আজমেরী হক বাঁধন
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
‘অভিনয়, অভিনয়শিল্পী এবং আমার জীবন’
আজমেরী হক বাঁধন

কথামালা ১৩
২৩ অক্টোবর ২০২৫, বিকেল ৪.৩০ মিনিট
১২৩, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
জেরিন আল জান্নাত : শুভ বিকেল। সবাইকে হেমন্তের এই নাতিশীতোষ্ণ পড়ন্ত বিকেলের শুভেচ্ছা। যদিও আমাদের জীবনের প্রতিটি পড়ন্ত বিকেল, হেমন্তের বিকেলের মতো কাটে না। মাঝেমধ্যে জীবনের মাঠে রৌদ্রতপ্ত দুপুরও নামে। তবে সেই উত্তাপ সইতে হয় শুধু এ রকম একটা বিকেলের আশায়। যেমন, এখনো বাংলাদেশের দৈনন্দিন সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কথাই যদি বলি, জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেখানে খুব বেশি আশার আলো জ্বালাতে পারেনি। তবুও তো আমরা নতুন এক সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখি।
মানুষ মূলত আশায় বেঁচে থাকে। এতো আশার মধ্যেও হতাশা গ্রাস করে। হতাশায় ডুবতে থাকা মানুষ, মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও আবার জীবনে ফিরে আসে। এভাবে বার বার ফিরে আসার নামই কি জীবন নয়! আর এভাবে যারা বার বার ফিরতে পারে, তারা প্রত্যেকে একেকজন যোদ্ধা। আমাদের আজকের অতিথি আজমেরী হক বাঁধন সেই যোদ্ধাদেরই একজন। আজ আমরা তার কাছে শুনবো জীবনের পরতে পরতে বাধার সম্মুখীন হয়েও দুর্বার গতিতে ছুটে চলার গল্প। শুনবো তার সেই যুদ্ধকালীন সময়ের গল্প, যা বলেও বোধহয় বলা হয়ে ওঠেনি এখনো। সেই ভাবনাকে মাথায় রেখেই আমাদের আজকের আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ১৩’। আজকের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি কথা বলবেন, ‘অভিনয়, অভিনয়শিল্পী এবং আমার জীবন’ বিষয়ে।
আশা-সম্ভাবনা আর হতাশায় একাকার হয়ে যাওয়া এ সময়কে সঙ্গী করে যারা এই আয়োজনে সামিল হয়েছেন, তাদের সবাইকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শুরু করছি ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ১৩’। সঞ্চালনায় আছি আমি জেরিন আল জান্নাত।
আমন্ত্রিত অতিথি ও উপস্থিত দর্শকের সঙ্গে খানিক পরিচয় করানোর উদ্দেশ্যেই জানিয়ে রাখি, চলচ্চিত্র ও গণমাধ্যমবিষয়ক ষান্মাসিক পত্রিকা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর পথচলা শুরু ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। এ বছরের জুলাইয়ে প্রকাশ হয়েছে এর ২৯তম সংখ্যা। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ বছরব্যাপী নানা আয়োজন নিয়ে আপনাদের কাছে হাজির হয়। উল্লেখযোগ্য এসব আয়োজনের তালিকায় রয়েছে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন বাতচিত’ ও ‘ম্যাজিক লণ্ঠন আড্ডা’। এর পাশাপাশি নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনসহ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজও করে থাকে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’। শ্রোতামণ্ডলী, আপনারা হয়তো খানিকটা আঁচ করতে পারছেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর বাৎসরিক কাক্সিক্ষত আয়োজন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’। এই অনুষ্ঠানের জন্য চলচ্চিত্রাঙ্গনের পেশাদার ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ করা হয়ে থাকে।
জানিয়ে রাখি প্রথমবার কথামালা অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ খ্রিস্টাব্দে। চলচ্চিত্রনির্মাতা নূরুল আলম আতিকের কথা উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা’র। এরপর ধারাবাহিকভাবে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ ১২টি কথামালার আয়োজন করে। বছর ঘুরে আসা এই আয়োজনে কথা উপস্থাপন করে গেছেন নির্মাতা আবু সাইয়ীদ, গোলাম রাব্বানী বিপ্লব, অভিনয়শিল্পী জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পী কাজী হায়াৎ, অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী, নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরী, অভিনয়শিল্পী রাইসুল ইসলাম আসাদ, নির্মাতা শামীম আখতার, নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন এবং শব্দগ্রাহক রিপন নাথ, সর্বশেষ এসেছেন নির্মাতা রায়হান রাফী। তিনি কথা উপস্থাপন করে গেছেন ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ’ নিয়ে।
আমাদের আজকের অতিথি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত অভিনয়শিল্পী আজমেরী হক বাঁধন। যিনি নিজের সাহস, মেধা ও সংগ্রামের মাধ্যমে দেশের সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আজমেরী হক বাঁধনের যাত্রা শুরু ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে, লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, যেখানে তিনি দ্বিতীয় রানার্সআপ হন। সেই প্রতিযোগিতাই তার জন্য খুলে দেয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র জগতের দরজা।
২০১০ খ্রিস্টাব্দে নিঝুম অরণ্যে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড়ো পর্দায় তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তবে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তিনি আলোচনায় আসেন ২০২১ খ্রিস্টাব্দে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত চলচ্চিত্র রেহানা মরিয়ম নূর-এর মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রে তার অভিনয় শুধু বাংলাদেশের দর্শকের কাছে নয়, গোটা বিশ্বের নজরে আসে। রেহানা মরিয়ম নূর প্রথম বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে কান চলচ্চিত্র উৎসবের আ সাত্রে রিগার্ড বিভাগে নির্বাচিত হয়। আর বাঁধন এই চলচ্চিত্রের জন্য এশিয়া প্যাসিফিক স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড (এ পি এস এ) এ সেরা অভিনয়শিল্পীর ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পান। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও মেরিল প্রথম আলো পুরস্কারও অর্জন করেন। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি তিনি ওয়েব সিরিজেও অভিনয় করেছেন। ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ ও ‘গুটি’ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র এশা মার্ডার : কর্মফলসহ প্রতিটি কাজেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে খুফিয়ার মাধ্যমে তিনি বলিউডের চলচ্চিত্রে পদার্পণ করেন। সেখানে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়। অভিনয়ের বাইরেও বাঁধন পেশায় দন্তচিকিৎসক।
অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আজকের অতিথি আজমেরী হক বাঁধনকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি [দর্শকের হাততালি]। এবারে অতিথিকে স্মারক প্রদান করবেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সহযোগী সম্পাদক শফিকুল ইসলাম। মঞ্চে আহ্বান করছি শফিকুল ইসলামকে।
এবার আজমেরী হক বাঁধনকে উপহার দিয়ে বরণ করে নেবেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ সদস্য সালাহ উদ্দীন নীল। অতিথিকে উপহার দেওয়ার জন্য মঞ্চে আসার অনুরোধ করছি সালাহ উদ্দীন নীলকে।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা আজকের আয়োজনের মূল আকর্ষণ আজমেরী হক বাঁধনের কথা শুনবো। মূল আয়োজনে যাওয়ার আগে শুভেচ্ছা বক্তব্য নিয়ে আসছেন ‘ম্যাজিক লণ্ঠন কথামালা ১৩’-এর আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক শাহরিয়ার সজিব।
শাহরিয়ার সজিব : অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজকের এই আয়োজনের মধ্যমণি আজমেরী হক বাঁধন ইতোমধ্যে আমাদের এখানে উপস্থিত হয়েছেন। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে জানাই উষ্ণ অভিবাদন। তিনি আজ উপস্থিত হয়ে সত্যিই আমাদের কৃতার্থ করেছেন। করতালির মাধ্যমে আমরা তাকে আরো একবার শুভেচ্ছা জানাতে পারি। আসলে একজন অভিনয়শিল্পী এক জীবনে বহু জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারেন। সেইসব কথাই আজ আমরা শুনবো তার কাছে। সবশেষে আগত অতিথিবৃন্দের প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনারা আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে আজকের এই আয়োজনে সামিল হয়েছেন। আশা রাখি অনুষ্ঠানের শেষ অবধি আমাদের সঙ্গে থেকে সহযোগিতা করবেন। এই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেষ করছি।
জেরিন : ধন্যবাদ শাহরিয়ার সজিবকে। আমন্ত্রিত সবার উদ্দেশেই বলে রাখি, আজকের অনুষ্ঠান আমরা সাজিয়েছি দুটি পর্বে। প্রথম পর্বে থাকবে আলোচকের কথা উপস্থাপন। দ্বিতীয় পর্বে সবার অংশগ্রহণে থাকবে প্রশ্নোত্তর পর্ব। কথা উপস্থাপনের মধ্যেই উপস্থিত সবার কাছে আমাদের সদস্যরা সাদা কাগজ পৌঁছে দেবে। সেখানে আপনাদের নাম, বিভাগ ও প্রশ্ন লিখে রাখবেন। পরে সদস্যরা সেগুলো সংগ্রহ করে নেবে। সেসব প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করবেন আজকের অতিথি। এ পর্যায়ে কথা উপস্থাপন করতে আসছেন আজমেরী হক বাঁধন। অথিতিকে অনুরোধ করছি তার কথা উপস্থাপনের জন্য।
আজমেরী হক বাঁধন : আসসালামু আলাইকুম। শুভ বিকেল। আমার খুব ভালো লাগছে ঘর ভর্তি এতো মানুষ, মানে সবাইকে দেখে। প্রথমে আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’কে—যারা আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত করেছেন। এর আগে আমার একবার আসা হয়েছে এই ইউনিভার্সিটিতে। কিন্তু এতো সুন্দর ক্যাম্পাসে পড়ার সুযোগ আমার কখনো হয়নি। আমি বাংলাদেশ মেডিকেলে পড়েছি। সো, আমরা খুবই ইট, কাঠের দেয়ালে বন্দি একটা প্রতিষ্ঠান, মানে মেডিকেল কলেজে পড়েছি। এতো সুন্দর ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস আপনাদের! এর আগেও আমি এসে পুরোটা ক্যাম্পাস ঘুরে দেখেছিলাম। আজকেও কিছুটা ঘুরে দেখলাম। ভীষণ ভালো লাগলো।
আজকে আমাকে বলা হয়েছে, আমার অভিনয়, অভিনয় জীবন এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলতে। আমার শুরুটা উপস্থাপক প্রথমেই বলে দিয়েছেন। শুরু হয়েছিলো লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার দিয়ে ২০০৬-এ। লাক্স সুন্দরী থেকে নায়িকা বাঁধন এবং নায়িকা বাঁধন থেকে অভিনয়শিল্পী বাঁধন হওয়ার একটা দীর্ঘ যাত্রা আমার আছে। প্রথম যখন আমি লাক্স থেকে বের হই, তখন সবাই আমাকে ‘লাক্স সুন্দরী’ বলতো; এবং ওটা আমি মোটামুটি এনজয় করতাম! কারণ ওই বয়সে আমার কাছে মনে হতো, এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস জীবনে। তারপর আমি নায়িকা বাঁধন হলাম। বিভিন্ন নাটকে অভিনয় করা শুরু করলাম। সিরিয়ালে অভিনয় শুরু করলাম। একটা সিনেমায় অভিনয় করলাম নিঝুম অরণ্যে নামে; এবং তখন বিভিন্ন সিনেমার অফার আসতে থাকলো। যারা কমার্শিয়ালি হিট ডিরেক্টর তারাও অফার দিলেন, কমার্শিয়াল হিরোর সঙ্গে সিনেমা করার সুযোগ আসলো।
কিন্তু তখন ওই বয়সেই কেনো জানি মনে হয়েছিলো, আমার আসলে পড়ালেখাটা শেষ করা দরকার। আমি আমার পড়াটা শেষ করেছি। বি ডি এস [ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি] কমপ্লিট করেছি। বি ডি এস কমপ্লিট করার পর আমার মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা দিলো—কারণ এটা শুধু লাক্স সুন্দরী বাঁধন থেকে অভিনয়শিল্পী বাঁধন হওয়ার গল্প না—আদর্শ সমাজের তথাকথিত নারী থেকে মানুষ বাঁধন হয়ে ওঠার গল্পও আছে। যখন আমি মেডিকেল পড়াটা শেষ করি, তখন আমার মনে হলো, যে কাজটা [অভিনয়] করছি সেটা আমি আসলে পছন্দ করি না, ভালোবাসি না। এবং এই কাজটা আমাদের সমাজে ও পরিবারে স্বীকৃত না। ফলে আমার কাজটা করা উচিত না। এই ভেবে আমি কাজটা ছেড়ে দিই এবং বিয়ে করে ফেলি। বিয়ে করার পর আমার বাচ্চা হয়ে যায়। বিয়ের এক বছরের মাথায় বাচ্চাটা হয়। তারপরে আমার জীবনে নানা রকমের ডিজাস্টার শুরু হয়। তখন আমাকে আবার মিডিয়ার কাজেই ফেরত আসতে হয়।
২০১১-তে আমি আবার মিডিয়ায় কাজ শুরু করি। ’১১-তে যখন শুরু করি, তখনো আমি আমার এই কাজটাকে ভালোবাসি নাই। আমি জাস্ট কাজ করার জন্য করতাম। আমার টাকার দরকার ছিলো মেয়ের এবং নিজের জীবন নির্বাহ করার জন্য। আমি কাজটা জাস্ট করে যেতাম টাকার জন্য। আমি শুটিং করতাম সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ক্যাশ টাকা নিতাম, বাসায় চলে যেতাম। মানে আমি যে কাজটা করছি, তার প্রতি আমার কোনো ডেডিকেশন, ভালোবাসা কিচ্ছু ছিলো না।
তারপর ২০১৮ সালে আমার জীবনে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে—আমার সন্তানের যে বাবা সে আমার কাছ থেকে সন্তানকে ছিনিয়ে নিতে চায়! ওই ঘটনা আসলে আমাকে পুরোপুরি বদলে দেয়। তখন তথাকথিত ভালো মেয়েটা থেকে হঠাৎ করে আমার মনে হয়, এখানে মানুষ বাঁধনটা কোথায়! মানুষ বাঁধনের অস্তিত্বটা কোথায়! কারণ যেই সমাজে আমি বেড়ে উঠেছি, সেই সমাজ আমাকে ততোক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করছে, যতোক্ষণ পর্যন্ত আমি একজন নারীর মতো করে কথা বলছি, চলছি, অধিকার চাইছি এবং স্বাধীনতা চাইছি। কিন্তু যখন আমি একজন মানুষের অধিকার চাইছি; যখন বলছি, আমার স্বাধীনতাটা সমান সমান বুঝে পেতে চাই, তখন আমাকে এই সমাজ, দেশের আইন, নিজের পরিবারের সবাই বলছে যে, না এভাবে হবে না! আমরা যেভাবে সেট করে দিয়েছি তোমাকে সেটাই মেনে নিতে হবে।
ওই সময়টায়—আমার মনে আছে—আমি সবচাইতে ভালনারেবল ছিলাম। সবচাইতে অসহায়বোধ করেছি। এবং নিজেকে একদম ভেঙেচুড়ে মানে একটা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করার পর, ওখান থেকে উঠে এসেছি। আমার তখন মনে হয়েছিলো, এই সমাজেই আমি বেঁচে থাকবো এবং মানুষ হয়েই বেঁচে থাকবো। আমার অধিকার আমাকে বুঝে পেতে হবে। কেউ আমাকে বলে দিবে না যে, এটা তোমার অধিকার, এই অধিকার নিয়ে তুমি খুশি থাকো। তখন আমি কোর্টে যাই। কোর্টে ফাইট করি। ২০১৮ সালে আমি আমার মেয়ের সম্পূর্ণ অভিভাবকত্ব পাই। যেটা শুধু বাংলাদেশের জন্য না, সাবকন্টিনেন্টেই একটা যুগান্তকারী রায় ছিলো—মা তার সন্তানের সম্পূর্ণ অভিভাবকত্ব পাচ্ছে। ওই ঘটনাটা আমাকে অনেক বদলে দিলো।
আমি ক্রনিক ডিপ্রেশনের পেশেন্ট। আমার বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার আছে। আমি এগুলোর এন্টি ডিপ্রেসার খাই। যদিও আমাদের এখানে এগুলো নিয়ে কথা বলা নিষেধ। কারণ এগুলো নিয়ে যখন কথা বলবো, তখন সবাই আমাকে পাগল ভাববে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য অনেক জরুরি একটা বিষয়; এবং সেটা নিয়ে আমাদের ওপেনলি কথা বলা ও আলোচনা করা উচিত। আমি তখন রেগুলার থেরাপি নিতাম—২০১৭-১৮ সালের কথা বলছি—থেরাপিস্টের কাছ থেকে। তখন থেরাপিস্ট আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি যে কাজটা করো এই কাজটাকে কি ভালোবাসো?’ আমি বললাম, না আমি আসলে ভালোবাসি না। উনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে তুমি কি করতে ভালোবাসো?’ আমি বলেছি, আমি জানি না! কারণ আমি তো কখনো আমার জন্য কিছু ডিসাইড করি নাই, আমার পরিবার ডিসাইড করে দিয়েছে। সমাজ আমাকে ডিসাইড করে দিয়েছে, আমাকে কী হতে হবে, কী করতে হবে। তখন উনি বললেন, ‘তুমি সেই কাজটাই করো, যে কাজটা তোমাকে আনন্দ দিবে এবং তুমি যে কাজটাকে ভালোবাসো।’
তখন আমি অনেক চিন্তা করলাম। আমি তখন একদম নিউবর্ন একটা মানুষের মতো। আমার সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে মানুষ হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছি। আমি জানি না, আমার কী করা উচিত, আমি কী করতে চাই। তখন আমি বিভিন্ন জায়গায় ইন্টারভিউ দেওয়া শুরু করলাম, আমার মনে হলো আমি অভিনয়টা ঠিক করে করতে চাই। আমি এমন একটা ক্যারেক্টার করতে চাই, যে ক্যারেক্টারটা দিয়ে মানুষ আমাকে মনে রাখবে। আমি এ রকম অনেক ইন্টারভিউ দিলাম এবং এটা খুবই কাকতালীয়। আমি ম্যানিফেস্ট করাতে বিশ্বাস করি। আমি মনে করি, আমরা যদি কোনো কিছু খুব শূন্য নিয়তে চাই, তাহলে সেটা নেচার ব্যবস্থা করে দেয়। সেই ব্যবস্থাটা কিন্তু আসলেই নেচার আমার জন্য করেছে। আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ, রেহানা মরিয়ম নূর-এর ডিরেক্টর; তার টিম থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এবং আমার মতো নায়িকা বাঁধনকে নিয়ে রেহানার মতো একটা চরিত্র করার সাহস আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ দেখায়। আমার জায়গা থেকে একজন অভিনেত্রী হিসেবে তখন যেটা করেছি—সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করেছিলাম আমার ডিরেক্টরকে—একদম জীবন বাজি রেখে কাজটা করেছিলাম।
দেড় বছর আমি কোনো কাজ করিনি। অন্য কোনো জায়গায় ইনভলভ হই নাই। আমি পুরোটা সময় আসলে রেহানাকে দিয়েছিলাম। কারণ রেহানার স্ক্রিপ্টটা যখন আমার কাছে আসে, তখন আমি উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম, এটা আমার জীবনের হয়তো একমাত্র সুযোগ। যে সুযোগটা আমাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে। এবং আমি সেটা করেছি। করার পর বাকিটা তো আসলে আপনারা সবাই দেখেছেন। সিনেমাটা কান চলচ্চিত্র উৎসবে সিলেক্টেড হয়েছে এবং আমরা সেখানে গিয়েছি। পৃথিবীর এতোগুলো মানুষের সামনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে উপস্থাপনের যে একটা আনন্দ সেটা আসলে ওইখানে গিয়ে আমি অনুভব করেছি। তারপর থেকে আমার মধ্যে অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হলো, একটা আকাঙ্ক্ষা জাগলো, আমি আসলে অভিনয়টাই ঠিক করে করতে চাই। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই আমার পরবর্তী সময়ের কাজগুলো; যে কাজগুলো প্রত্যেকটাই একটার থেকে আরেকটা আলাদা। এবং আমি সচেতনভাবেই আলাদা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
রেহানা চরিত্রটি করার পর এ ধরনের অনেকগুলো ক্যারেক্টারে অভিনয়ের অফার এসেছে। কিন্তু আমি সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিই, না, আমি আলাদা ধরনের ক্যারেক্টার করবো। তারপরে আমি করলাম ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’; কলকাতার সৃজিত মুখার্জির ওয়েব সিরিজ। যেটা রেহানার থেকে একেবারে আলাদা। আপনারা যারা দেখেছেন তারা জানেন, রেহানার সঙ্গে ওখানকার মুসকান জুবেরীর কোনো মিল নাই। দুটো চরিত্র একদমই আলাদা। তারপরে আমি করেছি ‘গুটি’ ওয়েব সিরিজ। এরপরে করলাম খুফিয়া, ‘নেটফ্লিক্স’-এর ফিল্ম। বিশাল ভারদ্বাজ বানিয়েছেন। আমার প্রত্যেকটা কাজ আসলে প্রত্যেকটার থেকে আলাদা। আর এটা হয়েছে আমার সচেতন সিদ্ধান্তে।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমার যারা ডিরেক্টর ছিলেন, তাদেরও এখানে অনেক কৃতিত্ব। কারণ ভালো ডিরেক্টরের সঙ্গে কাজ করলে চরিত্রকে যেভাবে ধারণ করা যায়, সেটা আসলে এমনি কোনো ক্যারেক্টারে কাজ করে বোঝা যায় না। আমি প্রচুর নাটকে অভিনয় করেছি, মানে সকাল-বিকাল অভিনয় করেছি; জাস্ট ডায়ালগ বলে গেছি। অনেক সময় ডায়ালগও থাকতো না। এ রকম অনেক হয়েছে—যেখানে ডায়ালগ থাকতো না, সেখানে অন স্পট ডায়ালগ বলতে বলা হতো। এ রকম অভিনয়ও আমি করেছি; তাই পার্থক্যটা জীবন দিয়ে আমি দেখেছি।
অভিনয়টা করতে হলে অভিনয়টাকে ভালোবাসতে হবে। আবদুল্লাহ সাদ আমাকে বলেছিলো—যখন আমি রেখা করতে গিয়েছিলাম—অভিনয়টা ভুলে যেতে হবে আসলে। মানে তুমি যে অভিনয় করছো এটা তোমাকে ভুলে যেতে হবে। অন স্ক্রিন যাতে এটা কখনো মনে না হয়, তুমি অভিনয় করছো।
এই জার্নির মধ্যে মানে নতুন জীবনবোধের সঙ্গে চলতে চলতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে আসে। সেই নতুন বোধেরই একটা অংশ আমাকে আসলে বাধ্য করে জুলাইয়ে স্টুডেন্টদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। কারণ আমি যে মানুষ বাঁধন হওয়ার চেষ্টা করছি, সেই মানুষ বাঁধনের কিছু সামাজিক দায়িত্বও আছে। আমি শুধু অভিনয়টা করে যাবো—একটা বাবল ক্রিয়েট করবো আমার চারপাশে, যেই বাবলের বাইরে সবাই থাকবে, এর ভেতরে কেউ আসতে পারবে না—এই জায়গাটা থেকে আমি বের হতে চেয়েছি। এটাও আমার সচেতন সিদ্ধান্ত ছিলো, আমি এই জায়গা থেকে বের হবো।
আমি কিন্তু ক্ষমতার খুবই কাছাকাছি ছিলাম। আমি অনেক মানুষের সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, যে অন্যায় আমার চোখের সামনে হচ্ছে, সেটা একজন সুবিধাভোগী নাগরিক হিসেবে আমি চুপ করে সহ্য করবো না বা চুপ করে থাকবো না। আমার রাস্তায় যাওয়াতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের হয়তো কিছুই হয়নি; কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে, একজন শিল্পী হিসেবে এটা বলতে পারি, জুলাই অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণ আমার জীবনের সবচাইতে ভালো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে একটা। যেটা সিদ্ধান্ত আমি সঠিক সময়ে নিতে পেরেছি এবং যা আমাকে আসলে নতুন স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে। কারণ আপনারা যারা ইয়াং জেনারেশন, আমার কাছে মনে হয়, আমরা যারা মিডল এইজড হয়ে গেছি, তারা তো এক ধরনের সুবিধার জায়গায় চলে গেছি। মানে আমাদের লাইফ একটু কমফোর্ট জোনে চলে গেছে। ওই জায়গা থেকে বের হওয়া আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। আমরা চাইও না ওই কমফোর্ট জোনটা থেকে বের হতে। কিন্তু জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের কমফোর্ট জোন থেকে বের হওয়া যায়; কীভাবে নিজের অধিকারটা চেয়ে নেওয়া যায়।
আমার এই পুরো লাইফ জার্নিতে আমি আসলে সমাজের তথাকথিত ওই লক্ষ্মী মেয়েটা থেকে একজন মানুষ বাঁধন হওয়ার চেষ্টা করেছি; চেষ্টা করে যাচ্ছি। আর এই চেষ্টাটা আমি আসলে আমৃত্যু জারি রাখবো। আমার কাজের মাধ্যমে আমি সামাজিক কিছু পরিবর্তন দেখতে চাই। কারণ আমার একটা মেয়ে সন্তান আছে। আমি চাই, যে সমাজে আমি বেড়ে উঠেছি সেই সমাজটা যাতে আমার মেয়ের জন্য না হয়। আমার মেয়ের জন্য একটা পরিবর্তিত সমাজ আমি দেখতে চাই। এবং সেই সমাজটা কেমন হবে সেইটার একটা স্বপ্ন আমার আছে এবং সেই স্বপ্নগুলো পূরণের জন্য আমি যতোটুকু পারবো মানুষকে সহযোগিতা করবো। আমার জায়গা থেকে আমি আমার কাজটা করবো।
তাহলে আমার কাজটা আমি কীভাবে করবো? আমি আমার চরিত্র দিয়ে করবো। ভবিষ্যতে আমার ইচ্ছা আছে স্ক্রিনপ্লে লেখার এবং ডিরেকশনে আসার। আমি চাই, বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গল্প হোক। যে গল্পগুলো আমাদের গল্প এবং যে গল্প নিয়ে আমরা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করবো। যে গল্পগুলো আমাদের দর্শককেও ছুঁয়ে যাবে। আর সেই জায়গা থেকে আমার চেষ্টাটা জারি থাকবে। আমি আসলে যতোটুকু পারলাম আমার জার্নিটা বললাম। আমি সবচাইতে খুশি হবো আপনাদের সঙ্গে ইন্টারেক্ট করতে পারলে। কারণ প্রশ্নোত্তর পর্ব আমার সবচাইতে পছন্দের, একা একা কথা বলে যাওয়ার চাইতে। আর এখানে একটা ছোট্ট বাবু আছে। ওর নাম কী? রাবেয়া [দর্শকের মধ্যে থেকে কেউ একজন বলেন]। হ্যালো রাবেয়া, হ্যালো। রাবেয়াদের জন্য আমাদের সমাজটাকে আরো অনেক ঠিক করতে হবে এবং সমাজ ঠিক করার কাজে আমাদের সবাইকে সাহায্য করতে হবে। একে অন্যের পাশে থাকতে হবে—এটাই আমি বিশ্বাস করি। থ্যাংক ইউ [দর্শকের করতালি]।
জেরিন : ধন্যবাদ, আজমেরী হক বাঁধন। প্রাণবন্ত এক আলোচনা শুনলাম আমরা। দর্শক, আলোচকের আলোচনার সময় আপনাদের যেসব প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, সেগুলো নিশ্চয়ই কাগজে আপনারা লিখেছেন। ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’-এর সদস্যদের আহ্বান করছি কাগজগুলো সংগ্রহ করে আলোচকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।
জান্নাতুল ফেরদৌস স্মৃতি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি যখন ভেঙে পড়েছিলেন তখন আপনাকে কোন কোন বিষয়গুলো সেই অবস্থা থেকে ফিরে আসতে সাহস জুগিয়েছিলো?
বাঁধন : খুবই ভালো প্রশ্ন। আমার ভেঙে পড়া তো একবার নয়। জীবনে এ রকম বহুবার হয়েছে—আমি শুধু ভেঙেই পড়িনি বরং একেবারে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিলাম। যখন ফার্স্ট বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স ১৯। ডিভোর্সের পর আমার শেষ পরিণতি হয় একটা রিহ্যাব সেন্টারে। আমি সিভিয়ার ডিপ্রেশনের পেশেন্ট ছিলাম উইদ সুইসাইডাল ট্রেন্ডেন্সি। আমি কিন্তু সেটা থেকে সারভাইভ করেছি। তখন আসলে আমার মাথায় কিছুই ছিলো না। তখন মনে হতো, পৃথিবীটা সম্পূর্ণ শূন্য। আমাদের এখানে মেন্টাল হেল্থটাকে খুবই ইগনোর করা হয়। আমি কিন্তু তখন থেকেই একজন সাইকোলজিস্টের আন্ডারে ছিলাম এবং রেগুলার মেডিসিন খেতাম, থেরাপি নিতাম। এইটা অনেক হেল্প করেছে আমাকে।
আরেকটা জিনিস আমাকে হেল্প করেছে সেটা হচ্ছে, আমার নিজের সততা। এটা আমাকে অনেক ইন্সপায়ার করে অলওয়েজ। কারণ আমি আমার লাইফ দিয়ে দেখেছি, কোনো না কোনোভাবে আল্টিমেটলি অনেস্টি জিতে যায়। এটা খুবই ফিল্মি শোনাবে। কিন্তু এই কথাটা একদম সত্যি। আমার কাছে মনে হয়, যখন আমরা বিষণ্ন বা আমাদের কোনো কারণে খারাপ লাগছে, সেক্ষেত্রে আমরা প্রফেশনাল হেল্প নিতে পারি। প্রফেশনাল হেল্প নেওয়া লজ্জার কিছু নয়। সমাজের অনেকে আমাকে বলতো, তুমি যে এগুলো নিয়ে কথা বলো, তোমাকে তো সবাই পাগল বলবে। আমাকে কিন্তু পাগলও বলেছে। এ রকম না যে, পাগল বলে নাই! আমাকে হেনো কোনো গালি নাই যেটা কেউ দেয় নাই। সব গালি খাওয়া হয়ে গেছে আমার। এখনো যখন আমার সঙ্গে কেউ কথায় পারে না, তখন বলে তোমার মাথা খারাপ। তাতে আমার কিছু আসে যায় না আসলে। কারণ আমি ভালো আছি।
মাঝখানে জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমার আবার ডিপ্রেশন হয়েছিলো। ভীষণভাবে ডিপ্রেশন হয়েছিলো। তারপরে আমি আবার থেরাপি নেওয়া শুরু করলাম। মেডিসিন খাওয়া শুরু করলাম এবং আমি এক্সারসাইজ করতাম। এটাও অনেক হেল্প করে। যখন মানুষ বিষণ্ন থাকে, তখন তাদের এক্সারসাইজ অনেক হেল্প করে। এই তো, এভাবেই আমি ওভারকাম করেছি। যতোবার একদম খাদের মধ্যে পড়েছি, ততোবারই কোনো না কোনোভাবে বাউন্স ব্যাক করেছি।
মো. রায়হান আলী, শিক্ষার্থী, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ : আপনি ঢালিউড, টালিগঞ্জ ও বলিউডে অভিনয় করেছেন। পেশাদারিত্বের দিক থেকে কোন ইন্ডাস্ট্রি এগিয়ে?
বাঁধন : পেশাদারিত্বের দিক থেকে অবশ্যই বলিউড এগিয়ে। আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তারা অসম্ভব ভালো। আমি একজন অসম্ভব গুণী নির্মাতার সঙ্গে কাজ করেছি—বিশাল ভারদ্বাজ। ওদের ওখানে সবকিছু আসলে অনেক বেশি গোছানো। টেকনিকাল সাপোর্টগুলো তারা অনেক বেশি পায়। আমাদের এখানে সেই সাপোর্টটা নাই। আর টালিউডে আমার অভিজ্ঞতা ভীষণ খারাপ। আমার সঙ্গে যেটা হয়েছিলো—সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে কাজটা করতে গিয়েছিলাম—আমার যে প্রোডাকশন হাউজ ছিলো তারা আমাকে খুবই বাজেভাবে ট্রিট করেছে। এটাও লাইফের একটা পার্ট। এটাও একটা অভিজ্ঞতা আমাকে দিয়েছে। কারণ তখনো রেহানা মরিয়ম নূর রিলিজ হয় নাই। তারা কনফিউজড, আমাকে কতোটুকু মূল্যায়ন করবে। ওই জায়গা থেকে তারা আমার সঙ্গে অনেক মিসবিহেভ করেছে। যার জন্য ওখানকার অভিজ্ঞতা আমার খুবই খারাপ। যদিও পরবর্তী সময়ে তারা এটার জন্য আমার কাছে সরি বলেছে।
অনেস্টলি ওদের [টালিগঞ্জ] টেকনিকাল টিম বা প্রফেশনালিজম আমাদের চাইতে বেটার না। আমাদের মতোই। আমি এখানেও কিছু ভালো টিমের সঙ্গে কাজ করেছি। যেটা অসাধারণ! যেমন, রেহানা মরিয়ম নূর-এর টিম অসাধারণ! ‘গুটি’র টিমও অসাধারণ! আমি রিসেন্ট আরেকটা কাজ করেছি রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিত-এর। অসাধারণ তাদের টিম! এটা আসলে ডিপেন্ড করে টিম টু টিম। বাট ইন্ডাস্ট্রির দিক থেকে ডেফিনেটলি বলিউড অনেক এগিয়ে, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি তার ধারে কাছেও না।
বিন্তি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি কি মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে নারীকেন্দ্রিক গল্পগুলো যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে? বিশেষ করে আপনি যেসব কাজ করছেন—রেহানা মরিয়ম নূর, ‘গুটি’—এসব কাজ কি আমাদের চলচ্চিত্রে নারী চরিত্রকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে?
বাঁধন : নারীকেন্দ্রিক বেশকিছু কাজ হয়েছে, এটা খুব ভালো একটা দিক। যদিও সেগুলো কমার্শিয়ালি সাকসেসফুল হয়নি। রেহানা মরিয়ম নূর তো ডেফিনেটলি বাংলাদেশে একটা মাইলফলক হয়ে আছে। আমি ‘গুটি’ করেছি। কলকাতার কাজটাও নারীকেন্দ্রিক। আমি চেষ্টা করি নারীপ্রধান গল্পগুলো চুজ করতে। বাংলাদেশে এখন নারীপ্রধান গল্পে কাজ হচ্ছে, প্রিয় মালতী সিনেমাটা হয়েছে, বাড়ির নাম শাহানা ও সাবা হয়েছে। সো এই ধরনের একটা ট্রেন্ড চালুর চেষ্টা চলছে।
আমাদের এখানে দর্শকেরও কিন্তু দায়িত্ব আছে। আমার এবার ঈদে একটা সিনেমা রিলিজ হয়েছে, এশা মার্ডার : কর্মফল নামে। এটা মোটামুটি কমার্শিয়াল সিনেমা আরকি, খুব বেশি না। কারণ ওই অর্থে নাচগান নাই। কিন্তু মোটামুটি কমার্শিয়াল সিনেমা। আমি ভেবেছিলাম, অনেক দর্শক সিনেমাহলে আসবে, কিন্তু আসে নাই। দর্শকেরও এক ধরনের হীনম্মন্যতা আছে। মানসিক দীনতা আছে। তারা নারীপ্রধান গল্পগুলোকে খুব একটা দেখতে চায় না বা নারীর শক্তিশালী চরিত্রগুলোকে স্ক্রিনে দেখতে চায় না। তারা আসলে সমাজ তথাকথিত নারীর যে আকারটা বানিয়ে রেখেছে—নারী এ রকমই হবে—সেই নারীর চরিত্রগুলোকে দেখতে পছন্দ করে। কিন্তু আমি যে সিনেমাগুলোর নাম বললাম, সেই সিনেমায় বা সেই ওয়েব সিরিজে আল্টিমেটলি আমাদের তথাকথিত নারীদের কোনো রিপ্রেজেন্টেশন নাই। ওইটা নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তিও আছে। আমাদের অডিয়েন্সকেও আসলে চেঞ্জ হতে হবে।
আরেকটা জায়গায় খুব বেশি কাজ করতে হবে; সেটা হচ্ছে, আমাদের প্রোডাকশনে যারা আসছেন, প্রোডিউসার যারা আছেন, তাদেরকে অনেক বেশি প্রগ্রেসিভ হতে হবে। কারণ আমার অবজারভেশন নারী ও পুরুষ মিলে বাংলাদেশে যথেষ্ট ট্যালেন্টেড ডিরেক্টর আছে; আর্টিস্ট তো আছেই। আমরা সবাই নিজে নিজে শিখেছি; হাতেকলমে শিখেছি; অনেক সাফার করে শিখেছি। আমাদের এখানে প্রচুর ট্যালেন্টেড মানুষ আছে। কিন্তু ওই রকম প্রগ্রেসিভ চিন্তার প্রোডিউসার পাই না। কারণ সবাই এখানে টাকা বানাতে আসে, না হলে কালো টাকা সাদা করতে আসে। এছাড়া আর কোনো এইম তাদের লাইফে নেই—একটা ইমপ্যাক্টফুল কাজ করবো বা আমি সোসাইটির জন্য কিছু করবো—এই চিন্তাটা আমি প্রোডিউসারদের মধ্যে খুব কম দেখি।
মো. তুরিন আলম, শিক্ষার্থী, নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি : অভিনয় জগতে আপনি সর্বপ্রথম কীভাবে আপসেট হয়ে পড়েছিলেন; সেটা থেকে কীভাবে বের হলেন?
বাঁধন : অভিনয়কে যখন থেকে ভালোবাসতে শুরু করি, তখন থেকেই আপসেট হয়েছি। রেহানা মরিয়ম নূর-এর সেটে অনেকবার আপসেট হতে হয়েছে। কারণ আমার ডিরেক্টর ছিলেন প্রচণ্ড পারফেকশনিস্ট। কিছুতেই তার স্যাটিসফ্যাকশন হচ্ছিলো না। আমি দেড় বছর অলরেডি ইনভেস্ট করে ফেলেছিলাম। ইনভেস্ট করে ফেলার পর যখন শ্যুটে গেলাম, তখন যেটা হয়েছে কোনো সিন, কোনো শট্ দেওয়ার পর, সে খুশি হয় না। যখন এ রকম হতাশ একজন ডিরেক্টরকে চোখের সামনে দেখছি—দেড় বছর ইনভেস্ট করার পর—তখন আসলে সেটা আমাকে ভীষণভাবে পীড়া দিয়েছে। আমার এখনো মনে আছে, সেটে আমাদের প্রচণ্ড ফাইট হতো। প্রচণ্ড ঝগড়া করেছি আমরা। আমি অনেক সময় সেট থেকে চলে আসতে চেয়েছি! এ রকমও হয়েছে আমি বলেছি, আমি আর শুটিং করবো না। কারণ কোনো সিন তাদের মন মতো হচ্ছে না। আমার ডিরেক্টরের কাছে—মানে আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ হচ্ছে সেই মানুষটা—আমি তার কাছে গ্রেটফুল! কারণ সে আমাকে একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নতুন করে জন্ম দিয়েছে। আমার মানুষ হতে চাওয়ার যে পথ চলা, সেটাতেও তার অনেক অবদান আছে।
এই বিষয়গুলো আল্টিমেটলি আমরা ওভারকাম করেছিলাম, যখন কানে সিনেমাটা সিলেক্ট হলো তখন। কারণ তার আগে পর্যন্ত আমি অনেক ফ্রাস্ট্রেটেড ছিলাম এই ভেবে—এমন একটা কাজ করে দেড় বছর ওয়েস্ট করলাম! তারপরে কোভিড শুরু হলো। ওই সিনেমার শুটিং শেষ হয়েছে ২০১৯-এর নভেম্বরে। আর কোভিড শুরু হয় ’২০-এ। আমরা তো তখন মারাই যাচ্ছি! তার ওপর এমন এক সিনেমা করেছি, সেটাও আল্লাহর ওয়াস্তে চলে গেছে! জীবনে আসলে কখন কী হবে, আমরা সেটা জানি না। কিন্তু ফোকাসটা ঠিক রাখা, সৎ থাকা ও পরিশ্রমী হওয়াটা ভীষণ জরুরি। তাহলে আল্টিমেটলি কোনো না কোনোভাবে সবকিছু ম্যানেজ হয়ে যায়।
স্বপ্নীল রহমান, শিক্ষক, লোক প্রশাসন বিভাগ : কোনো ক্যারেক্টারে কাজ করার পর অন্য কোনো ক্যারেক্টার করতে গিয়ে আগের ক্যারেক্টারের কোনো বৈশিষ্ট্য চলে আসে কি? আসলে সেটা কীভাবে ম্যানেজ করেন?
বাঁধন : কোনো ক্যারেক্টারে কাজ করার পর সবচাইতে আমি এফেক্টেড ছিলাম রেহানা নিয়ে। রিহার্সাল করেছি দেড় বছর। শ্যুটের পর প্রায় তিন-চার মাস আমি রেহানার কস্টিউম পড়ে ঘুরতাম। মানে আমাকে এইটা এমনভাবে এফেক্ট করেছিলো! রেহানাকে আমি বহুদিন বয়ে বেরিয়েছি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এবং নিজের চেষ্টায় আমি প্রত্যেকটা চরিত্রকে সচেতনভাবে আলাদা করতে চেয়েছি। ওই জায়গাটা আমি শিখেছি, কীভাবে একটা চরিত্র থেকে আরেকটা চরিত্রকে আলাদা করবো। এটার একটা মূলমন্ত্র হচ্ছে, যে চরিত্রটা আমি ধারণ করবো সেই চরিত্রকে আমি জাজ করবো না; সেই চরিত্রকে আমি আমার সঙ্গে মেলাবো না; এবং আমার অন্য কোনো চরিত্রের সঙ্গেও মেলাবো না। এইটা আল্টিমেটলি খুব কাজ করে। আমি চেষ্টা করেছি—আপনারা ভালো বলতে পারবেন—রেহানা পরবর্তী যে কাজগুলো করেছি, সেখানে প্রত্যেকটা চরিত্র প্রত্যেকটা থেকে আলাদা। কেউ বলতে পারবে না, বাঁধনের এই চরিত্রটা তো ওটার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
যতীন, শিক্ষার্থী, ফারসি বিভাগ : একজন করপোরেট নারীর অধিকারের আন্দোলন এবং একজন গৃহকর্মী, গার্মেন্টকর্মীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কীভাবে সমন্বয় করা সম্ভব?
বাঁধন : আসলে আমরা তো বেসিক অধিকার থেকেই বঞ্চিত। আমি কয়েকদিন আগেও একটা জায়গায় এটা নিয়ে আলাপ করছিলাম। নারীদের বেসিক যে অধিকার সেগুলোতে আমরা সবাই বঞ্চিত—করপোরেট লেডি, গার্মেন্টকর্মী এবং আমার বাসার যে সাহায্যকারী সেও। বেসিকগুলো যদি ঠিক হয়ে যেতো কোনোভাবে—রাষ্ট্রপক্ষ থেকে যদি এগুলো নিয়ে কোনো রকমের চেষ্টা থাকতো! এগুলো সমাধানের পর হয়তো আমরা বাকি বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারতাম।
যেখানে একেবারেই বেসিক অধিকার থেকে আমরা বঞ্চিত, সেখানে বাকিগুলো নিয়ে খুব একটা তো চিন্তা করা যায় না। আমার কাছে মনে হয়, আল্টিমেটলি সবার একই অবস্থা—সে যে অবস্থানেই থাকুক না কেনো। আমি একটা জায়গায় খুব বেশি ফোকাস করতে চাই—বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন। মানে ছেলে ও মেয়ে যেনো সমান অধিকার পায়, সেটা যাতে য়েনসিওর করা হয়। আমার কাছে মনে হয়, এটা য়েনসিওর করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তারপরে অন্য সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারবো। আমরা বিভিন্ন সময়ে এগুলো নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে পারবো, কাজ করতে পারবো।
মো. আরিফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ : বাঁধন, আপনি একজন কিন্তু আপনার মধ্যে কয়টা সত্তা বাস করে?
বাঁধন : আমার মনে হয়, প্রত্যেক চরিত্রের কিছু না কিছু অংশ আমার মধ্যে থেকে যায়। এটা আমি ফিল করি। আমার মেয়ে এটা খুব বলে, তুমি একেক সময় তোমার একেক চরিত্রের মতো বিহেভ করো। আমার মনে হয়, এগুলো আমার জীবনে এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। আর এমনিতেও ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেকগুলো সত্তা আছে। আমি একেক সময়, একেক মানুষের কাছে, একেক পরিস্থিতিতে একেক রকম। সো, তখন তো সত্তা ডেফিনেটলি ডিফারেন্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্নগুলো খুব ভালো হচ্ছে।
সিনথিয়া ইসলাম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আমাদের সমাজে ডিভোর্সকে এখনো স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয় না। একজন নারী যখন ডিভোর্সের পর নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চায়, তখন মানসিক ও সামাজিকভাবে অনেক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। আপনার জায়গা থেকে বলবেন, একজন নারী কীভাবে এসব বাধা অতিক্রম করে নিজেকে মানসিকভাবে দৃঢ় ও সামাজিকভাবে পুনর্গঠিত করতে পারবে?
বাঁধন : আপনার হ্যান্ডরাইটিং সুন্দর! আমার হ্যান্ডরাইটিং খুবই খারাপ। ভালো হ্যান্ডরাইটিং দেখে আমি মুগ্ধ। আমাদের এখানে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া হয় না ডিভোর্সকে। আমার তো আবার একটা না, দুইটা ডিভোর্স! আমি তো এই ব্যাপারে খুবই সাফারার! ফার্স্ট ডিভোর্সের পর এক ধরনের সাফারিং ছিলো। সেকেন্ড ডিভোর্সের পর আরেক ধরনের সাফারিং। আমার কাছে মনে হয়, আমাদের সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন সবার আগে দরকার, দৃষ্টিভঙ্গি চেঞ্জ করা দরকার।
ডিভোর্স কিন্তু কারো জন্যই খুব একটা আনন্দের না। এটা খুবই পেইনফুল একটা অধ্যায়, যার জীবনেই হোক সেটা। ওই মানুষটা তো এমনিতেই ভালনারেবল থাকে। তাকে আরো ভালনারেবল করে দেয় পরিবার ও সমাজ। এই জায়গাটায় কাজ করতে হবে সবার আগে। পরিবারকে সাপোর্টিভ হতে হবে এবং সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে এবং সেই পরিবর্তনটায় আমার কাছে মনে হয় আমাদের নিজেদেরকেও অনেক সংশোধন করতে হবে।
ডিভোর্সের অভিজ্ঞতায় আমার কাছে মনে হয়েছে, আমার যারা পার্টনার ছিলেন, তারা জানেন না, কীভাবে বিহেভ করতে হয়। তারা খুবই ভিন্ডিক্টিভ ছিলো। মেয়েরাও কিন্তু এ রকম ভিন্ডিক্টিভ হয়ে যায়। এই ভিন্ডিক্টিভ হওয়া আসলে সলিউশন না। একজন আরেকজনের ওপর প্রতিশোধ নিবে বা প্রতিশোধ পরায়ণ হবে, এটা তো সমাধান না। এই জায়গাটাও কিন্তু বুঝতে হবে।
আমাদের এখানে দেখেছি, ডিভোর্সের পর একটা মেয়েকে বিভিন্নভাবে যেমন আক্রমণ করা হয়, আবার মেয়েরাও অনেক সময় বিভিন্নভাবে মিথ্যা কেস দিয়ে ছেলেদেরকে হ্যারাস করে। এগুলো থেকে আসলে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। পরিবর্তনগুলো তখনই সম্ভব হবে। আমার মনে হয়, তখন মেয়েদের জন্য এটা আরো সহজ হবে। এমনিতেই মেয়েরা সবকিছু মানিয়ে নেওয়ায়—আমার কাছে যতোখানি মনে হয়—অনেক বেশি ক্যাপেবল। কারণ যেই পরিমাণে বাধার মুখে বাংলাদেশের নারীরা টিকে আছে, তাদের সবাই একেকটা অ্যাওয়ার্ড ডিজার্ভ করে।
ফাহিম ফয়সাল, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি কি আপনার মেয়েকে ভবিষ্যতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে দেখতে চান?
বাঁধন : আমার মেয়েকে আমি একজন ভালো মানুষ হিসেবে দেখতে চাই। তারপরে সে যা হতে চায়, তাই হবে। এইটুকু স্বাধীনতা আমি আমার মেয়েকে দিতে চাই। এই স্বাধীনতাটা আমি পাই নাই। আমি যখন পাই নাই, তার মানে এইটা না যে, আমি আমার মেয়েকে সেটা দেবো না। এইটা আমি আমার মেয়ের ক্ষেত্রে য়েনসিওর করবো, আমি যা যা থেকে বঞ্চিত হয়েছি তা যেনো তার সঙ্গে না হয়। আমার মেয়েকে আমি স্বাধীনতা দিতে চাই, সে তার জীবনে যা হতে চায়, সে যাতে তাই হতে পারে [দর্শকের করতালি]।
তিয়াস, শিক্ষার্থী, ফার্মেসি বিভাগ : বাঁধন আপনি খুফিয়া সিনেমায় কাজ করেছেন। এই সিনেমায় আপনার জন্য রেখা ভারদ্বাজ [বিশাল ভারদ্বাজের স্ত্রী] গান গেয়েছেন। এই ওয়ান ইন আ লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স পেয়ে আপনার অনুভূতি কেমন? শুটিংয়ের সময় ওনার সঙ্গে কখনো কি আপনার দেখা হয়েছে? সবমিলিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
বাঁধন : অবশ্যই রেখা ভারদ্বাজের সঙ্গে দেখা হয়েছে। কারণ তিনি বিশাল ভারদ্বাজের টিমের একটা অংশ এবং অসম্ভব ভালো মনের মানুষ। ইভেন বিশাল ভারদ্বাজ—আমার সৌভাগ্য ওনাদের মতো মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি। আমি অনেক কিছু শিখেছি ওনাদের কাছ থেকে। সবচাইতে বেশি যেটা শিখেছি, মানুষ যতো বড়ো হয়, ততো তাকে নমনীয় হতে হয়। এটা আমি ওনাদের কাছ থেকে শিখেছি।
আমি যখন বিশাল ভারদ্বাজ, রেখা ভারদ্বাজ ও টাবু’র সঙ্গে মিট করি, তখন দেখেছি যে, ওনাদের জায়গা এতো উপরে অথচ ওনারা মাটির সঙ্গে মিশে থাকা মানুষ! তখন আমার মনে হয়েছে, আসলে আমরা অনেক কিছু জানি না। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে অনেকের এই সমস্যা আছে। আমরা যখন একটু ফেমাস হয়ে যাই, তখন আর মাটিতে আমাদের পা থাকতে চায় না। ওনাদের সঙ্গে কাজ করে এই জায়গাটায় আমার খুব ভালো একটা এক্সপেরিয়েন্স হয়েছে। আমি এই শিক্ষাটা ওনাদের থেকে নিয়ে এসেছি।
অজ্ঞাত দর্শক, [সরবরাহ করা কাগজে তিনি কেবল প্রশ্ন লিখেছেন] : ডিভোর্সের দায় কি শুধু পার্টনারের? আপনার কি কোনো দায় আছে?
বাঁধন : আপনি নাম লেখেন নাই কেনো? আপনি নাম লিখতে পারতেন। প্রশ্ন করতে পেরেছেন, নাম কেনো লিখতে পারেন নাই! যাইহোক, ডেফিনেটলি ডিভোর্সের জন্য একজনের দায়ভার থাকে না। সম্পর্কটা দুই সাইড থেকেই ওয়ার্ক করে না বলেই আল্টিমেটলি গিয়ে বিচ্ছেদটা ঘটে। সেখানে একটা মিউচুয়াল রেসপেক্ট থাকা উচিত বলে আমার কাছে মনে হয়। যেটা আগের একটা প্রশ্নের উত্তরেও বলেছি। আমাদের এখানে এর প্রচণ্ড অভাব আছে।
আমার যারা পার্টনার ছিলেন—আমার ফার্স্ট পার্টনার অ্যাবিউসার ছিলেন। সেকেন্ড পার্টনারও ছিলেন অ্যাবিউসার। এখন আপনি বলতে পারেন, দুইটাতেই তো আপনি তাদের দোষ দিচ্ছেন। আমারও দোষ ছিলো। আমি তাদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারি নাই। আমার দোষ হচ্ছে—স্যাক্রিফাইস করে তার সঙ্গে থেকে যাওয়া দরকার ছিলো—স্যাক্রিফাইসটা আমি করতে পারি নাই। এই ব্যর্থতা ডেফিনেটলি আমার।
মো. মমিনুল ইসলাম, সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সবক্ষেত্রে সংস্কার ও নয়া বন্দোবস্তের কথা বলা হয়েছে। সেই যাত্রায় গণমাধ্যম কিংবা চলচ্চিত্রের নয়া বন্দোবস্তের বিষয়ে আপনার অভিমত কী?
বাঁধন : আসলে এ ধরনের যাত্রা শুরু হয়েছে কি? আমার তো মনে হয় না, খুব একটা শুরু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম কিছু পরিবর্তন আনার। কিন্তু ওই রকম কোনো পরিবর্তন আমার চোখে পড়ছে না। কয়েকটা সাকসেসফুল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে বাংলাদেশে। এই ধরনের কিছু সাকসেস আমি মিডিয়াতে দেখতে পেয়েছি। এছাড়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়ন নিয়ে বা মিডিয়ার সংস্কার নিয়ে, খুব একটা কাজ শুরু হয়েছে বা হচ্ছে বলে আমার মনে হয় না।
সাদিকুল, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ : আপনার কথা শুনে যতোখানি বুঝলাম, আপনি জীবন নিয়ে নানা সমস্যার মধ্যে ছিলেন। এখন আপনি আপনার কাজ ও জীবনকে কতোটা ভালোবাসতে পারছেন?
বাঁধন : অনেক। এখন আমি জীবনকে অনেক ভালোবাসি। মনে হয়, এটা আমার লাইফের সবচাইতে বড়ো অ্যাচিভমেন্ট, আমি এখন নিজেকে ভালোবাসতে পারি। কিন্তু তারপরও আমার ডিপ্রেশন হয়। আমি ভেঙে পড়ি। আমার এখনো মেডিসিন খেতে হয়। সো, লাইফে কোনো কিছু পারফেক্ট হবে এ রকম না; কিন্তু নিজেকে ভালোবেসে যেতে হবে। এবং যে কাজটা আমরা করবো সেইটার প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা দুটোই থাকতে হবে।
জাবের, শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ার কারণে পরবর্তী সময়ে পেশা জীবনে কোনো প্রভাব পড়েছে কি না? সহকর্মীদের দ্বারা কখনো হেনস্তা বা খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কি না?
বাঁধন : অবশ্যই হয়েছি। সহকর্মীরা প্রচণ্ডভাবে আমাকে আক্রমণ করেছে, হেয় ও অপমান-অপদস্ত করেছে। এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেটা নিয়ে তাদেরকে আমার কিছু বলার নাই। আর পেশাগত জীবনে অবশ্যই প্রভাব পড়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর। কারণ আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ কমে গেছে। আর আমি যে ধরনের কাজ চুজ করি, সেই কাজগুলো তো এমনিতেই কম হয়। অনেক কষ্ট করে আমি কিছু প্রডিউসার জোগাড় করেছিলাম, যারা আমার কাজগুলোকে প্রডিউস করবে। কিন্তু আনফরচুনেটলি তারা সবাই আওয়ামী লীগের লোক ছিলো! তারা এখন আমাকে জাস্ট কাট অফ করে দিয়েছে। এখন আমাকে আবার নতুন মানুষ খুঁজতে হবে—যারা আসলে আমার সিনেমা, আমি যে ধরনের কাজ করতে চাই, যে কাজগুলো সিলেক্ট করি, সেগুলো যাতে তারাও বোঝে। কারণ এইটা বোঝার ক্ষমতা সবার নাই। সবাই এই সিনেমাগুলোতে টাকা ইনভেস্ট করবে না। কারণ সবাই আসে এখানে টাকা বানাতে। সো, ওই জায়গা থেকে তারা আমাকে অনেক সাপোর্ট করেছিলো। কিন্তু আল্টিমেটলি তারা এখন আর আমার সঙ্গে নাই আরকি!
আতিকুর রহমান, শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ : আপনার কাছে জীবনের অর্থ কী, একটু বলবেন?
বাঁধন : এই প্রশ্নটা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমি সুইসাইডাল ছিলাম। একটা সময় আমার কাছে বেঁচে থাকার গুরুত্বটাই অনেক বেশি ছিলো!
প্রজ্ঞা লাবণী অনন্যা, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : মেয়ে হিসেবে আপনার কী ধরনের পরামর্শ থাকবে আমাদের প্রতি?
বাঁধন : মেয়ে হতে না চেয়ে, মানুষ হতে চাইতে হবে—এটা সবার আগে। আমাদের পরিবার, সমাজকে আসলে ওই জায়গায় নিয়ে যেতে হবে—আমরা যখন বাসায় একটা ছেলে ও মেয়েকে বড়ো করছি, তখন যাতে কোনো ভেদাভেদ না করি। ওই জায়গা থেকেই তো সবকিছুর শুরু হয়। সো, এই জায়গাটা যাতে আমরা য়েনসিওর করতে পারি।
উর্বি, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপু আপনার কথাগুলো ভীষণ ইন্সপায়ারিং। আমাদের সমাজে মেয়েদের ভালো মেয়ে হয়েই থাকতে হবে। বাইরের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করার চেয়ে বাড়ির মানুষের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা অনেক বেশি কঠিন। বিষয়টা অনেকটা বনে থেকে বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করার মতোই। এ বিষয়টা কীভাবে ডিল করা যেতে পারে?
বাঁধন : নাইস প্রশ্ন! এটা শুধু তোমার একার প্রশ্ন না। এটা এখানকার প্রত্যেকটা মেয়ের প্রশ্ন। বিকজ সবচাইতে বড়ো ফাইটটা আমাকেও বাবা-মার সঙ্গে করতে হয়। কারণ ওদের থট প্রসেস পুরো ৩৬০ ডিগ্রি ডিফারেন্ট আমার থেকে। মানে আমি একদম আলাদা মেরু, ওরা আলাদা মেরু। ওদের সঙ্গে ফাইট করে বেঁচে থাকাটা খুব ডিফিকাল্ট। এবং আমার সুইসাইডাল হওয়ার অন্যতম কারণ ছিলো এইটা যে, আমি আমার বাবা-মাকে বোঝাতে পারছিলাম না আমার কষ্টটা। আসলে বাবা-মারও অনেক দায়িত্ব আছে। আমি যখন প্যারেন্টস, সন্তানের প্রতি তো আমার দায়িত্ব থাকবে। আমার মনে হয়, সেই জায়গাটা আমাদের প্র্যাকটিস করা উচিত। একটা জিনিস আমি শিখেছি জীবন থেকে; সেটা হচ্ছে, আগে আব্বু-আম্মুর সঙ্গে অনেক রাগ করতাম; অনেক জিদ করতাম, অনেক চিৎকার করতাম—অনেস্টলি বলছি। কিন্তু ৪০ বছর বয়স হওয়ার পর আমি রিয়ালাইজ করলাম, আসলে এইটা করে এনার্জি নষ্ট করছি। এখন আর আমি চিৎকার চেঁচামেচি করি না। আল্টিমেটলি গিয়ে তাদের সঙ্গে কনভার্সেশন করি, কথা বলি।
আমি তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করি এবং তারা যদি না বোঝে, তাহলে আমি আমার মতো থাকি; যেহেতু আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট। সো, মেয়েদের সবার আগে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। যখন আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট, আমার বাবা-মার তো আমাকে আর আটকানোর কোনো ওয়ে নাই। তারা আর কী বলবে? মানে বলতে পারবে যে, তুমি বাসা থেকে চলে যাও। এইটুকু ছাড়া তো তাদের আর বলার কিছু নাই।
বাবা-মা আবার অতো খারাপও হয়ে যায় না। আল্টিমেটলি আমরা একটা সাম্য অবস্থায় আসার মধ্যে আছি আরকি।
প্রশ্নকর্তার নাম পাওয়া যায়নি : আপনার কাছে অভিনয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ কী?
বাঁধন : এটা তো কঠিন প্রশ্ন। আমার কাছে অভিনয় মানে চরিত্রের সঙ্গে মিশে যাওয়া। যে চরিত্রটাকে আমরা ধারণ করছি সেটার প্রতি ইমপ্যাথেটিক হওয়া, ভালোবাসা, সেটাকে ফিল করা এবং সেটা হয়ে পর্দায় ফুটে ওঠা—এমনটাই আমার কাছে মনে হয়।
মাহমুদুল হাসান, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আমাদের এখানে নারী আইডেন্টিটি কেবল নারী আইডেন্টিটি-ই নয়। এর সঙ্গে বাঙালি মুসলমান নারীর আইডেন্টিটি জড়িত। রেহানা মরিয়ম নূর করতে গিয়ে আপনার ভাবনাগুলো কীভাবে কাজ করেছে?
বাঁধন : ডেফিনেটলি আমি এইটাতে আমার ডিরেক্টরকে ক্রেডিট দিবো। বিকজ ও এই ক্যারেক্টার নিয়ে অনেক অ্যানালিসিস করেছে। আল্টিমেটলি ওর মতো করে এই চরিত্রটাকে পোর্ট্রে করেছে। সেখানে আমারও কিছু ইনপুট ছিলো। যেহেতু আমিও একজন নারী, মানে মুসলমান নারী আরকি! সো, সেই জায়গা থেকে আমরা দুইজন মিলেই কাজটা অন স্ক্রিন পোর্ট্রে করার চেষ্টা করেছি।
শিখর রায়, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনার তো নিজস্ব ফ্যান-ফলোয়ার আছে। তারা আপনার কাজ দেখে। কিন্তু এর বাইরে অনেকে বিরূপ সমালোচনাও করে। এমনকি সাইবার বুলিংও করে। আমার প্রশ্ন, আপনার কাজ কি শুধু ফ্যানদের জন্য, নাকি আপনার কাজ নিয়ে যাদের অস্বস্তি হয় তাদের জন্যও?
বাঁধন : আমার কাজ আসলে যাদের অস্বস্তি হয় তাদের জন্যও। শুধু কাজ না, আমার কথাও। আমাকে ওইদিন একজন বলছে, একজন নাকি আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে, বাঁধন কেমন? তখন ওই লোক নাকি দুইটা কথা বলেছে। তার মধ্যে একটা হলো, ও তো একটা নাগিন! ও নায়িকা কিন্তু নায়িকার মতো অ্যাক্ট করে না।
এখন আমি নায়িকার মতো অ্যাক্ট করবো, না কীসের মতো করবো, এটা তো আমার ইচ্ছা। এটা কেউ ডিসাইড করে দিবে না। আমি আসলে আমার কাজ, কথা, অভিনয়—সবকিছু—যারা আমার এগুলোতে অস্বস্তি ফিল করে তাদের জন্য করি। যাতে তারা অস্বস্তিটা আরো বেশি করে ফিল করে।
অনিক ইসলাম, সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ : আপনি স্পেসিফিকালি কোনো একটা স্ক্রিন প্লেতে অভিনয়শিল্পী হিসেবে কী খোঁজেন?
বাঁধন : আমি আসলে প্রথম দেখি ডিরেক্টর। এটা আমার জন্য খুব ইম্পরট্যান্ট। একজন ভালো ডিরেক্টরের কাজ করার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা এটা ভীষণভাবে আমার ভেতরে কাজ করে। তারপর আমি চরিত্রটা দেখার চেষ্টা করি। ওই চরিত্র আসলে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজে কতোটুকু ইম্প্যাক্টফুল। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, এই পুরো গল্পটা কতোটুকু ইম্প্যাক্টফুল সোসাইটির জন্য। এটা এখন আমার দেখার বিষয়, অবশ্য আগে দেখতাম না। আগে সব কাজই করতাম। কিন্তু এখন চেষ্টা করি, কোনো কিছু ফোকাস আছে কিনা তা দেখে স্ক্রিপ্ট সিলেক্ট করার। এখন বোধহয় আমি সেটা পারিও।
সাবাহ, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : শুধু নারী হওয়ার কারণে আপনি কি কখনো চলচ্চিত্র জগতে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন? হলে সেটা কেমন, আর সেটা কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
বাঁধন: নারী হওয়ার জন্য প্রতি পদক্ষেপে প্রত্যেক নারীকেই বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে সোসাইটিতে। মিডিয়া এর বাইরে নয়। প্রথমত, অভিনয় করার মতো আমাদের চরিত্রই নাই। তারপরে যদি দেখে সেই মেয়ের মানে নারীর বয়স ৩০-এর উপরে, তাহলে তো আর কোনো কথাই নাই—মরে যাওয়ার টাইম হচ্ছে, বাসায় গিয়ে আল্লাহবিল্লাহ করো। মানে তোমার জন্য চরিত্র সৃষ্টির টাইম আমাদের নাই! এই সাফার তো আমরা করেই যাচ্ছি। বিপরীতে আমাদের যারা ছেলে কো-অ্যাক্টর আছেন, তারা ৬০ বছর বয়সেও সমানে কাজ করে যাচ্ছে, হিরোর রোলও করছে! কিন্তু যখন একজন নারী ক্যারেক্টার দেওয়ার কথা আসবে, তখন তাকে আর সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার দিবে না। এই বৈষম্য তো প্রচণ্ডভাবে আছে।
তারপরে কাজের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এনভায়রনমেন্টের সেফটি, সিকিউরিটির একটা ব্যাপার আছে। ছেলেরা তো ওই ধরনের ঝামেলার মধ্যে পড়ছে না। যেটার মধ্য দিয়ে আমরা যাই। আরো নানা রকমের বৈষম্য আছে। নারী হওয়ার জন্য প্রতিটা পদক্ষেপে আমাদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়।
শেখ আহমেদ আহসান, শিক্ষাথী, গণযোগাযোগ বিভাগ : নায়িকা বাঁধন আর অভিনয়শিল্পী বাঁধন সম্পর্কে একটু ব্যাখ্যা দিবেন।
বাঁধন : আমি তো বললামই, প্রথমে আমি লাক্স সুন্দরী বাঁধন ছিলাম; সাবান সুন্দরী ছিলাম। সাবান সুন্দরী থেকে আমি নায়িকা বাঁধন হয়েছি। নায়িকা বাঁধন মানে হচ্ছে সেই বাঁধন, যে আসলে গ্ল্যামারাস অভিনয় করেছে, টুকটাক কাজ করেছে, বিজ্ঞাপন করেছে, কিছুটা পরিচিতি পেয়েছে। সে তার কাজটা কেনো করছে, জানে না—এইমলেস, গোললেস একটা মানুষ—ওই মেয়েটাই নায়িকা বাঁধন ছিলো। কিন্তু আল্টিমেটলি রেহানা মরিয়াম নূর-এর থ্রুতে আমি নিজেকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে আবিষ্কার করেছি। তারপরের কাজগুলোতে আসলে চেষ্টা করেছি আমার জায়গাটা ঠিক রাখতে। আমার মনে হয়, ওই সময়ের বাঁধন আর রেহানার পরবর্তী সময়ের বাঁধনকে যখন আপনারা দেখবেন, এই উত্তরটা পেয়ে যাবেন।
প্রশ্নকর্তার নাম পাওয়া যায়নি : যে প্রোডাকশনে অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনার ইম্প্রোভাইজেশনের জায়গা কতোটুকু থাকে বা আদৌ থাকে কি না?
বাঁধন : থাকে। রেহানা মরিয়ম নূর-এও আমাকে আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ সাদ ছাড় দিয়েছে স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের সময়। এ রকম না যে, স্ক্রিপ্ট ফাইনাল হয়ে গেছে, পরে আমরা আর ওখানে কিছু করি নাই। স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ের সময় আমরা অনেকবার বলেছি, কোন ডায়ালগ কীভাবে বললে ভালো লাগছে, বা কোনো একটা সিচুয়েশন—যেহেতু আমার বাচ্চা আছে, চরিত্রেও মেয়ে সন্তান ছিলো—রেহানা মরিয়াম নূর-এ অনেক কিছু রিলেট করেছি। যেগুলো আমি সেসময় ইনপুট দিয়েছিলাম সাদকে, সেটা সে গ্রহণ করেছে। এটা খুফিয়ার ক্ষেত্রেও হয়েছে। সৃজিত-এর সঙ্গে কাজের সময় মুসকানের ক্ষেত্রেও হয়েছে। এখন অভিনয়শিল্পী হিসেবে যে জায়গায় আমি আছি, সেখানে ইনপুটটা আমি দিতে পারি।
আরেকটা বিষয় হচ্ছে, সবাই আল্টিমেটলি ডিরেক্টর হতে চায়। আমি তো আমার গল্পটা বলতে চাই। আমার গল্পগুলো কেউ বলে দিচ্ছে না। আমার গল্পটা কে বলবে? ডিরেকশন দিলে অ্যাট লিস্ট আমি আমার গল্পগুলো বলতে পারবো। আমি প্রথমে আসলে স্ক্রিনপ্লে লিখতে চাই। আমার ইচ্ছা আছে, আমি স্ক্রিপ্ট লিখবো, তারপরে হয়তো আমি ডিরেকশনের কথা চিন্তা করবো অনেক বছর পর। স্ক্রিনপ্লে লেখা আমার অনেক আগের ইচ্ছা; কারণ আমি আমার গল্পগুলো বলতে চাই।
প্রিয়, শিক্ষার্থী, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ : মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতাকে নরমালাইজ করার জন্য কী কী ঘাটতি মোকাবিলা ও উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন বলে মনে করেন?
বাঁধন : প্রথমত, এটা নিয়ে কথা বলতে হবে। এটা যে লজ্জার বিষয় না, বা এটা যে লুকানোর বিষয় না, এইটা নিয়ে প্রচুর কথা বলতে হবে। আমরা একটা ডিজিজ হয়েছে, একটা অসুবিধা হচ্ছে, এই কথাটা আমি কাউকে বলতে পারছি না। মানসিক সমস্যার মূল জায়গা হলো, আমি কথাটা কাউকে বলতে পারি না। এমনি বলতে পারছি না, তার মধ্যে যদি সোসাইটির চাপ থাকে, পরিবারের চাপ থাকে, তাহলে আমি আর এটা নিয়ে কথাই বলতে পারবো না। তাহলে তো হলো না। সো, পরিবারেও এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা হতে হবে। সামাজিকভাবেও আমাদের এই ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এবং এটা যে লজ্জার বিষয় না, সেটা নিয়ে সচেতন হতে হবে।
সাকিব মল্লিক, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি যেমনটি বললেন, মানুষ হিসেবে বাঁচতে চান এই সমাজে। আপনি আসলে নারীর জন্য এবং নারী-পুরুষের উভয়ের জন্য কেমন সমাজ চান? এবং বর্তমান সমাজের কোন কোন দিকগুলো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য আপনি বাধা মনে করছেন?
বাঁধন : আপনারা যে আমার কথাগুলো এতো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, এতে আমি খুবই মুগ্ধ। আপনারা কথা শুনে প্রশ্ন করেছেন; নিজে থেকে কোনো কিছু প্রশ্ন করেন নাই। আসলে আমি এমন একটা সমাজব্যবস্থা চাই, যেখানে সামাজিকভাবে, আর্থিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে—নারী-পুরুষের, শুধু নারী-পুরুষ না, অন্যান্য লিঙ্গের যারা আছেন—সবাই তার অধিকার এবং স্বাধীনতা বুঝে পাবে। আমি এ রকম একটা সমাজ দেখতে চাই, যেখানে সাম্য থাকবে, যেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। যেখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র সব নির্বিশেষে সবাই আসলে তার মতো করে বেঁচে থাকতে পারবে, এবং সে তার নাগরিক অধিকারটা পাবে।
আর এখন আমাদের সমাজে যে বাধাগুলো আছে, তার মধ্যে আমার কাছে সবচাইতে বড়ো যে বাধাটা মনে হয়, উত্তরাধিকার। আইনে ছেলেমেয়ের সমান অধিকারটা যদি এনসিওর করা যেতো—আসলে আমার লাইফ দিয়ে আমি এই অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি—অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেতো।
সোহাগ আব্দুল্লাহ, সাবেক শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : আপনি পড়ালেখা করেছেন মেডিকেলে, কাজ করছেন চলচ্চিত্রে। আপনি যে ধরনের গল্পে অভিনয় করছেন, সেখানে কি কখনো মনে হয়েছে চলচ্চিত্র ব্যাকগ্রাউন্ড কিংবা মিডিয়ায় পড়ালেখা করার দরকার ছিলো এ ধরনের প্রফেশনে নিজেকে হাজিরের জন্য?
বাঁধন : এটা আসলে আমার কখনো মনে হয় নাই। কারণ আল্টিমেটলি আমি যখন অভিনয়টা করতে শুরু করেছি বা অভিনয়কে ভালোবাসতে শুরু করেছি, তখন আমি রিয়ালাইজ করেছি, এটা আসলে সময়ের সঙ্গে শেখার একটা বিষয়। ডেফিনেটলি আমার যদি অভিনয়ের প্রশিক্ষণ থাকতো, যদি থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতো, সেটা হয়তো আমার জন্য পজিটিভ হতো। কিন্তু সেটা না থাকাতে যে আমার খুব একটা অসুবিধা হয়েছে এ রকমও না।
লিমা মণ্ডল, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ : প্রাত্যহিক জীবনে আমরা নানা রকম রোল প্লে করতে থাকি। আমাদের চলচ্চিত্রগুলো কি সেই রোলগুলো প্লে করতে পারছে, বা আমাদের গল্প কতোটুকু বলতে পারছে?
বাঁধন : যে গল্পগুলো আমাদের, যে চলচ্চিত্রগুলো আমাদের গল্প বলে, সেই চলচ্চিত্র মানুষ দেখতে জানে না। এটা হচ্ছে সমস্যা। আমি এটা অনেক অবজার্ভ করেছি। মানে এটা নিয়ে অ্যানালিসিস করেছি, আসলে কী সিনেমা মানুষ দেখতে চায়? মানুষ আল্টিমেটলি শুধু এন্টারটেইনমেন্ট চায়। ও চায় পপকন খাবে, একটা সিনেমা দেখবে, হাসাহাসি করবে, চলে যাবে। আকাশ থেকে লাফ দিয়ে পড়তেছে, এসে একটা কিক করতেছে, ওইটা দেখে হাততালি দিচ্ছে, ওইগুলো দেখে তাদের মজা লাগতেছে বা একটা আইটেম গান হচ্ছে।
ওরা মনে করতেছে ভাই, লাইফে এতো স্ট্রেস, আবার অন স্ক্রিন মানে স্ক্রিনে তা দেখার এতো কষ্ট আমরা করতে পারবো না। কারণ রেহানা মরিয়ম নূর দেখার পর সিনেমাহল থেকে বের হয়ে প্রত্যকেটা মানুষ সাফকেটেড হয়ে গেছে। অনেকে বলছে, বমি চলে আসছে। এ রকম সিনেমা দেখার জন্য তো আমরা মেন্টালি প্রস্তুত না। সো, আমাদের জীবনভিত্তিক যে সিনেমাগুলো তৈরি হচ্ছে, সেগুলো আসলে মানুষ দেখে না। সেগুলো দেখার অভ্যাসটাও তৈরি করতে হবে। আমার মনে হয় সেটা তৈরি হচ্ছে। এখন কিন্তু বেশ ভালো ভালো কিছু কাজ হচ্ছে। আমি রিসেন্ট যে কয়টা সিনেমা দেখেছি, তার মধ্যে সাবা আমার খুব ভালো লেগেছে। আপনারা দেখতে পারেন। ভীষণ ভালো একটা কাজ!
নীল, সাবেক শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ : নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত অভিনয়টা কি চালিয়ে যেতে চান? চিকিৎসা পেশা কি জারি আছে?
বাঁধন: চিকিৎসা পেশা আসলে জারি নাই। কারণ যেটা হয়েছে, আমি মেডিকেলে যখন ইন্টার্নশিপ শেষ করেছি, তখনই আমার বাচ্চা হয়ে যায়। আমার আর সুযোগ হয়নি প্র্যাকটিস করার। ডেন্টাল হচ্ছে পুরো হাতের কাজ। যে যতো কাজ করবে, সে আসলে ততো ভালো করতে পারবে। এখানে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার ব্যাপারও আছে। এই পেশা নিয়ে আমি আর ভাবি নাই; আবার এমনও হতে পারে শেষ বয়সে মে বি একটা চেম্বার দিতেও পারি।
আর অভিনয়টা চালিয়ে যেতে চাই। কিন্তু আমার অভিনয় করার সুযোগটাও তো থাকতে হবে। আমাদের এখানে তো সেই সুযোগটা নাই। সেই সুযোগটা যদি কেউ আমাকে করে দেয়, ডেফিনেটলি আমি অভিনয় করে যেতে চাই।
ফাহিমা খানম, অর্থনীতি বিভাগ : ডু ইউ লাভ ইউরসেলফ?
বাঁধন : ডেফিনেটলি আমি আমাকে অনেক ভালোবাসি।
কাজী মামুন হায়দার, সম্পাদক, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ : আমরা প্রশ্ন নেওয়া শেষ করছি। কিছু রিপিটেশন কোয়েশ্চেন ছিলো। ওগুলো আর নেওয়া হচ্ছে না। আমাদের শিক্ষক আ-আল মামুন এখানে আছেন। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র সমালোচক ও গবেষক। তাকে অনুরোধ করছি কিছু কথা বলার জন্য। আসছেন আ-আল মামুন।
আ-আল মামুন : আমি এজন্য ধন্যবাদ জানাই যে, বাঁধন এখানে এসেছেন। এবং এসে হয়তো দেখতে পেলন যে, আমাদের স্টুডেন্টদের কী পরিমাণ আগ্রহ ভিজ্যুয়াল প্র্যাকটিস ও ভিজ্যুয়াল লার্নিং নিয়ে। ফেমিনিস্ট পয়েন্ট অব ভিউ থেকে নারী প্রশ্নটাকে ফেমিনিস্টরা একভাবে ভাবতে পারে, অন্যরা নানাভাবে ভাবতে পারে। নারী প্রশ্ন একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমি দেখলাম যতোগুলো প্রশ্ন এসেছে, তার মধ্যে অর্ধেক বোধ হয় নারী সংক্রান্ত প্রশ্ন। এটা খুবই এক্সাইটিং, আমার কাছে, একই সঙ্গে আনন্দেরও। আমি বাঁধনের বেশ কিছু অভিনয় দেখেছি, সর্বশেষ কমার্শিয়াল সিনেমা এশা মার্ডার : কর্মফলও দেখেছি।
ইন্টারেস্টিং হলো, এটার স্ক্রিপ্ট খুবই দুর্বল মনে হয়েছে। খুবই ঢিলেঢালা স্ক্রিপ্ট, আরো অনেক এডিট করার বিষয় ছিলো। এডিটিংয়েরও অনেক গ্যাপ আছে। স্টোরিটা খুব ভালো দাঁড়াতে পারতো, একটা পসিবিলিটি ছিলো আমার কাছে মনে হয়েছে। অবশ্য ‘গুটি’ খুবই ভালো লেগেছে! আর রেহানা মরিয়ম নূর-এর কথা তো বারবারই হচ্ছে। রেহানা মরিয়ম নূর-এর অন্য একটা পয়েন্ট অব ভিউ আছে, কিন্তু সেটা ইম্পরট্যান্ট না। এটা একটা অসাধারণ কাজ, নিশ্চিন্তে বলা যায়।
বাংলাদেশের সিনেমা কিংবা যেটা আমরা বলি অভিনয় ও চর্চার ক্ষেত্র—যেটা আমি লক্ষ করেছি, সেটা ছিলো একটা নকলনবিশ। যেটাকে বলা যায়, আমি মুম্বাইয়ের সিনেমা দেখছি, ওদের অভিনয় শিখেছি। কলকাতার নাটকের লোকজনের অভিনয় দেখেছি, ওই রকম অভিনয় শিখেছি। এবং যখন আমি স্ক্রিপ্ট তৈরি করছি, সেই স্ক্রিপ্টগুলো হয় ইউরোপের অথবা আমেরিকার অথবা ইন্ডিয়ার কোনো না কোনো স্ট্রাকচারের সঙ্গে মিলে। গত ১০ বছর আমি যেটা লক্ষ করি, আজমেরী হক বাঁধনদের কাজ কিংবা আরো বেশকিছু কাজ, যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করেছি—কাজী মামুন হায়দার আমার স্টুডেন্ট, আমরা একসঙ্গে কাজও করি, সিনেমা নিয়ে লিখিও মাঝে মাঝে—মনে হয়েছে ওই জেনারেশনের কাজ, যেখানে তারেক মাসুদের পরে আমরা কোনো ভালো মেকার পাই নাই!
তারেক মাসুদের যে ইমাজিনেশন এবং ইমেজ কনস্ট্রাকশনের স্টাইল ও ডিরেকশন—সিনেমা মাধ্যমটাই ডিরেক্টরের মাধ্যম—অভিনয়শিল্পীর এখানে কন্ট্রিবিউশন থাকে, কিন্তু ডিরেক্টর খুবই ইম্পরট্যান্ট। আমি দেখতে পেয়েছি পরের যে কাজ, আমাদের ফারুকীরা যেসব কাজ করেছে, ওই মানের ধারের কাছেও তারা যেতে পারে নাই। একটা রূপান্তর ঘটেছে হোল সোসাইটির মধ্যে; যেটা আমার ধারণা, টেলিভিশন মানে আমাদের যেটা আগের টেলিভিশন, আগের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি, সেটা যখন ভেঙে পড়লো, তারপরে ওটিটি আসা, মাল্টিপল প্লাটফর্মে দেখার সুযোগ তৈরি হলো—এর ফলে আমাদের শিল্পীরা, ফিল্মমেকাররা, স্টোরিটেলাররা নতুন ধরনের গল্প বলছে। ২০১২-১৩ সাল থেকে এটার শুরু। এবং ইমেজ কনস্ট্রাকশনের মধ্যে বোঝা যায়, স্টোরির ন্যারেটিভগুলো দেখলে বোঝা যায়—এটা নিয়ে আমরা একটা কাজে দাবি করেছি যে, কলকাতা ইজ ডাইং। কলকাতা আর নতুন কিছু দিতে পারছে না।
কলকাতার গল্পগুলো আপনি খেয়াল করবেন, সেগুলো কোনো না কোনোভাবে হয় গো ব্যাক টু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কিংবা ওখানে যে অভিনয় ছিলো, সেই অভিনয়ের রিক্রিয়েশন মানে কপির কপি। যেটাকে সিমুলাক্রা বলা যায়। বলিউড প্রথমে নকল করে তারপরে টলিউডে বানায়। এটার সিমুলেশন প্রথম হচ্ছে মুম্বাই, হলিউডের নকল করে। তারপরে টালিউডের নকল এবং এই নকলের মধ্যে ওরা আছে। ওই একই রকমের স্ট্রাকচার। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের যে কাজগুলো গত সাত-আট বছরে আমরা দেখতে পাচ্ছি—একটা চেষ্টা এখানে আছে, যেমন চেষ্টা দক্ষিণ ভারতেও আমরা দেখতে পাই—কিছু কিছু ভালো কাজ বেরিয়ে এসেছে। একই রকমভাবে বাংলাদেশে এই পসিবিলিটি তৈরি হয়েছে।
আমরা জানি যে, বাজেটও কিছু বেড়েছে এবং আমরা আশা করবো, সেই কন্টিনিউটিটা থাকবে। এবং বাংলাদেশ তার নিজস্ব সত্তা ও ভাষা নিয়ে দাঁড়াতে পারবে। আমাদের আজমেরী হক বাঁধনরা সেই উপলব্ধির জায়গায় এসেছেন, সেইজন্য তাদেরকে স্যালুট জানাতে হয়। উনি একটা কথা বললেন, সে কথাটা আমার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হলো। উনি যাত্রা করেছেন লাক্স সুন্দরী হিসেবে। দ্বিতীয় যাত্রা হচ্ছে নায়িকা। এবং সেই সময়ে উনি কিছুই ভাবছেন না, কারণ নায়িকাই তো একটা বিশাল ব্যাপার! সেই ভাব-ই তো আর মাটিতে পা পড়ে না!
কিন্তু পা তাকে ফেলতে হয়েছে সামহাউ। চক্র বা চক্রান্ত, পরিচালক সাদের চক্রান্ত। অভিনয় যে একটা কাজ এবং অভিনয় যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সোশাল ফাংশন, মানে পারফরমেন্স, পারফরমেটিভিটি, যেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—সেটা উনি উপলব্ধি করেছেন। আমার ধারণা, সেই উপলব্ধির একটা পরিণতি—ওই নায়িকা থাকলে মাটিতে যদি পা না পড়তো, তাহলে জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা বাঁধনকে পেতাম না। নিশ্চিতভাবে আমরা বাঁধনকে পেতাম না।
আর্টের যে কাজ, আর্টের যে এডুকেশন, সেই কাজটা কিন্তু ভেতর থেকে বদলানো। বাইরে না, ভেতরে এমনভাবে বদলে যাওয়া, এমনভাবে নিজেকে রূপান্তর করা, আমাকে দেখে আরো অনেক মানুষ রূপান্তর হয়ে যাবে। একটা সিনেমা সেই কাজটাই করতে চায়। একজন অভিনয়শিল্পী সেই কাজটাই করতে চায়। সে যখন পারফর্ম করবে, যারা ভিউয়ারস বা অডিয়েন্স তারা এসোসিয়েট করছে ইন এ ওয়ে, তারপর ওইটার ধাক্কা সে বহুদিন ধরে সামলাবে। হয়তো এক রাত, দুই রাত, বা চার রাত সে সামলাবে। বাঁধন যেমন বললন, যখন তিনি অভিনয় করেন, স্পেশালি রেহানা মরিয়ম নূর-এর কথা বললেন—তিন মাস তিনি কস্টিউম পড়ে ঘুরেছেন। ইমপ্যাক্টটা আসলে এইটা। ওই ইমপ্যাক্টটা যদি সিনেমার মধ্য দিয়ে অডিয়েন্সের মধ্যে আসে, দ্যাট ইজ ইম্পরট্যান্ট। আমাদের যেটা বড়ো সমস্যা, সিনেমা বলতে আমাদের শুরু থেকেই মারাত্মক ভুল ধারণা আছে, আমরা হলিউড, বলিউড, ঢালিউড এবং আমাদের যেসব পড়ানো হয় এগুলোকে আমরা সিনেমা ভাবি! আদতে এগুলো সিনেমা না।
সিনেমা ও উপন্যাস দুটোই মডার্ন ফর্ম। এই দুটো মডার্ন ফর্ম কেনো হাজির হলো এবং কীভাবে হাজির হলো? মডার্ন ফর্ম হিসেবে সিনেমা কীভাবে আমার সত্তাকে নির্মাণ করে? যেটাকে উপন্যাস এবং সিনেমা বলছি, এই গুরুত্ব যদি আমরা না বুঝি তাহলে বোধহয় ভুল করবো। আমাদের সমাজে এই গুরুত্বটা বোঝা দরকার। এই যে অভিনয়কে বুঝতে পারা, অভিনয়ে নিজেকে ওউন করা এবং সারাজীবন অভিনয় করতে চাওয়া, আমাদের সেসময় আসছে ভবিষ্যতে। আমরা আরো অপেক্ষা করবো ভালো ভালো কাজ পাওয়ার। ধন্যবাদ।
মামুন হায়দার: পুরো আলোচনা নিয়ে সবমিলে আপা যদি কোনো কিছু বলতে চান।
বাঁধন : আমি আসলে প্রথমে একটু নার্ভাস ও কনফিউজড ছিলাম, এখানে আসছি আদৌ কি নিয়ে কথা বলবো, তারপরে যারা শুনতে আসবে তারা আমার কথা বুঝবে কিনা, আমার সঙ্গে কমিউনিকেট করবে কিনা, ইন্টারেক্ট করবে কিনা। কিন্তু প্রমিস করে বলছি, আমার সুন্দর একটা সময় কাটলো; কারণ অডিয়েন্স এতো এঙ্গেজিং! আমি ভীষণ আনন্দিত এবং আমার ভীষণ ভালো লাগছে আপনাদের সঙ্গে এই সময়টা কাটিয়ে। আপনাদের জন্য একটা হাততালি [উপস্থিত দর্শকের হাততালি]। থ্যাংক ইউ, সবাই ভালো থাকবেন। এবং আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ।
মামুন হায়দার: আমরা একেবারে আয়োজনের শেষ পর্যায়ে চল এসেছি। আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ সবসময় চেষ্টা করছে পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে আমলে নিয়ে কাজ করতে। আমাদের গত কথামালায় এসেছিলেন রায়হান রাফী। আমরা কাজী হায়াৎ’কে এনেছি। রায়হান রাফীকে আমরা যেমন এনেছি, আজমেরী হক বাঁধনকেও এনেছি, শব্দের রিপন নাথকে, জয়ন্ত চট্টপাধ্যায়কেও এনেছি। আমরা আসলে টোটাল ইন্ডাস্ট্রিটাকে বুঝতে চাই।
আজমেরী হক বাঁধন নিঃসন্দেহে ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ। রেহানা মরিয়ম নূর নিয়ে অনেক কথা হলো। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘গুটি’। যদিও সেটা ওয়েব সিরিজ, বাংলাদেশে ওয়েব সিরিজকে একটু অন্যভাবে দেখা হয়। কিন্তু যে ক্যারেক্টার উনি সেখানে প্লে করেছেন—বাংলাদেশে এই ধরনের গল্প নিয়ে কোনো ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট হতে পারে, এটা ভাবাই কঠিন! উনি ওখানে একজন প্যাডলার ছিলেন; যিনি মাদক ক্যারি করেন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায়। এবং সেটা উনি কোনো সাধারণ উপায়ে করেন না—ওনার মলদারের মধ্যে সেই মাদক নেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটার মধ্যে তার হাঁটাচলা, তার জেসচার, আই এক্সপ্রেশন, বডির যে টোটাল মুভমেন্ট, এগুলো প্রত্যেকটা মেইনটেইন করতে হয়েছে। আপনারা যদি দেখেন, ‘চরকি’তে আছে এই কনটেন্টটা। কী অদ্ভুত ধরনের একটা খেলা আছে ওই পুরো সিরিজটার মধ্যে। আমার একেবারে ব্যক্তিগত অপিনিয়ন বললাম আসলে।
বাঁধন খুব ভালো করে বলেছেন, স্যারও রিপিট করলেন—এটা খুব ইম্পরট্যান্ট—একজন লাক্স ফটো সুন্দরী থেকে অভিনয়শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প। এটা তিনি হতে পেরেছেন কারণে আমার ধারণা বাংলাদেশে ওনার কাজের অভাব হবে না। উনি প্রত্যেক মাসে একটা করে সিনেমা, কনটেন্ট রিলিজ দিতে পারেন চাইলে। কিন্তু এটা হয়তো উনি দিচ্ছেন না। এর আগে অভিনয়শিল্পী রোকেয়া প্রাচী যখন এসেছিলেন উনিও বলেছিলেন, আমি চাইলে এটা পারি। উনি পুরো জীবনে সিনেমা করেছেন হাতেগোনা কয়েকটা। বাঁধন অভিনীত সিনেমা এখন দুইটা বা তিনটা। বাজারের সঙ্গে একজন শিল্পীকে এই চ্যালেঞ্জটা নিতে হয়, সে কারণে হয়তো মার্সিডিজটা হয় না!
এইটা খুব ইম্পরট্যান্ট। এই বিষয়টা কিন্তু শুধু শিল্পীর ক্ষেত্রে না। আপনি যে প্রফেশনেই যান, সেই প্রফেশনে এই চ্যালেঞ্জটা পাবেন। আপনি যদি সেই প্রফেশনটাকে ওউন করেন। এই টোটাল ব্যাপার নিয়ে আজকে বাঁধনকে কথা বলতে আমন্ত্রণ জানানোর পর মনে হচ্ছে, সিলেকশনটা ঠিকঠাক হয়েছে। বিশেষ করে এখানে উপস্থিতি নারীরা যেভাবে রেসপন্স করেছেন! এই রেসপন্সটা আমাদের দরকার। আপনারা শুধু এখানেই রেসপন্সটা করবেন না, সব জায়গাতেই করবেন। চিৎকার করে বলবেন, আপনি বলতে পারেন। আপনাকে বলতে হবে।
আপনারা যদি এটা না বলতে পারেন, যদি আটকে যান, তাহেল কিন্তু বের হতে পারবেন না। ইরানের মেয়েরা চিৎকার করে বলছে, তারা ওটা চায় না। ওই মুভমেন্টটা তারা ১৯৭৯ তে শাহের বিরুদ্ধে করেছিলো। কিন্তু সেই মুভমেন্টের ফল হিসেবে যখন তাদের ধোকা দেওয়া হয়েছে, তারপর তারা এবার সেটার বিরুদ্ধে কথা বলছে। আপনাদেরকেও কথা বলতে হবে। যদি না বলতে পারেন, আপনারা পিছিয়ে যাবেন।
অনেক ব্যস্ততার মধ্যে আজমেরী হক বাঁধন এখানে এসেছেন। আবার হয়তো কোনো একসময় আসবেন। আমরা ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ থেকে একটা ফিল্ম স্কুল করার চেষ্টা করছি, নিশ্চয় সেখানেও আসবেন। আপনারা সবাই সময় করে এসেছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন