মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত ২৩ জুন ২০২৬ ১২:০০ মিনিট
অন্যকে জানাতে পারেন:
ধারাবাহিক পাঠ
সিনেমা দেখার গল্প
মফিজ ইমাম মিলন

প্রথম কবিতা লিখেছিলাম একটি মেয়েকে উদ্দেশ করে। আমার বয়স তখন ১৪’র কম। কিন্তু কথা হচ্ছে, হঠাৎ আমি কবিতা লিখতে শুরু করলাম কেনো? আমাদের পরিবারে এমনকি বংশেও কেউ কবি, সাহিত্যিক ছিলেন না। তবে আমার দাদা প্রচুর পড়তেন, বই সংগ্রহেও রাখতেন। সেসব অবশ্য ভিন্ন গল্প। কিন্তু আমি কেনো কবিতা লিখতে গেলাম সেই অল্প বয়সে। তাও আবার একটি মেয়েকে নিয়ে। তার চেয়ে আরো বেশি শরমের ব্যাপার সে মেয়েটি আমারই বড়ো বোনের বান্ধবী। তারা দুজনেই অষ্টমে, আমি তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। দুজনেই আমাকে তুই-তুমি করে বলে, আমি তাদের আপনি বলে সম্বোধন করি। সিনেমা দেখার গল্প লিখতে বসে কবিতা লেখার গল্প বলে ফেলেছি! অবশ্য এই কবিতার জন্ম সেই সিনেমার একটি গান থেকে। এবার সিনেমার গল্পটি আগে বলি।
১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ। দেশ তখন গণআন্দোলনের চরম শিখরে। রাজপথ দখলে ছাত্র-জনতার। মুহুর্মুহু স্লোগান ‘আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। সোনার বাংলা শ্মশান কেনো; জবাব চাই, জবাব চাই। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা।’ এই সময় অনেক নেতা, ছাত্র-জনতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পরই স্লোগান উঠতো তাদের নামে--‘জেলের তালা ভাঙবো ... ভাইকে আনবো। ... ভাই জেলে কেনো, জবাব চাই জবাব চাই।’ তৎকালীন শোষক সরকারের কাছে জবাব চাওয়ার একটা জায়গা ছিলো। তখন তো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে চেনা যেতো, বিহারিদের ধরা যেতো, ফলে জবাব চাওয়া যেতো। এখন তো আমরা আমরাই। ফলে জবাব চাই, জবাব চাই--এ স্লোগান আর শোনা যায় না এখন। এমনই এক উত্তাল মুহূর্তে আমাদের জেলা শহরের একমাত্র সিনেমাহল ‘অরোরা টকিজ’-এ মুক্তি পেলো দর্পচূর্ণ। কে পরিচালক, কে প্রযোজক এসব বুঝবার বয়স তখনো হয়নি। তবে নায়ক-নায়িকাদের নাম জানতাম, তাদের দেখলেই মনে হতো আমার অনেক দিনের চেনা। দর্পচূর্ণ শব্দের অর্থ হলো, অহংকার, গর্ব-গরিমাকে যে হরণ করে, ভেঙেচুরে দেয়, সে। এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন, রাজ্জাক, কবরী, আনোয়ার হোসেন, ফতেহ লোহানী, খান জয়নুল, আনিস এমন অনেক খ্যাতিমান অভিনয়শিল্পী। সেসময়কার জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী আর সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ছিলো সেই মন ভরানো, হৃদয় কাপানো গান--
তুমি যে আমার কবিতা, আমারও বাঁশির রাগিনী
আমারও স্বপন আধো জাগরণ, চিরদিন তোমারে চিনি
তুমি যে আমার কবিতা
আমি কে তোমার যদি জানতে
তবে কী আমায় কাছে টানতে
হয়তো সুদূরে যেতে গো দূরে
না না নয়নের নীলে তুমি যে ছিলে
চিরদিন তোমারে চিনি
তুমি যে আমার কবিতা ...
রাজ্জাক-কবরীর মুখের এই গান আমাকে অল্প বয়সে পাকা বানিয়ে দিয়েছিলো। কী যে প্রেমের গান, কী যে আকুতি, প্রণয়ের আহ্বান প্রিয়তমাকে! কবিতার সঙ্গে উপমা দিয়ে কাছে টানবার ছলনা করছে!
সেই অল্প বয়সে আমারও সাধ জাগলো কাউকে প্রিয়তমা বানিয়ে ‘তুমি যে আমার কবিতা’ গানে অভিনয়ের মতো খেলা করি। আশপাশে কাউকে না পেয়ে বড়ো বোনের বান্ধবীকেই মনে মনে চয়েস করেছিলাম। সে বেশ নাদুসনুদুস, দেখতে সুন্দর--তাকে ভালো লেগে গেলো। কেনো ভালো লাগলো, কীসের ভালোলাগা, তা নিজেও বুঝতে পারলাম না! কিন্তু তাকে কবিতার মতোই ছন্দ মিলিয়ে প্রেমপত্র লিখে বসলাম! আমার মধ্যে দুই ধরনের শিহরণ কাজ করতে লাগলো। একে তো কবিতা লিখেছি, দ্বিতীয়ত প্রেমপত্র লিখে মনের পছন্দের মানুষটিকে দিতে পেরেছি। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা আর অপেক্ষা শুধু চিঠির উত্তরের আশায়। হঠাৎ উত্তর পেলাম--শনিবার ছাদে। ঘুম হারাম হয়ে গেলো। শনিবার আসতে আরো চার দিন দেরি। শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় তার জন্যে আর নিজের জন্যে খুব দোয়া করলাম। মনে মনে তাকে জড়িয়ে একটা জুটি বানিয়ে ফেললাম। ‘তুমি যে আমার কবিতা’, কেমন করে তার ঘাড়ে হাত রেখে বলবো। সে যখন বলবে--‘না না নয়নেরও নীলে তুমি যে ছিলে, চিরদিন তোমারে চিনি’। আমি তখন কেমন করবো। জল্পনা-কল্পনা করতে করতে শনিবার এলো। বিকেলে ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী যে ভাবছি তা নিজেই জানি না। বড়ো বোন হঠাৎ এসে হাজির। কী করিস তুই, ছাদে কেনো? আমি খানিকক্ষণ তোতলা মানুষের মতো--এই ইয়ে মানে কাজ আছে, কীসব বলতে শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে আমার ভালোলাগার মানুষটি মাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির!
মা বললেন, এই হাতের লেখা তোর? আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। মাকে তো কোনোদিন মিথ্যে বলিনি, আজ কী করবো। কিন্তু বলার আগেই বড়ো বোন বললেন, তোর খাতার সঙ্গে মিলিয়েছি, এ হাতের লেখা তোর। কোনো জবাব নেই, কী বলবো! তবে আমার সেদিন মরে যেতে ইচ্ছে করেছিলো। আর যাকে এতো আদর করে ভালোবেসে চিঠি লিখেছিলাম, তাকে মনে হলো জীবনের চির শত্রু। এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে জানলে, ওর দিকে ফিরেও তাকাতাম না। মা আমাকে কিল, চড়, থাপ্পড় দিলেন, তাও ওদের সামনেই। সত্যি সত্যি সেই যে কবিতা লেখা বাদ দিয়েছি আজো আর কবিতা লিখি না। অবশ্য কবিতা লিখতেও পারি না। কবিতা ভালোবাসি।
দর্পচূর্ণ দেখতে আমার খুবই ভালো লেগেছিলো। ফলে তিন বার দেখেছি। পুরো সিনেমা দেখা হতো না। শুধু ‘তুমি যে আমার কবিতা’ এই দৃশ্য ভালো লাগতো বেশি। আরেকদিন আমার বন্ধু বাতেনকে সঙ্গে নিয়ে যাই সিনেমা দেখতে। বাতেন টিকিট কাটার সময় একটা অঘটন ঘটায়--টাউন হাবিলদারের মোছ ধরে টান দেয়। তখন কোতোয়ালি থানায় দুই পোস্টের লোককে শহরের সবাই চিনতো। একজন হলো টি এস আই। টাউন সাব ইন্সপেক্টর আর অন্যজন টাউন হাবিলদার। শহরের যেকোনো মারামারি, বাকবিতণ্ডা, মিছিল-মিটিংয়ে এরা সবার আগে হাজির হতো। টাউন হাবিলদার দাউদ ছিলো অবাঙালি। সিনেমাহলের টিকিট ব্ল্যাকারদের সঙ্গে তার ছিলো সখ্য। সাধারণ দর্শককে টিকিট কাউন্টার থেকে লাঠি উঁচিয়ে হাটিয়ে-হাটিয়ে বলে সে সরিয়ে দিতো। তখন ব্ল্যাকাররা টিকিট কিনে বেশি দামে বিক্রি করতো। হাবিলদারকে তারা এর জন্য পয়সাও দিতো। আমাদের টিকিট কাটার সময় হাবিলদার হাটিয়ে-হাটিয়ে করে তাড়া করলে, বন্ধু বাতেন পিছন থেকে হাত দিয়ে হাবিলদারের মোছ ধরে টান দেয়। হাবিলদার কন্ কন্ করে ফিরে তাকিয়ে বুঝতে পারে না কে এই কাজ করেছে। গালাগাল করতে থাকে একচাপা। ওই ভিড়ের ভিতর থেকেই কে যেনো বলে উঠে--‘ম্যাওড়া বিহারি শালা, দ্যাশে আন্দোলন শুরু হইছে, দ্যাখবি কিছুদিন যাক’। বাতেন ভিড় ঠেলে যেয়ে ‘রিয়ার স্টল’-এর দুটি টিকিট কেটে নিয়ে আসে। বাতেন সিনেমা দেখতে দেখতে দাউদ হাবিলদারকে যে সে ভয় পেয়েছে, সেকথা বার বার বলতে থাকে--আচ্ছা আমাকে কি চিনে ফেলেছে, পরে কোনো ঝামেলা হলে কী করবো! কিছুক্ষণ পর বাতেন বলে, দোস্ত তুই দ্যাখ আমি মুইতে আসি। আমরা স্থানীয়ভাবে প্রস্রাবকে ‘মুত’ বলি। বাতেন গেইটম্যানকে বলে বাইরে যেয়েই আবার ফিরে চলে আসে। কিরে দোস্ত এতো তাড়াতাড়ি! নারে দোস্ত দাউদ হাবিলদার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! বাতেনের আর মুতা হয় না। বাতেন সিনেমা দেখতে থাকে।
সিনেমার ইন্টারভেলের সময়ও সে বের হবে না, এমনই প্রতিজ্ঞা তার। যথারীতি হাফ টাইমের লাইট জ্বলে উঠলো। বাদাম, চানাচুর, ফানটা হকাররা শোর করতে লাগলো। বাদামওয়ালার কণ্ঠটা একটু ভিন্ন রকমের ছিলো--সে তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বাদেম-বাদেম বলছে। কিন্তু বন্ধু বাতেন ভয় পেয়ে সিটের নিচে ঢুকে জড়োসড়ো। আমি বললাম, দোস্ত তুই এমন করিস ক্যান? ও বলে, দোস্ত আমারে ডাকে। বাদামওয়ালা কাছাকাছি এসে আবারো বাদেম বলে ডাক দিতেই বাতেন বলে ওঠে, এই যে স্যার আমি এইখানে। হাতজোড় করে উঠে দাঁড়ায়। বাদামওয়ালা হকচকিয়ে যায়। বাতেন বাদামওয়ালাকে দেখে হতভম্ব হয়ে যায়। তুই ওমন করলি ক্যান? বাতেন বলে, আমি ভাবছি দাউদ হাবিলদার আমার নাম ধরে বাতেন-বাতেন বলে ডাকছে।
সাত ভাই চম্পা দেখার গল্প
আমরা ছোটোবেলায় গ্রামে থাকতাম না; বেড়াতে যেতাম। গ্রামে গিয়ে উন্মাদ বালকের মতো দিগদিগন্তে ছোটাছুটি করেছি। বিরাট বিরাট মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। নৌকায় চড়ে হাটে গিয়েছি। হাট থেকে তাবিজ কিনেছি, যা সঙ্গে থাকলে নাকি সাপে কামড় দিলেও কিচ্ছু হয় না। কুলুদের বাড়ির তেল ভাঙানো দেখেছি; কেমন করে তিল-তিশি-সরষে পিষে তেল বের করা হয়। গ্রামের মাঠ-ঘাট, গাছ-গাছালি, পশু-পঙ্খী নিয়ে আমাদের কৌতূহল ছিলো বেশি। আমার দাদা, ফুপু, চাচাতো ভাইয়েরাও গ্রামে থাকতো। গ্রামের স্কুলেই তাদের লেখাপড়া শেখা। ঈদ, বিয়ে-শাদীতে গ্রামে গেলে সেখানকার ছেলে-মেয়েরা শহরের গল্প শোনার জন্য ঘিরে ধরতো। স্টিমার, রেলগাড়ি এমনকি বাস কীভাবে চলে সে গল্পও তারা হতবাক হয়ে শুনতো। আমরা তখনো মিথ্যা বলতে শিখিনি। সত্য কথা বলতে হয়, সেরকম দীক্ষাই পেয়েছি গুরুজনদের কাছ থেকে। ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে না বলে সত্যটুকুই গল্প করেছি। তাতেই তারা বিস্মিত। মুড়ি মানুষ কিনে খায়, এ কথা তাদের বিশ্বাস করাতে কষ্ট হয়েছে। সকালে চা-নাস্তা খেয়ে দুপুরে ভাত খায়--এমন কথা বিশ্বাস করাতেও বেগ পেতে হয়েছে তাদের।
আমাদের দাদাবাড়ি ছিলো রাজবাড়ি মহকুমার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের পাকশিয়া গ্রামের পাকিস্তানের হাটের পাশে। ‘বিশ্বাস বাড়ি’ বলেই সবাই জানতো, চিনতো। আবার কেউ কেউ জুম্মাঘরওয়ালা বাড়িও বলতো। সেকালে মসজিদকে বলা হতো ‘জুম্মাঘর’। শুধু শুক্রবারে গ্রামের মানুষ আসতো জুম্মার নামাজ পড়তে। ওয়াক্তিয়া নামাজ অধিকাংশ মানুষই বাড়িতে, মাঠে কাজ করার সময় হাতাইলে গামছা বিছিয়ে পড়ে নিতো। রমজান মাসে গ্রামে বেড়াতে গিয়ে অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছি। মাগরিবের আজান দিলে মানুষ টিউবওয়েলের পানি বা পুকুরের পানি দিয়ে ইফতার সেরেছে। আবার হাট থেকে ফেরার পথে আজান হয়ে গেলে একজন আরেকজনকে তাগাদা দিয়েছে, ‘এই বিড়ি ধরা, আজান দিছে’। অথচ এই সহজসরল মানুষগুলো আমাদের মতো মিথ্যে বলতো না। সত্যকে সত্য, মিথ্যেকে মিথ্যা বলতো। আসলে গ্রামে ইফতারের তেমন কোনো তোড়জোর ছিলো না। মধ্যবিত্তরা আখের গুড়ের শরবত, চিড়া ভিজানো পানি আর বাড়ির গাছের কলা দিয়ে ইফতার করতো।
একবার আমরা ঈদ করতে দাদাবাড়ি যাই। মা সেবার নিউ মার্কেট থেকে পিতলের সেমাই বানানো মেশিন কিনে নিয়েছিলো। সেই মেশিনের মধ্যে সিদ্ধ আটা দিয়ে ঘুরান দিলেই সেমাইয়ের আকারে পিঠা বের হয়ে আসে মুহূর্তেই। বিজ্ঞানের এই আবিষ্কার দেখার জন্য গ্রামসুদ্ধ মহিলাদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। আমার মা একে তো শহুরে মেয়ে, কুচি দিয়ে কাপড় পরে। তার ওপর আবার পিঠা বানানোর মেশিন নিয়ে এসেছে। তার ঠাট দেখে কে! মা-ও বেশ ভাবে ভাবে মত্ত হয়ে উঠলো। বাড়ির উঠতি বয়সি ননদ, দেবর জনাদশেক এসে মাকে অনুরোধ করলো, তারা কোনোদিন সিনেমা দেখেনি। ভাবী সাহেব যেনো তাদের সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করে দেয়। হঠাৎ সিনেমা দেখার এই উৎসাহ জেগেছে রাজবাড়ি মহকুমা শহরের ‘চিত্রা সিনেমাহলে’ সাত ভাই চম্পা সিনেমা চলার কারণে। খুবই দুঃখের সিনেমা--সাত ভাই ফুল হয়ে গাছে ফোটে আর তাদের বোন পারুল গান গেয়ে তাদের মানুষে রূপ দেয়। এসবই দরবেশের কাজ।
আমার দাদাবাড়ির লোকজন অনেকটা কুষ্টিয়া-কুমারখালী ঘেঁষা। তারা জেলাশহর ফরিদপুর না গিয়ে কুষ্টিয়া যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো বেশি। কুমারখালীতে তখন বিরাট কাপড়ের হাট বসে। কম পয়সায় মার্চ লাইটের লুঙ্গি, বিছানার চাদর আর গামছা পাওয়া যায়। কালুখালী থেকে পায়ে হেঁটে দাদাবাড়ির পথ গ্রামের রাস্তার তিন মাইল। শুকনাকালে সবাই পায়ে হেঁটে, বড়ো গেরস্থদের কেউ কেউ বাইসাইকেল চালিয়ে রতনদিয়া বাজারে যায়। মেয়েরা স্টেশনে যায় পালকিতে চড়ে। তবে বর্ষা মৌসুমে সবারই নৌকা ছাড়া গত্যন্তর নেই। ছেলে-ছোকড়ারা ট্রেনের হিসাব রেখে কুষ্টিয়া যায়। সেখানে ‘রক্সি’ ও ‘পাকপিকচার’ নামে দুটি সিনেমাহল আছে, লুকিয়ে সিনেমা দেখে বাড়ি ফেরে।
মা সিনেমা দেখা আর দেখানোর জন্যে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো বাড়ির মুরব্বিরা টের পেলে এ বাড়ির বংশ মর্যাদা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এ বাড়ির বড়ো বউ (মা), যে ঢাকায় প্রতি সপ্তাহে সিনেমা দেখে তা কয়জন জানে? পিছন বাড়ি থেকে নৌকা ছাড়লো। মায়ের বোন লাইলী খালা অসুস্থ, তাকে দেখতে যাবে; আবার আজই ফিরে আসবে। এই শর্তে বাড়ির মুরব্বিরা রাজি হলো। অনেকে মায়ের ভূয়সী প্রশংসা করলো--কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে এসেছে, তাও আবার বোনের অসুখের কথা শুনে দেখতে যাচ্ছে; এমন বউ কজনের বাড়িতে আছে। নৌকা ছাড়লো। পাটকাঠি দিয়ে ছই বানানো, তা আবার পরনের শাড়ি দিয়ে ঘেরা। বিশাল দুঁয়া (বিল ধরনের) পার হয়ে, চাতরার খাল পেরিয়ে হামরাটের ভিতর দিয়ে নদী চন্দনায় যেয়ে যখন পড়লাম, তখন তাতে বিশাল স্রোত। সবাই আল্লাহ-রাসুলের নাম নেন--মাঝি মকসেদ মোল্লার হুশিয়ারি। একসময় চন্দনার বড়ো সাঁকোর ঘাটে নৌকা বাঁধা হলো। সেখান থেকেও প্রায় আধা মাইল হেঁটে কালুখালী জংশন স্টেশন। মায়ের নির্দেশ মতো পিঁপড়ের খাড়ির মতন এগোতে লাগলাম হেঁটে হেঁটে।
স্টেশনে পৌঁছে জানা গেলো, এক ঘণ্টার আগে রাজবাড়ি যাওয়ার কোনো গাড়ি নেই। মকসেদ মাঝিকে বলা হয়েছে, তুমি এখানেই অপেক্ষা করবে, আমরা রাতে ফিরবো। অবশেষে ঢাকা মেইল ট্রেন যথাসময়ে পৌঁছে গেলো স্টেশনে। ইন্টার ক্লাশের টিকিট কাটা হয়েছে। আমরা সবাই বসে পড়েছি। কিন্তু দুই জন ট্রেনে উঠতে পারে না ভয়ে। তারা এর আগে কোনোদিন ট্রেনে চড়েনি। মা তাদের প্লাটফর্ম থেকে টেনে তুললেন। মেইল ট্রেন বেলগাছি, সূর্যনগর এই দুই স্টেশনে থামে না। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রাজবাড়ি পৌঁছে গেলাম। রাজবাড়ি মহকুমা শহর হলেও ট্রেন যাত্রীদের জন্য বড়ো স্টেশন। এ গাড়ি ও গাড়ির জংশন। ট্রেনের টিকিট কাটার ঘণ্টা, ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টা, কুলি-মজুরের হাকডাক, মালগাড়ির মাল খালাস, গার্ড সাহেব, চেকার, পোর্টার, সিগন্যালম্যানদের কথাবার্তা সবমিলিয়ে সেই আমলে রাজবাড়ি এক বিশাল কর্মযজ্ঞের আবাস রেলের। স্টেশন থেকে সরাসরি রিকশা যোগে ‘চিত্রা’ হলের সামনে হাজির হলাম। মা রিকশা গুনে লোক গুনে হিসাব মেলালেন। সব ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যা বাধলো, মেটিনি শো’র টিকিট শেষ! ইভনিং শো’র টিকিট আছে। মা হতাশ হলেও আমরা বেশ উৎফুল্ল। সিনেমাহলের সামনে বিশাল রঙিন কাপড়ের উপর লেখা, সাত ভাই চম্পা। নায়ক আজিম ঘোড়ার পিঠে বসা, গায়ে রাজা-বাদশার ড্রেস, নায়িকা কবরী আয়না হাতে দাঁড়িয়ে, একজন দরবেশ মাথায় পট্টি বাধা, হাতে লাউয়ের খোলের মতন, বুক আর হাত ভরা পাথরের মালা আর তাসবিহ দিয়ে জড়ানো। একটা গাছে সাতটা ফুল ফুটে রয়েছে। এসব দৃশ্য দেখে আমরা আরো উৎসাহী হয়ে উঠলাম, কখন সিনেমা শুরু হবে?
এমন সময় গানের বই, গানের বই, সাত ভাই চম্পার গানের বই বলে, এক ছোকড়া চিৎকার করতে লাগলো। মিনি ফুফুর আর তর সইলো না। সেখান থেকে কয়েকখানা গানের বই কিনে ফেললো। আমাকেও দিলো একখানা। মা আমাদের নিয়ে রেলক্রসিং সংলগ্ন লাইলী খালার বাসায় যেয়ে উঠলেন। যাওয়ার আগে সিনেমাহলের কর্মচারীদের সঙ্গে কী সব কথা বলে গেলেন। লাইলী খালা এতোগুলো মানুষ দেখে মোটেও অসন্তুষ্ট হলেন না। সে খুবই খুশি--আমার সাইজা বু আমাকে দেখতে এসেছে। গল্পে গল্পে সিনেমা দেখার গল্প মা লাইলী খালাকে বললেন। সংসারের কাজকর্মের জন্যে তারও অনেক দিন সিনেমা দেখা হয় নাই। এই দুঃখ বোনের কাছে প্রাণ খুলে বললেন। খালা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলেন খালুর কাছে--এই যে শুনছেন ...। খালুও বেশ নামকরা লোক ছিলেন। পাচুড়িয়ার চেয়ারম্যান ছিলেন অনেক দিন। আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারী। বিশ্রাম-খাওয়া শেষে লাইলী খালাসহ আমরা সিনেমাহলে আসবো এমন সময় খালুজান পকেট থেকে দশখানা টিকিট বের করে খালাআম্মার হাতে দিলেন; আর বললেন, হলে কোনো অসুবিধা হলে মমদু গেইটম্যানকে বলতে। মিনি ফুফু যে গানের বই কিনেছিলো সাত ভাই চম্পা’র, তার একটা গান আমরা প্রায় মুখস্থ করে ফেলেছি, কিন্তু সুর জানি না। কারণ তখনো তো সিনেমা দেখা হয়নি। গানটি ছিলো--
শোনেন শোনেন জাহাঁপনা শোনেন রানি ছয়জনা
শোনেন বলি নতুন করে পুরান ঘটনা।।
এক যে ছিলো বাদশা তাহার ঘরে ছিলো সাতটি রানি
ছোটো রানি মা হইবে লোকে করে কানাকানি
ছয় রানিতে যুক্তি করে বাদশা তাহা জানে না।।
ছোটো রানি জ্ঞান হারালো জন্ম নিলো সাতটি ছেলে
ছয় রানিতে যুক্তি করে পুঁতে রাখে মাটির তলে
পরে একটি মেয়ে হলো ছয় রানি তা জানে না।।
ছোটো রানি পাগলিনী ঘুরে বেড়ায় বনে বনে
কন্যাটি মালিনীর ঘরে বড়ো হলো দিনে দিনে
সাত ভাই তার চম্পা হলো দরবেশেরই ছলনা।।
সওদাগরের পুত্র যে এক সওদা করে হাটে হাটে
সেই কন্যার সনে তাহার দেখা হলো নদীর ঘাটে
বাদশাজাদীর রূপ দেখিয়া মন হইলো তার দিওয়ানা।।
সওদাগরের পুত্র বলে বাণিজ্যেতে যাওয়ার কালে
আজব দেখতে আয়না দিলাম, দেখতে পাবি দূরে গেলে
আরো দেখতে পাবে কন্যা আপন তোমার কয়জনা।।
নীরবে বসিয়া কন্যা আয়না দেখে আপন মনে
আহারে দুখিনি মা তার কেঁদে বেড়ায় বনে বনে
পিতা তাহার সিংহাসনে কেমন নাজুক ঘটনা।।
এই গান ছিলো তখন আমাদের মুখে মুখে। মিনি ফুফু যক্ষের ধনের মতো এই গানের বই এখানে-ওখানে লুকিয়ে রাখতো। আর সময় পেলেই বই খুলে অন্যান্য গান মুখস্থ করতো। আমাদের সিনেমা দেখা শেষ হলো রাত নটা নাগাদ। শো ভাঙতেই শুনি বাইরে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে। মানে এরপর নাইট শো শুরু হবে এবং তা শেষ হবে রাত ১২টায়। রাতে কালুখালী যাওয়ার কোনো ট্রেন নাই। সেকালে এতো রাতে চলাফেরা করার কোনো বিধানও ছিলো না। শহরে রাত ১১টার পর কেউ রাস্তায় থাকলে তাকে কৈফিয়ত দিতে হতো--এতো রাতে কোথায় যায়, কেনো যায়, কোন বাড়ির ছেলে--এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। আমরা লাইলী খালার বাসাতেই ফিরলাম। বাকি রাতটুকু খালা আর মা গল্প করে কাটিয়ে দিলেন। সে গল্পে এমন কোনো বিষয় ছিলো না, যা তারা উল্লেখ করেননি। খুব ভোরে শিলিগুড়ির ট্রেনে আমাদের তুলে দেওয়া হলো। আবার কালুখালী নেমে সেই সাঁকো ঘাটার কাছে ফিরলাম। মকসেদ মাঝি না খেয়ে নৌকায় জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে। আমাদের দেখে খুশিতে আটখান। তার যে কোনো কষ্ট হয়নি, আগাগোড়া সে ব্যাখ্যা নিজেই দিলো। রাতে এক হিন্দু বাড়ি থেকে মূলা শাক দিয়ে ভাত দিয়েছিলো কলাপাতায়, সে পেটপুরে খেয়েছে। মা তাকে লাইলী খালার দেওয়া ডিমভাজা আর পরোটা বের করে দিতেই অকপটে স্বীকার করলো--অনেক দিন পরোটার নাম শুনেছি লোকমুখে, কিন্তু কোনোদিন ভাগ্যে জোটেনি; আজ পরোটা খেলাম।
সাত ভাই চম্পার মূল কাহিনিতে ছিলো, বাদশার ছয়জন স্ত্রী; কোনো স্ত্রীরই সন্তানাদি হয় না। বংশকূল রক্ষায় বাদশা প্রায় পাগল হয়ে ওঠেন। এমন সময় এক দরবেশ তাকে স্বপ্নে দেখান, ছয় রানি তাকে সন্তান দিতে পারবে না, পারলে সপ্তম রানিই পারবেন। মৃগয়া রাজ্যে গেলে তিনি দেখা পাবেন সপ্তম রানির। বাদশা মৃগয়ায় চলে যান। তিনি দেখতে পান এক মেয়ের বাপকে অত্যাচারী পাওনাদাররা পেটাচ্ছে। মেয়েটি বাপকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে, বাপকে ছেড়ে তারা মেয়েটিকে জাপটে ধরে। মেয়েটি বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করলে বাদশা এসে তাকে উদ্ধার করেন। বাদশার ভালো লেগে যায় মেয়েটিকে। বাদশা মেয়েটির বাবার কাছে ঘটক পাঠিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দেন। মেয়ের বাবা আনন্দে সম্মতি জানান। বাদশার আগের ছয় রানি বিয়েতে বাধা দেয় না, কিন্তু ষড়যন্ত্রের ফন্দি আঁটতে থাকে। ছোটোরানি মা হতে যায়। এ সংবাদে ছোটোরানির বান্ধবী বাদশার বাড়িতে মালিনীর কাজ নেন। সন্তান প্রসবের দিন রানির হাতে আর বাদশার কোমরে সোনার শিকল বেঁধে দেওয়া হয়। যাতে সন্তান হলেই রানি শিকল ধরে টান দেবেন আর বাদশা এসে তার সন্তান দেখে যাবেন। কিন্তু অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না। কারণ ভিতরে ভিতরে ছয় রানির ষড়যন্ত্র কার্যকর হতে থাকে। ছোটোরানির সাতটি ছেলে হলে তাদেরকে মাটিকে পুঁতে ফেলা হয়। কিন্তু পরে একটি মেয়েও হয়, ছয় রানি তা দেখতে পায় না। ছোটোরানির সখি যে বাদশার বাড়িতে মালিনীর কাজ নিয়েছিলো, সে সবকিছু পরখ করে এবং মেয়েটিকে গোপনে নিয়ে তার কাছে মানুষ করতে থাকে।
(চলবে)
লেখক : মফিজ ইমাম মিলন, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক। তিনি ফরিদপুর থেকে ‘উঠোন’ নামে একটি সৃজনশীল সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
uthon.faridpur@gmail.com
https://www.facebook.com/milan.imam
বি:দ্র: প্রবন্ধটি জুলাই-২০১৯ (১৭ সংখ্যা) ম্যাজিক লণ্ঠন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন