Magic Lanthon

               

প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট

অন্যকে জানাতে পারেন:

‘ট্রেন ড্রিমস’

একাকিত্ব জীবনের নির্মম পরিণতি, নাকি অর্থ খোঁজা

একাকী এক জীবনের গল্প

ট্রেন ড্রিমস ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে মুক্তি পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ড্রামা চলচ্চিত্র। এটা নির্মাণ করেছেন ক্লিন্ট বেন্টলি। আমেরিকান লেখক ডেনিস জনসন-এর বিখ্যাত নভেলা অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। বেন্টলি এই চলচ্চিত্রে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিককার আমেরিকান এক শ্রমিকের জীবন ও একাকিত্বের মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেন। প্রোটাগনিস্ট রবার্ট গ্রেইনিয়ারকে কেন্দ্র করে গল্পটি এগিয়েছে। দিনমজুর রবার্ট কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের আইডোহোর বনাঞ্চলে রেললাইন ও ব্রিজ নির্মাণের। এতিম ও একাকিত্বে বেড়ে ওঠা রবার্ট একসময় স্ত্রী গ্ল্যাডিস ও শিশু কন্যাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন সুখী জীবনের। কিন্তু ভয়াবহ এক দাবানলে তাদের সাজানো সংসার ছাই হয়ে যায়; তিনি হারিয়ে ফেলেন দুই প্রিয়জনকে।

এরপর একাকী জীবনযাপন করতে থাকা রবার্ট খুঁজতে থাকেন জীবনের মানে ও উদ্দেশ্য। তিনি জীবনকে জানতে ও বুঝতে চান; কিন্ত শেষ পর্যন্ত রবার্ট আসমান কিংবা জমিন কিছুই অনুমান করতে পারেন না। এই আলোচনা এগিয়েছে রবার্টের জীবনের সেই গল্প নিয়ে।

ট্রেন ড্রিমস যা বলে

দিনমজুর রবার্টের দিন অতিবাহিত হয় নানা কাজে। কখনো বনে গাছ কেটে, কখনো বনের বুক চিরে রেললাইন বা সেতু তৈরির শ্রমিকের কাজ করে। আধুনিক অগ্রগতির প্রতীক রেললাইন তার হাত ধরেই প্রকৃতির বুক চিরে এসে প্রকৃতিকেই ধ্বংস করে। অথচ রবার্ট নিজেই প্রকৃতির শান্ত নীরবতাতে জীবন কাটাতে পছন্দ করেন!

একপর্যায়ে গ্ল্যাডিস’কে বিয়ে করেন রবার্ট। তাদের কোলে আসে কন্যাসন্তান কেট। তবে এক ভয়াবহ দাবানল নিমিষেই সব শেষ করে দেয়। বনের কোল ঘেঁষা বাড়ি ও পুরো পরিবার মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। জীবনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পর রবার্ট আর বিয়ে করেননি। বেছে নেন বনের ভেতর একাকী জীবন। খুব বেশি মানুষের সঙ্গেও তাকে মিশতে দেখা যায় না। নির্মাতা পুরো গল্পে তার এই একাকী হয়ে ওঠার জার্নিটা দেখিয়েছেন; মানুষের জীবন কতোটা ভঙ্গুর এবং গভীর শোক বুকে নিয়ে মানুষ কীভাবে বছরের পর বছর নিভৃতে বেঁচে থাকতে পারে!

পরিবার হারিয়ে রবার্ট বাস্তব আর স্বপ্নের ফারাক করতে পারেন না। প্রায়ই তিনি স্ত্রী-সন্তানকে স্বপ্নে দেখেন এবং বনের গভীরে তাদের উপস্থিতি টের পান। একপর্যায়ে তার কানে আসে এক পৌরাণিক উলফ গার্ল (Wolf-girl) এর আওয়াজ। রবার্ট যাকে অচেতনে মেয়ে কেট বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। নিঃসঙ্গ মানুষ কীভাবে স্মৃতি আর লোককথা দিয়ে নিজের ক্ষত উপশম করার চেষ্টা করেন, এ চলচ্চিত্রের গল্পে তা দারুণভাবে ফুটে ওঠে।

সাত দশকের জীবন অতিবাহিত করেন রবার্ট। ১৮৯০ থেকে ১৯৬০-এর দশকের এই দীর্ঘ সময়ে জগতের অনেক পরিবর্তন দেখতে পান তিনি; ঘোড়ার গাড়ি থেকে ট্রেন, যান্ত্রিক গাড়ি আর শেষ বয়সে উড়োজাহাজ উড়তে দেখেন। পৃথিবী যেনো চোখের পলকে বদলে যায়; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আলোয় কীভাবে যেনো হারিয়ে যায় পুরনো দিনগুলো। রবার্ট হয়ে ওঠেন ফেলে আসা অতীতের এক জীবন্ত সাক্ষী।

অস্তিত্বের শিকড় প্রকৃতির গভীরে

সভ্যতা যেনো মানুষকে ক্রমাগত একাকী করে চলেছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষ গড়েছে নিজস্ব অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও পারিবারিক ব্যবস্থা। মানুষ সেই নিজস্ব ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে/থাকছে। যেই ব্যবস্থায় মানুষ কেবল গুরুত্ব দিয়েছে/দিচ্ছে নিজেকেই। একদিকে মানুষ এই প্রাণের জগতের অংশ; অন্যদিকে অধিকারত্বে নিজেদের অন্যান্য প্রাণের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। এর ফলে বিশাল সংখ্যক মানুষ মনে করে, মানবপ্রাণ ও প্রকৃতি আলাদা কোনো কিছু। পরিস্থিতি কখনো এমন হয়ে ওঠে যে, মানুষ ভাবে তারা প্রকৃতিরই অংশ না! প্রকৃতিকে এমনভাবে ব্যবহার করে, যেনো প্রকৃতির সবকিছুই তাদের জন্য উন্মুক্ত। ফলে মানুষ কখনো কখনো মাদার নেচারকে উপেক্ষা করে নিজেদের সুবিধার্থে প্রকৃতির নিয়ম বা ব্যবস্থা বিঘ্নিত করে। প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের এই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ চেষ্টাও বলা যেতে পারে।

ফরাসি দার্শনিক ব্রুনো লাতুর বলেন, ইউরোপ শিল্পবিপ্লব ও তার পরের যে পৃথিবীটা তৈরি করেছে, সেই পৃথিবীতে ধরে নেওয়া হয় মানুষ আর প্রকৃতি আলাদা। এবং এর ফলে মানুষ এই পৃথিবীটাকে বস্তুর মতো দেখে। তাই মানুষ পৃথিবীর ওপর যা খুশি করবে। কিন্তু মানুষ তো প্রকৃতি থেকে আলাদা কোনো কিছু নয়, এরই অংশ। এর ফলে মানুষ কখনোই আধুনিক হতে পারেনি। এই জায়গায় দীপেশ চক্রবর্তীর যুক্তি হচ্ছে, আধুনিকতার দাবি ছিলো প্রকৃতি ও সমাজকে পুরোপুরি আলাদা রাখা। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, মানুষ যতো বেশি আধুনিক হওয়ার চেষ্টা করেছে, ততো বেশি প্রকৃতি ও প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সহাবস্থান ছিন্নের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তার পরিবর্তে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে আরো বেশি জড়িয়ে গেছে। যেহেতু মানুষ কখনোই এই দুই জগতকে আলাদা করতে পারেনি, তাই তারা কখনো আধুনিক বা প্রকৃতি থেকে আলাদা কিছু হয়ে উঠতে পারেনি। এর ফলে মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতিরই অংশ।

মানুষ সবকিছুর নিয়ন্ত্রক দাবি করলেও প্রকৃতির সবটাই নির্ধারিত হয় প্রকৃতির নিয়মেই। কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করলে তার ফলাফল পুরো মনুষ্য প্রজাতিকে ভোগ করতে হয়। মানবসৃষ্ট এই অচলাবস্থা বা বিপর্যয়ের জন্য আসলে দায়ী কে? শুধুই কী মানুষ? নাকি মানবসৃষ্ট এই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা? নৃবিজ্ঞানে Anthropocene বলে একটা সময়ের কথা বলা হয়, যেখানে মানুষের কর্মকাণ্ডকেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আর মানুষের এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে দায়ী করা হয় পুঁজির আগ্রাসী মনোভাবকে। যেখানে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মুনাফা ও ক্ষমতা।

অনেকে বলতে পারে মানুষ প্রকৃতিকে ব্যবহার করে, গাছ কাটে, জ্বালানি সংগ্রহ করেএগুলো তো প্রকৃতিরই অংশ! অথবা বলা যায়, এগুলোই তো মানুষের বৈশিষ্ট্য। তাহলে এই দায়ভার শুধু মানুষের কেনো? প্রকৃতির নয় কেনো! যে বা যারা এমনটি মনে করে, তাদের এটা মাথায় রাখতে হবে যে, তারা পুঁজির প্রাধান্যশীলতা থেকে বের হতে পারেনি। কেননা পুঁজি প্রাধান্যশীল সমাজ এ ধরনের চিন্তাকেই সমর্থন করে।

প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে মানুষ যেভাবে এগিয়ে চলছে তার প্রভাব পড়ছে পৃথিবীতে। ফলস্বরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পৃথিবীর লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। শিল্প, কল-কারখানা, যানবাহন থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড বা গ্রিন হাউজ গ্যাস পৃথিবীকে উষ্ণ করে তুলছে। সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, ফলে সমুদ্রে প্লাঙ্কটন মারা যাচ্ছে। প্লাঙ্কটন মারা যাওয়ায় কমছে অক্সিজেন সরবরাহ। এভাবে সর্বনাশ ডেকে আনছে মানুষ।

নিজের কৃতকর্মকে ‘প্রকৃতির অংশ' বলে মেনে নেওয়াই হলো পুঁজিবাদের বড়ো জয়। অথচ বিপরীতে এসব কিছুর ফলাফল হয় নিষ্ঠুর ও বেদনাতুর। তার বাস্তব প্রমাণ মেলে অসময়ে বন্যা, দাবানল ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে।

এ ধরনের এক বয়ানই লক্ষ করা যায় ট্রেন ড্রিমস-এ। রবার্ট শান্তি প্রিয় মানুষ। যিনি বন ও নদীর ধারে পরিবার নিয়ে আনন্দে জীবনযাপন করেন। কিন্তু তারা প্রকৃতির মধ্যে থাকলেও, যেনো প্রকৃতিকেই দূরে ঠেলে দেয়। চলচ্চিত্রের সাত মিনিটে দেখা যায়, রবার্ট তার স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে কাজের উদ্দেশে বনে যান। সেখানে তিনি ও অন্যান্য শ্রমিকরা বনের গাছ কাটছে; বনের ভেতর রেল লাইন নির্মাণ করছে। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার চরম নিষ্ঠুরতা ও বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটে যেনো এখানে। একদিকে রবার্ট প্রকৃতিতে শান্তি খুঁজে পান, অন্যদিকে সেই তাকেই নির্মমভাবে বনের গাছ কাটতে হয়! কী নির্মম বাস্তবতা! এর মাধ্যমেই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রাণ ও প্রকৃতির বন্ধন ছিন্ন হয়। এ কারণেই রবার্ট একসময় নিজেকে আলাদা মনে করতে শুরু করেন।

সমাজ থেকে রবার্টের এই বিচ্ছিন্নতা কেবল শারীরিকই নয়, মানসিকও। চলচ্চিত্রের শেষে দেখা যায়, রবার্ট যখন নিজের জীবন সম্পর্কে কিছুই অনুমান করতে পারেন না, তখন ন্যারেটরকে বলতে শোনা যায়, ‘as he misplaced all sense of up and down, he felt at last, connected to it all'। এভাবেই একদিন প্রকৃতির মাঝেই রবার্টের জীবনের অবসান ঘটে।

বাস্তবের ধর্ম ও ধর্মের বাস্তবতা 

পৃথিবীর সব ধর্মই শিক্ষা দেয় শান্তি, সাম্য ও পবিত্রতার। বলা হয় স্রষ্টার সৃষ্টি সব মানুষই সমান। কিন্ত কিছু মানুষ ধর্মকে ব্যবহার করে নিজ স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত, কেউবা ক্ষমতায় থাকতে, আবার কেউ নিজের অপরাধ ঢাকতে। নৈতিক মূল্যবোধকে মোরাল পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও লক্ষণীয়।

বৈশ্বিক বাস্তবতার দিকে তাকালে ধর্ম ও ধর্মীয় নানা প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের নেতিবাচক ও মানহানিকর অনেক খবর চোখে পড়ে। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে এমন একটা ঘটনা ঘটে। সেখানে সাত বছরের এক শিশু বলাৎকারের শিকার হয়। অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসার শিক্ষক নোমান আহাম্মেদ-এর বিরুদ্ধে। শিশুটির বাবার ভাষ্য, যখন তার ছেলে মাদ্রাসা থেকে বাসায় ফিরে আসে তখন সে জানায়, ওই মাদ্রাসায় আর পড়বে না। পরে ছেলের থেকে তিনি ঘটনার বিস্তারিত জানতে পারেন। এরপর অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশুটির বাবা মামলা করলে ওই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

এছাড়া শরীয়তপুরের জাজিরায়ও ২০২৬-এ এমন আরেকটি ঘটনা সামনে আসে। এই ঘটনায় মসজিদের ইমামের বিরুদ্ধে শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ ছয় বছরের শিক্ষার্থীকে কক্ষে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন অভিযুক্ত আবুল বাসার। বিষয়টি জানতে পেরে আশপাশের লোকজন তাকে আটক করে। পরে জাজিরা থানা পুলিশ তাকে হেফাজতে নেয়। একপর্যায়ে ইমামকে বলতে শোনা যায়, হয়তো শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তিনি এমনটা করেছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। সবচেয়ে বেশি এ প্রবণতা দেখা যায় রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের প্রার্থী হাফিজ উল্যাহ মন্তব্য করেন, তাদের প্রতীক দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত অবধারিত, না দিলে গুনাহ হবে। নিজ এলাকায় গণসংযোগের সময় দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ধর্মকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার ঘটনা কমবেশি সব ধর্ম ও দেশেই লক্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথেলিক চার্চের যাজক জন জিওগান-এর বিরুদ্ধে ২০০২ খ্রিস্টাব্দে ১৫০ জনকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এদিকে ভারতে হরহামেশাই শোনা যায় এই ধরনের খবর। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির দিকে ভারতের পুরোহিত ও তার শিষ্যের বিরুদ্ধে ২০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। একটু খোঁজখবর নিলে সব জায়গাতেই এ ধরনের ঘটনার বিবরণ পাওয়া যাবে।

এখানে ধর্মের নামে দুটি ঘটনা ঘটছে, প্রথমত, ধর্মীয় লেবাস ব্যবহার করে ভয়ঙ্কর সব অপরাধ হচ্ছে; দ্বিতীয়ত, সরাসরি ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই ব্যবহারকারীরা মুখে ন্যায়নীতির কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। ঠিক এই ধরনেরই এক চরিত্র ট্রেন ড্রিমস-এর ফ্রাঙ্ক। যার মুখে ধর্মের বাণী, কিন্তু কাজ তার বিপরীত।

চলচ্চিত্রের ২০ মিনিটে রবার্ট যখন কর্মস্থলে যান, তখন বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হন। এদেরই একজন ফ্রাঙ্ক; যার সঙ্গে রবার্টের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। দেখা হলেই ফ্রাঙ্ক বাইবেল নিয়ে ভালো ভালো সব কথা বলতেন। ফ্রাঙ্ক সবকিছু এতো আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতেন, মনে হয় `বাইবেল' যেনো তার সামনেই লেখা হয়েছে! ফ্রাঙ্ক চলচ্চিত্রের ২১ মিনিটে রবার্টের উদ্দেশে বলেন, ‘কখনো কখনো ঈশ্বর অদ্ভুত এক পন্থা খোঁজে তোমাকে বলার জন্য, যা তোমার শোনা দরকার'। আরো শোনা যায়, যখন ফ্রাঙ্ক নেব্রাস্কাতে ছিলেন তখন যীশু তাকে বলেছিলো ওমাহাতে যেতে, কিন্তু সে ভুল করে ওপিলাইকাতে এসেছেন।

এরই মধ্যে একজন তাদের কর্মস্থলে আসেন এবং ফ্রাঙ্কের খোঁজ করেন। এটা টের পেয়েই ফ্রাঙ্ক সটকে পড়ার চেষ্টা করেন। এরপর সেই লোকটি তাকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই লোকটির ভাষ্য, তার ভাইকে ফ্রাঙ্ক বর্ণবৈষম্যের কারণে হত্যা করেছেন। এবং তার পর থেকে নানা জায়গায় পালিয়ে থেকেছেন। এরপর লোকটি উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, কারো কোনো কথা থাকলে বলতে পারে, কেননা তিনি সারাজীবন ফ্রাঙ্কের মতো পালিয়ে থাকতে চান না।

আসলে ফ্রাঙ্ক ধর্মীয় লেবাস দিয়ে নিজের অপকর্মকে ঢাকার চেষ্টা করেছেন। আর এটা বুঝতে পেরে ফ্রাঙ্কের সম্পর্কে রবার্টের ধারণাই পাল্টে যায়। তিনি হতভম্ব হন! তবে ফ্রাঙ্কের হত্যার দৃশ্য দেখার পর রবার্টের ভেতরে যে অনুশোচনা ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে রবার্টকে কেবল কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়, যিনি সময়ের স্রোতে ভেসে চলেছেন। কিন্তু এই ঘটনার পর তিনি নিজের কাজ, ন্যায়-অন্যায় ও মানবিকতা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। ফ্রাঙ্কের হত্যার ঘটনায় তিনি বিচলিত হন এবং ট্রমাটাইজড হয়ে ভাবতে থাকেন, ওই সময় কী তার নিষ্ক্রিয় থাকা ঠিক ছিলো? কিংবা ফ্রাঙ্ককে যে হত্যা করা হলো, সেটাও কতোটা যৌক্তিক?

যে লোক ফ্রাঙ্ককে হত্যা করেন, তিনি যে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তীব্র আবেগী ছিলেন, এটা দর্শক বুঝতে পারে। অন্যদিকে এটাও বোঝা যায় যে, প্রতিশোধ মানুষকে শান্তি দেয় না। ভেতরের ক্ষত মুছে যায় না; বরং আরো শূন্যতা ও অস্থিরতা বাড়ে।

যে চক্রে জীবন জয়ী হয়

ট্রেন ড্রিমস-এর ন্যারেটিভ একটু ভালোভাবে খেয়াল করলে বোঝা যায়, এতে দুইটি পর্ব রয়েছে। প্রথম অংশ দাবানলে রবার্টের স্ত্রী-সন্তান নিহতের আগ পর্যন্ত; যেখানে দেখানো হয় রবার্ট, তার পরিবার, আশপাশে লোকজন ও সমাজকে। দ্বিতীয় অংশটি রবার্টের নিঃসঙ্গ জীবনের গল্প।

চলচ্চিত্রের ৫৫ মিনিটে দেখা যায়, পরিবার হারা রবার্ট আসলে বুঝে উঠতে পারছেন না বিশাল এই শোক কীভাবে কাটিয়ে উঠবেন। তিনি ভাবতে পারছিলেন না, আসলে তার জীবনের উদ্দেশ্যটাইবা কী! তিনি এমন এক জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন, যেনো তার জীবন থেকে সব আনন্দ হারিয়ে গেছে। তবে শোক বা আনন্দ তো জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। একটা না থাকলে আরেকটি অনুভব করা যায় না, বা অস্তিত্ব থাকে না।

ট্রেন ড্রিমস-এর এক ঘণ্টা ২২ মিনিটে রবার্ট নিজের ট্রাজেডি সম্পর্কে মিস থমসন নামে এক সরকারি কর্মকর্তাকে বললে থমসনও তখন তার স্বামী হারানোর কথা জানান। রবার্ট আরো জানান, স্ত্রী-সন্তান হারানোর পর তার কার্যকলাপ দেখে আশপাশের লোকজন তাকে পাগল বলতে থাকে। এর উত্তরে মিস থমসন বলেন, আপনি জীবনে অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, এটা অন্য কিছু হতে পারে কিন্তু পাগলামো না। মিস থমসনকে আরো বলতে শোনা যায়, এই বনকে দেখে মনে হয় না, এখানে কখনো আগুন লেগেছিলো। বনে সুস্থ গাছের যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি মরা গাছেরও আছে। আসলে এর মধ্য দিয়ে মিস থমসন হয়তো রূপকভাবেই বোঝাতে চেয়েছেন, সমাজে রবার্টের মতো লোকেরও প্রয়োজন আছে; হোক সে পাগল কিংবা চাপা স্বভাবের। এটা বলার মাধ্যমে রবার্টের অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেননা তিনি ওই পরিস্থিতি নিয়েই সমাজে অস্তিত্বশীল। এই অস্তিত্বটুকুই দিনশেষে সমাজে তার ভূমিকা। থমসনের এই কথাগুলো রবার্ট সেসময় বুঝতে না পারলেও জীবন সায়াহ্নে এসে ঠিকই বুঝতে পারেন যে, সময়ের সঙ্গে মানিয়ে, সমাজ বিচ্ছিন্ন না হয়ে মনুষ্য সমাজের অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার ছিলো। কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে!

এই বিষয়গুলো চলচ্চিত্রে দারুণ করে ফুটে ওঠে। শেষ সময়ে রবার্ট কিছুটা হলেও নিজেকে জানতে ও জীবনের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন। এ কারণেই হয়তো বৃদ্ধ বয়সে তিনি স্পোকেন শহরে মাঝেমধ্যেই যাতায়াত করতেন, মানুষের সঙ্গে মিশতেন ও মানুষকে দেখে নানা বিষয় বোঝার চেষ্টা করতেন। শেষে একবার প্লেনে ওঠার মধ্য দিয়ে রবার্ট যেনো জীবনের জয়োধ্বনি গান।

সময়ের সঙ্গে পৃথিবীর পরিবর্তন

রবার্টের ৭০ বছরের জীবনে পৃথিবী অনেকখানিই বদলে যায়। রেললাইন সম্প্রসারণ করে ট্রেন ড্রিমস-এ আমেরিকান বনগুলোকেও সভ্যতার অংশ করে তোলা হচ্ছিলো। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রবার্ট নিজেও বনের গাছ কাটেন, এবং তা দিয়ে রেললাইন তৈরি করেন। সময়ের ধারাবাহিকতায় রবার্ট একপর্যায়ে কুড়াল ছেড়ে সহশ্রমিকদের সঙ্গে চেনসও [গাছ কাটার উন্নত যন্ত্র] হাতে তুলে নেন। বন থেকে যখন তিনি শহরে যান, টেলিভিশনে তখন মহাকাশ জয়ের খবর দেখানো হয়। তিনি তার জীবনের শুরুর দিকে ঘোড়ার গাড়ি চালালেও শেষ সময়ে এসে একবারের জন্য হলেও প্লেনে ওঠেন। চলচ্চিত্রজুড়েই এমন পরিবর্তনের গল্প চলতে থাকে। ট্রেনের হুইসেলের মাধ্যমে এসব পরিবর্তনকে মোটিফ আকারে চলচ্চিত্রে হাজির করা হয়। যতোবার ট্রেনের এই হুইসেল বাজে, তার পরের দৃশ্যেই দেখা যায় সময় অনেকখানি এগিয়ে গেছে, পরিবর্তন হয়ে গেছে জীবনের কতোকিছুর।

ট্রেন ড্রিমস দর্শকের সামনে এ বার্তা নিয়ে হাজির হয় যে, সভ্যতা যতোই এগিয়ে যাক না কেনো, সেই অগ্রগতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি, বদলে যাওয়া জীবনধারা ও সময়ের নির্মম গতি। রবার্টের ব্যক্তিগত জীবন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন একসঙ্গে মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি দেখায় যে, প্রকৃতি স্থির নয়; এটা প্রতিনিয়ত মানুষকে নতুন বাস্তবতার দিকে ঠেলে দেয়।

লেখক : চৌহান মণ্ডল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

mondolchouhan02@gmail.com

https://www.facebook.com/chouhan.mondol.7


তথ্যসূত্র ও টীকা

১. উলফ গার্ল : মেক্সিকান ও আমেরিকান লোককথায় উলফ গার্লের গল্প আছে। লোককথা থেকে জানা যায়, ছোট্ট ওই মেয়েটি যখন বনের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখন তাকে একপাল নেকড়ে লালনপালন করে। মেক্সিকান ও আমেরিকান অনেক গল্পেই এই চরিত্রের কথা শোনা যায়।

২. চক্রবর্তী, দীপেশ (২০২২ : ৪৪); জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্তমান অতিমারি : মানুষের ইতিহাসের একটি সন্ধিক্ষণ; লৌকিক প্রকাশন, ময়মনসিংহ।

৩. ‘মুন্সিগঞ্জে শিশু বলাৎকারের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক কারাগারে; দেখুন : https://bangla.thedailystar.net/news/bangladesh/crime-justice/news-699291; retrieved on: 20.05.26

৪. ‘শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা: ইমাম বললেন, শয়তানের ধোঁকায় পড়ে এটা করেছি; দেখুন https://www.ittefaq.com.bd/785326; retrieved on: 20.05.26

৫. দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত অবধারিত: জামায়াত প্রার্থী; দেখুন : https://www.ittefaq.com.bd/773797; retrieved on: 20.05.26

৬. ‘Catholic Church Sexual Abuse Crisis; দেখুন : https://www.britannica.com/topic/Catholic-Church-Sexual-Abuse-Crisis; retrieved on: 20.05.26

৭.ভারতে পুরোহিত ও শিষ্যের বিরুদ্ধে ২০ শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ; দেখুন :  https://news24bd.tv/details/268308; retrieved on: 20.05.26

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন