খ্রিস্ট, ম্যারি কিংবা খ্রিস্টীয় অন্যান্য সেইন্টদের নিয়ে চিত্রকর্মগুলোই ছিলো তখনকার বাস্তবতা। ধর্মপ্রাণ মানুষের চোখে এই চিত্রকর্মগুলো স্থির কিছু ছিলো না। বরং ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী সেসবও ছিলো জীবন্ত। মোশনের ধারণা সেখানে মুছে যায়নি, বরং ধর্মীয় পর্দায় তা নিজেকে আবৃত করেছে। পাশাপাশি তখন বিভিন্ন বইয়ের মার্জিনে আঁকা ধারাবাহিক চিত্রকর্ম মোশনকেই নির্দেশ করে। চার্চে ব্যবহৃত রঙিন কাঁচগুলোতে বিভিন্ন ছবির সিরিজ আঁকা থাকতো। যখন দিনের কোনো পর্যায়ে সেখানে আলো পড়লে তা জীবন্ত হয়ে মোশনে রূপ নিতো। তার মানে মধ্যযুগীয় আর্টের পুরোটা জুড়েই ছিলো স্পিরিচুয়ালিটি। মধ্যযুগীয় থিয়েটারেও বিকশিত হচ্ছিলো মোরালিটি প্লে ও শ্যাডো প্লে; যেগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিকে বর্তমান মোশন ভাবনারই নির্দেশক ছিলো। অতীতে ঈশপের গল্প কিংবা মধ্যযুগে স্টেজে মোরালিটি প্লে’র মোশন ভাবনাই ধীরে ধীরে প্রাথমিক অ্যানিমেশনের ভিত তৈরি করে দেয়। মোরালিটি প্লেতে যেমন চরিত্রের ভূমিকায় মানুষের বিভিন্ন মানবিক গুণ (যেমন, সুখ, দুঃখ, পাপ, পুণ্য ও ঈশ্বর) দেখা যায়, অতীতের ঈশপের গল্পেও মানুষের ভূমিকা নিয়ে অন্যান্য প্রাণীদের দেখা যায়। সেসবের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো মানুষের গুণাবলির আলোচনা-সমালোচনা তুলে আনা, যা মানুষকে নৈতিক শিক্ষা দেবে বলে ধারণা করা হতো।

মধ্যযুগে রেনেসাঁ এলে তা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে এবং ধর্মকেন্দ্রিকতা থেকে মানবকেন্দ্রিকতায় প্রবেশ করে। রেনেসাঁ পরবর্তী মানবকেন্দ্রিক বিশ্বে মানুষের জয়জয়কার। আবারও মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে শিল্প, সাহিত্য। ধর্মীয় আধিপত্যের শৃঙ্খলে জমে থাকা যে বরফ মানবতাকে গ্রাস করে রেখেছিলো তা গলতে শুরু করে। মানুষের মুক্তি তখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সেই মানবতার মুক্তি নিয়েই আসে রেনেসাঁ তথা পুনর্জাগরণ। পুনর্জাগরণে মানুষ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া আধিপত্যের বাইরে গিয়ে আঁকড়ে ধরে ধ্রুপদী তথা গ্রেকো-রোমান ঐতিহ্যে চর্চিত মানবতা। চার্চের কঠোর ধর্মীয় রীতিনীতি যা মানুষকে শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে রেখেছে, তা থেকে মুক্তি দিয়েছে মাইকেল অ্যাঞ্জেলো কিংবা বত্তিচেল্লি বা ভিঞ্চির দেখানো মানবকেন্দ্রিক দুনিয়া। সেখানে মানুষের জয়জয়কার! মানুষ কেবল চার্চের নির্দেশনা মোতাবেক চিত্র আঁকেনি। মানুষ এঁকেছে মানুষকে; নির্মাণ করেছে মানুষকে। ডেভিডকে বানিয়েছে মানুষের মতো করেই। মোনালিসাও এসেছে মানুষ হয়েই।

তবে ভিজ্যুয়ালের সাফল্যের পূর্ণতা পেতে শুরু করে ১৭ শতকে ম্যাজিক লন্ঠনের যাত্রার মধ্য দিয়ে। অ্যানিমেশনসহ যেকোনো ভিজ্যুয়ালের অন্যতম আদি ফর্ম হিসেবে ধরা যেতে পারে ম্যাজিক লন্ঠনকে। ম্যাজিক লন্ঠনে মূলত হ্যান্ড-পেইন্টেড স্থিরচিত্রকে গ্লাস স্লাইডের আলোর সাহায্যে মোশন আকারে প্রজেক্ট করা হতো। মূলত এটা আলোকে ব্যবহার করে গ্লাস স্লাইড ও লেন্সের মধ্য দিয়ে চিত্র তুলে আনে। কিছু স্লাইডে lever and wheels-এর মতো মুভিং পার্টস থাকে, যেটা মোশন ইফেক্ট তৈরি করে। বলা যায়, ম্যাজিক লন্ঠন থেকেই মোশনকে প্রদর্শনের ধারা বৈপ্লবিক গতি পায়। যদিও এটাকে বর্তমান আঙ্গিকে অ্যানিমেশন হিসেবে বিবেচনা করা যায় না, তবে এটা প্রজেক্টরের সাহায্যে মুভিং কোনো ইমেজ দেখার একটা যাত্রা শুরু করে।

ম্যাজিক লন্ঠন অ্যানিমেশনের ক্যাটাগরিতে না পড়লেও এটা অ্যানিমেশনের একটা ভিত তৈরি করে দেয়। এই যাত্রায় ম্যাজিক লন্ঠন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যাত্রা শুরু হয় থমাট্রপ-এর। এটা মূলত এক ধরনের ছোটো ডিস্ক, যার দুই পাশে দুইটা ছবি একটা স্ট্রিং-এ লাগানো থাকে। যখন এটাকে ঘোরানো হয় তখন সেই দুই ছবি একীভূত হয়ে একটা ছবির মতো দেখায়। যেমন, একটা কয়েনের এক পাশে পাখি এবং অন্যপাশে খাঁচা রাখা হলে, এটা দ্রুত ঘুরালে মনে হবে যেনো খাঁচার ভেতর কোনো পাখি রয়েছে। এটা ভিত্তি ছিলো persistence of vision-এর নীতি, যার ওপর ভিত্তি করে একটা ভিজ্যুয়াল ট্রিকের মাধ্যমে এই চিত্রে মোশন দেখানো সম্ভব ছিলো।

অন্যদিকে জুট্রপ-ও ছিলো থমাট্রপ-এর কাছাকাছি অনেকটা স্পিনিং সিলিন্ডারের মতো ডিভাইস। যার পাশগুলো স্লিট দিয়ে ঘেরা এবং ভেতরে ছিলো সারিবদ্ধ চিত্র। যখন এটাকে ঘুরানো হয়, তখন মনে হবে ছবিগুলো যেনো জীবন্ত। এটাকে অ্যানিমেশনের অনেকটা প্রাথমিক ফর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে শর্ট লুপ থেকে এটা নড়তে থাকা ঘোড়ার চিত্র কিংবা নাচতে থাকা কোনো মানুষের দৃশ্য দেখা যায়। ম্যাজিক লন্ঠনের হাত ধরে মূলত জুট্রপই এটা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয় যে, স্থিরচিত্রকেও দ্রুত স্থানান্তরের মাধ্যমে মোশন দেখানো সম্ভব। পরবর্তী সময়ে ফেনাকিটোস্কোপ কিংবা প্র্যাক্সিনোস্কোপ ইত্যাদি স্পিনিং ডিভাইস, এই মোশনের ভ্রম তৈরি করতে সক্ষম হয়। মূলত এই যুগে আর্ট এবং বিজ্ঞানকে একত্র করার একটা প্রয়াস দেখা যায়। অপটিকাল ভ্রম ও মেকানিকাল রিপ্রোডাকশন সেখানে একত্র হয়েছে। তবে তখন পর্যন্ত এটাকে অ্যানিমেশন বলা সম্ভব নয়।

সিনেমাটিক অ্যানিমেশনের যাত্রা চলচ্চিত্রের সমসাময়িক। চলচ্চিত্র ও অ্যানিমেশন অনেকটা একই ক্ষেত্র থেকে বিকশিত হতে শুরু করে। দৃশ্যমাধ্যমে যে গল্প বলা হতো, সে গল্প বলার কোনো এক সাধারণ মাধ্যম থেকে এই দুটি ধারা নতুন রূপে বিকশিত হতে থাকে। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের জন্ম হিসেবে উল্লেখ করা যায় বিংশ শতকের শুরুর দিকটা। মূলত ফ্যান্টাসম্যাগোরি-কে (১৯০৭) দিয়ে এর যাত্রার শুরু বলে ধরা হয়, যেটা লাইন ড্রয়িং ও সুররিয়াল স্কেচ আর্টের মধ্যে সম্পর্ক নির্দেশ করে। এরপর উইনসর ম্যাকয়-এর পার্সোনালিটি ও সাইকোলজিকাল মুভমেন্টে নির্মাণ হয় গার্টি দ্য ডায়নোসর, যেটাকে ফাইন আর্ট ড্রটম্যানশিপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তী সময়ে স্টিমবোট উইলি চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয় সিনক্রোনাইজড সাউন্ড, যেটা অ্যানিমেশনকে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্টের অংশ করে তোলে। তার মানে এখানে অ্যানিমেশনের সঙ্গে চলচ্চিত্রের একটা সম্পর্ক বিদ্যমান। চলচ্চিত্রের টাইম-বেজড সিকোয়েন্সিং এবং প্রজেকশন টেকনোলজিকে অ্যানিমেশন ব্যবহার করেছে। তবে ক্যামেরার বাস্তবতাবাদ থেকে এটা মুক্ত। বলা চলে অ্যানিমেশন মূলত চলচ্চিত্রেরই ড্রিম-লাইফ। তবে সেটা ভিজ্যুয়াল ইমাজিনেশনেই সীমাবদ্ধ, রিয়ালিজম সেখানে মুখ্য নয়।

অ্যানিমেশনকে মডার্নিস্ট আর্টের সঙ্গেও জুড়ে দেওয়া হয়। অস্কার ফিসিঞ্জার ও লেন লাই-এর মতো অ্যানিমেটর রাশিয়ান চিত্রকর কান্দিনস্কাই-এর অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং ও মিউজিকাল রিদম দিয়ে প্রভাবিত ছিলো। তাদের ভিজ্যুয়াল মিউজিক ফিল্মগুলো রঙ ও মোশন থেকে নন-ন্যারেটিভ আর্টে পরিণত হয়। সুররিয়ালিস্টরাও (সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল) ড্রিম লজিককে প্রভাবিত করেছে, যেটা দেখা যায় ফ্যান্টাসিয়া ও স্পিরিটেড অ্যাওয়ে চলচ্চিত্রে।

বর্তমান অ্যানিমেশনের দুনিয়া অনেক বিস্তৃত, তবে এটা যে না-বলা গল্পকে স্পর্শ করার সুযোগ হাতছাড়া করে না, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অ্যানিমেশন এমন কিছু গল্প বলে, যা কমার্শিয়াল চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে সম্ভব নয়। যদিও অ্যানিমেশনের এই যাত্রাপথ কখনো বাণিজ্যিক জগতের বাইরে ছিলো না। তবে যে কথা লাইভ-অ্যাকশনে বলা কঠিন, সেটা সহজতর হয়ে ওঠে অ্যানিমেশনের হাত ধরে। আবার বিংশ শতকের মাঝামাঝিতে এসে যে বিতর্কটা স্পষ্ট হতে শুরু করে তা হলো মাস কালচার ও ফাইন আর্টের মধ্যকার সম্পর্ক। ডিজনির যাত্রা সেসময় শুরু। স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস সিনেমাটিক স্টোরিটেলিং-এর সঙ্গে পেইন্টিং টেকনিককে একত্র করে। ডিজনির অ্যানিমেটররা রেনেসাঁর পেইন্টিং ও ব্যারোক চেয়ারস্কুরোর ফর্মগুলো পর্যালোচনা করেন এবং রিয়ালিজম বোঝার চেষ্টা করে। পাশাপাশি আর্টিস্টরা ইম্প্রেশনিজম ও রোমান্টিসিজমের ল্যান্ডস্কেপ থেকেও অনুপ্রেরণা নিতে থাকে। যার মধ্যে বাম্বিস্লিপিং বিউটি অন্যতম। তবে তখন বিতর্ক তৈরি হয় আর্ট বনাম বাণিজ্য নিয়ে। অ্যানিমেশনকে তখন ফাইন আর্টের পরিবর্তে দেখা হতো কমার্শিয়াল আর্ট হিসেবে। যদিও নরম্যান ম্যাকলারেন, লট্টে রেইনিগার-এর মতো কিছু এক্সপেরিমেন্টাল অ্যানিমেটর এটা দাবি করে, এন্টারটেইনমেন্টের বাইরেও অ্যানিমেশন পিওর ভিজ্যুয়াল এক্সপ্রেশন। সেসময়কার প্যারালাল কিছু মুভমেন্টও জনপ্রিয় ছিলো। যার মধ্যে অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং (পলক, মন্ড্রিয়ান), অ্যানিমেশন অ্যাবস্ট্রাকশন দুইটাই রিপ্রেজেন্টেশনে মোশন, রিদম ও ফর্মকে যুক্ত করে। ভাস্কর্য ও অ্যানিমেশন তখন মোশনে একত্র হয় রে হ্যারি হউসেন-এর মডেলের মাধ্যমে। যেখানে ভাস্কর্যও মুভিং আর্টে পরিণত হয়।

বিংশ শতকের শেষ ও একুশ শতকের শুরুটা কম্পিউটার অ্যানিমেশনের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। CGI (Computer-Generated Imagery) ফটোগ্রাফির বাস্তবতার সঙ্গে পেইন্টিং-এর রঙ ও আলো একত্র হতে শুরু করে। টয় স্টোরি (১৯৯৫) হয়ে ওঠে থ্রিডি মডেলের একটা চলচ্চিত্র, যা ভাস্কর্যের একাংশকে সামনে আনে। আর্টিস্টরা তখন ডিজিটাল মাধ্যমে ভাস্কর্যের ব্যবহার করতে থাকে। অর্থাৎ স্থাপত্যের মডেলিংয়ের সঙ্গে সিনেমাটিক টেম্পোরালিটির একটা নির্দেশনা এখানে বিদ্যমান। পরবর্তী সময়ে এই ধাঁচে অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে, যার সর্বশেষ সংযোজন ধরা যেতে পারে এআই। অ্যানিমেশন আজ পেইন্টিংয়ের কম্পোজিশন, ভাস্কর্যের ফর্ম, মিউজিকের রিদম, চলচ্চিত্রের টেম্পোরালিটিকে একত্র করেছে। বলা যেতে পারে এটা টোটাল আর্ট ফর্ম, a digital gesamtkunstwerk ...(gesamtkunstwerk, জার্মান এই শব্দটির অর্থ হলো, এমন এক ধরনের আর্ট ফর্ম যাতে সব ধরনের আর্টের সম্মিলন ঘটে) যা বিভিন্ন ট্র্যাডিশনকে একত্র করার মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।

এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে এটা লক্ষণীয় যে, অ্যানিমেশনের আগমনের পথটুকুর অনেকটাই মানুষকে নিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। মানুষের ভেতরকার ভাবনার প্রতিধ্বনিই ঘটেছে এখানে। নানা শিল্পমাধ্যমে যেমন মানুষ বিদ্যমান, তেমনই অ্যানিমেশনের বিকাশে মানুষকে নিয়ে ভাবনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। নানা আর্ট ফর্মের যাত্রার সমগ্রটাই মানুষ কিংবা মানুষকেন্দ্রিক ঈশ্বরকে ঘিরে। পরবর্তী সময়ে মানুষের ভাষ্যই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। তবে অ্যানিমেশনের কথা বিবেচনায় নিলে, তা শুরু থেকেই মানুষের ঊর্ধ্বে যাওয়ার প্রয়াস দেখিয়েছে। যদিও মানুষ সেখানে কখনো গৌণ হয়ে ওঠেনি। এটা মানুষের জগতের মানুষকেন্দ্রিক ধারণাকে অতিক্রম করতে চেয়েছে। তবে সেটা মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। এখানেই প্রাধান্য পেতে শুরু করে পোস্ট হিউম্যানিস্ট জগৎ। পোস্ট হিউম্যানিজম মূলত এমন এক জগতের কথা বলে যা মূলত প্রচলিত মানুষকেন্দ্রিক ধারণা থেকে বের করে আনে। মানুষ এখানে শ্রেষ্ঠ নয়। এখানে বরং মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি ও মেশিনের সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন হয়। মানুষ এখানে আলাদা কোনো ক্যাটাগরি হিসেবে মূল্যায়ন হয় না। এখানে আইডেন্টিটির ধারণাও ফ্লুইড ও হাইব্রিড। এটা মূলত সমাজ, সেখানে বিদ্যমান ক্ষমতাকাঠামো এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুনভাবে ভাবনার পরিসর তৈরি করে। মূলত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অসামান্য বিকাশ ও পরিবেশের সঙ্কটকে নতুনভাবে ভাবতে গিয়েই এই পোস্ট হিউম্যানিজমের যাত্রা। পোস্ট হিউম্যানিজমের অন্যতম চিন্তক রচি ব্রেইদত্তি বলেন, Posthumanism is the historical moment that marks the end of the opposition between Humanism and anti-humanism and traces a different discursive framework, looking more affirmatively towards new alternatives. অর্থাৎ মানুষের জগতকে নতুনভাবে মূল্যায়নের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মানুষের বাইরে অ্যানিমেশন যে দুনিয়া দেখায়

By the late twentieth century, our time, a mythic time, we are all chimeras, theorized and fabricated hybrids of machine and organism; in short, we are cyborgs.

Donna Haraway

অ্যানিমেশনের জগৎ বেশ বিচিত্র। অ্যানিমেশন তার সেই জগতে নানা দৃষ্টিভঙ্গির নানা ব্যাপার নিয়ে হাজির হয়। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, অ্যানিমেশন মানুষের ঊর্ধ্বের একটা দুনিয়া দেখায়। সেই জগতে মানুষের বাইরের জগতও জীবন্ত হয়ে ওঠে। মানুষের ধারণার ঊর্ধ্বের জীবনপ্রকৃতি, স্পিরিট, ইমোশন, এমনকি অবজেক্টও জীবন্ত হয়ে ওঠে। অ্যানিমেশন যা দেখায়, তা বাস্তবে ইন্দ্রিয় উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়। চোখে না দেখা, বাস্তবতার ঊর্ধ্বের এমন অনেক কিছুই দর্শক অ্যানিমেশনে দেখে। বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট ও নানা ধাপ অতিক্রম করে অ্যানিমেশন তার অস্তিত্ব প্রাণবন্ত করে রেখেছে। পাশাপাশি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রের নানা দিক নিয়ে অ্যানিমেশন কথা বলে। অর্থ প্রদানে অ্যানিমেশন নানা দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন ন্যারেটিভ, মেটান্যারেটিভ কিংবা কাউন্টার ন্যারেটিভ নির্মাণে ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রযুক্তির বিভিন্ন মাধ্যমও প্রাণবন্ত করে তুলেছে অ্যানিমেশনের জগতকে। টু ডি থেকে থ্রি ডি অ্যানিমেশনের যাত্রায় আরো রিয়ালিস্টিক হচ্ছে অ্যানিমেশনের দুনিয়া। পুরনো গল্পগুলোও নির্মাণ হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে। চ্যালেঞ্জ করেছে দেখার পুরনো দৃষ্টিকে।

এই পর্বে মানুষের দুনিয়ার বাইরে অ্যানিমেশনের জগৎ কীভাবে বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে; পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সেই দৃশ্যের সম্পর্ক কেমন তার আলোচনা থাকবে। আলোচনার সুবিধার্থে অ্যানিমেশনকে বড়ো কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। এখানে বিখ্যাত অ্যানিমেশনগুলো ধরে সংক্ষিপ্ত আলোচনা থাকবে, যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের ঊর্ধ্বের ভিজ্যুয়ালের সম্পর্ক বিশ্লেষণ প্রাধান্য পাবে।

এক. মানুষহীন অ্যানিমেশন : সম্পর্কের শুরু যেভাবে

প্রথম দিককার অ্যানিমেশন মানুষকে ঘিরে তৈরি হয়নি। বরং এটা মোশনকে নানা আঙ্গিকে পর্যালোচনা করেছে। এখানে মোশন ও ট্রান্সফরমেশনই যেনো জীবনের উৎস। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের শুরুর দিনগুলো অনেকটাই পরীক্ষামূলক ছিলো। মোটাদাগে অ্যানিমেশনের জন্ম ও তার প্রাথমিক সফল যাত্রা ধরা হয় ৩০-এর দশক পর্যন্ত। ফ্যান্টাসম্যাগোরি (১৯০৭) সেসময়ের চলচ্চিত্রের মধ্যে অন্যতম। মডার্নিজমের ঊষালগ্নে এই চলচ্চিত্র স্ট্রিম অব কনসাসনেসের এক্সপেরিমেন্ট করেছে। স্বল্প দৃশ্যে সুররিয়ালিজমের ধাঁচে আঁকা চিত্রগুলোর মোশন একত্রে চলচ্চিত্র হিসেবে তার সম্পূর্ণতা নির্দেশ করে। যার অন্যতম ভাষ্য, বাস্তবতা ফ্লুইড এবং অবজেক্টই পুরো বাস্তবতার ধারক। এখানে দেখানো হয় অবজেক্টেরও প্রাণশক্তি রয়েছে; তারা চলাচল করতে সক্ষম। অর্থাৎ জীবন পূর্ণাঙ্গ মোশন ও ট্রান্সফরমেশনে পরিপূর্ণ। এখানে মূলত বিভিন্ন ইমেজের ট্রান্সফরমেশন দেখানো হয়। এক অবজেক্ট থেকে অন্য অবজেক্টে পরিণত হওয়ার মতো ড্রিমলাইক দৃশ্য প্রদর্শিত হয়। ২০ শতকের আনকনসাস, স্বপ্ন নিয়ে ফ্রয়েডীয় ফ্যাসিনেশনের নির্দেশক হিসেবে ফ্যান্টাসম্যাগোরিকে উল্লেখ করা যায়। আবার এটা আইডেন্টিটির ফ্লুইডিটিকেও নির্দেশ করে। কেননা কোনো কিছুর স্থিরতাকে নিয়ে এই চলচ্চিত্র নয়। বলা চলে অ্যানিমেশনের শুরুটা মানুষকেন্দ্রিক ছিলো না। এমিল কোল নির্মিত দেড় মিনিটের হাতে আঁকা এই অ্যানিমেশনের বিশেষত্ব ছিলো অসীম। মূলত এই চলচ্চিত্রকেই অ্যানিমেশন জগতের প্রথম কোনো পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

স্টিমবোট উইলি (১৯২৮), এটাই প্রথম সিনক্রোনাইজড সাউন্ড সিস্টেমে নির্মিত কোনো চলচ্চিত্র। ওয়াল্ট ডিজনির এই নির্মাণকে প্রযুক্তিগত সাফল্যের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এতে মিকি মাউস নামের (যে মানুষ নয়) এমন এক চরিত্র রয়েছে, যে তার নিজের মতো করে একটা স্টিমবোটে জীবন কাটাচ্ছে। সে মানুষের মতোই অন্যসব প্রাণীদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করে। মূলত স্টিমবোটে মিকির নানা ধরনের কার্যক্রম নিয়ে এর প্লট নির্মিত। পুরো চলচ্চিত্রে অ্যানিমেলদের মধ্য দিয়ে মানবিক জগতের নানা দিক দেখানো হয় মিউজিকের মাধ্যমে। পোস্টহিউম্যান আঙ্গিক থেকে এটা বোঝা যায়, অ্যানিমেলদের মধ্যেও মানুষের মতো মুভমেন্ট, রিদম ও এক্সপ্রেশন রয়েছে। তারাও মানুষের মতো জীবন্ত। অ্যানিমেলও এজেন্সির প্রতিফলন এখানে ঘটে। অ্যানিমেশন অ্যানিমেলদের নিজস্ব শব্দ, রিদম দিচ্ছে, যেনো তারা একেকজন শিল্পী, মানুষের দাস নয়।

ফ্যান্টাসিয়ায় (১৯৪০) প্রাধান্য পায় মিউজিক ও ম্যাটারের স্পিরিট। এটা মূলত এক্সপেরিমেন্টাল ডিজনি সিম্ফোনিক অ্যানিমেশন। এখানে নানা বিমূর্ত রঙ, জাদুর ঝাড়ু, বিভিন্ন কসমিক ক্রিয়েশন, এমনকি ডায়নোসর মিউজিকের তালে নড়াচড়া করে। ম্যাটার নিজেও নাচতে জানে। শব্দ, মোশন জীবনের এনার্জির প্রকাশক হিসেবেই ভূমিকা রাখে। এখানে মাশরুম থেকে তারকারাজি কোনো কিছুই রিদমের বাইরে নয়। এখানেও মানুষের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয় না। অ্যানিমেশন নিজেই যেনো মুভমেন্টের একটা আর্ট। তা শুধু গল্প বলে না, জীবনের পালসও নানা আঙ্গিকে তুলে আনে।

প্রথম দিককার অ্যানিমেশন পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, অ্যানিমেশন জীবনকে দৃশ্যে তুলে এনেছে। অ্যানিমেশনের কাছে জীবন কেবল মানুষকেন্দ্রিক নয়, বরং প্রতিটি সত্তা এর অংশীদার। জীবন কেবল বায়োলজিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটা মোশনের আদলে সবখানে বিদ্যমান। মানে অ্যানিমেশনের প্রথম দর্শনই হলো মোশন ও জীবন নিয়েMotion is life. মানুষের অস্তিত্ব এখানে বিদ্যমান ঠিকই, তবে মানুষকে ঘিরে যে জগৎ মানুষের চোখে উপেক্ষিত তা এখানে প্রাধান্য পায়।

দুই. প্রকৃতি ও তার নৈতিকতার দর্শন

প্রকৃতি অ্যানিমেশনে শুধু পটভূমি নয়, বরং এটা নৈতিকতার দর্শনের একটা স্বতন্ত্র সিস্টেম। ফলে নৈতিকতার ধারণা প্রকৃতির ধারণা ছাড়া সম্ভব নয়। মানুষের নৈতিকতা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো প্রকৃতির সান্নিধ্যে তার বেড়ে ওঠা। অর্থাৎ নৈতিকতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জুড়ে আছে প্রকৃতি। ঠিক তারই প্রতিফলন দেখা যায় বিভিন্ন অ্যানিমেশনের পর্দায়। যেমন, স্নো হোয়াইট অ্যান্ড দ্য সেভেন ডোয়ার্ফস (১৯৩৭) চলচ্চিত্রটি। এটা ডিজনির প্রথম কোনো ফিচার লেন্থে এবং ন্যারেটিভ ধাঁচে নির্মিত চলচ্চিত্র। পৌরাণিক কাহিনির আলোকে ন্যারেটিভ নির্মাণে এই চলচ্চিত্র প্রথমবারের মতো ভূমিকা রাখে। পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের যাত্রা এর মধ্য দিয়েই। এটা দৈর্ঘ্য ও গল্প বলার দিক থেকে ফ্যান্টাসম্যাগোরিস্টিমবোট উইলি থেকে আলাদা।

প্লট পর্যালোচনা করলে এখানে স্নো হোয়াইট নামের এক চরিত্র পাওয়া যায়, যিনি তার সৎ মায়ের আক্রোশের শিকার হয়ে নির্বাসিত। সেখানে তার সংগ্রাম ও উদ্ধারের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় ন্যারেটিভ। তবে এখানে যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা হলো প্রকৃতি। এখানে প্রকৃতি একটা জীবন্ত কমিউনিটি, যারা মানুষের মধ্যেই বাস করছে মানুষের মতো। চলচ্চিত্রে দেখা যায়, প্রাণীকুল, গাছপালা এবং বিভিন্ন বস্তু স্নো হোয়াইটকে সাহায্য করছে। সেখানে প্রকৃতির মধ্যে আবেগ ও বিশ্বস্ততার ধারণা বিদ্যমান। এর মধ্য দিয়ে বন ও পশুপাখিরা তাদের নিজস্ব জগতে নৈতিকতার ধারণা তৈরি করছে। সার্বিকভাবে পুরো দৃশ্যপটে দেখা যায়, প্রকৃতি মানুষের সহায়ক, কোনো টুল নয়। যদিও ন্যারেটিভের নির্মাণ এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়; তবে মানুষের বাইরের যে দুনিয়া প্রকৃতির ধারণাকে স্বতন্ত্র এজেন্সি হিসেবে উপস্থাপন করে, তা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়।

অ্যানিমেল জগতের এক নৈতিকতার বার্তা নিয়ে হাজির হয় দ্য লায়ন কিং (১৯৯৪)। এখানে জন্ম, মৃত্যু, পুনর্জন্ম জীবনের করুণ কোনো অধ্যায় নয়, বরং এটাই জীবন। জীবনের জন্য তা অবশ্য প্রয়োজনীয়। প্রত্যেক প্রাণীরই প্রকৃতির ভারসাম্য টিকিয়ে রাখায় ভূমিকা রয়েছে। প্রকৃতি প্রদত্ত নিয়ম, যেখানে সম্মান ও দায়িত্ববোধে জীবন পূর্ণতা পায়। চলচ্চিত্রের অন্যতম চরিত্র সিম্বা’কে ‘সার্কেল অব লাইফ’ বুঝতে গিয়ে প্রকৃতির ছন্দ বুঝতে হয়। মুফাসার মৃত্যুর পরে স্কার-এর সিংহাসন দখল ও প্রকৃতির ক্ষয়ে যাওয়া দেখে এটা প্রতীয়মান যে, নৈতিক অবক্ষয়ে প্রকৃতির অবক্ষয় নিহিত থাকে। প্রকৃতি এখানে শিক্ষক, নৈতিক তথা মোরাল অর্গানিজম।

ট্যাঙ্গলড (২০১০) ডিজনি ফেইরি টেলের রিভাইভাল হিসেবে আগমন করে। ফেইরি টেলের মধ্য দিয়ে নানা আঙ্গিকে প্রকৃতি ও মানুষের জগতের পার্থক্যের জায়গাগুলো নির্দেশ করে দেয়। এখানে প্রধান চরিত্র রেপানজেল’কে ঘিরেই পুরো গল্প। তিনি জাদুকরী সোনালি চুলের অধিকারী। সেই চুলে জীবনের নির্যাস পাওয়া যায় এবং সেটা জীবন দানে সক্ষম। আর সেই নির্যাসের উৎস সূর্য থেকে জন্ম নেওয়া ফুল। শৈশবেই রেপানজেলকে মাদার গোথেল সোনালি চুলের জন্য চুরি করে নেন। আর মাদার গোথেল সেই জাদুকরী চুলের মাধ্যমে নিজের যৌবনকে ফিরিয়ে আনতেন। তাই রেপানজেল বন্দি রয়ে যান বহু বছর। পরবর্তী সময়ে ফ্লিন রাইডারের আগমন ও রেপানজেলের মুক্ত পৃথিবীর প্রতি গমন এবং শেষে ফ্লিনের আত্মত্যাগ ও তাকে ফিরিয়ে আনার মধ্যেই পুরো চলচ্চিত্র।

চলচ্চিত্রে ফ্লিনের প্রাণ ফিরে আসে রেপানজেলের জাদুকরী চুলের জন্য নয়, বরং তার অশ্রুর জন্য। এক্ষেত্রে বোঝা যায় মানুষের এই চরিত্রে যে শক্তি আছে, তা প্রকৃতি থেকে পাওয়া। আলো, গাছ এই শক্তি মানুষের মধ্যে সঞ্চার করে। মানুষ সেই শক্তির বাইরের কেউ না। প্রকৃতির অংশই এখানে মানুষ। মানুষের সঙ্গে এক্ষেত্রে প্রকৃতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক দৃশ্যমান হয়। এখানে ইকোফেমিনিজমও গুরুত্ব পায়, কেননা প্রকৃতির শক্তি ও নারীর শক্তির সম্মিলন ঘটে। এক্ষেত্রে প্রকৃতি প্রতিকার করে তার মমতা দিয়ে, নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে নয়।

প্রকৃতি আর নৈতিকতা আলাদা কিছু নয়। দুই মিলেই প্রকৃতি। এই ইকো-স্পিরিচুয়ালিটি অনুযায়ী পুরো বিশ্বই একটা মোরাল অর্গানিজম। কোনো কিছুই প্রকৃতির নৈতিক বিচার থেকে বিচ্যুত নয়। এখানে পোস্টহিউম্যানিস্ট এথিকসের সঙ্গে সোশাল ইকোলজির একটা সমন্বয় দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, অ্যানিমেল এখানে শেখাচ্ছে মানুষ কীভাবে একসঙ্গে বাঁচতে পারে, জীবনের মানে কী? কীভাবে সমাজের ধারণাগুলো বদলানো যায়, ইত্যাদি। পাশাপাশি মানুষ ও প্রকৃতি মিশে প্রাণসঞ্চারে ভূমিকা রাখছে।

তিন. মেশিন ও অবজেক্টের প্রাণ (Soul)

অনেক অ্যানিমেশন কনসাসনেসের সঙ্গে নির্জীবের সম্পর্ককে দেখায়। বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট (১৯৯১) এ মোমদানি, চায়ের কাপগুলোর মতো বস্তুগুলোর মধ্যে ভালোবাসার চিত্র দেখা যায়। তারাও ভালোবাসে, কষ্ট পায় মানুষের মতোই। প্লট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভালোবাসার কমতির কারণে মানুষ জন্তুতে পরিণত হয়। এর ফলে অন্যান্য মানুষের জীবন সঞ্চারিত হয় মোমদানি ও চায়ের পটের মধ্যে।

অন্যদিকে দ্য আয়রন জায়ান্ট (১৯৯৯) এ একটি রোবট, যে কিনা মেশিন, সে তার মধ্যে সহানুভূতি তৈরি করে। দেখা যায়, একটা বড়ো মহাজাগতিক রোবট মানুষের মতো অনুভব করছে; মানুষ ঠিক যেভাবে নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবে, সেভাবে রোবটও তার বুদ্ধিমত্তার দিক থেকে বেড়ে ওঠে। পরিশেষে সে মানুষের মতোই শান্তির খোঁজে থাকে, ভালোবাসতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে মানুষের সঙ্গে মানুষ নয়, এমন কিছুর সম্পর্ক হাজির হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মেইনে বসবাসরত নয় বছরের এক বালকের সঙ্গে এক জায়ান্ট মেটাল রোবটের সম্পর্কের ব্যাপারগুলো এখানে প্রাধান্য পায়। সেই জায়ান্ট অনেক বড়ো হলেও সে এক শিশুর মতো। সে শিশু হিসেবেই বিকশিত হচ্ছিলো ওই বালকের মাধ্যমে। সে জায়ান্টকে মানুষের মতো করে ভাষা শেখায়। তবে সংঘর্ষ আসন্ন হয় যখন এটা মিলিটারির নজরে আসে। সেখানে লড়াই হয় বন্ধুত্ব বনাম অস্ত্রের। নানা নাটকীয়তায় শেষে জয় হয় বন্ধুত্বের। মানুষের সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার প্রয়াস আছে এতে।

অবজেক্ট ও প্রযুক্তি জীবনহীন কোনো কিছু নয়, এমনটাই দেখায় অ্যানিমেশন। তাদের মধ্যে স্মৃতির অনুভূতি রয়েছে, মানুষের মতো যত্নের আকাক্সক্ষা রয়েছে। তারা যেকোনো কিছু বেছে নিতে সক্ষম। যা হিউম্যান ও ননহিউম্যানের মধ্যকার সীমানা মুছে দেয়।

একই রকম বিষয় ওয়াল-ই (২০০৮) চলচ্চিত্রেও উঠে আসে। এখানে শত শত বছরের ভবিষ্যতের এক পৃথিবী দেখানো হয়; যেখানে মানুষের অস্তিত্ব নেই। সেখানে পৃথিবী শুধুই বর্জ্য পদার্থে পরিপূর্ণ। মানুষ আর সেখানে বাস করে না। বরং তারা বাস করে পৃথিবী থেকে দূরের এক স্পেসশিপে। সেই স্পেসশিপ আবার রোবটরা নিয়ন্ত্রণ করে। পৃথিবীতে ওয়াল-ই নামের একটি রোবট অবশিষ্ট রয়ে গেছে, যে কিনা প্রতিদিন রুটিনমাফিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাজ করে চলেছে। মূলত ওয়াল-ই নামের এই রোবটকে ঘিরেই পুরো গল্প। তার অনুভূতিও রয়েছে। ওয়াল-ই বর্জ্য থেকে বের করা ক্যাসেটে মানুষের গান শোনে। ধীরে ধীরে সে মানুষের আবেগ-অনুভূতিগুলো জোরালোভাবে পেতে শুরু করে। তার মধ্যেও মানুষের মতো প্রেম আসে। ইভ নামে অন্য একটা রোবট যখন পৃথিবীতে আসে, ওয়াল-ই তার সঙ্গে সখ্য তৈরি করে। ওয়াল-ইতে মূলত মানুষের চরিত্রের চেয়ে একটা মেশিনের চরিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

চার. অদৃশ্য জগৎ : স্পিরিটস, এলিমেন্টস ও দ্য স্যাকরেড

অনেক অ্যানিমেশন স্পিরিচুয়াল জগতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, যে জগতে মানুষের ভূমিকা গৌণ। সেই জগতে বিভিন্ন স্পিরিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১) চলচ্চিত্রে দেখা যায় মানুষহীন এক স্পিরিচুয়াল দুনিয়া। যেখানে মানুষের প্রাধান্য নেই। গল্পের মূল চরিত্রের হঠাৎ সেখানে প্রবেশ এবং বেঁচে ফেরার গল্পই এই চলচ্চিত্র। মানুষ না থাকলেও তারা মানুষের মতো করে ভাবে। মানুষের মতোই সেখানে নানা বিভাজন, নানা আকাঙ্ক্ষা। গল্পটি চিহিরো নামের ১০ বছরের এক বালিকাকে ঘিরে। সে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে পরিত্যক্ত পার্কে ভ্রমণে আসে। পরে দেখা যায় ওই স্থানটি বিভিন্ন স্পিরিটের জগৎ। তার বাবা-মা সেখানকার খাবার খেয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই শূকরে পরিণত হয়। তবে চিহিরো ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। পরবর্তী সময়ে সে এখান থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে থাকে। আর সেখানে তাকে সহযোগিতা করে হাকু নামের এক বালক।

চিহিরো ইউবাবা নামের এক স্পিরিটের বাথহাউজে কাজ করতে শুরু করে। সেখানে সে অনেক কিছু শেখে। বাবা-মাকে উদ্ধারের তাড়না তাকে পরিণত মানুষ করে তোলে। এই চলচ্চিত্র মানুষের জগতের ঊর্ধ্বের জগৎ দেখায়, যে জগৎ মানুষের নয়।

অন্যদিকে ডিজনি নির্মিত অ্যানিমেশন ফ্রোজেন (২০১৩) কে ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস-এর কাউন্টার ন্যারেটিভ হিসেবে ধরা হয়। এখানে নারীর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। গল্পটা মূলত অ্যারেন্ডেল রাজ্যের দুই রাজকুমারী এলসা ও আনাকে নিয়ে। এলসার কাছে এক বিশেষ শক্তি রয়েছে যাকে বলে ‘আইস পাওয়ার’। তিনি চাইলে যেকোনো বস্তুকে তুষারে পরিণত করতে পারেন। তবে সমস্যা হলো সেটা নিয়ন্ত্রণহীন। বাবা-মাকে আকস্মিকভাবে হারানোর পর এই শক্তিই তার বিড়ম্বনার কারণ হয়। রাজ্য অভিষেকের সময়ে এই শক্তিই তাকে প্রতিহত করে। শক্তি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তৈরি হয় ভয়ঙ্কর এক প্রতিক্রিয়া। কোনো এক ভুলে সমগ্র রাজ্য ঢেকে যায় তুষারে। পুরো রাজ্যের তিরস্কারের আশঙ্কায় তিনি নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে নেন।

ফ্রোজেন টু (২০১৯) একেবারে ভিন্ন গল্প বলে। সেই গল্পে তাদের রাজ্যের অতীতের কোনো পাপের, যা এসেছে একটা বনকে ঘিরে। সেই বনে থাকা বাসিন্দাদের প্রতি অন্যায়ের পাপমোচন এই চলচ্চিত্র। প্রোটাগনিস্ট এলসা যখন বুঝতে পারেন অ্যারেন্ডেল রাজ্য নর্থাল্ড্রা আদিবাসীদের সঙ্গে অন্যায় করেছে, তখন তাদের মনোজগৎ এই পাপমোচনের দিকে তাড়িত হয়। পরিশেষে, এলসা সমস্যা সমাধানের পর বনেই থেকে যান, মিশে যান তাদের মধ্যেই। এদিকে আনা রাজ্যভার গ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রজুড়ে প্রাধান্য পেয়েছে এমন এক জগৎ ও শক্তির, যা বাস্তবিক দুনিয়ায় অনুপস্থিত।

অন্যদিকে পলিনেশিয়ান সেটিং-এ নির্মিত মোয়ানা (২০১৬) অনেকগুলো দিক সামনে নিয়ে আসে; হিরোইজম ও ফিমেল অটোনমির ধারণাটি নতুনভাবে পর্যবেক্ষণ করে। অ্যানিমেশনের গল্প মোয়ানা নামের এক নারীকে ঘিরে। পলিনেশিয়ার এক দ্বীপে যার বেড়ে ওঠা। হলিউডের সাদাকালোর দ্বন্দ্বের বাইরে ভিন্ন এক পটভূমি এখানে প্রাসঙ্গিক।

মোয়ানাফ্রোজেন-এ নারীর উদ্ধারকর্তা হিসেবে হাজির হয়েছে নারী। প্রকৃতি রক্ষা যেনো নারীকে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেয়। এখানে প্রকৃতি মানুষের নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বেএকইসঙ্গে সুন্দর ও ভয়ঙ্কর। প্রকৃতিই এখানে স্বতন্ত্র সত্তা। চলচ্চিত্রগুলো মানবকেন্দ্রিক গল্প বলা থেকে অনেকটাই দূরে। যা মানবিক জগতের ঊর্ধ্বে। এখানে মানুষ ও মানুষহীনতার গল্প আছে। শুধু মানুষ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়; প্রকৃতি, প্রাণী, গাছ, পাহাড় সবই প্রাসঙ্গিক। তাদের অস্তিত্ব আবার মানুষকে ঘিরে নয়, তারা নিজেরা স্বতন্ত্র। ফ্রোজেন টু-এ একটি দৃশ্যে কেবল মানুষের উপস্থিতি তার স্বর। এই ধরনের অ্যানিমেশনে সাধারণত অ্যানিমিস্টিক কসমোলজি ও ইকো-স্পিরিচুয়ালিজমের নিদর্শন পাওয়া যায়।

পাঁচ. দ্য অ্যানিমেল সোসাইটি

এই ক্যাটাগরিতে মূলত অ্যানথ্রোমরফিক দুনিয়া প্রাধান্য পায়। যেখানে অ্যানিমেলদের ভেতরকার দুনিয়া, তাদের জগৎ, চিন্তা সবকিছুই মানুষের আদলে নির্মিত। এই ধারার চলচ্চিত্রের মধ্যে জুটুপিয়া (২০১৬) অন্যতম। এটা এমন এক অ্যানথ্রোমরফিক দুনিয়ায় নির্মিত যেখানে সবাই বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। সেখানে জুডি হপস নামের এক র‌্যাবিট পুলিশ হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং পুলিশ হয়ও। নিজেকে প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ এক মামলা হাতে নেয়। পরে নিক ওয়াইড নামে এক শেয়াল চরিত্রের সঙ্গে তার ইন্টারঅ্যাক্টের মধ্য দিয়ে পুরো প্লট গড়ে ওঠে। এখানে শেয়াল চরিত্রটি সামাজিক স্টেরিওটাইপকে ভেঙে দেয়। শেয়াল যাকে কিনা প্রচলিত গল্পে খারাপ হিসেবে দেখা হয়, স্টেরিওটাইপের পুনর্মূল্যায়ন হয়। চলচ্চিত্রটি মানুষের বাইরের এক পৃথিবী নিয়ে, তবে মানুষের পৃথিবীর নানা সামাজিক ধারণার স্যাটায়ার।

ডিজনির রেনেসাঁর সময়ে নির্মিত দ্য লায়ন কিং (১৯৯৪) মূলত অ্যানিমেল কিংডমকে দেখায়। জীবন, মৃত্যু, পুনর্জন্ম নিয়েই এই কিংডম। যখন এর ব্যাঘাত ঘটে তখনই প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়। মোরাল ও স্পিরিচুয়াল ব্যালেন্সের বার্তা দেয় এই চলচ্চিত্র। এখানেও পুরোপুরি মানুষবিহীন অ্যানথ্রোমরফিক দুনিয়া দেখানো হয়।

ছয়. মানুষের ভেতরকার জগৎ

অ্যানিমেশন মানুষের ভেতরকার জগতকেও খুঁজেছে, নির্মাণ করেছে মানুষের মন, মনস্তত্ত্ব ও অস্তিত্বের আকাক্সক্ষা। অনেক অ্যানিমেশন মানুষের ভেতরকার দৃশ্যমান জগতের বাইরের এক দুনিয়া দেখায়, যেটা নিয়ে মানুষ হয়তো কখনো ভাবেনি। এম্পিরিকাল জ্ঞানের পাশাপাশি যে দার্শনিক জ্ঞান মানুষের ভিত গড়ে দেয়, সেই আলোচনাই সেখানে প্রাধান্য পায়। বিমূর্তকে মূর্ত করার প্রয়াস সেখানে প্রবলভাবে দেখা যায়। মানুষ সেখানে কখনো তার ভেতরকার জগতের আদলে চলে। সেই জগৎ স্মৃতির অনুভূতি দিয়েও তৈরি হতে পারে। তবে সেই শক্তির উৎস কোথায়?

ইনসাইড আউট (২০১৫) এ সেই জগতেরই প্রতিফলন দেখা যায়। এতে মানুষ কোনো মূল চরিত্রে স্থান পায়নি। বরং মানুষের ভেতরকার অনুভূতিগুলো চরিত্র আকারে স্থান পেয়েছে। বলা চলে এই অ্যানিমেশন মানুষের ভেতরকার ম্যাট্রিক্সের দার্শনিক পর্যালোচনা, যেখানে চরিত্র হিসেবে স্থান পেয়েছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি। এতে রাইলি নামের ১১ বছরের এক মেয়ের মনস্তত্ত্বের অংশ জয়, স্যাডনেস, অ্যাঙ্গার, ফিয়ার, ডিসগাস্ট ইত্যাদি চরিত্র হিসেবে স্থান পায়। আর সেগুলো চলচ্চিত্রে নানা রঙে চিত্রিত হয়। যেমন, জয়কে হলুদ, স্যাডনেসকে নীল, অ্যাঙ্গারকে লাল রঙে চিত্রিত করা হয়। যা তাদের সিম্বলিক অর্থকে ভিজ্যুয়ালে রূপান্তর করে। এখানে লক্ষণীয় হলো, মানুষের চরিত্র এখানে যতো না প্রাধান্য পেয়েছে, তার চেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের আবেগ-অনুভূতি দিয়ে নির্মিত চরিত্রগুলো।

কোকো (২০১৭) তে দেখা যায়, মৃত মানুষের এক দুনিয়া। সেখানে মানুষ মৃত্যুর পরেও মনে রাখে, ভালোবাসে। মনে রাখার সঙ্গে ভালোবাসার অনুভূতিগুলো জোরালো হয়। এর গল্প আবর্তিত হয় ১২ বছরের মিগুয়েল রিভেরাকে ঘিরে। যে সঙ্গীত নিয়ে আগ্রহী। তবে তার পরিবারে সঙ্গীত নিয়ে কথা বলাও নিষেধ। তাদের ধারণা, এই সঙ্গীতই তাদের পূর্বপুরুষের একজনকে পরিবারবিমুখ করে। মিগুয়েল মৃতদের দুনিয়ায় আকস্মিকভাবে প্রবেশ করে সেখানকার জগতে তার পূর্বপুরুষদের দেখতে পায়। সে আবিষ্কার করে, পৃথিবীতে কারো বহন করা স্মৃতির ওপরই নির্ভর করে, কেউ মৃতের জগতে টিকে থাকতে পারবে কিনা। অ্যানিমেশন এতে মানুষের দৃষ্টিসীমা অতিক্রমের স্পর্ধা দেখায়।

সৌল (২০২০) অনেকটা মানুষের ভেতরকার ম্যাট্রিক্সের পর্যালোচনা করে। এই চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র জো’কে নিয়ে পুরো প্লট। তিনি বিখ্যাত জাজ কিংবদন্তি ডরোথিয়া উইলিয়ামসের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান। সেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে তিনি ম্যানহোলে পড়ে যান। আক্ষরিক জো এখানেই মারা যান। এরপরই তিনি নিজেকে খুঁজে পান গ্রেট বিফোর তথা এমন এক জায়গায়, যেখানে মানুষের আত্মা পৃথিবীতে আগমন করবে। তিনি সেখানে নানা চরিত্রের আত্মারও খোঁজ পান, যারা পৃথিবীতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই চলচ্চিত্রের দর্শন মূলত, মানুষের অস্তিত্বকে ঘিরে। মানুষ অস্তিত্বশীল কেননা মানুষ আছে।

বিইং-এর মেটাফিজিকাল ও ফেনোমেনোলজিকাল ধারণার ওপর এই ধরনের চলচ্চিত্রের বেশিরভাগের নির্মাণ। কনসাসনেস এখানে কেবল মানুষকেন্দ্রিক নয়, বরং এটা একটা কসমিক প্রক্রিয়া। জীবন সেখানে শারীরিক অস্তিত্ব ছাড়াও চলতে থাকে।

সাত. নিউ-ইকোলজিকাল চিন্তা

সাম্প্রতিক নির্মিত এই চলচ্চিত্রগুলো প্রাকৃতিক পরিবেশে বিদ্যমান সবকিছুকেই জীবন্ত হিসেবে দেখে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়াদি এখানে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নেয়। এনকান্টো (২০২১) এ দেখা যায় সেখানকার বাড়িঘরগুলো অনুভব করতে সক্ষম। এমনকি তারা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও করে। এলিমেন্টাল (২০২৩) এ আগুন, পানি, মাটি, বায়ু সবকিছু একটা সমাজের অংশ, যারা মানুষের মতো অস্তিত্বশীল ও সমাজে বেঁচে থাকতে সক্ষম। জীবন এখানে রিলেশনাল, তবে ইন্ডিভিজ্যুয়াল নয়। সবকিছুর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আবেগ, ভালোবাসার অনুভূতি, যা মানুষকেন্দ্রিক নয়। এলিমেন্টাল-এ এলিমেন্টাল নামের সিটিতে চার এলিমেন্ট (আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি) একসঙ্গে বাস করে। এখানে প্রত্যেক এলিমেন্ট ভিন্ন ভিন্ন সোশাল ক্লাসকে নির্দেশ করে, কেউই কারো সঙ্গে মেশে না। চলচ্চিত্রের গল্প এম্বার লুমেন নামের এক নারীকে ঘিরে নির্মিত। যিনি আগুনের এলিমেন্টের একজন নারী। তিনি পরবর্তী সময়ে ওয়েইড রালফ নামে পানি এলিমেন্টের একজন পুরুষের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করে। এই ধারায় প্রকৃতি কীভাবে নতুন করে চিন্তার কেন্দ্র হয়ে উঠছে তা প্রাধান্য পায়।

সব ক্যাটাগরির কথা চিন্তা করে এটা বলা যায়, অ্যানিমেশন যা দেখায় তার সবকিছুতেই জীবনের তাৎপর্য মোশন আকারে আসে। অ্যানিমেশন শুরু থেকেই মানুষের জীবনভাবনা নানাভাবে বদলে দিয়েছে। মোশন থেকে প্রকৃতি, প্রকৃতি থেকে মেশিন, মেশিন থেকে স্পিরিট-মাইন্ড, আবার সেখান থেকে ম্যাটারসবখানেই অ্যানিমেশন তার ধারণা বদল করে চলেছে। পাশাপাশি মানুষকেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে বিশ্বজনীন ভাবনার জগতটুকুও উন্মুক্ত হয়েছে এখানে। এটা শেখায় সবকিছুর অস্তিত্বই জীবনকে জুড়ে দেয়। মানুষ সেখানে থাকা বিদ্যমান ক্ষুদ্র অংশ কেবল।

পৃথিবীর বেশিরভাগ পুরাণে মানুষের পৃথিবীতে আগের সবকিছুকে আক্ষরিক অর্থে মানুষের মতোই মানবিক অস্তিত্বে কল্পনা করা হয়। গ্রিক পুরাণে পুরো পৃথিবীকে কল্পনা করা হয় গাইয়া বা মাদার আর্থ বলে। সমুদ্রও সেখানে স্বতন্ত্র অস্তিত্ব, যার নিয়ন্ত্রণ পোসেইডন-এর হাতে। নরকের একেকটা অস্তিত্বও তেমনই জীবন্ত। ঠিক এমনটাই প্রদর্শিত হয় অ্যানিমেশনের দুনিয়ায়। যেখানে প্রকৃতি একেকটা চরিত্র হিসেবে আগমন করে। যেমনটা দেখা যায় মোয়ানাতে। সেখানে প্রধান চরিত্রের সঙ্গে মানবিক ভূমিকায় ছিলো প্রকৃতিতে বিদ্যমান অন্যান্য জীব ও জড়। ফ্রোজেন-এ স্নো হয়ে ওঠে চরিত্র!

অ্যানিমেশনকে ঘিরে কিছু প্রশ্ন

অ্যানিমেশন মানুষের দেখার নানা দৃষ্টিভঙ্গিকে বিভিন্নভাবে প্রশ্ন করে। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে অ্যানিমেশন বিষয়টা নিয়েও প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন জাগে অ্যানিমেশনের দুনিয়াটা আসলে কেমন? অ্যানিমেশন কি বাস্তব নাকি অবাস্তব? লাইভ অ্যাকশন চলচ্চিত্রে যে ইমেজ ব্যবহৃত হয়, সেটা অ্যানিমেশন থেকে কী করে আলাদা? এক্ষেত্রে অ্যানিমেশনের অন্টোলজির ব্যাখ্যা আবশ্যক। অ্যানিমেশনে আসলে কী হয়? অ্যানিমেশন বাস্তব ও অবাস্তব দুনিয়ার মধ্যকার সম্পর্কগুলোকে নতুন করে দেখাতে সক্ষম। এটা প্রতীয়মান যে, অ্যানিমেশনে যা দেখানো হয় তা আদতে অস্তিত্বহীন, তবে মানুষ এটাকে বাস্তব হিসেবেই মূল্যায়ন করে। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের চরিত্রগুলোর অবস্থান এমন এক পরিসরে যা বাস্তব ও অবাস্তবের মাপকাঠিতে মূল্যায়ন সম্ভব নয়। মূলত অ্যানিমেশনের অন্টোলজির প্রশ্নে এক্ষেত্রে এটা নিশ্চিত যে, অ্যানিমেশনের দৃশ্যের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, তবে তা বাস্তবিক অর্থে অস্তিত্বহীন। তবে মানুষের বাস্তব ও অবাস্তব বোঝার সক্ষমতা কতোখানি? প্লেটোর অ্যালিগরি অব দ্য কেইভ তো এক্ষেত্রে বলে যে, মানুষের দুনিয়ার বেশিরভাগটা জুড়েই কেবল শ্যাডো বা ছায়া। মানুষের দৃষ্টিসীমা ও উপলব্ধির স্তর কেবল শ্যাডো অবধি, যেখানে জ্ঞান অনুপস্থিত। এক্ষেত্রে অ্যানিমেশন যা দেখায়, আর বাস্তবে যা, তা অনেকটাই প্লেটোর অ্যালিগরির চিত্রায়ণ। এক্ষেত্রে অ্যানিমেশনকে শ্যাডোর শ্যাডো বললেও ভুল হবে না। অর্থাৎ অ্যানিমেশন এক্ষেত্রে বাস্তবতার ইমিটেশনেরও ইমিটেশন। অ্যারিস্টটল যাকে বলেন, অ্যানিমা তথা আত্মা। অ্যারিস্টটল এই মিমেসিস তথা শৈল্পিক অনুকরণকে উত্তম হিসেবে বিবেচনা করে।

অন্যদিকে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের ভাষ্য অনেকটা অরিজিনালিটিকে নিয়ে। এক্ষেত্রে তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু এটার পুনরুৎপাদন সম্ভব, ফলে অ্যানিমেশনে অরিজিনালিটির ঘাটতি রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে মিকি মাউসকে ধরা যেতে পারে। মিকি মাউস কি বাস্তব? না, মিকি মাউস বাস্তবে কেউ না। এটা অস্তিত্বহীন। তবে একটু গভীরভাবে বিবেচনা করলে এটা মানুষের নানা ধ্যানধারণা, সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসেবে অবশ্যই অস্তিত্বশীল। লাইভ অ্যাকশন চলচ্চিত্রে ক্যামেরা তা-ই ধারণ করে, যা বাস্তবে অস্তিত্বশীল। কিন্তু অ্যানিমেশন অঙ্কন কিংবা সি জি আই-এর ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়, অর্থাৎ এটার মধ্যে বাস্তবিকই কেউ নেই।

এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকভাবেই অ্যানিমেশনের essence নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। ঠিক কোন মৌলিক বিষয় অ্যানিমেশনকে অ্যানিমেশন করে তোলে? লাইভ অ্যাকশন চলচ্চিত্রে চরিত্র কেবল তার শরীরে সীমাবদ্ধ; তবে অ্যানিমেশনে তা ব্যতিক্রম। অ্যানিমেশনে একটা চরিত্র তার শরীরে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তাকে পুনরায় আঁকা যায়, নতুন স্বর যোগ, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করা যায়। স্নো হোয়াইট চরিত্র নিয়ে নির্মিত প্রথম ও শেষ চলচ্চিত্র অনেকটাই আলাদা। এক্ষেত্রে বলা চলে অ্যানিমেশন লাইভ অ্যাকশনের মতো কখনোই একজন অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্ভর নয়। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের অস্তিত্ত্বের দ্বন্দ্ব অনেকটা অ্যানিমেশনের চরিত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। কেননা অ্যানিমেশন চরিত্রের আইডেন্টিটি নিয়েও নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ তুলে ধরতে থাকে। কোন চরিত্র আসলেই আসল? আর এই আইডেন্টিটি কোথায় নিহিত থাকে? কোন ব্যাপারটা আদতে সত্য তা ধোঁয়াশাতেই রয়ে যায়। অর্থাৎ বাস্তব ও অবাস্তবের সীমাবদ্ধতাটুকু স্ক্রিন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, তা চরিত্র ও তার আইডেন্টিটি ডিসকোর্সেও সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ। আবার এটাও হতে পারে, অ্যানিমেশনের দুনিয়া পুরোটাই হাইপাররিয়েল। অর্থাৎ এটা কেবল বাস্তবতাকে ইমিটেট করে না, বরং এটা নতুন একটা বাস্তবতা তৈরি করতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে টয় স্টোরি-এর দুনিয়া কিংবা শ্রেক-এর দুনিয়া। ফ্যান্টাসম্যাগোরি-তে দেখা যায়, চরিত্রগুলো গঠন হচ্ছে এবং পরিবর্তিত হচ্ছে নানা ফর্মে।

এবার অন্টোলজিকাল যে প্রশ্ন এখানে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, এটার নড়াচড়া বা মুভমেন্ট কি তাকে জীবনদান করে? নাকি এটা বাস্তবেই জীবন্ত? ঠিক অ্যানিমেশনে তাদের জীবন্ত হয়ে ওঠা বা কথা বলার ব্যাপারগুলো এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কেনো? আগের আলোচনায় অ্যানিমেশনের সঙ্গে নানা জীবনদর্শন প্রাধান্য পেয়েছে; এই পর্যায়ে নানা অ্যানিমেশন নিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নগুলোকে আরেকটু বিস্তৃত করে দেখা যাক।

সময়ের দৃষ্টিতে অ্যানিমেশন

অ্যানিমেশনকে বুঝতে যে ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সময়, যা অ্যানিমেশনের অন্যতম মৌলিক ডাইমেনশন। সময়ের ব্যবহার বোঝার মধ্য দিয়েই বোঝা যায় অ্যানিমেশন এক অনন্য আর্ট ফর্ম। আবার এটার মধ্য দিয়েই অ্যানিমেশনের নানা রূপ নতুনভাবে বিশ্লেষণ সম্ভব। বেশিরভাগ অ্যানিমেশনই তার পুরোটা জুড়ে সময়কে নিয়ে খেলা করে। এক্ষেত্রে সময়ের ধারণা অ্যানিমেশনে এসে কীভাবে বদলায়, তা এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

অ্যানিমেশনের স্পেক্টেটরের ক্ষেত্রে সময়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া মোশন ভূমিকা রাখে ভ্রম হিসেবে। এক্ষেত্রে অ্যানিমেশনকে মোশনের ভ্রম হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। তবে অ্যানিমেশন তো মোশন, অর্থাৎ বিভিন্ন ফ্রেমের সমষ্টি। কিন্তু ফ্রেম তো স্থির। জেনোর প্যারাডক্স অনুযায়ী, মোশন বলতে কিছুই নেই। সবকিছুই স্থির। সময় তৈরি হয় প্রত্যেকের স্বতন্ত্র মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। একেকটা মুহূর্তে সময় বাহ্যিকভাবে অস্তিত্বশীল নয়। এটা স্থির। কিন্তু সবকিছু স্থির হলে মানুষ মোশন কেনো দেখে? জেনোর ভাষায়, সবকিছু একত্রে মোশনের ভ্রমটা তৈরি হয়। অর্থাৎ মানুষের সময়কে দেখার ব্যাপারটা অনেকটাই ত্রুটিপূর্ণ। আর সেই ত্রুটিপূর্ণ জায়গাকে ধরে অ্যানিমেশন কাজ করেছে। কেননা অ্যানিমেশন অনেকটা এই প্যারাডক্সকে ঘিরে আবর্তিত। অ্যানিমেশন কেবল বিভিন্ন মুভমেন্টের ভ্রম মাত্র, যেটা সময়ের পার্থক্য তৈরি করতে সক্ষম। সেই মোশন আবার নানাবিধ পরিবর্তনকে ঘিরে আবর্তিত। হিরাক্লিটাস-এর ফ্লাক্স, যেটা অ্যানিমেশনের সতত পরিবর্তনের ধারণাকে ইঙ্গিত করে। এখানে চরিত্রের আইডেন্টিটি স্থায়ী কিছু নয়, বরং এটা একটা প্রক্রিয়া।

এখানেই প্রশ্নের উদয় হয়, সময় ও মোশনের সংযোগ এখানে কীভাবে কাজ করে? একজন স্পেক্টেটর বাস্তবিক জীবনের বাইরের এই পরিবর্তনকে কীভাবে বুঝতে পারে এবং কীভাবে গ্রহণ করে? লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্রের মতো অ্যানিমেশন রিয়েলটাইম ইমেজ নিয়ে আসে না। বরং অ্যানিমেশনের শুরুটা তৈরি করা স্থির ইমেজ দিয়ে হয়। সেই ইমেজ ড্রয়িং, মডেলিং, কিংবা ডিজিটাল ফ্রেম ইত্যাদি দিয়ে তৈরি। আর সেই ইমেজগুলোতে আপাত কোনো সময়ের ধারণা থাকে না। যতোক্ষণ না পর্যন্ত অ্যানিমেটর সময়কে সেখানে যুক্ত করে, ততোক্ষণ সময়ের অবস্থান শূন্য। অর্থাৎ এখানে সময়ের স্রষ্টা অ্যানিমেটর স্বয়ং। এক্ষেত্রে বলা চলে অ্যানিমেশন সময়কে শুধু ক্যাপচার করে না, বরং এটাকে কনস্ট্রাক্ট করে। অ্যানিমেটরই সেখানে সিদ্ধান্ত নেয়, কতো সময় ধরে কোনো অ্যাকশন চলতে থাকবে; কতো দ্রুত চরিত্রগুলো মুভ করবে; কীভাবে স্পেক্টেটর মোশন অনুভব করবে! এক্ষেত্রে সময়ের ব্যাপারটা স্থির কোনোকিছু থাকে না, সময়কে অ্যানিমেটর একটা আর্টিস্টিক ম্যাটেরিয়াল হিসেবে তৈরি করে। সেখানে যুক্ত হয় রঙ, লাইন, কিংবা নানাবিধ বর্ণনা।

অ্যানিমেশনের সময় যেহেতু রেকর্ড করা হয় না, বরং তৈরি করা হয়, সেজন্য অ্যানিমেশন সময়ের দিক থেকে ফ্লেক্সিবল। এটা চাইলে সময়কে টেনে বড়ো করতে পারে, কিংবা ছোটো করতে পারে; কখনো সময়কে থামিয়ে দিতে পারে, কখনো সময়কে রিভার্সও করতে পারে। অর্থাৎ সময়কে এখানে নানাভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। বহুকালের দুঃখের সময় অ্যানিমেশন কয়েক সেকেন্ডে এমনভাবে দেখানো সক্ষম, আবার কখনো সময়কে ধীর করার মাধ্যমেও দেখানো সম্ভব। এর মধ্য দিয়ে অ্যানিমেশন এক অসম্ভবের জগৎ তৈরি করে। শৈশবে কার্টুন নেটওয়ার্কে দেখা ‘টম অ্যান্ড জেরি’র কথা চিন্তা করা যাক। টম কিংবা জেরি যখন আকাশ থেকে পড়ে, তখন দেখা যায় সময় থেমে গিয়েছে। মাটিতে পড়ামাত্রই আবার স্বাভাবিক সময়ে ফিরে আসা। অর্থাৎ অ্যানিমেশন সময়কে নিয়ন্ত্রণে সক্ষম। কোকো, ইনসাইড আউট, ফ্রোজেন, স্পিরিটেড অ্যাওয়ে ইত্যাদি বিভিন্ন অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে সময় স্মৃতি, মিথ, স্বপ্ন ও নানা অভিজ্ঞতায় বিলীন হয়ে যায়। অ্যানিমেশন এখানে একটা ফর্ম তৈরি করে, যাকে বার্গসন বলেন, ডিউরেশন। এখানে মনস্তাত্ত্বিক ঘড়ি এবং বাস্তবিক ঘড়ি একই তালে চলে না। অ্যানিমেশন মনের ভেতরকার সময়ের ধারণাটুকুও দৃশ্যে তুলে আনে। মানুষের চিরাচরিত সময় এবং স্রোত অ্যানিমেশনের চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করে। অর্থাৎ সময় এখানে স্থির কোনো ধারণা নয়, বরং এটা বদলানো যায়, ক্যারেক্টার অনুযায়ী কনস্ট্রাক্ট করা যায়।

অ্যানিমেশন মেটামরফোসিসের মধ্য দিয়েও সময়কে তুলে আনে। এখানে শরীর নানাভাবে বদলায়, নতুনভাবে তৈরি হয়, ট্রান্সফর্ম করে। এই পরিবর্তনগুলো অনেকটা টেম্পোরালিটিরই নির্দেশক, কেননা এখানে দেখানো হয়, সময় কীভাবে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। এটা সময়ের ব্যাপারে এমন ধারণা দেয়, যেনো সময় নিজেও জীবন্ত কোনো সত্তা। পাশাপাশি অ্যানিমেশন মানুষের সময়ের ঊর্ধ্বের সময়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। অ্যানিমেশন পৌরাণিক, সাইক্লিকাল, কিংবা এলিমেন্টাল সময়ের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম। দ্য লায়ন কিং-এ প্রত্যাবর্তনের সময়, কোকো-তে পূর্বপুরুষদের সময়, মোয়ানা-তে সমুদ্রের সময়, ফ্রোজেন-এ প্রকৃতির সময়, সবগুলোই স্বতন্ত্র সময়ের ধারণা হিসেবে তৈরি হতে থাকে। এগুলো মানুষের বাহ্যিক সময়ের ধারণা থেকে আলাদা। তবুও অ্যানিমেশন এখানে ভিজ্যুয়ালি এবং ইমোশনালি বাস্তব।

ডিজিটাল অ্যানিমেশনের যাত্রায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে টেকনোলজিকাল ও কম্পিউটেশনাল সময়ের ধারণা। সিমুলেশন রেন্ডারিং, মোশন ক্যাপচার এবং ভার্চুয়াল ইঞ্জিন ইত্যাদি মোশনের ধারণা নতুনভাবে তৈরি করতে সক্ষম। এটা মূলত অ্যালগরিদম ও মেশিন প্রসেসে চলে। অ্যানিমেশনের সময় এখানে মানুষের ইমাজিনেশন ও মেশিনের সময়ের ধারণার একটা ফিউশন হিসেবে ধরা দেয়। এটা কোনো বায়োলজিকাল কোনোকিছুর পক্ষে সম্ভব নয়। এটা অ্যানিমেশনের পোস্টহিউম্যান ডাইমেনশনের প্রকাশক, যেখানে সময় আর্টিস্ট, কম্পিউটার, ইমাজিনেশন ও অ্যালগরিদমে মিশে আছে। যাইহোক, সময়ের নিয়ন্ত্রণ অ্যানিমেশনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে প্রযুক্তি। তবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ সবকিছুতে থাকলে সেখানে শিল্প কোথায়?

অ্যানিমেশন, প্রযুক্তি এবং শিল্প

Technology is therefore no mere means. Technology is a way of revealing.

Martin Heidegger

বর্তমান অ্যানিমেশন সৃষ্টিশীল শিল্প নাকি প্রযুক্তি, এটাকে কোন জায়গা থেকে বিবেচনা করা যায়, তা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। এটা কি আদৌ সৃষ্টিশীল কিছু, নাকি শুধুই প্রযুক্তি থেকে প্রাপ্ত পণ্যমাত্র? সৃষ্টিশীল শিল্প কি প্রযুক্তি দিয়ে সম্ভব নয়? প্রযুক্তির ছোঁয়ার কোনোকিছু কি শৈল্পিক হয়ে উঠতে পারে না? শৈল্পিক হলেও সেটাকে কি সৃষ্টিশীল বলা সম্ভব? এক্ষেত্রে একটা মাঝামাঝি অবস্থান থাকাটাও কি অযৌক্তিক? অর্থাৎ অ্যানিমেশন কি দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থান নিতে পারে না?

অ্যানিমেশনকে বর্তমানে টেকনোলজি থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। অ্যানিমেশন ব্যাপারটাই অস্তিত্বশীল কারণ প্রযুক্তির অস্তিত্ব রয়েছে। অন্যান্য আর্ট ফর্ম ধীরে ধীরে টেকনোলজি দিয়ে বিকশিত হলেও অ্যানিমেশন শুরু থেকেই টেকনোলজি দিয়ে প্রভাবিত। থমাট্রপ, জুট্রপ কিংবা প্র্যাক্সিনোস্কোপ থেকে শুরু করে থ্রি ডি মডেল সবখানেই টেকনোলজির প্রভাব রয়েছে। অ্যানিমেশনের সামগ্রিক ব্যাকরণ বলা যায় টেকনোলজির হাতে। বলা চলে, অ্যানিমেশন শৈল্পিক তথা সৃষ্টিশীল ও প্রযুক্তি। সৃষ্টিশীল এজন্য যে, এটা তৈরিতে অ্যানিমেটরকে ছবি আঁকতে হয়, ডিজাইন বুঝতে হয়, গল্প বলা জানতে হয়। তবেই সফলভাবে অ্যানিমেশন তৈরি সম্ভব। তবে সবকিছু পেরিয়ে তা সম্পূর্ণ অ্যানিমেশনে রূপান্তর হয় প্রযুক্তির কারণে। এর মধ্য দিয়েই অ্যানিমেশন নতুনভাবে বাস্তবতা তৈরির প্রক্রিয়া স্থির করে দেয়। তবে অ্যানিমেশন কি মানবসৃষ্ট শিল্প নাকি মেশিনে তৈরি অনেকগুলো ছবির সমষ্টিমাত্র? প্রযুক্তি এখানে শিল্পের মর্যাদা বাড়াচ্ছে নাকি কমাচ্ছে?

ডিজিটাল অ্যানিমেশন যতো এগিয়েছে, টেকনোলজি সেখানে অ্যানিমেশনে কো-ক্রিয়েটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পানি, বাতাস, আগুন, কিংবা আলো সিমুলেট করা হচ্ছে। এমন জটিল কাজগুলো মানুষের হাতের করা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের কাজ কেবল অ্যানিমেটরের একার নয়, এখানে মেশিনও সমানভাবে ভূমিকা রাখছে। মোয়ানা-তে সমুদ্রও একটা চরিত্র, কেননা পানির সিমুলেশন প্রক্রিয়া সমুদ্রকেও একটা সত্তা প্রদান করে। ফ্রোজেন-এ সেটা চলে যায় প্রকৃতির কাছে। এভাবে প্রযুক্তির একটা প্রত্যক্ষ ও পরিবর্তনশীল সংগ্রহশালা তৈরি হচ্ছে, যা বিভিন্ন অ্যানিমেশনের কালেক্টিভ ফর্ম তৈরি করে। যাইহোক, অ্যানিমেশনের মেশিন লজিক, প্রযুক্তিগত সময়, কিংবা অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে অ্যানিমেশনের ক্রিয়েটিভিটিতে।

ট্র্যাডিশনাল হাতে-তৈরি অ্যানিমেটরদের দাবি, প্রযুক্তির ছোঁয়া পেলে অ্যানিমেশন তার প্রাণরস তথা soul হারিয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে সামগ্রিকভাবে সৃষ্টিশীলতা আসলে কী? মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রমে বানানো স্নো হোয়াইট অ্যান্ড সেভেন ডোয়ারভস (১৯৩৭), যেখানে হাজার হাজার ইমেজের ব্যবহার বিদ্যমান? নাকি স্টপ মোশনে নির্মিত দ্য নাইটমেয়ার বিফোর ক্রিসমাস (১৯৯৩), যেটা ফটোগ্রাফি ও হিউম্যান-মেইড ক্র্যাফট দিয়ে নির্মিত এবং যার বার্তা ছিলো টেকনোলজি সহায়ক, পরিপূরক নয়? কিংবা টয় স্টোরি’র (২০০১), যেটা পুরোপুরি সি জি আই ফিচারে নির্মিত, যেটা ডিজিটাল অ্যানিমেশনের নতুন যুগ উন্মোচন করেছিলো এবং এর সঙ্গে প্রশ্নও জাগিয়েছিলো সি জি আই কি মানবসৃষ্ট শিল্পের থেকে কম অথেন্টিক? নাকি শুধুই নতুন একটা আর্ট ফর্ম? স্টুডিও জিলবির স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১) হ্যান্ডড্রয়িং-এর সঙ্গে কিছুটা প্রযুক্তির স্পর্শে নির্মিত। যেটা হ্যান্ডক্র্যাফটের soul-এর ডিফেন্স হিসেবে উল্লেখ্য।

এআই যুগের আলোচনায় আসা যাক এবার। কেননা বর্তমানে এআই দিয়ে অনেক শর্টফিল্ম নির্মাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। প্রশ্ন এখান থেকেও জাগে, এটা কি শিল্প, নাকি কেবল ডেটার বিভিন্ন ফর্মের রি-মিক্সিং। এক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে, এখানে সবকিছু মানুষের কৃতিত্ব নয়। এআই যদি মানুষের দেওয়া প্রম্পটে আর্ট তৈরি করতে সক্ষম হয়, তাহলে আর্টিস্ট আসলে কে? মানুষ নাকি এআই? এক্ষেত্রে মেশিন কি কোনোকিছু ক্রিয়েট করতে সক্ষম, নাকি শুধু এক্সিকিউশনে সীমাবদ্ধ? পাশাপাশি অরিজিনালিটির সংরক্ষণে প্রযুক্তিগত শিল্পের নৈতিক দায়িত্বই বা কতোখানি? অরিজিনালিটি প্রসঙ্গে বেঞ্জামিন নিয়ে আসেন aura-এর ধারণা, যা পুনরুৎপাদনের ফলে হারিয়ে যেতে পারে। অ্যানিমেশনও এদিক থেকে পুনরুৎপাদনক্ষম, যেটা বার্তা দেয় অ্যানিমেশনের aura আদৌ থাকবে কিনা।


তবে aura প্রসঙ্গটা তখনই প্রাসঙ্গিক, যখন সৃষ্টিশীলতার সীমাবদ্ধতা ধরা যাবে। সৃষ্টিশীলতা আসলে কোথায় সীমাবদ্ধ? হাইডেগারের ভাষ্যে, প্রযুক্তি মানুষের বাস্তবতাকে নতুন করে তৈরি করে দেয় এবং সেটাই মানুষের কাছে তার নিজ জগৎ হয়ে ধরা দেয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি অ্যানিমেশনে মানুষের সৃষ্টিশীলতার ঊর্ধ্বে গিয়ে ইফেক্টিভিটির দিকে খেয়াল রাখে। প্রযুক্তির সংযোগ এখানে আর্টের পোস্টহিউম্যান দুনিয়ার কথা বলে। কেননা এআই জেনারেটেড অ্যানিমেশন প্রশ্ন করে হিউম্যান ও মেশিনের বাউন্ডারি নিয়ে। অর্থাৎ শিল্প সেখানে পুরোপুরি হিউম্যান নয়। এক্ষেত্রে পোস্টহিউম্যানিজমের জায়গা থেকে এটা প্রতীয়মান, শিল্প কেবল মানুষের একচ্ছত্র ব্যাপার নয়, শিল্প সার্বজনীন। এখন তা মানুষ নির্মাণ করুক, কিংবা মানুষহীন কোনোকিছু। এক্ষেত্রে শিল্প তার স্পিরিট হারাচ্ছেএমন ধোঁয়াশা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। রেনেসাঁর মানবকেন্দ্রীকতা যে সবকিছুকে এড়িয়ে কেবল মানুষকে শিল্পসক্ষম করে তুলেছে, সেই ব্যাপারের সীমাবদ্ধতা এখানে দৃশ্যমান হচ্ছে। পোস্টহিউম্যানে এসে আর তা মানুষে সীমাবদ্ধ রইলো না।

অ্যানিমেশন, নির্মাতা ও তার নৈতিকতা

এখন আসা যাক অ্যানিমেশনে রিপ্রেজেন্টেশনের আলোচনায়। পপুলার কালচারে কোনোকিছু কীভাবে দেখানো হচ্ছে, সেই রিপ্রেজেন্টেশন নানা আঙ্গিকে মানুষের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেক্ষেত্রে চিন্তার স্বাধীনতা রিপ্রেজেন্টর তথা অ্যানিমেটরের অবশ্যই থাকে। অ্যানিমেটর এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকে না। কেননা রিপ্রেজেন্টেশনের স্বাধীনতা অনেকটা নির্মাতার বেছে নেওয়ার ওপর নির্ভরশীল। অ্যানিমেটর কী দেখাবে, কী বাদ দেবে, কীভাবে দর্শক দেখবে, সেটারই সমন্বিত রূপ রিপ্রেজেন্টেশন। এক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে, এখানে নৈতিকতা, রাজনীতি, সামাজিক নানা অনুষঙ্গ থাকবে। কেননা অ্যানিমেশনের চিত্রগুলো নির্ধারণ করে দেয়, দর্শক তার বাস্তবতার দর্শনকে কীভাবে সাজাবে; কীভাবে দর্শক অ্যানিমেশনের মাধ্যমে জেন্ডার, ধর্ম-বর্ণকে বুঝবে; নারী চরিত্রগুলোকে কোন দৃষ্টিতে দেখবে, ড্যামসেল ইন ডিস্ট্রেস-এর নিরিখে দেখবে নাকি হাইপার-সেক্সুয়ালাইজড চরিত্র হিসেবে দেখবে? কৃষ্ণাঙ্গদেরই বা কোন বিউটি স্ট্যান্ডার্ডে বিবেচনা করবে? এছাড়া নানা স্টেরিওটাইপড এথনিসিটিকে কীভাবে দর্শক দেখবে, তার প্রাথমিক দৃষ্টিকোণ শুরুতেই নির্ধারণ হয়ে থাকে। হতে পারে সেটা অ্যাক্সেন্ট, ফিচার, তাদের ভূমিকার মধ্য দিয়ে অ্যানিমেশনে প্রদর্শিত হবে, যার প্রতিফলনই দেখা যায় সম্পূর্ণ অ্যানিমেশনের রেপ্রিজেন্টেশনের কাঠামোয় এসে। অ্যানিমেটর সেই সবকিছুই তৈরি করে শূন্য থেকে। এই টোটাল ক্রিয়েটিভ পাওয়ার অ্যানিমেটরকে নৈতিক দায়িত্ব অর্পণ করে। প্রত্যেকটা লাইন, মুভমেন্ট থেকে দর্শকের কাছে বিভিন্ন ব্যাপারে বার্তা প্রেরণ হয়। সেই ম্যানুফ্যাকচারড বাস্তবতা কতোখানি প্রভাব ফেলে, তা প্রাসঙ্গিকভাবেই অ্যানিমেটরের নৈতিকতা প্রশ্নে গুরুত্ব পায়।

যেমন, ডাম্বো (১৯৪১) তে কাকদের যে ভূমিকায় দেখানো হয়, সেটা আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্য বর্ণবাদী হিসেবে বিবেচিত। জাজ মিউজিকের১০ আদলে কাকদের মুখ থেকে গান যা মূলত তখনকার আফ্রো-আমেরিকান কমিউনিটির প্রতি স্টেরিওটিপিকাল ধারণারই একটা নিদর্শন। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের প্রচলিত স্টেরিওটাইপগুলোকে ম্যানিপুলেটের সক্ষমতা রয়েছে। ডাম্বোতে সেই স্টেরিওটাইপ ব্যবহারের চেষ্টা বিদ্যমান। কমেডির মধ্যে স্টেরিওটাইপকে ব্যবহার করে কীভাবে নতুন ধারণা তৈরি সম্ভব, সেই চিত্র এখানে প্রতীয়মান।

সচেতন দর্শকমাত্রই খেয়াল করবে গরীব ও ভিলেন চরিত্রগুলোকে কীভাবে দেখানো হচ্ছে। তারা কি সবসময় কালো ও বীভৎস দেখতে? লুনি টিউনস (১৯৪০-৫০ এর দশকে নির্মিত) এ জাপানিজ মানুষদের বিদঘুটে-অদ্ভুতুড়ে হিসেবে দেখানো হয়। প্রশ্ন আসে, অ্যানিমেশন কতোটুকু দায়িত্ব নিতে পারে ঘৃণা ছড়াতে? বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট (১৯৯১) এ বেল খুবই বুদ্ধিমতি ও সচেতন হওয়া সত্ত্বেও সৌন্দর্যের মানদণ্ডগুলোকে তিনি সমীহ করেন। অর্থাৎ তার বিপ্লব সৌন্দর্যকে চ্যালেঞ্জ করলেও এটা সামাজিক মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না। বরং প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ধারণা ধ্রুব ধরে নিয়েই এগিয়েছে।

অন্যদিকে স্নো হোয়াইট (২০২৫) এ প্রকৃতি-মানুষের মেলবন্ধন ঘটে। তবে সেখানে কোন ধরনের সৌন্দর্যকে আদর্শ হিসেবে ধরা হয়? সেই সৌন্দর্যের মানদণ্ড কেনো শুভ্র? পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যরা এশীয়, কৃষ্ণাঙ্গসহ অন্যান্য জাতির, কিন্তু তাদের কমান্ডার হোয়াইট। এক্ষেত্রে এটা প্রতীয়মান শ্বেতাঙ্গ ছাড়া সবাই অধীন। এক্ষেত্রে রিপ্রেজেন্টেশনের মারপ্যাঁচ এই সৌন্দর্যের ধারণা তৈরিতে ও বর্ণবাদ প্রতিষ্ঠায় বিদ্যমান। তবে এই জট খোলার কাজ সফলভাবে করেছে জুটুপিয়া (২০১৬)। বর্ণবাদী স্টেরিওটাইপ দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ করে নানা এথনিক বৈচিত্র্যের পক্ষে তার যুক্তি হাজির করে। স্টুডিও জিলবির প্রিন্সেস মনোনকেনসিকক্কা-য় প্রকৃতিকে একটা এজেন্সি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং যার মধ্য দিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সপ্লোয়টেশন-এর। এই ইকো-এথিকাল দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা মানবকেন্দ্রিক দুনিয়ার একটা সমালোচনাও বলা চলে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, অ্যানিমেশনে দেখানোর দৃষ্টিকোণ থেকে দর্শককে অনেকভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব। সেটা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক দুই-ই হতে পারে।

এখন অ্যানিমেটরের ভূমিকার কথায় আসা যাক। রিপ্রেজেন্টশনে অ্যানিমেটরের নৈতিক ভূমিকা কী হতে পারে? অ্যানিমেশনকে যদি চিত্রের মাধ্যমে যেমন ইচ্ছে ম্যানিপুলেট করা যায়, তবে সৃষ্টিশীল ও প্রোপাগান্ডা ক্যারিকেচারের মধ্যে তফাত কী? প্লেটো ইমিটেশনের এথিকস নিয়ে বলতে গিয়ে এই প্রসঙ্গে বলেন, যেকোনো ইমিটেশন মানুষকে বিপথে চালিত করতে পারে। মানুষ ইমিটেশন দিয়ে প্রভাবিত হয় এবং কলুষিত হয় সেগুলো বার বার দেখার মধ্য দিয়ে। তবে অ্যারিস্টটলের ভাষ্য প্লেটোর বিপরীত। অ্যারিস্টটলের মতে, ইমিটেশন১১ ক্যাথারসিস-এর উদ্রেক ঘটাতে পারে, যেটা সহানুভূতি ও সহনশীলতার শিক্ষা দিতে সক্ষম। অর্থাৎ এক্ষেত্রে বোঝা যাচ্ছে, ভালো-খারাপের বিপরীত অবস্থান এখানে নেই। অর্থাৎ ভালো-খারাপের সহবস্থান দৃশ্যমান। অ্যানিমেশনের উদাহরণ হিসেবে এক্ষেত্রে সামনে আসবে জুটিপিয়ার কথা, যেটা বৈচিত্র্যময় দুনিয়ার গুণগান গায়। একইসঙ্গে লুনি টিউনস, যা প্রোপাগান্ডা ছড়ায়।

এক্ষেত্রে অ্যানিমেটরের দায়িত্ব কী? তার তৈরি অ্যানিমেশন কি মানুষকে স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখাবে নাকি শুধু মানুষের মন ও মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হবে? এটা কি মানুষকে ম্যানিপুলেট করবে, নাকি দ্বান্দ্বিক জটিল ভাবনাগুলোর সঙ্গে পরিচয় করাবে? বিশ্বযুদ্ধে ডিজনি ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু ডিজনি শর্টসের মধ্য দিয়ে প্রোপাগান্ডা অ্যানিমেশন তৈরি করেছে। আবার ক্রিটিকাল কমেন্টারি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে এমন অ্যানিমেশনও বিদ্যমান। যেমন, সাউথ পার্ক। এডর্নো ও হর্কহেইমার কালচার ইন্ডাস্ট্রির কথা বলে, যেখানে স্ট্যান্ডার্ড করে দেখানো গল্পগুলো কনজিউমারিজম ও সোশাল কনফোর্মিটিকে নির্দেশ করে। অর্থাৎ মানুষ দেখার মধ্য দিয়ে নিজেদের দর্শন ঠিক করে। লুই আলথুসার যাকে বলেন, ইডিওলজিক্যাল স্টেট অ্যাপারেটাস।১২ অর্থাৎ কার্টুন ইডিওলজিকাল টুল হতে পারে, যেটা একজন শিশুকে অথরিটি, নর্মস মানতে শেখায়। অ্যানথ্রোমর্ফিজম দেখানোর মধ্য দিয়ে রিয়ালিটিকে বিকৃত করা সম্ভব, আবার প্রকৃতির পক্ষ নিয়ে কথা বলাও সম্ভব। তবে তা কি শুধু প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধন দেখানোর জন্য? অর্থাৎ এক্ষেত্রে রিয়ালিটি ভূমিকা রাখে। অ্যানিমেশন অনেকসময় প্রাণী ও প্রকৃতিকে মানুষের উন্নতির সহায়ক বলে মনে করে। যেমন লায়ন কিংবাম্বি। নীতিগত প্রশ্নে ঠিক-বেঠিকের ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগোয়। কখনো কখনো প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বদলায়।

অ্যানিমেশনের অধিবিদ্যা

মেটাফিজিক্স দর্শনের এমন এক শাখা যেখানে অস্তিত্ব, বিইং ও বাস্তবতার মৌলিক প্রশ্নগুলো তৈরি হয়; যেটা এম্পিরিকাল তথা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ঊর্ধ্বে। যেমন, বেঁচে থাকার মানে কী? জীবনহীনতা থেকে জীবন কীভাবে আলাদা? কিংবা চেতনা বা আত্মার এসেন্স কী? মেশিন কিংবা স্পিরিট, কেউ কি জীবন্ত হতে পারে? অ্যানিমেশন শিল্পের একটা পার্ট হিসেবে জীবনহীনতায় জীবন দান করে, যেটা মেটাফিজিকাল ব্যাপারকে নির্দেশ করে। অ্যানিমেশন মূলত জীবন তৈরি করারই একটা শিল্প। অ্যানিমেশন শব্দটিও এসেছে ল্যাটিন শব্দ অ্যানিমা থেকে, যার অর্থ soul কিংবা জীবনীশক্তি। অ্যানিমেটর যাদের আক্ষরিকভাবেই জীবন আছে, তারা জীবনহীন চিত্র, পাপেট, পিক্সেল দিয়ে জীবনহীন কিছু একটাকে জীবন্ত করে তোলে। এজন্যই সবগুলো অ্যানিমেশনই দুইটা মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে হাজির হয়জীবনের মানে কী? ঠিক কীসের কারণে মানুষ কোনোকিছুকে জীবন্ত মনে করে? এই প্রসঙ্গে অ্যারিস্টটল soulব্যাপারটাকে একটা জীবন্ত শরীর হিসেবে চিন্তা করতেন। তিনি বলেন, The soul is the cause or source of the living body.১৩

ট্র্যাডিশনাল দর্শন অনুযায়ী জীবন মূলত দুইটা ব্যাপারের সমন্বয়মুভমেন্ট ও চেতনা। অ্যানিমেশন এখানেই বিতর্কের জন্ম দেয়। কেননা মোশন চেতনের ভ্রম তৈরি করতে সক্ষম। এই ভ্রম মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায়, অ্যানিমেশনের ঠিক কোন দিক দিয়ে জীবন্ত? আর জীবন বলতে শুধুই কি জীববিদ্যা ও অনুভূতির সঙ্গে সংযুক্ত? পিনোক্কিও-তে (১৯৪০) দেখা যায়, একটা কাঠের পুতুল জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং মানুষের মতো করেই তার চরিত্রের ভূমিকা পালন করে। টয় স্টোরি-তেও দেখা যায়, খেলনাগুলো জেগে ওঠে এবং মানুষের মতো বিচিত্র ইমোশনের অংশীদার হতে শুরু করে।

ওদিকে বর্তমান অ্যানিমেশন আর্টিফিশিয়াল লাইফের সঙ্গে যুক্ত। যেমন, রোবট, এআই এবং অন্যান্য ডিজিটাল বিষয়াদি। ওয়াল-ই, বে-ম্যাক্স, দ্য আয়রন জায়ান্ট ইত্যাদি চলচ্চিত্রে মেশিনগুলো মানুষের মতো করেই ভূমিকা পালন করে। এতে একটা ব্যাপার পরিষ্কার যে, অ্যানিমেশনে জীবন কেবল জৈবিক ব্যাপারে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটা প্রযুক্তি থেকে আগত হয়ে চেতনা পর্যন্ত বিস্তৃত। অর্থাৎ অ্যানিমেশনের জীবন মানুষ অবধি নয়, যেটা পোস্টহিউম্যানিজমের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। জীবন এখানে কেবল জৈবিকতার অন্তরালে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের চোখে যা আর্টিফিশিয়াল, সেগুলোর মধ্যেও জীবনের নানা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল লাইফ অ্যানিমেশনের অনেকটা প্রাণস্বরূপ।

স্পিরিটেড অ্যাওয়েতে স্পিরিচুয়াল দুনিয়াকে দেখানো হয়, যেখানে বিইংস তাদের নৈতিকতা ও আবেগকে সমন্বয় করে তার ভাইটালিটি পায় এবং হারায়। লায়ন কিং-এও কসমিক সাইকেল অব লাইফকে দেখা যায়। যেটাকে একটা মেটাফিজিকাল অর্ডার হিসেবে চিত্রিত করা হয়। কোকো (২০১৭) মৃত্যুর ঊর্ধ্বে জীবনের চলমানতাকে নির্দেশ করে। সেখানে মানুষের স্মৃতি টিকিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে ভালোবাসা জীবন্ত রাখার ব্যাপারটা প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ মানুষের টিকে থাকার নিমিত্তে প্রয়োজন কেবল ভালোবাসা ও স্মৃতির এক মেলবন্ধন, যেটা মানুষের অস্তিত্বের একটা মেটাফিজিকাল ফোর্স মাত্র। এই কাজগুলোতে জীবন কেবল একটা জৈবিক ব্যাপার নয়, এটা এথিকাল, ইমোশনাল ও রিলেশনাল। এটা ভাইটালিটির এমন একটা নেটওয়ার্ক যেখানে মানুষ, প্রকৃতি ও আত্মাকে যুক্ত করে।

মেটাফিজিকাল টার্মে অ্যানিমেটর ঈশ্বরতুল্য মানে সৃষ্টিকর্তাস্বরূপ, যিনি শূন্য থেকে তার জগত তৈরি করে, মোরাল অর্ডার তৈরি করে। এটা ক্রিয়েশন মিথকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ ক্যায়স বা শূন্যতা থেকে কোনোকিছুর উপস্থিতি; মাটি থেকে আদমের তৈরি। এগুলো বর্তমান ক্রিয়েটিভ ফিলোসোফির ইঙ্গিত বহন করে। মিয়াজাকি'স ওয়ার্ল্ড-এর হাউলস মুভিং ক্যাসল দেখায়, ইমাজিনেশন কীভাবে লাইফ জেনারেট করতে পারে। ডিজনির ফ্যান্টাসিয়াও মিউজিক ও মোশন থেকে কীভাবে প্রাণের সৃষ্টির ধারণা পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারে, সেই মেটাফিজিকাল দুনিয়ার দৃশ্যই প্রতীয়মান।

সোজা কথায়, বিইং ও সিমুলেশন, বডি ও স্পিরিট, ক্রিয়েশন ও অটোনমি, জীবন ও মৃত্যু এই বৈপরীত্যগুলোর দৃষ্টিকোণ অনেকটাই ব্লার করেছে অ্যানিমেশন। অ্যানিমেশনে চিত্রিত জীবন আসলেই জীবন, নাকি কেবলই রিপ্রেজেন্টেশন? জীবনের কি আদৌ দৃশ্যমান শরীর প্রয়োজন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা কঠিন! তবে যেকোনো বিষয়কে অ্যানিমেশন যেভাবে দেখায়, সেখানে এই বৈপরীত্যগুলো আর বিপরীত থাকে না।

মনের গহীনে অ্যানিমেশনের খোঁজে

বেশিরভাগ অ্যানিমেশনের নির্মাণধারা স্বপ্ন ও ফ্যান্টাসির আদলে হয়ে থাকে। সুররিয়েল ন্যারেটিভ, সময়, স্থান ও আইডেন্টিটিকে নিয়ে নানা আঙ্গিকে কাঁটাছেড়া তারই ইঙ্গিত। চরিত্রগুলোর ভূমিকাও এখানে বেশ প্রাসঙ্গিক। চরিত্রগুলো তার আকার নিজ আঙ্গিকে বদলায়, বস্তুও সেখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিষয়গুলো প্রাসঙ্গিকভাবেই আনকনসাসের বৈশিষ্ট্যকে টেনে আনে। অর্থাৎ অ্যানিমেশন কখনো কখনো নির্মাতার আনকনশাসের প্রতিফলন, আবার কখনো দর্শকের আসকনশাসের গভীরতার স্তরকে নির্দেশ করে। ঠিক এই কারণেই দর্শকের অংশগ্রহণ নির্মাতার নির্মাণে ভূমিকা রাখে। অ্যানিমেশনকে এজন্য অনেক সময় ড্রিম ওয়ার্ল্ডের দৃশ্যায়ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেইপশিফ্টিং, অবাস্তব মোশন, ও মেটামরফোসিস এটাকেই সায় দেয়। অর্থাৎ ড্রিমলাইক বৈশিষ্ট্য যেনো এখানে অন্যতম মৌলিক বিষয় হয়ে যায়। এই আলোচনার প্রাসঙ্গিকতায় প্রশ্ন জাগে, মানুষের মনের গহীনে থাকা লুকায়িত মানুষটাই অ্যানিমেশন হয়ে চিত্রিত হয়েছে কিনা।

অন্যদিকে ফ্যান্টাসির কথায় আসা যাক। ফ্যান্টাসি কি শুধু বাস্তবতা থেকে পালানো? না, বরং এটা মানুষের আকাঙ্ক্ষা, এনজাইটি ও রিপ্রেসড চিন্তার প্রতিফলনও। অ্যানিমেশন কি সেটারই প্রতিফলন, যেটা বাস্তব জীবনে পাই না? সেটা কি সত্য হয়ে কনসাসনেসের প্রযুক্তিগত ফর্ম অ্যানিমেশনে চলে আসে? আর যা আসে সেটাও কি সত্য? আবারও ডিজনির ফ্যান্টাসিয়ার (১৯৪০) কথা ধরা যাক। এটা পুরোপুরি ড্রিম-লজিকে নির্মিত নন-লিনিয়ার একটা স্টোরি। এটার রিদম, ইমেজ ও ডিজায়ারকে আনকনশাসের একাংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। লুনি টিউনস চরিত্রগুলো (বাগস বানি, ডাফি ডাক) তো রিয়ালিটির কোনো ধার ধারে না। এখানে চরিত্র পরিবর্তন হয়, শরীর এক্সপ্লোড করে, রিফর্ম করে। এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড (১৯৫১) তো পুরোপুরিই ড্রিম ন্যারেটিভ। স্থিরতা দেয় না, এমন পরিচয়ের দার্শনিক ভিত্তিকে নিয়েই এই চলচ্চিত্র।

ফ্রয়েড যেমন স্বপ্নকে উইশ ফুলফিলমেন্টের অংশ হিসেবে দেখেন, একইসঙ্গে এটা লুকায়িত তথা রিপ্রেশনের ধারণাকেও সামনে আনে। ফ্রয়েড বলেন, The dream is the disguised fulfilment of a repressed wish.১৪ ফ্রয়েডের ভাষ্যে, স্বপ্ন নানা সিম্বলের মধ্য দিয়ে আনকনসাসকে আড়াল করে রাখে। অ্যানিমেশন এটা দেখায় আইডিয়াকে ইমেজে স্থানান্তর করার মধ্য দিয়ে। ইউং-এর কালেক্টিভ আনকনশাসের দর্শন অনুযায়ী অ্যানিমেশন বিভিন্ন কালেক্টিভ আনকনশাসের আর্কেটাইপগুলোর প্রতিফলন। যেমন, হিরোর চরিত্র, ট্রিকস্টার কিংবা শ্যাডো ফিগারের চরিত্র ইত্যাদি। পাশাপাশি মিথ যেগুলো ডিজনি কিংবা জিলবিতে বলা হয়েছে, সেগুলো কালেক্টিভ আনকনশাস হিসেবে বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, সৌল-এর কথা বলা যেতে পারে, যেখানে মৃত্যুর পরের সময়ে আর্কেটাইপগুলো কীভাবে নিহিত থাকে সেটার দৃশ্য দেখানো হয়। পাশাপাশি স্পিরিটেড অ্যাওয়ে (২০০১) অনেকটা সেটারই প্রতিফলন। এখানে মানুষ এমন একটা দুনিয়ায় পৌঁছে, যেখানে বিভিন্ন চরিত্রের সমন্বয়ে দুনিয়া বিদ্যমান। এটা ফ্রয়েডের উইশ ফুলফিলমেন্টের সঙ্গে ইউং-এর আর্কেটাইপের মিশ্রণ ঘটেছে।

যাইহোক, এখন আসা যাক কার্টুনের কথায়, শিশুমনে যেটা ফ্যান্টাসির উদ্রেক ঘটায়। একজন শিশু কেনো অ্যানথ্রোমরফিক দুনিয়ার সঙ্গে বেশি সংযোগ স্থাপন করতে পারে? ম্যাজিকাল দুনিয়ার আকর্ষণ কেনো শিশুমনে সবচেয়ে বেশি? লাঁকার দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে অ্যানিমেটেড এই ইমেজকে মিরর স্টেজ হিসেবে ভাবা যায়। একজন শিশু সেগুলো তার নিজেরই আদর্শ বিক্ষিপ্ত চরিত্র হিসেবে কল্পনা করে। কার্টুন এদিক থেকে বিক্ষিপ্ত চিত্র দেখতে সাহায্য করে, যারা ঠিক এগুলোই দেখতে চায়। তবে কার্টুন কি মাঝে মাঝে সুন্দর দৃশ্যে বিক্ষিপ্ত বীভৎস বাস্তবতাকে তুলে আনে? যেমন মৃত্যু, নৃশংসতা, ট্রমা? বোজ্যাক হর্সম্যান (২০১৪-২০২০) এ সুররিয়েল স্বপ্নের সঙ্গে কমেডি মিশিয়ে ডিপ্রেশন, ট্রমার সিম্বলিক ইমেজ তুলে আনা হয়। আর অ্যাডাল্টরা কেনো সুররিয়ালিস্ট ও ডার্ক অ্যানিমেশন উপভোগ করে? সুররিয়াল এই ধাঁধায় আন্দ্রে ব্রেটন বলেন, যুক্তি তখন মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, যার জন্য স্বপ্ন ও অচেতন মনের অংশগুলো মানুষ এড়িয়ে চলে। তিনি বলেন,

Under the pretense of civilization and progress, we have managed to banish from the mind everything that may rightly or wrongly be termed superstition, or fancy; forbidden is any kind of search for truth which is not in conformance with accepted practices. It was, apparently, by pure chance that a part of our mental world which we pretended not to be concerned with any longer—and, in my opinion by far the most important part—has been brought back to light.১৫

তবে সুররিয়েল আর্টই পারে আনকনশাসে থাকা মানুষের কল্পনার জগতের সত্যকে সামনে আনতে। অর্থাৎ অ্যানিমেশনকে এখানে অনেকটা ইমাজিনেশনের পুনর্জন্ম হিসেবে ধরা যায়। যদিও এটা আর্লি আঁভগার্দ অ্যানিমেশনের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে প্রযোজ্য। যাইহোক, জুলিয়া ক্রিস্টেভার অ্যাবজেকশন অনুযায়ী, যেটা রিপ্রেসড ও ডিস্টার্বিং তা কখনো কখনো অ্যাট্রাক্ট করে অথবা দর্শকের মধ্যে ঘৃণার উদ্রেকও ঘটায়। অর্থাৎ অ্যানিমেশন যেনো পুরোটাই মনোজগতের নানা আকাঙ্খার খেলা, যেখানে উঠে আসে মানুষের মনোজগতের নানা দিক।

দেখা-অদেখার কথকতা

এবার আসা যাক অ্যানিমেশনে মানুষের ব্যক্তিগত ভূমিকার ব্যাপারে। অ্যানিমেশন মানুষ কীভাবে দেখে? অর্থাৎ দর্শক হিসেবে মানুষের ভূমিকা কী? মানুষ ও মানুষহীনতাকে অ্যানিমেশনে কীভাবে দেখানো হয় এবং মানুষের গ্রহণ প্রক্রিয়া কেমন, সেটা রিপ্রেজেন্টেশনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে দেখানো হয়, মানুষের অনুভূতি থেকে শুরু করে দেখার দর্শন সবটাই কীভাবে অ্যানিমেশনে প্রদত্ত ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। তবে এই আলোচনায় দেখার সেই দর্শনের ন্যারেটিভের বাইরে দর্শকের ব্যক্তিগত ভূমিকা প্রাধান্য পাবে। কেননা মানুষের দর্শন অনুভূতি সবসময় প্যাসিভ নয়। মানুষ প্রত্যক্ষভাবে অ্যানিমেশনের ভেতরকার দর্শন গ্রহণ করতে সক্ষম এবং দর্শক হিসেবে মানুষ তার ব্যক্তিগত বাস্তবতাও তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে চলচ্চিত্র দর্শনের স্পেক্টেটরশিপ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দেখার এমন এক প্রক্রিয়াকে স্পেক্টেটরশিপ বোঝায়, যেখানে দর্শক চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে জড়ায়, উপলব্ধি করে এবং ইমোশনালি রেসপন্স করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় দর্শকের সাবজেক্টিভিটি, যা দর্শকের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও আবেগের প্রতিফলন।

ভিভিয়ান সবচ্যাক-এর ভাষ্যে, কেউ যখন চলচ্চিত্র দেখে, তখন তার কার্যক্রম কেবল ভিজ্যুয়ালে আটকে থাকে না, বরং মানুষ তখন শারীরিকভাবেও সেখানে মনোনিবেশ করে। চলচ্চিত্র যতো এগোতে থাকে, দর্শক ততো চলচ্চিত্রের অনুভূতিতে তাড়িত হয়। চলচ্চিত্রের টেনশন দর্শকের মনস্তত্ত্ব পর্যন্ত পৌঁছায়।১৬ এক্ষেত্রে এই ব্যাপারের প্রাসঙ্গিকতা অ্যানিমেশনের গল্পগুলোতেও সমানভাবে প্রযোজ্য। সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করলে এটা বোঝা যায়, অ্যানিমেশন শুধু গল্প বলে না, বরং দর্শকের মননকেও গড়ে দেয়; একইসঙ্গে দর্শক নিজেও সেখানে অংশ নেয়। এক্ষেত্রে অ্যানিমেশন শুধু জীবনকে দেখায় না, বরং দেখা ও ব্যক্তিগত অনুভূতির মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করে।

লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্রের মতো অ্যানিমেশন বাস্তব ফটোগ্রাফির ওপর নির্ভর করে না। বরং অ্যানিমেশন তার নিজ দুনিয়া নিজেই তৈরি করে। সেক্ষেত্রে একজন স্পেক্টেটরকেও নিজেকে সক্রিয়ভাবে তৈরি করে নিতে হয় সেই দুনিয়ার জন্য। সেখানে স্পেক্টেটরের ভূমিকা অনন্য। স্পেক্টেটর জানে, অ্যানিমেশনে সে যা দেখছে তা বাস্তব নয়। তবুও সে এমনভাবে যুক্ত থাকে যেনো এটা খুবই বাস্তব। এই প্যারাডক্সটাই মূলত অনুভূতি ও চিন্তার মধ্যকার পার্থক্যের দিকে নির্দেশ করে।

ফেনোমেনোলজির আলোচনায় জ্য পল সার্ত্রে যেমন বলেন, চেতনা মানুষ তার ইচ্ছাতেই তৈরি করে। এক্ষেত্রে মানুষও সেই জগতকে সক্রিয়ভাবে উপলব্ধি করার মধ্য দিয়ে তৈরি করে থাকে। অ্যানিমেশনে স্পেক্টেটরের অন্যতম ভূমিকা হলো তার ডুয়াল কনসাসনেস তৈরি করা। স্পেক্টেটর জানে, এটা শুধুই ইমেজ এবং মানুষ এটা তৈরি করেছে। তবুও সে ফিলোসফিকালি অংশ নিচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা যায় অ্যানিমেশন দেখা মানে দর্শক একইসঙ্গে তার চিন্তা, সহানুভূতি ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি পূর্ণাঙ্গ মনোনিবেশ করে। এটা মেটাফিজিক্সের illusion and experience-এর সীমাকে মুছে দেয়। ইনসাইড আউট-এ দর্শক বিমূর্ত অনুভূতির চরিত্রগুলোকে এমনভাবে অনুভব করে যেনো সেই চরিত্রগুলো বাস্তব। সৌল-এ দেখা যায়, মানুষ নয় এমন চরিত্রগুলো এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং দর্শকও সেই ইমোশনের সঙ্গে মানসিকভাবে জুড়ে যাচ্ছে।

এখন আসা যাক সাবজেক্টিভিটির কথায়। অ্যানিমেশন অনেক সময় মন, স্বপ্ন, ও আবেগকে দৃশ্যে রূপান্তর করে, একটা সাবজেক্টিভ ইমেজ দেয়। অর্থাৎ দর্শক এখানে কেবল দেখছে না, বরং তিনি তার চেতনা দিয়ে উপলব্ধি করে। প্যাপরিকা (২০১৬) চলচ্চিত্রে স্বপ্ন ও বাস্তবতা একসঙ্গে মিশে যায়। পাশাপাশি দর্শকের কাছে প্রশ্ন রাখে এবং ভাবতে বাধ্য করায় কোনটা ভেতরের এবং কোনটা বাইরের। এলিস ইন দ্য ওয়ান্ডারল্যান্ড-এ দেখা দর্শক প্রধান চরিত্র ক্যারোলিনের নিজের ভয় ও ফ্যান্টাসির অনুভূতি তার নিজ দৃশ্যমান জগতের আদলে তৈরি করে নেয়। এক্ষেত্রে বলা যায়, অ্যানিমেশন শুধু দৃশ্য দেখায়ই না, বরং এখানে স্পেক্টেটরের ভেতরকার জীবন ভাবনার প্রতিফলনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেননা প্রত্যেকবার অ্যানিমেশনে যা দর্শক দেখে, সেগুলো তার নিজের ব্যক্তিত্বকে নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে গঠন করে। ফরাসি দার্শনিক মরিস মার্লো-পন্টি লিখেন, The body is our general medium for having a world.১৭ অর্থাৎ মানুষ তার ব্যক্তি শরীর দিয়েই সবকিছু দেখে, বোঝে। শরীর মন থেকে আলাদা কিছু নয়। মানুষ কেবল চিন্তা করে না, শরীরের অনুভূতিও এখানে মুখ্য হয়ে ওঠে। অর্থাৎ চলচ্চিত্রে পার্সেপশন তৈরিতে মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে। অর্থাৎ অ্যানিমেশনে যা মানুষ দেখে তা ব্যক্তিগত পার্সেপশনেই তৈরি। উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, শিশুদের মনস্তত্ত্ব গঠনের ক্ষেত্রকে। শিশুদেরকে অ্যানিমেশন নৈতিক ও আবেগীয় সাবজেক্টিভিটি গড়ে দেয়। ভালো-মন্দ, বন্ধুত্ব-শত্রুতা ইত্যাদির মধ্যকার পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেখানে। অন্যদিকে অ্যাডাল্ট অ্যানিমেশন আইডেন্টিটি, মোরালিটি ও কনশাসনেসকে প্রশ্ন করে। স্পেক্টেটর অনেক সময় ননহিউম্যান চরিত্রকেও সহানুভূতি দিয়ে দেখতে সক্ষম। অর্থাৎ স্পেক্টেটরশিপের বিস্তৃতি পোস্টহিউম্যান ধাঁচেও প্রতীয়মান। অর্থাৎ বোঝা যাচ্ছে, স্পেক্টেটর এখানে প্যাসিভ না। বরং তারা অ্যানিমেশন দেখার মাধ্যমে অ্যানিমেশনে প্রদর্শিত গল্পে তাদের অবস্থান ও আইডেন্টিটি নির্মাণ করে।

অ্যানিমেশন অন্যদিকে টেম্পোরাল সাবজেক্টিভিটিও নির্মাণ করতে পারে। অর্থাৎ স্পেক্টেটরের কাছে অ্যানিমেশনে দেখানো সময়টুকুই বাস্তব। অ্যানিমেশন সময়ের অনুভূতিও বদলে দেয়। স্লো-মোশন, রিপিটিশন, মেটামরফোসিস সবই স্পেক্টেটরের কাছে বাস্তব হয়ে ওঠে। অর্থাৎ স্পেক্টেটরের নির্মাণে গড়ে উঠছে সাবজেক্টিভ কাঠামো। ইওর নেইম (২০১৬) সময় ও স্মৃতি নিয়ে নির্মিত, যেটায় সময়ের আপাত পার্থক্য দৃশ্যমান হয় না। কোকো ভালোবাসা ও স্মৃতির মাধ্যমে ব্যক্তির অনুভূতির সেন্স তৈরি করতে সক্ষম হয়, যেটা সময়কে অতিক্রম করে।

ফেমিনিস্ট থিউরিতেও স্পেক্টেটরশিপের ভূমিকা অপরিহার্য। লরা মালভি’র মেইল গেইজ১৮ অনুসারে কীভাবে একজন দর্শক তার জেন্ডার্ড সাবজেক্টিভিটি তৈরি করে তা আলোচনা হয়। অর্থাৎ জেন্ডার্ড পার্সেপশন তৈরিতে দর্শকের ভূমিকা অপরিহার্য। ফ্রোজেন এবং টার্নিং রেড চলচ্চিত্রে ফিমেল অবজেক্টিফিকেশনের কাউন্টার ন্যারেটিভ হিসেবে স্পেক্টেটররা বিবেচনা করে বলেই তা ন্যারেটিভ তৈরিতে প্রাধান্য পায়। মোটকথা, অ্যানিমেশন যেভাবে রিয়েলিটি তৈরি করে, দর্শকও তার স্পেক্টেটরশিপ তৈরি করতে থাকে নিজ নিজ আঙ্গিকে। অর্থাৎ অ্যানিমেশন কখনো কখনো স্পেক্টেটরের ভূমিকাকে প্রভাবিত করে, আবার একইসঙ্গে স্পেক্টেটরও তার সাবজেক্টিভিটির আদলে নিজেকে সক্রিয়ভাবে সেখানে জুড়ে দেয়।

মানুষই জগতের শেষ নয়

মানুষের দেখার সক্ষমতা অসীম নয়। সসীম দেখার জগতে মানুষের দেখার তাড়না অসীম। সেই তাড়না কখনো পূর্ণ হয় অচেতনে। তবে সজ্ঞানে দেখার আকাঙ্খা তো রয়েই যায়। দেখতে না পাওয়ার সীমাবদ্ধতা থেকে তৈরি হয় মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা। মানুষ বিশ্বজয় করতে চায়, মহাবিশ্বের সর্বত্র তার আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। সেটা খুব সম্ভব না হলেও মানুষ অন্তত সত্যিকার বিশ্বকে জানতে চায়। বুঝতে চায় তার জানার সীমাবদ্ধতার আড়ালে আদতে কী চলছে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা মানুষ বের করে চলেছে প্রতিনিয়ত। তবে সেই ব্যাখ্যার নানা সীমাবদ্ধতা মানুষকে মনঃপূত করতে পারে না। আবার কখনো কখনো যুক্তির বাইরের দুনিয়াও মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিকভাবে যৌক্তিক হিসেবে ধরা দেয়। মানুষ জ্ঞানপিপাসু প্রাণী ঠিকই, তবে মানুষ তত্ত্বকথার চেয়ে গল্পের প্রতি বেশি সায় দেয়, হোক সে গল্প অবাস্তব। কেননা এটাই এক মাধ্যম, যেখানে মানুষ এমনকিছু জানতে পারে, যা সে আগে কখনো ভাবেনি। আর এই গল্প থেকে তৈরি হয় নানা আখ্যান। সেই আখ্যানেই মানুষ তার মনস্তত্ত্বকে সাজায়। হতে পারে সেই দেখার ক্ষেত্রটুকু কৃত্রিম।

তবে মানুষের জানার জায়গাটুকু এবং গ্রহণ করা আখ্যানগুলো কেবল কাগজে-কলমের ফ্যাক্টসে সীমাবদ্ধ নয়। এটা বহুদূর বিস্তৃত। আর এই বিস্তৃত জগতে অন্যতম ভূমিকা নিয়ে হাজির হয় অ্যানিমেশন। এখানে মানুষ বাস্তব দেখে অবাস্তবে। বিষয়টা ঠিক অবাস্তব হলেও এটা দেখায় মানুষের জগতে তার চিন্তার সীমবদ্ধতা কতোখানি; আর সেই অসীমতার শেষটাই বা কোথায় হয়!

অ্যানিমেশন ব্যাপারটাও ঠিক মানুষের জ্ঞানের খোরাক মেটাতে সক্ষম ব্যাপারটা তা নয়, তবে এটা এমন এক জগতের উন্মোচন করে, যা তার জানার সীমাবদ্ধতাকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ করে। ভাবনার সক্ষমতা মানুষের অন্যতম শক্তি। কিন্তু কতোকিছু যে কখনো ভেবে দেখা হয়নি, তার প্রতিফলনই স্পেক্টেটর হিসেবে দর্শক অ্যানিমেশনে উপলব্ধি করে। ভাবনার জগতের দৃষ্টিভঙ্গি যে আরো অনেক দূর বিস্তৃত করা সম্ভব তা স্থান পায় সেখানে।

এদিক থেকে লাইভ-অ্যাকশন চলচ্চিত্রের প্রভাব থেকে অ্যানিমেশন আলাদা এই কারণে যে, অ্যানিমেশন মানুষের বিমূর্ত জগতকে যতোটা না সাবলীলভাবে দৃশ্যের মাধ্যমে তুলে আনতে সক্ষম লাইভ-অ্যাকশনের কাছে তা খুবই কষ্টসাধ্য কিংবা অসম্ভবও বটে। আর অ্যানিমেশন এই বিমূর্ত ভাবনাগুলো মূর্ত করার মধ্য দিয়ে কাজ করে চলেছে বহুকাল। অ্যানিমেশনে ভাবনা প্রকাশ করতে মানুষকে দেখানো প্রয়োজন পড়ছে না। মানুষ ছাড়াই এটা সফলভাবে তার ভাষ্য প্রকাশ করতে পারছে। আর একইভাবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা মানুষও সেটা উপভোগ করছে ভাবনাহীনভাবেই। আর সেই ভাবনাহীনতার জগতই তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায় জীবনের কী মানে, জীবন বলতে আদৌ যা আছে সেটা কী! অ্যানিমেশনে দেখানো সময়, ন্যারেটিভ ও নৈতিকতার দোলাচলে দর্শক মানুষকেন্দ্রিক পৃথিবীর সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে। বিপরীতে অ্যানিমেশনের পোস্টহিউম্যান জগৎ মানুষকে নতুন ভাবনার দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে দেয়।

মানুষকে ঘিরে যে জগৎ মানুষ নির্মাণ করেছে, তা অ্যানিমেশন দেখে নতুন আঙ্গিকে। একইসঙ্গে মানবতার নানা স্তরকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, আদতে মানুষের নির্মিত মানবতাই কি সবকিছুর মূলে? পোস্টহিউম্যানিজমের মানবকেন্দ্রিকতার সমালোচনা অনেকটাই মুখ্য হয়ে ওঠে অ্যানিমেশনের জগতে। অ্যানিমেশন বাস্তবতার এম্পিরিসিস্টিক ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাস্তবতা মানুষের দেখার দৃষ্টিসীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দেখা বাস্তবতা কেবল একপাক্ষিক ভ্রম, যার বাইরে অনেককিছুই থাকতে পারে। অ্যানিমেশন সেই মানবকেন্দ্রিক বাস্তবতার সীমারেখা মুছে দিয়েছে সফলভাবে।


লেখক : সৈয়দ ইকরামুল হাসান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

syedekramulhasan@gmail.com

https://www.facebook.com/syed.ekramul.hasan.2025


তথ্যসূত্র ও টীকা

১. Mollaghan, A. (2011: 108); The Musicality of the Visual Music Film; University of Glasgow. 

২. Wells, P. (1998); Understanding animation; Routledge.

৩. Bendazzi, G. (2016); Animation: A world history (Vols. 1–3); CRC Press.

৪. Braidotti, R. (2013: 37); The Posthuman; Polity Press.

৫. Haraway, D. J. (1985); A Cyborg Manifesto: Science, Technology, and Socialist-feminism in the Late Twentieth Century; The Anarchist Library; https://theanarchistlibrary.org/library/donna-haraway-a-cyborg-manifesto.

৬. Plato. (1992); The Republic (G. M. A. Grube & C. D. C. Reeve, Trans.); Hackett.

. Bergson, H. (1911); Creative evolution (A. Mitchell, Trans.); Henry Holt and Company. (Original work published 1907)

. Heidegger, M. (1977: 3–35); The Question Concerning Technology; In W. Lovitt (Trans.), The Question Concerning Technology and Other Essays. Garland Publishing, Inc.
. Benjamin, W. (1936: 217–252); The work of art in the age of mechanical reproduction; In H. Arendt (Ed.), Illuminations. Schocken Books.

১০. জাজ মিউজিক : উনবিংশ শতকের শুরুর দিকে (মূলত লুইজিয়ানার নিউ অরলিন্স-এ) আফ্রো-আমেরিকান কমিউনিটিতে গড়ে ওঠে জাজ মিউজিক। এটা মূলত আফ্রিকান মিউজিকাল ট্র্যাডিশনের সঙ্গে ইউরোপিয়ান সুর ও বাদ্যযন্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত। এই ধাঁচে সঙ্গীতজ্ঞ লিখিত নোটস অনুসরণ করা চেয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার সুর তৈরি করে। এই মিউজিক জনরাকে অনেকসময় আফ্রিকান ক্লাসিকাল মিউজিকও বলা হয়ে থাকে। পরবর্তী সময়ে এটা আফ্রো-আমেরিকানদের মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।

১১. Aristotle. (1965: 29–74); Poetics (T. S. Dorsch, Trans.); In T. S. Dorsch (Ed.); Classical literary criticism; Penguin Books. (Original work published ca. 350 B.C.E.)

১২. Althusser, L. (1971: 127–186); Ideology and ideological state apparatuses (notes towards an investigation); In L. Althusser, Lenin and philosophy and other essays; Monthly Review Press.

১৩. Aristotle. (n.d.). On the soul (De Anima) (J. A. Smith, Trans.). Georgetown University.দেখুন : https://homepages.uc.edu/~martinj/Mediaeval%20Logic%20&%20Philosophy/Week%2002/Aristotle%20-%20De%20Anima%20-%20J%20A%20Smith%20trans.pdf; retrieved on: 20.12.2025

১৪. Freud, S. (1955); The Interpretation of Dreams (J. Strachey, Trans.); Basic Books. (Original work published 1900)

১৫. Breton, A. (1924: 9-10); Manifestoes of surrealism; University of Michigan Press.

১৬. Sobchack, V. (1992); The address of the eye: A phenomenology of film experience; Princeton University Press.

১৭.Merleau-Ponty, M. (1962: 168); The body as expression, and speech. In C. Smith (Trans.); Phenomenology of Perception; Routledge & Kegan Paul. (Original work published 1945).

১৮. Mulvey, L. (1975: 801-816); Visual pleasure and narrative cinema. Film: Psychology, Society, and Ideology

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন