সোহাগ আব্দুল্লাহ
প্রকাশিত ২৯ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
চলচ্চিত্রে গুপ্তচরবৃত্তি
রাষ্ট্রের ছায়াযুদ্ধ, ক্ষমতা ও সহিংসতার সাংস্কৃতিক রাজনীতি
সোহাগ আব্দুল্লাহ

ঘোর অন্ধকার, নাকি দিবালোকের ন্যায় স্বচ্ছ
৩ জানুয়ারি ২০২৬। রাত দুইটা। এফ-৩৫, এফ-২২ জেট, বি-১ বোম্বারসহ ১৫০টিরও বেশি বিমানের সমারোহে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন ‘অ্যাবসুলেট রিজলভ’। জরুরি পরিস্থিতির জন্য ক্যারিবীয় অঞ্চলে পেন্টাগন প্রস্তুত রাখে কমপক্ষে ১৫,০০০ সৈন্য। ব্যাপক অভিযানে বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয় রাজধানী কারাকাস। অভিযানের আগেই সাইবার অ্যাটাকে বিচ্ছিন্ন করা হয় কারাকাসের বিদ্যুৎ সরবরাহ। এরপর শুরু হয় এয়ার স্ট্রাইক। বিকল হয় কারাকাসের রাডার ও এয়ার ডিফেন্স। মাত্র মিনিট পাঁচেকের সশস্ত্র অভিযানে মার্কিন ডেলটা ফোর্স ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস’কে রাজধানী কারাকাসের সুরক্ষিত শোবার ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে তুলে নিয়ে যায়! যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধাভিযান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ‘ফক্স নিউজ’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বেশ কিছু ভালো অভিযান সম্পন্ন করেছি, কিন্তু এধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখিনি!’১
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেন, এটা টেলিভিশনে দেখার মতো ব্যাপার!২ আসলেই ‘টেলিভিশনে দেখার মতো’ এ ঘটনা অভূতপূর্ব, একইসঙ্গে অশনিসঙ্কেতও; যা ক্ষমতাধর দেশগুলোর ক্ষমতা জাহিরের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবের গুপ্তচর কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি ও মিলিটারি অভিযানকে কাজে লাগিয়ে এই ধরনের ঘটনা আধুনিক রাষ্ট্রে এভাবে ঘটলেও স্পাই জনরার চলচ্চিত্রে অবশ্য দেখা যায় হরহামেশাই। মিশন ইমপসিবল সিরিজের চলচ্চিত্রগুলো দর্শক-পাঠক দেখলে পুরো ঘটনাগুলো ঠিক কীভাবে ঘটে তার একটা চাক্ষুষ বিবরণ পাওয়া যায় বোধ করি।
যেকোনো রাষ্ট্র পরিচালনায় ওই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে এমনটাও দেখা যায়, আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তার ভেতরেই আরেকটা রাষ্ট্র (ডিপ স্টেট) তৈরি হতে; যা মূলত এসব গোয়েন্দা সংস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রাথমিকভাবে গুপ্তচর বা গোয়েন্দারা রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী বা কোনো সংগঠনের জন্য গোপন তথ্য সংগ্রহ ও সেটা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে। শুধু যে নিজ দেশে এই প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, ব্যাপারটা এ রকম নয়। তুলনামূলকভাবে ক্ষমতাধর দেশের গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা লক্ষ করা যায় পার্শ্ববর্তী দেশ কিংবা ওই অঞ্চলের সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে ভৌগোলিক রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণেরও। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে কখনো নাশকতা, স্বপক্ষে কিংবা বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা, সাইবার গুপ্তচরবৃত্তির (হ্যাকিং, ডেটা চুরি ও অনলাইন নজরদারি) কাজও করে। তারা মূলত এসব করে জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত সুবিধা (অন্য দেশের পরিকল্পনা জেনে নিজস্ব কৌশল নির্ধারণ করা), রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-প্রযুক্তিগত স্বার্থ এবং যুদ্ধ-সংঘর্ষে শক্তিশালী অবস্থানে থাকার জন্য।
বাস্তবের এসব গুপ্তচরদের কিংবা এ সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে নানাভাবে হাজির করা হচ্ছে দৃশ্যমাধ্যম চলচ্চিত্রে। চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় এসব গল্পের কদর নানা কারণেই। তবে মুখ্য কারণ জাতীয়তাবাদ ধারণায় পাঠক-দর্শককে উদ্বুদ্ধ করে স্বার্থগত নানা বিষয়ে সম্মতি উৎপাদন করা। এ প্রবন্ধ মূলত চলচ্চিত্রে গুপ্তচরকেন্দ্রিক এসব বিষয়ের উপস্থাপন ও প্রবণতার তালাশ নিয়ে।
এ প্রবন্ধের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও যৌক্তিকতা
মানুষের বাস্তব ও দৃশ্যমাধ্যমের জগৎ বর্তমানে যুদ্ধ আর সহিংসতায় ভরপুর। দুনিয়াব্যাপী এখন চলমান একাধিক যুদ্ধ। এ প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়ে হরর, অ্যাকশন ও থ্রিলার চলচ্চিত্রের উত্থানও লক্ষণীয়। এসব জনরার ভোক্তার তালিকাতে এগিয়ে তরুণরা। প্রযুক্তি তরুণদের এই সুযোগটা এনে দিয়েছে পরিসংখ্যান এমন তথ্য-উপাত্তই হাজির করে।৩ থ্রিলার ও অ্যাকশন জনরার মধ্যে ব্যবসায়িকভাবে সফলতার দিক দিয়ে গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রেও দর্শকের চাহিদা বিদ্যমান। যদিও এই চাহিদা কোনো না কোনোভাবে আরোপ করা—এ নিয়ে চাইলে পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক হাজির করাই যায়। স্পাই চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে নির্মাণ করা দেশগুলো এর মাধ্যমে নিজেদের কার্যকলাপ দেখিয়ে সক্ষমতা জাহিরের চেষ্টাও করে/করছে। এই জায়গা থেকেই মূলত এই আলোচনার সূত্রপাত।
এই প্রবন্ধের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রথমত, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে স্পাই জনরার চলচ্চিত্র কোন ধরনের বার্তা নিয়ে হাজির হচ্ছে তা দেখার চেষ্টা করা। দ্বিতীয়ত, এ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে এক দেশের ওপরে অন্য দেশের আধিপত্য কিংবা প্রভাব বিস্তার করাটা কীভাবে দেখানো হচ্ছে, তা আলোকপাত করা। তৃতীয়ত, আধুনিক ও উত্তরাধুনিক রাষ্ট্রের চরিত্র বোঝা। চলচ্চিত্রগুলোতে রাষ্ট্র কীভাবে হাজির থাকছে তাও খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে স্পাই চলচ্চিত্র
গুপ্তচরবৃত্তির সঙ্গে সম্পর্কিত রাষ্ট্র ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ, ন্যায়-অন্যায় ধারণা ও প্রযুক্তির বিবর্তন-পরিবর্তন। আন্তঃসম্পর্কিত এ বিষয়গুলোকে রাষ্ট্র সাধারণীকরণ করে সম্মতি উৎপাদনের চেষ্টা করে থাকে। যার কারণে স্পাই বা গুপ্তচরনির্ভর চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হিসেবে হরহামেশাই প্রাধান্য পায় বৈশ্বিক রাজনীতি, ক্ষমতা, বিভিন্ন গোপন মিশন, যুদ্ধ-আগ্রাসন-ষড়যন্ত্র ও প্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গ। এসব চলচ্চিত্র সাধারণত কোনো এজেন্ট বা গুপ্তচরকে ঘিরে এগোয়; যিনি বা যারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা, শত্রুর ষড়যন্ত্র বানচাল এবং গোপন তথ্য সংগ্রহ করে; নানাভাবে নজরদারির কাজে নিয়োজিত থেকে দেশ ও দেশের বাইরের শত্রুকে মোকাবিলা করে দেশ রক্ষা করে।
চলচ্চিত্রের একেবারে নির্বাক সময় থেকেই স্পাই জনরার চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। যুক্তরাজ্যের নির্মাতা বার্ট হ্যালডেন ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাকে আশ্রয় করে নির্মাণ করেন সাত মিনিটের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দ্য জার্মান স্পাই পেরিল। অবশ্য অস্ট্রিয়-আমেরিকান নির্মাতা ফ্রিটজ ল্যাঙ-এর স্পাইস (১৯২৮) কে ধরা হয় শুরুর দিককার পূর্ণদৈর্ঘ্য স্পাই চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রে গোপন সদর দপ্তর, ইলেট্রনিক্স ডিভাইস ও যৌন আকর্ষণের জন্য নারীদের ব্যবহারের (ফেমে ফেটেলস) মতো ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে হাজির থাকে। সমালোচকদের কেউ কেউ অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা অস্কার অ্যাপফেল নির্মিত বুলডগ ড্রামন্ড (১৯২২) কে স্পাই জনরার প্রথম দিককার চলচ্চিত্র হিসেবে এগিয়ে রাখে। ততোদিনে প্রভাব বিস্তারকারী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র কৈশোর পেরিয়ে সবাকে ফিরেছে।
এর পরের সময়টাতে মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় গুপ্তচরবৃত্তি বাস্তব রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ফলে সেসময়ের আলোচিত ঘটনাবলি চলচ্চিত্রে গুরুত্ব পেতে থাকে। যেমন, হারমান শুমলিন-এর কনফিডেনশিয়াল এজেন্ট (১৯৪৫) ও আলফ্রেড হিচকক-এর নোটোরিয়াস (১৯৪৬) এ নাৎসি গুপ্তচরদের নানামাত্রিক ষড়যন্ত্র দেখানো হয়। তবে ততোদিনেও বৈশ্বিকভাবে এই জনরার চলচ্চিত্র সেভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ১৯৬০-এর দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধ মানুষের রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ওই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে আমলে নিয়েই নির্মাণ হয় ডা. নো (১৯৬২)। জেমস বন্ড চরিত্র সৃষ্টির মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সিরিজ চলচ্চিত্র স্পাই চলচ্চিত্রের প্রবল জনপ্রিয়তা এনে দেয় ১৯৬০-এর দশকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও জাতীয়তাবাদকে উদ্দীপ্ত করে এমন ঘটনার সঙ্গে এ সময়কার স্পাই চলচ্চিত্রে দেখা মেলে অত্যাধুনিক গ্যাজেট, আন্তর্জাতিক লোকেশন, অ্যাকশন ও স্টাইল; যা মূলত এই ধারার চলচ্চিত্রকে বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয় করে তোলে।
১৯৭০ ও ৮০ দশকে এসে স্পাই চলচ্চিত্রে বাস্তবধর্মিতা অনেকাংশেই বৃদ্ধি পায়। এ সময়ের গুপ্তচরবৃত্তির চলচ্চিত্রে নানা জটিল বিষয় ও মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরা হতে থাকে। ফলে স্পাই চরিত্র নায়কোচিত নয়, বরং দ্বিধাগ্রস্ত ও মানবিকভাবে দেখানো শুরু হয়। তবে ৯০’র দশক বিশ্বরাজনীতির এক বড়োসড়ো পটপরিবর্তনের সময়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ায় বদল ঘটে বিশ্বব্যবস্থারও। আর এ পরিবর্তন স্পাই চলচ্চিত্রের ভাষা, শত্রু ও গল্প বলার ধরনকেও ব্যাপক বাকবদল করে। মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র এর মধ্যে যৌবনপ্রাপ্ত হয়। ফলে নতুন শত্রু খোঁজা শুরু হয় এর পরের সময়কার স্পাই চলচ্চিত্রে। এ সময় ও এর পরের দশকে প্রযুক্তির জগতে বড়ো ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয়। ডিশ অ্যান্টেনা, সিডি ও টেলিভিশন সেটের সহজলভ্যতা দেখা যায় সব জায়গায়।
২১ শতকের শুরুর দিকে ইন্টারনেটনির্ভর নানা ভিজ্যুয়াল প্লাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যমের যুগান্তকারী বিস্তার লক্ষ করা যায় বিশ্বব্যাপী। এ সময় যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনা ঘটে এবং ইরাকে যৌথভাবে হামলা করে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য ম্যাস ডেস্ট্রাকশন ওয়েপনের দোহাই দিয়ে। যদিও পরবর্তী সময়ে এ রকম মরণাস্ত্রের সন্ধান আর পাওয়া যায়নি ইরাকে! এসব ঘটনা ও প্রাযুক্তিক বিস্তার স্পাই চলচ্চিত্রের পরিসরেও নতুন মাত্রা যুক্ত করে। বাস্তবের জগতে যুক্তরাষ্ট্র শুরু করে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এর ফলে তখন স্পাই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু হিসেবে গুরুত্ব পেতে থাকে নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি, সন্ত্রাসবাদ, দুঃসাহসিক গোপন মিশন ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক টানাপড়েন। এমনও হয়েছে এ সময়কার স্পাই চলচ্চিত্রে যে প্রযুক্তি দেখানো হয়েছে, পরে সেসব প্রযুক্তি বাস্তব জগতেও ব্যবহার করা হয়েছে নজরদারির কাজে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় স্কাইফল (২০১২) ও মিশন ইম্পসিবল-এর কথা। যেখানে দেখা যায়, আধুনিক রাষ্ট্র ও গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য সংগ্রহের জন্য ডিজিটাল নজরদারি, সাইবার গোয়েন্দাগিরি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানামাত্রিক ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে স্পাই জনরার চলচ্চিত্রের বিস্তার শূন্য দশকের আগে ঘটলেও ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বলিউডের চলচ্চিত্রে তার প্রাধান্য দেখা যায় এর পরের সময় থেকেই। বলা যায়, এর শুরুটা যশরাজ ফিল্মের হাত ধরে। এই স্পাই ইউনিভার্সের চলচ্চিত্রে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্টদের কীর্তি তুলে ধরে তাদের মহিমান্বিত করার চেষ্টাও লক্ষণীয়। এক থা টাইগার (২০১২) ও টাইগার জিন্দা হ্যায় (২০১৭) এর ব্যবসায়িক সাফল্যের পর এই ফ্র্যাঞ্চাইজিতে যুক্ত হয় ওয়ার (২০১৯) ও পাঠান (২০২৩); যা আদতে শেয়ার্ড ইউনিভার্স। এই ইউনিভার্সের সবগুলো চলচ্চিত্রই ভারতীয় চলচ্চিত্র ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যবসাসফল হিসেবেও স্বীকৃত। একইসঙ্গে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির রয়েছে কমিক বই, গ্রাফিক উপন্যাস ও ভিডিও গেমও। যশরাজের স্পাই ইউনিভার্সে ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র হিসেবে দেখানো হয়। বিশেষ করে বলা যায় পাকিস্তান ও চিনের কথা। ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব সর্বজন জ্ঞাত। ভারত বিভাজন, পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধ বলিউড চলচ্চিত্রের এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। বলিউডের অনেক স্পাই চলচ্চিত্রে এসব ঘটনা বার বার বিষয়বস্তু হচ্ছে। এসব চলচ্চিত্রে পাকিস্তান প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র এবং ভারতীয় গুপ্তচর চরিত্রকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার কাজে নিয়োজিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যার সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে হাজির করা যায় ধুরন্ধর (২০২৫) কে। ব্যবসায়িক সফলতা এর পরবর্তী সিক্যুয়াল নির্মাণের গতিকেও অনেকটাই ত্বরান্বিত করেছে। আর ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ (২০২৬) তো ভারতীয় চলচ্চিত্রের আয়ের রেকর্ডকেই ওলটপালট করে দিয়েছে!
বলিউডের পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতের অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে ২০১০-এর পরে গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রবণতা লক্ষণীয়। মূলত সব দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিগুলোতেই স্পাই ঘরানার কদর বেড়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক পটপরির্তন ও দৃশ্যমাধ্যমে সেসবকে জাহিরের প্রবণতাও আধেয়ে স্পষ্ট। তবে কলকাতা ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রবণতা একেবারেই কম। এর উপস্থিতি এইসব ইন্ডাস্ট্রিতে বিভিন্ন চলচ্চিত্রের কেবল সূত্রাকারেই থেকে গেছে।
তাত্ত্বিক পাটাতন ও প্রবন্ধের নমুনায়ন
এই উপশিরোনামে মূলত এই প্রবন্ধের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পদ্ধতি আলোচনা করা হবে। মূল আলোচনায় মনোযোগী হওয়ার আগে এখানে ‘উইকিলিকস ওয়েবসাইট’ ও প্রামাণ্যচিত্র সিটিজেন ফোর (২০১৪) কে কেস হিসেবে হাজির করে পাঠের প্রয়োজন বোধ করি। কারণ দুইটা ঘটনাই রাষ্ট্র, গোয়েন্দা সংস্থা, নজরদারি ও গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
‘উইকিলিকস’ ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করেন জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে। ‘উইকিলিকস’ দাবি করে যুদ্ধ, গুপ্তচরবৃত্তি ও দুর্নীতিবিষয়ক গোপনীয় সরকারি প্রতিবেদনসহ এক কোটিরও বেশি নথি প্রকাশ করেছে তারা।৪ এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ সম্পর্কিত গোপন নথি, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি ক্যাবলগেট, ভোল্ট সেভেন নামে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির ফিরিস্তি ও স্পাই ফাইল নামে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির চালানসহ আরো কতো কী! যা ২০১০-এর পর থেকে ক্রমাগত ফাঁসের মাধ্যমে ‘উইকিলিকস’ জগতময় আলোড়ন তৈরি করে। ‘উইকিলিকস’-এর বিভিন্ন সময়ে ফাঁস হওয়া নানা গুপ্তচরবৃত্তি ও গোপন নথির কারণে বিপাকে পড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশ।
কীভাবে ও কোন প্রক্রিয়ায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গুপ্তচরবৃত্তি ও নজরদারির ঘটনায় লিপ্ত থাকে তা প্রকাশ্যে আনেন লরা পয়ত্রাস’ও। তার নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র সিটিজেন ফোর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এন এস এ-এর নজরদারির ঘটনাকে প্রকাশ্যে উন্মোচন করে। নজরদারির তথ্য ফাঁস করা সাবেক এন এস এ কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেন-এর এই সাক্ষাৎকারটি লরা পয়ত্রাস হংকংয়ের এক হোটেলে নেন। সাক্ষাৎকারে স্নোডেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এন এস এ সম্পর্কে যেসব তথ্য প্রকাশ্যে আনেন প্রামাণ্যচিত্রে, তা থ্রিলার চলচ্চিত্রকেও হার মানাবে। অবশ্য হুইসেলব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেন তার গোয়েন্দা জীবনের অভিজ্ঞতা ও গণনজরদারির ঘটনাকে উপজীব্য করে লেখেন ‘পার্মানেন্ট রেকর্ড’(২০১৯) নামে বইটিও।
এসব বিষয় ও গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের আদ্যোপান্ত পাঠে মনোযোগী হতে শুরুতেই স্মরণ করতে হয় মিশেল ফুকো’কে। ফুকোর ‘ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার’ ও ‘প্যানঅপটিকন’ ধারণা গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র বিশ্লেষণে জরুরি। ফুকো তার ‘Discipline and Punish: The Birth of the Prison’ বইয়ে৫ বলেন, আধুনিক ক্ষমতা সরাসরি হত্যা না করে মানুষকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বশে আনে। ডিসিপ্লিনারি ক্ষমতা মানুষকে নির্দিষ্ট নিয়মে আনে এবং তার শরীরকে দক্ষ যন্ত্রে রূপান্তর করে। কীভাবে এটা করা হয় সেটা বুঝাতে ফুকো জেরেমি বেন্থাম-এর প্যানঅপটিকন ধারণার কথা বলেন।
প্যানঅপটিকন হচ্ছে ১৮ শতাব্দীর শেষ দিকে প্রস্তাবিত বিশেষ কারাগারের স্থাপত্য নকশা; যেখানে প্রহরীরা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকার ফলে অদৃশ্যভাবে সব কয়েদিকে সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে পারে। কয়েদিরা জানবে যে, তাদেরকে কেউ নজরদারি করছে, কিন্তু কখন করা হচ্ছে তা জানবে না। এতে কয়েদিদের মধ্যে এক ধরনের নিয়মানুবর্তিতা থাকবে সবসময়। এটা কেবল কারাগারের ব্যাপারে ভাবা হলেও বর্তমান রাষ্ট্রে এর প্রয়োগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারখানা, মানসিক ভারসাম্যহীনদের নিরাময় কেন্দ্র (পাগলাগারদ), রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ির সব জায়গাতেই লক্ষ করা যায়। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর গণনজরদারির প্রক্রিয়াকে আরো সহজসাধ্য করে তুলেছে। আধুনিক রাষ্ট্র তার ক্ষমতা বজায় রাখতেই বিভিন্নভাবে নাগরিকদের ওপর নজরদারি করে; এটা প্রত্যক্ষ করা যায় ‘উইকিলিকস’ ফাঁস হওয়া নথিতে ও সিটিজেন ফোর চলচ্চিত্রে। স্পাই চলচ্চিত্র ফোনে আড়ি পাতা, ড্রোন, সিসিটিভি ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের নজরদারি বিষয়গুলোকে স্বাভাবিক করে তোলে। এছাড়া এসব চলচ্চিত্রে প্রোটাগনিস্ট হিসেবে যারা থাকে, তাদের প্রতিনিয়ত নজরদারির মধ্যে থাকা লাগে; এবং ডিসিপ্লিন ও প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে নিজেদের শরীরকে ‘যন্ত্রে’ পরিণত করে, স্বকীয়তা মুছে রূপান্তরিত হয় রাষ্ট্রের দক্ষ যন্ত্রে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফুকোর সময় থেকে এগিয়ে আরো অগ্রগামী চিন্তা হাজির করেন দক্ষিণ কোরিয়ান দার্শনিক বিয়ং-চুল হান। মিশেল ফুকোর ‘বায়োপলিটিক্স’ শরীর ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আর হানের ‘সাইকোপলিটিক্স’৬ ধারণা গড়ে উঠেছে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। সাইকোপলিটিক্স কাজ করে মূলত মানুষের আবেগকে পুঁজি করে। স্নায়ুযুদ্ধের পরের সময়কার নজরদারি ও ক্ষমতার যে পরিবর্তন তা অনেকটাই হানের দার্শনিক পাটাতনের সঙ্গে মিলে। হান মনে করেন, আমরা এখন ‘ডিসিপ্লিনারি সমাজ’ থেকে ‘কৃতিত্বের সমাজে’ প্রবেশ করেছি। যার কারণে এই সমাজব্যবস্থায় মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয় না, বরং মানুষ নিজেই নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে। এই জায়গাতে হান ও মিশেল ফুকোর চিন্তার পার্থক্য লক্ষ করা যায়। ফুকোর ‘ডিসিপ্লিনারি সোসাইটি’তে ক্ষমতার উৎস ছিলো দৃশ্যমান। তুলনামূলকভাবে আগেরকার গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে ফুকোর ধারণার প্রতিফলন দেখা যেতো, কারণ রাষ্ট্রের সীমানা নির্দিষ্ট ও শত্রু ছিলো চিহ্নিত। তবে বর্তমান সমাজ ‘সাইকোপলিটিক্সের’ জমানায় প্রবেশের কারণে ক্ষমতা এখন আর দমনমূলক নয়, অনুপ্রেরণামূলক। এখনকার চলচ্চিত্রে দেখা যায়, শত্রু নির্দিষ্ট কোনো দেশ নয়, বরং অদৃশ্য এক নেটওয়ার্ক বা সিস্টেম।
এদিকে হানের ‘The Transparency Society’৭ ধারণা মতে, যেখানে সবকিছু স্বচ্ছ ও প্রকাশ্য, সেখানে গোপনীয়তার মৃত্যু ঘটে। গুপ্তচরবৃত্তির মূল ভিত্তিই হলো গোপনীয়তা। কিন্তু আধুনিক গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়, বিগ ডেটা ও অ্যালগরিদম ব্যবহার করে মানুষের মনের গহীন পর্যন্ত উন্মোচন করা হচ্ছে। হানের মতে, এ স্বচ্ছতা আসলে স্বাধীনতার ছদ্মবেশে নিয়ন্ত্রণ। যার মধ্য দিয়ে তথ্যের মুক্তি ঘটে না, বরং ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার চরম ভঙ্গুরতা হাজির করে। এখন স্পাই চলচ্চিত্রে গোয়েন্দারা শুধু ফাইল চুরি করে না, তারা মানুষের ডেটা-প্যাটার্ন বিশ্লেষণ করে, যা মূলত হানের ‘Psychopolitics’ ধারণার মূল ভিত্তি। যার কারণে গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলোকে বিয়ং-চুল হানের মতো করেই ‘ডিজিটাল প্যানোপটিকন’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। হান আরো মনে করেন, স্বাধীনতার ভ্রম দেখিয়ে নিওলিবারেল ক্ষমতা মানুষকে দিয়ে কাজ করায়। গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে লক্ষ করা যায়, প্রোটাগনিস্টরা ভাবে তারা বিশ্বকে রক্ষা করছে কিংবা সন্ত্রাসবাদ দমন/নির্মূল করছে; কিন্তু আদতে তারা একটা ভ্রমের মধ্যেই থাকে হত্যা ও নেতিবাচক কাজের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেলে তাদেরকেও নানাভাবে নির্মূলে নামে রাষ্ট্র।
এসব কীভাবে কাজ করে তার ধারণা পাওয়া যায় লুই আলথুসার-এর কাছে। তিনি নির্দিষ্ট পরিচয়ে ডাক দেওয়া বা Hailing-এর৮ কথা বলেন; যেখানে ব্যক্তি রাষ্ট্রের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজ স্বতন্ত্র সত্তা বিসর্জন দেয়। আলথুসার জানান, ব্যক্তি জন্মগতভাবে ‘সাবজেক্ট’ থাকে না, রাষ্ট্র বা আদর্শ তাকে ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে গড়ে তোলে। এতে মানুষ যখনই কোনো সঙ্কেত বা নির্দেশ পায়, তখন তার শরীর ও মন অচেতনভাবে সাড়া দেয়। আবার যখন কোনো গোয়েন্দা বা ব্যক্তি রাষ্ট্রের ডাক প্রত্যাখ্যান করে, রাষ্ট্র তখন তার রিপ্রেসিভ স্টেট অ্যাপারেটাস৯ (RSA) সক্রিয় করে। আলথুসারের মতে, আদর্শ যখন ব্যর্থ হয়, তখনই রাষ্ট্র নগ্ন সহিংসতা বা ‘Physical Repression’ ব্যবহার করে নাগরিকের ওপরে। যা গুপ্তচরবৃত্তিক চলচ্চিত্রে হরহামেশাই লক্ষণীয়।
এই জায়গাতে জর্জিও আগামবেন-এর ‘স্টেট অব এক্সেপশন’১০ এর সঙ্গে লুই আলথুসার ধারণার যোগসূত্র পাওয়া যায়। যা গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের আইনি কাঠামো ও পরিসর বুঝতে সাহায্য করে। ‘স্টেট অব এক্সেপশন’ এমন এক পরিস্থিতি যেখানে রাষ্ট্র তার অস্তিত্ব রক্ষার অজুহাতে নিজের আইন নিজেই স্থগিত করে। স্পাই চলচ্চিত্রের বিভিন্ন মিশন মূলত আইনবহির্ভূত জগতকেই হাজির করা হয়। যেখানে রাষ্ট্র আইনকে স্থগিত রেখে গুপ্তচরদের ক্ষমতা দেয় আইন ও বিচারবহির্ভূত কাজের। আগামবেন ‘বেয়ার লাইফ’-এ১১ দেখান কীভাবে রাষ্ট্র জীবনকে আইনের সুরক্ষা থেকে বের করে দেয়। যা প্রত্যক্ষ করা যায় গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে। এখানে আলথুসারের দমনমূলক হাতিয়ারের সঙ্গে আগামবেনের ‘স্টেট অব এক্সেপশনের’ একটা সাযুজ্যতা তৈরি করা যায়। আলথুসার দেখান রাষ্ট্র কীভাবে দমন করে, আর আগামবেন দেখান রাষ্ট্র কীভাবে সেই দমনকে জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে আইনি রূপ দেয়। এই প্রবন্ধের তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করার ক্ষেত্রে এসব তাত্ত্বিকদের তত্ত্ব ভূমিকা রাখবে।
চলচ্চিত্র নমুনায়নের ক্ষেত্রে এখানে দর্শকপ্রিয়তা ও ব্যবসা সফলতার দিকটি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিকতাকে আমলে রেখে বাছাইকরণের এই তালিকায় স্থান পেয়েছে হলিউড নির্মাতা ক্রিস্টোফার ম্যাককোয়ারি-এর মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান (২০২৩) ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং (২০২৫)। আদতে দুইটা চলচ্চিত্র হলেও দুইটার সমন্বয়েই একটা মিশনের সমাপ্তি ঘটে। ফলে একটা চলচ্চিত্রকে বাদ দিলে গল্পের সামগ্রিকতা ধরা কঠিন। বর্তমানকে ছাপিয়ে ভবিষ্যতের প্রযুক্তির ইঙ্গিত থাকাও এই চলচ্চিত্রগুলোকে নমুনাতে রাখার আরেকটি কারণ। ঠিক একই প্রবণতা স্পষ্ট বলিউডের নির্মাতা আদিত্য ধর-এর ধুরন্ধর (২০২৫) ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ (২০২৬) বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও। এই চলচ্চিত্রে বর্তমানের মাঝারি গোছের প্রযুক্তির ব্যবহার থাকলেও ভবিষ্যতের কোনো ইঙ্গিত না থাকা চলচ্চিত্রটিকে নমুনায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে। এদিকে নমুনায়নের তালিকায় রাখা হয়েছে দক্ষিণ ভারতের নির্মাতা পি এস মিথরান-এর সর্দার (২০২২)। যেখানে অতীত ও বতর্মান প্রযুক্তির একটা মিশ্রণ লক্ষণীয়। নমুনা তালিকায় পাঁচটা চলচ্চিত্র হলেও আদতে তিনটা চলচ্চিত্রকেই এ প্রবন্ধের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে গভীর অনুসন্ধানের সুবিধার্থেই। পরিশেষে এসব চলচ্চিত্রের কাছাকাছি ধরনের আখ্যানকে থিম ধরে বিন্যস্ত করে আধেয় বিশ্লেষণ করা হবে এ প্রবন্ধে।
চলচ্চিত্রে গুপ্তচরবৃত্তির উপস্থাপন ও প্রবণতা
গুপ্তচরবৃত্তিকে নমুনায়িত চলচ্চিত্রে কেমন করে তুলে ধরা হচ্ছে ও তার উপস্থাপন প্রবণতাগুলো বুঝতে কাছাকাছি ধরনের থিমকে বিন্যাস করে সেসবের বিশ্লেষণ পেশ করা হলো।
এক. বাস্তবের শত্রু ভিজ্যুয়ালে নাকি ভিজ্যুয়ালের শত্রু বাস্তবে
পৃথিবীতে মানুষের যুদ্ধের ইতিহাস মূলত টিকে থাকা ও আধিপত্য বিস্তারের। সময়ের পরিক্রমায় প্রাণ ও প্রকৃতির অনেক কিছু বদলালেও মানুষের যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার বাসনা থেকে গেছে অপরিবর্তনীয়ই। ফলে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির লড়াইয়ে একে-অন্যকে শত্রু পরিণত করে যুদ্ধের ডামাডোল বেজে উঠছে প্রতিনিয়তই। বাস্তবের সেই যুদ্ধের প্রতিফলনই যেনো দৃশ্যমাধ্যমের স্পাই চলচ্চিত্রগুলো। নমুনায়িত তিনটি চলচ্চিত্রই নানা দেশকে অপর হিসেবে হাজির করে; যেখানে দেখা মেলে নানা শত্রু রাষ্ট্রের কিংবা সম্ভাব্য শত্রুদের। কখনো এই শত্রু থাকে প্রকাশ্যে, কখনো অপ্রকাশ্য। এসব শত্রু ও শত্রু রাষ্ট্র থেকে দেশ-দুনিয়া রক্ষার প্রাণপণ লড়াই করে চলে স্পাই চলচ্চিত্রের প্রোটাগনিস্টরা। শত্রু রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিভিন্ন রাষ্ট্রকে হেয় করা এসব চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য আকারে ধরা দেয়।
মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং-এ প্রোটাগনিস্ট ইথান হান্ট ও তার দলের লড়াই অদৃশ্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এনটিটির বিরুদ্ধে। মিশন : ইমপসিবল থ্রি (২০০৬) তে দেখা যায়, চিনা ল্যাবে তৈরি ‘রেবিটস ফুট’ প্রোটোটাইপ থেকে এআই এনটিটি উদ্ভূত হতে। যা ছিলো জৈব অস্ত্র। পরে ২০০৬-এ ইথান সেটা চুরি করে উদ্ধার করলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা তার হেফাজতে নিয়ে উন্নত করায় মনোযোগ দেয়। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ২০১২-তে পরীক্ষার সময় তা রাশিয়ান সেভাস্তোপোল সাবমেরিনে থাকা প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসলে, বিপজ্জনক হয়ে এনটিটি অদৃশ্য রূপ নেয় এবং নিয়ন্ত্রণ নেওয়া শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি, ইন্টারনেট পরিসর, মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স অবকাঠামো ও পারমাণবিক অস্ত্রের।
রাশিয়ার প্রযুক্তির কারণে যখন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে সবাই (পারমাণবিক দেশগুলোর অস্ত্রকে এআই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তার মতো করে ব্যবহারের প্রস্তুতি নেয়। যার শেষ পরিণতি বিশ্বযুদ্ধ), তখন দুনিয়া রক্ষার লড়াইয়ে লিপ্ত হয় যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট মিশন ইমপসিবল ফোর্সের সদস্য ইথান হান্ট ও তার দল। রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্য দাপিয়ে বেড়ানো এই গুপ্তচরদের লড়াইটা অদৃশ্য সুপার এআই সিস্টেমের বিরুদ্ধে; কম্পিউটারনির্ভর হওয়ায় এনটিটি সবকিছু অতি দ্রুত শিখে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে, পরিবর্তন করে ফেলে অবস্থানও। যুক্তরাষ্ট্র ১/১১-এর পরে ইসলাম ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধের যে যুদ্ধ বাস্তবায়ন করেছিলো তার পরের নতুন শত্রুর সন্ধানের গল্প মূলত এই প্রযুক্তিগত এআই এনটিটি। যেখানে শত্রু একক কোনো দেশ নয়, বরং শত্রু সর্বত্রই। যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের গুপ্তচরদের কাছে অন্য দেশের প্রযুক্তি ও সৈনিকরা যে কিছুই না, তারও নির্মাণ ঘটে যখন রাশিয়ার সমুদ্র সীমায় মার্কিন সাবমেরিন ঢুকে পড়ে অনায়াসেই। এবং সেখানকার বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে রাশিয়ান সৈনিকদের কুপোকাত করে ও প্রযুক্তিকে ধোকা দিয়ে সোর্স কোড ‘দ্য পডকোভা’ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যই চোখে পড়ে। আবার যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা ও ইতালির পুরো শহরের পুলিশকে নাস্তানাবুদ করে আসামি গ্রেসকে ছিনিয়ে আনে ইথানের দল; যা শত্রু শত্রু খেলায় যুক্তরাষ্ট্রকেই সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে।
এদিকে ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ পাকিস্তানে মিশনের গল্প বলে। পাকিস্তানকে চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করা হয় বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণকারী এবং জঙ্গি সংগঠন আই এস আই ও এর মতো নানা সন্ত্রাসী সংগঠন পরিচালনাকারী হিসেবে। যে সন্ত্রাসীরা করাচি থেকে সরবরাহ করা অস্ত্র ও জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিয়ে ভারতে হামলা চালায়। পাকিস্তানের সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতারা এসব জঙ্গিদের মদদ দেয়। সবমিলে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভারতের জন্য হুমকি—এমন ভাষ্যই এই চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। এছাড়া ভারতের অধিকাংশ সন্ত্রাসী হামলার পাশাপাশি বিশ্বে যতো জঙ্গি হামলা হয় সবগুলোতেই পাকিস্তান সরাসরি জড়িত—এমনটাই বলতে শোনা যায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান অজয় সান্যাল’কে। এ সময় পর্দায় ভেসে ওঠে টুইন টাওয়া হামলার ফুটেজও।
পাকিস্তান কীভাবে এসব সন্ত্রাসী হামলার দায় এড়ায় তা জানা যায়—আই এস আই প্রধান মেজর ইকবাল বেলুচিস্তান থেকে অস্ত্র কিনে সেই অস্ত্রের গায়ে মেইড ইন রাশিয়া, না হয় ইউ এস লেখার কথা উল্লেখের সময়। এবং চলচ্চিত্রে বলা হয়, পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রও নানা সহায়তা দেয়। এই ভাষ্যের মাধ্যমে পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতের শত্রু হিসেবে নির্মাণ করা হয় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকেও। এছাড়া ধুরন্ধর-এ জঙ্গি হামলার যেসব ফাইল ফুটেজ দেখানো হয় সেখানে হামলাকারীদের আল্লাহ আকবার স্লোগান দিতেও দেখা যায়। এর মাধ্যমে ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা লক্ষণীয়, যা ইসলামোফোবিক ডিসকোর্সকেই শক্তিশালী করে।
সেইসঙ্গে চলচ্চিত্রজুড়ে পাকিস্তানকে শত্রু হিসেবে ভারত আমলে নেয় না—এমন বয়ান উপস্থাপনের পাশাপাশি নানাভাবে বাংলাদেশকেও হেয় করা হয়। চলচ্চিত্রে মেজর ইকবালের বাবা ব্রিগেডিয়ার জাহাঙ্গীরকে বলতে শোনা যায়, ১৯৭১-এ বাংলাদেশের বিপক্ষে যুদ্ধে হাজারো নারীকে ধর্ষণ করেছেন তিনি; বাংলাদেশে এখনো তার সেই নাজায়েজ সন্তানরা আছে। এই ভাষ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকেও অপর হিসেবে নির্মাণ করা হয়। আবার মুসলমানের শত্রু মুসলমান সেটাও প্রতিষ্ঠিত হয়। বলিউডের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ আসলেই সেখানে বাংলাদেশকে হেয় করে কৃতিত্ব নিতে দেখা যায় ভারতকে। সেসব চলচ্চিত্র দেখলে মনে হয়, ১৯৭১-এ যুদ্ধটা বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্য হয়নি বরং হয়েছে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে; যেখানে জয়ী ভারত।
অন্যদিকে সর্দার-এ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শত্রু হিসেবে হাজির থাকে পাকিস্তান ও চিন। চিনের সঙ্গে মিলে পাকিস্তান ‘ওয়ান ইন্ডিয়া, ওয়ান পাইপ লাইন’ প্রজেক্টের মাধ্যমে ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। দীর্ঘমেয়াদি সেই ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেয় সর্দার। খাবার পানির সঙ্কট দেখিয়ে ওয়ান ইন্ডিয়া, ওয়ান পাইপ লাইন যাতে চিন করতে পারে সেজন্য পাকিস্তান তাদের ভূখণ্ডে প্রবাহিত নদীতে বিষ মিশাতে থাকে। এ পরিকল্পনায় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চিনকে সহযোগিতা করে। চলচ্চিত্রে এই বক্তব্য জোরালোভাবে হাজির হয়—ভারতকে মোকাবিলা করা এককভাবে চিন কিংবা পাকিস্তানের পক্ষে সম্ভব না; তাই তারা যুথবদ্ধ হয়েছে। ভারতের বিরুদ্ধে কী ধরনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে তা জানতে সর্দার ছদ্মবেশে পাকিস্তান যান এবং সীমান্ত ঘেঁষা পাকিস্তানের ব্যারাকে জেনারেলের কক্ষ থেকে গোপন নথি চুরি করে পড়েন ও ছবি তুলে নিয়ে আসেন। টের পেলেও ক্যাম্পের সৈনিকরা মিলে সর্দারকে ধরতে পারে না! আবার চিন থেকেও ভারতীয় গুপ্তচর ককরোচের হাত ধরে পাইপ লাইনের মানচিত্র ভারতের কাছে আসে! এভাবেই ভারত দীর্ঘদিনের শত্রু পাকিস্তানের পাশাপাশি চিনকেও চ্যালেঞ্জ ছোড়ে। ভারতের নানা ইন্ডাস্ট্রির চলচ্চিত্রেই এখন পাকিস্তানকে ছাপিয়ে চিনকে দেখা যাচ্ছে নতুন শত্রু হিসেবে হাজির হতে।
এই গল্পেও বাংলাদেশকে হেয় করা হয়েছে দুর্বল নিরাপত্তা ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র হিসেবে। চট্টগ্রাম জেলে ৩২ বছর বন্দি থাকা সর্দার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পালিয়ে যান না; বরং ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা মহারাজ রাঠোর-এর মিশনের চিঠির অপেক্ষা করতে থাকেন। সর্দারের কাছে চিঠি আসলে সেটা দেখে ভয়ে তটস্থ হয়ে বাংলাদেশের পুলিশ ভারতকে জানালে নির্দেশ আসে তাকে মেরে ফেলার। সর্দারকে হত্যা করতে গেলে বাংলাদেশের গোটা ৩০-এর মতো পুলিশকে মেরে তিনি ভারতে আসেন। এ সময় পুলিশকে উদ্দেশ করে সর্দারকে বলতে শোনা যায়, ‘পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জে কীভাবে গুলি করতে হয় সেই ট্রেনিং বাংলাদেশে তোর মেলেনি, তাই না?’ যা বাংলাদেশের পুলিশ ও জেলব্যবস্থার দুর্বলতা প্রমাণ করে। আবার কয়েদিরা একবার পুলিশের ওপর হামলা করলে সর্দার তাদের রক্ষা করেন। যার মাধ্যমে ভারতীয় গোয়েন্দাদের শক্তিমত্তা ও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের নতজানুতাই প্রতীয়মান হয়।
বৈশ্বিকভাবে কিংবা আঞ্চলিকভাবে এক ধরনের প্রভাব যে ক্ষমতাধর দেশগুলো বিস্তারের চেষ্টা সবসময় করে, তা যেনো এসব চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু হয়ে ধরা দেয়। পাঠক/দর্শক একটু মনোযোগ দিলেই তা বুঝতে পারবে বোধ করি।
দুই. মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন কিংবা ভারত মাতা কি জয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনী বক্তব্য ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানকে যেনো দৃশ্যমাধ্যমে হাজির করে মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি, সমৃদ্ধি ও আধিপত্য পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে পাঠ করা যায় চলচ্চিত্রটিকে। অন্যদিকে ধুরন্ধর ও সর্দার মূলত ‘ভারত মাতা কি জয়’ এই দেশপ্রেমমূলক স্লোগানকে প্রতিধ্বনিত করে। এসব গুপ্তচর চলচ্চিত্র শত্রুদের সক্ষমতা, চিত্র ও চরিত্র নির্মাণ করে দর্শককে এই ধারণা দেয় যে, তারা সবকিছু রাষ্ট্রের জন্য করছে। রাষ্ট্র ও ক্ষমতার অদৃশ্য জগৎ এসব চলচ্চিত্র দর্শকের সামনে উন্মোচনের একটা ভান করে ঠিকই; কিন্তু ভয় ও অনিশ্চয়তায় ফেলে দর্শকের ভাবনায় জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রীয় কল্পনাকে শক্তিশালী করে।
মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং-এ দেখা যায়, এনটিটি শক্তিধর দেশের প্রযুক্তিকে নাস্তানাবুদ করে পারমাণবিক ঘাঁটিগুলোকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। এআইয়ের কাছে পর্যায়ক্রমে পরাভূত হতে থাকে চিন, ফ্রান্স, পাকিস্তান, ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য, কোরিয়া, ভারত ও রাশিয়া। সবার পরে এনটিটি কব্জা করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ঘাঁটিকে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ‘ডুমসডে’ ভল্ট নামক দুর্ভেদ্য ও পারমাণবিক-প্রতিরোধী সার্ভারে এনটিটি তার চেতনাকে স্থানান্তর করে বিশ্বের ডিজিটাল নেটওয়ার্ক থেকে পালানোর চেষ্টা করে। সত্তাটি যখন নিজেকে ওখানে সংযুক্ত করার চেষ্টা করে, তখন ইথানের দল ১০০ মিলি সেকেন্ড সময়ের মধ্যে তাকে বন্দি করে। কিছুক্ষণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ হারালেও অল্প সময়ের ব্যবধানে ইথেন এআইকে নাস্তানাবুদ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের পারমাণবিক ঘাঁটিকে রক্ষা করে। এতে দুনিয়া বেঁচে যায় ভয়াবহ এক যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে। আর প্রাযুক্তিক সক্ষমতা ও আধিপত্যে মহিমান্বিত হয় যুক্তরাষ্ট্র।
ভয়ঙ্কর এ পরিস্থিতির জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হয়; কারণ এনটিটি তাদের কারণেই আক্রমণাত্মক হয়ে গেছে। তবে রাশিয়া জানে না এনটিটির সোর্স কোড ‘পডকোভা’ কোথায়? কারণ ২০১২ খ্রিস্টাব্দে তারা সেভাস্তোপোল সাবমেরিনসহ সোর্স কোর্ডকে সমুদ্র গহ্বরে হারিয়ে ফেলে (পডকোভা এনটিটির আসল ও অবিকৃত সোর্স কোড। এ সোর্স কোড উদ্ধার করতে পারলেই বিদ্রোহী এনটিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। তবে তার আগে দুইটা চাবি খুঁজে বের করতে হবে, যেটা দিয়ে পডকোভা খোলা যাবে)। শক্তিধর অন্যান্য দেশগুলো জানে না সোর্স কোড কোথায় আছে; ওয়াকিবহাল কেবল যুক্তরাষ্ট্র! কিংবা সোর্স কোডের ব্যাপারে জানলেও যুদ্ধ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাশিয়ার সীমানায় গিয়ে তা উদ্ধার করবে কে? আবার রাশিয়াসহ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এনটিটিকে চায় জৈব অস্ত্রে পরিণত করতে; বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে ধ্বংস করে ডিজিটাল স্পেসকে নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে ব্রত হয়। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইথানের সাহায্যে রাশিয়ার সমুদ্রে থাকা কোড উদ্ধার করে। পরে এনটিটিকে নিষ্ক্রিয়ও করে। রাশিয়ার সীমানায় যে মার্কিন ডুব জাহাজ আছে তা তারা টেরও পায় না। এভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে ও পরামর্শে এ মিশন সম্পন্ন হয়।
এছাড়া এনটিটিকে ধ্বংস করতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করলে অসংখ্য মানুষ মারা যাবে এবং বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল বেজে যাবে এই শঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এরিকা সব আয়োজন সম্পন্ন করা সত্ত্বেও নিউক্লিয়ার ফুটবল (এটা চাপলেই পারমাণবিক বোমা সক্রিয় হয়ে যায়) চাপেন না! এভাবেই এনটিটি নিয়ন্ত্রণ, দুনিয়ার কল্যাণ করে রক্ষাকর্তা ও সর্বোচ্চ শক্তিধর দেশ হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। যার মাধ্যমে আমেরিকা হয়ে যায় গ্রেট এগেইন। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো কথাই বলে। পৃথিবীর ইতিহাসে জাপানে দুইটা পারমাণবিক বোমার আঘাত হানা একমাত্র দেশটি যুক্তরাষ্ট্রই! এছাড়া ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ অনেক দেশেই অসংখ্য যুদ্ধে জড়িয়েছে/জড়াচ্ছে গ্রেট যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে সর্দার-এ ভারতের শত্রু পাকিস্তান ও চিন। তাদের যৌথ ষড়যন্ত্র বানচাল করেন সর্দার। মূলত চিনের প্রশ্রয় ও নির্দেশেই ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান এ ষড়যন্ত্রের সাহস করে—চলচ্চিত্রের ভাষ্য এমনটাই। সর্দার পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে বোকা বানিয়ে ফাইল চুরি করে পড়ে আসেন এবং আরেক গুপ্তচর ককরোচ চিনে গিয়ে পুরো পরিকল্পনার নকশা চুরি করে আনেন! এসব ঘটনা রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান-চিনের দুর্বলতা ও ভারতের সক্ষমতা প্রকাশ করে। নকশা দেখে তারা বুঝতে পারে ‘ওয়ান ইন্ডিয়া, ওয়ান পাইপ লাইন’ মূলত পানি প্রবাহের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভারতকে কব্জার চেষ্টা। আর বাংলাদেশের পুলিশকে মেরে ও জেল পালিয়ে ভারতে ফিরেন সর্দার। এসেই ভারতের সার্বভৌমত্বের হুমকিস্বরূপ চিনের মদদপুষ্ট পানির প্রজেক্টকে ধ্বংস করেন। চিন-পাকিস্তানের কূটচাল উপড়ে ফেলে ভারতের জয়োধ্বনি করেন সর্দার। এডওয়ার্ড সাঈদ-এর অপরায়ন১২ ধারণার আলোকে বলা চলে, এ চলচ্চিত্র পাকিস্তান ও চিনকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যা ভারতের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। এবং এমন এক সক্ষমতা সম্পন্ন ভারতকে হাজির করে যে একাই চিন ও পাকিস্তানের মতো শক্তিধর শত্রুকে মোকাবিলায় সক্ষম।
অন্যদিকে ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ-এ পাকিস্তানের জঙ্গিবাদকে মূলসহ উৎখাত করতে ভারত তাদের গুপ্তচরদের সেখানে পাঠায়। কেননা পাকিস্তান বৈশ্বিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী, বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনকে সহায়তা দেয়, ভারতে ফেক কারেন্সি পাঠায় ও মাদক সরবরাহ করে, যা ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ। এই কাজে পাকিস্তানের সরকার, পুলিশ-প্রশাসন, জঙ্গিগোষ্ঠী সবাই জড়িত। ভারতের মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও সোশালিস্ট ভারতবিরোধীরা এ কাজে পাকিস্তানকে সহায়তা করে। পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতেই ভারত তাদের গুপ্তচর নেটওয়ার্ক তৈরি করে পাকিস্তানজুড়ে।
আই এস আই প্রধান মেজর ইকবাল, রেহমান ডাকাত, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের কান্দাহারে ভারতীয় বিমান জিম্মি করা সন্ত্রাসী, বিভিন্ন সময় ভারতে হামলা করা সন্ত্রাসীসহ অসংখ্যজনকে হত্যা করে হামজা পাকিস্তানের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণে নেয়। এ বাস্তবতায় তখন হামজাকে বলতে শোনা যায়, পাকিস্তানের ভাগ্য এখন থেকে হিন্দুস্তান নির্ধারণ করবে এবং মোদি সরকারের নেতৃত্বে (চলচ্চিত্রে মোদি সরকারের শাসনামলকে গুরুত্ব দিয়ে দেখানো হয়, নরেন্দ্র মোদি শপথ নেওয়া ও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা, ‘অপারেশন উরি’ এবং ৫০০-১,০০০ রুপির নোট বাতিল করার বিষয়গুলো গল্পের প্লটে বেশ গুরুত্ব পায়) যে নতুন হিন্দুস্থান জন্ম নিয়েছে, তারা এখন থেকে পাকিস্তানে ঢুকেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করবে! এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান অজয় সান্যালকে বলতে শোনা যায়, তারা মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঐকমত্যে এনেছে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে তাদের জঙ্গি নেটওয়ার্ক নিঃশেষের। এর মধ্য দিয়ে পর্দায় পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের আধিপত্যের প্রসার ঘটে।
একপর্যায়ে পাকিস্তানের পুলিশ গুপ্তচর পরিচয় জানতে পেরে হামজাকে বন্দি করে নির্যাতন করতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ফোন করেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে। ইসরায়েলের কাছে গোপন নথি বিক্রি করে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ করেছেন, চুক্তির সেই ভিডিও তাকে পাঠিয়ে ধমকের সুরেই হামজাকে ছাড়তে বলেন। ইসরায়েল এই চুক্তির ব্যাপারে ভারতকে জানিয়েছে গোয়েন্দা প্রধান অজয় সান্যাল এমনটাই দাবি করেন—যা ভারতের আধিপত্যেরই নামান্তর। পরে কথা মতো হামজাকে নির্জন স্থানে ছাড়লে, পাকিস্তান অ্যাসেম্বিলির সদস্য ও শ্বশুর জামিল জামালি পাকিস্তান থেকে চার্টার্ড বিমানে করে তাকে ভারতে পাঠান। তখনই কেবল হামজা জানতে পারেন তার শ্বশুর ৪৫ বছর আগে গুপ্তচর হয়ে পাকিস্তানে এসে সেখানকার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন; এবং চলচ্চিত্রে বড়ো সাব হিসেবে পরিচিত ১৯৯৩-এ ভারতের মুম্বাই বোমা ব্লাস্টের মাস্টারমাইন্ড দাউদ ইব্রাহিম-এর খাবারে বিষ প্রয়োগ করে জীবন্মৃত করে ফেলেন; যা অন্য কেউ জানে না। এর মধ্য দিয়ে ভারতের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তানের কতোটা গভীরে, দর্শক তা বুঝতে পারে।
সবমিলিয়ে ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ পাকিস্তানকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে, সেখানে যেনো কোনো সরকার ব্যবস্থা নেই কিংবা রাষ্ট্র ফাংশন করে না, কারণ সবটাই সস্ত্রাসীদের দখলে। এবং এসব সস্ত্রাসীরা কেবল ভারতের শত্রু নয়; তারা নিজেদের মানুষেরও দুশমন, কেননা তারা প্রতিনিয়ত বেলুচিস্তানিদের নির্মমভাবে হত্যা করে। ফলে ভারত নিজেদের রক্ষাকর্তা হওয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের নির্মূল করে পাকিস্তানেরও ত্রাণকর্তা হয়ে ওঠে।
মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের রক্ষাকর্তা ও নেতৃত্বদানকারী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আর সর্দার, ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ বহিঃশত্রু ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় ভারতকে কার্যকর শক্তি রূপে উপস্থাপন করে। এভাবেই গুপ্তচরকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র তিনটি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও জাতীয়তাবাদের সম্পর্ককে পুনর্গঠনের এক সাংস্কৃতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়। পাশাপাশি ওই সময়ের সরকারেরও প্রোপাগান্ডার অংশ হয়ে ওঠে এসব চলচ্চিত্র। নানা ছলে গুণগান তুলে ধরে তখনকার সরকার ও তাদের নানা কাজকর্মের। এ কারণেই গত এক দশকে কমপক্ষে সাতটি দেশে হামলা করা যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের প্রেসিডেন্ট চলচ্চিত্রে পৃথিবীর কল্যাণকামী মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে হাজির হয়। আর মোদি সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তে ৬০,০০০ কোটি নকল রুপি ভারতে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে লুই আলথুসারের বরাতে বলা যায়, এসব চলচ্চিত্র রাষ্ট্রের ভাবাদর্শিক হাতিয়ার হয়ে বলপ্রয়োগ ছাড়াই নাগরিককে জাতীয়তাবাদী চেতনায় দীক্ষিত করে তোলে।
তিন. নজরদারি, প্রাযুক্তিক সক্ষমতা ও যুদ্ধ বাস্তবতা
সম্প্রতি ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে চিনের এক প্রাইমারি স্কুলের প্রাযুক্তিক নজরদারির ঘটনা এবং ২০২৫ ও ২০২৬-এ যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে ব্যবহৃত প্রযুক্তি সম্পর্কে আলোকপাত করা এ আলোচনায় জরুরি। স্কুলে শিশুরা পড়ালেখায় মনোযোগী কিনা, তারা পড়ালেখার সময় অন্য কী ভাবছে—প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটা জানা সম্ভব। এ জন্য শিশুদের মাথায় বিশেষ ডিভাইস পরানো হয়, যা ব্রেন স্ক্যানার হিসেবে কাজ করে। এই ডিভাইস মস্তিষ্কের সঙ্কেত বোঝে এবং মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ করে রিপোর্ট তৈরি করে। সাদা, নীল, হলুদ ও লাল আলোর মাধ্যমে বাচ্চাদের মনোযোগের ধরন মূল্যায়ন করে তা শিক্ষকের মনিটরে পাঠিয়ে দেয়। এছাড়া স্কুলে রোবট আর ক্যামেরাও রয়েছে, যা বাচ্চাদের অভিব্যক্তি, কে কতোবার হাই তুলেছে, শরীরের কী অবস্থা তার প্রতিবেদন তৈরি করে অভিভাবকের কাছে পৌঁছে দিতো। বাচ্চাদের মনোযোগ বুঝতে পরীক্ষামূলকভাবে এটা করা হলেও অভিভাবকদের নানামুখী শঙ্কায় তা স্থগিত করা হয়।১৩ ইংরেজি ইউ আকৃতির এই ডিভাইসটি তৈরি করেছিলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ব্রেইনকো এবং সহযোগী অংশীদার ছিলো চিনা কোম্পানি ঝেজিয়াং ব্রেইনকো টেকনোলজি লিমিটেড। নজরদারির এই ঘটনা মিডিয়ার বরাতে জানা গেলেও অনেক ঘটনাই থেকে যায় অগোচরে। যেমন, ‘উইকিলিকস’ নথি ফাঁস না করলে দুনিয়া জানতে পারতো না যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে দিনের পর দিন তাদের নাগরিকদের নজরদারি করেছে। স্বজাতিদের যখন এই অবস্থা তখন ভিনদেশিদের কোন কায়দায় নজরদারি করা হয়/হচ্ছে সেটা সচেতন পাঠক আন্দাজ করতে পারবে আশা করি।
প্রযুক্তিগত নজরদারি ও তথ্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বিশ্ববাসী তা প্রত্যক্ষ করেছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও কর্তাব্যক্তিদের হত্যায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রযুক্তি এবং সি আই এ-এর দেওয়া তথ্য কাজে লাগায়। দীর্ঘদিন থেকেই ইসরায়েলি গুপ্তচররা খামেনিসহ তার পরিবারের সদস্য, মিত্র ও নিরাপত্তার দেখভালে থাকা ব্যক্তিদের নজরদারি করে নথি প্রস্তুত করেছিলো। যার কারণেই মাত্র এক মিনিটের মধ্যে গোটা ৩০-এর মতো বোমার আঘাতে এ হত্যাযজ্ঞ সম্পন্ন করতে পারে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘তিনি (খামেনি) আমাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং অত্যন্ত উন্নত নজরদারি ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে পারেননি।’১৪
অন্যদিকে হামলার জবাবে আক্রান্ত ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপনাস্ত্র কয়েকশত মাইল পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি-স্থাপনা এবং ইসরায়েলেও নিখুঁতভাবে আঘাত হানে। কতোটুকু ক্ষতি সাধন করা গেলো সেটাও ইরান সরাসরি দেখতে পেরেছে। ‘দ্য ফাইন্সিয়াল টাইমস’-এর তথ্য মতে, চিনের স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এতোটা নিখুঁতভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করতে পেরেছে।১৫
খামেনিকে হত্যার পর সি আই এ-এর এক সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য গুরুত্বের দাবি রাখে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে তথ্য ও উপাত্তের এত বেশি স্তর রয়েছে যে কেউই কোনো না কোনো সূত্র রেখে যাওয়া ছাড়া থাকতে পারে না। আপনি যা-ই করেন না কেন, তার একটা ছাপ থেকে যায়।’১৬ এর আগেও ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের জুনে ইসরায়েল দূরনিয়ন্ত্রিত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে চলন্ত গাড়িতে থাকা ইরানের এক শীর্ষস্থানীয় পরমাণুবিজ্ঞানীকে হত্যা করে। সেইসঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কম্পিউটারে ম্যালওয়্যার পাঠানো ও নথির আর্কাইভ চুরির ঘটনাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
এ আলোচনার উদ্দেশ্য একটাই, প্রযুক্তি ও সক্ষমতাকে ব্যবহার করে বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষমতাধর দেশগুলো কী ধরনের আধিপত্য বজায় রাখছে তা বোঝার চেষ্টা করা। নমুনায়িত গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রেও দর্শক একই ধরনের প্রযুক্তি ও সক্ষমতার গল্প লক্ষ করতে পারবে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রযুক্তি উপস্থাপনে সর্দার বেশ পিছিয়ে। ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ-এ প্রাযুক্তিক ব্যবহার থাকলেও সেটা অত্যাধুনিক নয়, মাঝারি গোছের। তবে মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং-এ লক্ষণীয় সর্বোচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত এ চলচ্চিত্রটিতে দেখা যায়, শত্রুর অবস্থান জানতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার, মুহূর্তের মধ্যেই অন্যের মুখাবয়ব ও কণ্ঠ নকলের প্রযুক্তি—যা হুবহু ওই ব্যক্তির আদল দেয়। চলচ্চিত্রে এ ধরনের একাধিক দৃশ্যে প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করা হয়। এছাড়া বিমানবন্দরের ভেতরকার এআই নজরদারির দৃশ্য (এসব নজরদারির প্রযুক্তি চিনের পাবলিক স্পেসে১৭ দীর্ঘদিন থেকেই আছে। বাংলাদেশের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও এই নজরদারির প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে ট্রাফিক আগের চেয়ে নিয়ন্ত্রণে এসেছে—গণমাধ্যম গুরুত্ব দিয়েই এসব সংবাদ পরিবেশন করছে। যা অন্যান্য নজরদারিকেও স্বাভাবিক করার পথ বাতলে দেয়) এবং সেই প্রযুক্তিকেও ইথানের বন্ধু বেনজি ও লুথার হ্যাক করে ধোঁকা দেয়। প্রতিপক্ষের লাইভ লোকেশন বর্ণনা ও এআইয়ের কাছে এসবের নিয়ন্ত্রণ হারাতেও দেখা যায়। ইথানের মতো সক্ষমতা সম্পন্ন গুপ্তচরও বন্ধুদের কণ্ঠ এআই হ্যাক করে বর্ণনা করায় ধোঁকা খান। সেইসঙ্গে অত্যাধুনিক সামরিক যুদ্ধ বিমান, সাবমেরিন, যুদ্ধ জাহাজ ও বিমানবাহী রণতরী এ চলচ্চিত্রে গুরুত্ব সহকারে দেখানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবমেরিন প্রযুক্তি এতোটাই সক্ষম যে, রাশিয়ার সামুদ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে পারে। পাশাপাশি এ চলচ্চিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমার সক্ষমতাও গুরুত্ব দিয়ে হাজির থাকে। যা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ সক্ষমতা ও প্রযুক্তিকে আধিপত্যসহ রিপ্রেজেন্ট করে। এসব দেখে দর্শক এটা অন্তত বুঝতে পারবে যে, এমন সব প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আছে যার মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যান্য শক্তিধর দেশকে বশে আনা যায়। ঘটনা এমন যে, দৃশ্যমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রে যা ঘটছে আগে, বাস্তবের দুনিয়ায় তা কখনো কখনো পরে ঘটছে।
এদিকে ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ-এ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান দেশের গোপন নথি ইসরায়েলকে দিয়ে দেয়, এমন একটা ভিডিও ভারতের গোয়েন্দা প্রধানের কাছে আসে। নজরদারি করে যে এ দৃশ্য ধারণ করা, চলচ্চিত্রে তা স্পষ্ট। সেইসঙ্গে আধুনিক অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষণীয় এ চলচ্চিত্রে। এসবের মাধ্যমে পাকিস্তানের ওপর ভারতের এক ধরনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে দর্শকের ভাবনায় ভারতই এগিয়ে থাকে। এই জায়গাতে জ্যঁ বদ্রিয়ার হাইপাররিয়ালিটির১৮ ধারণা প্রাসঙ্গিক। এখানে চলচ্চিত্র বাস্তবতার চেয়ে অধিক প্রভাবশালী এক কৃত্রিম বাস্তবতা তৈরি করে গুপ্তচরদের দেশরক্ষাকারী হিসেবে দেখায় আর প্রতিপক্ষকে জাতীয় শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করে। এখানে বিয়ং-চুল হানের ‘সাইকোপলিটিক্স’ ভাবনারও প্রয়োগ ঘটে। কারণ এতে দর্শককে মিশন সম্পর্কে অবগত করে নজরদারির বৈধতা তৈরি করা সহজ হয়। এ পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক দার্শনিক নোম চমস্কি ও এডয়ার্ড এস হারম্যান চিন্তার আলোকে সম্মতি উৎপাদনের১৯ প্রচেষ্টাও বলা চলে। ফলে বলাই যায়, এসব গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্র শত্রুর ভয় দেখিয়ে ও জাতীয় নিরাপত্তা সঙ্কটের কথা বলে নজরদারি ও যুদ্ধ-আধিপত্যের চিন্তাকেও স্বাভাবিক করার বৈধতা দিচ্ছে। যেমনটা বাস্তবে প্রত্যক্ষ করা যায় চিনের পাবলিক স্পেসের নজরদারিতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধে কিংবা বাংলাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থার নজরদারিতে। একটা সময় গিয়ে এসব নজরদারিকে যে আরো বৃহত্তর পরিসরে করা হবে না, তার নিশ্চয়তা কে দিবে?
চার. রাষ্ট্রীয় আনুগত্য ও নগণ্য জীবন
গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রের গল্পের মুখ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে লক্ষণীয়—সবকিছুকে উপেক্ষা করে প্রাধান্য পায় কেবল রাষ্ট্র। বায়োপাওয়ার২০ নিয়ে আলোচনায় ফুকো দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্র কেবল নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়, বরং মানুষের জীবনকেও শাসনের বিষয়বস্তুতে পরিণত করে। আর অ্যাকিল এমবেম্বে নেক্রোপলিটিক্স২১-এ এই চিন্তা আরো বর্ধিত করে বলেন, রাষ্ট্রই অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারণ করে কে বাঁচবে, কে মরবে ও কোন মৃত্যু রাজনৈতিকভাবে দৃশ্যমান বা অদৃশ্য থাকবে। বায়োপাওয়ার ও নেক্রোপলিটিক্স-এ ফুকো ও এমবেম্বে মানুষের জীবন-মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাসম্পন্ন যে আধুনিক রাষ্ট্রের কথা বলেন, এসব চলচ্চিত্র তারই দৃষ্টান্ত। এতে করে হামজা, সর্দার কিংবা ইথান হান্টদের মতো গুপ্তচরদের ব্যক্তিগত জীবন, পরিচয় ও অস্তিত্ব রাষ্ট্রের অধীন হয়ে পড়ে। যে জীবন আর ব্যক্তিগত থাকে না; পরিণত হয় রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশে।
ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ-এ নৃশংস হত্যাকারী হামজাকেই গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বেছে নেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। মূলত পুলিশ হেফাজত থেকে বন্দুকযুদ্ধে তারা তাকে অপহরণ করে। এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে পাকিস্তানে গুপ্তচরগিরি করতে গিয়ে হামজা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পাকিস্তানে গিয়ে বিয়ে ও পরে সন্তান হলেও দ্বিতীয় অংশের শেষ দিকে শ্বশুরকে বলতে শোনা যায়, ‘ওদের ভুলে যাও বাবা। এতে সবারই মঙ্গল। শুধু এটা মনে রেখো তোমার কারণে আমরা এই যুদ্ধ জিতে গেছি।’ এছাড়া চলচ্চিত্রের প্রথম পার্ট ও দ্বিতীয় পার্টের শুরুর টাইটেল কার্ডের লেখাও মনোযোগের দাবি রাখে। প্রথম পার্টের লেখায় ভগবদগীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৩৭ নম্বর এবং দ্বিতীয় পার্টে দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৪৭ নম্বর শ্লোককে উদ্ধৃতি আকারে হাজির করা হয়। প্রথম উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধে নিহত হলে অর্জুন স্বর্গ লাভ করবেন এবং জয়ী হলে পৃথিবীর রাজ্য উপভোগ করবেন। কর্তব্যে অটল থেকে ও সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করার আহ্বান করা হয় এখানে। দ্বিতীয় উদ্ধৃতিতে বলা হয়, ‘তোমার কর্তব্য হলো ধর্ম রক্ষা করা, পুরস্কার দাবি করা নয়। বিজয়ের প্রতিশ্রুতি যেনো তোমাকে পথ না দেখায়। রণক্ষেত্র ডাকছে, কর্মে অদম্য হও।’ এই চলচ্চিত্র রাষ্ট্রীয় কর্তব্যকে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করতে ধর্মীয়-নৈতিক আদর্শকে ব্যবহার করে এবং হামজার মতো গুপ্তচরদের আত্মত্যাগ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকে গীতার আলোকে বৈধতাও দেয়। ফলে পাকিস্তানের মাটিতে দেশ রক্ষায় ব্রত হওয়া হামজাদের মতো গুপ্তচরদের জন্য দিনশেষে যুদ্ধই হয়ে ওঠে পরম ধর্ম।
সর্দার-এও ৩২ বছর ধরে পরিবারের কারো সঙ্গে যোগাযোগ থাকে না সর্দারের। একমাত্র সন্তান ছাড়া পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলা হলেও তিনি কিছু জানতে পারেন না। বরং ৩২ বছর ধরে জেলের মধ্যে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী মিশনের। যে মহারাজের চিঠির অপেক্ষায় তিনি থাকেন, সেই মূলত তার পরিবারকে হত্যা করে। অন্যদিকে পরিবারেরও কেউ জানতো না যে, ভারতীয় গুপ্তচর হিসেবে সর্দার কাজ করছেন দীর্ঘদিন থেকে। আবার সর্দার কাউকে জীবনসঙ্গীও করতে চান না, কারণ রাষ্ট্রীয় কাজ বিঘ্ন হতে পারে। চলচ্চিত্রের একেবারে শেষ দিকে সন্তানের সঙ্গে দেখা হলেও তাদের মধ্যে খুব বেশি ইন্টারেকশন হয় না। সেসময় সর্দার তার কাছে থাকা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের যাবতীয় নথি ধ্বংস করে সরকার ও রাষ্ট্রের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেন। তার ভাষ্য, তাকে দীর্ঘদিন থেকে সবাই বিশ্বাসঘাতক হিসেবে জানে, ফলে এটা নিয়ে তার আপসোস নাই। কিন্তু সরকার ও রাষ্ট্র নিয়ে যাতে জনগণের মধ্য কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়, সেজন্য তিনি যাবতীয় প্রমাণ নষ্ট করে ফেলেন। চলচ্চিত্রে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যকে এমনভাবে হাজির করা হয় যেখানে ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্কের চেয়েও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ গুরুত্ব পায়।
মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং-এ ইথানকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় তিনি একসময় দাগী অপরাধী ছিলেন। অপরাধী তকমা দূর করে রাষ্ট্র তাকে এভাবে তৈরি করেছে। প্রতিদানস্বরূপ ইথান সর্বোচ্চ মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রীয় মিশন পরিচালনা করেন। স্ত্রীর মঙ্গলের কথা ভেবে তার থেকে দূরে থাকেন। কোনো ধরনের নতুন সম্পর্কে জড়ান না। তার ধ্যান-জ্ঞান যেনো রাষ্ট্রের হয়ে দুনিয়া রক্ষা করে যাওয়া। এভাবেই গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত জীবন, পরিচয় ও সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে উপস্থিত থাকে; যেখানে গুপ্তচরদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বন্ধন এবং আত্মপরিচয় রাষ্ট্রীয় কর্তব্যের কাছে তুচ্ছ। এসব চলচ্চিত্র দর্শকের মনে এই ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে যে, সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাষ্ট্র, তাহার উপরে নাই।
পাঁচ. রাষ্ট্রের গুম-খুনের দায় এড়ানো ও বৈধতা দান প্রসঙ্গ
আধুনিক রাষ্ট্রে গোপন মিশন, গুপ্তহত্যা ও গুমের ঘটনাকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ হিসেবে দেখা হয়। স্বার্থের দোহাই দিয়ে এসব কাজ করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তার দায় স্বীকার করে না। গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্র এ ধরনের আধেয় উপস্থাপনের মাধ্যমে বাস্তবের যেকোনো গুম-খুনের ঘটনাকে অস্বীকার যোগ্য করে তোলে। পাশাপাশি দর্শক/মানুষের কাছে এসব গুপ্তহত্যা কিংবা গুমের ঘটনাকে স্বাভাবিক করে বৈধতাও দেয়। ‘দ্য প্রিন্স’ গ্রন্থে ম্যাকিয়াভেলি রাষ্ট্র ও শাসকের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে ক্ষমতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কথা বলেন।২২ তার মতে, এর ফলে জনগণের কাছে শাসকের ইতিবাচক ও নৈতিক ভাবমূর্তি বজায় থাকে। এসবেরই প্রতিফলন ঘটে নমুনায়িত গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে।
মিশন ইমপসিবল চলচ্চিত্রে মিশনের শুরুতে গোয়েন্দাদের তরফ থেকে আসা বার্তায় আই এম এফ এজেন্ট ইথান হান্টকে উদ্দেশ করে বলা হয়, ‘আগের মতোই ধরা পড়ে গেলে কিংবা তাদের দলের কেউ মারা গেলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাদেরকে অস্বীকার করা হবে। এসব কিছু মেনে নিয়ে যদি চাও মিশনটি গ্রহণ করতে পারো।’ তার মানে ইথানের মতো গুপ্তচররা রাষ্ট্রের জন্য জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও আইনিভাবে তারা একা! রাষ্ট্র এখানে দায়হীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে, দায়িত্ব ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিয়ে দায় এড়িয়ে যায়।
এদিকে সর্দার-এ সর্দার রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে গুপ্তচরের কাজ করেন। পরিবারেই কেউই এ ব্যাপারে অবগত নয়। একপর্যায়ে সর্দারকে দেশদ্রোহী তকমা দিয়ে তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করা হয়। নিমিষেই সর্দারের অবদান রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে নিঃশেষ হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় সিস্টেমের ফাঁদে পরে সর্দারের ছেলেকে গাদ্দারের সন্তান পরিচয়েই বড়ো হতে হয়। নির্লিপ্ত এক রাষ্ট্রের দেখা মেলে এখানেও।
এদিকে পাকিস্তানে প্রবেশ করে হামজা সেখানকার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেন। অসংখ্য সন্ত্রাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন, রেহমান ডাকাতের মতো সন্ত্রাসীকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী’ পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে আনেন (রেহমানকে লিহারি টাস্কফোর্স মন্ত্রীর নির্দেশে ক্রসফায়ার দিতে নিয়ে যায়, তখন পুলিশকে নির্যাতন ও জিম্মি করে হামজা তাকে উদ্ধার করে)। এছাড়া এস পি আসলাম মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে প্রভাবিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্রসফায়ার দেওয়ার ব্যাপারে মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদকও দেওয়া হয়। হামজা পরে লিহারি টাস্কফোর্সের সঙ্গে মিলে রেহমানকেই হত্যা করেন। এর মাধ্যমে খুন ও গুমকে বৈধতা দানকারী রাষ্ট্রের দেখা মেলে। রাষ্ট্র চাইলে যে কাউকে হোমো সাকের করে বেয়ার লাইফে২৩ প্রতিপন্ন করতে পারে, শিক্ষার্থীদের জঙ্গি তকমা দিয়ে ক্রসফায়ার ও রেহমানকে হত্যার ঘটনা তারই খতিয়ান তুলে ধরে।
আবার হামজা, ইথান ও সর্দার আগামবেন বর্ণিত ‘স্টেট অব এক্সেপশন’২৪ বা ব্যতিক্রমী কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। ইথান যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন দেশে, হামজা পাকিস্তানে ও সর্দার পাকিস্তান-বাংলাদেশে খুন, নির্যাতন ও নজরদারি চালালেও তাদের রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো দায় নিতে হয় না। আবার হত্যাকাণ্ড ঘটালেও হামজা, ইথান, সর্দার, রেহমান কিংবা আসলামদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কোনো ব্যবস্থা নেয় না; যা গুম ও খুনের দায় এড়িয়ে যাওয়ারই নামান্তর। সেইসঙ্গে ইথানদের মতো গুপ্তচরকে রাষ্ট্রীয় মিশনে পাঠিয়ে তাদেরকে অস্বীকার করে বেয়ার লাইফে পরিণত করা হয়। চলচ্চিত্রগুলো এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার হাজির করে, যেখানে প্রোটাগনিস্ট চরিত্ররা আলথুসারের বর্ণিত দমনমূলক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত আগামবেনের বেয়ার লাইফ-এ পরিণত হয়। আর তখন রাষ্ট্র হয়ে ওঠে ‘মনু সংহিতা’র ‘রাষ্ট্রং বাহুবলাশ্রিতম’ কিংবা ম্যাক্স ওয়েবারের বর্ণিত বৈধ সহিংসতার একচেটিয়া অধিকারী।
দৃশ্যমাধ্যমের এসব ঘটনাকে কীভাবে বৈধতা দেওয়া হয় তা বুঝতে শরণাপন্ন হতে হয় গ্রামসির কালচারাল হেজিমনি২৫ ধারণার। তার মতে, শাসকগোষ্ঠী শুধু রাজনৈতিক শক্তিতে নয়, বরং সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের চিন্তাকে প্রভাবিত করে। গুপ্তচর চলচ্চিত্র দর্শকের এই ধারণা দেয় যে, রাষ্ট্রীয় গোপন মিশন ও সহিংসতা রাষ্ট্রের স্বার্থেই। এর মাধ্যমে দর্শক/মানুষকে রাষ্ট্রীয় আনুগত্যে শ্রদ্ধাশীল করে তোলা যায়। এখানেও জ্যঁ বদ্রিয়ারের হাইপাররিয়ালিটি ধারণা প্রাসঙ্গিক। নমুনায়িত গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো এমন এক বাস্তবতা দেখায়, যেখানে দর্শক রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডকে বিনোদন হিসেবে উপভোগ করে। দৃশ্যমাধ্যমের এসব ঘটনা বাস্তবে কী ধরনের বৈধতা দান করে তারই দৃষ্টান্ত বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করা ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতাদের ক্রমাগত হত্যায়।
ছয়. গুপ্তচরবৃত্তি ও পুরুষ প্রাধান্যশীলতার বয়ান
‘চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি পুরুষের দুনিয়া’—এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে এসেও তা অপরিবর্তনীয়। এখনো অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে কলাকুশলী সব ক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ বেশ পিছিয়ে। ২০২৫ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শীর্ষ ২৫০ আয়কারী চলচ্চিত্রের নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, সম্পাদক ও সিনেমাটোগ্রাফারসহ গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল পদে পুরুষদের অংশগ্রহণ ৭৭ শতাংশ আর নারীদের ২৩ শতাংশ।২৬ ভারতীয় উপমহাদেশের বেলাতে এ সংখ্যা আরো কম। আবার যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়লেও ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো গণ্ডি আবদ্ধ। চলচ্চিত্র নির্মাণ ও দেখার দৃষ্টিভঙ্গি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রবন্ধের জন্য বাছাই করা চলচ্চিত্রগুলো পুরুষ প্রাধান্যশীলতার বৈশিষ্ট্য নিয়েই হাজির হয়; গল্প, চরিত্র নির্মাণ ও সংলাপেও যার প্রতিফলন ঘটে। সর্দার, মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান, মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং, ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ-এ কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে একজন পুরুষ গুপ্তচরকে দেখা যায়, যিনি বুদ্ধিমত্তা, শারীরিক শক্তি, নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হন। এর মধ্য দিয়ে এটা উপস্থাপন হয় যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, শত্রুর বিরুদ্ধে মিশন পরিচালনা কিংবা সঙ্কটময় পরিস্থিতি মোকাবিলার দায়িত্ব পুরুষে কাছেই ন্যস্ত। ফলে গুপ্তচরবৃত্তি কেবল হয়ে ওঠে পুরুষালি পেশা। লরা মালভি তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ভিজ্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’য়২৭ মূলধারার চলচ্চিত্রের ক্যামেরা, বর্ণনা ও দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই যে পুরুষকেন্দ্রিকতার কথা বলে তারই দেখা মেলে এসব গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রে; যেখানে পুরুষ গুপ্তচর সক্রিয়কর্মী, আর নারীরা নিষ্ক্রিয় কিংবা পার্শ্বচরিত্র।
হামজা, সর্দার কিংবা ইথান শুধু দক্ষ গুপ্তচর নয়, বরং শারীরিকভাবে শক্তিশালী, বুদ্ধিমান, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ ও নারীদের কাছে আকর্ষণীয় আদর্শ পুরুষের প্রতীক হিসেবেও হাজির হয়। অন্যদিকে নারী চরিত্রের নিজস্ব এজেন্সি বা কৌশলগত গুরুত্বের চেয়ে পুরুষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে চলচ্চিত্রে।
ইথানকে এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখানো হয় যার দক্ষতা, সাহস ও আত্মত্যাগের কারণে গোটা বিশ্ব ধ্বংসের থেকে রক্ষা পায়। চলচ্চিত্রের নারী চরিত্র গ্রেস, প্যারিস কিংবা অন্যান্য চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও কাহিনির মূল চালিকাশক্তি ইথান। মিশনে নারীরা সহায়তাকারী শক্তি এবং সহজেই ইথানের ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়—এভাবে তাদের হাজির করা হয়। সঙ্কট নিরসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, জীবনের ঝুঁকি নেওয়া, নেতৃত্ব ও পৃথিবী রক্ষার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বর্তায় ইথানের কাঁধেই। এ চলচ্চিত্রের নারী প্রেসিডেন্ট এরিকার চরিত্রটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। চলচ্চিত্রে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নারীকে দেখালেও বাস্তবের যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকশত বছরের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো নারী দেশটির সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন হতে পারেনি!
একই প্রবণতা ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ-এও দেখা যায়। গোয়েন্দা কার্যক্রম, রাষ্ট্রের গোপন কৌশল ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রসঙ্গ পুরুষকে কেন্দ্রে রেখেই নির্মিত। এ চলচ্চিত্রে কোনো নারী গুপ্তচর নেই। যে জনা কয়েক নারী চরিত্র আছে, তাদের উপস্থাপন কেবল স্ত্রী হিসেবে। এবং তাদের কাজ সন্তান লালন করা। বিশেষ করে বলা যায় হামজার স্ত্রী ও রেহমান ডাকাতের স্ত্রীর কথা। অন্যদিকে পাকিস্তানে গিয়ে মিশন পরিচালনা, অসংখ্য সন্ত্রাসীদের নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্ব দেওয়া, মৃত্যু ঝুঁকি নিয়ে শত্রু মোকাবিলা করে চলে হামজা ও অন্যান্য পুরুষ চরিত্ররা। হামজা, রেহমান ডাকাত, হামজার শ্বশুর জামিল জামালি, এস পি আসলাম, মেজর ইকবাল, দাউদ ইব্রাহিম—সবগুলো চরিত্রের উপস্থাপনই সহিংসতাপূর্ণ; যা দিনশেষে পুরুষের বৈশিষ্ট্য আকারেই দর্শকের সামনে প্রতীয়মান হয়। আবার চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় অংশের শেষদিকে ছেলে জন্ম দিতে না পারায় আই এস আই প্রধান মেজর ইকবালকেও ভর্ৎসনা করেন তার বাবা। এবং ’৭১-এ বাংলাদেশ-পাকিস্তানের যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে অসংখ্য বাঙালি নারীকে ধর্ষণের কথা গর্বের সঙ্গে ছেলেকে বলতে থাকেন; যা নারীদের হেয় প্রতিপন্ন করে।
এদিকে সর্দার চলচ্চিত্রজুড়েই সর্দার ও তার পুলিশ ছেলে বিজয়ের রাষ্ট্রের জন্য আত্মত্যাগের কথা বলা হয়। গোয়েন্দা সংস্থা পরিচালনা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও পাকিস্তান-চিনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে পুরুষরা। নারী চরিত্রের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় আইনজীবী প্রেমিকা, কিছু না জানা সর্দারের স্ত্রী এবং সন্তানস্নেহ্নাশিস প্রতিবাদী মা হিসেবে। ফলে এ চলচ্চিত্রও রাষ্ট্র রক্ষার দায়িত্ব পুরুষকে দিয়ে মহিমান্বিত করে। ফলে গুপ্তচরভিত্তিক এসব চলচ্চিত্রকে সমাজতাত্ত্বিক আর উব্লিউ কনেল-এর বরাতে ‘হেজিমনিক মেসকুলানিটি’২৮ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়।
নমুনায়িত তিনটি চলচ্চিত্রই পুরুষকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে; এবং যারা নেতৃত্ব, যুক্তি, শারীরিক সক্ষমতা ও সহিংসতারও প্রতিনিধত্বকারী। স্পাইভিত্তিক চলচ্চিত্রের আধেয়ের ঐতিহাসিকতা পর্যালোচনা করলেও দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্র, ক্ষমতা, যুদ্ধ, সহিংসতা ও বীরত্বের মতো ধারণাগুলোকে পুরুষত্বের সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়েছে; যা পুরুষপ্রাধান্যশীল ক্ষমতাকাঠামোকেই পুনরুৎপাদন করে চলেছে।
সাত. সহিংস এক মসীহের আগমন
ইসলাম, ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্ম মতে, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের মতো ঘটনা যখন সমাজে চূড়ান্তভাবে বৃদ্ধি পাবে, তখন রক্ষাকর্তা মসীহের আগমন ঘটবে। এই পরিস্থিতিতে মসীহ ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানবজাতিকে সঙ্কট মুক্ত করবেন। এদিকে মনোবিশ্লেষণের আলোচনায় সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের অচেতন মনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে পাঠ করেন। মনের এই বৃহৎ অংশকেই তিনি ভয়, নিরাপত্তাহীনতা ও আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, সবসময় মানুষ এমন এক শক্তির আশ্রয় খোঁজে যা তাকে ভয় থেকে রক্ষা করবে।২৯ গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য শত্রুরা যেনো সেই ভয়কে প্রতিনিধিত্ব করে; আর মসীহ হয়ে ওঠেন সেই ভয় মুক্তির রক্ষাকর্তা। ফ্রয়েড পরবর্তী মনোবিশ্লেষক কার্ল ইউং তার ‘কালেক্টিভ আনকনশাস’ ধারণায় ‘সেভিয়র আর্কেটাইপ’-এর কথা বলেন।৩০ এই রক্ষাকর্তা বা ত্রাণকর্তা আর্কেটাইপকে তিনি মানবজাতির চিরন্তন মানসিক কাঠামোর অংশ হিসেবে কল্পনা করেন। গুপ্তচর চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলো যেনো সেই মসীহ বা সেভিয়র আর্কেটাইপ। তবে চলচ্চিত্রে এসব আবতারের দেখা মেলে সহিংস আকারে।
ধুরন্ধর ও ধুরন্ধর : দ্য রিভেঞ্জ ভগবদগীতার যুদ্ধের ফজিলতবিষয়ক শ্লোক দিয়ে শুরু হয়। চারদিকে যেনো যুদ্ধের প্রস্তুতি। এ যুদ্ধ পাকিস্তানের মুসলমান জঙ্গি ও তাদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের লালিত আই এস আই ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর দাজ্জালিক শক্তিকে মোকাবিলার জন্য সেখানে আগমন ঘটে মসীহ হামজার। যে মসীহ গরম রান্না করার পাতিলে ডুবিয়ে, প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে সন্ত্রাসীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেন। মুসলমানদেরও ‘দাজ্জাল’ রূপে দেখানো হয় এ চলচ্চিত্রে। সারা শরীরে বড়শি বিদ্ধ করে সেগুলো টেনে টেনে মারা—এ সময় আল্লাহ ও বিসমিল্লাহ শব্দগুলো হত্যাকারী মেজর ইকবাল বলতে থাকেন। এছাড়া ভারতীয় সংসদ ভবনে জঙ্গি হামলা, সুইসাইড বোম্বিং, বিমান হাইজ্যাক করা, মুম্বাইয়ের হোটেল তাজ-এ জঙ্গি হামলা, মাদক ও অস্ত্রের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিতে কিংবা বদলা নিতে হত্যার পর হত্যা করে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করে দেন হামজা। যা তার সহিংস মসীহ গুণাবলিকে প্রকাশ করে।
এদিকে মিশন : ইমপসিবল-ডেড রেকনিং পার্ট ওয়ান ও মিশন : ইমপসিবল-দ্য ফাইনাল রেকনিং-এ ইথান রক্ষাকর্তা হয়ে গোটা দুনিয়াকে ‘দাজ্জালিক শত্রু’ এ আই এনটিটি’র হাত থেকে রক্ষা করেন। পৃথিবীর তাবৎ ক্ষমতাশীল শত্রুদের সঙ্গে ইথান তার কয়েক সদস্যের দল নিয়ে লড়ে যান। দলের সবাই এতোটাই আত্মপ্রত্যয়ী যে, তাদের বিশ্বাস ইথান শেষ পর্যন্ত সব ঠিক করে ফেলবেন; তার পক্ষে সবকিছু সম্ভব। ইথান শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক যুদ্ধ এড়িয়ে ঠিকই দুনিয়ার রক্ষাকর্তা হয়ে ওঠেন। সর্দার-এও চিন ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন পাইপ লাইনের প্রজেক্ট ধ্বংস করে দেশকে রক্ষা করেন সর্দার। তিনি দেশকে পাকিস্তান ও চিনের ক্ষমতাবলয় থেকে মুক্ত করার জন্য যেভাবে দীর্ঘদিন গুপ্তচরের দায়িত্ব পালন করে যান, এর মধ্যে দিয়ে তিনি মসীহ অবতারেই দর্শকের মনে জায়গা করে নেন।
এক্ষেত্রে হান্না আরেন্টের Banality of Evil৩১ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। আরেন্ট দেখিয়েছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভয়াবহ সহিংসতাও ‘দায়িত্ব পালন’ হিসেবে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এ কারণেই গুপ্তচররা ব্যক্তিগত নৈতিকতা হারিয়ে রাষ্ট্রীয় নির্দেশ পালনকারী যন্ত্রে পরিণত হয়ে হত্যাকে আর ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে দেখে না; বরং মিশনের অংশই বিবেচনা করে।
বাস্তবের দুনিয়ার চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও অবিচারের সময়ে মানুষ ‘মসীহ’কে প্রত্যাশা করে না পেলেও গুপ্তচরভিত্তিক চলচ্চিত্রের পর্দায় নির্মাতারা কেন্দ্রীয় চরিত্র আকারে ঠিকই ‘মসীহ’কে হাজির করছে। পুঁজি প্রাধান্যশীলতার এই সময়ে বিচ্ছিন্ন মানুষ স্পাইভিত্তিক চলচ্চিত্রের এসব মসীহদের দেখে খানিক সময়ের জন্য হলেও গাজা, লেবালন, ইরানের কিংবা অন্যান্য দেশগুলোতে ক্ষমতাশালী দেশগুলোর নৃশংসতাকে ভুলে থাকতে পারে। যা দিনশেষে পুঁজির জয়োধ্বনিকেই অণু থেকে পরমাণু সব জায়গাতেই প্রবেশযোগ্য করে তোলে।
নিরন্তর আধিপত্যের যাত্রাসঙ্গী চলচ্চিত্র
মাধ্যম হিসেবে অন্য যেকোনো কিছুর থেকে চলচ্চিত্রের সক্ষমতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্রনির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটক একবার বলেছিলেন, ‘সিনেমা থেকে বেটার কোনো শিল্পমাধ্যম পেলে আমি সিনেমাকে লাথি মেরে চলে যাব।’ সমন্বিত শিল্পমাধ্যম চলচ্চিত্রকে তিনি নাটক, সঙ্গীত, সাহিত্য, চিত্রকলা কিংবা অন্যান্য মাধ্যমের চেয়ে এগিয়ে রাখেন। সক্ষমতা বুঝতে পেরে এ কারণেই একেবারে শুরুর সময় থেকে বিভিন্ন দেশের শাসকশ্রেণিকে দেখা যায় চলচ্চিত্রকে তাদের মতাদর্শ প্রচারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্যবহার করতে। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় সোভিয়েত রাশিয়ার বলশেভিক সরকারের অ্যাজিট ট্রেনের কথা। ভ্রাম্যমাণ এই প্রচার মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাণ, প্রক্রিয়াকরণ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিলো। এর উদ্দেশ্য ছিলো শাসকের মতাদর্শকে দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার। যার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের মাহাত্ম্যই প্রকাশ পায়। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নানা অনুষঙ্গ যুক্ত হওয়ায় চলচ্চিত্র (দৃশ্যমাধ্যমও পড়া যেতে পারে) এখন অন্য যেকোনো মাধ্যমের তুলনায় হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী।
তাই চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদন মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং আধুনিক রাষ্ট্র ও সরকার তার ভাবাদর্শ, সক্ষমতা, জাতীয়তাবাদ, প্রাযুক্তিক নজরদারি ও যুদ্ধ-সহিংসতার সাংস্কৃতিক বয়ান তৈরিতেও খোলামেলাভাবে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন কার্যকলাপ প্রোটাগনিস্ট চরিত্রগুলোর ইমোশনাল এটাচমেন্টের কারণে সাংস্কৃতিকভাবে বৈধতাও পাচ্ছে। এ কারণে মসৃণ হয়েছে শত্রু রাষ্ট্র নির্মাণ ও অপরায়ন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও ব্যক্তিসত্তার ওপর রাষ্ট্রীয় আধিকার প্রতিষ্ঠারও পথ। যা দর্শককে বাস্তবতার ভ্রমে ফেলে রাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রকল্পকেই শক্তিশালী ভিত দেয়।
তাই আলথুসারের বরাতে বলা চলে, স্পাইভিত্তিক চলচ্চিত্র রাষ্ট্রের মতাদর্শ প্রচারের মোক্ষম হাতিয়ার। এই হাতিয়ার কোন রাষ্ট্র, কোন বাস্তবতায় ব্যবহার করছে তা যেনো ধরা দেয় সমসাময়িক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়েই। বাস্তবে রাষ্ট্রের আধিপত্য, সক্ষমতা ও সহিংসতা যতো বাড়বে নানা ভিজ্যুয়াল কনটেন্টে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় জয়গান ততো প্রকট হবে। এ কারণে বলা চলে, বৈশ্বিক চলমান যুদ্ধ-সহিংসতা ও আগ্রাসনের পূর্বাভাস যেনো এসব স্পাইভিত্তিক চলচ্চিত্র।
লেখক : সোহাগ আব্দুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে রাজশাহীর নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে একই বিষয়ে পড়ান।
abdshohag.bd@gmail.com
https://www.facebook.com/abd.shohag.3
তথ্যসূত্র ও টীকা
১. ‘যেভাবে তুলে নেওয়া হয় মাদুরোকে’; দেখুন : https://www.prothomalo.com/world/south-america/l2mt3ius7i; retrieved on: 10.06.26
২. “Trump reveals Venezuela’s Maduro was captured in ‘fortress’-like house: ‘He got bum rushed so fast’”; দেখুন : https://www.foxnews.com/politics/trump-reveals-venezuelas-maduro-captured-fortress-like-house-he-got-bum-rushed-so-fast; retrieved on: 11.06.26
৩. ‘Studios bet on horror movies to reanimate cinemas’; দেখুন : https://www.reuters.com/business/media-telecom/studios-bet-horror-films-reanimate-cinemas-2025-07-05/; retrieved on: 12.06.26
৪. ‘Is Wikileaks putting people at risk?’;দেখুন : https://www.bbc.com/news/technology-37165230;retrieved on: 12.06.26
৫. Foucault, M. (1977); Discipline and Punish: The Birth of the Prison (A. Sheridan, Trans.); New York, Pantheon Books.
৬. Han, B.-C. (2017); Psychopolitics: Neoliberalism and New Technologies of Power (E. Butler, Trans.); Verso Books.
৭. Han, B.-C. (2015). The Transparency Society (E. Butler, Trans.); Stanford University Press. (Original work published 2012)
৮. Althusser, L. (1971: 127–186); Ideology and Ideological State Apparatuses (Notes towards an investigation); In L. Althusser, Lenin and Philosophy and Other Essays (B. Brewster, Trans.); Monthly Review Press.
৯. প্রাগুক্ত, Althusser (1971).
১০. Agamben, G. (2005); State of Exception (K. Attell, Trans.); University of Chicago Press. (Original work published 2003)
১১. Agamben, G. (1998); Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life (D. Heller-Roazen, Trans.); Stanford University Press. (Original work published 1995)
১২. Said, E. W. (1978); Orientalism; Pantheon Books.
১৩.‘Chinese primary school halts trial of device that monitors pupils' brainwaves’; দেখুন :https://www.theguardian.com/world/2019/nov/01/chinese-primary-school-halts-trial-of-device-that-monitors-pupils-brainwaves; retrieved on: 10.06.26
১৪. ‘বহু মাস ধরে পরিকল্পনার পর খামেনিকে হত্যায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অভিযান’; দেখুন : https://www.google.com/amp/s/www.bbc.com/bengali/articles/c0e5dedevdqo.amp; retrieved on: 10.06.26
১৫. ‘Iran used Chinese spy satellite to target US bases’; দেখুন : https://www.ft.com/content/1fddd2cd-1294-4e9c-a17d-5ea06b399355?syn-25a6b1a6=1; retrieved on: 14.06.26
১৬. ‘দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন : খামেনিকে হত্যা : ইরানে রয়েছে ইসরায়েলের গুপ্তচর, তার সঙ্গে যোগ হয় সিআইএর আড়ি পাতার তথ্য’; দেখুন : https://www.prothomalo.com/world/middle-east/a60bayfos4; retrieved on: 13.06.26
১৭. চিন তাদের দেশে আধুনিক নজরদারির প্রকল্প চালু করে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে। গোল্ডেন শেল্ড, সেফ সিটিজ, স্কাইনেট, স্মার্ট সিটিজ ও শার্প আইজ-এর মতো প্রজেক্টের মাধ্যমে পাবলিক ও প্রাইভেট স্পেসে ২০০ মিলিয়নের বেশি নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে চিনজুড়ে। যার মধ্য দিয়ে চিন শতভাগ পাবলিক স্পেসকে নজরদারির আওতায় এনেছে। এতে দেশের নাগরিকরা নানা ধরনের নিরাপত্তা সুবিধার আওতায় আসবে বলে দেশটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছে। বিস্তারিত দেখুন : https://onezero.medium.com/chinas-sharp-eyes-program-aims-to-surveil-100-of-public-space-ddc22d63e015; retrieved on: 14.06.26
১৮. Baudrillard, J. (1994); Simulacra and Simulation (S. F. Glaser, Trans.); University of Michigan Press. (Original work published 1981)
১৯. Herman, E. S., & Chomsky, N. (1988); Manufacturing Consent: The Political Economy of the Mass Media; Pantheon Books.
২০. Foucault, M. (1990); The History of Sexuality, Volume 1: An Introduction (R. Hurley, Trans.); Vintage Books. (Original work published 1976).
২১. Achille Mbembe. (2003); Necropolitics. Public Culture, 15(1), 11–40. https://doi.org/10.1215/08992363-15-1-11.
২২. Machiavelli, N. (1998); The Prince (H. C. Mansfield, Trans., 2nd ed.). University of Chicago Press. (Original work written 1513, published 1532)
২৩. প্রাগুক্ত; Agamben (1998).
২৪. প্রাগুক্ত; Agamben (2005).
২৫. Gramsci, A. (1971); Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. N. Smith, Eds. and Trans.); International Publishers.
২৬. ‘The Celluloid Ceiling: Employment of Behind-the-Scenes Women on Top Grossing U.S. Films in 2025’; দেখুন : https://womenintvfilm.sdsu.edu/the-celluloid-ceiling-employment-of-behind-the-scenes-women-on-top-grossing-u-s-films-in-2024-2/?utm; retrieved on: 14.06.26
২৭. Mulvey, L. (1975); Visual pleasure and narrative cinema. Screen, 16(3), 6–18. https://doi.org/10.1093/screen/16.3.6.
২৮. Connell, R. W. (1995); Masculinities; University of California Press.
২৯. Freud, S. (1961); The Future of An Illusion (J. Strachey, Trans.); W. W. Norton & Company. (Original work published 1927)
৩০. Jung, C. G. (1968); The Archetypes and the Collective Unconscious (Collected Works, Vol. 9, Part 1); Princeton University Press.
৩১. Arendt, H. (2006); Eichmann in Jerusalem: A Report on the Banality of Evil (Rev. ed.); Penguin Books.
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন